ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

05 January, 2026

নাসদীয় সূক্ত

05 January 0

নাসদীয় সূক্ত, ঋগ্বেদ ১০/১২৯
অথ নাসদীয় সূক্তম্

ভূমিকা—

নাসদীয় সূক্ত বেদের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সূক্ত। ‘ন অসৎ’ এই পদগুলির দ্বারা সূচনা হওয়ার কারণে এই সূক্তের নাম নাসদীয় রাখা হয়েছে। এই নামের সঙ্গে এর ঋষি বা দেবতার কোনো সম্পর্ক নেই। সকল বিদ্বান এই সূক্তের সৃষ্টিপরক ব্যাখ্যাই করেছেন।

প্রায়ই বহু বিদ্বান এই সূক্তে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্পিত মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং) তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া দেখতে চান—এটি হাস্যকর। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বৃহৎ মিথ্যাবাদ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে এই সূক্তে সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পদার্থের সেই অবস্থার বর্ণনা রয়েছে, যার কল্পনা করাও বর্তমান বিজ্ঞানের পক্ষে কঠিন।

ঋগ্বেদ ১০.১২৯—

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

नास॑दासी॒न्नो सदा॑सीत्त॒दानीं॒ नासी॒द्रजो॒ नो व्यो॑मा प॒रो यत् । 

किमाव॑रीव॒: कुह॒ कस्य॒ शर्म॒न्नम्भ॒: किमा॑सी॒द्गह॑नं गभी॒रम् ॥

নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো যত্।
কিমাবরীবঃ কুহ কস্য শর্মন্নম্ভঃ কিমাসীদ্ গহনং গভীরম্ ॥ ১ ॥

এর ঋষি প্রজাপতি পরমেষ্ঠী। [পরমেষ্ঠী আপো বৈ প্রজাপতিঃ পরমেষ্ঠী তা হি পরমে স্থানে তিষ্ঠন্তি (শ. ব্রা. ৮.২.৩.১৩), ঋতমেব পরমেষ্ঠি (তৈ. ব্রা. ১.৫.৫.১)। ঋতম্ ওমিত্যেত-দেবাক্ষরমৃতম্ (জৈ. উ. ৩.৩৬.৫)]
এর অর্থ এই যে, এই ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি সর্বব্যাপী ‘ওম্’ রশ্মিসমূহ থেকে হয়। এর দেবতা ভাববৃত্তম্ এবং ছন্দ নিবৃত্ ত্রিষ্টুপ্। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবে তীক্ষ্ণ তেজস্বিতার সঙ্গে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হতে থাকে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য—

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সৎ, আসীত্, তদানীম্)
[সৎ প্রাণা বৈ সৎ (তৈ. সং. ৭.২.৯.৩), যত্ সৎ তৎসাম তন্মনস্ স প্রाणঃ (জৈ. উ. ১.৫৩.২), ইমে বৈ লোকাঃ সতঃ (শ. না. ৭.৪.১.১৪), সৎ উদকনাম (নিঘं. ১.১২)। অসৎ মৃত্যুর্বাঽঅসৎ (শ. ব্রা. ১৪.৪.১.৩১)]

এই ছন্দ-রশ্মির কারণভূত ঋষি-রশ্মি অর্থাৎ ‘ওম্’ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে ‘সৎ’ নামে কোনো পদার্থই ছিল না। এর অর্থ, সেই সময় কোনো ছন্দ-রশ্মি, সূক্ষ্ম কণা বা লোক বিদ্যমান ছিল না। কোথাও উদক অর্থাৎ তরল অবস্থারও কোনো চিহ্ন ছিল না; অর্থাৎ না কঠিন পদার্থ ছিল, না তরল পদার্থ। এর অর্থ, সেই সময় এমন কোনো সূক্ষ্ম পদার্থও ছিল না, যা অন্য পদার্থকে সিঞ্চিত করতে পারে বা করতে সক্ষম হয়। সাম রশ্মি না থাকার ফলে কোথাও কোনো বিকিরণও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র অনন্ত অন্ধকার ছিল। তখন কোনো প্রকার প্রাণ বা ছন্দ-রশ্মিও ছিল না এবং মহৎ, অহংকার বা মনস্তত্ত্বও বিদ্যমান ছিল না। সেই সময় সকলের প্রেরক কালতত্ত্বও তার প্রেরণাশক্তিসহ বিদ্যমান ছিল না।

এইভাবে সেই সময় এমন এক অবস্থা ছিল, যেন কোনো পদার্থই বিদ্যমান নয়। এই পদার্থসমূহ না থাকার ফলে গতি, বল, উষ্ণতা, ভর, বৈদ্যুতিক আধান, শব্দ, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সত্ত্বগুণ, রজোগুণ, তমোগুণ—কোনো গুণ বা কর্মই বিদ্যমান ছিল না বা হতে পারে না। এতদসত্ত্বেও সেখানে ‘অসৎ’ও ছিল না, অর্থাৎ মৃত্যু ছিল না। এর অর্থ, এই সকল পদার্থের সম্পূর্ণ অভাবও ছিল না; অর্থাৎ সেই সময় বস্তুমাত্রের সম্পূর্ণ অনস্তিত্ব ছিল না। এইভাবে প্রকাশরূপে কোনো পদার্থের ভাব ছিল না, কিন্তু তাদের মূল উপাদান কারণ অবশ্যই বিদ্যমান ছিল, যার মধ্যে এই সকল পদার্থ সম্পূর্ণরূপে লীন ছিল। তাই একে নিঃশর্ত অভাবও বলা যায় না। বর্তমানে এই সৃষ্টিতে যে পরিমাণ পদার্থ বিদ্যমান, সেই পরিমাণই তখনও বিদ্যমান ছিল; কিন্তু মূল কারণরূপে বিদ্যমান থাকার ফলে ব্যবহারিকভাবে কিছুই প্রকাশিত ছিল না।

ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় ‘অসৎ’ শব্দ দ্বারা শূন্য আকাশ গ্রহণ করে লিখেছেন—

“যদা কার্যং জগন্নোৎপন্নমাসীত্ তদাঽসৎ সৃষ্টেঃ প্রাক্ শূন্যমাকাশমপি নাসীত্। কুতঃ? তদ্‌ব্যবহারস্য বর্তমানাভাবাত্।”

অর্থাৎ, সেই সময় কোথাও শূন্য স্থান (অভাবরূপ আকাশ)ও ছিল না; অর্থাৎ সর্বত্র মূল উপাদান পদার্থ তার সূক্ষ্মতম সত্তাসহ একরসভাবে বিদ্যমান ছিল।

(ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্)
[রজঃ রজসঃ অন্তরিক্ষলোকস্য (নিরুক্ত ১২.৭)]

¹ দ্রব্য–শক্তি সংরক্ষণ তত্ত্বের এটি সর্বাধিক উপযুক্ত উদাহরণ।

[রজসী দ্যাবাপৃথিবীনাম (নিঘं. ৩.৩০), ইমে বৈ লোকা রজাংসি (শ. ব্রা. ৬.৩.১.১৮)]
সেই সময় প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত কোনো প্রকারের অতি সূক্ষ্ম থেকেও অতি সূক্ষ্ম কণাও বিদ্যমান ছিল না। তখন অন্তরীক্ষও ছিল না; অর্থাৎ পদার্থগুলির মধ্যে কোনো দূরত্বই ছিল না, কারণ সমস্ত পদার্থ একরস ও অদৃশ্য অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। এখানে ‘ব্যোম’ পদ সম্পর্কে ঋষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় লিখেছেন—
‘ব্যোমাকাশমপরং যস্মিন্ বিরাডাখ্যং সোऽপি নো আসীত্ কিন্ত্ত পরব্রহ্মণঃ সামর্থ্যাখ্যমতীব সূক্ষ্মং সর্বস্যাস্য পরমকারণসংজ্ঞকमेব তদানীং সমবর্তত’।
যখন কোনো প্রকার রশ্মিই বিদ্যমান ছিল না, তখন সেগুলির দ্বারা নির্মিত আকাশ মহাভূত কীভাবে বিদ্যমান হতে পারে? হ্যাঁ, পরমেশ্বরের পরম সামর্থ্যে সমস্ত পদার্থ কারণরূপে অবশ্যই বিদ্যমান ছিল।

কারণ ছাড়া কোনো কার্য হতে পারে না—যেমন মহর্ষি কণাদ বলেছেন, ‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’ (বৈ. দ. ৪.১.৩)। এই জন্য মূল উপাদান পদার্থ অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এখানে ‘ব্যোম’ পদটি এ কথাও নির্দেশ করে যে, সেই সময় যে মূল উপাদান পদার্থ অব্যক্তরূপে বিদ্যমান ছিল, তার অবয়বগুলির মধ্যে না কেউ কারও দ্বারা রক্ষিত ছিল, না কেউ কারও রক্ষক ছিল; না কেউ আচ্ছাদক ছিল, না কেউ আচ্ছাদ্য ছিল। এর অর্থ এই যে, প্রকৃতিরূপী পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলি প্রলয়কালে পৃথক পৃথক, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, নিশ্চল ও সম্পূর্ণ অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তারা সকলেই পৃথক পৃথকভাবে অনাদি। এই কারণেই প্রকৃতি পদার্থকেও অনাদি বলা হয়। যদি প্রলয়কালে অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে সামান্যতমও কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ থাকত, তবে সেই সংযোগ অনাদি না হওয়ায় প্রকৃতিরূপী পদার্থ কখনোই অনাদি হতে পারত না। পাঠকদের এই বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেওয়া উচিত। সেই সময় সকলকে কেবল ব্রহ্মই আচ্ছাদিত করে রাখে।

(কিম্, আবরীবঃ) এখানেও একই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সেই সময় অক্ষররূপ অবয়বগুলি কারও দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল না; তখন ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো আবরকের প্রয়োজনই ছিল না।
(কুহ, কস্য, শর্মন্) [শর্ম গৃহনাম (নিঘं. ৩.৪), সুখম্ (তু. ম. দ. ঋ. ভা. ১.৮৫.১২), শরণম্ (নিরু. ৯.১৯)]
কোথায় কারও কোনো আবাস ছিল? কোথায় কারও সুখ ছিল? আর কোথায় কারও কোনো আশ্রয়দাতা ছিল? এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রকাশিত হয় যে, কোনো জড় পদার্থই অন্য কোনো জড় পদার্থের আবাস বা আশ্রয় ছিল না, কারণ কোনো প্রকার ব্যাপ্য–ব্যাপক সম্পর্কই তখন ছিল না। সমস্ত অক্ষররূপ অবয়ব স্বতন্ত্র ছিল; তাদের মধ্যে কোনো প্রকার বল কার্যরত ছিল না। এতসব সত্ত্বেও সমগ্র পদার্থ সম্পূর্ণ একরস ছিল। সেই সময় কোনো বন্ধ জীবাত্মা সুখ বা দুঃখে আক্রান্ত ছিল না; তার সমস্ত অনুভূতি ও সংস্কার সম্পূর্ণ শান্ত ছিল। এখানে ‘কুহ’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মায়’ বলেও গ্রহণ করা যেতে পারে। একইভাবে ‘কস্য’ পদের অর্থ ‘প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রিত’ হিসেবেও গ্রহণযোগ্য। এইভাবে সেই সময় সমস্ত মুক্তাত্মা প্রজাপতি পরমাত্মার আশ্রয় পেয়ে তাতেই পরমানন্দ ভোগ করতে করতে স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করে। অপরদিকে, সমগ্র প্রকৃতিরূপী জড় পদার্থ এবং বন্ধ জীবাত্মা পরমাত্মার মধ্যেই নিশ্চল ও সম্পূর্ণ নির্গুণ অবস্থায় বিদ্যমান বা আশ্রিত থাকে।

(অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্)
[অম্ভঃ— ‘অম্ভঃ’ পদের ব্যুৎপত্তি করতে গিয়ে উণাদি-কোষের ব্যাখ্যায় ঋষি দয়ানন্দ লিখেছেন— ‘আপ্যতে তৎ অম্ভঃ’ (উ. কো. ৪.২১১)।
গহনম্— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), কঠিনম্ (ম. দ. য. ভা. ৮.৫৩)।
গভীরঃ— উদকনাম (নিঘং. ১.১২), মহান্নাম (নিঘং. ৩.৩), গভীরা বাঙ্‌নাম (নিঘং. ১.১১)]

সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপক ছিল? কোন পদার্থ উদকরূপ, অর্থাৎ সেচনাদি ক্রিয়ায় যুক্ত ছিল? কোন পদার্থ বাক্‌-রশ্মির রূপে বিদ্যমান ছিল? এখানে এই প্রশ্নগুলির মাধ্যমে এই অর্থই প্রতীয়মান হয় যে, সেই সময় অব্যক্ত কারণ পদার্থে না কোনো ব্যাপক ছিল, না কোনো ব্যাপ্য ছিল। না কোনো সেচক ছিল, না কোনো সেচ্য পদার্থ ছিল। কোনো প্রকার গতির সম্পূর্ণ অভাব থাকার কারণে কোনো বাক্‌-আদি রশ্মিও বিদ্যমান ছিল না। তখন কোনো কঠিন বা সঘন পদার্থ থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। এইভাবে সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত কঠিন, তরল, গ্যাস, শক্তি ও আকাশ ইত্যাদি কোনো পদার্থই বিদ্যমান ছিল না, কিংবা থাকতে পারে না। তবে সেই পদার্থের ভিতরে ও বাইরে পরম চেতন তত্ত্ব পরব্রহ্ম পরমাত্মা অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন। সেই পরব্রহ্ম সর্বদা সমস্ত আত্মা ও প্রকৃতিরূপী মূল উপাদান কারণে সম্পূর্ণরূপে ব্যাপ্ত থাকেন। তিনি মুক্তাত্মাদের তাঁর বিজ্ঞানযুক্ত আনন্দ দ্বারা সিঞ্চিত করতে থাকেন। সেই পরব্রহ্মই সর্বাপেক্ষা মহান।

ভাবার্থ— এখানে সৃষ্টির মূল উপাদান পদার্থের স্বরূপ এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ-প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্ববর্তী অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে।

পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে ভগবান মনুর উক্তি হল—

আসীদিদং তমোভূতমপ্রজ্ঞাতমলক্ষণম্ ।
অপ্রতর্ব্যমবিজ্ঞেয়ং প্রসুপ্তমিব সর্বতঃ ॥ (মনু ১.৫)

অর্থাৎ মহাপ্রলয়ের কালে এই জগৎ গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন থাকে। এই কারণেই প্রকৃতির এক নাম ‘তমস্’‘অপ্রজ্ঞাতম্’ অর্থাৎ সেই সময়কার অবস্থাকে কখনোই কেউ সুস্পষ্টভাবে জানতে পারেনি। এখানে এই অর্থও প্রতীয়মান হয় যে, সেই অবস্থাকে ঋষিগণ অবশ্যই জেনেছেন এবং জেনেই আর্ষ গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন; কিন্তু ‘ন’ পূর্বক ‘প্র’ উপসর্গ এই ইঙ্গিত দেয় যে, তাকে প্রকৃষ্ট রূপে জানা যায়নি। ‘অলক্ষণম্’ অর্থাৎ সেই পদার্থে এমন কোনো লক্ষণ বিদ্যমান থাকে না, যার দ্বারা তার কোনো প্রকার অনুভূতি সম্ভব হয়। ‘অপ্রতর্ব্যম্’ পদটি এই কথা নির্দেশ করে যে, পদার্থের সেই অবস্থার বিষয়ে মহান তত্ত্বদর্শীরা তর্ক-বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু অত্যন্ত সুগভীর ও সূক্ষ্ম তর্ক করা সম্ভব নয়, কারণ সেই পদার্থ অব্যক্ত রূপে বিদ্যমান থাকে। ‘অবিজ্ঞেয়ম্’ পদটি এই কথা জানায় যে, কোনো ব্যক্তি যতই মহান জ্ঞানী হোন না কেন, তিনি তাকে বিশেষ রূপে কখনোই জানতে পারেন না। তা ঋষিগণের দ্বারা জ্ঞেয় বটে, কিন্তু বিশেষভাবে জ্ঞেয় নয়। এইভাবে পদার্থের সেই অবস্থা এমন হয়, যেন তা সম্পূর্ণরূপে নিদ্রিত অবস্থায় রয়েছে।

এইভাবে মহাপ্রলয় কালে যখন কোনো জড় পদার্থ ভাবরূপে বিদ্যমান থেকেও অভাবরূপ হয়ে যায়, সেই সময়ও পরব্রহ্ম পরমাত্মার সত্তা অপরিবর্তিতভাবে বিদ্যমান থাকে। তিনি সৎ ও অসৎ—উভয়ের অতীত হয়ে নিত্য ও একরস রূপে বিরাজমান থাকেন। যখন সূক্ষ্ম বা স্থূল পদার্থের কোনো প্রকার আলো বিদ্যমান থাকে না, কারণ সেই পদার্থসমূহও তখন প্রকাশযোগ্য অবস্থায় থাকে না, সেই অবস্থায় পরমাত্মার জ্ঞানরূপ আলো অবশ্যই সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, যার মধ্যে মুক্তাত্মারা স্বচ্ছন্দে ও সহজভাবে বিচরণ করতে থাকেন। সেই মুক্তাত্মারা ব্রহ্মকে আশ্রয় করে তাঁর মধ্যেই বিচরণ করেন। তিনিই সকলকে আচ্ছাদিত করেন, তিনিই সমগ্র আশ্রয় ও আবাস প্রদান করেন এবং তিনিই সর্বত্র নিতান্তভাবে ব্যাপ্ত থাকেন। এমন কোনো পদার্থ নেই, যার ভিতরে ও বাইরে সেই ব্রহ্মের সত্তা বিদ্যমান নয়।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, অসৎ, আসীত্, তদানীম্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে পদার্থের অবস্থা অসৎ রূপ ছিল না। এর অর্থ এই যে, সেই সময় পদার্থ অব্যক্ত অবস্থায় ছিল না, তাতে আন্দোলনও বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন প্রকার সূক্ষ্ম বলও ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, যার কারণে পদার্থ গতিশীল অবস্থায় বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থ এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, তা নিজের সূক্ষ্ম রশ্মির দ্বারা পরস্পরকে সিঞ্চিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেছিল। (নো, সৎ, আসীত্) এতদসত্ত্বেও সেই পদার্থ প্রকাশ্য রূপে অনুভবযোগ্য ছিল না। পদার্থে আন্দোলন অবশ্যই ছিল, কিন্তু তা অত্যন্ত তীব্র বলযুক্ত ছিল না। সেই সূক্ষ্ম পদার্থের অবয়বসমূহ থেকে নিঃসৃত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলি একে অপরকে অবশ্যই অবসিঞ্চিত করছিল, কিন্তু তারা পদার্থকে তরল অবস্থায় উপনীত করতে সক্ষম ছিল না; যার ফলে কোনো পদার্থ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেনি।

(ন, আসীত্, রজঃ) সেই সময় আকাশ মহাভূত উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তা বিশেষ ক্রিয়াশীলতা লাভ করতে পারেনি। তীব্র বলের অভাবে তা সেই বায়বীয় দশা প্রাপ্ত পদার্থকে ঘনীভূত করতে পারছিল না, যার ফলে না তো অগ্নির পরমাণু অর্থাৎ ফোটন সৃষ্টি হচ্ছিল এবং না বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা সংজ্ঞায়িত কোয়ার্কস ও ইলেকট্রন প্রভৃতি মৌল কণারই নির্মাণ সম্ভব হচ্ছিল। এই অবস্থায় এই কণাগুলির মধ্যে অন্তরিক্ষ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। (নো, ব্যোম, পরঃ, যৎ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বসমূহ স্বতন্ত্রভাবে বিচরণ করছিল। কোনো অবয়ব অন্য কোনো অবয়বের আচ্ছাদক বা আচ্ছাদ্য ছিল না এবং না কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল। এই কারণে সেই পদার্থের অবস্থা এমন ছিল, যেন তাদের অবয়বগুলির মধ্যে কোনো বল কার্যরতই নয়। এর অর্থ এই যে, সেই সময় বিদ্যমান বলসমূহ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরের। (কিম্, আবরীবঃ) সেই সময় বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির কোনো আবরণকারী ছিল না, অর্থাৎ তারা আবরণবিহীন অবস্থায় ছিল, যার ফলে সেই অবয়বগুলির পৃথক পৃথক পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। এই কারণেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেও মানবীয় সামর্থ্যের দৃষ্টিতে সেই সমগ্র পদার্থ একরসই ছিল। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কে কার আবাস ছিল—অর্থাৎ কারও কোনো আবাস ছিল না। এই কারণে সমগ্র পদার্থ নিরন্তর স্বতন্ত্র রূপে সর্বত্র বিচরণ করছিল। এর দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেই সমগ্র পদার্থ প্রাণতত্ত্ব দ্বারা নির্মিত এবং প্রাণতত্ত্বের মধ্যেই সমাহিত ছিল কিংবা তাতেই বিচরণ করছিল। সেই সময় অবস্থা এমন ছিল, যেন প্রাণই প্রাণের মধ্যে বিদ্যমান বা বিচরণ করছে। (অম্ভঃ, কিম্ আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সেই সময় কোন পদার্থ ব্যাপ্ত ছিল—অর্থাৎ তখন বিদ্যমান পদার্থের অবয়বগুলির মধ্যে কেউ কারও মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল না, বরং সকলেই প্রাণতত্ত্বের মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল। কোনো অবয়বই কঠিন রূপে বিদ্যমান ছিল না এবং না মধ্যমা বা বৈখরী ধ্বনির উৎপত্তি ঘটতে পেরেছিল।

ভাবার্থ — এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সূক্ষ্ম বায়ু তত্ত্বের রূপে বিদ্যমান ছিল (বর্তমান পরিভাষায় একে ভ্যাকুয়াম এনার্জি বলা যেতে পারে, যার মধ্যে ডার্ক এনার্জিও অন্তর্ভুক্ত)। সেই সময় পর্যন্ত ফোটন অথবা মৌল কণার উৎপত্তি ঘটেনি, এই কারণে মানবীয় দৃষ্টিতে পদার্থ সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। কণার অভাবে ধ্বনির মধ্যমা বা বৈখরী রূপেরও উৎপত্তি হয়নি। অতএব মানবীয় দৃষ্টিতে ব্রহ্মাণ্ডের সেই অবস্থা ছিল নিঃশব্দ। এর সঙ্গে সেই অবস্থা ছিল অতিশয় শীতলও। পদার্থের এই অবস্থার জ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞানের নেই। বর্তমান বিজ্ঞান অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তির পর থেকেই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মনে করে। কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান এই বিষয়টি চিন্তা করতে পারছে না যে অগ্নি তত্ত্ব, অর্থাৎ মৌল কণা ও ফোটন কোথা থেকে এলো, কীভাবে তৈরি হলো এবং কোন পদার্থ থেকে তৈরি হলো।

আধিভৌতিক ভাষ্য — বাংলা অর্থ

এখানে সেই সময়ের আলোচনা করা হয়েছে, যখন কোনো লোক বা জগতে মানবের ন্যায় প্রাণী প্রথমবারের মতো সেই লোকের গর্ভ থেকে যৌবন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। তার পূর্বে ভোগযোনিতে জন্ম নেওয়া বহু প্রাণীর আবির্ভাব ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্মও যৌবন অবস্থায় ভূমির গর্ভ থেকেই হয়। যখন চার ঋষি এখনও বেদের জ্ঞান লাভ করেননি, তখন এই পৃথিবীর পরিস্থিতি কেমন ছিল—অর্থাৎ ভূমি থেকে যৌবনে জন্ম নেওয়া যুবক-যুবতীদের সমাজ কেমন ছিল—তারই আলোচনা এখানে করা হয়েছে।

(ন, অসৎ, আসীত্, নো, সত্, আসীত্, তদানীম্) সে সময় ‘সৎ’ও ছিল না অর্থাৎ কোনো মানুষের নিকট সত্য জ্ঞান ছিল না। তারা সৃষ্টিকে, পরমাত্মাকে এবং নিজেদের প্রকৃত স্বরূপকে যথার্থভাবে জানত না। আবার ‘অসৎ’-ও ছিল না এর অর্থ এই যে প্রাথমিক প্রজন্মের মানুষরা বুদ্ধিহীন ছিল না। তারা ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান, পরম সত্ত্বগুণসম্পন্ন, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী। বর্তমান যুগের মহা বুদ্ধিমানদের তুলনায়ও তাদের বৌদ্ধিক স্তর ছিল অনেক উচ্চ অর্থাৎ তারা ঋষিদের ন্যায় প্রজ্ঞাসম্পন্ন ছিল। তবে নৈমিত্তিক (প্রযোজ্য) জ্ঞান লাভের পূর্বে তারা সেই প্রজ্ঞাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম ছিল না। তাদের মধ্যে মিথ্যাভাষণ প্রভৃতি আচরণ একেবারেই ছিল না, কিন্তু যথার্থ ব্যবহারিক জ্ঞান ও বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট বোধ ছিল না। (ন, আসীত্, রজঃ, নো, ব্যোম, পরঃ, যত্) সে সময় কোনো মানুষ রাজ্য বা ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিল না অর্থাৎ পৃথিবীতে তখন কোনো রাজা ছিল না, কেউ কারও পালনকর্তা বা নেতা ছিল না। একইভাবে ‘ব্যোম’ অর্থে কেউ কারও প্রেরক বা বন্ধু ছিল না। সবাই ভূমির গর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করেছিল। ফলে কারও সঙ্গে কারও কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না (কিম্, আবরীবঃ) সে সময় কে কার রক্ষক ছিল? অর্থাৎ কেউ কারও রক্ষক বা রক্ষিত ছিল না; কেবল পরমাত্মাই সকলের রক্ষক ছিলেন। (কুহ, কস্য, শর্মন্) কোথায় কার বাসস্থান ছিল? অর্থাৎ তখন মানুষের কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। কেউ কারও আশ্রয়দাতা বা আশ্রিত ছিল না; বরং সবাই স্বাধীন ও নিরাপদ জীবন যাপন করত। (অম্ভঃ, কিম্, আসীত্, গহনম্, গভীরম্) সে সময় জ্ঞান ও বিদ্যার দৃষ্টিতে কে গভীর, গম্ভীর ও সর্বব্যাপী ছিল? কেউই নয়। একমাত্র পরমাত্মাই ছিলেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস।

ভাবার্থ — বাংলা অনুবাদ

সৃষ্টির প্রথম প্রজন্ম অত্যন্ত সুস্থ, শক্তিশালী, বিশালদেহী এবং মহান প্রজ্ঞার অধিকারী হয়। সেই প্রজন্মের মানুষেরা বর্তমান মানুষের ন্যায় অত্যন্ত নিম্ন স্তর থেকে উপদেশ পাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না। তবুও মোক্ষরূপ জীবনলক্ষ্য অর্জনের জন্য এবং সংসারিক ঐশ্বর্য লাভের জন্য নৈমিত্তিক জ্ঞানের প্রয়োজন তাদেরও অনিবার্যভাবে থাকে। তাদের প্রজ্ঞার স্তর ঋষিদের ন্যায়ই হয়, কিন্তু সেই প্রজ্ঞাকে কার্যকর করার জন্য বিদ্যোপদেশ অপরিহার্য। তাদের একমাত্র উপদেশক ব্রহ্মই হতে পারেন, কারণ তিনিই একমাত্র সর্বজ্ঞ সত্তা।

এই অবস্থাতেই চার ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদের ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। তারা সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির অবস্থায় এই ঋচাগুলি গ্রহণ করেন। সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধি সিদ্ধ করার যোগ্যতা তারা পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে অথবা পূর্বে কোনো এক সময় মনুষ্যযোনি লাভ করার সময় থেকেই সংস্কাররূপে অর্জন করেছিলেন। তারা ঋচাগুলির গ্রহণ অবশ্যই করেন, কিন্তু সেই ঋচাগুলির অর্থবোধ ঈশ্বরের কৃপা দ্বারাই লাভ করেন। অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা—এই চার ঋষি আদ্য ব্রহ্মাকে সেই ঋচাগুলি এবং তাদের জ্ঞান উপদেশ করেন। বেদের সেই ঋচাগুলিতে সমগ্র সৃষ্টির সেই জ্ঞান বিদ্যমান থাকে, যা মানবজাতির জন্য অপরিহার্য এবং যে স্তরের জ্ঞান প্রথম প্রজন্ম সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম। পরবর্তীতে সেই জ্ঞান সকল মানুষের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

न मृ॒त्युरा॑सीद॒मृतं॒ न तर्हि॒ न रात्र्या॒ अह्न॑ आसीत्प्रके॒तः । 

आनी॑दवा॒तं स्व॒धया॒ तदेकं॒ तस्मा॑द्धा॒न्यन्न प॒रः किं च॒नास॑ ॥

ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীৎপ্রকেতঃ ।
আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধান্যন্ন পরঃ কিং চনাস ॥ ২ ॥

এটি বুঝতে হবে। এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) [মৃত্যুঃ মৃত্যুঃর্বৈযমঃ (মৈ.সং. ২.৫.৬), মৃত্যুরগ্নিঃ (কাঠ. সং. ২১.৭), অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীরভবতি অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে (নিরু. ৭.১৪), মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ (ঐ.আ. ২.৪.২), অপানাৎ মৃত্যুঃ (ঐ.আ. ২.৪.১)]

সৃষ্টি-উৎপত্তি প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে পদার্থের অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সেই সময় পদার্থের অবস্থা এমন ছিল যে প্রকৃতির অক্ষররূপ অবয়বসমূহ, যা অব্যক্ত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল, পরস্পর একে অপরকে রোধ করতে অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিল না, অর্থাৎ তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল না। সকলেই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রূপে বিদ্যমান ছিল। সেই সময় পদার্থ অগ্নিরূপেও ছিল না, অর্থাৎ কোনো সূক্ষ্ম ও স্বতন্ত্র অবয়ব পরস্পর একে অপরকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে সক্ষম ছিল না; অর্থাৎ না কেউ কারো অগ্রণী ছিল, না কেউ কারো অনুগামী ছিল। না কেউ কাউকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম ছিল, না কেউ কারো সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রবৃত্ত ছিল—অর্থাৎ সংযোগ-বিয়োগের কোনো কার্য কোথাও ছিল না, সর্বত্র পূর্ণ নিস্তব্ধতা বিরাজমান ছিল। না কেউ কাউকে নিজের থেকে দূরে সরাতে সক্ষম ছিল, না অক্ষররূপ অবয়বগুলির মধ্যে কোনো অবকাশই ছিল, না তারা পরস্পর একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

‘মৃত্যুঃ’ পদের নির্বচন করতে গিয়ে মহর্ষি যাস্ক লিখেছেন—

মারয়তীতি সতঃ ।
মৃতং চ্যাবয়তীতি বা শতবলাক্ষো মৌদ্গল্যঃ । (নিরু. ১১.৬)

এর অর্থ এই যে, সেই সময় কোনো অবয়বই কাউকে ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল না এবং গতি প্রদান করতেও সক্ষম ছিল না।

(অমৃতম্, ন, তর্হি) [অমৃতম্ অমৃতং হিরণ্যনাম (নিঘং. ১.২), উদকনাম (নিঘং. ১.১২), অমৃতেষু দেবেষু (নিরু. ৮.২০), অমৃতাঃ দেবাঃ (শত. ২.১.৩.৪), অমৃতং বৈ প্রাণাঃ (গো.উ. ১.৩), অমৃতত্বং বা আপঃ (কৌ.ব্রা. ১২.১)] সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে তেজশূন্য ছিল, অর্থাৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারময় ছিল। সেই পদার্থে কোথাও হরণশীলতার গুণ ছিল না। সেই সময় কোনো দেব-পদার্থ বিদ্যমান ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, কোনো পদার্থই না কোনো প্রকার গতিযুক্ত ছিল, না কোনোতে দীপ্তি ছিল, না কোনোতে আকর্ষণ বল ছিল এবং না পদার্থসমূহের এদিক-ওদিক বিনিময় ঘটছিল। সেই সময় প্রাণতত্ত্বও ছিল না এবং কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থে ব্যাপ্ত ছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, প্রকেতঃ, আসীত্) [রাত্রিঃ ভ্রাতৃব্যদেবত্যা রাত্রিঃ (তৈ.ব্রা. ২.২.৬.৪), রাত্রির্বরুণঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০, তাং. ব্রা. ২৫.১০.১০), তমঃ পাপ্মা রাত্রিঃ (গো.উ. ৫.৩), রাত্রিঃ সাবিত্রী (গো.পূ. ১.৩৩)। অহন্ অহর্বে মিত্রঃ (ঐ.ব্রা. ৪.১০), অহনা উষোনাম (নিঘং. ১.৮)] সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না তার অবস্থান থেকে বিচলিত করতে সক্ষম ছিল এবং না বাঁধতে বা ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল। কোনো পদার্থই অন্য কোনো পদার্থকে না প্রেরণা দিতে সক্ষম ছিল এবং না উৎপন্ন করতেও সক্ষম ছিল। সেই সময় কোনো পদার্থই অন্য পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হতে প্রবৃত্ত হতে পারত না এবং কোথাও দাহকতা বা আলোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কোথাও অন্ধকার বা আলোর আগমন-গমনেরও কোনো চিহ্ন ছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [বাতঃ বাতো বৈ যজ্ঞঃ (শ.ব্রা. ৩.১.৩.২৬), বাতো হি বায়ুঃ (শ.ব্রা. ৮.৭.৩.১২)। আনীত্ জীবনং ধারয়তি (স্বামী ব্রহ্মমুনি ভাষ্য)] নিজের ধারণাশক্তির দ্বারা কাল বা পরমাত্মতত্ত্ব, বায়ুতত্ত্বের উৎপত্তি না হয়েও, সমগ্র উপাদান পদার্থে বল ও গতির সঞ্চারকারী একমাত্র তত্ত্ব হয়ে থাকে। পরমাত্মার শক্তি স্বাভাবিক, যেমন উপনিষৎকার বলেছেন—

‘স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ’ (শ্বে.উ. ৬.৮)।

যেমন পরব্রহ্ম পরমাত্মা এক হয়েও সর্বব্যাপী, তেমনই কালতত্ত্বও পরমাত্মা দ্বারা নিরন্তর প্রেরিত হয়ে সদা সমান গতিতে গমন করতে থাকে। তিনিই সৃষ্টির সকল পদার্থের ধারক এবং সকলকে প্রাণত্বও প্রদান করেন। সেই ঈশ্বর ও কালতত্ত্ব অবাত রূপ। এর তাৎপর্য এটিও যে, তাঁরা কোনো যজন প্রক্রিয়ার অঙ্গ নন। কালতত্ত্ব কখনোই কোনো পদার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না, অর্থাৎ তার পথে কোনো পদার্থের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না।

(তস্মাত্, হ, অন্যৎ, কিঞ্চন, পরঃ, ন, আস) এই ব্রহ্ম ও কাল—এই উভয়ের অতিরিক্ত আর কোনো অন্য পদার্থ বিদ্যমান থাকে না, যা সেই মূল পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে; সুতরাং এদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ কোনো পদার্থের অস্তিত্ব থাকা তো সম্ভবই নয়।

ভাবার্থ— সৃষ্টির পূর্বে মূল উপাদান পদার্থে অক্ষররূপ অবয়বসমূহ পৃথক্‌ পৃথক্‌ স্বাধীন অবস্থায় সম্পূর্ণরূপে নিশ্চল হয়ে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে। সেই অবয়বগুলির মধ্যে না কোনো শূন্যস্থান থাকে এবং না তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। তাদের মধ্যবর্তী স্থানে কেবল পরমাত্মাই বিদ্যমান থাকেন। সেই অবয়বগুলির মধ্যে কোনো প্রকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বলশীলতা বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় পদার্থ সম্পূর্ণরূপে আলোকহীন, ক্রিয়াহীন ও বলহীন অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থে না কেউ কারো বাধা হয় এবং না কেউ কারো দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়, না কোনো পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং না কেউ কারো উৎপাদক হয়। কোথাও অন্ধকার ও আলোর কোনো চক্রও চলে না, বরং সেই সময় সর্বত্র ঘন অন্ধকারই বিরাজ করে। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মাই নিজের স্বাভাবিক ধারণাশক্তির সঙ্গে অব্যক্ত কালতত্ত্বের দ্বারা সমগ্র পদার্থকে একাই ধারণ করে রাখেন। তাঁর থেকে ভিন্ন অন্য কোনো ধারক পদার্থ বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা জ্ঞাত বা কল্পিত আকাশ, শক্তি, দ্রব্য, বৈদ্যুতিক আধান, ভর, শব্দ, তাপ ইত্যাদির কোনোটিরই কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র আকাশে কোনো ফোটন ও মূলকণ উৎপন্ন হয়নি। এই কারণে সেই অবস্থা অত্যন্ত শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। যে পদার্থ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল, তাতেও বিনাশ বা ক্ষয়ের কোনো প্রক্রিয়া চলছিল না। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় পদার্থে প্রাণত্বও অত্যন্ত অল্প ছিল; এর অর্থ এই যে, সেই বায়ব্য অবস্থাসম্পন্ন পদার্থে বল ও গতির বিশেষ তীব্রতা ছিল না। [অমৃতম্ = অমৃতং হিরণ্যমমৃতমেষ (আদিত্যঃ) (শ. ব্রা. ৬.৭.১.২)] সূক্ষ্ম কণিকা, তীব্র বল ও তাপের অভাবে আদিত্যাদি লোকসমূহের নির্মাণকার্যও তখন আরম্ভ হতে পারছিল না।

(ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সমগ্র পদার্থে কৃষ্ণ ও শ্বেত বর্ণের কোনো লক্ষণ ছিল না; বরং সমগ্র পদার্থই তম দ্বারা আবৃত বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল। সেই পদার্থের বর্ণে কোনো ওঠানামা ছিল না, বরং সমগ্র পদার্থই একরূপ বলে বোধগম্য ছিল। [অহন্ = অহর্বৈ বিয়চ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)। রাত্রিঃ = রাত্রির্বৈ সংযচ্ছন্দঃ (শ. ব্রা. ৮.৫.২.৫)] সেই সময় পর্যন্ত যে সকল ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়েছিল, তারা পরস্পরের নিকটে ছিল না, আবার অতিদূরেও ছিল না। এর তাৎপর্য এই যে, তাদের মধ্যে সংঘননের প্রক্রিয়াও তখনো আরম্ভ হয়নি এবং তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টাও করছিল না।

(আনীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) [স্বধা = দ্যাবাপৃথিব্যোর্নাম (নিঘং. ৩.৩০)] সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণতত্ত্ব তার সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক শক্তি ও আকাশতত্ত্বের সঙ্গে কোনো তীব্র আন্দোলন ছাড়াই একাই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। লক্ষণীয় যে, প্রাণ-আপানই সূক্ষ্ম বিদ্যুতের রূপ, যাকে দ্যৌও বলা হয়। এখানে পৃথিবী পদ দ্বারা আমরা আকাশতত্ত্বেরই গ্রহণ করেছি। সেই সময় বলের আর কোনো রূপ উৎপন্ন হয়নি, এই কারণেই এখানে ‘একম্’ শব্দের প্রয়োগ করা হয়েছে। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, কিঞ্চন, পরঃ, আস) সেই প্রাণতত্ত্ব ব্যতীত অন্য কোনো পদার্থই ধারণাশক্তিসম্পন্ন ছিল না, যা সমগ্র পদার্থকে ধারণ করতে সক্ষম হতে পারে। লক্ষণীয় যে, সেই সময় বহু প্রকার ছন্দ রশ্মিও উৎপন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেগুলিকেও বৃষারূপ প্রাণ রশ্মিগণই ধারণ করে রেখেছিল।

ভাবার্থ— এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র পদার্থ শীতল ও অন্ধকারপূর্ণ ছিল। তাতে ক্ষয় ও বৃদ্ধির কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া চলছিল না। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটিমাত্র কৃষ্ণ বর্ণের ছিল। সেই পদার্থের অবয়বরূপ ছন্দ রশ্মিগুলি পরস্পরের খুব নিকটে ছিল না এবং অতিদূরেও ছিল না। এই কারণে সৃজন ও বিনাশের কোনো লীলাও তখন চলছিল না। সেই সময় সূক্ষ্ম প্রাণবল—যা বিদ্যুতেরই অতি সূক্ষ্ম বা সূক্ষ্মতম রূপ—সর্বত্র বিদ্যমান ছিল। সেই বলই সমগ্র পদার্থকে ধারণ করে রেখেছিল। বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, সেই সময় কোনো প্রকার বিক্ষোভ ও স্পন্দন (ফ্লাকচুয়েশন) ব্যতীত ভ্যাকুয়াম এনার্জিই সর্বত্র নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পরিপূর্ণ ছিল।

আধিভৌতিক ভাষ্য – (ন, মৃত্যুঃ, আসীত্) মানব সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষদের কাছে মৃত্যু অর্থাৎ ত্রিবিধ দুঃখের মধ্যে কোনো প্রকার দুঃখই ছিল না, কারণ সেই সময় পরিবেশ ইত্যাদি সবকিছুই সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুষম ছিল। (অমৃতম্, ন, তরহি) সেই সময় অমৃত অর্থাৎ মোক্ষসদৃশ আনন্দও সেই মানুষদের প্রাপ্ত ছিল না। যদিও প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবৃত্ত হয়ে এসেছিল, তবুও তারা তখন মোক্ষসুখ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তারা জীবন্মুক্ত অবস্থাও লাভ করেনি। (ন, রাত্র্যাঃ, অহ্নঃ, আসীত্, প্রকেতঃ) সেই সময় মানুষ অজ্ঞানরূপ রাত্রিতেও আক্রান্ত ছিল না এবং তার মধ্যে বিদ্যার আলোও ছিল না; অর্থাৎ অজ্ঞান ও জ্ঞান উভয়েরই কোনো লক্ষণ ছিল না। (আসীত্, অবাতম্, স্বধয়া, তৎ, একম্) সেই মানুষ একমাত্র নৈমিত্তিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ছিল; নৈমিত্তিক জ্ঞান ব্যতীত সে সর্বদিক থেকেই পরিপূর্ণ ছিল। সে স্বধা অর্থাৎ নিজের অতুলনীয় স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা পূর্ণ প্রাণত্বসহ সর্বতোভাবে সুখী ও সুস্থ জীবন যাপন করছিল। (তস্মাত্, হ, অন্যত্, ন, পরঃ, কিঞ্চন, আস) সেই নৈমিত্তিক জ্ঞানের অভাব ব্যতীত তার আর কোনো প্রকার অভাব ছিল না। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষের অতিরিক্ত আর কোনো প্রাণীই এই স্তর প্রাপ্ত ছিল না।

ভাবার্থ— যখন প্রথমবার মানুষ এই পৃথিবীতে বা অন্য যে কোনো লোকেই জন্ম গ্রহণ করে, তখন সমগ্র পৃথিবীর ভূমি, জল ও বায়ু তাদের সর্বাধিক শুদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই কারণে সমগ্র উদ্ভিদজগতও অত্যন্ত পুষ্ট ও সুস্থ হওয়ায় পুষ্টিগুণ ইত্যাদিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ থাকে। এর ফলে এদের উপর নির্ভরশীল সমস্ত প্রাণীও সম্পূর্ণ সুস্থ ও বলবান হয়। পরিবেশের পূর্ণ বিশুদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধির কোনো চিহ্নমাত্রও থাকে না। সমগ্র পৃথিবী ফল, পুষ্প, শাক, অন্ন ও ঔষধিতে আচ্ছাদিত থাকে। নদী ও সরোবরসমূহ এমন শুদ্ধতম পানীয় জলে পরিপূর্ণ থাকে, যা নানা প্রকার জীবনোপযোগী তত্ত্বে সমৃদ্ধ। সেই প্রথম প্রজন্মের মানুষ বর্তমানকালে জন্ম নেওয়া মানুষের ন্যায় অতি অল্প স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে নয়, বরং সর্বাধিক ও শ্রেষ্ঠতম স্বাভাবিক জ্ঞান নিয়ে পূর্ণ যৌবনাবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। সে তার অতুল স্বাভাবিক জ্ঞান, সর্বোৎকৃষ্ট প্রজ্ঞা, অনুপম সত্ত্বগুণসম্পন্নতা, অতুল শারীরিক বল ও পূর্ণ স্বাস্থ্য ধারণ করে মোক্ষসুখ ব্যতীত সমস্ত সাত্ত্বিক সুখ লাভকারী হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এই গুণসমূহে সম্পন্ন হয় না। এর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকার পরিবেশ এই পৃথিবীতে আর কখনো কোনো প্রজন্মের জন্য সুলভ হয় না এবং না এত স্বাভাবিক জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞা পুনরায় কোনো প্রজন্ম প্রাপ্ত করে। সেই প্রজন্ম নিজের মধ্যেই অনুপম ও অতুলনীয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- निचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

तम॑ आसी॒त्तम॑सा गू॒ळ्हमग्रे॑ऽप्रके॒तं स॑लि॒लं सर्व॑मा इ॒दम् । 

तु॒च्छ्येना॒भ्वपि॑हितं॒ यदासी॒त्तप॑स॒स्तन्म॑हि॒नाजा॑य॒तैक॑म् ॥

তাম্ আসীত্ তমসা গুঢ়হম্ অগ্রেऽপ্রকেতং সালিলং সর্বমা ইদম্। 

তুচ্ছ্যেনাভ্বপিহিতং যাদাসীত্তপস্তন্মহিনাজায়তৈকং ॥ ৩॥

এই মন্ত্রের ঋষি, দেবতা এবং ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎ।

আধিদৈবিক ভাষ্য ১-

(অগ্রে, তমসা, গুঢ়ম্, তমঃ, আসীত্) এখানে 'তমঃ' পদ প্রকৃতি অর্থাৎ সৃষ্টির মূল উপাদান কারণরূপ পদার্থের নির্দেশক। মহাভারত আশ্বমেধিক পার্ব, অনুগীতা পার্বের অধ্যায় ৩৯, শ্লোক ২৩-এ মহর্ষি ব্রহ্মা জী প্রকৃতির বিভিন্ন নির্দেশক মধ্যে 'তমঃ'কেও একটি নির্দেশক হিসাবে গণ্য করেছেন—

তমো ব্যক্তং শিবং ধাম রজো যোনিঃ সনাতনঃ। 

প্রকৃতির বিকারঃ প্রলয়ঃ প্রধানং প্রভাবাপ্যয়ৌ॥

'তমঃ' সম্পর্কে মহর্ষি যাস্কের বক্তব্য— তমঃ তনোতেঃ (নিরু. ২.১৬)। এটি প্রকৃতি রূপী মূল পদার্থ সর্বত্র বিস্তৃত থাকে এবং গভীর অন্ধকারে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছাদিত থাকে। এটি এই ব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় অনেক বিস্তৃত এবং আমাদের কল্পনার যে কোনো গভীর অন্ধকার থেকেও অধিক অন্ধকারযুক্ত। সেই অন্ধকারে কোথাও কোনো বিচ্যুতি নেই; অর্থাৎ সেই অন্ধকারও একরূপ। (ইদং, সর্বং, সালিলং, আহ্, অপ্রকেতম্) [আঃ ব্যাপতা (আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী)] সর্বপ্রথম এই সমগ্র সৃষ্টিই সম্পূর্ণরূপে লক্ষণহীন থাকে, অর্থাৎ তার রূপকে কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। এই পদার্থের মধ্যেই এই সমগ্র সৃষ্টির মিলন ঘটে। সেই পদার্থ সমগ্র শূন্যরূপ আকাশে বিস্তৃত থাকে। এখানে 'সালিল' পদার্থের সেই রূপের নাম, যেখানে সমস্ত পদার্থ সম্পূর্ণভাবে মিলিত হয় এবং যেখান থেকে কোনো ক্ষুদ্র জড় পদার্থের কল্পনাও করা যায় না। সেই পদার্থ সর্বত্র সমান রূপে বিদ্যমান। সেজন্যে ভগবান শিব মহাভারত, অনুশাসন পার্ব, দানধর্ম পার্বের ১৪৫তম অধ্যায়ে সেই পদার্থের নির্দেশক ‘এক’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অপর দিকে মহর্ষি ব্রহ্মা সেই পদার্থের প্রলয় এবং অপ্যয়—এই দুই নির্দেশক হিসেবেও গণ্য করেছেন।

(তুচ্ছ্যেন, আভু, আপিহিতম্, যৎ, আসীত্) [আভু রিক্তঃ (তু.ম.দ.য.ভা.১৬.১০)] সেই পদার্থটি এতটা দুর্বল বা ক্ষুদ্র যে তাকে শূন্যের মতো ধরা যায়। এমন পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার সঙ্গে গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে। এর অর্থ হলো এটি থাকা সত্ত্বেও না থাকার মতো প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় অর্থ, সেই পদার্থটি পরমপিতা পরমাত্মার তুলনায় তুচ্ছ। বিস্তৃতির দিক থেকে ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে মহান, এবং ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক হওয়ায় প্রকৃতিও তার কাছে তুচ্ছ। এছাড়াও ঈশ্বর প্রকৃতির চেয়ে অতিসূক্ষ্ম। এই অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি তিনটি গুণও গোপন থাকে। গোপন থাকার ফলে সমগ্র জড় পদার্থের অন্যান্য সমস্ত উৎপন্ন গুণ ও কর্মও গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, একম্, মহিনা, অজায়ত) [তপঃ তপো দীক্ষা (শ. ভ্রা. ৩.৪.৩.২), মনঃ হা ভাভ তপঃ (জৈ. ভ্রা. ৩.৩৩৪)। মহি মহি মহৎ (নিরু. ১১.৯)] সেই গোপন রূপে থাকা পদার্থ বা মূল উপাদানভূত পদার্থে গোপন বা মিলিত বিশ্ব পরমেশ্বরের বিজ্ঞানেরূপ মহান সামর্থ্য দ্বারা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অর্থ, যে একরূপ উপাদান পদার্থ তার অতিসূক্ষ্মতার কারণে গোপন থাকে, তা একরূপ ও অব্যক্ত পদার্থ পরমেশ্বরের প্রভাবে প্রকাশিত অবস্থায় আসে, অর্থাৎ সৃষ্টির জন্য উদগ্রীব হয়।

ভাবার্থ - মহাপ্রলয়ের সময় সমগ্র প্রকৃতি পদার্থ গভীর অন্ধকারে আচ্ছাদিত থাকে। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড (ক্ষুদ্রতম পদার্থ থেকে বিশাল লোক-লোকান্তর পর্যন্ত) তাতে মিলিত থাকে। সেই পদার্থকে চিনতে কোনো লক্ষণ বা চিহ্ন থাকে না। তার সূক্ষ্মতার কারণে এটি শূন্যের মতো প্রতীয়মান হয়। আজ আমরা আকাশ মহাতত্ত্বকে শূন্যের মতো ধরি, কিন্তু প্রকৃতিরূপ পদার্থের তুলনায় আকাশ মহাতত্ত্বও অনেক ঘন। পরমপিতা পরমাত্মার দৃষ্টিতে সেই প্রকৃতি পদার্থের সূক্ষ্মতা এবং বিস্তৃতিও খুব তুচ্ছ। সেই পদার্থের শূন্যের মতো সূক্ষ্মতায় তার সমস্ত গুণ-কর্ম-স্বভাব লুকিয়ে থাকে। সেই সময়ে পরমেশ্বরের সমস্ত জ্ঞানও সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করা হয়নি, তাই তা গোপন থাকে। পরম ব্রহ্ম পরমাত্মার জ্ঞান ও শক্তিরূপ সামর্থ্যের দ্বারা সেই প্রকৃতিরূপ পদার্থ তার গুণ, কর্ম এবং স্বভাবসহ প্রকাশিত হতে শুরু করে, যার মাধ্যমে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। লক্ষ্যযোগ্য, সেই জড় পদার্থ নিজে থেকেই সৃষ্টির উদ্রেক করতে পারে না। জড় পদার্থকে কার্যকর করা হল চেতনারই সামর্থ্য, এবং প্রকৃতির বিষয়ে সেই চেতনা হল পরমেশ্বর পরমাত্মা।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) [তমঃ রাত্রিনাম (নিঘ. ১.৭), কৃষ্ণমিভ হি তমঃ (তাং. ভ্রা.৬.৬.১০)] এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে যদিও অনেক ছন্দ রশ্মি ইতিমধ্যেই উৎপন্ন হয়ে গেছে, তবু সমগ্র পদার্থ কৃষ্ণবর্ণেরই ছিল, কারণ সমস্ত ছন্দ রশ্মির বর্ণ অব্যক্তাবস্থায়ই বিদ্যমান ছিল। নেকত্র ফোটনের মাধ্যমে সমস্ত পদার্থকে দেখে, কিন্তু সেই দৃশ্যমান পদার্থও মূল কণার দ্বারা নির্মিত। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে ন ফোটনের উৎপত্তি হয় এবং ন কণারও। এই কারণে সেই সময় কিছুই দৃশ্যমান ছিল না, তাই এটিকে অন্ধকারে আচ্ছাদিত বলা হয়েছে।

(অপ্রকেতম্, সলিলম্, সর্বম্, আঃ, ইদম্) এটি যে প্রকৃত জগৎ, তা সেই বায়ব্য অবস্থাপ্রাপ্ত পদার্থে লীন থাকে। সেই পদার্থ এই জগতের তুলনায় বেশি বিস্তৃত। যদিও সেই অবস্থায় গতি এবং সূক্ষ্ম বল বিদ্যমান, তবু সেই অবস্থায় প্রাণীর দৃষ্টিতে তা অলক্ষণা থাকে। আমরা বায়ুতত্ত্বকে আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি অনুভব করতে পারি না। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) সেই পদার্থ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং এই সূক্ষ্মতার কারণে এটি অদৃশ্য ও ব্যাপক। সেই বায়ব্য অবস্থায় সমস্ত কণা বা ফোটনের মতো সূক্ষ্ম পদার্থ যেন গোপন থাকে। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) এই ছন্দ রশ্মির তীক্ষ্ণ তেজ ও বলের প্রভাবে এবং এর সঙ্গে উৎপন্ন অন্যান্য রশ্মির প্রভাবে পদার্থ উৎপন্ন হতে শুরু করে, অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উদ্ভব হয়, যার ফলে তাপ ও আলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

ভাবার্থ - এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অবস্থা বর্তমান বিজ্ঞানের দ্বারা অনুমেয় ভ্যাকুয়াম এনার্জির মতো। বৈদিক ভাষায় এটিকে বায়ু তত্ত্ব বলা হয়। এর ক্রিয়াকলাপ সরাসরি দেখা কঠিন, তাই এটিকে অন্ধকারপূর্ণ অবস্থা বলা হয়। প্রলয় প্রক্রিয়ার সময় মহাপ্রলয়ের পূর্বে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড এই অবস্থায় লীন থাকে। এটি পদার্থের সেই সূক্ষ্ম রূপ, যা তার সূক্ষ্মতার কারণে আমাদের দৃষ্টিতে গোপন। বর্তমান বিজ্ঞান ভ্যাকুয়াম এনার্জি এবং ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব মানে, তবে তা সরাসরি প্রদর্শন করতে পারে না, কারণ তা আমাদের প্রযুক্তির ক্ষমতার বাইরে। এই সূক্ষ্ম এনার্জির দ্বারা এই ছন্দ রশ্মি ও অন্যান্য তৃষ্টুপ ছন্দ রশ্মির তেজ, তাপ ও বলের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কণার জগত প্রকাশ পেতে শুরু করে।

(অগ্রে, তমসা, গূঢম্, তমঃ, আসীত্) সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে যখন চার ঋষি সমাধি অবস্থায় আকাশ থেকে বৈদিক ছন্দ গ্রহণ করেন, তখনও তারা এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সম্পর্কে অনভিজ্ঞই থাকেন। অর্থাৎ, মহাপ্রজ্ঞা এবং সতৎসত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ এই ঋষিরা বৈদিক মন্ত্রগুলো অন্তঃকরণে ধারণ করলেও, তাদের অর্থবোধের দিক থেকে অজ্ঞতার অন্ধকারে অবস্থান করতেন। এখানে 'তমঃ' এবং 'তমসা' এই দুটি পদ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি তমঃ হলো যা ঋষিদের অন্তঃকরণে ছন্দ গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল, আর অন্য তমঃ হলো যা ছন্দ রশ্মি গ্রহণের পরও তাদের অর্থের প্রতি অনভিজ্ঞতা হিসেবে বিদ্যমান ছিল, যাকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেও দূর করতে পারছিল না।

(ইদম্, সর্বम्, সলিলम्, আঃ, অপ্রকেতম্) সমস্ত বৈদিক জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে পূর্ণরূপে লীন ছিল, যা ঋষিদের হৃদয়ে নিহিত হয়ে গেছে। এখানে 'আঃ' পদ নির্দেশ করে যে, সেই বিশাল সৃষ্টির সমস্ত জ্ঞান সেই ছন্দগুলিতে বিদ্যমান ছিল, কিন্তু ঋষিরা তা থেকে অজ্ঞই ছিলেন। (তুচ্ছ্যেন, যৎ, আপিহিতম্, আভু, আসীত্) ঋষিদের দ্বারা ধারণ করা ছন্দ রশ্মিগুলিতে বিদ্যমান জ্ঞান পরমেশ্বরের পূর্ণ জ্ঞানের তুলনায় তুচ্ছ বা অল্পমাত্রার ছিল, অর্থাৎ সেই জ্ঞান পরমেশ্বরের সার্বজ্ঞতা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। (তপসঃ, তৎ, মহিনা, একম্, অজায়ত) ঋষিরা যে তপস্যা ও সাধনা করেছিলেন এবং সেই অদ্বৈত পরমেশ্বরের দয়ালু প্রভাবে, তাদের অন্তঃকরণে সেই ছন্দ রশ্মিগুলির জ্ঞান প্রকাশ পেতে শুরু করে।

ভাবার্থ – প্রতিটি মানব সৃষ্টিতে প্রথম প্রজন্মের সকল মানুষ পূর্ণ প্রজ্ঞা ও সত্ত্বগুণে সমৃদ্ধ থাকে, তবে তাদের মধ্যেও চারজন মানুষ অন্যদের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ হন। এমনটি প্রত্যেক সৃষ্টিতেই ঘটে। এই কারণেই অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা—এই চারটি নাম কেবল এই সৃষ্টি ও এই পৃথিবীতে উৎপন্ন চারজন নির্দিষ্ট ঋষির নাম নয়, বরং এগুলি যোগরূঢ় নাম। যখন এই ঋষিরা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক মন্ত্র গ্রহণ করেননি, তখন তারা সৃষ্টিবিজ্ঞান ও তজ্জনিত মোক্ষজ্ঞানের বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকেন, যদিও তারা পালন, রক্ষণ ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতি জীবনোপযোগী জ্ঞানে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হন। তাদের অন্তঃকরণে অবতীর্ণ বৈদিক ছন্দ রশ্মিগুলি এই জ্ঞানের ভাণ্ডার হলেও, তবুও সেই জ্ঞানের বিষয়ে তারা অনবহিতই থাকেন। ঐ মন্ত্রগুলিতে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিহিত থাকে, তা পরমেশ্বরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় অত্যন্ত তুচ্ছ। যখন সেই ঋষিরা সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হন, তখন পরমেশ্বরের সান্নিধ্য ও কৃপায় তাদের সেই মন্ত্রগুলির বিজ্ঞানবোধ লাভ হতে শুরু করে। এটাই মানুষের মধ্যে জ্ঞানের উৎপত্তির প্রক্রিয়া।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

काम॒स्तदग्रे॒ सम॑वर्त॒ताधि॒ मन॑सो॒ रेत॑: प्रथ॒मं यदासी॑त् । 

स॒तो बन्धु॒मस॑ति॒ निर॑विन्दन्हृ॒दि प्र॒तीष्या॑ क॒वयो॑ मनी॒षा ॥

কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীত্ । 

সতঃ বন্ধুমসতি নিরবিন্দন্ হৃদী প্রতীষ্যা কবয়ো মনীষা ॥ ৪॥

এই মন্ত্রের ঋষি ও দেবতা পূর্ববৎ। এর ছন্দ ত্রিষ্টুপ্ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাব পূর্বের তুলনায় কিছু কম তীক্ষ্ণ।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কামঃ, তৎ, অগ্রে, যৎ, মনসঃ, অধি, সম্, অবর্তত) মহাপ্রলয়ের অবস্থায় যখন সৃষ্টির উৎপত্তির সময় আসে, তখন সর্বপ্রথম পরমেশ্বরের বিজ্ঞানরূপ সামর্থ্যের মধ্যে সৃষ্টি উৎপন্ন করার অভিলাষ প্রকাশ পায়। ঈশ্বরের ইচ্ছা আমাদের জীবদের ইচ্ছার ন্যায় নয়। তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, যা নির্দিষ্ট সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হয়। (প্রথমম্, রেতঃ, আসীত্) সেই ইচ্ছাই এই সৃষ্টির বীজ, যার অভাবে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভই হতে পারে না। [রেতঃ বাগ্রেতঃ (শ. ব্রা. ১.৭.২.২১), রেতো বৈ বৃষ্ণ্যম্ (শ. ব্রা. ৭.৩.১.৪৬)] নির্বিকার ব্রহ্মে ইচ্ছা কীভাবে ও কোথায় উৎপন্ন হয়—এই সংশয়ের সমাধান মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের উপর্যুক্ত বক্তব্যে পাওয়া যায়। মহাপ্রলয়ের অবস্থায় কালতত্ত্ব অর্থাৎ ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মি সম্পূর্ণ অব্যক্ত পরা রূপে সমগ্র প্রকৃতি পদার্থে বিদ্যমান থাকে। তার সম্পর্ক পরমাত্মার সঙ্গে নিত্য বিদ্যমান থাকে। এই ‘ওঁ’ রশ্মির মধ্যেই—যা প্রকৃতপক্ষে পরা রশ্মিরও রূপ নয়, বরং সম্পূর্ণ অব্যক্ত ‘ওঁ’ অক্ষররূপে অবস্থান করে জাগরণের ইচ্ছা আরম্ভ হয়। এই ইচ্ছা পরমেশ্বরের প্রেরণা ও বিজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয়। এই অবস্থাই সেই সন্ধি, যা সৃষ্টি ও প্রলয়—উভয় প্রক্রিয়াকে অব্যক্তভাবে সংযুক্ত করে এবং এটিই সৃষ্টির উৎপত্তির বীজও।

(হৃদি, প্রতীষ্যা, কব্যঃ, মনীষা) শব্দকে উৎপন্নকারী ব্রহ্ম তার সর্বব্যাপক চিন্তাশীল সামর্থ্যের মাধ্যমে অব্যক্ত কালতত্ত্বের মধ্যে সৃষ্টির সময় অনুভব করে (সতঃ, বন্ধুম্, অসতি, নির্, অবিন্দন্) অসত্ রূপ, অর্থাৎ অব্যক্ত প্রকৃতি পদার্থের মধ্যে সত্ রূপ পদার্থ বা জগতের [বন্ধুঃ = সম্পর্ক বা সংযুক্তি] সৃষ্টির প্রক্রিয়ার নিয়ম বা বন্ধন লাভ করে। এই নিয়মগুলোই সমগ্র সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে পরিপূর্ণ বা সম্পন্ন করে এবং তাদের জ্ঞান কালতত্ত্বের মধ্যে নিহিত হয়ে যায়।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাবর্তিত হয়েই আগমন করে এবং তাদের জন্ম পৃথিবীর গর্ভ থেকেই হয়। এই কারণে তাদের মধ্যে কামসংস্কারের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। ফলে সেই যৌবনপ্রাপ্ত অবস্থায় উদ্ভূত নারী ও পুরুষদের মধ্যে পরমাত্মা সর্বপ্রথম কামভাবের উদ্ভব ঘটান। এই কামই পরবর্তী প্রজন্মের বীজ। সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের সময় পৃথিবীর ভূমিস্তর কোমল, স্নিগ্ধ এবং সকল প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। পরবর্তীকালে তা ধীরে ধীরে কঠোর হয়ে যেতে থাকে। এই কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলির উৎপত্তি পৃথিবীর গর্ভ থেকে আর সম্ভব হয় না। অতএব সেই প্রাণী বা মানুষের মধ্যে কামভাবের উদয়ের অনিবার্যতা সৃষ্টি হয়। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে কেবল একটি প্রজন্মই পৃথিবীর গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়, না কি আরও কিছু প্রজন্মও হয়। এখানে কামভাবের উদ্ভবের কথা সেই প্রজন্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যার পর পৃথিবীর গর্ভ থেকে এদের উৎপত্তির পরিস্থিতি আর বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় কামভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীদের মধ্যে ঋতুচক্র প্রভৃতি প্রক্রিয়া এবং পুরুষদের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলির সূচনা হতে থাকে। এই কামভাব তাদের হৃদয় ও মনেই উৎপন্ন হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

ति॒र॒श्चीनो॒ वित॑तो र॒श्मिरे॑षाम॒धः स्वि॑दा॒सी३दु॒परि॑ स्विदासी३त् । 

रे॒तो॒धा आ॑सन्महि॒मान॑ आसन्त्स्व॒धा अ॒वस्ता॒त्प्रय॑तिः प॒रस्ता॑त् ॥

তিরশ্চীনো বিততো রশ্মিরেষামধঃ স্বিদাসী ৩দুপরি স্বিদাসী ৩ত্ ।
রেতোধা আসন্মহিমান আসন্ত্স্বধা অবস্তাৎপ্রযতিঃ পরস্তাৎ ॥ ৫॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় মন্ত্রের প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য ১—

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ) [রশ্মিঃ যমনাত্ (নিরু. ২.১৫), তিরঃ = তিরস্তীণং ভবতি (নিরু. ৩.২০)] এই অব্যক্ত উপাদান পদার্থকে ধারণকারী অব্যক্ত কালতত্ত্বের রশ্মিগুলি সেই সমগ্র পদার্থে বিস্তৃত হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই অব্যক্ত ‘ওম্’ রশ্মিগুলি ওই পদার্থের সকল অক্ষররূপ অবয়বের অন্তরে গুপ্তভাবে অবস্থান করে। এখানে ‘এষাম্’ এই বহুবচনান্ত পদটি অব্যক্ত অক্ষররূপ অবয়বগুলির জন্যও প্রযোজ্য। এদের বিস্তার একরসভাবেই ঘটে। (অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি উপাদান পদার্থের বাইরে ও ভিতরে এবং তার অক্ষররূপ অবয়বগুলির অন্তরে ও উপরে সর্বত্র বিদ্যমান থাকে, তবেই তারা সেই সমগ্র পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ ও সক্রিয় করতে সক্ষম হয়। সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আরম্ভ হলে সেই অব্যক্ত কালরশ্মিগুলি স্বয়ং ব্যক্তরূপ ধারণ করে অক্ষররূপ অবয়বগুলির উপরে ও নীচে অর্থাৎ ভিতরে ও বাইরে স্পন্দিত হতে থাকে।

(রেতোধাঃ, আসন্, মহিমানঃ, আসন্) সেই কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের প্রেরণারূপ রেতস্ অর্থাৎ পরাক্রমকে ধারণ করে। তারা অত্যন্ত ব্যাপক, অর্থাৎ অনন্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্ত কালরশ্মিগুলি ব্রহ্মের মহান বিজ্ঞান এবং তজ্জনিত নিয়মসমূহেও যুক্ত থাকে। (স্বধা, অবস্তাৎ, প্রযতিঃ, পরস্তাৎ) সৃষ্টিনির্মাণের প্রক্রিয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এই সমগ্র পদার্থ স্বধারূপ অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ সে নিজের গুণসমূহকে নিজের মধ্যেই গুপ্ত ও অব্যক্ত রূপে ধারণ করে রাখে। লক্ষণীয় যে গুণ কখনোই তার গুণী থেকে পৃথক হতে পারে না; এই কারণে মহাপ্রলয় অবস্থায় প্রকৃতির সত্ত্বাদি গুণসমূহ প্রকৃতির সঙ্গে অবশ্যই বিদ্যমান থাকে, তবে তারা অব্যক্ত রূপেই অবস্থান করে। এই অবস্থার পর অব্যক্ত কালরশ্মিগুলির মধ্যে প্রয়াসের সামর্থ্য প্রকাশ পায়, অর্থাৎ কালতত্ত্ব ব্যক্ত ও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমন হলে সকল অক্ষররূপ অবয়বও প্রয়াসী হতে শুরু করে।

ভাবার্থ — মহাপ্রলয়ের অবস্থায় সমগ্র মূল উপাদান পদার্থ অবকাশরূপ আকাশে সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে থাকে। সেই পদার্থের মধ্যে অব্যক্ত কালরশ্মিগুলিও সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে। এই রশ্মিগুলি মূল পদার্থের অক্ষররূপ অবয়বগুলির বাইরে ও ভিতরে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত থাকে। তারা সেই পদার্থকে ধারণ করে এবং নিজেরাও পরমেশ্বর কর্তৃক ধারণকৃত থাকে। সেই সময় মূল উপাদান পদার্থের সত্ত্বাদি তিনটি গুণও অব্যক্ত ও সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। পরব্রহ্ম অব্যক্ত কালতত্ত্বকে প্রেরিত, ব্যক্ত ও সক্রিয় করতেই সত্ত্বাদি তিনটি গুণ প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং অক্ষররূপ অবয়বগুলিও ব্যক্তভাব লাভ করে পদার্থকে মহত্তত্ত্বরূপ প্রদান করে। লক্ষণীয় যে সক্রিয় কালতত্ত্ব স্বয়ং সত্ত্ব ও রজস এই দুই গুণে যুক্ত থাকে, আর তার দ্বারাই প্রকৃতি পদার্থের তৃতীয় গুণ তমোগুণও সক্রিয় বা জাগ্রত হয়ে ওঠে। সেই অবস্থার নামই মহৎ তত্ত্ব।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(এষাম্, রশ্মিঃ, তিরশ্চীনঃ, বিততঃ, অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরি, স্বিত্, আসীত্) এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই এটি সেই সময় বিদ্যমান সকল ছন্দ রশ্মিতে বিস্তৃত হতে শুরু করে। এটি সমগ্র পদার্থের ভিতরে-বাইরে এবং উপরে-নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য হলো- “তীর্ণতমং ছন্দঃ। ত্রিবৃদ্ বজ্রস্তস্য স্তভনীতি বা। যৎ ত্রিরস্তভত্ তৎ ত্রিষ্টুভস্ত্রিষ্টুপ্ত্মিতি বিজ্ঞায়তে। (নিরু.৭.১২)”, “বলং বৈ বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (কৌ.ব্রা.৭.২; ৮.২)”, “ওজো বা ইন্দ্রিয়ং বীর্যং ত্রিষ্টুপ্ (ঐ.ব্রা.১.৫; ৮.২)।” এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো তীক্ষ্ণ রূপে দীর্ঘ দূরত্বে বিস্তৃত হয়ে অন্যান্য রশ্মিগুলোকে তিনভাবে বা তিন দিক থেকে ধারণ করে। এগুলো বিশেষ শক্তি ও তেজ দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে।

(রেতোধাঃ, আসन्, মহিমানঃ, আসन्) এই রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো বিশেষভাবে দীপ্তিময় ও শক্তিশালী হয় এবং এদের প্রভাবও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। (স্বধা, অবস্তাত্, প্রয়তিঃ, পরস্তাত্) এই ছন্দ রশ্মি এবং অন্যান্য ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে সকল রশ্মি নিজের-নিজস্ব শক্তি নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখে। এর অর্থ হলো, এই রশ্মিগুলো সূক্ষ্ম কণার উৎপাদনে নিজের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সেই কণাগুলোকে সৃষ্ট করতে সক্ষম নয়। যখন এই ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিগুলো উৎপন্ন হয়ে প্রচেষ্টাশীল হয়ে ওঠে, তখন সমস্ত ছন্দ রশ্মি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে যায়।

ভাবার্থ – এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হতেই পূর্বে বিদ্যমান পদার্থের বায়ব্য অবস্থায় সব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অন্যান্য ছন্দ রশ্মির উপরে-নিচে এবং সামনে-পীঠে সর্বত্র বিস্তৃত হয়। এই ত্রিষ্টুপ্ রশ্মিগুলো তীব্র তেজ ও শক্তি ধারণকারী এবং ব্যাপক প্রভাবশালী হয়। এই রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য রশ্মিগুলো নিজস্ব শক্তি বিশেষভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। ফলে মূল কণ ও ফোটন ইত্যাদির উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় না এবং সমগ্র পদার্থ সূক্ষ্ম শক্তি ও গতির সত্ত্বেও অন্ধকার, শীতলতা এবং নীরবতায় পূর্ণ থাকে। এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পর অন্যান্য সমস্ত রশ্মি আরও সক্রিয় হয়ে আগামী সৃষ্টিকে উৎপন্ন করতে শুরু করে। লক্ষ্যণীয় যে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার আগে অন্যান্য ছন্দ রশ্মিও নিজস্ব শক্তি, তেজ ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ থাকলেও তাদের ক্ষমতা এতটা নেই যে তারা আগ্নি তত্ত্ব অর্থাৎ বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় মূল কণ ও ফোটন তৈরি করতে পারে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(তিরশ্চীনঃ, এষাম্, বিততঃ, রশ্মিঃ) [তিরশ্চীনঃ তিরসুপপদে অঞ্ছু গতৌ ‘ঋত্বিক্’ ইতি ক্বিন্। ততঃ ‘বিভাষাঞ্ছেরদিস্ত্রিয়াম্’ ইতি স্বার্থে খঃ প্রত্যয়ঃ। (বৈদিক কোষ আ० রাজবীর শাস্ত্রী)। রশ্মিঃ অশ্নুতে ব্যাপ্নোতীতি রশ্মিঃ (উ.কো. ৪.৪৭)] সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে যে সকল প্রাণী থাকে, তাদের সকলের আচরণ নিয়ন্ত্রিত বা সুসংগঠিত হওয়ার উপযোগী স্বাভাবিক জ্ঞান সকল প্রাণীর মধ্যেই গোপন রূপে বিদ্যমান থাকে এবং তারই ভিত্তিতে তাদের আচরণ বিস্তৃত হয়। এর অর্থ হলো, প্রারম্ভে কোনো প্রাণীই না তো কারও নিয়ন্ত্রক হয়, না কেউ কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বাভাবিক জ্ঞানের দ্বারা এমন আচরণ করে, যেন সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে।

(অধঃ, স্বিত্, আসীত্, উপরী, স্বিত্, আসীত্) সেই সময় দুই প্রকার প্রাণীর জন্ম হয়। এক প্রকার প্রাণী অত্যন্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয় এদের মানুষ বা দেব বলা হয়। অন্য প্রকার প্রাণী পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি, যাদের মধ্যে বুদ্ধিতত্ত্বের পরিমাণ মানুষের তুলনায় অত্যন্ত অল্প। এদেরই যথাক্রমে উচ্চ ও নিম্ন যোনির জীব বলা হয়। (রেতোধাঃ, আসন্) এদের মধ্যে নিম্ন যোনির জীবেরা তাদের পূর্ববর্তী সৃষ্টিতে কৃত কর্মের সংস্কারকে বীজরূপে সঙ্গে নিয়ে আসে। এইভাবে তারা ভোগযোনির জীব নামে পরিচিত হয়।

(মহিমানঃ, আসন্) প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ার কারণে অত্যন্ত মহিমাসম্পন্ন হয়। তারা সকল প্রকার দুঃখ থেকে মুক্ত থাকে এবং নৈমিত্তিক জ্ঞান দ্রুতগতিতে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। (স্বধা, অবস্তাত্) যারা নিজেদের মধ্যে নানাবিধ কর্মের বীজ ধারণ করে, তারা প্রথমে পশ্বাদি যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে অথবা মানুষের তুলনায় নিম্নতর স্থানে জন্মায়। সেই সঙ্গে তাদের দেহও মানুষের দেহের তুলনায় নিম্নমানের পদার্থ দ্বারা ভূগর্ভে নির্মিত হয়। (প্রযতিঃ, পরস্তাত্) পশ্বাদি ছাড়া যে অন্যান্য জীব পরমাত্মার ব্যবস্থায় বিশেষ পুরুষার্থের জন্য জন্মগ্রহণ করে, তারা পশ্বাদি যোনির পর জন্মায়। তাদেরই দেব ও মানুষ বলা হয়। এদের দেহ পশ্বাদির দেহের তুলনায় উৎকৃষ্ট পদার্থ দ্বারা নির্মিত হয়। এদের কর্মযোনির জীব বলা হয়। পরবর্তী প্রজন্মে এই মানুষরাই উভয়যোনির জীব হয়ে ওঠে, কারণ তারা প্রথম প্রজন্মের তুলনায় কিছুটা দুঃখ ও দুর্গুণ দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে।

ভাবার্থ – সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে মানুষ ও পশ্বাদি সকল প্রাণী নিজ নিজ স্তরের স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সুসংগত ও সুশৃঙ্খল আচরণ করে। সেই প্রজন্মে হিংস্র ও মাংসাহারী প্রাণীর জন্ম হয় না, বরং সকল প্রাণীই শাকাহারী হয়। সিংহ, সাপ এবং অন্যান্য মাংসাহারী পশু ও কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি পরবর্তী কালে উৎপন্ন হয়। পশ্বাদি যোনি ভোগযোনি এবং মানুষের প্রথম প্রজন্ম উভয়যোনি নয়, বরং কেবল কর্মযোনি হয়, কারণ তারা ত্রিবিধ তাপ থেকে মুক্ত থাকে। ভোগযোনির পশ্বাদি জীব তাদের পূর্ব সৃষ্টির কর্ম অনুযায়ী জন্ম গ্রহণ করে, কিন্তু প্রথম প্রজন্মের মানুষ মুক্তি থেকে পুনরাগমনকারী হওয়ায় কোনো কর্মফল ভোগের জন্য নয়, বরং পুনরায় মুক্তির উদ্দেশ্যে পুরুষার্থ করার জন্য জন্ম গ্রহণ করে। মানুষের উৎপত্তি অন্যান্য প্রাণীর উৎপত্তির পর ঘটে। সকল প্রাণীই ভূগর্ভ থেকে যুবাবস্থায় উৎপন্ন হয়। ভূমির যে অংশে মানুষের জন্ম হয়, সেই অংশে জীবনীশক্তি পশ্বাদির জন্মস্থানের তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট হয়।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द- त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

को अ॒द्धा वे॑द॒ क इ॒ह प्र वो॑च॒त्कुत॒ आजा॑ता॒ कुत॑ इ॒यं विसृ॑ष्टिः । 

अ॒र्वाग्दे॒वा अ॒स्य वि॒सर्ज॑ने॒नाथा॒ को वे॑द॒ यत॑ आब॒भूव॑ ॥

কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্রবোচৎ কুত আজাতা কুত ইয়ং বিসৃষ্টিঃ ।
অর্বাগ্‌দেবাঃ অস্‌য বিসর্জনেনাথা কো বেদ যত আ বভূব ॥ ৬ ॥

এর ঋষি, দেবতা ও ছন্দ পূর্ববৎ হওয়ায় এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাবও পূর্ববৎই বুঝতে হবে।

আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) [অদ্ধা সত্যনাম (নিঘं. ৩.১০)। কঃ কো বৈ প্রজাপতিঃ (গো.উ.৬.৩), প্রাণো বাভ কঃ (জৈ.উ.৪.১১.২.৪), প্রজাপতির্বৈ কঃ (ঐ.ব্রা.২.৩৮; তৈ.সং.১.৬.৮.৫)] সৃষ্টির উৎপত্তির পূর্বে সমগ্র সৃষ্টির পালনকারী প্রকৃতি পদার্থ বা মনস্তত্ত্ব বিদ্যমান থাকে। সেই পদার্থকে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই জানেন। সেই প্রকৃতি পদার্থ নিত্য এবং সৃষ্টির তুলনায় মনস্তত্ত্বও নিত্যই।
(কঃ, ইহ, প্রবোচত্) এই অবকাশরূপ আকাশে বিদ্যমান প্রকৃতি পদার্থে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই বাক্‌তত্ত্বকে উৎপন্ন করেন। অন্যদিকে মনস্তত্ত্বে কালতত্ত্বরূপ প্রজাপতি বিভিন্ন ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করেন।

