ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

01 April, 2026

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

01 April 0

 বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

প্রশ্ন- পরমাত্মা সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের বহু মানুষের মধ্যে কেবল চার ঋষিকেই জ্ঞান কেন দিলেন? কি ঈশ্বর পক্ষপাতী? আবার এই প্রশ্নও আছে যে পরমাত্মা তাঁর জ্ঞান বৈদিক ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষাতেই কেন দিলেন? এতে কি অন্যান্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে ভেদভাব বা দোষ পরমেশ্বরের উপর আসে না?

উত্তর- এটি সত্য যে সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে বহু স্ত্রী-পুরুষ যুগল উৎপন্ন হয়। তারাও পূর্ণ যৌবন অবস্থায় পৃথিবী-রূপী গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়। যারা পূর্ণ যৌবন অবস্থা ও ভূমি থেকে উৎপত্তি নিয়ে সন্দেহ করেন, তাদের মহর্ষি দয়ানন্দ কৃত ‘সত্যার্থ-প্রকাশ’ এবং মদ্রচিত ‘সত্যার্থ প্রকাশ উভরতে প্রশ্ন-গর্জতে উত্তর’ নামক গ্রন্থগুলি পড়ার চেষ্টা করা উচিত। বিস্তারের ভয়ে আমরা এই বিষয়টি এখানে ছেড়ে দিচ্ছি। তদুপরি প্রত্যেক বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার পাঠক এটি মানবে যে প্রথম প্রজন্মের উৎপত্তি কেবল এইভাবেই সম্ভব।

সেই প্রথম প্রজন্মে সেই চার ঋষিই সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও সামর্থ্যসম্পন্ন ছিলেন। এই কারণে তাঁদেরই জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা সকলকে জ্ঞান প্রদান করতে পারেন। সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞান দেওয়ার বিষয়ে সন্দেহের প্রসঙ্গে জানা উচিত যে সেই সময় সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ভাষার উৎপত্তিই হয়নি। যা উৎপন্ন হয়েছিল তা কেবল সংস্কৃত বৈদিক ভাষাই ছিল, তাও বৈদিক ছন্দের রূপে। পরে সেই ঋষিরাই এই ভাষাকে কথ্য ভাষায় ব্যবহার করেছিলেন। কালক্রমে সংস্কৃত ভাষা থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বে বহু ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে সংস্কৃত ভাষাই সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছে। আজ বিশ্বজুড়ে এটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে সংস্কৃত ভাষাই সমস্ত মানব ভাষার জননী। এই কারণে সংস্কৃত ভাষায়ই জ্ঞান দেওয়া অনিবার্যও ছিল এবং নিরপেক্ষতাও ছিল।

প্রশ্ন- যদি ছন্দ অন্য কোনো ভাষা যেমন হিন্দি, ইংরেজি, চীনা, আরবি ইত্যাদি কোনো এক ভাষায় হতো এবং সেই ভাষা থেকে অন্যান্য ভাষার উৎপত্তি হয়ে যেত, তবে কী অসুবিধা ছিল? ঈশ্বরের কি কেবল সংস্কৃত ভাষার প্রতিই প্রেম ছিল? এটি কি সংস্কৃত ভাষাবিদদের নিজস্ব কল্পনা ও পূর্বাগ্রহ নয়?

উত্তর- হ্যাঁ, যেখানে পর্যন্ত কোনো এক ভাষার প্রথম উৎপত্তির প্রশ্ন, সেখানে পর্যন্ত আপনার প্রশ্ন যথার্থ ও স্বাভাবিক। আমরা 'বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান' নামক অধ্যায়ে স্পষ্ট করব যে বৈদিক সংস্কৃত ভাষার শব্দগুলির সঙ্গে তাদের অর্থের সম্পর্ক নিত্য। যে শব্দের যে অর্থ, সেই অর্থ কোনো মানুষ নিজের কল্পনা থেকে গ্রহণ করেনি, বরং সেই অর্থ সেই শব্দের সঙ্গে নিত্য সম্পর্কযুক্ত। যে বস্তু বিশেষ যখন সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় নির্মিত হচ্ছিল, তখনই সেই বিশেষ শব্দেরও উৎপত্তি হচ্ছিল। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় বাচক ও বাচ্য-এর সম্পর্ক নিত্য, প্রাকৃতিক, ঈশ্বরীয়, মানবীয় কখনোই নয়। এই বিশেষতা অন্য কোনো ভাষায় নেই। এইভাবে বৈদিক শব্দই নিত্য, অন্য কোনো ভাষার শব্দ নয়। বৈদিক শব্দই প্রাণরূপ হয়ে সৃষ্টির সমস্ত পদার্থের উপাদান কারণও, অথচ এই বিশেষতা কোনো মানব ভাষায় নামমাত্রও নেই। এই কারণে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা কোনো শ্রেণী, দেশ বা সম্প্রদায়, এমনকি কেবল পৃথিবীবাসী মানবজাতির ভাষাও নয়, বরং এটি ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা। বৈদিক ছন্দ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণবায়ু Vibrations-এর রূপে ব্যাপ্ত। বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তিও এগুলি থেকেই হয়েছে। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, শাশ্বত ও সর্বদেশীয় হওয়ায় অত্যন্ত সুসংবদ্ধ। এর ব্যাকরণ অন্য যে কোনো ভাষার ব্যাকরণের তুলনায় অধিক সুসংবদ্ধ। আধুনিক কালে প্রাপ্ত একমাত্র প্রামাণিক ব্যাকরণ-ভিত্তিক গ্রন্থ পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ী আজও বিশ্বব্যাপী ভাষাবিজ্ঞানীদের জন্য আশ্চর্যজনক আদর্শ।

এই অষ্টাধ্যায়ীর গুরুত্ব বর্ণনা করা কয়েকটি উক্তি আমরা 'অষ্টাধ্যায়ী ভাষ্য প্রথমাবৃত্তি- পং. ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসু, সংস্করণ ২০৪২ বিন.স. সন ১৬৮৫-এর প্রাক্কথন থেকে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করছি—

(১) তত্রাশক্যং বর্ণেনাপ্যনর্থকেন ভবিতুং কিং পুনরিয়তা সূত্রেণ (মহাভাষ্য-১.১.১ চৌখম্বা সংস্করণ)
অর্থাৎ তাঁর অর্থাৎ ভগবান পাণিনি-এর একটি বর্ণও অনর্থক নয়, তবে এত বড় সূত্রের তো কথাই নেই? মহর্ষি পতঞ্জলি পুনরায় বলেন—
সামর্থ্যযোগান্নহি কিঞ্চিদস্মিন্ পশ্যামি শাস্ত্রে যদনর্থক স্যাত্ অর্থাৎ শাস্ত্রের সামর্থ্য দ্বারা আমি এই শাস্ত্রে এমন কিছুই (কোনো বর্ণ বা পদ) দেখি না, যা অনর্থক হয়।

(২) চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং— শব্দ এবং অক্ষর বিষয়ক কোনো জ্ঞানই এতে অবশিষ্ট থাকে না।
(৩) মোনিয়ের উইলিয়ামস— অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থ মানব মস্তিষ্কের প্রতিভার আশ্চর্যতম অংশ, যা মানব মস্তিষ্কের সামনে এসেছে।
(৪) হন্টার— মানব মস্তিষ্কের অতীব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এই অষ্টাধ্যায়ী।
(৫) লেনিনগ্রাদ-এর প্রো. টি. ভাত্স্কি— মানব মস্তিষ্কের এই অষ্টাধ্যায়ী সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা।

এইভাবে সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের এই গ্রন্থ বিশ্বে আজও সকলের সম্মানের পাত্র। এই গ্রন্থের পূর্বেও বহু বৈয়াকরণ হয়েছেন। বহু বৈয়াকরণের নাম ভগবান পাণিনি নিজেই তাঁর অষ্টাধ্যায়ীতে উল্লেখ করেছেন। যে কোনো ভাষার ব্যাকরণ পৃথিবীতে সর্বাধিক সুসংবদ্ধ ও বিস্ময়ের কারণ হয়, সেই ভাষাই তো পরমাত্মার দ্বারা প্রথম উৎপন্ন প্রাকৃতিক ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা হতে পারে। এই কারণে পৃথিবীর সুবিজ্ঞ ব্যক্তিদের উচিত যে তারা সংস্কৃত ও বেদের দিকে অবশ্যই অগ্রসর হওয়ার প্রবল চেষ্টা করুন। এদের উপর মানবমাত্রের সমান অধিকার আছে। পৃথিবীকে আর্য্যাবর্তবাসীদের (ভারতবাসীদের) এজন্য ধন্যবাদ জানানো উচিত যে তারা অন্তত এগুলিকে কিছুটা হলেও সংরক্ষিত রেখেছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বেদপাঠী ব্রাহ্মণদের প্রতিও পৃথিবীর ঋণী হওয়া উচিত, যারা এই মহৎ সম্পদকে নিজেদের কণ্ঠে সংরক্ষণ করে বিনাশ থেকে রক্ষা করেছেন।

এইভাবে আমরা এটি প্রমাণ করেছি যে অগ্নি, বায়ু ইত্যাদি চার ঋষির মধ্যে সর্বসৃষ্টা পরমাত্মা বৈদিক ছন্দগুলির মাধ্যমে জ্ঞান ও ভাষার উৎপত্তি করেছেন। এই কথাই ভগবান মনু মহারাজ বলেছেন—
অগ্নিবায়ুরভিভ্যস্তু ত্রয়ং ব্রহ্ম সনাতনম্। দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থমৃগ্যজুঃসামলক্ষণম্ ॥ (মনু.১.২৩)

এর অর্থ করতে গিয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা ও সত্যার্থ প্রকাশ-এ লিখেছেন—
অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা এই চার ঋষিকে জ্ঞান দেওয়া হয়। এখানে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে যে বেদ তিন না চার? এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করে গ্রন্থ বা আয়তন বৃদ্ধি করতে চাই না। এ বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দকৃত গ্রন্থগুলির সঙ্গে বহু আর্য বিদ্বান যথেষ্ট ও সিদ্ধান্তমূলক লিখেছেন। পাঠক সেখানে দেখতে পারেন। হ্যাঁ, বৈদিক বিদ্যা অবশ্যই ঋক্, যজুঃ ও সাম এই তিন লক্ষণযুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক অর্থাৎ আধিদৈবিক রূপ আমাদের এই গ্রন্থে পদে পদে পাওয়া যাবে। এখানে একটি সন্দেহ বিদ্বানদের মধ্যে অবশ্যই উপস্থিত হতে পারে, যার সমাধান সম্ভবত আর্য বিদ্বানরাও কোথাও করেননি, এমন আমাদের ধারণা। সেই সন্দেহ এই যে মহর্ষি দয়ানন্দ এখানে ‘অগ্নি’, ‘বায়ু’ ও ‘রবি’ এই তিন নাম দ্বারা অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারটির গ্রহণ কেন করলেন? একইভাবে সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থে শতপথের প্রমাণে অগ্নি, বায়ু ও সূর্য থেকে ‘অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা’ এই চার নামের গ্রহণ কেন করা হলো? এটি কি স্বেচ্ছাচারিতা ও পূর্বাগ্রহের প্রমাণ নয়? বেদ চার এবং ঋষিও চার—এর বহু প্রমাণ অন্যত্র অবশ্যই পাওয়া যায়, কিন্তু এখানে উভয় স্থানে কেবল তিনটি নাম রয়েছে। বেদকে শৈলীর ভেদে চার-এর পরিবর্তে তিন ধরা গেলেও ব্যক্তিবাচক নামের ক্ষেত্রে তিন থেকে চার-এর গ্রহণ কীভাবে হবে? আরেকটি প্রশ্নও ওঠে যে কি কোনো ব্যক্তির নামের স্থানে তার সমার্থক শব্দের ব্যবহার করা যেতে পারে? এটি তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে এই সূর্য বা রবি-এর ব্যবহার আদিত্য-এর স্থানে কীভাবে হলো?

বাস্তবে এই দুই সন্দেহই গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতে এর সমাধান নিম্নরূপ—

আর্শ গ্রন্থগুলিতে যদিও প্রায় সর্বত্র এবং স্বয়ং বেদ সংহিতাতেও চার প্রকার বেদের বর্ণনা থাকায় বেদের তিন হওয়া সম্ভব নয়। বহু স্থানে চার বেদের জ্ঞান চার ঋষির দ্বারা গ্রহণের বর্ণনাও আছে, কিন্তু এখানে মনুস্মৃতি ও সত্যার্থ প্রকাশ-এ উদ্ধৃত প্রমাণে তিনটি নামই রয়েছে। এখানে বেদ বিদ্যার শৈলীগত বিভাগ তিন প্রকারে করা হয়েছে, তখন তাদের চার নামের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, এটিও সমস্যা। এই কারণেই ‘রবি’ ও ‘সূর্য’ উভয় শব্দ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা-এর গ্রহণ হয়েছে বলে প্রতীত হয়। এখানে উভয় স্থানেই ‘আদিত্য’ শব্দের ব্যবহার নেই। যোগিক অর্থের দৃষ্টিতে আদিত্য-এর সমার্থক রবি ও সূর্য উভয়ই এবং অঙ্গিরা প্রাণকে বলা হয়। "প্রাণো বা অঙ্গিরা" (শ.৬.১.২.২৮)। মহর্ষি দয়ানন্দ যজুর্বেদ ১১.১৫-এ অঙ্গিরা-এর অর্থ সূর্য করেছেন। সূর্য প্রাণতত্ত্বের সর্ববৃহৎ ভাণ্ডার, এই কারণেও সূর্য থেকে অঙ্গিরা-এর গ্রহণ করা হয়েছে। সূর্যে বহু প্রকার তীব্র বিস্ফোরণজনিত ধ্বনি ঘটতে থাকায় তাকে রবি বলা হয়। এইভাবে ‘রবি’ ও ‘সূর্য’ পদ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা উভয় ঋষির গ্রহণ ত্রয়ী বিদ্যার সামঞ্জস্যের জন্য করা হয়েছে। বাস্তবে অথর্ববেদে তিন প্রকার বিদ্যাই আছে। তখন তাকে কেবল কোনো একটি বিদ্যা দ্বারা নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়, অতএব বিদ্যার শৈলীর দৃষ্টিতে বেদ তিনই দেখাতে হয়েছে। এখন এই প্রশ্ন যে কি ব্যক্তির নামগুলিতে সমার্থক শব্দের ব্যবহার শোভন? আমাদের মতে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এগুলি কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, বরং যেসব ঋষিকে ক্রমানুসারে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়, তাদের নামই অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা হয়। এমন প্রত্যেক সৃষ্টির আদিতে ঘটে। এইভাবে এই নামগুলি যোগিক না হলেও যোগরূঢ় অবশ্যই, যেন এগুলি তাদের উপাধি। এই পরিস্থিতিতে ত্রয়ী বিদ্যার সামঞ্জস্যে তিনটি পদ থেকে চারটি পদের গ্রহণ সমার্থক শব্দ হিসেবেও গ্রহণ করা অনুচিত নয়। আবার আর্শ প্রয়োগ শোভনই মনে করা উচিত, এটি বৈদিক পরম্পরা। আমরা মানবীয় ইতিহাসেও এমন কিছু প্রয়োগ দেখতে পারি, যেখানে ‘রাম’ শব্দ দ্বারা তিন মহাপুরুষকে বোঝানো হয়। সেই তিন ব্যক্তি হলেন—মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম, মহর্ষি পরশুরাম এবং বসুদেব-পুত্র বলরাম। এখানে ‘রবি’ বা ‘সূর্য’ দ্বারা একইভাবে আদিত্য ও অঙ্গিরা উভয় মহর্ষির গ্রহণ করা উচিত।

অস্তু।

বেদ বিদ্যার বিষয়ে ভগবদ্ ব্যাস মহর্ষি মহাভারত শান্তিপর্ব অধ্যায় ২৩২-এ শুকদেবকে বলেন—
অনাদিনিধনা বিদ্যা বাগুৎসৃষ্টা স্বয়ম্ভুভা ।।২৪
ঋষীণাং নামধেয়ানি যাশ্চ বেদেষু সৃষ্টয়ঃ । নানারূপং চ ভূতানাং কর্মণাং চ প্রবর্তনম্ ।।২৫

বেদশব্দেব্য এভাদৌ নির্মিমীতে স ঈশ্বরঃ॥২৬

অর্থাৎ পরমব্রহ্ম পরমাত্মা অনাদি বেদবাণীকে উৎপন্ন করেছেন। এখানে 'উৎসৃষ্ট' শব্দ সেই ইঙ্গিতই
করছে, যা মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণে ব্রহ্মা থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় বাণীর উৎপত্তি বলেছেন।
এখানে 'বিদ্যা-বাক্‌'-এর অর্থ হলো যে সেই বাণী, যার মধ্যে যথার্থ জ্ঞানও আছে অর্থাৎ বেদবাণী ॥২৪॥

বিভিন্ন ঋষির নাম অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডস্থিত ঋষি-প্রাণদের নাম, যাদের থেকে মানব ঋষিরা নিজেদের
নাম রেখেছেন। সৃষ্টির যে-যে পদার্থ বৈদিক ছন্দরূপ প্রাণে নির্মিত হয়েছে, বিভিন্ন পদার্থ ও প্রাণীদের
নানারূপ এবং তাদের কর্মসমূহকে আদিসৃষ্টিতে ঈশ্বর বৈদিক শব্দ বা ছন্দ থেকেই রচনা করেন এবং
সেগুলির মাধ্যমেই তাদের বর্ণনাও করেন ॥২৫-২৬॥

এখানে কেবল ভাষা ও জ্ঞানের উৎস বেদের আলোচনা নয়, বরং সেই বেদ অর্থাৎ প্রাণ (ছন্দ)
সমষ্টিরূপ বেদেরও ইঙ্গিত আছে, যার থেকে সমস্ত পদার্থের উৎপত্তি হয়। বাস্তবে এই দুইটি এক।
আমরা এই আলোচনা 'বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান' নামক অধ্যায়ে করব। যদি এমন না হতো, তবে 'ভূতানাং
নানারূপং' এই পদ থাকত না। কর্মের প্রবর্তন তো ভাষা ও জ্ঞান থেকে হয়েছে, কিন্তু প্রাণী ও পদার্থের
রূপ তো জড় উপাদান থেকেই গঠিত হবে। সম্ভবত ভগবান ব্যাসের এই ভাবনা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে
মহাবিদ্বান ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয়ম্ গ্রন্থের ব্রহ্ম কাণ্ডের প্রথম শ্লোকে লিখেছেন—

অনাদিনিধনং ব্রহ্ম শব্দতত্ত্বং যদক্ষরম্। বিবর্ততে অর্থভাবেন প্রক্রিয়া জগতঃ যতঃ॥

অর্থাৎ অনাদি ও অবিনশ্বর শব্দতত্ত্বরূপ যে ব্রহ্ম, তা অর্থের ভাব থেকে বিবর্ত প্রাপ্ত হয়। এর অর্থ এই যে শব্দব্রহ্ম অর্থাৎ মূল শব্দ ওঁকার সৃষ্টির রচনার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাণী-ছন্দে পরব্রহ্ম পরমাত্মার দ্বারা বিস্তৃত করা হয়, প্রথমে সর্বত্র ওঁকাররূপী বাক্‌ ব্যাপ্ত হয়ে যায়, তারপর সমস্ত বৈদিক ছন্দ ব্যাপ্ত হয়ে যায়। এর দ্বারা জগত্‌ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অপরদিকে সেই বেদ-বাক্‌ থেকে সমগ্র মানব জগতের আচরণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যায়। আর্শ গ্রন্থের অধিক প্রমাণ এই কারণে দিচ্ছি না যে দুর্ভাগ্যবশত এই গ্রন্থগুলির আজ পৃথিবীতে তো কী, ভারতেও সম্মান অবশিষ্ট নেই। আমরা আমাদের গ্রন্থ বিশেষভাবে সেই বিদ্বানদের জন্য লিখছি, যারা কেবল বিজ্ঞান ও যুক্তির সহায়তায় অগ্রসর হওয়ার পক্ষে এবং নিজেদের বৈজ্ঞানিক বা বৌদ্ধিক অহংকারে ভরে বেদ বা আর্শ গ্রন্থের উপহাস বা নিন্দা করাকেই গৌরব মনে করেন, অস্তু।

এই চার ঋষি সর্বপ্রথম জ্ঞান মহর্ষি ব্রহ্মাকে দিয়েছিলেন। এর দ্বারা এটি স্পষ্ট যে মহর্ষি ব্রহ্মা সেই আদিসৃষ্টিতেই ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। মহর্ষি ব্রহ্মা এই চার ঋষির কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম চতুর্বেদবিত্ ঋষি হয়েছিলেন। এরপর জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরম্পরা মহর্ষি ব্রহ্মা থেকে অদ্যপর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে চলেছে। যেহেতু মহর্ষি ব্রহ্মাই প্রথম চতুর্বেদবিত্ ছিলেন, তাই ভারতীয়
পরম্পরায় তাকেই বিদ্যা-পরম্পরার আদ্য পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই পরম্পরায় ভগবান মনু,
ভগবান শিব, ভগবান বিষ্ণু, দেবরাজ ইন্দ্র, দেবগুরু মহর্ষি বৃহস্পতি, সনৎকুমার, নারদ, বসিষ্ঠ, অগস্ত্য,
ভরদ্বাজ, বাল্মীকি, বিশ্বামিত্র, ব্যাস, গৌতম, পতঞ্জলি, কণাদ, যাস্ক, পাণিনি, জৈমিনি প্রভৃতি বহু ঋষি-মুনির মাধ্যমে বিস্তৃত জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। এইভাবে সাহিত্য-শৃঙ্খলায় অপৌরুষেয় চার বেদসংহিতার পর বহু শাখা-গ্রন্থ, মনুস্মৃতি, বাল্মীকি রামায়ণ, মহাভারত, ঐতরেয়-শতপথ-গোপথ প্রভৃতি ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, শিক্ষা, কল্প, ছয় দর্শনশাস্ত্র (ন্যায়, সাংখ্য, বৈশেষিক, যোগ, বেদান্ত, মীমাংসা), উপনিষদ, বহু নীতিগ্রন্থ প্রভৃতির অত্যন্ত সমৃদ্ধ পরম্পরা অব্যাহত ছিল। পৃথিবীজুড়ে বেদ থেকেই জ্ঞান ও ভাষার বিকাশ হয়েছে। এর ইতিহাসের জন্য পং. ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার রচিত 'বৈদিক
বাঙ্গময়ের ইতিহাস' এবং পং. রঘুনন্দন শর্মা রচিত 'বৈদিক সম্পত্তি' গ্রন্থ বিশেষভাবে পাঠযোগ্য ও
মননীয়।

