ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

05 November, 2025

ঋগ্বেদ ৭/৪/৭

05 November 0

 

ঋগ্বেদ ৭/৪/৭

পরিষদ্যম্ হ্যরণস্য রেক্ণো নিত্যস্য রায়ঃ পতয়ঃ স্যাম।

ন শেষো অগ্নে অন‍্যজাতম্ অস্ত্যচেতনস্য মা পথম্ বিদুক্ষঃ॥

ঋগ্বেদ ভাষ্য (স্বামী দयानন্দ সরস্বতীর সংস্কৃত ভাষ্যের ভিত্তিতে)

বিষয়: আপন ধন কোনটি এবং পরধন কোনটি—এই বিষয়টিকে পরের মন্ত্রে বলা হয়েছে॥

পদার্থ

হে (অগ্নে) বিদ্বান্‌! আপনি (অচেতনস্য) চেতনাহীন মূর্খের (পথঃ) পথগুলোকে (মা) যেন না (বিদুক্ষঃ) কলুষিত করেন। (পরিষদ্যম্) সভায় যে (অন্যজাতম্) অন্য থেকে উৎপন্ন, সেই (হি) সেই (রেক্ণঃ) ধনকে এইরূপ জানুন যে এর (শেষঃ) বিশেষতা বা নিজের আত্মার দৃষ্টিতে শুদ্ধ বিবেচনার কিছুই (ন, অস্তি) নেই এমনি জানুন। আপনার সঙ্গ বা সাহায্যে আমরা (অরণস্য) সংঘর্ষহীন, (নিত্যস্য) স্থির, (রায়ঃ) ধনের (পতয়ঃ) স্বামী (স্যাম) হই॥৭॥

ভাবার্থ

হে মানুষ! ধর্মসঙ্গত পুরুষার্থে যে ধন লাভ হয়, তাকেই নিজের ধন বলে মানো; কিন্তু অন্যায়ে উপার্জিত ধনকে নিজের বলে গণ্য করো না। জ্ঞানীদের পথকে পাখণ্ডের উপদেশে কলুষিত কোরো না। যেমন ধর্মযুক্ত পুরুষার্থে ধন অর্জিত হয়, তেমনি চেষ্টা করো॥৭॥

ঋগ্বেদ ভাষ্য (হরিশরণ সিদ্ধান্তালঙ্কার)

বিষয়: ঋণগ্রস্ত হওয়ার দোষ

পদার্থ: [১] (অরণস্য) [অপার্ণস্য নি°] = ঋণমুক্ত ব্যক্তির (রেক্ণঃ) = ধন (হি) = নিশ্চয়ই (পরিষদ্যম্) = যথেষ্ট হয়। [‘পরিষদ্যং–পর্যাপ্তং’ সা°] অর্থাৎ সংসারী ধন এতটাই হওয়া উচিত যাতে আমরা ঋণগ্রস্ত না হই। প্রয়োজনগুলো পূর্ণ হতে থাকে এইরূপ ধনই আমাদের প্রাপ্ত হওয়া উচিত। আমরা সেই (রায়ঃ) = ধনের (পতয়ঃ স্যাম) = অধিপতি হই, যা (নিত্যস্য) নিত্য, অর্থাৎ ঋণ নিয়ে প্রাপ্ত নয়। ঋণ নিয়ে অর্জিত ধন তো আবার ফিরিয়ে দিতেই হবে।

[২] হে (অগ্নে) = প্রভু! আমরা যেন এইভাবে বুঝে চলি যে (অন্যজাতং শেষঃ ন অস্তি) = অন্যের থেকে জন্মানো অর্থাৎ নেওয়া ঋণে মৃত্যু থেকে মুক্তি নেই; অর্থাৎ মানুষ ঋণ নিয়ে নিজ জীবনকে অকালেই ঋণের ভারে মৃত্যুগ্রস্ত করে ফেলে। হে মানুষ! তুমি (অচেতনস্য) = তোমার পরবর্তী অজ্ঞ সন্তানদের (পথঃ) = পথগুলোকে (মা বিদুঃক্ষঃ) = কলুষিত কোরো না। তারা যেন জন্মাবস্থাতেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবন শুরু না করে। পিতার ঋণ সন্তানদের দুর্দশার কারণ হয়ে না ওঠে।

ভাবার্থ

ধনাভাব সংসারযাত্রার সবচেয়ে বড় বাধা, আর অতিরিক্ত ধন ভোগ-বিলাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রভু এমন ধন দিন যাতে আমরা ঋণগ্রস্ত না হই। ঋণকে মৃত্যুসম বিপদ জ্ঞান করো। তোমার সন্তানদের জন্য ঋণের ভার রেখে যেও না॥

এই মন্ত্রের ঋষি হলেন বসিষ্ঠ। এর অর্থ— “বশিষ্ঠঃ– প্রাণো বৈ বশিষ্ঠঃ” অর্থাৎ এই ছন্দরশ্মির উদ্ভব প্রাণ নামক মৌলিক জীবনীশক্তি থেকে ঘটে। এর দেবতা অগ্নি এবং ছন্দ ভুরিক্‌ পঙ্‌ক্তি হওয়ায় এর দৈবিক ও ছান্দসিক প্রভাবে অগ্নিতত্ত্বের বিস্তার ঘটে এবং আকর্ষণ-অনাকর্ষণ শক্তির বৃদ্ধি হয়।

আধিদেবিক ভাষ্য—
(পরিষদ্যম্‌ হি) “পরিহর্তব্যং হি নোপসর্তব্যম্‌” অর্থাৎ যে বস্তু ত্যাজ্য বা দূরে রাখার যোগ্য।
(অরণস্য, রেক্ণঃ) — [রণঃ = সংগ্রামের নাম; রেক্ণঃ = যে ব্যয় সৃষ্টি করে]
কোন বস্তু ত্যাজ্য ও দূরে রাখার যোগ্য এর উত্তর হিসেবে বলা হয়েছে
“অরণস্য রেক্ণঃ অরণোঅপার্ণো ভবতি রেক্ণ ইতি ধননাম রিচ্যতে প্রযতঃ”
অর্থাৎ যেসব পদার্থে সংঘাত বা সংযোগের প্রক্রিয়া আর ঘটে না, যাদের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত এমন নিকটবর্তী বা দূরবর্তী পদার্থ সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় ত্যাজ্য। সংযোগ-বিচ্ছেদে অংশ নিতে গিয়ে এদের শক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়, কিছু শক্তি নিঃসৃত হয়, এবং এরা সূক্ষ্ম কণারূপে মহাকাশে ছড়িয়ে থাকে।

এবার বলা হচ্ছে.. কোন পদার্থ সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় কার্যকর?

(নিত্যস্য, রায়ঃ, পতয়ঃ, স্যম্‌) “নিত্যস্য রায়ঃ পতয়ঃ স্যম্‌ পিত্র্যস্যেব ধনস্য” 
[রায়ঃ = পশু বা শক্তিসমূহ; নিত্যঃ = নিয়মিত বা নিয়ন্ত্রিত]
সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে কেবল সেই কণা বা পদার্থ, যা নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত মরুৎ বা ছন্দ-রশ্মি দ্বারা পালন ও রক্ষিত। যখন এই রশ্মিগুলো অনিয়ন্ত্রিত বা ক্ষণস্থায়ী হয়, তখন তারা সংযোগের যোগ্য থাকে না। 

[পিতরঃ = যাঁদের মধ্যে উষ্ণতার অংশ আছে] গ্রন্থকার বলেন:- যেসব পদার্থ উষ্ণতায় পরিপূর্ণ, তারাই সংযোগ-যোগ্য; উষ্ণতাহীন কণা কখনোই সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না।

(ন, শেষঃ, অগ্নে, অন্যান্যতম্‌, অস্তি) “ন শেষো অগ্নে অন্যান্যতম্‌ অস্তি শেষ ইত্যপত্যনাম শিষ্যতে प्रयतः (প্রযতঃ)” [অন্য = ভিন্ন; সপত্ন = পাপ বা প্রতিকূল শক্তি] অর্থাৎ দূরবর্তী, অনিয়ন্ত্রিত বা অসুর-প্রভাবিত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত অগ্নিতত্ত্ব শেষ অর্থাৎ কার্যরূপে নতুন অণু গঠনে অসমর্থ হয়। অর্থ এই যে অত্যধিক উত্তপ্ত পদার্থ যদি চরমভাবে অস্থির, অনিয়ন্ত্রিত, অতিদূরস্থিত কিংবা অসুর-তরঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়, তবে তা পরবর্তী ধাপের পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে না। এখানে কার্যরূপ পদার্থকে “অপত্য” ও “শেষ” উভয়ই বলা হয়েছে।

অর্থাৎ অগ্নি যখন সুপরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তখনই সে কার্যরূপ পদার্থ উৎপাদনে সক্ষম হয়; তখন অগ্নি নিজেই কার্যরূপ পদার্থে রূপান্তরিত হয় অথবা সেই পদার্থের রূপে অবশিষ্ট থাকে। উদাহরণ সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় বায়ু বা অগ্নিতত্ত্ব পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করে যথাক্রমে অগ্নি ও জলতত্ত্বে অবস্থান করে; তাই এরা পূর্ববর্তী তত্ত্বের শেষ

(অচেতনস্য, মা, পথঃ, বিদুক্ষঃ)
“অচেতযমানস্য তত্প্ৰমত্তস্য ভবতি মা নঃ পথম্‌ বিদৃদুষ ইতি”
অর্থাৎ যেসব পদার্থ দীপ্তিহীন বা জাগ্রত নয়, তারা বিভিন্ন ক্রিয়ায় বিচ্যুত হয় সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না। অগ্নিতত্ত্ব এসব প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পদার্থের পথকে বিকৃত হতে দেয় না; অর্থাৎ উপযুক্ত উষ্ণতা ও শক্তির মাধ্যমেই সূক্ষ্ম কণা ও পদার্থ নিজেদের নির্দিষ্ট পথে সক্রিয়ভাবে গমন করতে পারে এবং বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করতে সক্ষম হয়।

ভাবার্থঃ ক্ষীণ শক্তিযুক্ত কণারা সৃষ্টির যজন-প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা মহাবিশ্বে ইদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। যে কণারা নিয়ন্ত্রিত মরুদ্‌ বা ছন্দাদি রশ্মি দ্বারা যুক্ত থাকে, তারা যজন-প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। যখন মরুদাদি রশ্মি অনিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তারা সংযোজনে সক্ষম থাকে না। উষ্ণতাযুক্ত কণা সংযোজ্য, উষ্ণতাহীন কণা নয়। দূরবর্তী অনিয়ন্ত্রিত বা অসুর-পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত কণাও কোনো নতুন পদার্থ সৃষ্টি করতে পারে না। দীপ্তিযুক্ত পদার্থই পরবর্তী ধাপের পদার্থ তৈরি করতে সক্ষম হয়, দীপ্তিহীন নয়। আরও স্পষ্টতার জন্য পরবর্তী ঋচাটি পরবর্তী খণ্ডে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

“নহি গ্রভায়া অরণঃ সুশেভো’ন্যো দর্যো মনসা মন্তভা উ।
অধা চিদ্‌ অকঃ পুনরিত্স এত্যা নো বাজিক্‌ অভীষাল এ‌তু নব্যঃ ॥ ঋগ্বেদ ৭।৪।৮॥

এই মন্ত্রের ঋষি ও দেবতা পূর্বোক্ত মন্ত্রের মতোই, এবং এর ছন্দ পঙ্‌ক্তি। তাই দেবতা ও ছান্দসিক প্রভাবও মোটামুটি একই। কেবল একটি পার্থক্য এ মন্ত্রের প্রভাবে পূর্বোক্ত আকর্ষণ-প্রতিকর্ষণ শক্তির বৃদ্ধি ঘটে না, কিন্তু অগ্নিতত্ত্বের বিস্তার পূর্বের মতোই বজায় থাকে।

“ন হি গ্রহীতব্যোऽরণঃ” অর্থাৎ ক্ষণিক বলযুক্ত কণা পরস্পরের সংযোগ-বিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ যদি তাদের সংযোগ ঘটে যায়, তা অস্থির হয়, যার ফলে পরবর্তী উৎপাদের সৃষ্টি সম্ভব হয় না।

“সুশুখতমোऽপ্যন্যোদরর্যো” দূরবর্তী উখা অর্থাৎ সুদূর আকাশে অবস্থিত সপ্তদশ স্তোম নামে পরিচিত সতেরোটি গায়ত্রী রশ্মিতে যাদের সম্বন্ধে বেদবিজ্ঞান-আলোক ৩.৪২.২-এ পাঠযোগ্য বর্তমান কোনো সূক্ষ্ম পদার্থ যদিও নিজের স্থানে সৃজন-প্রক্রিয়ার জন্য সুখকর অর্থাৎ অনুকূল হয়;
“মনসাপি ন মন্তব্যঃ ময়ং পুত্র ইতি” তবুও মনত্ব দ্বারা তা অপ্রকাশিতই থাকে, অর্থাৎ সৃজন-প্রক্রিয়ার উপযোগী হয় না। কারণ এই যে, দূরস্থিত বা অসুর-পদার্থে আবৃত সেই সংযোজ্য পদার্থ নিজের স্থানে সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু দূরে অবস্থিত কোনো পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না।

[“পুত্রঃ”তস্মাদাহুঃ কর্তুরিব পুত্র ইতি (কাঠ.সং. ১৩.৩), বরো হি পুত্রঃ (কাঠ.সং. ৯.১৪)]

এই কারণে সেই দূরবর্তী পদার্থকে এখানে অবস্থিত পদার্থ নিজের উৎপাদ বা উৎপাদক বলে মানতে পারে না। এখানে ‘পুত্র’ শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ নির্মাতা এবং নিজের কর্মরূপ পদার্থ (উৎপাদ) উভয়ই গ্রহণ করতে হবে।

“অথ স অকঃ পুনরেব তদেতি যৎ আগতো ভবতি অক ইতি নিবাসনামোচ্যতে” অর্থাৎ এরপরও সে চলে যায় সেই স্থানে, যেখান থেকে এসেছে। এর তাৎপর্য এই যে, দূরবর্তী পদার্থ যদি কোনো আকর্ষণবলে আকৃষ্ট হয়ও, তা কিছুদূর এসে আবার পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে যায়। অনুরূপভাবে কোনো অণু যদি দৃঢ় বলযুক্ত হয় এবং কোনোভাবে ভাঙে এবং তার কিছু আয়ন অন্য কোনো আয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়, কিন্তু তাদের মধ্যবর্তী বন্ধনবল দুর্বল হয়, তবে সেই আয়ন ভেঙে পূর্ব-অণুর রূপ গ্রহণ করে। এখানে উদ্দেশ্য এই যে, আয়নদের মিলন দ্বারা অণু-গঠনের একটি নিয়মযুক্ত প্রক্রিয়া আছে।