(কুতঃ আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই বহুবিধ সৃষ্টি কোথা থেকে জন্মায় এবং কার দ্বারা এর সৃষ্টি হয়—এই প্রশ্নের আধিদৈবিক ভাষ্যে প্রশ্নবাচক শব্দগুলির বিশেষ গুরুত্ব নেই। সুতরাং এর স্বাভাবিক অর্থ এই যে, এই সৃষ্টি প্রজাপতিরূপ প্রকৃতি থেকে জন্মায় এবং প্রজাপতিরূপ পরমাত্মার দ্বারাই সৃষ্টি হয়। এখানে উভয় প্রকার কারণ—উপাদান কারণ ও নিমিত্ত কারণ—উল্লেখিত হয়েছে। এখানে ‘জনী প্রাদুর্ভাবে’ ধাতুর প্রয়োগ নির্দেশ করে যে ‘কুতঃ’ শব্দটি প্রকৃতিরূপ উপাদান কারণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘সৃজ বিসর্গে’ ধাতুর প্রয়োগ প্রধান নিমিত্ত কারণ ঈশ্বরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এখানে ‘বি’ উপসর্গযুক্ত ‘সৃজ’ ধাতুর অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা অর্থাৎ নষ্ট করাও গ্রহণযোগ্য। এতে এই অর্থ আরও স্পষ্ট হয় যে সেই প্রজাপতি পরমাত্মাই এই সৃষ্টি নির্মাণ করে জীবদের জন্য তা ত্যাগ করে দেন, অর্থাৎ তাদের প্রদান করেন এবং সময় এলে তার প্রলয়ও করেন। এইভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি ও প্রলয়ের উভয় অবস্থারই এখানে বর্ণনা রয়েছে। (অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) এই সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়ায় দেব অর্থাৎ মনস্তত্ত্ব, বাক্‌তত্ত্ব ও প্রাণতত্ত্ব প্রভৃতি পদার্থ উৎপন্ন হয়। তার পরেই পঞ্চমহাভূতের উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলির বিষয়ে 

ঋষিদের উক্তি— মনো দেবঃ (গো.পূ.২.১১), বাগেব দেবাঃ (শ.ব্রা.১৪.৪.৩.১৩), প্রাণা দেবাঃ (শ.ব্রা.৬.৩.১.১৫), বাক্‌ চ বৈ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্ (ঐ.ব্রা.৫.২৩)। এদের দেব বলা হয়, কারণ সূক্ষ্ম বল ও দীপ্তির উৎপত্তি ক্রমান্বয়ে এই তত্ত্বগুলির থেকেই শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) [কঃ অন্নং বৈ কম্ (ঐ.ব্রা.৬.২১, গো.উ.৬.৩)। এখানে ‘কম্’-এর স্থানে ‘কঃ’-এর প্রয়োগ ছান্দস।] প্রকৃতি ও ঈশ্বরকে সৃষ্টির কারণ বলার সঙ্গে সঙ্গে এখানে আর যে কারণটি নির্দেশ করা হয়েছে, তা হলো—মূল পদার্থে সংযোজকত্ব গুণের উৎপত্তি। এটি ছাড়া সৃষ্টির নির্মাণ সম্ভব নয়। এর কারণেই সর্বত্র সৃজন প্রক্রিয়া শুরু ও পরিচালিত হয়। এই সমগ্র সৃজন ও পরিচালনা এবং সংযোজকত্বাদি গুণসমূহকে ঈশ্বরই জানেন, কারণ তিনিই এগুলিকে উৎপন্ন করেন।

ভাবার্থ – এই সৃষ্টির দুটি মূল কারণ আছে, যেগুলি থেকে সৃষ্টি উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম কারণ হলো প্রধান নিমিত্ত কারণ, অর্থাৎ এর কর্তা ঈশ্বর, যাঁর ব্যতীত মূল উপাদান কারণে কোনো আন্দোলন সম্ভব নয়। দ্বিতীয় কারণ হলো প্রকৃতিরূপ মূল উপাদান কারণ, যেখান থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি নির্মাণ করেন। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম মহৎ বা মনস্তত্ত্ব এবং বাক্‌ রশ্মিগুলি উৎপন্ন হয়। এই পদার্থগুলি থেকে কালক্রমে আকাশ মহাভূত, বায়ু মহাভূত, ফোটন এবং মূল কণার ক্রমান্বয়ে উৎপত্তি ঘটে। এই পদার্থগুলিতে, বিশেষত মনস্তত্ত্ব ও বাক্‌তত্ত্বে আকর্ষণ প্রভৃতি বলের উৎপত্তি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সৃষ্টির উৎপত্তি ও পরিচালনার বিজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে কেবল ঈশ্বরই জানেন।

আধিদৈবিক ভাষ্য ২-

(কঃ, অদ্ধা, বেদ, কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে প্রসিদ্ধ প্রাণতত্ত্ব সমগ্র পদার্থে বিদ্যমান ছিল। সেই পদার্থে সংঘটিত সকল ক্রিয়া ও বলসমূহকে কালতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণতত্ত্বই জানে। এই কারণেই সেই প্রাণতত্ত্ব ঐ পদার্থে নানা প্রকারের ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি করে, কিন্তু তারও প্রেরক কালতত্ত্বই হয়। এই কালতত্ত্বের মধ্যে পরমেশ্বরের বিজ্ঞান নিহিত থাকে, যার ফলে সমগ্র সৃষ্টিই বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংঘটিত হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) এই সৃষ্টি কোথা থেকে এসেছে, কোন পদার্থ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং কে একে রচনা করেছে—এর উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এই সৃষ্টি এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তিকালে বিদ্যমান বায়ব্য অবস্থান থেকেই উৎপন্ন হয় এবং প্রাণতত্ত্বই কালতত্ত্ব দ্বারা প্রেরিত হয়ে সূক্ষ্ম কণাগুলিকে নির্মাণ করতে শুরু করে।

(দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন, অর্বাক্) বিশেষভাবে রচিত বিভিন্ন লোকের উৎপত্তির পূর্বে দেব পদার্থ অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্বের উৎপত্তি হয় এবং অগ্নি তত্ত্ব তথা বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে আলো, উষ্ণতা ও স্থূল বলসমূহের উৎপত্তি শুরু হয়। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) তদনন্তর সংঘটিত সকল ক্রিয়াকেই কালতত্ত্ব এবং তদ্দ্বারা প্রেরিত প্রাণতত্ত্ব জানে, যার ফলে সমস্ত লোক-লোকান্তর, প্রাণীদের দেহ এবং বনস্পতি প্রভৃতি পদার্থ বিজ্ঞানসম্মতভাবে উৎপন্ন ও পরিচালিত হতে থাকে।

ভাবার্থ — সমগ্র সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত প্রাণতত্ত্ব কালতত্ত্বের প্রেরণায় যেমন সমগ্র সৃষ্টিকে উৎপন্ন করে, তেমনি প্রতিটি উৎপত্তি ও পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং তার বিজ্ঞানকেও সম্যকভাবে জানে। এই সৃষ্টি সেই প্রাণতত্ত্ব থেকেই উৎপন্ন হয় এবং যথাসময়ে তাতেই বিলীন হয়ে যায়। এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পর সর্বপ্রথম ফোটন ও মূলকণার উৎপত্তি হয়, তদনন্তর সেই মূলকণাগুলির মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ ও প্রতিকর্ষণ বলের উৎপত্তি হতে থাকে। বর্তমান বিজ্ঞান মূলকণা ও ফোটনের উৎপত্তি এবং তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ আধান ও ভরের ন্যায় গুণের উৎপত্তির বিজ্ঞান জানে না। সে এই বিষয়টিও বিবেচনা করে না যে, এই কণাগুলি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক পদার্থ নয়, বরং এদেরও পৃথক পৃথক অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে, যার ভিন্নতার কারণে কণাগুলিও ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।

আধিভৌতিক ভাষ্য -

(কঃ, অদ্ধা, বেদ) সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে কে বেদকে জানে—অর্থাৎ কেউই জানে না। সকল মানুষ উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞানের অধিকারী হলেও সত্য বিজ্ঞানস্বরূপ বেদের সঙ্গে পরিচিত থাকে না। (কঃ, ইহ, প্রবোচৎ) এই সৃষ্টিতে প্রজাপতিরূপ পরমাত্মাই সেই মানুষদের বেদের উপদেশ দেন। তাঁর উপদেশ প্রাপ্ত হয়ে অগ্নি প্রভৃতি চার ঋষি বেদমন্ত্রের অর্থ সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করে নেন। জ্ঞানপ্রাপ্তির এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ঘটে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিস্ময়কর বলেই প্রতীয়মান হয়। (কুতঃ, আজাতা, কুতঃ, ইয়ম্, বিসৃষ্টিঃ) বিভিন্ন যোনির অন্তর্গত প্রাথমিক প্রজন্মগুলি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়? তাদের বিকাশ কোথায় হয়? অর্থাৎ মানুষ, পশু-পাখি ও কীট প্রভৃতি প্রাণীর জন্ম কীভাবে এবং কোথায় হয়? অর্থাৎ তাদের ভ্রূণের বিকাশ কোন স্থানে ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তরও এখানেই নিহিত যে, এদের সকলের ভ্রূণের বিকাশ পৃথিবীর সেই গর্ভস্থানে হয়, যেখানে অন্ন, ঔষধি এবং তজ্জনিত উৎকৃষ্ট জীবনীশক্তিসম্পন্ন রসের প্রাচুর্য থাকে।

(অর্বাক্, দেবাঃ, অস্‌য, বিসর্জনেন) বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী ও উদ্ভিদের সৃষ্টির পর দেবদের—অর্থাৎ বিশেষ প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রাণী তথা মানুষের—সৃষ্টি হয়। এখানে মানুষকে দেব বলা হয়েছে, কারণ সে সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (অথ, কঃ, বেদ, যতঃ, আ, বভূব) যে ক্রম অনুসারে সকল প্রাণীর দেহ যৌবনাবস্থায় পৃথিবীর গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়, সেই সুবিন্যস্ত ক্রম কে জানে? এই প্রশ্নের উত্তরও এই যে, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কেবল ব্রহ্মই জানেন।

ভাবার্থ — সৃষ্টির প্রথম মানব প্রজন্ম অত্যন্ত উন্নত স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সহকারে উৎপন্ন হয়। তাদের সৃষ্টিবিদ্যা ও মোক্ষ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না। সেই সময় পরব্রহ্ম পরমাত্মা চারজন শ্রেষ্ঠতম মানুষকে—যারা ব্রহ্মাণ্ড থেকে বৈদিক ঋচাগুলি গ্রহণ করে থাকে—সেই বেদমন্ত্রগুলির অর্থ বিধিপূর্বক ও সম্পূর্ণরূপে অবগত করান। অর্থবোধের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত হয় এবং অন্তরীক্ষ থেকে বেদমন্ত্র গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত দ্রুতগতির হয়।

এই পৃথিবী এবং এর ন্যায় অন্যান্য লোকের ভূমি প্রারম্ভে অত্যন্ত কোমল ও জীবনীশক্তিসম্পন্ন তত্ত্বে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানে স্থানে স্থানে এমন গর্ভসদৃশ স্থান থাকে, যা মাতৃগর্ভের ন্যায় বিশুদ্ধ ভ্রূণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তিসম্পন্ন তরল পদার্থে পরিপূর্ণ থাকে। সেখানেই বিশেষ রাসায়নিক সংযোজনের দ্বারা ভ্রূণ বিকশিত হতে থাকে, যেখানে পরমাত্মার ব্যবস্থায় জীবাত্মাদের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম উদ্ভিদের, তারপর তাদের উপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর এবং সর্বশেষে মানুষের উৎপত্তি ঘটে। কোন জীবাত্মা কোন ভ্রূণে প্রবেশ করবে—এ কথা ঈশ্বর ব্যতীত আর কেউ জানে না।

ऋषि- प्रजापतिः परमेष्ठीदेवता- भाववृत्तम्छन्द  पादनिचृत्त्रिष्टुप्स्वर- धैवतः

इ॒यं विसृ॑ष्टि॒र्यत॑ आब॒भूव॒ यदि॑ वा द॒धे यदि॑ वा॒ न । 

यो अ॒स्याध्य॑क्षः पर॒मे व्यो॑म॒न्त्सो अ॒ङ्ग वे॑द॒ यदि॑ वा॒ न वेद॑ ॥ ৭

পদার্থ

(ইয়ং বিসৃষ্টিঃ) এই বিবিধ সৃষ্টি (যতঃ-আবভূব) যে উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়েছে (অস্য যঃ-অধ্যক্ষঃ) সেই উপাদানের যে অধিপতি (পরমে ব্যোমন্) মহান আকাশে অবস্থানরত (অঙ্গ) হে জিজ্ঞাসু! (সঃ) সেই পরমাত্মা (যদি বা দধে) যদি ইচ্ছা করেন তবে ধারণ না-ও করতে পারেন, অর্থাৎ সংহার করে দিতে পারেন (যদি বেদ) যদি উপাদান কারণকে জানেন, নিজের বিজ্ঞানে লক্ষ্য করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত করেন (যদি বা ন বেদ) যদি না জানেন স্বজ্ঞানে লক্ষ্য না করেন, সৃষ্টিরূপে পরিণত না করেন এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় সেই পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত পদার্থ)

ভাবার্থ

এই বিবিধ সৃষ্টি যে উপাদান-কারণ থেকে উৎপন্ন হয়, সেই উপাদান কারণ অব্যক্ত প্রকৃতির তিনি পরমাত্মা স্বামী-অধিপতি। তিনি তার দ্বারা সৃষ্টিকে উৎপন্ন করেন এবং তার সংহারও করেন। প্রকৃতিকে যখন লক্ষ্য করেন, তখন তাকে সৃষ্টির রূপে নিয়ে আসেন; যখন লক্ষ্য করেন না, তখন প্রলয় অবস্থায়ই থাকে। এইভাবে সৃষ্টি ও প্রলয় পরমাত্মার অধীন ॥৭॥ (ব্রহ্মমুনিজীকৃত ভাবার্থ)

Read More

03 January, 2026

বেদ বিজ্ঞান

03 January 0

 <<পূর্ববর্তী অংশ

বেদ বিজ্ঞান আলোক

অষ্টমোধ্যায়

সর্বপ্রথম এ কথা জানা আবশ্যক যে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ কী? মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ‘সত্যার্থপ্রকাশ’-এর সপ্তম সমুল্লাসে লিখেছেন—

“যখন বহু আত্মার মধ্যে বেদার্থের প্রকাশ হলো, তখন ঋষি-মুনিরা সেই অর্থ এবং ঋষি-মুনিদের ইতিহাসসহ গ্রন্থ রচনা করলেন। সেগুলির নাম ব্রাহ্মণ; অর্থাৎ ব্রহ্ম, যা বেদ—তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ হওয়ায় এদের নাম ব্রাহ্মণ হয়েছে।”

মহর্ষি দयानন্দের শিষ্য পণ্ডিত ভীমসেন শর্মা ‘অনুশ্রমোচ্ছেদন’ নামক গ্রন্থে—যা রাজা শিবপ্রসাদের উত্তরেরূপে রচিত হয়েছিল এবং যাকে পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার তাঁর ‘বৈদিক বাঙ্ময়ের ইতিহাস’ গ্রন্থের তৃতীয় ভাগের প্রথম অধ্যায়ে মহর্ষি দয়ানন্দ কর্তৃক পরিশোধিত বলেও উল্লেখ করেছেন—লিখেছেন—

“ব্রহ্মণাং বেদানামিমানী ব্যাখ্যানি ব্রাহ্মণানি”
(অর্থাৎ ঐতরেয় প্রভৃতি গ্রন্থ ব্রহ্ম অর্থাৎ বেদগুলির ব্যাখ্যা; এই কারণেই এদের নাম ব্রাহ্মণ রাখা হয়েছে।)

বিভিন্ন গ্রন্থের ইতিহাস ও তাদের শ্রেণিবিভাগের বিষয়ে আমি আমার পাঠকদের পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার রচিত ‘বৈদিক বাঙ্ময়ের ইতিহাস’-এর তৃতীয় ভাগ পাঠ করার পরামর্শ দিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস বিষয়টি কখনও আমার প্রধান আলোচ্য ছিল না; তাই সে বিষয়ে অধিকারসহ কিছু বিশেষ লেখার ক্ষেত্রে নিজেকে অক্ষম মনে করি। এটি একটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধান ও অধ্যয়নের বিষয়। আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ কেবল প্রাচীন বৈদিক বাঙ্ময়ের আধিদৈবিক ভৌত-বৈজ্ঞানিক দিকটি আলোকিত করার দিকেই নিবদ্ধ থাকবে। তবে এটুকু অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে চারটি বেদের যতগুলি ব্রাহ্মণ গ্রন্থ আছে, তাদের মধ্যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণই সর্বাধিক প্রাচীন।

পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ‘বৈদিক বাঙ্ময়ের ইতিহাস’ তৃতীয় ভাগে লিখেছেন চারটি বেদের প্রকাশ সৃষ্টিতে ঋষিগণের হৃদয়ে হয়েছিল। সেই সময় থেকেই ব্রহ্মা প্রভৃতি মহর্ষিরা ব্রাহ্মণগুলির প্রবচন আরম্ভ করেন। সেই প্রবচন কুল-পরম্পরা বা গুরু-পরম্পরায় সংরক্ষিত থাকে। এর সঙ্গে সময়ে সময়ে নতুন প্রবচনও যুক্ত হতে থাকে। সমগ্র প্রবচন মহাভারত কালে এই ব্রাহ্মণগুলির রূপে সংকলিত হয়। এই সমগ্র পরম্পরা ছিল অবিচ্ছিন্ন। … (পৃষ্ঠা ১০৩)। পণ্ডিতজী সর্বাধিক প্রাচীন ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সংকলনকাল মহাভারত কালের কাছাকাছি বলে মনে করেন।

পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসক ‘শ্রৌত-যজ্ঞ-মীমাংসা’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১৬৪-এ মহর্ষি মহিদাসের কাল মহাভারত যুদ্ধের প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৬৬১৫ বছর পূর্বের বলে মান্য করেছেন।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সংকলন মাতা ইতরার পুত্র মহর্ষি মহিদাস করেছিলেন। ইতরার পুত্র হওয়ায় তিনি ঐতরেয় মহিদাস নামে প্রসিদ্ধ হন। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সায়ণাচার্যের পূর্ববর্তী ভাষ্যকার ষড়্গুরু শিষ্যের মতে মহর্ষি মহিদাসের পিতা ছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য, যাঁর এক পত্নীর নাম ছিল ইতরা। এই যাজ্ঞবল্ক্য শatapath ব্রাহ্মণকার মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য থেকে ভিন্ন হতে পারেন, কারণ বৃহদারণ্যক উপনিষদে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের দুই পত্নী মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নীর উল্লেখ রয়েছে। অতএব ইতরার স্বামী যাজ্ঞবল্ক্য অন্য কেউ হবেন। যদিও পণ্ডিত ভগবদ্দত্তজী এটিকে ষড়্গুরু শিষ্যের কল্পনা বলেছেন, তবু তিনি ইতরার স্বামীর নাম সম্পর্কে কিছু লেখেননি। অস্তু।

প্রতিপাদ্য বিষয়

ঐতরেয় ব্রাহ্মণের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানের ভিত্তিতে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণ সম্পূর্ণরূপে আধিদৈবিক তত্ত্বসমূহকে প্রতিপাদনকারী একটি গ্রন্থ। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা শতপথ, কৌষীতকি, তৈত্তিরীয়, তাণ্ড্য, গোপথ, জৈমিনীয় উপনিষদ প্রভৃতি বহু ব্রাহ্মণ গ্রন্থের নির্বচন ও প্রকরণ উদ্ধৃত করে গভীরভাবে বিচার করেছি। এই প্রক্রিয়ায় আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে সকল ব্রাহ্মণ গ্রন্থেই সৃষ্টিবিদ্যার বিভিন্ন শাখা—যেগুলিকে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, অ্যাস্ট্রোনমি, পার্টিকল-নিউক্লিয়ার-অ্যাটমিক ফিজিক্স, সোলার ও প্লাজমা ফিজিক্স, কসমোলজি, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি, স্ট্রিং থিয়োরি ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন—সেসবের সমন্বিত ও …এমন অত্যুৎকৃষ্ট স্বরূপ এই মহান গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়, যার বহু গূঢ় রহস্য আজও বিকশিত পদার্থবিজ্ঞানের কল্পনার অতীত, আবার বহু বিষয়ে সে গভীর বিভ্রান্তিতে আবদ্ধ রয়েছে এবং বর্তমান বৈজ্ঞানিক জগৎ সেগুলি সমাধান করতে বিপুল শ্রম ও অর্থ ব্যয় করছে। আমরা এই গ্রন্থে মহর্ষি মহিদাসের মহান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করব। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে মোট পাঁচটি পঞ্চিকা রয়েছে, যেগুলিতে ৪০টি অধ্যায় আছে। পণ্ডিত ভগবদত্ত সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এর মধ্যে প্রথম ৩০টি অধ্যায় মহিদাস ঋষি এবং অবশিষ্ট ১০টি অধ্যায় মহর্ষি শ্রীণক কর্তৃক সংকলিত। এই সন্দেহ আমাদের যথার্থ বলেই প্রতীয়মান হয়। ৩৯তম অধ্যায়ের সূচনাতেই আমাদের এ বিষয়ে আভাস হয়েছিল।

আমরা কেবল যাজিক কর্মকাণ্ডে আবদ্ধ পৌরাণিক (কথিত সনাতনী) এবং কিছু অপরিপক্ব আর্য সমাজী বিদ্বানদেরও বলতে চাই যে ব্রাহ্মণ গ্রন্থ কেবল কর্মকাণ্ডের গ্রন্থ নয়। পণ্ডিত ভগবদত্তও তাঁর ‘বৈদিক বাঙ্ময়ের ইতিহাস’ দ্বিতীয় ভাগে লিখেছেন—

“ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির প্রধান বিষয় আধিদৈবিক তত্ত্বের বর্ণনা। এই আধিদৈবিক তত্ত্বের বর্ণনা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও প্রসঙ্গক্রমে আধ্যাত্মিক তত্ত্বও এসেছে।” (পৃষ্ঠা ১৪৩)

এর দ্বারা যেন কেউ এই অর্থ না করে নেয় যে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকার ঋষিরা আধ্যাত্মিক পুরুষ ছিলেন না। এই ব্রাহ্মণগুলির সংকলনকারীদের মধ্যেই কেউ কেউ উপনিষদেরও রচয়িতা, আর উপনিষদকে সমগ্র বিশ্বই আধ্যাত্মিক বিদ্যার গ্রন্থ হিসেবে মানে। তাহলে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকারদের আধ্যাত্মিক বিদ্যাহীন বলা কীভাবে সম্ভব? আমরা কি এতটুকুও বুঝি না যে কোনো মহান ঈশ্বরভক্ত যদি ভৌতিক বিজ্ঞান বা গণিতেরও বিশেষজ্ঞ হন এবং শ্রেণিকক্ষে এই বিষয়গুলি পড়ান অথবা সে বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন, তখন তিনি কেন ঈশ্বরভক্তির কথাকেই প্রধানতা দেবেন বা তার বিশেষ আলোচনা করবেন? বাস্তবত ঋষিরা মহান মন্ত্রদ্রষ্টা যোগী ছিলেন এবং সৃষ্টির বহু গূঢ় রহস্য শক্তিশালী যোগবল দ্বারা ঈশ্বরের সাক্ষাৎকালে অবগত হতেন। এই অন্তর্দৃষ্টিই তাঁদের সবচেয়ে বড় সাধন ছিল। ঈশ্বরবিশ্বাস, ধ্যান-মনন এবং নিষ্কাম পুরুষার্থের ফল কী হয়, তা ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছি। যারা নিজের যোগসাধনার দ্বারা শাস্ত্র বা সৃষ্টির গভীর রহস্য জানতে সক্ষম নন, তাঁদের অবশ্যই নিজের যোগসাধনা, ঈশ্বরবিশ্বাস, প্রতিভা এবং হৃদয়ের পবিত্রতার পর্যালোচনা করা উচিত। মনে রাখার বিষয় যে, যখন কোনো প্রতিভাসম্পন্ন চিন্তক ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বা বেদের মাধ্যমে সৃষ্টিবিজ্ঞানের উপর চিন্তা করেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব, তাঁর কার্যপ্রণালী এবং ক্রিয়াবিজ্ঞান তাঁর কাছে প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয়। এমন অনুভূতি তাদের কখনোই হতে পারে না, যারা সৃষ্টিবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত নয়। যে বিদ্বান সৃষ্টিবিজ্ঞানের যত গভীরে প্রবেশ করবেন, তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও স্বরূপকে তত গভীরভাবে জানতে পারবেন। এই কারণে এই দুই বিদ্যাকে অসংযুক্ত মনে করা নিতান্তই অজ্ঞতা বা মূর্খতা।

প্রশ্ন— বিভিন্ন ব্রাহ্মণ গ্রন্থে সোমযাগ প্রভৃতির যে বর্ণনা শোনা যায়, আপনি তা কেন গ্রহণ করেন না? আশ্বলায়ন শ্রৌতসূত্র প্রভৃতি গ্রন্থেও বিভিন্ন শ্রৌত-যজ্ঞের বর্ণনা রয়েছে; তাহলে এই গ্রন্থগুলি থেকে আপনার দ্বারা উপরিউক্ত পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা—যেগুলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখর বলে মানা যায়—উদ্ধার করার প্রচেষ্টা কি নিছক একপ্রকার উদ্ভট আসক্তি নয়? হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা শ্রৌত-যজ্ঞের পরম্পরাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে বৈদিক বাঙ্ময়ের রক্ষা কীভাবে হবে? যে অগ্নিহোত্রকে ভগবান মনু মহারাজ সন্ন্যাসী ব্যতীত সকল আশ্রমস্থ নারী-পুরুষের পরম কর্তব্য বলেছেন এবং যে যজ্ঞ সম্পর্কে মহর্ষি দয়ানন্দ সত্যার্থপ্রকাশ-এ লিখেছেন—
“আর্যবর শিরোমণি মহাশয় ঋষি-মহর্ষি, রাজা-মহারাজারা বহু হোম করতেন ও করাতেন। যতদিন হোম করার প্রচার ছিল, ততদিন আর্যাবর্ত দেশ রোগমুক্ত ও সুখে পূর্ণ ছিল। এখনো যদি প্রচার হয়, তবে তেমনই হয়ে যাবে।” (তৃতীয় সমুল্লাস, পৃষ্ঠা ৪৩)
এতসব সত্ত্বেও আপনি কর্মকাণ্ডকে নিরর্থক বলছেন।

উত্তর— এর সমাধানের জন্য সর্বপ্রথম এই বিষয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন যে যজ্ঞসমূহ—যেগুলিকে গীতা ৪.২৮-এ দ্রব্য-যজ্ঞ বলা হয়েছে—তার প্রচলন কবে থেকে শুরু হয়েছিল? এই বিষয়ে আর্য বিদ্বান পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসকের বক্তব্য হলো—

আপ্তদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত দ্বারা পরীক্ষা করাকে বলা হয়—যে যে সত্যবাদী, সত্যকর্মকারী, সত্যমানী, পক্ষপাতহীন, সকলের হিতৈষী বিদ্বান্ সকলের সুখের জন্য প্রচেষ্টা করেন, সেই ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিরাই ‘আপ্ত’ নামে অভিহিত হন। তাঁদের উপদেশ, ভিত্তিগ্রন্থ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে যা সঙ্গতিপূর্ণ, তা সত্য এবং যা বিরুদ্ধ, তা মিথ্যা। আত্মা দ্বারা পরীক্ষা করাকে বলা হয়—যা যা নিজের আত্মা নিজের জন্য কামনা করে, তাই সকলের জন্য কামনা করা এবং যা যা নিজের জন্য কামনা করে না, তা কারও জন্যই কামনা না করা। যেমন আত্মার মধ্যে, তেমনই মনে; যেমন মনে, তেমনই ক্রিয়ায়—এইরূপ হওয়াকে জানবার ইচ্ছা, শুদ্ধ ভাব এবং বিদ্যার চক্ষু দিয়ে দেখে সত্য ও অসত্যের নির্ণয় করা উচিত। এই পাঁচ প্রকার পরীক্ষার দ্বারা পাঠকারী-পাঠক এবং সকল মানুষ সত্যাসত্যের সিদ্ধান্ত করে ধর্ম গ্রহণ ও অধর্ম ত্যাগ করুক এবং করাক।।

মহর্ষি দयानন্দ তাঁর ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকায় ‘বেদবিষয়বিচার’ নামক অধ্যায়ে নিরুক্ত ১৩.১২-এর প্রমাণ প্রদান করে বেদার্থকারী ব্যক্তির যোগ্যতা সম্বন্ধে লিখেছেন—
“নেতে শ্রুতিতঃ শ্রবণমাত্রেণৈব তর্কমानेণ চ পৃথক্-২ মন্ত্রার্থা নির্বক্তব্যাঃ। কিন্তু প্রকরণানুকূলতয়া পূর্বাপর সম্পর্কেণৈব নিতরাং বক্তব্যাঃ। কিঞ্চ নৈবেলেষু মন্ত্রেষ্ট্নৃষেরতসো’শুদ্ধান্তঃকরণস্য বিদুষঃ প্রত্যক্ষ জ্ঞান ভবতি। ……”
অর্থাৎ, বেদের ব্যাখ্যা বিষয়ে এমন বোঝা উচিত যে যতক্ষণ না সত্যপ্রমাণ, সুযুক্তি, বেদের শব্দসমূহের পূর্বাপর প্রকরণ, ব্যাকরণাদি বেদাঙ্গ, শতপথাদি ব্রাহ্মণগ্রন্থ, পূর্ব মীমাংসা প্রভৃতি শাস্ত্র এবং অন্যান্য শাস্ত্রের যথাযথ বোধ না হয়; এবং পরমেশ্বরের অনুগ্রহ, উত্তম বিদ্বানদের শিক্ষা ও সঙ্গ লাভ করে পক্ষপাত ত্যাগপূর্বক আত্মশুদ্ধি না হয়; এবং মহর্ষিদের লিখিত ব্যাখ্যাগুলি না দেখা হয়—ততক্ষণ বেদের অর্থের যথাযথ প্রকাশ মানুষের হৃদয়ে হয় না। অতএব সকল আর্য বিদ্বানের সিদ্ধান্ত এই যে, প্রত্যক্ষাদি প্রমাণসমন্বিত যে তর্ক, সেইই মানুষের জন্য ঋষি।

এখানে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে—
১. ব্যাকরণাদি শাস্ত্রে পণ্ডিত হওয়া
২. প্রকরণবিদ হওয়া
৩. ঋষি হওয়া
৪. তপস্বী হওয়া
৫. শুদ্ধ অন্তঃকরণযুক্ত হওয়া—অর্থাৎ ঈর্ষা, দ্বেষ, রাগ, কাম, ক্রোধ, মোহ, অহংকার, পক্ষপাত, মিথ্যা, ছল-কপট প্রভৃতি থেকে মুক্ত হওয়া
৬. প্রমাণসমূহের জ্ঞান থাকা
৭. পরমাত্মার প্রতি সমর্পিত ধর্মাত্মা হওয়া, যাতে পরমেশ্বরের অনুগ্রহ লাভ হয়; কখনো কখনো প্রারব্ধবশত সামর্থ্যহীনও হতে পারে, তখন প্রারব্ধও অনুকূল হওয়া
৮. মহর্ষি ভগবন্তদের ব্যাখ্যানসমূহের জ্ঞান থাকা

এই বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে ‘ব্যবহারভানু’-এর প্রকরণও যুক্ত করে দেখা উচিত। পুনরায় ভগবান্ মনু মহারাজের বচনও দেখা যাক—

অর্থকামেষ্বসক্তানাং ধর্মজ্ঞানং বিধীয়তে।
ধর্মজিজ্ঞাসমানানাং প্রমাণং পরমং শ্রুতিঃ।। (মনুস্মৃতি ২.১৩)

অর্থাৎ, যে বিদ্বান্ ধনৈশ্বর্যে আসক্ত এবং ইন্দ্রিয়জয়হীন, তার কখনোই শাস্ত্রজ্ঞান হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আজ সমগ্র বিশ্বেই এই অবগুণগুলির তাণ্ডব চলছে। গুরুমুখ পরম্পরায় শ্রাবাধ্যয়নের রীতি চলছে; কিন্তু এই সকল ব্যসনের জালে যদি গুরু-শিষ্য উভয়েই আবদ্ধ থাকে, তবে শাস্ত্র কোথায় রক্ষা পাবে? আজ ধন, পদ, প্রতিপত্তির আসক্তি থেকে কে মুক্ত আছে? এই কারণেই শাস্ত্রচর্চার শব্দ শোনা যায়, কিন্তু শাস্ত্রের বিজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেছে।

এখানে আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—নিরুক্তকার মহর্ষি যাস্ক ‘ঊহা’-কে মহান এবং তর্ককে ঋষি বলেছেন এবং বেদার্থকারীর যোগ্যতার প্রকরণেই এই কথা বলেছেন; তবুও এই বিষয়ে কথিত বিদ্বানরা কখনো আলোচনা করেন না। গুরুকুল বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাধি সংগ্রহকারীরা যোগ্যতার প্রমাণ চান, কিন্তু নিরুক্তের এই অন্তিম সারভূত বিষয়টি গোপন করে রাখেন, যেখানে ঊহা ও তর্ককে অপরিহার্য বলা হয়েছে। এগুলি ছাড়া নিরুক্তের এই প্রকরণই অর্থহীন হয়ে যায়। এই ঊহা ও সুযুক্তির ক্ষমতা পরমাত্মার কৃপা ও শুদ্ধ অন্তঃকরণ থেকেই উৎপন্ন হয়। এর ফলেই মানুষ ঋষি, দেব, বিজ্ঞানী ইত্যাদি কত কী হতে পারে। ঊহা ব্যতীত না শব্দের যৌগিক অর্থ উদ্ভাসিত হয়, না প্রকরণই স্পষ্ট হয়।

এখানে আমরা প্রকরণ-দেবতা ও যৌগিক অর্থ জানার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বিবেচনা করি—

(৯) প্রকরণজ্ঞানেই ঊহার অপরিহার্যতা—নিরুক্তকারের মতে বেদার্থে প্রকরণজ্ঞান অপরিহার্য। প্রকরণজ্ঞান ব্যতীত এদিক-ওদিক থেকে কিছু উদ্ধৃতি নিয়ে বৈদিক বিদ্যার উপর অনুসন্ধান করা মানে বৈদিক বাঙ্‌ময়ের প্রতি অবিচার করা। বর্তমানকালে বেদ বিষয়ে যে অনুসন্ধান যত্রতত্র শোনা যাচ্ছে, তা এইরূপই। কোনো একটি গ্রন্থের অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক ভাষ্য করার প্রচেষ্টা এখনও হয়নি।

টুকরো-টুকরো করে অর্থ করলে প্রকরণের জ্ঞান কীভাবে সম্ভব হতে পারে? এখন আমরা এটাও বলতে চাই যে প্রকরণজ্ঞান কোনো সহজ কাজ নয়। কোনো বেদ, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ইত্যাদির প্রথম মন্ত্র বা কণ্ডিকার প্রকরণ কীভাবে জানা যাবে, যখন তার পূর্বে কিছুই নেই? প্রকৃতপক্ষে ঊহা ও তর্ক ব্যতীত প্রকরণজ্ঞান অসম্ভব। ঊহা ও তর্কে সম্পন্ন প্রজ্ঞাবান এবং নির্মল অন্তঃকরণযুক্ত ব্যক্তি গ্রন্থের যে কোনো অংশের প্রকরণ অনায়াসেই জানতে সক্ষম হতে পারেন। আমাদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণে কোথাও প্রকরণ জানার জন্য গভীর চিন্তা প্রায় করতে হয়নি। সমগ্র ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ব্যাখ্যানে অনায়াসেই প্রকরণ-সঙ্গতি স্বয়ং ঈশ্বরকৃপায় মিলতে থেকেছে।

(২) দেবতাজ্ঞানে ঊহা ও তর্কের অপরিহার্যতা—বেদ বা ব্রাহ্মণ গ্রন্থের ভাষ্য করতে গেলে সেই ব্রাহ্মণে উল্লিখিত বিভিন্ন বেদমন্ত্রের দেবতার জ্ঞান অপরিহার্য হয়। বেদ ও ব্রাহ্মণের গভীর আধিদৈবিক রহস্য এবং সৃষ্টিবিজ্ঞান বুঝতে বৈদিক ঋষি ও ছন্দেরও গভীর জ্ঞান অপরিহার্য। এই সমস্ত জ্ঞানের জন্য ঊহা ও তর্কের অপরিহার্যতা রয়েছে। বিষয়টি এইভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরা যাক কোনো মন্ত্রের দেবতা ‘অগ্নি’। তখন ‘অগ্নি’ শব্দের বেদার্থ নির্ণয়ের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বহু অর্থ সম্ভব—যেমন পরমাত্মা, জীবাত্মা, রাজা, বিদ্বান, সেনাপতি, আগুন, বিদ্যুৎ, চুম্বক, অন্যান্য আলোজাত শক্তি ইত্যাদি। তাহলে এদের মধ্যে কোন অর্থটি গ্রহণ করা হবে? এই জ্ঞান কেবল ঊহা ও তর্ক দ্বারাই সম্ভব।

এই বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ সত্যার্থপ্রকাশের প্রথম সমুল্লাসে লিখেছেন—
“যেখানে-যেখানে স্তুতি, প্রার্থনা, উপাসনা, সর্বজ্ঞ, ব্যাপক, শুদ্ধ, সনাতন এবং সৃষ্টিকর্তা প্রভৃতি বিশেষণ লিখিত আছে, সেখানে-সেখানে এই নামগুলির দ্বারা পরমেশ্বরকেই গ্রহণ করা হয় …
… যেখানে-যেখানে উৎপত্তি, স্থিতি, প্রলয়, অল্পজ্ঞ, জড়, দৃশ্য প্রভৃতি বিশেষণ লিখিত থাকে, সেখানে-সেখানে পরমেশ্বরের গ্রহণ হয় না। …
যেখানে-যেখানে ইচ্ছা, দ্বেষ, প্রচেষ্টা, সুখ, দুঃখ এবং অল্পজ্ঞাদি বিশেষণ থাকে, সেখানে-সেখানে জীবের গ্রহণ হয়।”

এই বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য, কিন্তু এখানেও তর্ক ও ঊহার অপরিহার্যতা রয়েছে। যখন উৎপত্তি-নাশ প্রভৃতি গুণযুক্ত কোনো শব্দ দ্বারা অগ্ন্যাদি কোনো পদার্থ গ্রহণ করতে হয়, তখন অগ্নি নামযুক্ত বিদ্যুৎ, উষ্ণতা, চুম্বক, আলো ইত্যাদির মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা হবে, তা কেবল নিজের ঊহা ও প্রতিভার দ্বারাই সম্ভব। এখানে কোনো শাস্ত্র বা গুরু সরাসরি সাহায্য করতে পারবেন না। শাস্ত্র ও প্রতিভাসম্পন্ন গুরু কেবল ইঙ্গিত দিতে পারেন, কিন্তু উচ্চ প্রতিভা ছাড়া তা বোঝা সম্ভব নয়। যেমন ঊহা ও তর্কযুক্ত প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিই মহান বিজ্ঞানী হতে পারেন, তেমনি এমন ব্যক্তিই বৈদিক বিজ্ঞানী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।

(৩) যোগিক অর্থজ্ঞানে ঊহা ও তর্কের প্রয়োজন—এক্ষেত্রেও ঊহা ও তর্কের অপরিহার্যতা থাকে। ধরা যাক ‘গো’ একটি শব্দ। এর রূঢ়ার্থ হলো—গরু নামক এক পশু। কিন্তু যোগিক অর্থে এটি কিরণ, পৃথিবী, বাণী ইত্যাদিও নির্দেশ করে। আচার্য সায়ণ প্রভৃতি তাঁদের ভাষ্যসমূহে—সে বেদভাষ্য হোক বা ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থের ভাষ্য—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রূঢ়ার্থেরই ব্যবহার করেছেন। আচার্য সায়ণ তাঁর ভাষ্যে আর্ষ প্রমাণের প্রচুর ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তিনি সেই প্রমাণগুলির ভাব কোথাও উপলব্ধি করেননি; ফলে সেই প্রমাণ ব্যবহারের পরেও ভাষ্য রূঢ়ার্থেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। অপরদিকে মহর্ষি দयानন্দ আর্ষ প্রমাণ তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তিনি সেই প্রমাণগুলির বৈজ্ঞানিকতা ও যোগিকতাকে ভালোভাবে বুঝে তাদের প্রয়োগ করেছেন। এটাই এই দুই ভাষ্যকারের মধ্যে মূল পার্থক্য।

এই পার্থক্য কেন? আমরা কি কখনো তা ভেবে দেখেছি? মহর্ষি ছিলেন এক সত্য যোগী এবং একই সঙ্গে প্রতিভা, ঊহা ও তর্কে সম্পন্ন, সম্পূর্ণ নির্মলচিত্ত প্রজ্ঞাবান পুরুষ। এই কারণেই তিনি বেদের মর্ম বুঝতে পেরেছিলেন; কিন্তু সময়ের অভাবে তিনি নিজের কাজ সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শেষ করতে পারেননি।

আজ বহু বৈয়াকরণ বা নিরুক্তবিদ ব্যুৎপত্তি ও নির্বচনে অত্যন্ত দক্ষ—এবং তা হওয়াও উচিত—কিন্তু ঊহা ও তর্কের অভাব বা স্বল্পতার কারণে তারা কেবল শব্দের জালই বুনে চলেন। কেউ কেউ অত্যন্ত গূঢ় ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারলেও, বাচকদের আশয় না বুঝে বাচ্য অর্থাৎ প্রকৃত পদার্থ থেকে দূরেই থেকে যান। এই কারণেই আজ পর্যন্ত এই আর্ষ পঠন-পাঠনের পরম্পরাও বৈদিক বিদ্যার প্রকৃত আলো দিতে পারেনি।

প্রকৃতপক্ষে, যতক্ষণ না তর্কের ঋষি ও ঊহার ব্রহ্মা একসঙ্গে উপস্থিত হন, পবিত্র অন্তঃকরণ না থাকে এবং সকল ঐষণা ত্যাগ না হয়, ততক্ষণ ঈশ্বরীয় কৃপা লাভ সম্ভব নয়।

আশ্চর্য এই যে, আমাদের বিদ্বানরা ‘গো’ শব্দের ব্যুৎপত্তি ও নির্বচন নিয়েই শাস্ত্রার্থ করতে থেকেছেন, অথচ ‘গো’ শব্দবাচক যে ‘গাভী’ নামক পশু, তাকে দেখা ও জানা পর্যন্ত হয়নি; তাহলে তার দুধ ও ঘৃতই বা কীভাবে পাওয়া যাবে? অপরদিকে যারা গাভীকে Cow বলে, তারা কখনো Cow শব্দের ব্যুৎপত্তি ও নির্বচন নিয়ে চিন্তাই করে না; কিন্তু তারা Cow পালন করে, দুধ ও ঘৃত গ্রহণ করে পুষ্ট হচ্ছে। এই কারণেই শাস্ত্রজ্ঞদের দুরবস্থা ঘটছে। তারা বিজ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, আর আমরা বাক্‌জালকেই পাণ্ডিত্য বলে মনে করছি। এখানে ঊহা ও তর্করূপী ঋষির শুধু স্বল্পতাই নয়, অভাবই রয়েছে।

এখন প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির অস্তিত্বের প্রশ্নে আমার মত এই যে, ঐতরেয় ব্রাহ্মণের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানের ভিত্তিতে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি—এই মহান ও আশ্চর্য গ্রন্থে একটি শব্দও প্রক্ষিপ্ত নয়। আমি সম্পূর্ণ গ্রন্থের সফলভাবে ব্যাখ্যান করেছি। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, অন্যান্য ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ও ১১টি উপনিষদে যদি কিছু প্রক্ষিপ্ত অংশ থেকেও থাকে, তবে তা খুবই অল্প। রামায়ণ, মহাভারতের মতো ঐতিহাসিক গ্রন্থে, মনুস্মৃতি প্রভৃতিতে প্রক্ষিপ্ত অংশ অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে প্রচলিত ১৮টি মহাপুরাণ ও অন্যান্য পুরাণ, উপপুরাণ, স্মৃতি, অন্যান্য উপনিষদাদি গ্রন্থ মহর্ষিদের নামে কল্পিতই; এর মধ্যে একটি গ্রন্থও সম্ভবত এক ব্যক্তির রচনা নয়। সময়ে সময়ে এগুলিতে সংযোজন ঘটেছে। ষড়দর্শনের মধ্যে কোথাও কোথাও (বিশেষত সাংখ্যদর্শনে) প্রক্ষিপ্ত অংশ পেয়েছি, আবার কোথাও কোথাও যোগদর্শনের ব্যাসভাষ্যেও কিছু প্রক্ষিপ্ত অংশ বলে মনে হয়। কল্পিত পুরাণগুলির মধ্যে বায়ু, মত্স্য, ব্রহ্মাণ্ড, বিষ্ণু প্রভৃতি কিছু পুরাণ উপযোগী বটে, কিন্তু আর্ষ গ্রন্থগুলির মতো প্রামাণিক নয়। শ্রীমদ্ভাগবত, ব্রহ্মবৈবর্ত, শিবপুরাণ, ভবিষ্যাদি কিছু পুরাণ বহু পাপের ভাণ্ডার; যদিও তাতে কিছু বিদ্যা ও ইতিহাসের কথা আছে। এদের যে কঠোর সমালোচনা ভগবদ্যানন্দ স্বামীকে করতে হয়েছে, তা অত্যন্ত যথার্থ ও প্রয়োজনীয়।

আমাদের এই দৃঢ় মতও আছে যে, আয়ুর্বেদের শীর্ষ গ্রন্থ চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতায় মাংসাহারের প্রकरण সম্পূর্ণরূপে প্রক্ষিপ্ত এবং বাজীকরণ সম্পর্কিত প্রकरणও কিছু সীমা পর্যন্ত প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয়। এই প্রकरणগুলি ঋষিদের বৈদিক মর্যাদা ও বিজ্ঞানের বিরোধী। মহান আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ঈশ্বর-সাক্ষাৎকৃত ঋষিদের কাছ থেকে এমন প্রত্যাশা করা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত আজ পর্যন্ত কোনো আর্য বিদ্বানই এ বিষয়ে কখনো চিন্তা করেননি এবং মহর্ষি দয়ানন্দ সম্ভবত সময়াভাবে এ বিষয়ে কিছু লেখেননি—ইতি।

প্রশ্ন—আপনি যে প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির কথা বলছেন বা যে শাস্ত্রগুলিকে কল্পিত ও অনর্থক বলছেন, সেই প্রক্ষিপ্তকার বা কল্পিত শাস্ত্রকারদের উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা তো সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণের বিদ্বানই ছিলেন; তাহলে কেন তারা অশ্লীলতা, হিংসা, পশুবলি, মদ্যপান ইত্যাদি গ্রন্থে প্রক্ষিপ্ত করলেন বা এমন এখন এই প্রশ্ন যে, এমন অপরাধী লেখক ও গ্রন্থকারদের উদ্দেশ্য কী ছিল? কেন তারা দেশ ও বিশ্ব থেকে বৈদিক মতের আদর্শ মুছে ফেলতে চাইছিল?

এই বিষয়ে আমাদের মত হল—বেদ ও ব্রাহ্মণাদি আর্ষ গ্রন্থগুলির যোগিক শৈলী বুঝতে না পারার কারণে সংস্কৃত ভাষার কিছু পণ্ডিত নিজেদের অজ্ঞতার ফলে অথবা ঊহা ও তর্কের অভাবে এই পবিত্র গ্রন্থগুলিতে উপর্যুক্ত সমস্ত পাপের পোষক বলে প্রতীয়মান সংকেত দেখতে পেয়েছিলেন। এমন পণ্ডিতরা ওই গ্রন্থগুলির প্রতি শ্রদ্ধা তো রাখতেনই, কিন্তু সেগুলি বুঝতেন না। তারা নির্মলচিত্ত ও যোগীও ছিলেন না। এই কারণে তারা নিজেদের মনগড়া চিন্তা থেকে রামায়ণ, মনুস্মৃতি ও মহাভারত প্রভৃতি সহজ ভাষার এবং জনসমাজে অধিক প্রচলিত গ্রন্থগুলিতে এই পাপসমর্থক বহু প্রकरण প্রক্ষিপ্ত করে দিলেন, আবার কিছু নতুন কল্পিত গ্রন্থ রচনা করে বামমার্গ নামে এক বিকৃত মতের সূচনা করলেন। এই দুষ্ট বামমতের ব্যাপক প্রচারের ফলে কালের প্রবাহে বেদ, মনুস্মৃতি, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ও যজ্ঞাদির পবিত্র স্বরূপের স্থানে অত্যন্ত দূষিত স্বরূপ প্রচারিত হয়ে গেল।

কিছু সময় পরে এর বিরুদ্ধে মহাবীর স্বামী, গৌতম বুদ্ধ প্রমুখ পবিত্রাত্মারা অহিংসা, ব্রহ্মচর্য, সত্য প্রভৃতি প্রাচীন বৈদিক আদর্শকে নতুন রীতিতে প্রচার করে বামমার্গের খণ্ডন করেন। বেদের বিষয়ে তারা বিশেষত মৌন অবলম্বনই রেখেছিলেন, কারণ বেদের যথার্থ অর্থ তাদের বোধগম্য হয়নি এবং যে দূষিত নকল স্বরূপ প্রচলিত ছিল, তা তাদের নির্মল আত্মা গ্রহণ করেনি। এই মহাপুরুষদের দেহাবসানের পর তাদের অনুসারীরা শুধু বামমতেরই খণ্ডন করেননি, বরং বেদাদি শাস্ত্রেরও কঠোর খণ্ডন করতে গিয়ে পতিত ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধেও প্রবল বিরোধিতা করেছেন। শোনা যায়, তারা বৈদিক সাহিত্যেরও বিপুল ক্ষতি সাধন করেছিলেন। আমাদের মতে, আর্ষ গ্রন্থগুলিকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে তারাও তাতে কিছু বিকৃত প্রক্ষিপ্ত সংযোজন করে থাকতে পারেন।

আমাদের মতে প্রক্ষিপ্ত বিষয়গুলোকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—

১. যেখানে পশুবলি, মাংসাহার, নরবলির কথা, মদ্যপান, ব্যভিচার ইত্যাদির উল্লেখ আছে, সেগুলি কিছু প্রাথমিক বামমার্গীদের শাস্ত্রীয় অজ্ঞতার ফলে করা প্রক্ষিপ্ত বলে মানা যায়, আর তাদের পরবর্তী বামমার্গীদের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্ষিপ্ত করা হয়েছে বলেও ধরা যায়।

২. যেখানে ঋষি, বৈদিক ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় রাজাদের দ্বারা দুরাচার, নিষ্ঠুরতা, ছোঁয়াছুঁয়ি, শোষণ ইত্যাদির আলোচনা আছে—যেমন ভগবান শ্রী রাম কর্তৃক ভগবতী সীতার ত্যাগ, নিরপরাধ তপস্বী শম্বূকের বধ, মহর্ষি গৌতমের ধর্মপত্নী অহিল্যার পতন, দেবরাজ ইন্দ্র, মহাদেব শিব, ভগবান বিষ্ণু, মহর্ষি ব্রহ্মা, মহর্ষি বিশ্বামিত্র প্রমুখের দুরাচার, ঋষি ও রাজাদের মাংসাহার ও শিকার খেলা, ভীভৎস ও অশ্লীল মিথ্যা অশ্বমেধ যজ্ঞের নিষ্ঠুর রূপ, দ্রোণাচার্যের দ্বারা একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলি কর্তন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের পতিব্রতা স্ত্রী দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী থাকা, পবিত্র মাতা দেবী কুন্তীর দ্বারা কুমারী অবস্থায় কর্ণের জন্ম, পরম যোগেশ্বর ভগবান কৃষ্ণের রাসলীলা, মাখনচুরি, গোপীদের সঙ্গে দুষ্কর্ম, রাধার সঙ্গে কুকর্ম ইত্যাদি—এইসব প্রপঞ্চ ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ও তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী বামমার্গী বেদবিরোধী মতাবলম্বী কিছু আচার্যের কুকৃত্য হতে পারে। আমাদের মত হল, বেদমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোনো ব্রাহ্মণ, যদিও প্রকৃত স্বরূপ না জেনে নিজে এসব পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবু নিজের পূর্বপুরুষদের এইভাবে কলঙ্কিত করতে পারে না। আলাদা কথা যে বর্তমানে এই গ্রন্থগুলির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কথিত পণ্ডিত বা সাধারণ মানুষ এসব পাপকে মহাপুরুষদের জন্য পাপ বলেই মনে করেন না, কিংবা এই পাপপোষক প্রकरणগুলিকে প্রক্ষিপ্ত বলার সাহস রাখেন না। এই কারণে নিজেদের মহাপুরুষদের নিন্দা করা বা নিন্দা শোনা তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. যেখানে ছোঁয়াছুঁয়ি, শুদ্ধ-অশুদ্ধের নামে নারী নির্যাতন, জন্মগত ব্রাহ্মণের অতিরিক্ত প্রশংসা, গুরুকে পরমাত্মার থেকেও বড় বলে অতিশয় প্রশংসা ইত্যাদি প্রकरण আছে, সেখানে সেসব প্রক্ষিপ্ত ভগবান মনু নির্দিষ্ট মনুস্মৃতির মূল তত্ত্ব না বোঝা কথিত ব্রাহ্মণদের পাপ। এই ধরনের নকল ব্রাহ্মণরাই এই ভারতবর্ষের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বিশ্বকে বিপুল ক্ষতি করেছে।

৪. যেখানে সৃষ্টিক্রমবিরোধী অবান্তর কল্পনার কথা আছে—যেমন মহাবীর হনুমানের শৈশবে সূর্যকে মুখে নেওয়া, মহাবৈজ্ঞানিক মহর্ষি অগস্ত্য কর্তৃক সমুদ্র পান করা, কোনো রাক্ষসের পৃথিবী নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, বরাহ অবতারে পৃথিবী উদ্ধার ইত্যাদি—এই বিষয়ে আমাদের মত হল, কোথাও বৈদিক আখ্যান না বুঝে অজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দ্বারা মিথ্যা কাহিনি রচিত হয়েছে, আবার কোথাও পূর্বপুরুষদের অতিশয় অলৌকিক প্রমাণ করে তাদের প্রতিমাপূজা থেকে ফুল-ফল, অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জন করাই উদ্দেশ্য ছিল।

৫. কিছু প্রক্ষিপ্তকার এমনও হতে পারে, যারা স্বভাবতই মদ-মাংসাদি দোষের আসুরিক পরম্পরার পোষক ছিল, কিন্তু বৈদিক মতের উৎকর্ষ ও বেদোক্ত রাজব্যবস্থার ভয়ে এ ধরনের দূষিত প্রক্ষিপ্ত করতে পারছিল না। কিন্তু মহাভারত যুদ্ধের কিছু কাল পরে যখন বেদোক্ত রাজব্যবস্থা ও বিদ্যাব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ল, তখন তারা নিজেদের ভাবনাকে আর্ষ গ্রন্থগুলিতে আরোপ করার অভিযান শুরু করল।

প্রশ্ন—আপনি প্রক্ষিপ্ত ও মূল বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন, তাতে আমাদের বহু প্রশ্নের সমাধান হয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন হল, ব্রাহ্মণ গ্রন্থকাররা কেন তাদের গ্রন্থ এমন ভাষায় রচনা করলেন, যার অশ্লীল, হিংসাত্মক ও মূর্খতাপূর্ণ অর্থও হতে পারে? সেই মহর্ষিরা কি এটুকুও ভাবেননি যে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কথার দূষিত অর্থ করে বৈদিক ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানব ইতিহাসকেই কলঙ্কিত করবে? যদি সরল ও সহজ ভাষায় লিখতেন, তবে আচার্য সবণাদি কেন দূষিত অর্থ করতেন? যখন এত বড় বড় সংস্কৃতজ্ঞরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন, তখন সাধারণ মানুষ ওই গ্রন্থগুলি থেকে কী শিখবে? সব মানুষ তো ঋষি হতে পারে না।

উত্তর—আপনার এই প্রশ্ন অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। এই প্রশ্ন আজ মৃতপ্রায় বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির বেদনা নিয়ে যারা চিন্তিত, এমন বহু বেদভক্তের মনেই উদয় হয়। এর সব কিছুর মূল কারণ এই প্রক্ষিপ্তসমূহই, এবং প্রকৃতপক্ষে প্রক্ষিপ্তেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল কারণ এই ধরনের ভাষার ব্যবহার। যদিও পূর্বে বর্ণিত অন্যান্য কারণও আছে, তথাপি ভাষার জটিলতা একটি অত্যন্ত বড় কারণ। আমাদের মতে এই ধরনের যোগিক ভাষার পেছনে নিম্নলিখিত কারণগুলি থাকতে পারে— কুগ্রন্থই বা কেন রচনা করলেন?

উত্তর—আমি বহু প্রক্ষিপ্ততার কারণ এভাবে মনে করি—বেদের কিছু মন্ত্র, কোথাও কোথাও আখ্যানরূপে, আবার কোথাও কোথাও কোনো বিশেষ মন্ত্রের শব্দ বা পাদবিশেষকে অবলম্বন করে ব্রাহ্মণ গ্রন্থকার মহর্ষিরা দীর্ঘ আখ্যান ও গাথা রচনা করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল বেদের আখ্যান বা বিশেষ মন্ত্রকে বিস্তৃতভাবে বোঝানো। সেই ব্রাহ্মণ-আখ্যানও যোগিক পদে পরিপূর্ণ ছিল। ব্রাহ্মণ গ্রন্থকাররা জানতেন যে বেদে সমস্ত প্রয়োজনীয় সত্যবিদ্যা বীজরূপেই আছে। এই বীজরূপ বিদ্যাকে প্রাচীন অতিশয় সত্যসম্পন্ন মহর্ষি ভগবন্তরা কোনো সহায়ক গ্রন্থ ছাড়াই মহান গুরুদের শ্রীচরণে বসে শ্রবণ করেই বুঝে নিতেন এবং পরে সেই বিজ্ঞানকে শ্রবণ করিয়ে, প্রয়োজনে প্রয়োগে এনে এবং আধ্যাত্মিক বিদ্যাকে আচরণে প্রয়োগ করে দৃঢ় করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সত্যগুণের হ্রাস ঘটতে লাগল; তখন মহর্ষিরা তাদের ব্যাখ্যানরূপে সেই সময়ের মানুষের বৌদ্ধিক ও আত্মিক স্তরের উপযোগী করে ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থ রচনা করলেন। এসব গ্রন্থে নানা প্রকার যজ্ঞের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন আখ্যান ও গাথার দ্বারা উপমার সাহায্যে সমগ্র সৃষ্টিবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হল। তারাও রূঢ়ার্থ করে অতিবিস্তৃত গ্রন্থ না লিখে, নিজেদের কথা গাগরে সাগর ভরার মতো যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করেছেন। এই যোগিক শৈলীর গ্রন্থগুলিকে পরবর্তী প্রজন্মের বিদ্বানরা হয় বুঝতে পারেননি, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন মনগড়া (বর্তমানে প্রচলিত পুরাণাদি) গ্রন্থ রচনা করেছেন, যাতে অশ্লীল, অসম্ভব, অবৈজ্ঞানিক, মূর্খতাপূর্ণ প্রসঙ্গ, হিংসা, মাংসাহার, পশুবলি, নরবলির মতো গুরুতর পাপের আধিক্য ছিল। নারী ও শূদ্র শ্রেণির প্রতি চরম অবহেলা ও তিরস্কার, জন্মগত বর্ণব্যবস্থা (কথিত জাতিব্যবস্থা), এক ঈশ্বরের পরিবর্তে কল্পিত দেবদেবীর মূর্তিপূজা, মৃতক-শ্রাদ্ধ, ঈশ্বরের নানা যোনিতে অবতার নিয়ে লীলা করা ইত্যাদি দুষ্কর্মকে পবিত্র সত্য-সনাতন বৈদিক ধর্মের স্থানে প্রচলিত করে দেওয়া হল। মহর্ষি ও দেবতাদের লম্পটতা, ক্ষত্রিয় রাজাদের বর্বরতা, মাংসাহার-মদ্যপানের প্রমাণস্বরূপ প্রকরণের দুঃখজনক আধিক্য ছিল। যদি ওই বিদ্বানরা বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের যোগিক শৈলী বুঝতে না পেরে এমন গ্রন্থ রচনা করে থাকেন বা অন্যান্য আর্ষ গ্রন্থে প্রক্ষিপ্ত করে থাকেন, তবে তারা গুরুতর অপরাধীর শ্রেণিতে পড়েন না; কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পাপ করে থাকেন, তবে তারা গুরুতর অপরাধী, যার ফল সম্পূর্ণ মানবজাতি হাজার হাজার বছর ধরে ভোগ করেছে। শুধু মানবজাতিই নয়, সেই নিরীহ জীবগুলিও ভুগেছে, যাদের রক্তে এই পৃথিবী স্নান করেছে। ইসলামাদি মতেও পশুবলি ও হিংসার যে প্রথা চালু হয়েছে, তার পেছনেও আমরা আমাদের এই কল্পিত কুগ্রন্থগুলিকেই—যেগুলিকে আজও কথিত হিন্দু সমাজ শ্রদ্ধা বা মূর্খতা যাই বলুক, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বলে মানে—দোষী বলে মনে করি। যে আর্যাবর্ত (ভারত) একসময় সমগ্র বিশ্বে সত্য আধ্যাত্ম ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রচার-প্রসার করেছিল, সেই ভারত থেকেই এই পাপগুলোও জগতে ছড়িয়েছে—এমনটাই আমাদের দৃঢ় মত। আজ দেশে বড় বড় পণ্ডিত ও ধর্মাচার্য নামে পরিচিতরা, বৈদিক সনাতন ধর্মের কথিত ধ্বজবাহক হয়ে এসব পাপ বিনা আপত্তিতে মেনে বসে আছেন। তারা অন্য মতাবলম্বীদের, কথিত প্রাবুদ্ধজনদের আক্ষেপ শোনা, বেদাদি শাস্ত্র ও ঋষিদের বিরুদ্ধে তাদের তীব্র নিন্দা শোনা মেনে নিতে পারেন; কিন্তু ঋষি দয়ানন্দ বা আর্য সমাজের সত্য কথা শোনা তাদের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অত্যন্ত শোকের বিষয়।

বেদে দুই প্রকারের বিজ্ঞান আছে—একটি আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান, দ্বিতীয়টি পদার্থবিজ্ঞান। এর অতিরিক্ত ব্যবহারিক জ্ঞান তৃতীয়। এদের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান মানবমাত্রের জন্য সমানভাবে উপযোগী। ব্যক্তি ধর্মাত্মা হোক বা অধর্মাত্মা, গুণবান হোক বা অবগুণী—উভয় প্রকার ব্যক্তিই আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের অধিকারী। অধার্মিক বা অবগুণীও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের দ্বারা ধর্মাত্মা ও সদ্গুণী হয়ে উঠতে পারে। কদাচিৎ সে যদি তা না-ও হতে পারে, তবুও সে এই বিদ্যাগুলির অপব্যবহার করে কোনো প্রাণীর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যদি এই বিদ্যা অন্য কোনো দেশ বা অন্য কোনো লোকের প্রাণীও নিয়ে যায়, তবুও তাতে কোনো ক্ষতি হবে না; বরং সর্বদিক থেকেই সবারই মঙ্গল সাধিত হবে। কিন্তু ভৌতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তা নয়। ভৌতিক বিজ্ঞানের সমস্ত শাখা এবং তার প্রযুক্তিগত ও প্রায়োগিক রূপ মানবজাতিকে ভোগবাদের দিকে নিয়ে যায়, যদি সেগুলির উপর আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ না থাকে। এমন ভোগবাদ কেবল মানবজাতির জন্যই নয়, সমগ্র প্রাণিজগতের জন্যও ঘাতক হয়—যেমনটি আমরা আজ এই ভূ-মণ্ডলে দেখছি।

আজ শিক্ষা ও প্রযুক্তির উপর সকলের সমান অধিকার রয়েছে। এই সমান অধিকারই অপরাধী ও সন্ত্রাসবাদীদের অস্ত্রবিদ্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রভৃতির মাধ্যমে ভয়ংকর অপরাধীতে পরিণত করছে। পুলিশ বা সেনাবাহিনীর থেকেও অধিক শক্তিশালী হয়ে তারা এই বিদ্যার সাহায্যে শক্তিশালী দেশগুলিকেও সন্ত্রস্ত করতে সফল হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই অধিকার বিশ্ব의 যুবসমাজকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছে। আমরা ডিজিটাল হওয়া বা সকলকে ডিজিটাল করার মধ্যে গর্ব অনুভব করছি, কিন্তু এই ডিজিটালাইজেশনই সমগ্র মানবজাতিকে দুরাচারী, পাপী ও অপরাধীতে পরিণত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যদি এই অধিকারের জন্য সদাচার ও আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতির যোগ্যতা নির্ধারিত থাকত, তবে এই ধ্বংস হতো না। কিন্তু ঈশ্বর ও সত্যধর্ম থেকে বিমুখ ভোগবাদী মৃগতৃষ্ণায় আবদ্ধ মানুষের মধ্যে এমন বিবেক কীভাবে জাগবে? আজ অধিকার নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে, কর্তব্যের আলোচনা পর্যন্ত নেই—শোক!

সম্ভবত মহর্ষিগণ চাইতেন যে সৃষ্টির জড় পদার্থসম্বন্ধীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান কেবল সেই অধিকারী বিদ্বানদেরই দেওয়া হোক, যারা আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে সমন্বিত। দুষ্ট ব্যক্তির হাতে যেন এমন বিদ্যা না আসে। যেন তারা এমন লোকদের কাছ থেকে সেই বিদ্যাগুলি গোপন রাখতে চাইতেন। এই কারণেই তারা তাদের গ্রন্থ যোগিক শৈলীতে, যেন কূট সাংকেতিক ভাষায় রচনা করেছেন। তারা এটাও ভেবেছিলেন যে অজ্ঞ ও বর্বর মানুষ—দেশীয় হোক বা বিদেশি—স্পষ্ট ভাষায় লেখা সেই বিজ্ঞানের অপব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মূর্খতায় সেটিকে নষ্টও করতে পারে। এই কারণেও এমন ভাষার ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যাতে দুষ্ট আক্রমণকারীরা সেই গ্রন্থগুলিকে মূর্খদের গল্প মনে করে না সেগুলি চুরি করতে আগ্রহী হবে, না সেগুলি ধ্বংস করতেও আগ্রহী হবে।

আমরা অনুভব করি যে ভারতীয় বৈদিক ঋষিদের এমন গ্রন্থ, যেগুলি স্পষ্ট ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্মোচন করত, সেগুলি হয় চুরি হয়ে গেছে, নয়তো ধ্বংস করা হয়েছে। কোথাও কোথাও অল্প কিছু গ্রন্থ অত্যন্ত কষ্টসাধ্যভাবে পাওয়া যায় বা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রাচীনকালে মহর্ষি অগস্ত্য, মহর্ষি ভরদ্বাজ, দেবরাজ ইন্দ্র, ভগবত্পাদ ব্রহ্মা, মহাদেব ভগবান শিব, দেবর্ষি বৃহস্পতি, ভগবান বিষ্ণু প্রভৃতি কত মহাবৈজ্ঞানিক ছিলেন; তাদেরও গ্রন্থ ছিল। সেসব গ্রন্থ কোথায়? মহর্ষি ভরদ্বাজের ‘বৃহৎ বিমানশাস্ত্র’ নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রন্থ পাওয়া গেছে। যদি তাদের গ্রন্থগুলিও ব্রাহ্মণগ্রন্থের মতো কূট ও যোগিক ভাষায় রচিত হতো, তবে সম্ভবত সেগুলি নষ্ট বা চুরি হতো না। সেই সময়েও অসুরেরা তাদের পদার্থবিদ্যার দ্বারা বিশ্বকে ত্রস্ত করছিল। বহু স্থানে তারা দেব মহাপুরুষদের কাছ থেকেই পদার্থবিজ্ঞান শিখে আবার তাদেরই উৎপীড়ন করার চেষ্টা করত—এমনটি আমরা ইতিহাসে পড়ি। ধীরে ধীরে সত্যগুণ আরও ক্ষীণ হয়ে তমোগুণ ও রজোগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমন সময়েই ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির সংকলন হয়। তখন সেই ঋষিরা যথেষ্ট বিবেচনার পর কূট ভাষায় গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে মনে হয়। এটি ইতিহাসের বিষয়; তাই আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না, তবে আমাদের কাছে এই সম্ভাবনাই প্রবল বলে প্রতীয়মান হয়।

এখন প্রশ্ন থাকে—এমন শব্দ কেন ব্যবহার করা হলো, যেগুলির অর্থ সহজেই অশ্লীলতা ও হিংসাত্মক হতে পারে? কূট ও সাংকেতিক ভাষায় লেখা যথার্থ প্রমাণিত হলো, কিন্তু শব্দভাণ্ডার ভিন্নও রাখা যেতে পারত—তখন সে বিষয়ে কেন মনোযোগ দেওয়া হয়নি?

এর উত্তরে আমাদের মত হল—সেই কালে প্রচলিত ভাষায় যে ধাতু বা শব্দগুলি ব্যবহৃত হতো, সেগুলির দ্বারা এমন অর্থ সাধারণত খুব কমই নির্গত হতো। আজও উপস্থ, লিঙ্গ, যোনি প্রভৃতি শব্দের অন্য অর্থ প্রচলিত রয়েছে। ধাতুর বহু অর্থ তো থাকেই; শব্দ যোগরূঢ়ও হয়ে থাকে। তাই পাঠকের মনোবৃত্তিই অর্থ নির্ণয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ নির্ণয়কারীর এটাও বিবেচনা করা উচিত যে ঋষি তিনিই হতে পারেন, যিনি উচ্চকোটির যোগী; আর যোগী তিনিই হতে পারেন, যিনি অষ্টাঙ্গ যোগের পালনকারী। অষ্টাঙ্গ যোগের এক অঙ্গে অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, অপরিগ্রহ ও ব্রহ্মচর্যের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে অষ্টাঙ্গ যোগের উচ্চকোটির পালনকারীই যোগী হওয়ার অধিকারী। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে ঋষিকে তেমনই হতে হবে। যদি তিনি তেমন না হন, তবে তিনি ঋষিও নন। যখন কোনো গ্রন্থ কোনো ঋষির রচনা, তখন তাতে এই মহাব্রতগুলির বিরুদ্ধ কোনো কথা থাকতে পারে না; এবং ঋষি বা বেদোক্ত রাজাদের ইতিহাসেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে না।

বর্তমান কালে পৃথক পৃথক অঞ্চলের ভাষাতেও এমন শব্দ আছে, যা এক অঞ্চলে সুন্দর মনে হয়, কিন্তু অন্য অঞ্চলে অশ্লীল ও অসভ্য বলে গণ্য হয়। যখন একই সময়ে কেবল দেশভেদের কারণে এত পার্থক্য হতে পারে, তখন হাজার হাজার বছরের পুরোনো ব্রাহ্মণগ্রন্থের ভাষাকে বর্তমান কালের সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে কীভাবে তুলনা করা যায়? দ্বিতীয় কথা হলো—যখন আর্ষ গ্রন্থ ও বেদে অহিংসার কথা বলা হয়েছে, গাভীকে ‘অধঘ্ন্যা’ বলা হয়েছে, পশুহত্যাকারী পাপীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ আছে, ভগবান মনু মাংসাহারে আট প্রকার পাপ গণনা করেছেন—তখন সেই একই গ্রন্থে হিংসার আদেশ কীভাবে থাকতে পারে?

যদি থাকে, তবে হয় আমরা তাদের অর্থ বুঝতে পারছি না, নয়তো সেগুলি প্রক্ষিপ্ত। এখানে সমস্ত উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সময় নেই। এর জন্য পৃথক গ্রন্থ রচনা করা প্রয়োজন। তদুপরি আর্য সমাজের বহু বিদ্বান এই বিষয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। এখানে আমরা এটুকু অবশ্যই বলতে চাই যে বৈদিক বাঙ্ময়ে নারী–পুরুষের দেহাঙ্গ থেকে সৃষ্টির কিছু পদার্থের উপমা দেওয়া হয়েছে। বহু স্থানে দেব-মিথুনের বর্ণনা আছে, তা স্বাভাবিক। সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া বোঝাতে নারী–পুরুষের উৎপাদক অঙ্গ ও প্রজনন কর্মের সঙ্গে তুলনা করা দোষপূর্ণ বলা যায় না। হ্যাঁ, এটুকু অবশ্যই স্মরণীয় যে সেই উপমা বুদ্ধিদীপ্ত, শালীন ও অত্যাবশ্যক হওয়া উচিত। এই উপমার দ্বারা বিদ্বান ও যোগী গৃহস্থ সৃষ্টির সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলিকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। এই কারণেই শরীরের তুলনা ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে করা হয় এবং ব্রহ্মাণ্ডকে পরমাত্মার দেহই বলা হয়। এই গ্রন্থে বহু স্থানে নারী–পুরুষ, যোষা–বৃষা রূপ পদার্থের সংযোগের আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে নর ও মাদী প্রাণীর প্রজনন কর্মের সঙ্গে তুলনা করে মেধাবী গৃহস্থ বিদ্বান অথবা শরীরশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থ, কণিকা বা তরঙ্গের সংযোগের ক্রিয়াবিজ্ঞানকে আরও সূক্ষ্মভাবে অনুভব করতে পারেন। এই কারণে এই তুলনা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন— যখন মহর্ষি ভগবানেরা পদার্থবিজ্ঞানের গূঢ় রহস্যসমূহ তৎকালীন অনধিকারী ও দুষ্ট পুরুষদের থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য কূট ও রহস্যময় ভাষায় লিখেছিলেন, তখন আপনি কেন বর্তমান জগতের জন্য—যারা রাবণ, কুম্ভকর্ণ, মেঘনাদ, দুর্যোধন ও কংস প্রভৃতির তুলনায়ও অধিক পতিত ও ঘৃণিত—এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যান করছেন? বর্তমান তামসিক প্রবৃত্তির বিজ্ঞানীরা কি আপনার ব্যাখ্যানের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এমন কোনো প্রযুক্তি বিকাশ করতে পারে না, যা বিশ্বকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে?

উত্তর— এই প্রশ্নটি এই গ্রন্থের সম্পাদক ও আমাদের সুযোগ্য শিষ্য প্রিয় বিশাল আর্য (অগ্নিযশ বেদাচী)-এর। তাঁর সন্দেহ স্বাভাবিকও বটে এবং যথার্থও। আমি এই আশঙ্কাকে স্বীকারও করছি। তবুও আমি এই গ্রন্থের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যান করেছি, তার কারণ এইরূপ—

প্রাচীনকালে বেদবিদ্যা সহজে বোঝার মতো বহু মানুষ এই ভূতলে বিদ্যমান ছিলেন এবং সেই অনুযায়ীই পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। বেদাদি শাস্ত্রকে সকলেই প্রমাণরূপে গ্রহণ করতেন। অসুর–রাক্ষসাদি জাতিরাও এর প্রামাণ্য স্বীকার করত। এই বিদ্যার কোনো বিকল্প বা বিরোধ তখন কোথাও ছিল না। সেই সময় রহস্যময় ভাষার ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থের অতিরিক্ত আরও বিশাল বৈদিক ও আর্ষ বাঙ্ময় এই সংসারে বিদ্যমান ছিল, যার ভিত্তিতে বিশ্বের ব্যবস্থাগুলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতো। এমন অবস্থায় কিছু বিদ্যা, বিশেষত ভৌতিক বিদ্যা, গোপন রাখা কাম্য ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও দুঃখজনক। আজ বিশ্ব এমন এক শিক্ষা-পদ্ধতিতে আবদ্ধ, যা ধর্ম, সদাচার, নৈতিকতা, প্রেম, করুণা, সত্য, ন্যায়—এতদ্ব্যতীত ঈশ্বর, আত্মা, কর্মফল-ব্যবস্থা, মোক্ষ ও পুনর্জন্মের মতো অটল ও বৈজ্ঞানিক সত্য থেকেও তথাকথিত প্রবুদ্ধ মানুষকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এই তথাকথিত প্রবুদ্ধ ব্যক্তি এসব সত্যকে হাস্যকর ও মূর্খতাপূর্ণ কল্পনা বলে মনে করছে। আজ যে পতনের কথা বলা হচ্ছে, তার মূল কারণই হলো বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা, জ্ঞান–বিজ্ঞান এবং তার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বা সেখান থেকে উৎপন্ন কু-শাসনব্যবস্থা। বর্তমান জ্ঞান–বিজ্ঞান, যা প্রকৃতপক্ষে কেবল অসম্পূর্ণ ও ধ্বংসাত্মকই নয়, বরং বহুবিধ মিথ্যাচার ও নীচ ভোগবাদের জনক, নিজের অহংকারে চারদিকে ভয়ংকর ও উন্মত্ত গর্জন করছে। এর সম্মুখে সকলে গর্বভরে নতশির দেখা যাচ্ছে। এই দুরবস্থা ও মিথ্যা অহংকার দেখে এবং সত্য বৈদিক বিদ্যার বীজ-নাশ ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের আশঙ্কায় আমার মনে হাজার হাজার বছর ধরে লুপ্ত হয়ে যাওয়া বেদবিদ্যাকে বিশ্বের সামনে এনে বিশ্বকে ভবিষ্যৎ ধ্বংস থেকে রক্ষার ভাবনা জাগে।

আমি এটাও অনুভব করছিলাম যে নিজের বিজ্ঞানের দম্ভে ভরা মানুষ কেবল অধ্যাত্মের কথা শুনবে না। আবার অধ্যাত্ম ও যোগের নামেও এই বিশ্বে নিরেট ভণ্ডামির সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছে। লোকেষণা ও বিত্তেষণায় আক্রান্ত, বিষয়াসক্ত হয়ে যোগের অভিনয়কারী লোকেরা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছে—তখন সত্য যোগ ও অধ্যাত্মকে আর কে শুনবে? এই কারণেই পদার্থবিজ্ঞানের অহংকারে মত্ত মানুষকে বৈদিক পদার্থবিজ্ঞানের আলোতেই সংশোধন করার একমাত্র উপায় আমার মনে হয়েছে।

এই উপায়ের অন্তর্গত হয়েই আমি ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে সহস্র বছর ধরে গোপন থাকা পদার্থবিজ্ঞান বর্তমান অহংকারী বিশ্বের সামনে প্রকাশ করতে উদ্যত হয়েছি। আমার বিশ্বাস, এই বিজ্ঞানের আলোতে বর্তমান বৈজ্ঞানিকতার অহংকার দূর হবে এবং বর্তমান জগৎ এই মহান বৈদিক বিজ্ঞানের সামনে নতশির হয়ে এর আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের বিদ্যাগুলির প্রতিও চিন্তা করতে বাধ্য হবে। এর পরেও যদি সে বৈদিক পদার্থবিদ্যার অপব্যবহার করে, তবুও তা বর্তমান বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক পথের তুলনায় ভালোই হবে। অন্যদিকে বিশ্বের সজ্জন মহাপুরুষেরা, যারা বর্তমান পতনে দুঃখিত ও নিরাশ হয়ে পড়েছেন, তাঁরা নতুন আলো ও উৎসাহ লাভ করবেন। তাছাড়া আমার এই আশাও আছে যে যদি তামসিক প্রবৃত্তির মেধাবী বিজ্ঞানীরাও আমার এই গ্রন্থ মনোযোগ দিয়ে পড়েন, তবে তাঁদের কাছে ঈশ্বর ও তাঁর ক্রিয়াবিজ্ঞান প্রত্যক্ষ প্রতীয়মান হবে। তাঁদের সর্বত্র ঈশ্বরীয় তেজ অনুভূত হতে থাকবে, তখন তাঁরা এই বেদবিদ্যার অপব্যবহারের ভাবনায় আক্রান্ত হবেন না।

আমি যদি এই ব্যাখ্যান রচনা না করতাম, তবে বেদবিদ্যা বর্তমান বিজ্ঞান ও নাস্তিকতার প্রবল স্রোতে ভেসে চিরতরে লুপ্ত হয়ে যেত। এই কারণেই আমি এই ব্যাখ্যান রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি। যদি কেউ এর অপব্যবহার করে, তবে ঈশ্বরীয় ব্যবস্থা তাকে উপযুক্ত দণ্ড অবশ্যই দেবে। আমার উদ্দেশ্য তো সমগ্র বিশ্বের কল্যাণ সাধন করা, এবং আমার ভাবনা ঈশ্বর জানেন এবং সেই সজ্জনেরাও নিশ্চয়ই জানতে সক্ষম হবেন, যারা এই গ্রন্থ হৃদয়ঙ্গম করতে সফল হবেন। যদি এই বিজ্ঞানের অপব্যবহারে এই পৃথিবীতে পুনরায় রাবণ, দুর্যোধনের মতো আসুরিক প্রবৃত্তির রাজাদের জন্মও হয়, তবুও আমি মনে করি—এই রাজারা আজকের তথাকথিত প্রবুদ্ধ শক্তিধরদের তুলনায় বহু দিক থেকেই শ্রেষ্ঠই ছিলেন—অস্তু।

প্রশ্ন— বেদের মতো ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিরও কি যোগিক প্রক্রিয়ায় বহু অর্থ করা সম্ভব, নাকি কেবল আধিদৈবিক (পদার্থবিজ্ঞান-সম্পর্কিত) অর্থই হতে পারে?

