ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

08 January, 2026

বেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ

08 January 0

 

ও৩ ম্
বেদামৃতম্ : ভাগ ১৩–১৬
বেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ
(Medical Sciences in the Vedas)

লেখক:
পদ্মশ্রী ডঃ কপিলদেব দ্বিবেদী

নির্দেশক:
বিশ্বভারতী অনুসন্ধান পরিষদ
জ্ঞানপুর (ভদোহি)

এবং
ডঃ ভারতেন্দু দ্বিবেদী
প্রবক্তা – সংস্কৃত
রাজ্যিক স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়
হামীরপুর (উ.প্র.)
বিশ্বভারতী অনুসন্ধান পরিষদ
জ্ঞানপুর (ভদোহি), উ.প্র.

ও৩ম্
প্রাক্কথন

বেদের গুরুত্ব – বেদ হলো আর্যজাতির সর্বস্ব এবং মানবজাতির জন্য এক দীপ্তি স্তম্ভ ও শক্তির উৎস। বেদের জ্ঞানই মানবজাতিকে সুখ ও শান্তি দিতে পারে। একই সাথে এটি অজ্ঞতা, হতাশা, অনাচার এবং রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়ে জীবনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

বেদ এবং আয়ুর্বেদ – মনু বলেন, “সর্বজ্ঞানময় হি সঃ” (মনু ২.৭)। বেদের মধ্যে সকল বিদ্যার ভাণ্ডার রয়েছে। বেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত শত শত মন্ত্র রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা বর্ণিত। অথর্ববেদকে ভেষজ অর্থাৎ ভিষগ্বেদ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। চরক এবং সুশ্রুত গ্রন্থে আয়ুর্বেদকে অথর্ববেদের উপাংশ বলা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে আয়ুর্বেদের উদ্ভব উৎস হলো অথর্ববেদ।

ঋগ্বেদ এবং যজুর্বেদেও আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত যথেষ্ট উপাদান পাওয়া যায়।
ঋগ্বেদ প্রভৃতিতে ঔষধির উল্লেখও যথাস্থানে আছে। ঋগ্বেদে ৬৭ প্রকার উদ্ভিদ, যজুর্বেদে ৮২ এবং অথর্ববেদে ২৮৮ প্রকার উদ্ভিদ উল্লেখিত। এদের বিস্তারিত বিবরণ অধ্যায় ১২-তে দেওয়া হয়েছে।

অধ্যায়ের বিভাজন

অধ্যায়ের বিভাজনে চরক, সুশ্রুত প্রভৃতির আয়ুর্বেদী গ্রন্থের বিভাজন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এইভাবে ক্রমশঃ সূত্রস্থান, শারীরস্থান, নির্ণয়স্থান এবং চিকিৎসা-স্থান অধ্যায় রাখা হয়েছে। শরীরের অংশ অনুসারে রোগগুলোকে ক্রমান্বিত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। শল্যচিকিৎসা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একত্র করা হয়েছে।

বেদামৃত গ্রন্থমালা

এই গ্রন্থমালার ১২টি অংশ ইতিমধ্যেই জনগণের সেবায় উৎসর্গ করা হয়েছে। ভাগ ১৩: শরীর-বিজ্ঞান, ভাগ ১৪: রোগ-চিকিৎসা, ভাগ ১৫: বিষ-চিকিৎসা, ভাগ ১৬: বিভিন্ন ঔষধ। এই চারটি ভাগ এই গ্রন্থে একত্র করা হয়েছে। এতে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য এক স্থানে সংরক্ষিত হয়েছে। ব্যবহারিক দিক থেকে চারটি ভাগ একত্রিত করে প্রকাশ করা যৌক্তিক মনে হয়েছে।

মুদ্রণের কিছু অসুবিধার কারণে প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে টিপ্পণী ক্রমশঃ দেওয়া হয়েছে। পাঠকরা সেগুলো সেখানে দেখতে পারবেন।

আয়ুর্বেদ – আয়ুর্বেদ হলো জীবনের অঙ্গ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আয়ুর্বেদের প্রয়োজনীয়তা থাকে। কালিদাসের এই বক্তব্য একেবারে উপযুক্ত যে, “শরীরমাদ্যং খল ধরমসাধনম্” – অর্থাৎ সুস্থ শরীরই ধর্মের সাধন।

সুস্থ থাকার পদ্ধতির উপদেষ্টা হলো আয়ুর্বেদ। রোগ ও ব্যাধির চিকিৎসা আয়ুর্বেদের মাধ্যমে সম্ভব, অতএব এই শাস্ত্র আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমি চেষ্টা করেছি যে, বিষয় সম্পর্কিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাদ না যায়। একই সঙ্গে বিষয়কে যতটা সম্ভব সহজবোধ্য করা হোক। ঔষধির বিবরণ ইত্যাদিতেও বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

সূত্রস্থান, শারীরস্থান, নির্ণয়স্থান ও চিকিৎসাস্থান অধ্যায়ের লেখায় চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা এবং অষ্টাঙ্গহৃদয় গ্রন্থের পর্যাপ্ত সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। শল্যচিকিৎসা অধ্যায়ের লেখায় ডা. রামজীৎ বিশ্বকর্মা রচিত ‘বৈদিক সাহিত্যে শল্যচিকিৎসা’ থেকে বিশেষ সহায়তা প্রাপ্ত হয়েছে।

‘বিভিন্ন ঔষধ’ অধ্যায়ের লেখায় ভাওপ্রকাশ নিঘন্টু, আচার্য প্রিয়বরত শর্মা রচিত ‘দ্রব্যগুণ বিজ্ঞান’ (ভাগ ৪), ডা. রাজীব কমল রচিত ‘Economy of Plants in the Vedas’ থেকে বিশেষ সহায়তা নেওয়া হয়েছে। শ্রী স্বামী ব্রহ্মমুনি রচিত ‘অথর্ববেদীয় চিকিৎসাশাস্ত্র’ গ্রন্থ থেকেও উপকারী তথ্য নেওয়া হয়েছে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ।

গ্রন্থের প্রকাশনার ব্যবস্থাপনায় জ্যেষ্ঠ পুত্র ডা. ভারতেন্দু দ্বিবেদী অবদান রেখেছেন। প্রুফ রিডিং প্রভৃতি কাজে পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সহযোগিতা লেগেছে – ধর্মেন্দু, জ্ঞানেন্দু, বিশ্বেন্দু, আর্যেন্দু এবং পুত্রবধূমহিলা স্মৃতি সাভিতা, জয়া ও সুনীতা। সকলকে আন্তরিক আশীর্বাদ।

আশা করি এই গ্রন্থ বেদ ও আয়ুর্বেদ প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ উদ্রেক করবে এবং তাদের জন্য উপকারী প্রমাণিত হবে। যদি এই গ্রন্থের মাধ্যমে জনার্দনের কোনো উপকার সাধিত হয়, আমি আমার প্রচেষ্টা সফল মনে করব।

– ডা. কাপিলদেব দ্বিবেদী
জ্ঞানপুর (বারাণসী)
তারিখ: ১৪.১.১৬৬৩ ই.
(মকর সংক্রান্তি ২০৪৬ বি.সি.)

ওম
অধ্যায় – ১
সূত্রস্থান

১. বেদ এবং আয়ুর্বেদ

বেদ হলো বিশ্বসংস্কৃতির ভিত্তি স্তম্ভ। প্রাচীন কাল থেকে বেদ মানবজাতির জন্য আলোকস্তম্ভ হিসেবে বিদ্যমান। বেদে জ্ঞান এবং বিজ্ঞান অশেষে সমৃদ্ধ। অতএব মানু বেদকে সর্বজ্ঞানময় বলেছেন, অর্থাৎ বেদে সমস্ত প্রকারের জ্ঞান এবং বিজ্ঞান নিহিত আছে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বেদ অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, চারটি বেদেই আয়ুর্বেদের বিভিন্ন অঙ্গ এবং উপাংশের যথাযথ বিবরণ বিস্তৃতভাবে দেওয়া আছে।

ঋগ্বেদ এবং আয়ুর্বেদ
ঋগ্বেদে আয়ুর্বেদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর যথাযথ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। এখানে আয়ুর্বেদের উদ্দেশ্য, বেদের গুণ-কর্ম, বিভিন্ন ঔষধের উপকারিতা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিভিন্ন চিকিৎসা, অগ্নি-চিকিৎসা, জলের মাধ্যমে চিকিৎসা, বায়ুচিকিৎসা, সূর্যচিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা, হস্তস্পর্শ-চিকিৎসা, যজ্ঞচিকিৎসা, বিষ-চিকিৎসা, কৃমিনাশন, দীর্ঘায়ু, তেজ, ওজ, রোগমুক্তি, ওষুধের মাধ্যমে কুস্বপ্ননাশন ইত্যাদির বিশেষ বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হয়েছে।

যজুর্বেদ এবং আয়ুর্বেদ
যজুর্বেদে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত নিম্নলিখিত বিষয়ের তথ্য পাওয়া যায় – বেদের গুণ-কর্ম, বিভিন্ন ঔষধের নাম, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, চিকিৎসা, দীর্ঘায়ু, রোগমুক্তি, তেজ, ভার্চস, বল, অগ্নি ও জলের গুণ-কর্ম ইত্যাদি।

সামবেদ এবং আয়ুর্বেদ
সামবেদে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত তথ্য অত্যন্ত সীমিত। এখানে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত কিছু মন্ত্র নিম্নলিখিত বিষয়ের প্রকাশক – বেদক, চিকিৎসা, দীর্ঘায়ু, তেজ, জ্যোতি, বল, শক্তি ইত্যাদি।

অথর্ববেদ এবং আয়ুর্বেদ
আয়ুর্বেদের দৃষ্টিকোণ থেকে অথর্ববেদ অত্যন্ত মহত্ত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এতে আয়ুর্বেদের প্রায় সমস্ত অঙ্গ এবং উপাংশের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। অথর্ববেদ আয়ুর্বেদের মূল ভিত্তি। এতে আয়ুর্বেদ সম্পর্কিত নিম্নলিখিত বিষয়ের বিবরণ রয়েছে – ভিষজ বা বেদের গুণ-কর্ম, ভৈষজ্য, শরীরের অঙ্গ, দীর্ঘায়ু, রোগমুক্তি, তেজ, ভার্চস, প্রশমন, বাশি-করন, রোগনাশক, বিভিন্ন মণি, বিভিন্ন ঔষধের নাম এবং গুণ-কর্ম, রোগনাম ও চিকিৎসা, কৃমিনাশন, সূর্যচিকিৎসা, জলচিকিৎসা, বিষচিকিৎসা, পশুচিকিৎসা, প্রাণচিকিৎসা, শল্যচিকিৎসা ইত্যাদি।

অথর্ববেদেই এই বেদকে ভেষজ বা ভিষগ্বেদ নামে অভিহিত করা হয়েছে। গোপথ ব্রাহ্মণে অথর্ববেদের মন্ত্রগুলিকে আয়ুর্বেদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলা হয়েছে এবং অথর্বা শব্দের অর্থ ভেষজ বলা হয়েছে। শাতপথ ব্রাহ্মণে যজুর্বেদের এক মন্ত্রের ব্যাখ্যায় প্রানকে অথর্বা বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো প্রানবিদ্যা বা জীবনবিদ্যা হলো অথর্বণ বিদ্যা।

অথর্ববেদের আরেকটি নাম হলো ব্রহ্মবেদ। গোপথ ব্রাহ্মণের মতে, ব্রহ্ম শব্দও ভেষজ বা ভিষগ্বেদের সূচক। যা অথর্বা, তা ভেষজ; যা ভেষজ, তা অমৃত; যা অমৃত, তা ব্রহ্ম। অর্থাৎ ভেষজ এবং ব্রহ্ম শব্দ সমার্থক।

গোপথ ব্রাহ্মণের মতে, অঙ্গিরসের সম্পর্ক আয়ুর্বেদ ও শরীরবিজ্ঞানের সঙ্গে আছে। অঙ্গের রস বা তত্ত্বের যা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা অঙ্গিরস। অঙ্গ থেকে যা রস বের হয়, তা অঙ্গরস; সেটিকেই অঙ্গিরস বলা হয়েছে। গোপথে অন্যত্র বর্ণনা আছে যে, রস বা রসায়নবিজ্ঞানকে অঙ্গিরস বলা হয়।

২. আয়ুর্বেদ এবং তার উদ্দেশ্য

চরক এবং সুশ্রুতায় আয়ুর্বেদের লক্ষণ এবং তার উদ্দেশ্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

আয়ুর্বেদের লক্ষণ – চরক আয়ুর্বেদের লক্ষণ দিয়েছেন – “আয়ুর্বেদযতি ইতি আয়ুর্বেদঃ।”* অর্থাৎ, যা আয়ুর্বেদের জ্ঞান প্রদান করে, সেটিই আয়ুর্বেদ। এর ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে যে আয়ুর্বেদই মানুষের আয়ু বা জীবনকে সহায়ক (পাথ্য) এবং অপ্রয়োজনীয় (অপাথ্য) বস্তুর বর্ণনা দেয়, সুখজনক এবং দুঃখদায়ক কারণগুলির বিবরণ দেয়, উপাদানের গ্রহণযোগ্য মাত্রা এবং অযথার্থ মাত্রার পরামর্শ দেয়, এবং আয়ুবর্ধক ও আয়ুনাশক পদার্থের গুণ ও কর্মের বর্ণনা প্রদান করে। এছাড়াও আয়ুর্বেদে আয়ুর ক্ষমতা এবং আয়ুর প্রকৃতি সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়।

সুশ্রুত বলেছেন, যেখানে আয়ুর সহায়ক এবং অপ্রয়োজনীয় উপাদান বিবেচনা করা হয় এবং যা দীর্ঘায়ু প্রদান করে, সেটিই আয়ুর্বেদ।

আয়ুর্বেদের উদ্দেশ্য – চরক আয়ুর্বেদের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন – সুস্থ ব্যক্তির স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং অসুস্থ ব্যক্তির রোগ দূর করা। সুশ্রুতও একই অর্থ প্রকাশ করেছেন – রোগীকে রোগমুক্ত করা এবং সুস্থের স্বাস্থ্য রক্ষা করা, এটাই আয়ুর্বেদের প্রধান উদ্দেশ্য।

পশ্চিমা চিকিৎসাশাস্ত্রে স্বাস্থ্যরক্ষা বা Preventive Medicine and Hygiene এবং চিকিৎসা বা Curative Medicine নামে দুটি বিভাগ করা হয়েছে।

চরক বলেছেন, ধাতুর অমিলকে রোগ বলা হয় এবং ধাতুর সামঞ্জস্যকে রোগমুক্তি বা স্বাস্থ্য বলা হয়। স্বাস্থ্যই সুখ এবং রোগাবস্থা দুঃখ। অতএব, ধাতুকে সমমিত অবস্থায় রাখা হলো আয়ুর্বেদের লক্ষ্য।

বেদে আয়ুর্বেদের উদ্দেশ্য – বেদে আয়ুর্বেদের উদ্দেশ্যের উল্লেখ এবং নির্দেশ রয়েছে।

(ক) মৃত্যু বা রোগের কারণ দূরীকরণ – ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদে বলা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ দূর করুন ২০।
(খ) দীর্ঘায়ু প্রাপ্তি – দীর্ঘায়ু লাভ করুন ২১।
(গ) আচরণ এবং চিন্তাধারার পবিত্রতা – দীর্ঘায়ুর জন্য আচরণ ও চিন্তার পবিত্রতা প্রয়োজন। পবিত্র আচরণ ও চিন্তার মাধ্যমে রোগ নির্মূল করে দীর্ঘায়ু লাভ করা যায় ২২।
(ঘ) রোগের কারণ নির্মূল – তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছে, যেসব কারণে রোগ হয়, সেগুলো দূর করা উচিত ২৩।
(ঙ) জীবনকাল শতায়ু – জীবনের সীমা শতাব্দী বা তার বেশি ২৪। বেদে বহু স্থানে দীর্ঘায়ু, শতায়ু এবং সম্পূর্ণায়ু বা সর্বায়ু উল্লেখ আছে ২৫।
(চ) আত্মা ও দেহের দৃঢ়তা – অথর্ববেদে দেহের অঙ্গগুলোর রোগমুক্তি এবং আত্মার অজেয়তার প্রার্থনা করা হয়েছে ২৬।
(ছ) রোগের জীবাণু বিনাশ – অথর্ববেদে সকল রোগের কারণ বিষ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং সেই বিষ বা রোগকৃমি বিনাশের উল্লেখ আছে ২৭।

২০. মৃত্যোঁঃ পর্দ ঘোপয়ন্তঃ – ঋগ্ ১০.১৮.২, অথর্ব ১২.২.৩০
২১. দ্রাধীয়ায়ুঃ প্রতরং দধানাঃ – ঋগ্ ১০.১৮.২, অথর্ব ১২.২.৩০
২২. শুদ্ধাঃ পূতা ভবত যশিয়াসঃ – ঋগ্ ১০.১৮.২
২৩. যদাময়তি নিষ্কৃত – তৈত্তিরীয সংহিতা ৪.২.৬.২
২৪. শর্ত জীবন্তু শরদঃ পুরুষীঃ – ঋগ্ ১০.১৮.৪
২৫. অথর্ব ১৮.৬৭.১–৮; ১৬.৬৬.১–৪
২৬. অরিষ্ঠানি মে সর্বাত্মানিভৃষ্টঃ – অ. ১৬.৬০.২
২৭. যক্ষ্মাগাং সর্বেষাং বিষ নিরবোধমঃ ত্যতঃ – অ. ৬.৮.১২

এইভাবে, আয়ুর্বেদের মূল তত্ত্বে রোগনাশন, সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, রোগকৃমিনাশন এবং আচরণ-চিন্তাধারার পবিত্রতার উল্লেখ পাওয়া যায়।

৩. আয়ুর্বেদ-এর আটটি অঙ্গ


যদিও বৈদিক সাহিত্য-সংগ্রহে আয়ুর্বেদের আটটি অঙ্গের বিবরণ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়, তবু আট অঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ কোথাও দেখা যায় না। এটি নির্দেশ করে যে, আয়ুর্বেদের আট অঙ্গে বিভাজন পরবর্তীকালের চিন্তাধারার ফল।


চরক, সুশ্রুত এবং অষ্টাঙ্গহৃদয় গ্রন্থে এই আট অঙ্গের কিছু নামান্তর পাওয়া যায়। সুশ্রুত এদের নাম দিয়েছেন: ১. শল্যচিকিৎসা, ২. শালাক্য চিকিৎসা, ৩. কায়চিকিৎসা, ৪. ভূতবিদ্যা, ৫. কুমারভৃত্য, ৬. অগদ তন্ত্র, ৭. রসায়ন তন্ত্র, ৮. বাজীকরণ তন্ত্র।


চরক এদের নাম দিয়েছেন: ১. কায়চিকিৎসা, ২. শালাক্য, ৩. শল্যাপহর্তৃক (শল্য তন্ত্র), ৪. বিষগর-ভৈরোধিক-প্রশমন (অগদ তন্ত্র), ৫. ভূতবিদ্যা, ৬. কুমারভৃত্য, ৭. রসায়ন, ৮. বাজীকরণ।
অষ্টাঙ্গহৃদয় গ্রন্থে এদের নাম রয়েছে: ১. কায়চিকিৎসা, ২. বালচিকিৎসা, ৩. গ্রহচিকিৎসা, ৪. ঊর্ধ্বাঙ্গ-চিকিৎসা, ৫. শল্যচিকিৎসা, ৬. দংশত্রচিকিৎসা (বিষচিকিৎসা), ৭. জরাচিকিৎসা (রসায়ন), ৮. বৃশ্চিকিৎসা (বাজীকরণ)।

১. কায়চিকিৎসা – সম্পূর্ণ শরীরের চিকিৎসা। শরীরের সকল অঙ্গের রোগের চিকিৎসাই কায়চিকিৎসা। কায় শব্দের অর্থ জাঠরাগ্নি হিসেবে নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ যঠর (পেট) সম্পর্কিত আগ্নির চিকিৎসা।
২. বালচিকিৎসা – এটিকে কুমারভৃত্যও বলা হয়। অর্থ: শিশুদের পরিচর্যা এবং তাদের রোগের চিকিৎসা। ইংরেজিতে এটিকে Science of Paediatrics বলা হয়।
৩. গ্রহচিকিৎসা – এটিকে ভূতবিদ্যাও বলা হয়। এতে দেবী, বিপত্তি এবং গ্রহের কুপ্রভাব দূর করার জন্য শান্তিকর্ম ইত্যাদির বিধান আছে। এটিকে Demonology বলা হয়।
৪. ঊর্ধ্বাঙ্গ-চিকিৎসা – এটিকে শালাক্য চিকিৎসাও বলা হয়। এতে ঘাড় থেকে উপরের সমস্ত অঙ্গ, যেমন চোখ, নাক, কান, ঘাড় ইত্যাদির রোগের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত। ডাক্তারিতে এটিকে কায়চিকিৎসার অংশ ধরা হয়।
৫. শল্যচিকিৎসা – এটিকে শল্যতন্ত্রও বলা হয়। এতে তীক্ষ্ণ যন্ত্রাদি ব্যবহার করে চীর-ফাড় করা হয় এবং দূষিত উপাদান বের করা হয়। ইংরেজিতে এটিকে Surgery বলা হয়।
৬. বিষচিকিৎসা – এটিকে অগদতন্ত্র, দংশত্রচিকিৎসা, বিষগর-ভৈরোধিক-প্রশমনও বলা হয়। এতে সাপের বিষ ইত্যাদি দূর করার বিধান রয়েছে। ইংরেজিতে এটিকে Toxicology বলা হয়।
৭. রসায়নতন্ত্র – এটিকে রসায়ন বা জরাচিকিৎসাও বলা হয়। এতে যুবাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী রাখার, বার্ধক্যের প্রভাব দূর করার এবং শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির উপায় বর্ণিত হয়।
৮. বাজীকরণতন্ত্র – এটিকে বৃশ্চিকিৎসাও বলা হয়। শুক্রহীনকে শুক্রযুক্ত করার পদ্ধতিকে বাজীকরণ বলা হয়। এই চিকিৎসার মাধ্যমে শুক্রহীনকেও শুক্রযুক্ত করা সম্ভব।

বেদে কায়চিকিৎসা, বিষচিকিৎসা, শালাক্যচিকিৎসা বা চোখ, মাথা ইত্যাদি অঙ্গের রোগের চিকিৎসা এবং শল্যচিকিৎসার বর্ণনা অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে পাওয়া যায়। এগুলোর যথোপযুক্ত বিবরণ পরবর্তী অধ্যায়ে প্রদান করা হয়েছে। বালচিকিৎসা বা কুমারভৃত্য-এর বর্ণনা খুবই সংক্ষিপ্ত। একইভাবে গ্রহচিকিৎসা, রসায়নতন্ত্র এবং বাজীকরণের প্রসঙ্গও সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায়।

৪. চিকিৎসা চার প্রকারের
অথর্ববেদে চার প্রকারের ওষুধ এবং চিকিৎসা-পদ্ধতির উল্লেখ আছে। এগুলো হলো:-

১. আথর্বণী চিকিৎসা – এই চিকিৎসা-পদ্ধতির সম্পর্ক আথর্বণ বা আথর্বা ঋষির সঙ্গে। এই চিকিৎসা-পদ্ধতি সম্পর্কে একমততা নেই, তবে অধিকাংশ পণ্ডিতের মত অনুযায়ী এটি শান্তিমূলক পদ্ধতিতে সম্পাদিত চিকিৎসা। আথর্বা মানে যোগী। এতে ধ্যান, মনন, চিন্তন এবং মনোযোগ দ্বারা সম্পাদিত চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত। তাই এটিকে মানসিক চিকিৎসা বা Psycho-Therapy বলা যায়। এতে মন্ত্রশক্তি, জপ, পূজা-পাঠ, আশ্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণশক্তি বৃদ্ধি এবং রোগনাশন করা হয়। এখানে মনোবলকে উদ্দীপিত করে ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে রোগ নষ্ট বা ক্ষীণ করা হয়। অতএব Auto-Suggestion পদ্ধতিও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

২. অঙ্গিরসি চিকিৎসা – এর সম্পর্ক আংগিরস বা আংগিরা ঋষির সঙ্গে। এর দুইটি ব্যাখ্যা হতে পারে:
(ক) অঙ্গিরসের ব্যাখ্যা গোপথ এবং শতপথ ব্রাহ্মণ অনুযায়ী আঙ্গ-রাস হিসেবে। “অঙ্গের রস দ্বারা সম্পাদিত চিকিৎসা আংগিরসি।” এতে অঙ্গের রস যেমন রক্ত ইত্যাদি অন্যকে প্রদান করা, শরীরে বাহ্যিক রস পৌঁছানো, শরীরের অন্যান্য কার্যকর উপাদান পৌঁছানো, বৃক্ষ-উদ্ভিদ থেকে পুষ্টি গ্রহণ, রোগীর শরীরে অন্যান্য শক্তি-প্রেরক উপাদান পৌঁছানো ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পদ্ধতি কিছু অংশে অলপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গে সাম্যপূর্ণ।
(খ) অঙ্গিরসের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো কঠোর কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৌশিতকি ব্রাহ্মণ, শঙ্খায়ন শ্রোতসূত্র, আশ্বলায়ন শ্রোতসূত্র এবং ছান্দোগ্য উপনিষদে অঙ্গিরসকে ঘোর আংগিরস বলা হয়েছে। অঙ্গিরা ঋষির দৃষ্টি মন্ত্রে বর্ণিত রয়েছে বরণচিকিৎসা, শত্রুনাশন, শত্রুসেনানাশন, মণি দ্বারা সকল রোগ, শত্রু এবং রাক্ষসের নাশন ইত্যাদি। এছাড়াও বলা হয়েছে যে ঋষি কঠোর, তাদের দৃষ্টি এবং চিন্তন সত্য, অর্থাৎ তারা সূক্ষ্মদৃষ্টি সম্পন্ন। অঙ্গিরস পদ্ধতিতে শল্যক্রিয়া বা চীরফাড়া (Surgery) সম্পন্ন করা যায়। এতে সূক্ষ্মদৃষ্টি, কঠোর কৃত্য, অঙ্গ ছেদন এবং রোগের সঠিক কারণের জ্ঞান অপরিহার্য।