“এতু নো বাজী বেজনবান্‌ অভিঋষমানঃ সপত্নান্‌ নবজাতঃ স এব পুত্র ইতি” এখানে ‘নঃ’ সর্বনামটি সেই কণাদের জন্য ব্যবহৃত, যারা সংযোগের ইচ্ছুক। ফলে এই পাদের অর্থ এই কণারা এমন নূতন উৎপন্ন কণার কামনা করে, যাদের উপযুক্ত বেগ ও শক্তি আছে এবং যারা বাধক অসুর-প্রভৃতি পদার্থকে কম্পিত ও দমনে সক্ষম। এখানে ইঙ্গিত এই যে, কোনো ক্ষেত্রে যেসব কণা সংযোজনে উপযুক্ত, সেই ধরনের কণাই ঐ ক্ষেত্রে উৎপন্ন হতে থাকে। তারা পূর্ব-উৎপন্ন কণাদের অপত্য অর্থাৎ কর্মরূপ। পাশাপাশি তারা সংযোগাদি ক্রিয়ায়ও শ্রেষ্ঠ, তাই তাদের ‘পুত্র’ বলা হয়েছে।

Read More

03 November, 2025

ঋগ্বেদ ১০/২৮/৩

03 November 0

ঋগ্বেদ ১০/২৮/৩
ঋগ্বেদ ১০.২৮.৩-এর সঠিক অর্থ ও গোমাংস ব্যাখ্যার খণ্ডন


🌼 ভুল ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ

কিছু আধুনিক লেখক, বিশেষত পশ্চিমা দার্শনিক ও কিছু “বেদবিরোধী” অনুবাদক, ঋগ্বেদের ১০.২৮.৩ মন্ত্রে “বৃষভা পচন্তি” অংশটি দেখে দাবি করেছেন— “তাহারা ষাঁড় রান্না করে এবং ইন্দ্রকে তা ভক্ষণ করতে বলা হয়েছে।” এই ব্যাখ্যা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ও বেদীয় ব্যাকরণ অনুসারে সম্পূর্ণ ভুল।


🕉️ অপ্রামাণিক সংস্কৃত পাঠ

পচস্তি তে বৃষভা অৎসি তেষাম

এটি আসলে ঋগ্বেদ ১০.২৮.৩ মন্ত্রেরই একটি মাত্র অংশ মূল মন্ত্রটি নীম্নে দেওয়া হলঃ

প্রামাণিক পাঠ (ঋগ্বেদ ১০।২৮।৩)

অদৃণা তে মন্দিন ইন্দ্র তূযান্ত্‌সুন্বন্তি সোমান্‌ পিবসি ত্বমেষাম্‌।
পচন্তি তে বৃষভাঁ অত্সি তেষাং পৃক্ষেণ যন্মঘবন্ন্‌ হূযমানঃ॥

“বৃষভ” শব্দের ভাবার্থ পরিপক্বতা বা সম্পূর্ণ বিকাশ বোঝায়।

 বৈদিক সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে একটি বিশ্লেষণ

পদার্থঃ (ইন্দ্র) হে আত্মা! অথবা হে রাজন! (তে) তোমার জন্যে, (অদৃণা) প্রশংসাকারী বৈদ্য বা পুরোহিত দ্বারা প্রেরিত, (মন্দিনঃ) তোমাকে আনন্দিত করা পারিবারিক জন বা রাজকর্মচারী, (তূয়াৎ সোমান্ সুন্বন্তি) রসময় সোমপদার্থ (অর্থাৎ শক্তিদায়ক রস) প্রস্তুত করে,(তেষাম্ ত্বং পিবসি)  তুমি তা পান করো, এবং (তে) তোমার জন্যে, (বৃষভান্ পচন্তি) সুখবর্ষণকারী ভোগ্য বস্তুকে প্রস্তুত করে, (মঘবন্ পৃক্ষেণ হূয়মানঃ) হে আত্মা! অথবা হে রাজন! স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক দ্বারা আহ্বানিত হয়ে, (তেষাম্ অত্সি)  তুমি তাদের ভোগ করো। ॥৩॥

ভাবার্থঃ যখন আত্মা শরীরে অবতীর্ণ হয়, তখন তাকে অনুমোদনকারী বৈদ্য এবং আনন্দদানকারী পারিবারিক জনেরা নানা রকমের রস ও ভোগ্যবস্তু তার জন্য প্রস্তুত করে, এবং স্নেহসহকারে তাকে খাওয়ায়–পান করায়, যাতে দেহ ক্রমে পুষ্ট হতে থাকে। একইভাবে, যখন রাজা রাজপদে অধিষ্ঠিত হন, তখন তার প্রশংসাকারী পুরোহিত ও সন্তুষ্টিদায়ক রাজকর্মচারীরা সোমাদির মতো ঔষধি রস এবং নানান ভোগ্য বস্তু তার জন্য প্রস্তুত করে। রাজা, স্নেহভরে ও সম্মানসহ যাদের দ্বারা আহ্বানিত হন, তিনি সেই সকল প্রস্তুত ভোগ্যবস্তুর আস্বাদ গ্রহণ করেন। ॥৩॥

(ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক কর্তৃক হিন্দি পদার্থ ও ভাবার্থের বাংলা অনুবাদ)

अद्रि॑णा ते म॒न्दिन॑ इन्द्र॒ तूया॑न्त्सु॒न्वन्ति॒ सोमा॒न्पिब॑सि॒ त्वमे॑षाम् । 

पच॑न्ति ते वृष॒भाँ अत्सि॒ तेषां॑ पृ॒क्षेण॒ यन्म॑घवन्हू॒यमा॑नः ॥

পদার্থঃ [১] পূর্ববর্তী মন্ত্রে প্রভু জীবকে "সুত সোম" (অর্থাৎ পরিশুদ্ধ শক্তিময়) হতে বলেছিলেন। তার উত্তর দিতে গিয়ে সে বলে—হে (ইন্দ্র) = সোমপানকারী প্রভু! (তে মন্দিনঃ) = তোমার স্তোতা ভক্তগণ, (অদৃণা) = [অদ্রিঃ = বজ্রঃ] ক্রিয়াশীলতার দ্বারা, অথবা [না দীর্যতে] ধর্মমার্গ থেকে বিচ্যুত না হয়ে, (তূয়ান্) = বিলম্ব না করে, অর্থাৎ দ্রুত কর্মসম্পাদনের শক্তি প্রদানকারী, (সোমান্) = সোমরূপ শক্তিকণসমূহকে (সুন্বন্তি) = উৎপন্ন করে। (ঐষাম্) = এই সোমকণগুলির (ত্বম্) = আপনিই (পিবসি) = পান করেন অর্থাৎ এই সোমকণসমূহ আমার শরীরে আপনার কৃপায় সংরক্ষিত থাকে। আপনার স্মরণ আমাকে কামনা বাসনা থেকে উপরে তুলে আনে, এবং কামনা থেকে উর্ধ্বে উঠার ফলে আমি সোমকে (অর্থাৎ আত্মশক্তিকে) রক্ষা করতে সক্ষম হই।

[২] এইভাবে, (তে) = তোমার এই ভক্তগণ (বৃষভান্ পচন্তি) = অর্থাৎ পরিপক্ব ও শক্তিশালী পুরুষে রূপান্তরিত হয়, শক্তিশালী হয়ে তারা অপরের উপর সুখের বর্ষণ ঘটায়।

[৩] হে প্রভু! আপনি (তেষাম্) = তাদের পথের অন্তরায়রূপ বাধাসমূহের (অত্সি) = বিনাশ করেন [‘অদ্’ = ধ্বংস করা]। কিন্তু এই বাধা-বিঘ্নের বিনাশ আপনি কখন করেন? (যৎ) = যখন (পৃক্ষেণ) = [পৃচি = সংস্পর্শ] আপনার সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে, হে (মঘবন্) = ঐশ্বর্যশালী প্রভু! আপনি (হূয়মানঃ) = আহ্বান করা হন। এই ভক্তগণ প্রাতে ও সায়ং আপনার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্থাপন করে, এবং শক্তিশালী হয়ে, সমস্ত বাধা দূর করে, অগ্রসর হয়।

ভাবার্থঃ ক্রিয়াশীলতার মাধ্যমে আমরা কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে রক্ষা করব। সোম (অর্থাৎ আত্মশক্তি ও সত্ত্বগুণ) সংরক্ষণের দ্বারা নিজেদের শক্তিশালী করে তুলব। প্রভুর সংস্পর্শে এসে, শক্তিসঞ্চয় করে, বাধা-বিঘ্ন দূর করে আমরা দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হব।

(হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারজীর হিন্দি পদার্থ ও ভাবার্থের বাংলা অনুবাদ)

📘 পদার্থ বিশ্লেষণ

শব্দ ধাতু / উৎস নিরুক্ত / সূত্র প্রামাণিক অর্থ রূপক ভাব
পচন্তি (pachanti) √पच্ (ধাতু) নিরুক্ত ১.১.১.১২  “সিদ্ধ করা”, “পরিপক্ব করা” সিদ্ধ করে / পরিপক্ব করে আধ্যাত্মিক বিকাশ সাধন
বৃষভাঃ (vṛṣabhāḥ) √वृष্ ধাতু নিরুক্ত ৯.২৩.১  “বলবান”, “শক্তিশালী ব্যক্তি” বলবান মানুষ সাধক, পরিপক্ব কর্মযোগী
অদ্রিণা (adriṇā) अद्रि (পাথর / দৃঢ়তা) নিরুক্ত ৫.৫.১  “দৃঢ় কর্মশক্তি” দৃঢ়তার দ্বারা অধ্যবসায় ও সাধনার প্রতীক
তে মন্দিনঃ (te mandinaḥ) মন্দিন = স্তোতা নিরুক্ত ৭.৩.১ তোমার ভক্তগণ উপাসকরা
অৎসি (atsi) √अद্ ধাতু নিরুক্ত ৬.৩.৪ “খাওয়া” বা “ধ্বংস করা” তুমি ধ্বংস করো এখানে “বাধা বিনাশ করা” অর্থে
মঘবন (maghavan) নামরূপ ইন্দ্রের নিরুক্ত ৪.১৯.৮ ঐশ্বর্যশালী / দাতা ঈশ্বররূপ প্রভু
হুয়ামাহ্ (hūyamānaḥ) √हु ধাতু নিরুক্ত ১.৫.৫  “আহ্বান করা” আহ্বানিত যজ্ঞে আহ্বান প্রাপ্ত হওয়া

🪔 সংস্কৃত থেকে সঠিক বাংলা অনুবাদঃ 

(ইন্দ্র) হে আত্মন! অথবা রাজন! (তে) তোমার জন্য (অদ্রিণা) স্তোত্রকার কবি, চিকিৎসক বা পুরোহিতের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে “অদ্রিরসি শ্লোককৃত্” [কাঠক সংহিতা ১।৫] (মন্দিনঃ) তোমাকে আনন্দিতকারীরা, তোমার পারিবারিক সদস্যগণ বা রাজকর্মচারিগণ (তূয়ান্ সোমান্ সুন্বন্তি) জলে পরিপূর্ণ, রসে পরিপূর্ণ “তূয়ম্ উদকনাম” [নিঘন্টু ১।৯]এমন সোমরস প্রস্তুত করে; (তেষাম্ ত্বং পিবসি)তুমি সেগুলি পান করো “লিঙ্গার্থে লেট্” [অষ্টাধ্যায়ী ৩।৪।৭]; আবার (তে) তোমার জন্য (বৃষভান্ পচন্তি)সুখ ও রসের বর্ষণকারী বস্তুসমূহ প্রস্তুত করে “বৃষভঃ যঃ বর্ষতি সুখানি সঃ” [ঋগ্বেদ ১।৩১।৫ দয়ানন্দ], “বৃষভঃ বর্ষিতা আপাম্” [নিরুক্ত ৪।৮]; (মঘবন্) হে ঐশ্বর্যবান প্রভু! (পৃক্ষেণ) স্নেহ-সম্পর্ক দ্বারা (হূয়মানঃ) আহ্বানিত বা নিমন্ত্রিত হয়ে (তেষাম্ অত্সি)তুমি তাদের ভোগ করো বা উপভোগ করো ॥


🚫 ভুল অনুবাদের খণ্ডন

ভুল দাবি সঠিক ব্যাখ্যা
“বৃষভা” মানে ষাঁড় “বৃষভ” মানে শক্তিমান ব্যক্তি, ঈশ্বর বা জ্ঞানবান
“পচন্তি” মানে রান্না করা “পচন্তি” মানে পরিপক্ব করা, উন্নত করা, সিদ্ধ করা
“অৎসি” মানে খাওয়া “অৎসি” মানে ধ্বংস করা / রক্ষা করা
“গোমাংস ভক্ষণ” প্রসঙ্গ কোথাও নেই  মন্ত্রটি শক্তি, ভক্তি ও সাধনার রূপক প্রকাশ

📜 পাণিনি ও নিরুক্ত সূত্র প্রমাণ

১. পাণিনি অষ্টাধ্যায়ী ৭.১.৫১: “वृषस्यति गोः”-  এখানে “বৃষ” শব্দে “গো” অর্থে নয়, বরং বলবান রূপে ব্যবহৃত।
২. নিরুক্ত (৯.২৩.১): “वृषो बलवां नरः” - বৃষ মানে বলবান মানুষ।
৩. নিরুক্ত (১.১.১.১২): “पच् = सिध्यति” - সিদ্ধ করা, উন্নত করা।


🌸 উপসংহার

ঋগ্বেদ ১০.২৮.৩ মন্ত্রটি গোমাংস ভক্ষণ বা পশুবলি নির্দেশ করে না।
বরং এটি বলে—মানুষকে দৃঢ় কর্ম, সাধনা ও ঈশ্বরস্মরণের দ্বারা শক্তিমান হতে হবে,
তখন প্রভু তার সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করে পথ প্রসারিত করেন।

অতএব, “ষাঁড় রান্না” বা “গোমাংস ভক্ষণ” ব্যাখ্যা কেবল ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি।
এই মন্ত্র আসলে কর্মশক্তি, বোধ ও ঈশ্বরযোগের প্রতীকী স্তব।