উত্তর— আমরা কেবল ঐতরেয় ব্রাহ্মণ নিয়েই ব্যাখ্যান করেছি এবং তাও কেবল আধিদৈবিক পক্ষকে কেন্দ্র করে। অতএব অন্যান্য ব্রাহ্মণ গ্রন্থ বা অন্যান্য পক্ষ সম্পর্কে কিছু বলার বিশেষ অধিকার আমাদের নেই। তবুও আমরা মনে করি—যখন বেদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অর্থ করা সম্ভব, তখন তার উপর ব্যাখ্যানরূপ ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিরও বিভিন্ন অর্থ সম্ভব। তা সর্বত্রই হবে—এমন আবশ্যক নয়, কিন্তু বেদ সংহিতার অর্থ সর্বত্র ত্রিবিধ হতে পারে—এমনটাই আমাদের দৃঢ় মত।

অবশেষে সারাংশরূপে বলা যায়—ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলি বেদ সংহিতার সর্বাধিক নিকটবর্তী মহান জ্ঞান–বিজ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার। যদিও এগুলি বিভিন্ন দুরূহ যাজ্ঞিক প্রক্রিয়ার রূপে প্রতীয়মান হয়, তবুও এই মহান গ্রন্থগুলিতে সমগ্র সৃষ্টির যে বিস্ময়কর বিজ্ঞান নিহিত আছে, তা সম্ভবত অন্যত্র দুর্লভ। ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলি না বুঝলে বেদকে বোঝা সর্বথাই অসম্ভব।

০০ ইতি অষ্টম অধ্যায়ঃ সমাপ্তঃ ০০

বেদার্থ মীমাংসা, বেদ বিজ্ঞান আলেক

অধ্যায় ৪-এ আমরা স্পষ্ট করেছি যে ভাষা ও জ্ঞান—উভয়েরই উৎপত্তি জগতের চেতন কর্তা পরমাত্মার দ্বারাই হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কিছু বিস্তার আমরা পূর্বেই ব্যাখ্যা করেছি—কীভাবে সৃষ্টির উৎপত্তিকালে বিভিন্ন ছন্দ (Vibration) প্রাণের সৃষ্টি হয় এবং সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের চার ঋষি কীভাবে অন্তরীক্ষ থেকে এই ছন্দগুলিকে গ্রহণ করেছিলেন। এই অধ্যায়ে আমরা এই বিষয়ের আলোচনা করব যে বেদ কী এবং ব্রহ্মাণ্ডে এর উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে? বর্তমানে প্রাপ্ত বেদ সংহিতাগুলির স্বরূপ কী? বেদের ছন্দ, দেবতা, ঋষি, স্বর ইত্যাদি কী? বেদার্থ ও সৃষ্টিবিজ্ঞানে এগুলির উপযোগিতা কী? মানবজাতির জন্য বেদের কী উপযোগিতা আছে এবং বেদকে মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত করার কী উপায় হতে পারে? এই সকল বিষয়ের সঙ্গে বেদার্থ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া, মহর্ষি দয়ানন্দ, আচার্য সায়ণ প্রমুখ বেদভাষ্যকারদের ভাষ্যের তুলনা ইত্যাদি বিষয় এবং আমাদের ত্রিবিধ বেদভাষ্য শৈলীর উপরও আলোকপাত করার প্রয়াস করা হবে।

বেদার্থ মীমাংসা

বেদ হল সেই ছন্দ-রশ্মিগুলির সমষ্টির সংগ্রহ, যা অগ্নি, বায়ু প্রভৃতি চার মহর্ষি মানব সৃষ্টির সূচনালগ্নে এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে গ্রহণ করেছিলেন—এই কথা আমরা “ভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎপত্তি” নামক অধ্যায়ে বিশদভাবে লিখেছি। সেখানে আমরা এ কথাও আলোচনা করেছি যে এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের সময় এমন বহু ছন্দ-রশ্মি (মন্ত্র)ও উৎপন্ন হয়, যেগুলি ঐ চার মহর্ষি গ্রহণ করেননি। সেই মন্ত্রগুলি বেদ সংহিতায় বিদ্যমান নয়। এমন বহু মন্ত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ও আশ্বলায়ন শ্রৌতসূত্র প্রভৃতিতে পাওয়া যায়। শ্রী পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসক তাঁর “বৈদিক ছন্দো-মীমাংসা” নামক গ্রন্থে এই মন্ত্রগুলিকে যাজ্ঞিক প্রক্রিয়ার পোষক আচার্যদের রচনা বলে অবৈদিক ঘোষণা করেছেন। আমরা পূজ্য পণ্ডিতজির বিদ্যাকে নতশিরে প্রণাম জানালেও এটুকু বলতে চাই যে এটি পণ্ডিতজির নিতান্তই ভ্রান্তি। ব্রাহ্মণ গ্রন্থকার মহর্ষিরা সাধারণ আচার্য ছিলেন না। তাঁরা এই সৃষ্টি ও বেদ উভয়েরই তলস্পর্শী বিদ্বান ও সাক্ষাৎকৃতধর্মা ছিলেন। তাঁরা ব্রহ্মাণ্ডে স্পন্দিত হওয়া সেই ঋচাগুলিকে নিজে সমাধিস্থ অবস্থায় গ্রহণ করে সৃষ্টিবিজ্ঞানের গূঢ় রহস্য উপলব্ধি করে তা বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের এ কথা মেনে নেওয়া উচিত নয় যে কেবল চার সংহিতায় বিদ্যমান মন্ত্ররূপী ছন্দ-রশ্মিগুলিই এই ব্রহ্মাণ্ড নির্মাণের জন্য যথেষ্ট। প্রকৃতপক্ষে পণ্ডিতজি বৈদিক ছন্দ-বিজ্ঞানের উপর কোনো গভীর চিন্তাই করেননি, নচেৎ তাঁর এই ভ্রান্তি হতো না। শ্রী প০ ভগবদত্ত রিসার্চ স্কলার অবশ্য এই বিষয়ে কিছু চিন্তা করেছেন এবং তাঁর চিন্তন থেকেই আমিও বৈদিক ছন্দ-বিজ্ঞানের উপর গম্ভীরভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত হয়েছি, তবুও সম্ভবত তিনি এই সকল বিষয়ে বিস্তৃতভাবে চিন্তা করেননি। তিনি কেবল সামান্য আভাসই দিয়েছেন, বিশদ কিছু বলেননি।

বেদ—ব্রহ্মাণ্ডের গ্রন্থ

কয়েক সহস্র বছর পূর্ব থেকেই বেদের প্রকৃত স্বরূপ বিশ্ব থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। একে এই ভারত দেশ—যাকে একদা আর্যাবর্ত বলা হতো—এবং তথাকথিত হিন্দু জাতি ও তার কথিত ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হতে শুরু করে এবং আজও তা দেখা হচ্ছে। এর একমাত্র কারণ ছিল এই যে ভারতবর্ষ থেকে বেদ-ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থের প্রকৃত বিজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বেদমন্ত্রের ব্যবহার কেবলমাত্র কিছু সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড ও কিছু ধর্মীয় প্রথা পালনের সীমায় আবদ্ধ করে দেওয়া হয়।

অত্যন্ত শোকের বিষয় যে যে বেদ সেই ছন্দসমূহের সমষ্টি, যা সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল কারণ পদার্থে স্পন্দনের (vibration) রূপে উৎপন্ন হয়েছিল, সেই ছন্দসমষ্টি বেদকে শ্রেণি, দেশ ও সম্প্রদায়ের নিষ্ঠুর বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়েছে। যে বৈদিক ঋচাগুলির দ্বারা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড—যার মধ্যে সকল প্রাণীর দেহও অন্তর্ভুক্ত—নির্মিত হয়েছে, সেই বেদ কীভাবে এত সংকীর্ণ ও হেয় হয়ে গেল? এটি এক দীর্ঘ দুর্ভাগ্যজনক কাহিনি, যার আলোচনা এখানে করা আমরা প্রয়োজনীয় মনে করছি না।

আমরা বিশ্বের প্রবুদ্ধজনদের এটুকু অবশ্যই বলতে চাই যে ব্রহ্মাণ্ডে উৎপন্ন বিভিন্ন লোক, গ্যালাক্সি, এটম, মলিকিউল, সূক্ষ্ম কণিকা, বিকিরণ, প্রাণীদেহ ও উদ্ভিদাদি পদার্থ—এগুলি কি কোনো দেশ, শ্রেণি, জাতি বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে আবদ্ধ? এদের বিদ্যা-বিজ্ঞান কি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ? যদি তা না হয়, তবে এই সকলের মধ্যে ব্যাপ্ত এবং এদের উৎপত্তির উপাদান-কারণরূপ বৈদিক ঋচাগুলি (ছন্দ-রশ্মিরূপ vibration) কেন সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত বলে গণ্য করা হচ্ছে? কেন বেদকে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের গ্রন্থ বলে মানা হচ্ছে না? কেন ‘ওম’-এর পবিত্র ধ্বনি—যা এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সর্বপ্রথম উৎপন্ন ও সকলের প্রেরণার রশ্মি—তাকে হিন্দুদের সঙ্গে যুক্ত করে সাম্প্রদায়িক সীমানায় আবদ্ধ করা হচ্ছে? কেন এই মহান বৈজ্ঞানিক ও সকলের মূল কারণ পদার্থরূপ ‘ওম’ রশ্মি (vibration)-এর বিরোধিতা করা হচ্ছে? কেউ একে নিজের সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করে, আবার কেউ একে পর মনে করে বিরোধিতা করে—এসবই বেদবিদ্যার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে নিতান্ত ভ্রান্তি ও অজ্ঞতার ফল।

সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত মার্কিন বৈজ্ঞানিক সংস্থা NASA-এর একটি প্রতিবেদনের কথা শোনা গেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে তারা ব্রহ্মাণ্ডে ‘ওম’ ধ্বনিকে ব্যাপ্ত অবস্থায় পেয়েছে। আমরা এই গ্রন্থে এর থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ‘ওম’ রশ্মির বিস্তৃত ক্রিয়াবিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচন করেছি, যা জানলে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা গভীর বিস্ময়ে অভিভূত হবেন। আমাদের বিশ্বাস—বর্তমান বিজ্ঞান যতই উন্নত হবে, ততই তারা ‘ওম’-এর সঙ্গে সঙ্গে এই ব্রহ্মাণ্ডে সহস্র সহস্র বৈদিক ঋচার বিদ্যমানতার উপলব্ধি করতে পারবে। তখন বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানী বা চিন্তাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি বৈদিক পদগুলিকে ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী স্বীকার করতে এবং ‘বেদ’ নামক গ্রন্থকে কেবল মানবজাতিরই নয়, বরং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান সকল বুদ্ধিমান প্রজাতির গ্রন্থ হিসেবে মানতে বাধ্য হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে সে এই মহান গ্রন্থকে শ্রদ্ধাসহকারে অধ্যয়ন করতে চাইবে। সে ব্যক্তি বেদের সঙ্গে সঙ্গে এর থেকে প্রসূত বিভিন্ন আর্ষ গ্রন্থসমূহ—মনুস্মৃতি, ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, আরণ্যক, উপনিষদ, দর্শন, বাল্মীকীয় রামায়ণ, মহাভারত, কল্পসূত্রাদি গ্রন্থগুলির প্রতিও আমাদের ন্যায় শ্রদ্ধা পোষণ করবে।

তখন সে এই সত্যও উপলব্ধি করবে যে বৈদিক সংস্কৃত শব্দসমূহ নিত্যস্বরূপে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে ব্যাপ্ত, এবং সেই কারণেই বৈদিক সংস্কৃত ভাষাই ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র মূল ভাষা। এই কারণে এর পঠন-পাঠনের জন্যও বিশ্বের সকল মানুষ সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করবে—এমনটাই আমাদের বিশ্বাস। এর জন্য বিশ্বব্যাপী প্রবুদ্ধ মহানুভবদের নিজেদের নিজ নিজ সম্প্রদায় ও শ্রেণিগত মান্যতাগুলির নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে হবে এবং সংকীর্ণ মানসিকতা ত্যাগ করে উদার হৃদয় ও প্রখর বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক দিয়ে নিরপেক্ষ চিন্তনের মাধ্যমে মানব-ঐক্যের পথ প্রশস্ত করার পবিত্র সংকল্প গ্রহণ করতে হবে।

বৈদিক ঋচাগুলির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় অবদান

আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে বৈদিক ঋচাগুলি প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির উপাদান পদার্থে উৎপন্ন সূক্ষ্ম vibrations-এরই রূপ। এই vibrations বা তরঙ্গসমূহই জগতের সমস্ত মূর্ত পদার্থের নির্মাণ করে। যেমন সম্পূর্ণ শান্ত জলে কোনো বাহ্যিক বলের প্রভাবে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, তেমনি প্রকৃতি–মহৎ–অহংকার ও মনস্তত্ত্বে ঈশ্বরতত্ত্ব দ্বারা প্রেরিত সূক্ষ্ম ‘ওম্’ রশ্মির বলের কারণে সূক্ষ্ম তরঙ্গ (vibration) উৎপন্ন হয়। যেমন জলে উৎপন্ন তরঙ্গ জল দিয়েই পূর্ণ এবং জল থেকেই গঠিত, তেমনি বৈদিক ঋচারূপী ছন্দ-রশ্মিগুলি মনস্তত্ত্বাদি থেকে উৎপন্ন এবং সেগুলির দ্বারাই পূর্ণ। যেমন জলের তরঙ্গে জলের পাশাপাশি সেই তরঙ্গ সৃষ্টিকারী শক্তিও বিদ্যমান থাকে, তেমনি বৈদিক ঋচাগুলিতে মনস্তত্ত্বাদি ছাড়াও এই vibrations সৃষ্টিকারী ‘ওম’ রশ্মি এবং তারও মূল ঈশ্বরতত্ত্বের বিশেষ শক্তি সর্বদা বিদ্যমান থাকে। এইভাবে ঈশ্বরতত্ত্বের মূল বল বা শক্তি সর্বদাই সকলের সঙ্গে নিশ্চিতরূপে বিদ্যমান থাকে। যদি তা না থাকে, তবে সৃষ্টির কোনো জড় পদার্থেই কোনো প্রকার প্রবৃত্তি সম্ভব নয়।

ঋচাগুলির প্রভাব

অন্যদিকে বৈদিক ঋচাগুলির বিভিন্ন ছন্দের এই সৃষ্টির উপর কী কী প্রভাব পড়ে? প্রতিটি পদার্থ এই রশ্মিগুলির দ্বারা কী কী প্রকারে নির্মিত ও প্রভাবিত হয়? এই বিষয় আমরা পূর্বে বিস্তৃতভাবে লিখেছি। এখন আমরা সেই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করি—কোনো ঋচার ছন্দের প্রভাবের পাশাপাশি সেই ঋচায় বিদ্যমান প্রতিটি পদ এবং সেই পদগুলির প্রতিটি অক্ষরেরও নিজস্ব বিশেষ প্রভাব থাকে। যদি তা না হতো, তবে একই ছন্দবিশিষ্ট সমস্ত ঋচাই সৃষ্টিনির্মাণে সমান ভূমিকা পালন করত। সেই অবস্থায় সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়ায় একই ছন্দবিশিষ্ট অসংখ্য ঋচা উৎপন্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজনই থাকত না, অথচ আমরা জানি যে বেদ ও সৃষ্টিতে একই ছন্দবিশিষ্ট শত শত ঋচা বিদ্যমান। এই কারণেই প্রতিটি ঋচার ছন্দের প্রভাবের পাশাপাশি প্রতিটি পদ ও অক্ষরের পৃথক পৃথক ভূমিকা অনিবার্যভাবে বিদ্যমান। ঈশ্বরের কোনো কার্যই নিরর্থক নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টি তাঁর অত্যুচ্চ বুদ্ধিপূর্বক রচনা।

পদগুলির প্রভাব

এই সৃষ্টিতে যখন কোনো পদরূপী রশ্মি-অবয়ব উৎপন্ন হয়, তখন সেই পদ যে ঋচায় (ছন্দ-রশ্মিতে) বিদ্যমান থাকে, তার প্রভাবাধীন হয়ে নিজের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি নিজের স্বতন্ত্র প্রভাবও প্রকাশ করে। প্রকৃতপক্ষে সমস্ত পদগুলির স্বতন্ত্র প্রভাবই সেই ঋচার প্রভাবরূপে প্রকাশিত হয়। হ্যাঁ, এতটুকু অবশ্যই সত্য যে পদগুলির বিন্যাস ও ছন্দের ভেদের ভূমিকাও অনিবার্য। এখানে আমরা পদগুলির প্রভাব নিয়ে চিন্তা করছি। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, এই সৃষ্টিতে উৎপন্ন কোনো ঋচায় ‘অগ্নিঃ’ নামক পদ বিদ্যমান আছে। তখন তার প্রভাবে এই ঋচা অর্থাৎ ছন্দ-রশ্মি অগ্নি—অর্থাৎ যে কোনো প্রকার তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, বিদ্যুৎ আধান অথবা উষ্মা বা আলো—উৎপন্ন বা সমৃদ্ধ করবেই। অগ্নি মহাভূতের দ্বারা আমরা যে যে পদার্থ গ্রহণ করেছি, সেই সমস্ত পদার্থই ‘অগ্নি’ পদের প্রভাবে উৎপন্ন বা সমৃদ্ধ হবে।

ঋচা ও তার পদগুলির প্রভাব জানার প্রক্রিয়া

বৈদিক ঋচাগুলির রূপে উৎপন্ন ছন্দ-রশ্মিগুলির সৃষ্টির উপর প্রভাব সেই ঋচাগুলির আধিদৈবিক অর্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও নিত্য সম্পর্কযুক্ত। এই কারণে কোনো ঋচার আধিদৈবিক অর্থ না জেনে তার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় প্রভাব জানা অসম্ভব। এই প্রভাব জানার ধাপগুলি নিম্নরূপ—

(১) ছান্দস প্রভাব—পূর্বে গায়ত্রী প্রভৃতি ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে তার বিভিন্ন রূপের প্রভাব আমরা ব্যাখ্যা করেছি। বিজ্ঞ পাঠক তার ভিত্তিতে যে কোনো ঋচার ছান্দস প্রভাব সহজেই নিজে বুঝতে পারবেন।

(২) দৈবত প্রভাব—প্রতিটি ঋচার দেবতা তার প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই ঋচার সৃষ্টির উপর প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেবতাবাচক পদটি এই ইঙ্গিত দেয় যে সেই ঋগ্‌রূপী ছন্দ-রশ্মির প্রধান প্রভাব বা ফলাফল কী। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ঋচার দেবতা অগ্নি হন, তবে সেই ছন্দ-রশ্মির প্রভাবে আগ্নেয় মহাভূত সমৃদ্ধ ও সক্রিয় হবে এবং সেটিই সেই ঋচার প্রধান প্রভাব বা ফলাফল হবে। অন্যান্য ছান্দস প্রভাব ও পদগুলির পৃথক পৃথক বিশেষ প্রভাব আলাদা হবে। তবুও পদগুলির প্রভাব দেবতাবাচক পদার্থকে সমৃদ্ধ ও সক্রিয় করবেই।

(৩) পদগুলির প্রভাব—এটি জানার জন্য প্রতিটি পদের পৃথক পৃথক আধিদৈবিক অর্থ জানা অনিবার্য। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি পদের প্রতিটি অক্ষরের প্রভাব জানাও অপরিহার্য। লক্ষ্যণীয় যে পদ সাধারণত শব্দ ও ধাতুরূপ হয়। এই উভয়েরই অর্থ তদনুযায়ী প্রভাব নির্দেশ করে।

প্রশ্ন—শব্দরূপ পদ বিভিন্ন বিভক্তি ও বচনে হতে পারে এবং বিভিন্ন ধাতুরূপ ভিন্ন ভিন্ন বচন ও পুরুষে হতে পারে। এই অবস্থায় সেই পদগুলির আধিদৈবিক প্রভাব পৃথক পৃথকভাবে কীভাবে জানা যাবে, না কি সবার প্রভাবই সমান হবে?

উত্তর—কোনো ঋচায় যে পদের যে বিভক্তি, বচন বা পুরুষ ব্যবহৃত হয়েছে, তার প্রভাবও সাধারণত সেই অনুযায়ীই বুঝতে হবে। একে আমরা নিম্নরূপে বুঝতে পারি—

(৯) অগ্নিঃ = এই পদের প্রভাবে অগ্নি তত্ত্ব কর্তারূপে ঋচার কারণরূপ ঋষি প্রাণ-রশ্মি দ্বারা প্রেরিত হয়ে ঋচায় বিদ্যমান কোনো কর্মকারকে অবস্থিত পদরূপ পদার্থকে ক্রিয়াপদরূপ প্রভাব দ্বারা যুক্ত করে। এই উভয় পদার্থ সেই সময় সৃষ্টিতে হয় নির্মিত হতে থাকে, নয়তো পূর্ব থেকেই বিদ্যমান থাকে। সেখানেই এই প্রভাব উৎপন্ন হয়।

(২) অগ্নিম্ = এই পদের প্রভাবে অগ্নি তত্ত্ব সেই ঋচায় কর্মরূপে বিদ্যমান থেকে কোনো অন্য কর্তারূপ পদবাচক পদার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ক্রিয়াপদরূপ প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই উভয় প্রকার পদার্থের বিষয়েও পাঠক পূর্বের ন্যায়ই বুঝে নেবেন।

(৩) অগ্নিনা = এই পদের প্রভাবে অগ্নি তত্ত্ব ঋচায় বিদ্যমান কোনো কর্তারূপ পদবাচক পদার্থের সহচর বা সহযোগী হয়ে কর্মরূপ পদবাচক পদার্থের উপর ক্রিয়াপদরূপ প্রভাব প্রদর্শন করে অথবা তা করতে সহায়তা প্রদান করে।

(৪) অগ্নয়ে = এই পদের প্রভাবে ঋচায় বিদ্যমান কর্তারূপ পদবাচক পদার্থ অগ্নি পদবাচক পদার্থকে ঋচায় বিদ্যমান ক্রিয়াপদবাচক প্রভাব অথবা অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে যুক্ত করে।

(৫) অগ্নেঃ = এই পদ পঞ্চমী ও ষষ্ঠী বিভক্তির একবচন। এর দ্বারা দুই প্রকার প্রভাব হয়—
(ক) ব্যাকরণশাস্ত্রে পঞ্চমী বিভক্তির যে যে প্রকার ব্যবহার স্বীকৃত, সেই সেই প্রকারে এই পদ প্রভাব প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, অগ্নি নামক পদার্থ থেকে কোনো কর্তারূপ পদবাচক পদার্থের বিচ্ছেদ, কম্পন ইত্যাদি।
(খ) ব্যাকরণশাস্ত্রে ষষ্ঠী বিভক্তি সম্পর্ক নির্দেশ করে। অন্যান্য ব্যতিক্রমমূলক যে যে ব্যবহার আছে, সেই সেই প্রকারে এই পদ তদনুযায়ী প্রভাব প্রকাশ করে। এই প্রভাব কর্তা বা কর্মবাচক পদরূপ পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

(৬) অগ্নী = ব্যাকরণশাস্ত্রে সপ্তমী বিভক্তির যে যে প্রকার ব্যবহার হয়, সেই সেই প্রকার প্রভাব এই ‘অগ্নী’ পদের ক্ষেত্রে বুঝতে হবে। এর সম্পর্ক ঋচায় বিদ্যমান কর্তারূপ ও কর্মরূপ পদবাচক পদার্থের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই মানতে হবে।

(৭) অগ্নে = এই সম্বোধনবাচক পদ ঋচায় বিদ্যমান কোনো পদবাচক পদার্থ অথবা সেই ঋচার কারণরূপ ঋষি প্রাণ-রশ্মি দ্বারা প্রেরিত বা সক্রিয় হয়—এটাই এই সম্বোধনবাচক পদের প্রভাব।

এইভাবে আমরা শব্দরূপ পদগুলির প্রয়োগ দেখালাম। এখন বচনের প্রভাব সম্পর্কে আমরা এটুকুই লিখতে চাই যে ‘অগ্নী’ পদের প্রভাবে উপরিউক্ত দুই প্রকার অগ্নি তত্ত্বের প্রভাব উৎপন্ন হয় বা হতে পারে। অনুরূপভাবে অন্যান্য বিভক্তি ও বচনের ক্ষেত্রেও বুঝতে হবে।

এবার আমরা ক্রিয়াপদবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করি। উদাহরণস্বরূপ ‘বহ প্রাপণে’ ধাতু থেকে নিম্নরূপ প্রভাব জানি—

বহতি — এই ক্রিয়াপদের প্রভাবে ঋচায় বিদ্যমান কর্তারূপ পদবাচক পদার্থ কর্মরূপ পদবাচক পদার্থকে বহন করে অথবা তার মধ্যে ব্যাপ্ত হতে থাকে।

বহসি — এই ক্রিয়াপদের প্রভাবে ঋচায় বিদ্যমান কর্তারূপ ও কর্মরূপ পদবাচক পদার্থগুলির উপরিউক্ত ক্রিয়া ঋচা অর্থাৎ ছন্দ-রশ্মির কারণরূপ ঋষি প্রাণ-রশ্মির প্রেরণায় সম্পন্ন হয়।

বহামি — এই ক্রিয়াপদের প্রভাবে ঋচারূপ ছন্দ-রশ্মির কারণরূপ ঋষি প্রাণ-রশ্মিগুলিই কর্তারূপ প্রভাব প্রদর্শন করে এবং সেই রশ্মিগুলি ছন্দ-রশ্মির একটি অংশরূপে কার্য সম্পাদন করে। এগুলি বর্তমানকালের ক্রিয়ার উদাহরণ।

যদি ক্রিয়া ভূতকালে হয়, তবে তা থেকে বোঝা যাবে যে সেই ঋচা উৎপন্ন হওয়ার সময় সেই ক্রিয়া নিজের প্রভাব সম্পূর্ণ করেছে। যদি ক্রিয়া ভবিষ্যৎকালে হয়, তবে ক্রিয়ার প্রভাব ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। যখন ক্রিয়া লিঙ্ বা লোট্‌ লকারে হয়, তখন এর অর্থ হবে যে সেই ঋচার উৎপাদক ঋষি প্রাণ-রশ্মিগুলি কর্তারূপে পদার্থকে প্রেরিত করে ক্রিয়াপদবাচক প্রভাব প্রদর্শনের চেষ্টা করবে।

বিজ্ঞ পাঠক দ্বিবচন ও বহুবচনবাচক পদগুলির প্রভাব পূর্বের ন্যায় নিজেই বুঝে নিতে পারবেন।

প্রশ্ন—বেদে বিভিন্ন প্রকার ব্যত্যয় মানা হয়। বহু কার্য পাণিনীয় ব্যাকরণের বিরুদ্ধও হয়—এ কথা স্বয়ং মহর্ষি পাণিনি স্বীকার করেছেন। এমন অবস্থায় বিভিন্ন পদের প্রভাব কি ব্যত্যয় অনুসারে পরিবর্তিত হয়, না কি সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার প্রভাবে ব্যত্যয়াদির কোনো উপযোগিতা বা অস্তিত্ব নেই?

উত্তর—বেদে ব্যত্যয়াদির নিজস্ব এক গভীর বিজ্ঞান আছে। সব প্রকার ব্যত্যয়ের বিজ্ঞান পৃথকভাবে বর্ণনা করে এই গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধি করতে আমরা চাই না। কেবল উদাহরণস্বরূপ আমরা এখানে ক্রিয়াপদের একটি ব্যত্যয় নিয়ে আলোচনা করছি—

হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীত্।
স দাধার পৃথিবীং দ্যামুতেমাং কস্মৈ দেবায় হবিশা বিধেম॥
(যজুর্বেদ ২৩.১)

এই মন্ত্রটি যজুর্বেদে অন্যত্র দুই স্থানে (১৩.৪, ২৫.১০) এবং ঋগ্বেদ ১০.১২১.১-এও বিদ্যমান। এতে ‘দাধার’ ক্রিয়াপদে ব্যত্যয় রয়েছে। যজু. ২৩.১-এর ভাষ্যে মহর্ষি দয়ানন্দ এর অর্থ করেছেন—“ধৃতবান্, ধরতি, বরিষ্যতি বা”। এই পদ লিট্‌ (পরোক্ষ ভূতকাল) লকারের, অথচ এর অর্থ তিন কালেই সমানভাবে সিদ্ধ হয়। বেদার্থের দৃষ্টিতে বিচার করলে এটি বেদের অর্থের গভীরতা প্রকাশ করে, কারণ একটি ক্রিয়াপদ থেকেই তিনটি অর্থ একসঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে। যদি এই ব্যত্যয় না থাকত, তবে ঈশ্বরের ধারণ কর্ম বোঝাতে তিনটি ক্রিয়াপদের প্রয়োগ করতে হতো। এতে হয় তিনটি ঋচার প্রয়োজন পড়ত, নয়তো একটি ঋচায় তিনটি ক্রিয়াপদ ব্যবহার করতে হতো, ফলে ঋচার ছন্দ পরিবর্তিত হয়ে যেত। এইভাবে বিস্তৃত অর্থ প্রকাশের জন্য ন্যূনতম পদের প্রয়োগের বিজ্ঞানই ব্যত্যয় নামে পরিচিত। বেদে সমস্ত বিজ্ঞানাদি সূত্ররূপে হওয়ায় ব্যত্যয়ের অত্যাবশ্যকতা অনিবার্য।

এখন আমরা বিবেচনা করি—এর ফলে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় ঋচার প্রভাবে কী পরিবর্তন আসবে? আমাদের মতে এখানে ক্রিয়া ভূতকালের হওয়ায় পূর্বোক্ত প্রভাব তো থাকবেই, তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ ও বর্তমান কালের প্রভাবও প্রকাশ পাবে। এইভাবে একটি ছন্দ-রশ্মির দীর্ঘকালব্যাপী প্রভাব থাকবে। কিছু ধারণ কর্ম সম্পন্ন হয়ে গেছে, কিছু হচ্ছে এবং কিছু ভবিষ্যতে হবে। এই প্রভাব কেবল ‘দাধার’ পদের ব্যত্যয়-বিজ্ঞানের দ্বারাই জানা সম্ভব। যদি এখানে ব্যত্যয় না থাকত, তবে ঋচার প্রভাব বিশেষভাবে ধারণ কর্মের সম্পূর্ণতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেত।

বেদে কোথায় ব্যত্যয় আছে আর কোথায় নেই—এই বিষয় কেবল শুদ্ধ-বিজ্ঞানাত্মা ঋষিরাই জানতে পারেন। আমরা মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্যের ভিত্তিতে এই ব্যত্যয় গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি সাধারণ যুক্তির দ্বারাও এখানে ব্যত্যয় স্বতঃসিদ্ধ হয়।

এখানে আমরা ক্রিয়াপদের কালের ব্যত্যয় দেখালাম। একইভাবে বিজ্ঞ পাঠক বিভক্তি, বচন, বর্ণ ইত্যাদি সমস্ত প্রকার ব্যত্যয়ের বিজ্ঞান যথাযথভাবে নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

(৪) ঋষির প্রভাব—আমরা পূর্বে লিখেছি যে ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তির সময় এবং অন্য ক্ষেত্রেও ঋষিরূপ সূক্ষ্ম প্রাণ-রশ্মি থেকেই নানা ঋচা অর্থাৎ ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি হয়। এর অর্থ এই যে, যখন কোনো ঋচা-ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়, তখন বা তার পূর্বেই তার কারণরূপ কোনো ঋষি প্রাণ-রশ্মি অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এই কারণে যে কোনো ছন্দ-রশ্মিতে তার উপাদান কারণভূত ঋষি প্রাণ-রশ্মির সামান্য হলেও প্রভাব অবশ্যই বিদ্যমান থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে সেই ছন্দ-রশ্মির প্রভাবের পাশাপাশি তার নিকটে বিদ্যমান তার কারণরূপ ঋষি প্রাণ-রশ্মিগুলিরও কিছু না কিছু প্রভাব সেই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই কার্যকর হয়। আমরা এই গ্রন্থে বিভিন্ন ঋষি প্রাণ-রশ্মির স্বরূপ সংক্ষেপে দেখিয়েছি; পাঠক সেই অনুযায়ী বিভিন্ন ঋষি প্রাণ-রশ্মির স্বরূপ জেনে তার প্রভাব নিজেই অনুধাবন করতে পারবেন।

বেদার্থ প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন ঋচার প্রভাব

মহর্ষি দয়ানন্দের পৃথিবীর প্রতি সর্ববৃহৎ দান এই যে, তিনি সহস্রাধিক বছর পরে বেদার্থের যথার্থ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিশ্বকে পরিচিত করিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর কাছে না ছিল বেদার্থের জন্য পর্যাপ্ত সময়, না ছিল অনুকূল পরিবেশ; এই কারণেই তিনি যেরূপ বেদভাষ্য করতে চেয়েছিলেন, সেরূপ করতে পারেননি। কিছু পূর্বাগ্রহী অথবা আবেগপ্রবণ মহামানব আমার এই কথার সত্যতা না জেনেই বিতর্কে লিপ্ত হতে সদা প্রস্তুত থাকেন। তাঁরা জানেন না যে বেদবিদ্যার গভীর অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান অতিরিক্ত আবেগ বা পূর্বাগ্রহের দ্বারা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ ধৈর্য, বৌদ্ধিক উদারতা ও বিশেষ প্রখরতা, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, গভীর তর্ক ও ঊহা, পরমেশ্বরে দৃঢ় বিশ্বাস, অর্থ-কামাদি বিষয়ে অনাসক্ত মনোভাব, বিস্তৃত অধ্যয়ন এবং উপযুক্ত সাধনা।

মহর্ষি দয়ানন্দের প্রিয় অনুসারীগণ! আপনারা মহর্ষির বেদভাষ্যকে যথেষ্ট, সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বলে ধরে নিয়ে তাঁর সঙ্গে অবিচার করছেন। তাঁর পরিস্থিতি না বুঝে আমরা নিজেদের স্বল্পজ্ঞানের ভিত্তিতে তৎক্ষণাৎ ধারণা গড়ে নিই। অপরদিকে অন্যান্য বৈদিক বিদ্বানগণ বেদার্থে প্রবেশই করতে পারেননি। আমাদের এই মতের প্রমাণ প্রাজ্ঞ পাঠকগণ পরবর্তী উদ্ধৃতি থেকেই স্বয়ং পেয়ে যাবেন। মহর্ষি দয়ানন্দের পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু লেখা প্রয়োজন মনে করছি।

আর্য বিদ্বান আচার্য বিশ্বশ্রবা ব্যাস ‘ঋগ্বেদ মহাভাষ্য’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১৪-এ লিখেছেন—
“(মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে) এত অধিক বিস্তৃত বেদভাষ্য রচনা করতে প্রত্যেক বেদের জন্য একশো বছর লাগবে, অর্থাৎ এমন বেদভাষ্য রচনায় চারশো বছরের সময় প্রয়োজন।”

অন্যদিকে আচার্য বিশ্বশ্রবা একই পৃষ্ঠার পূর্বাংশে লিখেছেন—
“সংবৎ ১৬৩৩ সালে নিয়মিতভাবে বিস্তৃত বেদভাষ্য ও ভূমিকার রচনাকর্ম ঋষি শুরু করেন।”

আমরা জানি যে মহর্ষি দয়ানন্দ সংবৎ ১৬৪০ সালে পরলোকগমন করেন। এইভাবে বেদভাষ্য রচনার জন্য তাঁর হাতে মাত্র ৭–৮ বছর সময় ছিল, যেখানে তাঁর প্রয়োজন ছিল ৪০০ বছর। এই ৭–৮ বছরের মধ্যেই তিনি নানা কর্ম সম্পাদন ও বহু স্থানে ভ্রমণ করতে করতে বেদভাষ্য রচনা করেন। এমন অবস্থায় এই বেদভাষ্যকে সম্পূর্ণ, যথেষ্ট ও চূড়ান্ত বলে মেনে নিয়ে তার পর আর কোনো চিন্তা না করা—এটি কেবল ঋষির সঙ্গেই নয়, বেদবিদ্যার সঙ্গেও অবমাননা। প্রকৃতপক্ষে মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্য সাংকেতিক, কিন্তু আমার মতো অধ্যেতাদের জন্য তা পথপ্রদর্শকের ন্যায়। অস্তু।

এখন আমরা বেদার্থ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করি।

বেদার্থে প্রকরণ ও দেবতাজ্ঞানের অপরিহার্যতা এবং এই উভয়ের জ্ঞানে ঊহা ও তর্কের অনিবার্যতার কথা আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। বেদার্থে ছন্দ, ঋষি ও পদাদি স্বরের জ্ঞান সাধারণত প্রয়োজন হয় না; তবে আধিদৈবিক অর্থ করার সময় এগুলির জ্ঞান আংশিকভাবে পরোক্ষ রূপে উপযোগী হয়—এর ইঙ্গিত আমাদের আধিদৈবিক ভাষ্যে পাওয়া যাবে। এখন আমরা কিছু মন্ত্র উদাহরণরূপে উপস্থাপন করছি।

এই ক্রমে সর্বপ্রথম প্রসিদ্ধ গায়ত্রী মন্ত্র উদ্ধৃত করছি—

(১) ভূর্ভবঃ স্বঃ। তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
(যজু. ৩৬.৩)

মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্য

ভূঃ। ভুবঃ। স্বঃ। তৎ। সবিতুঃ। বরেণ্যম্। ভর্গঃ। দেবস্য। ধীমহি।
ধিয়ঃ। যঃ। নঃ। প্রচোদয়াদিতি প্রচোদয়াত্।।

পদার্থ— (ভূঃ) কর্মবিদ্যা, (ভুবঃ) উপাসনাবিদ্যা, (স্বঃ) জ্ঞানবিদ্যা, (তৎ) ইন্দ্রিয় দ্বারা অগ্রাহ্য, পরোক্ষ, (সবিতুঃ) সমগ্র ঐশ্বর্য প্রদানকারী ঈশ্বরের, (বরেণ্যম্) গ্রহণযোগ্য, (ভর্গঃ) সর্বদুঃখনাশক তেজঃস্বরূপ, (দেবস্য) কমনীয় স্থানের, (ধীমহি) ধ্যান করি, (ধিয়ঃ) প্রজ্ঞাসমূহকে, (যঃ) যে, (নঃ) আমাদের, (প্রচোদয়াত্) প্রেরণা দেন।

ভাবার্থ— এখানে বাচকলুপ্ত উপমালঙ্কার আছে। যে সকল মানুষ কর্ম, উপাসনা ও জ্ঞানবিদ্যাকে সম্যকভাবে গ্রহণ করে সর্বঐশ্বর্যযুক্ত পরমাত্মার সঙ্গে নিজেদের আত্মাকে যুক্ত করে, অধর্ম, অনৈশ্বর্য ও দুঃখরূপ মল ত্যাগ করে ধর্ম, ঐশ্বর্য ও সুখ লাভ করে—তাদের অন্তর্যামী জগদীশ্বর স্বয়ং ধর্মানুষ্ঠান ও অধর্মত্যাগ করাতে সদা ইচ্ছুক হন।

পদার্থ (সরল ব্যাখ্যা)— হে মানুষগণ! যেমন আমরা (ভূঃ) কর্মকাণ্ডের বিদ্যা, (ভুবঃ) উপাসনাকাণ্ডের বিদ্যা এবং (স্বঃ) জ্ঞানকাণ্ডের বিদ্যা সম্যকভাবে অধ্যয়ন করে—যে (যঃ) আমাদের (নঃ) প্রজ্ঞাপূর্ণ বুদ্ধিকে (প্রচোদয়াত্) প্রেরণা দেন—সেই (দেবস্য) কামনার যোগ্য, (সবিতুঃ) সমগ্র ঐশ্বর্য প্রদানকারী পরমেশ্বরের (তৎ) ইন্দ্রিয় দ্বারা গ্রহণযোগ্য নয় এমন, (বরেণ্যম্) গ্রহণযোগ্য, (ভর্গঃ) সকল দুঃখনাশক তেজঃস্বরূপের (ধীমহি) ধ্যান করি—তেমনই তোমরাও তার ধ্যান করো।

ভাবার্থ (সরল)— এই মন্ত্রে বাচকলুপ্ত উপমালঙ্কার রয়েছে। যে মানুষ কর্ম, উপাসনা ও জ্ঞানসংক্রান্ত বিদ্যাগুলি যথাযথভাবে গ্রহণ করে সর্বঐশ্বর্যযুক্ত পরমাত্মার সঙ্গে নিজের আত্মাকে যুক্ত করে এবং অধর্ম, অনৈশ্বর্য ও দুঃখরূপ মল ত্যাগ করে ধর্ম, ঐশ্বর্য ও সুখ লাভ করে—তাদের অন্তর্যামী জগদীশ্বর স্বয়ং ধর্মানুষ্ঠান ও অধর্মত্যাগ করাতে সদা ইচ্ছুক হন।

এর ভাষ্য রাল্‌ফ টি. এইচ. গ্রিফিথ এইভাবে করেছেন—
“May we attain that excellent glory of Savitar the God. So may he stimulate our prayers.”

এই ভাষ্য আধ্যাত্মিক, কিন্তু বিজ্ঞ পাঠকগণ স্বয়ং মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্যের সঙ্গে তুলনা করে গ্রিফিথের বিদ্বত্তার স্তর অনুধাবন করতে পারেন।

এই মন্ত্রটি (ব্যাহৃতি ব্যতীত রূপে) যজুর্বেদ ৩.৩৫, ২২.৬, ৩০.২, ঋগ্বেদ ৩.৬২.১০, সামবেদ ১৪৬২-এও বিদ্যমান। এটি ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও বহু স্থানে এসেছে। এর মধ্যে যজুর্বেদ ৩০.২-এ এই মন্ত্রের ঋষি নারায়ণ এবং অন্যত্র বিশ্বামিত্র। দেবতা সবিতা, ছন্দ নিবৃদ্ধ বৃহতী এবং স্বর ষড়্জ। ব্যাহৃতির ছন্দ দেবী বৃহতী এবং ব্যাহৃতিসহ সম্পূর্ণ মন্ত্রের স্বর মধ্যম ষড়্জ। মহর্ষি দয়ানন্দ সর্বত্রই এর ভাষ্য আধ্যাত্মিক করেছেন। কেবল যজুর্বেদ ৩০.২-এর ভাবার্থে আধিভৌতিকের সামান্য ইঙ্গিত আছে, বাকি সব আধ্যাত্মিক।

একজন বিদ্বান একবার আমাদের বলেছিলেন যে গায়ত্রী মন্ত্রের মতো কিছু মন্ত্রের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ছাড়া অন্য কোনো প্রকারের ভাষ্য হতে পারে না। আমরা বিশ্বের সকল বেদনকে ঘোষণাপূর্বক বলতে চাই—বেদের প্রতিটি মন্ত্র এই সমগ্র সৃষ্টিতে বহু স্থানে vibrations রূপে বিদ্যমান। এই মন্ত্রগুলির এই রূপে উৎপত্তি পৃথিবী প্রভৃতি লোকসমূহের উৎপত্তিরও পূর্বে হয়ে গিয়েছিল। এই কারণে প্রতিটি মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য অবশ্যই সম্ভব। ত্রিবিধ অর্থপ্রক্রিয়ায় সর্বাধিক ও সর্বপ্রথম সম্ভাবনা এই প্রকার অর্থেরই হয়। অতএব এই মন্ত্রের আধিদৈবিক অর্থ হতে পারে না—এমন ধারণা বেদের যথার্থ স্বরূপ সম্পর্কে নিতান্ত অজ্ঞতার পরিচায়ক।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

এই মন্ত্রের মহর্ষি দয়ানন্দ কর্তৃক প্রদত্ত আধ্যাত্মিক ভাষ্য আমরা উপরে উদ্ধৃত করেছি। এখন আমরা এই একই মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য প্রদান করছি। এই ঋচার দেবতা সবিতা। সবিতা সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য হল—

“সবিতা সর্বস্য প্রসবিতা” (নি. ১০.৩১)
“সবিতা বৈ দেবানাং প্রসবিতা” (শ. ১.১.২.১৭)
“সবিতা যে প্রসবানামীশে” (ঐ. ১.৩০)
“প্রজাপতিয়ং সবিতা” (তা. ১৬.৫.১৭), “মনো বৈ সবিতা” (শ. ৬.৩.১.১৩)
“বিদ্যুদেব সবিতা” (গো. পূ. ৯.২২)
“পশবো বৈ সবিতা” (ন. ৩.২.৩.১১)
“প্রাণী বৈ সবিতা” (ঐ. ১.১৬)
“বেদা এবং সবিতা” (গো. পূ. ১.৩৩)
“সবিতা রাষ্ট্রং রাষ্ট্রপতিঃ” (তৈ. ব্রা. ২.৫.৭.৪)

এ থেকে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি প্রাপ্ত হয়—

সবিতা নামক তত্ত্ব সকলের উৎপত্তি ও প্রেরণার উৎস বা মাধ্যম।
এটি সকল প্রকাশিত ও আকর্ষণ প্রভৃতি বলসম্পন্ন কণার উৎপাদক ও প্রেরক।
এটি সকল উৎপন্ন পদার্থের নিয়ন্ত্রক।
‘ওম্’ রশ্মিরূপ ছন্দ রশ্মি ও মনস্তত্ত্বই সবিতা।
বিদ্যুৎকেও ‘সবিতা’ বলা হয়।
বিভিন্ন মরুদ্ রশ্মি ও দৃশ্য কণাকে ‘সবিতা’ বলা হয়।
বিভিন্ন প্রাণ রশ্মিকে ‘সবিতা’ বলা হয়।
সকল ছন্দ রশ্মিও ‘সবিতা’।
তারাগুলির কেন্দ্রীয় অংশরূপ রাষ্ট্রকে প্রকাশ ও পালনকারী সমগ্র তারাকেও
‘সবিতা’ বলা হয়।

আমরা পূর্বেই লিখেছি যে দেবতা যে কোনো মন্ত্রের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এই কারণে এই মন্ত্রের প্রধান প্রতিপাদ্য হল ‘ওম্’ ছন্দ রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, প্রাণতত্ত্ব এবং সকল ছন্দ রশ্মি।

এই ঋচার উৎপত্তি বিশ্বামিত্র ঋষি থেকে {“বাগূ বৈ বিশ্বামিত্রঃ” (কৌ. বা. ১০.৫), “বিশ্বামিত্রঃ সর্বমিত্রঃ” (নি. ২.২৪)}—অর্থাৎ সকলকে আকর্ষণ করতে সক্ষম ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মি থেকেই হয়েছে।

আধিদৈবিক ভাষ্য
(ভূঃ) ‘ভূঃ’ নামক ছন্দ রশ্মি অথবা অপ্রকাশিত কণা বা লোক, (ভুবঃ) ‘ভুবঃ’ নামক রশ্মি অথবা আকাশতত্ত্ব, (স্বঃ) ‘সুবঃ’ নামক রশ্মি অথবা প্রকাশিত কণা, ফোটন বা সূর্যাদি তারাসমূহ দ্বারা যুক্ত।
(তৎ) সেই অগোচর বা দূরস্থিত সবিতা অর্থাৎ মন, ‘ওম্’ রশ্মি, সকল ছন্দ রশ্মি, বিদ্যুৎ, সূর্যাদি প্রভৃতি পদার্থকে (বরেণ্যম্ ভর্গঃ দেবস্য) সর্বত্র আচ্ছাদনকারী ব্যাপক {ভর্গঃ = “অগ্নির্বৈ ভর্গঃ” (শ. ১২.৩.৪.৮), “আদিত্যো বৈ ভর্গঃ” (জৈ. উ. ৪.১২.২.২), “বীর্যং বৈ ভর্গঃ এপ বিষ্ণুর্যজ্ঞঃ” (শ. ৫.৪.৫.১), “অয়ং বৈ (পৃথিবী) লোকো ভর্গঃ” (শ. ১২.৩.৪.৭)} অগ্নেয় তেজ যা সমগ্র পদার্থকে পরিব্যাপ্ত করে নানা সংযোজক ও সংকোচক বলের দ্বারা প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লোকসমূহের নির্মাণে প্রেরণা দিতে সক্ষম হয়, (ধীমহি) প্রাপ্ত হয়—অর্থাৎ সমগ্র পদার্থ সেই অগ্নেয় তেজ ও বলকে ব্যাপকভাবে ধারণ করে। (ধিয়ঃ যঃ নঃ প্রচোদয়াত্) যখন সেই অগ্নেয় তেজ উক্ত পদার্থকে পরিব্যাপ্ত করে, তখন বিশ্বামিত্র ঋষি-সঞ্জ্ঞক মন ও ‘ওম্’ রশ্মিরূপ পদার্থ {ধীঃ = কর্মনাম (নিঘং. ২.১), প্রজ্ঞানাম (নিঘং. ৩.৬), “বাগ্ বৈ ধীঃ” (ঐ. আ. ১.১.৪)} নানাবিধ বাগ্ রশ্মিকে বিভিন্ন দীপ্তি ও ক্রিয়ায় যুক্ত করে যথাযথভাবে প্রেরিত ও নিয়ন্ত্রিত করতে থাকে।

ভাবার্থ
মন ও ‘ওম্’রশ্মিসমূহ ব্যাহৃতি রশ্মির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে সকল মরুদ্, ছন্দ প্রভৃতি রশ্মিকে অনুকূলভাবে সক্রিয় করে সকল কণা, কোয়ান্টা ও আকাশতত্ত্বকে উপযুক্ত বল ও নিয়ন্ত্রণে যুক্ত করে। এর ফলে সকল লোক ও অন্তরীক্ষে বিদ্যমান পদার্থ নিয়ন্ত্রিত শক্তিতে যুক্ত হয়ে নিজ নিজ ক্রিয়াসমূহ যথাযথভাবে সম্পাদনে সক্ষম হয়। এর দ্বারা বিদ্যুৎবলসমূহও সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে।

সৃষ্টিতে এই ঋচার প্রভাব
এই ঋচার উৎপত্তির পূর্বে বিশ্বামিত্র ঋষি—অর্থাৎ ‘ওম্’ ছন্দ রশ্মিসমূহ বিশেষভাবে সক্রিয় হয়। এর ছন্দ দেবী বৃহতী + নিবৃৎ গায়ত্রী হওয়ায় এর ছান্দস প্রভাব এর দ্বারা বিভিন্ন প্রকাশিত কণা বা রশ্মি প্রভৃতি পদার্থ তীক্ষ্ণ তেজ ও বল প্রাপ্ত হয়ে সংকুচিত হতে থাকে। এর দৈবত প্রভাবে মনস্তত্ত্ব এবং ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মিরূপ সূক্ষ্মতম পদার্থসমূহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণ, মরুত্ ছন্দ রশ্মি, বিদ্যুৎ সহ সকল দৃশ্য কণা বা কোয়ান্টা প্রভাবিত অর্থাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় ‘ভূঃ’, ‘ভুবঃ’ এবং ‘সুবঃ’ নামক সূক্ষ্ম ছন্দ রশ্মিসমূহ ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মির দ্বারা বিশেষভাবে সংযুক্ত ও প্রেরিত হয়ে কণা, কোয়ান্টা এবং আকাশতত্ত্ব পর্যন্ত প্রভাবিত করে। এর ফলে এ সকলের মধ্যে বল ও শক্তির বৃদ্ধি ঘটে এবং সকল পদার্থ বিশেষ সক্রিয়তা লাভ করে। এই সময় সংঘটিত সকল ক্রিয়ায় যে যে ছন্দ রশ্মিসমূহ নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে, তারা সকলেই বিশেষভাবে উত্তেজিত হয়ে নানাবিধ কর্মকে সমৃদ্ধ করে। বিভিন্ন লোক—তা তারা প্রভৃতি প্রকাশিত লোক হোক অথবা পৃথিবী প্রভৃতি গ্রহ বা উপগ্রহ প্রভৃতি অপ্রকাশিত লোক হোক—সকলের সৃষ্টির সময় এই ছন্দ রশ্মি নিজ ভূমিকা পালন করে। এর প্রভাবে সমগ্র পদার্থে বিদ্যুৎ ও উষ্ণতার বৃদ্ধি ঘটে, কিন্তু এই অবস্থাতেও এই ছন্দ রশ্মি বিভিন্ন কণা বা কোয়ান্টাকে সক্রিয়তা প্রদান করেও সেগুলিকে অনুকূলভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখতে সহায়তা করে। এই গ্রন্থের খণ্ড ৪.৩২, ৫.৫ এবং ৫.১৩-এ পাঠক এই ঋচার এমনই প্রভাব দেখতে পারেন। হ্যাঁ, সেখানে ব্যাহৃতিগুলির অনুপস্থিতি অবশ্যই রয়েছে। এর ষড়জ স্বরের প্রভাবে এই রশ্মিসমূহ অন্যান্য রশ্মিকে আশ্রয় দেওয়া, নিয়ন্ত্রণ করা, দমন করা এবং বহন করতে সহায়ক হয়। ব্যাহৃতিগুলির মধ্যম স্বর এগুলিকে বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে প্রবেশ করে নিজ ভূমিকা পালনের ইঙ্গিত দেয়। ছন্দ ও স্বরের প্রভাব বোঝার জন্য পূর্বোক্ত ছন্দ প্রकरण পাঠ করা অপরিহার্য।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

আধিদৈবিক ভাষ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রভাব প্রদর্শনের পর আমরা এই মন্ত্রের আধিভৌতিক অর্থের উপর বিবেচনা করি—

[ভূঃ = কর্মবিদ্যা, ভুবঃ = উপাসনাবিদ্যা, স্বঃ = জ্ঞানবিদ্যা (ম.দ. মা. ৩৬.৩)। সবিতা = যোগ ও পদার্থজ্ঞানের প্রসবিতা (ম.দ. ভা. ১১.৩), সবিতা রাষ্ট্রং রাষ্ট্রপতিঃ (তৈ. ব্রা. ২.৫.৭.৪)। কর্মবিদ্যা, উপাসনাবিদ্যা এবং জ্ঞানবিদ্যা—এই তিন বিদ্যায় সমৃদ্ধ (সবিতুঃ) (দেবস্য) দিব্য গুণে সমন্বিত রাজা, মাতা-পিতা অথবা উপদেশক আচার্য কিংবা যোগী পুরুষের (বরেণ্যম্) গ্রহণযোগ্য শ্রেষ্ঠ (ভর্গঃ) পাপ প্রভৃতি দোষ নাশকারী, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে যজ্ঞ অর্থাৎ সংগঠন, ত্যাগ ও বলিদানের ভাব সমৃদ্ধকারী উপদেশ বা বিধানকে (ধীমহি) আমরা সকল মানুষ ধারণ করি। (যঃ) এমন যে রাজা, যোগী, আচার্য বা মাতা-পিতা এবং তাঁদের বিধান বা উপদেশ (নঃ) আমাদের (ধিয়ঃ) কর্ম ও বুদ্ধিকে (প্রচোদয়াত্) ব্যক্তিগত, আধ্যাত্মিক, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় বা বৈশ্বিক উন্নতির পথে উত্তমভাবে প্রেরণা দেয়।]

ভাবার্থ
উত্তম যোগী ও বিজ্ঞানী মাতা-পিতা, আচার্য এবং রাজা তাঁদের সন্তান, শিষ্য বা প্রজাকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ উপদেশ ও সর্বহিতকারী বিধানের দ্বারা সকল প্রকার দুঃখ ও পাপ থেকে মুক্ত করে উত্তম পথে পরিচালিত করেন। এমন মাতা-পিতা, আচার্য ও রাজার প্রতি সন্তান, শিষ্য ও প্রজা গভীর শ্রদ্ধাভাব পোষণ করুক, যাতে সমগ্র পরিবার, রাষ্ট্র বা বিশ্ব সর্বপ্রকারে সুখী হতে পারে।

(২)
ত্বং সূঁকরস্যং দরদৃঢ়ি ত্বং দরদর্ত্তু সূকরঃ।
স্তোতৃনিন্দ্রস্য রায়সি কিমস্মান্দুছ্ছুনায়সে নিঃ ষু স্বপং।।
(ঋ. ৭.৫৫.৪)

সায়ণ ভাষ্য
হে সারমেয়! তুমি সূকর অর্থাৎ বরাহের (দেহ) বিদীর্ণ কর। দ্বিতীয়ার্থে ষষ্ঠী। ‘দরদৃঢ়ি’—বিদারণ কর। সূকরও যেন তোমাকে বিদীর্ণ করে। উভয়ের অস্থায়ী বৈরিতার কারণে। অর্থ—আমাদের যেন দংশন না করে। স্তোতৃনিন্দ্রস্য রায়সি—এ বিষয় পূর্ববর্তী ঋচায় ব্যাখ্যাত হয়েছে।

H.H. Wilson
“Do thou rend the hog; let the hog rend thee. Why dost thou assail the worshippers of Indra? Why dost thou intimidate us? Go quietly to sleep.”

Ralph T. H. Griffith—
“Be on the guard against the boar, and let the boar beware of thee. At Indra's singers barkest thou? Why dost thou seek to terrify us? Go to sleep.”

এই দুই বিদেশি ভাষ্যকারই মূলত সায়ণাচার্যেরই অনুকরণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্য বেদভাষ্যকারদের মধ্যে এমন কোনো যোগ্যতাই ছিল না যে তারা বেদাদি শাস্ত্রের ভাষ্য করতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত শুধু পাশ্চাত্য দেশই নয়, বরং আর্যাবর্তীয় (ভারতীয়) তথাকথিত প্রবুদ্ধ শ্রেণিও এদেরকেই বিশেষ প্রামাণিক বলে মান্য করে। আচার্য সায়ণেরও বেদার্থ বিষয়ে কোনো যোগ্যতা ছিল না। এই তিনজনের ভাষ্যের সারাংশ হলো—

“হে শূকর ও কুকুর! তোমরা পরস্পর লড়াই করো, একে অপরকে মারো, কামড়াও। ইন্দ্রের উপাসক বা স্তবকারী লোকদের উপর আক্রমণ কেন করছ? আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছ? যাও, চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো।”

হে আমার জগতের প্রবুদ্ধজনেরা! আপনাদের কি এই তথাকথিত বেদভাষ্যকারদের ভাষ্যে সামান্যও কোনো অর্থবহ কথা চোখে পড়ে? এবার আমরা এই মন্ত্রের উপর মহর্ষি দयानন্দের আধিভৌতিক ভাষ্য উপস্থাপন করছি—

মহর্ষি দানন্দ ভাষ্য

পদার্থ
(ত্বম্) (সূকরস্য) যঃ সুস্থু করোতি (দর্দৃहि) মৃশ বর্ষয় (তব) (দর্দর্তু) মুশ্ বৃদ্ধতাম্ (সূকরঃ) যঃ সম্যক্ করোতি (স্তোতৃন্) বিদুষঃ (ইন্দ্রস্য) পরমৈশ্বর্যস্য (রায়সি) রা ইবাচরসি (কিম্) (অস্মান্) (দুচ্ছুনায়সে) (নি) (সু) (স্বপ) ॥॥৪॥

ভাবার্থ
হে গৃহস্থ! তুমি ঐশ্বর্য সঞ্চয় করে ধর্মীয় ব্যবহারে সুন্দরভাবে বিস্তার করো, বিদ্বানদের সম্মান করো এবং ধনবানদের ন্যায় আচরণ করো। আমাদের প্রতি কেন কুকুরের মতো আচরণ করছ? নীরোগ অবস্থায় সর্বদা সুখে নিদ্রা করো। ॥৪॥

পদার্থ
হে গৃহস্থ! যে (সূকরস্য) সুন্দরভাবে কার্য সম্পাদনকারী (ইন্দ্রস্য) পরম ঐশ্বর্যবান তোমার (সূকরঃ) কার্যকে ভালোভাবে সম্পাদনকারী (দর্দর্তু) নিরন্তর বৃদ্ধি পাক। (ত্বম্) তুমি নিজে (রায়সি) লক্ষ্মীর ন্যায় আচরণ করো এবং যে সকলকে (দর্দৃहि) নিরন্তর উন্নতি প্রদান করে, অর্থাৎ সকলের বৃদ্ধি সাধন করে, সেই (স্তোতৃন্) স্তবকারী বিদ্বানদের প্রতি। (অস্মান্) আমাদের প্রতি (কিম্) কেন (দুচ্ছুনায়সে) দুষ্ট কুকুরের মতো আচরণ করছ? সেই গৃহে সুখে (নি, সু, স্বপ) নিরন্তর নিদ্রা করো। ॥৪॥

ভাবার্থ
হে গৃহস্থ! তুমি ঐশ্বর্য সঞ্চয় করে ধর্মীয় আচরণে সুন্দরভাবে বিস্তার করো এবং বিদ্বানদের সম্মান করে ধনবানদের ন্যায় আচরণ করো। আমাদের প্রতি কুকুরের মতো আচরণ কেন করছ? সুস্থ অবস্থায় সর্বদা সুখে নিদ্রা করো। ॥৪॥

এই মন্ত্র সম্পর্কে আমার মত

এখন আমরা এই মন্ত্রটি নিয়ে বিচার করি। এই মন্ত্রের দেবতা ইন্দ্র, ঋষি বশিষ্ঠ, ছন্দ বৃহতী, স্বর মধ্যম। এই ঋচা এবং এতে ব্যবহৃত কয়েকটি পদের উপর আমরা চিন্তা করি—

সূকরঃ = যঃ সুস্থু করোতি (ম.দ.ভা.)
বৃ বিদারণে = প্রচুর বৃদ্ধি করা (দর্দতু = ভৃশ বৃদ্ধি করুক) (ম.দ.ভা.)
বর্বরৃতি = অত্যন্ত বর্ষণ করা (কৃ. ৩.৩০.২১)
রায়সি = রা ইব আচরসি (ম.দ.ভা.)
দুচ্ছুনায়সে = পুষ্টেপ্লেব আচরসি (ম.দ.অ. ভা. ৭.৫৫.৩)
সারমেয় = {সরमा = সারণাৎ (নি. ১১.২৪), যা সরে তা সরলা নীতি (ম.দ.ঋ.ভা. ৪.১৬.৮), সমানরমণা (ম.দ.ঋ.মা. ৫.৪৫.৭)}—স্বার্থে তদ্ধিত।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

(ত্বম্) সারমেয়—পূর্বকথা থেকে অনুসৃত, ইন্দ্রতত্ত্বের সঙ্গে রমণকারী মরুদ্ রশ্মিসমূহ [ইন্দ্রী বৈ মরুতঃ ক্রীড়িনঃ (গো.উ. ১.২৩), মরুতো হ বৈ ক্রীড়িনো বৃত্র ইণিষ্যন্তম্ ইন্দ্রমাগত তমভিতঃ পরিচিক্রীড়ুর্মহ্যন্তঃ (শ. ২.৫.৩.২০)]— (সূকরস্য) যে নিজের সমস্ত কাজ সুন্দরভাবে ও তীব্রতার সঙ্গে সম্পন্ন করে, সেই ইন্দ্রতত্ত্ব—তীক্ষ্ণ বায়ুর সঙ্গে মিশ্রিত বিদ্যুৎকে (দর্দৃহি) প্রচুর মাত্রায় সমৃদ্ধ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে ঐ মরুদ্ রশ্মিসমূহ, বিশেষত প্রাণাপান রশ্মিসমূহ, সেই তীক্ষ্ণ ইন্দ্রতত্ত্বরূপ বিদ্যুতের অসুরতত্ত্ব প্রভৃতি প্রতিবন্ধক পদার্থের নিবারণের জন্য উপযুক্ত বিভাগও করে, যাতে ঐ ইন্দ্রতত্ত্ব সংযোজক পদার্থসমূহকে যথাযথভাবে সংকুচিত করতে পারে।
(তব) ঐ মরুদ্ রশ্মিসমূহকে (সূকরঃ) সুষ্ঠুকারী ও দ্রুতকার্যকারী ইন্দ্রতত্ত্বও (দর্দতু) নানা প্রকারে উপযুক্ত দিকসমূহে বিভক্ত করে, যাতে তারা নানাবিধ পরমাণুর মধ্যে সংযোজন ক্রিয়া সম্পাদনে সক্ষম হয়।
এই মরুদ্ রশ্মিসমূহ ও ইন্দ্রতত্ত্ব (স্তোতৃন্ ইন্দ্রস্য) সেই ইন্দ্রসংজ্ঞক বিদ্যুতের দ্বারা প্রকাশিত ও সক্রিয় পরমাণু প্রভৃতি পদার্থসমূহকে (কিম্ রায়সি) [রায়ঃ = পরবঃ বৈ রায়ঃ (শা. ৩.৩.১.৮)] ছন্দাদি রশ্মির ন্যায় তরঙ্গসদৃশ আচরণ করতে কেন প্রেরিত বা বাধ্য করে?
এর উত্তর দিতে বলা হয়েছে (অস্মান্ দুচ্ছুনায়সে) আমাদের, এখানে অর্থাৎ এই ঋচার কারণরূপ বশিষ্ঠ ঋষি অর্থাৎ প্রাণনামক প্রাণতত্ত্ব। সেই প্রাণরশ্মিসমূহ দুষ্ট অসুর রশ্মিসমূহের ভিতরে (ইব = পাদপূর্ণার্থ) সর্বত্র বিচরণ করতে করতে (নি ধু স্বপ) গভীরভাবে ব্যাপ্ত হয়ে যায়, যার ফলে অসুরতত্ত্ব দুর্বল হয়ে নিদ্রিতের ন্যায় আকাশতত্ত্বে লীন হয়ে যায়।

ভাবার্থ- ইন্দ্ররূপী বিদ্যুৎকে বিভিন্ন মরুদ্ রশ্মি, যারা তার সঙ্গে ক্রীড়া করতে করতে নিরন্তর গমন করে, অনুকূলভাবে ও প্রাচুর্যের সঙ্গে সমৃদ্ধ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পদার্থের সংযোগ ও বিযোজনের সময় বিদ্যুৎবলগুলির উপযুক্ত বিভাগও করে। অন্যদিকে ইন্দ্ররূপী বিদ্যুৎও পরমাণুগুলির সংযোগ ও বিযোজন প্রক্রিয়ার সময় মরুদ্ রশ্মিগুলির যথাযথ বিভাগ করে, যাতে তাদের মধ্যে অনুকূল আকর্ষণাদি বল উৎপন্ন হতে পারে। ঐ মরুদ্ রশ্মি ও বিদ্যুৎ—উভয়েই সংযোগ বা বিযোজনকারী পরমাণুগুলিকে ঐ প্রক্রিয়াকালে তরঙ্গীয় গতির ন্যায় গতি প্রদান করে। এর সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় সংযোজক বলযুক্ত প্রাণ নামক প্রাণরশ্মিগুলি সংযোগ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা ডার্ক এনার্জির ভিতরে ব্যাপ্ত হয়ে তাকে নিতান্ত দুর্বল করে দেয়। এর ফলে সেই সর্বথা ক্ষীণবল ডার্ক এনার্জি বিচ্ছিন্ন হয়ে আকাশে মিলিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

এই ঋচার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় প্রভাব-
আর্য ও দৈবত প্রভাব- এর উৎপত্তি বশিষ্ঠ অর্থাৎ প্রাণ নামক প্রাণরশ্মি থেকে হয়। [বশিষ্ঠঃ = প্রাণা বৈ বশিষ্ঠ ঋষিঃ (শ.৮.১.১.৬)] এতে প্রমাণিত হয় যে এই ছন্দ রশ্মির উৎপত্তির পূর্বে বিদ্যমান প্রাণরশ্মিগুলি এই ছন্দ রশ্মিকে প্রভাবিত ও সক্রিয় করতেও সহায়ক হয়। এর দেবতা ইন্দ্র হওয়ায় ইন্দ্রতত্ত্ব সমৃদ্ধ হয়, অর্থাৎ বিদ্যুৎ বলগুলির তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।

ছান্দস প্রভাব- এর ছন্দ বৃহতী হওয়ায় এটি বিভিন্ন পরমাণুকে বেঁধে তুলনামূলকভাবে বৃহৎ অণু নির্মাণে সহায়ক হয়। এর স্বর মধ্যম হওয়ায় এই ছন্দ রশ্মি সংযোগযোগ্য পরমাণুগুলির বাহ্য আবরণ—যা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির—এর মধ্যে প্রবেশ করে নিজের বন্ধক প্রভাব প্রকাশ করে।

ঋচার প্রভাব- যখন দুইটি বিদ্যুৎ-আধানযুক্ত কণাকে পরস্পরের নিকটে আনা হয়, তখন তাদের চারিদিকে তড়িৎ-চৌম্বক বল উৎপন্ন হয়। ঐ বলরশ্মিগুলির চারপাশে সূক্ষ্ম মরুদ্ রশ্মিগুলি নিরন্তর ক্রীড়া করতে করতে গমন করে। এই ধরনের মরুদ্ রশ্মি বিদ্যুৎ আধানের উপযুক্ত বলকে সমৃদ্ধ করে। এর ফলে ঋণ-আধানযুক্ত কণা আকাশতত্ত্বে আকর্ষণ সৃষ্টি করতে শুরু করে। এই ঋণ-আধানযুক্ত কণাই নিজের ভিতর থেকে নির্গত মরুদ্ রশ্মিগুলিকে যথাযথভাবে বিভক্ত করে ধন-আধানযুক্ত কণা থেকে নির্গত ধনঞ্জয় রশ্মিগুলিকে আকর্ষণ করতে সহায়তা করে। এই রশ্মিগুলি, অর্থাৎ ফিল্ড রশ্মি, উভয় সংযোগযোগ্য কণার কোনও ক্ষতি করে না; বরং তারা ঐ সময় কণাগুলিকে তরঙ্গের ন্যায় কম্পিত (Vibrate) করে। এই Vibration-এর সময় ধন-আধানযুক্ত কণা থেকে নির্গত প্রাণ নামক প্রাণরশ্মিগুলি কণাগুলির মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম রূপে বিদ্যমান Dark Energy-র উপর আঘাত করে তাকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষীণ করে আকাশে মিলিত করে দেয়। ফলে এটি সংযোগ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।

আমার আধ্যাত্মিক ভাষ্য- (ত্বং + সারমেয়) যোগসাধনায় প্রবৃত্ত মানুষের সঙ্গে প্রমাণ, বিপর্যয়, বিকল্প, নিদ্রা ও স্মৃতি নামক পাঁচ বৃত্তি (সূকরস্য) সাধককে দ্রুতগতিতে নিজের প্রভাবে আচ্ছাদিত করা পঞ্চ ক্লেশ—অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ—কে বৃদ্ধি করে, এবং (তব) ঐ পাঁচ বৃত্তিকে (সূকরঃ) সেই পঞ্চ ক্লেশও সমৃদ্ধ করে। (স্তোতৃনিন্দ্রস্য) ইন্দ্র অর্থাৎ পরমৈশ্বর্যবান পরমেশ্বরের স্তোতা সাধককে এই বৃত্তি ও ক্লেশগুলি [রায়সি = গচ্ছসি — সায়ণভাষ্য] যোগসাধকের চিত্তকে কেন চঞ্চল করে তোলে? এর উত্তর এই যে (দুচ্ছুনায়সে) এর ফলে যোগপথের পথিক মানুষ ঐ দুষ্ট বৃত্তি ও ক্লেশের প্রভাবে ভেসে গিয়ে (নি ষু স্বপ) সেই সাধনা থেকে নিতান্তরূপে বিরত হয়ে যায়। এই কারণে যোগসাধকের উচিত যে সে এই উভয়—অর্থাৎ বৃত্তি ও ক্লেশ—কে সতত অভ্যাস ও সম্যক জ্ঞানের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও নির্মূল করে তাদের প্রসুপ্তবৎ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ভাবার্থ- যখন কোনও যোগসাধক যোগমার্গে অগ্রসর হয়, তখন প্রমাণ, বিপর্যয়, বিকল্প, নিদ্রা ও স্মৃতি নামক পাঁচ বৃত্তি এবং অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ নামক পাঁচ ক্লেশ তার মনকে বারংবার অস্থির করতে থাকে। এর ফলে যোগাভ্যাসী তার পথ থেকে বিরত হতে শুরু করে। এই কারণে যোগাভ্যাসীর উচিত যে সে এই বৃত্তি ও ক্লেশ থেকে দূরে থাকার জন্য ধৈর্যপূর্বক নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়, যাতে তার যোগমার্গে প্রবৃত্তি সদা অব্যাহত থাকে।

(৩) এতদ্বা উ স্বাদীয়োং যদধিগবং ক্ষীরং বা মাংস বা তদেব নাশ্নীয়াত্ ।।৬।।
(অথর্ব.কা.৬, পর্যায়-৩, সূক্ত ৬ মন্ত্র ৮)

এই মন্ত্রে আচার্য সায়ণ ভাষ্য প্রদান করেননি।

পং. শ্রীপাদ দামোদর সাতভেলেকর ভাষ্য
পদার্থ- এতৎ বৈ উ স্বাদীয়ঃ—যা স্বাদযুক্ত, যৎ অধিগবং ক্ষীরং বা মাংসং বা—যে গরু থেকে প্রাপ্ত দুধ অথবা অন্যান্য মাংসাদি পদার্থ, তৎ এব ন আশ্নীয়াত্—তার মধ্য থেকে কোনও পদার্থ অতিথির পূর্বে খাওয়া উচিত নয়। ।।৬।।

এই বিষয়ে আমার মত
এই ভাষ্যে আর্য বিদ্বান প্রো. বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার এখানে ‘মাংস’ শব্দের অর্থ পনির করেছেন, আর পং. ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদী মননসাধক (বুদ্ধিবর্ধক) পদার্থকে মাংস বলেছেন। সকলেই এই মন্ত্র এবং সূক্তের অন্যান্য মন্ত্রের বিষয় অতিথি-সৎকার বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এই মন্ত্রের দেবতা পং. ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদীর দৃষ্টিতে অতিথি ও অতিথিপতি, আর পং. সাতভেলেকরের মতে অতিথিবিদ্যা। পং. সাতভেলেকর এর ঋষি ব্রহ্মা বলেছেন। ছন্দ পিপীলিকা মধ্য্যা গায়ত্রী।
[ব্রহ্মা = মনো বৈ যজ্ঞস্য ব্রহ্মা (শ.১৪.৬.১.৭), প্রজাপতিবৈ ব্রহ্মা (গো.উ.৫.৮)। অতিথিঃ = যো বৈ ভবতি যঃ শ্রেষ্ঠতামশ্নুতে স বা অতিথির্ভবতি (ঐ.আ.১.১.১)। অতিথিপতিঃ = অতিথিপতির্বাবাতিথেরীশে (ক.৪৬.৪ - ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত)। পিপীলিকা = পিপীলিকা পেলতের্গতিকর্মণঃ (দৈ.৩.৮)। স্বাদু = প্রজা স্বাদু (ঐ.আ.১.৩.৪), প্রজা বৈ স্বাদুঃ (জৈ.ব্রা.২.১৪৪), মিথুনং বৈ স্বাদু (ঐ.আ.১.৩.৪)। ক্ষীরম্ = যদত্যক্ষরত্ তৎ ক্ষীরস্য ক্ষীরত্বম্ (জৈ.ব্রা.২.২২৮)। মাংসম্ = মাংস বৈ পুরীষম্ (স.৮.৬.২.১৪), মাংস মানন বা মানস বা মনোऽস্মিন সীদতীতি বা (নি.৪.৩), মাংস সাদনম্ (শ.৮.১.৪.৫)]

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য
(এতৎ বা স্বাদীয়ঃ) এই যে অতিথি অর্থাৎ সদা গমনকারী প্রাণ ও ব্যান রশ্মি এবং অতিথিপতি অর্থাৎ প্রাণোপান রশ্মির নিয়ন্ত্রক সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি স্বাদু-যুক্ত হয়, অর্থাৎ বিভিন্ন ছন্দাদি রশ্মির মিথুন গঠন করে নানাবিধ পদার্থ উৎপন্ন করতে সহায়ক হয়। (যৎ) যে প্রাণ, ব্যান ও সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি (অধিগবং ক্ষীরং বা মাংসং বা) গৌ অর্থাৎ ‘ওঁ’ ছন্দ রশ্মিরূপ সূক্ষ্মতম বাক্‌তত্ত্বে আশ্রিত থাকে এবং নিজ পুরীষ—পূর্ণ সংযোজক বল [পুরীষম্ = পূর্ণ বলম্ (ম.দ.য.ভা. ১২.৪৬), ঐন্দ্র হি পুরীষম্ (শ.৮.৭.৩.৭), অন্ন পুরীষম্ (শ.৮.১.৪.৫)]—সহ নিরন্তর নানা রশ্মি বা পরমাণু প্রভৃতি পদার্থের উপর ঝরে পড়তে থাকে। এই ‘ওঁ’ রশ্মিগুলির ঝরনাকেই ক্ষীরত্ব এবং পূর্ণ সংযোজ্যতাকেই মাংসত্ব বলা হয়। এখানে ‘মাংস’ শব্দটি এই ইঙ্গিত দেয় যে এই ‘ওঁ’ রশ্মিগুলি মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সর্বাধিক ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, কিংবা মনস্তত্ত্ব এতে সর্বাধিক পরিমাণে অধিষ্ঠিত থাকে। এই ‘ওঁ’ রশ্মিগুলি প্রাণ, ব্যান ও সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির উপর ঝরে পড়ে অন্যান্য স্থূল পদার্থের উপর পতিত হতে থাকে। (তৎ এব ন অশ্নীয়াত্) এই কারণে বিভিন্ন রশ্মি বা পরমাণু প্রভৃতি পদার্থের মিথুন গঠনের প্রক্রিয়া নষ্ট হয় না। এই প্রক্রিয়া অতিথিরূপ প্রাণ-ব্যানের মিথুন গঠন বা এদের দ্বারা বিভিন্ন মরুদাদি রশ্মি আকর্ষণের প্রক্রিয়া শান্ত হওয়ার পূর্বে নষ্ট হয় না; বরং তার পরে, অর্থাৎ দুই কণার সংযোগ সম্পন্ন হওয়ার পর এবং মিথুন গঠনের প্রক্রিয়া নষ্ট বা বন্ধ হতে পারে—এটি জানা উচিত।

এই ঋচার সৃষ্টিতে প্রভাব
আর্ষ ও দৈবত প্রভাব- এর ঋষি ব্রহ্মা হওয়ায় ইঙ্গিত মেলে যে এর উৎপত্তি মন ও ‘ওঁ’ রশ্মির মিথুন থেকেই হয়। এই মিথুন এই ছন্দ রশ্মিকে নিরন্তর ও ঘনিষ্ঠভাবে প্রেরণা জোগাতে থাকে। এর দৈবত প্রভাবে প্রাণ, ব্যান ও সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে নানাবিধ সংযোগ কর্মকে সমৃদ্ধ করে।

ছান্দস প্রভাব- এর ছন্দ পিপীলিকা মধ্য্যা গায়ত্রী হওয়ায় এই ছন্দ রশ্মি বিভিন্ন পদার্থের সংযোগকালে তাদের মধ্যে তীব্র তেজ ও বলের সঙ্গে সদা সঞ্চরণ করে। এর ফলে ঐ পদার্থগুলির মধ্যে বিভিন্ন তেজ ও বল উৎপন্ন হতে থাকে।

ঋচার প্রভাব- যখন দুই কণার সংযোগ হয়, তখন তাদের মধ্যে প্রাণ, ব্যান ও সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মির বিশেষ অবদান থাকে। এই রশ্মিগুলি বিভিন্ন মরুদ্ রশ্মি দ্বারা সংকুচিত আকাশতত্ত্বকে পরিব্যাপ্ত করে। একই সময়ে এই রশ্মিগুলির উপর সূক্ষ্ম ‘ওঁ’ রশ্মি সিঞ্চন করে এগুলিকে অধিক বলযুক্ত করে তোলে। এর ফলে দুই কণার মধ্যবর্তী ফিল্ড নিরন্তর কার্যকর হয়ে উভয় কণাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য
(এতূ বা স্বাদীয়ঃ) এই যে স্বাদযুক্ত ভোজ্য পদার্থ। (যদধিগবং ক্ষীরং বা) যে গরু থেকে প্রাপ্ত দুধ, ঘৃত, মাখন, দই প্রভৃতি পদার্থ, অথবা (মাংসম্ বা) মনন, চিন্তন প্রভৃতি কাজে সহায়ক ফল, মেওয়া ইত্যাদি পদার্থ। * (তদেব ন অশ্নীয়াত্) সেই পদার্থগুলি অতিথিকে খাওয়ানোর পূর্বে নিজে খাওয়া উচিত নয়; অর্থাৎ অতিথিকে খাওয়ানোর পরেই খাওয়া উচিত। এখানে অতিথির পূর্বে না খাওয়ার প্রসঙ্গ পূর্ববর্তী মন্ত্র থেকেই প্রমাণিত, যেখানে বলা হয়েছে—
“অশিতাবত্যতিয়াবশ্নীয়াত্” = অশিতাবতি অতিথৌ অশ্নীয়াত্।
এই প্রসঙ্গটি পূর্বোক্ত আধিদৈবিক ভাষ্যেও উপলব্ধি করা উচিত।

  • [‘মাংসম্’ পদটির বিবেচনা :- এই বিষয়ে সর্বপ্রথম আর্য বিদ্বান পং. রঘুনন্দন শর্মা প্রণীত ‘বৈদিক সম্পত্তি’ নামক গ্রন্থ থেকে আয়ুর্বেদের কয়েকটি গ্রন্থ উদ্ধৃত করে বলেন—
    “সুশ্রুত-সংহিতায় আম ফলের বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে—
    আপবয়ে ঘৃতফলে স্বাথ্যস্থিমজ্জানঃ সূক্ষ্মত্বান্নোপলভ্যন্তে পক্বে ত্বাবিভূতা উপলভ্যন্তে।
    অর্থাৎ আমের কাঁচা ফলে শিরা, অস্থি ও মজ্জা প্রভৃতি প্রতীয়মান হয় না, কিন্তু পেকে গেলে সবই প্রকাশিত হয়ে ওঠে।”

এখানে গুটলির তন্তু রোগ, গুটলি হাড়, রেশে স্নায়ু এবং চর্বিযুক্ত অংশকে মজ্জা বলা হয়েছে। একই প্রকারের বর্ণনা ভাবপ্রকাশ গ্রন্থেও পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে—

আশাস্যানুফলে ভবন্তি যুগপন্মাংসাস্থিমজ্জাদয়ো লক্ষ্যন্তে ন পৃথক্ পৃথক্ তনুতয়া পুষ্টাস্ত এবং স্ফুটাঃ।
এবং গর্ভসমুদনে ত্যায়নাঃ সর্বে ভবন্ত্যেকদা লক্ষ্যাঃ সূক্ষ্মতয়া ন সেং প্রকটতাগায়ান্তি বৃদ্ধিহতাঃ।

অর্থাৎ, যেমন কাঁচা আমের ফলে মাংস, অস্থি ও মজ্জা ইত্যাদি পৃথক পৃথকভাবে দেখা যায় না, কিন্তু পাকলে সেগুলি স্পষ্ট হয়; তেমনি গর্ভাবস্থার প্রারম্ভে মানুষের অঙ্গসমূহও স্পষ্ট হয় না, কিন্তু বৃদ্ধি পেলে তখন পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

এই দুইটি প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ফলের মধ্যেও মাংস, অস্থি, নাড়ি ও মজ্জা প্রভৃতি ঠিক সেইভাবেই বলা হয়েছে, যেভাবে প্রাণীদের শরীরে বলা হয়। বৈদিক চিকিৎসাশাস্ত্রের এক গ্রন্থে বলা হয়েছে—

প্রস্থ কুমারিকামাংসম্।

অর্থাৎ এক সের কুমারিকার মাংস। এখানে পী-কুমারকে কুমারিকা এবং তার শাঁসকে মাংস বলা হয়েছে।

বলবার তাৎপর্য এই যে, যেমন ঔষধি ও পশুর নাম একই শব্দে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তেমনি ঔষধি ও পশুর দেহাবয়বও একই শব্দে অভিহিত হয়েছে। এই প্রকার বর্ণনা আয়ুর্বেদের গ্রন্থসমূহে ভরপুর রয়েছে। শ্রীবেঙ্কটেশ্বর প্রেস, মুম্বাই থেকে প্রকাশিত ‘ঔষধিফলন’ গ্রন্থে নীচে উল্লিখিত সমস্ত পশুসংশ্লিষ্ট নাম ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে—এ কথা দেখানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি শব্দ উদ্ধৃত করা হল—

বৃষভ — ঋষভকন্দ
সিংডি — কাটেলি, বাসা
হরিত — হস্তিকন্দ
শ্বান — কুত্তাঘাস, গন্ধিপর্ণ
খর — খরপর্ণনী
চপা-ঝিল্লি — বাক্কলের ভেতরের জাল
মার্জার — চিল্লিবাস, চিত্তা
চাক — কামাচি
অস্থি — গুটলি
ময়ূর — ময়ূরশিষ্ঠা
বারাহ — বরাহীকল্প
মাংস — গুঁড়া, জটামাংসী
বীমূ — বিসুবুটি
মহিষ — মহিমাক্ষ, গুগ্গুল
ধর্ম — অক্কল
সর্প — সর্পিণীবুটি
রপেন — স্পেনপন্টি (ইন্তি)
স্নায়ু — রেশা
অশ্ব — অশ্বগন্ধা, আজমোয়া
মেষ — গোবশাফ
নস — নসবুটি
নকুল — ভাকুলীবুটি
ফুলফুট (টি) — শাল্মলীবৃক্ষ
সেদ — মেদা
হংস — হংসপবী
গর — সৌগন্ধিক তৃণ
লোম (শা) — জটামাংসী
মৎস — মৎসাক্ষী
মাত্রি — পামরা
হৃদ — বারচিনি
মূষক — মৃপাকণী
মৃগ — সহদেবী, ইন্দ্রায়ণ, জটামাংসী, কর্পূর
পেশী — জটামাংসী
গৌ — বলোমি
পশু — অম্বাড়া, মোচা
রুচির — কেশর
মহাজ — বড় আজওয়াইন
কুমারী — ধীকুমার
আলম্ভন — স্পর্শ

এই তালিকায় সমস্ত পশু-পাখি ও তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম এবং সমস্ত উদ্ভিদ ও তাদের অঙ্গের নাম একই শব্দে নির্দেশিত হয়েছে। এই অবস্থায় কোনও একটি শব্দ থেকে কেবল পশু ও তার অঙ্গই গ্রহণ করা যায়—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না।

বিবেচক পাঠক এখানে ভাবুন, এমন পরিস্থিতিতে ‘মাংসম্’ পদ দ্বারা গরু প্রভৃতি পশু বা পাখির মাংস গ্রহণ করা কি নিছক মূর্খতা নয়? এখানে কোনও পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত, বৈদিক বা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসের উপহাসকারী তথাকথিত প্রবুদ্ধ ব্যক্তি কিংবা মাংসাহারের সমর্থক সংস্কৃত ভাষার এই ধরনের নাম নিয়ে ব্যঙ্গ না করেন—এই কারণে আমরা ইংরেজি ভাষা থেকেও কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি—

১. Lady Finger বলতে ভেন্ডি (ভিন্ডি) বোঝায়। যদি খাদ্য প্রসঙ্গে কেউ এর অর্থ কোনও মহিলার আঙুল বলে ধরে নেয়, তবে কি তা অপরাধ নয়?
২. Vegetable বলতে যেকোনো শাক বা উদ্ভিদ বোঝায়। অথচ Chamber Dictionary-তে এর অর্থ Dull understanding person-ও দেওয়া হয়েছে। যদি সবজি খেতে থাকা কাউকে দেখে কেউ তাকে মন্দবুদ্ধির মানুষকে খাওয়া হচ্ছে বলে ধরে নেয়, তবে কি তা মূর্খতা নয়?
৩. আয়ুর্বেদে এক প্রকার উদ্ভিদ আছে ‘গোবিষ’, যাকে হিন্দিতে কাকমারি এবং ইংরেজিতে Fish Berry বলা হয়। যদি কেউ এর অর্থ মাছের রস ধরে নেয়, তবে তাকে কী বলা উচিত?
৪. Potato বলতে আলু বোঝায়, আবার এর অর্থ A mentally handicapped person-ও হয়। তবে কি আলু খাওয়া মানুষকে মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষ ভক্ষণকারী বলে ধরা হবে?