এই অধ্যায়টি লেখার আমাদের উদ্দেশ্য কেবল এটুকুই ছিল যে জ্ঞান ও ভাষার প্রথম উৎপত্তি কোথা
থেকে এবং কীভাবে হয়, যার উপর যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে।

এই বিষয়টি সর্ববিদিত যে পৃথিবীর কোনো দেশই তার বিদ্যা ও সভ্যতার পরম্পরাকে মানবসৃষ্টির
আদিকালের সঙ্গে যুক্ত করার সাহস করে না। বর্তমান সময়ে বিকাশবাদ-এর মিথ্যা প্রচার, যা বিজ্ঞানের
নামে প্রচলিত, এর ফলে সকলেই যেন নিজেদের পশুর বংশধর মনে করে মূর্খ পূর্বপুরুষদের সন্তান
বলে স্বীকার করতে বাধ্য। এই বিষয়টি আমাদের বোধগম্য নয় যে বর্তমান বিজ্ঞানের প্রবল প্রভাবে মানুষ
নিজেকে পশু ও অরণ্যবাসী মানুষের বংশধর বলতে এত জোর কেন করে? এমন কি নয় যে পাশ্চাত্য
দেশগুলির বিজ্ঞানীরা নিজেদের গবেষণাকেও তাদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার পক্ষপাত থেকে মুক্ত রেখে
নিরপেক্ষভাবে বিচার করার সাহস করতে পারেন না? তারা কি এই ভয়ে আক্রান্ত নয় যে নিজেদের মহান
মনিষীদের সন্তান প্রমাণ করলে তাদের সাম্প্রদায়িক মত ভেঙে পড়বে এবং বৈদিক ও ভারতীয় মত সত্য
প্রমাণিত হবে? বাস্তবে বেদবিদ্যার যথাযথ বোধ না থাকায় বৈদিক পরম্পরাকে কেবল হিন্দু বা ভারতীয়
পরম্পরা বলে সাম্প্রদায়িক বা আঞ্চলিক দৃষ্টিতে দেখা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এই দেশের তথাকথিত বেদানুরাগী বৈদিক বিদ্বানদের সঙ্গে তথাকথিত প্রগতিশীল শ্রেণী এবং রাজনীতিই এ সমস্তের জন্য অধিক দায়ী। এর বর্ণনা করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়। বিবেকবান নিরপেক্ষ মানুষ জ্ঞান ও ভাষার পরম্পরার আরম্ভ সম্পর্কিত বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত বিভিন্ন মতের সঙ্গে আমাদের বৈদিক মতের তুলনা করে নিজেই সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন।


Read More

বাণীর প্রকার

01 April 0

বাণীর প্রকার

বিদ্বানরা বাণীর চার রূপ বলেছেন। ঋগ্বেদের—
চুত্বারি বাক্‌পরিমিতা পদানি তানি বিদুর্ব্রাহ্মণা যে মনীষিণঃ।
গুহ্যা ত্রীণি নিহিতা নেঙ্গয়ন্তি তুরীয়ং বাচো মনুষ্যা বদন্তি।। (ঋ. ১.১৬৪.৪৫)

এর ভাষ্যে মহর্ষি দयानন্দ চার প্রকার বাণীকে ব্যাকরণবিদদের দৃষ্টিতে নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাত এই রূপে বিভাগ করেছেন। আচার্য সায়ণ এর ভাষ্যে বাণীর বিভাগ ব্যাকরণবিদদের দৃষ্টির অতিরিক্ত নিরুক্তকার প্রভৃতির দৃষ্টিকেও গ্রহণ করেছেন। এতে একটি বিভাগ আছে—পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং বৈখরী। এদের মধ্যে বৈখরী বাণীই মানব ব্যবহারে আসে, অবশিষ্ট তিন প্রকার বাণীকে কেবল যোগী পুরুষই দেখতে বা জানতে পারেন।

মহর্ষি প্রবর যাস্ক নিরুক্ত ১৩.৬-এ এই মন্ত্রের ব্যাখ্যানে বাণীর বিভাগ নিম্নরূপ বলেছেন—
"চত্বারি বাচঃ পরিমিতানি পদানি। তানি বিদুর্ব্রাহ্মণা যে মেধাবিনঃ। গুহায়াং ত্রীণি নিহিতানি। নার্থ বেদয়ন্তে। গুহা গূহতে। তুরীয়ং ত্বরতে। কতমানি তানি চত্বারি পদানি। ওংকারো মহাব্যাহৃতয়শ্চেত্যার্ষম্। নামাখ্যাতে চোপসর্গনিপাতাশ্চেতি ব্যাকরণাঃ। মন্ত্রঃ কল্পো ব্রাহ্মণং চতুর্থী ব্যবহারিকীতি যাজ্ঞিকঃ। ঋচো যজুঁষি সামানি চতুর্থী ব্যবহারিকীতি নিরুক্তাঃ। সর্পাণাং বাক্‌বয়সাং ক্ষুদ্রস্য সরীসৃপস্য চতুর্থী ব্যবহারিকীতি একে। পশুষু তূণবেষু মৃগেষ্বাত্মনি চেত্যাত্মপ্রবাদাঃ। অথাপি ব্রাহ্মণং ভবতি।।"

এখানে বিভাগ নিম্নরূপ—
(১) আর্শমত— ওংকার এবং ভূঃ ভুবঃ স্বঃ মহাব্যাহৃতি।
ভগবান মনু মহারাজও বলেন—
"অকারং চাপ্যুকারং চ মকারং চ প্রজাপতিঃ। বেদত্রয়ান্নিরদুহদ্ ভূর্ভুবঃ স্বরিতীতি চ।।" (মনু.০২.৭৬)
অর্থাৎ প্রজাপতি বেদ থেকে এই চার পদ দোহন করেছেন— ওম্, ভূঃ, ভুবঃ এবং স্বঃ। এটিই বেদের সার।

(২) ব্যাকরণ মত— নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাত।

(৩) যাজ্ঞিক মত— মন্ত্র, কল্প, ব্রাহ্মণ এবং ব্যবহারিকী অর্থাৎ লোকভাষা।

(৪) নিরুক্ত মত— ঋক্, যজুঃ, সাম এবং ব্যবহারিকী অর্থাৎ লোকভাষা।

(৫) অন্যমত— সাপদের বাক্‌, পক্ষীদের বাক্‌, ক্ষুদ্র রেঙে চলা প্রাণীদের বাক্‌ এবং ব্যবহারিকী (মানব-লোকভাষা)।

(৬) আত্মবাদী মত— পশুদের মধ্যে, বাদ্যযন্ত্রে, সিংহ প্রভৃতিতে এবং আত্মায় অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারিক বাণী।

এগুলির অতিরিক্ত নিরুক্তকার (১৩.৬, পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ভাষ্য) বাণীর অন্য শ্রেণী বলার জন্য মৈত্রায়ণী সংহিতাকে উদ্ধৃত করে বলেন—
"অথাপি ব্রাহ্মণং ভবতি—সা বৈ বাক্ সৃষ্টা চতুর্ধা ব্যবভবৎ। এষ্বেব লোকেষু ত্রীণি। পশুষু তুরীয়म्। যা পৃথিব্যাং সাগ্নী সা রথন্তরে। যাঽন্তরিক্ষে সা বায়ী সা বামদেব্যে। যা দিবি সাদিত্যে সা বृहতী সা স্তনয়িত্রী। অথ পশুষু। ততো যা বাক্ অত্যরিচ্যত তাং ব্রাহ্মণেষ্বদধুঃ। তস্মাদ্ ব্রাহ্মণা উভয়ীং বাকং বদন্তি যা চ দেবানাং যা চ মনুষ্যানাম্। (মৈ.১.১১.৫) ইতি"

আমরা মৈত্রায়ণী সংহিতায় পাঠ এইরূপ পেয়েছি—
সা বৈ বাক্ সৃষ্টা চতুর্ধা ব্যবভবৎ, এষু লোকেষু ত্রীণি তুরীয়াণি, পশুষু তুরীয়ঃ, যা পৃথিব্যা সাগ্নী
সা রথন্তরে, যা অন্তরিক্ষে সা বাতে সা বামদেব্যে। যা দিবি সা বৃহতী সা স্তনয়িত্না, অথ পশুষু। ততো যা
বাক্ অত্যরিচ্যত তাং ব্রাহ্মণে ন্বদধু, তস্মাদ্ ব্রাহ্মণ উভয়ী বাক্ বদন্তি যশ্চ দেব যশ্চ ন, .... । অর্থাৎ
সেই উৎপন্ন বাণী চার প্রকার। ভূঃ ভুবঃ এবং স্বঃ এই তিন লোক বা সূক্ষ্ম ছন্দ রশ্মির রূপে তিন প্রকারে
এবং পশু অর্থাৎ বিভিন্ন মরুত্ ও ছন্দ রশ্মির রূপে {পশবো বৈ মরুতঃ মৈ.৪.৬.৮} চতুর্থ প্রকারে। যে
বাণী পৃথিবীতে আছে, সেইই অগ্নিতে এবং সেইই রথন্তর সামে আছে। এর তাৎপর্য এই যে যে বাণী
অপ্রকাশিত পরমাণুতে থাকে, সেইই উষ্ণতা ও বিদ্যুৎ-সংযুক্ত কণায় থাকে এবং সেইই বাণী রথন্তর সাম
অর্থাৎ এমন তীব্র বিকিরণসমূহে, যা মনোরম হয়েও তীক্ষ্ণ ভেদক এবং বিভিন্ন কণাকে অতিক্রম করাতে
সমর্থ, তাতেও বিদ্যমান থাকে। যে বাণী অন্তরীক্ষে থাকে, সেই বাণী বায়ু (সূক্ষ্ম ও স্থূল)-এও বিদ্যমান
থাকে। এখানে সূক্ষ্ম বায়ু দ্বারা বিভিন্ন প্রকার প্রাণের কথাও বোঝানো হয়েছে। সেইই বাণী বামদেব্যে
অর্থাৎ বিভিন্ন সৃষ্টি-প্রজনন ক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রশংসনীয় ও উজ্জ্বল প্রাণ তত্ত্বেও বিদ্যমান থাকে।
যে বাণী দ্যুলোক অর্থাৎ সূর্য প্রভৃতি নক্ষত্রে থাকে, সেইই তাদের রশ্মিতে এবং সেইরূপ বাণী স্তনয়িত্নু
অর্থাৎ শব্দকারী বিদ্যুতে-ও থাকে। এর পরে অন্য বাণী পশু অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারিকী=লোক ভাষার
বাণী হয়। এর অতিরিক্ত যে বাণী আছে, তা পরমাত্মা ব্রাহ্মণদের মধ্যে স্থাপন করেছেন। এখানে
'ব্রাহ্মণ' শব্দের অর্থ অত্যুচ্চ স্তরের যোগী পুরুষ, যারা পরব্রহ্ম পরমাত্মায় সর্বদা রমণ করেন। এইরূপ
ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ উভয় প্রকার (মোট চার প্রকার) বাণীকে, যা বিভিন্ন দেব (লোকাদি)-তে বিদ্যমান
অথবা মানুষের কথ্য বাণী, জানেন। এইরূপ ব্রাহ্মণের অক্ষর স্তব।" এখানে নিরুক্তকার নিজের মত এবং
মৈত্রায়ণী সংহিতার মত অনুযায়ী বাক্-তত্ত্বের গভীর ও ব্যাপক স্বরূপের উপর আলোকপাত করেন।

বর্তমান বৈজ্ঞানিকরাও বিভিন্ন প্রকার ধ্বনিকে জানেন। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত
শক্তিশালী তরঙ্গকে বৈজ্ঞানিকরা Shock waves বলেন। ইউ.এস.এ.-র খগোল ভৌতবিজ্ঞানী John Gribbin
ডার্ক ম্যাটার এবং কসমিক রশ্মিতেও সূক্ষ্ম ধ্বনি তরঙ্গের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। এই কথা তিনি নিজের
গ্রন্থ The origins of the future- ten questions for the next ten years পৃষ্ঠা ১৩০ এবং ১৩৪-এ
লিখেছেন। আজ সৃষ্টির উৎপত্তির মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব Big Bang Theory, যার সমালোচনা আমরা পরবর্তী
অধ্যায়ে করব, তাতে যে Background radiation, 2.7 °K শীতল থাকে, তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়।
সেই অত্যন্ত শীতল radiation-এও সেই সময় ওঠানামা Fluctuations-এর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, যখন
এই ব্রহ্মাণ্ড তার প্রাথমিক অবস্থায় ছিল। এই ওঠানামা ধ্বনি তরঙ্গ দ্বারা হয় বলে মানা হয়। The trouble
with Physics নামক গ্রন্থে Lee Smolin পৃষ্ঠা-২০৫-এ লিখেছেন—

"Over the last decades, the temperature fluctuations of the microwave background have been mapped by satellites, balloon borne detectors, and ground based detectors, one way to understand what these experiments measure is to think of the fluctuations as if they were sound waves in the early universe."

স্পষ্টই এখানে সূক্ষ্ম ধ্বনি তরঙ্গের আলোচনা হয়েছে। সূর্যে হওয়া বিস্ফোরণ এবং সাধারণ অবস্থাতেও,
পৃথিবীর ভিতরে বিভিন্ন কার্যকলাপ এবং অন্তরীক্ষে cosmic rays-এর সংঘর্ষ থেকেও ধ্বনি তরঙ্গের
উৎপত্তি হয়—এটি বৈজ্ঞানিকরা মানেন এবং জানেন। যে বিষয় বৈজ্ঞানিকরা আজ জানেন, তার থেকেও
সূক্ষ্ম বিজ্ঞান যাস্ক এবং মৈত্রায়ণী সংহিতাকার সহস্র বছর পূর্বেই জানতেন। বৈদিক সাহিত্যে বাক্-এর
বিজ্ঞান অত্যন্ত বিস্তৃত এবং গভীর। এই ধ্বনি প্রকৃতপক্ষে কি, তা বৈজ্ঞানিকরা এখনও সম্পূর্ণভাবে জানতে পারেননি। ধ্বনি বিষয়ে বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য—

'Sound is an alteration in pressure, stress, particle displacement or particle velocity, which is propagated in an elastic material, or the superposition of such propagated vibrations- (definition recommended by American Standard Association)- "Acoustics" By Joseph L. Hunter

এখানে অবশ্যই ধ্বনির স্পষ্ট ও উৎকৃষ্ট স্বরূপ বলা হয়নি, বরং কোনো পদার্থে উৎপন্ন চাপের রূপেই
ধ্বনি তরঙ্গকে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত সাধারণ কথা। সেই চাপ কেন এবং কিভাবে উৎপন্ন হয়,
এই বিষয় বর্তমান বিজ্ঞান কিছুই স্পষ্ট করতে পারে না।

বর্তমান বৈজ্ঞানিকরা আলোক প্রভৃতি বিকিরণের মতো ধ্বনির কণারও কল্পনা করেন। Q is for Quantum
particle physics from A to Z নামক গ্রন্থের পৃষ্ঠা ২৮১-এ John Gribbin ধ্বনিকণ Phonon সম্পর্কে
লিখেছেন—

"Phonon - A particle of sound travelling through a crystal lattice. The idea of a sound wave can be replaced by the idea of phonons in an analogous way to the description of light in terms of photons."

এখানে ধ্বনির কণার ধারণা স্পষ্ট। বৈদিক ভাবধারায়ও শব্দ তন্মাত্রার স্বীকৃতি প্রাচীনকাল থেকেই
চলেছে।

এপর্যন্ত আমরা বাণীর বিভিন্ন রূপের আলোচনা করার পরে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং বৈখরী এই চার
রূপের উপর বিশেষ আলোচনা করি। বাণীর এই বিভাগ, যা আচার্য সায়ণ করেছেন, তার প্রামাণিকতা
সম্পর্কে কিছু আর্য বিদ্বান প্রশ্ন তুলতে পারেন। যদিও বৈদিক গ্রন্থগুলি বোঝার ক্ষেত্রে সায়ণের পদ্ধতি
অত্যন্ত দোষপূর্ণ অথবা মূর্খতাপূর্ণ। যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের আমি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা লিখছি, তাতে সায়ণ
ভাষ্যের প্রায় উপেক্ষা করা হয়েছে, কারণ তার ভাষ্য সর্বতোভাবে দোষপূর্ণ, কোথাও-কোথাও বিকৃত,
অশ্লীল, মূর্খতাপূর্ণ এবং বৈদিক দৃষ্টির সম্পূর্ণ বিপরীত। এতকিছুর পরেও আমাদের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য
নয় যে সায়ণাচার্যের কোনো যুক্তিসঙ্গত কথাকেও গ্রহণ করা হবে না। এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ আর্য বিদ্বান
পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার নিজের নিরুক্ত ভাষ্য ১৩.৬-এ লিখেছেন—

"পরাবাক্-এর সিদ্ধান্ত নতুন নয়। দেবকীপুত্র ভগবান কৃষ্ণ এর বর্ণনা সাম্ব পঞ্চাশিকার তৃতীয় শ্লোকে করেছেন।" এইরূপে মহৎ বেদবিজ্ঞানী যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মত আমাদের সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য। যে বিদ্বান এর উপরও সন্দেহ করে, তাদের কোনো উপায় নেই।

পরা, পশ্যন্তী প্রভৃতি বাণীর চারটি রূপের আলোচনা ব্যাকরণ মহাভাষ্যের ভাষ্য প্রদীপে আচার্য কৈয়ট এবং নাগেশ ভট্টও করেছেন। তারা "বাক্যপদীয়ম্" এর বহু শ্লোকও উদ্ধৃত করেছেন।

আমরা বাণীর এই চারটি স্বরূপের উপর কিছু চিন্তা করি—

(১) পরা— পরাবাণী সর্বাধিক সূক্ষ্ম কিন্তু সর্বাধিক উৎকৃষ্ট এবং সমস্ত বাণীর সর্বোচ্চ মূল স্বরূপ। 'পরা' একটি অব্যয় পদ, যার ব্যবহার আপ্টে সংস্কৃত-হিন্দি কোষে বহু অর্থে দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে যাওয়া, সম্মুখীন হওয়া, পরাক্রম, আধিক্য, পরাধীনতা, মুক্তি, একদিকে সরিয়ে রাখা প্রভৃতি প্রধান। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এই অব্যয়ের ব্যবহার উপরিভাবে, দূরার্থে, পৃথক, প্রকৃষ্টার্থে, দূরীকরণে, পরাজয়ের অর্থে প্রভৃতিতে করেছেন। (দেখুন— বৈদিক কোষ - আচার্য রাজবীর শাস্ত্রী।)

যদিও এখানে আমরা 'পরা' উপসর্গ অব্যয় পদের আলোচনা করছি না, তথাপি এই অর্থগুলি থেকে 'পরা' পদের অর্থ জানা গেলে 'পরাবাক্' এর স্বরূপও বোঝা যায়। সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রয়োগ করে কোনো শব্দের অর্থের সম্পর্ক এবং তার বাচ্য পদার্থের স্বরূপ বোধ করানোই ব্যাকরণ শাস্ত্রের বৈজ্ঞানিকতা। এইভাবে পরাবাক্ একটি এমন সূক্ষ্ম বাণী, যা সর্বাধিক সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী, অত্যধিক পরিমাণে বিদ্যমান, সকলকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে কিন্তু নিজে সকলের থেকে মুক্ত এবং সর্বোচ্চ অবস্থাসম্পন্ন। এটি এত সূক্ষ্ম হওয়ায় কখনোই শ্রবণগোচর হতে পারে না। এটি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে সূক্ষ্মতম রূপে ব্যাপ্ত থেকে প্রতিটি কণাকে নিজের সঙ্গে সমন্বিত রাখে। এটিকে কেবল উৎকৃষ্ট যোগী পুরুষরাই অনুভব করতে পারেন। এটিকে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি দ্বারা জানা যায় না। আমাদের মতে মানুষ যে বৈখরী বাণী শুনে, সেই বাণী আত্মতত্ত্ব দ্বারা পরা অবস্থাতেই গ্রহণ করা হয়।

(২) পশ্যন্তী— এই শব্দের রূপই বলে দেয় যে এই বাণী পরার তুলনায় স্থূল এবং এটি বিভিন্ন বর্ণকে দেখে অর্থাৎ তাদের স্বরূপ প্রদান করতে করতে বীজরূপে থাকে। এটি পরাবাণী থেকে স্থূল এবং মধ্যমা থেকে সূক্ষ্ম। সাম্বপঞ্চাশিকার চতুর্থ শ্লোক—
"যা সা মিত্রাবরুণসদানাদুচ্চরন্তী ত্রিষষ্টিং
বর্ণান্তঃ প্রকটকরনৈঃ প্রাণ সংগাৎ প্রসূতে।।"

এর ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ বলেছেন—
"তত্র চিজ্জ্যোতিষি গুণীভূত সূক্ষ্মপ্রাণসঙ্গাৎ পশ্যন্তাম্।"

অর্থাৎ পশ্যন্তীতে চিত্-জ্যোতির প্রধানতা এবং সূক্ষ্মপ্রাণ গৌণ থাকে, সেই অবস্থাতেও বর্ণ উৎপন্ন হয়। (দেখুন— মহাত্মা ভর্তৃহরি রচিত বাক্যপদীয়ম্-এর ব্রহ্মকাণ্ডে পণ্ডিত শিবশঙ্কর अवस्थীর টীকা, পৃ. ৪২৩-২৪)