📚 ৫. সায়ণাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ীঃ

“वृषभान् पचन्ति इति बलीयान् पुरुषान् परिपच्य भवन्ति।”
(Rigveda with Sāyaṇa Bhāṣya, Nirnaya Sagar Edition, Vol. 4, p. 532)

অর্থাৎ, “বৃষভান্ পচন্তি” মানে— ভক্তরা নিজেদের পরিপক্ব বা শক্তিশালী করে তোলে, এটা না যে তারা পশু রান্না করে।


Read More

27 October, 2025

অথর্ববেদ ১৪/১/১৯

27 October 0

অথর্ববেদ ১৪/১/১৯

অথর্ববেদ ১৪/১/১৯ (মন্ত্রাঃ ৬-৬৪। বিবাহসংস্কারোপদেশঃ-)

ঋষিঃ — আত্মা। দেৱতা — তৃষ্টুপ্। ছন্দঃ — সবিত্রী, সূর্যা। সূক্তম্ — বিবাহ প্রकরণ সূক্ত।

প্র ত্বাম্ উঞ্চামি বরুণস্য পাশাত্, যেন ত্বা অভধ্নাত্ সবিতা সুশেভাঃ। ঋতস্য যোনৌ সুকৃতস্য লোকে, স্যোনং তে অস্তু সহসংভলায়ৈ॥

(বরুণস্য) বরণ যোগ্য শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর সম্বন্ধী (পাশাৎ) প্রেম-বন্ধন থেকে (ত্বা) হে বধু ! তোমাকে (প্র মুঞ্চামি) আমি মুক্ত করি, (যেন) যে প্রেম-বন্ধন দ্বারা (সুশেবাঃ) উত্তম সুখদাতা (সবিতা) জন্মদাতা পিতা (ত্বা) তোমাকে (অবধ্নাৎ) বন্ধন করেছিল। (ঋতস্য) সত্য নিয়মের (যোনৌ) আমার গৃহে, তথা (সুকৃতস্য) সুকর্মীদের (লোকে) সমাজে, (সহসম্ভলায়ৈ, তে) সম্যগ্ভাষী পতির সাথে বর্তমান তোমার জন্য (স্যোনম্) সদা সুখ (অস্তু) হোক।

[সুশেবাঃ=সু + শেবম্ সুখনাম (নিঘং০ ৩।৬)। যোনিঃ গৃহনাম (নিঘং০ ৩।৪) সম্ভল=সম্ (সম্যক্) + ভল (পরিভাষণে), অর্থাৎ সম্যগ্ভাষী, প্রেমপূর্বক ভাষণকারী পতি (মন্ত্র ৩১)। স্যোনম্ সুখনাম (নিঘং০ ৩।৬)। সহসম্ভলায়ৈ= সম্ভলেন সহ বর্ততে ইতি সহসম্ভলা, তস্যৈ] [ব্যাখ্যা–বরুণ অর্থাৎ সংসারের সম্রাট্ পরমেশ্বরের বন্ধন, সংসারকে বেঁধে রেখেছে। মাতা-পিতা এবং সন্তানদের, পতি এবং পত্নীর পারস্পরিক প্রেমবন্ধনও একটি বন্ধন যার রচনা প্রভু সৃষ্টিতে করে রেখেছেন। এই প্রেমবন্ধনের সত্তা পশুদের, পক্ষীর তথা কীট-পতঙ্গের মধ্যেও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রাণিসৃষ্টির সৃজন হচ্ছে। বর বলে— হে বধু ! এখনও পর্যন্ত তো এই প্রেমবন্ধন দ্বারা তোমার সুখী মাতা-পিতা তোমাকে বেঁধে রেখেছিল, কিন্তু এখন থেকে আমি তোমাকে নিজের প্রেমবন্ধন দ্বারা আবদ্ধ করি। এইভাবে বর নিজের হার্দিক প্রেমের বিশ্বাস বধূকে দেয়। সাথে বর বলে এই নতুন ঘরে সত্যের রাজ্য আছে। এই ঘরে তুমি সদা সুখপূর্বক থাকবে, এবং আমি সদা সম্যগ্ভাষী হয়ে তোমার জন্য সুখদায়ী হবো।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার জীর টিপ্পণী সহঃ অর্থ

ক্ষেমকরণ ত্রিবেদীকৃত পদার্থ ভাস্যঃ 
[হে বধূ !] (ত্বা) তোমাকে (বরুণস্য) প্রতিরোধের (পাশাৎ) বন্ধন থেকে (প্র মুঞ্চামি) আমি [বর] উত্তমরূপে মুক্ত করি, (যেন) যার সাথে (ত্বা) তোমাকে (সুশেবাঃ) অত্যন্ত সেবাযোগ্য (সবিতা) জন্মদাতা পিতা (অবধ্নাৎ) বেঁধেছে। (ঋতস্য) সত্য নিয়মের (যোনৌ) ঘরে এবং (সুকৃতস্য) সুকৃত [পুণ্য কর্মের] (লোকে) সমাজে (সহসম্ভলায়ৈ) সখীদের সহিত বর্তমান (তে) তোমার জন্য (স্যোনম্) আনন্দ (অস্তু) হোক ॥১৯॥

যে কন্যাকে পিতা যোগ্য পতি প্রাপ্তির পূর্বাবস্থা পর্যন্ত ধরে রেখেছিল, তাঁকে পিতার ঘর থেকে প্রসন্নতার সহিত নিয়ে বর প্রেমপূর্বক রাখুক এবং ঘরের সব ধর্মাত্মা বিদ্বান্ স্ত্রী-পুরুষ শ্রেষ্ঠ ব্যবহার করে তাঁকে সুখ প্রদান করুক ॥১৯॥মন্ত্র ১৮ এর টিপ্পণী দেখো ॥
Read More

অথর্ববেদ ১৭/১/৩০

27 October 0

অথর্ববেদ ১৭/১/৩০

অথর্ববেদ ১৭।১।৩০ 

অগ্নিঃ মা গোপ্তা পরি পাতু বিশ্বতঃ, উদ্যন্তঃ সূর্যঃ নুদতাম্ মৃত্যুপাশান্। ব্যুছন্তী ঋষসঃ পর্বতা ধ্রুৱাঃ, সহস্রং প্রাণা ময়্যা যতন্তাম্॥

পদার্থঃ (গোপ্তা) রক্ষক/রক্ষাকারী (অগ্নিঃ) জ্ঞানময় পরমেশ্বর (বিশ্বতঃ) সব দিক থেকে (মা পরি পাতু) আমার রক্ষা করেন/করুক, (উদ্যন্) উদীয়মান (সূর্যঃ) সর্বপ্রেরক পরমাত্মা (মৃত্যুপাশান্) মৃত্যুর বন্ধন-সমূহকে (নুদতাম্) দূর করেন/করুক। (ব্যুচ্ছন্তীঃ) বিশেষ চমকিত (উষসঃ) প্রভাতবেলা, (ধ্রুবাঃ) দৃঢ় (পর্বতাঃ) পাহাড় এবং (প্রাণাঃ) সব প্রাণ [শারীরিক এবং আত্মিক বল] (সহস্রম্) সহস্র প্রকারে (ময়ি) আমার মধ্যে (আ যতন্তাম্) সবদিক থেকে প্রচেষ্টা করতে থাকুক ॥৩০॥

ভাবার্থঃ মনুষ্য পরমেশ্বরের আশ্রয় নিয়ে অমর অর্থাৎ যশস্বী হয়ে সব কাল/সময়কে, সব উঁচু-নীচু অবস্থাকে এবং শারীরিক ও আত্মিক বলকে অনুকূল করুক ॥৩০॥

টিপ্পণীঃ [মন্ত্রে অগ্নি এবং সূর্য পরমেশ্বর বাচক [মন্ত্র ৬ এর ব্যাখ্যা], কেননা অগ্নি অর্থাৎ সর্বাগ্রণী পরমেশ্বরই সবদিক থেকে পূর্ণরক্ষা করার ক্ষেত্রে সমর্থ। তথা পরমেশ্বরই হৃদয়াকাশে উদিত হয়ে, নিজ জ্যোতি দ্বারা অবিদ্যান্ধকার দূর করে মৃত্যু অর্থাৎ জন্ম-মরণের ফাঁদ থেকে মুক্তি প্রদান করতে পারেন। যথা "তমেব বিদিত্বাতি মৃত্যুমেতি" (যজু০ ৩১।১৮)। উষসঃ= ঊষা কালের সাত্ত্বিক সময়, তথা পর্বতীয় শুদ্ধ বায়ুর সেবন, এবং এগুলোর দ্বারা প্রাণ-সমূহের শুদ্ধ হওয়া,–এই উপায়গুলোর দ্বারা জীবনে শক্তি সঞ্চার হলে ব্যক্তি প্রচেষ্টাশীল হয়/হয়ে যায়। সহস্র প্রাণাঃ শরীরের প্রত্যেক অবয়ব এবং অঙ্গে, তথা অঙ্গের প্রকোষ্ঠে (cells) নিজ নিজ শক্তি নিহিত রয়েছে যাকে প্রাণ বলা হয়। এই দৃষ্টিতে প্রাণ-সমূহকে সহস্রম্ বলা হয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাসও প্রাণ। জীবনে এগুলোর সংখ্যা অসংখ্য। এইভাবে প্রাণ, অপান, ব্যান, সমান, উদান এগুলোও প্রাণ। এই দৃষ্টিতে প্রাণ-সমূহের জন্য সহস্ত্রম্ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। পর্বতাঃ ধ্রুবাঃ= পর্বত-এর দুটি অর্থ, (১) মেঘ (নিঘং০ ১।১০) তথা পার্থিব পর্বত। পার্থিব পর্বত ধ্রুব/স্থির, মেঘ অধ্রুব। মন্ত্রে অগ্নি দ্বারা অগ্নিহোত্রের অগ্নি তথা সূর্য দ্বারা দ্যুলোকস্থ সূর্যেরও গ্রহণ অভিপ্রেত হয়েছে। অগ্নিহোত্রের অগ্নি স্বাস্থ্যকারী তথা রোগ বিনাশক সামগ্রীর আহুতির দ্বারা, তথা সূর্য নিজ জ্যোতি তথা তেজ দ্বারা জীবনের রক্ষা করে, আয়ু বৃদ্ধি করে, শীঘ্র মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর সাথে-সাথে ঊষাকালের সেবন তথা পর্বতবাস আদি দ্বারা প্রাণশুদ্ধি আদিও আয়ুবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়] টীকাঃ বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার


Read More

অথর্ববেদ ১৭/১/২১

27 October 0

অথর্ববেদ ১৭/১/২১

রুচিরসি রোচোऽসি। স যথা ত্বং রুচ্যা রোচোऽস্যেবাহং পশুভিশ্চ ব্রাহ্মণবৰ্চসেন চ রুচিষীয়॥

পদার্থঃ [হে পরমেশ্বর !] তুমি (রুচিঃ) প্রীতিরূপ (অসি) হও, তুমি (রোচঃ) প্রীতিকর (অসি) হও। (সঃ ত্বম্) সেই তুমি (যথা) যেমন (রুচ্যা) প্রীতি সহিত (রোচঃ) প্রীতিকর (অসি) হও, (এব) তেমনই (অহম্) আমি (পশুভিঃ) প্রাণীদের সহিত (চ চ) এবং (ব্রাহ্মণবর্চসেন) ব্রাহ্মণদের [ব্রহ্মজ্ঞানীদের] সমান তেজ সহিত (রুচিষীয়) রুচি করি ॥২১॥

ভবার্থঃ যেমন পরমাত্মা আমাদের সাথে প্রীতি করে অনেক উপকার করেন, তেমনই আমরা মহাত্মাদের সমান সব প্রাণীদের এবং বেদজ্ঞান দ্বারা প্রীতি করে সদা উপকার করি ॥২১॥

টিপ্পণীঃ [রুচিঃ, রোচঃ=রুচ্ দীপ্তৌ, অভিপ্রীতৌ চ। সংসারের উৎপত্তি, স্থিতি, প্রলয়ে পরমেশ্বরের কোনো স্বার্থ নেই, জীবাত্মার ভোগ এবং অন্ত/শেষে অপবর্গ অর্থাৎ মোক্ষের নিমিত্ত/জন্য, প্রেমবশ হয়ে, সে উৎপত্তি আদি কার্য করে। "তত্ত্বসমাস" সাংখ্য সূত্রে সূত্র রয়েছে "অনুগ্রহ সর্গঃ"। (তত্ত্ব সমাস, সূত্র ১৭) অর্থাৎ সৃষ্টি পরমেশ্বরের কেবল অনুগ্রহ, দয়া এবং প্রেমের প্রদর্শন। উপাসকও সকলের প্রেমপাত্র হতে চায়। এরজন্য সে পরমেশ্বরের কাছে পশুদের এবং ব্রাহ্মণবর্চসের যাচনা করে যাতে সে পশুদের দ্বারা সর্বোপকার করতে পারে, তথা ব্রহ্মবেত্তাদের তেজ সমান তেজ প্রাপ্ত করে সকলের আধ্যাত্মিক উন্নতি করে তাঁদের প্রেমের পাত্র হতে পারে। রুচিঃ- Liking, love (আপ্টে)]

Read More

অথর্ববেদ ১৭/১/২০

27 October 0

অথর্ববেদ ১৭/১/২০

শুক্রোऽসি ভ্রাজোऽসি। স যথা ত্বং ভ্রাজতা ভ্রাজোऽস্যেবাহং ভ্রাজতা ভ্রাজ্যাসম্॥

আয়ুর্বৃদ্ধ্যর্থমুপদেশঃ
পদার্থঃ [হে পরমেশ্বর !] তুমি (শুক্রঃ) শুদ্ধ [স্বচ্ছ নির্মল] (অসি) হও, তুমি (ভ্রাজঃ) প্রকাশমান (অসি) হও। (সঃত্বম্) সেই তুমি (যথা) যেমন (ভ্রাজতা) প্রকাশমান স্বরূপের সাথে (ভ্রাজঃ) প্রকাশমান (অসি) হও, (এব) তেমনই (অহম্) আমি (ভ্রাজতা) প্রকাশমান স্বরূপের সাথে (ভ্রাজ্যাসম্) প্রকাশমান থাকি ॥২০॥

ভাবার্থঃ জগদীশ্বরের প্রকাশস্বরূপের ধ্যান করে মনুষ্য বিদ্যা আদি উত্তম গুণ দ্বারা সংসারে তেজস্বী হোক॥২০॥