৩. দেবী চিকিৎসা – পৃথিবীসহ পাঁচ উপাদানকে দেবতা বলা হয়েছে। সূর্য, চন্দ্রও দেব। তাই মৃত্তচিকিৎসা, জলচিকিৎসা, অগ্নিচিকিৎসা, বায়ুচিকিৎসা, সূর্যচিকিৎসা, প্রাণায়াম-চিকিৎসা ইত্যাদি চিকিৎসা দেবী চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে প্রাকৃতিক চিকিৎসা বা Naturopathy বলা যায়।

৪. মানবজা বা মানষিক চিকিৎসা – এটি মানুষের দ্বারা নির্মিত চিকিৎসা। এতে মানুষের দ্বারা তৈরিকৃত চূর্ণ, অবলেহ, ভস্ম, কল্প, আষব, ভটি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এটি ঔষধ-চিকিৎসা, তাই এটিকে Drug-Therapy বলা যায়।

৫. বৈদ্য এবং তার কর্তব্য
বেদে বৈদ্য এবং তার কর্তব্যের বহু স্থানে উল্লেখ আছে। বৈদ্যের প্রধান কর্তব্য হলো-
১. রক্ষোহা – রাক্ষস অর্থাৎ রোগকৃমি নাশক হোক।
২. আমীবচাতন – রোগ ধ্বংস কর।
৩. বিপ্র – নিজের বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হও।
৪. সমস্ত ওষুধ সংগ্রহ কর।
৫. চিকিৎসার কার্য সম্পাদন কর।
৬. রোগের কারণ নাশ কর।
৭. ওষুধের মাধ্যমে শরীরের সকল ত্রুটি বের কর।
৮. শরীরকে রোগমুক্ত কর।
৬. দীর্ঘায়ু প্রদান কর।
১০. শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে ভাঙা হাড় ইত্যাদি জোড়া লাগানো।

অথর্ববেদে বলা হয়েছে, বৈদ্য রোগের বিস্তার রোধ করে তার সীমা স্থাপন করবে, ওষুধনির্মাণের মাধ্যমে মানুষ এবং প্রাণীকে রোগমুক্ত রাখবে, হাজার হাজার ওষুধের জ্ঞান অর্জন করবে। বৈদ্যকে বলা হয়েছে যে সে ক্রমাগত অভ্যাস বাড়াবে, চিকিৎসা কার্য সম্পাদন করবে এবং পবিত্র জীবন কাটাবে, তখনই সে উচ্চমানের বৈদ্য হতে পারে। বৈদ্য এমন শক্তিবর্ধক ওষুধ তৈরি করবে, যাতে বার্ধক্যের প্রভাব না থাকে এবং মানুষ শতবর্ষ বয়স পর্যন্ত তেজস্বী হয়ে জীবিত থাকে।49

আঙ্গিরস পদ্ধতিতে শল্যক্রিয়া বা চিরফাড় (সার্জারি) করা যেতে পারে। এতে সূক্ষ্ম দৃষ্টি, কঠোর কর্ম—অঙ্গচ্ছেদন ইত্যাদি করার ক্ষমতা এবং রোগসমূহের প্রকৃত কারণ ইত্যাদির জ্ঞান অপরিহার্য।
३. দেবী চিকিৎসা—পৃথিবী ইত্যাদি পঞ্চতত্ত্বকে দেব বলা হয়। সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদিও দেব। অতএব মৃত্তিকা-চিকিৎসা, জল-চিকিৎসা, অগ্নি-চিকিৎসা, বায়ু-চিকিৎসা, সূর্য-চিকিৎসা, প্রাণায়াম-চিকিৎসা ইত্যাদি চিকিৎসা দেবী চিকিৎসার অন্তর্গত। আধুনিক বিজ্ঞানের মতে একে প্রাকৃতিক চিকিৎসা বা Naturopathy বলা যেতে পারে।
४. মনুষ্যজা বা মানবী চিকিৎসা—এটি মানুষের দ্বারা নির্মিত চিকিৎসা। এতে মানুষের দ্বারা তৈরি চূর্ণ, অবলেহ, ভস্ম, কল্প, আসব, বড়ি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই চিকিৎসা ঔষধি-চিকিৎসা, তাই একে Drug-Therapy বলা যেতে পারে।

এমন ঔষধির নির্মাণ করুক, যাতে বার্ধক্যের প্রভাব না পড়ে এবং মানুষ শতবর্ষ পর্যন্ত তেজস্বী হয়ে জীবিত থাকতে পারে। চরক, সূশ্রত এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়ে বৈদ্যের গুণাবলি ও কর্তব্যের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে। উপর্যুক্ত সব তत्त्वই সেখানে অন্তর্ভুক্ত পাওয়া যায়। চরক যোগ্য বৈদ্যের প্রধান চারটি গুণ বলেছেন— (১) শাস্ত্রের ভালোভাবে জ্ঞান রাখা, (২) বহুবার রোগী, ঔষধ-নির্মাণ ও ঔষধ-প্রয়োগের প্রত্যক্ষ দর্শন করা, (৩) দক্ষ বা চতুর হওয়া, অর্থাৎ সময়ানুসারে উপযুক্ত ঔষধ নির্ধারণ করা ও তার প্রয়োগ করা, (৪) পবিত্রতা—অর্থাৎ আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শুচিতা। আভ্যন্তরীণ শুচিতা বলতে বোঝায়—সংযমী ও পবিত্র জীবন যাপন করা। বাহ্যিক শুচিতা বলতে বোঝায়—দেহ ও বস্ত্রাদি পরিচ্ছন্ন রাখা। অষ্টাঙ্গহৃদয়ে বৈদ্যের এ চারটি গুণও উল্লেখ করা হয়েছে—দক্ষতা, গুরুর কাছ থেকে শাস্ত্রের যথাযথ জ্ঞান অর্জন, ঔষধ-প্রয়োগাদি কাজ নিজে দেখে জ্ঞানলাভ করা এবং বাহ্য ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা।

সূশ্রত উচ্চকোটির বৈদ্যকে ‘ভিষকপাদ’ বলেছেন এবং তাঁর গুণ ও কর্তব্য উল্লেখ করেছেন যে তিনি শাস্ত্রজ্ঞ হবেন, ঔষধ-নির্মাণ ইত্যাদি নিজে দেখে থাকবেন, নিজে ঔষধ-নির্মাণ ও চিকিৎসার কাজ করবেন, সিদ্ধহস্ত হবেন, পবিত্র ও বীর হবেন, সব साधন প্রস্তুত রাখবেন, প্রত্যুৎপন্নমতি ও বিদ্বান হবেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ছাড়বেন না, সব ক্রিয়ায় দক্ষ হবেন, সত্যনিষ্ঠ ও ধর্মপরায়ণ হবেন।

সূশ্রত আরও জোর দিয়েছেন যে কেবল শাস্ত্রজ্ঞান থাকলেই যোগ্য বৈদ্য হওয়া যায় না; তাঁকে কার্যকর জ্ঞানও থাকা আবশ্যক, নচেৎ কঠিন রোগাদি ক্ষেত্রে সে ভীত হয়ে পড়বে। অতএব তত্ত্ব ও প্রয়োগ—উভয় দিক জানা যার, তিনিই উত্তম বৈদ্য। सुश्रुत এ দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে যোগ্য বৈদ্য হতে হলে নিজের শাস্ত্র ব্যতীত অন্যান্য শাস্ত্রেরও জ্ঞান থাকা দরকার এবং সে বহুশ্রুত হওয়া উচিত।

৬. চিকিৎসালয় এবং রোগীর শুশ্রূষা
অথর্ববেদের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে মানুষ ও পশুর জন্য চিকিৎসালয় ছিল। মন্ত্রে মানুষ এবং গরু, ঘোড়া ইত্যাদি পশুর উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে এদের জীবনরক্ষা হওয়া উচিত। অন্য এক মন্ত্রে বলা হয়েছে যে এখানে এসে সব মানুষ ও পশু নিরোগ ও সুস্থ হয়ে যায়। সঙ্গে গ্রামেরও উল্লেখ আছে। এতে জানা যায় যে চিকিৎসালয়ের ব্যবস্থা গ্রামেও প্রচলিত ছিল। এদের ব্যবস্থা ভালো হলে তবেই বলা যেত যে এখানে এসে…কিন্তু মানুষ ও পশু সবাই নিরোগ হয়ে যায়। গাভী ও ঘোড়া প্রভৃতির উল্লেখ থেকে জানা যায় যে মানুষের চিকিৎসালয়ের মতো পশুদের চিকিৎসালয়েরও ব্যবস্থা ছিল।

রোগীর পরিচর্যা ও শুশ্রূষার প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে যে বৈদ্য রোগীকে আশ্বাস দিয়ে যেতে থাকবে যেন সে ভয় না পায়, তার রোগ দ্রুত সেরে যাবে। এখানে এসে কেউ মারা যায় না। আমি তোমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনব। এই ধরনের আশ্বাসের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে এবং রোগী নিরোগ হয়ে যায়। রোগীর মনোবলকে উদ্দীপ্ত করলে মানসিক শক্তি বিদ্যুতের মতো কাজ করে এবং রোগকে মূল থেকে ধ্বংস করে দেয়। আধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাতেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

चरक সংহিতার সূত্রস্থানে চিকিৎসালয় (হাসপাতাল) নির্মাণের বর্ণনা আছে। হাসপাতালে ঔষধির সুন্দর ব্যবস্থা, শৌচালয়-মূত্রালয়ের ব্যবস্থা, সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মনোরঞ্জনের উপায়, সব ধরনের যন্ত্র ও শস্ত্র (সরঞ্জাম), রোগীদের দেওয়ার জন্য ফল-মেওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা আবশ্যক বলা হয়েছে। বৈদ্য ও চিকিৎসকের জন্য বলা হয়েছে যে তারা অভিজ্ঞ, যোগ্য, হৃদয়বান এবং চিকিৎসাকুশল হোন।

৭. নিরোগতা
বেদের মধ্যে নিরোগতার কিছু উপায় বলা হয়েছে। দীর্ঘায়ুর যে উপায় বলা হয়েছে, তা-ই নিরোগতার ভিত্তি। কয়েকটি অন্যান্য উপায় হলো—

১. পাঁচ আরোগ্যকারক তত্ত্ব—অথর্ববেদের এক সূক্তে পাঁচ আরোগ্যকারক তত্ত্বের উল্লেখ আছে। এগুলো হলো—পর্জন্য (বৃষ্টির জল), মিত্র (প্রাণশক্তি), বরুণ (জল), চন্দ্র ও সূর্য। বৃষ্টির জল শুদ্ধ ও রোগনাশক। প্রাণবায়ু শরীরকে শক্তি প্রদান করে। জল শরীরের দূষিত তত্ত্বকে বাইরে বের করে দেয়। চন্দ্র ইন্দ্রিয় ও মনকে শান্তি ও শক্তি দেয়। সূর্য শরীরের পোষক ও রক্ষক।

২. শুদ্ধ ও নির্বিষ অন্নের সেবন—অথর্ববেদের বক্তব্য যে শুদ্ধ অন্ন শক্তিবর্ধক ও রোগনাশক। যব ও চাল পুষ্টিকর ও রোগনাশক। অন্নের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে নিরোগতার জন্য নির্বিষ অন্নই খেতে হবে।

৩. খাদ্যগ্রহণের নিয়ম—অথর্ববেদে নিরোগতার জন্য খাদ্যের কিছু নিয়ম বলা হয়েছে। সেগুলো হলো— (ক) ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া; ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া অন্ন বলবর্ধক ও পুষ্টিকর হয়। (খ) সঠিকভাবে জল পান করা; পানীয় বস্তু যথাযথভাবে ও উপযুক্ত পরিমাণে পান করা উচিত। উপযুক্ত পরিমাণে পান করা জল রোগনাশক ও শরীরশোধক হয়। (গ) সঠিকভাবে গিলে খাওয়া; যত শান্তভাবে খাবার খাওয়া হয় এবং মুখের লালার সঙ্গে গিলে খাওয়া হয়, ততই তা পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য হয়। তাড়াহুড়ো করে খাওয়া খাদ্য অপাচ্য হয় এবং অজীর্ণ সৃষ্টি করে। এই জন্য আয়ুর্বেদে খাদ্যের তিনটি নিয়ম বলা হয়েছে— (ক) হিতভুক—হিতকর খাদ্য গ্রহণ করা, (খ) মিতভুক—অল্প বা সুষম পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করা, (গ) ঋতভুকসাত্ত্বিক ও সৎ উপায়ে উপার্জিত অন্নই ভোজন করা। ‘কোऽরুক’—কে নিরোগ থাকে?—এর উত্তরে এ উপরের তিনটি বিষয়ই বলা হয়েছে।

৪. মল-মূত্রের বেগ সংবরণ না করা—মল ও মূত্রের বেগ আটকে রাখলে নানারকম রোগ হয়; তাই তা আটকে রাখা উচিত নয়। अथर्वবেদে মূত্রের বেগ রোধ করলে মূত্রকৃচ্ছ্রের উল্লেখ আছে এবং মূত্র দ্রুত বের করে দেওয়া প্রয়োজনীয় বলা হয়েছে। चरक ‘ন বেগান্ধারনীয়’ অধ্যায়ে এর বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে মূত্রাদি আটকে রাখার ফলে যে রোগ হয় এবং তার চিকিৎসাও বলা হয়েছে।

৫. ত্রিদোষজনিত বিকারকে রোধ করা—বাত, পিত্ত ও কফের বিকার থেকে সব রোগ হয় এবং এগুলো সমভাবে রাখা হলে নিরোগতা আসে। অথর্ব বেদে অভ্রজ (কফ), বাতজ (বাত) ও শুষ্ম (পিত্ত) বিকার থেকে সৃষ্ট মাথাব্যথা ও কাস (কাশি) প্রভৃতি রোগের উল্লেখ আছে এবং এর চিকিৎসা হিসেবে ঔষধি-সেবন ও পর্বতাশ্রয় গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

৬. সাত্ত্বিক চিন্তাধারা গ্রহণ করা—অষ্টাঙ্গহৃদয়ের বক্তব্য যে রোগের দুটি আশ্রয়স্থান—শরীর ও মন। মানসিক রোগ রজোগুণ ও তমোগুণ থেকে উৎপন্ন হয়। যজুর্বেদে নিরোগতার জন্য শুভ চিন্তাধারা গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। অথর্ব বেদে উত্তম ভাবনা ও চিন্তার দ্বারা দীর্ঘায়ু লাভের কথা বলা হয়েছে।

৭. প্রসন্নচিত্ত থাকা—প্রসন্নচিত্ত থাকলে মানুষ নিরোগ, দীর্ঘায়ু ও তেজস্বী হয়।

৮. পাপ ও দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকা—পাপ, কুকর্ম ও কুবৃত্তির পরিত্যাগে মানুষ নিরোগ ও দীর্ঘায়ু হয়।

৯. শরীরকে হৃষ্টপুষ্ট রাখা—অথর্ববেদের বক্তব্য যে শরীরে নেত্রাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় শরীরের রক্ষক; এগুলোকে পুষ্ট রাখলে মানুষ নিরোগ ও দীর্ঘায়ু হয়।

১০. সূর্যোদয়ের আগে জাগ্রত হওয়া—অথর্ববেদের বক্তব্য যে উদীয়মান সূর্য ঘুমন্ত মানুষের তেজ হরণ করে; তাই নিরোগতা ও তেজস্বিতার জন্য সূর্যোদয়ের আগে ওঠা প্রয়োজনীয়।

৮. দীর্ঘায়ুষ্য

চারটি বেদেই দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত শত শত মন্ত্র আছে। এসব মন্ত্রে বিভিন্ন দেবতার নিকট দীর্ঘায়ুর প্রার্থনা করা হয়েছে। কিছু মন্ত্রে দীর্ঘায়ুর উপায়গুলোরও উল্লেখ আছে। বহু মন্ত্রে প্রার্থনা করা হয়েছে যে আমরা নিরোগ থেকে একশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে দেখি, শুনি, বলি, জীবিত থাকি, প্রজ্ঞাবান হই এবং উন্নতি করতে থাকি। দীর্ঘায়ুর কামনাকে শুধু একশ বছরে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনশ বছরের আয়ুর কামনাও করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে जमদগ্নি ও কশ্যপ ঋষি তিনশ বছর জীবিত ছিলেন। দেবতা ও ঋষিদের আয়ু তিনশ বছর পর্যন্ত হয়, সেই তিনশ বছরের আয়ু আমাদেরও প্রাপ্ত হোক। अथर्वবেদের একটি মন্ত্রে এর চেয়েও এগিয়ে সহস্র বছরের আয়ুর কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব মন্ত্রে দীর্ঘায়ু ও সহস্রায়ুর কয়েকটি উপায়ও বলা হয়েছে—

(১) সুকৃতঃ—সত্কর্ম করা,
(২) আবৃতো ব্রহ্মণা বর্মণা—জ্ঞানরূপী বর্মের আশ্রয় গ্রহণ করা,
(৩) জ্যোতিষা বৃদ্ধি চ—জীবন তেজস্বী এবং বীর্য-ঐশ্বর্যপূর্ণ হওয়া,
(৪) ঋতেন গুপ্তঃ—সত্য ভাষণ ও সত্য আচরণের আশ্রয় গ্রহণ করা,
(৫) ঋতুভিশ্চ সর্বেঃ গুপ্তাঃ—ঋতুর অনুকূল জীবনচর্চা,
(৬) মা মা প্রাপৎ পাপ্মা মোত মৃত্যুঃ—মৃত্যু বা স্বল্পায়ুর কারণ পাপ বা দুষ্কর্ম; তাই এর পরিত্যাগ করা,
(৭) অগ্নির্মা গোপ্তা—অগ্নি রক্ষক; শারীরিক অগ্নিকে সর্বদা প্রজ্বলিত রাখা, তাকে মন্দ হতে না দেওয়া,
(৮) উদ্যন সূর্যো নুদতাং মৃত্যুপাশান্—উদীয়মান সূর্য মৃত্যুর কারণসমূহ নাশ করে; অতএব তার কিরণ শরীরে পড়তে দেওয়া,
(৯) ব্যুচ্ছন্তীঃ উষসঃ—উষাকাল বা ব্রাহ্ম মুহূর্তে জাগ্রত হওয়া, ধারণা-ধ্যানাদি কার্য করা,
(১০) পর্বতা ধ্রুভাঃ—পর্বতের আশ্রয় গ্রহণ করা, সেখানে যাওয়া ও থাকা এবং নির্মল বায়ুর সেবন করা,
(১১) সহস্রং প্রাণা ময়ি আয়তন্তাম্—উপর্যুক্ত সাধনসমূহ মানুষকে শতগুণ বা সহস্রগুণ প্রাণশক্তি প্রদান করে তাকে সহস্রায়ু করে তোলে।

দীর্ঘায়ুর উপায়—উপরোক্ত সহস্রায়ুর সাধনের অতিরিক্ত আরও কিছু উপায়ও দীর্ঘায়ুর বলা হয়েছে। সংক্ষেপে সেগুলো হলো—

১. রজোগুণ ও তমোগুণ থেকে বাঁচা—মন্ত্রে বলা হয়েছে যে দীর্ঘায়ুর জন্য রজোগুণ ও তমোগুণে না জড়াতে। রজোগুণ রাগ–দ্বেষাদির আধার, তাই আয়ু ক্ষীণ করে। তমোগুণ আলস্য, প্রমাদ, অকর্মণ্যতা ও অবিবেকের কারণ, তাই মানুষের জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে। দীর্ঘায়ুর জন্য সত্ত্বগুণপ্রধান জীবন ও সাত্ত্বিক প্রবৃত্তি প্রয়োজন।

২. সত্যকে গ্রহণ করা—সত্যনিষ্ঠা, সত্যাচরণ ও সাত্ত্বিক জীবন মৃত্যু দূর করার সর্বোত্তম উপায়।

৩. প্রাণ ও আপান শক্তির সংযম—বহু মন্ত্রে প্রাণ ও আপান শক্তির সংযমকে মৃত্যুনাশক ও দীর্ঘায়ুর সাধন বলা হয়েছে। ‘মিত্র’ ও ‘বরুণ’ শব্দ দ্বারাও প্রাণ ও আপান শক্তিকে পুষ্ট করা দীর্ঘায়ুর জন্য প্রয়োজনীয় বলা হয়েছে। প্রাণ ও আপান শক্তিকে পুষ্ট করার উপায় হলো প্রाणায়াম।

৪. চিন্তার পরিত্যাগ—চিন্তা মানুষের आधি–ব্যাধি বাড়ায়, তাই তার পরিত্যাগ করতে হবে। দুঃখ ইত্যাদির অতীত ঘটনা ভুলে যেতে হবে।

৫. সূর্য ও বায়ু থেকে শক্তি গ্রহণ—সূর্য থেকে দর্শনশক্তি এবং বায়ু থেকে প্রাণশক্তি লাভ দীর্ঘায়ুর উপায়। সূর্যের রশ্মিকে দীর্ঘায়ুর দাতা ও মৃত্যুর রক্ষক বলা হয়েছে। সূর্যকিরণচিকিৎসা শিরোনামে এর বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।

৬. অগ্নি থেকে প্রাণশক্তি—অগ্নি প্রাণশক্তির দাতা। দেহে আগ্রেয় তত্ত্ব বৃদ্ধি করা এবং জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখা দেহকে নিরোগ ও হৃষ্টপুষ্ট করে।

৭. দুষ্কর্ম ও দুষ্প্রবৃত্তির পরিত্যাগ—দীর্ঘায়ুর জন্য দুষ্প্রবৃত্তি ও দুশ্চরিত্র ত্যাগ করা প্রয়োজন। মন্ত্রে ‘দুরিত’ শব্দ দ্বারা দুষ্কর্ম ও দুষ্প্রবৃত্তিকেই বোঝানো হয়েছে। এ দুটোই মানুষের জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে তাকে আল্পায়ু করে।

৮. ঔষধি-সেবন—ঔষধির গুরুত্ব বলা হয়েছে যে এগুলো মানুষকে বড় থেকে বড় রোগ ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। ঔষধি রোগনাশক ও শক্তিবর্ধক। এতে সহস্রপ্রকার শক্তি আছে। এগুলো দেহকে নবীন করে তোলে এবং দীর্ঘায়ু প্রদান করে।

ঠিক আছে, নিচের অংশটি সম্পূর্ণ বাংলায় অনুবাদ করা হলো — কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা যোগ করা হয়নি এবং শৈলী অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে—

৯. সূর্য, চন্দ্র ও ঔষধি—এক মন্ত্রে সূর্য, চন্দ্র এবং ঔষধিকে দীर्घায়ুর উপায় বলা হয়েছে। উদীয়মান সূর্য সকল রোগের নাশক। চন্দ্র ঔষধির রাজা। সূর্য অগ্রেয় তত্ত্ব বৃদ্ধি করে, আর চন্দ্র সোমীয় গুণের বর্ধক। চন্দ্র শীতলতা, স্নিগ্ধতা, শান্তি ও আনন্দপ্রদ স্বভাব দেয়। সোম্য গুণের দ্বারা শান্তি, আনন্দ ও সদ্ভাবের বৃদ্ধি ঘটে। ঔষধিগুলো সূর্য ও চন্দ্রের গুণ গ্রহণ করে অগ্নি ও সোমতত্ত্বকে পরিপূর্ণ করে।

১০. অজ্ঞানের পরিত্যাগ ও জ্যোতির পথ গ্রহণ—অজ্ঞতার কারণে মানুষ অ-পথ্য গ্রহণ করে এবং রোগগ্রস্ত হয়; তাই অজ্ঞতা দূর করে জ্যোতির পথ গ্রহণ করা দীর্গায়ুর উপায় বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, দীর্ঘায়ুর জন্য স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নিয়মের জ্ঞান ও তাদের পালন অপরিহার্য।

১১. ইচ্ছাশক্তি ও আত্মিক বল—ইচ্ছাশক্তি ও মানসিক বল মানুষকে দীর্ঘায়ু করে। আত্মিক শক্তি রোগগুলোকে নাশ করে মানুষকে শতায়ু ও সবল করে। অসুরদের দ্বারা বিদ্ধ ইন্দ্র মানসিক বল (স্বধা)-এর আশ্রয় নিয়ে নিজের রক্ষা করেছিলেন এবং মনোবল দ্বারা আত্মিক শক্তি লাভ করেছিলেন।

১২. শুদ্ধ জলের ব্যবহার—শুদ্ধ বায়ুর মতোই শুদ্ধ জল সর্বরোগনাশক। বৃষ্টির জলকে দেবজল বলা হয়েছে এবং এর গুণ হিসেবে বলা হয়েছে যে তা অমৃততুল্য এবং ঔষধিস্বরূপ।

১৩. মণি ও রত্নধারণ—বিভিন্ন মণি ও রত্ন ধারণ করা দীর্ঘায়ুর উপায় বলা হয়েছে। অথর্ববেদে হিরণ্য (সোনা) এবং জঙ্গিড প্রভৃতি মণিকে সর্বরোগনিবাৰক ও দীর্ঘায়ুর সাধক বলা হয়েছে।

দীর্ঘায়ুর উপায়—অথর্ববেদে বহু সূক্ত আছে, যেখানে দীর্ঘায়ুর প্রার্থনা করা হয়েছে। তাতে আয়ুবৃদ্ধির কয়েকটি উপায়ের উল্লেখও পাওয়া যায়। চারটি বেদেই প্রাকৃতিক চিকিৎসা ও প্রকৃতির সদ্ব্যবহারকে দীর্ঘায়ুর শ্রেষ্ঠ উপায় বলা হয়েছে। সূর্যরশ্মির গ্রহণ, বিশুদ্ধ বায়ুতে অবস্থান ও প্রाणায়ামের মাধ্যমে শুদ্ধ বায়ু গ্রহণ, যজ্ঞ ও অগ্নির গ্রহণ, শুদ্ধ জলের যথাযথ ব্যবহার—এসবের দ্বারা শরীর সুস্থ থাকে এবং দীর্ঘায়ু লাভ হয়।