{মিত্রাবরুণৌ = মনো মৈত্রাবরুণঃ (শ.১২.৮.২.২৩), যজ্ঞো বৈ মৈত্রাবরুণঃ (কৌ.ব্রা. ১৩.২), প্রাণাপানী মিত্রাবরুণী (তা.৬.১০.৫), প্রাণোদানৌ বৈ মিত্রাবরুণৌ (শ.১.৮.৩.১২)। সদনম্ = গর্ভস্থানম্ (ম.দ.য. ভা. ১২.৩৬)} আমাদের মতে এই শ্লোকের ভাব এই যে পশ্যন্তী বাক্ সংযোজ্য মনস্তত্ত্বের ভিত্তিতে অথবা তার মধ্যেই উৎপন্ন হয়। প্রাণ, অপান ও উদানাদি রশ্মির গর্ভরূপ এই পশ্যন্তী বাক্ তত্ত্ব, অর্থাৎ সমস্ত প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি এই বাক্ তত্ত্ব থেকেই এবং এইতেই উৎপন্ন হয়। এখানে "প্রাণ সংগাৎ প্রসূতে" এ প্রাণের অর্থ মনস্তত্ত্ব বোঝা উচিত। পরার অতিরিক্ত তিন প্রকার বাণীর উৎপত্তিই এখানে সাম্বপঞ্চাশিকার এই শ্লোক থেকে বোঝা যাচ্ছে। পরাবাণীতে তিরেষট্টি বর্ণের অস্তিত্ব থাকে না। ক্ষেমরাজের বক্তব্য থেকে এটিই স্পষ্ট হয় যে চেতনা যখন মনরূপ সূক্ষ্মপ্রাণের সঙ্গে সংযোগ করে অর্থাৎ যখন চেতনার প্রধানতা এবং সেই সূক্ষ্মপ্রাণ গৌণ হয়, তখন এই পশ্যন্তী বাক্-এর উৎপত্তি হয়। এই পশ্যন্তী বাক্ সমস্ত বর্ণের মূলরূপকে ধারণ করে থাকে। সম্ভবত এই বাণীকে ভবিষ্যতে কোনো সূক্ষ্ম প্রযুক্তি দ্বারা গ্রহণ করা যেতে পারে, এমনই আমাদের মত। এখানে এমন প্রতীয়মান হয় যে বাণীর বর্ণরূপ এই পশ্যন্তী অবস্থাতেই মূলরূপে প্রকাশিত হয়। পরাবাক্ সম্পূর্ণ অব্যক্ত রূপে থাকে। আমাদের মতে পরাবাণীতেও অক্ষরের সংস্কার সূক্ষ্মতম রূপে অবশ্যই থাকে এবং সেই থেকেই মূলরূপ পশ্যন্তী বাক্-এর উৎপত্তি হয় অথবা পরাবাক্-ই পশ্যন্তী বাক্-এর রূপে পরিবর্তিত হয়। লক্ষ্যণীয় যে পশ্যন্তীতেও বর্ণের স্পষ্ট রূপ বিদ্যমান থাকে না।

ডাঃ শিবশঙ্কর অবস্থী বাক্যপদীয়ম্-এর টীকা পৃ.সং. ৭৪-এ এক অজ্ঞাত রচিত শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন—
বৈখরী শব্দনিষ্পত্তির্মধ্যমা শ্রুতিগোচরা। দ্যোতিতার্থা চ পশ্যন্তী সূক্ষ্মা বাগনপায়িনী।।

এই শ্লোক কিছু পাঠভেদসহ ব্যাকরণের ভাষ্যপ্রদীপকার নাগেশ ভট্টও 'চত্বারি বাক্‌পরিমিতা' (ঋ. ১.১৬৪.৪৫) মন্ত্রের ব্যাখ্যানে দিয়েছেন।

এতে পশ্যন্তী-এর স্বরূপের বিবেচনায় অবস্থী-এর বক্তব্য যথার্থই যে এতে শ্রোতার বুদ্ধিতে অর্থের দ্যোতন হয়। যখন কোনো ব্যক্তি কর্ণ দ্বারা কোনো কথা শোনে, তখন কানের স্নায়ুর দ্বারা সংবেদন মস্তিষ্ক হয়ে পুনরায় মনস্তত্ত্বে পৌঁছে। সেই সংবেদনে বর্ণের বিদ্যমানতার মধ্যেই মন এর সহযোগে মস্তিষ্ক বর্ণগুলির পরিচয় করে। যদি ঐ সংবেদনগুলিতে যদি বর্ণের সম্পূর্ণ অভাব হতো, তবে মস্তিষ্ক বা মনস্তত্ত্ব বাণীকে কখনোই চিনতে পারত না। সেই বাণীই পশ্যন্তী, যা কানে শোনা যায় না কিন্তু মস্তিষ্কের মাধ্যমে মনস্তত্ত্ব যাকে অনুভব করে।

(৩) মধ্যমা- সাম্বপঞ্চাশিকা-এর উপরিউদ্ধৃত শ্লোকের ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ লিখেছেন-
"গুণীভূত চিৎসূক্ষ্মপ্রাণসঙ্গান্মধ্যমায়াম্।" এই সম্পর্কে ড. অবস্থী পৃ.সং.৪২৪-এ লিখেছেন যে মধ্যমা
বাণীতে চিজ্জ্যোতি গৌণ এবং সূক্ষ্মপ্রাণ প্রধান হয়। এই বাক্‌কে পশ্যন্তী থেকে স্থূল এবং বৈখরী থেকে
সূক্ষ্ম মানা হয়। উপরিউক্ত অজ্ঞাতরচিত শ্লোকের ব্যাখ্যায় ড. অবস্থী-এর বলা যে যে বাণী শ্রোতার কর্ণ দ্বারা শোনা যায়, তা মধ্যমা হয়। এর থেকে আমাদের এই প্রতীত হয় যে কর্ণপটলে যে ধ্বনি শোনা যায়, তা যে স্বরূপ ধারণ করে, সেটিই মধ্যমা হয়। মস্তিষ্ক ও কানের মধ্যে যে বাণীর সঞ্চারণ হয়, সেটিই এই। এতে বর্ণের রূপ পশ্যন্তীর তুলনায় স্থূল এবং বৈখরীর তুলনায় সূক্ষ্ম হয়। এতে চেতন-এর সান্নিধ্যেরও পশ্যন্তীর
ন্যায় অপরিহার্যতা থাকে, কিন্তু তার তুলনায় কিছু কম হয়।

(৪) বৈখরী- এটি সেই স্থূল বাণী, যা আমরা বলি। 'বৈখরী' শব্দের নিরুক্ত আপ্টে তাঁর কোষে করেছেন- "বিশেষেণ খং রাতি" অর্থাৎ যা বিশেষরূপে আকাশে মিলিয়ে যায়। এই বাণীই বক্তা ও শ্রোতার মধ্যে গমন করে, যা শেষে শ্রোতার মস্তিষ্কে গিয়ে পশ্যন্তী-এর রূপ ধারণ করে। এর বিষয়ে উপরিউদ্ধৃত সাম্বপঞ্চাশিকা-এর শ্লোকের ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ লিখেছেন- "স্থূল প্রাণসঙ্গাদ্বৈখর্যাং বর্ণা জায়ন্তে।" অর্থাৎ স্থূল প্রাণের সংযোগে বৈখরীতে বর্ণের উৎপত্তি হয়। এখানে বক্তার স্বরযন্ত্র থেকে বিভিন্ন আভ্যন্তর ও বাহ্য প্রয়াসে যে ধ্বনি-রূপ বর্ণের উৎপত্তি হয়, সেটিই সংকেত। এটিই লোক ভাষা।

এখন বাণীর চার রূপের উপর সায়ণাচার্য-এর মত উদ্ধৃত করা হয়-
"পরাপশ্যন্তী মধ্যমা বৈখরীতি চত্বারীতি। একৈব নাদাত্মিকা বাগ্মূলাধারাদুদিতা সতি পরেত্যুচ্যতে।
নাদস্য চ সূক্ষ্মত্বেন দুর্নিরূপত্বাৎ সৈব হৃদয়গামিনী পশ্যন্তীত্যুচ্যতে যোগীভির্দ্রষ্টুং শক্তত্বাৎ। সৈব বুদ্ধি গতা
বিবক্ষা প্রাপ্তা মধ্যমেত্যুচ্যতে মধ্যে হৃদয়াখ্য উদীয়মানত্বান্মধ্যমায়াঃ। অথ যদা সৈব বক্ত্রে স্থিতা
তাল্বোষ্ঠাদিব্যাপারেণ বহির্নির্গচ্ছতি তদা বৈখরীত্যুচ্যতে ... ।।" (ঋগ্বেদ ভাষ্য. ১.১৬৪. ৪৫)

অর্থাৎ যখন কোনো মানুষ বাণীর উচ্চারণ করে, তখন সর্বপ্রথম নাদরূপ বাক্‌ মূলাধার চক্রে উৎপন্ন হয়ে উপরে উঠতে থাকে। এটিই বাণীর সূক্ষ্মতম পরা-রূপ। এর নিরূপণ সম্ভব নয় অর্থাৎ অত্যন্ত দুষ্কর। যখন এই পরাবাণী হৃদয় চক্রে আসে, তখন সেখানে এটিই পশ্যন্তী বাক্‌-এর রূপ গ্রহণ করে। এই বাণী যখন বুদ্ধি তত্ত্বের সঙ্গে সংযোগে আসে, তখন মধ্যমা রূপে প্রকাশিত হয়ে কণ্ঠে অবস্থিত তালু-ওষ্ঠাদি-এর প্রয়াসে বৈখরীর রূপ ধারণ করে বাইরে বের হয়।

এখানে বিবেচনীয় যে বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের মধ্যে বাণীর চার রূপ পৃথক-২ স্থানে প্রকাশিত হয়। সাধারণ মানুষের শোনা ও বলা যোগ্য বাণী বৈখরীই, এটি নিশ্চিত।

এখন প্রশ্ন এটি উঠে যে যখন সর্বপ্রথম চার ঋষি অন্তরীক্ষ থেকে ঈশ্বরীয় সহায়তায় সম্প্রজ্ঞাত সমাধির ভিতরে বৈদিক ছন্দগুলি গ্রহণ করেছিলেন, তখন সেই ছন্দগুলি ব্রহ্মাণ্ডে বাণীর এই চার রূপের মধ্যে কোন রূপে ব্যাপ্ত ছিল? কি যেমন বেদ পাঠী আজ বৈখরী বাণীতে বেদপাঠ করেন, তেমনই আকাশে শব্দ ব্যাপ্ত ছিল? আমাদের মতে এমন সম্ভব নয়। তাল্বাদি প্রয়াস ছাড়া এমন শব্দ অর্থাৎ বৈখরী বাণীর উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নয়। অতএব আমাদের মতে এই সমস্ত ছন্দ পরা এবং পশ্যন্তী বাণীর রূপে সর্বত্র ব্যাপ্ত ছিল। বর্ণত্বের বীজ তো বিদ্যমান ছিল কিন্তু শ্রব্য অবস্থায় নয়। এখন এই পশ্যন্তী বাক্‌কে ঋষিরা কিভাবে গ্রহণ করেছিলেন? এর আলোচনা আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতে লিখেছি। এই বিষয়েই মহাত্মা ভর্তৃহরির বাক্যপদীয়ম্-এর ব্রহ্ম কাণ্ডের ১৩৬তম শ্লোক যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয়-

"আবিভাগাদ বিবৃত্তানামভিখ্যা স্বপ্নবচ্ছ্রুতি।
ভাবতত্ত্বং তু বিজ্ঞান লিঙ্গেব্যো বিহিতা স্মৃতিঃ।।"

এর আশয় এই যে অখণ্ড পরমেশ্বর অথবা পরাবাক্‌ রূপ একাক্ষর 'ওম' পদ বাচক থেকে বিস্তৃত ও প্রকাশিত বিভিন্ন ছন্দ, যা পশ্যন্তী রূপে বিদ্যমান থাকে, তার স্বপ্নের ন্যায় জ্ঞান হয়। এর তাৎপর্য এই যে যেরূপ শ্রোত্রেন্দ্রিয়-এর সহায়তা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা বিভিন্ন বাণী শোনা যায়, সেইরূপ সবিচার সমাধি, যেখানে যোগী সূক্ষ্ম বিষয়গুলির বিচার করে, তাতে এই ছন্দগুলিকে নিজের সূক্ষ্ম শরীর অথবা অন্তঃকরণ দ্বারা গ্রহণ করে নিজের চিত্তে অগ্নি, বায়ু ইত্যাদি চার ঋষি সঞ্চিত করে নিয়েছিলেন।

প্রশ্ন- আপনি ভগবদ্যাস্ক দ্বারা নিরুক্ত শাস্ত্রে প্রদর্শিত বাণী সম্পর্কিত ছয় প্রকারের শ্রেণীবিভাগের
উপেক্ষা করে আচার্য সায়ণ অথবা সাম্বপঞ্চাশিকা-এ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অথবা ব্যাকরণ মহাভাষ্য-এর
ভাষ্য প্রদীপকার আচার্য কৈয়ট ও আচার্য নাগেশভট্ট-কে প্রমাণ মেনে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং
বৈখরী এই শ্রেণীবিভাগকে কেন গ্রহণ করেছেন? এই যুগের মহান বেদজ্ঞ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী
বৈয়াকরণদের মতানুসারেই পূর্বে বর্ণিত ঋ. ১.১৬৪.৪৫-এর ভাষ্য করেছেন, পুনরায় আপনি মহর্ষি
দয়ানন্দ-এর উপেক্ষা, কি এই কারণে করেছেন, কারণ এতে আপনার ছন্দ বিজ্ঞান এবং তাদের অগ্ন্যাদি চার ঋষিদের দ্বারা গ্রহণের কল্পিত প্রক্রিয়ার সমর্থন হতে পারত না। মহর্ষি দয়ানন্দ তাঁর ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা এবং সত্যার্থপ্রকাশাদি গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন যে পরমাত্মা সেই অগ্ন্যাদি চার
ঋষির আত্মায় বেদের প্রকাশ করেছিলেন। কি আপনার বেদজ্ঞান-এর আবির্ভাবের প্রক্রিয়া এর বিপরীত
মনগড়া নয়?

উত্তর- বাক্‌-এর শ্রেণীবিভাগের উপর বিবেচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে নিরুক্ত যে শ্রেণীবিভাগের মতগুলির বর্ণনা করেছে, সেইরূপ শ্রেণীবিভাগ পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি নয়। আপনার সন্দেহের সমাধানের জন্য আমরা সমস্ত শ্রেণীবিভাগের উপর ক্রমান্বয়ে বিবেচনা করি।

(১) আর্যমত- ও৩ম্, ভূঃ ভূবঃ, স্বঃ।
যেমন আমরা পূর্বে প্রদর্শন করেছি যে এই মত ভগবান মনু মহারাজও প্রদর্শন করেছেন। এটিকে
আর্শমত বলার পিছনে আমাদের দুইটি প্রধান কারণ দেখা যায়।
(ক) ভগবান মনু থেকে সমস্ত মহর্ষি ভগবন্তদের মতে বাণীর এই শ্রেণীবিভাগ গ্রহণযোগ্য ছিল। এই
কারণে একে আর্শমত বলা হয়েছে।

(খ) বিভিন্ন ঋষি প্রাণে চার ছন্দ 'ওম', 'ভূঃ', 'ভুবঃ', 'স্বঃ' বিদ্যমান থাকে অথবা এগুলির থেকেই সকল ঋষি অর্থাৎ প্রাণের উৎপত্তি হয়। এই কারণেও একে আর্শ মত বলা হয়, এমন আমাদের মত হয়। ঋষি প্রাণ কী হয়, এটি আমরা বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান নামক অধ্যায়ে লিখব।

বাণীর এই শ্রেণীবিভাগ ধ্বনি উৎপত্তির বিশেষত তার পর্যায়গুলির বর্ণনা নয়, বরং বাক্‌ এর প্রকারগুলির বর্ণনা করে। হ্যাঁ, 'ওম' মূল বাক্‌, এটি অবশ্যই। এই শ্রেণীবিভাগ থেকে বাক্‌-এর গ্রাহ্যতার পর্যায় বা সামর্থ্যের কোনো স্পষ্টীকরণ হয় না। এগুলি সকলেই ছন্দ, যা সৃষ্টি আরম্ভে উৎপন্ন হয়েছিল এবং আজও সর্বতোব্যাপ্ত। পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি চারটি রূপে এই চারটি ছন্দ 'ওম', 'ভূঃ' ইত্যাদি থাকে বা থাকতে পারে। এটিকে এইভাবে বোঝা যায় যে কোনো গায়ক ক্রমানুসারে নির্দিষ্ট চারটি ভজন গায় এবং সেই ভজনগুলি এমন, যা তার পরবর্তীতে গাওয়া ভজনগুলির যেন ভূমিকার রূপ হয় অথবা সে সর্বপ্রথম চারটি ছন্দ 'দোহা', 'সোরঠা', 'চৌপাই', ও 'কবিত্ব' গায়, কিন্তু তাদের চার প্রকার স্তর বা ধ্বনি তরঙ্গের কম্পাঙ্কে গায়। তখন চার স্তর এবং চার ছন্দ উভয় প্রকারের শ্রেণীবিভাগ পৃথক-২ স্তর থেকে হয়। এইভাবে প্রত্যেক ছন্দ বা বাক্‌ তত্ত্ব পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি চার রূপে থাকে।

(২) বৈয়াকরণ মত- নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত। এগুলি চারটিই বাক্‌-এরই রূপ, কিন্তু চারটিই পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি স্তরে থাকে। এদের পরস্পরের কোনো বিরোধ নেই।

এইভাবে পূর্বোক্ত যাজিক, নৈরুক্ত ইত্যাদি সমস্ত মতের বিষয়ে জানুন। পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি শ্রেণীবিভাগ প্রকৃতপক্ষে বক্তা ও শ্রোতার বলা ও শোনার প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করে এবং অন্যান্য শ্রেণীবিভাগ এই ভিত্তিতে যে বক্তা ও শ্রোতা কী বলছে বা শুনছে। এই বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এটি।

এখন যেহেতু আমরা পূর্ব মহর্ষিদের দ্বারা বৈদিক ছন্দগুলির গ্রহণের বর্ণনা করছি অর্থাৎ সেই প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিকতাকে বোঝার চেষ্টা করছি, তখন বাণীর অন্য কোনো বর্ণনা এখানে গুরুত্ব রাখে না, বরং পরা, পশ্যন্তী রূপগুলির বর্ণনাই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই আমরা প্রসঙ্গানুযায়ী এইটিরই আলোচনা করেছি। যেখানে পর্যন্ত মহর্ষি দয়ানন্দ-এর সেই মতের প্রশ্ন, যেখানে তিনি অগ্ন্যাদি চার ঋষির আত্মায় বেদের প্রকাশের আলোচনা করেছেন, তা আমাদের মত সম্পূর্ণ বর্ণিত হওয়ার পরেই বোঝা যাবে। এই কারণে আমরা আমাদের পূর্ব প্রসঙ্গে পুনরায় আসি—যখন চার ঋষির চিত্তে বৈদিক ছন্দ পশ্যন্তী বাক্‌-এর অবস্থায় সঞ্চিত হয়ে গেল, তখন তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার বিষয়ে আমরা বেদের বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ-এর মতের উপর পরবর্তীতে বিবেচনা করি। ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-তে বেদোৎপত্তিবিষয় নামক অধ্যায়ে 'বেদ' শব্দের অর্থ করতে গিয়ে লিখেছেন—"বেদ: = বিদন্তি-জানন্তি, বিদ্যন্তে= ভবন্তি, বিন্দন্তি বিন্দতে= লভন্তে, বিন্দতে= বিচারয়ন্তি সর্বে মনুষ্যাঃ সর্বাঃ সত্যবিদ্যা ধৈর্যেষু বা তথা বিদ্বাংশ্চ ভবন্তি তে বেদাঃ" অর্থাৎ যেগুলি পড়ার দ্বারা যথার্থ বিদ্যার বিজ্ঞান হয়, যেগুলি পড়ে বিদ্বান হওয়া যায়, যেগুলিতে সমস্ত সুখের লাভ হয়, এবং যেগুলির দ্বারা যথাযথ সত্যাসত্যের বিচার মানুষ করতে পারে, সেই কারণে ঋক্ সংহিতাদি-র নাম 'বেদ'। এতে বিদ্ জ্ঞানে, বিদ্লূ লাভে, বিদ্ সত্তায়াম্, এবং বিদ্ বিচারণে এই চার ধাতু থেকে 'বেদ' শব্দের উৎপত্তি দেখানো হয়েছে। আমরা এই চার ধাতু থেকে কিছু অন্য প্রকারের অর্থও গ্রহণ করব। বিদ্ জ্ঞানে থেকে, যা জ্ঞানরূপ এবং যার দ্বারা সকল মানুষ সত্যাসত্যের পূর্ণ জ্ঞান পায়। বিদ্ সত্তায়াম্ থেকে সেই জ্ঞান এমন হয়, যার সর্বদা সত্তা থাকে অর্থাৎ এর দ্বারা সকল সত্য বিদ্যারই জ্ঞান হয়, কোনো অনিত্য ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান এর দ্বারা হয় না। বিদ্লূ লাভে, অর্থাৎ সেই বেদের জ্ঞান থেকে মানবমাত্র বা মানবমাত্রের এর ব্যবহার দ্বারা প্রাণীমাত্রের সকল যথার্থ সুখের লাভ হয়। বিদ্ বিচারণে থেকে অর্থাৎ যে জ্ঞান অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চার ঋষিকে সবিচার সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তর্গত হয়, সেই জ্ঞান বিচার অর্থাৎ সম্পূর্ণ সংশয়হীন হয়।

ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-এর 'বেদোৎপত্তিবিষয়' নামক অধ্যায়ে মহর্ষি দয়ানন্দ উদ্ধৃত করেন—
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে। ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদূ যজুস্তস্মাদজায়ত ॥ (যজু.৩১.৭) এবং বা অরেऽস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বাসিতমেতদ্যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোऽথর্বাঙ্গিরসঃ ॥ (শ.১৪.৫.৪.১০)

অর্থাৎ তস্মাদূ যজ্ঞাৎ সচ্চিদানন্দাদিলক্ষণাত্ পূর্ণাৎ পুরুষাত্ সর্বহুতাৎ সর্বপূজ্যাত্ সর্বোপাস্যাত্ সর্বশক্তিমতঃ পরব্রহ্মণঃ ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদশ্চ চত্বারো বেদাস্তেনৈব প্রকাশিতা ইতি বৈদ্যম্। মহত আকাশাদপি বৃহতঃ পরমেশ্বরস্যৈব সকাশাৎ ঋগ্বেদাদিবেদচতুষ্টয়ং নিঃশ্বাসবৎ সহজতয়া নিঃসৃতমস্তীতি বেদ্যম্। যথা শরীরাচ্ছ্বাসো নিঃসৃত্য পুনঃ তদেব প্রবিশতি, তথৈবেশ্বরাদ্ বেদানাং প্রাদুর্ভাবতিরোভাবৌ ভবত ইতি নিশ্চয়ঃ ।।

অর্থাৎ সেই সচ্চিদানন্দস্বরূপ পূর্ণ পুরুষ পরমাত্মা থেকেই ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ সেই চার ঋষির হৃদয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এখন তারা কীভাবে প্রকাশিত হয়, তার প্রক্রিয়া বোঝানোর জন্য মহর্ষি দয়ানন্দ শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য-এর উক্তি উদ্ধৃত করেন, যার ভাব এই যে পরমেশ্বর, যিনি আকাশাদি থেকেও অনেক বড়, তার থেকেই চার বেদ সেই চার ঋষির মধ্যে এভাবে প্রকাশিত হয়েছে বা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে এভাবে উৎপন্ন হয়েছে, যেমন কোনো প্রাণী স্বাভাবিকভাবে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে। যেরূপ প্রাণীকে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ প্রচেষ্টা করতে হয় না, সেইরূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার দ্বারা ছন্দরূপ বেদ এই ব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টি-উৎপত্তির সময় প্রসারিত করা হয়।


এখানে ভগবান যাজ্ঞবল্ক্য যে উপমা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চেতন প্রাণী জড় প্রাণকে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে, সেইরূপ চেতন পরমাত্মা জড় প্রকৃতি থেকে ছন্দগুলির উৎপত্তি ও প্রলয় করেন। এর থেকে আমাদের মতে বেদের সেই মহর্ষিদের আত্মা বা চিত্তে প্রকাশিত হওয়ার একটি আরও বিজ্ঞানও উদ্ঘাটিত হচ্ছে। তা এইরূপ—যখন সেই ঋষিরা সম্প্রজ্ঞাত সবিচার সমাধিতে থাকেন, তখন পরমাত্মা ব্রহ্মাণ্ডে সেই সময় ব্যাপ্ত বিভিন্ন বৈদিক ছন্দগুলিকে সেই ঋষিদের ভিতরে শ্বাসের ন্যায় প্রবেশ করিয়ে দেন এবং সেই ছন্দগুলির মধ্যে থেকে যে যে সেই মহর্ষিদের এমন প্রতীত হয়, যাদের অর্থের প্রকাশ মানব বা প্রাণিজাতির জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তাকে গ্রহণ করে নেন, এবং অবশিষ্টকে প্রশ্বাসের ন্যায় ব্রহ্মাণ্ডে নিঃসৃত করে দেন। যেরূপ প্রাণী বায়ুমণ্ডল থেকে বায়ুকে গ্রহণ করে তার মধ্যে থেকে অক্সিজেনকে ফুসফুসের দ্বারা গ্রহণ করে নেয় এবং অবশিষ্ট বায়ুকে বাইরে বের করে দেয়, সেইরূপ বৈদিক ছন্দগুলির গ্রহণ ও বিসর্জন হয়।

Read More

বিদ্যার সংজ্ঞা

01 April 0

বিদ্যার সংজ্ঞা বিদ্যাই একটি এমন গুণ, যা এই মানবজাতিকে অন্যান্য সমস্ত জীবধারীদের থেকে পৃথক একটি বিশেষ পরিচয় প্রদান করে। বিদ্যাই সেই গুণ, যা জগতের সমস্ত জড় ও চেতন পদার্থগুলির যথার্থ স্বরূপ জানায়। এটিও বিশেষভাবে বোঝার বিষয় যে, কোনো মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের যথার্থ স্বরূপ এবং তাদের পারস্পরিক বাস্তব সম্পর্ক ঠিকভাবে না জেনে তাদের থেকে যথাযথ উপকার নিতে পারে না। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লেখেন “যার দ্বারা পদার্থের স্বরূপ যথাযথভাবে জেনে তা থেকে উপকার নিয়ে নিজের এবং অন্যদের জন্য সমস্ত সুখসমূহকে সিদ্ধ করা যায়, সেটিই বিদ্যা বলা হয়।” (ব্যবহারভানু)

বিদ্যা ছাড়া মানুষের পারস্পরিক ন্যায়সংগত ব্যবহারও সম্ভব নয়। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ লেখেন “যার দ্বারা পদার্থ যথাযথভাবে জেনে ন্যায়সংগত কর্ম করা যায়, সেটিই বিদ্যা বলা হয়।” (ব্যবহারভানু)
মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে বিদ্যার ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক, যার মধ্যে বর্তমান জগতে পড়ানো হয় এমন বহু বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত যেমন ভৌত বিজ্ঞান এবং এর শাখাসমূহ খগোলভৌতবিদ্যা, 🌍খগোলবিজ্ঞান, পরমাণু ভৌতবিদ্যা, নাভিকীয় কণাভৌতবিদ্যা, ভূ-ভৌতবিদ্যা, সূর্যবিজ্ঞান, জীবভৌতবিদ্যা প্রভৃতি। রসায়নবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা— যেমন 🔬কার্বনিক রসায়ন, অকার্বনিক রসায়ন, 🧪ভৌত রসায়ন, জীবরসায়ন প্রভৃতি; 🐦প্রাণীবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভিন্ন ক্ষেত্র, অত্যন্ত উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান, শরীররচনা ও ক্রিয়াবিজ্ঞান, পশুপাখি বিজ্ঞান, পরিবেশ ও আবহাওয়াবিজ্ঞান, ভূগোল, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, 🔬শিল্প-বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা, ⚔️যুদ্ধবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, সঙ্গীত প্রভৃতি বিভিন্ন উপযোগী কলা সবই মহর্ষির মতে বিদ্যার অন্তর্গত।
এটিও লক্ষণীয় যে, এই সমস্ত বিদ্যাগুলি প্রধানত জড় পদার্থের সঙ্গেই বিশেষ সম্পর্ক রাখে। অথচ আমরা জানি যে, এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয়; এবং এই জড় পদার্থগুলি কেবল নিজের জন্যও নয়। ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা জড় হতে পারে না এবং একে ভোগকারীও জড় হতে পারে না। তবে এই বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে করব।
মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে উপরে বর্ণিত বর্তমান প্রচলিত বিদ্যাগুলি বিদ্যার কেবল অর্ধেক অংশ। বিদ্যার দ্বিতীয় অর্ধেক অংশ, যা চেতন পদার্থগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত, পাশাপাশি যা ভৌত জগতের সূক্ষ্মতম বিজ্ঞান (কণাভৌতবিদ্যা, তরঙ্গভৌতবিদ্যা, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এবং স্ট্রিং থিওরি)-এর থেকেও সূক্ষ্ম এবং বৃহত্তম সৃষ্টি-বিজ্ঞানের থেকেও ব্যাপক এই দুই মিলেই বিদ্যার পূর্ণ স্বরূপ গঠিত হয়।
এইজন্য মহর্ষি বিদ্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লেখেন📚“যার দ্বারা ঈশ্বর থেকে নিয়ে পৃথিবী পর্যন্ত পদার্থগুলির সত্য বিজ্ঞান লাভ করে তাদের থেকে যথাযথ উপকার নেওয়া যায়, এর নাম বিদ্যা।” 📚(আর্যোদ্ধেশ্যরত্নমালা)
প্রাচীন বৈদিক ভারতে বিদ্যার সমগ্র স্বরূপেরই প্রচলন ছিল। এই কারণেই একবার দেবর্ষি নারদ মহর্ষি সনৎকুমারের কাছে গিয়ে বললেন—
"ঋগ্বেদং ভগবোऽধ্যেমি যজুর্বেদং সামবেদমাথর্বণং চতুর্থমিতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং বেদং পিত্র্যং রাশি দেবং নিধিং বাকোবাক্যমেকায়নং দেববিদ্যাং ব্রহ্মবিদ্যাং ভূতবিদ্যাং ক্ষত্রবিদ্যাং নক্ষত্রবিদ্যাং সর্পদেবজনবিদ্যামেতদ্ভগবোऽধ্যেমি ।।" (ছা০উ০ ৭।১।২ ডঃ সত্যব্রত সিদ্ধান্তালংকার ভাষ্য)
অর্থাৎ (নারদ) বললেন (ঋগ্বেদম্) ঋগ্বেদকে (ভগবঃ) হে ভগবান (অধ্যেমি) পড়ি, পড়েছি (যজুর্বেদম্) যজুর্বেদকে (সামবেদম্) সামবেদকে (অথর্বণম্) অথর্ববেদকে (চতুর্থম্) চতুর্থ (ইতিহাসপুরাণম্) ইতিহাস-পুরাণকে (পঞ্চমম্) পঞ্চম (বেদানাম্) বেদগুলির (বেদম্) বেদ জ্ঞান-প্রদানকারী, জ্ঞাপক অর্থাৎ ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, শিক্ষা, কল্প প্রভৃতি) কে (পিত্র্যম্) পিতৃ কর্ম (পিতৃ-শুশ্রূষা শাস্ত্র অর্থাৎ গৃহ বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ, কৃষি বিজ্ঞান প্রভৃতি) কে (রাশিম্) গণিত শাস্ত্রকে (দৈবম্) আবহাওয়া বিজ্ঞান, বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রकोপ প্রভৃতি সম্পর্কিত বিজ্ঞান এবং কর্মফল ব্যবস্থা (নিধিম্) অর্থশাস্ত্রকে (বাকোবাক্যম্) তর্ক শাস্ত্র এবং বিধি শাস্ত্রকে (একায়নম্) নীতিশাস্ত্র (দেববিদ্যাম্) সমস্ত প্রকাশিত সূক্ষ্ম পদার্থগুলির বিজ্ঞান এবং বেদমন্ত্রগুলির বিভিন্ন দেবতাদের বিজ্ঞান (ব্রহ্মবিদ্যাম্) বিদ্যুৎ বিদ্যা, মন-বাক্ তত্ত্ব প্রভৃতির বিজ্ঞান এবং পরমাত্মতত্ত্ব বিজ্ঞানকে (ভূতবিদ্যাম্) ভৌতবিদ্যা, রসায়ন বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, ভূগর্ভশাস্ত্র প্রভৃতি কে (ক্ষত্রবিদ্যাম্) যুদ্ধ এবং অস্ত্র-শস্ত্র বিদ্যাকে (নক্ষত্রবিদ্যাম্) খগোল ভৌতবিদ্যা, খগোল বিজ্ঞান, সূর্য এবং নক্ষত্রগুলির বিজ্ঞান (সর্পদেবজনবিদ্যাম্) পৃথিবীতে রেঙে চলা প্রাণীদের এবং বন্য প্রাণীদের বিজ্ঞান, শিল্পশাস্ত্র অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সঙ্গীত প্রভৃতি ললিত বিদ্যাগুলিকে (এতদ্) এই সমস্তকে (ভগবঃ) হে ভগবান (অধ্যেমি) শিক্ষা লাভ করছি (লাভ করেছি)।।২।।
"সোऽহং ভগবো মন্ত্রবিদেবাস্মি নাত্মবিচ্ছূতে হ্যেব মে ভগবদ্দৃশেভ্যস্তরতি শোকমাত্মবিদিতি। সোऽহং ভগবঃ শোচামি তং মা ভগবা ছোকস্য পারং তারয়ত্বিতি। তং হ উবাচ যদ্বৈ কিঞ্চৈতদধ্যগীষ্ঠা নামৈবৈতত্ ।।৩।।
(ছা০ উ০ ৭।১।৩)
অর্থাৎ (সঃ অহম্) সেই আমি অর্থাৎ বেদাদি শাস্ত্রকে জানা আমিও (ভগবঃ) হে ভগবান! (মন্ত্রবিত্+এব) মন্ত্রজ্ঞই (অস্মি) আছি অর্থাৎ পাঠকমাত্র (আত্মবিত্ ন) ব্রহ্মজ্ঞ নই (হি) কারণ (ভগবদ্দৃশেভ্যঃ) আপনার মতো তত্ত্বজ্ঞদের থেকে (মে) আমি (শ্রুতমেব) শুনেছি যে (আত্মবিত্) ব্রহ্মজ্ঞ (শোকম্ তরতি) শোককে অতিক্রম করে অর্থাৎ শোক করে না (ইতি) কিন্তু (ভগবঃ) হে ভগবান! (সোऽহম্) সেই আমি (শোচামি) শোক করছি, এই কারণে আমি আত্মজ্ঞ নই (তম্) সেই শোকগ্রস্ত (মা) আমাকে (ভগবান্) আপনি (শোকস্য পারম্) শোকের পার (তারয়তু) পার করান (ইতি) এই আমার প্রার্থনা। (তম্ হ উবাচ) সেই প্রসিদ্ধ সনৎকুমার সেই নারদকে বললেন যে (যত্কিঞ্চ) যা কিছু (এতত্) উপরে বর্ণিত বিজ্ঞানসমূহের (বৈ) নিশ্চয়ই (অধ্যগীষ্ঠাঃ) আপনি অধ্যয়ন করেছেন (এতত্ নামৈব) তা সবই নামমাত্র। ভাষ্য— (পণ্ডিত শিবশঙ্কর শর্মা 'কাব্যতীর্থ')


পাঠকগণ এখানে বিবেচনা করুন যে দেবর্ষি নারদের অধ্যয়ন কত বিশাল ছিল। কোনো একক ব্যক্তি এত বিষয়ের বিশেষজ্ঞও হতে পারে, এমন কল্পনাও করা অত্যন্ত কঠিন। দুর্ভাগ্যবশত আর্যাবর্ত (ভারতবর্ষ) অথবা বিশ্ব ভগবান নারদ প্রভৃতি মহাপুরুষদের যথার্থ চরিত্রকে বিস্মৃত হয়ে বসেছে। এখন একটু এই দিকটি বিবেচনা করুন যে সমগ্র জড় এবং চেতন জগতের বিস্তৃত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও দেবর্ষি নারদ কেন শোকে নিমগ্ন ছিলেন? তিনি কোন জ্ঞান-পিপাসায় মহর্ষি সনৎকুমারের শ্রীচরণে উপস্থিত হয়েছিলেন? এই কথার উত্তর তিনি নিজেই দেন যে আমি মন্ত্রজ্ঞ, আত্মজ্ঞ নই অর্থাৎ তিনি উপরে বর্ণিত সমস্ত বিদ্যার বিস্তৃত তাত্ত্বিক জ্ঞান তো রাখতেন। শিল্পশাস্ত্র অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে তাকে সমস্ত পদার্থ বিদ্যার প্রায়োগিক জ্ঞানও ছিল। ঈশ্বর এবং জীব উভয় চেতন তত্ত্বের গভীর মনন-চিন্তনও তিনি করেছিলেন কিন্তু এই চেতন তত্ত্বগুলির সাক্ষাৎকার করে জীবন্মুক্ত অবস্থা তখনও লাভ করতে পারেননি এবং এইটিই একমাত্র তার শোকের কারণ ছিল। এই বিষয়ে দুইটি কথা গভীরভাবে বিবেচনীয়—
ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের অনিবার্য সম্পর্ক

(১) সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ঈশ্বর-জীবের পূর্ণ তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়া চেতন তত্ত্বের সাক্ষাৎকার সম্ভব নয়। এই কারণেই ভগবান নারদ জগতের বিভিন্ন বিদ্যার অধ্যয়ন পূর্বেই করে নিয়েছিলেন এবং তার গুরুরাও এত বিদ্যার অধ্যাপন তাকে করিয়েছিলেন। যদি ঈশ্বর এবং আত্মসাক্ষাৎকারের জন্য এই সমস্ত বিদ্যা অনাবশ্যক হত, তবে সেই মহান বৈদিক কালে এবং সেই মহান দেব সমাজের মহান ঋষি মহাপুরুষেরা নারদের মতো মহান ব্যক্তিকে এই সমস্ত বিদ্যা পড়ানোর পুরুষার্থ করতেন না। এই বিষয়ে সেই মহাপুরুষদের গম্ভীরভাবে চিন্তা করা উচিত, যারা পদার্থ বিজ্ঞান এবং লোকব্যবহারের বিদ্যাগুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ঈশ্বর এবং মুক্তির কথা বলেন। আবার কেউ-কেউ মহাপুরুষ ক্ষণমাত্রে সমাধি প্রাপ্ত করানোর দাবি করেন। প্রকৃতপক্ষে এমন মহাপুরুষেরা বৈদিক আর্শ পরম্পরা এবং তারই এক অঙ্গ পাতঞ্জল যোগশাস্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

প্রশ্ন—আপনার মতে ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য যদি এত জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রয়োজন হয় এবং এর পরে ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের উপায় করা হয়, তবে তো কোনো মানুষ ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবে না, কারণ না মহর্ষি নারদের মতো জ্ঞান হবে এবং না আত্মসাক্ষাৎকারের চেষ্টা করবে?

উত্তর—আমাদের উপরের কথার এই অর্থ নয় যে উপরোক্ত পদার্থ বিদ্যা অথবা চেতন বিদ্যার অধ্যয়নের সময় ঈশ্বরের উপাসনা করা হবে না। আমাদের বৈদিক সংস্কৃতিতে তো শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শিশুর পিতা স্বর্ণ শলাকার দ্বারা মধু দিয়ে শিশুর জিহ্বায় 'ওম' লিখে। এর উদ্দেশ্য এই হয় যে সেই শিশু জীবনে মাধুর্য নিয়ে জগতে নিজের মধুর আচরণের দ্বারা মাধুর্য ভরিয়ে দেবে এবং মধু উৎকৃষ্ট স্বাস্থ্যবর্ধক হওয়ার কারণে আয়ুর্বিজ্ঞান, আহারশাস্ত্র এবং শরীরোপযোগী বিভিন্ন বিদ্যার জ্ঞানী হয়ে উৎকৃষ্ট বল, বুদ্ধি, পরাক্রম, প্রজ্ঞা এবং দীর্ঘায়ু দ্বারা যুক্ত হয়ে সমগ্র জগৎকে নিজের মতোই গুণে পূর্ণ করার চেষ্টা করতে করতে এবং সোনা প্রভৃতি রত্ন দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে বিভিন্ন লোকোপযোগী বিদ্যার দ্বারা জগৎকে সুখী-সমৃদ্ধ করার চেষ্টা সর্বদা করতে থাকবে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে চিন্তনীয় যে এমন বিস্তৃত উদার ভাবনা কোনো ব্যক্তির মধ্যে তখনই আসতে পারে, যখন সে সমগ্র জগতকে নিজেরই পরিবার মনে করবে এবং নিজের পরিবার তখনই হয়, যখন তাকে উৎপন্ন করার পিতা-মাতার একটি জোড়া থাকে। এইজন্য সেই শিশুর জিহ্বায় 'ওম' শব্দ লেখা হয়। এটি এই বিষয়ের সংকেত যে হে শিশু! এই পরমাত্মাই এই সমগ্র জগতের মাতা এবং পিতা অথবা চেতন পরমাত্মা সকলের পিতা এবং জড় প্রকৃতি সকলের মাতা। এই কারণে জগতের সমস্ত প্রাণী এক পরিবারের সদস্য। এখানে এই বিষয়ও উল্লেখযোগ্য যে প্রকৃতিকে মাতা বলা হয়েছে কিন্তু পিতা কোথাও বলা হয়নি। অথচ পরমাত্মাকে—

"ত্বং হি নঃ পিতা বসো ত্বং মাতা শন্তক্রতো বভূবিথ।
অধা তে সুম্নমীমহে" ॥১১॥ (ঋ.৮.৬৮.১১), (সা.১৯৭০, অথর্ব. ২০.১০৮.২)

বলে মাতা এবং পিতা উভয় নামে সম্বোধন করা হয়েছে। এইজন্য সেই সর্বোচ্চ উপাস্য দেব এবং তারই প্রধান এবং নিজ নাম 'ওম'। এই কারণে শিশুকে শুধু জগৎ পরমাত্মার পরিবার—এই শিক্ষা দেওয়া হয় না, বরং সেই পরমাত্মাই আমাদের চূড়ান্ত পরমধাম—এই সংকেতও দেওয়া হয়।

এই কারণে পাতঞ্জল যোগের বিভিন্ন অঙ্গের সাধনা করতে করতে শৈশব থেকেই ঈশ্বরোপাসনা প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ ধর্ম হওয়া উচিত। ঈশ্বরোপাসনা এবং ব্রহ্মচর্য-প্রাণায়াম প্রভৃতি তপস্যার দ্বারা ছাত্র মহৎ প্রজ্ঞা লাভ করে বিভিন্ন পদার্থ বিদ্যার গভীর রহস্য এবং আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানকেও তুলনামূলকভাবে বুঝতে সক্ষম হয় এবং এইরূপ করতেই মহর্ষি নারদ উপরে বর্ণিত বিদ্যাগুলির মহান বিশেষজ্ঞ হতে পেরেছিলেন। এই কারণে কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জন্য পদার্থ বিদ্যার উপেক্ষা এবং নিন্দা কোনো অবস্থাতেই যুক্তিযুক্ত মনে করা যায় না, বরং পদার্থ বিদ্যা প্রত্যেক আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জন্য অনিবার্য বিষয় আছে। এটি খুবই সহজ কথা যে কার্যকে না দেখে কোনো কর্তার অনুমানও কিভাবে সম্ভব এবং যখন তার অস্তিত্বের অনুমানও হবে না, তখন তার স্বরূপের যথার্থ জ্ঞান এবং তার প্রাপ্তির তো কল্পনাও করা যায় না।

(২) সমগ্র সৃষ্টিকে জানার পরে এবং ঈশ্বর-জীবাত্মা বিষয়ক বিভিন্ন বেদাদি শাস্ত্রকে গম্ভীরভাবে অধ্যয়ন করার পরেও ঈশ্বর-আত্মার সাক্ষাৎকার ছাড়া অথবা জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত না করে সম্পূর্ণ বিশোক অবস্থার প্রাপ্তি সম্ভব নয়, এই অবস্থাকেই মুক্তি বলা হয়। আমাদের দৃষ্টিতে মহর্ষি নারদ মহর্ষি সনৎকুমারের কাছে আসার পূর্বে আত্মা অথবা ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করেননি, এমনটি কখনোই সম্ভব বলে মনে হয় না। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি না হয়ে এত বিশাল এবং গভীর অধ্যয়ন করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এবং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি সেই হবে, যে ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করেছে। বর্তমান কোনো আধ্যাত্মিক এবং প্রতিভাশালী বিদ্বানের দ্বারা বেদার্থ করা আলাদা কথা এবং সেই মহান যুগে মহর্ষি নারদের দ্বারা নিজেকে মন্ত্রবিত্ বলা খুব উচ্চ কথা। আমাদের দৃষ্টিতে 'মন্ত্রবিত্' এর অর্থ কেবল পাঠকমাত্র নয়, বরং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির স্তর প্রাপ্ত করা। আমরা বিভিন্ন বিদ্বানদের দ্বারা মন্ত্রবিত্ শব্দের অর্থ 'পাঠকমাত্র' করা সঙ্গে সম্মত নই।

প্রশ্ন— যদি 'মন্ত্রবিত্' এর অর্থ ঋষিই হয়, তবে কি ঋষিরাও শোকাকুল এবং অপূর্ণবিদ্যা হয়, তাহলে তাদের এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য কি রইল?