টিপ্পণীঃ 
[সূর্য পবিত্র তথা ভূমণ্ডলকে পবিত্র করছে। সূর্য, পরমেশ্বরের প্রকাশ দ্বারা, প্রকাশিত হচ্ছে, "তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি" (মুণ্ডক ২।১০)। উপাসক ইচ্ছা প্রকট করে, আমিও পরমেশ্বরের প্রকাশ প্রাপ্ত করে প্রকাশিত হবো। এইভাবে মন্ত্রে মুখ্য রূপে সূর্যের বর্ণনা হয়েছে, এবং সাথে, সূর্যকে প্রদীপ্তকারী পরমেশ্বরেরও বর্ণনা হয়েছে। ভ্রাজতা=ভাজৃ দীপ্তৌ+শতৃ (কর্তরি)। "যোঽসাবাদিত্যে পুরুষঃ সোঽসাবহম্। ওঽম্ খং ব্রহ্ম" (যজু০ ৪০।১৭)]
Read More

অথর্ববেদ ১৭/১/১৯

27 October 0

অথর্ববেদ ১৭/১/১৯

অসতিসত্প্রতিষ্ঠিতং সতি ভূতং প্ৰতিষ্ঠিতম্। 
ভূতং হ ভব্য আহিতং ভব্যং ভূতে প্ৰতিষ্ঠিতং তবেদ্বিষ্ণো বহুধা বির্যাণি। 

ত্বং নঃ পৃণীহিপশুভির্বিশ্বরূপৈঃ সুধায়াং মা ধেহি পরমে ব্যোমন্॥

আয়ুর্বৃদ্ধ্যর্থমুপদেশঃ--

পদার্থঃ (অসতি) অনিত্য [কার্যে] (সৎ) নিত্য বর্ত্তমান [আদিকারণ ব্রহ্ম] (প্রতিষ্ঠিতম্) প্রতিষ্ঠিত/স্থিত, এবং (সতি) নিত্য [ব্রহ্মের] মধ্যে (ভূতম্) সত্তাবান জগৎ [অথবা পৃথিবী আদি ভূতপঞ্চক] (প্রতিষ্ঠিতম্) প্রতিষ্ঠিত/স্থিত। (ভূতম্) ভূত/অতীত (ভব্যে) ভবিতব্যের মধ্যে (হ) নিশ্চিতরূপে (আহিতম্) স্থাপিত, এবং (ভব্যম্) ভবিতব্য (ভূতে) অতীতের মধ্যে (প্রতিষ্ঠিতম্) প্রতিষ্ঠিত/স্থিত, (বিষ্ণো) হে বিষ্ণু ! [সর্বব্যাপক পরমেশ্বর] (তবইৎ) তোমারই (বীর্যাণি) বীরকর্ম [পরাক্রম] (বহুধা) অনেক প্রকার। (ত্বম্) তুমি (নঃ) আমাদের (বিশ্বরূপৈঃ) সব রূপবিশিষ্ট (পশুভিঃ) প্রাণীদের দ্বারা (পৃণীহি) ভরপূর করো, (মা) আমাকে (পরমে) সর্বোচ্চ/পরম (ব্যোমন্) বিশেষ রক্ষাপদে (সুধায়াম্) পূর্ণ পোষণশক্তির মাঝে (ধেহি) রাখো/ধারণ করো ॥১৯॥

ভবার্থঃ যে ওম্ তৎসৎ পরমাত্মা নিজের মহিমা দ্বারা সকলের আদি কারণ হয়ে সকলের ভেতরে/অভ্যন্তরে এবং বাহিরে এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমানে একরস/সমানভাবে ব্যাপক হয়ে সব ব্রহ্মাণ্ডকে ধরে রেখেছেন, আমরা সবাই উনার উপাসনা করে সুখী হই ॥১৯॥

টিপ্পণীঃ
[অসতি সৎপ্রতিষ্ঠিতম্ =অসৎ অর্থাৎ সদ্রূপে অপ্রতীত প্রকৃতি হল কারণ, উপাদান-কারণ, এবং সৎ অর্থাৎ বিদ্যমান জগৎ হল কার্য। কার্যের স্থিতি উপাদান-কারণের মধ্যে দর্শানো হয়েছে। ইহার দ্বারা সৎকার্যবাদের সিদ্ধান্তের পরিপুষ্টি হয়। সৎকার্য নিজ উপাদান-কারণের মধ্যে শক্তি রূপে থাকে; উপাদান-কারণ থেকে-উৎপন্ন হওয়ার-যোগ্যতা রূপে থাকে, যেমন অঙ্কুর, নিজের কারণ বীজের মধ্যে উৎপন্ন হওয়ার যোগ্যতা-রূপে থাকে। "সতি ভূতম্” “ভব্যে ভূতম্” “ভূতে ভব্যম্" = এগুলোর অভিপ্রায় এটাও হয়, "সত অর্থাৎ বিদ্যমান পদার্থে উহার ভূতরূপ অর্থাৎ অতীতরূপও থাকে," এবং "ভব্য অর্থাৎ যে পদার্থ উৎপন্ন হবে উহার মধ্যেও উহার ভূতরূপ অর্থাৎ অতীত-রূপ নিহিত থাকে, “তথা ভূত পদার্থের মধ্যে উহার ভব্য/ভবিষ্যত/ভবিতব্যরূপও স্থিত থাকে"। তবেই মহাযোগী ত্রিকাল-দর্শী হতে পারে। এইজন্য যোগ-এ বলা হয়েছে “পরিণামত্রয়সংয়মাদতীতানাগতজ্ঞানম্" (যোগ০ ৩।১৬) অর্থাৎ তিনটি পরিণামে সংযম করলে ভূত এবং ভবিষ্যতের জ্ঞান হয়, ইহার কারণ যোগ-এ ইহা দর্শানো হয়েছে “ক্রমান্যত্বং পরিণামান্যত্বে হেতুঃ" (যোগ০ ৩।১৫), অর্থাৎ যে যে পদার্থের মধ্যে উহার যে যে রূপ প্রথম উৎপন্ন হয়ে যায়/হয়, এবং যা যা ভবিষ্যতে হবে, এই সবকিছুর মধ্যে ক্রম নিয়ত রয়েছে। ক্রম-এর ভেদ/পার্থক্যই পরিণামের ভেদ/পার্থক্যের কারণ, নিয়ামক, অতঃ যে যোগী বস্তুর উৎপত্তির এই নিয়ত ক্রমকে জেনে নেয় সে সেই বস্তুর ভূতরূপ এবং ভাবী/ভবিতব্য রূপেরও দ্রষ্টা হয়ে যায়। যোগ-এ অন্য সূত্রগুলোতে ত্রিকাল দ্রষ্টৃত্ব-এর পর্যাপ্ত বর্ণনা হয়েছে২] [১. মন্ত্রোক্ত সিদ্ধান্তকে নিম্নলিখিত দৃষ্টান্ত দ্বারা সুগমতাপূর্বক বোঝা যেতে পারে। যথাঃ - মাটি থেকে/দ্বারা ঘড়া/কলস তৈরি হয়েছে। সৎ-ঘড়া মাটি রূপ কারণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, নিজের স্থিতি রাখে। ইহাই । "অসতি সৎ প্রতিষ্ঠিতম্" অর্থাৎ প্রকৃতিতে সৎ জগতের স্থিতি। যেমন মাটি থেকে/দ্বারা নির্মিত ঘড়া-এর মধ্যে, ঘড়া/কলসের পূর্বরূপ যে মাটি তা স্থিত থাকে, এইভাবে "সতি ভূতং প্রতিষ্ঠিতম্” অর্থাৎ সৎ-জগতে, জগতের ভূতরূপ অর্থাৎ পূর্বরূপ প্রকৃতিও স্থিত থাকে। যেমন কলসের ভবিতব্যরূপ ঠিকরা-এর মধ্যে ঘড়ার ভূতপূর্ব মাটি স্থিত থাকে, এইভাবে "ভব্যে ভূতম্ আহিতম্" অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কালে সম্ভাব্য জগতের স্বরূপের মধ্যেও প্রকৃতি স্থিত থাকে। তথা যেভাবে ঘড়ার ভব্য অর্থাৎ ভবিষ্যৎ-কালে সম্ভাব্য ঠিকরা-এর--স্বরূপ ভূতস্বরূপ মাটি তথা ঘটে স্থিত হয়/থাকে, এইভাবে "ভব্যং ভূতে প্রতিষ্ঠিতম্" অর্থাৎ জগতের ভব্য অর্থাৎ ভবিষ্যৎ-কালে পরিবর্তিত স্বরূপও, ভূতরূপ প্রকৃতির মধ্যে তথা উহার পূর্ব পরিণামেও স্থিত থাকে। এইভাবে এক উপাদান-প্রকৃতিকে বিবিধ নামরূপে পরিণত করা, -সর্বব্যাপক পরমেশ্বরের নানাবিধ বীর্য অর্থাৎ সামর্থ্যের কাজ, "তবেদ্ বহুধা বীর্যাণি। মন্ত্রে এই নানাবিধ নামরূপকে পরমেশ্বরের সামর্থ্যরূপ বলা হয়েছে। এই ভাবনাকে "নামরূপে ব্যাকরবাণি" (ছান্দো০ উপ০ অধ্যায় ৬, খং০ ৩) এ বলা হয়েছে। মন্ত্রে ইহা দর্শানো হয়েছে, বস্তুর বর্তমান স্বরূপে উহার পূর্ববর্তী পরিণাম-সমূহ তথা ভবিষ্যম্ভাবী পরিণাম-সমূহের স্থিতিও অনভিব্যক্তাবস্থায় থাকে, যার জ্ঞান যোগীর সূক্ষ্মপ্রবেশী চিত্ত দ্বারা যোগীর হয়ে যায়। বাচ্চা যখন জন্ম হয় তখন তাঁর বর্তমান চিত্তেও পূর্বজন্মের ভূতকালের পরিণাম সংস্কার রূপে থাকে, তথা ভবিষ্যৎ কালে উদ্ভূত পরিণাম-সমূহের অর্থাৎ ভাবীপরিণামের সংস্কারও অনুদ্ভূতাবস্থায় থাকে। এইভাবে অন্য বস্তুরও স্থিতি। এই সিদ্ধান্তকে "সনং সর্বরূপ"---এই মহাব্যাপী নিয়ম দ্বারাও প্রকট করা হয় ॥ ২. মন্ত্রোক্ত ভাবনার পরিপুষ্টিতে নিম্নলিখিত, যোগদর্শনের সূত্রগুলো দেখা উচিৎ। যথাং "অতীতানাগতং স্বরূপতোঽস্ত্যধ্বভেদাদ্ধর্মাণাম্ ॥ তে ব্যক্তসূক্ষ্মাঃ গুণাত্মানঃ ॥ পরিণামৈকত্বাদ্বস্তুতত্ত্বম্ ॥ তদা সর্বাবরণমলাপেতস্য জ্ঞানস্যানন্ত্যাজ্জ্ঞেয়মল্পম্" ॥ (যোগ ৪।১২, ১৩, ১৪, ৩১)। তথা “সত্ত্বপুরুষান্যতাখ্যাতিমাত্রস্য সর্বভাবাধিষ্ঠাতৃত্বং সর্বজ্ঞাতৃত্বং চ ॥ তারকং সর্ববিষয়ং সর্বথাবিষয়ম্ অক্রমং চেতি বিবেকজং জ্ঞানম্" (যোগ ৩।৪৬, ৫৪) ॥]
Read More

21 October, 2025

ঋগ্বেদ ১০/১৯১/১

21 October 0

সংসমিদ্যুভসে বৃষন্নগ্নে বিশ্বান্যর্য আ। 

ইळস্পদে সমিধ্যসে স নো বসূন্যা ভর॥ ঋগ্বেদ ১০।১৯১।১

স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজকৃত পদার্থ ভাষ্যঃ (বৃষণ্–অগ্নে) হে সুখের বর্ষা-স্বরূপ, দুঃখ-নাশক পরমাত্মা! (অর্যঃ–বিশ্বানি–ইৎ সন্সম্–আ যুবসে) তুমি, হে স্বামী! সমস্ত ভূতগণ—জড় ও চেতন প্রাণীদের মধ্যে যথাযথভাবে সম্পূর্ণরূপে বিদ্যমান আছো; বিশেষত আমরা মানুষ, যারা তোমার উপাসক—তাদের মধ্যে তুমি যথা-ভাবে প্রতিষ্ঠিত। "সমো দ্বিরুক্তিঃ—‘সমুপোদঃ পাদপূর্ণে’" [অষ্টা ৮।২৬] এই নিয়ম অনুযায়ী, (ইডঃ–পদে সমিধ্য সে) পৃথিবী—অর্থাৎ পার্থিব দেহের পদ, অর্থাৎ হৃদয় বা স্তুতির পদস্থান—অধ্যাত্ম-যজ্ঞে যথাযথভাবে জ্বলমান হয়, প্রজ্বলিত হয়। (সঃ–নঃ–বসুনি–আভর) সেই তুমি আমাদের জন্য শান্তি ও সুখে বাসযোগ্য ঐশ্বর্যময় ধন সম্পদ প্রদান করো॥১॥

পদার্থ (হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার)

[১] হে (বৃষণ্) = আমাদের সকলের উপর সুখের বর্ষণকারী, (অগ্নে) = হে অগ্রগণ্য প্রভু! আপনি (ইৎ) = নিশ্চয়ই (বিশ্বানি সংস্কং যুবসে) = সমস্ত প্রাণীদের সাথে সম্যকভাবে মিলিত হন। আপনি সকলেরই পিতা। এই পিতৃত্বই সকলকে পরস্পরের নিকটে আনয়ন করে। আপনাকে পিতার রূপে স্মরণ করলে সকলে পরস্পর ভ্রাতৃত্বের স্মরণ করে।

[২] (অর্যঃ) = আপনিই সকলের স্বামী। (ইডঃ পদে) = [ইডা = বাণী, বেদবাণী] বেদবাণীর শব্দসমূহে আপনি (আ সমিধ্যসে) = সর্বতোভাবে দীপ্ত হন — “সর্বে বেদাঃ যৎ পদমামনন্তি”, “ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্” ইত্যাদি এরই প্রমাণ।

[৩] (সঃ) = সেই আপনি (নঃ) = আমাদের জন্যে (বসুনি) = বাসস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পদার্থ (আ ভর) = প্রাপ্ত করান। আপনিই সকলের প্রভু, আপনিই সকলকে ঐশ্বর্য ও সম্পদ প্রাপ্ত করান। ॥