চিন্তার পরিত্যাগ দীর্ঘায়ুর উত্তম উপায়। অতীতের কথা ভুলে যাওয়া উচিত। মনকে পবিত্র রাখা, সাত্ত্বিক চিন্তা গ্রহণ করা এবং সত্ত্বগুণের সংযোজনের দ্বারা আয়ু বৃদ্ধি পায়। রাজস ও তামস চিন্তা আয়ুকে ক্ষীণ করে। সত্য বলা, সত্য আচরণ ও সত্যনিষ্ঠা দ্বারা জীবনের রক্ষা হয়। পবিত্র ও সাত্ত্বিক আহার গ্রহণে দীর্ঘায়ু লাভ হয়। অপবিত্র বা বিষাক্ত খাদ্য আয়ুকে হ্রাস করে। দীর্ঘায়ুর জন্য প্রয়োজন যে মানুষ স্বনির্ভর ও পুরুষার্থপরায়ণ হোক। শারীরিক সুস্থতা, নিঃরোগতা, শরীরকে সবল রাখা এবং নিজের পুরুষার্থের ওপর নির্ভর থাকা মানুষকে শতায়ু করে।

অথর্ববেদের বক্তব্য হলো—ঔষধি এবং জলে দেবশক্তি আছে। এগুলোর যথাযথ সেবনে মানুষ শতায়ু হয়। ঔষধিতে সোমীয় তত্ত্ব রয়েছে। এগুলো মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকেও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে দীর্ঘায়ু করে। অথর্ববেদের এক সূক্তে বলা হয়েছে যে দাক্ষায়ণ মণি (সোনার মণি) ধারণ করলে মানুষ দীর্ঘায়ু, শতায়ু, তেজস্বী ও বীর্যবান হয়। অথর্ববেদে উগ্রঔষধি (দর্ব, কুশ ইত্যাদি) এবং দর্ব (কুশ) মণি ধারণকে দীর্ঘায়ুর উপায় বলা হয়েছে।

৬. ওজ, তেজ, বরচস ও জ্যোতি

চারটি বেদেই ওজ, তেজ, বরচস এবং জ্যোতির শত শত মন্ত্রে বর্ণনা হয়েছে এবং এগুলোর প্রাপ্তির জন্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।

সুশ্রুত বলেছেন যে শরীরে বিরাজমান সমস্ত ধাতুর উৎকৃষ্ট সারভাগ (তেজ)-কেই “ওজ” বলা হয়। ওজের কারণেই মানুষের মধ্যে বল থাকে, তাই বলকেও ওজ বলা হয়। ওজের ফলে মানুষের মধ্যে কর্ম করার শক্তি আসে এবং জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলো তাদের কাজ উত্তমভাবে করে। ওজের স্থান হৃদয়, কিন্তু তা রক্তের সঙ্গে সমগ্র দেহে ব্যাপিত হয়ে থাকে। ওজের অবস্থানের সঙ্গে দেহের অবস্থান যুক্ত এবং ওজ ক্ষয় হলে দেহের নাশ ঘটে। ওজই জীবনের ভিত্তি।

ঋগ্বেদে অক্ষয় ওজের প্রার্থনা করা হয়েছে। ওজ দ্বারা মানুষ উন্নতি করে। সর্বোত্তম ওজ এবং শক্তি আমাদের প্রাপ্ত হোক। প্রজাদের মধ্যে ওজ ও তেজ থাকুক। তেজের কারণেই সূর্য-চন্দ্র প্রভৃতি জ্যোতিমান। আমরা বরচস্বী হই। আমরা তেজ এবং মহান শক্তি লাভ করি। আমি অমর জ্যোতি লাভ করি। বিদ্বান অন্ধকার দূর করে জ্যোতি লাভ করে। অশ্বিনী দেবতারা মানবজাতিকে জ্যোতি দিয়েছেন।

যজুর্বেদে বহু মন্ত্রে ওজ-তেজ প্রার্থনা আছে। ইন্দ্র ওজের কারণে উন্নতিশীল। ইন্দ্র দেবতাদের মধ্যে সর্বাধিক ওজস্বী—আমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ওজস্বী হই। অগ্নি দেবতাদের মধ্যে সর্বাধিক বরচস্বী—আমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক বরচস্বী হই। সূর্য সর্বাধিক জ্যোতির্ময়—আমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক জ্যোতির্ময় হই। হে ঈশ্বর! তুমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রদের তেজস্বী করো। বরচসের দ্বারা মানুষের মধ্যে কর্মঠতা ও দক্ষতা আসে। তেজস্বিতা মানুষের ইন্দ্রিয়সমূহকে পবিত্র করে। বরচস থেকে আত্মিক শক্তি, ওজ এবং দীর্ঘায়ু লাভ হয়। বরচস থেকে প্রাণাদি শক্তি, বাকশক্তি, দর্শনশক্তি, শ্রবণশক্তি, কর্মঠতা প্রভৃতি পাওয়া যায়।

সামবেদে বহু মন্ত্রে ওজ ও তেজের প্রার্থনা আছে। অগ্নি আমাদের বরচস এবং মহান শক্তি দিক। ইন্দ্র আমাদের জ্ঞান, তেজ এবং স্থায়ী শক্তি দিক। সোম আমাদের বরচসের জন্য শক্তি, বেগ এবং সৌন্দর্য দিক। পরমাত্মার উৎকৃষ্ট তেজ আমরা হৃদয়ে ধারণ করি। ওজলাভের জন্য আমরা অগ্নিকে প্রণাম করি। তেজের দ্বারা মানুষ দেবলোক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরমাত্মা আমাদের তেজ এবং যশ দান করুন। দয়াময় পরমাত্মা জ্যোতি দিয়ে আমাদের রক্ষা করেন। পরমাত্মা আমাদের সর্বদা জ্যোতি ও আনন্দ দান করুন।

অথর্ববেদেও বহু মন্ত্রে তেজ ও বরচসের প্রার্থনা আছে। আমি ব্রহ্মবরচসের দ্বারা বরচস্বী হই। দেবজল আমাদের বরচস প্রদান করুক। আমি তেজ দ্বারা তেজস্বী হই। অশ্বিনী দেবতা আমাকে বরচস, তেজ, বল এবং ওজ দিন। সূর্যের মধ্যে যে তেজ আছে, সেই তেজ আমাকে প্রাপ্ত হোক। দেবতারা জ্যোতির কারণে দেবলোক লাভ করেছেন। পৃথিবী আমাদের তেজস্বী ও তীক্ষ্ণশক্তিসম্পন্ন করুক। সূর্য, অগ্নি ও ব্রাহ্মণের মধ্যে যে তেজ আছে, তা আমাদের প্রাপ্ত হোক। পরমাত্মা ওজরূপ, তিনি আমাদের ওজ দিন। পরমাত্মা তেজরূপ, তিনি আমাদের তেজ দিন। আমরা তেজ, জ্ঞান ও দিব্যপ্রকাশ লাভ করি। তেজ ও কান্তি কোনোদিন আমাদের ত্যাগ না করুক। অগ্নি আমার শরীরে ওজ, বরচস, শক্তি ও বল প্রদান করুক। তোমরা দিব্য জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হও। হাতির তেজের ন্যায় আমাদের মহান যশ সর্বত্র বিস্তৃত হোক।

১০. বল এবং শক্তি
চারটি বেদে বহু মন্ত্রে শারীরিক শক্তির প্রার্থনা করা হয়েছে এবং তার উপায়গুলোরও বর্ণনা আছে।

চরক শক্তিবর্ধক তত্ত্বকে “রসায়ন” বলেছেন। চরকের বচন—ব্রহ্মচর্য বা সংযম সর্বোত্তম রসায়ন। এটি ধর্ম, যশ, দীর্ঘায়ু এবং উভয় লোকের (ইহলোক-পরলোক) জন্য কল্যাণকর রসায়ন। অষ্টাঙ্গহৃদয়ে বল ও শক্তির জন্য এই গুণগুলোকে অপূর্ব রসায়ন বলা হয়েছে—সত্যভাষণ, অক্রোধ, আত্মচিন্তন, শান্তচিত্ততা এবং সদাচার।

সুশ্রুত বলেছেন যে জীবনবল, বর্ণ ও ওজের মূল কারণ হলো আহার। আহার থেকেই দেহবৃদ্ধি, বল, স্বাস্থ্য, বর্ণ এবং ইন্দ্রিয়ের প্রফুল্লতা আসে। আহারের বিশৃঙ্খলতা থেকে অসুস্থতা ও রোগ জন্মায়।

ভোজনের বিষয়ে সুশ্রুত কয়েকটি উপকারী নিয়ম বলেছেন—
১) ক্ষুধা হলে তবেই আহার করা
২) যথোপযুক্ত পরিমাণে আহার করা
৩) ভালোভাবে চিবিয়ে আহার করা
৪) নির্দিষ্ট সময়ে আহার করা
৫) হালকা, পুষ্টিকর, রসযুক্ত এবং উষ্ণ আহার করা

ঋগ্বেদে বল ও শক্তির প্রার্থনার সঙ্গে-সঙ্গে তার সাধনসমূহেরও উল্লেখ আছে। যেমন—
১. প্রাতঃকালে ওঠা— উষাকাল আমাদের বল ও বীর্য দিক। ১৫৫
২. প্রাণ এবং আপানশক্তি বৃদ্ধি— অশ্বিনী আমাদের বল দিক। ১৪৭ প্রाण ও আপানশক্তির নামই অশ্বিনী।
৩. ঘৃতসেবন— ঘৃত দ্বারা নিজের শক্তি বৃদ্ধি করা। ১১৮
৪. তেজস্বিতার জন্য শক্তিবৃদ্ধি— আমরা তেজোময় ও সুখবর্ধক শক্তি লাভ করি। ১৫৬
৫. জল ও দুধসেবন— জল ও দুধ থেকে শক্তি লাভ করা। ১৬০

যজুর্বেদে বহু মন্ত্রে শক্তির প্রার্থনা আছে এবং কিছু উপায়েরও বর্ণনা রয়েছে।
১. বিশুদ্ধ অন্ন থেকে শক্তি— গব্য পদার্থ অন্নরূপ; তার ভক্ষণ করা। ১৫১
২. গৌদুগ্ধাদি থেকে শক্তি— গব্য পদার্থ উর্জারূপ; তার সেবনে শক্তি লাভ করা। ১৫২
৩. ঘৃতসেবন— ঘি দ্বারা শরীর পুষ্ট করা। ১৫৩
৪. সংযম ও বীর্যরক্ষা— বীর্য অমৃত। বীর্যরক্ষায় শক্তি বাড়ে। ৯৫৫
৫. জ্ঞানপূর্বক কর্ম করা— বাগ্দেবী প্রাণশক্তির দ্বারা শক্তি প্রদান করেন। ১৬৫

সামবেদের কিছু মন্ত্রে বল ও শক্তির প্রার্থনা রয়েছে। তাতে কিছু সাধন এইগুলি বলা হয়েছে—
১. আস্থিকতা ও উপাসনা— স্তুতিকারী উত্তম শক্তি লাভ করে। ১৬১
২. অগ্নি (জঠরাগ্নি) প্রদীপ্ত করা— অগ্নি প্রজাকে শক্তি দেয়। ১৯৭
৩. প্রাণ ও আপান থেকে শক্তি— অশ্বিনী অর্থাৎ প্রাণ ও আপানশক্তি মানুষকে বল দেয়। ১৯৮
৪. সোমপান— সোম আমাদের তেজোময় শক্তি দিক। ১৯৬
৫. উত্তম পুরুষার্থ— উত্তম পুরুষার্থীই শক্তি লাভ করে। ১৭০

অথর্ববেদের বহু মন্ত্রে বল ও শক্তির প্রার্থনা করা হয়েছে। কিছু উপায় এইগুলি বলা হয়েছে—
১. সূর্যকিরণ থেকে শক্তি— সূর্য দেব আমাদের শক্তি দিন। ১৭১
২. প্রाणায়াম থেকে শক্তি— বায়ু আমাদের প্রাণ ও আপানশক্তি দিন। ১৭২
৩. সূর্য থেকে নেত্রশক্তি— সূর্য থেকে নেত্রশক্তি এবং আকাশ থেকে শ্রবণশক্তি লাভ করা। ১৭৩
৪. ঈশপ্রার্থনা— হে ঈশ! তুমি বলরূপ, আমাদের বল দাও।
৫. অগ্নি থেকে দিব্যশক্তি— অগ্নিতে ৩৩ দেব-এর নিবাস আছে; অগ্নি আমাদের সকল ৩৩ দেবের শক্তি দিক। ১৭১
৬. যজ্ঞোপবীত থেকে ত্রিবিধ শক্তি— যজ্ঞোপবীতের তিনটি সুতোর দ্বারা আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক তিন প্রকার শক্তি আমাদের লাভ হোক। ১৭৬
৭. জ্ঞান থেকে বাকশক্তি— সরস্বতী থেকে আমাদের বাকশক্তি লাভ হোক। ১৯
৮. শ্রম থেকে বল— আমাদের শারীরিক বল লাভ হোক। ১৭৮
৯. পুরুষার্থ— পুরুষার্থের দ্বারা আমরা সর্বতোভাবে নিরোগ ও পরাক্রান্ত হই।
১০. মৃত্যুর কারণ থেকে বাঁচা— আমরা মৃত্যুর কারণসমূহ দূরে সরাই।

তথ্যঃ

১. বেদ এবং আয়ুর্বেদ
১. সর্বজ্ঞানের আধার তিনিই। মনুস্মৃতি ২.৭
২. দেখো, বেদামৃতম্ ভাগ ১২, ঋগ্বেদ সুবাণীতাবলী, পৃষ্ঠা ৩৩০ থেকে ৩৫৮
৩. দেখো, বেদামৃতম্ ভাগ ৬, যজুর্বেদ সুবাণীতাবলী, পৃষ্ঠা ১৭৮ থেকে ১৬৩
৪. বেদামৃতম্ ভাগ ১০, সামবেদ সুবাণীতাবলী, পৃষ্ঠা ১৩৭–১৪১
৫. বেদামৃতম্ ভাগ ১১, অথর্ববেদ সুবাণীতাবলী, পৃষ্ঠা ২২৬–৩০৩
৬. ঋষঃ সামানি ভেষজা, objectives। অথর্ব ১১.৬.১৪
৭. যে অথর্বাঙ্গঃ, তাই ভেষজ। গোপথ ব্রা. ১.৩.৪
৮. যজু ১১.৩৩। প্রাণো বা অথর্বা। শতপথ ব্রা. ৬.৪.২.২
৯. যজুষি চ ব্রহ্ম চ। অথর্ব ১৫.৬.৮
১০. যা ভেষজ তাই অমৃত, যা অমৃত তাই ব্রহ্ম। গোপথ ব্রা. ১.৩.৪
১১. যাকে অঙ্গরস বলা হয় তাকেই অঙ্গিরা বলে অভিহিত করা হয়। গো. ব্রা. ১.১.৭
১২. যে অদ্বিরসঃ সেইই রস। গোপথ ব্রা. ১.৩.৪

২. আয়ুর্বেদ এবং তার উদ্দেশ্য
১৩. চরক সূত্র ৩০.২৩
১৪. হিত–অহিত, সুখ–দুঃখ এবং আয়ুর হিত–অহিতের পরিমাপ যেখানে বলা হয়েছে তাকেই আয়ুর্বেদ বলা হয়। চরক সূত্র ১.৪১
১৫. যেখানে আয়ু বিদ্যমান, অথবা যার দ্বারা আয়ু লাভ হয় তাই আয়ুর্বেদ। সুश्रুত সূত্র ১.২৩
১৬. এর উদ্দেশ্য হলো — সুস্থের স্বাস্থ্যরক্ষা এবং অসুস্থের বিকার প্রশমন। চরক সূত্র ৩০.২৬
১৭. সুশ্রুত সূত্র ১.২২
১৮. চরক সূত্র ৮.৪
১৯. ধাতুর সাম্য রক্ষা করার কার্যই এই তন্ত্রের উদ্দেশ্য। চরক সূত্র ১.৫৩
২০. মৃত্যুর পথ গোপনকারী। ঋগ ১০.১৮.২, অথর্ব ১২.২.৩০
২১. দীর্ঘতর আয়ু প্রাপ্তির ধারক। ঋগ ১০.১৮.২, অথর্ব ১২.২.৩০
২২. তোমরা শুদ্ধ হও, পবিত্র হও, যজ্ঞযশস্বী হও। ঋগ ১০.১৮.২
২৩. যা রোগ দূর করে তার নিষ্কৃতি। তাইত্তিরীয় সংহিতা ৪.২.৬.২
২৪. শত বর্ষজীবী হও, বহু শরৎ দেখো। ঋগ ১০.১৮.৪
২৫. অথর্ব ১৮.৬৭.১ থেকে ৯; ১৮.৬৬.১ থেকে ৪
২৬. আমার সর্বাঙ্গ হোক অনিষ্টহীন। অ ১৬.৬০.২
২৭. যক্ষ্মা প্রভৃতি সকল রোগের বিষ আমি দূর করলাম। অ ৬.৮.১২

৩. আয়ুর্বেদের ৮ অঙ্গ

২৮. সুদূত সূত্র ১.৭
২৯. চরক সূত্র ৩০.২৮
৩০. অষ্টাঙ্গ সূত্র ১.৫.৬

৪. চিকিৎসা চার প্রকারের

৩১. আথর্বণীরাংগিরসী দেবীর মানবজাতি উত।
ঔষধয়ঃ প্র জয়ন্তে যদা ত্বং প্রাণ জন্দসि॥ অথর্ব ১১.৪.১৬
৩২. প্রাণো বা অথর্বা। শতপথ প্রা. ৬.৪.২.১
৩৩. ইয়েঅথর্বাঙ্গস্তদ ভেষজम्। মো. গ্রা. ১.৩.৪
৩৪. সর্বেভ্যোংগেম্যো রসোক্ষরত্, তোংঙ্গরতোবভবত্, তে বা এতম্ অঙ্গরসং সন্তম্ আডগিরা ইত্যাচক্ষতে,
গোপথ পূর্ব ১.৭। আইগিরসোংগানা হি রসঃ। শত. গ্রা. ১৪.৪.১.৮
৩৫. ঘোরা আঙ্গিরসোঽশ্বর্যুঃ। কৌষীতকি ব্রা. ৩০-৬। আশ্বো শ্ৰৌত ১০.৭.৪, শাংখো শ্ৰৌত ১৬.২.১২, ছান্দোগ্য উপ. ৩.১৭.৬
৩৬. অথর্ব ২.৩, ৭.৭৭, ৭.৬০, ১৬.৩৪, ৩৫।
৩৭. ঘোরা ঋষয়ো নমো অস্তধেব্যঃ।
চক্ষুয়দিয়া মনসশ্চ সত্যম॥ অথর্ব ২.৩৫.৪

৫. বৈদ্য এবং তার কর্তব্য

৩৮. যত্রৌষধি: সমগ্মত রাজানঃ সমিতাভিচ।
বিপ্রঃ স উচ্চতে ভিষণ রক্ষোহাআমীভচাতনঃ ॥ ওমগু. ১০,৬৭.৬
৩৯. যদ্ বা দেব ভিষজ্যথঃ। ঋগ. ৮.৬.৬। বরুণো ভিষজন। যজু. ১৬.৮০
৪০. যদামযতি নিষ্কৃত। ঋগ. ১০.৬৭.৬
৪১. ঔষধি: প্রাচুচ্যবুঃ যৎ কি চ তত্ত্বো রপঃ। সগ. ১০.৬৭.১০
৪২. ইস্ ম্ যদি কৃত। ঋগ. ১০.৬৭.২
৪৩. প্র না আয়ূষি তারিষত্। সাম. ১৮৪
৪৪. নিষ্কর্তা বিদ্যুতং পুনঃ। সাম. ২৪৪
৪৫. যথা সো অস্য পরিধিষ্ঠাতি। অ. ৫.২৬,২
৪৬. অ. ৫.২৬.১
৪৭. অ. ২.৬.৩
৪৮. যশ্চকার স নিষ্করত্ স এভং সুভিষকৃতমঃ। অ. ২.৬.৫
৪৯. উর্জা স্বধামজরাম্ ..... ভিষজস্তে আক্রণ। অ. ২.২৬,৭
৫০. শ্রুতে পর্যবদাতত্ব, বহুশো দৃষ্টকর্মতা।
দাক্ষ্য শৌচমিতি শ্রেয়ং, বৈধ্যে গুণচতুষ্টযম্।। চরক সূত্র ৬.৬
৫১. দক্ষস্তীর্যাত্তশাস্ত্রার্থো দৃষ্টকর্মা শুচির্ভিষক। অষ্টাঙ্গ সূত্র ১.২৮
৫২. তত্ত্বাধিগতশাস্ত্রার্থো দৃষ্টকর্মা স্বয়ংকৃটি।
লঘুহস্তঃ শুচি: শূরঃ সাজ্জোপস্করভেষজঃ॥
প্রত্যুত্পন্নমতিার্থীমান্ ব্যবসায়ী বিশারদঃ।
সত্যধর্মপোঃ বা শ্চ স ভিষকৃপাদ উচ্চতে॥ সুশ্রুত সূত্র ৩৪.১৬.২০
৫৩. বস্তুভয়জ্ঞো মতিমান, স সমর্থোঃ আর্বসাধনে। সুশ্রুত সূত্র ২.৫৩
৫৪. তসমাদূ বহুশ্রুতঃ শাস্ত্রং বিজানীযাত্ চিকিৎসকঃ। সুশ্রুত সূত্র ৪.৭

৬. চিকিৎসালয় এবং রোগীর সেবা
৫৫. তাইয়ন্তাম্ অসম্বিন্ গ্রামে গামশ্ব পুরুষ পশুম্। অ. ৮.৭.১১
৫৬. সর্বো ভে তত্র জীবতি গৌরশ্বঃ পুরুষঃ পশুঃ। অ. ৮.২.২৫
৫৭. ন রিষ্যসি মা বিবেহঃ। অ. ৮২.২৪
ত্বং মৃত্যো..... উদ্ ভরামি, ত মা বিভেহঃ। অ. ৮.২.২৩
৫৮. চরক, সূত্রস্থান, ১৫.৭

৭. নিরোগতা
৫৯. অথর্ব ১.৩.১-৫
৬০. ব্রীহিয়ভৌ ... এতোউ যক্ষ্ম বিবাঘেতে। অ. ৮২.১৮
৬১. সর্বো তে অত্রম্ অবিষ কৃগোমি। অ. ৮.২.১৬
৬২. যদশ্নামি বল কুরুবে। অ. ৬.১৩৫.১
৬৩. যৎ পিয়ামি সং পিভামি। অ. ৬.১৩৫.২
৬৪. যদু গিরামী সে গিরামি। অ. ৬.১৩৫.৩
৬৫. যদান্নেপু .... এভং তে মূত্র মুচ্যতা বহিঃ। অ. ১.৩.৬
৬৬. ন বেগান্ ধার্যেদূ ধীমান্ জাতান্ মূত্রপুরীষয়ঃ। চরক, সূত্র ৭.৩
৬৭. রোগস্তু দোষবৈষম্য দোষসাম্যমরোগতা। অষ্টাঙ্গ্ সূত্র ১.২০
৬৮. মুন্চ শীর্ষকতয়া উত্ কাত এনং। ইয়ো অভ্রজা বাতজা পশ্চ শুষ্ণোং বনস্পতীন্ সচতাং পর্বতাংশ্চ। অথর্ব ১.১২.৩
৬৯. রজস্তমশ্চ মনসঃ হি চ দোষাবুদাহাতৌ। অষ্টাঙ্গ্ সূত্র ১.২১
৭০. তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু। ইয়ণু ৩৪.১-৬
৭১. শিবাভিস্তে হৃদয় তর্পয়ামি। অ. ২.২৬.৬
৭২. অনমীবো মোদীষীফাঃ সুভার্চাঃ। অ. ২.২৬.৬
৭৩. ভ্যহ সর্বেণ পাম্মনা ভি লক্ষ্যণ সমায়ূষা। অ. ৩.৩১.১
৭৪. আয়ূর্ষত্ত প্রতরং জীবসে নঃ। অ. ৬.৪১.৩
৭৫. উচ্চন্ সূর্য ইভ সুপ্তানাঃ দ্বিষতা ভার্চ আ দদে। অ. ৭.১৩.২

৮. দীর্ঘায়ুষ্য
৭৬. অথর্ব ১৮.৬৭.১-৮, যজু ৩৬.১৬,২৪
৭৭. ত্যায়ুষ জমদগ্নেঃ কশ্যপস্য ত্যায়ুষম্। যদ্ দেবেষু ত্যায়ুষ তন্নো অস্তু ব্যায়ুষম্। যজু ৩.৬২
৭৮. সহসায়ুঃ সুকৃতশ্চরেয়ম্। অথর্ব ১৭.১.২৭
৭৯. অথর্ব ১৭.১.২৭-৩০
৮০. রজস্তমোমোপ গা। অ. ৮.২.১
৮১. সত্যস্য হস্তাভ্যাম্ উদমুল্বদ্ বৃষস্পতিঃ। অ. ৩.১১.৮
৮২. কৃণোমি তে প্রাণাপানি ... দীর্ঘমায়ুঃ। অ. ৮.২.১১, ২.২৮.৪, ৩.১১.৫
৮৩. অথর্ব ২.২৮.২
৮৪. মা গতানাম্ দীধীয়াঃ। অ. ৮.১.৮
৮৫. বাতাত্ তে প্রাণমবিদ সূর্যাৎ চক্ষুরঃ তব। অ. ৮.২.৩, ১৪
৮৬. সূর্যসত্বা ... মৃত্যুরদায়চ্ছতু রশ্মিভিঃ। অ. ৫.৩০.১৫
৮৭. অগ্রেষ্ঠে প্রাণম্ অমৃতাদু আয়ুষ্যতো বন্দে। অ. ৮২.১৩