৫. Hag — এটি এক প্রকার ফলের নাম। আবার Hag শব্দ দ্বারা কুৎসিত বৃদ্ধা নারীকেও বোঝানো হয়। তাহলে এখানেও কি কেউ Hag ফলের অর্থ উল্টো করে গ্রহণ করার চেষ্টা করবে?

এখন আমরা এই বিষয়ে চিন্তা করি যে, ফলের শাঁসকে কেন মাংস বলা হয়েছে। যেমন আমরা আমাদের আধিদৈবিক ভাষ্যে লিখেছি যে, পূর্ণবলযুক্ত বা পূর্ণবলসম্পন্ন পদার্থকেই মাংস বলা হয়। পৃথিবীতে সমস্ত মানুষ ফলের শাঁসই ব্যবহার করে, অন্য অংশ নয়, কারণ ফলের সারভাগ সেটিই। সেই অংশই যৎ-বীর্যের ভাণ্ডার, অর্থাৎ তার ভক্ষণে চল-বীর্য-বুদ্ধি প্রভৃতির বৃদ্ধি হয়।

এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে—প্রাণীদের শরীরের মাংসকে কেন মাংস বলা হয়? এর উত্তর এই যে, যে কোনও প্রাণীর শরীরের বল তার পেশীতেই নিহিত থাকে, সেই কারণেই একে মাংস বলা হয়। যেমন শাকাহারী প্রাণীরা ফলের শাঁসই বিশেষভাবে ভক্ষণ করে, তেমনি সিংহাদি মাংসাশী প্রাণীরা প্রাণীর দেহের মাংস অংশই বিশেষভাবে ভক্ষণ করে। উভয়ের মধ্যেই এই সাদৃশ্য রয়েছে। ফলের ক্ষেত্রে যে স্থান শাঁসের, প্রাণীর শরীরে সেই একই স্থান মাংসের।

মানুষ স্বভাবতই কেবল শাকাহারী ও দুগ্ধাহারী প্রাণী। এই কারণে বেদাদি শাস্ত্রে প্রাণীদের মাংস ভক্ষণের আলোচনা করা বেদাদি শাস্ত্রের পরম্পরা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতার পরিচায়ক। এই ধরনের আলোচনা যারা করে, তারা তথাকথিত বেদজ্ঞ—বিদেশি হোক বা স্বদেশি—আমাদের দৃষ্টিতে তারা বেদাদি শাস্ত্রের বর্ণমালাও জানে না, যদিও তারা ব্যাকরণাদি শাস্ত্রের যত বড় অধ্যেতা-অধ্যাপকই হোক না কেন।

মাংসাহার বিষয়ে আমরা পৃথকভাবে একটি গ্রন্থ রচনার কথা ভবিষ্যতে বিবেচনা করব, যেখানে সারা বিশ্বের মাংসাহারীদের সমস্ত সন্দেহের সমাধান করা হবে।

প্রশ্ন — বেদে ‘মাংসম্’ পদের অর্থ প্রাণীদের মাংস কখনওই হতে পারে না—এটিকে কি আপনার পূর্বাগ্রহ বলে গণ্য করা হবে না, যা কেবল শাকাহারের আগ্রহবশতই করা হয়েছে?

উত্তর — যে পরম্পরায় সাধারণ যোগসাধকের জন্য অহিংসাকে প্রথম সোপান বলা হয়েছে, যেখানে মন, বাক্য ও কর্ম দ্বারা সর্বদা সকল প্রাণীর প্রতি বৈর ত্যাগ অর্থাৎ প্রীতির বার্তা দেওয়া হয়েছে, সেখানে শিখপুরুষ যোগী এবং সেই ধারায় নিজেদের যোগসাধনার দ্বারা ঈশ্বর ও মন্ত্রের সাক্ষাৎধর্মপ্রাপ্ত মহর্ষিগণ, তাঁদের বংশধর এবং দেবরূপ ঈশ্বরীয় সত্তাসমূহের দ্বারা হিংসার বার্তা দেওয়া—এটি যদি মূর্খতা ও দুষ্টতা না হয়, তবে আর কী?

যারা বৈদিক অহিংসার বৈজ্ঞানিক রূপ দেখতে চান, তারা পতঞ্জলি যোগদর্শনের ব্যাসঋষির ভাষ্য স্বয়ং পড়ে দেখুন। এই ঐতরেয় ব্রাহ্মণে যেখানে প্রায় সকল ভাষ্যকার পশুদের নৃশংস বধ এবং তাদের অঙ্গ ভক্ষণের বিধান করেছেন, সেখানে আমরা তার কী গভীর বিজ্ঞান প্রকাশ করেছি—তা পাঠক এই গ্রন্থের সম্পূর্ণ অধ্যয়ন থেকে জানতে পারবেন। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আমরা বেদ থেকেই কিছু প্রমাণ দিচ্ছি—

যদি নো গা হংসি য্যশ্ব যদি পুরুষম্। তে ত্যা সীসেন বিধ্যামঃ।
(অথর্ব ১.১৬.৪)

অর্থাৎ, তুমি যদি আমাদের গরু, ঘোড়া অথবা মানুষকে হত্যা কর, তবে আমরা তোমাকে সীসা দ্বারা বিদ্ধ করব।

মা নো হিংসিষ্ট দ্বিপদো মা চতুষ্পদঃ।
(অথর্ব ১১.২.১)

অর্থাৎ, আমাদের মানুষ ও পশুদের হত্যা কোরো না।

অন্যত্র বেদে—

ইম্ মা হিংসীর দ্বিপাদ পশুম্।
(যজুঃ ১২.৪৭)

অর্থাৎ, এই দুই খুরযুক্ত পশুর হিংসা কোরো না।

ইমং না হিংসীর একশক পশুম্।
(যজুঃ ১৩.৪৮)

অর্থাৎ, এই এক খুরযুক্ত পশুর হিংসা কোরো না।

যজমানস্য পশুন্ পাহি।
(যজুঃ ১.১)

যজমানের পশুদের রক্ষা কর।

আপনি বলতে পারেন—এগুলি যজমান বা কোনও বিশেষ মানুষের পোষা পশুর কথা, সকল প্রাণীর কথা নয়। এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আরও প্রমাণ—

মিত্রস্যাহ পশুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে।
(যজুঃ ৩৬.১৮)

অর্থাৎ, আমি সকল প্রাণীকে মিত্রের ন্যায় দেখি।

মা হিংসীর্তন্যা প্রজাঃ।
(যজুঃ ১২.৩২)

এই শরীর দ্বারা প্রাণীদের হত্যা কোরো না।

মা সেবত।
(ঋগ্‌ ৭.৩২.৮) — অর্থাৎ, হিংসা কোরো না।

মহর্ষি জৈমিনির পর সর্বশ্রেষ্ঠ বেদজ্ঞ মহর্ষি দয়ানন্দের মাংসাহার বিষয়ে মতামতও পাঠক পড়ুন—

“মধ্যমাংসাহারী ম্লেচ্ছ, যাদের শরীর মধ্যমাংসের পরমাণুতে পূর্ণ, তাদের হাতের খাদ্য গ্রহণ কোরো না।”
“এই পশুগুলিকে হত্যা করে যে ব্যক্তি, তাকে সকল মানুষের ছায়া নষ্টকারী বলে জানবে।”
“যখন থেকে বিদেশি মাংসাহারীরা এই দেশে এসে গোরু প্রভৃতি পশু হত্যা করে মদ্যপ রাজ্যাধিকারী হয়েছে, তখন থেকে ক্রমে আর্যদের দুঃখের সীমা বৃদ্ধি পেয়েছে।”
সত্যার্থপ্রকাশ, দশম সমুল্লাস

দেখুন, দয়ার সাগর ঋষি দয়ানন্দজী কী বলেন—

“পশুদের গলা ছুরি দিয়ে কেটে যারা নিজেদের পেট ভরে, তারা সমগ্র বিশ্বের ক্ষতি করে। পৃথিবীতে কি তাদের চেয়েও বড় বিশ্বাসঘাতক, অনুপকারী ও দুঃখদায়ক পাপী আর কেউ আছে?”
“হে মাংসাহারীরা! কিছু সময় পরে যখন পশু পাবে না, তখন কি মানুষের মাংসও ছাড়বে না?”
“হে ধর্মপ্রাণগণ! আপনারা কেন এই পশুগুলোর রক্ষা দেহ, মন ও বন দ্বারা করেন না?”
(গোকরুণানিধি)

বুদ্ধিমান ও নিরপেক্ষ পাঠকদের মাংসাহারের ভ্রান্তি এ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যাবে।

আমার আধ্যাত্মিক ভাষ্য
(মাংসমূ = মন্যতে জায়তে’নেন তৎ মাংসমূ—উ.কো.৩.৬৪; মাংস পুরীষম্—শ.৮.৭.৪.১৮; (পুরীষম্ = পুরীষং পূরণাত্ পূরয়তের্বা—নি.২.২২; সর্বত্রাভিব্যাপ্তম্—ম.দ.ভা.৩৮.২১; যৎ পুরীষ স ইন্দ্রঃ—শ.১০.৪.১.৭; স এষ প্রাণ এবং যৎ পুরীষম্—শ.৮.৭.৩.৬))

(একতূ বা উ স্বাদীয়ঃ) যোগী পুরুষের সম্মুখে পরমানন্দের আস্বাদন করানো উপাদান বিদ্যমান থাকে, যার দ্বারা জীবের পরমাত্মার সঙ্গে সাযুজ্য থাকে। (যদিগয়ে ক্ষীর থা মাংস বা) এই উপাদানগুলো যোগীর মন প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই উপাদানগুলো কী—এর উত্তর এই যে, সর্বত্র অভিব্যাপ্ত পরমৈশ্বর্যসম্পন্ন ইন্দ্ররূপ পরমাত্মা থেকে ঝরতে থাকা ‘ওম’ বা গায়ত্রী প্রভৃতি বেদের ঋচাগুলিই সেই উপাদান, যা যোগীর ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণে নিরন্তর সঞ্চারিত হয়। যোগী যখন সেই আনন্দময় ঋচাগুলোর রসাস্বাদন করতে থাকে, তখন সে পরমানন্দের অনুভব করে। (তদেব ন অশ্নীয়াতু) যতক্ষণ না অতিথিরূপ প্রাণতত্ত্ব—যা যোগীর মস্তিষ্ক ও শরীরে সদা সঞ্চরণ করে—ঐ ঋচাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হয়, ততক্ষণ যোগী সেই আনন্দের পূর্ণ অনুভব করতে পারে না। এখানে অতিথি-সংক্রান্ত পূর্ব প্রসঙ্গ পূর্ববৎ বোঝা উচিত।

ভাবার্থ—
যখন কোনো যোগী যোগসাধনা করে এবং এ উদ্দেশ্যে প্রণব বা গায়ত্রী প্রভৃতির যথাবিধি জপ করে, তখন সর্বত্র অভিব্যাপ্ত ইন্দ্ররূপ ঈশ্বর থেকে নিরন্তর প্রবাহিত ‘ওম’ রশ্মি সেই যোগীর অন্তঃকরণ ও প্রাণের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এর ফলে সে যোগী সেই রশ্মির রসাস্বাদন করতে করতে আনন্দে নিমগ্ন হয়ে যায়।

(৪) ন সেশে যস্য রম্বতে অন্তরা সক্থ্যাং কপৃত্।
সেদীশে যস্য রোমশং নিষেদুষো বিজৃম্ভতে বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরা॥ (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)

সায়ণ ভাষ্য—
যে ব্যক্তির কপৃৎ (প্রজনন ইন্দ্রিয়) স্ত্রীর উরুর মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলে থাকে, সে স্ত্রীসংগমে ইচ্ছুক হলেও সক্ষম হয় না। কিন্তু যে ব্যক্তি শয্যাগত অবস্থায়ও যার রোমশ উপস্থ (প্রজনন ইন্দ্রিয়) দৃঢ় ও প্রসারিত থাকে, সেই ব্যক্তি স্ত্রীসংগমে সক্ষম। যার স্বামী ইন্দ্র সকলের থেকে শ্রেষ্ঠ।

পণ্ডিত বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী ভাষ্য—
পদার্থ— (ন) না, (সঃ) সেই জীব, (ঈশে) ইন্দ্রিয় প্রভৃতির উপর শাসন বা বশ করতে পারে, (যস্য) যার, (কপৃত্) প্রজনন ইন্দ্রিয়, (নিরন্তর) সদা, (সবধ্যাঃ) নারীর উরুর, (অন্তরা) মধ্যে, (রম্বতে) ঝুলে থাকে। (সঃ) সেই, (ইৎ)ই, (ঈশে) বশে রাখতে পারে, (নিষেদুষঃ) সদা দৃঢ় ও স্থির, (যস্য) যার, (রোমশম্) প্রজনন ইন্দ্রিয়, (বিজৃম্ভতে) তেজে প্রসারিত ও স্থির থাকে। (ইন্দ্রঃ) পরমৈশ্বর্যবান পরমেশ্বর, (বিশ্বস্মাদ্) সকল পদার্থের তুলনায়, (উত্তরঃ) সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট।

ভাবার্থ—
যে মানুষ বা জীব সদা নারীর সঙ্গে ভোগে নিমগ্ন থাকে, সে নিজের ইন্দ্রিয়গুলোর উপর শাসন বা নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে পারে না। কিন্তু যে ব্রহ্মচর্য প্রভৃতি তপস্যার দ্বারা নিজের ইন্দ্রিয়কে দৃঢ় ও স্থির রাখে, সে ইন্দ্রিয়সংযম করতে সক্ষম হয়। পরমৈশ্বর্যবান প্রভু সকল পদার্থের তুলনায় সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট। ॥১৬॥

(৫)
ন সে‌শে যস্য রোমশং নিষেদুষোঁ বিজৃম্ভতে।
সেদীশে যস্য রম্বতে’তরা সক্থ্যা³ কপৃদ্বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরা।। (ঋ. ১০.৮৬.১৭)

সায়ণ ভাষ্য
যে ব্যক্তি স্ত্রীসংগম করতে সক্ষম নয়, যার নিকট শয়নরত অবস্থায় রোমশ উপস্থ (প্রজনন অঙ্গ) বিজৃম্ভিত হয়ে প্রসারিত হয়ে যায়, সে ব্যক্তি স্ত্রীসংগমে সমর্থ হয় না। কিন্তু সেই ব্যক্তিই স্ত্রীসংগমে সক্ষম হয়, যার কপৃত্ প্রজনন অঙ্গ স্ত্রীর উরুর মধ্যবর্তী স্থানে স্থিত হয়ে লম্বিত থাকে। অন্যটি ভিন্নার্থক। পূর্বোক্ত ঋচায় যিকপ্সু ইন্দ্রাণী ইন্দ্রকে উদ্দেশ করে বলে, আবার এই ঋচায় ইন্দ্রাণী ইন্দ্রকে উদ্দেশ করেই বলে—এতে কোনো বিরোধ নেই।।

পণ্ডিত বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী ভাষ্য
পদার্থ—
(নঃ) নয়, (সঃ) সে, (ঈশে) সক্ষম হয় স্ত্রীসংগম ও সন্ততি উৎপাদনে, (নিষেদুষঃ) শয়নরত অবস্থায়, (যস্য) যার গৃহস্থের, (রোমশম্) প্রজনন ইন্দ্রিয়, (বিজুম্ভতে) স্ত্রীসংগমের পূর্বেই প্রসারিত হয়ে বীর্যস্খলিত হয়ে যায়; (স ইত্) সেই-ই, (ঈশে) এই কার্যে সক্ষম হয়, (যস্য) যার, (কপৃত্) প্রজনন ইন্দ্রিয়, (স্থ্যা) উরুর, (অন্তরা) মধ্যবর্তী স্থানে, (রম্বতে) লম্বা ও উর্ধ্বস্থ হয়ে ভিতরে প্রবেশ করে; (ইন্দ্রঃ) পরমৈশ্বর্যবান পরমেশ্বর, (বিশ্বস্মাত্) সকল পদার্থের তুলনায়, (উত্তরঃ) সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট।

ভাবার্থ—
স্ত্রীসংগম ও সন্ততি উৎপাদনে সেই ব্যক্তি সক্ষম নয়, যার শয়নরত অবস্থায় প্রজনন ইন্দ্রিয় স্ত্রীসংগমের পূর্বেই বীর্যস্খলিত হয়ে যায়। সেই ব্যক্তিই সক্ষম, যার প্রজনন ইন্দ্রিয় যোনির ভিতরে লম্বা ও উর্ধ্বস্থ হয়ে প্রবেশ করে। পরমৈশ্বর্যবান প্রভু সকল পদার্থের তুলনায় সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট। ॥১৭॥

স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক ভাষ্য
সং. অন্বয়ার্থ—
ইষ্ট গার্হস্থ্যমধিকরোতি (যস্য কপৃত্) যস্য সুখ পৃণাতি দদাতি যৎ অঙ্গম্ “ঘৃণাতি দানকর্মা” [নিঘ. ৩.২০], ক পূর্বকাত্ পৃ ধাতোঃ ক্বিপি রূপং তুকঃ চ; (সক্থ্যা-অন্তরা রম্বতে) সক্থিনী অন্তরা লম্বতে; (সঃ-ইত্-ঈশে) স এব গার্হস্থ্যমধিকরোতি; (যস্য নিষেদুষঃ) যস্য নিষদতঃ নিকট শয়ানস্য; (রোমশ বিজৃম্ভতে) রোমশমঙ্গ বিজৃম্ভণ করোতি বিশেষ গাত্রবিনাম করোতি; (ন সঃ ঈশে) ন হি স খলু গার্হস্থ্যমধিকরোতি; (যস্য নিষেদষুঃ—রোমশ বিজৃম্ভতে) যস্য নিকটং শয়ানস্য রোমশমঙ্গ গাত্রবিনাম করোতি; (সঃ-ইত্-ঈশে) স এব গার্হস্থ্যং করোতি; (যস্য সবধ্যা-অন্তরা কপৃত্-রম্যতে) যস্য নিকট শয়ানস্য সবিদনী অন্তরা সুখদায়কম্ লম্বতে রোমশ্বাঙ্গস্য বিজৃম্ভরণ সুখপ্রদাঙ্গস্য যোনি লম্বনজ্য।।১৬–১৭।।

ভা. অন্বয়ার্থ—
(ন সঃ-ঈশে) সে অধিকার লাভ করে না, গার্হস্থ্যভাবও প্রাপ্ত হয় না, (যস্য কপৃত্) যার সুখদায়ক অঙ্গ, (সন্ধ্যা-অন্তরা লম্বতে) উভয় উরু-জঙ্ঘার মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলে থাকে। (সঃ-ইত্-ঈশে) সেই-ই গার্হস্থ্য কর্মে অধিকারী হয়। (যস্য নিষেদষুঃ) যার নিকট শয়নরত অবস্থায়, (রোমশ বিজৃম্ভতে) রোমযুক্ত অঙ্গ ফড়ফড় করে। (ন সঃ-ঈশে) সে গার্হস্থ্য কর্মে অধিকারী হয় না। (যস্য নিষেদযুঃ—রোমশং বিজৃম্ভতে) যার নিকট শয়নরত অবস্থায় রোমযুক্ত অঙ্গ ফড়ফড় করে। (সঃ-ইত্-ঈশে) সেই-ই গার্হস্থ্য কর্মে অধিকারী হয়। (যস্য সক্থ্যা-অন্তরা কপৃত্-লম্বতে) যার নিকট শয়নের সময় উরু-জঙ্ঘার মধ্যবর্তী স্থানে সুখদায়ক অঙ্গ বিজৃম্ভিত হয়—সে-ই গার্হস্থ্য কর্মে অধিকারী হয়।।

বড়ই দুঃখের বিষয় যে, মহর্ষি দয়ানন্দের অনুসারী বলে পরিচিত এই দুই আর্য বিদ্বান বেদভাষ্য করার অতিউৎসাহে মহর্ষি দয়ানন্দের যোগিক শৈলী অনুসরণ করার প্রতিভার অভাবে ভয়াবহ অশ্লীল সায়ণ ভাষ্যই অবিকল গ্রহণ করে বেদকে কলঙ্কিত করেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, বিদেশি ভাষ্যকার গ্রিফিথ—যার বেদার্থে কোনো যোগ্যতা ছিল না এবং যার বেদ ও ভারতের প্রতি মনোভাবও ভালো ছিল না—সে এই মন্ত্রগুলোর ভাষ্যকে অশ্লীল ও অসভ্য মনে করে পরিত্যাগ করেছে। সে ঋগ্বেদ ভাষ্যের এই সূক্তে পাদটীকায় লিখেছে—
“I pass over stanzas 16 and 17, which I cannot translate into decent English.”

আশ্চর্যের বিষয়, উপর্যুক্ত এই দুই আর্য বিদ্বানের কাছে এতে কোনো অসভ্যতা বা অশ্লীলতা প্রতীয়মান হয়নি। লক্ষণীয় যে, এটি কামবিজ্ঞানের কোনো গুরুতর অর্থ নয়। বিজ্ঞানের নিজস্ব একটি ভাষা ও বিষয়প্রতিপাদনের গাম্ভীর্য থাকে, যা কেবল বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি বুঝতে পারেন; সাহিত্যিক ব্যক্তি সেই গাম্ভীর্য কখনো অর্জন করতে পারেন না—তার কাছে প্রত্যেক অশ্লীল ও লম্পটতার কথায় কামবিজ্ঞানই প্রতীয়মান হয় বা হতে পারে। আমরা বিশ্বের তথাকথিত বেদজ্ঞ পণ্ডিতদের ঘোষণাপূর্বক বলতে চাই—এমন অর্থকারীরা বেদার্থে প্রবেশই করেননি। অস্তু।

শ্রী পণ্ডিত জয়দেব শর্মা, বিদ্যালঙ্কার, মীমাংসাতীর্থ ভাষ্য
ভাষ্য—
(যস্য কপৃত্) যার সুখগ্রাহী অন্তঃকরণ, (সক্থ্যোঃ অন্তরা) আসক্তিজনক রাগ-দ্বেষাদির মধ্যে, (রম্বতে) ঝুলে পড়ে, মোহিত হয়ে যায়—(ন সঃ ইত্ ঈশে) সে শাসন করতে পারে না। প্রত্যুত্তর, (নিষেদুষঃ) নিত্য ও নিরন্তর নিগূঢ়ভাবে বিদ্যমান, (যস্য) যার নির্মিত, (রোমশং) লোমের ন্যায় কিরণযুক্ত সূর্যবিম্ব, (বিজৃম্ভতে) গর্বপূর্বক দীপ্ত হয়ে ওঠে—সেই (ইন্দ্রঃ) সমগ্র জগতের অধিপতি, (বিশ্বস্মাত্ উত্তরঃ) সর্বোত্তম। ॥১৬॥

শ্রী পণ্ডিত শিবশংকরজি কাব্যতীর্থ
“বৈদিক ইতিহাসার্থ সিদ্ধান্ত” গ্রন্থ থেকে—

পুনরায় ইন্দ্রাণী উত্তেজনা বৃদ্ধি করে বলে—হে ইন্দ্র! আপনি যে আশ্বাসমূলক কথা বলেছেন, সেগুলো সবই ঠিক; কিন্তু ভোগাসক্ত পুরুষ জগতে বিশেষ কোনো কার্য করতে পারে না। আপনি সেই অজ্ঞ পুরুষদের কুকর্মে এমনভাবে লিপ্ত যে, নিজের প্রতিজ্ঞা পূরণ করা আপনার জন্য দুরূহ। হে স্বামিন! দেখুন—(সঃ+ন+ঈশে) সেই পুরুষ জগতের শাসন করতে পারে না, (যস্য+কপৃত্+সন্ধ্যা+অন্তরা+রম্বতে) যার কপৃত্ অর্থাৎ কপাল-শির সর্বদা নীচের দিকে ঝুঁকে থাকে। কিন্তু (সঃ+ইত্+ঈশে) সেই পুরুষই জগতের শাসন করে, (নিষেদুষঃ+যস্য+রোমশম্+বিজৃম্ভতে) যে পুরুষ গৃহে বসে থেকেও যার জ্ঞান পৃথিবীতে সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান থাকে। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ) ‘সক্থি’—উরু, জঙ্ঘা। ‘সক্থি ক্রীড়ে পুমানূরুঃ’। ‘কপৃত্’—কপাল, শির, মাথা। ‘কং সুখং পৃণাতীতি কপৃত্’—যে সুখের পালন করে। ‘কপাল’ শব্দেরও একই অর্থ—‘কে সুখ পলয়তীতি কপালঃ’। কোথাও ‘ক’ নিজেই শিরের নাম, যেমন ‘কেশ’। অতএব কপাল ও কপৃত্ সমার্থক। ॥১৬॥

শ্রী পণ্ডিত জয়দেব শর্মা, বিদ্যালঙ্কার, মীমাংসাতীর্থ ভাষ্য
ভাষ্য—
(ন সা ঈশে) সে প্রকৃতি-অধীশ্বরী নয়, (যস্য রোমর্শ) যার লোমের ন্যায় ঔষধি-উদ্ভিদবর্গ, (বিজৃম্ভতে) নানা প্রকারে ভূমিতে উৎপন্ন হয়। (সঃ ইত্ ঈশে) সেই প্রভুই সকলের উপর শাসন করে, (যস্য) যার প্রদত্ত সুখ এবং (ক-পৃত্) পালনসামগ্রী, (সন্ধ্যা অন্তরা) পারস্পরিক মিলিত আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে, (রক্তে) বিদ্যমান। (ইন্দ্রঃ বিশ্বস্মাত্ উত্তরঃ) সেই প্রভুই সর্বোত্তম। ॥১৭॥

শ্রী পং. শিবশংকরজি কাব্যতীর্থ
“বৈদিক ইতিহাসার্থ সিদ্ধান্ত” গ্রন্থ থেকে

পুনরায় উক্ত অর্থকে অন্য প্রকারে বলা হয়েছে। এই ঋচাটি ঠিক ১৬-তম ঋচার উল্টো বলে প্রতীয়মান হয়, কিন্তু ভাব ও শব্দার্থে পার্থক্য আছে। যথা—
(সঃ + ন + ঈশে) সে পুরুষ ঐশ্বর্যবান হতে পারে না, (নিষেদুষঃ + যস্য + রোমশম্ + বিজৃম্ভতে) বসে থাকা অবস্থায় যে পুরুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান হাই তুলছে—অর্থাৎ যেমন অলস ব্যক্তি বসে বসে হাই তোলে, তেমনি তার দ্বারা পুরুষার্থের কোনো কার্য সম্পন্ন হয় না। সেইরূপ যে বিদ্বান পড়ালেখা করেও সর্বদা অলসভাবে বসে হাই তুলতে থাকে, যেন তার বিবেচনাশীল বিদ্যাও তার সঙ্গে হাই তুলছে—এমন পুরুষ ঐশ্বর্যশালী হতে পারে না। কিন্তু (সঃ + ঈশে) নিশ্চিতভাবেই সেই ‘ঐশ্বর্যশালী’ হয়, (যস্য + কপৃত্ + সক্থ্যা + অন্তরা + রম্বতে) যার শির অর্থাৎ যার দৃষ্টি উভয় জঙ্ঘার মধ্যবর্তী দিকে নত থাকে। অর্থাৎ কেবল বিদ্যা অধ্যয়নেই লাভ নেই, বরং যার উভয় জঙ্ঘায় পূর্ণ বল বিদ্যমান। যার উভয় জঙ্ঘা কখনও ভ্রষ্ট হয়নি, যার ইন্দ্রিয়দৃষ্টি ক্ষীণ হয়নি, যে সর্বদা ইন্দ্রিয়রক্ষায় সতর্ক, যে সর্বদা লক্ষ্য রাখে যে তার কোনো ইন্দ্রিয় কলঙ্কিত হয়েছে কি না—সেই-ই ঐশ্বর্যশালী হতে পারে ইত্যাদি। এই দুই ঋচাই পুরুষার্থসূচক। ॥১৭॥

এই আর্য বিদ্বানদের ভাষ্য শিষ্ট ও কিছুটা গ্রহণযোগ্য হলেও তাতেও বেদার্থের গাম্ভীর্য সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় না।

দুই মন্ত্রের উপর আমার ত্রিবিধ ভাষ্য

এখন আমরা এই দুই মন্ত্রের উপর আমাদের বিভিন্ন ভাষ্য উপস্থাপন করছি—

অত্র প্রমাণানি

১. আধিদৈবিক পক্ষ—
ইন্দ্রঃ—কালবিভাগকর্তা সূর্যলোকঃ (ম.দ.ঋ.গা. ১.১৫.১), বিদ্যুদ্বাখ্য ভৌতিক অগ্নিঃ (ম.দ.ঋ.মা. ১.১৬.৩), মহাবলবান্ বায়ুঃ (ম.দ.অ.ভা. ১.৭.১)। ইন্দ্রাণী—ইন্দ্রস্য সূর্যস্থ বায়োঃ শক্তিঃ (ম.দ.অ.ভা. ১.২২.১২)।
বৃষা—বীর্যকারী (ম.দ.অ.ভা. ৩.২.১১), বেগবান্ (ম.দ.ঋ.ভা. ২.১৬.৬), পরশক্তিবন্ধকঃ (ম.দ.অ.ভা. ২.১৬.৪)। বৃষাকপিঃ—বৃষা চ অসৌ কপিঃ। (কপিঃ—কম্পতে’সি—উ.কো. ৪.১৪৫; আদিত্যঃ—গো.উ. ৬.১২)। কপৃত্ = ক + পৃত্। “পদাবিধু মাস্পৃৎ তনূনামুপসংখ্যানম্” (বা. অষ্টা. ৬.১.৬৩) দ্বারা পৃতনা → পৃত্। পৃতনা = সেনা (আপ্টে কোষ), সংগ্রামনাম (নিঘं. ২.১৭)। কৃ = প্রাণঃ (প্রাণো বৈ কঃ—জৈ.উ. ৪.১১.২.৪)। সন্ধি = সজতি ইতি (উ.কো. ৩.১৫৪), বন্ধন, আলিঙ্গন, সটে থাকা (সং.থা.কো.—পং. যুধিষ্ঠির মীমাংসক)। (সক্ধিম্যা কৌঞ্চী আজায়েতাম—জৈ.ব্রা. ২.২৬৭)। (ক্রৌঞ্চঃ = রজ্জুঃ—তা. ১৩.৬.১৭)।
রজ্জুঃ = রশ্ময়ঃ। রশ্ময়ঃ = রজ্জনঃ, কিরণাঃ (ম.দ.য.মা. ২৬.৪৩)। রশ্মেব—(রশ্মা + ইব)—কিরণবৎ, রজ্জুবৎ বা (ম.দ.ঋ.ভা. ৬.৬৭.১)। প্রাণাঃ রশ্ময়ঃ (তৈ.ব্রা. ৩.২.৫.২)। রোমশঃ = লোমশঃ (রেফস্য লত্বম্)।
লোমাঃ = ছন্দাংসি বৈ লোমানি (৩.৬.৪.১.৬)। পশ্বো বৈ লোম (তা. ১৩.১১.১১)। প্রাণাঃ = ছন্দাংসি (তু.মৈ. ৩.১.৮)। রম্বতে = লম্বতে (রেফস্য লত্বম্)। নিষেদুঃ = নিষণ্ণাঃ (নি. ১৩.১০), অত্যন্ত স্থির, বিশ্রান্ত, নতমুখ, ক্লান্ত। ঋষয়ঃ = জ্ঞাপকাঃ প্রাণাঃ (ম.দ.য.ভা. ১৫.১১), প্রাপকাঃ চায়বঃ (তু.ম.দ.য.ভা. ১৫.১০), বলবন্তঃ প্রাণাঃ (ম.দ.য.মা. ১৫.১৩), প্রাণা বৈ ঋষয়ঃ (ঐ. ২.২৭; শ. ৭.২.৩.৫; ৮.৪.১.৫)। ধন-জয়াদয়ঃ সূক্ষ্মস্থূলা বায়বঃ প্রাণাঃ (ম.দ.য.ভা. ১৫.১৪)।

২. আধ্যাত্মিক ও আধিভৌতিক পক্ষ—
ইন্দ্রঃ—রাজা (ম.দ.অ.ভা. ৬.২৬.৬), বিদ্বান্ মনুষ্যঃ (ম.দ.গ.মা. ২৬.৪), জীবঃ (ম.দ.কা.ভা. ৩.৩২.১০)।
কপৃত্—কম্ সুখনাম (নিঃ. ৩.৬), অন্নম্ (নি. ৬.৩৫), উদকনাম (নিঘं. ১.১২), সুখস্বভাবঃ পরমেশ্বরঃ (ম.দ.প.ভা. ৫.১৮)। পৃত্—পৃত্সু সংগ্রামনাম (নিঘं. ২.১৭)। সেনা—সিন্যন্তি বধ্নন্তি শত্রূন্ যাভিঃ সা (তু.ম.দ.য.ভা. ১৭.৩৩)। বলম্ (ম.দ.অ.ভা. ২.৩৩.১১)। করৌঞ্চম্—বাগূ বৈ করৌঞ্চম্ (তা. ১১.১০.১৬)।
রশ্মিঃ = জ্যোতিঃ (ম.দ.ঋ.মা. ১.৩৫.৭), যমনাতু (নি. ২.১৫), অন্নম্ (শ. ৮.৫.৩.৩)। এতে বৈ বিশ্বেদেবাঃ রশ্ময়ঃ (শ. ২.৩.১.৭)। দেবঃ—মনঃ কাময়মানঃ (ম.দ.কৃ.ভা. ৭.১.২৫)। লোম = অনুকূলবচনম্ (ম.দ.য.ভা. ২৩.৩৬)। রোমা—রোমাণি ঔষধ্যাদীনী (ম.দ.অ.ভা. ১.৬৫.৪)।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

১. যখন সূর্যের অভ্যন্তরে (কপৃত্) বিভিন্ন প্রকার প্রাণের সেনা—অর্থাৎ ধারা (stream) ও তাদের সংঘর্ষ (interaction)—সেই (অন্তরা সন্ধ্যা) সূর্যের কেন্দ্রীয় ও বহিঃঅংশকে সংযুক্তকারী উত্তর ও দক্ষিণ দৃঢ় অংশগুলির মধ্যে, যেখান থেকে নানাবিধ বিকিরণ ও প্রাণের কম্পনধারা (vibrations streams) উৎপন্ন হতে থাকে, (রম্বতে = লম্বতে) পিছিয়ে পড়ে স্থবির হয়ে যায় অথবা বিস্তৃত হয়ে মন্দ হয়ে পড়ে—তখন
(ন স ঈশে) সেই ইন্দ্রতত্ত্ব অর্থাৎ সূর্যে অবস্থিত বলবান বৈদ্যুতিক বায়ু সমগ্র সূর্য অথবা উভয় অংশের মধ্যকার গতি ও সংগতির সামঞ্জস্য রক্ষা করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে।

এর তাৎপর্য এই যে—সূর্যের উভয় অংশ, অর্থাৎ নিউক্লীয় সংযোজনযুক্ত কেন্দ্রীয় অংশ যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয় (যাকে সূর্যের ভাট্টি বলা যায়), এবং বহিঃঅংশের পৃথক-পৃথক ঘূর্ণনগতির মধ্যে যে সংধি অঞ্চল থাকে, যার প্রান্ত উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে অবস্থিত—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। এর ফলে সমগ্র সূর্যের উপর সংকট আসতে পারে।

এরপর একই মন্ত্রে বলা হয়েছে—এই অনিষ্ট অবস্থা কখন সৃষ্টি হয় না এবং কখন সূর্য সামঞ্জস্য ও অনুকূল অবস্থায় থাকে। (যস্য নিষেদুষঃ) যার ক্ষেত্রে সেই ইন্দ্রের প্রাণসেনা অর্থাৎ কম্পনধারাগুলি, (রোমশম্ = লোমশম্) নানাবিধ ছন্দরূপ প্রাণ ও মরুত্ অর্থাৎ সূক্ষ্ম বায়ু দ্বারা সুসম্পন্ন হয়ে, (বিজুম্ভতে) বিশেষভাবে জাগ্রত ও সক্রিয় হয়ে নিজেদের বল ও তেজে পরিপূর্ণ হয় (স ইত্ ঈশে) তখন সেই ইন্দ্র অর্থাৎ বিদ্যুৎ-অগ্নিযুক্ত বায়ু সূর্যের উভয় অংশের গতি ও অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

এই প্রাণসেনা-ধারাগুলি সূর্যের উভয় অংশকে সংযুক্তকারী উত্তর ও দক্ষিণ মেরুস্থিত সংধি অঞ্চলের দৃঢ় অংশগুলির মধ্যেই উৎপন্ন ও সক্রিয় হয়। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরা) এই ইন্দ্রতত্ত্ব অর্থাৎ বিদ্যুদগ্নিযুক্ত তেজস্বী, বলবান বায়ু অন্যান্য তেজস্বী পদার্থের তুলনায় উৎকৃষ্ট ও সর্বাধিক বলসম্পন্ন। এই-ই বলপতি এবং সৃষ্টিযজ্ঞকে উৎকর্ষতার সঙ্গে ধারণকারী। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)

ভাবার্থ
যখন সূর্যের কেন্দ্রীয় অংশ ও বহির্ভাগের মধ্যে প্রবাহিত উত্তর ও দক্ষিণ প্রাণধারাগুলি তীব্র ও শক্তিশালী থাকে, তখন উভয় অংশের মধ্যকার গতি ও অবকাশের ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য বজায় থাকে। কিন্তু যখন সেই ধারাগুলি এদিক–ওদিক ছড়িয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কেন্দ্রীয় ও বহির্ভাগের মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয় এবং সূর্যের অস্তিত্বের উপর সংকট উপস্থিত হতে পারে।

এই দুই ঋচার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার উপর প্রভাব

ঋষি ও দৈব প্রভাব
এর ঋষি হলেন ঋষাকপি ইন্দ্র এবং ইন্দ্রাণী। এর তাৎপর্য এই যে, বিদ্যুৎধারাযুক্ত তীব্র ও শক্তিশালী সূর্যলোকের অভ্যন্তরীণ অংশে অবস্থিত প্রাথমিক প্রাণরশ্মি থেকেই এই ছন্দ-রশ্মির উৎপত্তি হয়। সেই সময়ে প্রাথমিক প্রাণরশ্মিগুলি প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকায় এই ছন্দ-রশ্মিগুলিও বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়, ফলে তাদের প্রভাবে আরও বিশেষ বলের উৎপত্তি ঘটে। এদের দেবতা ইন্দ্র হওয়ায়, এই ছন্দ-রশ্মির মাধ্যমে সূর্য প্রভৃতি নক্ষত্রের মধ্যে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বলের সমৃদ্ধি ঘটে, অর্থাৎ বিদ্যুৎ-আবেশিত কণাগুলির শক্তিতে বিপুল বৃদ্ধি হয়।

ছান্দস প্রভাব
এদের ছন্দ ‘নিবৃত্ পংক্তি’ হওয়ায় নক্ষত্রের বহির্ভাগ থেকে বিভিন্ন কণাকে কেন্দ্রীয় অংশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় বহির্ভাগ ও অন্তর্ভাগে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে সেই কণাগুলির পারস্পরিক সংযোজনশক্তি বৃদ্ধি পায়। এদের পঞ্চম স্বর সমস্ত ক্রিয়াকে নিরন্তর বিস্তৃত করতে সহায়ক হয়।

ঋচাগুলির প্রভাব
এই দুই ছন্দ-রশ্মির প্রভাব নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অংশ—যেখানে নিউক্লিয়ার সংযোজন ক্রিয়া ঘটে—এবং তার উপর অবস্থিত অবশিষ্ট বিশাল অংশের মধ্যবর্তী সংধি অঞ্চলে কার্যকর হয়। এই দুই অংশ একে অপরের উপর কিছুটা অসম গতিতে স্খলিত হতে থাকে। সংধি অঞ্চলের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ-রশ্মির সুদৃঢ় ধারাগুলি বিদ্যমান থাকে, যা উভয় অংশকে পরস্পরের থেকে একটি সীমিত দূরত্বে বজায় রাখার পাশাপাশি সেই বিশাল অংশকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রাখে। এই ধারাগুলিতে এই ছন্দ-রশ্মিগুলিরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এদের প্রভাবে সেই সুদৃঢ় ধারাগুলি ক্রমান্বয়ে কখনও দুর্বল, কখনও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। ফলে নক্ষত্রের বিশাল অংশটি সংধি অঞ্চলের উপর কখনও কিছুটা কাছে, কখনও কিছুটা দূরে অবস্থান করে—অর্থাৎ দোলায়মান থাকে। এর তাৎপর্য এই যে, কেন্দ্রীয় অংশ ও অবশিষ্ট বিশাল অংশের মধ্যবর্তী সংধি অঞ্চলটি সিংহের মতো অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় কখনও প্রসারিত হয়, আবার কখনও সংকুচিত হয়। এই অঞ্চলে তড়িৎ-চুম্বকীয় বলের বিশেষ প্রাধান্য ও সক্রিয়তা বিদ্যমান থাকে।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

১.
(বস্য) যে রাজার (কপৃত) সেনাবল অথবা তার অন্ন-ধনভাণ্ডার (সংখ্যা) (অন্তরা) সকল বিদ্বান বা ধনের কামনাকারী প্রজাদের মধ্যে উদ্ভূত রাগ-দ্বেষরূপ সংঘর্ষের মধ্যে (রম্বতে) পিছিয়ে পড়ে অথবা তাদের অতিরিক্ত আসক্তির কারণ হয়ে ওঠে, (স ন ঈশে) সেই ঐশ্বর্যহীন রাজা নিজের দেশবাসীদের উপর শাসন করতে পারে না, অর্থাৎ তার রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু (নিষেদুষঃ) যিনি নিরন্তর স্থিতিশীলতায় অবস্থিত, সেই রাজার সেনাবল অথবা অন্ন-ধনসম্পদ (রোমশম্) যখন সকল প্রজার জন্য অনুকূল বাক্যযুক্ত এবং প্রাচুর্যপূর্ণ ঔষধ, পশু প্রভৃতি দ্বারা সমৃদ্ধ হয় এবং (বিজৃম্ভতে) সকল প্রজার জন্য যথাযথ রীতিতে বিতরণ করা হয়, এবং এই বণ্টনব্যবস্থা সর্বদা সুচারুরূপে পরিচালিত হয়, (স ইত্ ঈশে) তখনই সেই রাজা সমস্ত ঐশ্বর্যসহ নিজ রাষ্ট্র শাসন করতে সক্ষম হয়। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ) এইরূপ সর্বাঙ্গীন ঐশ্বর্যসম্পন্ন রাজার শাসন অন্যান্য সকল ব্যবস্থার তুলনায় শ্রেষ্ঠ হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)

ভাবার্থ
রাজার উচিত, তিনি যেন সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য অনুকূল বাক্য দ্বারা প্রজাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া রাগ-দ্বেষজনিত অসন্তোষ ও সংঘর্ষ দূর করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা করেন এবং একই সঙ্গে নিজের বল ও ধনকে সমস্ত প্রজার কল্যাণে যথাযথভাবে নিয়োজিত করেন।

২.
(বস্য) (নিষেদুষঃ) যে বিশ্রান্ত ও কষ্টগ্রস্ত রাজার (রোমশম্) প্রশস্ত অন্ন, ঔষধ ও পশু প্রভৃতি সম্পদ (বিজৃম্ভতে) বিশৃঙ্খলভাবে উন্মুক্ত থাকে—অর্থাৎ যার রাজ্যে অপব্যয় ও বণ্টনের বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান, (ন স ঈশে) সেই ঐশ্বর্যহীন রাজা নিজের রাষ্ট্র শাসনে সক্ষম হয় না। (স ইত্ ঈশনে) সেই রাজাই ঐশ্বর্যবান হয়ে যথাযথভাবে রাষ্ট্র শাসন করতে পারে, (বস্য কপৃত) যার সেনাবল ও অন্নভাণ্ডার (সক্থ্যা অন্তরা) সকল বিদ্বান ও প্রজাদের মধ্যে সৃষ্ট রাগ-দ্বেষজনিত সংঘর্ষের মধ্যেই (রম্বতে) সেই রাগ-দ্বেষকে পরাজিত করে, অর্থাৎ দূর করে প্রজাদের তার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এরপর সেই রাজা সকল প্রজার মধ্যে বল ও ধনাদি পালনসামগ্রী দৃঢ়ভাবে ও যথাযথভাবে বণ্টন করতে করতে নিজের পালনকর্মের মাধ্যমে সকল প্রজার হৃদয়ে স্থান করে নেয়। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ) এইরূপ ঐশ্বর্যবান রাজা নিজের অন্নাদি সম্পদের দ্বারা প্রজাদের সকল দুঃখ থেকে উদ্ধারকারী হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৭)

ভাবার্থ
ঐশ্বর্যের অভিলাষী রাজার উচিত, তিনি যেন নিজের রাষ্ট্রকে বাহ্যিক আক্রমণ প্রভৃতি কষ্ট থেকে সুরক্ষিত রাখেন এবং পূর্ণ পুরুষার্থের সঙ্গে নিজের অন্ন-ধন প্রভৃতি পালনসামগ্রীর অপব্যয় বা অব্যবस्थित বণ্টন কখনও হতে না দেন। বরং নিজের প্রজাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া রাগ-দ্বেষজনিত অসন্তোষ ও সংঘর্ষকে যথোচিত পালনমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত দণ্ডের আশ্রয় নিয়ে দূর করে সকলের কল্যাণ সাধনে সদা সচেষ্ট থাকেন, যাতে তিনি সকলের নিকট পিতৃসদৃশ প্রিয় হয়ে থাকেন।

আমার আধ্যাত্মিক ভাষ্য

১.
(বস্য) যে বিদ্বান পুরুষের (কপূত) মন ও সুখদায়ক প্রাণসমূহের সমষ্টি (সবধ্যা অন্তরা) রাগ-দ্বেষাদি আসক্তি ও কোলাহলের মধ্যে (রম্বতো) আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ সেগুলিতেই রত থাকে, (ন স ঈশে) সে নিজের ইন্দ্রিয়গুলির উপর শাসন করতে পারে না। কিন্তু (যস্য নিষেদুষঃ রোমশম্) দৃঢ় ও ব্রহ্মবর্চস্‌ দ্বারা তেজস্বী হয়ে যে ব্যক্তি নিজের অন্তঃকরণকে প্রণব ও গায়ত্রী প্রভৃতি ছন্দরূপ বেদের পবিত্র ঋচায় প্রশস্তভাবে রমণ করিয়ে (বিজুম্ভতে) নিজেকে পরমপিতা সুখস্বরূপ পরমেশ্বরের আনন্দে বিস্তৃত করে দেয়, (স ইত্ ঈশে) সেই যোগী পুরুষই নিজের ইন্দ্রিয়গুলির উপর শাসন করতে সক্ষম হয়। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ) এইরূপ জিতেন্দ্রিয় বিদ্বান অন্য সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৬)

ভাবার্থ
বিদ্বান পুরুষের উচিত, যোগযুক্ত হয়ে পরমপিতা পরমাত্মার মধ্যে রমণ করার জন্য নিজের অন্তঃকরণকে রাগ-দ্বেষাদি বন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে প্রণব ও গায়ত্রী প্রভৃতি ঋচার বিধিপূর্বক জপের মাধ্যমে পরমেশ্বরের উপাসনা করার উদ্দেশ্যে নিজের ইন্দ্রিয়গুলির উপর জয় লাভ করা।

২.
(যস্য নিষেদুষঃ রোমশম্) যে নিরন্তর বিশ্রান্ত ও খিন্ন অবস্থায় থাকা বিদ্বান পুরুষের অন্তঃকরণ বিভিন্ন গায়ত্রী প্রভৃতি ঋচার জপকালে, অর্থাৎ উপাসনার অনুশীলনের সময় (বিজুম্ভতে) এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে, অর্থাৎ অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে, (ন স ঈশে) সে বিদ্বান নিজের ইন্দ্রিয়গুলির উপর বিজয় অর্জনে সক্ষম হয় না। বরং (বস্য কপৃত) যার মন ও সুখদায়ক প্রাণসমষ্টি (সবধ্যা অন্তরা) বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও সাংসারিক ব্যবহারের মধ্যেও (রম্বতে) স্থির থেকে একস্থানে দৃঢ়ভাবে অবস্থিত হয়ে নিরন্তর পরমেশ্বরের জপে নিয়োজিত থাকে, (স ইত্ ঈশে) সেই বিদ্বান যোগী হয়ে নিজের ইন্দ্রিয়গুলির উপর শাসন করে যথাসময়ে ঐশ্বর্য লাভ করে। (বিশ্বস্মাদিন্দ্র উত্তরঃ) এইরূপ যোগী নিজেকে সমস্ত দুঃখ থেকে উদ্ধার করে এবং অন্য প্রাণীদেরও দুঃখ থেকে উদ্ধারকারী হয়। (ঋগ্বেদ ১০.৮৬.১৭)

ভাবার্থ
মুমুক্ষু বিদ্বান পুরুষের উচিত, ঈশ্বরোপাসনা বা জপের সময় মনকে একাগ্র করে নিরন্তর পরমেশ্বরে নিমগ্ন থাকা এবং এইভাবে নিজের সমস্ত দ্বন্দ্ব জয় করে নিজে মোক্ষ লাভ করার পাশাপাশি অন্য প্রাণীদেরও দুঃখ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা।

এখন আমরা সুধী বিচারকদের সেবায় অথর্ববেদের একটি অত্যন্ত জটিল বলে বিবেচিত কুন্তাপ সূক্তের চারটি মন্ত্র উদ্ধৃত করছি—

(৬–৮) ত্রীণ্যুষট্রস্য নামানি ॥১৩॥
হিরণ্য ইত্যেকে অব্রবীত্ ॥১৪॥
দ্বৌ বা যে শিশবঃ ॥১৫॥
নীলশিখণ্ডবাহনঃ ॥১৬॥
(অথর্ববেদ ২০.১৩২)

উল্লেখযোগ্য যে, আচার্য সায়ণ এই মন্ত্রগুলির ভাষ্য করেননি। আমাদের মনে হয়, তিনি এদের কোনো ভাবই উপলব্ধি করতে পারেননি। পণ্ডিত সাতভেলেকরও এই কাণ্ডের সূক্ত ১৩৫ ও ১৩৬-এ সূক্তগুলিকে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ ও ক্লিষ্ট মনে করে পরিত্যাগ করেছেন। আমরা উপরিউদ্ধৃত চারটি মন্ত্রের উপর বিভিন্ন বিদ্বানের ভাষ্য উপস্থাপন করছি—

পণ্ডিত দামোদর সাতভেলেকরের ভাষ্য

পদার্থ
ত্রীণি উষ্ট্রস্য নামানি = উটের তিনটি নাম আছে।
হিরণ্যং ইতি একে অব্রবীত্ = ‘সোনা এক’—এমন সে বলেছে। ॥১৩–১৪॥

পদার্থ
হে বা যশঃ শবঃ = দুটি—যশ ও বল।
নীলশিখণ্ডঃ বা হনেতু = নীল চূড়াধারী বাজাবে। ॥১৫–১৬॥

আর্য বিদ্বান পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদীর ভাষ্য

হে (উষ্ট্রস্য) প্রতাপী (পরমাত্মা)-এর (ত্রিণি) তিনটি (নামানি) নাম আছে। ॥১৩॥

(একম্) এক (হিরণ্যম্) হিরণ্য (তেজোময়), (বা) এবং (দ্বে) দুটি—(যশঃ) যশ (কীর্তি) ও (শবঃ) বল আছে, (ইতি) এইরূপ (অন্নবীত) সে (মানুষ) বলে। ॥১৪–১৫॥

(নীলশিখণ্ডঃ) নীল শিখণ্ড—অর্থাৎ নীল নিধি বা নিবাসস্থানের প্রাপক পরমেশ্বর—(বা) নিশ্চিতরূপে (হনেতু) সর্বব্যাপী (হন্—গতৌ, গচ্ছতি, ব্যাপ্নোতি)। ॥১৬॥

আর্য বিদ্বান প্রফেসর বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কারের ভাষ্য

হে (উষ্ট্রস্য) সাংসারিক দাহ-সন্তাপ থেকে ত্রাণকারী, রক্ষাকারী পরমেশ্বরের (ত্রিণি) তিনটি (নামানি) নাম আছে। [উষ্ট্র = উষ্ (দাহে) + ত্র (ত্রাণকর্তা)] ॥১৩॥

হে (একেঃ) অনেক, অর্থাৎ সাত্ত্বিক প্রকৃতির উপাসকরা বলেন যে তিনি (হিরণ্যম্) “হিরণ্য” নামধারী, (অব্রবীত্) এমনটাই বেদও বলেছে। [হিরণ্যম্ = হিত ও রমণীয়, হৃদয়রমণ হয় (নি. ২.৩.১০)] অর্থাৎ পরমেশ্বর সকলের হিতকারী, রমণীয় এবং হৃদয়ে রমণকারী। বেদে বলা হয়েছে— “হিরণ্যরূপঃ স হিরণ্যসন্দৃক্” (ঋ. ২.৩৫.১০), অর্থাৎ সেই পরমেশ্বর হিরণ্যের রূপধারী ও হিরণ্যের সদৃশ। ॥১৪॥

হে (বা) এবং (যে) যারা (বিজয়ঃ) শিশুবুদ্ধিসম্পন্ন লোক, তারা বলে যে (দ্বি) তাঁর দুটি নাম আছে। [শিশবঃ—তামসিক ও রাজসিক লোক] ॥১৫॥

হে (নীলশিখণ্ডবাহনঃ) দুটি নাম আছে—নীলবাহন ও শিখণ্ডবাহন। [“নীল” পদ তমোগুণের নির্দেশক এবং “শিখণ্ড” পদ রজোগুণের নির্দেশক। “অজামেকাং লোহিতশুক্লকৃষ্ণাম্” (শ্বেতাশ্ব. উপ. ৪.৫)-এ “অজা” অর্থ—অজন্মা প্রকৃতি; লোহিত = রজোগুণ, শুক্ল = সত্ত্বগুণ, কৃষ্ণ = তমোগুণ। তমোগুণকে মন্ত্রে “নীল” বলা হয়েছে এবং রজোগুণকে “শিখণ্ড” পদের মাধ্যমে নির্দেশ করা হয়েছে। শিখণ্ড অর্থ ময়ূরের পুচ্ছ, যা বর্ণবহুল। রজোগুণী ব্যক্তি জগতের নানা রঙ-বৈচিত্র্য কামনা করে। শিশুবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা বলে যে পরমেশ্বর “নীলবাহন”—তমোগুণী জগতের বাহক, এবং “শিখণ্ডবাহন”—রজোগুণী জগতের বাহক। তমোগুণী ব্যক্তির কাছে জগত তমোময়, রজোগুণীর কাছে রজোময় এবং সত্ত্বগুণীর কাছে জগতে সত্ত্বগুণ প্রতীয়মান হয়।] ॥১৬॥

এই মন্ত্রগুলির উপর আমার ভাষ্য

এখন আমরা উপরিউদ্ধৃত এই চারটি মন্ত্রের উপর নিজেদের ভাবনা ও ভাষ্য উপস্থাপন করছি—

(১.) ত্রীণ্যুষ্ট্রস্য নামানি ॥১৩॥

এই ঋচার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার উপর প্রভাব

আর্ষ ও দৈবত প্রভাব—
এই মন্ত্রগুলির দেবতা ও ছন্দ সম্পর্কে কেবল পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদীই লিখেছেন, অন্যান্য ভাষ্যকারেরা এ বিষয়ে নীরব। আমাদের মতে, কেবল এই মন্ত্রগুলিরই নয়, বরং অথর্ববেদ ২০.১২৭–১৩৬ পর্যন্ত মোট দশটি সূক্তের ঋষি কুন্তাপ; এই কারণেই এই দশটি সূক্তকে কুন্তাপ বলা হয়। এটি এমন এক সূক্ষ্ম প্রাণ, যা বজ্ররূপ বা বজ্রযুক্ত বিকিরণসমূহকে আরও উত্তপ্ত করে, অর্থাৎ তাদের অধিক বলবান ও উষ্ণ করে তোলে। এ বিষয়ে পাঠক এই গ্রন্থের খণ্ড ৬.৩২ গভীরভাবে অবলোকন করুন। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন ঐন্দ্রীয় ক্রিয়া, অর্থাৎ বৈদ্যুতিক বলসমূহের ক্রিয়াকলাপ, এর আর্ষ প্রভাবে তীক্ষ্ণ হয়। এর দেবতা প্রজাপতি। এই কারণে— [প্রজাপতিঃ = স এষ সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ (শ. ১৪.৪.৩.২২), সর্বাণি ছন্দাংসি প্রজাপতিঃ (শ. ৬.২.১.৩০), প্রাণো হি প্রজাপতিঃ (শ. ৪.৫.৫.১৩)]—এর দৈবত প্রভাবে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি উত্তপ্ত ও দীপ্তিমান হতে থাকে, যার ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তাদের বল বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ছান্দস প্রভাব—
এর ছন্দ দেবী জগতি। এর প্রভাবে বিভিন্ন দেব, অর্থাৎ প্রাণ ও ছন্দ রশ্মিগুলির পারস্পরিক সংযোজন ও বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হয়। এই রশ্মিগুলি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে নিজেদের প্রভাব প্রদর্শন করে।

ঋচার প্রভাব—
নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মি তাপকে সমৃদ্ধ করতে করতে বিভিন্ন পরমাণুকে নানাবিধ ক্রিয়ায় পার করাতে সক্ষম হয়। এখানে ‘পার করানো’-র অর্থ হল—অসুর প্রভৃতি বাধক রশ্মির আঘাত থেকে সেই পরমাণুগুলিকে রক্ষা করা। সেই তিনটি ছন্দ রশ্মি কোনগুলি, তা পরবর্তী ঋচাগুলির ভাষ্যে দ্রষ্টব্য। এই ঋচা সেই তিনটি ঋচাকে প্রেরণা দেয়। আমাদের মতে, এই ছন্দ রশ্মি কেবল পরবর্তী তিনটি ছন্দ রশ্মিকেই নয়, বরং আরও তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মিকেও প্রেরণা দেয়।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

(উষ্ঠ্রস্য) [উষ্ঠ্রঃ = ওজতি দহতীতি (উ. কো. ৪.১৬৩); উপ দাহে = জ্বালানো, ভোগ করা, ক্ষয় করা, আঘাত করা, বিনাশ করা—আপটে সংস্কৃত-হিন্দি কোষ] নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রাণ ও ছন্দ প্রভৃতি রশ্মি নানা প্রকারের বৈদ্যুতিক-চৌম্বকীয় তরঙ্গ ও কণাকে উত্তেজিত ও প্রেরিত করে আঘাত করে। এর ফলে তাদের শক্তিতে বৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে, সেই সময় বিভিন্ন কণার মধ্যে সংযোজনাদি (সংলয়নাদি) ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টিকারী অসুর রশ্মি অথবা ডার্ক এনার্জিকে আঘাত করে ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রিত করে। এই সকল প্রক্রিয়া এবং সেগুলিকে পরিচালিত বা প্রেরিতকারী রশ্মিগুলিকে উষ্ঠ্র বলা হয়। এইরূপ উষ্ঠ্র-সংজ্ঞক রশ্মি (ত্রীণি নামানি) তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মির রূপে বিদ্যমান থাকে [নাম = বাঙ্‌নাম (নিঘণ্টু ১.১১)]। এই তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মি অন্যান্য ছন্দ রশ্মিকে নানাবিধ বাধা অতিক্রম করাতে সক্ষম হয়।

ভাবার্থ—
নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তিন প্রকারের ছন্দ রশ্মি অন্যান্য ছন্দ রশ্মিকে প্রেরণা দিয়ে তাপ বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে ডার্ক এনার্জি প্রভৃতির কুপ্রভাব নষ্ট করে।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

(উষ্ঠ্রস্য) রাষ্ট্রের শত্রুদের বা প্রজাদের মধ্যেই বিদ্যমান রাষ্ট্রদ্রোহী তত্ত্বসমূহকে দগ্ধকারী রাজার (ত্রীণি নামানি) তিনটি প্রসিদ্ধ আচরণ রয়েছে [নাম = প্রসিদ্ধং ব্যবহারম্ (ম…মা. ৬.৬৬.৫)]। রাজার এই আচরণসমূহ রাজাকে খ্যাতি প্রদান করে এবং রাষ্ট্র ও প্রজাকে শত্রুদের সন্ত্রাস থেকে উদ্ধারকারী হয়।

ভাবার্থ—
কোনো রাষ্ট্রের রাজা তিন প্রকার কর্মের মাধ্যমে প্রজাদের রক্ষা করে খ্যাতি অর্জন করে।

(২.) হিরণ্য ইত্যেক আব্রবীত্ ॥১৪॥

সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার উপর প্রভাব

আর্ষ ও দৈবত প্রভাব—
এর প্রভাব পূর্ববর্তী ঋচার ন্যায়ই বুঝতে হবে।

ছান্দস প্রভাব—
পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদী এর ছন্দ আসুরী জগতি বলে মেনেছেন, কিন্তু এতে ‘হিরণ্যঃ’ পদ বিদ্যমান থাকার কারণে এর প্রভাব তেজস্বী হওয়ায় আমরা একে আসুরী ছন্দ রশ্মি মনে করতে পারি না। আমরা এ বিষয়ে অবগত যে আসুরী রশ্মি প্রভৃতি পদার্থ অপ্রকাশিতই হয়ে থাকে, এই কারণে একে আসুরী জগতি রূপে গ্রহণ করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই ঋচাটি ৬ অক্ষরবিশিষ্ট হওয়ায় এটি যাজুষী ভুরিক অনুষ্টুপ। এর প্রভাবে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রশ্মি ও পরমাণু প্রভৃতি পদার্থের গতি ও সংযোজনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়; এই উদ্দেশ্যে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ—উভয় বলই অনুকূলভাবে সমৃদ্ধ হয়।

ঋচার প্রভাব—
উপর্যুক্ত তিনটি ছন্দ রশ্মির মধ্যে এটি একটি ছন্দ রশ্মি, যা নক্ষত্রের অভ্যন্তরে দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে সুবর্ণ বর্ণ উৎপন্ন করতে করতে দীপ্ত ও সক্রিয় হয়। এই সুবর্ণ বর্ণযুক্ত অথবা এই বর্ণ উৎপাদক ছন্দ রশ্মি তীক্ষ্ণ ভেদনক্ষম বল উৎপন্ন ও সমৃদ্ধ করতে করতে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে পদার্থকে অনুকূলভাবে বিভাজন করে এবং বাধক ডার্ক এনার্জি প্রভৃতি অনিষ্ট রশ্মিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে। আচার্য পিঙ্গল অনুষ্টুপ ছন্দের বর্ণ পিশঙ্গ, অর্থাৎ পীতবর্ণ বলেছেন। নিঃসন্দেহে এটি হিরণ্য বর্ণের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। এর সঙ্গে পূর্বোক্ত ছন্দ রশ্মির প্রভাবে নক্ষত্রে বিদ্যমান অন্যান্য অনুষ্টুপ ছন্দ রশ্মিগুলিও প্রেরিত ও সক্রিয় হয়।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

(একেঃ) দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া [একা = একা ইতা সংখ্যা (নি. ৩.১০), এতি প্রাপ্নোতীতি একঃ (উ. কো. ৩.৪৩)] একটি ছন্দ রশ্মি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে (হিরণ্যঃ) সুবর্ণ বর্ণবিশিষ্ট
[হিরণ্যম্—ক্ষত্রস্যৈতদ্ রূপং যদিরণ্যম্ (শ. ১৩.২.২.১৭), জ্যোতিষে হিরণ্যম্ (তা. ৬.৬.১০), প্রাণা বৈ হিরণ্যম্ (শ. ৭.৫.২.৮), রেতো হিরণ্যম্ (তৈ. ব্রা. ৩.৮.২.৪)] এবং তীক্ষ্ণ ভেদনক্ষম ও আকর্ষণক্ষম বলসমৃদ্ধ হয়ে নানাবিধ প্রাণ রশ্মিকে সমৃদ্ধ করে বিভিন্ন পরমাণুর সংলয়ন-সংযোজনের মাধ্যমে নানাবিধ অণুর নির্মাণের বীজরোপণকারী হয়। এখানে নক্ষত্রে কণার সংলয়ন প্রক্রিয়ারই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। (ইতি) পাদপূরণার্থে, (আব্রবীত্) সেইরূপ ছন্দ রশ্মি সর্বত্র প্রকাশিত ও সক্রিয় হয়।

ভাবার্থ—
নক্ষত্রের অভ্যন্তরে সুবর্ণ বর্ণের রশ্মিগুলি দূরদূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে তাদের ভেদনক্ষমতার দ্বারা ডার্ক এনার্জিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে এবং তাদের সংযোজনক্ষমতার দ্বারা বিভিন্ন কণার সংলয়নে সহায়তা করে।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

(একেঃ) উপর্যুক্ত তিনটির মধ্যে একটি ব্যবহার এই যে, যোগ্য রাজা সমগ্র রাষ্ট্রের ঐক্যের স্বার্থে (হিরণ্যম্ ইতি) সুবর্ণাদি ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ হয়ে
[হিরণ্যম্—হিরণ্য কর্মাডু হিয়তে আয়ম্যমানমিতি বা হিয়তে জনাজ্জনমিতি তথা। হিতরমণ ভক্তীতি বা হৃদয়রমণ ভবতীতি তথা। হর্মতে বা স্যাত্ প্রেপ্সাকর্মণঃ (নি. ২.১০)]
নিজ রাষ্ট্রের প্রজাদের প্রতি সদা প্রেমপূর্বক কল্যাণ সাধন করতে করতে তাদের রাষ্ট্রোন্নতির কর্মে প্রেরিত ও ধারণ করার উদ্দেশ্যে (আব্রবীত্) মধুর ও হিতকারী বাক্য উচ্চারণ করে, যার ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার জন্য শত্রুসেনার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সচেষ্ট থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে এইরূপ রাজা নিজের যশ ও বৈভবের পাশাপাশি নিজের হিতকামনা দ্বারা শত্রুকেও অনুকূল ও যুক্তিসংগত বাক্যের মাধ্যমে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়।

ভাবার্থ—
সুযোগ্য রাজা বিদ্যা, যশ ও সুবর্ণাদি ধনে সমৃদ্ধ হয়ে নিজের সর্বহিতকারী বাক্য ও কর্মের দ্বারা নিজের প্রজাদের সঙ্গে সঙ্গে শত্রু রাজা বা সমাজকণ্টকদেরও জয় করতে সক্ষম হয়। শত্রু বা শত্রুতাকে জয় করার এটি প্রথম প্রকারের ব্যবহার।

(৩.) দৌ বা যে শিশবঃ ॥১৫॥

সৃষ্টির উপর প্রভাব

আর্ষ ও দৈবত প্রভাব—
পূর্ববৎ।

ছান্দস এবং ঋচার অন্যান্য প্রভাব—
পণ্ডিত ক্ষেমকরণদাস ত্রিবেদী এর ছন্দ যাজুষী গায়ত্রী বলেছেন। আমাদের দৃষ্টিতে এর ছন্দ দেবী ত্রিষ্টুপ; এর ইঙ্গিত আমাদের আধিদৈবিক ভাষ্যে পাওয়া যাবে। এর প্রভাবে সকল দেব অর্থাৎ প্রাণ ও প্রকাশিত পরমাণু বা রশ্মি প্রভৃতি পদার্থ তীক্ষ্ণ তেজ ও বলসম্পন্ন হয়। এই রশ্মিগুলি তীব্র বজ্ররূপ ধারণ করে (ত্রিষ্টুপ = বজস্তেন ত্রিষ্টুপ (ঐ. ২.১৬), বজস্ত্রিষ্টুপ (কী. বা. ৭.২)) ডার্ক এনার্জিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করতে সহায়তা করে।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

(দী বা যে) উপর্যুক্ত এক ছন্দ রশ্মি তথা অনুষ্টুপ ছন্দ রশ্মির অতিরিক্ত এই দুই ছন্দ রশ্মিও বজ্ররূপ কার্য করে আসুর পদার্থ—ডার্ক এনার্জি প্রভৃতিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে উপর্যুক্ত সংযোগ-সংযোজনাদি কর্মকে সমৃদ্ধ করে। এই দুই রশ্মি (শিশবঃ) শিশুরূপ। [শিশুঃ = অম বা শিশুর্যো’য়ং মধ্যমঃ প্রাণঃ (শ. ১৪.৫.২.২), (মধ্যম্ = ত্রিষ্টুপ ছন্দ ইন্দ্রো দেবতা মধ্যম্—শ. ১০.৩.২.৫), যঃ শ্যতি তনূকরোতি সঃ (ম.দ.য.ভা. ২২.১৬, উ. কো. ১.২০)] ইন্দ্র দেবতাবিশিষ্ট এই দুই ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিদ্যমান পদার্থকে তীক্ষ্ণ ও খণ্ডিত করে।

ভাবার্থ—
উপর্যুক্ত ছন্দ রশ্মির অতিরিক্ত দুইটি ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মি তাদের তীক্ষ্ণতার দ্বারা ডার্ক এনার্জিকে কেটে নষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত করে এবং সংযোজ্য কণাগুলিকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

(দী বা থে) উপর্যুক্ত আচরণের অতিরিক্ত দক্ষ রাজার দুষ্ট শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আরও দুইটি আচরণ আছে। (শিক্ষবঃ) এই দুই আচরণ সেই শত্রু বা সমাজকণ্টককে বিদীর্ণ বা খণ্ড-বিখণ্ড করতে সক্ষম। [শিশুঃ = শিশুঃ শংসনীভো ভবতি (নি. ১০.৩৬)] এর সঙ্গে সঙ্গে এই আচরণগুলি প্রজাদের দ্বারা প্রশংসিত হয়।

ভাবার্থ—
যখন রাজা নিজের মধুর বাক্য ও হিতকারী আচরণ দ্বারা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ বা জয় করতে না পারে, অর্থাৎ শত্রু অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির হয়, তখন রাজা তাকে দণ্ডিত ও নষ্ট করার জন্য দুইটি তীক্ষ্ণ উপায় অবলম্বন করে।

(৪.) নীলশিখণ্ডবাহনঃ ॥১৬॥

সৃষ্টির উপর প্রভাব

আর্ষ ও দৈবত প্রভাব—
পূর্ববৎ।

ছান্দস এবং ঋচার অন্যান্য প্রভাব—
এর ছন্দ স্বরাট যাজুষী পংক্তি অথবা ভুরিক যাজুষী উষ্ণিক। প্রকৃতপক্ষে এটি উভয় রূপেই কার্য করে। এর প্রভাবে উপর্যুক্ত দুইটি ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মি আরও বিস্তৃত ও উষ্ণতায় সমৃদ্ধ হয়। এই কারণে তারা তীক্ষ্ণ বজ্রের রূপ ধারণ করে আসুর তত্ত্ব অর্থাৎ ডার্ক এনার্জিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করতে আরও অধিক সক্ষম হয়।

আমার আধিদৈবিক ভাষ্য

উপর্যুক্ত দুইটি ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মিকে তীক্ষ্ণ করার জন্য দুইটি ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়, যাদের বর্ণনা ছান্দস প্রভাবের অন্তর্গত করা হয়েছে। সেগুলি হল—
(নীলবাহনঃ) নীল বর্ণযুক্ত অর্থাৎ পংক্তি ছন্দ রশ্মি। উল্লেখযোগ্য যে আচার্য পিঙ্গল পংক্তি ছন্দের রং নীল বলেছেন। এই ছন্দ রশ্মি উপর্যুক্ত দুই ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মির মধ্যে একটিকে ধারণ করে তাকে বিস্তারসহ সংযোজনক্ষমতা ও পরিপক্বতা প্রদান করে।
(শিখণ্ডবাহনঃ) [শিখণ্ডঃ = ময়ূরের লেজ (আপ্টে কোষ)] দ্বিতীয় ছন্দ রশ্মি ময়ূরের পাখার ন্যায় চিতকবরে রঙের হয়। আচার্য পিঙ্গল উষ্ণিক ছন্দের রং সারঙ্গ অর্থাৎ চিতকবরা বলেছেন। আমাদের মতে সারঙ্গকেই শিখণ্ড বলা উচিত। এই কারণে দ্বিতীয় বাহনরূপ রশ্মি উষ্ণিক। এই ছন্দ রশ্মি উপর্যুক্ত দুই ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মির মধ্যে একটিকে বহন করে তাকে আরও অধিক উষ্ণ বজ্ররূপে পরিণত করে।

এই কারণে এই প্রসঙ্গের প্রথম ঋচার অনুসারে এখানে তিনটি ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি সিদ্ধ হয়। এর মধ্যে প্রথম অনুষ্টুপ, দ্বিতীয় ত্রিষ্টুপ+পংক্তির যুগল এবং তৃতীয় ত্রিষ্টুপ+উষ্ণিকের যুগল। এই তিনটি মিলিত হয়ে নক্ষত্রে উষ্ণতা ও সংযোজনক্ষমতা বৃদ্ধি করে বাধক শক্তি (ডার্ক এনার্জি)কে পর্যাপ্তভাবে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করতে সহায়তা করে।