উত্তর— জগতে সম্পূর্ণ পূর্ণপুরুষ তো কেবল পরমাত্মাই হতে পারে এবং জীবাত্মাদের স্তরে সম্পূর্ণ শোকহীন এবং সমস্ত জ্ঞেয়ের জ্ঞানী কেবল মুক্তাত্মা এবং জীবন্মুক্ত পুরুষই হতে পারে। অন্য স্তরগুলিতে কখনো-সখনো সামান্য শোক-দুঃখ আসতেই পারে এবং সেই অবস্থাই তখন মহর্ষি নারদের ছিল। এটিও লক্ষ্যণীয় যে এই স্তরের মহাপুরুষদের এবং অন্যান্য স্তরের মানুষের সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দে অনেক পার্থক্য থাকে।

এখন মহর্ষি নারদ তখন যে আত্মবিত্ না হওয়ার কথা বলেন, তার অর্থ এই যে তিনি মুক্তির কামনায় জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত করার জন্য ঈশ্বর সাক্ষাৎকারকে দৃঢ় করার এবং নিজের সমস্ত সংস্কারকে দগ্ধবীজ করার অভ্যাসের জন্য জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত সদ্গুরু মহর্ষি সনৎকুমারের শরণে এসেছিলেন। এইরূপে এই সিদ্ধান্ত প্রাপ্ত হয় যে সমগ্র পদার্থ বিদ্যার জ্ঞানী বিজ্ঞানী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ সুখ প্রাপ্ত করতে পারে না, যতক্ষণ না সে চেতন তত্ত্বের সাক্ষাৎকার দ্বারা তার যথার্থ বিজ্ঞান প্রাপ্ত করে। সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি সুন্দর মালার ন্যায়। জগতের সমস্ত পদার্থ বিদ্যাগুলি সেই মালার সুন্দর মুক্তোর ন্যায় এবং সেই মুক্তোগুলিকে পরস্পর যুক্ত করার সূতোরূপ ভিত্তি চেতনতত্ত্ব বিজ্ঞান। যতক্ষণ এই সূতা থাকবে না, ততক্ষণ মুক্তোগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে সৌন্দর্য প্রাপ্ত করতে পারবে না। এইরূপে আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান ছাড়া পদার্থ বিজ্ঞান এবং ব্যবহারিক বিদ্যার বিভিন্ন শাখা মানব সমাজ অথবা প্রাণীমাত্রকে কখনোই সুখ-শান্তি দিতে পারে না। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিরোধভাব থাকবেই, যার কারণে সুখ-সুবিধার বিভিন্ন বিস্তার হওয়া সত্ত্বেও মানব সমাজ সুখী এবং আনন্দিত হতে পারবে না, তখন প্রাণীমাত্রের কথাই বা কি বলা যায়? দুর্ভাগ্যবশত আজ জগতে এইসবই ঘটছে। সুখ-সুবিধার উপকরণের ভিড়ে সুখ, শান্তি, প্রেম, মৈত্রী, করুণা প্রভৃতি মানবীয় গুণ কোথাও হারিয়ে গেছে। কোনো মালার সূতা শুধু সেই মুক্তোগুলিকে ভিত্তি দেয় না, বরং তাদের সুশৃঙ্খল ক্রম প্রদান করে সুন্দর এবং উপযোগীও করে তোলে। এইরূপে যথার্থ আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান বিভিন্ন বিদ্যাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে, তাদের পরস্পর পরিপূরক করে প্রাণীমাত্রের জন্য উপযোগীও করে তোলে। তখন যেখানে নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির বিকাশ হয়, যেখানে পরিবেশ সুন্দর এবং সংরক্ষিত থাকে, সেখানে মানুষের মধ্যে গলা-কাটা প্রতিযোগিতা না হয়ে পারস্পরিক প্রীতি এবং শান্তিও বজায় থাকে। তিন প্রকারের দুঃখ অর্থাৎ শারীরিক এবং মানসিক দুঃখ, প্রাকৃতিক প্রকোপ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন দুঃখ এবং প্রাণীদের পারস্পরিক সংঘর্ষজনিত দুঃখ কাউকেই পীড়িত করে না। অন্যদিকে বিভিন্ন পদার্থবিদ্যা এবং ব্যবহারিক জ্ঞানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল আধ্যাত্মের কথা বলার মহাপুরুষেরা কোনো সুন্দর মালার ন্যায় সামাজিক ব্যবস্থার কল্পনা থেকেও অত্যন্ত দূরে একটি সূতার ন্যায় এমন নীরস ব্যবস্থা উৎপন্ন করার হয় হয়, যেখানে তাদের পরমাত্মা অথবা মুক্তির প্রাপ্তি তো কি হবে, বরং তারা নিজেদের উদর-পোষণেও সক্ষম না হয়ে সম্পূর্ণ দুঃখী এবং অভিশপ্ত জীবন যাপন করে। এই কারণেই যজুর্বেদে বলা হয়েছে—

"অন্ধন্তমঃ প্রবিশন্তি যেऽবিদ্যামুপাসতে। ততো ভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ ॥" (যজু. ৪০.১২)

অর্থাৎ যারা মানুষ কেবল পদার্থ বিজ্ঞানে নিমগ্ন থাকে, তারা দুঃখ-সাগররূপ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং যারা মানুষ পদার্থ বিদ্যার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে নিমগ্ন থাকতে চায়, তারা আরও অধিক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এর কারণ পাঠক উপরে বুঝেই গেছেন। তখন, কিভাবে মানুষ সম্পূর্ণ সুখী হতে পারে, এর উত্তরে বেদ আবার বলে—

"বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্বেদোভাব্যং সহ। অবিদ্যয়া মৃত্যুঁ তীর্ত্বা বিদ্যয়া অমৃতমশ্নুতে ।।" (যজু. ৪০.১৪)

অর্থাৎ যে মানুষ পদার্থ বিদ্যা এবং আধ্যাত্মিক বিদ্যা উভয়কেই একসঙ্গে জানে, সেই মানুষ পদার্থ বিদ্যার যথাযথ এবং সর্বহিতকারী প্রয়োগের দ্বারা এবং শরীর ও জগতের নশ্বর হওয়ার জ্ঞান দ্বারা মৃত্যু-ভয় এবং অন্যান্য সমস্ত দুঃখ অতিক্রম করে যথার্থ আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের দ্বারা জীবন্মুক্ত অথবা মুক্তিরূপ পরমানন্দ প্রাপ্ত হয়।

এইভাবে জগতের বিদ্যাগুলির বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা এবং তাদের সমন্বিত, সুষম এবং যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা মানুষ নিজে সমস্ত প্রকার দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে অন্য সকল প্রাণীকেও সুখ দিতে সক্ষম হয়। এটিই বিদ্যার উপাদেয়তা।

Read More

30 March, 2026

ঋগ্বেদ ১/৯৫/১

30 March 0

 

নিজের জন্য নোট; নিচে উল্লেখিত ঋগ্বেদের মন্ত্র ১.৭৩.০৭-এ বলা হয়েছে কীভাবে ২৪ ঘণ্টার একটি দিনের দুই বিপরীত দিক—অর্থাৎ দিন ও রাত—সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। ঋগ্বেদের প্রাচীনত্ব নির্ণয় করতে অপরিসীম পরিশ্রম প্রয়োজন হতে পারে, তবে এর মধ্যেই আমরা বিস্মিত হতে পারি যে এতে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলীর জ্ঞান সংরক্ষিত রয়েছে। এই পোস্টটি আমি সহজ রেখেছি—মূল মন্ত্র, পদপাঠ এবং ভাষ্যসহ—যাতে এর সূক্ষ্মতা লক্ষ্য করা যায়। দিন ও রাত সম্পর্কে আমি আগে একটি ব্লগেও সংক্ষেপে লিখেছিলাম (RV 1.35.7-9)। https://rupabhaty.home.blog/2019/07/30/heliocentric-model-in-rig-veda-hymn-no-164-9-and-connection-of-164-1-with-suryasidhanta-and-aryabhatiya-part-2/


সংযুক্ত ছবিটি কলম্বিয়া মহাকাশযানের শেষ অভিযানের সময় ক্রু সদস্যদের দ্বারা তোলা হয়েছিল, এক মেঘহীন দিনে। ছবিটি ইউরোপ ও আফ্রিকার, যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। ছবির অর্ধেক অংশে রাত। যে উজ্জ্বল বিন্দুগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি শহরের আলো।

ত্বে অ॑গ্নে সুম॒তিং ভিক্ষ॑মাণা দি॒বি শ্রবো॑ দধিরে য॒জ্ঞিয়া॑সঃ। 

নক্তা॑ চ চ॒ক্রুরু॒ষসা॒ বিরূ॑পে কৃ॒ষ্ণং চ॒ বর্ণ॑মরু॒ণং চ॒ সং ধুঃ॑ ॥ ঋগ্বেদ ১।৭৩।৭

স্বর সহিত পদ পাঠ
ত্বে । অ॒গ্নে॒ । সু॒ऽম॒তিম্ । ভিক্ষ॑মাণাঃ । দি॒বি । শ্রবঃ॑ । দ॒ধি॒রে॒ । য॒জ্ঞিয়াঃ॑ । নক্তা॑ । চ॒ । চ॒ক্রুঃ । উ॒ষসা । বিরূ॑পে॒ ইতি॒ বিঽরূ॑পে । কৃ॒ষ্ণম্ । চ॒ । বর্ণ॑ম্ । অ॒রু॒ণম্ । চ॒ । সম্ । ধু॒রিতি ধুঃ ॥

পদার্থ:

পদার্থঃ— (ত্বে) ত্বয়ি (অগ্নে) অধ্যাপক (সুমতিম্) শোভনাং বুদ্ধিম্ (ভিক্ষমাণাঃ) লম্ভমানাঃ (দিবি) প্রকাশস্বরূপে (শ্রবঃ) শ্রবণমন্নং বা (দধিরে) ধারণ করে (যজ্ঞিয়াসঃ) যজ্ঞক্রিয়াকুশলাঃ (নক্তা) রাত্র্যা (চ) সমুচ্চয়ে (চক্রুঃ) করেন (উষসা) দিনের সঙ্গে (বিরূপে) বিরুদ্ধরূপে (কৃষ্ণম্) নিকৃষ্টম্ (চ) সমুচ্চয়ে (বর্ণম্) চক্ষুর্বিষয়ম্ (অরুণম্) রক্তম্ (চ) সমুচ্চয়ে (সম্) সম্যগর্থে (ধুঃ) ধারণ করেন ॥৭॥

অন্বয়:
হে অগ্নি! যারা তোমার নিকটে অবস্থান করে বিদ্যার ভিক্ষা প্রার্থনা করে, সেই যজ্ঞকর্মে পারদর্শী ব্যক্তিরা উত্তম বুদ্ধি ধারণ করে এবং আলোতে শ্রবণ বা অন্ন ধারণ করে। তারা রাত্রি ও দিনের সঙ্গে কৃষ্ণ ও অরুণ বর্ণ এবং অন্যান্য বর্ণ ধারণ করে এবং বিপরীত রূপের জ্ঞান লাভ করে—তারা সুখী হয়।

হে অগ্নি, হে বিদ্বান শিক্ষক! যারা তোমার নিকটে অবস্থান করে এবং বিদ্যার ভিক্ষা করে, সেই অধ্যয়নশীল জ্ঞানীরা উত্তম বুদ্ধি ধারণ করে এবং শ্রবণ বা অন্ন গ্রহণ করে। তারা রাত্রি ও দিনের সঙ্গে কৃষ্ণ ও অরুণ বর্ণ এবং অন্যান্য বর্ণবিশিষ্ট বস্তু ধারণ করে এবং বিপরীত রূপের জ্ঞান অর্জন করে—তারা সুখী হয়।

ঋগ্বেদ ০১.০৯৫.০০১-এ একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দিন ও রাতের প্রমাণ

দ্বে বিরূ॑পে চরতঃ॒ স্বর্থে॑ অ॒ন্যান্যা॑ ব॒ত্সমুপ॑ ধাপয়েতে।
হরি॑র॒ন্যস্যাং॒ ভব॑তি স্ব॒ধাবা॑ঞ্ছু॒ক্রো অ॒ন্যস্যাং॑ দদৃশে সু॒বর্চা॑ঃ॥ ঋ० ०১।৯৫।১

স্বর সহিত পদ পাঠ
দ্বে । বিরূ॑পে॒ ইতি॒ বিঽরূ॑পে । চ॒র॒তঃ॒ । স্বর্থে॒ ইতি॑ সু॒ऽঅর্থে॑ । অ॒ন্যাঽঅ॑ন্যা । ব॒ত্সম্ । উপ॑ । ধা॒প॒য়ে॒তে॒ ইতি॑ । হরিঃ॑ । অ॒ন্যস্যা॑ম্ । ভব॑তি । স্ব॒ধাঽবা॑ন্ । শু॒ক্রঃ । অ॒ন্যস্যা॑ম্ । দ॒দৃ॒শে॒ । সু॒ऽবর্চাঃ॑ ॥

(দ্বে) রাত্রিদিনে (বিরূপে) প্রকাশান্ধকারাভ্যাং বিরুদ্ধরূপে (চরতঃ) (স্বার্থে) শোভনার্থে (অন্য্যান্যা) পরস্পরং বর্ত্তমানা (বত্সম্) জাতং সংসারম্ (উপ) (ধাপয়েতে) পায়য়েতে (হরিঃ) হরত্যুষ্ণতামিতি হরিশ্চন্দ্রঃ (অন্যস্যাম্) দিবসাদন্যস্যাং রাত্রৌ (ভবতি) (স্বধাবান্) স্বেন স্বকীয়েন গুণেন ধার্য্যত ইতি স্বধাऽমৃতরূপ ঔষধ্যাদিরসস্তদ্বান্ (শুক্রঃ) তেজস্বী (অন্যস্যাম্) রাত্রেরন্যস্যাং দিনরূপায়াং বেলায়াম্ (দদৃশে) দৃশ্যতে (সুবর্চাঃ) শোভনদীপ্তিঃ ॥১॥

হে মানুষ! এই দুই বিপরীত রূপ—দিন ও রাত—পরস্পর চলমান হয়ে জগতকে পোষণ করে। এক অবস্থায় নিজস্ব গুণে ধারণকারী শক্তি থাকে এবং অন্য অবস্থায় উজ্জ্বল সূর্য দীপ্তি সহ দেখা যায়। এগুলি সর্বদা বিদ্যমান থাকে; রেখা প্রভৃতি গণিতবিদ্যার দ্বারা এগুলি জেনে তাদের মধ্যে যথাযথভাবে ব্যবহার করা উচিত।

মানুষের জন্য দিন ও রাত কখনো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয় না; বরং সর্বদা বিদ্যমান থাকে—এক দেশে না হলে অন্য দেশে থাকে। যে কাজগুলি রাতে করা উচিত এবং যে কাজগুলি দিনে করা উচিত, সেগুলি অলসতা ত্যাগ করে সম্পন্ন করা উচিত।

উপরের ছবিটি কি মনোমুগ্ধকর নয়, যা দেখায় যে দিন ও রাত কখনো অবসর নেয় না। পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে দিন রাতকে অনুসরণ করে এবং এক দেশের পর আরেক দেশে এগিয়ে যায়—এ বিষয়টি ঋগ্বেদে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। একই ধরনের উল্লেখ ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও পাওয়া যায়। এটি কি আকর্ষণীয় নয়?

🖋Rupa Bhaty

উক্ত ১।৯৫।১ মন্ত্রে মহর্ষি দয়ানন্দ স্বামীর ভাষ্যঃ

বিষয়

এখন রাত্রি এবং দিন কেমন, এই বিষয়ের উপদেশ পরবর্তী মন্ত্রে করা হয়েছে ।

পদার্থ

হে মনুষ্যগণ ! যে (বিরূপে) উজ্জ্বল এবং অন্ধকার থেকে পৃথক-পৃথক রূপ এবং (স্বার্থে) উত্তম প্রয়োজনবিশিষ্ট (দ্বে) দুই অর্থাৎ রাত্রি এবং দিন পরস্পর (চরতঃ) বর্তমান থাকে এবং (অন্যান্যা) পরস্পর (বত্সম্) উৎপন্ন হওয়া সংসারকে (উপধাপয়েতে) খান-পান করায় (অন্যস্যাম্) দিন থেকে অন্য রাত্রিতে (স্বধাবান্) যে নিজের গুণ দ্বারা ধারণ করা হয়, সেই ঔষধি প্রভৃতি পদার্থের রস যাতে বিদ্যমান আছে, এমন (হরিঃ) উষ্ণতা প্রভৃতি পদার্থের নিবারণকারী চন্দ্র (ভবতি) প্রকাশিত হয় অথবা (অন্যস্যাম্) রাত্রি থেকে অন্য দিবস হওয়া বেলায় (শুক্রঃ) আতপযুক্ত (সুবর্চাঃ) উত্তমরূপে আলো প্রদানকারী সূর্য (দদৃশে) দেখা যায়, সেই রাত্রি-দিন সর্বদা বর্তমান থাকে, এদের রেখাগণিত প্রভৃতি গণিত বিদ্যা দ্বারা জেনে এদের মধ্যে ব্যবহার করো ॥ ১ ॥

ভাবার্থ

মনুষ্যদের উচিত যে দিন-রাত্রি কখনও নিবৃত্ত হয় না, বরং সর্বদা বিদ্যমান থাকে অর্থাৎ এক দেশে না হলে অন্য দেশে থাকে। যে কাজ রাত্রি এবং দিনে করা উপযুক্ত হয়, সেগুলি নিরালস্যভাবে করে সকল কাজের সিদ্ধি করা উচিত ॥ ১ ॥

হরিশরণসিদ্ধান্তলঙ্কার জীর ভাষ্যঃ

পদার্থ

১. (দ্বে) = দিন এবং রাত্রি এই দুই (বিরূপে) = পরস্পর বিরুদ্ধ রূপবিশিষ্ট [দিন উজ্জ্বলতাযুক্ত হয় আর রাত্রি অন্ধকারযুক্ত, এই কারণে দিনকে “অহরর্জুনঞ্চ” শ্বেত বলা হয়েছে এবং “রাত্রিশ্চ কৃষ্ণম্” রাত্রিকে কালো] (চরতঃ) = গতি করে । একটির পরে অন্যটির আসা ক্রমানুসারে হয়ে চলতেই থাকে । এই দুই (স্বার্থে) = উত্তম প্রয়োজনবিশিষ্ট । দিন ক্রিয়াশীলতার দ্বারা মানুষে শক্তি উৎপন্ন করে এবং রাত্রি গাঢ় নিদ্রায় নিয়ে গিয়ে, ক্রিয়াকে থামিয়ে শরীরকে শোধনকারী হয় । এই শোধনের দ্বারা এটি জীবনকে দীর্ঘ করে ।

২. রাত্রি থেকে সূর্য উৎপন্ন হয় — এমন প্রতীত হয় এবং দিনের সমাপ্তিতে উজ্জ্বলতাযুক্ত হওয়ার কারণে এই অগ্নি দিন থেকে উৎপন্ন হয় । [রাত্রের্‌বত্সা শ্বেত আদিত্যঃ, অহ্নোऽগ্নিস্তাম্রোऽরুণঃ, ইতি - তৈ০] । এই দিন এবং রাত্রি এক - অন্যের (বত্সম্) = পুত্রকে (উপধাপয়েতে) = দুধ পান করায় । [দিন রাত্রির পুত্র সূর্যকে এবং রাত্রি দিনের পুত্র অগ্নিকে । প্রাতে সূর্যের জন্য আহুতিগুলি দেওয়া হয় এবং রাত্রিতে [সায়ং] অগ্নির জন্য] ।