৮৮. অপসিদ্ধ্য দুরিত ধত্তমায়ুঃ। অ. ৮.২.৭
৮৬. মৃত্যুর ঔষধয়ঃ সোমরাশীরপীপরণ। অ. ৮.১.১৭
৬০. ৩০ ৮,১১৮
৯১. অ. ৮.১.২০
৬২. শিবাস্তে সন্ত্বোষধয়ঃ। রক্ষতা সূর্যাচন্দ্রমসাভূভী। অ. ৮২.১৫
৮৩. আরোহ তমসো জ্যোতিঃ। অ. ৮.১.৮
৬৪. আরিষ্টঃ, শতহায়ন আত্মনা ভূজমশ্নুতাম্। অ. ৮.২.৮
৬৫. ইন্দ্রঃ.... বিদ্ধো অগ্র উর্জা স্বধামজরামু। অ. ২.২৬.৭
৮৬. অপ্তু অন্তরমৃতম্ আপ্সু ভেষজম্। অ. ১.৪.৪
৬৭. দাক্ষায়ণা হিরণ্য.... দীর্ঘায়ুত্বায় শতশারদায়। অ. ১.৩৫.১
দীর্ঘায়ুত্বায়... মণি... অঙ্গিড বিভৃমো বয়ম্। অ. ২.৪.১
৮৮. অথর্ব ৮১.৫ ৭৮২, ১৩ ও ১৪।
৬৬. অ. ৮১.৮
১০০. অ. ৮.২১। ২.২৬.৬
১০১. তে তে সত্যস্য হস্তাভ্যাম্ উদমুঞ্চদ্ বৃষস্পতিঃ। অ. ৩.১১.৮
১০২. অ. ৮.২.১৮ ও ১৬
১০৩. অ. ২.২৬.৭
১০৪. অ. ৬.৪১৩ ৬৮২৮৮
১০৫. অ. ১.৩০.৩
১০৬. অ. ৮১.১৭ ১ ৮.২.৫
১০৭. অ. ১.৩৫.১ থেকে ৪

৯. ওজ, তেজ, ভার্চস্ এবং জ্যোতি

১০৮. তত্র রসাদীন শুক্রান্তানং ঘালুনাং যৎ পরং তেজস্তৎ খল্বোজঃ তদেভ বলমিত্যুচ্যতে।
সুশ্রুত, সূত্র ১৫.২৪-৩০
১০৬. ঋগ্ ৩.৬২.৫
১১০. ঋগ্ ৮.৭৬.১০
১১১. ঋগ্ ৬.১৬.৬
১১২. ঋগ্ ৬.৪৬.৭
১১৩.ঋগ্১.৬.১
১১৪. ঋগ্১.২৩.২৩
১১৫. ঋগ্ ৬.৬৬.২১
১১৬. ঋগ্২.২৭.১১
১১৭. ঋগ্ ২.৩৬.৭
১১৮. ঋগ্ ১.৬২.১৭
১১৬. যজু ৮.৩৬
১২০. যজু ৮.৩৮
১২১. যজু ৮.৪০
১২২. যমু ১৮.৪৮
১২৩. যজু ৭.২৭
১২৪. যজু ১৬.৫
১২৫. যজু ৭.২৮
১২৬. যজু ৭.২৭
১২৭. সাম ১৫২০
১২৮. সাম ৬২৫
১২৬. সাম ৮৩৪
১৩০. সাম ১৪৬২
১৩১. সাম ১১
১৩২. সাম ৮৭৫
১৩৩. সাম ৬০২
১৩৪. সাম ১৩৫৬
১৩৫. সাম ১০৪৮
১৩৬. অথর্ব ১৭.১.২১
১৩৭. অ. ১০.৫.৭
১৩৮. অ. ১৭.১.২০
১৩৬. অ. ৬.১.১৭
১৪০. অ. ৩.২২,৪
১৪১. অ. ১১.১.৩৭
১৪২. অ. ১২.১.২১
১৪৩. অ. ৬.৩৮.১
১৪৪. অ. ২.১৭.১
১৪৫. অ. ৭.৮৬.৪
১৪৬. অ. ১৬.৮.১
১৪৭. অ. ১৬.৩.২
১৪৮. অ. ১৬.৩৭.২
১৪৯. অ. ২.৬.১
১৫০. অ. ৩.২২.১

১০. বল এবং শক্তি
১৫১. ব্রহ্মচর্যম্ আয়ুষ্কারাণাং শ্রেষ্ঠতমম্। চরক
১৫২. ধর্ম্য যশত্যমায়ুষ্যং লোকদ্বয়রসায়নম্।
অনুমোদামাহে ব্রহ্মচর্যমেকান্তনির্মলম্॥ অষ্টাঙ্গ০ উত্তর০ ৪০.৪
১৫৩. সত্যবাদিনমক্রোধম্ আধ্যাত্মপ্রবণেন্দ্রিয়ম্।
শান্ত সদ্বৃত্তনিরতং বিদ্যাদ্ নিত্যরসায়নম্। অষ্টাঙ্গ০ উত্তর০ ৩৬.১৭৬
১৫৪. প্রাণিনা পুনর্মূলমাহারো বলবর্ণীসা চ। সুশ্রুত, সূত্র০ ৪৬.৩
১৫৫. কালে সাত্ম্য লঘু সিন্ধ, ক্ষিপ্রমুষ্ণ দ্রবোত্তরম্।
বুভুখিতো'ত্রমশ্নীয়াদ মাত্রাবদ্ বিদিতাগমঃ।। সুশ্রুত, সূত্র০ ৪৬৪৭১
১৫৬. ঋগ০ ১.৪৮.১২
১৫৭. ঋগ্০ ৮.৩৫.১০
১৫৮. ঋগ্০ ১০৫৬.৫
১৫৬. গৃ০ ৬.১০৬.৪
১৬০. ঋগ্০ ১.৬১.১৮
১৬১. যজু০ ৩.২০
১৬২. যজু০ ৩.২০
১৬৩. যজু০ ১২.৪৪
১৬৪. যজু০ ১৬.৭৬, ২১.৫৫
১৬৫. অনু০ ২০.৮০
১৬৬. সাম০ ১৩১২
১৬৭. সাম০ ১৭৩৮
১৬৮. সাম০ ১৭৩৬
১৬৬. সাম০ ১৩২৫
১৭০. সাম০ ২৩৮
১৭১. অথর্ব০ ৬.৬১.১
১৭২. অথর্ব০ ৫.১০.৮
১৭৩. অথর্ব০ ৫.১০.৮
১৭৪. অ০ ২.১৭.৩
১৭৫. অ০ ১৬.৩৭.১
১৭৬. অ০ ৫২৮.৩
১৭৭. অ০ ৫.১০.৮
১৭৮. অ০ ৬.৪.২০
১৭৬. অ০ ৫.৩, ৫
১৮০. অ০ ১২২.৩০

অধ্যায় ২
শারীরিক স্থান

১. শরীরে ধাতুসমূহ – ঋগ্বেদ এবং অথর্ববেদে “ত্রিধাতু” শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
ঋগ্বেদে সায়ণ ত্রিধাতুর ব্যাখ্যা করেছেন – বাত, পিত্ত এবং শ্লেষ্ম (কফ) রূপী তিনটি ধাতু। অথর্ববেদের এক মন্ত্রে বলা হয়েছে যে এক ওজই ত্রেধা, অর্থাৎ তিন রূপে শরীরে বিস্তৃত। সায়ণও ব্যাখ্যায় ‘ত্রেধা’-কে বাত, পিত্ত এবং কফ রূপী ত্রিদোষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অথর্ববেদে পিত্ত শব্দের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। বাতের জন্য ‘বাত’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। বাতিকার, বাতীকৃত, বাতীকৃতনাশিনী শব্দগুলো থেকে বোঝা যায় যে বাত শব্দ বাত ধাতুর জন্য প্রযোজ্য এবং এর দোষ থেকে উদ্ভূত রোগকে বাতীকৃত ইত্যাদি বলা হয়। কফের জন্য ‘অভ্র’ (বৃষ্টি জল) শব্দ পাওয়া যায় এবং কফজ রোগের জন্য ‘অভ্রজা’ এবং ‘বলাস’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
একটি মন্ত্রে এদেরকে অভ্রজা (কফ, বৃষ্টি বা শীত থেকে উদ্ভূত), বাতজা (বাত, বায়ু থেকে উদ্ভূত) এবং শুষ্ম (পিত্ত বা উত্তাপ থেকে উদ্ভূত) বলা হয়েছে। অন্য মন্ত্রে এদেরকে বাতু (বাত), অর্ক (পিত্ত, সূর্যতাপের কারণে) এবং রবি (কফ, সোমরূপ পুষ্টিকর) নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

চরক, সুশ্রুত এবং অষ্টাঙ্গহৃদয়ে বাত, পিত্ত এবং কফকে শরীরের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই তিনটির বিকারেই শরীরে নানা ধরনের দোষ জন্মায়। সুশ্রুত বলেছেন যে বাত, পিত্ত এবং শ্লেষ্ম এই তিনটি শরীরের উৎপত্তির কারণ। যেমন তিনটি স্তম্ভ দিয়ে ঘর দাঁড় করানো হয়, তেমনই এই তিনটি ধাতুর মাধ্যমে শরীরের অবস্থান। তাই শরীরকে ত্রিস্তূণ বলা হয়েছে।

অষ্টাঙ্গহৃদয়ের মতে বাত, পিত্ত এবং কফ তিনটি দোষ। এগুলো বিকৃত হলে শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অ-বিকৃত থাকলে শরীর স্থিতিশীল থাকে।
অথর্ববেদে যেভাবে বাত, পিত্ত এবং কফকে বাতু, অর্ক (অগ্নি) এবং রবি (সোম) বলা হয়েছে, তেমনি চরক ও সুশ্রুতেও বাতকে বাত, অগ্নিকে পিত্ত এবং সোমকে শ্লেষ্ম বলা হয়েছে।
অথর্ববেদে সাতটি ধাতুকে শরীরের স্রষ্টা বলা হয়েছে এবং এর জন্য ‘সপ্তমাতরং’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অষ্টাঙ্গহৃদয়ে সাতটি ধাতুকে বলা হয়েছে – রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা এবং শুক্র। এগুলো বাত, পিত্ত ইত্যাদিতে দূষিত হয়, তাই এদেরকে দূষ্য বলা হয়েছে।
বেদের উল্লেখে এই সাতটি ধাতুর উল্লেখ আছে – রস, অশৃক (রক্ত), মাংস, মেদস (চর্বি), অস্থি, মজ্জা এবং শুক্র (বীর্য)।
অষ্টাঙ্গহৃদয়ে রসের উৎপত্তির ধারা নিম্নরূপ বলা হয়েছে – খাবারের পরিপাক হলে রস সৃষ্টি হয়। রস থেকে রক্ত, রক্ত থেকে মাংস, মাংস থেকে মেদ, মেদ থেকে অস্থি, অস্থি থেকে মজ্জা এবং মজ্জা থেকে শুক্র সৃষ্টি হয়। এই শুক্র থেকেই গর্ভ তৈরি হয়।

২. শিরা এবং ধমনী – শিরাকে ‘সিরা’ হিসাবেও লেখা হয়। বেদে শিরার জন্য ‘হিরা’ শব্দ আছে। ধমনী শব্দও দুইভাবে লেখা হয়েছে – ধমনী এবং ধমনি। শিরা এবং ধমনী উভয়ই রক্তনালি। শিরাকে Veins বলা হয়। এগুলো অশুদ্ধ রক্ত বহন করে এবং সমস্ত শরীর থেকে অশুদ্ধ রক্তকে হৃদয়ে পৌঁছে দেয়। আয়ুর্বেদের মতে এগুলোকে ‘কালিকা’ বলা হয়। এগুলোর রঙ কালো বা নীল। ধমনীকে Arteries বলা হয়। এগুলো শুদ্ধ রক্ত বহন করে এবং হৃদয় থেকে শুদ্ধ রক্ত শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পৌঁছে দেয়। আয়ুর্বেদে এগুলোকে ‘লোহিতিকা’ বলা হয়েছে। এগুলোর রঙ লাল।

বাতসুত্রকে জ্ঞানতন্তু, নাস বা Nerve বলা হয়। আয়ুর্বেদে এগুলোকে মর্মরিকা বলা হয়েছে। অথর্ববেদে নাড়িকে শরীরের ভিত্তি বলা হয়েছে। শিরা ও ধমনীর সংখ্যা শত শত এবং সহস্র হিসেবে বলা হয়েছে। শিরাকে রক্তনালী নাড়ি বলা হয়েছে এবং রঙ লাল। নাড়ি উপরে, নিচে এবং মাঝখানে সর্বত্র বিস্তৃত। এগুলো ছোট ও বড় উভয় রকম।

সুশ্রুতের শারীরস্থান প্রক্রিয়ায় শিরা এবং ধমনীর বিস্তৃত বর্ণনা আছে। এটিকে Angiology (এঞ্জিয়োলজি, নাড়ী বিজ্ঞান) বলা হয়। সুশ্রুত বলেছেন – যেমন ছোট জলপথের মাধ্যমে উদ্যান সেচ হয়, তেমনি শিরার মাধ্যমে শরীর পুষ্ট হয়। গাছের পাতা যেমন সেচ পায়, তেমন শিরা শরীর জুড়ে বিস্তৃত। এই শিরার মূল স্থান নাভি। নাভি থেকে শিরা উপরে, নিচে এবং পাশাপাশি ছড়িয়ে আছে। এই শিরার মাধ্যমে হাত ইত্যাদি আন্দোলন, বাঁকানো ইত্যাদি কাজ হয়।

মূল শিরা ৪০টি। এগুলোর মধ্যে বাত, পিত্ত, কফ এবং রক্তবাহক দশ-দশটি শিরা। এই অংশের বাংলা লিপি রূপ হলো:

এইগুলো তাই চল্লিশটি হয়। এই শিরাগুলোই ভেদ-উপভেদ হয়ে ৭০০টি হয়ে যায়। সমস্ত শিরা বাত, পিত্ত, কফ এই তিনটির বহন করে, তাই এদের সার্বভাহক বলা হয়। যেগুলিতে বাতের আধিক্য থাকে, সেগুলোকে বাতভাহা, পিত্তের আধিক্য হলে পিত্তভাহা ইত্যাদি বলা হয়। সমস্ত শিরায় বাত, পিত্ত, কফ কম বা বেশি মাত্রায় থাকে।

সুশ্রুত শিরার রঙেরও বর্ণনা দিয়েছেন। পিত্তভাহাকে নীল, কফভাহাকে গৌরী (সাদা) এবং রক্তভাহাকে রোহিণী (লালচমক) বলা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো – শিরাকে রক্তবাহক (Blood Vessels) ধরা হলে নীল শিরা হলো Veins, গৌরি বা সাদা হলো Lymphatics বা রসায়নী, এবং রক্তবাহক Arteries হলো ধমনী।

সুশ্রুত ধমনীরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এদের কর্ম হলো – রসের ধারাবাহিক বহন, শব্দ ও স্পর্শ দ্বারা রস ও গন্ধ গ্রহণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করা। সমস্ত ধমনী নাভি থেকে উদ্ভূত হয়। এদের সংখ্যা ২৪। এর মধ্যে ১০টি উপরের দিকে যায়, ১০টি নিচের দিকে এবং ৪টি তির্যক (পাশে)। উপরের দিকে যাওয়া ধমনী রূপ, রস, গন্ধ ইত্যাদি এবং হাসি, কথা বলা, কান্না ইত্যাদির বহন করে শরীরকে ধারণ করে। ধমনী হৃদয়ে পৌঁছে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ৩০টি হয়ে যায়।

নিচের দিকে যাওয়া ধমনী আপানবায়ু, মল-মূত্র, রজ-শুক্র নিচের দিকে বহন করে। এগুলো হৃদয়ে রস পৌঁছে দেয়। তির্যক ধমনীর মধ্যেও রস পৌঁছায়, মল-মূত্র এবং ঘামের বিভাজন করে। তির্যক ধমনী শত প্রকারে বিভক্ত, এদের হাজারো শাখা রয়েছে। শাখাগুলোর মুখ রয়েছে। এদের উপমা দেওয়া হয়েছে মৃণাল বা কমলনাল দিয়ে। ধমনীর মধ্যে ছিদ্র থাকে, যা রোমকূপের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মাধ্যমে ঘাম বের হয়। তেল-মালিশ ইত্যাদিতে তেল শোষণও এরা করে। এদের মাধ্যমে স্পর্শের জ্ঞান হয় এবং রস গ্রহণ হয়।

৩. শরীরের অঙ্গ – অথর্ববেদে অনেক স্থানে শরীরের অঙ্গের নাম উল্লেখ আছে। ২৫টি মন্ত্রে নিম্নলিখিত অঙ্গের নাম দেওয়া হয়েছে –
(১) অক্ষি (দুই চোখ), (২) নাসিকা (দুই নাকের ছিদ্র), (৩) কর্ণ (দুই কান),
(৪) ছুবুক (ঠোঁট), (৫) মস্তিষ্ক (মাথা, মস্তক), (৬) জিহ্বা (জিহ্বা), (৭) গ্রীবা (ঘাড়ের বিভিন্ন অংশ), (৮) উষ্ণিহা (ঘাড়ের পেছনের অংশ, গুদ্দী), (৯) কীকসা (বক্ষ এবং হাড়ের অংশ), (১০) অনূক্য (মেরুদণ্ড), (১১) অংস (দুই কাঁধ), (১২) বাহু (দুই বাহু), (১৩) হৃৎপিণ্ড, (১৪) ক্লোমন (ডান ফুসফুস), (১৫) হলীক্ষ্ণ (বাম ফুসফুস), (১৬) পার্শ্ব (দুইপাশের পাঁসলা), (১৭) মতত্রন (দুই কিডনি), (১৮) পলীহা (তিল্লী), (১৯) যকৃত (যকৃত), (২০) আন্ত্র (আন্ত্র), (২১) গুদা (গুদার অংশ), (২২) বনিষ্ঠু (বৃহৎ অন্ত্র), (২৩) উদর (পেট), (২৪) কুঙ্খি (দুই কোখ), (২৫) প্লাশি (মূত্রাশয়, প্রস্রাব বা মূত্রেন্দ্রিয়ের ওপরের শিরা), (২৬) নাভি, (২৭) ঊরু (দুই উরু), (২৮) অষ্টীবত্ (দুই হাঁটু), (২৯) পার্শ্ণি (দুই এড়ি), (৩০) প্রপদ (দুই পায়ের পঞ্জা), (৩১) শ্রোনি (দুই কুলহ), (৩২) ভংসস (গোপন অঙ্গ, যোনি), (৩৩) অস্থি (হাড়), (৩৪) মজ্জন (মজ্জা, চর্বি), (৩৫) ত্রাবন (নাড়ি, পুটি, শিরা), (৩৬) ধমনী (ধমনী), (৩৭) পাণি (দুই হাত), (৩৮) অঙ্গুলি (অঙ্গুলি), (৩৯) নখ, (৪০) অঙ্গ (মাংসপেশী), (৪১) লোমন (চুল), (৪২) পার্বন (জয়েন্ট, গাঁট)।

এক অন্য স্থানে শরীরের অঙ্গের নামও উল্লেখ আছে। সেখানে উপরের নামগুলোর পাশাপাশি নতুন নাম দেওয়া হয়েছে –
(১) মাংস, (২) গুল্ফ (দুই গোড়ালি), (৩) খ (রোমকূপ, রোমছিদ্র), (৪) উচ্ছলঙ্খ (দুই পায়ের তল), (৫) কবন্ধ (শরীরের কণ্ঠ), (৬) উরস (বক্ষ), (৭) স্তন (দুই স্তন), (৮) কফোড় (দুই কনুই), (৯) পৃষ্ঠি (পাঁসলা), (১০) মুখ, (১১) হনু (দুই চোয়াল), (১২) ললাট (মাথা), (১৩) ককাটিকা (সামনের হাড়), (১৪) কৃকাট (ঘাড়ের জয়েন্ট), (১৫) কপাল, (১৬) উত্তরহনু (উপরের জবা), (১৭) অধরহনু (নিচের জবা), (১৮) মেধা (বুদ্ধি), (১৯) পুরীতত্ (হৃদয়ের আবরণ), (২০) ক্রোড় (গোদ), (২১) পাজস্য (পেট), (২২) দন্ত (দাঁত), (২৩) পার্শু (পাঁসলা), (২৪) নিবেষ্য (পৃষ্ঠাংশ), (২৫) বৃক্ক (কিডনি), (২৬) আঁন্ড (অণ্ডকোষ), (২৭) শেপ (জননেন্দ্রিয়, মূত্রেন্দ্রিয়), (২৮) চর্মন (ত্বক), (২৯) লোমন (চুল), (৩০) পীভস্ (চর্বি), (৩১) মজ্জা, (৩২) তীব্রা (শ্বেত কফবাহক নাড়ি), (৩৩) অরুণা (কিছু লাল রঙের বাতবাহক নাড়ি), (৩৪) তাম্রধূমা (নীল রঙের পিত্তবাহক নাড়ি), (৩৫) বাসস্ (বস্ত্র, ত্বক), (৩৬) রেতঃ (শুক্র), (৩৭) প্রাণঃ, (৩৮) আপান (আপান বায়ু), (৩৯) ব্যান (ব্যান বায়ু), (৪০) সমান (সমান বায়ু), (৪১) উদান (উদান বায়ু), (৪২) বাক্ (বাণী), (৪৩) মনঃ।

কিছু অন্যান্য নাম – ত্বক, উদর, আস্য (মুখ), দৎ (দাঁত), গবীনি (মূত্রনালী), বস্তি (মূত্রাশয়), বস্তিবিল (মূত্রাশয়ের বিল), মেহন (মূত্রেন্দ্রিয়, মূত্রদ্বার)।

অথর্ববেদে অন্তঃকরণের কিছু গুণ-ধর্মের উল্লেখ আছে। ১৯ এগুলো হলঃ
(১) প্রিয় (অনুকূল বিষয়), (২) অপ্রিয় (প্রতিকূল বিষয়), (৩) স্বপ্ন (স্বপ্রাবস্থা), (৪) সম্ভাধ (নিদ্রা বিঘ্নিত হওয়া, নিদ্রায় বাধা), (৫) তন্দ্রি (তন্দ্রা, অলসতা), (৬) আনন্দ (আনন্দের অনুভূতি), (৭) নন্দ (হর্ষ, প্রসন্নতা), (৮) আর্তি (বেদনা, দুঃখ), (৬) অবর্তি (অরুচি বা বাধ্যবাধকতা), (১০) নীর্কৃতি (ব্যাকুলতা, অতিরিক্ত দুঃখ), (১১) অমতি (কুমতি বা কিঙ্কর্তব্যবিমূঢ়তা), (১২) রাধ্ধি (পূর্ণতা, ইচ্ছাকৃত প্রাপ্তি), (১৩) সমৃদ্ধি (পূর্ণতা, সম্পন্নতা), (১৪) অব্যৃদ্ধি (অক্ষীণতা, মর্যাদা), (১৫) মতি (বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি), (১৬) উদিতি (উন্নতি, প্রগতি অনুভূতি), (১৭) মেধা (ধারণাশক্তি), (১৮) পাপ্মানঃ (পাপের অনুভূতি), (১৬) সত্য (সত্যনিষ্ঠা), (২০) তৃষ্ণা (ভোগবাসনা), (২১) শ্রদ্ধা (ভালোবাসা, বিশ্বাস), (২২) অশ্রদ্ধা (ঘৃণা, অবিশ্বাস), (২৩) বিদ্যা (জ্ঞান), (২৪) অবিদ্যা (অজ্ঞান), (২৫) মোদ (প্রসন্নতা), (২৬) প্রমুদ (মনোরঞ্জন, বিনোদন), (২৭) অভিমোদমুদ (অতিসুখ, অতিরিক্ত হর্ষ), (২৮) আয়ুজঃ (নবনির্মাণ বা আয়োজনের শক্তি), (২৬) প্রয়ুজঃ (চিন্তাধারার প্রয়োগের শক্তি), (৩০) যুজঃ (প্রবৃত্তি, কাজে নিয়োগ), (৩১) আশিসঃ (আশার অনুভূতি), (৩২) প্রশিষঃ (প্রবোধ বা উদ্বোধনের অনুভূতি), (৩৩) সংশিষঃ (সমন্বয় বা সংগঠনের অনুভূতি), (৩৪) বিশেষঃ (বৈশিষ্ট্য বা শৃঙ্খলার অনুভূতি), (৩৫) চিত্ত (চিন্তনশক্তি), (৩৬) সংকল্প (চিন্তাশক্তি বা ইচ্ছাশক্তি)। ১০

অন্তঃকরণ শরীরের সমস্ত কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রক। এটি সন্মার্গ ও কুমার্গ, ধর্ম ও অধর্ম, পাপ ও পূণ্য, সুখ ও দুঃখ, জ্ঞান ও অজ্ঞান—সকলের এর কারণ। অন্তঃকরণের ত্রুটির কারণে যে রোগগুলি হয়, সেগুলিকে ‘প্রজ্ঞাপরাধ’ বলা হয়েছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রোগের মূলেই ‘প্রজ্ঞাপরাধ’ দোষ থাকে।

৪. হৃদয়ের রূপ-হৃদয় পদ্মফুলের মতো নিচের দিকে মুখ করে থাকে। জাগ্রত অবস্থায় হৃদয়ের গতি তীব্র হয়, তাই এটিকে বিকশিত (ফুলে ওঠা) মনে করা হয় এবং নিদ্রার অবস্থায় বিশ্রামের কারণে তার গতি ধীর হয়, তাই এটিকে নিমীলন (সংকুচিত হওয়া) মনে করা হয়। ২১