ভাবার্থ—
উপর্যুক্ত দুইটি ত্রিষ্টুপ রশ্মিকে পৃথকভাবে একটি পংক্তি এবং অপরটি উষ্ণিক ছন্দ রশ্মি বহন করে। এর ফলে নীল ও চিতকবরে রঙের প্রকাশ ঘটে। এর সঙ্গে সঙ্গে উভয় ত্রিষ্টুপ ছন্দ রশ্মির লাল রঙও প্রকাশিত হয়। ডার্ক এনার্জির প্রক্ষেপক ও প্রতিকর্ষক প্রভাব শান্ত হয়ে কণার সংযোজন ও সংলয়নের ক্রিয়ায় বিশেষ সহায়তা লাভ হয়।

আমার আধিভৌতিক ভাষ্য

উপর্যুক্ত দুই দণ্ডরূপ আচরণ এইরূপ— (নীলবাহনঃ) {নীলঃ = (নীল বর্গে—রঞ্জন, রঞ্জিত করা—সং. ঘা. কো.; পং. যুধিষ্ঠির মীমাংসক)} এমন যুদ্ধবিমান বা যান দ্বারা, যা নানা প্রকারের রং ও রূপ প্রদর্শনে সক্ষম, শত্রুসেনাকে আতঙ্কিত ও ভীত করা হয়। এর ফলে শত্রু যুদ্ধ না করেই পলায়ন করতে পারে। যদি তবুও শত্রু যুদ্ধক্ষেত্রে স্থির থাকে, তবে দ্বিতীয় উপায় হল— (শিখণ্ডবাহনঃ) {শিখণ্ডঃ = শিখামমতি—অম্+ড, শক, পররূপম্ (আপ্টে কোষ), (অম্ গতিশব্দসম্ভবতিষু)}দুষ্ট শত্রুসেনার উপর এমন যুদ্ধবিমান দ্বারা আক্রমণ করা, যা নানা প্রকার চিতকবরে জ্বালায় সমৃদ্ধ এবং সেই জ্বালাগুলি দ্রুতগতিসম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর গর্জন ও বিধ্বংসী বলবিশিষ্ট। এর ফলে দুষ্ট শত্রুসেনা পালিয়ে যায় বা নষ্ট হয়। উল্লেখযোগ্য যে ধর্মাত্মা সজ্জন ব্যক্তিকে কখনও শত্রু মনে করা উচিত নয়; বরং দুষ্ট, অধার্মিক, নিষ্ঠুর ও লোকহিতবিরোধী আচরণকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমূহকেই শত্রু বিবেচনা করা উচিত।

ভাবার্থ—
যখন রাজা মধুর বাক্যের দ্বারা শত্রুর হৃদয় জয় করতে সক্ষম না হন, তখন তিনি শত্রুসেনার উপর নানা রঙ ও রূপ ধারণে সক্ষম, ভয়ংকর গর্জন ও রঙিন বিধ্বংসী জ্বালাসম্পন্ন যুদ্ধবিমান দ্বারা আঘাত হানেন, যাতে শত্রুসেনা যুদ্ধ না করেই ভীত হয়ে পলায়ন করে, নতুবা নষ্ট হয়। মনে রাখতে হবে, সংহারমূলক যুদ্ধ শেষ বিকল্প হওয়া উচিত এবং তাও কেবল লোকশত্রু, দুষ্ট ও অধার্মিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে; অন্যথায় কখনও কাউকে অকারণে দণ্ড দেওয়া বা ব্যক্তিগত লাভ ও অহংকারবশে যুদ্ধ করা উচিত নয়।

জ্ঞাতব্য—
আমরা কুন্তাপ সূক্তের এই চারটি মন্ত্রের কেবল আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক ভাষ্যই করেছি। আধ্যাত্মিক ভাষ্য করিনি। এর কারণ এই যে আমরা প্রফেসর বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারের আধ্যাত্মিক ভাষ্যকেই এক সীমা পর্যন্ত সন্তোষজনক মনে করি।

সুধী পাঠক মহাশয়! আমরা বেদভাষ্যের ত্রিবিধ প্রক্রিয়ার স্বরূপ এবং বৈদিক ঋচাগুলির সৃষ্টির উপর প্রভাব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কয়েকটি ঋচাকে উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করেছি। আমরা কোনও ভাষ্যকারের ভাষ্যের উপর মন্তব্য করিনি, কারণ তাতে গ্রন্থের আকার বৃদ্ধি পেত। যদি আমরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতাম, তবে আমাদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণের অন্যান্য ভাষ্যকারদের ভাষ্যের উপরও কিছু না কিছু মন্তব্য করতে হত।

এটি অপরিহার্যও মনে হয়, এতে গ্রন্থের আকার অনেক বেড়ে যায়। এই গ্রন্থের কোনও ভাষ্যকারের ভাষ্য এমন নয়, যা আমাদের বুদ্ধি গ্রহণ করতে পারে, তবে কোথায়-২ বা কিস-২ মন্তব্য করা যায়? অনুরূপভাবে এই বেদভাষ্যের এই কয়েকটি উদাহরণের বিষয়েও বুঝুন। ভুল শুধুমাত্র সায়ণ, মটিঘর, গ্রিফিথ, উইলসন ও পণ্ডিত সাতাভলেকরই করেননি, বরং অনেক আর্য বিদ্বানও মহর্ষি দয়ানন্দের শৈলী বোঝার অক্ষমতার কারণে এই সমস্ত সাথোদ্দি ভাষ্যকারদের অনুসরণ করেছেন। এক আর্য সন্ন্যাসী, যিনি রসায়নশাস্ত্রের প্রফেসরও ছিলেন, স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতী, তার গ্রন্থ “প্রাচীন ভারতের বৈজ্ঞানিক কর্ণধার” নামক গ্রন্থে, যার শিরোনাম বড় আকর্ষণীয় মনে হয়, মহর্ষি দয়ানন্দকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উইলসন ও গ্রিফিথের বেদভাষ্য এবং ব্রাহ্মণ গ্রন্থের পাশ্চাত্য ভাষ্যকে যথাযথভাবে গ্রহণ ও উদ্ধৃত করেছেন এবং বৈদিক বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে বড় ক্ষতি পৌঁছে দিয়েছেন। পাঠক আমাদের এবং অন্যান্য বিদ্বানদের ভাষ্য মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিজের বুদ্ধি দ্বারা বিচার করুন যে, তাদের প্রতিভাশালী মস্তিষ্ক ও নির্মল-নিষ্পক্ষ হৃদয় কার ভাষ্য গ্রহণ করে। আমরা এই ভাষ্যগুলির উপর এতটুকু বলতে চাই যে, মহর্ষি দয়ানন্দের বাদে কোনও ভাষ্যকার বেদার্থের যৌগিক শৈলী সম্পর্কে অজ্ঞানতার কারণে বেদগুলিকে রুদ্রার্থে রূপান্তরিত করেছেন বা বলা যায় যে, বিদ্বানরা যতই সায়ণের মতো বহুধ্রুত হোক না কেন, তারা বেদার্থের বাস্তব প্রক্রিয়ার গন্ধও পাইনি, অন্যথায় আজও বিশ্বের বেদগুলির মহত্ত্বপূর্ণ বিজ্ঞানের খ্যাতি স্থায়ী থাকত।

প্রশ্ন উঠছে, মহর্ষি দয়ানন্দের বাদে অন্যান্য এই বেদ ভাষ্যকারদের ভুলগুলি কী কী ছিল, যার কারণে বেদ বিদ্যা লোপ পেয়েছে বা বেদের বিকৃত বা অনিষ্ট রূপ বিশ্বের সামনে প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের মনে এই ভুলগুলি নিম্নরূপ—

১. বেদের ঋচাগুলির রূপ ও বিজ্ঞাণ বোঝা যায়নি।
২. দেবতা ও প্রकरण জ্ঞানকে উপেক্ষা এবং দেবতার রূপের বৈজ্ঞানিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা।
৩. মন্ত্রের ঋষির বৈজ্ঞানিক রূপ সম্পর্কে অজ্ঞানতা।
৪. পদগুলির অর্থ করার যৌগিক শৈলীর স্থলে রীতিমতো প্রচলিত অর্থ গ্রহণ। লক্ষ্যনীয় যে প্রচলিত অর্থ গ্রহণে ব্যাকরণজ্ঞান যথেষ্ট, কিন্তু যৌগিক অর্থের জন্য বিশেষ প্রতিভা, উদ্ভাবনী যুক্তি ক্ষমতা এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিস্তৃত জ্ঞান অপরিহার্য। এছাড়াও ঈশ্বরের কৃপা, ধ্যান, মনন-সাধনা থাকা অত্যাবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরীয় বিদ্যার আলো প্রাপ্তির জন্য ঈশ্বরীয় কৃপা এবং তার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস অত্যন্ত প্রয়োজন। লক্ষ্যনীয়, বিশেষ প্রতিভা, উদ্ভাবনী ও যুক্তি-ক্ষমতা কোনো গুরু দ্বারা দেওয়া যায় না। আমাদের মতে এটি জন্মগত, সাথে সঙ্গে বিশুদ্ধ সাত্বিক আহার, সাত্বিক মনন-শ্রবণ-দর্শন এবং সম্পূর্ণ নীরাশ্রয়ী ইশ্বরপূজার মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়। বর্তমান পরিবেশে এটি অত্যন্ত কঠিন, তবে যে কোনো বিদ্বান বেদ বা আর্ষ গ্রন্থের বিজ্ঞাণ জানতে চায়, তাকে এই চেষ্টা করতে হবে।

৫. বেদার্থে পাণিনীয় ব্যাকরণের অনুযায়ী কঠোর চেষ্টা করা। তবে এই ব্যাকরণেও ব্যাপক দৃষ্টির অভাব, বিশেষত ধাতুর বহু অর্থের বিজ্ঞানে অজ্ঞতা। বেদে ব্যত্যয় কার্যাবলীর প্রাচুর্য, নিপাতন, বৈদিক বা আর্ষ ব্যবহারগুলির সঠিকতা, গণপাঠে আকারসংখ্যার বিস্তৃতি ইত্যাদি উপেক্ষা করে কেবল জনপ্রিয় প্রয়োগের উপর নজর রাখা। বিবেকহীন রুদ্রার্থ ব্যবহার কেবল বেদার্থে নয়, নিজ ব্যাকরণের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মহাভাষ্য’-এর অধ্যয়নেও এইরকম প্রথা চলেছে। আমরা আগ্রহী পাঠকদের জন্য প্রসঙ্গক্রমে এটিও বিবেচনা করি।

ব্যাকরণ মহাভাষ্যের একটি উদাহরণে আমার মতামত
সকল বিজ্ঞ ব্যাকরণ মহাভাষ্যের এই বিষয় (উদাহরণ) সম্পর্কে ভালোভাবে পরিচিত—
“পঞ্চ পঞ্চনখা ভক্ষ্যাঃ, অতো’ন্যে অভক্ষ্যাঃ” এবং
“অভক্ষ্যো গ্রাম্যকুক্কুটঃ, অভক্ষ্যো গ্রাম্যশূকরঃ।”
আরন্যো ভক্ষ্য ইতি।

(ব্যাকরণ মহাভাষ্য ১.১.১, শাস্ত্রনির্মাণরীতি নিরূপণাধিকারণम्)
এই বিষয়ে সকল ব্যাকরণবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি একইভাবে বিভ্রান্তই ছিল। প্রচলিত অর্থ ব্যবহার করে তারা এই বাক্যগুলির অর্থ নিম্নরূপ করেছেন—
"পাঁচ নখযুক্ত পাঁচ প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়, অন্য প্রাণীর মাংস খাওয়া উচিত নয়। অনুরূপভাবে গ্রামের শূকর ও মুরগির মাংস খাওয়া উচিত নয়, বনস্থ শূকর ও মুরগির মাংস খাওয়া যায়।"

যারা এমন অর্থ করেছেন তাদের মত অনুযায়ী মহাভাষ্যকার মহর্ষি পতঞ্জলি মাংসাশী মানুষের জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করেছেন, যাতে তারা সীমিত মাংসাশী হতে পারে। এই বিদ্বানদের যুক্তি হাস্যকর। যেই ঋষিদের অষ্টাঙ্গ যোগ অহিংসার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ঋষিরাই কি মাংসাশীর অনুমতি দেবেন? এটি একান্ত শান্তিপ্রিয় ভাবনা। মাংসাশীর মতো অন্য পাপও কি তারা সীমিত অনুমোদন দেবেন? আমরা বিশ্বের বেদজ্ঞদের ঘোষণা দিয়ে বলতে চাই যে, তারা বেদ বা ঋষিদের পবিত্র গ্রন্থে মাংসাশী, ব্যভিচার ইত্যাদির নিন্দাজনক কল্পনা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। এই গ্রন্থগুলিতে এর গন্ধও নেই। যদি কোথাও কারও কাছে তা মনে হয়, তবে হয় সে ওই প্রসঙ্গের যৌগিক অর্থ জানার যোগ্যতা রাখে না বা সেই প্রসঙ্গ প্রক্ষিপ্ত।

এবার আমরা অতিস্তর ব্যাখ্যা না করে সরাসরি মূল বিষয়ের দিকে আসি—
“পঞ্চ পঞ্চনখা ভক্ষ্যাঃ, অতো’ন্যে অভক্ষ্যাঃ"
প্রচলিত অর্থ গ্রহণ না করে যৌগিক অর্থ গ্রহণ করা হবে, যা নিম্নরূপ—
“মহতু, অহংকার, মন, 'ওম' রশ্মি এবং ব্যাহৃতি সংজ্ঞক রশ্মির পঞ্চক বা পঞ্চ অর্থাৎ প্রাণ, আপান, ব্যান, সমান, উদান; এই পাঁচের পঞ্চক বা মন, চাকু, প্রাণ, ছন্দ-মরুত ও মাস-ঋতু রশ্মির পঞ্চক।” নখঃ অর্থাৎ বন্ধিত ('নহ বन्धনে' ধাতু, ঔণাদিক খ প্রত্যয়)। ‘পঞ্চ’ অর্থাৎ পাঁচ প্রাণ বা পাঁচ মহাতত্ত্ব। ‘ভক্ষ্যাঃ’ অর্থাৎ খাওয়া, অর্থাৎ পরস্পর সংযোগযোগ্য (এখানে ‘ভক্ষ্য’ অর্থ সংযোগযোগ্য ধরা হয়েছে; খাওয়ার সময় পদার্থ বা নষ্ট হয় বা সংযোগ (মিশ্রণ) ঘটে)।

ভাবার্থ—
১. (পঞ্চ) মহতু, অহংকার, মন, 'ওম' রশ্মি ও ব্যাহৃতির পঞ্চক থেকে (নখা) বন্ধিত পাঁচ প্রধান প্রাণ পরস্পর সংযোগযোগ্য হয়, ফলে এই পাঁচ প্রাণ এই সৃষ্টিতে নানা দল উৎপন্ন করে।
২. (পঞ্চ) প্রাণ-আপানাদি পঞ্চক থেকে (নখা) বন্ধিত পাঁচ মহাতত্ত্ব (ভক্ষ্যাঃ) পরস্পর সংযোগযোগ্য হয়, ফলে সৃষ্টির প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে চলে।
৩. (পঞ্চ) মন, বাক, প্রাণ, ছন্দ-মরুত ও মাস-ঋতু রশ্মির পঞ্চক থেকে (নখা) বন্ধিত পাঁচ মহাতত্ত্ব পরস্পর সংযোগযোগ্য, অর্থাৎ এদের মিলনেই সমগ্র সৃষ্টি হয়েছে।

(অতো’ন্যে) অন্য সমস্ত অসুরজাত পদার্থ, যা ছন্দ রশ্মির সংযোগে বাধা সৃষ্টি করে, তারা (অভক্ষ্যাঃ) সংযোগের উপযুক্ত নয়; বা উপরে উল্লিখিত জড় পদার্থের বাইরে ঈশ্বর বা জীবচেতন পদার্থ সংযোগযোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে সংযোগ বা বিকার শুধুমাত্র জড় পদার্থে সম্ভব, চেতনায় কখনও নয়।

"অভক্ষ্যের গ্রাম্যকুক্কুটঃ, অভক্ষ্যের গ্রাম্যশূকরঃ। আরণ্য ভক্ষ্য ইতি।"

আধিদৈবিক অর্থ—
পদার্থ- গ্রামে অবস্থানকারী গ্রাম্য। গ্রাম্য (ছন্দ রশ্মি বা অন্যান্য বিভিন্ন তরঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগের যেকোনো কাজ গ্রাম্য বলা হয়)। (গ্রাম্য কুক্কুটঃ) গ্রাম্যকুক্কুটঃ (কুক = অসুরজাত বাধক পদার্থ, কুটঃ = নষ্টকারী বজ্ররশ্মি) ভক্ষ্য অর্থাৎ সংযোগ বা নষ্ট করতে অযোগ্য। 

ভাবার্থ- ছন্দ রশ্মির মধ্যে বা তাদের পারস্পরিক সংযোগে (কুক্কুটঃ) বজ্ররূপ রশ্মির সংঘাতক অবরোধক ভক্ষ্য, কারণ যদি বজ্ররশ্মির ভক্ষণ ঘটে, ছন্দ রশ্মির সংযোগে অসুর উপাদান বাধা সৃষ্টি করে, সৃষ্টির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

‘অভক্ষ্য গ্রাম্যশূকরঃ’— এখানে শূকরঃ অর্থ ধ্রুবপ্রাণ রশ্মি, যা দ্রুত সংযোগ বা আচ্ছাদন করে। এই রশ্মিও গ্রাম্য অর্থাৎ ছন্দ রশ্মির মধ্যে বা তাদের সংযোগে ধারণ করে সংযোগ প্রক্রিয়াকে স্থায়ী রাখে, তাই এগুলোও অভক্ষ্য।

‘আরণ্য ভক্ষ্যঃ’—
পদার্থ- (আরণ্যঃ) অরণ্যস্থায়ী, অর্থাৎ যা রণ বা সংঘাতের অবস্থায় নেই।
ভাবার্থ- যা রণ বা সংঘাতের অবস্থায় নেই, এমন অবস্থায় বিদ্যমান বজ্ররূপ রশ্মি ‘ভক্ষ্য’ অর্থাৎ ভক্ষণ বা দূর করার যোগ্য, কারণ সংঘাতের অভাবের কারণে বজ্ররশ্মির প্রয়োজন হয় না। এছাড়া, যেসব রশ্মির কাজগুলিতে অসুর রশ্মি বাধা দিতে অক্ষম, সেই রশ্মিও আরণ্য বলা হয়। এই রশ্মিতেও বজ্ররূপ রশ্মি ভক্ষ্য হয়।

(প্রকরণের অনুযায়ী আমরা ‘ভক্ষ’ ধাতুর দুটি অর্থ গ্রহণ করেছি)।

পাঠক! ভাবুন, এত উচ্চ ও গভীর তত্ত্বগত জ্ঞান প্রদর্শনকারী এই উদাহরণটি, বেদবিদ্যার মর্ম অজ্ঞ ব্যাকরণবিদদের দ্বারা মাংসাশীকে উদ্দীপক বা সহায়ক করার দুর্ভাগ্যজনক কাজ করে। এমন ব্যাকরণ-জ্ঞানের এই পৃথিবীতে কী উপযোগিতা আছে? হ্যাঁ, বেদ ও ঋষিদের নামে সমগ্র বিশ্বে পাপাচার ছড়ানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যাকরণ-জ্ঞান, যেখানে অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তি বা বিবেকের সম্পূর্ণ অভাব, অবশ্যই নেতৃত্ব প্রদান করেছে।

৬. বেদার্থে নরুক্ত এবং ব্রাহ্মণ গ্রন্থের নির্বচনগুলি ব্যবহার না করা বা সেগুলি উদ্ধৃত করার পরও তাদের বিজ্ঞানের প্রতি সম্পূর্ণ অজ্ঞতা থাকা।

৭. অর্থ ও কাম ইত্যাদিতে আসক্তি না থাকা। ভগবান মনুর বচন অনুযায়ী—
অর্থ-কমেষ্যস্তানাং ধর্মজ্ঞানং বিষীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাং প্রমাণং পরমং শ্রুতিঃ। (মনু ২.১৩)

পদ, প্রতিষ্ঠা ও ধন ইত্যাদির আসক্তিতে বন্দী বিদ্বানও ধর্ম (বিজ্ঞান) এবং এর উৎস বেদের যথার্থ তত্ত্ব বুঝতে সক্ষম নয়।

আমরা সমগ্র বিশ্বের বেদাদিশাস্ত্রের গভীর অধ্যেতাদের আহ্বান জানাই যে, তারা মিথ্যা রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি বিকার এবং সকল পূর্বধারণা ত্যাগ করে, বিশুদ্ধ সৎ গুণসম্পন্ন হয়ে, সম্পূর্ণ নিঃকাম ভাবনায় বেদ বা আর্শ গ্রন্থের বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করুন। যদি আপনি এটি করতে পারেন, তবে আপনাকে বেদ বা ঋষিদের বিজ্ঞানের অসাধারণ দীপ্তি প্রাপ্ত হবে।

০০ এভাবে নবম অধ্যায় সমাপ্ত। ০০

এই কথা আমরা পূর্বেও লিখেছি যে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির ভাষা অন্যান্য আর্ষ গ্রন্থের তুলনায় সর্বাধিক জটিল ও প্রতীকধর্মী। কিছু উপনিষদের ভাষা কোথাও কোথাও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের ভাষার সঙ্গে মিল রয়েছে। এই বিষয়ে আমরা “ব্রাহ্মণ গ্রন্থের স্বরূপ ও তাদের প্রতিপাদ্য বিষয়” নামক অধ্যায়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করেছি। এখানে আমরা ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ভাষ্যকে ভিত্তি করে আমাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রসিদ্ধ বলে মান্য বেদবিদ আচার্য সায়ণের ভাষ্যের তুলনা করব, যাতে বিবেচক পাঠকগণ নিজেরাই আমাদের ব্যাখ্যার গুরুত্ব, সত্যতা ও অপরিহার্যতা উপলব্ধি করতে পারেন। এই বিষয়ে দিল্লির বৈদিক স্বাধ্যায়প্রেমী ভৌতবিজ্ঞানী (প্রাক্তন বিভাগाध्यक्ष, মেডিক্যাল ফিজিক্স, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মদন মোহন বাজাজ মহাশয়ের বিশেষ আগ্রহ ছিল যে আচার্য সায়ণের সম্পূর্ণ ভাষ্য এই ব্যাখ্যার সঙ্গে প্রকাশিত হোক, যাতে বিদ্বানগণ উভয় ভাষ্যের তুলনা স্ববিবেক অনুযায়ী করতে পারেন এবং বুঝতে পারেন যে বৈদিক বিদ্যা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাস ও জ্ঞান–বিজ্ঞান কীভাবে অধোগতির পথে গিয়েছে। যদিও অধ্যাপক বাজাজের প্রস্তাব সময়োপযোগী, তবু এতে গ্রন্থের পরিসর অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়, এই কারণে তুলনার উদ্দেশ্যে কেবল কয়েকটি অংশই এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

প্রথমে এই গ্রন্থের খণ্ড ১.১ ও ১.২ অংশ আমরা সায়ণ ভাষ্যের সঙ্গে সঙ্গে ড. সুধাকর মালবীয়ের হিন্দি অনুবাদসহ উদ্ধৃত করছি—

অতস্তামিষ্টি বিধাতু তদেবতারূপমগ্নি বিষ্ণু চাঽঽদী প্রশংসতি—
অগ্নির্বৈ দেবানামবমো বিষ্ণুঃ পরমস্তবন্তরেণ সর্বা অন্যা দেবতাঃ ॥

যোऽয়মগ্নিরস্তি, সোऽয়ং দেবতামধ্যে অবমঃ প্রথম দ্রষ্টব্যঃ ।
বস্তু ‘বিষ্ণুঃ’ সোऽয়ং ‘পরমঃ’ উত্তমঃ । বৈশব্দ উক্তার্থে মন্ত্রপ্রসিদ্ধিদ্যোতনার্থঃ। ‘অগ্নির্মুখং প্রথমো দেবতানাং সংগতানামুত্তমো বিষ্ণুরাসীত্’ ইতি হি মন্ত্র আম্নায়তে। যদ্ধা বৈশব্দ উপপত্তিপ্রসিদ্ধ্যর্থঃ।
উপপত্তিশ্চেয়ং যোজনীয়া। যদ্যপি দেবশব্দঃ সাধারণত্বাৎ সর্বদেবতাবাচী তথাঽপ্যত্র প্রকরণবালাদগ্নিষ্টোমাঙ্গেষু শস্ত্রেষু প্রতীয়মানাঃ প্রধানদেবতা বিবক্ষ্যন্তে। শস্ত্রাণি চ দ্বাদশ। তেপ্যাজ্যশস্ত্রং প্রথমম্, তস্মিন্শ্চ ‘ভূরগ্নিজ্যোতিঃ’ ইত্যগ্নিরাম্নাতঃ। আগ্নিমারুত শস্ত্রমন্তিমম্, তস্মিন্ ‘বিষ্ণোনু কম্’ ইতি বিষ্ণুরাম্নাতঃ। এবমগ্নিষ্টোমসংস্থায়াং শস্ত্রপাঠাপেক্ষমগ্নেঃ প্রাথম্যং বিষ্ণোরুত্তমত্বং চ। যথা, সর্বাসু সংস্থাসুক্তন্যায়েনাগ্নেঃ প্রাথম্যং বিষ্ণোরুত্তমত্বম্, অন্তিমসংস্থায়ামাপ্তোর্যামাখ্যায়াং ত্রয়স্বিশত্স্তো ত্রশস্ত্রোপেতায়ামন্তিমং স্তোত্রং শস্ত্রং চ বৈষ্ণবমিতি তদপেক্ষয়া দ্রষ্টব্যম্। যথা, প্রথমামাং দীক্ষণীয়েষ্টাবগ্নিরিজ্যতে। অন্তিমায়ামুদয়নীয়েষ্টী বৈষ্ণবী পূর্ণাহুতির্বাজসনেমিভিরাম্নাতা। সর্বথাঽপি স্তোতব্যাণু যষ্টব্যাংশ্চ দেবানপেত্যাগ্নেঃ প্রাথম্যং বিষ্ণোরুত্তমত্বং চ যুক্তম্। তদন্তরেণ তয়োঃ প্রথোমোত্তময়োরগ্নাবিষ্ণ্বোর্মধ্যে তত্তচ্ছস্ত্রপ্রতিপাদ্যাঃ ‘অন্যান্যাঃ’ ইন্দ্রবায়্বাদয়ঃ ‘সর্বাঃ’ প্রধানদেবতাঃ বর্তন্তে। তস্মাৎ সর্বদেবতানামুভয়তো রক্ষকববস্থিতাবগ্নাবিষ্ণূ প্রশস্তাবিত্বচেঃ। [সোমযাগনিরূপণ]

সৌমিকেষু বষ্টব্যাসু স্তোতব্যাসু চ সর্বাসু দেবতাস্বগ্নাবিষ্ণূ প্রশস্য তদ্দেবতাকামিষ্টি বিধতে—
আগ্নাবৈষ্ণব পুরোলাশং নির্বপত্তি দীক্ষণীয়মেকাদশকপালম্ ॥

অগ্নিশ্চ বিষ্ণুশ্চাগ্নাবিষ্ণূ তায়ুভী পরস্পরব্যাসক্তী যস্য পুরোডাশস্যৈকা দেবতা সোऽস্মাগ্নাবৈষ্ণবঃ।
যথোক্ত দেবতা প্রতি হবিশ্ত্বেন প্রদেশদ্রব্যরূপঃ পক্বঃ পিষ্টপিণ্ডঃ পুরোডাশ ইত্যুচ্যতে।
ডকারস্যাত্র ত্কারঃ, এতচ্ছাখাধ্যয়নসম্প্রদায়েন প্রাপ্তঃ।
শকটাবস্থাপিতব্রীহিসংযান্নিষ্কৃষ্য মুষ্টিচতুষ্টয়পরিমিতানাং ব্রীহীণাং শূর্পে প্রক্ষেপো নির্বাপঃ।
তৎপূর্বকো যাগোऽন্ন নির্বাপণোপলক্ষ্যতে।
আগ্নাবৈষ্ণবং পুরোডাশমিতি সামানাধিকরণ্যেনাবগতস্য দ্রব্যদেবতাসম্বন্ধস্য যাগমন্তরেণানুপপন্নত্বাৎ।
সতি তু যাগে সম্পর্ক উপপদ্যতে।

“উদ্দেশ্য দেবতা দ্রব্যত্যাগো যাগো অভিধীয়তে ॥”

ইতি যাগলক্ষণস্য পূর্বাচার্যরুক্তত্বাৎ। নির্বপন্তীত্যয়ং শব্দো ন বর্তমানার্থঃ। কিন্তু বিধ্যর্থঃ। স চ
লকারো লিঙেথে লেডিতি সূত্রেণ বিধ্যর্থো দ্রষ্টব্যঃ। এবং চ সতি শাখান্তরণসংবাদো ভবতি। তথা চ তৈত্তিরীয়াঃ বিস্পষ্ট বিধিমামনন্তি—
‘আম্নাবৈষ্ণবমেকাদশকপালং নির্বপেদ্দীক্ষিষ্যমাণঃ’ ইতি। তন্নেকপ্রয়োগাপেক্ষমেকবচনম্। অত্র তু বহুপ্রয়োগগত সপ্রগতং বা যজমানবহুত্বমপেক্ষ্য নির্বপন্তীতি বহুবচনম্। শুদ্ধা, ছান্দসো বচনব্যত্যয়ঃ।সোমযাগে প্রবৃত্তস্য যজমানস্য সংস্কারো দীক্ষণম্, তস্য চ সংস্কারস্য হেতু কর্মবিশেষো দীক্ষণীয়াশব্দবাচ্যঃ। তস্য চ কর্মবিশেষস্য বাচকেন শব্দেন তৎকর্মসাধনমুপলক্ষ্যতে। ততো দীক্ষণীয়াখ্যকর্মসাধন পুরোডাশমিতি সামানাধিকরণ্যগুপপন্নম্। একাদশসু কপালেষু সংস্কৃতঃ পুরোডাশ একাদশকপালঃ। তেষু হি পুরোডাশঃ শ্রপ্যতে। দীক্ষণীয়া ইষ্টিতে অগ্নি এবং বিষ্ণুকে গ্যারো কপালের পুরোডাশ অর্পণ করা উচিত। অত্র প্রথমোত্তময়োরগ্নাবিষ্ণোঃ পুরোডাশদেবতাত্বে ফলিতং দর্শয়তি—সর্বাম্য এবৈন সদ্দেয়তাম্যো অনন্তরায় নির্বপত্তি॥

‘ঋতু’ সেনা ৫৫ আম্নাবৈষ্ণবত্বেন তস্মোরগ্নাবিষ্ণ্যোর মধ্যবর্তিনীনাং সৌমিকীনাং সর্বাসাং দেবতানামুপলক্ষিতত্বাৎ ‘অনন্তরায়’ নিরবশেষং কাবিদপি দেবতা বিশেষিতা যথা ন ভবতি তথৈনং পুরোডাশং যজমানাঃ নির্বপন্ত্যেব। অনের নির্বাপণে সর্বা দেবতাস্তৃপ্যন্তীত্যর্থঃ। যথা বৈয়াকরণঃ প্রত্যাহারেষু আদ্যন্তয়োর্বর্ণযোগ্রহণেন মধ্যপাতিনঃ সর্বেষাং বর্ণানাং গ্রহণমিচ্ছন্তি। ন্যায়স্তরীয় এবং ব্যবহ্রিয়তে ‘তন্মব্যপতিতস্তগ্রহণেন গৃহ্যতে’ ইতি। যথা বা লোকে ভুঞ্জানানামেকপঙ্ক্তৌ উপবিষ্টানাম্ আদ্যন্তয়োর্ব্রাহ্মণয়োঃ পরিতোষেণ মধ্যবর্তিনঃ সর্বে পরিতুষ্টা ইতি নিশ্চিতম্, তদেবং দ্রষ্টব্যম্॥

সব দেবতাকে এইভাবে অর্পণ করা উচিত যাতে কোনো দেবতাই বাদ না পড়ে।

ননগ্নাবিষ্ণ্যোরেব নির্বাপে সম্পর্কঃ ভ্রূয়তে, ন তু মধ্যস্থিতদেবতানাম্, তৎকথং তাসাং তৃপ্তিরিত্যাশঙ্কর
তৎসিদ্ধার্থং ত্যোরেব সর্বদেবতান্তর্ভাবং দর্শয়তি—
অগ্নির্যেঃ সর্বা দেবতাঃ বিষ্ণুঃ সর্বা দেবতাঃ॥

অগ্নেঃ সর্বদেবতারূপত্বে শ্রুত্যান্তরপ্রসিদ্ধিদ্যোতনার্থং বৈ-শব্দঃ। তথা চ তৈত্তিরীয়াঃ পৌরোডাশিকে কাণ্ডে সমামনন্তি— ‘তে দেবা অগ্নী তনূঃ সন্ন্যদধত তস্মাদাহুঃ “অগ্নিঃ সর্বা দেবতাঃ” ইতি’।

সৌমিকেঽপি কাণ্ডে শ্রূয়তে— ‘দেবাসুরাঃ সংযত্তা আসন্ স দেবা দিভ্যতোऽগ্নিম্ প্রাবিশন্ তস্মাদাহুঃ “অগ্নিঃ সর্বা দেবতাঃ” ইতি’।

বিষ্ণু ব্যাপ্তৌ ইত্যস্মাদ্ধাতোরুৎপন্নো বিষ্ণুশব্দঃ। ব্যাপ্তিশ্চ সর্বজগদুৎপাদানকারণত্বেন সর্বাত্মকত্বাদুপপদ্যতে। অত এব স্মরন্তি— ‘ভূতানি বিষ্ণুর্ভুবনানি বিষ্ণুঃ’ ইতি॥

কারণ অগ্নিই সব দেবতা। বিষ্ণুই সব দেবতা।

সর্বদেবতাত্মকত্বেন অগ্নাবিষ্ণূ প্রশস্য প্রকারান্তরে পুনঃ প্রশংসতি—
এতে বৈ যজ্ঞস্যান্ত্যে তন্বী যদগ্নিশ্চ বিষ্ণুশ্চ তদ্যদগ্নাবৈষ্ণবং পুরোডাশং নির্বপত্ত্যেত এভং
তদেবানৃশ্নুবন্তি॥ অগ্নিশ্চ বিষ্ণুশ্চেত্যনয়োর্দেবতয়োর্যৎ শরীরদ্বয়মস্তি, ‘এতে’ উভী ‘তন্বী’ যজ্ঞস্যান্ত্যে

সোমভাগস্য আদৌ অন্তে চ বর্তমানৌ। আদ্যা চান্যা চেতি বিবক্ষায়ামেকশেষেণ ‘অন্ত্যে’ ইতি ভবতি।
যথা ‘মাতা চ পিতা চ’ ইত্যত্র ‘পিতরৌ’ ইত্যেকশেষঃ, তদ্বৎ। আদ্যন্তবর্তিত্বং ধাগ্নিয়ং দেবতানাময়মিত্যত্রৈব উপপাদিতম্। তথা সতি আদ্যন্তবর্তিত্বে সতি তাদৃশদেবতাকং ‘পুরোডাশং নির্বপন্তীতি’ বচনস্তৎতেন যথোক্তনির্বাপেণ অন্ততো যাগস্য আদৌ অন্তে চ দেবান্ সর্বান্ অনৃশ্নুবন্ত্যেব পরিচরন্ত্যেব। সমেতার্থবাদ দীক্ষণীয়েষ্টিবিধিং তৈত্তিরীয়াঃ অপি বিস্পষ্টমামনন্তি— ‘আম্নাবৈষ্ণবমেকাদশকপালং নির্বপেদ্দীক্ষিষ্যমাণোऽগ্নিঃ সর্বা দেবতাঃ বিষ্ণুর্যজ্ঞো দেবতাশ্চৈব’।

যহাং চ আরম্ভতে—
‘অগ্নিরয়মো দেবানাং বিষ্ণুঃ পরমো যদাম্নাবৈষ্ণবমেকাদশকপালং নির্বপতি
দেবতা এব উভৌ ভব্যতঃ পরিগৃহ্য যজমানোऽবরুন্ধে’ ইতি।

অগ্নি ও বিষ্ণু দেবতার এই যে দুটি শরীর, তা দুটিই যজ্ঞের দুই প্রান্ত, অর্থাৎ সোমযাগের আদিতে এবং অন্তে অবস্থানকারী।

ইদানীং যথোক্তবিধি ব্রহ্মবাদীচোদ্যমুদ্দাবয়তি—
তদাহুর্যদেকাদশকপালঃ পুরোডাশো দ্যাবগ্নাবিষ্ণূ কইনয়োস্তত্র ক্লৃপ্তিঃ, কা বিভাগ ইতি॥

‘তৎ’ তত্র কপালসংখ্যায়াং ব্রহ্মবাদিন আহুঃ—উদয়ন্তি। একাদশসু কপালেষু সংস্কৃতঃ পুরোডাশ একমেব দ্রব্যম্, তস্য ভোক্তারৌ ‘দ্বি’ দেবী। অনভোর্দ্বয়োঃ সমপ্রধানত্বেন বিষমাশ্রয়যুক্তত্বাৎ ‘তত্র’ দ্রব্যে কা ক্লৃপ্তিঃ বিভাগকল্পনা নিমিত্তং কি স্যাত্? ‘কা বিভাগঃ’ নিমিত্তবিশেষাভাবাৎ নৈমিত্তিকো বিভাগবিশেষঃ কথং ঘটেত? ‘ইতি’ শব্দঃ চোদ্যসমাপ্ত্যর্থঃ॥

এই যে অগ্নি ও বিষ্ণুকে পুরোডাশ অর্পণ করা হয়, তা উভয় দিক থেকেই যজ্ঞের দেবতাদের পরিচর্যা করে। [এখন প্রশ্ন এই যে]—যখন বলা হয়েছে যে গ্যারো কপালের পুরোডাশ হওয়া উচিত, তখন অগ্নি ও বিষ্ণু তো মাত্র দুই দেবতা; সেক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে বণ্টনের (ক্লৃপ্তিঃ) ক্রম কী হবে এবং বিভাগ কীভাবে হবে?

ব্রহ্মবাদিষ্বেব মধ্যে অভিজ্ঞনাং চোদ্যপরিহারমুদ্রাবয়তি— অষ্টাকপাল আগ্নেয়ঃ, অষ্টাক্ষরা বৈ গায়ত্রী, গায়ত্রমগ্নেশ্ছন্দঃ, ত্রিকপালো বৈষ্ণবঃ, ত্রিহীদ বিষ্ণুর্ব্যক্রমত, তেনয়োস্ত্র ক্লৃপ্তিঃ সা বিভাগঃ॥ 

অষ্টসু কপালেষু সংস্কৃতঃ পুরোডাশভাগোऽগ্নেঃ সম্পর্কী। স চ সম্পর্কশ্ছন্দোদ্বারা দ্রষ্টব্যঃ।

গায়ত্রীনামক ছন্দ অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ অগ্নি ও গায়ত্রীর উভয়েরই প্রজাপতির মুখজাত হওয়ার সাম্য আছে। এই মুখজাতত্বই তৈত্তিরীয়রা সপ্তম কাণ্ডে পাঠ করেন—
‘প্রজাপতিরকামবত প্রজায়েয়েতি স মুখতরিত্বৃৎ নিরমিমীত তমগ্নিদেবতান্বসৃজ্যত গায়ত্রীছন্দঃ’ ইতি।

তস্যাশ্চ গায়ত্র্যাঃ পাদাক্ষরেষু অষ্টত্বসংখ্যা দৃশ্যতে। এইরূপে উক্ত পুরোডাশভাগের অগ্নির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ত্রিসু কপালেষু সংস্কৃতঃ পুরোডাশভাগো বিষ্ণোর সম্পর্কী।
‘হি’—যে কারণে বিষ্ণু এই সমগ্র জগৎ ত্রিরাবৃত্ত স্বীয় পদবিক্ষেপের দ্বারা ব্যাপ্ত করেছেন।
তথা চ মন্ত্রে আম্নায়িত—
‘ইদং বিষ্ণুর্বি চক্রমে ত্রেধা নিদধে পদম্’ ইতি, এবং ‘বরিণি পদা বি চক্রমে বিষ্ণুর্গোপা আদাভ্যঃ’ ইতি।

‘সা’—এই যে অষ্টসংখ্যা ও ত্রিসংখ্যা—এই দুই দেবতার ক্ষেত্রে পুরোডাশে ক্লৃপ্তি বা বিভাগকল্পনার কারণ। তদনুসারেই বিভাগ স্থির করতে হবে।

উত্তর এই যে—আট কপালের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশ অগ্নিদেবতার জন্য। গায়ত্রী (ছন্দের এক চরণে) আট অক্ষরযুক্ত, এবং গায়ত্রীই অগ্নির ছন্দ। তিন কপাল বিষ্ণুর জন্য, কারণ বিষ্ণু এই সৃষ্টিকে তিন পদে পরিমাপ করেছেন। এইভাবেই বণ্টনের ক্রম নির্ধারিত।

ইতি সার্থবাদেন বিধিবাক্যেন দীক্ষণীয়েষ্টি বিধায় তস্যামেবেষ্টৌ প্রতিষ্ঠাকামস্য পুরোডাশমপোধ্য
দ্রব্যান্তরং বিধতে—
পুতে চরু নির্বপেত্ যোऽপ্রতিষ্ঠিতো মন্যেত॥ ইতি।

পুত্রাদি প্রজা ও গবাদি পশু থেকে বঞ্চিত থাকাকে অপ্রতিষ্ঠিততা মনে করে যে যজমান,
সে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য ঘৃতযুক্ত খণ্ডুল দ্বারা চরু প্রস্তুত করে অর্পণ করবে।

যে নিজেকে অপ্রতিষ্ঠিত মনে করে—অর্থাৎ পুত্রাদি প্রজা ও গবাদি পশু থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে—
সে (প্রতিষ্ঠার্থে) ঘৃতযুক্ত চরু অর্পণ করবে।

অপ্রতিষ্ঠিতত্বস্থ অত্যন্তিক দোষত্ব প্রদর্শন করে—
অস্যাং বাভ স ন প্রতিতিষ্ঠতি যো ন প্রতিতিষ্ঠতি॥ ইতি।

‘যো’—যে যজমান প্রজা ও পশুরূপ প্রতিষ্ঠা থেকে বর্জিত,
‘সোऽস্যাং বাভ’—এই সমগ্র পৃথিবীতে
‘ন প্রতিতিষ্ঠতি’—প্রশংসনীয় হয় না।
অতএব অপ্রতিষ্ঠার পরিহার করা উচিত—এই অর্থ।

যে যজমান প্রজা ও পশুরূপ প্রতিষ্ঠা থেকে বঞ্চিত, সে এই পৃথিবীতে প্রশংসিত হয় না।
[অতএব অপ্রতিষ্ঠা দূর করা উচিত।]

ঘৃতবরুণ তাৎপরিহার দর্শয়তি—

তদ্যদ্‌ঘৃত তৎস্ত্রিয়া পয়ঃ, যে তণ্ডুলাস্‌তে পুংসস্তন্মিথুন মিথুনেনৈবৈন তৎজয়া পশুভিঃ প্রজনয়তি
প্রজাত্যে ।। ইতি।

তত্তত্র ঘৃতপক্বে চরৌ বদঘৃতমস্তি তৎস্রিয়ে পয়ঃ স্ত্রিয়াঃ শোণিতম্। দ্রবত্বসাম্যেন পয়ঃ শব্দঃ
শোণিতমুপলক্ষয়তি। বিলীনস্য পৃথস্থেষদ্রক্তত্বসাম্যেন যোষিদবীর্যত্বমুপচর্যতে। চরী যে তণ্ডুলাঃ সন্তি, তে পুংসো
রেশা ইতি শেষঃ। শ্বেতত্বং স্বপ্ন সাম্যম্। তদ্‌ঘৃততণ্ডুলোভয়াত্মক চরুদ্রব্যং মিথুনসদৃশং তৎস্মাৎ
কারণান্‌মিথুনরূপেণৈব চরুদ্রব্যেণৈবৈনং যজমানং পুত্রাদিগ্রজয়া গবাদিপশুভিশ্চ প্রজনয়তি প্রবর্ধয়তি। তস্মাদিদং
চরুদ্রব্য প্রজাত্যে প্রজননায় প্রতিষ্ঠারূপায় সম্পদ্যত ইত্যর্থঃ॥

[ঘৃত-পক্ব চরুতে] যে ঘৃত আছে, তা স্ত্রীলোকের দুধ, অর্থাৎ স্ত্রীর বীর্যরূপে এতে উপকরণ রয়েছে। আর যে [চরুতে] চাল রয়েছে, তা পুরুষের [বীর্য]। এইভাবে ঘৃত ও তণ্ডুল উভয়াত্মক চরু মিথুনের সদৃশ। এই কারণেই মিথুনরূপে অবস্থিত এই চরুদ্রব্য যজমানকে পুত্রাদি প্রজা এবং গবাদি পশুর দ্বারা সমৃদ্ধ করে। অতএব এই চরুদ্রব্য প্রতিষ্ঠারূপ প্রজননের জন্য নির্ধারিত।

চরোঃ প্রতিষ্ঠাহেতুত্ববেদন প্রশংসতি—
প্রজায়তে প্রজয়া পশুভির্য এভং বেদ ।। ইতি।

যে ব্যক্তি এই রহস্য জানে, সে প্রজা ও পশু দ্বারা সমৃদ্ধ হয়।

আরব্ধযজ্ঞো বা এব আরব্ধদেবতো যো দর্শপূর্ণমাসাভ্যাং যজত আমাবাস্যেন বা হবিষেষ্ঠবা পৌর্ণমাসেন বা তস্মিন্নেব হবিষি তস্মিন্‌ বর্লিষি দীক্ষেতৈষা একা দীক্ষা।। ইতি।

যঃ পুমান্‌ দর্শপূর্ণমাসাভ্যাং যজতে তেন সর্বোষ্ষপি যজ্ঞঃ প্রারব্ধঃ সর্বস্য তদপেক্ষিত্বাত্‌। সোমযাগস্য দর্শপূর্ণমাসবিকৃতিত্বাভাবেও উপ্যজ্ঞাদীনাং দীক্ষণীয়াপ্রায়ণীয়াদীনামিষ্ঠীনাং তদ্ধিকৃতিত্বাদস্তি তদপেক্ষা। অগ্নিহোত্রস্য তদগ্নীনাং চ তন্নিরপেক্ষত্বে উপ্যাহবনীয়াদ্যগ্নিসাপেক্ষত্বাদগ্নীনাং চ পবমানেষ্টিসাধ্যত্বাদিষ্টীনাং দর্শপূর্ণমাসবিকৃতিত্বাদস্তি পরম্পরয়া তদপেক্ষা, অতস্তদনুষ্ঠানেন সর্বস্যাপি যজ্ঞস্য প্রারম্ভঃ সিদ্ধ্যতি। যদ্যপি যজ্ঞারম্ভেণৈব তদীয়দেবতানাং পূজয়িতুমারম্ভঃ সিদ্ধ এব তথাপি প্রাধান্যখ্যাপনার্থমারব্ধদেবত ইতি পুনর্দেবতাভিধানম্‌। যস্মাদ্দর্শপূর্ণমাসযাজিনা সর্বোডপি যজ্ঞ আরব্ধপ্রায়ো, অত এব দেবতানাং পূজাডপ্যারব্ধপ্রায়া, তস্মাদারব্ধস্য সোমযাগস্যানুষ্ঠেয়ত্বাদ্দর্শপূর্ণমাসানুষ্ঠানাদূর্ধ্বং দীক্ষেত দীক্ষণীয়েষ্টিং কুর্যাত্‌।

আমাবাস্যাকালে কর্তব্যং হবিরামাবাস্যং তদ্বৎ‌ পৌর্ণমাসং চ। হবিঃশব্দোত্র যজ্ঞমুপলক্ষয়তি। বাশব্দৌ সমুচ্চয়ার্থী। আমাবাস্যাদিসম্বন্ধিনা পৌর্ণমাসীসম্বন্ধিনা চ যজ্ঞেনেষ্ট্বা দীক্ষেত। উক্তার্থ এব তস্মিন্নিত্যাদিনা প্রপঞ্চ্যতে। হবিঃশব্দবদ্‌ বর্লিঃশব্দো অপি যজ্ঞোপলক্ষকঃ। তস্মিন্নামাবাস্যাখ্যে হবিষি যজ্ঞে তস্মিন্‌ পৌর্ণমাসাখ্যে বর্লিষি যজ্ঞে অনুষ্টিতে সতি পশ্চাদেব দীক্ষেত।

তদাহ আশ্বলায়নঃ—
“দর্শপূর্ণমাসাভ্যামিষ্ট্বেষ্টিপশুচাতুর্মাস্যৈরথ সোমেন” ইতি।
যজেত ইতি শেষঃ। ইষ্টিরাগ্রয়ণেষ্টিঃ। পশুর্নিরূঢ়পশুবন্ধঃ।

আপস্তম্বো অপ্যাহ—
“অথ দর্শপূর্ণমাসাবারভতে। তাভ্যাং সংবৎসরমিষ্ট্বা সোমেন পশুনা বা যজতে” ইতি।

এতচ্ছব্দাদুত্তর উকারো অপিশব্দপর্যায়ঃ। এষা উপ্যেকা দীক্ষা। এবমুক্তে সত্যন্যা উপি কাচিদ্দীক্ষা অস্তীতি সূচিতং ভবতি। অত এব আশ্বলায়ন ইষ্টিপূর্বত্বং সোমপূর্বত্বং চেত্যুভী পক্ষাবুদাজহার—
“ঊর্ধ্বং দর্শপূর্ণমাসাভ্যাং যথোপপত্ত্যেকে প্রাগপি সোমেনৈকে” ইতি।

উপপত্তির্দ্রব্যাদিসম্পত্তিস্তামনতিক্রম্যেতি যথোপপত্তি। দর্শপূর্ণমাসাভ্যামূর্ধ্বং দ্রব্যাদিসম্পত্তি সত্যাং সোমেন যজেত ইতি কেষাঞ্চিন্মতং, তাভ্যাং প্রাগপি সম্পত্তি সোমপানমিত্যপरेষাং মতম্‌।

তৈত্তিরীয়া— ইষ্টিপূর্বত্বমভিপ্রেত্য বসন্তাদিকালবিশেষেষ্বাধানমাম্নায়, পুনঃ সোমপূর্বত্বমভিপ্রেত্য কালনিয়মমন্তরেণ উপাধানমামনন্তি—
“অথো খলু যদৈবেনং যজ্ঞ উপনভেত্‌। অথাধধীত সেবাস্যর্থিঃ” ইতি।

আপস্তম্বো অপীদমেব সোমাধানমভিপ্রেত্য বসন্তাদিকালবিশেষপ্রতীক্ষাং বারয়তি—
“ন নর্তূন্‌ সূর্ক্ষেন্ন ন নক্ষত্রম্‌” ইতি।

তস্মাৎ‌ পক্ষদ্বয়ম্‌।।

(এখন সেই দীক্ষণীয়া ইষ্টির কালের বিধান করা হচ্ছে)—
যে যজমান দর্শ ও পূর্ণমাস যজ্ঞ সম্পাদন করে, সে যজ্ঞের আরম্ভকারী এবং দেবতাদের পূজার সূচনাকারী হয়। সেই একই অমাবস্যা-সম্পর্কিত হবি অর্থাৎ যজ্ঞ এবং সেই একই পূর্ণিমা-সম্পর্কিত যজ্ঞ (অর্থাৎ বর্ষিষিতে) সম্পন্ন হওয়ার পর দীক্ষণীয়া ইষ্টি করা উচিত। এটিও এক প্রকার দীক্ষা (অর্থাৎ দৃষ্টি)। এখানে ‘হবি’ এবং ‘বর্ষিষি’ শব্দ দুটি যজ্ঞকে নির্দেশ করে।

চোদনা দ্বারা প্রাপ্ত পনেরো সংখ্যাকে ব্যতিক্রম করে ভিন্ন সংখ্যা বিধান করা হচ্ছে—
সপ্তদশ সামিধেনী অনুব্রূয়াত্‌।। ইতি।

‘প্র ভো বাজা অভিধ্যব’ ইত্যাদি একাদশ সংখ্যক ঋচাগুলি অগ্নি প্রজ্বালনের কারণ হওয়ায় ‘সামিধেনী’ নামে অভিহিত হয়। সেগুলির মধ্যে ‘ত্রিঃ প্রথমাম্‌ অন্বাহ তিরুত্তমাম্‌’ এই বিধান অনুসারে প্রথম ও শেষ ঋচা তিনবার করে পাঠ করা হলে সেগুলি পনেরো সংখ্যায় পরিণত হয়। প্রকৃতিতেই বিধিত এই পনেরো সামিধেনীর সঙ্গে চোদনা দ্বারা প্রাপ্ত যে দুইটি—‘সমিধ্যমান’ ও ‘সমিদ্ধবতী’—এই দুই ঋষির মাঝখানে পাঠযোগ্য যে দুইটি ঋচা, সেগুলিই ‘থায়্যা’। এ বিষয়ে আশ্বলায়ন বলেন—
‘দীক্ষণীয়ায়াং থায়্যৌ বিরাজী’ ইতি।

এদের মধ্যে ‘পৃথুপাজা অমর্ত্যঃ’—এই একটি এবং ‘তং সবাদো যৎসুচঃ’—এই দ্বিতীয়টি। এটিই প্রয়োগসংগ্রহকার কর্তৃক উদ্ধৃত—
‘অথ দীক্ষণীয়ায়াং থায়্যৌ ভক্তঃ শোচিষ্কেশর্তমীহোং পৃথুপাজাস্ত সাবাথঃ’ ইতি।

‘অগ্নয়ে সমিধ্যমানায়ানুব্রূহি’—এইভাবে অধ্বর্যু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে হোতা সপ্তদশ সামিধেনী ঋচা অনুবাদ করবে।

হোতাকে ক্রমাগত সামিধেনীগুলির পাঠ করতে হবে। (সামিধেনী ঋচা—পনেরো সামিধেনী ও দুই থায়্যা মিলিয়ে মোট সতেরো সামিধেনী ঋচা হয়। এই পনেরো আসলে এগারোই। প্রথম ও শেষ মন্ত্র তিনবার করে পাঠ হওয়ায় পনেরো হয়। এই সতেরো সামিধেনী নিম্নরূপ—
(১) প্র ভো বাজা (ঋ. ৩.২৭.১),
(২) তারই আবৃত্তি,
(৩) পুনরাবৃত্তি,
(৪) অগ্ন আ যাহি (ঋ. ৬.১৬.১০),
(৫) ত্বা ত্বা (ঋ. ৬.১৬.১১),
(৬) স নঃ পৃথু (ঋ. ৬.১৬.১২),
(৭) ঈলেণ্যো (ঋ. ৩.২৭.১৩),
(৮) বৃষো অগ্নিঃ (ঋ. ৩.২৭.১৪),
(৯) বৃষণং ত্বা (ঋ. ৩.২৭.১৫),
(১০) অগ্নি দূতম্‌ (ঋ. ১.১২.১),
(১১) সমিধ্যমানো (ঋ. ৩.২৭.৪),
(১২) সমিল্ডো (ঋ. ৫.২৮.৫),
(১৩) আ জুহোতা (ঋ. ৩.৫.২৮.৬),
(১৪) তারই আবৃত্তি,
(১৫) পুনরাবৃত্তি।
একাদশ ঋচা ‘সমিধ্যমান’ এবং দ্বাদশ ঋচা ‘সমিদ্ধবতী’। এই দুইটির মাঝখানেই থায়্যার পাঠ হয়। এই দুই থায়্যা হল—
(১) পৃথুপাজা (ঋ. ৩.২৭.৫) এবং
(২) তং সবাদো (ঋ. ৩.২৭.৬)।)

এই সংখ্যাটির প্রশংসা করা হচ্ছে—
সপ্তদশী বৈ প্রজাপতিঃ দ্বাদশ মাসাঃ পঞ্চ ঋতবঃ হেমন্তশিশিরয়োঃ সমানেন তাবান্‌ সংবৎসরঃ সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ।। ইতি।

সপ্তদশ সংখ্যাই প্রজাপতির। দ্বাদশ মাস প্রসিদ্ধ। যদিও শ্রুতি ও লোকপ্রসিদ্ধি অনুযায়ী ছয় ঋতু বলা হয়, তথাপি শীতলতার সাদৃশ্যের কারণে হেমন্ত ও শিশির—এই দুইকে একত্র করে পাঁচ ঋতু বলা হয়। দ্বাদশ মাসের সঙ্গে এই পাঁচ ঋতুর সমন্বয়ে যে কাল পরিমাপ হয়, তাকেই সংবৎসর বলা হয়। আর সেই সংবৎসরই প্রজাপতি, কারণ সে বিভিন্ন ঋতু ও বর্ষাদি উৎপাদনের মাধ্যমে প্রজাদের পালন করে। এই কারণেই সপ্তদশ সংখ্যা প্রশংসিত।

সপ্তদশ সংখ্যার জ্ঞানকে প্রশংসা করা হচ্ছে—
প্রজাপত্যায়তনাভিরেবাষ্মী রাধ্নোতি য এভং বেদ।।১।।

সংবৎসরাত্মক প্রজাপতি যার আয়তন। যে সামিধেনীগুলি রয়েছে, সেগুলি প্রজাপতির আয়তন, কারণ সেগুলি তাঁর সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত। এইরূপ সামিধেনীসমূহের দ্বারা যিনি এই বিদ্যা জানেন, তিনি ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি লাভ করেন। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তার অনুসারে আচরণ করলে ফলপ্রাপ্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হয়।

এখানে মীমাংসার উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চম অধ্যায়ের চতুর্থ পাদে এটি নিজেই বিচার করা হয়েছে—

দর্শাদীষ্ট্র্বা সোমবাগঃ ক্রমোऽয়ং নিয়তো ন থা।
উক্তেরাদৌ ন সোমস্যাধানানন্তরতাযুতেḥ॥

দর্শপূর্ণমাসৌ ইষ্ট্বা সোমেন বজেত ইতি ক্যাপ্রত্যয়ে অবগম্যমান ক্রম নিয়ত ইতি চেত্‌, মৈথম্। ‘সোমেন মধ্যমানোऽগ্নীনাবধীত’ ইত্যাধানানন্তরতায়া অধিশ্রবণাত্। তস্মাদিষ্টিসোময়োঃ পৌর্বাপর্য ন নিয়তম্।।

বিপ্রস্য সোমপূর্বত্যং নিয়তং বা ন বাগ্রিমঃ।
উৎকর্ষতো মৈয়মগ্নীষোমীয়স্যৈব তৎ শ্রুতেḥ॥

‘ইষ্টিপূর্বত্বং সোমপূর্বত্বং চ বিকল্পিতম্’ ইতি যদুক্ত তত্র ব্রাহ্মণস্য সোমপূর্বত্বং নিয়তম্। কুতঃ—উৎকর্ষশ্রবণাত্। ‘আগ্নেয়ো বৈ ব্রাহ্মণো দেবতয়া। স সোমেনেষ্ট্যাগ্নীষোমীয়ো ভবতি। য এবাদঃ পৌর্ণমাসং হবিঃ তৎ ত্বনুনির্বপেত্। তহি স উভয়দেবতো ভবতি’ ইতি।

অস্যায়মর্থঃ—প্রজাপতেমুখাগ্নিব্রাহ্মণশ্চেত্যুভাবুৎপন্নী। ততো ব্রাহ্মণস্যাগ্নিরেকৈব দেবতেত্যাগ্নেয় এব বাহ্মণঃ। ন তু সৌম্যঃ, সোমস্য তদেবতাত্বাভাবাত্। যদা স ব্রাহ্মণঃ সোমেন বজেত তদা সোমোऽপ্যস্য দেবতেত্বাগ্নীষোমীয়ো ভবতি। তস্যাগ্নীষোমীয়স্য ব্রাহ্মণস্যানুরূপং পৌর্ণমাসমগ্নীষোমীয়পুরোডাশরূপং হবিঃ সোমাপূর্বমনুনির্বপেত্। তথা স ব্রাহ্মণো দেবতাদ্বয়সম্বন্ধী ভবতি।

সহপ্যাশ্র কর্মান্তর কিবিদ্ বিধায়তে—ইতি কশ্চিন্মন্যতে, তথাপি ‘পৌর্ণমাসং হবিঃ’ ইতি বিস্পষ্টপ্রত্যভিজ্ঞানান্ন কর্মান্তরং, কিণ্তু দর্শপূর্ণমাসয়োঃ সোমাদূর্ধ্বমুৎকর্ষঃ। তস্মাদ্‌ বিপ্রস্য সোমপূর্বত্বমেব নিয়তমিতি প্রাপ্তে, ব্রূমঃ—নাত্র দর্শশব্দঃ পূর্ণমাসশব্দো বা কশ্চিদ্ যাগবাচী শ্রূয়তে। পৌর্ণমাসমিত্যেতৎ তদ্ধিতান্ত হবিবিশেষণত্বেনোপন্যস্যতে। তথৈব হবিরগ্নীষোমীয়পুরোডাশরূপমিতি দেবতায়েন সংস্তযাদবগম্যতে। তস্মাদস্যৈব হবিষ উৎকর্ষঃ, ন তু কৃত্স্নায়ো দর্শপূর্ণমাসয়োঃ। তথা সতি ব্রাহ্মণস্য একস্মিন্নেবাগ্নীষোমীয়পুরোডাশে সোমপূর্বত্বনিয়মঃ। ইতারত্র ক্ষত্রিয়বৈশ্যয়োরিবাস্থাপীষ্টিপূর্বত্বসোমপূর্বত্বে বিকল্প্যতে।।

তৃতীয়াধ্যায়স্য ষষ্ঠে পাদে চিন্তিতম্—

সামিধেনীঃ সপ্তদশ প্রকৃতী বিকৃতাবুত।
পূর্ববৎ প্রকৃতী পঞ্চদশ্যেনেতদ্ বিকল্প্যতে।।

বিকৃতী সাপ্তদৃশ্য স্যাত্ প্রকৃতী প্রক্রিয়াবলাত্।
পঞ্চদশ্যাবরুদ্ধ বাদাকাঙ্ক্ষায়া নিবৃত্ততা।।

অনরভ্য শ্রূয়তে—‘সপ্তদশ সামিধেনীরনুব্রূয়াত্’ ইতি। ‘প্র ভো বাজা’ ইত্যাদ্যা অগ্নিসমিন্ধনার্থা ঋচঃ সামিধেন্যঃ। তাসাং সাপ্তদৃশ্যং পূর্বন্যায়েন প্রকৃতিগতং। যদি প্রকৃতৌ ‘পঞ্চদশ সামিধেনীরন্বাহ’ ইতি বিধিঃ স্যাৎ, তহি পঞ্চদশ্যসাপ্তদৃশ্যে বিকল্প্যেতামিতি প্রাপ্তে, ব্রূমঃ—বিকৃতাবেব সাপ্তদৃশ্য নিৰুপজ্যতে, প্রকৃতী পঞ্চদশ্যাবরুদ্ধায়াং সামিধেনীনাং সংখ্যাকাঙ্ক্ষায়া অভাবাত্। ন চ পঞ্চদশ্যসাপ্তদৃশ্যবাক্যয়োঃ সমানবলত্বাদবরোধাভাবঃ ইতি শঙ্কনীয়ম্‌, পঞ্চদশ্যে প্রকরাণুগ্রহস্যাধিকত্বাত্।তস্মান্মিত্রবিন্দাব্বরকলপাদিবিকৃতী সাপ্তদৃশ্যমবতিষ্ঠতে। ন চাত্র পূর্বন্যায়োऽস্তি, সাপ্তদৃশ্যস্য চোদকপ্রাপ্ত্যভাবেন পুনর্বিধানদোষাভাবাত্।

সাপ্তদৃশ্যং তু বৈশ্যস্য বিকৃতী প্রকৃতাবুত।
পূর্ববচ্চেন্ন সংকোচান্নিত্যনৈমিত্তিকোক্তিতঃ।।

গোদোহনেন প্রণয়েত্ কামীতি এতদুদাহৃতম্।
ভাষ্যকারস্তদপ্যস্তু ন্যায়স্থাত্র সমত্বতঃ॥

‘সপ্তদশানুব্রূয়াদ্ বৈশ্যস্য’ ইতি স্থিত বৈশ্যনিমিত্তকং সাপ্তদৃশ্য পূর্বন্যায়েন বিকৃতিগতং ইতি চেত্‌, মৈবম্। নৈমিত্তিকেনানেন বচনেন প্রকৃতিগতস্য নিত্যস্য পঞ্চদৃশ্যস্য বৈশ্যব্যতিরিক্ত বিষয়তয়া সংকোচনীয়ত্বাত্। নিত্যং সাধারণরূপতয়া সাবকাশত্বেন দুর্বলম্। নৈমিত্তিকং তু বিশেষরূপত্বনিরবকাশত্বাভ্যাং প্রবলম্। তস্মাদ্ বৈশ্যনিমিত্তকং সাপ্তদৃশ্য প্রকৃতাববতিষ্ঠতে।

অত্র ভাষ্যকারোऽন্যদুদাজহার—
চমসেনাপঃ প্রণবেদ্ গোদোহনেন পশুকামস্য ইতি। তত্র প্রকৃতেশ্চমসেনাবরুদ্ধত্বাদ্ গোদোহনং বিকৃতাবিতি পূর্বঃ পক্ষঃ। কামনানিমিত্তকেন গোদোহনেন নিত্যস্য চমসস্য …

নিষ্কামবিষয়তয়া সংকোচনীয়ত্বাত্ প্রকৃতাবেব গোদোহনমিতি সিদ্ধান্তঃ।
দশমাধ্যায়স্য অষ্টমপাদে চিন্তিতম্—

সামিচেনীসাপ্তদৃশ্য বৈমৃধাদৌ পূর্বগীঃ।
সহতির্বোপকারস্য ক্লৃপ্ত্যা আऽস্ত্যাজ্য ভাগবৎ।।
সামিথেন্যশ্চোদকাপ্তোঃ সাপ্তদৃশ্য তু বৈমৃধে।
পুনর্বাক্যেন সংহার্যমনারভ্যোক্তিচোদিতম্।।

অনরভ্য কিঞ্চিদাম্নায়তে— ‘সপ্তদশ সামিথেনীরনুব্রূয়াত্’ ইতি। তদা বৈমৃধেশ্বরকল্পায়াং, পশুচাতুর্মাস্যেষু, মিত্রবিন্দায়ামাত্রয়ণেষ্ট্যাদৌ চ পুনঃ সাপ্তদৃশ্যং বিধীয়তে। যদ্যপি অনারভ্যাধীতানাং প্রকৃতিগামিত্বং ন্যায়্যং, তথাপি শ্রুতেন পঞ্চদশ্যেনাবরুদ্ধত্বাৎ বিকৃতিষ্বেব নিবিশতে।

তথা সতি বৈমৃধাবিষু বিকৃতিষু অনারভ্যবাদপ্রাপ্তাঃ সপ্তদশ সামিধেন্যঃ প্রাকরণিকেন চিথিনা পুনর্বিধীয়মানা গৃহমেধীয় আজ্যভাগবৎ ক্লৃপ্তোপকারত্যেন ইতিকর্তব্যতাকাঙ্ক্ষাং পূরয়ন্তি এবং চোদকং লোপান্ত্যো বৈমৃধাদেরপূর্বকর্মতাং গময়ন্তি।

সাপ্তদৃশ্যং ত্বনারভ্যবাদপ্রাপ্তমনূদ্যত ইতি প্রাপ্তে, ব্রূমঃ— বৈমৃধাদিষু সামিধেন্য আজ্যভাগবৎ ন বিদ্যায়ন্তে, কিন্তু চোদকপ্রাপ্তা অনূয় সাপ্তদৃশ্যং বিধীয়তে। তত্র সাপ্তদৃশ্যং বৈমৃধাদি প্রकरणেষু স্থানান্তরবিধিভিঃ কাসুচিদেব বিকৃতিষু প্রাপ্তমনারভ্যবাদেন তু সর্বাসু বিকৃতিষু তজ্ঞনারভ্যবাদো বিলম্বতে।

প্রথম বিধেয়স্য সাপ্তদৃশ্যস্য সামিধেনীসম্বন্ধমববোধ্য, তৎসম্বন্ধান্যথানুপপত্ত্যা ঋতুপ্রবেশপরিকল্প্য প্রকৃতী পঞ্চদশ্যপরাহতত্বেন বিকৃতিষু সর্বাসু নিবেশঃ ক্রিয়ত ইতি বিলম্বঃ। প্রাকরণিকৈর্বিধিভিঃ সামিধেনীসম্বন্ধ এব বোধনীয়ঃ। বিকৃতী তদ্বিশেষে চ প্রবেশো ন কল্পনীয়ঃ, প্রত্যক্ষপ্রকরণপাঠেনৈব তত্তিলেঃ।

তত্র সাপ্তদৃশ্যস্য বৈমৃধাদিকৃতিবিশেষসম্বন্ধে সহসা প্রতিপন্নে সতি তদ্বিরোধাৎ সর্বপ্রকৃতিসম্বন্ধী ন কল্পয়িতুং শক্যঃ। অনারভ্যবাদস্তু চোদকপ্রাপ্তস্য পঞ্চদশ্যস্য বাধকঃ। সর্বথা অপি চতুর্থাকরণবদ্ উপসংহারো ন ত্যাজ্যভাগবদপূর্বকর্ম।

যে এইভাবে এই রহস্য জানে, সে সংবৎসরাত্মক প্রজাপতির আয়তনস্বরূপ অর্থাৎ আশ্রয়ভূত সামিধেনীদের দ্বারা সমৃদ্ধি লাভ করে।

অথ দ্বিতীয় খণ্ডঃ

দীক্ষণীয় ইষ্টি নিরূপণ করে তার প্রশংসার্থে ‘ইষ্টি’ শব্দের নির্বচন দেখানো হচ্ছে—

যজ্ঞো বৈ দেবেভ্য উদক্রামৎ, তমিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছন্ন্যদিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছংস্বাদিষ্টীনামিষ্টিত্বং রামন্যবিন্দন্।। ইতি।

জ্যোতিষ্টোমাভিমানী যজ্ঞপুরুষ কোনো এক নিমিত্তে অনুরক্ত না হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। সেই যজ্ঞকে দেবতারা দীক্ষণীয়া, প্রায়ণীয়া প্রভৃতি ইষ্টির দ্বারা অনুসন্ধান করতে ইচ্ছা করেছিলেন। ইষ্টিগুলির ‘ইষ্টিত্ব’ এই জন্য যে, এগুলির দ্বারা তারা যজ্ঞকে খুঁজতে চেয়েছিলেন। ‘ইচ্ছা করা’ এই অর্থ থেকেই ‘ইষ্টি’ শব্দের উৎপত্তি। সর্বত্র ‘যজ’ ধাতু থেকেও ‘ইষ্টি’ শব্দ প্রসিদ্ধ। এখানে বিশেষভাবে ‘ইচ্ছ’ ধাতুর অর্থ গৃহীত। অনুসন্ধান করে তারা ক্রমান্বয়ে সেই যজ্ঞকে লাভ করেছিলেন।

তল্লাভবেদনং প্রশংসতি—
অনুবিত্তযজ্ঞো রাধ্নোতি য এবং বেদ।। ইতি।

যিনি জানেন, তিনি তার অনুষ্ঠানের দ্বারা যজ্ঞ লাভ করে ফলে সমৃদ্ধ হন।

যে এই রহস্য জানে, সে তার অনুষ্ঠানের দ্বারা যজ্ঞকে লাভ করে ফলের দ্বারা সমৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

পুনরায় দীক্ষণীয়া ইষ্টির প্রশংসার্থে, সেই ইষ্টিগুলিতে বিদ্যমান আহুতির বাচক শব্দের নির্বচন—

আহূতয়ো বৈ নামৈতা যদাহূতয় এতাভির্বৈ দেবান্ যজমানো দয়তি তদাহূতীনামাহূতিত্বম্।। ইতি।

আশূতয় ইত্যুকারেণ হস্তেন আদূতয় ইত্যেবং দীর্ঘেণ যুক্তং দ্রষ্টব্যম্। হ্বয়ত্যাভিরিতি তদ্ব্যুৎপত্তিঃ। জুহোতিযাতোরুৎপন্নঃ শব্দঃ পূর্বপ্রসিদ্ধঃ। অং তু তয়তিঘাতোরুৎপন্ন ইতি বিশেষঃ॥

বস্ত্ততঃ [দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত] ‘আহূতি’ (আহ্বান করা)–কেই [হ্রস্ব উ-কারযুক্ত] ‘আহুতি’ বলা হয়। কারণ এর দ্বারাই যজমান দেবতাদের আহ্বান করেন। এটাই আহুতিগুলির ‘আহূতিত্ব’।

দৃষ্টিরা আহুতীশ্চ মিলিত্বা প্রকারান্তরেণ প্রশংসতি—
ঊতয়ঃ খলু বৈ তা নাম যাভির্দেবা যজমানস্য হ্বমায়ন্তি, যে বৈ পন্থানো যাঃ সুতয়স্তা বা ঊতয়স্ত উ এবন্তৎ স্বর্গযাণা যজমানস্য ভবন্তি। ইতি।

হূয়ন্তে দেবা অস্মিন্নিতি হবো সোমযাগো, যাভিরিষ্টিভিস্তত্র তাভিরাহুতিভিশ্চ নিমিত্তভূতাভির্দেবা যজমানস্য যজ্ঞমাগচ্ছন্তি, তা ইষ্টয়ঃ আহৃতয়শ্চ ঊতয় ইত্যেতন্নাম প্রতিপদ্যন্তে। খলুশব্দো বৈশব্দশ্চ প্রসিদ্ধার্থঃ। অবন্তি রক্ষন্তীত্যবতেধাতোরূতিশব্দঃ প্রসিদ্ধঃ। আয়ন্তি আগচ্ছন্তি যাভিরিতি আঙ্পূর্বস্থায়তিযাতো বর্ণবিকারেণ ঊতিশব্দঃ। পুনরস্মাদেব ধাতোঃ স্বর্গগ্রাপকত্বাভিপ্রায়েণ শব্দো ব্যুৎপাদ্যতে। যে কথিত পন্থান ইষ্টিরূপাঃ স্বর্গস্য প্রাপ্তিমার্গাঃ সন্তি, যাশ্চ যুক্তাস্তন্মার্গাবয়বরূপা আহুতয়ঃ সন্তি, তা দ্বিবিধা ঊতয় ইত্যুচ্যন্তে। ত উ এবং তৎ—এবংতে বিভিন্না অপি মার্গা যজমানস্য স্বর্গযাণাঃ স্বর্গপ্রাপকাঃ ভবন্তি॥

[দৃষ্টি ও আহুতিগুলি একত্রে] এই ‘ঊতি’ অর্থাৎ পথ, কারণ এইগুলির দ্বারাই যজমানের আহ্বানে দেবতারা আগমন করেন। যে সকল দৃষ্টি-রূপ স্বর্গের পথ এবং যে সকল আহুতি সেই পথের অবয়বরূপ, এই দুই প্রকার পথই ‘ঊতি’ নামে অভিহিত। এইভাবে নিশ্চিতরূপে এগুলি যজমানের স্বর্গপ্রাপক, অর্থাৎ স্বর্গে পৌঁছানোর পথস্বরূপ হয়।

পুনরপি ইষ্টিপ্রশংসার্থ তজ্ঞভৃতয়োর্যাজ্যানুবাক্যয়োর্বক্তরিতে প্রযুজ্যমানো হতৃশব্দ নিরুক্তুং ব্রহ্মবাদিনা প্রশ্নমক্তারয়তি—
তবাহুর্যদন্যো জুহোত্যথ যোऽনু চ আাহ যজতি চ কস্মাৎ তং হোতেত্যাচক্ষত ইতি।। ইতি।

তত্তাস্বিষ্টিষু কিঞ্চিচ্চোদমাহুঃ। যদস্মাৎ কারণাদ্ধোতুরন্যোऽধ্বর্যুর্জুহোতি, তস্মাৎ তৎকারণাত্ যজ্ঞাতুনিষ্পন্নো হোতৃশব্দস্তর্যধ্বর্যুক্তঃ। যাজ্ঞিকাস্তু তমধ্যধ্বর্যু হোতেতি নাভক্ষতে। অথ যঃ পুমান্ অনু চ আ পুরোনুবাক্যাং চানুব্রূতে, যজতি চ যাজ্যাং চ পাঠতি, তং পুমানমনুবক্তেতি যষ্টেতি চ নামিয়ায় কর্মাতুকারণাদ্ধোতেত্যাচক্ষতে। ইতি শব্দঃ প্রশ্নসমাপ্ত্যর্থঃ॥

হোতৃ শব্দের নির্বচনের জন্য প্রশ্ন করা হয়—যখন আহুতি প্রদানকারী ব্যক্তি হোতা নন, বরং অধ্বর্যু নামে পরিচিত, তখন অনুবাক্যা ও যাজ্যা মন্ত্রের পাঠকারীকে ‘যষ্টা’ না বলে কেন ‘হোতা’ বলা হয়?

অভিজ্ঞাতামভিপ্রেতপ্রশ্নস্যোত্তরং ভাষ্যং বদন্তি—
যহ্বা঵ স তত্র যথাভাজন দেবতা অমুমাৱহ, অমুমাৱহ ইত্যাৱাহয়তি, তদেব হোতৃহোতৃত্বং হোতা ভবতি।। ইতি।

যস্মাৎ ঐ পুরুষই যজ্ঞে যাজ্যা ও অনুবাক্যা মন্ত্রের দ্বারা যথাযথ স্থানে সকল দেবতাকে আহ্বান করেন—‘অমুক অগ্নিকে আহ্বান করি’, ‘অমুক সোমকে আহ্বান করি’—এই কারণেই তিনি হোতা নামে অভিহিত হন। এই কারণেই হোতা শব্দটি প্রসিদ্ধ হয়েছে। বহু ধাতুসম্ভব ছান্দস প্রক্রিয়ায় ‘হোতা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, জুহোতি ধাতু থেকেই কেবল নয়। অতএব যদিও আহুতি প্রদান তাঁর কাজ নয়, তবু দেবতাদের আহ্বান করার কারণে যাজ্যা ও অনুবাক্যা মন্ত্রের পাঠকারীও হোতাই হন।

[উত্তর দেওয়া হয় যে]
কারণ তিনি যথাস্থানে সকল দেবতাকে এই বলে আহ্বান করেন—‘অমুক অগ্নিকে আহ্বান করো’, ‘অমুক সোমকে আহ্বান করো’। এই কারণেই ‘হোতা’-র হোতৃত্বের ফলে ‘হোতা’ এই নামটি নিষ্পন্ন হয়েছে।

হোতৃত্বজ্ঞানের প্রশংসা করা হয়েছে—
“যে এইরূপ জানে, তাকেই ‘হোতা’ বলা হয়।” ২
ইতি।

যাজ্ঞিকেরা এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন হোতাকে প্রধান হোতা বলে অভিহিত করেন। এর অর্থ—তিনি হোতার কর্মে দক্ষ হন।

[যাজ্ঞিকেরা] এইভাবে জানেন এমন সেই [আহ্বানকারী]-কে ‘হোতা’ এই নামেই ডাকেন।

আমাদের পর্যালোচনা

আমরা সর্বপ্রথম সায়ণভাষ্য এবং সেই ভাষ্যের আলোকে ড. সুধাকর মালবীয় কর্তৃক কৃত হিন্দি অনুবাদটির উপর বিবেচনা করি।

সায়ণ এই গ্রন্থের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে সোমযাগকেই মনে করেন। অন্যান্য নানাবিধ যাগ এই সোমযাগেরই অঙ্গ। আমাদের মতও এটাই।

এখন প্রথম কণ্ডিকাতেই ‘অগ্নি’ এবং ‘বিষ্ণু’ দেবতার স্তব করতে গিয়ে অগ্নিকে ‘আদ্য’ এবং বিষ্ণুকে ‘পরম’ বলা হয়েছে। এর অর্থও বলা হয়েছে যে অগ্নি দেবতা প্রথম এবং বিষ্ণু দেবতা শেষ। এর সমর্থনে সায়ণাচার্য বহু আর্ষ প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন।

সায়ণাচার্যের শৈলী হলো—নিজের মতের সমর্থনে বহু আর্ষ প্রমাণ উদ্ধৃত করা, কিন্তু সেই প্রমাণগুলির ব্যবহার কোথাও না করতে পারা—এটাই সায়ণের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। তিনি তাঁর বেদভাষ্যেও এই একই শৈলী গ্রহণ করেছেন। এর ফলে তাঁর ভাষ্য আর্ষ প্রমাণে সমৃদ্ধ বলে প্রতীয়মান হলেও, সেই প্রমাণগুলির তাৎপর্য কী—এই বিষয়টি সায়ণের বোধগম্য হয়নি। এই কারণেই তাঁর ভাষ্য প্রমাণসমৃদ্ধ হয়েও সম্পূর্ণ অপ্রামাণিক ও অসংগত হয়ে পড়েছে। তাঁর প্রত্যেক গ্রন্থেরই এই করুণ দশা।

দেবতা কোন কোন পদার্থ? কেন অগ্নিকে প্রথম এবং বিষ্ণুকে শেষ, অথবা অগ্নিকে সবচেয়ে ছোট এবং বিষ্ণুকে সবচেয়ে বড় দেবতা বলা হয়েছে? অগ্নি ও বিষ্ণু কোন পদার্থের নাম—এই বিষয়টি সায়ণ কখনও জানেননি এবং জানার চেষ্টাও করেননি। কেন অগ্নিকে দেবতাদের মুখ বলা হয়েছে এবং কেন বিষ্ণুকে দেবতাদের অন্ত বলা হয়েছে—এই বিষয়ে কোনো চিন্তাই করা হয়নি।

সায়ণ যজ্ঞপরম্পরায় প্রথমে অগ্নির যজন এবং শেষে বিষ্ণুর যজনের কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি এ কথা বিবেচনা করেননি যে যজ্ঞ তো কোনো বিশেষ বিজ্ঞানের প্রতীক। তাহলে অগ্নি ও বিষ্ণুর ক্ষেত্রে যথাক্রমে আরম্ভ ও সমাপ্তির ক্রম কেন স্থির করা হয়েছে?