ভাবার্থ — পরমাত্মা সুখের বর্ষা ঘটান এমন স্বামী; তিনি সমস্ত জড় ও সচেতন সৃষ্টির মধ্যে বিরাজমান। তিনি দেহের বিশেষ স্থান অর্থাৎ হৃদয়ে, অথবা স্তুতির স্থান — আধ্যাত্মিক যজ্ঞে — প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশিত হন। তখন তিনি মানুষকে শান্তি ও সুখে স্থিত রাখার জন্য সকল ঐশ্বর্য ও ধন প্রদান করেন ॥১॥ ব্রহ্মমুনি

Read More

14 October, 2025

মাধ্যন্দিন পদপাঠ

14 October 0

আমাদের ভারতীয়দের জন্য বেদই সর্বোচ্চ প্রমাণ— এই বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বৈদিক সংহিতাগ্রন্থসমূহ যেভাবে ভারতের ব্রাহ্মণরা মুখস্থ করে আজও সংরক্ষণ করে রেখেছেন, সেইরূপ উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোনো দেশে পাওয়া যায় না।

বেদমন্ত্রের অর্থ বোঝার উদ্দেশ্যে প্রাচীন আচার্যগণ পদপাঠ নামক পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন। এই পদপ্রবচনে, পৃথকভাবে বিভক্ত শব্দসমূহের পাঠ ও তাদের উচ্চারণচিহ্নের মাধ্যমে মন্ত্রের অর্থ বুঝতে বিশেষ সহায়তা পাওয়া যায়। পদপাঠকে ভিত্তি করে সংহিতার সংরক্ষণে অগ্রসর হয়েছেন ক্রম, জটা, ঘন ইত্যাদি মিলিয়ে আট প্রকার বিকৃতিপাঠ-পদ্ধতির প্রচলন হয়েছে। ফলে পদপাঠ উভয় উদ্দেশ্যেই উপকারী হয়েছে—
✔ মন্ত্রার্থ-জ্ঞান
✔ সংহিতা-পাঠ রক্ষা — উভয় ক্ষেত্রেই এটি মহৎ উপকার করেছে।

এই গ্রন্থ সম্পাদনার পূর্বে আমার ধারণা ছিল—
সংহিতা পাঠে কোনো পাঠভেদ নেই, এবং
পদগ্রন্থেও কোনো পাঠভেদ নেই।

কিন্তু যখন বিভিন্ন কোষ (lexicons) পরস্পরের তুলনায় মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করলাম, তখন প্রথমবার সত্য স্পষ্ট হলো যে মাধ্যন্দিন পদপাঠে কিছু সুনির্দিষ্ট পাঠভেদ বিদ্যমান।

সেগুলো বিচার ও শ্রেণিবদ্ধ করার পর জানা গেল: পদপাঠগ্রন্থসমূহে মোট চার প্রকারের পাঠ প্রচলিত রয়েছে —
একটি প্রধান পাঠ এবং অন্যান্য তিনটি উপ-পাঠ।

এই চার প্রকার পাঠ সম্পর্কে ‘মাধ্যন্দিন পদপাঠের চতুর্বিধ পাঠ’ নামক অধ্যায়ে বিস্তৃতরূপে আলোচনা করা হয়েছে — তা সেখানেই দেখা উচিত।

এই গ্রন্থে বৈদিক প্রথায় প্রচলিত মূল পাঠকে বড় অক্ষরে মুদ্রণ করা হয়েছে। যেখানে দুই পাঠের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে, সেখানে ভিন্ন শব্দগুলো ছোট অক্ষরে উপস্থাপিত হয়েছে। মূল পাঠের অতিরিক্ত কিছু স্থানে যেখানে স্বরচিহ্ন বা উচ্চারণের যথার্থ পার্থক্য আছে— সেই কাশিকা-পাঠ অনুসরণ করে টীকা হিসেবে নিচে সংযোজিত হয়েছে।

এভাবে আমাদের প্রয়াস—
মাধ্যন্দিন পদপাঠের চার রূপকে একত্রে সংরক্ষণ করা।

মাধ্যন্দিন সংহিতা এবং পদগ্রন্থ উভয় ক্ষেত্রেই ‘য’ এবং ‘ব’ বর্ণের উচ্চারণ ও লেখন-ভিন্নতা, এবং অন্যান্য বৈদিক বিশেষত্বগুলো যেখানে প্রয়োজন, সেখানে যথার্থভাবে নির্দেশ করা হয়েছে।

‘য’ এবং ‘ব’ বর্ণদ্বয়ের বিশেষ লেখনরীতি — এই বিষয়ে (পৃষ্ঠা ৩৪–৪১) আলোচনায় উপস্থাপিত হয়েছে, এবং উচ্চারণ সম্পর্কে তৃতীয় পরিশিষ্টে (পৃষ্ঠা ৬৪১–৬৪৪) বিচার করা হয়েছে। একই পরিশিষ্টেই ষ্‌কারের যে খ্‌কাররূপ উচ্চারণ, তারও শাস্ত্রসম্মত বিশ্লেষণ বিধৃত হয়েছে।

১৯-তম বিষয় আলোচনা:

মাধ্যন্দিন পাঠে ‘९ १’ (৯-১) দ্বারা কোন বর্ণ নির্দেশিত, এবং তার উচ্চারণ শিক্ষাশাস্ত্রসম্মত কীভাবে — এই বিষয়ে তৃতীয় পরিশিষ্টে (পৃষ্ঠা ৬৩৮–৬৪০) বিচার বিধৃত হয়েছে।

যম-রা কারা এবং কতজন— যমদের প্রকৃতি কী, কত যম রয়েছে, এবং তাদের লেখনরীতি কী — এই বিষয়ে দ্বিতীয় পরিশিষ্টে (পৃষ্ঠা ৬৩৫–৬৩৭) আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।

পদপাঠসমূহের পারস্পরিক তুলনা— সকল পদগ্রন্থের পাঠপদ্ধতি শাখাভেদে পৃথক। সেখানে যত পার্থক্য উপলব্ধ হয়, সেই সমস্ত পার্থক্য ‘পদপাঠসমূহের তুলনামূলক অধ্যয়ন’ এই অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা ১১–৩৩) শাস্ত্রমতে এবং শাখানুসারে বিস্তৃতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে সকল উপলব্ধ পদগ্রন্থের পাঠপদ্ধতি সহজেই জানা সম্ভব।

এই কর্ম সূচনার কারণ—

বিক্রমাব্দ ২০১৯-এ রাজস্থানের কেকড়ি নগরে বসবাসকারী বিদ্বান পণ্ডিত শ্রীমদন মোহন ব্যাসশর্মা আকস্মিক কারণবশত্‌ আমার গৃহে আগমন করেছিলেন। আলোচনায় তাঁর হস্তলিখিত গ্রন্থসংগ্রহে আগ্রহ উপলব্ধ হওয়ায় আমি নিবেদন করেছিলাম— যদি কখনো সৌভাগ্যক্রমে বেদ-ব্যাকরণ-সংক্রান্ত কোনো হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়, তবে গ্রন্থস্বামীকে নতশিরে প্রণাম করে তা আমার জন্য সংগ্রহ করবেন।

দুই-তিন মাস পর যখন পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ পুনরায় আমার গৃহে আগমন করেন, তখন তিনি আমাকে দুইটি হস্তলিখিত গ্রন্থ প্রদান করেন। তার একটি ছিল মাধ্যন্দিন পদপাঠের কোষ, যা ১৪৭১ বিক্রমাব্দে লিপিবদ্ধ; অপরটি ছিল ভর্তৃহরির রচিত শতকত্রয়ের ব্রজভাষায় পদ্যরূপ কোষ, যা প্রায় দুইশো বছরের পুরাতন।

এই সাড়ে পাঁচশো বছরের প্রাচীন মাধ্যন্দিন পদপাঠের কোষ হঠাৎ প্রাপ্ত হয়ে আমি অতুল আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম — কারণ এরূপ প্রাচীন কোষ কোনো গ্রন্থাগারে নেই, তা পূর্বেই আমার সুপরিচিত ছিল।

অন্যান্য কাজে ব্যস্ততার কারণে কিছু সময় আমি এ গ্রন্থটি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করিনি। পরে যখন আমি মনোযোগ সহকারে এই কোষ পরীক্ষা করলাম এবং বিভিন্ন স্থানে মুদ্রিত পাঠের সঙ্গে তুলনা করলাম — তখন এতে বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম, এবং এর প্রকাশনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।

রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক সহায়তা — আমি এই অভিধানটিকে তৎকালীন...

রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা–সঞ্চালকবৃন্দ, গীর্বাণবাণী প্রসারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বন্ধুবরগণ, স্বর্গীয় বিদ্বজ্জনগণ, সম্মাননীয় শ্রীমৎ মাধবকৃষ্ণ শর্ম মহোদয়ের নিকট প্রদর্শন করেছিলাম। তারাও এতকাল পূর্বেকার এই বৃহৎ অভিধান দর্শন করে, এর বিশেষত্ব উপলব্ধি করে অত্যন্ত প্রীত হন। আলোচনা–পরিচালনার সময় আমি বলেছিলাম— যদি আপনাদের রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগ এই গ্রন্থের সম্পাদনার কাজে সহায়তা প্রদান করেন, তবে আমি এই গ্রন্থটিকে বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথির সাহায্যে সম্পাদনা করতে ইচ্ছুক। গবেষণা-কার্যে পারদর্শী শ্রীমান মাধবকৃষ্ণ শর্মও এই কাজের যথার্থ মর্যাদা উপলব্ধি করে, এই গ্রন্থের সম্পাদনার কাজে তার বিভাগ হতে যথোচিত সহায়তা প্রদানের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

তিন বৎসরব্যাপী প্রতিমাসে ষাট-ষাট মুদ্রা সহায়তা-সংক্রান্ত অনুমোদন রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগের সঞ্চালকদের নিকট প্রাপ্ত হয়ে, বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে হস্তলিখিত কপি সংগ্রহ করে, দূরবর্তী স্থানের গ্রন্থাগারে গিয়ে, বিভিন্ন অভিধান পর্যালোচনা করে— এই গ্রন্থের সম্পাদনার কর্মধারা নির্ধারণ করে, আমি রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগের সঞ্চালকদের নিকট সহায়তার জন্য প্রতিবেদন প্রদান করেছিলাম।

সেখানে রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগের সঞ্চালকাদি শ্রদ্ধেয় মাধবকৃষ্ণ শর্ম, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া, স্ব কর্তৃক প্রতিমাসে ষাট মুদ্রা সহায়তা প্রদানের অনুমোদন লাভ করিয়া, আমাকে এই সম্পাদনার পদে নিয়োজিত করেছিলেন। যদিও রাজার কোষ হতে সহায়তা প্রথমে দুই বৎসর মাত্র অনুমোদিত হয়েছিল, তথাপি এই কর্মের গুরুত্ত্ব জেনে সঞ্চালক মহাশয় আরেক বৎসরের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করেছিলেন। এইভাবেই রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগের বিরাট সহায়তায় এই গ্রন্থের সম্পাদনার কর্ম তিন বৎসরে পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে।

প্রকাশনায় সহায়তা — এমন প্রকার বৃহৎ গ্রন্থের প্রকাশনাও অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য হয়। এত ব্যয়বহুল কাজ বহন করিতে কোনও ব্যক্তিই সক্ষম নন। অতএব এই গ্রন্থের প্রকাশনায় সহায়তার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষা–যুবকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংস্কৃত বিভাগের প্রধানের নিকট ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়। সংস্কৃত বিভাগের প্রধান, সহায়তা-নির্ণায়ক সমিতির অন্যান্য সদস্যগণ এই কর্মের উপযোগিতা ও গুরুত্ব বুঝে, প্রকাশনার সহায়তা প্রদান অনুমোদন করেন।

শ্রীরামলাল কাপুর ট্রাস্ট-এর মহান সহযোগিতা — স্বরযুক্ত বৈদিক
গ্রন্থের মুদ্রণ-ব্যবস্থা ভারতের রাজধানীতে অবস্থিত বহু বিশাল মুদ্রণালয়ে কদাচিৎ পাওয়া যায়। দূরদেশে মুদ্রণকর্মে বহুল বিলম্ব ঘটে। তখন আমি শ্রীরামলাল কাপুর ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের নিবেদন করেছিলাম যে— তাদের নবস্থাপিত মুদ্রণালয়ে যেন এই গ্রন্থের মুদ্রণ-ব্যবস্থা করেন।

তাঁরা মহান উদারতায় পাঁচ-সহস্র মুদ্রা ব্যয় করে দুই প্রকার বৈদিক স্বরচিহ্নযুক্ত মূল্যবান টাইটেল মুম্বাইস্থিত নির্ণয় সাগর প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে, এই গ্রন্থের মুদ্রণে বিরাট সহায়তা করেছিলেন।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

১— শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত মদনমোহন ব্যাস মহাশয়ের নিকট আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, যাঁহার দ্বারা বিরল, প্রায় পাঁচ-শত বৎসর পুরাতন মাধ্যন্দিন-সংহিতার পদপাঠের হস্তলিখিত কপি আমাকে প্রদান করা হয়েছিল।

২— রাজস্থান সংস্কৃত শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন সঞ্চালক শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় মাধবকৃষ্ণ শর্ম মহাশয়ের প্রতিও আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ, যিনি এই গ্রন্থের সম্পাদনার জন্য স্ব বিভাগ হতে তিন বৎসরকাল প্রতিমাসে ষাট মুদ্রার সহায়তা নির্দিষ্ট করেছিলেন।

৩— শ্রীরামলাল কাপুর ট্রাস্ট-এর কর্মকর্তাদের প্রতিও আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, যাঁহারা এই গ্রন্থের মুদ্রণের কাজে পাঁচ-সহস্র মুদ্রা ব্যয় করে যথার্থ ব্যবস্থা প্রদান করেছিলেন।

৪— আমাদের বন্ধু শ্রী মহেন্দ্রশাস্ত্রী মহোদয়ের প্রতিও আমি পরম কৃতজ্ঞ, যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মুদ্রণ-প্রুফ সংশোধন অত্যন্ত পরিশ্রমে সম্পন্ন করেছিলেন এবং পরিশেষে সংশোধনপত্র প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে সমগ্র গ্রন্থ পুনরালোচনা করেছিলেন। যদি তাঁর এই সহায়তা না থাকতো, তবে এই গ্রন্থের শুদ্ধ মুদ্রণ অসম্ভব ছিল। এই সহায়তার গুরুত্ত্ব এর দ্বারা বুঝা যায়— যে তাঁর সহযোগিতা পূর্বে যেসব পৃষ্ঠা মুদ্রিত হয়েছিল, সেগুলিতে আমার দৃষ্টিদোষবশত বহু ভুল ছিল।