৩. (হরিঃ) = রসসমূহকে হরণকারী অথবা রোগসমূহকে হরণকারী সূর্য (অন্যস্যাম্) = নিজের রাত্রিরূপ মাতা থেকে ভিন্ন দিনে (স্বধাবান্) = অন্নযুক্ত হয় — সূর্যের জন্য আহুতিগুলি দিনে দেওয়া হয় এবং (শুক্রঃ) = মলসমূহের দহন দ্বারা শুচিতাকে উৎপন্নকারী অগ্নি (অন্যস্যাম্) = নিজের দিনেরূপ মাতা থেকে ভিন্ন রাত্রিতে (সুবর্চাঃ) = উত্তম (বর্‌চস্বালা) = উত্তম তেজ এবং উজ্জ্বলতাযুক্ত (দদৃশে) = দেখা যায় । এর জন্য একে সায়ংকালে আহুতিগুলি দেওয়া হয় । প্রাতে সূর্যের মহত্ত্ব ছিল, এখন সায়ং অগ্নির মহত্ত্ব আছে ।

৪. দিনে সূর্য হরি, আমাদের রোগসমূহকে হরণকারী — আমরা সূর্যের ন্যায়ই পরিশ্রমশীল হলে এটি আমাদের দারিদ্র্যকে দূর করে । রাত্রিতে অগ্নি শুক্র । আমরা আমাদের জাঠরাগ্নিকে ঠিক রাখলে এটি শরীরের যথাযথ শোধন করে দেয় । কক্ষে অগ্নি জ্বালালে এটি সেখানে থাকা দুর্গন্ধযুক্ত বায়ুকে ছিন্ন - ভিন্ন করে সেখানে বায়ুকে পবিত্রকারী হয় ।

জয়দেব শর্মাকৃত ভাষ্যঃ

ভাবার্থ

( দ্বে বিরূপে স্বার্থে চরতঃ ) যেমন দুই স্ত্রী ভিন্ন ২ রূপ ও বর্ণবিশিষ্ট নিজের শুভ প্রয়োজনের জন্য বিচরণ করে এবং ( অন্যান্যা বত্সম্ উপধাপয়েতে ) তারা উভয়েই একে অপরের শিশুকে দুধ পান করায়, লালন-পালন করে । ( অন্যস্যাম্ ) একটির কোলে ( হরিঃ ভবতি ) মনোহর শ্যামবর্ণের শিশু থাকে এবং ( অন্যস্যাম্ সুবর্চাঃ শুক্রঃ দদৃশে ) অন্যটির কোলে শুক্র, শুদ্ধ উজ্জ্বল বর্ণের শিশু থাকে । সেইরূপ ( দ্বে ) উভয় ( বিরূপে ) আলো এবং অন্ধকার দ্বারা ভিন্ন ২ রূপবিশিষ্ট দিন এবং রাত্রি ( সু-অর্থে ) নিজের উত্তম জগতের কল্যাণ করার উদ্দেশ্যে ( চরতঃ ) যেন দুই স্ত্রীর ন্যায় বিচরণ করে । তারা উভয় ( অন্যান্যা-অন্যান্যা ) একে অপরের অথবা পৃথক ২ নিজের নিজের ( বত্সম্ উপধাপয়েতে ) অগ্নি এবং সূর্য অথবা চন্দ্র এবং সূর্য উভয়কেই শিশুর ন্যায় নিজের রস প্রদান করে পুষ্ট করে । অর্থাৎ রাত্রির গর্ভ থেকে উৎপন্ন সূর্যের পোষণ দিন করে এবং দিন থেকে উৎপন্ন অগ্নির পোষণ রাত্রি করে । সূর্য এবং অগ্নি তাদের উভয়কে অধিক উজ্জ্বল রূপে প্রকাশ করা তাদের পোষণ করা হয় । ( অন্যস্যাম্ ) একটিতে অথবা নিজের জননী দিনবেলায় ( হরিঃ ) জলসমূহ এবং রসসমূহকে হরণকারী সূর্য ( স্বধাবান্ ভবতি ) নিজের রশ্মির দ্বারা জলকে ধারণকারী হয় । ( অন্যস্যাম্ ) এবং অন্য রাত্রিতে ( শুক্রঃ ) শুদ্ধ কান্তিমান অগ্নি অথবা জলই ( সুবর্চাঃ ) উত্তম তেজস্বী হয়ে ( দদৃশে ) দেখা যায় । (২) অথবা—( দ্বে ) উভয় রাত্রি এবং দিন, ভিন্ন ২ রূপের হয়ে উত্তম প্রজাপালনের কর্মে পরস্পর মিলিত হয়ে ( বত্সম্ ) বসবাসকারী সংসারকে শিশুর ন্যায় পালন করে । ( অন্যান্য্যাম্ ) দিন থেকে ভিন্ন রাত্রিকালে ( হরিঃ ) উষ্ণতাকে দূরকারী চন্দ্র ( স্বধাবান্ ) নিজের দ্বারা ধারণযোগ্য ঔষধি-রসে যুক্ত হয় এবং ( অন্যস্যাম্ ) অন্যটি, রাত্রিকাল থেকে ভিন্ন দিনবেলায় ( শুক্রঃ ) কান্তিমান সূর্য উজ্জ্বল রূপে দেখা যায় ॥ অথবা—আকাশ এবং পৃথিবী উভয়ই সংসাররূপ শিশুকে অথবা সূর্য এবং অগ্নি অথবা মেঘ এবং অগ্নিকে পালন করে, সূর্য এবং মেঘ উভয়ই জল গ্রহণ এবং আনার দ্বারা ‘হরি’ এবং ‘স্বধাবান্’ । অগ্নি তেজস্বী হওয়ার কারণে ‘শুক্র’ । অধ্যাত্মে—বিরূপ অর্থাৎ ভিন্ন রূপের প্রাণ এবং আপান দুই প্রাণগুণের গতি । তারা দেহে অবস্থানকারী আত্মাকে পুষ্ট করে । এক দেহকে ধারণ করা এবং অন্নকে পচানো এবং ক্ষুধা উৎপন্নকারী হওয়ার কারণে প্রাণ ‘হরি’ এবং অন্য আপান অর্থাৎ নাভি থেকে নিচের অধশ্চারী প্রাণশক্তিতে শুক্র, বীর্য যা দেহে কান্তি উৎপন্ন করে তা আশ্রিত । (৪) এইরূপ ব্রাহ্মণ বর্গ এবং ক্ষত্র বর্গ, এই উভয় শান্ত এবং উগ্র স্বভাব দ্বারা ভিন্ন ২ হয়ে পরস্পর মিলিত হয়ে প্রধান বিদ্বান এবং নেতাকে, এবং বসবাসকারী প্রজাগণকে পালন করে, একটিতে জ্ঞানবান বিদ্বান আছে অন্যটিতে তেজস্বী নায়ক আছে । ( ৫ ) আকাশ এবং পৃথিবী উভয়ই দুই ভিন্ন ২ রূপবিশিষ্ট হয়ে বৎসরূপ বায়ু অথবা মেঘকে পুষ্ট করে অর্থাৎ জলে পূর্ণ করে, অথবা বসবাসকারী প্রাণী-সংসারকে পালন করে একটির কোলে হরি সূর্য আছে অন্যটির কোলে ‘শুক্র’ অর্থাৎ জল আছে ।

ড০ কৃষ্ণকান্ত বৈদিক শাস্ত্রী জীর পদার্থ ভাষ্যঃ

সন্ধিবিচ্ছেদসহঅন্বয়ঃ

হে মনুষ্যাঃ! এই বিরূপে স্বার্থে দুই রাত্রি দিনে পরস্পর চলতে থাকা অন্যন্যা বৎসম্ উপ ধাপয়েত। তাহার অন্যস্যাঃ স্বধাওয়া হরি ভবতি। অন্যস্যাঃ শুক্রঃ সুবর্ত্চা সূর্যঃ দদৃশে তে সর্বদা বর্তমান রেখাদিগণিত বিদ্যয়া বিজ্ঞায় অনয়ঃ মধ্য উপযুঞ্জীধ্বম্ ॥১॥

পদার্থঃ হে (মনুষ্যাঃ) মনুষ্যরা! (যে)=যারা, (বিরূপে) প্রকাাশ-অন্ধকার থেকে বিরূদ্ধরূপে=প্রকাশ ও অন্ধকার পরস্পর থেকে বিরুদ্ধরূপে, (স্বার্থে) সৌন্দর্যার্থে=উত্তমতার জন্য, (দ্বে) রাত্রি ও দিনের রূপে, (পরস্পরং)=পরস্পর, (চরতঃ)=চলতে থাকা, (অন্যান্যা) পরস্পরে উপস্থিত=পরস্পর উপস্থিত, (বৎসম্)=জন্মলাভ করা জগতে, (উপ)=নিকট থেকে, (ধাপয়েত)=পান করায়, (তযোঃ)=উভয়কে, (অন্যস্যাম্)=দিন থেকে পৃথক রাত্রি-তে, (স্বধাওয়ান্)=নিজস্ব গুণধারণ করে থাকা যেমন অমৃতরূপ ওষধি-সারসমূহ, (হরিঃ)=উষ্ণতা নাশক চন্দ্র, (ভবতি)=হয়, (অন্যস্যাম্)=রাত্রি থেকে পৃথক দিনের সময়ে, (শুক্রঃ)=প্রদীপ্ত, (সুবর্ত্চাঃ)=উজ্জ্বল দীপ্তিমান, (সূর্যঃ)=সূর্য, (দদৃশে)=দৃশ্যমান হয়, (তে)=তারা, (সর্বদা)=সদা, (বর্ত্তমান)=উপস্থিত, (রেখাদিগণিত)=রেখা ইত্যাদির গণিত, (বিদ্যয়া)=বিদ্যা দ্বারা, (বিজ্ঞায়)=জানি, (অনয়ঃ)=এই দুইয়ের, (মধ্য)=মধ্য, (উপযুঞ্জীধ্বম্)=প্রয়োগ করো॥১॥


মহর্ষিকৃত ভাবার্থ

মানুষ দিন ও রাত্রি থেকে কখনও অব্যাহতি পায় না। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সময় ও ক্ষেত্র অনুযায়ী তারা সদা থাকে, যা কাজ রাত্রিতে করা উচিত, যা কাজ দিনে করা উচিত, সেই কাজগুলো অলসতা ছাড়া শুরু করলে সমস্ত কার্য সিদ্ধি করা সম্ভব হয়॥১॥

Read More

ঋগ্বেদর প্রথম মন্ত্র

30 March 0
ঋগ্বেদর প্রথম মন্ত্র

ও৩ম্

ঋগ্বেদ এর প্রথম মন্ত্র এর ভাষ্য
[ভাষ্যকার : আচার্য অগ্নিব্রত নৈষ্ঠিক]

अ॒ग्निमी॑ळे पु॒रोहि॑तं य॒ज्ञस्य॑ दे॒वमृ॒त्विज॑म्। होता॑रं रत्न॒धात॑मम्॥

ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।। [ঋগ্বেদ ১.১.১ ]

ভূমিকা

চারো বেদ জ্ঞান একই সময়ে চার ঋষিদের অন্তঃকরণে সমাধি অবস্থায় প্রকাশিত হয় অর্থাৎ সেই ঋষিরা সমাধি অবস্থায় ব্রহ্মাণ্ড থেকে বেদমন্ত্র রূপী ছন্দ রশ্মিগুলিকে নিজের যোগস্থ মন দ্বারা বেছে-২ করে গ্রহণ করে, সেই ছন্দ রশ্মিগুলির পদগুলির অর্থ এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত পদার্থগুলির জ্ঞান ঈশ্বর সঙ্গে-সঙ্গে করায়।

চারো বেদগুলির মধ্যে ঋগ্বেদ সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়। এতে সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থগুলির গুণ-কর্ম-স্বভাবগুলির বিবেচন হয়। চারো বেদগুলির প্রথম মন্ত্রগুলির রচনা কে দেখে আমাদের এমন মত হয় যে যদিও চারো বেদ সমকালীন হয়, পুনরপি বেদমন্ত্রগুলিকে গ্রহণ করার প্রক্রিয়া এর প্রারম্ভ ঋগ্বেদ থেকেই হয় হবে, যদিও এগুলির সমাপ্তি সঙ্গে-সঙ্গে হয়েছে হয়। যদিও মনুস্মৃতি আদি শাস্ত্রগুলির ব্যাহতিসহ গায়ত্রী মন্ত্র (সাবিত্রী মন্ত্র) উচ্চারণ করার মহিমাকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বহু শাস্ত্রেও এই মন্ত্রের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। এর সমান মহিমা অন্য কোনো মন্ত্রের কোথাও শোনা ও পড়া যায় না। ঋষি দয়ানন্দের মহান গুরু দণ্ডী শ্রী স্বামী বিরজানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্রেরই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জপ করতেন। ঋষি দয়ানন্দ সরস্বতী জির কাছে ‘বিশ্বানি দেব সবিত ...’ এই মন্ত্র প্রিয় ছিল, কিন্তু জপের জন্য তিনিও গায়ত্রী মন্ত্রকেই প্রধানতা দিতেন।

এখানে প্রশ্ন এই উঠে যে তাহলে ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে এমন কী বিশেষতা আছে যে এই মন্ত্রই সর্বপ্রথম প্রাদুর্ভূত হল? যদি এই মন্ত্র বিশেষ হয়, তবে এর কী অর্থ?

আসুন, আমরা পৃথিবীতে মানবোৎপত্তির সময়ের পরিস্থিতির উপর কিছু স্থূল চিন্তা করি। মানুষের প্রথম প্রজন্মের সদ্যই যৌবনাবস্থায় ভূমি থেকে প্রাদুর্ভাব হয়েছে। এর পূর্বে সমগ্র পৃথিবী জলচর, নভচর, স্থলচর সকল প্রাণী, বনস্পতি, ফুল ও ফলের সঙ্গে অত্যন্ত শুদ্ধ বায়ুমণ্ডল, নদী এবং সরোবরগুলিতে অত্যন্ত পবিত্র জল প্রভৃতি দ্বারা যুক্ত ছিল। ভূমি-আকাশ সব কিছু সম্পূর্ণ শুদ্ধ, সর্বত্র অক্সিজেনের পরিপূর্ণ মাত্রা, ফল ও মূলগুলিতে প্রচুর পুষ্টিকতা, এটাই ছিল সেই সময় এই পৃথিবীর পরিবেশ। সব কিছু সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবর্ধক এবং সুষম অবস্থায় ছিল। সমস্ত প্রাণী ও বনস্পতি সম্পূর্ণরূপে নিরোগ, বিশালকায় ও বলবান ছিল।

সেই সময়ের প্রথম প্রজন্ম যদিও নৈমিত্তিক জ্ঞান থেকে বিহীন ছিল, কিন্তু তাদের সকলের স্বাভাবিক জ্ঞান বর্তমান জন্মানো শিশুদের তুলনায় অথবা জন্মানো শিশুকে যদি যৌবনাবস্থা পর্যন্ত একান্তে রাখা হয়, সেইরূপ এক যুবকের তুলনায় অধিক এবং পবিত্র ছিল। এই কারণে তাদের বুদ্ধি খুব সূক্ষ্ম এবং গভীর ছিল। পুনরপিও তাদের নৈমিত্তিক জ্ঞানের পরম প্রয়োজন ছিল, কিন্তু পশু-পাখিদের অতিরিক্ত এমন কোনো প্রাণী ছিল না, যার থেকে প্রথম প্রজন্মের মানুষ কিছু জ্ঞান প্রাপ্ত করতে পারে এবং পশু-পাখিদের থেকে তাদের জ্ঞান নেওয়ার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, কারণ তারা তাদের তুলনায় জ্ঞানের দৃষ্টিতেও উন্নতই উৎপন্ন হয়েছিল। এমন অবস্থায় এই প্রশ্ন স্বাভাবিক যে সর্বপ্রথম কোন্‌ ছন্দ রশ্মির গ্রহণ হল এবং নৈমিত্তিক জ্ঞানের উৎস পরমাত্মা সেই মন্ত্রের কী অর্থ সুপারিশ করলেন?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রের ভাষ্য থেকেই প্রাপ্ত হতে পারবে।

এখন আসুন, মন্ত্রের উপর চিন্তা করি—

ঋষি, দেবতা ও ছন্দ

এই মন্ত্রের ঋষি মধুচ্ছন্দা। [ মধু = প্রাণো বৈ মধু (শ.6.4.3.2), মধু ধমতের্বিপরীতস্য (নি.10.31), ছন্দ ধমতি অর্চতিকর্মা (নিঘং.3.14), গতিকর্মা (নিঘং.2.14), বধকর্মা (নিঘং.2.19) ]

এর অর্থ এই যে এই ছন্দ রশ্মি এমন এক বিশেষ প্রাণ রশ্মি, যা আলোকযুক্ত হয়ে গমন করে এবং যে কোনো বাধক পদার্থকে নষ্ট করে, প্রাণ নামক প্রাণ রশ্মি দ্বারা আচ্ছাদিত হয়, তা থেকেই উৎপন্ন হয়। এর দেবতা অগ্নি এবং ছন্দ গায়ত্রী। এই কারণে এর দৈবত ও ছান্দস প্রভাব দ্বারা অগ্নি তত্ত্ব তেজস্বী এবং বলবান হয়। এখানে অগ্নি তত্ত্ব দ্বারা বহু পদার্থের বোধ হয়, এমন জানা উচিত, যাদের বিষয়ে আমরা ভাষ্যে আলোচনা করব, কারণ মন্ত্রেও অগ্নি পদ বিদ্যমান আছে।

এখন আমরা এই মন্ত্রের দুই প্রকারের ভাষ্য প্রদর্শন করি, যাদের মধ্যে সর্বপ্রথম আধিদৈবিক ভাষ্য করব, কারণ এই ভাষ্য যে কোনো মন্ত্ররূপ ছন্দ রশ্মির এই সৃষ্টিতে হওয়া তার প্রভাব এবং সৃষ্টির পদার্থগুলির স্পষ্ট বোধ করায়।

আধিদৈবিক ভাষ্য

(যজ্ঞস্য) [ যজ্ঞম্ = ক্রিয়াকাণ্ডজন্যং সংসারম্ (ম.দ.য. ভা.2.21), সঙ্গতঃ সংসারঃ (ম.দ.ঋ. ভা.1.18.7)] ‘যজ্ঞ’ শব্দ ‘যজ্ঞ দেবপূজাসঙ্গতিকরণদানেষু’ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয় অর্থাৎ যাতে বিভিন্ন দেব পদার্থের পূজা অর্থাৎ তাদের সমুচিত ব্যবহার, তাদের পারস্পরিক সংগতিকরণ এবং তাদের গ্রহণ ও বিসর্জন প্রভৃতি কর্ম হয়, তাকে যজ্ঞ বলে। এই সৃষ্টিতে সর্বত্র এমনই হচ্ছে। এই কারণে এই সমগ্র সৃষ্টি যজ্ঞরূপ, যেমন ঋষি দয়ানন্দের এই উদ্ধরণগুলি থেকে স্পষ্ট। সেই এমন সৃষ্টি-যজ্ঞের প্রধান সাধক পদার্থ এই সেই প্রথম শব্দ, যা মানুষের মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম এসেছে। এই পদের বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হল—

(অগ্নিম্) [অগ্নিঃ = অগ্নিঃ কস্মাদগ্রণীর্ ভবতি। অংগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে। অঙ্গং নয়তি সন্নমমানঃ। (নি.7.14), অগ্নির্ বৈ দেবানাং বসিষ্ঠঃ (ঐ.1.28), অগ্নি বৈ দেবানাং মুখং প্রজনয়িতা স প্রজাপতিঃ (শ.3.9.1.6), অগ্নিরেব ব্রহ্মা (শ.10.4.1.5), বাগেবাগ্নিঃ (শ.3.2.2.13), মন এবাগ্নিঃ (শ.10.1.2.3),আত্মৈবাগ্নিঃ (শ.6.7.1.20)]

এই বাক্যগুলি থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে এটি সেই পদার্থ, যার সৃষ্টি-রচনায় সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। সৃষ্টি নির্মাণের পৃথক-পৃথক স্তরে ‘অগ্নি’ পদের পৃথক-পৃথক অর্থ হয়, কারণ পৃথক-পৃথক স্তরে প্রাথমিক উপাদান পৃথক-পৃথক হয়। এজন্য যখন মূল উপাদান কারণ প্রকৃতি-ই বিদ্যমান থাকে, তখন ‘অগ্নি’-র অর্থ বাক্ তত্ত্ব অর্থাৎ পরা ‘ওম্’ রশ্মি মানা উচিত, কারণ এই রশ্মিই প্রকৃতিতে প্রাথমিক স্পন্দন উৎপন্ন করে।

দ্বিতীয় চরণে ‘অগ্নি’-র অর্থ মনস্তত্ত্ব (মহৎ) মানা উচিত, কারণ এটিই সৃষ্টির সর্বপ্রথম পদার্থ, যার ছাড়া আগামী সৃষ্টি অসম্ভব।

তৃতীয় চরণে ‘অগ্নি’ পদের অর্থ আত্মা অর্থাৎ সূত্রাত্মা বায়ু, যা পদার্থকে সংঘনিত করা আরম্ভ করে। ‘অগ্নি’ পদের চতুর্থ অর্থ হল— ‘প্রাণ’, যার প্রাণাপান প্রভৃতি দশ ভেদ আছে। ‘অগ্নি’-র পঞ্চম অর্থ হল ব্রহ্ম এবং এখানে ‘ব্রহ্ম’-র অর্থ হল— বল, যেমন মহর্ষি তিত্তির বলেছেন—
বলম্ বৈ ব্রহ্মা (তৈ.ব্রা. 3.8.5.2)। বল সেই গুণ, যার সৃষ্টি-রচনার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয়। পরা ‘ওম্’ রশ্মি উৎপন্ন হতেই বল গুণ উৎপন্ন হয়ে যায়।