হৃদয়ের বর্ণনা-হৃদয় বক্ষস্থল (Thorax) এ কিছুটা বাম দিকে থাকে। এর বাম এবং ডান দিকে দুটি ফুসফুস আছে। নিচের দিকে মহাপ্রাচীরক (Diaphragm) আছে। উপরের দিকে রক্তনালি রয়েছে। এতে চারটি আছে। দুটি অশুদ্ধ রক্ত আনা মহাশিরা। দুটি অশুদ্ধ রক্ত বহনকারী ধমনী। এগুলিকে ‘ফুসফুসীয় ধমনী’ বলা হয়। এই চারটি শিরা (Veins) বলা হয়। শিরা হলেও এগুলো শুদ্ধ রক্ত আনে। একটি বড় ধমনী (Artery) আছে, যা রক্তকে সমগ্র শরীরে পৌঁছে দেয় এবং দুটি কপাট আছে। এইভাবে দুটি মহাশিরা…

অশুদ্ধ রক্ত বহনের জন্য চারটি শিরা, শুদ্ধ রক্ত আনার জন্য চারটি শিরা এবং ‘একটি মহাধমনী’ শুদ্ধ রক্তকে শরীরে পৌঁছে দেয়।
উর্ধ্ব মহাশিরা উপরের অংশ থেকে এবং অধো মহাশিরা নিচের শরীর থেকে অশুদ্ধ রক্ত নিয়ে ডান অরিন্দ্রে (Right Auricle) ঢোকায়। সেখানে রক্ত ডান নিলয়ে (Ventricle) কপাটের পথ দিয়ে যায়। সেখান থেকে ফুসফুসীয় ধমনীর (Pulmonary Arteries) মাধ্যমে ফুসফুসে (Lungs) যায়, সেখানে রক্ত শুদ্ধ হয়। তারপর ফুসফুসীয় শিরা (Pulmonary Veins) দিয়ে বাম অরিন্দ্রে (Left Auricle) যায়। সেখান থেকে বাম নিলয়ে চলে যায়। তারপর মহাধমনী (Aorta) দিয়ে শুদ্ধ রক্ত সবদিকে শাখা-উপশাখার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

৫. ত্বকগুলোর সংখ্যা-সুশ্রুত ত্বকের সংখ্যা সাতটি মনে করেছেন। এগুলোকে অবভাসিনী, শ্বেতা, তাম্রা ইত্যাদি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ত্বক সব বর্ণ (ছায়া) প্রকাশ করে। এতে সিধ্ম ইত্যাদি রোগ হয়। দ্বিতীয় ত্বকে তিলকালক, ছায়ী ইত্যাদি রোগ হয়। তৃতীয় ত্বকে মাসা ইত্যাদি রোগ হয়। চতুর্থ ত্বকে কিছু (Skin Disease) হয়। পঞ্চম ত্বকে বিসর্প (Erysipelas), ষষ্ঠ ত্বকে গ্রন্থি (Tumor), আপচি, অর্বুদ, শ্লীপদ এবং গলগণ্ড ব্যাধি হয় এবং সপ্তম ত্বকে ভাগন্দর (Fistula in Ano), বিদ্রধি (Abscess) এবং অর্শ (Piles) হয়। ১২

চরকের মতে ছয়টি ত্বক আছে- (১) উদকধারা-জল ধারণকারী, (২) অসৃগ্ধারা-রক্ত ধারণকারী, (৩) সিধ্ম (Leprosy) ও কিলাস (Leucoderma)-এর উৎপত্তিস্থল, (৪) দাদ (Ring worm) এবং কিছু (Skin disease)-এর উৎপত্তিস্থল, (৫) আলজী ও বিদ্রধি (Abscess)-এর উৎপত্তিস্থল, (৬) কালো ও লাল রঙের অসাধ্য ফোস্কির উৎপত্তিস্থল। এর ফেটে যাওয়ায় চারদিকে অন্ধকার দেখা যায়।
আধুনিক মতে ত্বক দুই প্রকারের-(১) বাহ্যিক ত্বক (Epidermis), (২) অন্তঃ ত্বক (Dermis)। এই দুই ত্বকে বাহ্যিক ত্বকে পাঁচটি এবং অন্তঃ ত্বকে দুইটি স্তর আছে। এভাবে সাতটি স্তর হয়।

৬. মর্মস্থল (Vital Parts)-বেদে মর্মস্থলের উল্লেখ আছে। এখানে আঘাত লাগলে দ্রুত মৃত্যু হয়। মৃত্যুফলক হওয়ায় ‘মর্ম’ নামকরণ হয়েছে। অষ্টাঙ্গহৃদয়ে মর্মস্থলের সংখ্যা ১০৭ এবং এভাবে বিভাগ করা হয়েছে :-
২ হাত এবং ২ পা = ৪, প্রতিটিতে ১১
কোষ্ঠ (গুদা, মূত্রাশয়, নাভি) = ৩
উরঃস্থল (হৃদয়, স্তন ইত্যাদি)
পিঠ (পসলী, নিতম্ব ইত্যাদি) = ১৪
শিরা ও গ্রীবা = ৩৭
যোগ = ১০৭

৭. মজ্জা, মেদ ও চর্বি-মজ্জা (Bone-marrow) স্থূল হাড়ে থাকে। মেদ সূক্ষ্ম হাড়ে থাকে। চর্বি (Fat) হলো শুদ্ধ মাংসের স্নেহ (ঘন অংশ, মলাই সদৃশ অংশ)। এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

৮. শিরা, স্নায়ু ও আশয়-ভেদের স্নেহ ধারণ করে শিরা (Veins) ও স্নায়ু (Ligament) তৈরি হয়। শিরা ও স্নায়ুর মধ্যে পার্থক্য হল শিরার পাক নরম হয়, স্নায়ুর পাক কিছু কঠিন বা খরা হয়। কিছু বিদ্বান স্নায়ুকে Muscles (পেশী) মনে করেন। এগুলোর মাধ্যমে উত্তোলন, নীচে নামানো ইত্যাদি কাজ হয়।
পেশীতে বাতাসের অব্যাহত উপস্থিতি হৃৎপেশীর উৎপত্তি ঘটায়। ১৭

আশয় আটটি- বাতাশয়, পিত্তাশয়, কফাশয়, রক্তাশয়, আমাশয়, পাক্বাশয়, মূত্রাশয়, গর্ভাশয়। গর্ভাশয় কেবল তিনিতে থাকে। বাকি সাতটি নারী-পুরুষ উভয়েই থাকে।

৬. শুক্র- সুশ্রুতের মতে শুক্র (Seminal Fluid) সমগ্র শরীরে বিস্তৃত থাকে। যেমন দুধে ঘি এবং আখে গুড় থাকে, তেমনি পুরুষদেহে শুক্র থাকে। মানুষের শরীর পর্যবেক্ষণ করলে তার ভেতরের শুক্র বোঝা যায়। যেমন দুধ মথে ঘি বের হয়, তেমনি অন্ডকোষ (Testicles) এ সংরক্ষিত শুক্র মৈথুনে প্রকাশ পায়। আধুনিক মত শুক্রকে সমগ্রশরীরে বিস্তৃত বলে মনে করে না।
পুরুষে মূত্রমার্গ ও শুক্রমার্গ একই। বাইরে বের হওয়ার জন্য আলাদা পথ নেই। মূত্রাশয়ের দুই পাশে দুটি শুক্রাশয় (Seminal Vesicles) থাকে, যেখান থেকে শুক্র মেদ্রসরোত (Urethral Canal)-এ যায়। ১৮

১০. অন্তঃস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংখ্যা-সুশ্রুত অনুযায়ী এদের সংখ্যা হলঃ ত্বক (Skins)-৭, কলা (Membrances)-৭, আশয় (Reservoir)-৭, ধাতু (Tissues)-৭, শিরা (Veins)-৭০০, পেশী (Muscles)-৫০০, স্নায়ু (Ligaments)-৬০০, হাড় (Bones)-৩০০, সংধি (Joints)- ২১০, মর্ম (Vital Weak Spots)-১০৭, ধমনী (Arteries)-২৪। ২৬

আন্ত্রের দৈর্ঘ্য-আধুনিক মতে পুরুষের ক্ষুদ্রান্ত্র…

  • (Small Intestine) ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৩ ফুট ৬ ইঞ্চি।

  • বড় অন্ত্র (Large Intestine) ৫ ফুট। **

  • ১১. হাড়ের সংখ্যা-শরীরে হাড়ের সংখ্যা সম্পর্কে যথেষ্ট মতবৈষম্য আছে। চরকের মতে ৩৬০টি হাড়, সুশ্রুতের মতে ৩০০ এবং আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী ২০৬।

হাড় গণনার জন্য শরীরকে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে :-

  • (১) ঊর্ধ্বাঙ্গ-শির এবং ঘাড়ের হাড়

  • (২) ধড়-ছাতি, কাঁধ, পসলি, কোমর ইত্যাদির হাড়

  • (৩) শাখা হাড়-হাত, পা, জঙ্ঘা, হাঁটু, আঙ্গুল ইত্যাদির হাড়

এইভাবে বিভাজন করা হয়েছে :-

অঙ্গচরকসুশ্রুতআধুনিক
(১) শির ও ঘাড়৬২৬৩৩৬
(২) ধড়ের হাড়১৪০১১৭৫০
(৩) শাখার হাড়১২৮১২০১২০
মোট৩৬০৩০০২০৬
  1. ত্রিধাতু শর্ম বহতে শুভস্পতি। ঋগ্ ১.৩৪.৬
    ত্রিধাতু শরণ জীবরূতমৃ। অথর্ব ২০.৮৩,১

  2. য একমোজস্ ত্রেধা বিচক্রমে। অ ১.৩৪.১

  3. অগ্রে পিত্তমূ অপামতি। অ ১৮.৩.৫

  4. অ ৬.৮.২০ ১৬.১০৬ ৩৪ ৬.৪৪.৩

  5. অ ১.১২.৩১৬.১৪.১১ ৮.৭.১০

  6. যঃ অভ্রজা বাতজা যশ্ব শুষ্মো। অ ১.১২.৩

  7. বায়ুম্ আরক্ম্.... রবিম্। অ ১৮.৪.২৬

  8. চরক, সূত্র ১.৫৭

  9. সুশ্রুত, সূত্র ২১.৩

  10. অষ্টাঙ্গ, সূত্র ১.৬ এবং ৭

  11. অথর্ব ১৮.৪.২৬, চরক সূত্র ১২.১১ এবং ১২, সুশ্রুত সূত্র ২১.৮

  12. সপ্তমাতরং, অ ১৮.৪.২৬

  13. রসাসৃকূ-মাংস-মেদোঅস্থি-মজ্জা-শুক্রাণি ধাতবঃ। সপ্ত দুষ্যঃ। অষ্টাঙ্গ, সূত্র ১.১৩

  14. অত্যি ত্নাব মাংস মজ্জাম্। অ ১১.৮.১১, রতম্, ঋগু ১.১০৫২।
    আসৃক-পবনং। অ ২.২৫.৩, মেদসা, অ ৪.২৭.৫, শুক্রম্, অ ৪.১.৫।
    বীর্যং, অ ১.৭.৫।

  15. রসাদ রক্তং, ততো মাংস, মাংসাদ মেদস্, ততো অস্থি চ।
    অস্থানো মজ্জা, তৎঃ শুক্র, শুক্রাদ গর্ভঃ প্রজায়তে। অষ্টাঙ্গ, শরীর ৩.৬২-৬৩

  • ১৬. ঘাতস্য ধমনিনা সহস্রস্য দিরাণাম্। অ ১,১৭.৩
    পতং হিরা: সহসং ধমনীরত। অ ৭.৩৫.২

  • ১৭. হিরা লোহিতবাসসঃ। অ ১.১৭.১

  • ১৮. তিষ্ঠাবরে তিষ পারে উৎ ত্বং তিক মধ্যমে।
    কনিষ্ঠিকা চ... ধমনীরমহী। অ ১.১৭.২

  • ১৬. সুশ্রুত, শরীর ৭.৩ থেকে ৫। পৃষ্ঠা ৫৬

  • ২০. সুশ্রুত, শরীর ৭.১৭ এবং ১৮। পৃষ্ঠা ৬০-৬১

  • ২১. সুশ্রুত, শরীর ৭.১৬। পৃষ্ঠা ৬১

  • ২২. সুশ্রুত, শরীর ৬.১১। পৃষ্ঠা ৭০-৭১

  • ২৩. সুশ্রুত, শরীর ৮.৩ থেকে। পৃষ্ঠা ৬৬-৭০

  • ২৪. সুশ্রুত, শরীর ৬.৬-১০। পৃষ্ঠা ৭০-৭১

  • ২৫. অক্ষীভ্যাং তে নাসিকাভ্যাং করনর্যায় ছুবুকাদধি। অ ২.৩৩.১ থেকে ৭ / ২০.৬৬.১৭ থেকে ২৩

  • ২৬. অথর্ব ১০.২.১ থেকে ১৭, ৬ ৬.৭.১ থেকে ২৬ / ১১.৮.২৬

  • ২৭. অ ১১.২.৫-৬

  • ২৮. অ ১.৩, ৬-৮

  • ২৬. প্রিয়াপ্রিয়াণি। অ ১০.২, ৬-১০, ১৭

  • ৩০. পাষ্মানো নাম দেবতাঃ। চিত্তানি সর্বে সংকল্পা: শরীরমনু প্রাবিশন। অ ১১.৮.১৮ থেকে ২৭

  • ৩১. পুন্ডরীকেণ সদৃশ হৃদয়ং স্বাদধোমুখং।
    জাগ্রতস্তদ্ বিকসতি, স্বপতশ্চ নিমীলতি। সুশ্রুত, শরীর ৪.৩১। ভাগ ১, পৃষ্ঠা ৩৩

  • ৩২. সুশ্রুত, শরীর ৪.৪। পৃষ্ঠা ২৬

  • ৩৩. চরক, শরীর ৭-৪

  • ৩৪. মর্মাণি নে বর্মগা ছাদয়ামি। অথর্ব ৭.১১৮.১

  • ৩৫. অষ্টাঙ্গ শরীর ৪.১-২। পৃষ্ঠা ১৬৬

  • ৩৬. সুশ্রুত, শরীর ৪.১২ এবং ১৩। পৃষ্ঠা ৩০

  • ৩৭. সুশ্রুত, শরীর ৪.২৬। পৃষ্ঠা ৩২

  • ৩৮. সুশ্রুত, শরীর ৪.২১ এবং ২২। পৃষ্ঠা ৩১

  • ৩৬. সুশ্রুত, শরীর ৫.৬। পৃষ্ঠা ৪২

  • ৪০. সুশ্রুত, শরীর ৫.৮। পৃষ্ঠা ৪২

  • ৪১. সুশ্রুত, শরীর ৫.১৮ থেকে ২২। পৃষ্ঠা ৪৩ থেকে ৪৫


>>

Read More

05 January, 2026

নাসদীয় সূক্ত

05 January 0

নাসদীয় সূক্ত, ঋগ্বেদ ১০/১২৯
অথ নাসদীয় সূক্তম্

ভূমিকা—

নাসদীয় সূক্ত বেদের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সূক্ত। ‘ন অসৎ’ এই পদগুলির দ্বারা সূচনা হওয়ার কারণে এই সূক্তের নাম নাসদীয় রাখা হয়েছে। এই নামের সঙ্গে এর ঋষি বা দেবতার কোনো সম্পর্ক নেই। সকল বিদ্বান এই সূক্তের সৃষ্টিপরক ব্যাখ্যাই করেছেন।

প্রায়ই বহু বিদ্বান এই সূক্তে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্পিত মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া দেখতে চান—এটি হাস্যকর। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বৃহৎ মিথ্যাবাদ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে এই সূক্তে সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পদার্থের সেই অবস্থার বর্ণনা রয়েছে, যার কল্পনা করাও বর্তমান বিজ্ঞানের পক্ষে কঠিন।

ঋগ্বেদ ১০.১২৯—

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

नास॑दासी॒न्नो सदा॑सीत्त॒दानीं॒ नासी॒द्रजो॒ नो व्यो॑मा प॒रो यत् । 

किमाव॑रीव॒: कुह॒ कस्य॒ शर्म॒न्नम्भ॒: किमा॑सी॒द्गह॑नं गभी॒रम् ॥

নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো যত্।
কিমাবরীবঃ কুহ কস্য শর্মন্নম্ভঃ কিমাসীদ্ গহনং গভীরম্ ॥ ১ ॥

এর ঋষি প্রজাপতি পরমেষ্ঠী। [পরমেষ্ঠী আপো বৈ প্রজাপতিঃ পরমেষ্ঠী তা হি পরমে স্থানে তিষ্ঠন্তি (শ. ব্রা. ৮.২.৩.১৩), ঋতমেব পরমেষ্ঠি (তৈ. ব্রা. ১.৫.৫.১)। ঋতম্ ওমিত্যেত-দেবাক্ষরমৃতম্ (জৈ. উ. ৩.৩৬.৫)]
এর অর্থ এই যে, এই ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি সর্বব্যাপী ‘ওম্’ রশ্মিসমূহ থেকে হয়। এর দেবতা ভাববৃত্তম্ এবং ছন্দ নিবৃত্ ত্রিষ্টুপ্। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে তীক্ষ্ণ তেজস্বিতার সঙ্গে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হতে থাকে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য—

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সৎ, আসীত্, তদানীম্)
[সৎ প্রাণা বৈ সৎ (তৈ. সং. ৭.২.৯.৩), যত্ সৎ তৎসাম তন্মনস্ স প্রाणঃ (জৈ. উ. ১.৫৩.২), ইমে বৈ লোকাঃ সতঃ (শ. না. ৭.৪.১.১৪), সৎ উদকনাম (নিঘं. ১.১২)। অসৎ মৃত্যুর্বাঽঅসৎ (শ. ব্রা. ১৪.৪.১.৩১)]

এই ছন্দ-রশ্মির কারণভূত ঋষি-রশ্মি অর্থাৎ ‘ওম্’ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে ‘সৎ’ নামে কোনো পদার্থই ছিল না। এর অর্থ, সেই সময় কোনো ছন্দ-রশ্মি, সূক্ষ্ম কণা বা লোক বিদ্যমান ছিল না। কোথাও উদক অর্থাৎ তরল অবস্থারও কোনো চিহ্ন ছিল না; অর্থাৎ না কঠিন পদার্থ ছিল, না তরল পদার্থ। এর অর্থ, সেই সময় এমন কোনো সূক্ষ্ম পদার্থও ছিল না, যা অন্য পদার্থকে সিঞ্চিত করতে পারে বা করতে সক্ষম হয়। সাম রশ্মি না থাকার ফলে কোথাও কোনো বিকিরণও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র অনন্ত অন্ধকার ছিল। তখন কোনো প্রকার প্রাণ বা ছন্দ-রশ্মিও ছিল না এবং মহৎ, অহংকার বা মনস্তত্ত্বও বিদ্যমান ছিল না। সেই সময় সকলের প্রেরক কালতত্ত্বও তার প্রেরণাশক্তিসহ বিদ্যমান ছিল না।

এইভাবে সেই সময় এমন এক অবস্থা ছিল, যেন কোনো পদার্থই বিদ্যমান নয়। এই পদার্থসমূহ না থাকার ফলে গতি, বল, উষ্ণতা, ভর, বৈদ্যুতিক আধান, শব্দ, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সত্ত্বগুণ, রজোগুণ, তমোগুণ—কোনো গুণ বা কর্মই বিদ্যমান ছিল না বা হতে পারে না। এতদসত্ত্বেও সেখানে ‘অসৎ’ও ছিল না, অর্থাৎ মৃত্যু ছিল না। এর অর্থ, এই সকল পদার্থের সম্পূর্ণ অভাবও ছিল না; অর্থাৎ সেই সময় বস্তুমাত্রের সম্পূর্ণ অনস্তিত্ব ছিল না। এইভাবে প্রকাশরূপে কোনো পদার্থের ভাব ছিল না, কিন্তু তাদের মূল উপাদান কারণ অবশ্যই বিদ্যমান ছিল, যার মধ্যে এই সকল পদার্থ সম্পূর্ণরূপে লীন ছিল। তাই একে নিঃশর্ত অভাবও বলা যায় না। বর্তমানে এই সৃষ্টিতে যে পরিমাণ পদার্থ বিদ্যমান, সেই পরিমাণই তখনও বিদ্যমান ছিল; কিন্তু মূল কারণরূপে বিদ্যমান থাকার ফলে ব্যবহারিকভাবে কিছুই প্রকাশিত ছিল না।

ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় ‘অসৎ’ শব্দ দ্বারা শূন্য আকাশ গ্রহণ করে লিখেছেন—

“যদা কার্যং জগন্নোৎপন্নমাসীত্ তদাঽসৎ সৃষ্টেঃ প্রাক্ শূন্যমাকাশমপি নাসীত্। কুতঃ? তদ্‌ব্যবহারস্য বর্তমানাভাবাত্।”

অর্থাৎ, সেই সময় কোথাও শূন্য স্থান (অভাবরূপ আকাশ)ও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র মূল উপাদান পদার্থ তার সূক্ষ্মতম সত্তাসহ একরসভাবে বিদ্যমান ছিল।

(ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্)
[রজঃ রজসঃ অন্তরিক্ষলোকস্য (নিরুক্ত ১২.৭)]

¹ দ্রব্য–শক্তি সংরক্ষণ তত্ত্বের এটি সর্বাধিক উপযুক্ত উদাহরণ।

[রজসী দ্যাবাপৃথিবীনাম (নিঘं. ৩.৩০), ইমে বৈ লোকা রজাংসি (শ. ব্রা. ৬.৩.১.১৮)]
সেই সময় প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত কোনো প্রকারের অতি সূক্ষ্ম থেকেও অতি সূক্ষ্ম কণাও বিদ্যমান ছিল না। তখন অন্তরীক্ষও ছিল না; অর্থাৎ পদার্থগুলির মধ্যে কোনো দূরত্বই ছিল না, কারণ সমস্ত পদার্থ একরস ও অদৃশ্য অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। এখানে ‘ব্যোম’ পদ সম্পর্কে ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় লিখেছেন—
‘ব্যোমাকাশমপরং যস্মিন্ বিরাডাখ্যং সোऽপি নো আসীত্ কিন্ত্ত পরব্রহ্মণঃ সামর্থ্যাখ্যমতীব সূক্ষ্মং সর্বস্যাস্য পরমকারণসংজ্ঞকमेব তদানীং সমবর্তত’।
যখন কোনো প্রকার রশ্মিই বিদ্যমান ছিল না, তখন সেগুলির দ্বারা নির্মিত আকাশ মহাভূত কীভাবে বিদ্যমান হতে পারে? হ্যাঁ, পরমেশ্বরের পরম সামর্থ্যে সমস্ত পদার্থ কারণরূপে অবশ্যই বিদ্যমান ছিল।

কারণ ছাড়া কোনো কার্য হতে পারে না—যেমন মহর্ষি কণাদ বলেছেন, ‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’ (বৈ. দ. ৪.১.৩)। এই জন্য মূল উপাদান পদার্থ অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এখানে ‘ব্যোম’ পদটি এ কথাও নির্দেশ করে যে, সেই সময় যে মূল উপাদান পদার্থ অব্যক্তরূপে বিদ্যমান ছিল, তার অবয়বগুলির মধ্যে না কেউ কারও দ্বারা রক্ষিত ছিল, না কেউ কারও রক্ষক ছিল; না কেউ আচ্ছাদক ছিল, না কেউ আচ্ছাদ্য ছিল। এর অর্থ এই যে, প্রকৃতিরূপী পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলি প্রলয়কালে পৃথক পৃথক, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিশ্চল ও সম্পূর্ণ অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তারা সকলেই পৃথক পৃথকভাবে অনাদি। এই কারণেই প্রকৃতি পদার্থকেও অনাদি বলা হয়। যদি প্রলয়কালে অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে সামান্যতমও কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ থাকত, তবে সেই সংযোগ অনাদি না হওয়ায় প্রকৃতিরূপী পদার্থ কখনোই অনাদি হতে পারত না। পাঠকদের এই বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেওয়া উচিত। সেই সময় সকলকে কেবল ব্রহ্মই আচ্ছাদিত করে রাখে।

(কিম্, আবরীবঃ) এখানেও একই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সেই সময় অক্ষররূপ অবয়বগুলি কারও দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল না; তখন ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো আবরকের প্রয়োজনই ছিল না।
(কুহ, কস্য, শর্মন্) [শর্ম গৃহনাম (নিঘं. ৩.৪), সুখম্ (তু. ম. দ. ঋ. ভা. ১.৮৫.১২), শরণম্ (নিরু. ৯.১৯)]
কোথায় কারও কোনো আবাস ছিল? কোথায় কারও সুখ ছিল? আর কোথায় কারও কোনো আশ্রয়দাতা ছিল? এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রকাশিত হয় যে, কোনো জড় পদার্থই অন্য কোনো জড় পদার্থের আবাস বা আশ্রয় ছিল না, কারণ কোনো প্রকার ব্যাপ্য–ব্যাপক সম্পর্কই তখন ছিল না। সমস্ত অক্ষররূপ অবয়ব স্বতন্ত্র ছিল; তাদের মধ্যে কোনো প্রকার বল কার্যরত ছিল না। এতসব সত্ত্বেও সমগ্র পদার্থ সম্পূর্ণ একরস ছিল। সেই সময় কোনো বন্ধ জীবাত্মা সুখ বা দুঃখে আক্রান্ত ছিল না; তার সমস্ত অনুভূতি ও সংস্কার সম্পূর্ণ শান্ত ছিল। এখানে ‘কুহ’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মায়’ বলেও গ্রহণ করা যেতে পারে। একইভাবে ‘কস্য’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রিত’ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য। এইভাবে সেই সময় সমস্ত মুক্তাত্মা প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রয় পেয়ে তাতেই পরমানন্দ ভোগ করতে করতে স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করে। অপরদিকে, সমগ্র প্রকৃতিরূপী জড় পদার্থ এবং বন্ধ জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যেই নিশ্চল ও সম্পূর্ণ নির্গুণ অবস্থায় বিদ্যমান বা আশ্রিত থাকে।

(অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্)
[অম্ভঃ— ‘অম্ভঃ’ পদের ব্যুৎপত্তি করতে গিয়ে উণাদি-কোষের ব্যাখ্যায় ঋষি দয়ানন্দ লিখেছেন— ‘আপ্যতে তৎ অম্ভঃ’ (উ. কো. ৪.২১১)।
গহনম্— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), কঠিনম্ (ম. দ. য. ভা. ৮.৫৩)।
গভীরঃ— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), মহান্নাম (নিঘং. ৩.৩), গভীরা বাঙ্‌নাম (নিঘং. ১.১১)]

সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপক ছিল? কোন পদার্থ উদকরূপ, অর্থাৎ সেচনাদি ক্রিয়ায় যুক্ত ছিল? কোন পদার্থ বাক্‌-রশ্মির রূপে বিদ্যমান ছিল? এখানে এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রতীয়মান হয় যে, সেই সময় অব্যক্ত কারণ পদার্থে না কোনো ব্যাপক ছিল, না কোনো ব্যাপ্য ছিল। না কোনো সেচক ছিল, না কোনো সেচ্য পদার্থ ছিল। কোনো প্রকার গতির সম্পূর্ণ অভাব থাকার কারণে কোনো বাক্‌-আদি রশ্মিও বিদ্যমান ছিল না। তখন কোনো কঠিন বা সঘন পদার্থ থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। এইভাবে সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত কঠিন, তরল, গ্যাস, শক্তি ও আকাশ ইত্যাদি কোনো পদার্থই বিদ্যমান ছিল না, কিংবা থাকতে পারে না। তবে সেই পদার্থের ভিতরে ও বাইরে পরম চেতন তত্ত্ব পরব্রহ্ম পরমাত্মা অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন। সেই পরব্রহ্ম সর্বদা সমস্ত আত্মা ও প্রকৃতিরূপী মূল উপাদান কারণে সম্পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত থাকেন। তিনি মুক্তাত্মাদের তাঁর বিজ্ঞানযুক্ত আনন্দ দ্বারা সিঞ্চিত করতে থাকেন। সেই পরব্রহ্মই সর্বাপেক্ষা মহান।

ভাবার্থ— এখানে সৃষ্টির মূল উপাদান পদার্থের স্বরূপ এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ-প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্ববর্তী অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে।

পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে ভগবান মনুর উক্তি হল—

আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্ ।
অপ্রতর্ব্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ ॥ (মনু ১.৫)

অর্থাৎ মহাপ্রলয়ের কালে এই জগৎ গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন থাকে। এই কারণেই প্রকৃতির এক নাম ‘তমস্’‘অপ্রজ্ঞাতম্’ অর্থাৎ সেই সময়কার অবস্থাকে কখনোই কেউ সুস্পষ্টভাবে জানতে পারেনি। এখানে এই অর্থও প্রতীয়মান হয় যে, সেই অবস্থাকে ঋষিগণ অবশ্যই জেনেছেন এবং জেনেই আর্ষ গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু ‘ন’ পূর্বক ‘প্র’ উপসর্গ এই ইঙ্গিত দেয় যে, তাকে প্রকৃষ্ট রূপে জানা যায়নি। ‘অলক্ষণম্’ অর্থাৎ সেই পদার্থে এমন কোনো লক্ষণ বিদ্যমান থাকে না, যার দ্বারা তার কোনো প্রকার অনুভূতি সম্ভব হয়। ‘অপ্রতর্ব্যম্’ পদটি এই কথা নির্দেশ করে যে, পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে মহান তত্ত্বদর্শীরা তর্ক-বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু অত্যন্ত সুগভীর ও সূক্ষ্ম তর্ক করা সম্ভব নয়, কারণ সেই পদার্থ অব্যক্ত রূপে বিদ্যমান থাকে। ‘অবিজ্ঞেয়ম্’ পদটি এই কথা জানায় যে, কোনো ব্যক্তি যতই মহান জ্ঞানী হোন না কেন, তিনি তাকে বিশেষ রূপে কখনোই জানতে পারেন না। তা ঋষিগণের দ্বারা জ্ঞেয় বটে, কিন্তু বিশেষভাবে জ্ঞেয় নয়। এইভাবে পদার্থের সেই অবস্থা এমন হয়, যেন তা সম্পূর্ণরূপে নিদ্রিত অবস্থায় রয়েছে।

এইভাবে মহাপ্রলয় কালে যখন কোনো জড় পদার্থ ভাবরূপে বিদ্যমান থেকেও অভাবরূপ হয়ে যায়, সেই সময়ও পরব্রহ্ম পরমাত্মার সত্তা অপরিবর্তিতভাবে বিদ্যমান থাকে। তিনি সৎ ও অসৎ—উভয়ের অতীত হয়ে নিত্য ও একরস রূপে বিরাজমান থাকেন। যখন সূক্ষ্ম বা স্থূল পদার্থের কোনো প্রকার আলো বিদ্যমান থাকে না, কারণ সেই পদার্থসমূহও তখন প্রকাশযোগ্য অবস্থায় থাকে না, সেই অবস্থায় পরমাত্মার জ্ঞানরূপ আলো অবশ্যই সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, যার মধ্যে মুক্তাত্মারা স্বচ্ছন্দে ও সহজভাবে বিচরণ করতে থাকেন। সেই মুক্তাত্মারা ব্রহ্মকে আশ্রয় করে তাঁর মধ্যেই বিচরণ করেন। তিনিই সকলকে আচ্ছাদিত করেন, তিনিই সমগ্র আশ্রয় ও আবাস প্রদান করেন এবং তিনিই সর্বত্র নিতান্তভাবে ব্যাপ্ত থাকেন। এমন কোনো পদার্থ নেই, যার ভিতরে ও বাইরে সেই ব্রহ্মের সত্তা বিদ্যমান নয়।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, অসৎ, আসীত্, তদানীম্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে পদার্থের অবস্থা অসৎ রূপ ছিল না। এর অর্থ এই যে, সেই সময় পদার্থ অব্যক্ত অবস্থায় ছিল না, তাতে আন্দোলনও বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন প্রকার সূক্ষ্ম বলও ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে পদার্থ গতিশীল অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তা নিজের সূক্ষ্ম রশ্মির দ্বারা পরস্পরকে সিঞ্চিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। (নো, সৎ, আসীত্) এতদসত্ত্বেও সেই পদার্থ প্রকাশ্য রূপে অনুভবযোগ্য ছিল না। পদার্থে আন্দোলন অবশ্যই ছিল, কিন্তু তা অত্যন্ত তীব্র বলযুক্ত ছিল না। সেই সূক্ষ্ম পদার্থের অবয়বসমূহ থেকে নিঃসৃত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলি একে অপরকে অবশ্যই অবসিঞ্চিত করছিল, কিন্তু তারা পদার্থকে তরল অবস্থায় উপনীত করতে সক্ষম ছিল না; যার ফলে কোনো পদার্থ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি।

(ন, আসীত্, রজঃ) সেই সময় আকাশ মহাভূত উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তা বিশেষ ক্রিয়াশীলতা লাভ করতে পারেনি। তীব্র বলের অভাবে তা সেই বায়বীয় দশা প্রাপ্ত পদার্থকে ঘনীভূত করতে পারছিল না, যার ফলে না তো অগ্নির পরমাণু অর্থাৎ ফোটন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং না বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা সংজ্ঞায়িত কোয়ার্কস ও ইলেকট্রন প্রভৃতি মৌল কণারই নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল। এই অবস্থায় এই কণাগুলির মধ্যে অন্তরিক্ষ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। (নো, ব্যোম, পরঃ, যৎ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বসমূহ স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করছিল। কোনো অবয়ব অন্য কোনো অবয়বের আচ্ছাদক বা আচ্ছাদ্য ছিল না এবং না কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল। এই কারণে সেই পদার্থের অবস্থা এমন ছিল, যেন তাদের অবয়বগুলির মধ্যে কোনো বল কার্যরতই নয়। এর অর্থ এই যে, সেই সময় বিদ্যমান বলসমূহ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরের। (কিম্, আবরীবঃ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির কোনো আবরণকারী ছিল না, অর্থাৎ তারা আবরণবিহীন অবস্থায় ছিল, যার ফলে সেই অবয়বগুলির পৃথক পৃথক পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। এই কারণেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেও মানবীয় সামর্থ্যের দৃষ্টিতে সেই সমগ্র পদার্থ একরসই ছিল। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কে কার আবাস ছিল—অর্থাৎ কারও কোনো আবাস ছিল না। এই কারণে সমগ্র পদার্থ নিরন্তর স্বতন্ত্র রূপে সর্বত্র বিচরণ করছিল। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেই সমগ্র পদার্থ প্রাণতত্ত্ব দ্বারা নির্মিত এবং প্রাণতত্ত্বের মধ্যেই সমাহিত ছিল কিংবা তাতেই বিচরণ করছিল। সেই সময় অবস্থা এমন ছিল, যেন প্রাণই প্রাণের মধ্যে বিদ্যমান বা বিচরণ করছে। (অম্ভঃ, কিম্ আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপ্ত ছিল—অর্থাৎ তখন বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির মধ্যে কেউ কারও মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল না, বরং সকলেই প্রাণতত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল। কোনো অবয়বই কঠিন রূপে বিদ্যমান ছিল না এবং না মধ্যমা বা বৈখরী ধ্বনির উৎপত্তি ঘটতে পেরেছিল।

ভাবার্থ — এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সূক্ষ্ম বায়ু তত্ত্বের রূপে বিদ্যমান ছিল (বর্তমান পরিভাষায় একে ভ্যাকুয়াম এনার্জি বলা যেতে পারে, যার মধ্যে ডার্ক এনার্জিও অন্তর্ভুক্ত)। সেই সময় পর্যন্ত ফোটন অথবা মৌল কণার উৎপত্তি ঘটেনি, এই কারণে মানবীয় দৃষ্টিতে পদার্থ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। কণার অভাবে ধ্বনির মধ্যমা বা বৈখরী রূপেরও উৎপত্তি হয়নি। অতএব মানবীয় দৃষ্টিতে ব্রহ্মাণ্ডের সেই অবস্থা ছিল নিঃশব্দ। এর সঙ্গে সেই অবস্থা ছিল অতিশয় শীতলও। পদার্থের এই অবস্থার জ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞানের নেই। বর্তমান বিজ্ঞান অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তির পর থেকেই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করে। কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান এই বিষয়টি চিন্তা করতে পারছে না যে অগ্নি তত্ত্ব, অর্থাৎ মৌল কণা ও ফোটন কোথা থেকে এলো, কীভাবে তৈরি হলো এবং কোন পদার্থ থেকে তৈরি হলো।

আধিভৌতিক ভাষ্য — বাংলা অর্থ

এখানে সেই সময়ের আলোচনা করা হয়েছে, যখন কোনো লোক বা জগতে মানবের ন্যায় প্রাণী প্রথমবারের মতো সেই লোকের গর্ভ থেকে যৌবন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। তার পূর্বে ভোগযোনিতে জন্ম নেওয়া বহু প্রাণীর আবির্ভাব ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্মও যৌবন অবস্থায় ভূমির গর্ভ থেকেই হয়। যখন চার ঋষি এখনও বেদের জ্ঞান লাভ করেননি, তখন এই পৃথিবীর পরিস্থিতি কেমন ছিল—অর্থাৎ ভূমি থেকে যৌবনে জন্ম নেওয়া যুবক-যুবতীদের সমাজ কেমন ছিল—তারই আলোচনা এখানে করা হয়েছে।

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সত্, আসীত্, তদানীম্) সে সময় ‘সৎ’ও ছিল না অর্থাৎ কোনো মানুষের নিকট সত্য জ্ঞান ছিল না। তারা সৃষ্টিকে, পরমাত্মাকে এবং নিজেদের প্রকৃত স্বরূপকে যথার্থভাবে জানত না। আবার ‘অসৎ’-ও ছিল না এর অর্থ এই যে প্রাথমিক প্রজন্মের মানুষরা বুদ্ধিহীন ছিল না। তারা ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান, পরম সত্ত্বগুণসম্পন্ন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী। বর্তমান যুগের মহা বুদ্ধিমানদের তুলনায়ও তাদের বৌদ্ধিক স্তর ছিল অনেক উচ্চ অর্থাৎ তারা ঋষিদের ন্যায় প্রজ্ঞাসম্পন্ন ছিল। তবে নৈমিত্তিক (প্রযোজ্য) জ্ঞান লাভের পূর্বে তারা সেই প্রজ্ঞাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম ছিল না। তাদের মধ্যে মিথ্যাভাষণ প্রভৃতি আচরণ একেবারেই ছিল না, কিন্তু যথার্থ ব্যবহারিক জ্ঞান ও বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট বোধ ছিল না। (ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্) সে সময় কোনো মানুষ রাজ্য বা ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিল না অর্থাৎ পৃথিবীতে তখন কোনো রাজা ছিল না, কেউ কারও পালনকর্তা বা নেতা ছিল না। একইভাবে ‘ব্যোম’ অর্থে কেউ কারও প্রেরক বা বন্ধু ছিল না। সবাই ভূমির গর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করেছিল। ফলে কারও সঙ্গে কারও কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না (কিম্, আবরীবঃ) সে সময় কে কার রক্ষক ছিল? অর্থাৎ কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল না; কেবল পরমাত্মাই সকলের রক্ষক ছিলেন। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কোথায় কার বাসস্থান ছিল? অর্থাৎ তখন মানুষের কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। কেউ কারও আশ্রয়দাতা বা আশ্রিত ছিল না; বরং সবাই স্বাধীন ও নিরাপদ জীবন যাপন করত। (অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সে সময় জ্ঞান ও বিদ্যার দৃষ্টিতে কে গভীর, গম্ভীর ও সর্বব্যাপী ছিল? কেউই নয়। একমাত্র পরমাত্মাই ছিলেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস।

ভাবার্থ — বাংলা অনুবাদ

সৃষ্টির প্রথম প্রজন্ম অত্যন্ত সুস্থ, শক্তিশালী, বিশালদেহী এবং মহান প্রজ্ঞার অধিকারী হয়। সেই প্রজন্মের মানুষেরা বর্তমান মানুষের ন্যায় অত্যন্ত নিম্ন স্তর থেকে উপদেশ পাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না। তবুও মোক্ষরূপ জীবনলক্ষ্য অর্জনের জন্য এবং সংসারিক ঐশ্বর্য লাভের জন্য নৈমিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন তাদেরও অনিবার্যভাবে থাকে। তাদের প্রজ্ঞার স্তর ঋষিদের ন্যায়ই হয়, কিন্তু সেই প্রজ্ঞাকে কার্যকর করার জন্য বিদ্যোপদেশ অপরিহার্য। তাদের একমাত্র উপদেশক ব্রহ্মই হতে পারেন, কারণ তিনিই একমাত্র সর্বজ্ঞ সত্তা।

এই অবস্থাতেই চার ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদের ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। তারা সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির অবস্থায় এই ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধি সিদ্ধ করার যোগ্যতা তারা পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে অথবা পূর্বে কোনো এক সময় মনুষ্যযোনি লাভ করার সময় থেকেই সংস্কাররূপে অর্জন করেছিলেন। তারা ঋচাগুলির গ্রহণ অবশ্যই করেন, কিন্তু সেই ঋচাগুলির অর্থবোধ ঈশ্বরের কৃপা দ্বারাই লাভ করেন। অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা—এই চার ঋষি আদ্য ব্রহ্মাকে সেই ঋচাগুলি এবং তাদের জ্ঞান উপদেশ করেন। বেদের সেই ঋচাগুলিতে সমগ্র সৃষ্টির সেই জ্ঞান বিদ্যমান থাকে, যা মানবজাতির জন্য অপরিহার্য এবং যে স্তরের জ্ঞান প্রথম প্রজন্ম সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম। পরবর্তীতে সেই জ্ঞান সকল মানুষের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

न मृ॒त्युरा॑सीद॒मृतं॒ न तर्हि॒ न रात्र्या॒ अह्न॑ आसीत्प्रके॒तः । 

आनी॑दवा॒तं स्व॒धया॒ तदेकं॒ तस्मा॑द्धा॒न्यन्न प॒रः किं च॒नास॑ ॥

ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীৎপ্রকেতঃ ।
আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্ন পরঃ কিং চনাস ॥ ২ ॥

এটি বুঝতে হবে। এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) [মৃত্যুঃ মৃত্যুঃর্বৈযমঃ (মৈ.সং. ২.৫.৬), মৃত্যুরগ্নিঃ (কাঠ. সং. ২১.৭), অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীরভবতি অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে (নিরু. ৭.১৪), মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ (ঐ.আ. ২.৪.২), অপানাৎ মৃত্যুঃ (ঐ.আ. ২.৪.১)]

সৃষ্টি-উৎপত্তি প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে পদার্থের অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সেই সময় পদার্থের অবস্থা এমন ছিল যে প্রকৃতির অক্ষররূপ অবয়বসমূহ, যা অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল, পরস্পর একে অপরকে রোধ করতে অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিল না, অর্থাৎ তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল না। সকলেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রূপে বিদ্যমান ছিল। সেই সময় পদার্থ অগ্নিরূপেও ছিল না, অর্থাৎ কোনো সূক্ষ্ম ও স্বতন্ত্র অবয়ব পরস্পর একে অপরকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে সক্ষম ছিল না; অর্থাৎ না কেউ কারো অগ্রণী ছিল, না কেউ কারো অনুগামী ছিল। না কেউ কাউকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম ছিল, না কেউ কারো সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রবৃত্ত ছিল—অর্থাৎ সংযোগ-বিয়োগের কোনো কার্য কোথাও ছিল না, সর্বত্র পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজমান ছিল। না কেউ কাউকে নিজের থেকে দূরে সরাতে সক্ষম ছিল, না অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে কোনো অবকাশই ছিল, না তারা পরস্পর একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

‘মৃত্যুঃ’ পদের নির্বচন করতে গিয়ে মহর্ষি যাস্ক লিখেছেন—

মারয়তীতি সতঃ ।
মৃতং চ্যাবয়তীতি বা শতবলাক্ষো মৌদ্গল্যঃ । (নিরু. ১১.৬)

এর অর্থ এই যে, সেই সময় কোনো অবয়বই কাউকে ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল না এবং গতি প্রদান করতেও সক্ষম ছিল না।

(অমৃতম্, ন, তর্হি) [অমৃতম্ অমৃতং হিরণ্যনাম (নিঘং. ১.২), উদকনাম (নিঘং. ১.১২), অমৃতেষু দেবেষু (নিরু. ৮.২০), অমৃতাঃ দেবাঃ (শত. ২.১.৩.৪), অমৃতং বৈ প্রাণাঃ (গো.উ. ১.৩), অমৃতত্বং বা আপঃ (কৌ.ব্রা. ১২.১)] সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে তেজশূন্য ছিল, অর্থাৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারময় ছিল। সেই পদার্থে কোথাও হরণশীলতার গুণ ছিল না। সেই সময় কোনো দেব-পদার্থ বিদ্যমান ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, কোনো পদার্থই না কোনো প্রকার গতিযুক্ত ছিল, না কোনোতে দীপ্তি ছিল, না কোনোতে আকর্ষণ বল ছিল এবং না পদার্থসমূহের এদিক-ওদিক বিনিময় ঘটছিল। সেই সময় প্রাণতত্ত্বও ছিল না এবং কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থে ব্যাপ্ত ছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, প্রকেতঃ, আসীত্) [রাত্রিঃ ভ্রাতৃব্যদেবত্যা রাত্রিঃ (তৈ.ব্রা. ২.২.৬.৪), রাত্রির্বরুণঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০, তাং. ব্রা. ২৫.১০.১০), তমঃ পাপ্মা রাত্রিঃ (গো.উ. ৫.৩), রাত্রিঃ সাবিত্রী (গো.পূ. ১.৩৩)। অহন্ অহর্বে মিত্রঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০), অহনা উষোনাম (নিঘং. ১.৮)] সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না তার অবস্থান থেকে বিচলিত করতে সক্ষম ছিল এবং না বাঁধতে বা ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল। কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না প্রেরণা দিতে সক্ষম ছিল এবং না উৎপন্ন করতেও সক্ষম ছিল। সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হতে প্রবৃত্ত হতে পারত না এবং কোথাও দাহকতা বা আলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কোথাও অন্ধকার বা আলোর আগমন-গমনেরও কোনো চিহ্ন ছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [বাতঃ বাতো বৈ যজ্ঞঃ (শ.ব্রা. ৩.১.৩.২৬), বাতো হি বায়ুঃ (শ.ব্রা. ৮.৭.৩.১২)। আনীত্ জীবনং ধারয়তি (স্বামী ব্রহ্মমুনি ভাষ্য)] নিজের ধারণাশক্তির দ্বারা কাল বা পরমাত্মতত্ত্ব, বায়ুতত্ত্বের উৎপত্তি না হয়েও, সমগ্র উপাদান পদার্থে বল ও গতির সঞ্চারকারী একমাত্র তত্ত্ব হয়ে থাকে। পরমাত্মার শক্তি স্বাভাবিক, যেমন উপনিষৎকার বলেছেন—

‘স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ’ (শ্বে.উ. ৬.৮)।

যেমন পরব্রহ্ম পরমাত্মা এক হয়েও সর্বব্যাপী, তেমনই কালতত্ত্বও পরমাত্মা দ্বারা নিরন্তর প্রেরিত হয়ে সদা সমান গতিতে গমন করতে থাকে। তিনিই সৃষ্টির সকল পদার্থের ধারক এবং সকলকে প্রাণত্বও প্রদান করেন। সেই ঈশ্বর ও কালতত্ত্ব অবাত রূপ। এর তাৎপর্য এটিও যে, তাঁরা কোনো যজন প্রক্রিয়ার অঙ্গ নন। কালতত্ত্ব কখনোই কোনো পদার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ তার পথে কোনো পদার্থের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না।

(তস্মাত্, হ, অন্যৎ, কিঞ্চন, পরঃ, ন, আস) এই ব্রহ্ম ও কাল—এই উভয়ের অতিরিক্ত আর কোনো অন্য পদার্থ বিদ্যমান থাকে না, যা সেই মূল পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে; সুতরাং এদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ কোনো পদার্থের অস্তিত্ব থাকা তো সম্ভবই নয়।

ভাবার্থ— সৃষ্টির পূর্বে মূল উপাদান পদার্থে অক্ষররূপ অবয়বসমূহ পৃথক্‌ পৃথক্‌ স্বাধীন অবস্থায় সম্পূর্ণরূপে নিশ্চল হয়ে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে। সেই অবয়বগুলির মধ্যে না কোনো শূন্যস্থান থাকে এবং না তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। তাদের মধ্যবর্তী স্থানে কেবল পরমাত্মাই বিদ্যমান থাকেন। সেই অবয়বগুলির মধ্যে কোনো প্রকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বলশীলতা বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে আলোকহীন, ক্রিয়াহীন ও বলহীন অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থে না কেউ কারো বাধা হয় এবং না কেউ কারো দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়, না কোনো পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং না কেউ কারো উৎপাদক হয়। কোথাও অন্ধকার ও আলোর কোনো চক্রও চলে না, বরং সেই সময় সর্বত্র ঘন অন্ধকারই বিরাজ করে। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মাই নিজের স্বাভাবিক ধারণাশক্তির সঙ্গে অব্যক্ত কালতত্ত্বের দ্বারা সমগ্র পদার্থকে একাই ধারণ করে রাখেন। তাঁর থেকে ভিন্ন অন্য কোনো ধারক পদার্থ বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞাত বা কল্পিত আকাশ, শক্তি, দ্রব্য, বৈদ্যুতিক আধান, ভর, শব্দ, তাপ ইত্যাদির কোনোটিরই কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র আকাশে কোনো ফোটন ও মূলকণ উৎপন্ন হয়নি। এই কারণে সেই অবস্থা অত্যন্ত শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। যে পদার্থ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল, তাতেও বিনাশ বা ক্ষয়ের কোনো প্রক্রিয়া চলছিল না। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় পদার্থে প্রাণত্বও অত্যন্ত অল্প ছিল; এর অর্থ এই যে, সেই বায়ব্য অবস্থাসম্পন্ন পদার্থে বল ও গতির বিশেষ তীব্রতা ছিল না। [অমৃতম্ = অমৃতং হিরণ্যমমৃতমেষ (আদিত্যঃ) (শ. ব্রা. ৬.৭.১.২)] সূক্ষ্ম কণিকা, তীব্র বল ও তাপের অভাবে আদিত্যাদি লোকসমূহের নির্মাণকার্যও তখন আরম্ভ হতে পারছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সমগ্র পদার্থে কৃষ্ণ ও শ্বেত বর্ণের কোনো লক্ষণ ছিল না; বরং সমগ্র পদার্থই তম দ্বারা আবৃত বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল। সেই পদার্থের বর্ণে কোনো ওঠানামা ছিল না, বরং সমগ্র পদার্থই একরূপ বলে বোধগম্য ছিল। [অহন্ = অহর্বৈ বিয়চ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)। রাত্রিঃ = রাত্রির্বৈ সংযচ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)] সেই সময় পর্যন্ত যে সকল ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়েছিল, তারা পরস্পরের নিকটে ছিল না, আবার অতিদূরেও ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, তাদের মধ্যে সংঘননের প্রক্রিয়াও তখনো আরম্ভ হয়নি এবং তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টাও করছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [স্বধা = দ্যাবাপৃথিব্যোর্নাম (নিঘং. ৩.৩০)] সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণতত্ত্ব তার সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক শক্তি ও আকাশতত্ত্বের সঙ্গে কোনো তীব্র আন্দোলন ছাড়াই একাই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। লক্ষণীয় যে, প্রাণ-আপানই সূক্ষ্ম বিদ্যুতের রূপ, যাকে দ্যৌও বলা হয়। এখানে পৃথিবী পদ দ্বারা আমরা আকাশতত্ত্বেরই গ্রহণ করেছি। সেই সময় বলের আর কোনো রূপ উৎপন্ন হয়নি, এই কারণেই এখানে ‘একম্’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, কিঞ্চন, পরঃ, আস) সেই প্রাণতত্ত্ব ব্যতীত অন্য কোনো পদার্থই ধারণাশক্তিসম্পন্ন ছিল না, যা সমগ্র পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে। লক্ষণীয় যে, সেই সময় বহু প্রকার ছন্দ রশ্মিও উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেগুলিকেও বৃষারূপ প্রাণ রশ্মিগণই ধারণ করে রেখেছিল।