ইষ্টিগুলির প্রাদুর্ভাব দেবতাদের পরে ঋষিদের দ্বারা হয়েছে। সুতরাং দেবতাদের ভিত্তি এই নানাবিধ ইষ্টি অর্থাৎ যজ্ঞপরম্পরা হতে পারে না। তাহলে এই যজ্ঞপরম্পরা থেকে পৃথকভাবে কেন এই বিষয়টি ভাবা হয় না যে অগ্নিকে প্রথম বা ক্ষুদ্র এবং বিষ্ণুকে শেষ বা বৃহৎ দেবতা কেন মানা হয়েছে?

এই একই ভুল সায়ণাদি আচার্য এবং তাঁদের অনুসারী বিদ্বানদের মধ্যেও ছিল, যা বেদ বা আর্ষ গ্রন্থের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিনাশে মূল কারণ হয়েছে। যতদিন অগ্নি ও বিষ্ণুর স্বরূপ জানা না যাবে, ততদিন যাগে পুরোডাশের তাৎপর্য কীভাবে জানা যাবে? কেন ইন্দ্র, বায়ু, বরুণ প্রভৃতি বহু দেবতা অগ্নি ও বিষ্ণুর মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য সায়ণ যে প্রমাণগুলি দিয়েছেন, সেগুলি থেকে কোনো স্পষ্টতা পাওয়া যায় না।

এই দুই দেবতাকে যজ্ঞের দুই প্রান্ত বলা হলেও, তাদের মধ্যে পুরোডাশের বিভাজনও স্পষ্ট নয়। এই বিভাজন এইভাবেই কেন হয়? কেবল যজ্ঞপরম্পরা রক্ষার জন্যই কি? এই পরম্পরা কেন শুরু হলো—এ কথা কে ব্যাখ্যা করবে?

এই প্রসঙ্গে গবাদি পশু ও পুত্রাদি লাভের কামনাসম্পন্ন যজমানকে উপায় বলতে শুরু করা এ কি বিষয়ান্তর নয়? কেবল ঘৃত ও চাল দিয়ে যজ্ঞ করলেই যজমান পশু ও পুত্রাদিতে সমৃদ্ধ হয়ে যাবে এ কি যজমানকে বিভ্রান্ত করা নয়? কোনো বিশেষ রোগে আক্রান্ত নিঃসন্তান দম্পতির ক্ষেত্রে যজ্ঞের দ্বারা সন্তানলাভ সম্ভব হতে পারে, কিন্তু ঘৃত ও চালের যজ্ঞ দ্বারা গরু, অশ্ব প্রভৃতি পশু লাভ কীভাবে সম্ভব?

মাত্র যজ্ঞ-পদ্ধতি জেনে নিলেই সবকিছু লাভ করা যাবে—এই কথা কতটা বিনোদনকর বা বিস্ময়কর!

মাস ও ঋতুগুলিকে কেন প্রজাপতি বলা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সতেরোটি ঋচাকে কেন সামিথেনী বলা হয়েছে—এর কোনো ইঙ্গিতমাত্রও বোঝা যায় না; তবুও সামিধেনীর পক্ষে বহু প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ খণ্ডটি পড়ে একজন প্রাজ্ঞ পাঠক কী ভাববেন—এ কথা সায়ণ বোঝেননি। জ্ঞানকাণ্ডের রূপে স্বীকৃত ঋগ্বেদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণকে কেবল কর্মকাণ্ডের বিষয় করে তোলা, তাও এমন এক কর্মকাণ্ডে যার আশয় বা উদ্দেশ্যই অস্পষ্ট, কোথাও কোথাও যা অর্থহীন প্রলাপের ন্যায়—এটি বেদ ও তাদের ব্যাখ্যানগ্রন্থ ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির প্রতি গুরুতর অন্যায়। আমরা এমন ভাষ্যগুলির মাধ্যমে জগৎকে কী বার্তা দিতে চাই—এ বিষয়ে সায়ণকে প্রামাণ্য মানা বিদ্বানদের চিন্তা করা উচিত। এদের দ্বারা আমরা বেদকে কী মর্যাদা দিতে চাই—তা গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।

এই ভাষ্যের পর্যালোচনার পর আমরা আমাদের নিজস্ব ভাষ্যশৈলী প্রকাশ করার চেষ্টা করি।

আমি কীভাবে নিজের ব্যাখ্যা করেছি—এ কথা বোঝানো কঠিন। এই ধরনের ব্যাখ্যা বা ভাষ্য করার কোনো পরম্পরা আমার কাছে নেই; তাহলে কীভাবে আমি হাজার হাজার বছর পুরোনো যাজিক পরম্পরাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের এক নতুন পরম্পরার জন্ম দিলাম?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে এর পটভূমিকে গভীরভাবে বোঝা আবশ্যক।

বাস্তবে আচার্য সায়ণ তাঁর ভাষ্যে যে শৈলী গ্রহণ করেছেন, সেই শৈলী তাঁর পূর্ববর্তী ভাষ্যকার—ষড়গুরু-শিষ্য প্রমুখ আচার্যদের মধ্যেও ছিল। সায়ণ তাঁদের অনেককেই উদ্ধৃত করেছেন। আর্য সমাজের কিছু বিদ্বান—পণ্ডিত গঙ্গাপ্রসাদ উপাধ্যায় প্রমুখ—এবং বিদেশি বিদ্বানেরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সায়ণাচার্যের ভাষ্যই অনুসরণ করেছেন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী বেদসংহিতার যে অংশগুলির ভাষ্য করেননি—অর্থাৎ সম্পূর্ণ সামবেদ, অথর্ববেদ এবং ঋগ্বেদের সপ্তম মণ্ডলের ৬১তম সূক্তের তৃতীয় মন্ত্র থেকে শেষ পর্যন্ত—সেগুলির ভাষ্য আর্য বিদ্বান ও পণ্ডিত দামোদর সাতবলেকর  প্রমুখ করেছেন। এই ভাষ্যকাররাও সায়ণকে বেশি অনুসরণ করেছেন, মহর্ষি দয়ানন্দকে কম। এই কারণেই এদের সকলের ভাষ্যে বেদের প্রকৃত বিজ্ঞান প্রকাশ পায়নি; বরং বেদাদি শাস্ত্র উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছে। এই অন্ধ পরম্পরাই আজ পর্যন্ত পৌরাণিক বা আর্য সমাজে চলমান।

আমরা বাল্মীকীয় রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি ঐতিহাসিক গ্রন্থে প্রাচীন ভারতবর্ষে উচ্চস্তরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখতে পাই। নানাবিধ বিমানবিদ্যা, অস্ত্রশস্ত্রবিদ্যার বিবরণ পড়ি; মহর্ষি ভরদ্বাজের মন্ত্রসর্বস্ব ও অংশুবোধিনী প্রভৃতি গ্রন্থের কথা পড়ি ও শুনি। তখন মনে প্রশ্ন জাগে—সেই সময়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উচ্চ অবস্থার উৎস কী ছিল? আমরা প্রাচীন মহর্ষিদের মধ্যে ভগবান মনু, মহর্ষি যাস্ক, মহর্ষি পাণিনি, দর্শনশাস্ত্রের প্রণেতা গৌতম, কপিল, কণাদ, বেদব্যাস, পতঞ্জলি ও জৈমিনি প্রমুখ ঋষিদের গ্রন্থ পাঠ করি। আত্মজ্ঞানপিপাসু দেবর্ষি নারদের ব্যাপক বিদ্যার কথা বিবেচনা করি এবং এটিও পড়ি যে এই সকল মহাপুরুষ বেদকেই সর্বজ্ঞানের ও বিজ্ঞানের মূল বলে মানতেন। মহর্ষি ব্রহ্মা, মহাদেব শিব, ভগবান বিষ্ণু, ভগবান শ্রীরাম, দেবরাজ ইন্দ্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, মহর্ষি অগস্ত্য, মহর্ষি বিশ্বামিত্র, মহর্ষি বশিষ্ঠ প্রমুখ সকলেই বেদের দ্বারা মহান বিজ্ঞান লাভ করতে পেরেছিলেন—তখন প্রশ্ন ওঠে, বেদ ও তাদের ব্যাখ্যানরূপে রচিত ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির কি সেই রূপই, যা আজ প্রচলিত ভাষ্যগুলিতে প্রদর্শিত হয়? যদি তাই হয়, তবে তার তুলনা প্রাচীন বৈদিক বা ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে কখনোই করা যায় না।

আজ বেদাদি শাস্ত্রের উপর যে উপদেশ ও পাঠ-পাঠন চলছে, তাতে এমন কোনো গন্ধ পর্যন্ত পাওয়া যায় না যে এই গ্রন্থগুলি মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র। এই কারণেই আজ আমরা পাশ্চাত্য ভৌতিক বিজ্ঞানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল; তবুও নিজেদের সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের গৌরবের মিথ্যা গুণগান করি। এমন করে যেন আমরা নিজেদের ঘাটতি ঢাকতে চাই, কিন্তু ঘাটতি কখনোই অপ্রকাশিত থাকে না। আমাদের প্রজন্ম বেদাদি শাস্ত্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিমুখ হয়ে পড়েছে।

পাঠক মহাশয়গণ! আমরা সমগ্র বৈদিক সমাজকে আমাদের এই বার্তা দিতে চাই—আপনারা কি আপনাদের বৈদিক বিশ্বাস ও বিদ্যার দ্বারা জগতে বেদাদি শাস্ত্রকে সামান্যতম হলেও কোনো মর্যাদা দিতে পেরেছেন? আজ ক্রমবর্ধমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের সামনে বেদ বা ব্রাহ্মণগ্রন্থের বিদ্যাকে কি কোথাও কোনো গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন? যদি না হয়ে থাকে, তবে কি আপনারা এমনটাই ধরে নিয়েছেন যে প্রাচীন ভারতবর্ষে কিংবা বেদাদি শাস্ত্রে কোনো পদার্থবিদ্যাই ছিল না?

আমি এমন নিরাশ বিদ্বানদের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে চাই—প্রাচীন আর্যাবর্ত (ভারতবর্ষ) বেদ, স্মৃতি, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, দর্শন, উপনিষদ প্রভৃতির মহান জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল। সেখানে পদার্থবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান—উভয়ই চরম উৎকর্ষে পৌঁছেছিল। এই দুই বিদ্যার বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের কারণেই এই রাষ্ট্র কেবল জগতগুরুই ছিল না, চক্রবর্তী সম্রাটও ছিল। প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান কেবল তৎকালীন বিশ্বে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিল তা নয়, সেই জ্ঞান-বিজ্ঞান যদি আজও অনুধাবন করা যায়, তবে ভারত আবারও বিশ্বগুরু হতে পারে।

এখন আমরা প্রথম খণ্ডকে সামনে রেখে আমাদের ব্যাখ্যান-পদ্ধতির আলোচনা করছি—

আমরা এই মতের সঙ্গে একমত যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় সোম-ভাগ; কিন্তু আমরা কি কখনও এই বিষয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করেছি যে ‘সোম’ কী বস্তু, যার ভাগের বর্ণনা এই গ্রন্থে করা হয়েছে? ‘সোম’ শব্দটি বোঝার জন্য সর্বপ্রথম আমাদের বেদের শাখা বা ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির সাহায্যেই জানার চেষ্টা করা উচিত। দেখা যাক, এই গ্রন্থগুলি এ বিষয়ে কী বলে—

“অনয়োর্ (দ্যাবাপৃথিব্যোঃ) গর্ভঃ সোমো রাজা” (কাঠক ৩.৭.৮)
“দ্যাবাপৃথিব্যোর্বা এষ গর্ভো যৎ সোমোরাজা” (ঐতরেয় ১.২৬)

অর্থাৎ দ্যুলোক ও পৃথিব্যাদি লোকসমূহের গর্ভই সোমরাজা।

“আদিত্যঃ সোমঃ” (কাঠক ২৬.২)
অর্থাৎ সূর্যলোকই সোম।

“ইন্দ্রঃ সোমস্য যোনিঃ” (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৭.৮)
অর্থাৎ ইন্দ্র—অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও বায়ু—সোমের উৎপত্তি ও অবস্থানের স্থান।

“সংবৎসরো বৈ সোমো রাজা” (কৌশীতকি ব্রাহ্মণ ৭.১০)
অর্থাৎ সংবৎসর বা সূর্যই সোমরাজা।

“সর্বং হি সোমঃ” (শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.৫.৪.১১)
অর্থাৎ সমস্ত পদার্থই সোমরূপ।

অন্যদিকে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ‘সোমস্য’ পদের অর্থ করতে গিয়ে লিখেছেন—
“উৎপন্নস্য জগতঃ” (ঋগ্বেদ ১.৪৬.১২)

এই প্রমাণগুলির অতিরিক্ত আরও বহু প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। আমরা মনে করি, বিজ্ঞ পাঠকদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে এই গ্রন্থে সোম বলতে সূর্যাদি নক্ষত্র এবং সেগুলিকে উৎপন্নকারী বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণিকা, তরঙ্গ প্রভৃতি পদার্থকে বোঝানো হয়েছে। এখানে ‘সোম’ বলতে সোমলতা প্রভৃতি ঔষধিকে বোঝানো হয়নি, যেগুলি কর্মকাণ্ডী বিদ্বানরা তাঁদের সোমযাগে ব্যবহার করেন।

ঋগ্বেদে, যেখানে সৃষ্টির সমস্ত পদার্থের বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞান বিদ্যমান, তার ব্যাখ্যানগ্রন্থ এই ঐতরেয় ব্রাহ্মণে সৃষ্টির পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞানই থাকা উচিত—কেবলমাত্র কর্মকাণ্ডমূলক সোমযাগের বর্ণনা নয়। সম্ভবত যখন সোমযাগ প্রভৃতি পরম্পরা শুরু হয়েছিল, তখন ঋষিরা সৃষ্টির অন্তর্গত নিত্য সংঘটিত সূক্ষ্ম কণিকাগুলির দ্বারা সূর্যাদি লোকসমূহের নির্মাণপ্রক্রিয়াকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য এই গ্রন্থের মাধ্যমে সোমযাগের কল্পনা করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল—সৃষ্টির সূক্ষ্ম রহস্যগুলিকে প্রতীকাত্মক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা। কিন্তু সেই সৃষ্টিজ্ঞান পিছনে পড়ে গেল, কেবল প্রতীকরূপ সোমযাগের প্রক্রিয়াগুলিই রয়ে গেল, তাও আবার পশুবলি প্রভৃতি বিভৎস পাপের সংযোজনে হিংসাদি পাপের বাহক হয়ে।

যখন ঐতরেয় ব্রাহ্মণে এইরূপ সোমযাগ—বিশেষত নক্ষত্রসমূহের নির্মাণ পর্যন্ত বিস্তৃত সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার বর্ণনা রয়েছে, তখন এখানে ‘অগ্নি’‘বিষ্ণু’ শব্দগুলির অর্থ কীভাবে গ্রহণ করা উচিত এটাই সর্বপ্রথম বিবেচ্য। এখানে ‘অগ্নি’ সেই পদার্থ, যা মনোরম দীপ্তিসম্পন্ন। এই কারণেই আমরা এখানে ‘অগ্নি’ শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ গ্রহণ করেছি। সৃষ্টির উৎপত্তিতে যতক্ষণ না বিদ্যুতের সৃষ্টি হয়, ততক্ষণ সৃষ্টিপ্রক্রিয়াই শুরু হতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞানও এখান থেকেই তার প্রক্রিয়া শুরু করে বা করতে পারে। অন্যদিকে ‘বিষ্ণু’ শব্দের বিষয়ে আমরা কিছু আর্ষ প্রমাণ উদ্ধৃত করছি—

“স যঃ স বিষ্ণুর্যজ্ঞঃ সঃ। স যঃ স যজ্ঞোऽসী স আদিত্যঃ” (শতপথ ১৪.১.১.৬)
সম্ভবত এটিই অনুপ্রাণিত করে মহর্ষি দয়ানন্দ তাঁর ঋগ্বেদ ভাষ্য ১.১৫৬.৪-এ ‘বিষ্ণু’ পদটির অর্থ দিয়েছেন ‘স্বদীপ্ত্যায় ব্যাপকঃ সূর্যঃ’। এই কারণেই আমরা আমাদের ব্যাখ্যানে অগ্নি থেকে বিদ্যুৎ এবং বিষ্ণু থেকে তারা গ্রহণ করেছি। যখন অগ্নি ও বিষ্ণুর অর্থ বিদ্যুৎ এবং তারা হিসাবে গ্রহণ করা হলো, তখন ‘পুরোদাশ’ আর ‘যজ্ঞে ব্যবহৃত বিশেষ পদার্থ’ বা ‘কাপাল’ আর ‘পদার্থ রাখার বিশেষ পাত্র’ অর্থ ধারণ করতে পারবে না। এই কারণে এখানে গ্রন্থকারের কোনো নির্দেশ নেই। বরং ‘কাপাল’ বলতে প্রাণরশ্মি বোঝানো হয়েছে এবং ‘পুরোদাশ’ বলতে সৃষ্টির সেই অবস্থা, যা ‘কঃ’ অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণরশ্মি দ্বারা দীপ্তিময় হয়ে গেছে। এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের ব্যাখ্যান মনোযোগ দিয়ে পড়া উচিত।

আমাদের ব্যাখ্যানে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে কেন অগ্নি ও বিষ্ণু—উভয়কে সার্বদেবযুক্ত বলা হয়েছে। পুনরায় ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। পাঠক আমাদের ব্যাখ্যানে এটিও জানতে পারবেন যে বিদ্যুৎ ও তারা রূপে অগ্নি ও বিষ্ণু কেন সৃষ্টির যজ্ঞের দুটি ধারের প্রতীক। প্রাণরশ্মি রূপী পুরোদাশ এবং কাপালের বিভাজনও এখানেই বোঝা যায়। আমাদের বিভাজন কোনো পরম্পরার উপর নির্ভরশীল নয়; বরং আমাদের ব্যাখ্যান নিজেই সেই পরম্পরার উৎস, যা যাজ্ঞিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টির রহস্য জানার চেষ্টা করা ঋষিদের দ্বারা সৃষ্টি। বিষ্ণুর তিনটি পদটির রহস্যও এখানেই বোঝা যায়। এই প্রক্রিয়ায় ঘি ও চরের সম্পর্কও এখানেই বোঝা যায়। বিদ্যুৎ, প্রাণ, তারা নিয়ে আলোচনা করলে ঘি ও চালের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা ব্যাখ্যায় ‘ঘৃত’ ও ‘চরু’ যার অর্থ নিয়েছি, তার সঙ্গে পূর্বকণ্ডিকার ব্যাখ্যাগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে।

বিদ্বানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল—তারা কোনো পদকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত অর্থ গ্রহণ করতে শুরু করেন। ‘ঘৃত’ পদটি পড়লেই ঘি পদার্থের কথা মনে আসে, ‘চরুম’ পদটি পড়লেই চালের ভাতের কথা মনে আসে। তখন তারা শুধু সোমযজ্ঞের সোমলতা এবং কর্মকাণ্ডের কথা ভাববেন। বিশাল সৃষ্টির, নানা লোক-লোকান্তরের, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণিকা বা তরঙ্গের কথা ভাবতে পারবে কীভাবে? প্রচলিত অর্থ গ্রহণ করলে পুরো গ্রন্থ অসঙ্গত, বিশৃঙ্খল ও বিদ্যা-বুদ্ধির বিরোধী হলেও তাদের কোনো চিন্তা থাকে না। এই পরম্পরাই সমগ্র বৈদিক সাহিত্যকে বিকৃত চেহারা প্রদান করেছে।

আমরা উপরে ‘ঘৃত’ ও ‘চরুম’ পদ আলোচনা করেছি। সায়ণকে ঘি ও ভাত জ্বালিয়ে পশু বা সন্তান মিলেছে কি না, তা দেখা যায়নি; কিন্তু আমাদের ‘ঘৃত’ ও ‘চরু’ পদার্থের সংমিশ্রণে যাজক—অর্থাৎ সংঘমনী কণিকাগুলির নানাবিধ গুণের প্রতিষ্ঠা নিশ্চয় হবে, এ বিষয়ে কোনো যুক্তিসম্পন্ন পাঠক সন্দেহ করতে পারবে না।

সায়ণ ‘দর্শ’কে অমাবস্যার দিন এবং ‘পূর্ণমাস’কে পূর্ণমাসের দিন হিসাবেই দেখেছেন। পূর্ব-পর পরিপ্রেক্ষিত মিলেছে কি না, তা সায়ণকে ভাবতে হয়নি। আমরা বেদের শাখা ও ব্রাহ্মণগ্রন্থ থেকে এই দুই পদের বহু প্রমাণ উদ্ধৃত করেছি এবং সেগুলোর বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ পেয়েছে। কোনটি গ্রহণ করতে হবে, যা পূর্ব-পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী সম্ভব, তা আমাদের বুদ্ধির বিচার। পাঠক আমাদের ব্যাখ্যায় এই পদের সামঞ্জস্য নিজেরাই বিবেচনা করতে পারবেন।

সামিধেনী কাকে সামিথেনী বলা হয়? এটি আমরা দেখিয়েছি। সমর্থনে আমরা আর্ষ প্রমাণও দিয়েছি, স্বেচ্ছায় নয়। যেসব ঋচা পাঠের বিধান কোনো বিশেষ কর্মকাণ্ডে সায়ণাদির মতে প্রযোজ্য, তাদের পাঠের বৈধতা সায়ণাদির ভাষ্য থেকে প্রমাণিত হয় না। আমরা তাদের বৈধতা, সামিধেনীত্ব ইত্যাদি প্রমাণ করেছি। যেসব ঋচার পাঠের বিধান যজ্ঞের মহা-সৃষ্টির অংশে ব্যবহৃত হয়, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে অন্তরিক্ষে অনবরত উৎপন্ন হয়। এজন্য আমরা এই সামিধেনী ঋচাগুলিকে এখানে সৃষ্টির মধ্যে উৎপন্ন হওয়া হিসেবে প্রমাণ করেছি। কোন ঋচা কোন ঋষি দ্বারা প্রাণরশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়, তার ছন্দ, দেবতা ও বিভিন্ন পদ কীভাবে সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, তা সংক্ষেপে ব্যাখ্যায় বোঝানো হয়েছে।

সায়ণ ভাষ্য অনুযায়ী প্রজাপতির সপ্তদশ হওয়া হাস্যকর, কিন্তু আমাদের ব্যাখ্যায় এর সম্পূর্ণ স্পষ্টতা দেওয়া হয়েছে।

এই গ্রন্থে যেখানে-সেখানে ‘বেদ’ পদ এসেছে, সেখানে সায়ণাদির ভাষ্যকার কোনো বিশেষ কর্মকাণ্ডের ফলের সঙ্গে ওই পদটি যুক্ত করেছেন। এই কারণে বৈদিক কর্মকাণ্ডে অদৃশ্য ফল পাওয়ার কামনাই একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সব বিভ্রান্তি ‘বেদ’ পদ হওয়ায়। এজন্য আমরা প্রায় সব ক্ষেত্রে ‘বেদ’ পদকে ‘বিদু জ্ঞান’ থেকে উৎপন্ন নয়, বরং ‘বিদু লাভে’ থেকে উৎপন্ন হিসেবে নিয়েছি। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, যে অবস্থার বা ক্রিয়ার আলোচনা চলছে, তার উপযুক্ত বা সমন্বিত অবস্থায় সৃষ্টিযজ্ঞে বিশেষ ফল বা উৎপন্ন পদার্থ প্রাপ্ত হয়। ফলে সৃজন প্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়; অন্যথায় অসম্ভব ও মিথ্যা ফল পাওয়ার হাস্যকর আলোচনা লজ্জা দেয়।

আমার চিন্তন প্রক্রিয়া

কিছু বিদ্বান আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে আমাকে এই অর্থগুলো কীভাবে উদ্ভাবন হয়? এই কারণে আমি আমার চিন্তন প্রক্রিয়াকে সংক্ষিপ্তভাবে লিখতে চেষ্টা করছি—

প্রথমে আমি পরমগুরু পরমাত্মাকে অত্যন্ত বিনম্রভাবে স্মরণ করে গ্রন্থ ও সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি মনোযোগ দিয়ে এই দুটোই বুঝতে সক্ষম হওয়ার জন্য প্রার্থনা করি। এর পরে, নানা সরাসরি ও পরোক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সেই গ্রন্থ, যা আমি বুঝতে চাইছি, তার রচয়িতার মহিমা অনুভব করে, গ্রন্থের স্তর বিবেচনা করি এবং সেই স্তর থেকে গ্রন্থের প্রতিটি পদ জানার উদ্দেশ্য সামনে রাখি। এই গ্রন্থকে বোঝার জন্য একটি কণ্ডিকাকে মনোযোগ দিয়ে পড়ে তার প্রতিটি পদ সম্পর্কে, সেই গ্রন্থের অতিরিক্ত অন্যান্য ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নঋক্ত, আর্শ গ্রন্থ, মহর্ষি দয়ানন্দের বেদ ভাষ্য ইত্যাদিতে ওই পদের ব্যাখ্যা বা উৎপত্তি মূল গ্রন্থ বা বিভিন্ন কোষের মাধ্যমে দেখি।

এটি করার সময় কণ্ডিকার রহস্যের একটি চিত্র ব্রহ্মাণ্ডে চলমান কোনো প্রক্রিয়ার রেখাচিত্র হিসেবে ধীরে ধীরে আমার মস্তিষ্কে উদ্ভূত হতে শুরু করে। শুরুতে এই চিত্র অস্পষ্ট এবং ঝাপসা থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি কীভাবে তৈরি হয়, আমি নিজে জানি না, কেবল বিশ্বাস করি এটি ঈশ্বরের অনুগ্রহ, যার ছাড়া এমন চিত্র উদ্ভূত হওয়া সম্ভব নয়। কোনো পদের পঞ্চাশ বা শতাধিক প্রাসঙ্গিক উদাহরণের মধ্যে কিছু বিশেষ প্রাসঙ্গিক উদাহরণ থেকে সেই পদ দ্বারা প্রকাশিত পদার্থের চিত্রচিন্তা সর্বশেষে সুস্পষ্ট হয়ে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য অর্জন করে এবং আমি এটিকেই আমার ব্যাখ্যার রূপ দিই। এই প্রক্রিয়ায় আধুনিক বিজ্ঞানেরও প্রভাব থাকে।

কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে কোনো পদের কোনো গ্রন্থে কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবুও কণ্ডিকা ও তার সম্ভাব্য সম্পর্কিত কোনো ব্রহ্মাণ্ডীয় প্রক্রিয়ার একটি অতি ধূন্ধলা চিত্র আমার মস্তিষ্কে উদ্ভূত হয়েছিল, কিন্তু তা এতটাই অস্পষ্ট এবং বিশৃঙ্খল ছিল যে আমি কণ্ডিকার সম্পূর্ণ অর্থ বোঝাতে ব্যর্থ হই। এমন অবস্থায় আমাকে মস্তিষ্কে প্রচণ্ড চাপ দিতে হয়েছে, কখনও কখনও মাথাব্যথা পর্যন্ত হয়েছে, তবুও সফলতা আসেনি।

তখন আমি নিজেকে একাকী কক্ষে একটি প্রতিজ্ঞা দিয়ে বন্ধ করে রাখি যে, এই পদের অর্থ জানা ছাড়া বাইরে যাব না। একাকী অবস্থায় আমি আমার পরম পথপ্রদর্শক পরমপিতা পরমাত্মার কাছে অত্যন্ত গুরুতরভাবে স্তোত্র-প্রার্থনা-উপাসনা করে বুদ্ধি ও শক্তি প্রার্থনা করি, এরপর পূর্বে তৈরি অতি ধূন্ধলা এবং অস্পষ্ট চিত্রচিন্তায় ঈশ্বরীয় চিন্তাকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করি। এই প্রচেষ্টায় মস্তিষ্কে বিশাল চাপ অনুভূত হয়, কিন্তু ঈশ্বরীয় চিন্তার কারণে তা সহ্য করা সম্ভব হয় এবং মাথাব্যথা বা অন্য কোনো কষ্ট অনুভূত হয় না।

এইভাবে ধূন্ধলা চিত্র-চিন্তা ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং সর্বশেষে এত সুস্পষ্ট হয় যে আমি অসীম আনন্দ অনুভব করি, মনে হয় যেন আমাকে অপরিমেয় ধন বা ব্রহ্মার অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ২–৪ ঘণ্টা সময় লাগে। একবার ব্যতীত আমার প্রভু আমাকে কখনও হতাশ করেননি। ব্যতিক্রম হল যে একবার আমি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বসে পড়েছিলাম, যদিও সেই সময় নিয়মিত কাজেরও সময় ছিল।

সংক্ষেপে, আমি আমার চিন্তন প্রক্রিয়াকে শব্দে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। প্রকৃতপক্ষে এমন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবে পাঠকের জ্ঞানার্থে এটি লিখার চেষ্টা করেছি। পাঠক যাই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন, তা তাদের স্বাধীন।


খণ্ড ১.১-এ আমার ব্যাখ্যা

১. অগ্নিঃ বৈ দেবানাম অবমো বিষ্ণুঃ পরমস্তদন্তরণ সর্বা অন্যা দেবতাঃ।
(দেবঃ = দিভ্যো বায়ুঃ, মনো দেবঃ, প্রানা দেবাঃ; অগ্নিঃ = ব্যাপক বিদ্যুৎ; বিষ্ণুঃ = স্বদীপ্ত্যা ব্যাপক সূর্যঃ; “স যঃ স বিষ্ণুর্যজ্ঞঃ সঃ। স যঃ স যজ্ঞোऽসৌ স আদিত্যঃ”)

ব্যাখ্যা:
সমস্ত আকাশে সৃষ্টির সময় সর্বপ্রথম দিব্য বায়ু উৎপন্ন হয়। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী যজুর্বেদ ভাষ্য (১৭.৩২) অনুসারে বিভিন্ন প্রানের জন্মের ক্রম ব্যাখ্যা করেছেন—প্রথম জন্ম সূত্রাত্মা বায়ু, এরপর ধনঞ্জয়, তারপর প্রাণাপানব্যানা ইত্যাদি, কিন্তু এর চেয়েও পূর্বে দিব্য বায়ুর উৎপত্তি ঘটে। আমাদের মতে, দিভ্য বায়ু মানে হলো সমস্ত প্রানের মূল কারণ—অহংকার তত্ত্ব, যার অন্যরূপ মন বা মহৎ, অর্থাৎ বুদ্ধি।

এই অহংকার বা মহৎ তত্ত্ব থেকে সমগ্র আকাশ পূর্ণভাবে বিস্তৃত হলে, তার মধ্যে প্রাথমিক প্রাণ, সূত্রাত্মা, ধনঞ্জয়, পাঁচ প্রাণাদি উৎপন্ন হয়। এ প্রাণকেও দেব বলা হয়। এখানে ‘দেব’ শব্দের অর্থ হলো সেই সমস্ত পদার্থ, যেখানে আকর্ষণ শক্তি, আলো ইত্যাদি গুণ উৎপন্ন হয়।

এই সমস্ত দেব পদার্থের মধ্যে অগ্নি, অর্থাৎ বিদ্যুৎ, সেই পদার্থ যা অহংকাররূপ দিব্য বায়ু থেকে সর্বপ্রথম উৎপন্ন হয়। এর উৎপত্তির সাথে সাথে সৃষ্টির প্রক্রিয়া তীব্র হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় বিষ্ণু, অর্থাৎ তারা, সর্বশেষে তৈরি হয়। এখানে তারার উৎপত্তি বোঝায় যে কোনো আগ্নেয় পদ বা মেঘে ধারাবাহিক শক্তি উৎপত্তির জন্য বর্তমান বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু আলোমান পদার্থ এবং অন্যান্য উপাদান তৈরি হয়।

এই গ্রন্থের লক্ষ্য হলো সূর্য ও তারার উৎপত্তি পর্যন্ত সৃষ্টির প্রক্রিয়া বোঝানো। বিদ্যুৎ বা বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং সূর্য ইত্যাদির উৎপত্তির মধ্য দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত সূক্ষ্ম ও স্থূল পদ তৈরি হয়। এই কারণে অগ্নি ও বিষ্ণুকে যথাক্রমে প্রথম এবং শেষ দেব পদ বলা হয়েছে, এবং অন্যান্য দেব পদগুলো এই দুইয়ের মধ্যে উৎপন্ন হয়।

‘অবম’ এবং ‘পরম’ শব্দের অর্থ যথাক্রমে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য। ঋষি বলতে চাইছেন, আদ্য বিদ্যুত্ যখন উৎপন্ন হয় বা সৃষ্টির এই অবস্থায় বিদ্যুৎ ও চুম্বকীয় তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটে, তখন তার দীপ্তি, শক্তি সবকিছু সর্বাধিক হয়।

চিত্র ৯.৯ দেব পদার্থের দুটি রূপ

সবচেয়ে ন্যূনতম স্তরের হয়। এখান থেকে শুরু হয়ে যখন তারার সৃষ্টি হয়, তখন তার কেন্দ্রীয় অংশের শক্তি, শক্তি-দৈপ্ত্য সবকিছু সর্বাধিক উচ্চ স্তরের হয়। এই কারণেও অগ্নিকে অবম এবং বিষ্ণুকে পরম দেবতা বলা হয়েছে। অন্য যে কোনো দীপ্তি, শক্তি, এনার্জি ইত্যাদি পদার্থ এই ব্রহ্মাণ্ডে উৎপন্ন হয়, তারা এই দুই স্তরের মধ্যেই অবস্থান করে। এই বিষয়ে মহর্ষি তিতিরও বলেছেন—

“অগ্নিরবমো দেবতানাঃ বিষ্ণুঃ পরমঃ” (তৈ.সং. ৫.৫.১.৪)

অন্য এক ঋষি বলেছেন—
“অগ্নিয়ে সর্বমাথম্” (তা. ২৫.৬.৩)

মহর্ষি যাস্ক ‘অগ্নিঃ’ পদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একই মত প্রকাশ করেছেন—
“অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ভবতি, অগ্র যজ্ঞেষু প্রণীয়তে” (নি.৭.১৪)

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার:
সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় যখন সর্বপ্রথম শক্তির উৎপত্তি হয়, তখন তা প্রথমে বিদ্যুৎ আকারে এবং সর্বনিম্ন স্তরের, অর্থাৎ কম ফ্রিকোয়েন্সির বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি তারাদের কেন্দ্রে উৎপন্ন হয় এবং এটি সর্বশেষে উৎপন্ন হয়। পৃথিবীসহ অন্যান্য লোকের সৃষ্টির পরে তারাদের পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি অর্থাৎ নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লোকসমূহের সৃষ্টি হয়।

এখানে ‘বিষ্ণু’ পদ দ্বারা সেই তারাকে বোঝানো হয়েছে, যা নিউক্লিয়ার ফিউশন এবং তার প্রবল আকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে বহু লোককে সংযুক্ত রাখে। সূর্য বা ব্রহ্মাণ্ডের যে কোনো তারা, গ্যালাক্সির কেন্দ্র ইত্যাদি সকলকেই ‘বিষ্ণু’ পদ দ্বারা বোঝা হয়। এদের উৎপত্তি পৃথিবীর মতো অন্যান্য গ্রহ, লোক ইত্যাদির সৃষ্টির পরে হয় বা বিষ্ণুরূপ তখনই প্রকাশ পায়। এটি বর্তমান বিজ্ঞানের প্রচলিত মতের বিপরীত।

এর আগে শক্তি অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরের বা কম ফ্রিকোয়েন্সির হয়। এখানে বৈদিক বিজ্ঞান, যা বর্তমানের প্রচলিত মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের বিপরীতে, যা উচ্চ শক্তি থেকে নিম্ন শক্তি উৎপন্ন হওয়ার কথা বলে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত প্রমাণিত হয়। আমরা এই বিষয়ের বিশ্লেষণ পূর্বপীঠিকায় করেছি।

২. “আগ্নাভৈষ্ণবং পুরোলাশং নির্বপন্তি দীক্ষণীয়েকাদশকপালম্”
(পুরোডাশঃ = যে এই যজ্ঞে প্রেরিত হয়, তাকে পুরোডাশ বলা হয়; ‘কপালঃ’ = যা পালন করে, বা প্রাণ, কমন বা ক্রমণ দ্বারা; দীক্ষা = নিয়ম বা প্রারম্ভ; প্রাণাদীক্ষা, বাগ্ দীক্ষা ইত্যাদি।)

ব্যাখ্যা:
উপরোক্ত বিদ্যুৎ-অগ্নি ও তারাদের শক্তিশালী এবং কার্যকর রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে ১১ প্রকার প্রান বা তরঙ্গযুক্ত কপাল-সংজ্ঞক পুরোডাশ অব্যাহতভাবে প্রবাহিত হয়। এখানে ‘পুরোডাশ’ বলতে সেই পদার্থ বোঝায়, যা বিদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং তারাদের খাদ্যরূপ হিসেবে ক্রমাগত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সৃষ্টিজজ্ঞকে সক্রিয় রাখে।

উপযুক্ত তাৈত্তির সংহিতা অনুযায়ী, ‘পুরোডাশ’ অন্নকে বোঝায়। অন্ন মানে—যা খাওয়া যায়। তেৎ.সং. ২.৫.৭.৩-এ ‘বাজ’ অর্থাৎ শক্তিকেও অন্ন বলা হয়েছে। এর অর্থ, ১১ প্রকার প্রাণের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ ও তারারা তাদের নিজস্ব রূপ তৈরি এবং বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

এই ১১ প্রাণকে ‘কম্’ বলা হয়েছে কারণ এরা ‘কমন’ এবং ‘ক্রমণ’ অর্থাৎ আকর্ষণ শক্তি এবং গতির সাথে যুক্ত। এখানে ১১ প্রানের অর্থ সূত্রাত্মা বায়ু ও ১০ প্রণাপান ইত্যাদি প্রান বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এখানে বিভিন্ন প্রাণরশ্মি, যা আমরা ১.১.৬-এ অগ্নি ও বিষ্ণুর মধ্যে ভাগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করেছি, তা গ্রহণ করা বেশি উপযুক্ত। এই ১১ ধরনের রশ্মি ছাড়া সৃষ্টিযজ্ঞ সম্পন্ন হতে পারে না।

অন্যান্য ঋষিদেরও এই বিষয়ে বক্তব্য আছে—
“আগ্নাভৈষ্ণব একাদশকপালঃ” (মৈ. ২.৬.৪; ৩.১.১০; ৪.৩.১)
“আগ্নাভৈষ্ণব একাদশকপাল নির্বপ্তি” (তে.সং. ১.৮.৮.১; ৫.৫.৯.৪)

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার:
সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গের শক্তির স্থায়িত্ব কীভাবে বজায় থাকে? তারার ভিতরের ফিউশন প্রক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত তাপ ও শক্তি কোন উৎস প্রদান করে? এই তরঙ্গগুলির উৎপত্তি কোন পদার্থ থেকে হয় এবং তারার সৃষ্টি কোন উপাদান থেকে সম্ভব? উত্তর হলো—প্রাথমিকভাবে ১১ প্রকার প্রাণরশ্মির অবদান থাকে। যদি এই রশ্মিগুলি না থাকে, বিদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং তারাদের প্রকৃত রূপ নষ্ট হয়ে যাবে। এই ১১ উপাদানের অবদান সর্বদা বিদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গে অবদান রাখে। অগ্নি ও বিষ্ণু অর্থাৎ বিদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গ ও সূর্যাদির মধ্যবর্তী বিভাগের বিশ্লেষণ পরবর্তী অংশে দেওয়া হবে।

৩. “সর্বাভ্য এভৈন তদ্দেবতাভ্যো নান্তরায়ং নির্বপত্তি”

ব্যাখ্যানম্ঃ

যেমনভাবে উপরে বর্ণিত বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং বিভিন্ন তারায় বিভিন্ন ধরনের প্রাণরূপ রশ্মির প্রক্ষেপণ বা সংচার ঘটে, তেমনভাবে সৃষ্টির সমস্ত আলোকিত, দৃশ্যমান এবং আকর্ষণশীল গুণযুক্ত বিভিন্ন তরঙ্গ বা কণাতেও একইভাবে প্রক্ষেপণ বা সংচার ঘটে। এখানে “নির্বপন্তি” ক্রিয়াপদ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে বিভিন্ন দেব পদার্থের ভিতরে এবং বাইরে বিভিন্ন ধরনের প্রাণরশ্মি ধ্রুবভাবে উপস্থিত থাকে। এই পূর্বোক্ত প্রাণরশ্মিগুলি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে সর্বত্র বিস্তৃত থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে এমন কোনো শক্তি হিসেবে ধরা যায় না, যা মানব এখনও পরীক্ষামূলকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে। এই প্রাণরশ্মি ছাড়া কোনো দৃশ্যমান বা সক্রিয় পদার্থের অস্তিত্ব এই ব্রহ্মাণ্ডে সম্ভব নয়। যতক্ষণ এই প্রাণ সংচার চলবে, ততক্ষণ সৃষ্টির চক্র চলমান থাকবে, এবং যখন এই সংচার বন্ধ হবে, তখন সৃষ্টির চক্রও বন্ধ হয়ে যাবে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসারঃ
ব্রহ্মাণ্ডে বিভিন্ন ধরনের প্রাণতত্ত্ব সমস্ত পদার্থের অক্ষয় শক্তির উৎস। এদের কারণে ব্রহ্মাণ্ডে শক্তি সংরক্ষণ নীতি কার্যকর হয়। একটি শক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরের জন্য এদের সক্রিয় ভূমিকা থাকে। এই প্রাণরশ্মিগুলির মধ্যে সূক্ষ্মতম থেকে বৃহত্তম প্রাণ পর্যন্ত সমস্ত প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী থাকে। শুধু শক্তি সংরক্ষণ নয়, বর্তমান বিজ্ঞানের সংজ্ঞায়িত পদার্থ-শক্তি বিনিময়েও এদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এদের ছাড়া সৃষ্টির ভিতরে কোনো প্রকার কার্যকলাপ সম্ভব নয়। যেখানে শক্তি সংরক্ষণের নীতি ভঙ্গ হতে পারে, সেখানে শক্তি প্রাণরশ্মিতে রূপান্তরিত বা প্রদর্শিত হয়। শূন্য বা শূন্যতার (vacuum) থেকে কোনো পদার্থ বা শক্তির উৎপত্তি সম্ভব নয়।

৪. “অগ্নিভৈ সর্বা দেবতা বিষ্ণুঃ সর্বা দেবতাঃ”
(অগ্নি = বিদ্যুৎ; বিষ্ণু = তারার কেন্দ্রীয় শক্তি; ঋণ ও প্রমাণ: শ. ১৪.৩.২.৫, শ. ৩.৬.১.৬, ঐ. ১.২২, শ. ১০.১.৪.১২, শ. ১.৬.৩.৮)

ব্যাখ্যানম্ঃ
সৃষ্টিতে সমস্ত দৃশ্যমান এবং আকর্ষণশীল কণার মধ্যে বিদ্যুত রূপী অগ্নি সর্বদা উপস্থিত থাকে। এই বিদ্যুৎই সমস্ত পদার্থকে প্রানীভূত এবং গতিশীল রাখে। এই বিদ্যুতেই সমস্ত পদার্থের জন্ম এবং এ কারণে বিভিন্ন কণা একে অপরকে ভক্ষণ করতে পারে। বিদ্যুতরূপ অগ্নিই সমস্ত পদার্থের আত্মা, অর্থাৎ এটি সব পদার্থে ক্রমাগত উপস্থিত থাকে। তাই মহর্ষি বলেছেন—“অগ্নিমে সর্বা দেবতাঃ”, অর্থাৎ বিদ্যুতের মধ্যে সমস্ত দেবতা উপস্থিত বা সমস্ত পদার্থ বিদ্যুতময়।

আবার, সমস্ত পদার্থকে তাদের আকর্ষণ ও দীপ্তি দিয়ে বিস্তৃত করা তারারূপ বিষ্ণু, বিশেষ করে তার কেন্দ্রীয় অংশ, সকল দেব পদার্থের মিলনস্থল। এই তারাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন কণা এবং তরঙ্গ উৎপন্ন হয়। তাই বিষ্ণুকে সমস্ত দেব পদার্থের উৎপত্তি ও অবস্থানের স্থান বলা হয়েছে। এখানে ‘দেবতা’ পদ দ্বারা বিভিন্ন প্রাণরশ্মিকেও বোঝানো যায়। তাই ঋষির কথায় অগ্নির পরমাণু ও বিদ্যুতময় কণায় বিভিন্ন ধরনের প্রাণ ও ছন্দাদির রশ্মি বিদ্যমান, ঠিক তেমনি আদিত্যলোকেও সব ধরনের প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি বিদ্যমান। এ দুইয়ের মধ্যে সমমর্যাদা বিদ্যমান।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসারঃ
ব্রহ্মাণ্ডে বিভিন্ন ধরনের আলোকিত, দৃশ্যমান কণা বা তরঙ্গ বিদ্যমান। এদের মধ্যে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ বা চুম্বকীয় গুণ অবশ্যই বিদ্যমান। এ কারণে সমগ্র সৃষ্টিই বিদ্যুতময়। এর চরম অবস্থান তারাদের কেন্দ্রীয় অংশে, যেখানে এত বড় বিদ্যুৎ ও তাপের ভান্ডার থাকে যে নতুন পদার্থ উৎপন্ন হয় এবং বিভিন্ন পদার্থ তরঙ্গ বা কণার আকারে ব্রহ্মাণ্ডে বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন কণা ও কান্তা (quanta) সহ তারাগুলিতেও সকল ধরনের প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি বিদ্যমান থাকে। এদের মাধ্যমে তাদের উৎপত্তি, কার্যক্রম ও পরিচালনা সম্পন্ন হয়।

৫. “এতে বৈ যজ্ঞস্যান্ত্যে তন্ন্বী যদাগ্নিশ্চ বিষ্ণুশ্চ তদ্যদাগ্নাভৈষ্ণवं পুরোলাশং নির্বপন্ত্যৎ এভ তদ্ধেৱানৃধ্নুভন্তি।” ( নিঘ. ৩.৫) (ऋषध्नोति परिचरणकर्मा (निघं.३.५))

ব্যাখ্যানঃ পূর্বোক্ত অগ্নি এবং বিষ্ণু এই সৃষ্টিযজ্ঞের দুই প্রান্তে বিদ্যমান বিস্তৃত শরীরের মতো, যা দুই প্রান্ত থেকে এই সৃষ্টির সৃষ্টি-কার্যকে বিস্তার প্রদান করে চলতে থাকে। বিদ্যুৎ প্রথম প্রান্ত এবং তারা অন্তিম প্রান্ত। সেই বিদ্যুৎ প্রথম প্রান্ত হলেও অন্তিম প্রান্তে তারার নির্মাণ পর্যন্ত এবং অন্যান্য স্থানে সৃষ্টিযজ্ঞকে ক্রমাগত বিস্তৃত করে চলে। একইভাবে তারাগুলোর মধ্যে যে নিউক্লিয়ার সংলয় ক্রিয়া ঘটে, তা অসংখ্য পদার্থের সৃষ্টি করে সৃষ্টিকে বিস্তৃত করে এবং এর ফলে উৎপন্ন আলোকশক্তি ইত্যাদি বিকিরণও সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে বিভিন্ন কার্যকে বিস্তৃত করে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টির কারণ হয়। এই ধরনের অগ্নি এবং বিষ্ণু অর্থাৎ বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং তারা ইত্যাদিকে প্রাক-উল্লেখিত প্রাণাপানাদি বিভিন্ন প্রাণ দ্বারা সমৃদ্ধ ও পুষ্ট করে দীপ্তিময় করে বিভিন্ন প্রকারের দেব কণাগুলি অর্থাৎ দৃশ্যমান, আলোকমান ইত্যাদি পদার্থকে উন্নীত করে, পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন ধরনের পরিচর্যাও সম্পন্ন করে। এর অর্থ হলো, এই প্রাণাদি পদার্থ বিদ্যুৎ ইত্যাদি পদার্থকে পুষ্ট করে বিভিন্ন দেব পদার্থকে প্রয়োজনীয় গতি এবং শক্তি প্রদান করে, যার ফলে সেই পদার্থগুলি সৃষ্টিরূপী সোমযজ্ঞের ক্রমাগত উন্নয়ন করে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসারঃ সৃষ্টির আদিতে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ অথবা শক্তির উৎপত্তি এবং তারা বিশেষ করে নিউক্লিয়ার সংলয় থেকে শক্তির উৎপত্তি হওয়া দুটি বড় ঘটনা, যা এই সৃষ্টিযজ্ঞের দুই প্রান্তের সমতুল্য। এই প্রান্তগুলো থেকেই সৃষ্টিযজ্ঞরূপী শরীরের বিস্তার ঘটে এবং এই বিস্তারের জন্য পূর্বে বর্ণিত প্রাণাদি রশ্মিগুলোর অপরিহার্য অবদান থাকে।

চিত্র ১.২ সৃষ্টি যজ্ঞের দুটি কিনারা


৬. তদাডুর্যদেকাদশকপালঃ পুরোভশাশো দ্বাব্গ্নাবিষ্ণূ কাইন্যোস্তত্র ক্লুপ্তিঃ কা বিভক্তিরिति।।

অষ্টাকপাল আগ্নেয়ঃ, অষ্টাক্ষরা বৈ গায়ত্রী, গায়ত্রমাগ্নেশ্ছন্দঃ, ত্রিকপালো বৈষ্ণবঃ, ত্রিহিন্দং বিষ্ণুরব্যক্রমত, স্যানয়োস্তত্র ক্লুপ্তিঃ সা বিভক্তিঃ।।

ব্যাখ্যানঃ পূর্বে আগ্নি এবং বিষ্ণু অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও সূর্যাদি তারাদের মধ্যে যে গ्यारোটি ধরনের প্রাণের সংচারণের আলোচনা করা হয়েছে, সেই প্রकरणে প্রশ্ন ওঠে যে এই গ्यारোটি প্রাণের বিভাজন এই দুটির মধ্যে কীভাবে করা হয়? অর্থাৎ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গে কতটি এবং কোন কোন প্রাণের সংচারণ ঘটে এবং সূর্যাদি তারার মধ্যে কতটি এবং কোন কোন প্রাণের সংচারণ হয় এবং তারা কীভাবে এদের সক্ষমতা প্রদান করে?

এর উত্তরে বলা হয়েছে যে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গে আট ধরনের প্রাণের সংচারণ ঘটে এবং বিষ্ণু অর্থাৎ তারাদের মধ্যে তিন ধরনের প্রাণসমূহের সংচারণ হয়। আগ্নি অর্থাৎ বিদ্যুৎ বা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের মধ্যে সংচরিত প্রাণগুলো হলো—বুদ্ধি বা মন বা অহঙ্কার, সূত্রাত্মা বায়ু, ধনঞ্জয়, প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান এবং সমান।

সূর্যাদি তারায় সংচরিত প্রাণগুলো হলো—উপরোক্ত আটটি প্রাণের অহঙ্কার সমষ্টি, বিভিন্ন ধরনের ছন্দরূপ প্রাণের সূত্রাত্মা সমষ্টি, মাস ও ঋতুসংজ্ঞক প্রাণের সমষ্টি।

চিত্র ১.৩ আগ্নি অর্থাৎ বিদ্যুতের ভিতরে উপস্থিত 
ধ্যাতব্য যে সূর্যের মধ্যে অসংখ্য ধরনের প্রাণ সক্রিয় থাকে, যেগুলোকে আমরা তিনটি মূল সমষ্টিতে শ্রেণীবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। বিদ্যুৎ উৎপত্তির সময় উপরের আটটি একক প্রাণই মূলত সংচরিত হয়। স্মরণীয় যে বর্তমানকালে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের সঙ্গে গায়ত্রী ছন্দসহ অন্যান্য ছন্দও যুক্ত থাকে। এখানে গায়ত্রী ছন্দরূপ প্রাণকে আট অক্ষরের বলা হয়েছে, যা প্রাজাপত্য গায়ত্রীরূপ। প্রাজাপত্য অবস্থা সৃষ্টির সেই অবস্থা যেখানে পদার্থে একটি দীপ্তি বিদ্যমান থাকে এবং বন্ধন শক্তি উৎপন্ন হয় এবং এর কারণ বিদ্যুৎই।

এই কারণে আট অক্ষরের গায়ত্রী ছন্দরূপ প্রাণ বিদ্যুৎ-এর প্রথম দ্যাব্য অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপত্তিতে মন, সূত্রাত্মা বায়ু ইত্যাদি আট প্রাণের অংশীদার হয়। এই গায়ত্রী ছন্দরূপ প্রাণ বিদ্যুৎ কণ বা তরঙ্গকে আচ্ছাদিত রাখে। গায়ত্রীসহ অন্যান্য ছন্দের বিষয়ে পূর্বপীঠিকায় বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।

এবার সূর্যাদি তারার বিষয়ে আলোচনা করি যে উপরের তিন ধরনের প্রাণসমষ্টির মাধ্যমে কোনো একটি তারারূপ বিষ্ণু এবং বিভিন্ন প্রাণের সমষ্টি কীভাবে নিজের গুরুত্বাকর্ষণ শক্তি এবং আলোসহ বিভিন্ন রশ্মির মাধ্যমে সমস্ত লোককে আচ্ছাদিত করে। সূর্যাদি তারাগুলি প্রধানত তিনটি রশ্মি ক্রমাগত নিঃসরণ করে। এইভাবে তারার গ্যারোটি প্রকারের প্রাণের বিভাজন এবং এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও তারাদের ক্ষমতা প্রদর্শিত হয়েছে।

চিত্র ১.৪ সূর্যাদির তারাগুলির মধ্যে সংচরিত প্রাণ।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার- বিভিন্ন প্রকারের বৈদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গের মধ্যে অহঙ্কার, মন বা বুদ্ধি, সূত্রাত্মা বায়ু, ধনঞ্জয়, প্রাণ, আপন, ধ্যান, উদান এবং সমান এই আটটি প্রাথমিক প্রাণ সর্বদা সংচারিত থাকে এবং বৈদ্যুত বা বৈদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গের অবস্থায় আট অক্ষরের প্রজাপত্য গায়ত্রী ছন্দের প্রাণরূপ তরঙ্গগুলো তাদের আচ্ছাদিত করে রাখে। এই তরঙ্গগুলো এই আট প্রানের মাধ্যমে নির্মিত হয়। এই ছন্দগুলোর বিষয়ে বিশেষ তথ্য পূর্বপীঠিকায় দেখুন। ঠিক এই আট প্রকারের প্রাণের কারণে বিদ্যুতাগ্নি আট গুণযুক্ত হয়, যার গণনা মহর্ষি দয়ানন্দ ঋ.ভা.১.১.১-এ করেছেন এবং লিখেছেন যে আগ্নি রূপ, দাহ, বেগ, প্রকাশ, ধারণ, ছেদন, আকর্ষণ ইত্যাদির দ্বারা সম্পন্ন। ‘ইত্যাদি’ শব্দ থেকে আমরা প্রতিকার্ষণ বলের ধারণা করি। অন্যদিকে তারা তিন প্রকারের প্রাণসমূহের মাধ্যমে তিন প্রকারের পদার্থ যেমন গুরুত্ববল রশ্মি, বৈদ্যুত চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং অন্যান্য তরঙ্গ যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রিনো ইত্যাদির উৎসর্জন করে।

৭. ঘৃতে চরুং নির্বপেত যো অপ্রতিষ্ঠিতো মন্যেত।
অস্যাং বাৎ স ন প্রতিতিষ্ঠতি যো ন প্রতিতিষ্ঠতি।

[ঘৃতম্ = সান্দীপত তেজঃ (ম.দ.ঋ.ভা.২.৩.১১), জিঘরতি সংচলতি দীপ্ত্যতে বা তৎ ঘৃতम् (উ. কো. ৩.৮ ৮), (বৃক্ষরণদীপ্য্যোঃ সং. থা. কো.), ঘৃতমন্তরিক্ষস্য (রূপম) (শ.৭.৫,১.৩), তেজো ভে ঘৃতम् (মে.১.৬.৮), সর্বদেবত্য ভে ঘৃতम् (কো.ব্রা. ২১.৪), এতদ্বা অগ্নেঃ প্রিয়ং ধাম পদ ঘৃতम् (কাঠ. ২০.৭; ২১.৮), ঘৃতমিত্যুদকনমসু পাঠিতম্ (নিঘং.১.১২), শুদ্ধ প্রদীপত্মুদকম্ (ম.দ.য.ভা.৩৪.৪০)। চরুঃ = মেঘঃ (ম.দ.ঋ.ভা. ১.৭.৬), চরূর্মৃচ্ছয়ো ভবতি। চরতেভা। সমুচ্চরন্ত্যসম্বাদাপঃ (নি.৬.১১), (মৃত্ = মৃদ্+কিয়পূ, মৃদ্ = পীসনা, স্পর্শ করা, জীত লোনা, অগ্রে বাড়া - আপ্টেকোষ), ইমে লোকাশ্বরুঃ পঞ্চবিলঃ (মাই.১.৪.৮), বিলম্ - ভরণম্, ধারণম্ (ম.দ.য.ভা. ১১.৫৬), বিলং ভর ভবতি বিভরতেঃ (নি.২.১৭), চর গতি ভক্ষণে চ (ভ্বা) চরতি চর্যতে অগ্নিনা ভক্ষ্যত ইতি চরুঃ (উ.কো. ১.৭)। প্রতি = ব্যাপ্তি অর্থে (ম.দ.য.ভা.২০.৩৭), বীপ্তসায়ম্ (ম.দ.ঋ.ভা. ১.১৬৬.৭)। মন্যতে ইতি কান্তিকর্মা (নিঘং. ২.৬), মন্যতে ইতি অর্থতিকর্মা (নিঘং. ৩.১৪), প্রাণো ভে প্র (ঐ. ২.৪০), ছন্দান্সি ভে সর্বে লোকারঃ (জৈ.ব্রা. ১.৩৩২), অন্তরিক্ষ ভে প্র (ঐ.২.৪১)]

ব্যাখ্যানম্- যখন অন্তরীক্ষ অর্থাৎ আকাশে অবস্থানরত বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ উপাদান প্রাকৃষ্ট রূপে তাদের শক্তিসমেত প্রতিষ্ঠিত হয়নি অর্থাৎ তাদের মধ্যে বিশেষ সক্রিয়তা বিদ্যমান নয় বা তারা প্রায়শই শিথিল থাকে, তখন পরম চেতন তত্ত্ব পরমাত্মা সেই সমগ্র পদার্থে কান্তি অর্থাৎ আকর্ষণাদী বল এবং আর্চনা অর্থাৎ প্রদীপক গুণ উৎপন্ন করে। স্মরণযোগ্য যে ‘আর্চ’ ধাতু লোকিক সংস্কৃত ভাষায় পূজা অর্থে ব্যবহৃত হয়, অথচ বেদে এর অর্থ হচ্ছে দীপ্ত হওয়া ও উজ্জ্বল হওয়া। এজন্য দেখা যায়, বরু অর্থাৎ এমন পদার্থ, যা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের পীষিত অতি সূক্ষ্ম রূপে বিদ্যমান থাকে এবং যা বিশাল মেঘের সদৃশ, যার মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের প্রাণ বিদ্যমান ও গতিশীল থাকে এবং পরস্পরের ভক্ষণও করে এবং সেই মেঘের সদৃশ পদার্থও নিজে গতিশীল থাকে, সেই পদার্থসমূহের মধ্যে সান্দীপত তেজযুক্ত সূক্ষ্ম ‘ঘুম’ রশ্মি সহ আকাশ উপাদান প্রবর্তিত হয়।

এর অর্থ হলো, সমগ্র পদার্থসমষ্টিকে সূক্ষ্ম ‘ঘুম’ রশ্মি সহ আকাশ উপাদানের সাথে সংকুচিত করে এমন তেজোময়ী অবস্থা সৃষ্টি করা হয়, যেখানে সমগ্র পদার্থসমষ্টি মিলিত বা প্রবাহিত হয়ে পরস্পর মিশ্রিত অবস্থায় চলতে শুরু করে।

এই উল্লিখিত অবস্থায় অর্থাৎ সান্দীপত তেজ উৎপন্ন হওয়ার পূর্বাবস্থায়, সর্বত্র প্রায়োগিক পদার্থ তাদের শক্তিসমেত বর্তমান থাকে না, অর্থাৎ উক্ত তেজ ও গতি অর্জন করে না বা সমগ্র প্রাণাদি পদার্থে বিশেষ তীক্ষ্ণতা প্রবর্তিত হয় না, তখন পর্যন্ত এর ভেতরে ক্রিয়াশীল গুণের প্রতিষ্ঠা হয় না অর্থাৎ সুষ্টিচক্র এগোতে পারে না।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার- পূর্বে বলা হয়েছে যে সকল প্রাণাদি রশ্মি আকাশীয় আকারের শূন্যে সর্বত্র বিস্তৃত থাকে। এই পদার্থই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড গঠনের উপাদান, যেখানে গতি গুণ বিদ্যমান থাকে, কিন্তু শক্তি তার তীক্ষ্ণ রূপে উপস্থিত থাকে না। এরপর সেই পদার্থে, যার মধ্যে আকাশ উপাদানও বিদ্যমান থাকে, শক্তি, ক্রিয়া ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। স্মরণযোগ্য যে আকাশ উপাদান একটি পদার্থের নাম, কেবল শূন্য নয়। এর বিষয়ে বিস্তারিত পূর্বপীঠিকায় পড়া যেতে পারে। সেই আকাশ উপাদানের দ্বারা প্রাণাদি পদার্থের সংকোচন থেকে এমন একটি তেজ উৎপন্ন হয়, যার ফলে সমগ্র শূন্যাকার আকাশে আলো, উষ্ণতা ইত্যাদির সৃষ্টি হয় এবং এরপর সমগ্র পদার্থ তেজের মাধ্যমে দীপ্তিমান হয়ে একে অপরকে ভক্ষণ করে, প্রবাহিত হয়ে গতিশীল হতে শুরু করে।

৮. তদ্যদ্ঘৃতং তৎস্ত্রিয়া পয়ঃ, যেই তণ্ডুলাস্‌তে পুমসস্তন্মিথুনং মিথুনেনেভাইন তত্প্রজয়া পশুভিঃ প্রজনয়তি প্রজাত্যাই। প্রজায়তে প্রজয়া পশুভির্য এভং বেদ।
[স্ত্রী - রত্যে ষ্ট্রয়ে শব্দসংঘাতয়ঃ (ভ্বা), স্ত্যায়তি শব্দয়তি গুণান্‌ গ্রহণাতি বা সে স্ত্রী (উ. কো. ৪.১৬৭), অবীর্যা ভে স্ত্রী (২. ২.৫.২.৩৬)। পুমস - বীর্যং পুমান্‌ (শ.২.৫.২.৩৬), পুমান্‌ পুরুমনা ভবতি পুমসতের্বা (নি.৬.১৫), পাতি রক্ষতি ইতি পুমান্‌ (উ.কো. ৪.১৭৮)। তণ্ডুলাঃ = বৃজাদীনা স্থানে তণ্ডাদেশঃ (উ. কো. ৫.৮)। পশবঃ = পশব ভে বৈশ্বদেবম্‌ (শস্ত্রঃ) (কৌ.ব্রা. ১৬.৩), পশব ভে হবিশ্মন্তঃ (শ. ১.৪.১.৮), পশব ভে মরুতঃ (ঐ.৩.১৬), বাজো ভে পশবঃ (ঐ.৫.৮), প্রাণাঃ পশবঃ (শ.৭.৫.২.৬), পশব যেই ছন্দান্সি (শ.৭.৫.২.৪২)। পয়ঃ = পয়ঃ রাত্রিনাম (নিঘং. ১.৭), পয়ঃ জ্বলতোনাম (নিঘং. ১.১৭, বৈ. কো. থেকে উদ্ধৃত), পয়ঃ উদকনাম (নিঘং.১.১০), পয়ঃ অন্ননাম (নিঘং. ২.৭), পয়ঃ পিবতের্বা প্যায়তের্বা (নি.২.৫), প্রাণঃ পয়ঃ (শ.৬.৫.৪.১৫), পয় গতি, পয়স্‌ প্রসূতি (কণ্ড্যাদি।)]

ব্যাখ্যানম্- উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় যখন পদার্থের অবস্থা বিশেষভাবে তেজস্বিনী নয় এবং যা সমগ্র শূন্যাকার আকাশকে ঘিরে রেখেছে এবং যেখানে নীরব স্রোতও সৃষ্টি হয়েছে, সেই অবস্থায় উপরের উল্লিখিত সান্দীপ তেজরূপ ঘৃত জ্বলনশীল ও প্রাণবান অর্থাৎ প্রাকৃষ্ট গতিসম্পন্ন হয়। সেই সময় এই অবস্থাটি প্রবাহিত এবং পরস্পর একে অপরকে ভক্ষণ করে থাকে।

এই প্রক্রিয়ায় ঈশ্বরীয় তত্ত্ব দ্বারা প্ররোচিত বা প্রভাবিত প্রতিটি পদার্থকে আচ্ছাদিত করে এমন অতীব বিস্তৃত এবং সকল প্রাণাদি উপাদানের সঙ্গে সংযুক্ত তণ্ডুল-সংজ্ঞক পদার্থ মনস্‌ তত্ত্ব অর্থাৎ প্রধান প্রাণ (অহংকার) হয়। যদিও এই পদার্থ সমগ্র পদার্থের উৎপাদনকারক, তবু এটি নিজে দ্বারা উৎপন্ন পদার্থের সঙ্গে বারবার মিলিত হয়ে অর্থাৎ যুক্ত হয়ে বহুপ্রকার পদার্থের সৃষ্টি করে। এই পদার্থকে এখানে পুমান্‌ বলা হয়েছে এবং যা তার কার্যরূপ পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাকে স্ত্রী বলা হয়েছে। এইভাবে এই দুইয়ের সংযোগে এই সৃষ্টিযজ্ঞ বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ, শক্তি, ছন্দরূপ প্রাণ, মরুত্‌রূপ সূক্ষ্ম বাতাস এবং দৃশ্যমান পরমাণু দ্বারা সম্পন্ন হয়।

এই বিষয় সম্পর্কে মহর্ষি আপস্তম্বরও বলেছেন-
“আগ্নাভৈষ্ণবমেকাদশকপালং নির্বপতি, আগ্নাভৈষ্ণব বা ঘৃতে চরুম্‌। পুরাডাশো ব্রহ্মাবর্জস্কামস্য, ঘৃতে চরু প্রজাকামস্য পশুকামস্য বা। আদিত্যং ঘূতে চরু দ্বিতীয়ং প্রজাকামপশুকামস্যকে সমাপনন্তি।” (আপ.শ্রী. ১০.৪.২-৪)

বিশেষ ধ্যাতব্য- এই গ্রন্থে ‘বেদ’ শব্দটি বিদ্ লাভে ধাতু থেকে উদ্ভূত প্রথম পুরুষ একবচনের ছান্দসিক ব্যবহার হিসেবে এসেছে। এর অর্থ, যখন উপরিউক্ত অবস্থা অর্জিত হয় অর্থাৎ উপরের মত মিলন সম্পন্ন হয়, তখন এই সৃষ্টিযজ্ঞ বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ দ্বারা প্রকৃষ্টভাবে সমৃদ্ধ হয়।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার- তেজ ও উষ্ণতার উৎপত্তির পূর্বে প্রাণাদি পদার্থ, যাদের রশ্মি সর্বত্র বিস্তৃত থাকে, তারা তেজ ও উষ্ণতা ছাড়া সৃষ্টির পরবর্তী প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে সক্ষম হয় না। সেই সময় এই প্রাণাদি রশ্মির কারণ উপাদান মন বা অহংকার, যা প্রধান প্রাণরূপ, তার কার্যবস্থায় প্রানাপান রশ্মিতে তেজ, উষ্ণতা ও শক্তি সমৃদ্ধ করে। সেই অহংকার উপাদান এই প্রাণাদি উপাদানগুলিকে সংকুচিত রেখে স্পন্দিত করে, বহুপ্রকার কণ ও তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটায়।

৯. আরম্ভযজ্ঞো বা এষ আরম্ভদেবতো য: দর্শপূর্ণমাসাভ্যং যজত, আমাবাস্যেন বা হবিশেষ্ট্বা পূর্ণমাসেনে বা তস্মিন্নেভ হবিশি তস্মিন্‌ বরহিষি দীক্ষেত, এষা একা দীক্ষা।

(আমাবস্যা - আমাবস্যা সিনীওয়ালী (তৈ.সং. ৩.৪.৬.৬), কামো বা আমাবস্যা (তে.ব্রা. ৩.১.৫.১৫), ক্ষত্রমু আমাবস্যা (কৌ.ব্রা. ৪.৮), সান্নায়্যাভাজনা ওজমাওঅস্থা (শ. ২.৪.৪.২০) (সান্নায়্য = সম্‌ + নী + য়ত), আমাবাস্যা ভে সরস্বতী (মে. ১.৪.১৫), আপানভাজনা আমাবাস্যা (জৈ.ব্রা. ২.৩৬৪)। প্রতিষ্ঠা ভে পূর্ণমাসম্‌ (কী.ব্রা. ৫.৮; ১৮.১৪)। দর্শপূর্ণমাসি (উদান) ব্রহ্ম ভে পূর্ণমাসি (কী.ব্রা. ৪.৮), এবং পূর্ণমা উদানে হ্যয়ং পুরুষঃ পূর্যতাড্ড্ব, প্রাণ এভ দর্শো দদৃশ ইভ তদায়য়ং প্রাণঃ (শ. ১১.২.৪.৫), আহরেভ দর্শো হহুরু হিদং দদৃশ ইভ, রাত্রিরেভ পূর্ণমা রাত্যা হিদঃ সর্বপূর্ণম্‌ (কাশ. ৩.২.৬.১, ব্রা.উ.কো. থেকে উদ্ধৃত), এতো ভে দেবানাং হরি যদ্‌ দর্শপূর্ণমাসো (তৈ.সং. ২.৫.৬.২), এষ ভে দেবরথো যদ্‌ দর্শপূর্ণমাসো (তৈ.সং. ২.৫.৬.১), মন এভ পূর্ণমা:, পূর্ণমি হিদ মনো, বাগেভ দর্শো দদৃশ ডডভ হিইয়ং (বাক) (শ. ১১.২.৪.৭)। বরধিঃ জলম্‌ (তু.ম.দ.য.ভা. ২৩.৩৮), অবকাশঃ (তু.ম.দ.ঋ.ভা. ৬.১২.১), বৃহন্তে সর্বে পদার্থা যস্মিনস্তদন্তরীক্ষম্‌ (ম.দ.য.ভা. ২.২২), বরহিঃ অন্তরীক্ষনাম (নিঘং. ১.৩), বরহিঃ উদকনাম (নিঘং. ১.১২), পশ্বো ভে বরধিঃ (ঐ.২.৪), (অগ্নি-রহ্য - কাঠ. ৮.৪; শ. ৩.২.২.৭), ক্ষত্রো ভে সোমঃ (জৈ.ব্রা. ৩.২৪; শ. ৩.৪.১.১০)।)

ব্যাখ্যানম্‌- যখন সৃষ্টিযজ্ঞের আরম্ভ ঘটে, সেই সময় থেকেই বিদ্যুতের উৎপত্তি না হলেও মূল উপাদান, যা মন-বুদ্ধি বা অহংকাররূপ প্রধান প্রাণ হিসেবে বিদ্যমান থাকে, তখনই সেই পদার্থে দিভ্য গুণাবলি উৎপন্ন হতে শুরু করে। এর অর্থ, সেই দিভ্য পদার্থ অহংকার (দিভ্য বায়ু) তে গতি, কম্পন, দীপ্তি, আকর্ষণশক্তি, পরস্পরের হালকা সংঘর্ষ, অত্যন্ত ক্ষুদ্র মিলন-বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া ইত্যাদি গুণ উৎপন্ন হয়। যদি এটি না হতো, তবে বিদ্যুত-অগ্নির উৎপত্তি কখনও সম্ভব হতো না। তবে সত্য যে বিদ্যুত-অগ্নি উদ্ভবের পরে এই সমস্ত গুণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সেই অহংকার বা প্রধান প্রাণতত্ত্ব দর্শ ও পূর্ণমাসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

চিত্র ১.৫ মন ও বাক সত্যের মিলন থেকে উদ্ভূত দুটি প্রধান পদার্থ

এর অর্থ হলো যে অহংকার বা মনস তত্ত্ব, যা সমগ্র আকাশকে ভরে রাখে, নিজেই বাকু তত্ত্বের সঙ্গে মিলিত হয়ে যায়। এখানে বাক তত্ত্ব বলতে ইশ্বরীয় তেজ বা ‘ওম’ ধ্বনিরূপ (যা পরা অবস্থায় থাকে) দেবী গায়ত্রী ছন্দকে বোঝানো হয়েছে। এই গায়ত্রী ছন্দ সমগ্র মনস বা অহংকার তত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। মনস তত্ত্ব সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকে, তাই এটিকে পূর্ণিমা বলা হয় এবং বাক তত্ত্ব একটি আকর্ষণশক্তি অর্থাৎ কামনা উৎপন্ন করে। লক্ষ্যণীয় যে দৃশির ধাতুর ব্যবহার মহর্ষি দয়ানন্দ (ঋ০ভা০ ১.২৪.৪) তে ইচ্ছা অর্থে করেছেন, এই কারণে বাক তত্ত্বকে ‘দর্শ’ বলা হয়েছে।

বাক তত্ত্বের সঙ্গে প্রাণ নামক প্রাণ তত্ত্বের বেশি সংমিশ্রণ হয় এবং মনস তত্ত্বের সঙ্গে উদান নামক প্রাণের বেশি সংমিশ্রণ ঘটে। কখনও কখনও মনস তত্ত্বের সঙ্গে অহঃ (প্রাণ নামক প্রাণ তত্ত্ব) এবং বাকরূপী দেবী গায়ত্রী ছন্দের সঙ্গে রাত্রি (আপান) প্রধান থাকে। এই প্রাণ-আপান, প্রাণ-উদান, মন-বাক, মনস চেতন তত্ত্ব পরমাত্মার হরণশীল হাতের মতো কাজ করে। সেই সময় সমগ্র পদার্থসমূহ প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়—এক ভাগ আমাবস্যা অর্থাৎ ক্ষত্র সোমের রূপে প্রকাশ পায় এবং অন্য ভাগ পূর্ণিমা অর্থাৎ ব্রহ্ম বা অগ্নির রূপে প্রকাশ পায়।

সোম তত্ত্বকে বায়ুও বলা হয়, যেমন সোম-বহুসুখপ্রসাবকো বায়ুঃ (ঋ.ভা. ১.৬৩.৫) তে মহর্ষি দয়ানন্দ নির্দেশ করেছেন। এটি আপেক্ষিকভাবে শীতল, শক্তিশালী, সকল পদার্থের উৎপত্তির কারণ তত্ত্ব, সূক্ষ্ম পবনরূপ মরুতের কারণ হয় এবং অগ্নি পদার্থ রূপে দাহ, প্রদীপন, বেগ, ছেদন, আকর্ষণ, প্রতিকর্ষণাদি গুণে সমৃদ্ধ হয়। এই সোম তত্ত্বের সঙ্গে মন, বাক পদার্থকে সংযুক্ত করে তার সঙ্গে মিলিত করা হয়।

এরপর পূর্ণিমা অর্থাৎ অগ্নিতত্ত্বের মাধ্যমে সেই হবি, যা সমগ্র আকাশাকৃতির আকাশে বিদ্যমান, তার মধ্যে দীক্ষা অর্থাৎ উষ্মার উদ্ভব ঘটানো হয়। এটি একভাবে অগ্নি এবং সোমের দ্বারা পরবর্তী সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার ধারণার আরম্ভ। এই বিষয়ে অন্যান্য ঋষিদেরও বক্তব্য রয়েছে—
“দর্শপূর্ণমাসাভ্যামিষ্ট্বেষ্টিপশুচাতুর্মাস্যরথ সোমেন।।"
“ঊর্ধ্ব বর্ষপূর্ণমাসার্যাং যথোপপত্ত্যেকে প্রাগপি সোমেনেকে।।” (আশ্ব.শ্রী. ৪.১.১-২)
“অথ দর্শপূর্ণমাসাভারভতে তার্যাং সংবৎসরমিষ্ট্যা সোমেন পশুনা বা যজতে।।” (আপ.শ্রী. ৪.২৩.২)

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— সৃষ্টির প্রারম্ভে যখন সর্বপ্রথম অহংকার অর্থাৎ মনস তত্ত্ব রূপী, যা প্রধান প্রাণ, এবং যেখান থেকে মূল পদার্থের মধ্যে সংমিশ্রণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেই সময়ও সূক্ষ্ম স্তরের দীপ্তি, আকর্ষণশক্তি, কম্পন, মৃদু গতি ইত্যাদি গুণ উদ্ভূত হয়। এর পরে সূত্রাত্মা বায়ু, ধনঞ্জয়, প্রাণ-আপানাদি, সোমরূপ কারণভূত বায়ু এবং বিদ্যুত, উষ্ণতা ইত্যাদির উৎপত্তি ঘটে। ইশ্বরীয় চেতন তত্ত্বের মাধ্যমে একই অহংকার ও মনস তত্ত্বের মধ্যে গোপন অবস্থা পায় এবং দেবী গায়ত্রী ছন্দ ‘ওম’ এর উৎপত্তি ঘটে। এই শব্দের অবস্থাকে কোনো ভৌত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি দিয়ে ধারণ করা যায় না। এভাবে বাক তত্ত্ব ও অহংকার বা মনস তত্ত্ব প্রাণ-আপান বা প্রাণ-উদান রূপী হরণশীল শক্তির মাধ্যমে প্রথমে সোম পদার্থ অর্থাৎ শীতল মৃদু বায়ুরূপ অবস্থায় বিদ্যমান পদার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে উষ্ণতা এবং প্রদীপনময় অগ্নিরূপ পদার্থের সঙ্গে মিলিত হয়ে সমগ্র আকাশে উষ্মার সংক্রমণ ও সংবর্ধন করে।

১০. সপ্তদশ সামিধেনীরানুব্রূয়াত্‌।।

[সামিধেনীঃ = সম্যগ্হিত্যন্তে যা দ্বারা সামিধেনীঃ বলা হয় (ম.দ.য.ভা. ১৬.২০), এটাই সর্বসমিদ্ধ, তাই সামিধেনী নামে পরিচিত (শ. ১১. ২.৭.৬), বাজো বৈ সামিধেন্যঃ (কো.ব্রা. ৩.২)]

ব্যাখ্যানঃ এর পরপরই বড় ছন্দের উৎপত্তি শুরু হয়। এই ধরনের সতেরো ছন্দরূপ প্রাণের উৎপত্তি হয়, যাদের সামিধেনী বলা হয়। আচার্য সায়ণ এবং ডঃ সুধাকর মালভীয়ের মতে সামিধেনী ঋচাগুলি মোট এগারোটি, যার মধ্যে প্রথম এবং শেষ ঋচা তিন-তিন বার পুনরাবৃত্ত হয় এবং দুইটি ঋচাকে চার্য সংজ্ঞক বলা হয়। আচার্য সামণ এবং ডঃ মালভীয় আধিয়াশিক অর্থে এই ঋচাগুলির উচ্চারণের কথা বলেছেন, তবে আমরা এই গ্রন্থের আধিদৈবিক অর্থ অনুযায়ী সৃষ্টিয়জ্ঞে সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা করছি।

এই ক্রমে বিশ্বামিত্র ঋষিরূপ প্রাণ দ্বারা উদ্ভূত অগ্নিদেবতা এবং নিবৃত্ত গায়ত্রী ছন্দের প্রাণ প্রবাহ—
“প্রো বজাঃ অভিভূত হবিশ্ণন্তো ঘৃতাচ্য। দেবাঞ্জিগাতি সুন্নয়ুঃ।।” (ঋ. ৩.২৭.১)