অনুতাপ-সহ নিবেদন

এই গ্রন্থের সম্পাদনায় বৈদিক সাম্প্রদায়িক পাঠ-ব্যবস্থাপনায় বিরাট প্রচেষ্টা করা সত্ত্বেও, অজ্ঞতা বা অসাবধানতাবশত কোথাও ত্রুটি ঘটেছে— এমন সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। অতএব বৈদিক সাহিত্য রক্ষায় নিবেদিত বিদ্বজ্জনদের নিকট বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা— আমার এই ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে, এই গ্রন্থকে অধ্যয়ন-অধ্যাপনে ব্যবহার করে, আমার অল্প পরিশ্রমকে সফল করুন। সংশোধনপত্র অনুযায়ী মূল গ্রন্থ সংশোধনপূর্বক পাঠ করুন।

সংখ্যা ২০২৮, জ্যৈষ্ঠ কৃষ্ণা ৮,
সোনীপত (হরিয়ানা)
যুধিষ্ঠির মীমাংসক


মাধ্যন্দিন পদপাঠের সম্পাদনাকর্মে উপযুক্ত

হস্তলিখিত ও মুদ্রিত গ্রন্থসমূহের পরিচয়

এই মাধ্যন্দিন পদপাঠের সম্পাদনাকর্মে যেসব বিভিন্ন স্থানের হস্তলিখিত অথবা মুদ্রিত গ্রন্থ উপযুক্ত হয়েছে, তাদের পরিচয় নিম্নে উপস্থাপিত হলো—

হস্তলিখিত কোষসমূহ

১. ক— এই হস্তলিখিত কপি আমরা *গজমেরু (গজমের) মণ্ডলান্তর্গত কেকড়ি নগরে বাসকারী বন্ধুসম শ্রদ্ধেয় ব্যাস নামে খ্যাত পণ্ডিত মদনমোহন মহোদয়ের অনুগ্রহে লাভ করেছি।
এর বিবরণ:

  • আকার — দৈর্ঘ্য ৪ x ১০ ইঞ্চি।

  • পঙক্তি — প্রতি পৃষ্ঠায় ৬, নবসংখ্যায় মাপা।

  • অক্ষরসংখ্যা — প্রতি পঙক্তিতে প্রায় ৪০ অক্ষর।

  • লিপিপ্রাচীন দেবনাগরী

  • লেখনকাল — বিক্রম সংবৎ ১৪৭১, শকাব্দ ১৩৩৬।

  • পাতাসংখ্যা — পূর্বার্ধে ভূ–রামচন্দ্র নামে ১৩১ পৃষ্ঠা, উত্তরার্ধে নৃষিদ্বীপ নামে ৭৭ পৃষ্ঠা।
    উভয় অংশ মিলিয়ে মোট ২০৮ পৃষ্ঠার অধিক সংখ্যা রয়েছে।

উভয় অংশেই সমাপ্তিপাঠ এভাবে পাওয়া যায়—

“শুভ ভবতু মঙ্গলम् ॥ সংবৎ ১৪৭১ বর্ষে শকে ১৩৩৬ বহসেনে।”


টীকা:
“বহমানে” — এইটি শুদ্ধ পাঠ রূপে দৃষ্টব্য।

উত্তরার্ধের সমাপ্তিপাঠে শুদ্ধ নির্দেশ পাওয়া যায়।

এখন পুরো লেখাটির অর্থ সহজ ও পরিষ্কার ভঙ্গিতে বাংলায় তুলে দিলাম—
(রূপ, ভাব, প্রাচীন ভঙ্গি বজায় রেখে)

গ্রবাড় শুদি ১৫ ভৌমে । 'অদ্য হংসীঘণী গ্রামবাস্তব্য জ্যোতিরামদেবসুত জ্যোতিপীपासুত শ্রীমরেশ্বরপঠনাথং লিখিতম্‌ ।

গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকার মতে শুদ্ধি পক্ষের ১৫তম দিনে, মঙ্গলবার—

আজ হংসীঘণী গ্রামের অধিবাসী, জ্যোতিরামদেবের পুত্র এবং জ্যোতিপীপার পুত্র, শ্রীমরেশ্বর পঠনাধিকারী এই পুস্তকটি লিখলেন।

যেমনভাবে এই বইটি পাওয়া গিয়েছিল, ঠিক তেমনভাবেই আমি এটিকে নকল করেছি।
এটি যদি কোথাও শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হয়, তবে তার দায় আমার নয়।

"ইয়্যাদৃশ বইয়ক দৃষ্ট্বা তাদৃশং লিখিতং ময়া ।
ইয়দি শুদ্ধমশুদ্ধং বা । মম দোষো ন দীয়তে ॥১
তেলাদ রক্ষেজ্জলাদ রক্ষেদ্‌ রক্ষে শিথিলবন্ধনাত্‌ ।
পরহস্তে গতা রক্ষে ।
এवं বদন্তি পুস্তিকং ॥


শান্তি ভবতু ।
গুরুভ্যো নমঃ ।
পরমগুরুভ্যো নমঃ ।

(শ্লোক অর্থঃ)
এটি তেল থেকে রক্ষা করতে হবে, জল থেকেও রক্ষা করতে হবে।
ঢিলে বাঁধন থেকে রক্ষা করতে হবে, এবং অন্যের হাতে যেন না যায়—এভাবে এই পুস্তকটি সতর্ক করে।

শান্তি হোক।
গুরুবরদের প্রতি প্রণাম।
পরমগুরুর প্রতি প্রণাম।


উত্তর অর্ধের শেষে এভাবে পাঠ করা হয়:

“সম্পূর্ণ হল।
শ্রেয়স্কর হোক।
যেমন এই পুস্তকটি পাওয়া গিয়েছিল, ঠিক তেমনই আমি লিখেছি।
যদি তা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হয়, তার দায় আমার নয়।

বিক্রম সংবৎ ১৪৭১ সালে, শকাব্দ ১৩৩৬ চলমান অবস্থায়
সীন্ধনী গ্রামের অধিবাসী জ্যোতিরামদেব-পুত্র, জ্যোতিপীপার-পুত্র শ্রীমরেশ্বর পঠনাধিকারী দ্বারা এটি লিখিত।

শুভ হোক, মঙ্গল হোক।

আমার পিঠ, কোমর ও ঘাড় ভেঙে গেছে (অর্থাৎ অত্যন্ত কষ্ট করে)।
দৃষ্টিও বহুবার ক্ষীণ হয়েছে।
এই পুস্তকটি আমি কঠোর পরিশ্রমে লিখেছি।
অতএব, এটি যত্ন সহকারে রক্ষা করবে।

এটি তেল ও জল থেকে রক্ষা করা উচিত।
ঢিলে বাঁধন থেকে রক্ষা করা উচিত।
অন্যের হাতে গেলে রক্ষা কর—এভাবে পুস্তকটি নির্দেশ দেয়।

যে মহাশয় এই পুস্তকটি প্রদান করেছেন, তাঁকে নমস্কার জানিয়ে এটি প্রদান করা হলো।”


পাঠ নির্দেশ

এই গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে এ রকম পাঠ পাওয়া যায়—

“এইভাবে শ্রী বজ্রসনেয়ী সংহিতার পদপাঠে প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।”

এভাবে ৩০তম অধ্যায় পর্যন্ত পাঠ পাওয়া যায়।

কিছু স্থানে পাঠভেদ পাওয়া যায়—
যেমন “বজসনেয়ী সংহিতা পদপাঠে” বা “পদভাবে”—এভাবে।

৩০তম অধ্যায় থেকে ৪২তম অধ্যায় পর্যন্ত দশটি অধ্যায়ে শাকল্য ঋষির পদরীতি দেখা যায়, যেমন—

“এইভাবে শ্রী বজসনেয়ী সংহিতায় শাকল্যকৃত পদরূপে একত্রিশতম অধ্যায়।”


নোটসমূহ

১. পুরনো পাতাটি ঘষে পরিষ্কার করা হয়েছিল এবং তার উপর আবার লিখা হয়েছে।
তাই কিছু স্থানে গ্রামের নাম বা তথ্য বিকৃত হয়েছে।
সঠিক নাম পরবর্তী পাঠ অংশে পাওয়া যাবে।

২. যাজ্ঞবল্ক্য শিক্ষায় ব্যাকরণ অনুসারে যেখানে দীর্ঘ 'ও' বা গুরু স্বর নির্দেশ আছে, সেখানে হাতে লেখা পাঠে 'য্য' ব্যবহার করা হয়েছে।

৩. কলকাতার রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি গ্রন্থাগারে মধ্যদিনীয় পদপাঠের আরও একটি পাণ্ডুলিপি আছে, যার শেষে একইভাবে ‘শাকল্যকৃত’ পাঠ পাওয়া যায়।

“এইভাবে শ্রী বজসনেয়ী সংহিতায় শাকল্যকৃত পদে চুয়াল্লিশতম অধ্যায় সমাপ্ত।”

লিপিবিশেষ বিবরণঃ
এই পুরো কোষটি একই একজন লেখক দ্বারা লিখিত বলে প্রতীয়মান হয়। তবে মাঝেমাঝে কিছু পুরনো বা ক্ষয়প্রাপ্ত পাতার স্থলে অন্য পাতা জুড়ে অন্য লেখকের দ্বারা পাঠ পূরণের প্রমাণ দেখা যায়।

এই হস্তলিপিটি মোটামুটিভাবে শুদ্ধভাবেই প্রাপ্ত হয়।

অক্ষরবিন্যাসঃ
এই কোষটি অত্যন্ত প্রাচীন হওয়ায় কিছু অক্ষরের রূপ আজকের তুলনায় ভিন্ন ও বিশেষ প্রকৃতির দেখা যায়। সেখানে সন্ধিক্ষরগুলির উপরে চিহ্ন বা মাত্রা বঙ্গলিপির মতো সামনের দিকে নির্দেশিত হয়েছে। যেমন—

  • पद वा वः = দেবো বঃ

  • त्रे ष्टुसेन = ত্রেষ্তুসেন।

  • द्योः = দ্যৌঃ।

এধরনের মাত্রানির্দেশ-পদ্ধতিকে আধুনিক পণ্ডিতেরা “পৃষ্ঠসাত্রা” নামে উল্লেখ করেন। কিন্তু আমরা মনে করি—
পুর্বমাত্রা, প্রাংমাত্রা অথবা পদমাত্রা—এই নামগুলির ব্যবহারই অধিক উপযুক্ত।

এই মাত্রানির্দেশ পদ্ধতি চার শতাব্দীরও পূর্বে রচিত প্রাচীন দেবনাগরী-লিপির গ্রন্থসমূহে দেখা যায়।

বিশেষত্বঃ

এই কোষে বহু ধরনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
তার মধ্যে একটি হল—
অধিকাংশ স্থানে মন্ত্রপাঠ অনুসারে সমস্ত শব্দ পৃথকভাবে উল্লেখিত।

অন্য পদগ্রন্থগুলিতে পুনরুক্ত শব্দ বা মন্ত্রগুলি তালিকাভুক্ত করা হয় না (অর্থাৎ পদপাঠে পড়া হয় না)।
সে কারণে মন্ত্রকাণ্ডের সংখ্যার সঙ্গে পদকাণ্ডের সংখ্যার বহু স্থানে পার্থক্য দেখা যায়।

কিন্তু এখানে, পুনরুক্ত শব্দও সম্পূর্ণ পাঠসহ নির্দেশিত হওয়ায়—
মন্ত্রসংখ্যা ও পদসংখ্যার মাঝে বিচ্যুতি রয়ে যায়।

কিছু স্থানে পুনরুক্ত মন্ত্রের ক্ষেত্রে কেবল প্রতীক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবং সম্পূর্ণ পাঠ লেখার স্থান খালি রেখে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া এই কোষে যে অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি পাওয়া যায়, সবই —
“মাধ্যন্দিন পদপাঠের চতুর্বিধ পাঠ” অধ্যায়ে বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে।
সেগুলি সেখানে দেখা উচিত।

২. খ— হস্তলিপি

এই হস্তলিপিটি পুনানগরে অবস্থিত ভাণ্ডারকর প্রাচ্যবিদ্যা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত।

এটি সেখানে তালিকাভুক্ত হয়েছে—
ক্রমসংখ্যা ৮, সন ১৮৮১–৮২ এই পরিচয়ে।

লিপিবিবরণঃ

  • আকারঃ ২৬×১১¾ অঙ্গুল পরিমিত।

পঙ্ক্তিঃ — প্রতি পাতায় চারটি করে পঙ্ক্তি।
অক্ষরসংখ্যা — প্রতি পঙ্‌ক্তিতে সাধারণত ৩২ অথবা ৩৩ টির মতো অক্ষর।
লিপি — দেবনাগরী।
লেখনের কাল — বিক্রম সংवत্‌ ১৬৯১ এবং শক্তাব্দ ১৫৫৬।
পাতাসংখ্যা — পূর্বার্ধে ২৪৩, উত্তরার্ধে ১৭৮; অতএব মোট ৪২১ সংখ্যা।

গ্রন্থসমাপ্তির পাঠ

পূর্বার্ধের শেষাংশে পাঠ এইরূপ পাওয়া যায় —

“এইভাবে পদে বিশতম অধ্যায় সমাপ্ত।
বিক্রম সংवत্‌ ১৬৯১ এবং শক্তাব্দ ১৫৫৬ সালে শ্রাবণ মাসে কৃষ্ণপক্ষের দশম দিনে লিখিত।
শ্রীরক্ষিত হউক।
ওঁ নরসিংহ সহায় নমঃ।
শ্রী রামকে নমঃ।
ওঁ নমঃ কৃষ্ণায়।
নমঃ শ্রী বিন্দুমাধবায়।
ওঁ নমঃ বিশ্বেশ্বরায়।
শ্রী রামায় নমঃ।
শ্রী কৃষ্ণায় নমঃ।
প্রথম অধ্যায়ে বিশটি পদ।”

উত্তরার্ধের অন্তে পাঠ—

“এইভাবে শ্রী বজসনেয়ী সংহিতার পদে চুয়াল্লিশতম অধ্যায় সমাপ্ত।
বিক্রম সংवत্‌ ১৬৯১, মাঘীর মাসে কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে।
শ্রী রামায় নমঃ।
শ্রী রামার্পণম্‌।
পদপুস্তক সমাপ্ত।
শ্রী বিন্দুমাধবায় নমঃ।”