ভাবার্থ— এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র পদার্থ শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। তাতে ক্ষয় ও বৃদ্ধির কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া চলছিল না। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটিমাত্র কৃষ্ণ বর্ণের ছিল। সেই পদার্থের অবয়বরূপ ছন্দ রশ্মিগুলি পরস্পরের খুব নিকটে ছিল না এবং অতিদূরেও ছিল না। এই কারণে সৃজন ও বিনাশের কোনো লীলাও তখন চলছিল না। সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণবল—যা বিদ্যুতেরই অতি সূক্ষ্ম বা সূক্ষ্মতম রূপ—সর্বত্র বিদ্যমান ছিল। সেই বলই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, সেই সময় কোনো প্রকার বিক্ষোভ ও স্পন্দন (ফ্লাকচুয়েশন) ব্যতীত ভ্যাকুয়াম এনার্জিই সর্বত্র নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিপূর্ণ ছিল।

আধিভৌতিক ভাষ্য – (ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) মানব সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষদের কাছে মৃত্যু অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখের মধ্যে কোনো প্রকার দুঃখই ছিল না, কারণ সেই সময় পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুই সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুষম ছিল। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় অমৃত অর্থাৎ মোক্ষসদৃশ আনন্দও সেই মানুষদের প্রাপ্ত ছিল না। যদিও প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে এসেছিল, তবুও তারা তখন মোক্ষসুখ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তারা জীবন্মুক্ত অবস্থাও লাভ করেনি। (ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সেই সময় মানুষ অজ্ঞানরূপ রাত্রিতেও আক্রান্ত ছিল না এবং তার মধ্যে বিদ্যার আলোও ছিল না; অর্থাৎ অজ্ঞান ও জ্ঞান উভয়েরই কোনো লক্ষণ ছিল না। (আসীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) সেই মানুষ একমাত্র নৈমিত্তিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ছিল; নৈমিত্তিক জ্ঞান ব্যতীত সে সর্বদিক থেকেই পরিপূর্ণ ছিল। সে স্বধা অর্থাৎ নিজের অতুলনীয় স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা পূর্ণ প্রাণত্বসহ সর্বতোভাবে সুখী ও সুস্থ জীবন যাপন করছিল। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, পরঃ, কিঞ্চন, আস) সেই নৈমিত্তিক জ্ঞানের অভাব ব্যতীত তার আর কোনো প্রকার অভাব ছিল না। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষের অতিরিক্ত আর কোনো প্রাণীই এই স্তর প্রাপ্ত ছিল না।

ভাবার্থ— যখন প্রথমবার মানুষ এই পৃথিবীতে বা অন্য যে কোনো লোকেই জন্ম গ্রহণ করে, তখন সমগ্র পৃথিবীর ভূমি, জল ও বায়ু তাদের সর্বাধিক শুদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই কারণে সমগ্র উদ্ভিদজগতও অত্যন্ত পুষ্ট ও সুস্থ হওয়ায় পুষ্টিগুণ ইত্যাদিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ থাকে। এর ফলে এদের উপর নির্ভরশীল সমস্ত প্রাণীও সম্পূর্ণ সুস্থ ও বলবান হয়। পরিবেশের পূর্ণ বিশুদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধির কোনো চিহ্নমাত্রও থাকে না। সমগ্র পৃথিবী ফল, পুষ্প, শাক, অন্ন ও ঔষধিতে আচ্ছাদিত থাকে। নদী ও সরোবরসমূহ এমন শুদ্ধতম পানীয় জলে পরিপূর্ণ থাকে, যা নানা প্রকার জীবনোপযোগী তত্ত্বে সমৃদ্ধ। সেই প্রথম প্রজন্মের মানুষ বর্তমানকালে জন্ম নেওয়া মানুষের ন্যায় অতি অল্প স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে নয়, বরং সর্বাধিক ও শ্রেষ্ঠতম স্বাভাবিক জ্ঞান নিয়ে পূর্ণ যৌবনাবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। সে তার অতুল স্বাভাবিক জ্ঞান, সর্বোৎকৃষ্ট প্রজ্ঞা, অনুপম সত্ত্বগুণসম্পন্নতা, অতুল শারীরিক বল ও পূর্ণ স্বাস্থ্য ধারণ করে মোক্ষসুখ ব্যতীত সমস্ত সাত্ত্বিক সুখ লাভকারী হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এই গুণসমূহে সম্পন্ন হয় না। এর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকার পরিবেশ এই পৃথিবীতে আর কখনো কোনো প্রজন্মের জন্য সুলভ হয় না এবং না এত স্বাভাবিক জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞা পুনরায় কোনো প্রজন্ম প্রাপ্ত করে। সেই প্রজন্ম নিজের মধ্যেই অনুপম ও অতুলনীয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

तम॑ आसी॒त्तम॑सा गू॒ळ्हमग्रे॑ऽप्रके॒तं स॑लि॒लं सर्व॑मा इ॒दम् । 

तु॒च्छ्येना॒भ्वपि॑हितं॒ यदासी॒त्तप॑स॒स्तन्म॑हि॒नाजा॑य॒तैक॑म् ॥

তাম্ আসীত্ তমসা গুঢ়হম্ অগ্রেऽপ্রকেতং সালিলং সর্বমা ইদম্। 

তুচ্ছ্যেনাভ্বপিহিতং যাদাসীত্তপস্তন্মহিনাজায়তৈকং ॥ ৩॥

এই মন্ত্রের ঋষি, দেবতা এবং ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(অগ্রে, তমসা, গুঢ়ম্, তমঃ, আসীত্) এখানে 'তমঃ' পদ প্রকৃতি অর্থাৎ সৃষ্টির মূল উপাদান কারণরূপ পদার্থের নির্দেশক। মহাভারত আশ্বমেধিক পার্ব, অনুগীতা পার্বের অধ্যায় ৩৯, শ্লোক ২৩-এ মহর্ষি ব্রহ্মা জী প্রকৃতির বিভিন্ন নির্দেশক মধ্যে 'তমঃ'কেও একটি নির্দেশক হিসাবে গণ্য করেছেন—

তমো ব্যক্তং শিবং ধাম রজো যোনিঃ সনাতনঃ। 

প্রকৃতির বিকারঃ প্রলয়ঃ প্রধানং প্রভাবাপ্যয়ৌ॥

'তমঃ' সম্পর্কে মহর্ষি যাস্কের বক্তব্য— তমঃ তনোতেঃ (নিরু. ২.১৬)। এটি প্রকৃতি রূপী মূল পদার্থ সর্বত্র বিস্তৃত থাকে এবং গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত থাকে। এটি এই ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অনেক বিস্তৃত এবং আমাদের কল্পনার যে কোনো গভীর অন্ধকার থেকেও অধিক অন্ধকারযুক্ত। সেই অন্ধকারে কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই; অর্থাৎ সেই অন্ধকারও একরূপ। (ইদং, সর্বং, সালিলং, আহ্, অপ্রকেতম্) [আঃ ব্যাপতা (আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী)] সর্বপ্রথম এই সমগ্র সৃষ্টিই সম্পূর্ণরূপে লক্ষণহীন থাকে, অর্থাৎ তার রূপকে কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। এই পদার্থের মধ্যেই এই সমগ্র সৃষ্টির মিলন ঘটে। সেই পদার্থ সমগ্র শূন্যরূপ আকাশে বিস্তৃত থাকে। এখানে 'সালিল' পদার্থের সেই রূপের নাম, যেখানে সমস্ত পদার্থ সম্পূর্ণভাবে মিলিত হয় এবং যেখান থেকে কোনো ক্ষুদ্র জড় পদার্থের কল্পনাও করা যায় না। সেই পদার্থ সর্বত্র সমান রূপে বিদ্যমান। সেজন্যে ভগবান শিব মহাভারত, অনুশাসন পার্ব, দানধর্ম পার্বের ১৪৫তম অধ্যায়ে সেই পদার্থের নির্দেশক ‘এক’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অপর দিকে মহর্ষি ব্রহ্মা সেই পদার্থের প্রলয় এবং অপ্যয়—এই দুই নির্দেশক হিসেবেও গণ্য করেছেন।

(তুচ্ছ্যেন, আভু, আপিহিতম্, যৎ, আসীত্) [আভু রিক্তঃ (তু.ম.দ.য.ভা.১৬.১০)] সেই পদার্থটি এতটা দুর্বল বা ক্ষুদ্র যে তাকে শূন্যের মতো ধরা যায়। এমন পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার সঙ্গে গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে। এর অর্থ হলো এটি থাকা সত্ত্বেও না থাকার মতো প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় অর্থ, সেই পদার্থটি পরমপিতা পরমাত্মার তুলনায় তুচ্ছ। বিস্তৃতির দিক থেকে ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে মহান, এবং ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক হওয়ায় প্রকৃতিও তার কাছে তুচ্ছ। এছাড়াও ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে অতিসূক্ষ্ম। এই অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি তিনটি গুণও গোপন থাকে। গোপন থাকার ফলে সমগ্র জড় পদার্থের অন্যান্য সমস্ত উৎপন্ন গুণ ও কর্মও গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, একম্, মহিনা, অজায়ত) [তপঃ তপো দীক্ষা (শ. ভ্রা. ৩.৪.৩.২), মনঃ হা ভাভ তপঃ (জৈ. ভ্রা. ৩.৩৩৪)। মহি মহি মহৎ (নিরু. ১১.৯)] সেই গোপন রূপে থাকা পদার্থ বা মূল উপাদানভূত পদার্থে গোপন বা মিলিত বিশ্ব পরমেশ্বরের বিজ্ঞানেরূপ মহান সামর্থ্য দ্বারা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অর্থ, যে একরূপ উপাদান পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার কারণে গোপন থাকে, তা একরূপ ও অব্যক্ত পদার্থ পরমেশ্বরের প্রভাবে প্রকাশিত অবস্থায় আসে, অর্থাৎ সৃষ্টির জন্য উদগ্রীব হয়।

ভাবার্থ - মহাপ্রলয়ের সময় সমগ্র প্রকৃতি পদার্থ গভীর অন্ধকারে আচ্ছাদিত থাকে। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড (ক্ষুদ্রতম পদার্থ থেকে বিশাল লোক-লোকান্তর পর্যন্ত) তাতে মিলিত থাকে। সেই পদার্থকে চিনতে কোনো লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে না। তার সূক্ষ্মতার কারণে এটি শূন্যের মতো প্রতীয়মান হয়। আজ আমরা আকাশ মহাতত্ত্বকে শূন্যের মতো ধরি, কিন্তু প্রকৃতিরূপ পদার্থের তুলনায় আকাশ মহাতত্ত্বও অনেক ঘন। পরমপিতা পরমাত্মার দৃষ্টিতে সেই প্রকৃতি পদার্থের সূক্ষ্মতা এবং বিস্তৃতিও খুব তুচ্ছ। সেই পদার্থের শূন্যের মতো সূক্ষ্মতায় তার সমস্ত গুণ-কর্ম-স্বভাব লুকিয়ে থাকে। সেই সময়ে পরমেশ্বরের সমস্ত জ্ঞানও সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করা হয়নি, তাই তা গোপন থাকে। পরম ব্রহ্ম পরমাত্মার জ্ঞান ও শক্তিরূপ সামর্থ্যের দ্বারা সেই প্রকৃতিরূপ পদার্থ তার গুণ, কর্ম এবং স্বভাবসহ প্রকাশিত হতে শুরু করে, যার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। লক্ষ্যযোগ্য, সেই জড় পদার্থ নিজে থেকেই সৃষ্টির উদ্রেক করতে পারে না। জড় পদার্থকে কার্যকর করা হল চেতনারই সামর্থ্য, এবং প্রকৃতির বিষয়ে সেই চেতনা হল পরমেশ্বর পরমাত্মা।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) [তমঃ রাত্রিনাম (নিঘ. ১.৭), কৃষ্ণমিভ হি তমঃ (তাং. ভ্রা.৬.৬.১০)] এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে যদিও অনেক ছন্দ রশ্মি ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গেছে, তবু সমগ্র পদার্থ কৃষ্ণবর্ণেরই ছিল, কারণ সমস্ত ছন্দ রশ্মির বর্ণ অব্যক্তাবস্থায়ই বিদ্যমান ছিল। নেকত্র ফোটনের মাধ্যমে সমস্ত পদার্থকে দেখে, কিন্তু সেই দৃশ্যমান পদার্থও মূল কণার দ্বারা নির্মিত। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে ন ফোটনের উৎপত্তি হয় এবং ন কণারও। এই কারণে সেই সময় কিছুই দৃশ্যমান ছিল না, তাই এটিকে অন্ধকারে আচ্ছাদিত বলা হয়েছে।

(অপ্রকেতম্, সলিলম্, সর্বম্, আঃ, ইদম্) এটি যে প্রকৃত জগৎ, তা সেই বায়ব্য অবস্থাপ্রাপ্ত পদার্থে লীন থাকে। সেই পদার্থ এই জগতের তুলনায় বেশি বিস্তৃত। যদিও সেই অবস্থায় গতি এবং সূক্ষ্ম বল বিদ্যমান, তবু সেই অবস্থায় প্রাণীর দৃষ্টিতে তা অলক্ষণা থাকে। আমরা বায়ুতত্ত্বকে আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি অনুভব করতে পারি না। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) সেই পদার্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং এই সূক্ষ্মতার কারণে এটি অদৃশ্য ও ব্যাপক। সেই বায়ব্য অবস্থায় সমস্ত কণা বা ফোটনের মতো সূক্ষ্ম পদার্থ যেন গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) এই ছন্দ রশ্মির তীক্ষ্ণ তেজ ও বলের প্রভাবে এবং এর সঙ্গে উৎপন্ন অন্যান্য রশ্মির প্রভাবে পদার্থ উৎপন্ন হতে শুরু করে, অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উদ্ভব হয়, যার ফলে তাপ ও আলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

ভাবার্থ - এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অবস্থা বর্তমান বিজ্ঞানের দ্বারা অনুমেয় ভ্যাকুয়াম এনার্জির মতো। বৈদিক ভাষায় এটিকে বায়ু তত্ত্ব বলা হয়। এর ক্রিয়াকলাপ সরাসরি দেখা কঠিন, তাই এটিকে অন্ধকারপূর্ণ অবস্থা বলা হয়। প্রলয় প্রক্রিয়ার সময় মহাপ্রলয়ের পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এই অবস্থায় লীন থাকে। এটি পদার্থের সেই সূক্ষ্ম রূপ, যা তার সূক্ষ্মতার কারণে আমাদের দৃষ্টিতে গোপন। বর্তমান বিজ্ঞান ভ্যাকুয়াম এনার্জি এবং ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব মানে, তবে তা সরাসরি প্রদর্শন করতে পারে না, কারণ তা আমাদের প্রযুক্তির ক্ষমতার বাইরে। এই সূক্ষ্ম এনার্জির দ্বারা এই ছন্দ রশ্মি ও অন্যান্য তৃষ্টুপ ছন্দ রশ্মির তেজ, তাপ ও বলের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কণার জগত প্রকাশ পেতে শুরু করে।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে যখন চার ঋষি সমাধি অবস্থায় আকাশ থেকে বৈদিক ছন্দ গ্রহণ করেন, তখনও তারা এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সম্পর্কে অনভিজ্ঞই থাকেন। অর্থাৎ, মহাপ্রজ্ঞা এবং সতৎসত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ এই ঋষিরা বৈদিক মন্ত্রগুলো অন্তঃকরণে ধারণ করলেও, তাদের অর্থবোধের দিক থেকে অজ্ঞতার অন্ধকারে অবস্থান করতেন। এখানে 'তমঃ' এবং 'তমসা' এই দুটি পদ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি তমঃ হলো যা ঋষিদের অন্তঃকরণে ছন্দ গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল, আর অন্য তমঃ হলো যা ছন্দ রশ্মি গ্রহণের পরও তাদের অর্থের প্রতি অনভিজ্ঞতা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, যাকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেও দূর করতে পারছিল না।

(ইদম্, সর্বम्, সলিলम्, আঃ, অপ্রকেতম্) সমস্ত বৈদিক জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে পূর্ণরূপে লীন ছিল, যা ঋষিদের হৃদয়ে নিহিত হয়ে গেছে। এখানে 'আঃ' পদ নির্দেশ করে যে, সেই বিশাল সৃষ্টির সমস্ত জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু ঋষিরা তা থেকে অজ্ঞই ছিলেন। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) ঋষিদের দ্বারা ধারণ করা ছন্দ রশ্মিগুলিতে বিদ্যমান জ্ঞান পরমেশ্বরের পূর্ণ জ্ঞানের তুলনায় তুচ্ছ বা অল্পমাত্রার ছিল, অর্থাৎ সেই জ্ঞান পরমেশ্বরের সার্বজ্ঞতা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) ঋষিরা যে তপস্যা ও সাধনা করেছিলেন এবং সেই অদ্বৈত পরমেশ্বরের দয়ালু প্রভাবে, তাদের অন্তঃকরণে সেই ছন্দ রশ্মিগুলির জ্ঞান প্রকাশ পেতে শুরু করে।

ভাবার্থ – প্রতিটি মানব সৃষ্টিতে প্রথম প্রজন্মের সকল মানুষ পূর্ণ প্রজ্ঞা ও সত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ থাকে, তবে তাদের মধ্যেও চারজন মানুষ অন্যদের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ হন। এমনটি প্রত্যেক সৃষ্টিতেই ঘটে। এই কারণেই অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা—এই চারটি নাম কেবল এই সৃষ্টি ও এই পৃথিবীতে উৎপন্ন চারজন নির্দিষ্ট ঋষির নাম নয়, বরং এগুলি যোগরূঢ় নাম। যখন এই ঋষিরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক মন্ত্র গ্রহণ করেননি, তখন তারা সৃষ্টিবিজ্ঞান ও তজ্জনিত মোক্ষজ্ঞানের বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকেন, যদিও তারা পালন, রক্ষণ ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতি জীবনোপযোগী জ্ঞানে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হন। তাদের অন্তঃকরণে অবতীর্ণ বৈদিক ছন্দ রশ্মিগুলি এই জ্ঞানের ভাণ্ডার হলেও, তবুও সেই জ্ঞানের বিষয়ে তারা অনবহিতই থাকেন। ঐ মন্ত্রগুলিতে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিহিত থাকে, তা পরমেশ্বরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ। যখন সেই ঋষিরা সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হন, তখন পরমেশ্বরের সান্নিধ্য ও কৃপায় তাদের সেই মন্ত্রগুলির বিজ্ঞানবোধ লাভ হতে শুরু করে। এটাই মানুষের মধ্যে জ্ঞানের উৎপত্তির প্রক্রিয়া।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

काम॒स्तदग्रे॒ सम॑वर्त॒ताधि॒ मन॑सो॒ रेत॑: प्रथ॒मं यदासी॑त् । 

स॒तो बन्धु॒मस॑ति॒ निर॑विन्दन्हृ॒दि प्र॒तीष्या॑ क॒वयो॑ मनी॒षा ॥

কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীত্ । 

সতঃ বন্ধুমসতি নিরবিন্দন্ হৃদী প্রতীষ্যা কবয়ো মনীষা ॥ ৪॥

এই মন্ত্রের ঋষি ও দেবতা পূর্ববৎ। এর ছন্দ ত্রিষ্টুপ্ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাব পূর্বের তুলনায় কিছু কম তীক্ষ্ণ।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কামঃ, তৎ, অগ্রে, যৎ, মনসঃ, অধি, সম্, অবর্তত) মহাপ্রলয়ের অবস্থায় যখন সৃষ্টির উৎপত্তির সময় আসে, তখন সর্বপ্রথম পরমেশ্বরের বিজ্ঞানরূপ সামর্থ্যের মধ্যে সৃষ্টি উৎপন্ন করার অভিলাষ প্রকাশ পায়। ঈশ্বরের ইচ্ছা আমাদের জীবদের ইচ্ছার ন্যায় নয়। তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, যা নির্দিষ্ট সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয়। (প্রথমম্, রেতঃ, আসীত্) সেই ইচ্ছাই এই সৃষ্টির বীজ, যার অভাবে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভই হতে পারে না। [রেতঃ বাগ্রেতঃ (শ. ব্রা. ১.৭.২.২১), রেতো বৈ বৃষ্ণ্যম্ (শ. ব্রা. ৭.৩.১.৪৬)] নির্বিকার ব্রহ্মে ইচ্ছা কীভাবে ও কোথায় উৎপন্ন হয়—এই সংশয়ের সমাধান মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উপর্যুক্ত বক্তব্যে পাওয়া যায়। মহাপ্রলয়ের অবস্থায় কালতত্ত্ব অর্থাৎ ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মি সম্পূর্ণ অব্যক্ত পরা রূপে সমগ্র প্রকৃতি পদার্থে বিদ্যমান থাকে। তার সম্পর্ক পরমাত্মার সঙ্গে নিত্য বিদ্যমান থাকে। এই ‘ওঁ’ রশ্মির মধ্যেই—যা প্রকৃতপক্ষে পরা রশ্মিরও রূপ নয়, বরং সম্পূর্ণ অব্যক্ত ‘ওঁ’ অক্ষররূপে অবস্থান করে জাগরণের ইচ্ছা আরম্ভ হয়। এই ইচ্ছা পরমেশ্বরের প্রেরণা ও বিজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয়। এই অবস্থাই সেই সন্ধি, যা সৃষ্টি ও প্রলয়—উভয় প্রক্রিয়াকে অব্যক্তভাবে সংযুক্ত করে এবং এটিই সৃষ্টির উৎপত্তির বীজও।

(হৃদি, প্রতীষ্যা, কব্যঃ, মনীষা) শব্দকে উৎপন্নকারী ব্রহ্ম তার সর্বব্যাপক চিন্তাশীল সামর্থ্যের মাধ্যমে অব্যক্ত কালতত্ত্বের মধ্যে সৃষ্টির সময় অনুভব করে (সতঃ, বন্ধুম্, অসতি, নির্, অবিন্দন্) অসত্ রূপ, অর্থাৎ অব্যক্ত প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে সত্ রূপ পদার্থ বা জগতের [বন্ধুঃ = সম্পর্ক বা সংযুক্তি] সৃষ্টির প্রক্রিয়ার নিয়ম বা বন্ধন লাভ করে। এই নিয়মগুলোই সমগ্র সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে পরিপূর্ণ বা সম্পন্ন করে এবং তাদের জ্ঞান কালতত্ত্বের মধ্যে নিহিত হয়ে যায়।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবর্তিত হয়েই আগমন করে এবং তাদের জন্ম পৃথিবীর গর্ভ থেকেই হয়। এই কারণে তাদের মধ্যে কামসংস্কারের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। ফলে সেই যৌবনপ্রাপ্ত অবস্থায় উদ্ভূত নারী ও পুরুষদের মধ্যে পরমাত্মা সর্বপ্রথম কামভাবের উদ্ভব ঘটান। এই কামই পরবর্তী প্রজন্মের বীজ। সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের সময় পৃথিবীর ভূমিস্তর কোমল, স্নিগ্ধ এবং সকল প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে যেতে থাকে। এই কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলির উৎপত্তি পৃথিবীর গর্ভ থেকে আর সম্ভব হয় না। অতএব সেই প্রাণী বা মানুষের মধ্যে কামভাবের উদয়ের অনিবার্যতা সৃষ্টি হয়। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে কেবল একটি প্রজন্মই পৃথিবীর গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়, না কি আরও কিছু প্রজন্মও হয়। এখানে কামভাবের উদ্ভবের কথা সেই প্রজন্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যার পর পৃথিবীর গর্ভ থেকে এদের উৎপত্তির পরিস্থিতি আর বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় কামভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীদের মধ্যে ঋতুচক্র প্রভৃতি প্রক্রিয়া এবং পুরুষদের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলির সূচনা হতে থাকে। এই কামভাব তাদের হৃদয় ও মনেই উৎপন্ন হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

ति॒र॒श्चीनो॒ वित॑तो र॒श्मिरे॑षाम॒धः स्वि॑दा॒सी३दु॒परि॑ स्विदासी३त् । 

रे॒तो॒धा आ॑सन्महि॒मान॑ आसन्त्स्व॒धा अ॒वस्ता॒त्प्रय॑तिः प॒रस्ता॑त् ॥

তিরশ্চীনো বিততো রশ্মিরেষামধঃ স্বিদাসী ৩দুপরি স্বিদাসী ৩ত্ ।
রেতোধা আসন্মহিমান আসন্ত্স্বধা অবস্তাৎপ্রযতিঃ পরস্তাৎ ॥ ৫॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় মন্ত্রের প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য ১—