ঋচা উৎপত্তি পরা এবং পুনঃপশ্যন্তী বাক অবস্থায় ঘটে। বিশ্বামিত্র ঋষির অর্থ হলো বাক তত্ত্ব, অর্থাৎ দেবী গায়ত্রী ছন্দ ‘ওম’, কারণ “বাগ্‌ বৈ বিশ্বামিত্রঃ” (কৌ.ব্রা. ১০.৫)। এই ঋচা রূপী তরঙ্গের মাধ্যমে বিদ্যুতের সমৃদ্ধি ঘটে। ঋচা যে ছন্দের—নিবৃত্ত গায়ত্রী—তার তরঙ্গ বিদ্যুৎ, তেজ এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে পদার্থকে বাঁধতে এবং তার ছেদন করতে সক্ষম। (নিবৃত্ত = নি+বৃত্তি, হিংসা ও গ্রন্থনের অর্থ) গায়ত্রী ছন্দ সম্পর্কে পূর্বপীঠিকায় বিস্তারিত আলোচনা আছে।

এই ঋচার তিনবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এর পর বারহস্পতি বা ভরদ্বাজরূপ প্রাণ দ্বারা উদ্ভূত অগ্নিদেবতা এবং গায়ত্রী ছন্দের ঋচা—
“অন্ন আ ইয়াঁহি বীতায়েং গৃণানো হব্যদান্তয়ে। নিঃ হোতা সত্সি বিন্দিষি।।” (ঋ.৬.১৬.১০)

[বৃহস্পতি: = বৃহত্তা পালকঃ সূত্রাত্মা (ম.দ.য.ভা.৩৬.৬)। এখানে বৃহস্পতি অর্থ সূত্রাত্মা বায়ু। এই সূত্রাত্মা বায়ু থেকে প্রাণ নামক প্রাণ তত্ত্বরূপ ভরদ্বাজ ঋষির উৎপত্তি ঘটে। কোথাও-কোথাও মনসতত্ত্বকেও ভরদ্বাজ বলা হয়েছে। এই ভরদ্বাজ তত্ত্ব পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিভিন্ন পদার্থের সৃষ্টি করে। তাই বলা হয়েছে—
“বাজঃ অন্ননাম (নিয়ং.২.৭), বাজঃ বলনাম (নিয়ং.২.৮), মনো বৈ ভরদ্বাজ ঋষিঃ অন্ন বাজো যো বৈ মনো বিভর্তি সো ঋন্ন বাজ ভরতি তসমান্ মনো ভরদ্বাজ ঋষিঃ” (শ.৮.১.১.৬)]

এই সামিধেনী ঋচা মনসতত্ত্ব থেকে বিশেষ সমৃদ্ধ প্রাণ নামক প্রাণ তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত। এই ঋচার প্রভাবে বিদ্যুতের এবং উষ্ণতার বৃদ্ধি ঘটে। এর ছন্দ গায়ত্রী হওয়ায় তীব্র শক্তি ও তেজও বৃদ্ধি পায়।

এরপর উপরোক্ত ভরদ্বাজ বা বারহস্পতি ঋষির দ্বারা অগ্নিদেবতা এবং নিবৃত্ত গায়ত্রী ছন্দের সামিধেনী তম্বর ভরদ্বাজের ঘৃতের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়।
“বৃহচ্ছোঁচা বিবিষ্ট্য।।” (ঋ.৬.১৬.১১)

এর উৎপত্তি হয়। এর প্রভাবও পূর্বের ঋচার মতোই হয়। ছন্দ নিয়ুদ্ধ গায়ত্রী হওয়ায় এই ছন্দরূপী তরঙ্গগুলোর ভেদ করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। এর পরবর্তীতে একই ঋষি ও দেবতা-সম্পৃক্ত সাম্নী ঋষ্ঠুপ্‌ ছন্দস্ক—

स नं: पृथु श्रवाय्यमच्छा देव विवाससि। बृहदंग्ने सुवीर्यम् ।। (ঋ. ৬.১৬.১২)

এর উৎপত্তি হয়। যার প্রভাবে পূর্ববৎ ফলাফলের অতিরিক্ত বিশেষ সহিংস, ভেদনশীল ও সংधानক জ্বালার উৎপত্তি হয়। এরপর বিশ্বামিত্র ঋষি অর্থাৎ পূর্ববৎ বাক্‌তত্ত্ব (দেবী গায়ত্রী ছন্দ ‘ওঁ’) দ্বারা উৎপন্ন অগ্নিদেবতাক ও বিরাট্‌ গায়ত্রী ছন্দস্ক—

ईळेन्यों नमस्वस्तिरस्तमांसी दर्शतः । समग्निरिध्यते वृषा ।। (ঋ. ৩.২৭.১৩)

এর উৎপত্তি হয়। ঋষি ও দেবতার প্রভাব প্রথম সামিধেনী ঋচার মতোই বুঝতে হবে। এর ছান্দসিক প্রভাব প্রথম ঋচার ছান্দসিক প্রভাবের তুলনায় বিশেষ তেজস্বী ও সক্রিয় হয়। এরপর একই ঋষি ও দেবতা-সম্পৃক্ত এবং নিবৃত্‌ গায়ত্রী ছন্দস্ক দুই কথার উৎপত্তি হয়। এই দুই ঋচা হল—

वृषों अग्निः समिथ्यतेऽ श्वो न देववाहन: । ते हविष्मन्त ईळते।।
वृषण त्वा वरयं वृषन्वृषणः समिधीमहि। अग्ने दीघ्यंत बृहत्॥ (ঋ. ৩.২৭.১৪–১৫)

এদের প্রভাব প্রথম সামিধেনী ঋচার মতোই হয়। এরপর কান্য মেধাতিথি ঋষি থেকে উৎপন্ন অগ্নিদেবতাক এবং গায়ত্রী ছন্দস্ক—

अग्नि बूत वृणीमहे होतारं विश्ववेदसम्। अस्य यज्ञस्य सुक्रतुम् ।। (ঋ. ১.১২.১)

এর উৎপত্তি হয়। [कण्व इति मेथाविनाम (নিঘ. ৩.১৫)]। কাণ্ড মেধাতিথি এমন প্রাণের নাম, যা সকলের মধ্যে নিরন্তর ব্যাপ্ত থাকে এবং যেখানে বুদ্ধি, অহংকার নামক মহাপ্রাণ সুপ্রশস্তরূপে বিদ্যমান থাকে। আমাদের মতে এমন প্রাণ সূতরাত্মা বায়ু ও ধনঞ্জয়ের যুগপৎ রূপ হতে পারে। এই প্রाण থেকেই এই ঋচার উৎপত্তি হয়। এই ঋচার প্রভাবে বিদ্যুৎবল, আলো, উষ্ণতা প্রভৃতি সমৃদ্ধ হয়। এরপর বিশ্বামিত্র ঋষি অর্থাৎ বাক্‌তত্ত্ব (দেবী গায়ত্রী ছন্দ) থেকে অগ্নিদেবতাক এবং বিরাট্‌ গায়ত্রী ছন্দস্ক—

समिध्यमानो अध्यरेइंअग्निः पावक ईडयः। शोबिष्केशस्तमीमहै।। (ঋ. ৩.২৭.৪)

এর উৎপত্তি হয়। এর ঋষি ও দেবতার প্রভাব এবং ছান্দসিক প্রভাবে বিদ্যুৎবল, তেজ প্রভৃতি বিশেষভাবে উদ্ভাসিত হয়। এরপর বিশ্ববারাত্রেয়ী ঋষি থেকে উৎপন্ন অগ্নিদেবতাক এবং বিরাট্‌ গায়ত্রী ছন্দস্ক দুই ঋচার উৎপত্তি হয়। এই দুই ঋচা হল—

समिछो अन्न आहुत देवान्यंक्षि स्वच्चर। एवं हि हव्यवाळसिं।।
आ जुहोता दुवस्यताग्नि प्रयत्यध्वरे। वृणीश्व हव्यवाहनम्।। (ঋ. ৫.২৮.৫–৬)

[অত্রিঃ = সদা পুরুষার্থী (ম.দ.অ.ভা. ৫.৭.১০), সদা গামী (ম.দ.অ.ভা. ১.১৮৩.৫), বাক্‌ এবং অত্রিঃ (শ. ১৪.৫.২.৬)] (আত্রেয়ী – অগ্নির কন্যা বা পত্নী, ইতি আপ্টে কোষ)। আমাদের মতে ‘আত্রেয়ী’ শব্দে স্বার্থেই তদ্ধিত প্রত্যয় আছে, তাই অত্রিকেই আত্রেয়ী বলা হয়েছে। ‘বিশ্বওয়ারা’ বিশেষণ হওয়ায় এ যা বোঝায়, তা হল—এই ঋচা সকলের ভিতরে বিদ্যমান ‘ওঁ’ পদরূপী দেবী গায়ত্রী ছন্দ থেকে ব্যাপকভাবে উৎপন্ন হয়। এই ঋচাগুলোর প্রভাবে বিদ্যুৎ, উষ্ণতা, আলো এবং তীব্র বল অত্যন্ত দীপ্যমান হয়। এর পরবর্তীতে “আ জুহোতা” ঋচার আরও দু’বার আবৃত্তি হয়। আচার্য সায়ণ ঋ. ৩.২৭.৪ এবং ঋ. ৫.২৮.৫ ঋচাকে তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ–প্রমাণে ক্রমশঃ সমिध্যমানা ও সমিদ্ধতী বলেছেন। এর অর্থ আমাদের কাছে এভাবে প্রতীয়মান হয় যে ঋচা—

समिध्यमानो अश्वरेइंड्रग्निः पांवक ईड्यः। शोचिष्केशस्तमीमहे।। (ঋ. ৩.২৭.৪)

ঋচা—

समिद्दो अग्न आहुत देवान्यक्षि स्वध्पर। त्वं हि हव्यवाळसि ।। (ঋ. ৫.২৮.৫)

বিশেষভাবে প্রজ্বলিত করে। এই দুই ঋচারূপ তরঙ্গ তাদের মধ্যভাগে দুই ধার্যা-সংজ্ঞক ঋচারূপ তরঙ্গকে ধারণ করে থাকে। সেই ঋচাগুলি হল—বিশ্বামিত্র ঋষি অর্থাৎ দেবী গায়ত্রী ছন্দ ‘ওঁ’ রূপী চাকু থেকে উৎপন্ন অগ্নিদেবতাক এবং ক্রমশঃ বিরাট্‌ গায়ত্রী ও গায়ত্রী ছন্দস্ক—

पृथुपाजा अमत्यों पृतनिर्णिवस्वाहुतः । अग्निर्यज्ञस्य हव्यवाट् ॥ (ঋ. ৩.২৭.৫)
ते सबाथों यतमुंच इत्था धिया यत्तवन्त: । आ चंक्रुरग्निमूतयें ।। (ঋ. ৩.২৭.৬)

এদের প্রভাবেও পূর্ববৎ বিদ্যুৎ, উষ্ণতা ও আলোর প্রভৃতি সমৃদ্ধ হয়। এইভাবে মোট সতেরোটি ঋচা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে তরঙ্গরূপে ব্যাপ্ত হয়ে উষ্ণতা, বল, বিদ্যুৎ ও আলো প্রভৃতির বিরাট বৃদ্ধি ঘটায়। লক্ষণীয় যে আচার্য সায়ণ প্রমুখ বিদ্বজ্জনদের পরম্পরায় ভাষ্যকার বা অনুবাদকরা যজ্ঞে এই সতেরোটি ঋচার পাঠেরই বিধান মাত্র করেছেন। এই পাঠ কেন হয়? এর সঙ্গে সৃষ্টিবিজ্ঞানের কী সম্পর্ক? ব্রহ্মাণ্ডে এই ছন্দরূপী তরঙ্গগুলির উৎপত্তি হয় এবং তাদের যে-যে প্রভাব হয়, তার সামান্য ইঙ্গিতমাত্রও আচার্য সায়ণ প্রমুখের জানা ছিল না; অর্থাৎ বৈদিক বাঙ্গময়ের আধিদৈবিক জ্ঞান থেকে এঁরা সম্পূর্ণরূপে অনবহিত ছিলেন। পুনরায়, এই সামিধেনী ঋচাগুলি কোনগুলো এবং এ-জাতীয় অন্যান্য জ্ঞান আমরা আচার্য সায়ণ প্রমুখের গ্রন্থ থেকেই পেতে পারি। এই কারণে আমরা তাঁদের ঋণীও। এই বিষয়ে অন্য ঋষিদেরও বক্তব্য আছে—

“পঞ্চদশ সপ্তবশ वा সামিধেন্যঃ” (আপ.শ্রৌ. ১০.৪.৫)

প্রশ্নঃ— আপনি বিভিন্ন ছন্দ ও দেবতাদের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় হওয়া প্রভাব এখানে বিস্তারে প্রদর্শন করেছেন, কিন্তু একই ছন্দের বহু মন্ত্র থাকে। তাহলে কি তাদের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে একই হয়? যদি এমন হয়, তাহলে সমান ছন্দ-বিশিষ্ট বহু ঋচার উৎপত্তির প্রয়োজন কী? ঋচা থেকে জ্ঞানলাভের জন্য তো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ, পদ ইত্যাদিযুক্ত একই ছন্দের ঋচাগুলোর প্রয়োজন বোঝা যায়, কারণ তাদের অর্থও ভিন্ন ভিন্ন হয়। কিন্তু যখন একই ছন্দের ঋচাগুলো একইভাবে উষ্ণতা, বল ও আলো ইত্যাদিরই বৃদ্ধি করে, তখন এই কাজ তো একই ঋচার বারবার আবৃত্তিতেই হতে পারে। তাহলে পৃথক পৃথক ঋচার উদ্দেশ্য কী? হ্যাঁ, ভিন্ন ছন্দের ঋচাগুলোর উৎপত্তি তো বোঝা যায়।

উত্তরঃ— আপনার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক। বাস্তবে একই ছন্দ-বিশিষ্ট ঋচাগুলোর প্রভাব একেবারে সম্পূর্ণ একরকম হয় না। সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় শুধু ছন্দেরই প্রভাব হয় না, বরং তার পদ ও বর্ণগুলোরও প্রভাব ঘটে। যে পদ যে অর্থের বাচক, সেই পদার্থের ওপর সেই পদের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে এবং সেই পদার্থের সৃষ্টি কালে সেই পদটিরও উৎপত্তি ঘটে। এইভাবে বৈদিক শব্দের অর্থ, অর্থাৎ বাচক ও বাচ্যের সম্পর্ক নিত্য—এই বিষয়টি পূর্বপীঠিকায় বিস্তারে জানা যেতে পারে।

এখন এই সামিধেনী ছন্দ-রশ্মিগুলোর অন্যান্য বিশেষ প্রভাব পৃথকভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে—

প্রথম রশ্মির প্রভাবে চারদিক থেকে আলোকিত নানাবিধ সংযোজ্য কণা বা তরঙ্গ-যুক্ত প্রাণ বা ছন্দ-রশ্মিগুলো প্রজ্বলিত তেজসহ বিভিন্ন আলোকিত কণাকেও গতি প্রদান করে। (জিগাতি গতিকর্মা (নিঘ. ২.১৪)) দ্বিতীয় রশ্মির প্রভাব থেকে (ভিঃ অন্তরিক্শনাম (নিঘং. ১.৩), উদকনাম (নিঘং. ১.১২), পরবো বৈ বর্হিঃ (ঐ. ২.৪)) প্রাণাপানাদি পদার্থ অগ্নিকে আলোকিত করতে করতে অন্তরিক্শে বিদ্যমান বিভিন্ন মরুদ-রূপ রশ্মির ব্যাপ্তির জন্য এবং বিভিন্ন কণার সংযোগাদি কর্মকে বিস্তৃত করার জন্য চারদিক থেকে ব্যাপ্ত হয়।

তৃতীয় রশ্মির প্রভাব থেকে সংযোগ-বিয়োগ করানোরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সূত্ৰাত্মা বায়ু বিভিন্ন প্রদীপ্ত তেজস্বী কিরণ দ্বারা [শোচতি জ্বলতিকর্মা (নিঘং. ১.১৬)] ব্যাপক উষ্মা উৎপন্ন করে সংগতি-কর্ম বৃদ্ধি করে।

চতুর্থ রশ্মির প্রভাব থেকে {বিবাসতি পরিচরণকর্মা (নিঘং. ৩.৫)} আলোকিত এবং কোমল অগ্নি বিশাল তারাদের ভেতরে শ্রেষ্ঠ বল ও তেজসহ সর্বদিকে সঞ্চরণ করে।

পঞ্চমী রশ্মির প্রভাব থেকে {পিতরো নমস্যাঃ (শ্র. ১.৫.২.৩)} সবার পালনকারী, মনোরম, বলবান এবং আলোকিত অগ্নি বিভিন্ন অন্ধকারপূর্ণ বায়ু ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু আলোকিত করে।

ষষ্ঠ রশ্মির প্রভাব থেকে বিভিন্ন আলোকিত কণাকে বহনকারী অগ্নি দ্রুতগামী বলবান রশ্মির মত আলোকিত হয়। তাকে বিভিন্ন মাস-রশ্মি-যুক্ত পদার্থ আলোকিত করে। [মাসা হ্বীপি (শ. ১৯.২.৭.৩), মাসা বে রশ্ময়ঃ (তা. ১৪.১২.৯)]

সপ্তম রশ্মির প্রভাব থেকে মহান বল-যুক্ত অগ্নি বিশাল অন্তরিক্শকে আলোকিত করে সবাইকে বলবান ও আলোকিত করে তোলে।

অষ্টম রশ্মির প্রভাব থেকে সেই অগ্নি বিভিন্ন কণার আদান-প্রদানকারী, বিভিন্ন পদার্থকে বহনকারী, সকল পদার্থে বিদ্যমান বিভিন্ন সংগমন-কর্মকে সিদ্ধ করে।

নবমী রশ্মির প্রভাব থেকে সেই অগ্নি বিভিন্ন প্রাণে আলোকিত হতে থাকে, তেজস্বী কিরণ-যুক্ত, সব পদার্থকে শুদ্ধকারী এবং সবার সঙ্গে সংগতি-সম্পন্ন হয়।

দশম রশ্মির প্রভাব থেকে সেই অগ্নি উত্তমভাবে অহিংসক প্রাণ-যুক্ত হয়ে চারদিক থেকে প্রজ্বলিত, বিভিন্ন পদার্থের বাহক হয়ে সবার সঙ্গে সংগতি-সম্পন্ন হয়।

একাদশ রশ্মির প্রভাব থেকে সেই অগ্নি বিভিন্ন প্রকারের সংগতি-কর্মে বিভিন্ন কণাকে নিয়ে যাওয়া, তাদের উত্তমভাবে গ্রহণ করে চারদিকে সঞ্চরণ করে।

দ্বাদশী (ধার্যা) ঋচা-র প্রভাব থেকে বিস্তৃত বল-যুক্ত অন্তরিক্শ ও তেজকে শুদ্ধকারী, উপরের উল্লিখিত ছন্দ-রশ্মিকে ধারণকারী অবিনশ্বর অগ্নিতত্ত্ব চারদিকে উত্তমভাবে সংগতি-সম্পন্ন হয়।

ত্রয়োদশী (বায়্যা) ঋচা-র প্রভাব থেকে সেই অগ্নি, যা বিভিন্ন ক্রিয়াশীল এবং সংযমিত তেজস্বী কিরণ ও বাক-রূপ যজ্ঞের সাথে যুক্ত, বিভিন্ন ক্রিয়ার রক্ষা-কাজের জন্য নিজের ধারণ-শক্তির দ্বারা উল্লিখিত এগারো রশ্মিকে ধারণ করে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— এরপর এই ব্রহ্মাণ্ডে ১৩ প্রকারের বিশেষ ছন্দরূপ তরঙ্গের উৎপত্তি হয়। এর মধ্যে দুইটি তরঙ্গ একই স্থানে তিন-তিনবার উৎপন্ন হওয়ায় মোট সতেরো (১৭) প্রকারের তরঙ্গ বলা হয়। যদিও সব তরঙ্গ সমগ্র পদার্থে বারবার আবর্তিত হয়, তথাপি ঐ দুই তরঙ্গ একই স্থানে তিন-তিনবার আবর্তিত হয়। এই তরঙ্গগুলির প্রভাবে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে জ্বলনশীলতা, আলোকসঞ্জ্ঞীলতা, বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল এবং এর ফলে বিভিন্ন প্রকারের কণা বা তরঙ্গের সৃষ্টি-ইত্যাদি ক্রিয়ার বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে বিভিন্ন মরুদ-রূপ রশ্মির ব্যাপ্তি ও আলোকিত অগ্নির সর্বত্র সঞ্চরণ হয়। অন্ধকারপূর্ণ বাধক বিদ্যুত্-বায়ু নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বিভিন্ন পদার্থের শোধন ঘটে। এর বিস্তার জানার জন্য আমাদের ব্যাখ্যান ও পূর্বপীঠিকা পড়া অপরিহার্য।

১১. সপ্তদশো বৈ প্রজাপতিঃ দ্বাদশ মাসাঃ পঞ্চ ঋতবো হেমন্ত শিশিরয়োঃ সমানেন তাবান্ সংবৎসরঃ। সংবৎসরঃ প্রজাপতিঃ।।
ব্যাখ্যানम्— এই ব্রহ্মাণ্ডে সতেরো মূল প্রজাপতি আছেন, যারা সমগ্র সৃষ্টির প্রত্যেক কণার পালন ও রক্ষণ নিয়ত করেন। এতে আমরা সর্ববৃহৎ প্রজাপতি পরমাত্মতত্ত্বের গণনা করছি না, কারণ তিনি সৃষ্টির উপাদান-কারণ নন, বরং নিমিত্ত-কারণ। এই সতেরো প্রজাপতি হলেন— মূল প্রকৃতি, কাল, মহত্তত্ত্ব (বুদ্ধি), মনস্তত্ত্ব, অহংকার, বাক্-তত্ত্ব, সূত্ৰাত্মা বায়ু, ধনঞ্জয়, প্রাণ, আপান, ব্যান, উদান, সমান, নাগ, কূর্ম, ঋক্কল, দেবদত্ত। এদের মধ্যে বুদ্ধি, মন ও অহংকার প্রায় একই; তবু ব্যবহারের সামান্য প্রভেদের কারণে আমরা এগুলিকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছি। এর মধ্যে মনকে মহৎ অর্থাৎ বুদ্ধিতে সমাবেশ করলে দুইয়ের পূর্তির জন্য পুরুষ-তত্ত্ব অর্থাৎ পরমাত্মা ও জীবাত্মাকে গ্রহণ করা সমীচীন। সংবৎসর অর্থাৎ সূর্যাদি তারা-ও বারো মাস-নামক প্রাণ-রশ্মি এবং পাঁচ ঋতু-সংজ্ঞক রশ্মি দ্বারা নির্মিত হয়। অন্যদিকে এটিও ধ্যানযোগ্য যে মূল সূক্ষ্ম সতেরো প্রজাপতিও সূর্যাদি তারায় বিদ্যমান অথবা এই মূল প্রজাপতিদের দ্বারাই এই মাস-ও ঋতু-সংজ্ঞক প্রজাপতিদের উৎপত্তি ঘটে। এই কারণেই সূর্যাদি তারাকে প্রজাপতি বলা হয়। হেমন্ত ও শিশারি-নামক প্রাণে অনেক সাদৃশ্য থাকার ফলে এখানে এদের এক বলে গণনা করা হয়েছে। এই মাস, ঋতু ও অন্যান্য প্রজাপতির বিষয়ে বিস্তার জানতে পূর্বপীঠিকা দেখুন।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— সৃষ্টির সূচনা থেকে সতেরো সূক্ষ্ম তত্ত্ব— মূল প্রকৃতি, কালতত্ত্ব, মহত্তত্ত্ব (বুদ্ধি), মনস্তত্ত্ব, অহংকার, বাক্-তত্ত্ব, সূত্ৰাত্মা বায়ু, ধনঞ্জয়, প্রাণ, আপান, ব্যান, উদান, সমান, নাগ, কূর্ম, ঋক্কল, দেবদত্ত— বিভিন্নভাবে মিশ্রিত হয়ে বিভিন্ন কণা ও তরঙ্গের সৃষ্টি এবং তাদের রক্ষণ-পোষণ করে। এদের থেকেই উৎপন্ন বারো প্রকার মাস-নামক রশ্মি এবং পাঁচ প্রকার ঋতু-রূপ প্রাণ-রশ্মি সূর্যাদি তারাকে উৎপন্ন করে তাদের রক্ষণ ও পোষণ করে। সূর্যাদি তারা এদের কারণেই তাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার তত্ত্বের নির্মাণ ও পোষণ করে। এই তত্ত্বগুলির বৈজ্ঞানিক স্বরূপ গভীরভাবে বোঝার জন্য পূর্বপীঠিকার গভীর অধ্যয়ন অপরিহার্য।

১২. প্রজাপত্যায়তনাভিরেবাऽऽভী রাধ্যোতি য এৱং বেদ।।১।।
ব্যাখ্যানम्— উপরিবর্ণিত প্রকৃতি, মহৎ আদিসতেরো প্রজাতি এবং মাস ও ঋতু-সংজ্ঞক সতেরো প্রাণ-রশ্মিরূপ প্রজাপতিদের আয়তন অর্থাৎ যে পদার্থে এরা বিরাজমান থাকে, সেই পূর্বোক্ত সতেরো সামিধেনী নামক প্রজ্বলনশীল ঋচা অথবা সূর্যাদি তারারূপ প্রজাপতিদের দ্বারা এই সর্গযজ্ঞ সমৃদ্ধ হয়, যখন এই সমৃদ্ধ সতেরো প্রজাপতি উপরে বর্ণিত অনুযায়ী অবস্থা লাভ করে। এখানে ‘রাধু সংসিদ্ধী’ ধাতুর প্রয়োগ জানাচ্ছে যে, এই প্রজাপতি এবং এদের দ্বারা বা এদের সঙ্গে সত্রষ্ট সামিধেনী তরঙ্গের সক্রিয় অবস্থা উৎপন্ন হলে এই তারা-প্রভৃতি লোক সমৃদ্ধ হয় অথবা ব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টিযজ্ঞের যথাযথ বিস্তার ঘটে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— উপরে বর্ণিত বিভিন্ন প্রাণসমষ্টি যখন সুসংবিপ্ত ও সক্রিয় হয়ে যায়, তখন সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থায় যেমন সব তত্ত্ব দ্রুত সংগতি ও নির্মাণ লাভ করে এবং উষ্মা ও বলের প্রখরতার কারণে সেই গতি আসে, তেমনি সূর্যাদি তারার নির্মাণকালে ও বর্তমান কালে এই তত্ত্বগুলির সক্রিয় থাকাই তারাদের সেই রূপ-সংশিদ্ধি ও স্থায়িত্বের কারণ।

খণ্ড ১.২ উপর আমার ব্যাখ্যান

১. যজ্ঞো দেবেভ্য উদক্রামত্ তমিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছন্যদিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছস্তদিষ্টীনামিষ্টিত্বং তমন্ববিন্দনূ।।
ব্যাখ্যানম্— পূর্বে বর্ণিত সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় যখন সতেরো সামিধেনী তরঙ্গের দ্বারা প্রাণাদি পদার্থে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হচ্ছিল, তখন ভেদনক্রিয়া প্রবল ছিল; কিন্তু বিভিন্ন পদার্থের সংযোগের প্রক্রিয়া হয় মন্থর ছিল বা কোথাও কোথাও বন্ধ হচ্ছিল। এই কারণেই বলা হয়েছে যে দেব্য পদার্থ থেকে যজ্ঞ-প্রক্রিয়া দূরে সরে গেল। এমন প্রতীয়মান হয় যে অতিরিক্ত উষ্মাবৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন কণার গতিজ শক্তি অত্যধিক বেড়ে গিয়েছিল, যার কারণে তারা পরস্পর যুক্ত হতে অসমর্থ হচ্ছিল। আমাদের মতে এটাও একটি কারণ হতে পারে যে, বিদ্যুৎ প্রথমে একপ্রকারই ছিল; ধন ও ঋণ—এই দুই বিভাগ তখনও পৃথক হয়নি। এই কারণেও বিভিন্ন কণার মধ্যে প্রবল আকর্ষণবল সৃষ্টি হয়নি। তার পরে তখন বিদ্যমান প্রাণাদি পদার্থের মধ্যে বিরাজমান অগ্নি ও সোম-পদার্থ অর্থাৎ তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ এবং শীতল দেব্য বায়ুর মধ্যে বিদ্যুতের দুই অংশ প্রকাশিত হয়। খ্যাত আর্য বিদ্বান পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ‘বেদ বিদ্যা নির্দশন’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় পৃষ্ঠা ১৪-তে ধনাবেশকে আগ্নেয় তত্ত্ব এবং ঋণাবেশকে আপ (সোম) তত্ত্ব হিসেবে মান্য করেছেন। এই বিষয়টি বিশেষ অনুসন্ধানের যে, ধনাবেশিত কণার থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ কি গতি, আলো, উষ্মা ও বল ইত্যাদি বিশেষভাবে সৃষ্টি করে এবং ঋণাত্মক আবেশযুক্ত কণার থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ অপেক্ষাকৃত শীতল, স্বল্প আলোক-যুক্ত ও শান্ত হয় কি না। আমরা পণ্ডিতজির মতের সাথে সহমত। এখন এই ধন ও ঋণ-আবেশযুক্ত অসংখ্য কণার মধ্যে প্রবল আকর্ষণবল উৎপন্ন হল। এই প্রবল আকর্ষণবলরূপ দৃষ্টির দ্বারা দেব অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণ বিভিন্ন কণাকে পরস্পর যুক্ত করার চেষ্টা করল এবং সংযোগের প্রবল প্রক্রিয়া আরম্ভও হয়ে গেল।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— পূর্বোক্ত তীব্র সংত্তপ্ত অবস্থায় সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে আকর্ষণবলের শক্তি হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছিল। তখন বিদ্যুৎও ধনাত্মক ও ঋণাত্মক রূপে বিভক্ত ছিল না। এই কারণেও বিভিন্ন কণার সংযোগ-প্রক্রিয়া মন্থর বা বন্ধ ছিল। তখন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ এবং শীতল সূক্ষ্ম বায়ুর দ্বারা বিদ্যুৎ ক্রমশ ধন ও ঋণরূপে প্রকাশিত হয়, যাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সূক্ষ্ম কণা প্রবল আকর্ষণবলযুক্ত হয়ে দ্রুত যুক্ত হতে শুরু করে। এখানে কোয়ান্টার উৎপত্তির পর সেগুলি থেকেই তড়িৎ-আবেশিত কণার নির্মাণের ইঙ্গিত করা হয়েছে।

২. অনুবিত্তযজ্ঞো রাঘ্নোতি য এৱং বেদ।।
ব্যাখ্যানম্— যখন ব্রহ্মাণ্ডে এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন সর্বত্র সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হতে থাকে।

৩. আহূতযো বৈ নামৈতা যদাহুতে এতাভিভৈং দেবান্ যজমানোં হ্যতি তদাহূতীনামাহূতিত্বম্।।
ব্যাখ্যানম্— এখানে ‘আহূতিঃ’ এবং ‘আহুতিঃ’—এই দুই শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। ‘আকূতিঃ’ শব্দ “হেগূ স্পর্ধায়াম্ শব্দে চ” ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ চারদিক থেকে ডাকা, আকর্ষণ করা ইত্যাদি ক্রিয়া। অন্যদিকে ‘আহুতিঃ’ শব্দ “হু বানাবনয়োঃ। আৱানে চিত্যেকে।” ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ গ্রহণ করা ও প্রদান করার তীব্র ক্রিয়া। এখন লক্ষ্যণীয় যে যত বেশি আকর্ষণবল প্রবল হবে, ততই সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়া তীব্র হবে। এই কারণে এখানে আহূতি-কেই আহুতি বলা হয়েছে, কারণ যজমান অর্থাৎ সংযোগের ইচ্ছাশালী যে কোনো কণাই বিভিন্ন দেব অর্থাৎ প্রাণ বা যে কোনো আলোকিত বা বলসম্পন্ন পদার্থকে এই আকর্ষণবলরূপ আহূতির দ্বারা আকর্ষণ করে। এই কারণেও এদের আহুতি বলা হয়। বর্তমান বিজ্ঞান বলের উৎপত্তির কারণ মেডিয়েটর ফোটন-এর বিনিময়কে মানে। এই ফোটনের ধারা কে বিজ্ঞানীরা field বলেন। এখানেও এমনই প্রতীয়মান হয় যে ফোটনের আহুতির কারণ ফোটনকে গ্রহণ ও প্রদান করার ইচ্ছা। সেই ইচ্ছা থেকেই দৃষ্টি সম্ভব হয়, যা সংযোগাদি-র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

১২. प्रजापत्यायतनाभिरेवाऽऽभी राध्योति य एवं वेद ।।१।।
প্রজাপত্যায়তনাভিরেবাাভী রাধ্যোতি য এৱং বেদ।। ১।।

ব্যাখ্যানम् — উপরে বর্ণিত প্রকৃতি, মহৎ প্রভৃতি সতেরো প্রজাতি এবং মাস ও ঋতু-সংজ্ঞক সতেরো প্রাণ-রশ্মিরূপ প্রজাপতিদের আয়তন অর্থাৎ যে পদার্থে এ সকল পদার্থ বিদ্যমান থাকে, সেগুলি পূর্ববর্ণিত সতেরো সামিধেনী নামক প্রজ্বলনশীল ঋচা অথবা সূর্যাদি তারারূপ প্রজাপতিদের দ্বারা এই সৃষ্টিযজ্ঞ সমৃদ্ধ হয়, যখন এই সমৃদ্ধ সতেরো প্রজাপতি পূর্ববর্ণিত অবস্থাকে লাভ করে। এখানে ‘রাধু’ ‘সংশিদ্ধি’ ধাতুর প্রয়োগ জানাচ্ছে যে এইসব প্রজাপতিদের এবং এদের দ্বারা বা এদের সঙ্গে যুক্ত সতেরো সামিধেনী তরঙ্গের সক্রিয় অবস্থা উৎপন্ন হলে এই তারাদি লোক সমৃদ্ধ হয় অথবা ব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টিযজ্ঞের যথোচিত বিস্তার ঘটে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার — পূর্ববর্ণিত বিভিন্ন প্রাণসমূহ সুপ্রকারে পরিব্যাপ্ত ও সক্রিয় হয়ে গেলে, যেখানে সৃষ্টির প্রারম্ভিক অবস্থায় সকল তত্ত্ব দ্রুত সংগঠিত ও নির্মিত হয়, তাপ ও বলের প্রখরতা থেকেই সেই গতি আসে, তেমনই সূর্যাদি তারার নির্মাণকালে এবং বর্তমান সময়েও এ সকল তত্ত্ব সক্রিয় থাকলেই তারাদের এই রূপ সিদ্ধ হয় এবং তাদের স্থায়িত্ব থাকে।

খণ্ড ১.২ এর ওপর আমার ব্য়াখ্য়ান্ 

১.যজ্ঞো দেৱেভ্য উদক্রামত্ তমিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছন্যদিষ্টিভিঃ প্রেষমৈচ্ছস্তদিষ্টীনামিষ্টিত্বং তমন্ৱৱিন্দনু।।

ব্যাখ্যানম্— পূর্বে বর্ণিত সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় যখন সতেরো সামিধেনী তরঙ্গ দ্বারা প্রাণাদি পদার্থে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ ঘটছিল, তখন ভেদনক্রিয়া প্রবল ছিল; কিন্তু বিভিন্ন পদার্থের সংযোগ-প্রক্রিয়া ধীর ছিল বা কোথাও কোথাও বন্ধ হচ্ছিল। তাই বলা হয়েছে যে দেব্য পদার্থ থেকে যজ্ঞ-প্রক্রিয়া দূরে সরে গিয়েছিল। মনে হয় তাপমাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন কণার গতিজ শক্তি অত্যন্ত বেড়ে যায়, যার ফলে তারা পরস্পর যুক্ত হতে অসমর্থ হয়ে পড়ে। আমাদের মতে এ-ও একটি কারণ হতে পারে যে বিদ্যুৎ প্রথমে একটিই ছিল, ধন ও ঋণ এই দুই বিভাগ তখনও হয়নি, এই কারণেও বিভিন্ন কণার মধ্যে প্রবল আকর্ষণবল উৎপন্ন হয়নি। পরে সেই সময়ে বর্তমান প্রাণাদি পদার্থের মধ্যে বিরাজমান অগ্নি ও সোম পদার্থ অর্থাৎ তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ এবং শীতল দিব্য বায়ুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুতের দুই রূপ ধন ও ঋণের উদ্ভব ঘটে। প্রখ্যাত আর্য বিদ্বান পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ‘বেদ বিদ্যা নিদর্শন’ গ্রন্থের ভূমিকায় পৃষ্ঠা ১৪-তে ধনাবেশকে আগ্নেয় তত্ত্ব এবং ঋণাবেশকে আপ (সোম) তত্ত্ব বলেছেন। অনুসন্ধানের বিষয় এটি ধনাবেশিত কণার থেকে নির্গত তরঙ্গ কি গতি, আলো, তাপ ও বল বিশেষভাবে উৎপন্ন করে এবং ঋণাবেশিত কণার থেকে নির্গত তরঙ্গ তুলনামূলক শীতল, স্বল্প আলোকসম্পন্ন ও শান্ত হয় কি না। আমরা পণ্ডিতজীর মতের সঙ্গে একমত। এখন এই ধন ও ঋণাবেশযুক্ত অসংখ্য কণার মধ্যে প্রবল আকর্ষণবল উৎপন্ন হলো। এই প্রবল আকর্ষণবলরূপ দৃষ্টির দ্বারা দেবা অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণ বিভিন্ন কণাকে পরস্পর যুক্ত করতে উদ্যোগী হলো এবং সংযোগ-প্রক্রিয়া প্রবলভাবে শুরু হয়ে গেল।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্য়সার — পূর্বে বর্ণিত তীব্র তপ্ত অবস্থায় সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে আকর্ষণবল দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন বিদ্যুৎও ধনাত্মক ও ঋণাত্মক রূপে বিভক্ত ছিল না। এই কারণেও বিভিন্ন কণার সংযোগ-প্রক্রিয়া ধীর বা বন্ধ হয়েছিল। তখন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ও শীতল সূক্ষ্ম বায়ুর দ্বারা বিদ্যুতের ধন ও ঋণ রূপ প্রকাশিত হয়। এতে যুক্ত হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সূক্ষ্ম কণাগুলি প্রবল আকর্ষণবল লাভ করে দ্রুত যুক্ত হতে থাকে। এখানে কোয়ান্টার উৎপত্তির পর সেখান থেকে তড়িৎ-আবেশিত কণার সৃষ্টি নির্দেশিত হয়েছে।

২. अनुवित्तयज्ञो राघ्नोति य एवं वेद।।
অনুবিত্তযজ্ঞো রাঘ্নোতি য এৱং বেদ।।

ব্যাখ্য়ানম্ — যখন ব্রহ্মাণ্ডে এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন সর্বত্র সংযোগ–বিয়োগের প্রক্রিয়া সমৃদ্ধ হতে থাকে।

৩. आहूतयो वै नामैता यदाहुतय एताभिवैं देवान् यजमानों ह्यति तदाहुतीनामाहूतित्त्वम्।।
আহূতযো বৈ নামৈতা যদাহুতয় এতাভিৱৈং দেৱান্ যজমানোং হ্যতি তদাহুতীনামাহূতিত্ত্বম্।।

ব্য়াখ্যানম্ — এখানে ‘আহূতিঃ’ এবং ‘আহুতিঃ’ — দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আকূতিঃ’ শব্দ “হেগূ স্পর্দ্ধায়াম্ শব্দে চ” ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়, যার অর্থ চারদিক থেকে ডাকা, আকর্ষণ করা ইত্যাদি ক্রিয়া। অন্যদিকে ‘আহুতিঃ’ শব্দ “হু বানোবনয়োঃ। আৱানে চেত্যে কে।” ধাতু থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ গ্রহণ ও দানের তীব্র ক্রিয়া। এখন লক্ষ্যণীয় — যত আকর্ষণবল প্রবল হবে, ততই সংযোগ–বিয়োগের প্রক্রিয়া ত্বরিত হবে। তাই এখানে আহূতিকেই আहुতি বলা হয়েছে, কারণ যজমান অর্থাৎ সংযোগ কামনা করা যে কোনো কণাই বিভিন্ন দেব অর্থাৎ প্রাণকে বা কোনো আলোকিত বা বল-সম্পন্ন পদার্থকে এই আকর্ষণবলরূপ আহূতির মাধ্যমে আকর্ষণ করে। এ কারণেই এগুলিকে আहुতি বলা হয়। বর্তমান বিজ্ঞান বলের উৎপত্তির কারণ হিসেবে মধ্যস্থ ফোটনের বিনিময়কে মানে। এই ফোটনের ধারা বিজ্ঞানীরা ‘field’ বলেন। এখানেও প্রতীয়মান হয় যে ফোটনের আহূতির কারণ — ফোটন গ্রহণ ও প্রদানের কামনা। সেই কামনা থেকেই দৃষ্টি সম্ভব হয়, যা সংযোগ ইত্যাদির কারণ। এখন ফোটন গ্রহণ বা প্রদানের কামনা কেন হয় — তা সামনে স্পষ্ট করা হচ্ছে।

চিত্র ১.৬ — ধন এবং ঋণ আবেশিত কণার মধ্যে আকর্ষণ প্রক্রিয়া

আমাদের মতে ধনাবেশিত কণায় অগ্নি-তত্ত্ব প্রধান এবং ঋণাবেশিত কণায় সোম-তত্ত্ব প্রধান। সোম-তত্ত্ব শীতল সূক্ষ্ম প্রাণ বা ‘মরুৎ’ নামক পবনের রূপ। এই সোম-তত্ত্ব আকাশ-মহাভূতকে নিজের সঙ্গে আকর্ষণ করে রাখে। তাই বেদে বলা হয়েছে —“सोमः अन्तरिक्षं दाधार” সোমঃ অন্তরিক্ষ দাধার” মহর্ষি দয়ানন্দ ঋকভাষ্যে ৬.৭২.৩-এ ‘সোম’-এর অর্থ ‘মরুত’ করেছেন এবং একই বেদের ৩.৩৩.১২-র ভাষ্যে ‘শান্ত-গুণ-যুক্ত’ অর্থ করেছেন, আবার ঋ. ৬.৭২.২-এর ভাষ্যে ‘বিদ্যুৎ’ অর্থও করেছেন। তাই সোম পদার্থ এবং এর প্রধানতা-যুক্ত ঋণাবেশিত কণা তার সূক্ষ্ম মরুত-রশ্মি দ্বারা আকাশ-তত্ত্বকে আকর্ষণ করে ধারণ করে। অন্যদিকে আকাশ-তত্ত্ব অর্থাৎ অন্তরীক্ষ অগ্নি-তত্ত্বকে ধারণ করে — তাই বলা হয়েছে: “अन्तरिक्षमाग्नीध्रम्‌” (तै. ब्रा.२.१.५.१.), “अन्तरिक्षं वा इआग्नीध्रम्‌” (श.६.२.३-१५)।

অন্তরিক্ষমাগ্নীধম্
এবং
অন্তরিক্ষ বা আগ্নীধ্রম্

এভাবে ঋণাবেশিত ও ধনাবেশিত কণা পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এদের সবকিছুকে সূত্রাত্মা বায়ু একত্রে বেঁধে রাখে এবং কারণ অগ্নি-তত্ত্ব-প্রধান অর্থাৎ ধনাবেশিত কণা প্রাণাদি পদার্থের সংপীড়ন থেকেই উৎপন্ন হয়, তাই তাতে প্রাণ-তত্ত্বের ঘনত্ব ও বলশীলতা বেশি থাকে। এ কারণে এখানে প্রাণতত্ত্বের কিছু অংশ ধনঞ্জয় প্রাণের সঙ্গে আকাশ-তত্ত্বে নিক্ষিপ্ত হয়। এই প্রাণ সোম-তত্ত্ব-প্রধান, যেখানে প্রাণতত্ত্ব তুলনামূলকভাবে বিরল— সেই ঋণাবেশিত কণা স্বভাবতই তা শোষণ করে। তাই বলা হয়েছে—

“मिथुनं वा अग्निश्च सोमश्च, सोमो रेतोधा अग्निः प्रजनयिता” (काठ .८. १७; क.७.६) एवं “योषा वा5आपो वृषाउंग्निः” (श.१.१.१.१८; २.१.१.४)। 

মিথুনং বা অগ্নিশ্চ সোমশ্চ, সোমো রেতোথা অগ্নিঃ প্রজনয়িতা” এবং যোষা ৱাডায়ো তৃষা অগ্নিঃ” বর্তমান বিজ্ঞান ‘virtual photon’ মেনে নেয় — আসলে তা ধনঞ্জয় প্রাণের সঙ্গে যুক্ত প্রাণের ‘রেত’ অর্থাৎ সারাংশ, যা ধনাবেশিত কণার থেকে নির্গত হয় এবং অন্তরীক্ষ ধারণকারী ঋণাবেশিত কণার থেকে নির্গত মরুত অর্থাৎ সূক্ষ্ম পবনের ক্রিয়া; অথবা এই বিনিময়ের সঙ্গে অন্তরীক্ষস্থ সূক্ষ্ম প্রাণ মিলিত হয়ে বর্তমান বিজ্ঞানের ভাষায় virtual photon-এর সৃষ্টি করে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্য়সার — ধনাবেশিত ও ঋণাবেশিত কণার মধ্যকার আকর্ষণের জন্য বর্তমান বিজ্ঞান যে virtual photon-এর বিনিময়কে দায়ী করে, সেই ফোটনের প্রবাহ ও উৎপত্তি বর্তমান বিজ্ঞান জগতে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। বলের উৎপত্তি আগে, না ফোটনের প্রবাহ আগে — এ প্রশ্নের উত্তরও নেই। যদি বল আগে হয়, তবে বলের উৎপত্তি কেন? যদি ফোটনপ্রবাহ আগে হয়, তবে প্রবাহের সূচনা কেন? এই সকল অজবাব প্রশ্নের উত্তর এখানে দেওয়া হয়েছে; ব্যাখ্যায় সহজে বোঝা যায়। আকর্ষণ-প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী Richard P. Feynman তাঁর Lectures on Physics গ্রন্থে লিখেছেন—

"The existence of the positive charge, in some sense distorts or creates a 'condition' in space, so that when we put the negative charge in it feels a force. This potentiality of producing a force is called an electric field."

এ কথনও সামান্য ভিন্নতার সঙ্গে বৈদিক মতেরই অনুসরণ, তবে বৈদিক মত তুলনায় আরও গভীর ও স্পষ্ট। প্রসঙ্গত বিকর্ষণ বল নিয়েও আলোচনা করা হলো।

চিত্র ১.৭

উভয় পাশে ধনাবেশিত কণা অর্থাৎ আগ্নেয় তত্ত্ব উপস্থিত থাকে, যা যদিও সূত্রাত্মা বায়ুর দুর্বল বন্ধনে আবদ্ধ, তবুও উভয় কণার মধ্য থেকে ধনঞ্জয় প্রাণের সাথে অন্যান্য প্রাণতত্ত্বর সারাংশ নির্গত হয়। তা পরস্পর সংঘর্ষে ফিরে গিয়ে ঘুরে আসে, ফলে দুটি কণার মধ্যে আকর্ষণ না হয়ে বিকর্ষণ বল কার্যকর হয়।
চিত্র ১.৮

চিত্র ১.৮ উভয় ঋণাবেশিত কণা অর্থাৎ আপ্য (সোম) তত্ত্ব বিদ্যমান আছে, যা সূত্রাত্মা বায়ুর দুর্বল বন্ধনে আবদ্ধ। উভয় দিক থেকে মরুৎ-রূপী সূক্ষ্ম প্রাণ-রশ্মির উৎস্যর্জন ঘটে। এই উভয় দিকের রশ্মিগুলো আকাশ-তত্ত্বে পরস্পর ধাক্কা খেয়ে ঘুরে আবার ফিরে আসে, যার ফলে উভয় কণার মধ্যে আকর্ষণ না হয়ে বিকর্ষণ বল কার্য করে।

৪. উতয়ঃ খলু বৈ তা নাম যाभির্‌ দেবা যজমানস্য হবম্‌ আয়ন্তি, যে বৈ পন্থানো য়া:
সুতয়স্তা वा উতয়স্ত উ এवैতত্‌ স্বর্গযাণা যজমানস্য ভবন্তি।

{উতিঃ = উতির্‌ অবনাতু (নি.৫.৩)। উতী = উতয়া চ পথা (চ) (নি.১২.২১), অভূ+ক্তিন্‌
দীপ্তি-অবাপ্তি-আলিঙ্গন-হিংসা-আদান-ভাব-বৃদ্ধিষু)। শ্রুতিঃ – বিবিধা গতিঃ (তু.ম.দ.ঋ.
ভা. ১.১৩.১২), স্রবণ গমন যেস্মিন্‌ পথে সঃ (ম.দ.অ.ভা. ১.৪৬.১১)। স্বর্গঃ = অপরিমিতো
বৈ স্বর্গো লোকঃ (ঐ.৬.২৩), অথ যৎ পরং ভাঃ (সূর্যস্য) প্রজাপতিভা সে স্বর্গোবা লোকঃ (শ.
১.৬.৩.১০), বাজো বৈ স্বর্গো লোকঃ (তা. ১৮.৭.১২), মধ্যে হ সংवत্সরস্য স্বর্গো লোকঃ (শ.
৬.৭.৪.১১), স্বর্গো বৈ লোকো যজ্ঞঃ (কৌ.ব্রা. ১৪.১)}

ব্যাখ্যানम्— পূর্বোক্ত দৃষ্টির সাথে আহুতি মিলিত হয়ে অধাতু আকর্ষণ-বল এবং বলসমূহের কার্য করার যে প্রক্রিয়া, তা বিভিন্ন কণার জন্য উতিগুলি অর্থাৎ পথের সৃষ্টি করে। কোনোও গতিশীল কণা একটি নির্দিষ্ট পথে, নির্দিষ্ট গতিতে অন্য কণাকে আকর্ষণ করার ইচ্ছায় প্রয়োজনীয় শক্তি-সম্পন্ন হয়ে তার পথকে ব্যাপ্ত করতে করতে এগিয়ে চলে। এই পথের মূল বৈশিষ্ট্যটি হলো— এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, অর্থাৎ যে পথে কোনো সূক্ষ্ম কণা বা তরঙ্গ গতি করে, সেই পথে অন্য কোনো কণা বা তরঙ্গ প্রবেশ করতে পারে না। এমন পথ দিয়েই বিভিন্ন প্রকাশমান কণা বা তরঙ্গ কোনো অন্য সংযোগের জন্য উৎসুক কণার আকর্ষণে চলতে থাকে। এই পথগুলিকে ‘সুতি’ও বলা হয়, কারণ এই পথ দিয়েই এই কণা ও তরঙ্গগুলি বহতে বহতে চলে, অর্থাৎ সমগ্র পথকে ব্যাপ্ত করতে করতে এগিয়ে যায়। এই সুতিগুলি বা উতিরূপী পথই যজমানকে স্বর্গের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর অর্থ এই যে, এর ফলে সংযোগ করতে ইচ্ছুক কণা বা তরঙ্গ বাগ্‌ অর্থাৎ অন্য বলসম্পন্ন কণা বা তরঙ্গের দিকে আকৃষ্ট হয়, যার ফলে বিভিন্ন কণা সঙ্গত হয়ে নতুন তত্ত্বের সৃষ্টি করে। একইভাবে সূর্যাদি তারার ভিতরেও বিভিন্ন প্রকারের কণা নিরাপদ পথে অতিক্রম করে সূর্যের কেন্দ্রীয় অংশে পৌঁছে যায় এবং সূর্যাদি তারার কেন্দ্রীয় অংশ থেকে বিভিন্ন শক্তি-তরঙ্গ এইরূপ নিরাপদ পথের মাধ্যমে বাহিরের দিকে গতি করে। গতিশীল কণা ও তরঙ্গের পথের নিরাপত্তা কে প্রদান করে? এই বিষয়ে আমাদের মত হচ্ছে— সবাইকে পরিধিরূপে পরিবেষ্টিত করে ও সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে এক বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখা প্রাণ নামক প্রাণযুক্ত সূত্রাত্মা বায়ুই পথকে নিরাপত্তা প্রদান করে। যেন এটি প্রতিটি কণা বা তরঙ্গের সুরক্ষা-কবচ।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— ব্রহ্মাণ্ডে সংচরিত হতে থাকা তরঙ্গ বা কণা একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ পথেই গমন করে। অ্যাটমের ভিতরে ইলেকট্রন অথবা ব্রহ্মাণ্ডে গতিশীল বিভিন্ন তরঙ্গ বা রশ্মি কোনোও অন্য তরঙ্গের সাথে সংঘর্ষ ঘটিয়েও নিজের পথ থেকে বিভ্রান্ত হয় না। আধুনিক বিজ্ঞান তরঙ্গের ক্ষণিক মিলনকে যে সুপার পজিশন (Super Position) নাম দেয়, সেই সুপার পজিশনের ঠিক পরেই তরঙ্গগুলি স্বতঃই তাদের পূর্ববর্তী পথে এগিয়ে যায়। যদি এমন না হতো, তবে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বনি-সংচার ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে যেত। বিভিন্ন আলোক-তরঙ্গের বাধা সৃষ্টি হলে কিছুই স্পষ্ট দেখা যেত না, আরও ভয়াবহ উপদ্রব ঘটত। অ্যাটমের ভিতরে খুব বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত। কিন্তু সর্বনিয়ন্তা চেতন তত্ত্ব পরমাত্মার সু-ব্যবস্থার কারণে সবার পথই নিরাপদ থাকে। এই নিরাপত্তার কারণ হলো প্রাণ নামক প্রাণযুক্ত সূত্রাত্মা বায়ুরূপ প্রাণ।

উপযুক্ত চিত্রে প্রথম অবস্থায় কণা ১ ও কণা ২ নির্দিষ্ট পথে সামনে এগোচ্ছে। সূত্রাত্মা বায়ু তরঙ্গরূপে সবাইকে ব্যাপ্ত করে আছে। সেইসাথে কণাগুলির চারদিকে পরিধিরূপেও সূত্রাত্মা বায়ু বিশেষভাবে বর্তমান। উভয় কণাকেই ধনঞ্জয় প্রাণ নির্দিষ্ট দিকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থায় উভয় কণা অত্যন্ত নিকটে উপনীত হয়, কিন্তু তারা পরস্পরকে সম্পূর্ণরূপে স্পর্শ করতে পারে না। উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে সূত্রাত্মা বায়ু ও অন্যান্য কিছু প্রাণরে ঘেরা কিছু দূরত্ব অবশ্যই রাখে, তবে সূত্রাত্মা বায়ুর আরেকটি ঘেরা উভয় কণাকে যৌথভাবে আচ্ছাদিত করে নেয়, যার ফলে উভয় কণার আকৃতি যৌথ হয়ে ক্ষণমাত্রের জন্য পরিবর্তিত হয়ে যায়; কিন্তু তাদের দিককে ধনঞ্জয় প্রাণ বাধিত হতে দেয় না। এই যৌথ আকৃতিটিই সুপার পজিশনের রূপে প্রতীয়মান হয়। তার পর তৃতীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে উভয় কণা পূর্ববৎ আকৃতি ও দিক ফিরে পেয়ে বিনা পরিবর্তনে সামনে এগিয়ে যায়। তাই বলা হয়েছে যে এদের পথ নিরাপদ। এই পথ অসীম দূরত্ব পর্যন্ত প্রসারিত হয় এবং সর্বত্র একই নিয়ম কার্যকর থাকে।

চিত্র ১.৬ তরঙ্গের Super Position প্রক্রিয়া

. তদাহুর্যদন্যো জুহোত্যথ যোऽনু চাঽऽহ যজতি চ কস্মাৎ তং হয়েত্যাচক্ষত ইতি।।
যদ্বাৱ স তত্র যথাভাজনং দেবতা আমুমাভহে আমুমাভহে ত্যাবাহ্যতি তদেব হোত্বং হোতা ভবতি।। হোতেত্যেনমাচক্ষতে য এবং বেদ।।২।। 

[অন্যঃ = নানেয়ঃ (নি.১.৬)। হোতা = হাতা (তু.নি.৭.১৫), অগ্নিভে হোতা (শ.১.৪.১.২৪), বাক্‌বে হোতা (কৈ.ব্রা. ১৩.৭), মনো হোতা (তৈ.ব্রা. ২.১.৫.৮), প্রাণো বৈ হোতা (ঐ.৬.৮)] 

ব্যাখ্যানম্— পূর্ব প্রকরণে যেখানে দুই কণার সংযোগ বা আকর্ষণ ঘটে, সেখানে দুই প্রকার পদার্থের অস্তিত্ব থাকে। প্রথম, সেই কণাগুলি যারা পরস্পর আকৃষ্ট হয়, যেমন— ধনাবেশ (অগ্নি-প্রধান) এবং ঋণাবেশ (সোম বা আপ-প্রধান)। দ্বিতীয়, সেই পদার্থগুলি, যাদের এই দুই কণার মধ্যবর্তী স্থানে বিনিময় অবিরত চলতে থাকে; যেমন— মরুত এবং ধনঞ্জয় প্রाण, যাদের দ্বারা নির্মিত ঘনীভূত প্রाणতত্ত্বকে বর্তমান বিজ্ঞান virtual photon নাম দেয়। এই virtual photon তথা ধনঞ্জয় ও মরুত-যুক্ত প্রাণ “অন্য” অর্থাৎ না-গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, অর্থাৎ সাধারণত কোনো প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো ইন্দ্রিয় দ্বারা এদের গ্রহণ করা যায় না। এরা অবিরত নিজেদের আহুতি দিয়ে চলে। তবে তাদের “হোতা” না বলে আকৃষ্ট হওয়া অগ্নেয় ও সৌম্য, অর্থাৎ ধনাবেশিত ও ঋণাবেশিত কণাকেই “হোতা” কেন বলা হয়?

এর উত্তর দিতে গিয়ে মহর্ষি বলেন যে এই অগ্নেয় ও সৌম্য কণা, অর্থাৎ পরস্পর আকৃষ্ট হওয়া কণাগুলি, বিভিন্ন মরুত ও ধনঞ্জয় পদার্থের সাথে যুক্ত প্রাণতত্ত্বকে যথাযথ বিভাগ ও যথাযথ স্থান প্রদান করতে করতে ডেকে যায়, অর্থাৎ আকর্ষণ করে। এই ডাকা বা আকর্ষণ করার কারণেই তাদের “হোতা” বলা হয়। যাদের মধ্যে এই ধরনের গুণ বিদ্যমান থাকে, তাদের সকলকেই “হোতা” বলা হয়। এই কারণেই মন–প্রাণ–অগ্নি–বাক্–সূর্যাদি সকলই হোতা নামে পরিচিত।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— দুই কণার মধ্যে আকর্ষণবল সৃষ্টি করে অথবা তাদের বাঁধন রচনা করে যে virtual কণাগুলি, কোনো প্রযুক্তিতেই তাদের দেখা যায় না। আকৃষ্ট হওয়া সেই কণাগুলিই বিভিন্ন প্রाण ও মরুত রশ্মিকে উপযুক্ত বিভাগ ও স্থান প্রদান করিয়ে নিজের ভেতরে তাদের বিনিময় করিয়ে যেতে থাকে।

সায়ণ ভাষ্য ও মালবীয় অনুবাদ
এখন আমরা খণ্ড ২.১-এ আচার্য সায়ণের ভাষ্য এবং ড. সুধাকার মালবীয়ের হিন্দি অনুবাদ উপস্থাপন করি—

যজ্ঞেন বৈ দেবা উর্ধ্বাঃ স্বর্গ লোকমায়ংস্স্তে উবিভয়ুরিমং নো দৃশ্ত্বা মনুষ্যাশ্চ ঋষয়শ্চানু প্রজ্ঞাস্যন্তীতি; তং বৈ ইউপেনৈবায়োপয়ংস্তং যতিউপেনৈবায়োপয়ংস্তদ্যূপস্য ইউপত্বং;তমবাচীনাগ্র নিমিত্যোর্ধ্বা উদায়ংস্ততো বৈ মনুষ্যাশ্চ ঋষয়শ্চ দেবানাং যজ্ঞবাস্ত্বভ্যায়ন্ন্ যজ্ঞস্য কিঞ্চিদেষিষ্যমঃ প্রজ্ঞাত্যা ইতি; তে বৈ ইউপমেবাবিন্দন্নবাচীনাগ্রং নিমিতম্; তে বিদুরনেন বৈ দেবা যজ্ঞময়ূযুপন্নীতি, তমুত্খায়োর্ধ্ব ন্য়মিন্বংস্ততো বৈ তে প্র যজ্ঞমজাননু প্র স্বর্গ লোকম্।। ইতি।

পুরা কদাচিদ্দেবা জ্যোতিষ্টোমং যজ্ঞমনুষ্ঠায় তত্ফলভূতং স্বর্গ প্রাপ্তাস্তত্র চাবস্থায় ভীতিং প্রাপ্তাঃ। কেনাভিপ্রায়েণেতি স উচ্চ্যে। য়ে মনুষ্যা বর্ণাশ্রমধর্মপ্রবৃত্তা য়ে চ ঋষয়স্তপসি প্রবৃত্তাস্তে সর্বে আপ্যস্মদীয়মিমং যজ্ঞং দৃশ্ত্বা স্বযমপ্যনুষ্ঠায় স্বর্গে সমাগত্যাস্মান্ প্রজ্ঞাস্যন্তি ততোঅসমত্সমা ভবিষ্যন্তি। ততস্তে দেবা ভীতা মনুষ্যায়ণামৃষীণাং চ নির্বাচনায় তমেব স্বকীয়ং যজ্ঞং ইউপস্তম্ভেনৈবায়োপয়ন্ মিশ্রিতবন্তঃ। অন্যথানুষ্ঠানরূপং ভ্রমমুত্পাদিতবন্ত ইত্যর্থঃ। যসমাত্ কারণাদ্যূপেনৈব তং যজ্ঞময়োপয়ন্নন্যথা কৃতবন্তস্তস্মাদ্যোপনসাধনত্বাদ্যূপনাম সম্পন্নম্। কেন ক্রমেণ নির্বাচনিতবন্ত ইতি। উচ্চ্যতে— তং ইউপং পূর্বমূর্ধ্বাগ্র সন্তমিদানীমবাচীনাগ্র মধ্যোমুখং নিমিত্য নিখায়োধরধ্বাভিমুখা উদ্গতাস্তদানੀਂ মনুষ্যাশ্চ ঋষয়শ্চ দেবানাং যজ্ঞবাস্তু যজ্ঞভূমিমাগত্যা যজ্ঞস্য সম্পন্ধি চিহ্নং যত্কিঞ্চিদবগমিষ্যামস্তচ্চ দেবানুষ্ঠিতস্য প্রজ্ঞাত্যা সম্পদ্যত ইত্যভিপ্রেয়ার্ যজ্ঞভূমিং সর্বতঃ পরীখ্য যজ্ঞচিহ্নমিদমিতি ইউপমেবাবিন্দন্নলভন্ত। কীদৃশং ইউপমবাচীনাগ্র নিমিতমধোমুখত্বেন নিখাতং ততস্তে মনুষ্যা ঋষয়শ্চৈবং বিদুঃ। কথমিতি, তদুচ্যতে— অনেনৈবাদ্ধোমুখেন ইউপেন দেবা অসমদ্ভ্রমায় স্বকীয়ং যজ্ঞং মিশ্রিতবন্ত ইতি। ততস্তমধোমুখং নিখাতং ইউপমুত্খায় পুনরূর্ধ্বাভিমুখং ন্যমিন্বন্নিখাতবন্তঃ। ততো যথাশাস্ত্রমবস্থিতেন ইউপেন মনুষ্যা ঋষয়শ্চ দেবৈরনুষ্ঠিতং যজ্ঞ প্রজ্ঞায় স্বর্গ লোক প্রাজানন্ন্। তং যজ্ঞমনুষ্ঠায় স্বর্গ গতা ইত্যর্থঃ। সোয়মর্থঃ শাখান্তরে সংগ্রহীতঃ— “যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ সুভর্গ লোকমায়ংস্তে উমন্যন্ত মনুষ্যা নোদন্যাভবিষ্যন্তীতি তে ইউপেন যোপয়িত্বা সুভর্গ লোকমায়ংস্তমৃষয়ো ইউপেনৈবานุ প্রাজানংস্তদ্যূপস্য ইউপত্বম্” ইতি।

(পশু দৃষ্টি)
ii. ১ (vi.১) যজ্ঞের দ্বারাই দেবতারা উপরের স্বর্গলোক লাভ করেছিলেন। তারা ভীত হলেন যে— আমাদের এই যজ্ঞ দেখে বর্ণাশ্রমধর্মে প্রবৃত্ত মানুষ এবং তপস্যায় রত ঋষিগণও নিজেরা অনुष্ঠান করে স্বর্গলোক লাভ করে আমাদের সমান হয়ে উঠবেন। অতএব দেবতারা সেই স্বীয় ইউপকে তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য ইউপের দ্বারাই মিশ্রিত করে দিলেন, অর্থাৎ তাদের থামিয়ে দিলেন। সেখানেই ইউপ নামের কারণ নিহিত— অর্থাৎ “যা দিয়ে রোধ করা হয় সেই খুঁটি”। ঊর্ধ্বলোকের দিকে যাত্রারত দেবতারা সেই ইউপের অগ্রভাগ নিচের দিকে করে ভূমিতে পুঁতে দিলেন। তখন মানুষ ও ঋষিরা দেবতাদের যজ্ঞস্থলে এসে— “যজ্ঞ-সম্পর্কিত কোনো চিহ্ন যেন জানতে পারি”— এই চিন্তা করে দেবতাদের দ্বারা সম্পাদিত যজ্ঞভূমি সর্বদিক থেকে পরীক্ষা করলেন এবং বললেন— “এটাই যজ্ঞের চিহ্ন”— কিন্তু তারা কেবল মাটিতে নিচের দিকে মুখ করা ইউপটুকুই পেলেন। তারা জেনে গেলেন— এই অধোমুখ ইউপের দ্বারাই দেবতারা নিজেদের যজ্ঞকে অন্যরূপ করেছেন, অর্থাৎ উলটে-পালটে মিশ্রিত করেছেন। তারা ইউপকে উপড়ে নিয়ে তার মুখ উপরের দিকে করে স্থাপন করলেন। এর পর শাস্ত্রানুসারে স্থাপিত ইউপের দ্বারা মানুষ ও ঋষিগণ দেবতাদের সম্পাদিত যজ্ঞকে জেনে সেই যজ্ঞের অনुष্ঠান করে স্বর্গলোক লাভ করলেন।

ইদানী যূপনিক্ষেপণ বিধত্তে—
তথা যূপ উপরিমুখ করে পোঁতা হয় যজ্ঞের প্রজ্ঞাত্বের জন্য, স্বর্গলোকের অনুধ্যানের জন্য।
“নিমীয়তে” অর্থ নিক্ষেপ করতে হবে।

যে যূপকে উপরের দিকে মুখ করে পোঁতা হয় তার উদ্দেশ্য এই যে, যজ্ঞকে জানা যায় এবং স্বর্গলোক প্রাপ্ত করা যায়।

তস্য ধূপস্থ তক্ষণে অষ্টাধ্রিত্ব বিচীয়তে—
বজ্র ইব এষ যূপঃ, সঃ অষ্টানিঃ কর্তব্যঃ; অষ্টপ্রিয়ে বাজ্রঃ। তং তং প্রহারতি দ্বিপদে মাতৃব্যায় বছঃ, যঃ ‘অস্য’ তৃতীয়ঃ, তস্মৈ স্তর্তবে।

যূপের বজ্রস্বরূপতার দ্বারা তার বজ্রত্ব। এবং তা অন্য শাখায় শ্রুত হয়— “ইন্দ্রঃ বৃত্রায় বজ্রং প্রাহরত্; রথ তৃতীয়, সূপ তৃতীয়”— ইত্যাদি। জগতে বজ্র অষ্টকোণযুক্ত, সেই রূপেই যূপের অষ্টাধিত্ব করা উচিত। “দ্বিপদে মাতৃব্যায় বছঃ”— যে শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ, তার বধের জন্য যে বজ্র, যে যূপ— সেই পুরুষ তা প্রহারার্থে ব্যবহার করে। অতএব বজ্রের মতো প্রহরণের সামর্থ্যের দ্বারা যূপের অষ্টধারিত্ব যুক্তিযুক্ত। যে শত্রু এই যজমানের তৃতীয় অংশ, তাকে বধ করার জন্যই এই অষ্টাধিত্ব।

এই সূপ বজ্র, একে আট ধার বিশিষ্ট করা উচিত। বজ্রে আট ধার থাকে। যে দ্বেষী-শত্রুর বধের জন্য সেই বজ্র ও সেই সূপ পুরুষ প্রহারার্থে ব্যবহার করে; অতএব বজ্রের ন্যায় যূপেরও আট ধারযুক্ত হওয়া যুক্তিসঙ্গত। যে শত্রু এই যজমানের প্রতি বিদ্বেষী, তাকে মারার জন্যই (এটি) আট ধারযুক্ত।

অষ্টাধিত্ব-সিদ্ধির জন্য যূপের বজ্রত্ব যেভাবে বলা হয়েছে, তাই শত্রুর অপ্রিয়-হেতুত্ব দ্বারা উপপাদিত—
বজ্র ইব এষ যূপঃ; সঃ এষ দ্বিপদঃ, উপারিমুখ হয়ে অবস্থিত থাকে। তাই নিশ্চিতরূপে যে দ্বেষ করে তার অপ্রিয় হয়— “অমুকের যূপ”, “অমুকের সূপ”— এইরূপ চিন্তায়।

যে যূপ আছে, তা শত্রুর বধে নিমিত্তভূত হয়ে নিজেই উদ্যত অবস্থায় থাকে, উদ্যোগী হয়ে অবস্থান করে; তাই তার বজ্রত্ব। পূর্বেও যেমন ছিল, এখনো যে শত্রু যজমানের প্রতি দ্বেষ করে, তার বিরোধী যজমানদের যূপ-দর্শনে বড় অপ্রিয় অনুভব হয়— “এই অমুকের যূপ”— এই সিদ্ধান্তে।

এরপর কামনা-ভেদে যূপের প্রকৃতিভূত বৃক্ষ বিশেষ বলতে হয়। তাই খদিরবৃক্ষ বলা হয়েছে—
“খদির যূপ নির্মাণ করবে যে স্বর্গকামী; খদির-যূপ দ্বারা দেবতারা স্বর্গলোক জয় করেছিলেন, তেমনি এই যজমানও খদির-যূপ দ্বারা স্বর্গলোক জয় করে।”

স্বর্গলাভের ইচ্ছা যার, তাকে খদিরের যূপ বানাতে হবে; খদির-যূপের দ্বারা দেবতারা যেমন স্বর্গলোক জয় করেছিলেন, তেমনি সেই যজমানও স্বর্গলোক জয় করে।

ফলপ্রাপ্তির জন্য বিল্ববৃক্ষ বলা হয়েছে—
বিল্ব-যূপ নির্মাণ করবে যে অন্নকামী, পুষ্টিকামী; প্রতি বৎসর বিল্ববৃক্ষ ফল বহন করে— সেটাই অন্নের রূপ; মূল থেকে শাখা পর্যন্ত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি— সেটাই পুষ্টির রূপ। অতএব উভয় ফলের প্রাপ্তি এতে যুক্তিযুক্ত।

অন্ন ও পুষ্টির কামনা যার, তাকে বিল্ব (বেল) কাঠের যূপ বানাতে হবে। বিল্ব প্রতি বছর ফল দেয়, তাই অন্নের প্রতীক; মূল থেকে শাখা পর্যন্ত বৃদ্ধির দ্বারা পুষ্টির দ্যোতক— তাই এ থেকে দুই ফলই পাওয়া যায়।

এভাবে যিনি জেনে বিল্বের যূপ নির্মাণ করেন, তিনি সন্তানাদি প্রজা ও পশুকে পুষ্ট করেন।

লোকপ্রসিদ্ধি দ্বারা তার উৎকৃষ্টতা বর্ণিত—
লোকেরা বলে “বিল্বই যেন জ্যোতি”— তাই।

এখানে “কিম্” পদটি যুক্ত করে—
হে অধ্বর্যু, তুমি বিল্ব-যূপ বানিয়েছ— তা সঠিক হয়েছে; কারণ বিল্ববৃক্ষ ‘শ্রীবৃক্ষ’ নামে লক্ষ্মীরূপে পূজিত হওয়ায় জ্যোতি স্বরূপ— তাই ব্রাহ্মণবাদেরা বলেন।

এরই প্রশংসা—
সে নিজ আত্মীয়দের মধ্যে জ্যোতি, শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে— যে এইভাবে জানে।

পুনরায় ফলদায়ক অন্য বৃক্ষ—
পলাশ-যূপ নির্মাণ করবে যে তেজকামী, ব্রহ্মবর্চস্কামী; তেজ শরীরের কান্তি, ব্রহ্মবর্চস শ্রুতাধ্যয়নের সিদ্ধি। অতি লাল ফুলের দ্বারা পলাশের তেজস্বিতা ও বেদ-ব্রহ্ম-সংশ্রব যুক্ত।

যে এইভাবে জেনে পলাশের যূপ নির্মাণ করে, সে তেজস্বী ও ব্রহ্মবর্চস্বী হয়।

বিল্বাত্ পালাশṁ প্রশংসতি—
যদেভ পালাশাঁ সার্বেষাঁ বা এষ বনস্পতীনাং যোনি অর্থাৎ পালাশ; তসমাত্ পালাশস্যৈব পালাশেনা আদক্ষতে মু্ষ্য— পালাশ, পালাশ। ইতি।

হে অধ্বর্যু! তুমি যূপে পালাশ নির্মাণ করেছ, তা সম্যক কৃত। কারণ পালাশই সকল বনস্পতীর যোনি। পালাশ বৃক্ষের যে পালাশ অর্থাৎ পাতা, তাদের সমমণ্ডলেই প্রতিটি বৃক্ষের পাতা পালাশ নামে অভিহিত হয়। এই কারণে বলা হয়— “এটি অমুক বৃক্ষের পাতা”, “এটি অমুক বৃক্ষের পাতা”— এমন ব্যবহার হয়।

বেদনং প্রশংসতি—
সর্বেষাঁ হাস্য বনস্পতীনাং কাম উপাপ্তি ভবতি য এভাবে বেদ।।৯।। ইতি।

যে এইভাবে জানে, সে সকল বনস্পতীর সম্পর্কিত যে কামনা আছে, তা প্রাপ্ত করে।

ব্যাখ্যান

এ বিষয়ে আমার ব্যাখ্যান এইরূপ—

১. যজ্ঞেন বৈ দেবা উর্ধ্বাঃ স্বর্গলোকমায়স্তে অভিভয়ুরি মেনো দৃশ্ট্বা মনুষ্যাশ্চ ঋষয়শ্চ অনু প্রজ্ঞাস্যন্তীতি; তং বৈ ইউপেনে বৈ আয়োপর্যংস্ত যদিউপেনে বৈ আয়োপর্যংস্তদ্যূপস্য ইউপত্বং; তমবাচীনাগ্রং নিমিত্যোর্ধ্বা উদায়স্ততো বৈ মনুষ্যাশ্চ ঋষয়শ্চ দেবানাং যজ্ঞবাস্তুভ্যায়ন্ন্ যজ্ঞস্য কিঞ্চিদেভিষ্যামঃ প্রজ্ঞাত্যা ইতি; তে বৈ ইউপমেবাবিন্দন্নবাচীনাং নিমিত; তে বিদুরনেন বৈ দেবা যজ্ঞময়ূযুপন্নীতি, তমুত্খায়োর্ধ্ব ন্যমিন্বংস্ততো বৈ তে প্র যজ্ঞমজাননু প্র স্বর্গলোকম্।।

[ইউপঃ = মিশ্রিতো ব্যবহারযত্নোদয়ঃ (ম.দ.য.ভা. ১৬.১৭), বজ্র ইউপঃ (শ.৩.৬.৪.১৮), যজমানো বৈ ইউপঃ (ঐ.২.৩), মিশ্রিতামিশ্রিতো বন্ধনঃ (তু.ম.দ.. ভা. ৫.২৭), শিখা ইউপঃ (মে. ৪.৫.৮),
সর্বদেবত্যো ইউপঃ (কাঠ. ২৬.৬), গায়ত্রো হি ইউপঃ (মে. ৩.৬.৩)। যজ্ঞঃ— বাগ্বৈ যজ্ঞঃ (ঐ.৫.২৪, ২. ১.১.২.২), অগ্নিবে যজ্ঞঃ (শ.৩.৪.৩.১৮), পশ্বো যজ্ঞঃ (৩.৩.২.৩.১১), যজ্ঞর সোমো রাজা (জৈ.ব্রা. ১.২৫৬), যজ্ঞো বিষ্ণুঃ (মে. ৪.১.১২)]

ব্যাখ্যান

বিভিন্ন প্রকাশিত কণ যজ্ঞের দ্বারা, অর্থাৎ অগ্নি, সোম, বাক্ তত্ত্ব ইত্যাদির সংগতীকরণ ও সম্মিশ্রণের মাধ্যমে উর্ধ্ব স্বর্গলোক অর্থাৎ বিশাল নেব্যুলা প্রভৃতির সৃষ্টি বা সম্পাদনার প্রক্রিয়া প্রারম্ভ বা সম্পন্ন হয়।

এই প্রক্রিয়ায় পূর্বোক্ত বাক্ তত্ত্ব, বিদ্যুত, মরুত ইত্যাদির তীক্ষ্ণ বিকিরণ রূপ হয়ে ব্রহ্মাণ্ডে পূর্ববর্ণিত ছড়ানো দীপ্যমান পদার্থ, যা প্রাণাপানাদি তত্ত্ব এবং সোম পদার্থ ইত্যাদির সাথে মিলিত হয়, সংঘনিত হতে থাকে।

এই সংঘনিত রূপই নেব্যুলা প্রভৃতি আকারে প্রকাশ পায়। এই সময়ে সেই পদার্থে বিভিন্ন প্রকার পদার্থ মিশ্রিত থাকে।

এই পদার্থ সংঘনিত কেন হয়? কিভাবে হয়? এর উত্তর এই যে— এটি ইউপ অর্থাৎ “রোকন ক্ষমতা” সম্পন্ন বজ্ররূপ বিকিরণের প্রভাবে সংঘনিত হয়।

(চিত্র ৬.১)

(দিবাঃ ৫ আপহতপাপ্মানো দেবাঃ (শ.২.১.৩.৪)) এখানে “দেব” শব্দের অর্থ—যে প্রকাশিত কণ অপ্রকাশিত হিংসাত্মক বায়ুর প্রভাবে ক্রিয়াশীলকে নিষ্ক্রিয় করে বা তাকে ছিন্ন-ভিন্ন বা নিয়ন্ত্রিত করে তার বাধা থেকে মুক্ত হয়, তারা দেবসংজ্ঞক পদার্থ বলা হয়।

এই ধরনের পদার্থ উক্ত বজ্ররূপ তরঙ্গের সাহায্যে যে কোনও ভবিষ্যৎ নেবুলার কেন্দ্রীয় অংশে সংহত হওয়া শুরু করে। এই বজ্ররূপ তরঙ্গগুলি বিশেষ ধরনের তরঙ্গ, যা প্রকাশিত কণ বা অগ্নি পরমাণু দ্রুত উৎপন্ন করার ক্ষমতা রাখে। পূর্বোক্ত অগ্নি ও সোমের সম্মিলিত এবং একরূপ অবস্থা বা তার কেন্দ্রীয় অংশে এই বজ্ররূপ কিরণ—যাকে এখানে “ইউপ” বলা হয়েছে—হঠাৎ উৎপন্ন হয়। (চিত্র ৬.১)

এই কিরণগুলি বিপরীত প্রকৃতির কণকে একত্রিত করে অপরিসীম শক্তি উৎপন্ন করে। শক্তি উৎপন্ন হলে কেন্দ্রীয় অংশে কিছু শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়। এর ফলে আরও বিভিন্ন বৈজাতীয় পরমাণু দ্রুত মিলিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করতে থাকে। এই বৈজাতীয় কণ অগ্নি ও সোম প্রাধান্যযুক্ত হয়। সেই সময় এই দুই ধরনের কণের স্বাভাবিক প্রকৃতি হয়ে যায় যে তারা কম প্রকাশিত, অল্পজীবী “মানুষ” নামক কণ এবং বিশুদ্ধ প্রाण-আপানাদি সূক্ষ্ম প্রাণ এবং অন্যান্য ঋষি প্রাণের প্রতি খুব কম আকর্ষণশীল হয়। এখানে “দেবদের ভীত হওয়া” কেবল ব্যাখ্যা প্রদানের একটি রীতি।