প্রত্যধ্যায় শেষে পাঠ নির্দেশ

"এইভাবে বজসনেয়ী সংহিতায় দীর্ঘপাঠ পদে প্রথম অধ্যায়।
এইভাবে বজসনেয়ী সংহিতার পদে দ্বিতীয় অধ্যায়।
এইভাবে বজসনেয়ী সংহিতার দীর্ঘপাঠে তৃতীয় অধ্যায়।
এইভাবে বজসনেয়ী পদসংহিতায় একবিংশ অধ্যায়।"

অন্যত্রও একই রীতিতে দেখা যায়।

লেখকের বিবরণ

পূর্বার্ধের প্রথম ৪৮ বা ৪৯ পাতার লেখক একজন, এবং তারপরে গ্রন্থের সমাপ্তি পর্যন্ত (পূর্বার্ধ ও উত্তরার্ধ দুই-তেই) অন্য লেখকের হাত।
অক্ষরবিন্যাস শুদ্ধ, লেখা মোটামুটি নিখুঁত।

৩. গ—হস্তলিপি

এই প্রতিলিপিটিও একই গ্রন্থাগার থেকে প্রাপ্ত।
এই কোষটি তালিকাভুক্ত হয়েছে—

ক্রমসংখ্যা ৪৪, সাল ১৮৯২–৯৫

লিপিবিবরণ —

  • আকার — ৪ × ৫৮৩ ইঞ্চি পরিমাপ

  • প্রতি পাতায় — ছয় বা সাতটি পঙ্ক্তি

  • অক্ষরসংখ্যা — প্রতি পঙ্‌ক্তিতে ২৬–২৮ টি

  • লিপি — দেবনাগরী

  • লেখনকাল — বিক্রম সংवत্‌ ১৮৫০, শকাব্দ ১৭১৫

পাতা সংখ্যা —
পূর্বার্ধে ১৭৪, উত্তরার্ধে ১৪১
অতএব মোট — ৩১৫ পাতার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫ পাতা।

সমাপ্তির পাঠ

পূর্বার্ধের ১৭৪তম পাতায় —

“এইভাবে সংহিতার পদে বিশতম অধ্যায় সমাপ্ত।
বিক্রম সংवत্‌ ১৮৫০ ও শকাব্দ ১৭১৫, মাঘশিরা মাস, কৃষ্ণপক্ষ দশমী, বৃহস্পতিবারে—
ব্রহ্মপুরীতে বাসকারী উত্তরের ঝা বংশীয় জীভণজীর পুত্র মোতিরাম কর্তৃক
নিজ অধ্যয়নার্থে এবং অপরের উপকারার্থে লিখিত।
চিরঞ্জীব ভাই সম্পত্রামের এই গ্রন্থ।
মঙ্গল হোক।
কল্যাণ হোক।”

উত্তরার্ধের ১৪১তম পাতায় —

“হরি ওঁ।
ইতি বজসনেয়ী সংহিতার পদে চ...”

এর পরবর্তী অংশ পাতা নষ্ট হয়ে খণ্ডিত পেয়েছি।

প্রত্যধ্যায় শেষে পাঠ নির্দেশ

“এইভাবে পদে প্রথম অধ্যায়।
এইভাবে সংহিতা পদে বিশতম অধ্যায়।
এইভাবে বজসনেয়ী পদসংহিতায় একত্রিশতম অধ্যায়।
এইভাবে বজসনেয়ী সংহিতার পদে চুয়াল্লিশতম অধ্যায়।”

লেখার উল্লেখ—
এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণভাবে একজন লেখকের দ্বারা লিপিবদ্ধ।
তবে ৩৫–৩৬তম অধ্যায় পর্যন্ত স্বরচিহ্ন নেই।

৪. ঘ—হস্তলিপি

এই কোষটিও ভাণ্ডারকর প্রাচ্যবিদ্যা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনুলিপি।
সেখানে এটি তালিকাভুক্ত হয়েছে—

ক্রমসংখ্যা ৩৫৩, সাল ১৮৮৩–৮৪।

আকার — ৪×৮ ইঞ্চি মাত্রা।
পংক্তি — প্রতি পৃষ্ঠা সাত বা আট।
অক্ষর — প্রতি পংক্তিতে ২০–২৪।
লিপি — দেবনাগরী।
লেখার কাল — শক ১৭৪১ (বিক্রমাব্দ ১৮৭৬)।
পাতা — মোট ৩২৭, অর্থাৎ তিনশ সাতাশটি।

অধ্যায়ান্ত পাঠ:
একোনবিংশ অধ্যায়ের শেষে পাওয়া যায় —

“এইভাবে পদসংহিতায় উনিশতম অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রী রাম প্রসন্ন হোন।
গঙ্গা, গোদাবরী প্রসন্ন হোন।
শ্রী কৃষ্ণাবাই প্রসন্ন হোন।
শ্রী রামচন্দ্র প্রসন্ন হোন।
কৃষ্ণার্পণমস্তু।
শ্রী বেদসূতি প্রসন্ন হোন।”

উত্তরাংশের শেষে লেখা আছে —

“.....ব্রহ্ম।
এইভাবে বাজসনীয় সংহিতার পদে চারশতম অধ্যায় সমাপ্ত।
শক ১৭৪০ সালে, ভাদ্রপদের কৃষ্ণপক্ষ তৃতীয়া তিথিতে, সোমবার, তৃতীয় প্রহরে এই পুস্তক সমাপ্ত।”

প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে লেখা পাওয়া যায় —

“এইভাবে বাজসনীয় সংহিতার পদে প্রথম অধ্যায়।
এইভাবে বাজসনীয় পদের চতুর্দশ অধ্যায়।
এইভাবে পদের উনত্রিশতম অধ্যায়।
এইভাবে বাজসনীয় পদের একত্রিশতম অধ্যায়।”

লেখা সম্পর্কে মন্তব্য:
এই কোষটি মাঝেমাঝে বহুস্থানে খণ্ডিত হয়ে পুনরায় পূরণ করা হয়েছে বলে অনুমান হয়।
এই কারণে পৃষ্ঠাসমূহে অক্ষরের আকার অনেক স্থানেই ভিন্ন দেখতে পাওয়া যায় এবং
এতে বহু লেখকের হাতের লেখা রয়েছে বলে প্রতীয়মান।

সম্ভবত এটি বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রন্থাংশ সংগ্রহ করে নতুন করে লেখা বা সংকলিত হয়েছে।

সংগ্রহস্থল:
এই কোষ বর্তমানে বারাণসী সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতী ভবন সংগ্রহে সংরক্ষিত।
এর প্রবেশ সংখ্যা — ৪/১২১১
নথিসংখ্যা — ০০১০৫২

সমুদ্রিত পদগ্রন্থসমূহ

১০. অ —
কাশীতে গৌরীশ প্রিন্টিং প্রেসে মুদ্রিত। পত্রাকৃতি বড় অক্ষরযুক্ত।
এই গ্রন্থে যৌগিক ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে সাধারণত দ্বিত্বচিহ্ন সঠিকভাবে নির্দেশিত হয়েছে,
এবং ধ্বনির প্রাচীন বা প্রচলিত আঙ্গিকও পাওয়া যায়।

স্বরে কিছু স্থানে বিশেষ প্রকারের পার্থক্য দেখা যায়। এই পার্থক্য
‘মাধ্যন্দিন পদপাঠ পরিচয়’ গ্রন্থের মাধ্যন্দিন পদপাঠের চার প্রকার পাঠ অংশে ব্যাখ্যা করা হয়েছে;
সুতরাং এখান থেকে সেটি বোধগম্য হওয়া উচিত।

আমরা এই স্বরভেদের অংশ ‘ইতি কাশিক পাঠ’ নামে টীকা হিসেবে সংযোজন করেছি।
এ গ্রন্থে ভুলের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।


১১. ট —
এই পদপাঠ গ্রন্থ বোম্বাইয়ের তত্ত্ববিবেচক প্রেসে মুদ্রিত।
পাতার আকার মাঝারি, অক্ষরও মধ্যম আকারের।

এ গ্রন্থে সাধারণত রেফ-চিহ্নযুক্ত ধ্বনির পরবর্তী ব্যঞ্জনে
দ্বিত্ববর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়।

কাশী মুদ্রিত সংস্করণের তুলনায় এই সংস্করণ অপেক্ষাকৃত শুদ্ধ।


১২. ঠ —
এটি মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর রচিত যজুর্বেদ ভাষ্য–এ অন্তর্ভুক্ত পদপাঠ।

এই গ্রন্থের প্রথম এবং তৃতীয় সংস্করণ আমরা ব্যবহার করেছি।
এই দুই সংস্করণের মাঝে কিছু স্থানে পার্থক্যও পাওয়া যায়।

এখানে পদপাঠে যে সমস্ত পদ মূল পাঠে অনুপস্থিত,
সেগুলোও মন্ত্রপাঠের ধারাবাহিকতায় যথাস্থানে সংযুক্ত হয়েছে।

কিন্তু যেসব পদ পরে যুক্ত করা হয়েছে—
সেসব স্থানে কখনো স্বরচিহ্নের অভাব, কখনো স্বরের ভুল নির্দেশ,
আক্ষরিক বিরতি নির্দেশের অভাব এবং অনেক সময় অনুপযুক্ত সংশোধনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

১২) ঠ— শ্রদ্ধেয় দयानন্দ সরস্বতী রচিত যজুর্বেদ ভাষ্য-এ যে পদপাঠ মুদ্রিত হয়েছে, সেটিও এখানে গৃহীত। এই গ্রন্থের প্রথম ও তৃতীয় সংস্করণ এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুই সংস্করণের মধ্যে কোথাও কোথাও পাঠভেদও দেখা যায়। এখানে পদপাঠে যেখানে যেখানে শব্দ লুপ্ত ছিল, সেখানে সেগুলো মন্ত্রপাঠ অনুযায়ী যথাস্থানে যুক্ত করে পড়া হয়েছে। যেসব স্থানে শব্দগুলি পূরণ করা হয়েছে, সেখানে কোথাও স্বরচিহ্ন অনুপস্থিত, কোথাও স্বরের ভুল নির্দেশ, কোথাও অবগ्रह নেই — এবং বহু বর্ণ-লেখার ভুল "ইতি", "পদেন", "আবেষ্টনা" ইত্যাদি শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

১৩) ড— এ পদপাঠটি পণ্ডিত ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসু কর্তৃক সংশোধিত এবং তার নিজস্ব ব্যাখ্যাসহ পূর্ণ করা দयानন্দ সরস্বতীর যজুর্বেদ ভাষ্য-এর (প্রথম খণ্ডে) মুদ্রিত পাঠ। এ গ্রন্থের কাঠমান্ডুতে মুদ্রিত দ্বিতীয় সংস্করণ এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও এখানে যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণে দ্বিত্ববাচক পাঠ নেই এবং শব্দের শুরুতে বা অক্ষরের প্রচলিত নির্দেশও পাওয়া যায় না, তবুও ‘ঠ’ গ্রন্থে পাওয়া অক্ষরলিপির ভুল এখানে নেই। স্বরের বিন্যাসে এটি কাশির (কাশীতে মুদ্রিত) সংস্করণের মতোই মধ্যন্দিন শাখার পাঠ অনুসরণ করে।

উল্লিখিত সব অভিধান (সংস্করণ)-এর বিবরণ শেষ।

                                            বেদিক পদপাঠের তুলনামূলক অধ্যয়ন

বৈদিক সাহিত্যেতে সংহিতা গ্রন্থগুলোর পর পদপাঠ গ্রন্থগুলোর যে বিশেষ স্থান রয়েছে— সে বিষয়ে কোনও মতভেদ নেই। এই পদগ্রন্থগুলো সংহিতাপাঠকে ভেঙে পৃথক পদরূপ প্রকাশ, অবগ्रहচিহ্নের মাধ্যমে ধাতু-প্রত্যয়ের বিভাজন, পূর্ব-পরবর্তী শব্দসংযোগের নির্দেশ ইত্যাদির দ্বারা মন্ত্রের অর্থ উপলব্ধিতে বড় সহায়তা করে— এটি সব বৈদিক পণ্ডিতই মেনে নেন।

এই দৃষ্টিতে দেখা যায়— পদগ্রন্থগুলো আসলে সংহিতার সংক্ষিপ্ততম ব্যাখ্যাগ্রন্থ বললেও ভুল হবে না।

যে-সংহিতা সেই মতে পদপাঠের পাঠপদ্ধতি প্রায়ই পৃথক হয়। প্রতিটি সংহিতার পদপাঠ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট নিয়ম তাদের নিজস্ব প্রাতিশাখ্য গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে নির্ধারিত রয়েছে। সেই বিধান অনুযায়ী পদপাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ সমকালীন বৈদিক ব্যাকরণ ও ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়ম বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অনেক স্থানে এ তুলনামূলক পাঠ এমন কিছু শব্দ বা ধাতুর অস্তিত্ব প্রকাশ করে— যা বর্তমানে সংস্কৃত ভাষা থেকে বিলুপ্ত। এই ধরনের শব্দ বিষয়ে পানিনি-প্রমুখ ব্যাকরণাচার্যরা উপনিয়ম, আগম-লুপ্তি, বিকার প্রভৃতি নিয়ম আলোচনা করেছেন।


সমস্ত পদগ্রন্থের মধ্যে সামবেদীয় পদপাঠ বিশেষভাবে স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। যেখানে অন্য পদকারেরা একমত হয়ে শব্দভাগ দেখিয়ে অবগ्रह প্রদর্শন করেন না, সামবেদীয় পদকার সেখানে অবগ्रहচিহ্ন ব্যবহার করেন। এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী অধ্যায়ে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হবে।

এখানে সামগ্রিকভাবে পদপাঠগুলোর পাঠপদ্ধতি যথাযথ বিভাগে উপস্থাপন করা হলো—


(টীকা)

১. পানিনীয় ব্যাকরণে বর্ণিত লোপ-আগম-আদেশ ইত্যাদির মাধ্যমে হ্রাস পাওয়া বা পরিবর্তিত রূপ থেকে মূল ধাতু শনাক্ত করা যায়— এই প্রসঙ্গে লেখকের "আদিভাষায় ব্যবহৃত অপাণিনীয় রূপগুলির শুদ্ধতার বিচার"-নামক প্রবন্ধ দেখার যোগ্য। এটি বেদবাণী-পত্রিকার ১৪য় বর্ষের প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১ — যেখানে অবগ্রহচিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে, সে ধরনের পদপাঠের নিয়ম