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ) [রশ্মিঃ যমনাত্ (নিরু. ২.১৫), তিরঃ = তিরস্তীণং ভবতি (নিরু. ৩.২০)] এই অব্যক্ত উপাদান পদার্থকে ধারণকারী অব্যক্ত কালতত্ত্বের রশ্মিগুলি সেই সমগ্র পদার্থে বিস্তৃত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই অব্যক্ত ‘ওম্’ রশ্মিগুলি ওই পদার্থের সকল অক্ষররূপ অবয়বের অন্তরে গুপ্তভাবে অবস্থান করে। এখানে ‘এষাম্’ এই বহুবচনান্ত পদটি অব্যক্ত অক্ষররূপ অবয়বগুলির জন্যও প্রযোজ্য। এদের বিস্তার একরসভাবেই ঘটে। (অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি উপাদান পদার্থের বাইরে ও ভিতরে এবং তার অক্ষররূপ অবয়বগুলির অন্তরে ও উপরে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, তবেই তারা সেই সমগ্র পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ ও সক্রিয় করতে সক্ষম হয়। সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভ হলে সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি স্বয়ং ব্যক্তরূপ ধারণ করে অক্ষররূপ অবয়বগুলির উপরে ও নীচে অর্থাৎ ভিতরে ও বাইরে স্পন্দিত হতে থাকে।

(রেতোধাঃ, আসন্, মহিমানঃ, আসন্) সেই কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের প্রেরণারূপ রেতস্ অর্থাৎ পরাক্রমকে ধারণ করে। তারা অত্যন্ত ব্যাপক, অর্থাৎ অনন্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্ত কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের মহান বিজ্ঞান এবং তজ্জনিত নিয়মসমূহেও যুক্ত থাকে। (স্বধা, অবস্তাৎ, প্রযতিঃ, পরস্তাৎ) সৃষ্টিনির্মাণের প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এই সমগ্র পদার্থ স্বধারূপ অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ সে নিজের গুণসমূহকে নিজের মধ্যেই গুপ্ত ও অব্যক্ত রূপে ধারণ করে রাখে। লক্ষণীয় যে গুণ কখনোই তার গুণী থেকে পৃথক হতে পারে না; এই কারণে মহাপ্রলয় অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি গুণসমূহ প্রকৃতির সঙ্গে অবশ্যই বিদ্যমান থাকে, তবে তারা অব্যক্ত রূপেই অবস্থান করে। এই অবস্থার পর অব্যক্ত কালরশ্মিগুলির মধ্যে প্রয়াসের সামর্থ্য প্রকাশ পায়, অর্থাৎ কালতত্ত্ব ব্যক্ত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমন হলে সকল অক্ষররূপ অবয়বও প্রয়াসী হতে শুরু করে।

ভাবার্থ — মহাপ্রলয়ের অবস্থায় সমগ্র মূল উপাদান পদার্থ অবকাশরূপ আকাশে সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে থাকে। সেই পদার্থের মধ্যে অব্যক্ত কালরশ্মিগুলিও সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে। এই রশ্মিগুলি মূল পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলির বাইরে ও ভিতরে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকে। তারা সেই পদার্থকে ধারণ করে এবং নিজেরাও পরমেশ্বর কর্তৃক ধারণকৃত থাকে। সেই সময় মূল উপাদান পদার্থের সত্ত্বাদি তিনটি গুণও অব্যক্ত ও সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পরব্রহ্ম অব্যক্ত কালতত্ত্বকে প্রেরিত, ব্যক্ত ও সক্রিয় করতেই সত্ত্বাদি তিনটি গুণ প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং অক্ষররূপ অবয়বগুলিও ব্যক্তভাব লাভ করে পদার্থকে মহত্তত্ত্বরূপ প্রদান করে। লক্ষণীয় যে সক্রিয় কালতত্ত্ব স্বয়ং সত্ত্ব ও রজস এই দুই গুণে যুক্ত থাকে, আর তার দ্বারাই প্রকৃতি পদার্থের তৃতীয় গুণ তমোগুণও সক্রিয় বা জাগ্রত হয়ে ওঠে। সেই অবস্থার নামই মহৎ তত্ত্ব।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ, অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরি, স্বিত্, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই এটি সেই সময় বিদ্যমান সকল ছন্দ রশ্মিতে বিস্তৃত হতে শুরু করে। এটি সমগ্র পদার্থের ভিতরে-বাইরে এবং উপরে-নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য হলো- “তীর্ণতমং ছন্দঃ। ত্রিবৃদ্ বজ্রস্তস্য স্তভনীতি বা। যৎ ত্রিরস্তভত্ তৎ ত্রিষ্টুভস্ত্রিষ্টুপ্ত্মিতি বিজ্ঞায়তে। (নিরু.৭.১২)”, “বলং বৈ বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (কৌ.ব্রা.৭.২; ৮.২)”, “ওজো বা ইন্দ্রিয়ং বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (ঐ.ব্রা.১.৫; ৮.২)।” এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো তীক্ষ্ণ রূপে দীর্ঘ দূরত্বে বিস্তৃত হয়ে অন্যান্য রশ্মিগুলোকে তিনভাবে বা তিন দিক থেকে ধারণ করে। এগুলো বিশেষ শক্তি ও তেজ দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে।

(রেতোধাঃ, আসन्, মহিমানঃ, আসन्) এই রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো বিশেষভাবে দীপ্তিময় ও শক্তিশালী হয় এবং এদের প্রভাবও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। (স্বধা, অবস্তাত্, প্রয়তিঃ, পরস্তাত্) এই ছন্দ রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে সকল রশ্মি নিজের-নিজস্ব শক্তি নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখে। এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো সূক্ষ্ম কণার উৎপাদনে নিজের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সেই কণাগুলোকে সৃষ্ট করতে সক্ষম নয়। যখন এই ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিগুলো উৎপন্ন হয়ে প্রচেষ্টাশীল হয়ে ওঠে, তখন সমস্ত ছন্দ রশ্মি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে যায়।

ভাবার্থ – এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই পূর্বে বিদ্যমান পদার্থের বায়ব্য অবস্থায় সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অন্যান্য ছন্দ রশ্মির উপরে-নিচে এবং সামনে-পীঠে সর্বত্র বিস্তৃত হয়। এই ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো তীব্র তেজ ও শক্তি ধারণকারী এবং ব্যাপক প্রভাবশালী হয়। এই রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য রশ্মিগুলো নিজস্ব শক্তি বিশেষভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। ফলে মূল কণ ও ফোটন ইত্যাদির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় না এবং সমগ্র পদার্থ সূক্ষ্ম শক্তি ও গতির সত্ত্বেও অন্ধকার, শীতলতা এবং নীরবতায় পূর্ণ থাকে। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পর অন্যান্য সমস্ত রশ্মি আরও সক্রিয় হয়ে আগামী সৃষ্টিকে উৎপন্ন করতে শুরু করে। লক্ষ্যণীয় যে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য ছন্দ রশ্মিও নিজস্ব শক্তি, তেজ ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ থাকলেও তাদের ক্ষমতা এতটা নেই যে তারা আগ্নি তত্ত্ব অর্থাৎ বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় মূল কণ ও ফোটন তৈরি করতে পারে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(তিরশ্চীনঃ, এষাম্, বিততঃ, রশ্মিঃ) [তিরশ্চীনঃ তিরসুপপদে অঞ্ছু গতৌ ‘ঋত্বিক্’ ইতি ক্বিন্। ততঃ ‘বিভাষাঞ্ছেরদিস্ত্রিয়াম্’ ইতি স্বার্থে খঃ প্রত্যয়ঃ। (বৈদিক কোষ আ० রাজবীর শাস্ত্রী)। রশ্মিঃ অশ্নুতে ব্যাপ্নোতীতি রশ্মিঃ (উ.কো. ৪.৪৭)] সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে যে সকল প্রাণী থাকে, তাদের সকলের আচরণ নিয়ন্ত্রিত বা সুসংগঠিত হওয়ার উপযোগী স্বাভাবিক জ্ঞান সকল প্রাণীর মধ্যেই গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে এবং তারই ভিত্তিতে তাদের আচরণ বিস্তৃত হয়। এর অর্থ হলো, প্রারম্ভে কোনো প্রাণীই না তো কারও নিয়ন্ত্রক হয়, না কেউ কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা এমন আচরণ করে, যেন সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে।

(অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই সময় দুই প্রকার প্রাণীর জন্ম হয়। এক প্রকার প্রাণী অত্যন্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয় এদের মানুষ বা দেব বলা হয়। অন্য প্রকার প্রাণী পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি, যাদের মধ্যে বুদ্ধিতত্ত্বের পরিমাণ মানুষের তুলনায় অত্যন্ত অল্প। এদেরই যথাক্রমে উচ্চ ও নিম্ন যোনির জীব বলা হয়। (রেতোধাঃ, আসন্) এদের মধ্যে নিম্ন যোনির জীবেরা তাদের পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে কৃত কর্মের সংস্কারকে বীজরূপে সঙ্গে নিয়ে আসে। এইভাবে তারা ভোগযোনির জীব নামে পরিচিত হয়।

(মহিমানঃ, আসন্) প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ার কারণে অত্যন্ত মহিমাসম্পন্ন হয়। তারা সকল প্রকার দুঃখ থেকে মুক্ত থাকে এবং নৈমিত্তিক জ্ঞান দ্রুতগতিতে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। (স্বধা, অবস্তাত্) যারা নিজেদের মধ্যে নানাবিধ কর্মের বীজ ধারণ করে, তারা প্রথমে পশ্বাদি যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে অথবা মানুষের তুলনায় নিম্নতর স্থানে জন্মায়। সেই সঙ্গে তাদের দেহও মানুষের দেহের তুলনায় নিম্নমানের পদার্থ দ্বারা ভূগর্ভে নির্মিত হয়। (প্রযতিঃ, পরস্তাত্) পশ্বাদি ছাড়া যে অন্যান্য জীব পরমাত্মার ব্যবস্থায় বিশেষ পুরুষার্থের জন্য জন্মগ্রহণ করে, তারা পশ্বাদি যোনির পর জন্মায়। তাদেরই দেব ও মানুষ বলা হয়। এদের দেহ পশ্বাদির দেহের তুলনায় উৎকৃষ্ট পদার্থ দ্বারা নির্মিত হয়। এদের কর্মযোনির জীব বলা হয়। পরবর্তী প্রজন্মে এই মানুষরাই উভয়যোনির জীব হয়ে ওঠে, কারণ তারা প্রথম প্রজন্মের তুলনায় কিছুটা দুঃখ ও দুর্গুণ দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে।

ভাবার্থ – সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে মানুষ ও পশ্বাদি সকল প্রাণী নিজ নিজ স্তরের স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সুসংগত ও সুশৃঙ্খল আচরণ করে। সেই প্রজন্মে হিংস্র ও মাংসাহারী প্রাণীর জন্ম হয় না, বরং সকল প্রাণীই শাকাহারী হয়। সিংহ, সাপ এবং অন্যান্য মাংসাহারী পশু ও কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি পরবর্তী কালে উৎপন্ন হয়। পশ্বাদি যোনি ভোগযোনি এবং মানুষের প্রথম প্রজন্ম উভয়যোনি নয়, বরং কেবল কর্মযোনি হয়, কারণ তারা ত্রিবিধ তাপ থেকে মুক্ত থাকে। ভোগযোনির পশ্বাদি জীব তাদের পূর্ব সৃষ্টির কর্ম অনুযায়ী জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ায় কোনো কর্মফল ভোগের জন্য নয়, বরং পুনরায় মুক্তির উদ্দেশ্যে পুরুষার্থ করার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। মানুষের উৎপত্তি অন্যান্য প্রাণীর উৎপত্তির পর ঘটে। সকল প্রাণীই ভূগর্ভ থেকে যুবাবস্থায় উৎপন্ন হয়। ভূমির যে অংশে মানুষের জন্ম হয়, সেই অংশে জীবনীশক্তি পশ্বাদির জন্মস্থানের তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

को अ॒द्धा वे॑द॒ क इ॒ह प्र वो॑च॒त्कुत॒ आजा॑ता॒ कुत॑ इ॒यं विसृ॑ष्टिः । 

अ॒र्वाग्दे॒वा अ॒स्य वि॒सर्ज॑ने॒नाथा॒ को वे॑द॒ यत॑ आब॒भूव॑ ॥

কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্রবোচৎ কুত আজাতা কুত ইয়ং বিসৃষ্টিঃ ।
অর্বাগ্‌দেবাঃ অস্‌য বিসর্জনেনাথা কো বেদ যত আ বভূব ॥ ৬ ॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) [অদ্ধা সত্যনাম (নিঘं. ৩.১০)। কঃ কো বৈ প্রজাপতিঃ (গো.উ.৬.৩), প্রাণো বাভ কঃ (জৈ.উ.৪.১১.২.৪), প্রজাপতির্বৈ কঃ (ঐ.ব্রা.২.৩৮; তৈ.সং.১.৬.৮.৫)] সৃষ্টির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র সৃষ্টির পালনকারী প্রকৃতি পদার্থ বা মনস্তত্ত্ব বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থকে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই জানেন। সেই প্রকৃতি পদার্থ নিত্য এবং সৃষ্টির তুলনায় মনস্তত্ত্বও নিত্যই।
(কঃ, ইহ, প্রবোচত্) এই অবকাশরূপ আকাশে বিদ্যমান প্রকৃতি পদার্থে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই বাক্‌তত্ত্বকে উৎপন্ন করেন। অন্যদিকে মনস্তত্ত্বে কালতত্ত্বরূপ প্রজাপতি বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করেন।

(কুতঃ আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই বহুবিধ সৃষ্টি কোথা থেকে জন্মায় এবং কার দ্বারা এর সৃষ্টি হয়—এই প্রশ্নের আধিদৈবিক ভাষ্যে প্রশ্নবাচক শব্দগুলির বিশেষ গুরুত্ব নেই। সুতরাং এর স্বাভাবিক অর্থ এই যে, এই সৃষ্টি প্রজাপতিরূপ প্রকৃতি থেকে জন্মায় এবং প্রজাপতিরূপ পরমাত্মার দ্বারাই সৃষ্টি হয়। এখানে উভয় প্রকার কারণ—উপাদান কারণ ও নিমিত্ত কারণ—উল্লেখিত হয়েছে। এখানে ‘জনী প্রাদুর্ভাবে’ ধাতুর প্রয়োগ নির্দেশ করে যে ‘কুতঃ’ শব্দটি প্রকৃতিরূপ উপাদান কারণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘সৃজ বিসর্গে’ ধাতুর প্রয়োগ প্রধান নিমিত্ত কারণ ঈশ্বরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখানে ‘বি’ উপসর্গযুক্ত ‘সৃজ’ ধাতুর অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা অর্থাৎ নষ্ট করাও গ্রহণযোগ্য। এতে এই অর্থ আরও স্পষ্ট হয় যে সেই প্রজাপতি পরমাত্মাই এই সৃষ্টি নির্মাণ করে জীবদের জন্য তা ত্যাগ করে দেন, অর্থাৎ তাদের প্রদান করেন এবং সময় এলে তার প্রলয়ও করেন। এইভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি ও প্রলয়ের উভয় অবস্থারই এখানে বর্ণনা রয়েছে। (অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) এই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়ায় দেব অর্থাৎ মনস্তত্ত্ব, বাক্‌তত্ত্ব ও প্রাণতত্ত্ব প্রভৃতি পদার্থ উৎপন্ন হয়। তার পরেই পঞ্চমহাভূতের উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলির বিষয়ে 

ঋষিদের উক্তি— মনো দেবঃ (গো.পূ.২.১১), বাগেব দেবাঃ (শ.ব্রা.১৪.৪.৩.১৩), প্রাণা দেবাঃ (শ.ব্রা.৬.৩.১.১৫), বাক্‌ চ বৈ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্ (ঐ.ব্রা.৫.২৩)। এদের দেব বলা হয়, কারণ সূক্ষ্ম বল ও দীপ্তির উৎপত্তি ক্রমান্বয়ে এই তত্ত্বগুলির থেকেই শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) [কঃ অন্নং বৈ কম্ (ঐ.ব্রা.৬.২১, গো.উ.৬.৩)। এখানে ‘কম্’-এর স্থানে ‘কঃ’-এর প্রয়োগ ছান্দস।] প্রকৃতি ও ঈশ্বরকে সৃষ্টির কারণ বলার সঙ্গে সঙ্গে এখানে আর যে কারণটি নির্দেশ করা হয়েছে, তা হলো—মূল পদার্থে সংযোজকত্ব গুণের উৎপত্তি। এটি ছাড়া সৃষ্টির নির্মাণ সম্ভব নয়। এর কারণেই সর্বত্র সৃজন প্রক্রিয়া শুরু ও পরিচালিত হয়। এই সমগ্র সৃজন ও পরিচালনা এবং সংযোজকত্বাদি গুণসমূহকে ঈশ্বরই জানেন, কারণ তিনিই এগুলিকে উৎপন্ন করেন।

ভাবার্থ – এই সৃষ্টির দুটি মূল কারণ আছে, যেগুলি থেকে সৃষ্টি উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কারণ হলো প্রধান নিমিত্ত কারণ, অর্থাৎ এর কর্তা ঈশ্বর, যাঁর ব্যতীত মূল উপাদান কারণে কোনো আন্দোলন সম্ভব নয়। দ্বিতীয় কারণ হলো প্রকৃতিরূপ মূল উপাদান কারণ, যেখান থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি নির্মাণ করেন। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম মহৎ বা মনস্তত্ত্ব এবং বাক্‌ রশ্মিগুলি উৎপন্ন হয়। এই পদার্থগুলি থেকে কালক্রমে আকাশ মহাভূত, বায়ু মহাভূত, ফোটন এবং মূল কণার ক্রমান্বয়ে উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলিতে, বিশেষত মনস্তত্ত্ব ও বাক্‌তত্ত্বে আকর্ষণ প্রভৃতি বলের উৎপত্তি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সৃষ্টির উৎপত্তি ও পরিচালনার বিজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে কেবল ঈশ্বরই জানেন।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(কঃ, অদ্ধা, বেদ, কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে প্রসিদ্ধ প্রাণতত্ত্ব সমগ্র পদার্থে বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থে সংঘটিত সকল ক্রিয়া ও বলসমূহকে কালতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণতত্ত্বই জানে। এই কারণেই সেই প্রাণতত্ত্ব ঐ পদার্থে নানা প্রকারের ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করে, কিন্তু তারও প্রেরক কালতত্ত্বই হয়। এই কালতত্ত্বের মধ্যে পরমেশ্বরের বিজ্ঞান নিহিত থাকে, যার ফলে সমগ্র সৃষ্টিই বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংঘটিত হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই সৃষ্টি কোথা থেকে এসেছে, কোন পদার্থ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং কে একে রচনা করেছে—এর উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এই সৃষ্টি এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তিকালে বিদ্যমান বায়ব্য অবস্থান থেকেই উৎপন্ন হয় এবং প্রাণতত্ত্বই কালতত্ত্ব দ্বারা প্রেরিত হয়ে সূক্ষ্ম কণাগুলিকে নির্মাণ করতে শুরু করে।

(দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন, অর্বাক্) বিশেষভাবে রচিত বিভিন্ন লোকের উৎপত্তির পূর্বে দেব পদার্থ অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তি হয় এবং অগ্নি তত্ত্ব তথা বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে আলো, উষ্ণতা ও স্থূল বলসমূহের উৎপত্তি শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) তদনন্তর সংঘটিত সকল ক্রিয়াকেই কালতত্ত্ব এবং তদ্দ্বারা প্রেরিত প্রাণতত্ত্ব জানে, যার ফলে সমস্ত লোক-লোকান্তর, প্রাণীদের দেহ এবং বনস্পতি প্রভৃতি পদার্থ বিজ্ঞানসম্মতভাবে উৎপন্ন ও পরিচালিত হতে থাকে।

ভাবার্থ — সমগ্র সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত প্রাণতত্ত্ব কালতত্ত্বের প্রেরণায় যেমন সমগ্র সৃষ্টিকে উৎপন্ন করে, তেমনি প্রতিটি উৎপত্তি ও পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং তার বিজ্ঞানকেও সম্যকভাবে জানে। এই সৃষ্টি সেই প্রাণতত্ত্ব থেকেই উৎপন্ন হয় এবং যথাসময়ে তাতেই বিলীন হয়ে যায়। এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পর সর্বপ্রথম ফোটন ও মূলকণার উৎপত্তি হয়, তদনন্তর সেই মূলকণাগুলির মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ ও প্রতিকর্ষণ বলের উৎপত্তি হতে থাকে। বর্তমান বিজ্ঞান মূলকণা ও ফোটনের উৎপত্তি এবং তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ আধান ও ভরের ন্যায় গুণের উৎপত্তির বিজ্ঞান জানে না। সে এই বিষয়টিও বিবেচনা করে না যে, এই কণাগুলি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক পদার্থ নয়, বরং এদেরও পৃথক পৃথক অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে, যার ভিন্নতার কারণে কণাগুলিও ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে কে বেদকে জানে—অর্থাৎ কেউই জানে না। সকল মানুষ উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞানের অধিকারী হলেও সত্য বিজ্ঞানস্বরূপ বেদের সঙ্গে পরিচিত থাকে না। (কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই সৃষ্টিতে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই সেই মানুষদের বেদের উপদেশ দেন। তাঁর উপদেশ প্রাপ্ত হয়ে অগ্নি প্রভৃতি চার ঋষি বেদমন্ত্রের অর্থ সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেন। জ্ঞানপ্রাপ্তির এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ঘটে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিস্ময়কর বলেই প্রতীয়মান হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) বিভিন্ন যোনির অন্তর্গত প্রাথমিক প্রজন্মগুলি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়? তাদের বিকাশ কোথায় হয়? অর্থাৎ মানুষ, পশু-পাখি ও কীট প্রভৃতি প্রাণীর জন্ম কীভাবে এবং কোথায় হয়? অর্থাৎ তাদের ভ্রূণের বিকাশ কোন স্থানে ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এদের সকলের ভ্রূণের বিকাশ পৃথিবীর সেই গর্ভস্থানে হয়, যেখানে অন্ন, ঔষধি এবং তজ্জনিত উৎকৃষ্ট জীবনীশক্তিসম্পন্ন রসের প্রাচুর্য থাকে।

(অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী ও উদ্ভিদের সৃষ্টির পর দেবদের—অর্থাৎ বিশেষ প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রাণী তথা মানুষের—সৃষ্টি হয়। এখানে মানুষকে দেব বলা হয়েছে, কারণ সে সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) যে ক্রম অনুসারে সকল প্রাণীর দেহ যৌবনাবস্থায় পৃথিবীর গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়, সেই সুবিন্যস্ত ক্রম কে জানে? এই প্রশ্নের উত্তরও এই যে, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কেবল ব্রহ্মই জানেন।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম মানব প্রজন্ম অত্যন্ত উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সহকারে উৎপন্ন হয়। তাদের সৃষ্টিবিদ্যা ও মোক্ষ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মা চারজন শ্রেষ্ঠতম মানুষকে—যারা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক ঋচাগুলি গ্রহণ করে থাকে—সেই বেদমন্ত্রগুলির অর্থ বিধিপূর্বক ও সম্পূর্ণরূপে অবগত করান। অর্থবোধের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত হয় এবং অন্তরীক্ষ থেকে বেদমন্ত্র গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত দ্রুতগতির হয়।

এই পৃথিবী এবং এর ন্যায় অন্যান্য লোকের ভূমি প্রারম্ভে অত্যন্ত কোমল ও জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানে স্থানে স্থানে এমন গর্ভসদৃশ স্থান থাকে, যা মাতৃগর্ভের ন্যায় বিশুদ্ধ ভ্রূণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তরল পদার্থে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানেই বিশেষ রাসায়নিক সংযোজনের দ্বারা ভ্রূণ বিকশিত হতে থাকে, যেখানে পরমাত্মার ব্যবস্থায় জীবাত্মাদের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম উদ্ভিদের, তারপর তাদের উপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর এবং সর্বশেষে মানুষের উৎপত্তি ঘটে। কোন জীবাত্মা কোন ভ্রূণে প্রবেশ করবে—এ কথা ঈশ্বর ব্যতীত আর কেউ জানে না।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द  पादनिचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

इ॒यं विसृ॑ष्टि॒र्यत॑ आब॒भूव॒ यदि॑ वा द॒धे यदि॑ वा॒ न । 

यो अ॒स्याध्य॑क्षः पर॒मे व्यो॑म॒न्त्सो अ॒ङ्ग वे॑द॒ यदि॑ वा॒ न वेद॑ ॥ ৭

পদার্থ

(ইয়ং বিসৃষ্টিঃ) এই বিবিধ সৃষ্টি (যতঃ-আবভূব) যে উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়েছে (অস্য যঃ-অধ্যক্ষঃ) সেই উপাদানের যে অধিপতি (পরমে ব্যোমন্) মহান আকাশে অবস্থানরত (অঙ্গ) হে জিজ্ঞাসু! (সঃ) সেই পরমাত্মা (যদি বা দধে) যদি ইচ্ছা করেন তবে ধারণ না-ও করতে পারেন, অর্থাৎ সংহার করে দিতে পারেন (যদি বেদ) যদি উপাদান কারণকে জানেন, নিজের বিজ্ঞানে লক্ষ্য করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত করেন (যদি বা ন বেদ) যদি না জানেন স্বজ্ঞানে লক্ষ্য না করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত না করেন এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় সেই পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত পদার্থ)

ভাবার্থ

এই বিবিধ সৃষ্টি যে উপাদান-কারণ থেকে উৎপন্ন হয়, সেই উপাদান কারণ অব্যক্ত প্রকৃতির তিনি পরমাত্মা স্বামী-অধিপতি। তিনি তার দ্বারা সৃষ্টিকে উৎপন্ন করেন এবং তার সংহারও করেন। প্রকৃতিকে যখন লক্ষ্য করেন, তখন তাকে সৃষ্টির রূপে নিয়ে আসেন; যখন লক্ষ্য করেন না, তখন প্রলয় অবস্থায়ই থাকে। এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত ভাবার্থ)

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

বেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ

  ও৩ ম্ বেদামৃতম্ : ভাগ ১৩–১৬ বেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ (Medical Sciences in the Vedas) লেখক: পদ্মশ্রী ডঃ কপিলদেব দ্বিবেদী নির্দেশক: বিশ্বভারতী ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