এই সমস্ত পদার্থ সমস্ত দেব পদার্থকে বসানো এবং উৎপন্ন করার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, এজন্য অগ্নিকে দেবদের বসিষ্ঠ বলা হয়েছে। এই পদার্থগুলিই বিভিন্ন দেব পদার্থের মুখরূপও, কারণ সব প্রকারের দেব পদার্থ ছন্দ, কণ, বিকিরণ, আকাশ প্রভৃতি এই পদার্থগুলি থেকেই শক্তি প্রাপ্ত করে এবং এগুলিই সকলকে উৎপন্ন, পরিচালিত এবং সংরক্ষিতকারী হয়। এই পদার্থগুলি থেকে স্থূল অগ্নির আরও দুই পদার্থ আছে।

প্রথম অর্থাৎ পঞ্চম অর্থ হল ‘বিদ্যুৎ’, যার উৎপন্ন হওয়ার দ্বারা সমস্ত কণ-বিকিরণ প্রভৃতি উৎপন্ন হওয়া আরম্ভ হয়। বিদ্যুতের উৎপত্তি ছাড়া এদের উৎপত্তি সম্ভব নয়। যদিও আমরা বলকে পঞ্চম পদার্থ লিখে ফেলেছি, কিন্তু বল দ্রব্য না হয়ে গুণ, এই কারণে তাকে পৃথক ধরে বিদ্যুৎকে পঞ্চম পদার্থ লেখা হয়েছে।

দ্বিতীয় অর্থাৎ ষষ্ঠ অর্থ হল— ‘ঊষ্মা’, এর উৎপত্তি ছাড়াও সৃষ্টিতে কোনো পদার্থ নির্মিত হতে পারে না। এখানে ছন্দ এবং রশ্মিগুলির আলোচনা এই কারণে করা হয়নি, কারণ এদের গ্রহণ বাক্ তত্ত্ব থেকেই হয়ে যায়।

এইভাবে এই ছয় পদার্থরূপী অগ্নি তত্ত্ব, যার বিশেষণগুলির আলোচনা এই মন্ত্রে ক্রমানুসারে নিম্নলিখিত প্রকারে করা হয়েছে—

  1. পুরোহিতম্- [ পুরোহিতঃ = যঃ পুরস্তাত্ সর্বং জগদ্ দধাতি, ছেদন ধারণা-আ কर्षণাদিগুণাংশ্চাপি তম্ (অগ্নিম্ = পরমেশ্বরং ভৌতিকং বা), পুরোহিতঃ পুর এনং দধতি (নি.2.12), প্রথমঃ পুরোহিতমিতি পুর এবং বা এনমেতদ্ দধতে। যদগ্নিমাদধতে। (জৈ.3.63)] অর্থাৎ যে পদার্থকে অন্যান্য পদার্থ সম্মুখে ধারণ করে নানা প্রকারের বল প্রাপ্ত করে, সেই পদার্থগুলিকে পুরোহিত বলা
    হয়। অগ্নি নামক উপরিউক্ত সমস্ত পদার্থ পুরোহিত কেমন করে বলা হয়? এ বিষয়ে আমরা ক্রমানুসারে চিন্তা করি—

(ক) বাক্ তত্ত্ব— সৃষ্টির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম পদার্থ, সে রশ্মি হোক অথবা কোনো তরঙ্গ প্রভৃতি, তারা যখন নিজেদের সম্মুখে অথবা নিজেদের সঙ্গে ‘ওম্’ রশ্মিকে ধারণ করে, তখনই তারা সৃষ্টির সূক্ষ্মতম বলকে প্রাপ্ত হয়ে অগ্রিম যজন প্রক্রিয়া আরম্ভ করতে পারে। স্থূল পদার্থ, যা নিজেরাই রশ্মি প্রভৃতি সূক্ষ্ম
পদার্থ দিয়ে গঠিত, তারা নিজেদের অবয়বভূত সূক্ষ্ম রশ্মিগুলির দ্বারা সূক্ষ্মতম ‘ওম্’ রশ্মিকে ধারণ করেই বিভিন্ন প্রকারের বল প্রাপ্ত করতে পারে, অন্যথায় সৃষ্টিতে কোনো বল উৎপন্নই হতে পারে না। ঋষি দয়ানন্দ বেদ ভাষ্যে ‘পুরোহিত’ পদ থেকে আটটি গুণ গ্রহণ করেছেন— রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন, ধারণ এবং আকর্ষণ প্রভৃতি। এখানে ‘আদি’ শব্দ থেকে প্রতিকর্ষণ গুণ গ্রহণ করা উচিত। এই আটটি গুণের মধ্যে একটি গুণও তখন পর্যন্ত প্রকাশিত হতে পারে না, যতক্ষণ না কোনো পদার্থ ‘ওম্’ রশ্মি দ্বারা যুক্ত হয়। মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেক পদার্থের ভিতরে ‘ওম্’ রশ্মি ব্যাপ্ত থাকে, এর পরেও যতক্ষণ না সেই পদার্থ অন্য কোনো পদার্থের ‘ওম্’ রশ্মিকে নিজের সঙ্গে ধারণ করে মিলিত হবে, ততক্ষণ তাদের মিলন সম্ভব হবে না অর্থাৎ ততক্ষণ কোনো বল উৎপন্ন হবে না। এই কারণে বাক্ রূপ অগ্নিকে এখানে
পুরোহিত বলা হয়েছে। অন্যান্য ছন্দ রশ্মিগুলির বিষয়েও এইরূপেই পুরোহিত গুণের সম্পর্ক বোঝা উচিত।

(খ) মন— এই সৃষ্টিতে পরা ‘ওম্’ রশ্মি ছাড়া সমস্ত রশ্মিই মনস্তত্ত্বেই উৎপন্ন হয়। মনস্তত্ত্বে রশ্মিগুলি সেইরূপেই উৎপন্ন বা স্পন্দিত হয়, যেমন জলে ঢেউ উৎপন্ন হয়। এই কারণে বাক্ রশ্মিগুলির সমস্ত কার্য মনস্তত্ত্বেরই কার্য। এই জন্য মহর্ষি জৈমিনিকে বলতে হয়েছে— ‘বাগিতি মনঃ’ (জৈ.উ. 4.11.1.11)
এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন— ‘বাক্ চ বৈ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্’ (ঐ.5.23)। এইরূপে বাক্ তত্ত্ব মনস্তত্ত্ব ছাড়া উৎপন্নই হতে পারে না, এই কারণে মনস্তত্ত্বরূপ অগ্নিকেও পুরোহিতরূপ বলা হয়েছে।

(গ) আত্মা (সূত্রাত্মা বায়ু)— এই সৃষ্টিতে যেখানে কোথাও দুই রশ্মির সংযোগ হয়, সেখানে ‘ওম্’ রশ্মির পরে যদি কোনো রশ্মির সবচেয়ে প্রধান এবং প্রাথমিক ভূমিকা থাকে, তবে তা সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিরই। এর
ছাড়া বলের কল্পনাই সম্ভব নয়। যখন কোনো কণ, তরঙ্গ বা রশ্মি অন্য কোনো কণ, তরঙ্গ বা রশ্মির সঙ্গে সংযোগ করে, তখন তাদের ভিতরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু সম্মুখে উপস্থিত পদার্থের বাইরে বিদ্যমান সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মিগুলির সঙ্গেই যুক্ত হয়। ‘পুরোহিত’ শব্দ থেকে অগ্নির যে আটটি গুণ দেখানো হয়েছে, তাদের মধ্যে একটি গুণও সূত্রাত্মা বায়ু ছাড়া কখনও প্রকাশিত হতে পারে না। এজন্য সূত্রাত্মা বায়ুরূপ অগ্নিও পুরোহিত বলা হয়।

(ঘ) প্রাণ— দুই পদার্থের সংযোগ এবং বিয়োগের প্রক্রিয়ায় সূত্রাত্মা বায়ুর পরে যে পদার্থের স্থান, তা হল— প্রাণ তত্ত্ব অর্থাৎ প্রাণ, আপান, ব্যান, সমান, উদান, নাগ, কূর্ম, কৃকল, দেবদত্ত এবং ধনঞ্জয়— এদেরই ভূমিকা থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের মধ্যে প্রত্যেক গুণের উৎপত্তিতে কোনো না কোনো প্রাণ রশ্মির থাকা অনিবার্য। এই রশ্মিগুলিও বিভিন্ন পদার্থের যজন ক্রিয়ায় সর্বদা সেই পদার্থগুলির সম্মুখে প্রকাশিত হয়ে সেই ক্রিয়াগুলি সম্পাদন করে।

(ঙ) বিদ্যুৎ— এই সৃষ্টিতে প্রত্যেক যজন ক্রিয়াকে সম্পন্ন করতে বিদ্যুতের অনিবার্য ভূমিকা থাকে। সেই বিদ্যুৎ ধনাবেশ, ঋণাবেশ অথবা উদাসীন— যে কোনো রূপে হতে পারে। বৈদিক বিজ্ঞানে ‘বিদ্যুৎ’ শব্দের অর্থ খুব ব্যাপক, যা আধুনিক বিজ্ঞানে নেই। গুরুত্বাকর্ষণ বলও বিদ্যুতেরই একটি রূপ। এইভাবে সমস্ত পদার্থ বিদ্যুতের কোনো না কোনো রূপ অবশ্যই ধারণ করে থাকে। পূর্বোক্ত আটটি গুণের উৎপত্তিও বিদ্যুৎ ছাড়া সম্ভব নয়। এই কারণে এটিও পুরোহিতরূপ।

(চ) ঊষ্মা— সমস্ত পদার্থের সমস্ত প্রকারের ক্রিয়াগুলি ঊষ্মার বিদ্যমানতায়ই হয়, যদিও সেই ঊষ্মার পরিমাণ যতই কম কেন না হোক। অনন্ত শীতল প্রকৃতিতে কোনো ক্রিয়া অথবা বলের থাকা সম্ভব নয় এবং এদের ছাড়া পূর্বোক্ত আটটি গুণের প্রকাশ হওয়াও সম্ভব নয়। এই কারণে ঊষ্মাকেও পুরোহিত বলা হয়েছে।

  1. দেবম্— [দেবম্ = দেবো দানাদ্ বা। দীপনাদ্ বা। দ্যোতনাদ্ বা। দ্যুস্থানো ভবতীতি বা। যো দেবঃ সা দেবতা। (নি.7.15)] অর্থাৎ যে পদার্থ বল প্রভৃতি দেওয়ার, নিজে প্রকাশিত এবং অন্যদের প্রকাশিত করার এবং দ্যুস্থানে থাকে, তাকে দেব বলা হয়। এখানে ‘দ্যু’-র অর্থ [দ্যৌঃ = বাগিতি দ্যৌঃ (জৈ.উ.4.22.11), দ্যৌরেবাত্মা (শ.6.3.3.15), ঐন্দ্রী দ্যৌঃ (তা. 15.4.8), আপো বৈ দ্যৌঃ (শ.6.4.1.9), প্রাণো বৈ দিবঃ (শ.6.7.4.3)] প্রসঙ্গ অনুযায়ী পৃথক-পৃথক হয়। যা অগ্নিবাচী সমস্ত ছয় পদার্থের সঙ্গে ঘটতে পারে। যেমন ‘ওম্’ রশ্মি পরমাত্মায় বিদ্যমান। মনস্তত্ত্ব ‘ওম্’ রশ্মি এবং পরমাত্মায় বিদ্যমান। প্রাণ রশ্মিগুলিও সূত্রাত্মা বায়ুতে বিদ্যমান, সূত্রাত্মা বায়ু রশ্মি বাক্ অর্থাৎ ‘ওম্’ রশ্মিতে বিদ্যমান, বিদ্যুৎ প্রাণ রশ্মিগুলিতে বিদ্যমান এবং ঊষ্মা বিদ্যুতে বিদ্যমান। এই কারণে দেবরূপ অগ্নিকে দ্যুস্থানে বলা হয়েছে।

  2. ঋত্বিজম্— [ঋত্বিক্ = ঋত্বিক্ কস্মাত্। ঈরণঃ। ঋগ্যষ্টা ভবতীতি শাকপূণিঃ। ঋতুযাজী ভবতীতি বা।] পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সমস্ত ছয় পদার্থ ঋত্বিক্ এই কারণে বলা হয়, কারণ এরা অগ্রবর্তী স্তরের পদার্থগুলিকে প্রেরিতকারী হয়। এর সঙ্গে এরা সকলেই সূক্ষ্ম থেকে বৃহৎ ছন্দ রশ্মিগুলির যজনকারী হয়। এই যজন থেকে সমস্ত পদার্থ ক্রমশ উৎপন্ন হয়। এরা সকল পদার্থ যথাসময়ে প্রকাশিত হয়ে যজন প্রক্রিয়াগুলি সম্পাদন করে। এই কারণে সমস্ত পদার্থ ঋত্বিক্ বলা হয়।

  3. হোতারম্— [হোতা = হোতারং হ্বাতারম্ (নি.7.15), আত্মা বৈ যজ্ঞস্য হোতা (কৌ.9.6), বাগ্বৈ হোতা (কৌ.13.9.17.7), মনো হোতা (তৈ.ব্রা.2.1.5.9) প্রাণো বৈ হোতা (ঐ.6.8), ক্ষত্রং বৈ হোতা (ঐ.6.21)]

পূর্বোক্ত অগ্নিবাচী সমস্ত পদার্থ হোতারূপও হয়, কারণ এই সমস্ত পদার্থ অন্য পদার্থগুলিকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে। ‘ওম্’ রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু এবং প্রাণ রশ্মিগুলি সকলেই আকর্ষণ গুণে যুক্ত। বিদ্যুৎ এবং ঊষ্মাও আকর্ষণ অথবা ভেদন অথবা উভয় গুণে যুক্ত হওয়ার কারণে ক্ষত্ররূপ বলা হয়। এই কারণেই তারা হোতারূপও হয়।

  1. রত্নধাতমম্— [রত্নম্ = রময়তি হর্ষয়তীতি রত্নম্ (উ.কো.3.14), রত্নম্ ধননাম (নিঘং.2.10)] অগ্নিবাচী পূর্বোক্ত সমস্ত পদার্থ রত্নধা-ও বলা হয়, কারণ এই সমস্ত পদার্থ নিজেদের থেকে সূক্ষ্ম অন্যান্য পদার্থকে ধারণ করতে শ্রেষ্ঠ হয়। আমরা এখানে ক্রমানুসারে এই বিষয়টি স্পষ্ট করি—

(ক) ‘ওম্’ রশ্মি— এই রশ্মি সমস্ত পদার্থকে উৎপন্ন ও তৃপ্তকারী এবং মূল উপাদান পদার্থ প্রকৃতিকে ধারণকারী হওয়ায় রত্নধাতম বলা হয়। এর থেকে অধিক নিকটতা দিয়ে প্রকৃতিকে ধারণকারী অন্য কোনো পদার্থ এই সৃষ্টিতে নেই।

(খ) মনস্তত্ত্ব— ওম্ রশ্মিগুলি, যা সকলের তৃপ্তিকারিণী, তাদের ধারণকারীদের মধ্যে এটি শ্রেষ্ঠতম।

(গ) সূত্রাত্মা বায়ু— এই রশ্মি সকলের তৃপ্তিকারিণী ‘ওম্’ রশ্মি এবং মনস্তত্ত্বকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

(ঘ) প্রাণ— পূর্বোক্ত তিনটি পদার্থ, যা পরবর্তী পদার্থগুলিকে তৃপ্ত করে, তাদের ধারণকারীদের মধ্যে প্রাণ শ্রেষ্ঠতম।

(ঙ) বিদ্যুৎ— পূর্বোক্ত সমস্ত পদার্থ, যা নিজেদের থেকে স্থূল পদার্থগুলিকে তৃপ্তকারী, তাদের সকলকে ধারণকারীদের মধ্যে বিদ্যুৎ শ্রেষ্ঠতম।

(চ) ঊষ্মা— ঊষ্মাযুক্ত পদার্থ এই পাঁচটি পদার্থকে ধারণকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

ধ্যানযোগ্য যে এখানে যেসব পদার্থকে তৃপ্তিকারী বলা হয়েছে, তারা সমস্ত পদার্থকে ক্রিয়াশীল করতেও সক্ষম। এই কারণে তারা ‘রত্ন’ বলা হয়। সেই রত্নরূপ পদার্থগুলিকে ধারণকারী পদার্থ রত্নধা বলা হয় এবং বহু রত্নধা পদার্থের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ হয়, তাকে রত্নধাতম বলা হয়।

(ইळे) স্তুবে যাছে অধীচ্ছামি প্রেরয়ানি বা অর্থাৎ আমি এই উপরিউক্ত অগ্নিকে, যা উপরিউক্ত বিশেষণগুলি দ্বারা বিভূষিত হয়, তাকে প্রকাশ করি, তাদের আকর্ষণ করার বারবার ইচ্ছা করি। এখানে করণকারী কর্তা এই মন্ত্রের ঋষি মধুচ্ছন্দা, যার ব্যাখ্যা আমরা প্রারম্ভেই করে ফেলেছি অর্থাৎ এই মধুচ্ছন্দা
রশ্মিগুলি অগ্নির ছয়টি রূপের মধ্যে কোনো একটিকে প্রকাশ করে, কোনো একটিকে আকর্ষণ করে এবং কোনো একটিকে প্রেরিতও করে। এই ঋষি রশ্মিগুলি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ছন্দ রশ্মিগুলিও এই সমস্ত কার্য্যে পূর্ণ সহযোগ করে।

ভাবার্থ
সমগ্র সৃষ্টি বিভিন্ন সূক্ষ্ম তত্ত্বের মিলনে নির্মিত, এই কারণে এটি যজ্ঞরূপই। এই যজ্ঞের প্রধান উপাদান অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন তত্ত্বের পরিচায়ক। এই পদার্থগুলি ক্রমানুসারে এইরূপে মানা যেতে পারে— ‘ওম্’ রশ্মি, মনস্তত্ত্ব, সূত্রাত্মা বায়ু, প্রাণ তত্ত্ব, বিদ্যুৎ এবং ঊষ্মা। এই সমস্ত তত্ত্ব প্রত্যেক পদার্থকে নিজেদের সম্মুখে ধারণ করে তাতে নানা প্রকারের প্রয়োজনীয় বল উৎপন্ন করে। রূপ, দাহ, প্রকাশ, বেগ, ছেদন প্রভৃতি গুণের জন্যও এই তত্ত্বগুলিই নিজেদের নিজ নিজ স্তরে প্রথম দায়িত্বশীল হয়। এই পদার্থগুলিই নিজেদের তুলনায় সূক্ষ্ম পদার্থে অবস্থান করে নিজেদের গুণ ও কর্ম প্রকাশ করে। সৃষ্টির বিভিন্ন ক্রিয়ায় যখন-যখন যে-যে পদার্থের প্রয়োজন হয়, তখন-তখন তারা প্রকাশিত হতে থাকে। এই পদার্থগুলিই নিজেদের তুলনায় সূক্ষ্ম পদার্থগুলিকে সর্বদা নিজেদের ভিতরে ধারণ করে থাকে। এই ছন্দ রশ্মিকে উৎপন্নকারী ঋষিরূপ রশ্মিগুলি এমন সমস্ত পদার্থের মধ্যে কিছুদের আকর্ষণ করে, আবার কিছুদের প্রেরিত করতে থাকে। সমগ্র সৃষ্টি এই ছয়টি প্রধান পদার্থ দ্বারা খেলা হওয়া ঈশ্বরের খেলা।

এই মন্ত্রে সৃষ্টি-নির্মাণের প্রধান উপাদান, তাদের প্রেরক প্রভৃতির সংক্ষেপে বর্ণনা আছে। মানুষের প্রথম প্রজন্ম যখন এই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করল অথবা ব্রহ্মাণ্ডে কোথাও জন্ম গ্রহণ করল, তখন সেই সময়
মানুষ কৌতূহলবশে এই সৃষ্টিকে দেখল, তখন তার এর বিষয়ে কিছুই জ্ঞান ছিল না এবং তাকে বলার মতো অর্থাৎ তার থেকে বুদ্ধিমান অন্য কোনো প্রাণীও ছিল না। সেই সময় অগ্নি ঋষি ব্রহ্মাণ্ড থেকে যে ছন্দ রশ্মিগুলি সমাধি অবস্থায় গ্রহণ করেছিলেন, সেই রশ্মিগুলির মধ্যে এটি প্রথম রশ্মি ছিল, যা সৃষ্টির সার বলার জন্য অপরিহার্য ছিল এবং এই শব্দগুলির জ্ঞান অগ্নি ঋষিকে ঈশ্বর দ্বারা হয়েছে, এমন আমরা লিখেছি। মানুষ সৃষ্টিতে কীভাবে থাকবে, সৃষ্টির পদার্থগুলির কীভাবে ব্যবহার করবে এবং সৃষ্টিকে জেনে ঈশ্বরকে কীভাবে জানবে ও প্রাপ্ত করবে, এই সবের জন্য সৃষ্টির জ্ঞান অপরিহার্য।

এখন আমরা এর আধিভৌতিক অর্থ উপস্থাপন করছি—

আধিভৌতিক ভাষ্য

(যজ্ঞস্য) [ যজ্ঞম্ = অনেকবিধব্যবহারম্ (ম.দ.য. ভা.29.36), বিদ্যাপ্রজ্ঞাপ্রবর্ধকম্ (ম.দ.ঋ. ভা. 4.34.1) ] এই সৃষ্টির সমগ্র বিজ্ঞানকে জানার এবং প্রজ্ঞাকে বৃদ্ধি করার এবং সমস্ত প্রকারের লৌকিক আচরণকে
জানার, (অগ্নিম্) [অগ্নিঃ = অগ্নিরেব ব্রহ্ম (শ. 10.4.1.5), বিশ্বোপকারক (ম.দ.ঋ. ভা. 1.76.2) ] বেদ অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টির বিজ্ঞান এবং ব্রহ্মকে জানেন, সমগ্র প্রাণিজগতের মঙ্গল কামনা করেন এমন মহাবিদ্বান্,
(পুরোহিতম্) যিনি নিজের সম্মুখে আগত যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর সর্বদা মঙ্গল সাধনে প্রবৃত্ত থাকেন।