প্রথমে সেই পদগুলোর পাঠপদ্ধতি বলা হলো— যেগুলোতে অবগ্রহ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে।

ক — ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদ পদপাঠে

এখানে অবগৃহীত (সংযোগবিচ্ছিন্ন) পদ কেবল একবার অবগ্রহসহ প্রদর্শিত হয়। উদাহরণ:

  • परः$हितम्‌ (ঋগ্বেদ ১।১।১)

  • चित्रश्रव$तमः (ঋগ্বেদ ১।১।৫)

  • त्रि$सप्ताः (অথর্ববেদ ১।১।১)

  • पार्‌ऽयान्त (অথর্ববেদ ১।১।১)

এখানে $ চিহ্ন অবগ্রহসূচক।

খ — শ্বেত ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ পদপাঠে

এখানে অবগৃহীত পদ প্রথমে এটি বা ইতি শব্দ যোগ করে নির্দেশ করা হয়, তারপর পৃথক রূপে পুনরায় লেখা হয়। যেমন—

  • “श्रेष्ठतमायेति श्रेष्ठ तमाय” (শুক্ল যজুর্বেদ ১।১)

  • “प्रजावंती-রিতি-प्रजा वतीः” (শুক্ল যজুর্বেদ ১।১)

কৃষ্ণযজুর্বেদেও একই নিয়ম—

  • श्रेष्ठतमायेति श्रेष्ठ तमाय (তৈত্তিরীয় সংহিতা ১।১)

  • प्रजावंतीरिति प्रजा वतीः (তৈত্তিরীয় সংহিতা ১।১)

মৈত্রায়ণীয় পদপাঠে

এখানেও পদ দুইবার লেখা হয়, কিন্তু এখানে দুটি পাঠভেদ দেখা যায়—

  • একটি পাঠ শ্বেত যজুর্বেদের নিয়ম অনুসরণ করে।

  • অপরটি তৈত্তিরীয় (কৃষ্ণ যজুর্বেদ) পাঠ অনুসরণ করে।

উদাহরণ:

  • श्रेष्ठतमायेति श्रेष्ठ तमाय । श्रेष्ठतमायेति श्रेष्ठ तमाय ।
    (মৈত্রায়ণীয় সংহিতা ১।১।১)

গ — সামবেদ পদপাঠে

এখানেও অবগৃহীত পদ দুইবার লেখা হয়, কিন্তু এখানে যজুর্বেদের মতো “इति”-পদ যোগ করা হয় না।

উদাহরণ:

  • हव्यदातये हव्य दातये (সামবেদ পূর্বার্চিক ১।১।১)

(টীকা)

১. মাধ্যন্দিন পদপাঠে, সংহিতার মতো যথাস্থানে দ্বিত্ব (ব্যঞ্জনদ্বিগুণ) পাঠ পাওয়া যায়— এখানে উদাহরণ না দিয়ে সংক্ষেপ রাখা হলো।

২. মৈত্রায়ণীয় স্বরপদ্ধতি, ঋগ, অথর্ব ও যজুর্বেদের স্বরপদ্ধতির থেকে ভিন্ন। তবে এখানে উদাহরণ প্রদানে সহজতার জন্য তিনটির সাধারণ স্বরচিহ্ন অনুসরণ করা হয়েছে।

विश्ववेद्ससम्‌ विश्व वंद्ससू | स० पू० १११११ ॥
উচ্চারণ → বিশ্ববেদ্সসম্‌ বিশ্ব বন্দ্সসু | সা. পূ. ১১।১।১১॥

এখানে অবগ्रहচিহ্ন ব্যবহৃত হলে, পূর্ব অংশের শেষে যে উদাত্ত উচ্চারণ থাকে, তা বিরামের সময়ও উদাত্তরূপেই ধরা হয়, এবং সেটি নির্দেশের জন্য ‘২’ সংখ্যাচিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
পরবর্তী অংশে, তৈত্তিরীয় পদপাঠের মতো, পৃথক পদ হিসেবে গণ্য হয়। তাই পূর্ব অংশ উদাত্ত বা স্বরিত যাই হোক—
প্রয়োজনে স্বতন্ত্র স্বরিতরূপ বা সমাসবিহীন একক শব্দরূপ পাওয়া যায় না।


ঘ— "इव" (ইব/ইভ) শব্দের ক্ষেত্রে পাঠপদ্ধতি

কিছু পদকারেরা "ইব" শব্দটি সমাস (যৌগিক শব্দ) হিসেবে ধরে অবগ्रहচিহ্ন ব্যবহার করেন, আবার অন্যেরা এটিকে স্বতন্ত্র পদ অর্থাৎ আলাদা শব্দ হিসেবে গ্রহণ করেন।


উদাহরণ:

দেবনাগরী পাঠ বাংলা উচ্চারণ মন্তব্য
पिताऽईव । ऋ० १।१।६ ॥ পিতা’ইব এখানে ‘ইব’ সমাসবদ্ধ
अथर्व० २।१३।१ ॥ অথর্ব ২।১৩।১
पितेवेतिं पिता इव শু. য. ৩।২৪ পিতেভেতিং পিতা ইব
पितेवेतिं पिता इव, पितेवेतिं पिता इव । मै० १।५॥ মৈ. ১।৫ দুইভাবে পাঠ পাওয়া যায়

এখানে মৈত্রায়ণীয় পাঠে, পূর্বোক্ত নিয়মের মতোই ভিন্ন ভিন্ন কোষভেদে অবগ্রহচিহ্নের পর দুটি স্বরপদ্ধতি পাওয়া যায়।


स्वतन्त्र "इव" (ইব শব্দের স্বতন্ত্র রূপ):

দেবনাগরী বাংলা উচ্চারণ সূত্র/স্থান
पिता । इव॒ । तै० सं० १।५।६ ॥ পিতা । ইবꣳ । তৈ. সং. ১।৫।৬
राजा । इव রাজা । ইব তৈ. সং. ১।২।১৪
चम । इव । सा० पू० २।६।८ ॥ চম । ইব । সা. পূ. ২।৬।৮
महिषी इव মহিষী । ইব

📌 অতিরিক্ত মন্তব্য

এখানে এটিও জেনে রাখা প্রয়োজন যে—

  • সূত্রকার পাণিনি "ইব" শব্দকে সমাসরূপে গ্রহণ করেন না।

  • কিন্তু বাত্তিককার (কাত্যায়ন) তাঁর সূত্রে বলেন—

    “इवेन नित्यसमासो विभक्त्यलोपः पूर्वपदप्रकृतिस्वरत्वं च।”
    (বাত্তিকসূত্র ২।২।১৮)

অর্থাৎ— ইব শব্দের সঙ্গে সমাস নিত্য বা বাধ্যতামূলক, বিভক্তির অপসার এবং পূর্বপদের মূল স্বর বজায় থাকে।


📌 উল্লেখিত রেফারেন্স:

  • আমাদের গ্রন্থ— "वैदिक स्वर मीमांसा"
    পৃষ্ঠা: ২০৩ (সূত্র ১৬৩) এবং পৃষ্ঠা ১৫৬ (সূত্র ৫৩) দেখুন।

দ্বি — আগুদ্যত্বনিদেশেন প্রকারঃ প্রগৃহ্যত্বনিদর্শনায় যদ্যপি সর্বেষু পদগ্রন্থেষ্বিতিনা নির্দেশঃ সাধারণরূপেণোপলভ্যতে, তথাপি প্রগৃহ্যত্বনিদর্শনপ্রকারঃ পদগ্রন্থেষু বহু‌ধা ভিদ্যতে।

ক— কৃক্সামাথব বেদেতে রিয় ম্যৈত্রায়ণ পদপাঠেষু যত্র শুধু প্রগৃহ্য-সংজ্ঞাই নির্দেশনীয় হয়, তত্র শুধু “ইতি” পদ পরে ব্যবহৃত হয়। তদ্যথা —

  • বায়ো ইতি | ঋ ১।২।৩; গ্র ৬।৬৮।১।

  • হ্যে ইতি | সাম পূ ১।১।৩।

  • অসমে ইতি | সাম পূ ২।১।৩।

  • বিষ্ণো ইতি | তাই ১।১।৩; ম্যৈ ১।১।৩।

অনুস্মরণ-বাক্য

ভ্রাত্রে দমপি ধ্যেয়ম্ — তৈত্তিরীয় পদপাঠে ও-কারান্ত সম্বোধনপদ প্রগৃহ্যত্ব ও অপ্রগৃহ্যত্ব — উভয় ফল লাভ করে। তার ব্যাখ্যা “গ”-সন্দর্ভে দ্রষ্টব্য।


খ--

খ— শ্বেতযজুর্বেদের পদপাঠে প্রগৃহ্যত্ব নির্দেশ করার জন্য মন্ত্র-পদ “ইতি”-সহ পুনরায় পড়া হয়। তদ্যথাবিষ্ণো ইতি বিষ্ণো | য ১।৪।

ত্রৈত্তিরীয় পদপাঠে সম্বোধন-ও-কারান্ত শব্দ দ্বৈতরূপে— নিরবগ্রহ ও স-অবগ্রহ — উভয়ভাবেই পাওয়া যায়।


উদাহরণ 

  • विष्णो हव्यम-विष्णो इति | तै १।१।३॥
    বিষ্ণো হব্যম — বিষ্ণো ইতি | তাই ১।১।৩।

  • शतक्रतो इति शत क्रतो | तै १।६।१२॥
    শতক্রতো ইতি শত ক্রতো | তাই ১।৬।১২।


घ-- (চ)

সামবেদ-পদকার সম্বোধনে ও-কারান্ত শব্দে কখনোই প্রগৃহ্যত্ব চান না, তাই “ইতি” ব্যবহার হয় না।

উদাহরণ:

  • विभावसो विभा वसो । सा० पू० १।९।६॥
    বিভাবসো বিভা বাসো | সাম পূ ১।৯।৬।


डः (ঙ)

যেখানে প্রগৃহ্য নির্দেশ-সহ অবগ্রহও দিতে হয়, সেখানে “ইতি”-সহ পুনরাবৃত্তি হয়।

উদাহরণ:

  • द्र्वत्पाणी इति द्रवत्पाणी । ऋ० ९।१।३॥
    দ্র্বত্পাণী ইতি দ্রবত্পাণী | ঋ ৯।১।৩।


📌এই অংশে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—

  • "প্রগৃহ্য" (যে স্বরান্ত শব্দে সংযোগ-বদল হয় না) কীভাবে বিভিন্ন বেদ-সংস্করণে নির্দেশিত হয়।

  • কোথাও শুধু "ইতি" বসিয়ে নির্দেশ করা হয়,

  • কোথাও শব্দটি পুনরায় পড়তে হয় (ইতি-সহ),

  • কখনো সন্ধি-সমেত ও বিনা-সন্ধি দুটো রূপই দিতে হয়,

  • সামবেদে আবার এটি একেবারে দেওয়া হয় না।

মূল বক্তব্য:
👉 বিভিন্ন বেদে পদপাঠ-ব্যাকরণে প্রগৃহ্য নির্দেশের পদ্ধতি এক নয়—বহুভাবে দেখা যায়।


সাম্বেদ-এর পদপাঠ-গ্রন্থে যেখানে প্রগৃহ্য (যেখানে অক্ষর জোড়া ভঙ্গ না করে পড়তে হয়) এবং অবগ্রহ (যেখানে বিরতি বোঝানোর জন্য আলাদা করা হয়)—এই দুইয়ের নির্দেশ একটিমাত্র শব্দে দিতে হয়, সেখানে প্রথমে মন্ত্রের শব্দ স্বাভাবিকভাবে (সংহিতা মতে) পড়তে হয় এবং পরে আবার তা পুনঃপাঠ করে দেখাতে হয় কোথায় অবগ্রহ হবে এবং কোথায় প্রগৃহ্য নয়।

উদাহরণস্বরূপ —

  • "বিষু রূপে বিষু রূপে"

  • "অইনি অহনি"

এটিও মনে রাখা উচিত যে, কিছু পদকার (ব্যাকরণকার বা পাঠসংকলনকারী) ‘গৃহনী’ শব্দটিকে অবগৃহ নয়।

পদ-অবগ্রহ সংক্রান্ত বিষয়ে সাম বেদ-এর পদপাঠ-গ্রন্থ অন্য সব বেদ-পদপাঠ-গ্রন্থের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

পরবর্তীতে যথাস্থানে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশ দেওয়া হবে।

৩ — উপসর্গ নির্ধারণের নিয়ম

সংহিতা-পাঠে উপসর্গ (prefix) দুইভাবে ব্যবহৃত হয় —

১. স্বাধীন শব্দরূপে
২. ক্রিয়ার সাথে মিলিত রূপে

যে উপসর্গ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়, সেখানে তার নির্দেশনা পদপাঠের নিয়ম অনুযায়ী দেওয়া হয়।

আর যে উপসর্গ স্বাধীন রূপে ব্যবহৃত হয়, তা ঋগ্বেদ, সামবেদ এবং শুক্ল-যজুর্বেদের পদপাঠে একটি স্বাধীন শব্দের মতো পড়া হয়।

খন দুটি উপসর্গ একসাথে স্বাধীনভাবে উচ্চারিত হয়, তখন সংহিতা পাঠে “पर (পর)” যুক্ত করে না — অর্থাৎ পরে যুক্ত হয় না, আগে যুক্ত হয় না।

উদাহরণস্বরূপ —

  • এক উপসর্গ — “গণ অতি”

  • অনুইর্তি

  • সং-প্রয়চ্ছতি = সম্ + প্র + যচ্ছতি

  • অনু-প্রেহি = অনু + প্র + ইহি


✔️ সারসংক্ষেপ

এই অংশটি মূলত বেদপাঠের পদবিভাগ, উপসর্গ-ব্যবহার, সংহিতা-ও-পদপাঠের নিয়ম, এবং কোথায় প্রগৃহ্যঅবগ্রহ হবে তা বোঝানোর ভাষাতাত্ত্বিক নিয়ম।

সমাপ্তম্‌ । শিবমস্তু ।


Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদ ৭/৪/৭

  পরিষদ্যম্ হ্যরণস্য রেক্ণো নিত্যস্য রায়ঃ পতয়ঃ স্যাম। ন শেষো অগ্নে অন‍্যজাতম্ অস্ত্যচেতনস্য মা পথম্ বিদুক্ষঃ॥ ঋগ্বেদ ভাষ্য (স্বামী দयानন্দ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