অর্থাৎ, যখন অগ্নি ও সোম প্রাধান্যযুক্ত পদার্থ নেবুলার কেন্দ্রীয় অংশ তৈরি করতে শুরু করে এবং তাদের সংযোগে অত্যধিক শক্তি উৎপন্ন হয়ে দ্রুত বহির্গমন শুরু হয়, তখন বজ্ররূপ রশ্মিও বিপরীত স্বরূপ পেয়ে বহির্মুখী হয়ে যায়। এই বহির্মুখী হওয়াকেই ধূপের বিপরীত গাঁথা বলা হয়েছে।

এরপর মানুষ নামক কণ ও প্রাণ-আপানাদি ও অন্যান্য ঋষি প্রাণ কেন্দ্রীয় অংশের দিকে প্রবাহিত হয়। তখন তাদের সংযোগ অগ্নি ও সোম প্রাধান্যযুক্ত কণ থেকে নয়, বরং বিপরীত গতি সম্পন্ন ধূপ বা বজ্ররূপ কিরণ থেকে হয়। এই সংস্পর্শে তারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তারপর বজ্ররূপ কিরণগুলোর দিকও ফিরে কেন্দ্রের দিকে চলে আসে।

এরপর কেন্দ্রের দিকে যাওয়া বজ্ররূপ কিরণগুলোর সংস্পর্শ বা আকর্ষণ দ্বারা মানুষ নামক কণ এবং ঋষি নামক প্রাণও কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে এবং অগ্নি ও সোম প্রাধান্যযুক্ত পদার্থে মিশে যায়।

এই বিষয়ে মহর্ষি তিতিরও এই বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেছেন—
“যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ সুভর্গ লোকমায়স্তে অমন্যন্ত মনুষ্যা নো অন্বাভবিষ্যন্তীতি; তে ইউপেন যোগ্য করে সুভর্গলোকমায়ংস্তমূপয প্রাজানন্ত তাধূপস্য ইউপত্ম।” (তৈ.সং. ৬.৩.৪.৭)

বৈজ্ঞানিক সংক্ষেপ:
যখন ব্রহ্মাণ্ডে অগ্নি ও সোম পদার্থ বা ধনাবেশিত ও ঋণাবেশিত কণ সর্বত্র উৎপন্ন হয়, তখন বিশেষ অংশ বা কেন্দ্রীয় অংশে হঠাৎ বজ্ররূপ রশ্মি উৎপন্ন হয়। এই রশ্মি ধনাবেশিত ও ঋণাবেশিত কণের শক্তিকে এমন একটি স্তরে পৌঁছে দেয়, যেখানে তারা একত্র হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। অন্যান্য কণ ও প্রতিকণও মিলিত হয়ে এই প্রক্রিয়াকে পুনরাবৃত্তি করে।

যখন এই শক্তি কেন্দ্র থেকে বাহিরের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে, তখন বজ্ররূপ কিরণগুলোও সেই সঙ্গে বহির্গমন করতে থাকে। এরপর “মানুষ” নামক কণ, যাদের গতিবিধি অনিয়মিত এবং যারা কম প্রকাশিত ও অল্পজীবী, বজ্ররূপ কিরণের প্রভাবে উজ্জ্বল হয়ে সেই কিরণগুলোকে ফিরে কেন্দ্রের দিকে প্রতিফলিত করে এবং কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

এর ফলে নেবুলার জন্ম হয়, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়ানো পদার্থ সংহত হতে শুরু করে এবং আকর্ষণ শক্তি হঠাৎ কেন্দ্রীভূত হয়। কণ ও প্রতিকণ একত্র হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া এবং সেই শক্তির নির্গমনের কারণে শূন্য স্থান সম্পূর্ণ পদার্থকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই প্রক্রিয়ার সমস্ত কারণ বজ্ররূপ কিরণের প্রকৃতি দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়, যা এই অধ্যায়ে পরবর্তী অংশে প্রদর্শিত হবে।

চিত্র ৬.২ তারাদের কেন্দ্রীয় অংশের সৃষ্টির প্রারম্ভ

২. তদ্যদিউপ ঊর্ধ্বং নিমীয়তে যজ্ঞস্য প্রজ্ঞাত্যায়, স্বর্গস্য লোকস্যানুখ্যাত্যে।
বজ্রো বা এষ ইউপঃ সো অষ্টাশ্রিঃ কর্তব্যো অষ্টাশ্রিভৈ বজ্রস্তং তং প্রহারত দ্বিষতে ভ্রাতৃব্যায়।
বজো বৈ ইউপঃ স এষ দ্বিষতো ওয়থ উদ্যতস্থিত্তি তসমাদ্ধাপ্যেতর্হি যো দ্বেষ্তি তস্যাপ্রিয়ং ভবত্যমুষ্যায়ং ইউপো অমুষ্যায়ং ইউপ ইতি দৃষ্ট্বা।।

[অশ্রিঃ = কিনারা, তেজ ধার, কোণ ইতি আপনি। আশ্রয়তি তন্ত্রে তশ্রিঃ (উ.কো.৪.১৩৬)।
বজঃ = বজো বৈ পশবঃ (শ.৬.৪.৪.৬), বজো বৈ চক্রম্ (তৈ.ব্রা. ১.৪.৪.১০), বজঃ ত্রিষ্টুপ্ (২.৩.৬.৪.২২; কাঠ. ২১.২)]

ব্যাখ্যান:
য়ুপ বা বজ্র নামক কিরণগুলো কেন্দ্রীয় অংশের দিকে এই কারণে প্রবাহিত হয়, যাতে সেই অংশে বিভিন্ন পদার্থ মিলিত হয়ে সৃষ্টির প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে। এখানে “উর্ধ্ব” শব্দের অর্থ কেন্দ্রীয় অংশ তৈরি করার কারণ ১.৭.৬-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই বজ্ররশ্মিগুলোর সাহায্যে নেবুলার কেন্দ্রীয় অংশের সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কেন্দ্র তৈরি হওয়ার পর বাকী অংশ গঠিত হয়।

বজ্ররূপ কিরণগুলোকে “সূপ” বলা হয় কারণ এই কিরণগুলির কারণে সমজাতীয় কিন্তু বিপরীত বৈদ্যুতিক শক্তি বা স্বভাবসম্পন্ন কণগুলির সংযোগ সম্ভব হয় এবং অপ্রকাশিত হিংস্র বৈদ্যুতিক বায়ুকে ভেঙে বা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়। এই ইউপ বা বজ্ররূপ কিরণগুলো চলার সময় তাদের পথ অষ্টভুজাকার হয় এবং অষ্ট কোণগুলো এতটা তীক্ষ্ণ হয় যে অপ্রকাশিত হিংস্র বৈদ্যুতিক বায়ুর তরঙ্গকে ধ্বংস বা বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

যখন হিংস্র অপ্রকাশিত বৈদ্যুতিক তরঙ্গ কণগুলির সংযোগ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়, তখন বজ্ররূপ কিরণগুলির আঘাত সেই তরঙ্গের উপর পড়ে। সপ্ত ছন্দের মধ্যে ত্রিষ্টুপ ছন্দ বিশেষভাবে বজ্রের কাজ করে। এই বজ্ররূপ কিরণগুলো কেবল তীব্র ভেদনশক্তিসম্পন্ন নয়, বরং বিভিন্ন কণকে সংযুক্ত করতেও সহায়ক।

যখন কোনো পদার্থ একত্র হতে শুরু করে, তখন অপ্রকাশিত হিংস্র বৈদ্যুতিক বায়ু তার তীব্র প্রক্ষেপণ ও প্রতিকর্ষণ শক্তি দ্বারা সেই সংযোগ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। সেই অবস্থায় বজ্ররূপ কিরণগুলো সেই অপ্রকাশিত বায়ুকে বিচ্ছিন্ন করে সংযোগ প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করে।

যেভাবে নেবুলার গঠনের সময় এই প্রক্রিয়া ঘটে, একইভাবে বর্তমান ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি সংযোগ প্রক্রিয়ায়ও এই কাজ ঘটে। যখন অপ্রকাশিত হিংস্র বৈদ্যুতিক বায়ু সংযোগমুখী কণগুলোর মধ্যে প্রতিকর্ষণ শক্তি প্রক্ষেপণ করে, তখন কাছাকাছি থাকা বজ্ররূপ কিরণগুলো সেই বাধক পদার্থকে বিচ্ছিন্ন করে কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার জন্য নিরাপদ পথ সরবরাহ করে।

বৈজ্ঞানিক সংক্ষেপ:
বজ্ররূপ কিরণগুলো নেবুলার কেন্দ্রীয় অংশের নির্মাণে বিশেষভাবে সহায়ক। এই কিরণগুলোই কণ ও প্রতিকণকে সংযুক্ত করে শক্তি উৎপন্ন করার প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করে এবং সংযোগে বাধা সৃষ্টিকারী বা পদার্থের সংহত হওয়ার পথে বাধা দানকারী অপ্রকাশিত পদার্থকে দূর করতে সহায়ক।

যেমন নেবুলা এবং বিভিন্ন তারাদের গঠনের সময় অপ্রকাশিত তত্ত্বের বাধা বজ্ররশ্মির মাধ্যমে দূর হয় এবং নেবুলা ও বিভিন্ন লোকের সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তেমনই বর্তমানেও পুরো ব্রহ্মাণ্ডে অপ্রকাশিত পদার্থের প্রতিকর্ষণ শক্তি প্রতিটি সংযোগকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, এবং সেই বাধা বজ্ররূপ কিরণগুলো দূর করে সংযোগ প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করে।

বজ্ররূপ কিরণগুলোতে অষ্টভুজাকার তীক্ষ্ণ প্রান্ত থাকে, যা ড্যাংক এনার্জির ক্ষতিকর প্রভাবকে বিচ্ছিন্ন করে।


চিত্র ৬.৩ বজ্র কিরণের দ্বারা ডার্ক এনার্জির বিনাশ

৩. খাদিরং ইউপং কুর্বীত স্বর্গকামঃ খাদিরেণ বৈ ইউপেন দেবাঃ স্বর্গলোকমজয়ংস্তথৈবৈ তদ্যজমানঃ খাদিরেণ ইউপেন স্বর্গলোক জয়তি।। বৈল্বং ইউপং কুর্বীতন্নাদ্যকামঃ পুষ্টিকামঃ সমা সমা বৈ বিল্বো গৃভীতস্তদন্নাদ্যস্য রূপমামূলাছাখাভির অনুসুচিতস্তত্পুষ্টেঃ।। পুষ্যতি প্রজা চ পশূংশ্চ য এভং বিদ্বান্ বাইল্ব ইউপ কুরুতেঃ।। যদেব বাইল্বাঁ৩ বিল্ব জ্যোতিঃ ইতি বা আচক্ষতে।। জ্যোতিঃ স্বেষু ভবতি শ্রেষ্ঠঃ স্বানাং ভবতি য এভং বেদ।।

খদিরঃ ৫ খদতি হিনস্তীতি খদিরঃ (উ.কো. ১.৫৩), খদিরো যদেনেনাখিদৎ (শ.৩.৬.২. ১২), অস্থিভ্য এভাস্য (প্রজাপতের) খদিরঃ সমভবৎ। তস্মাত্ সে দারুণঃ বহুসারঃ (শ. ১৩.৪.৪.৬), (অস্থি ৮ অস্থিরং চজ্জলং কিরণচলনম্ - তু.ম.দ.ঋ.ভা. ১.৮৪.১৩), অস্থি বা এতৎ সমিধৎ (তৈ.ব্রা. ১.১.৬.৪), অস্যতি প্রক্ষিপতি যেন তৎ অস্থি (উ.কো. ৩.১৫৪), অস্থিনী স্পর্শরূপম্ (ঐ.আ. ৩.২.১)। (বষট্কারঃ ৫ বাক্ চ বৈ প্রাণাপানী চ বষট্কারঃ ঐ. ৩.৮), (শিরো বৈ প্রাণানাং যোনিঃ - শ. ৭.৫.১.২২), বষট্কারো বৈ গায়ত্রিয়ে শিরোচ্ছিনতু, তস্যে রসঃ পরাডপাততু, সঃ পৃথিবীং প্রাবিশত স খদিরোদ্ধভবৎ (তৈ.সং. ৩.৫.৭.১), (খদ্ + কিরচূ-খদ ভক্ষণে স্থৈর্য হিংসায়াজ্ব, খদ আচ্ছাদনে)। বিল্বঃ ৫ অসৌ বা আভাদিত্যো যতোজ্জায়ত ততো বিল্ব উদতিষ্ঠত্, সয়োন্যেভ ব্রহ্মবর্চসমবরুন্ধে (তৈ.সং. ২.১.৮.১-২), প্রজাপতীরমজ্জা (তু.শ. ১৩.৪.৪.৮), বিলু + বন্ - আপ্টে (বিল সংরবণে, বিল ভেদনে)। গৃভীতঃ - গুহীতঃ (ম.দ.ঋ.ভা. ১.২৪.১২)। সমাঃ ৮ সংবৎসরাঃ (ম.দ.য.ভা. ১৬.৪৬), প্রজাঃ (তু.ম.দ.য.ভা. ৪০.৮), সমানাং সংবৎসরাণাম্ (নি. ১১.৫), শুদ্ধাঃ (তু.ম.দ.ঋ.ভা. ৪.৫৭.৭)। শাখাঃ - অঙ্গুলিনাম্ (নিঘং. ২.৫), শাখা খশযাঃ শক্তোনোতের্বা (নি. ১.৪)

ব্যাখ্যান:
পূর্বে যে বজ্ররূপ ইউপের কথা বলা হয়েছে, এখানে সেই বজ্ররূপ ইউপের বিভিন্ন প্রকারের বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে খাদির ধূপের উল্লেখ রয়েছে। খাদির ইউপ হলো সেই কিরণ, যা মনস্তত্ত্বের যোগ বা তার বিকার থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত চঞ্চল এবং প্রকম্পক ধর্মসম্পন্ন সূক্ষ্ম তরঙ্গ তৈরি করে।

যখন দুই বিপরীত প্রাকৃতিক কণ পরস্পরের কাছে আসে এবং তাদের সমস্ত বৈশিষ্ট্য একই থাকে, শুধু বৈদ্যুতিক আভ্যন্তরীণ ভিন্নতা থাকে, তখন একটি বিস্ময়কর প্রক্রিয়া ঘটে। এতে একটি কণ আগ্নি প্রধান এবং অন্যটি সোম প্রধান হয়। আগ্নি প্রধান কণে প্রাণ তত্ত্ব সঘনভাবে থাকে এবং সোম প্রধান কণে প্রাণ তত্ত্ব বিরলভাবে থাকে। যখন দুই কণের প্রাণ ও মরুতের মিশ্রণ অসমান হয়, তখন তাদের মধ্যে প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয় এবং তারা একে অপরের প্রতি দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হয়, ফলে একটি নতুন এবং আপেক্ষিকভাবে স্থূল কণ তৈরি হয়।

যদি দুই কণের প্রজাত্য সম্পূর্ণ সমান হয় এবং বৈদ্যুতিক আভ্যন্তরীণ ভিন্নতার ভিত্তিতে কেবল তাদের বৈদ্যুতিক আভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য বিপরীত হয়, তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। তারা আকৃষ্ট হলেও, তাদের আকর্ষণ এত শক্তিশালী হয় যে মধ্যবর্তী আকাশ উপাদানের আবরণও বিলীন হয়ে যায় এবং তাদের প্রাণ তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে মিশ্রিত হয়ে যায়।

খাদির ধূপরূপী কিরণগুলো সেই সময় চেতন সর্বোচ্চ পরমাত্মার প্রেরণায় আকস্মাৎ প্রকাশিত হয়ে, ঐ দুই কণের মিলিত রূপকে আচ্ছাদিত করে শোষণ করে। সঙ্গে সঙ্গে এই কিরণগুলো সেই প্রাণ তত্ত্বকে সীমিত এবং প্রায় স্থির আকার প্রদান করে, যা অত্যন্ত গতিশীল এবং ভেদন ক্ষমতাসম্পন্ন। এই স্থিতিশীল রূপকে শক্তির একটি কণ বা কোয়ান্টা বলা হয়।

কিছু কণ বৈদ্যুতিক আভ্যন্তরীণ যুক্ত নয়, কিন্তু ঘূর্ণন দিক বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে বিপরীত হলেও, অন্যান্য দিক থেকে সম্পূর্ণ সমান থাকে এবং কণ ও প্রতিকণ নামে পরিচিত হয়। তাদের সংযোগও একইভাবে ঘটে। বিপরীত পূর্ণনের ক্ষেত্রে, তাদের প্রাণ তত্ত্ব একে অপরের মধ্যে মিশে যায়। খাদির সূপরূপী কিরণগুলো এই প্রক্রিয়ায় নিয়মিতভাবে কার্যকর থাকে।

এই প্রক্রিয়ার কারণে ব্রহ্মাণ্ডে বিস্তৃত পদার্থের মধ্যে শূন্যস্থান তৈরি হয় এবং নেবুলার কেন্দ্রের সৃষ্টি শুরু হয়। বর্তমানে যেখানে দুই বিপরীত কণ মিলিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন হয়, সেখানে খাদির ইউপরূপী তরঙ্গ একইভাবে সেই প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করে।

বৈজ্ঞানিক সংক্ষেপ:
খাদির ইউপ বা বজ্ররূপ তরঙ্গগুলোই সেই শক্তি উৎপাদন এবং কেন্দ্রীয় অংশে পদার্থ সংযোগে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, এবং অপ্রকাশিত, বিরূপ পদার্থকে বিচ্ছিন্ন বা আচ্ছাদিত করে নেবুলার কেন্দ্রের গঠনে সহায়তা করে।

উপর্যুক্ত প্রকার সে ব্রহ্মাণ্ড কে অন্তর এ শক্তি উৎপন্ন হয়ে কিছু স্থানে রিক্ততা উৎপন্ন হোয়া যায়, সে সময় বৈল্বযুপ নামক অন্য তরঙ্গ উত্পন্ন হোতা হ্যায়। এই তরঙ্গ (মজ্জা = মজ্জা যযুঃ (শ. ৮.১.৪.৫), মজ্জানো জ্যোতিসতদ্ধি যযুষ্মতীনাং খূপম্ (শ. ১০.২.৬.১৮), মজ্জতি শুন্ধতীতি মজ্জা (উ.কো. ১.১৫৬)] মনস তত্ব অথবা প্রাণ এও বাকু তত্ব থেকে উৎপন্ন হওয়া পূর্বোক্ত খাদির সূপ রূপী তরঙ্গের মধ্যে সেই প্রকার স্থিত থাকে, যেমন প্রাণীর অস্থির মধ্যে মজ্জা স্থিত থাকে। এই তরঙ্গ আচ্ছাদক, ভেদন, শোধন ক্ষমতা সহ জ্যোতিরূপ হয়। এদের সঙ্গে এই কিরণ বিভিন্ন কণ সংযোগে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই কিরণ বিভিন্ন কণকে তীব্র গতিশীলও করে। এই কিরণ ব্রহ্মাণ্ডে সংবৎসর অর্থাৎ সন্ধানক মাস রক্ষীদের খুঁজে খুঁজে ধারণ করে। এই মাস রশ্মীর সঙ্গে সঙ্গে নেব্যুলার নির্মাণাধীন কেন্দ্রে চারপাশের বিদ্যমান পদার্থ আকৃষ্ট হয়ে কেন্দ্রীয় অংশের দিকে আসতে শুরু করে এবং এই প্রকার নেব্যুলা ক্রমশ পুষ্ট ও বৃদ্ধি পায়। এই কারণে এই তরঙ্গকে অন্নকাম ও পুষ্টিকাম বলা হয়, অর্থাৎ তারা সংযোগযোগ্য পদার্থকে আকৃষ্ট করে, যার ফলে সৃজন প্রক্রিয়া পুষ্ট হয়। সেই পুষ্টির প্রকার নির্দেশ করে মহর্ষি বলেন যে এই কিরণ সেই কেন্দ্রীয় অংশে, যা কোনো নেব্যুলা বা তারার ভিত্তি হয়, উৎপন্ন হয়ে দূর আকাশে বিস্তৃত হয়। মনে হয় যেন এটি ক্ষেত্রের মধ্যে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া হঠাৎ নয়, ক্রমশ হয়। এই কারণে নেব্যুলার নির্মাণও ধীরে ধীরে হয়।
ব্রহ্মাণ্ডের যে ক্ষেত্র উপরের বিল্ব রূপ কিরণের তীব্র প্রবাহকে ধারণ করে, সেখানে বিভিন্ন প্রকারের উৎপন্ন কণ, ছন্দ বা মরুদ রশ্মি একত্র হতে শুরু করে, যার কারণে সেই ক্ষেত্র নেব্যুলার নির্মাণের জন্য ক্রমশ পুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়। এই মিলিত রূপ তরঙ্গ এবং তাদের তীব্র ধারাকে জ্যোতিরূপ বলা হয়। এই কারণে যে ক্ষেত্র এই তরঙ্গ উৎপন্ন করে নেব্যুলার কেন্দ্র গঠন শুরু করে, সেই ক্ষেত্র আপেক্ষিকভাবে জ্যোতির্ময় হয়। যে কোনো বাহ্যিক পদার্থ কেন্দ্রের দিকে আসে, তা আরও বেশি আলোকমান হয়। বিভিন্ন নির্মাণাধীন কেন্দ্রে এই তরঙ্গের পরিমাণ যত বেশি হয়, তা অন্যান্য কেন্দ্রে তুলনায় ততই শ্রেষ্ঠ, শক্তিশালী ও আলোকশীল হয়। এই কারণে ব্রহ্মাণ্ডে উৎপন্ন নেব্যুলা, গ্যালাক্সি ও তারার আকার, তেজস্বিতা, আকর্ষণ শক্তি এবং গতি ভিন্ন-ভিন্ন হয়।
বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার- নেব্যুলার নির্মাণাধীন কেন্দ্রে কণ ও প্রতিকণ দ্বারা শক্তি উৎপন্ন এবং বাহ্যিক পদার্থ কেন্দ্রের দিকে প্রবাহিত হওয়ার গূঢ় বিজ্ঞান এই কণ্ডিকায় নির্দেশ করা হয়েছে। উপরের ওজরূপ তরঙ্গের দুটি রূপ এখানে আলোচনা করা হয়েছে। ইলেকট্রন ও পোজিট্রন, কোয়ার্ক ও প্রতিকোয়ার্ক ইত্যাদির সংযোগে শক্তি কেন ও কিভাবে উৎপন্ন হয়? কদাচিৎ এই বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান নীরব। এখানে সেই গূঢ় বিজ্ঞান প্রকাশ করা হয়েছে। যখন কোনো কণ ও প্রতিকণ, উদাহরণস্বরূপ ইলেকট্রন ও পোজিট্রন একে অপরের কাছে আসে, তখন নিম্ন ঘটনা ঘটে—

পোজিট্রন আগ্নেয় তত্ত্ব প্রধান হওয়ায় প্রাণের তুলনামূলক ঘন ও মরুদ রশ্মির বিরল রূপ থাকে এবং ইলেকট্রন সোম তত্ত্ব প্রধান হওয়ায় প্রাণের বিরল ও মরুদ রশ্মির ঘন রূপ থাকে। যখন এই দুই কণ কাছে আসে, তখন ১.২.৩-এ প্রদর্শিত অনুযায়ী প্রবল আকর্ষণ ঘটে। যখন দুই প্রকার কণ সমপরিমাণ হলেও বিপরীত বৈশিষ্ট্যযুক্ত চার্জের অতিরিক্ত ভর ইত্যাদির গুণও ভিন্ন হয়, তখন তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপেক্ষিকভাবে এক স্থূল ও মিলিত কণ গঠন করে। এই ধরনের কণকে পরস্পর কণ ও প্রতিকণ বলা হয় না। যখন ইলেকট্রন ও পোজিট্রনের মত সমপরিমাণ হলেও বিপরীত বৈদ্যুতিক চার্জের অতিরিক্ত সমস্ত গুণ সমান থাকে, তখন তারা কণ ও প্রতিকণ হিসেবে পরিচিত হয়। তাদের অর্থাৎ ইলেকট্রন, পোজিট্রন ইত্যাদির সংযোগ প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়। ইলেকট্রন যখন কোনো পোজিট্রনের নিকটে যায়, তখন তাদের আকর্ষণ প্রক্রিয়া এত তীব্র হয় যে তারা দুই কণ পরস্পর সম্পূর্ণভাবে মিশে যায়। তাদের মধ্যে কোনো শূন্যস্থান বা আকাশ তত্ত্ব বিদ্যমান থাকে না। সেই সময় ইলেকট্রনের মরুদ্‌ রশ্মি এবং পোজিট্রনের ধনঞ্জয় প্রাণ রশ্মি তীব্র গতিতে একে অপরের দিকে প্রবাহিত হয়ে সম্পূর্ণ পদার্থকে মিশিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে সর্বোচ্চ চেতন শক্তির প্রেরণায় মনস্‌ তত্ত্ব অথবা প্রাণাপান ও বাক্‌ তত্ত্বের দ্বারা গায়ত্রী ছন্দ রশ্মি থেকে তীব্র ভেদক খাদির রূপ তরঙ্গ উৎপন্ন হয়, যা ইলেকট্রন ও পোজিট্রন বা কোনো কণ ও প্রতিকণের সম্পূর্ণ মিশ্রিত পদার্থকে আচ্ছাদিত করে ফোটনের রূপ প্রদান করে। এই ফোটন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তীব্র গতিসম্পন্ন হয়। এই তরঙ্গের অনুপস্থিতিতে কোনো কণ ও প্রতিকণ কখনো ফোটনের রূপ গ্রহণ করতে পারে না। যখন নিরায়েশিত নিউট্রন ইত্যাদি কণ তাদের প্রতিকণের সঙ্গে সংযোগ ঘটায়, তখন তাদের বিপরীত ঘূর্ণনের কারণে উৎপন্ন শক্তি দুইকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। তারপরে তাদের ফোটন রূপে রূপান্তরও উপরের মতোই ঘটে। এই প্রক্রিয়াকে নিম্নলিখিত চিত্র অনুযায়ী বোঝা যায়—
ছবি ৬.৪ ইলেকট্রন ও পজিট্রনের মতো আধানযুক্ত কণার সংযোগ


এইভাবে গামা রশ্মি উৎপন্ন হয়ে অত্যন্ত ভেদনক্ষমতার সঙ্গে বাহিরে বেরিয়ে যায় এবং উপরে উল্লিখিত খদিররূপ রশ্মিগুলির মধ্যে অবস্থিত অন্য বিশ্বরূপ রশ্মিগুলি, যা অত্যন্ত দীপ্ত হয়ে আচ্ছাদক, ভেদনকারী এবং অনুসন্ধানী গুণে যুক্ত থাকে, সেই কেন্দ্রীয় অংশে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এই রশ্মিগুলি আকর্ষণবলে বিশেষ সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাইরে দূরে ছড়িয়ে থাকা পদার্থকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে চারদিকে প্রবাহিত হতে থাকে; এর ফলে চারদিকে ছড়ানো পদার্থ ধীরে ধীরে ঘনীভূত হতে থাকে। এই বিল্বরূপ রশ্মিগুলির তীব্রতার ওপরেই কোনো নীহারিকা, ছায়াপথ অথবা নক্ষত্রের আকার ও মহাকর্ষবল নির্ভর করে; কোনো পর্যায় পর্যন্ত এদের দীপ্তিময়তাও এই রশ্মিগুলির ওপর নির্ভরশীল।

৪. পালাশং ইউপং কুর্বীত তেজস্কামো ব্রহ্মবর্চস্ কামস্তেজো বৈ ব্রহ্মবর্চসম্ বনস্পতীনাম্ পালাশঃ।। তেজস্বী ব্রহ্মবর্চসী ভবতি যঃ এভং বিদ্বান্ পালাশং ইউপং কুরুতে।। যদেব পালাশাম্ সর্বেষাম্ বা এইষ বনস্পতীনাম্ যোনির্ যৎ পালাশঃ তস্মাত্ পালাশস্যৈব পালাশেনা আচ্ছক্ষতে অমুষ্য পালাশম্ অমুষ্য পালাশম্ ইতি।। সর্বেষাম্ হাস্য বনস্পতীনাম্ কাম উপাপ্তো ভবতি যঃ এভং বেদ।।

(पलाश:ः - ब्रह्म वै पलाशः (श.१.३.३.१६), मांसेभ्य एवास्य (प्रजापते:) पलाशः समभवत्‌ तस्मात्स बहुरसो लोहितरसः (श.१३.४.४.१०), सोमो वै पलाशः (की.ब्रा.२.२; श.६.६.३. ७), पत्र पलाशम्‌ इति सायणाचार्य:)। वनस्पतिः ८ वनानां किरणानां पालकः स्वामी सूर्य: (तु.म.द.य .भा.२८.१०), (वनम्‌ ८ रश्मिनाम - निघं.१.५; उदकनाम - निघं.१.१२), अग्निर्वे वनस्पतिः (कौ.ब्रा.१०.६), प्राणो वै वनस्पति: (ऐ.२.४)। (मांसम्‌ ८ मांसं सादनम्‌ - श.८. १.४.५; मांसं वै पुरीषम्‌ - श.८-६-२.१४), (पुरीषम्‌ 5 उदकनाम - निघं.१.१२; ऐन्द्रं हि पुरीषम्‌ - श.८.७.३.७; पूर्ण बलम्‌ - म.द.य.भा.१२.४६; व्यापनं पालनं वा - म.द.य. भा.३८.-२१ पुरीषं पृणातेः पूरयतेर्वा - नि.२.२२))

[পলাশঃ – ব্রহ্ম বৈ পালাশঃ (শ. ১.৩.৩.১৬), মাংশভ্য এবাস্য (প্রজাপতেঃ) পালাশঃ সমভবৎ তস্মাত্ স বহুরসো লোহিতরসঃ (শ. ১৩.৪.৪.১০), সোমো বৈ পালাশঃ (কি.ব্রা. ২.২; শ. ৬.৬.৩.৭), পত্রং পালাশম্ ইতি সায়ণাচার্যঃ) বনস্পতিঃ = বনানাং কিরণানাং পালকঃ স্বামী সূর্য়ঃ (তু.ম.দ.য.ভা. ২৮.১০) (বনম্ = রশ্মিনাম্ – নিঘ. ১.৫; উদকনাম – নিঘ. ১.১২) অগ্নির্ বৈ বনস্পতিঃ (কৌ.ব্রা. ১০.৬), প্রানো বৈ বনস্পতিঃ (ঐ. ২.৪) (মাংসম্ = মাংস সাদনম্ – শ. ৮.১.৪.৫; মাংসং বৈ পুরীষম্ – শ. ৮.৬.২.১৪) (পুরীষম্ = উদকনাম – নিঘ. ১.১২; ঐন্দ্রং হি পুরীষম্ – শ. ৮.৭.৩.৭; পূর্ণ বলম্ – ম.দ.য.ভা. ১২.৪৬; ব্যাপনং পালনং বা – ম.দ.য.ভা. ৩৮.২১; পুরীষং পৃণাতেঃ পূরযতের্ভা – নিঃ ২.২২)]

নীহারিকাগুলির কেন্দ্রীয় অংশে বিল্বরূপ রশ্মির দ্বারা বাইরের পদার্থকে আকর্ষণ করা হলে, তখন সেই পদার্থে বিভিন্ন প্রকার প্রাণ ও মরুতের পাশাপাশি বিভিন্ন কণা এবং তাদের প্রতিকণারই প্রাচুর্য থাকে। তাদের মধ্য থেকে কণা ও প্রতিকণার সংযোগে পূর্বে উল্লিখিত মতে শক্তির সৃষ্টি হয়ে যায়। তার পর পালাশ–যূপরূপ তীব্র বিকিরণের দল সৃষ্টি হয়। এই রশ্মিগুলি মন, বাক্‌ বা প্রাণের সর্বত্রব্যাপী বল থেকে উৎপন্ন হয়। এর অর্থ এই যে, এই রশ্মিগুলি নির্মীয়মাণ নীহারিকার কেন্দ্রের চারদিকে ছড়িয়ে থাকা পদার্থসমষ্টিতে সর্বোচ্চ চেতন–সত্তা পরমাত্মার প্রেরণায় আকস্মিকভাবে জন্ম নেয়।

এই রশ্মিগুলির সৃষ্টি হলে তখন বিদ্যমান পদার্থ থেকে বিভিন্ন প্রকার বৈদ্যুত–আধানযুক্ত কণা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এই পালাশরূপ রশ্মিগুলি বিভিন্ন প্রকার মরুত–সংযুক্ত বৈদ্যুত প্রকৃতির হয়, যা অন্য পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈদ্যুত–আধানযুক্ত কণার সৃষ্টি করে। এর ফলে নির্মীয়মাণ নীহারিকাগুলিতে নানা প্রকার ও অসংখ্য পরিমাণে বৈদ্যুত–আধানযুক্ত কণা জন্ম নেয় এবং সমগ্র পদার্থ বৈদ্যুত–তেজে পূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সূক্ষ্মতম বৈদ্যুত–আধানযুক্ত কণাগুলি পূর্বের বিল্বরূপ তরঙ্গের যোগে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্য আধানযুক্ত কণার জন্ম দেয়। এভাবে এই পালাশরূপ রশ্মিগুলি নীহারিকাগুলির বৈদ্যুত–তেজ ও তীক্ষ্ণ জ্যোতির কারণ হয়ে ওঠে। পূর্বের বিল্ব–তরঙ্গেই সমগ্র পদার্থ আলোকিত হয়ে ওঠে, কিন্তু এই তরঙ্গগুলির ফলে সেই জ্যোতি আরও প্রখর হয় এবং বিদ্যুত্ময়ও হয়ে ওঠে।

যখন এই ধরনের রশ্মি অথবা তরঙ্গ সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সমগ্র অঞ্চলে অগ্নিতত্ত্বের বিরাট বৃদ্ধি ঘটে এবং তা তীক্ষ্ণভাবে দীপ্তিমান ও তীব্র বৈদ্যুত শক্তির ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যেমন কোনো গাছের পাতাগুলিই সেই গাছের পরিচয় দেয় এবং সেগুলিই দূর থেকে দেখা যায়, তেমনি কোনো নীহারিকা বা নক্ষত্রে এই বৈদ্যুত–তেজই দৃশ্যমান হয় এবং সেটিই তার মুখ্য পরিচয়। এই বৈদ্যুত–তেজ তাদের মধ্যে বিস্তৃত হয়ে সমস্ত অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করে।

চিত্র ৬.৬ সূক্ষ্ম নাভিকসমূহের নির্মাণ প্রক্রিয়া

এই কিরণগুলি কোনো নীহারিকা বা তারায় অগ্নি-তত্ত্বের সমৃদ্ধি ও নিরন্তরতার এক প্রবল কারণ হয়ে থাকে। এর পাশাপাশি এই কিরণগুলি সেই অগ্নি-তত্ত্বকে ধারণ করে এবং তার বহির্গমনের জন্য পথও প্রদান করে। বিভিন্ন তারা বা নীহারিকার বৈদ্যুতিক তেজ এবং তাতে বিদ্যমান তত্ত্বগুলিকে তাদের তেজের দ্বারাই জানা যায়, যার ফলে বিভিন্ন তারা বা নীহারিকার আকার ও প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। এই তরঙ্গগুলির বিদ্যমানতা ও ব্যাপ্তি থাকলে বিভিন্ন নীহারিকা বা তারায় আকর্ষণ ইত্যাদি বল প্রবল হয়ে ওঠে।।+॥।।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— তদুপরান্ত নীহারিকাগুলির সমগ্র অংশে মন, বাণী বা প্রাণ থেকে এক ধরনের “পলাশ” নামক তরঙ্গের উৎপত্তি হয়। এগুলির উৎপত্তি হলে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুত-আবেশিত কণ প্রকাশ পেতে থাকে। পূর্ব “বিল্ব” তরঙ্গের সঙ্গে এদের যোগে সূক্ষ্মতম বৈদ্যুত-আবেশিত কণগুলির সংযোগ হয়ে অন্যান্য স্থূল আবেশিত কণগুলির সৃষ্টি হতে থাকে। উদাহরণতঃ কোয়ার্কের যোগে হ্যাড্রন, মেজন ইত্যাদির সৃষ্টি হতে থাকে। একই সময়ে সূক্ষ্ম নাভিকেরও উৎপত্তি আরম্ভ হয়। এ কারণে নীহারিকা বা তারায় বৈদ্যুত-আবেশিত কণগুলির সংখ্যা অত্যন্ত বেড়ে যায়। কণ ও প্রতিকণের মিলনে শক্তি উৎপন্ন হওয়ার ধারাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং বৃহৎ বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের উৎপত্তি হতে থাকে। এসবের ফলে সমগ্র পদার্থ অত্যন্ত তেজস্বী হয়ে ওঠে। কোনো নীহারিকা বা তারার পৃথক পৃথক পরিচয় তাদের দ্বারা উৎস্যর্জিত কিরণগুলির দ্বারাই হয়। এই “পলাশ” কিরণগুলি শক্তির উৎপত্তি, তা বহন করা এবং উপযুক্ত পথ প্রদান করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। এখনও নাভিকীয় সংলয়নের মতো ক্রিয়াগুলি আরম্ভ হতে পারে না। এই তরঙ্গগুলির প্রভাব নীহারিকা বা তারার আকর্ষণ বলের উপরও পড়ে, সূক্ষ্ম নাভিকের নির্মাণের প্রক্রিয়ায়। 

সায়ন ও মালবী ভাষ্য অনুবাদঃ

এবার দেখা যাক— খণ্ড ২.৬-এর শেষ চারটি কণ্ডিকার উপর সায়ণ ভাষ্য এবং ড. সুধাকর মালব্যের বাংলা অনুবাদ—

ষষ্ঠ ভাগে তিনি বলেন—

उदीचीनाँ अस्य पदो निधत्तात्‌ सूर्य चन्षुर्गमयताद्‌ वातं प्राणमन्ववसुजतादन्तरिक्षमसुं दिशः श्रोत्रं पृथिवीं शरीरमित्येष्वेवेनं तल्‍लोकेष्वादधाति ।। इति।

संज्ञप्पमानस्य पशोः पदः पादानुदीचीनानुत्तरदिग्गतान्निधत्तात्‌ू स्थापयत। चन्षुरिन्द्रियं सूर्यदेवतां प्रापयत | प्राणं वायुदेवतां प्रत्यन्ववसुजतात्‌ प्राययत। असुं जीवमन्तरिक्ष॑ प्रापयत। श्रोत्र॑ दिग्देवतां प्रापयत। शरीरं पृथिवीं प्राययत। तद्घागपाठेनैनं पशुमेष्वेव यथोक्‍्तदेवतासंबन्धिषु लोकेषु स्थापयति

এর পা-দুটি উত্তরদিকে স্থাপন করো, চোখকে সূর্য দেবতার অধীন করো, প্রাণকে বায়ু দেবতার প্রতি ছেড়ে দাও, জীবকে অন্তরীক্ষের জন্য, কানকে দিকসমূহের জন্য এবং শরীরকে পৃথিবীর জন্য [ছেড়ে দাও]। वस्तुतः এভাবে সেই অংশের পাঠে এই পশুটিকে ঐ ঐ দেবতাদের লোকসমূহে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

সপ্তম ভাগে তিনি বলেন—

एकथधा उस्य त्वचमाच्छयतात्‌ पुरा नाभ्या अपि शसो वपामुत्खिदतादन्तरेवोष्माणं वारयध्वादिति पशुष्वेव तत्प्राणान्‌ दधाति।। इति।

एकथचैकविधया विच्छेदराहित्येनास्य त्वचमाच्छयतात्समन्ताच्छिन्नां कुरुत। नाभ्या अपि शंसश्छेदात्‌ पूर्वमेव वपामुत्खिदतादुद्धरत । ऊष्माणमुच्छुवासमन्तरेव वारयध्वान्निवारयत पिहितास्यं संज्ञपयतेत्यर्थ: । तद्घागपाठेन पशुष्वेव प्राणान्‌ संपादयति।।

একটিমাত্র বিচ্ছেদের দ্বারা, বিচ্ছেদহীনভাবে তার ত্বক খুলে নাও— চারদিক থেকে অক্ষতরূপে করো। নাভির ছেদন পূর্বেই বপা অর্থাৎ ভুড়ি-উপভুড়ি ও অন্ত্রাদি উত্তোলন করে নাও। উষ্মাণ অর্থাৎ উচ্ছ্বাস-প্রশ্বাসকে মুখের ভিতরেই রোধ করো— নিবৃত করো, মুখ বন্ধ করে তাকে সংজ্ঞাহীন করারই অর্থ। এই অংশের পাঠের দ্বারা পশুতেই প্রাণসমূহকে সংহত করে।।

এর সম্পূর্ণ ত্বককে (বিচ্ছেদরহিত ভাবে) চারদিকে থেকে তুলে নাও এবং নাভি কাটার আগেই ভপা অর্থাৎ आतड़ियाँ বের করে নাও। তার শ্বাসকে (মুখ বন্ধ করে) ভেতরেই রোধ করো (অর্থাৎ মুখ বন্ধ করে সংজ্ঞাহীন করো)। এইভাবে ঐ অংশের পাঠে পশুদের মধ্যেই প্রাণসমূহকে সম্পাদিত করে।।

অষ্টম ভাগে তিনি বলেন—

श्येनमस्य वक्षः कृणुतात्‌ प्रशसा बाहू, शला दोषणी, कश्यपेवांसाउच्छिद्रे श्रोणी, कवषोरू स्रेकपर्णा उष्ठोवन्ता षड़विंशतिरस्य वड्क्रयस्ता अनुष्ठ्योच्च्यावयताद्‌ गात्रं गात्रमस्यानूनं कृणुतादित्यज्ञान्येवास्य तद्गात्राणि प्रीणाति।। इति।

श्येनं श्येनाकृतिकमस्य पशोर्वक्षः कुरुत। बाहू प्रशसा प्रकृष्टच्छेदनी कुरुत। दोषणी प्रकोष्ठी शला कृणुताच्छलाकाकारी कुरुत। उभावप्यंसी कश्यपाकारौ कुरुत। श्रोणी उभे अप्यच्छिद्रे अनूने कुरुत। कवषोरू कवषाकाराबूरू प्लेकपर्णा करवीरपत्नाकारावष्ठीवन्तावूरू मूलयुक्तौ कुरुत। अस्य पशोर्वड्क्रयो वक्राणि पार्श्वास्थीनि षड़्विंशतिर्भवन्ति । ताः सर्वा अनुष्ट्यानुक्रमेण स्वस्थानगतान्युच्च्यावयतोछ्धरत। गात्र गात्रं सर्वमप्यदनीयमड्मनूनं कृणुतादविकलं कुरुत। तद्घागपाठे तस्य पशोरज्ञान्येवावयवरूपाण्येव गात्राणि प्रीणाति। गात्रशब्द:ः शरीरे तदवयवे च वर्तते। अतो5त्रावयवविवक्षां ग्योतयितुमज्भानीति निर्देश: ।।

“এর বক্ষকে শ্যেন (=বাজ) পাখির আকৃতির মতো করো। এর দুইটি বাহুকে प्रशस (=কুড়াল) আকৃতির মতো, এর প্রकोষ্ঠগুলোকে (পিছনের দুটি পা) বর্শার ফলার আকৃতির মতো, এর কন্ধগুলোকে কচ্ছপের আকৃতির মতো, শ्रोণি (কূল–কোমর) অংশকে ছিদ্রহীন, উরুদ্বয়কে कवच (=ঢাল বা door leaves) আকৃতির মতো, দুটি হাঁটুকে सेक বৃক্ষ (করবীর বা কনেড়)–এর পাতার আকৃতির মতো করো। এই পশুটির পাঁজরের ছাব্বিশটি হাড় আছে— সেগুলোকে ক্রমানুসারে তাদের নিজ নিজ স্থান থেকে বের করে নাও।”

“এইভাবে এর অঙ্গ–অঙ্গকে সম্পূর্ণ রাখো, অর্থাৎ সকল অঙ্গ যেন এমনভাবে বের করো যে তারা পূর্ণ থাকে।” — এইভাবে ওই (অংশের পাঠ) দ্বারা এই পশুর শরীরের অবয়বরূপ অঙ্গসমূহকে সন্তুষ্ট করে।

নবম ভাগে তিনি বলেন—

ऊवध्यगोहं (উবধ্যগোহং) पार्थिव (পার্থিব) खनतादिति (খনতাদি) आहौषधं॑ (আহৌষধং) वा ऊवध्यमियं (উবধ্যমিয়ং) वा ओषधीनां (ওষধীনাং) प्रतिष्ठा (প্রতিষ্ঠা), तदेनत्स्वायामेव प्रतिष्ठायामन्ततः प्रतिष्ठापयति।। इति।

ऊतवध्यगोहं (উতবধ্যগোহং) पुरीषगूहनस्थानं (পুরীষগূহনস্থানং) पार्थिव खनतात् (পার্থিব খনতাত্) — পৃথিবীর সঙ্গে সংশ্রবের জন্য খনন কর। এখানে ऊवध्य (উবধ্য) শব্দ দ্বারা ओषधि (ওষধি)–কেই বলা হয়েছে, কারণ পুরীষ অর্থাৎ পশু–ভক্ষিত বস্ত্তটি ওষধিরই বিকার। ওষধীদেরও যেমন ভূমিই প্রতিষ্ঠা–আশ্রয়, তেমনি সত্যিই তাকে সেই ऊवध्य॑ (উবধ্যং) তার নিজস্ব ভূমিরূপ আশ্রয়েই পশুবিসর্জন–সমাপ্তিতে অন্ততঃ প্রতিষ্ঠিত করে।

এই মলকে লুকিয়ে রাখার জন্য ভূমিতে একটি গর্ত খনন কর। (পশু–ভক্ষিত বনস্পতি বিকার হওয়ায়) ओषधि (ওষধি)–ই ऊवध्य (উবধ্য = পুরীষ) এবং এই ভূমি ওষধিদের আশ্রয়স্থান। এইভাবে ऊवध्य (উবধ্য)–কে তার নিজ ভূমিরূপ স্বীয় আশ্রয়েই (পশু–মেথের) শেষে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।

আমার ব্যাখ্যান

এই সমগ্র খণ্ড ২.৬-এর উপর আমার ভাষ্য = ব্যাখ্যান এই রকম—

১. দৈব্যাঃ শমিতার আরভধ্বমুত মনুষ্যা ইত্যা।। য়ে চৈব দেবানাং শমিতারোয়ে চ মনুষ্যাণাং তানেব তৎসংশাস্তি॥ উপনয়ন মেধ্যা দুর আশাসানা মেধপতিভ্যাং মেধমিতি।। পশুর মেধো যজমানো মেধপতির্যজমানমেব তৎস্বেন মেধেন সমর্থয়তি॥ অথো खল্বাহুর্যস্যে वाव কস্যৈ চ দেবতায়ৈ পশুরালভ্যতে সেইব মেধপতিরিতি॥ স যদ্যেকদেবত্যঃ পশুঃ স্যান্‌মেধপতয় ইতি ব্ৰূয়াদ যদি দ্বিদেবত্যো মেধপতিভ্যামিতি যদি বহুদেবত্যো মেধপতিভ্য ইত্যেতদেব স্থিতম্।।

[শমিতা = যজ্ঞের কর্তা…, প্রাসঙ্গিক অভিধানসূত্র এখানে পূর্বের মতোই; মূল শৈলী রক্ষিত]

ব্যাখ্যান— পূর্বোক্ত মন এবং বাক্‌ তত্ত্ব নেবিউলা বা তারার ভিতরে বিভিন্ন দীপ্ত কণিকা বা তরঙ্গ এবং অল্পদীপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং নিম্নগতিসম্পন্ন ‘মানব’ নামক কণিকাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে ও ধরে রাখে। এইভাবে তারা বিভিন্ন প্রকারের সংযোগাদি প্রক্রিয়া সম্পাদনে সক্ষম হয়। এই মন ও বাক্‌তত্ত্ব ঐ কণা বা তরঙ্গগুলিকে বেগবান করে পরস্পর সংযুক্ত হওয়ার জন্য চারিদিক থেকে প্রবৃত্ত করে। এর ফলে সব কণাই একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে নৃত্যের ন্যায় আচরণ করে যুক্ত হতে থাকে। একইভাবে মন ও বাক্‌ বিভিন্ন দীপ্ত বা অল্পদীপ্ত লোককেও নিয়ন্ত্রণে এনে ধরে রাখতে আরম্ভ করে, ফলে সেই লোকগুলিও বিভিন্ন গতিসম্পন্ন হয়ে কম্পায়মান হতে থাকে।

এখানে আচার্য সায়ণ “दैव्याः शमितार आरमध्यमुत मनुष्या उपनयत मेध्यादुर आशासाना मेपतिम्यां मेथम्” (আশ্ব.শ্রৌ.৩.৩.১) উদ্ধৃত করে এটিকে মন্ত্ররূপে অভিহিত করেছেন এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাসও এই কন্ডিকাগুলিতে একেই উদ্ধৃত করেছেন। এই কারণে আমরা মানি যে এই ছন্দরশ্মি উপরে উক্ত সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় মন ও বাক্‌তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। এটিকে আচার্য সায়ণ ‘অধিগুḥ প্রেষ’ মন্ত্ররূপে চিহ্নিত করেছেন। এর তাৎপর্য এই যে, এই ছন্দরশ্মি তীব্র বিদ্যুৎযুক্ত বায়ু এবং ঔষ্ম্যকে সমৃদ্ধ করে।

উপরোক্ত ছন্দরশ্মির পূর্বার্ধই দীপ্ত ও অদীপ্ত কণা বা তরঙ্গকে মনস এবং বাক্‌তত্ত্বের সংযোগে নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এই অংশ দ্বারা উদ্বুদ্ধ মনস ও বাক্‌তত্ত্ব আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে তারা উল্লিখিত উভয় প্রকারের কণা ও তরঙ্গকে ধরে রাখার জন্য অধিকতর সমর্থ হয়।

এরপর উল্লিখিত ছন্দরশ্মির উত্তরার্ধ প্রভাবী হয়। এখানে ঐতরেয় মহীদাস বলেন যে পশুই মেধ, এর তাৎপর্য এই যে বিভিন্ন দৃশ্যমান কণা, ছন্দ বা মরুতরশ্মি—সবকিছুই সংযোজনযোগ্য। এদের সংযোজনে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া সম্ভব হয় এবং এই পদার্থগুলি সময়সময়ে বিভক্ত হয়ে অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, যার ফলে বিভিন্ন তত্ত্বের নির্মাণ অব্যাহত থাকে। এরপর মহর্ষি বলেন— যজমানই মেধপতি। এর অর্থ—বিভিন্ন তারা বা নেবিউলাদি লোক এই সংযোজনযোগ্য পদার্থের ভান্ডার এবং তারাই এগুলির দ্বারা পালিত ও রক্ষিত হয়। এই নেবিউলা ও তারাদি লোকের সংবর্ধন ও পরিচালনার জন্য এই ঋকার দ্বিতীয়ার্থ বিভিন্ন সংযোজনযোগ্য পথ এবং অপ্রকাশিত বিদ্যুত্বায়ু নিয়ন্ত্রণকারী তীব্র প্রভাময় রশ্মি, এবং বিভিন্ন সংযোজনযোগ্য কণা ও তরঙ্গকে আকর্ষণ করে পারস্পরিক নিকটবর্তী করতে সাহায্য করে। তদ্বারা নির্মিত বিভিন্ন লোককেও পরস্পর যুক্ত রাখার জন্য উপযুক্ত স্থান প্রদান করতে সহায়ক হয়। এইভাবে এই রশ্মির উত্তরার্থ থেকে কণা বা লোক সমূহ পরস্পর সমৃদ্ধ ও সংযুক্ত হয়।

এই প্রসঙ্গে মহর্ষি বিদ্বজ্জনের মত উদ্ধৃত করেন যে— যে দীপ্ত কণার নিকটে যে দৃশ্যমান কণাকে আনা হয়, সেই দীপ্ত কণাই তার নিয়ন্তা ও রক্ষক হয়ে ওঠে; অথবা যে দীপ্ত কণার মধ্যে যে মরুত বা ছন্দরশ্মি বর্তমান থাকে, সেই দীপ্ত কণাই তাদের পালক ও রক্ষক হয় অথবা সেই কণাই তাদের দ্বারা পালিত ও রক্ষিত হয়। একইরূপে যে যে লোকের মধ্যে যে প্রाणাদি পদার্থ বর্তমান, সেগুলিই ঐ লোকসমূহের পালক ও রক্ষক।

এখানে মহর্ষি বলেন— যেখানে ‘মেধপতয়ে’ শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়, সেখানে বুঝতে হবে যে দৃশ্যমান কণা, ছন্দ বা মরুতরশ্মি একটি মাত্র লোকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; আর যেখানে ‘মেধপতিম্যাম্’ এবং ‘মেধপতিভ্যঃ’ পদগুলির প্রয়োগ দেখা যায়, সেখানে তারা ক্রমান্বয়ে দুই ও বহু দীপ্ত কণা বা লোকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—এমনটি জানা উচিত।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার— মন এবং বাক্‌তত্ত্ব সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন কণা ও তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণকারী ও ধারণকারী; এই কারণেই তারা বিভিন্ন সংযোগ-প্রক্রিয়াকে সম্ভব করে। যখন কোনো দুটি কণা পরস্পর যুক্ত হতে থাকে, তখন তারা সরাসরি যুক্ত না হয়ে একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে নৃত্যের ন্যায় যুক্ত হয়। সেই সময়ে এক প্রকার ছন্দরশ্মি উৎপন্ন হয়ে মন ও বাক্‌তত্ত্বকে অধিকতর উদ্বুদ্ধ করে, ফলে সংযোজনক্রিয়া অধিকতর তীব্র হয়। এই মন ও বাক্‌তত্ত্ব ঐ ছন্দরশ্মি দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন লোককেও পরস্পর যুক্ত রাখতে কিছুটা সহায়তা করে।

২. প্রাস্মা অগ্নিং ভরতেতি।। পশুর্বে নীয়মানঃ স মৃত্যুং প্রাপশ্যত্। স দেবান্নান্ব কাময়তৈতুং তং দেবা অনবলুবন্নেহি স্বর্গ বৈ ত্বা লোকং গময়িষ্যাম ইতি স ততখথেত্যব্রবীত্। তস্য বৈ মে যুষ্মাকমেকঃ পুরস্তাদৈত্বি। তথেতি। তস্যাগ্নিঃ পুরস্তাদৈত্। সো উগ্নিমনু প্রাচ্যবত।। তস্মাদাহুরাগ্নেয়ো বাভ সর্বঃ পশুর অগ্নিং হি সোডনু প্রাচ্যবতেতি।। তাস্মাদ্ ব্যস্যাগ্নি পুরস্তাদ্ধরন্তি। স্তৃণীত বর্হিরিত্যোষধ্যাত্মা বৈ পশুঃ পশুমেবা তৎসর্বাত্মানং করোতি।। অন্বেনং মাতা মন্যতামঅনু পিতাঽনুভ্রাতা সগভ্যোऽনু সখা সযূথ্য ইতি জনিত্রৈরেবৈন তৎসমানুমতমালাভন্তে॥ উদীচীনাং অস্য পদো নিবদ্ধত্তাত্ সূর্য চক্ষুর্গময়তাড্ বাতং প্রাণমন্ববসৃজতাদন্তরিক্ষমসুং দিশঃ শ্রোত্রং পৃথিবী শরীরমিত্যেষ্বেবৈন তল্লোকেষ্বাদধাতি॥

[ভাতা = ভাতা মধ্যমোऽস্ত্যশণঃ, ভাতা ভারতেরহরতিকর্মণো হরতে ভাগ ভর্তব্যো ভবতীতি বা, তৃতীয়ো আতা ঘৃতপৃষ্ঠো অস্যায়মগ্নিঃ (নি.৪.২৬)। পিতা = প্রাণো বৈ পিতা (ঐ. ২.৩৮), মনঃ পিতরঃ (শ. ১৪.৪. ৩. ১৩), পিতা ও প্রযাজাঃ (তৈ.সং. ২.৬.১.৬)। মাতা = মাতৃভত্ পরিপালিকা বাকূ (তু.ম.দ.ঋ.ভা. ১.১২১.২), মান্যকারিণী রশ্মিঃ (তু.ম.দ.ঋ.ভা. ১.৮২.১), আকাশঃ (তু.ম.দ.অ.ভা.৩.২৬.১১), মাতাঃ অন্তরিক্ষম্, নির্মীয়ন্তে অসমিন ভূতানি (নি.২.৮)]

ব্যাখ্যানম্ – তদুপরান্ত প্রাস্মা অগ্নিং ভারত স্তৃণীত বর্হিরন্যেনং মাতা মন্যতামঅনু পিতাঅনুভ্রাতা সংগভ্যোऽনুসখা সযূথ্যঃ। (আশ্ব.শ্রী.৩.৩.১) ছন্দ রশ্মির উৎপত্তি হয়। এর ছন্দ আর্পী বৃহতী তথা দেবতা অগ্নি প্রতীত হয়। এটি ঋচাসমূহে বিদ্যমান নয়। এই বিষয়ে আমাদের মত পূর্ববৎ বোঝা উচিত।

এর ছান্দস এবং দৈবীক প্রভাবে অগ্নি উপাদান ব্যাপক হয়। অন্যান্য প্রভাবের ক্রমশঃ বর্ণনা কন্ডিকায় করা হয়েছে। যখন দুটি কণার পরস্পর সংযোগ হতে থাকে, তখন তা সর্বপ্রথম অগ্নি অর্থাৎ বিদ্যুৎ ধারণ করে এবং বিদ্যুতের দ্বারা তারা পরস্পর আকৃষ্ট হয়। এই বিদ্যুৎ উপাদানও পূর্বোক্ত নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান মন ও বাক দ্বারা উৎপন্ন হয় এবং তারা নিজেই সেই বিদ্যুৎ উপাদানের পোষকও হয়।

যখন কোনো কণা অন্য কণার নিকটে আনা হয়, তখন সর্বপ্রথম তার মুখোমুখি মৃত্যু আসে। অর্থাৎ প্রথমে অপ্রকাশিত, হিংসাত্মক বিদ্যুৎ বায়ু তার পথে বাধা হিসেবে উপস্থিত হয়। এইভাবে বিভিন্ন লোক, ছন্দ বা মরুতের সব সংযোগ প্রক্রিয়ায় একই উপাদান বাধা হিসেবে উপস্থিত থাকে, যার কারণে সংযুক্ত হওয়া পদার্থের গতি হঠাৎ থেমে যায়। প্রাণ ইত্যাদি প্রাথমিক উপাদান বাধা প্রভাবিত না হলে গতি রাখতে সক্ষম হয়।

যখন সংযোগযোগ্য কণার গতি থেমে যায়, তখনও প্রাণাদি পদার্থ গতি রাখে। এর পরও কণা অপ্রকাশিত, হিংসাত্মক বিদ্যুৎ অতিক্রম করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে প্রাণাপান ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত তীব্র বৈদ্যুতিক অগ্নি ওজরূপ হয়ে বাধা বিদ্যুতকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে এবং কণাকে নিরাপদ পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর কণাও ওজরূপ বৈদ্যুতিক অগ্নির পেছনে চলতে চলতে সম্মুখ কণার সাথে সংযুক্ত হওয়ার দিকে অগ্রসর হয়।

দুটি কণার মধ্য সংযোগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রাণ, ছন্দ রশ্মি রূপ প্রাণ ইত্যাদির সংযোগ ও সহযোগিতা থাকে, তবে হিংসাত্মক বাধা বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণে তীব্র বৈদ্যুতিক শক্তি সম্পন্ন বায়ুর আঘাতই সক্ষম। তাই সংযোগযোগ্য কণা তার গতিশীল অবস্থায় এগিয়ে চলে।

প্রত্যেক সংযোগযোগ্য কণা তীব্র বৈদ্যুতিক অগ্নি অনুসরণ করে, তাই প্রতিটি কণা অবশ্যই বৈদ্যুতিক অগ্নি দ্বারা সমৃদ্ধ হয় এবং এই বিদ্যুৎ অগ্নিই কণার চলাচলে সাহায্য করে। বিদ্যুত অগ্নি কণার আগে-২ চলে। অর্থাৎ কোনো কণার থেকে বিদ্যুৎ রশ্মি সামনে প্রবাহিত হয়। এই রশ্মি সম্মুখে থাকা কণাকে আকৃষ্ট করে এবং নিজের অনুসারী কণাকে নিজের সঙ্গে বেঁধে এগিয়ে নিয়ে যায়। মনে করুন, বিদ্যুৎ রশ্মি বিভিন্ন কণার বাহক হিসাবে কাজ করে।

তাই বলা হয়েছে – "अग्निदेवानामभवत् पुरोगाः" (কাঠ. ১৬.২০), দেবরত্থো বা অগ্নয়ঃ (কৌ.ব্রা.৫.১০), অর্থাৎ এই বিদ্যুত অগ্নি সকল দিভ্য কণার রথ। এছাড়াও বলা হয়েছে – "अग्निरु सर्वेषां पাপ্মनामपहन्ता" (শ.৭.৩.২.১৬), অর্থাৎ এই বিদ্যুত অগ্নি বাধা উপাদান দূর করে সংযোগ প্রক্রিয়ার পথ প্রশস্ত করে।

উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় “প্রাস্মা অগ্নিং ভারত” এই অংশের ভূমিকা থাকে।।+॥।।

তদনন্তর "स्तृणीत बर्हिः" কে প্রভাবের আলোচনা করা হয়—
যখন দুইটি সংযোগযোগ্য কণ পরস্পর সংযুক্ত হওয়ার জন্য নিকট আসে, তখন তাদের চারপাশ বিশেষত দুটির মধ্যবর্তী आकाश तत्व কিছু প্রসারিত হয়। তাদের মধ্যে প্রচারিত विद्युत् রশ্মি ও কিছু প্রসারিত হয় [औषधি - औषधय ओষद्धयन्तीति वा, ओषत्येना धयन्तीति वा, दोष धयन्तीति वा (नि. ৬.২৭)]। এই প্রভাবে তারা সংযোগযোগ্য কণ একে অপরের প্রচারিত বিদূৎ রশ্মি গ্রহণ করতে শুরু করে। একই সঙ্গে সেই বিদ্যুতাগ্নি দুটির মধ্যবর্তী অপ্রকাশিত বাধা विद्युत् রশ্মি শোষণ বা ধ্বংস করে। এছাড়াও, এই বিদূৎ রশ্মি আত্মরূপ হয়ে উভয় কণের ভিতরে ক্রমাগত বিচরণ শুরু করে এবং কণগুলোর বাইরে মিলিতভাবে বিস্তৃত হয়। এভাবে দুই কণ সেই विद्यুত্ রশ্মি দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ এবং নিয়ন্ত্রিত হয়।

এরপর সেই সংযোগযোগ্য কণগুলির মাতা-পিতা, মাতা ও সখা সকলেই সেই কণগুলির সংযোগের সময় তৎক্ষণাৎ উদ্ভাসিত বা সক্রিয় হয়। অর্থাৎ মনরূপ পিতা ও বাকরূপ মাতা একত্রিত হয়ে সংযোগযোগ্য কণকে উদ্ভাসিত ও প্রেরণা দেয়। অন্যদিকে প্রাণরূপ পিতা ও বাকরূপ মাতা একত্রিত হয়ে কণগুলিকে উদ্ভাসিত ও প্রেরণা দেয়। পূর্বোক্ত প্রযাজারূপ ছন্দ রশ্মি রূপ পিতা, যাজ্যা সংজ্ঞক রশ্মির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে আকাশ উপাদানরূপ মাতা-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে কণগুলিকে উদ্ভাসিত ও প্রেরণা দেয়। মাতা অর্থাৎ অগ্নি এবং বায়ুর মিশ্রিত রূপ বা কণকে ধারণ ও পুষ্টি দেওয়ার সূত্রাত্মা বায়ু সেই কণগুলিকে প্রেরণা এবং বাঁধতে সহায়ক হয়।

নিজ দলের বিভিন্ন প্রাণের যুগ্মরূপ সखा সেই কণগুলিকে প্রেরণা ও উদ্ভাসিত করে। এই প্রাণ যুগ্ম সবসময় ঐ প্রাণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং এই প্রাণ, যেগুলিতে ছন্দাদি প্রাণও অন্তর্ভুক্ত, প্রকৃতপক্ষে এই কণগুলির স্রষ্টা। এদের সকলের উদ্ভাসন ও প্রেরণার মাধ্যমে কণগুলির সংযোগ ও বিচ্ছেদ সম্ভব হয়।

[সূর্যম্ = সরণশীল স্বকীয় রশ্মিগণ (ম.ব.অ.ভা. ১.৩৫.৮), প্রাণাদি সমূহের বায়ু গোষ্ঠী (ম.দ.য. মা.৩.৬), বাহতো वा এষ্যই তাপিত (কি.ব্রা. ১৫.৪.২৫.৪)। চক্ষুঃ - চতুর্যেব বৃদ্ধি (শ. ১৪.৬.১০.৮), বশুরুষ্ণিক (শ. ১০.৩.১.১), শ্রেষ্ঠুম চক্ষুঃ (তা.২০.১৬.৫)। অসু: - নাগাদি মারুত (ম.দ.প.ভা. ১৮.২), প্রজ্ঞনাম (নিঘং.৩.৮)। শ্রীত্রম্ = বাকৃতি শ্রীত্রম্ (জা.উ.৪.১১.১.১১), অবকাশমূ (তু.ম.দ.য. মা.৩২.১৩), শ্রীত্রম্ পংক্তি: (শু. ১০.৩.১.১)। দিক্ = ছন্দোসি যে দিশ: (২.৮.৩.১.১২), দিশো যে পরিভূশ্ছন্দ: (শ.৮.৫.২.৩), দিশ: পরিধমঃ (তে.বা. ২.১, ৫.২)]

যখন কোনো কণ অন্য কণের সঙ্গে সংযোগের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে, তখন তার উত্তরি ধ্রুব (উত্তর धुव) সামনে থাকে অর্থাৎ তার গতি উত্তরি ধ্রুবের দিকে চলে যায়। সেই কণের ভিতরে উদ্ভাসিত ত্রিষ্টুপ ও উষ্ণিক ছন্দময় বৈদ্যুতিক তেজ পরবর্তী কণের চারপাশে বিস্তৃত বৃহৎ ছন্দ এবং এই কণগুলির চারপাশে বিস্তৃত প্রাণবায়ুর সঙ্গে মিলিত হয় বা সেগুলির মধ্যে প্রবেশ করে। সেই কণের ভিতরে বিদ্যমান প্রाणাপান প্রাণ কণগুলোর বাইরে অবস্থানরত সূত্রাত্মা বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। দুই কণের মধ্যে বিদ্যমান আকাশ উপাদান নাগ, কূর্ম ইত্যাদি উপপ্রাণরূপ মারুত রশ্মি দ্বারা বিস্তৃত হয়। সেই কণের ভিতরে বিদ্যমান বাক্ উপাদান এবং তলপ্রেরিত পণ্ডিত ছন্দ অন্য কণের চারপাশে বা নিজের চারপাশে বিদ্যমান ছন্দ রশ্মিতে বিস্তৃত হয় এবং কণগুলির আকার নিকট আসার সময় কিছুটা প্রসারিত হয়। এভাবে এই ছন্দ রশ্মি অংশের প্রভাবে কণগুলির মিলনের পরিস্থিতি সঠিকভাবে তৈরি হয়।

জ্ঞাতব্য়ঃ— এই প্রক্রিয়ায় যে বিভিন্ন কণের সংযোগের আলোচনা করা হয়েছে, প্রায় একই প্রক্রিয়া স্থূল এবং বৃহত্তর পদার্থের সংযোগে ও ঘটে। আমরা তার আলোচনা এখানে করি নি। পাঠক নিজেই এই প্রক্রিয়া বুঝে স্থূল পদার্থের মিলনের প্রক্রিয়া উপলব্ধি করতে পারে।

বৈজ্ঞানিক ভাষ্যসার—
যখন দুই কণের মধ্যে পরস্পর সংযোগ ঘটে, তখন মন এবং বাক্ উপাদানের মাধ্যমে বিদ্যুত্‌ আভ্যন্তরীণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। যখন কণগুলো নিকট আসে, তখন তাদের মধ্যবর্তী অপ্রকাশিত শক্তি বাধা হিসেবে উপস্থিত হয়, যার ফলে সেই কণগুলোর গতি হঠাৎ থেমে যায়। জ্ঞাতব্য যে প্রাণ ও আপান ইত্যাদির গতি অপ্রকাশিত শক্তি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় না। প্রাণ, আপান থেকে উৎপন্ন তীব্র বিদ্যুত্‌ সেই অন্ধকার শক্তিকে ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করে কণগুলির সামনে চলে যায় এবং তাদের জন্য নিরাপদ পথও সরবরাহ করে। সেই নিরাপদ পথ বরাবর কণগুলো পরস্পরের দিকে গতিশীল হয়ে ওঠে।

প্রতিটি সংযোগযোগ্য কণের সঙ্গে বিদ্যুত্‌ ধন, ঋণ বা উদাসীন আভা অবশ্যই থাকে। সেই আভাই উভয়কে পরস্পরের দিকে আকর্ষণ করার প্রধান ভূমিকা পালন করে। যখন কণগুলো নিকট আসে, তখন তাদের মধ্যবর্তী আকাশ উপাদান ও বিদ্যুত্‌ চুম্বকীয় ক্ষেত্র কিছুটা প্রসারিত হয়। এর ফলে কণগুলো পরস্পরের প্রচারিত বিদ্যুত্‌ চুম্বকীয় তরঙ্গ গ্রহণ করতে শুরু করে এবং অপ্রকাশিত শক্তির তরঙ্গ থেকে মুক্ত হয়। তাদের মধ্যবর্তী বিদ্যুত্‌ রশ্মি মিলিতভাবে বিচরণ করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

এই প্রক্রিয়ায় মন এবং বাক্ উপাদানের মিলন রূপ, পূর্বোক্ত প্রযাজারূপ ছন্দ রশ্মি এবং যাজ্যা সংজ্ঞক ছন্দ রশ্মির মিলন, অগ্নি ও বায়ুর মিলন এবং বিভিন্ন ছন্দের যুগল—all কণগুলোকে প্রভাবিত ও উদ্ভাসিত করতে শুরু করে। যখন কোনো কণ সংযোগের জন্য এগিয়ে আসে, তখন তা তার উত্তরের ধ্রুবের দিকে এগোয়, অর্থাৎ এটি একই দিক বা দক্ষিণ দিক থেকে সংযুক্ত হয়। এই সময় দুই কণের ছন্দ রশ্মি সংযুক্ত হতে শুরু করে। প্রাণাপান ইত্যাদি প্রাণ সূত্রাত্মা বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হতে থাকে। নাগ, কূর্ম ইত্যাদি মারুত রশ্মি দুই কণের মধ্যবর্তী আকাশ উপাদানে বিস্তৃত হয় এবং বাক্ উপাদান ও পংক্তি ছন্দ রশ্মি অন্যান্য ছন্দ রশ্মির সঙ্গে বিস্তৃত হয়। এভাবে দুই কণের সংযোগ প্রক্রিয়া ক্রমাগত এগিয়ে চলে।

জ্ঞাতব্য়ঃ— এই প্রকরণে যে বিভিন্ন কণের সংযোগ প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, প্রায় একইভাবে স্থূল কণ, যেমন—অণু, অন্যান্য বড় কণ, আকাশীয় পিণ্ড এবং বিশাল বিশ্বের সংমিশ্রণও ঘটে, যা আমরা পৃথকভাবে দেখাইনি। পাঠক এই প্রক্রিয়াটি গভীরভাবে বোঝার মাধ্যমে সেই স্থূল প্রক্রিয়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।

৩. একধাউস্য ত্বচমাচ্ছয়তাৎ পুরা নাভ্যা আপি শসো বপামুত্খিদতাদন্তরেওষ্মাণং বারয়ধ্বাদিতি পশুষ্বেব তৎপ্রাণান্‌ দধাতি।। শ্যেনমস্য বক্ষঃ কৃণুতাৎ প্রশসা বাহূ, শলা দোষণী, কশ্যপেভাঁসাছেড়্রে ওণী, কবষোরূ স্রেকপর্ণা উষ্ঠীবন্তা ষড়বিংশতিরস্য ওড়ক্রয়স্তা অনুষ্ট্যোচ্চ্যাবয়তাদ গাত্রং গাত্রমস্যানুনং, কৃণুতাদিত্যজ্ঞান্যেভাস্য তদ্গাত্রাণি প্রিণাতি।। ঊবধ্যগোহং পার্থিভ খনতাদিত্যাহৌষধ্য় বা ঊবধ্যমিয়ং বা ঔষধীনার প্রতিষ্ঠা, তদেনত্স্বায়ামে প্রতিষ্ঠায়ামন্ততঃ প্রতিষ্ঠাপয়তি।।৬।।

(ত্বক্ – তনোতি বিস্তৃতা ভবতিতি त्वক্‌ (উ.কো.২.৬৪), যস্ত্বচতি সংবৃণোতি সঃ (বায়ুহ:) (ম.দ.য.ভা.৪.৩০), আচ্ছাদকঃ (তু.ম.দ.ঋ.ভা.১.১২৬.৩)। নাভিঃ – মধ্যাকর্ষণে বন্ধকম্‌ (ম.দ.য.ভা.২৩.৬১), আকর্ষণে বন্ধনম্‌ (ম.দ.ঋ.ভা.১.১৬৪.৩৫), স্তম্ভনং, স্থীরীকরণং, প্রবন্ধনম্‌ (ম.দ.য.ভা.১৭.৮৬), ধারকমড্জম্‌ (ম.দ.য.ভা.২৩.৫৬), আধারঃ (প্রজ্ঞাপিকা বিদ্যুত্‌ - তু.ম.দ.য.ভা.১৩.৪৪), অত তৃষ্টুপ্‌ নাভিরে সা (জৈ.ব্রা.৯.২৫৪)।) (বাপা – বপন্তি যাভৃঃ ক্রিয়াভিস্তা: (ম.দ.য.ভা.২১.৩১), আত্মা বপা (কৌ.ব্রা.১০.৫), ছিদ্রম্‌ (আপ্টে কোষ)।)

ব্যাখ্যানম্‌ – পূর্বোক্ত প্রসঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে বলা যায় যে, যখন দুই কণের মধ্যে সংযোগ ঘটে, তখন তাদের নিকট আসার সময় উভয়ের চারপাশে বিদ্যমান বিভিন্ন ছন্দ রশ্মি, সূত্রাত্মা বায়ু এবং পূর্ববর্ণিত প্রাণের ঘেরা প্রথমে ভারী কম্পন ঘটে। সেই ঘেরাটি হল কোনো কণ বা বিশ্বের আচ্ছাদক ত্বক আকার। উভয় নিকট এলে সেই আচ্ছাদক ঘেরাটি একবারে সরিয়ে যায়। ঘেরার অপসারণের পরও সেই কণ বা বিশ্বের কেন্দ্রীয় অংশ অত্যন্ত অস্থির হয়, তবে তাদের কম্পনের আগে কণ বা বিশ্বের পুরো অংশ, যা পরস্পর মিলনশীল, তাতে অত্যন্ত তীব্র ছেদ ক্রিয়া ঘটে। অর্থাৎ পুরো অংশই উথল-পাথল হয়ে যায়। মনে হয় যেন তা বিভিন্ন শক্তির দ্বারা খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়।

এরপর সেই কণ বা বিশ্বের কেন্দ্রীয় অংশে বিদ্যুত্‌ আগ্নি এবং আকর্ষক উপাদানও তাদের স্থান থেকে বিচ্যুত হয়। জ্ঞাতব্য যে কণ বা বিশ্বের পুরো অংশের উথল-পাথল ক্রিয়াগুলি উপরের দিকে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সেই কণ বা বিশ্বের মধ্যবর্তী অংশে, নাভিরূপে থাকা ত্রিষ্টুপ্‌ প্রাণাদির অবস্থান, যদিও স্থানচ্যুত হয়, তবে তা কণ বা বিশ্বের ভিতরে আটকে থাকে, অর্থাৎ বাইরে বেরোতে পারে না। এইভাবে বিশেষ আন্দোলিত প্রক্রিয়া সেই কণ বা বিশ্বের বাহ্যিক অংশে ঘটে এবং ভিতরে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রাণাদি পদার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে।

যখন দুই কণ বা বিশ্ব নিকট আসে, তখন তাদের উপরের এবং সম্মুখ দিকে বিদ্যমান পদার্থ অত্যন্ত তীব্র গতিতে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। তখন মনে হয় যে তাদের অন্যান্য নিকটস্থ অংশের পদার্থও সংরক্ষিত হয়ে সেই দিকেই প্রবল গতিতে বাড়ছে। এই ক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত এবং শক্তিশালীভাবে ঘটে। উভয় কণের বাহুরূপ বায়ু এবং বিদ্যুত্‌, তাদের প্রভাবে প্রাণাপান ও প্রাণদান এবং অতি সূক্ষ্ম স্তরে মন এবং বাক্‌ উপাদান বিশেষ সক্রিয় হয়। জ্ঞাতব্য যে কণ বা বিশ্বের ধারণ এবং আকর্ষণ শক্তি, যা তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে, তা এই বায়ু, বিদ্যুত্‌ ইত্যাদি যুগলের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। সংযোগের সময় এই শক্তি অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে।

এই প্রক্রিয়ায় কণ বা বিশ্বের কেন্দ্রগুলোকে মিলনকারী রেখার লম্বাংশের নিকটে থাকা বাহ্যিক অংশগুলি সংযোগের সময় উদ্দীপ্ত হয়ে বিকৃত হয়। যদিও তাদের বিকৃতি পূর্বে মন্থর আন্দোলন থেকে শুরু হয়, পরে তা তীব্র গতিতে ঘটে। উপরোক্ত বায়ু, বিদ্যুত্‌, প্রাণাপান ও প্রাণদানের মূলের মধ্যে কূর্ম প্রাণ সংযুক্ত থাকে। সেই কূর্ম প্রাণই মন এবং বাক্‌ সহ অন্যান্য তিন যুগলকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে চেতন শক্তি পরমাত্মা রূপী সর্বকর্ত্তা কূর্ম সকল শক্তিকে মূলরূপে প্রেরণা দেয়। তার প্রেরণা সর্বশেষ প্রেরণা, যার ব্যতীত এই সম্পূর্ণ সৃষ্টিতে কোনো শক্তি কার্যকর হতে পারে না।

বিভিন্ন কণ বা বিশ্বের কেন্দ্র এবং অবশিষ্ট অংশকে সংযুক্ত করা ক্ষেত্র ক্রমাগত চলমান থাকে। অর্থাৎ, এই অংশের উপর তারা উভয় অংশ পরস্পর ফিসলতে থাকে। পদ “শ্রোণু সংঘাতে” ধাতু থেকে উদ্ভূত হয়, যা স্পষ্ট করে যে এই অংশ কণ বা বিশ্বকে পরস্পরের সঙ্গে বাঁধে। তারা এই অংশে ফিসললেও কখনো আলাদা হয় না, বরং দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। এই ওণি অংশে জগতী ছন্দ রশ্মির প্রধানতা থাকে। ক্ষেত্র অছিদ্র। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় এবং অবশিষ্ট অংশের মধ্যে পদার্থের চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট পথ থাকে না, বরং পদার্থ ঝরে প্রবাহিত হয়।

এই প্রক্রিয়ায় বিস্তৃত স্তরে শব্দ উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ তারা বা বিভিন্ন কণের মধ্যে এই ওণি অংশে পদার্থের বিসরণের সময় ক্রমাগত শব্দ থাকে। এর দুই পাশের অংশের গতি অচ্যুত থাকে, অর্থাৎ তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে বাঁধা থেকে ফিসলতে থাকে, ভেঙে যায় না। সংযোগযোগ্য কণ বা বিশ্বে ছাব্বিশ প্রকারের কুটিল গতি থাকে। মনে হয়, যখন দুই কণ বা বিশ্ব সংযোগে আসে, তখন তাদের ভিতরের বিভিন্ন প্রাণাদি পদার্থ তীব্র এবং বিচিত্র গতি করতে শুরু করে। সেই গতি ছাব্বিশ প্রকারের হয়। সবই বক্ররেখীয়। কোনো সরলরেখীয় গতি নেই। সব গতি সম্পন্ন হলে, সমস্ত গতিশীল পদার্থ তাদের কুটিল ও অস্থায়ী গতি বন্ধ করে, এবং পরে সেই বিশ্ব বা কণের সমস্ত অংশ পূর্বের সাম্য অবস্থায় ফিরে এসে একটি নতুন পূর্ণ কণ বা বিশ্বের রূপ গঠন করে।

এইভাবে সেই কণ বা বিশ্বের প্রতিটি অংশ পরস্পরকে আকর্ষণ করে, তৃপ্ত ও সুষম রাখে।



Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

নাসদীয় সূক্ত

অথ নাসদীয় সূক্তম্ ভূমিকা— নাসদীয় সূক্ত বেদের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সূক্ত। ‘ন অসৎ’ এই পদগুলির দ্বারা সূচনা হওয়ার কারণে এই সূক্তের নাম নাসদ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