(দেবম্) [ দেবঃ = দিব্যগুণসম্পন্নো বিদ্বান্ (ম.দ.ঋ. ভা.1.68.1), যো বৈ দেবানাং পথমেতি ঋতস্য পথমেতি (শ.4.3.4.16)] যিনি দিব্যগুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞার অনুকূল পথে চলেন এমন বিদ্বান্। (ঋত্বিজম্) যিনি সর্বদা সকলের সঙ্গে সংগতি এবং সৃষ্টির প্রত্যেক পদার্থকে সর্বহিতের জন্য ব্যবহার করার ভাবনা রাখেন। 

(হোতারম্) যিনি দেওয়ার যোগ্য পদার্থ এবং তাদের যথার্থ বিজ্ঞানের দাতা এবং গ্রহণ করার যোগ্য পদার্থের গ্রহীতা অর্থাৎ সমস্ত লোকোপকারক আচরণের জ্ঞানী এবং সেগুলির উপর সর্বদা আচরণশীল হন।

(রত্নধাতমম্) যিনি তিন প্রকারের সুখ প্রদানকারী পদার্থগুলিকে ধারণকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সেইরূপ মহান পুরুষকে (ঈডী) অনুসন্ধান করো, তাকে অনুসন্ধান ও জানার ইচ্ছা করো এবং এমন পুরুষ প্রাপ্ত হলে তার নিকট থেকে সমগ্র সৃষ্টি ও লোকব্যবহার শেখার প্রার্থনা করো এবং শেখো। এখানে পুরুষ-ব্যত্যয় দ্বারা মধ্যম পুরুষের স্থানে উত্তম পুরুষের প্রয়োগ হয়েছে।

ভাবার্থ
এই সৃষ্টির সমগ্র বিজ্ঞান এবং তার ব্যবহার করা এবং সাংসারিক আচরণগুলিকে বিশুদ্ধভাবে জানেন, সমগ্র প্রাণিজগতের মঙ্গল কামনা করেন, দিব্যগুণসম্পন্ন এবং সর্বদা ঈশ্বরের আজ্ঞা অনুযায়ী আচরণ করেন, সকল প্রকার সুখপ্রদাতা ত্যাগী-তপস্বী গুরুকে পুরুষার্থসহকারে অনুসন্ধান করে লৌকিক এবং পারলৌকিক জ্ঞান গ্রহণের পূর্ণ চেষ্টা করা উচিত। এর দ্বারা সকল মানুষ পরস্পর একে অপরের সুখ বৃদ্ধি করতে করতে আনন্দের সঙ্গে বাস করতে পারে।

এইরূপেই সকল মানুষকে এই সমস্ত সদ্গুণে যুক্ত তেজস্বী রাজারও নির্বাচন করা উচিত, যাতে সমগ্র পৃথিবীতে সুখ এবং শান্তির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

জ্ঞাতব্য
এখানে এই মন্ত্রের দ্বারা পৃথিবীতে উৎপন্ন প্রারম্ভিক প্রজন্মের সকল মানুষকে সংসারে বাস করার জন্য এমন গুরুকে অনুসন্ধান করার প্রেরণা দেওয়া হয়েছে, যিনি বেদের সাক্ষাৎকার লাভ করেছেন অর্থাৎ অগ্নি প্রভৃতি চার মহর্ষি, পুনরায় অন্যান্য ব্রহ্মা প্রভৃতি ঋষিদের অনুসন্ধান করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

সকল মানুষকে চার ঋষির কাছ থেকে অথবা ব্রহ্মা প্রভৃতি থেকে সমগ্র বিদ্যা এবং আচরণ শেখার উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই উপদেশ গ্রহণ করাও অনিবার্য ছিল। এখানে শিক্ষক পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে রাজপুরুষকেও গ্রহণ করা যেতে পারে, তখন অর্থে কিছু ভেদ হয়ে যাবে। মহর্ষি দয়ানন্দ জি যে ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক অর্থ করেছেন, সেগুলিকেও এখানে যুক্ত করে দেখা উচিত। এইরূপে মন্ত্রের মোট চারটি অর্থ হয়। দুইটি অর্থ এখানে আমরা দিয়েছি এবং দুইটি ঋষি দয়ানন্দের ভাষ্যে পড়া যায়। যদি ঋষির ভাষ্য উপলব্ধ না হত, তবে আমরা এইরূপ আরও দুইটি অর্থ করতাম। ঋষি দয়ানন্দ অর্থগুলিতে ভৌতিক অগ্নিকে অনুসন্ধান করে নানা প্রকার ভৌতিক অনুসন্ধানের প্রেরণার কথা বলেছেন, যা এই পৃথিবীতে সুখদ জীবনযাপনের জন্য এটি অপরিহার্য। এই জ্ঞানও প্রথম প্রজন্মের মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।

শেষে মহর্ষি দয়ানন্দ ‘অগ্নি’ পদ দ্বারা পরমেশ্বরকে গ্রহণ করে তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করে জানার প্রেরণা দিয়েছেন। এটিই মানবজীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। এই কারণে এই জ্ঞান সবচেয়ে অধিক প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু সৃষ্টিকে না জেনে সৃষ্টিকর্তা পরমাত্মার বিজ্ঞান কখনোই জানা সম্ভব নয়। এই কারণে এই মন্ত্রের আধিদৈবিক ভাষ্য অপরিহার্য।

এইভাবে এই মন্ত্র মানুষকে লৌকিক ও পারলৌকিক সকল ধর্ম ও কর্তব্য এবং সমগ্র সৃষ্টিকে জানার সাররূপ উপদেশ প্রদান করে, যা সমগ্র বেদের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এই কারণেই এই মন্ত্র চারটি বেদের প্রস্তাবনা এবং সেইজন্যই এটি প্রথম মন্ত্র।

~**~

প্রথম ধ্বনির রূপে প্রথম ছন্দ কী বেরোল ? সেই ছন্দ হল—
ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।।

এখানে ‘অগ্নি’-র কিছু বিশেষণ বলা হয়েছে— পুরোহিত, দেব, ঋত্বিক, হোতা, রত্নধাতম। এগুলি অগ্নির বিশেষণ এবং সেই অগ্নির গুণগুলির এখানে প্রকাশ করা হয়েছে। বেদের সবচেয়ে প্রথম শব্দ ‘অগ্নি’, ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও প্রথম শব্দ ‘অগ্নি’ এবং চার ঋষির মধ্যে প্রথম ঋষি— ‘অগ্নি’ আছে। এই ‘অগ্নি’ শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভবত চার বেদের মধ্যে অগ্নি পদই সবচেয়ে বেশি বার আবৃত হয়েছে অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বার এসেছে। এই অগ্নির মধ্যে এমন কী আছে ? এই অগ্নি এবং অগ্নির বিশেষণ অন্য শব্দগুলি, সম্পূর্ণ সৃষ্টির জ্ঞানের ভূমিকা কি ? এই অগ্নি এবং তার বাচক বিশেষণবাচী শব্দগুলি সম্পূর্ণ সৃষ্টিতে থাকার জন্য লোকব্যবহারের ভূমিকা কি ? অগ্নি এবং তার বিশেষণবাচী শব্দগুলি সম্পূর্ণ সৃষ্টির অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের ভূমিকা কি ?

জ্ঞান তিন প্রকারের হয়—

  1. আধিদৈবিক জ্ঞান— সৃষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান।

  2. আধিভৌতিক জ্ঞান— লোকব্যবহারের জ্ঞান অর্থাৎ সংসারে কীভাবে
    থাকা যায়, তার সঙ্গে সম্পর্কিত জ্ঞান।

  3. আধ্যাত্মিক জ্ঞান— চেতন বিজ্ঞান।

এই তিনের বাইরে চতুর্থ কোনো জ্ঞান সম্পূর্ণ সংসারে নেই। চতুর্থ জ্ঞান যা-ই হবে, এই তিনের মধ্যেই সমাহিত হয়ে যাবে। এই মন্ত্র কি আমাদের এই সৃষ্টিতে থাকা, সৃষ্টি জানা, স্রষ্টা এবং নিজের স্বয়ং অর্থাৎ আত্মার জ্ঞানরূপ ভূমিকার নির্দেশ করে ? যদি এমন হয়, তবে বেদই ঈশ্বরীয় এবং যদি এমন না হয়, তবে বেদও ঈশ্বরীয় নয় এবং এরও অর্থ তেমনই যেমন কোরান বা বাইবেলের আয়াতগুলির অর্থ।

আগামীকাল থেকে আমরা এর অর্থের উপর আলোচনা করব যে এই মন্ত্র কী বলে ? সংসারের সমস্ত ইহুদি, ইসলামী ও খ্রিষ্টান বন্ধুগণের কাছে আমি অনুরোধ করি যে তারা-ও তাদের-২ প্রথম আয়াতগুলি আমাকে বলুন যে তার অর্থ কী। যদি তারা আমাকে বলবেন যে তাতে সৃষ্টি বিজ্ঞান, লোকব্যবহার ও অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের কী ভূমিকা আছে, তবে আমি এর উপর সংলাপ করার জন্য প্রস্তুত আছি এবং যদি বলতে না পারেন, তবে এই ভূমিকা শুনুন। যদি আপনার আত্মা বলে যে হ্যাঁ, এই ভূমিকা ঠিক আছে, তবে আমাদের সঙ্গে আসুন। এটি তো আপনিও মানেন যে বেদ সবচেয়ে পুরোনো। এর অর্থ এই যে আমাদের পূর্বজরা ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের তো ঋষি দয়ানন্দ সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং এর জন্য তিনি বলিদানও হয়েছিলেন। তিনি কেবল হিন্দুদের ও আর্যসমাজীদেরই তো ছিলেন না, তিনি তো মানবমাত্রের ছিলেন। এটি বড় দুর্ভাগ্য যে সংসার তাকে এখন পর্যন্ত বুঝতে পারেনি। কী করা যায় যখন ভারতের কর্ণধাররাই তাকে ভুলে যান, বিদ্বৎ সমাজ ভুলে যায়, তখন অনেক কথিত রাষ্ট্রভক্ত তার নিন্দা করেন, তখন অন্যান্য দেশের দোষই বা কী ?

আসুন ! আমরা আবার সেই পথেই চলি, সেই ঘরে ফিরে যাই, যেখান থেকে আমরা ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছি। আগে আমাদের ভাবনা শুনুন, মনন করুন। সামনে মন্ত্রের উপর বিবেচনা আগামীকাল থেকে করব। আজ এতটুকুই। 

ওম্ শম্।

আমরা কি আধুনিক বিজ্ঞানের পিছনে দৌড়াচ্ছি ?

ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।।

প্রিয় শ্রোতাগণ ! আমাদের এখন পর্যন্তের প্রবচনগুলির উপর দুটি প্রশ্ন করা হয়েছে,
প্রথমে তাদের সমাধান করা প্রয়োজন, তারপরেই আমরা সামনে এগোব।

প্রথম প্রশ্ন— কোরানে খুদার প্রশংসা আছে। খুদার নাম নিয়ে কোরানকে প্রারম্ভ করা হয়, তাই এটি খুদায়ী পুস্তক নয়, এইভাবে তো বেদ মন্ত্রগুলিতেও পরমাত্মার প্রার্থনাগুলি আছে, তাহলে সেগুলিও কীভাবে ঈশ্বরীয় গ্রন্থ ?

দ্বিতীয় প্রশ্ন— হিন্দু লোকেরা সেই আবিষ্কার বা খোঁজকে বেদে খোঁজে, যেটি বিজ্ঞান করে ফেলেছে। এমন কোনো খোঁজ তারা বলে না, যা আধুনিক বিজ্ঞান করেনি এবং সেটি বেদে আছে।

দুটিই খুব ভালো প্রশ্ন। এমন মনে হয় যে শ্রোতা ভালোভাবে শুনেছেন এবং সম্পূর্ণ বিবেকের সঙ্গে এই প্রশ্নগুলি করেছেন।

প্রথম সমাধান— ঈশ্বর বলেন যে এই গ্রন্থকে আমি ঈশ্বরের নাম দিয়ে প্রারম্ভ করি, এটি এক বিষয় এবং দ্বিতীয় বিষয় এটি যে ঈশ্বর কেমন, সেই ঈশ্বরের উপাসনা করো। এই দুই বিষয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। গ্রন্থ প্রারম্ভকারী সর্বদা নিজের আদর্শের নাম নিয়ে বা স্মরণ করে গ্রন্থকে প্রারম্ভ করেন অথবা নিজের ইষ্টকে স্মরণ করে গ্রন্থকে প্রারম্ভ করেন, নিজের নাম নিয়ে কখনোই নয়। প্রায়ই এর এই উত্তর দেওয়া হয় যে বেদগুলিতে ঈশ্বরের এমন ভাবনা আছে যে যেন কোনো পিতা-মাতা নিজেদের সন্তানদের শিষ্টাচার শেখান যে পিতা-মাতাকে নমস্তে করা উচিত, কিন্তু আমি এই উত্তরে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট নই। যদিও এটি ঠিক যে বেদ মন্ত্রগুলিতে ঈশ্বরের প্রার্থনা তাই বলা হয়েছে, যাতে মানুষ ঈশ্বরের উপাসনা ও প্রার্থনা করে

এবং এগুলির দ্বারা তাদের জীবন পরিবর্তিত হয়। যদি আমরা ঈশ্বরের প্রার্থনা, ধ্যান, উপাসনা এবং ভক্তি করব, তবে ঈশ্বরের তাতে কোনো লাভ নেই, এতে আমাদেরই লাভ আছে। আমরা ঈশ্বরকে সর্বদা নিজের সামনে অনুভব করতে করতে ভালো কাজ করব, মন্দ থেকে বাঁচব, সাহসী হব, আমরা সুখ এবং শান্তি পাব।

মহর্ষি দয়ানন্দ ঈশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা ও উপাসনার ফল বলেছেন। স্তুতির ফল বলেছেন যে ঈশ্বরের গুণগুলির কীর্তন এবং তদ্দ্বারা নিজের গুণগুলির মধ্যে সংশোধন। প্রার্থনার ফল বলেছেন যে অহংকার দূর হওয়া অর্থাৎ নিরভিমানতা এসে যাওয়া এবং উপাসনার ফল যেমন শীত থেকে কাতর ব্যক্তি যখন
অগ্নির কাছে যাবে, তখন নিজেই তার উষ্ণতা অনুভব হতে থাকবে, তেমনি ঈশ্বরকে নিকট অনুভব করলে ঈশ্বরের গুণ আমাদের মধ্যেও আসবে। আমাদের মধ্যে সাহস আসবে, আমরা শান্তি ও আনন্দের অনুভূতি পাব। তাই স্তুতি-প্রার্থনা- উপাসনা করা হয় এবং তাই বেদে এমন বলা হয়েছে। আমি এই উত্তরে
সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট নই, যদিও এই উত্তর ভালো, কিন্তু এর আরও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উত্তর আছে, যেগুলি আমি পরে বলব।

দ্বিতীয় সমাধান— দ্বিতীয় যে বলেন যে আমরা লোকেরা সেই খোঁজগুলিকেই বেদে খুঁজি, যেগুলি বিজ্ঞান করে ফেলেছে। এমন কোনো খোঁজ বলা হয় না, যা বিজ্ঞান করেনি। এমন বলার ব্যক্তি আমাদের ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ গ্রন্থ পড়েননি এবং আমাদের ‘বৈদিক রশ্মি থিয়োরি’ও শোনেননি, না ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’-এর শ্রেণিগুলি শুনেছেন এবং না তিনি আমার প্রিয় শিষ্য বিশাল আর্য (অগ্নিয়শ বেদার্থী) কর্তৃক লিখিত ‘পরিচয় বৈদিক ভৌতিকী’ নামক বই পড়েছেন। আমরা আমাদের শ্রেণিগুলিতে সেই বিষয়গুলি বলেছি, যেগুলি বর্তমান বিজ্ঞান আগামী ১০০ বছর পরেও ভাবতে পারবে কি না, এটাও আমরা বলতে পারি না। চলুন, বৈদিক রশ্মি থিয়োরি তো খুব বিস্তৃত, কেউ তাকে কতটা শুনবে এবং কতটা বুঝতে পারবে। কিন্তু বেদের প্রথম মন্ত্রের যে আমরা ভাষ্য বলব, তাতেও সেই বিজ্ঞান থাকবে,
যা আধুনিক বিজ্ঞান আগামী ৫০-১০০ বছরেও ভাবতে পারবে না, এমন আমার অনুমান। যখন আপনারা সকলে এই মন্ত্রের অর্থ শুনবেন, তখন প্রশ্নকারী যুবকের কাছেও এই কথা আপনাআপনি স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের কথাগুলি বেদে খুঁজি না, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের ভুল কথাগুলির খণ্ডন করি এবং তাদের বলি যে আপনি এখানে ভুল আছেন। ঠিক করতে হলে আমাদের ‘বৈদিক রশ্মি থিয়োরি’ পড়ুন।

এখন আমরা মন্ত্রে আসি। প্রথম প্রজন্ম জন্ম নিয়েছিল এবং সেই প্রথম প্রজন্মে এই চার ঋষিও হয়েছিলেন যাদের নাম ছিল— অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা। এরা সেই মানুষদের নাম, যারা প্রথম প্রজন্মে জন্ম নেওয়া সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র এবং সবচেয়ে উচ্চ স্তরের ছিলেন। সেই চার ঋষি সমাধি
অবস্থায় মনস্তত্ত্ব থেকে সেই ধ্বনি তরঙ্গগুলিকে পশ্যন্তী এবং পরা অবস্থায় গ্রহণ করেছিলেন। এক তো মন আমাদের মস্তিষ্কে থাকে অর্থাৎ আমাদের শরীরে থাকে এবং এক মন সমগ্র সৃষ্টিতে ব্যাপ্ত থাকে এবং সেই মন থেকেই সৃষ্টি তৈরি হয়েছে। একে সমষ্টি মনও বলা হয়, যা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে এবং তার বাইরে
ব্যাপ্ত থাকে।

প্রথম মন্ত্র যা অগ্নি ঋষি গ্রহণ করেছিলেন, তা এই ছিল— ‘অগ্নিমীড়ে পুরোহিতম্ ... ’। একটু ভাবুন যে আমি কাউকে কোনো বস্তু দিই, ধরুন যে নিজের গ্রন্থ ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ উপহার দিই, তবে উপহার দেওয়ার সময় আমি কী বলব ? সেই বইটির সাররূপে পরিচয় বলব যে এই বই এভাবে লেখা হয়েছে,
এর এই-এই বিষয় আছে এবং এটিকে এইভাবে পড়তে হবে এবং তার ফল এটি হবে, এই সব বলব। তেমনই এই মন্ত্র দ্বারা সমগ্র সৃষ্টির একটি সাধারণ পরিচয় হয়ে যাবে এবং এই পরিচয়ও হয়ে যাবে যে এই সৃষ্টি কে তৈরি করেছে ? এর সঙ্গে এই পরিচয়ও হয়ে যাবে যে ঈশ্বর সৃষ্টি তৈরি করে আমাদের মানুষদের দিয়েছেন, তাহলে আমরা এই সৃষ্টিতে কীভাবে থাকব ? তিনটি বিষয় প্রধান— প্রথম বিষয়, সৃষ্টি কী ? দ্বিতীয় এটি কীভাবে তৈরি হয় ? তৃতীয় এটি যে আমরা এই সৃষ্টিতে কীভাবে থাকব ? তৌরেত-ওয়ালা ইহুদি ভাইয়েরা চিন্তা করে নিন যে তাদের তৌরেতও সৃষ্টি থেকে শুরু হয়। পৃথিবী এবং আকাশকে তৈরি করা হলো, জলের উপর আত্মা দৌড়াত ছিল। এইভাবে তারা সৃষ্টি থেকে শুরু করেছে, কিন্তু তাদের সৃষ্টির
জ্ঞান ছিল না। সৃষ্টিতে আমরা কীভাবে থাকব, এটাও তারা বলেনি। এটির কথা আমরা গতকাল বলেছি।

এখন আমরা মন্ত্রের উপর চিন্তা করি। এই যে প্রথম মন্ত্র, এর ঋষি মধুচ্ছন্দা। মহর্ষি দয়ানন্দের মতে ঋষি কে? প্রথম প্রজন্মে হওয়া এই চার ঋষির পরে (এই চারজন তো সকলেরই সাক্ষাৎ করেছিলেন)
যে যে ঋষিরা যে যে মন্ত্রের সর্বপ্রথম সাক্ষাৎ করে এবং তার সম্পূর্ণ জ্ঞান প্রাপ্ত করে প্রচার-প্রসার করেছেন, তারা সেই মন্ত্রগুলির ঋষি এবং উপকারের জন্য তাদের নাম মন্ত্রগুলির সঙ্গে লেখা হয়েছে। মধুচ্ছন্দা নামের এক ব্যক্তি বা ঋষি হয়েছিলেন, তিনি অগ্নি ঋষির পরে অথবা ব্রহ্মা জির পরে এই মন্ত্রকে এবং এর বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণরূপে জেনেছিলেন এবং প্রচারিত ও প্রসারিত করেছিলেন, তাই এর ঋষি মধুচ্ছন্দা। আর এক ঋষিও হন, তারা ঋষি সমগ্র সৃষ্টিতে রশ্মির রূপে বিদ্যমান থাকেন। সেই রশ্মিগুলি কী
? এটি বোঝার জন্য আমাদের ‘বৈদিক রশ্মি থিয়োরি’ বুঝুন, যার জন্য ‘বেদবিজ্ঞান-আলোকঃ’ অথবা ‘পরিচয় বৈদিক ভৌতিকী’ নামক গ্রন্থগুলি পড়ুন অথবা আমাদের ভিডিও শুনুন। সেই ঋষি রশ্মিগুলি থেকে এই মন্ত্ররূপী কম্পনের উৎপত্তি হয়।

মধু কী ?

মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণে লিখেছেন—
‘প্রাণো বৈ মধু’ অর্থাৎ প্রাণই মধু। প্রাণ, অপান, উদান ইত্যাদি যে এগারো প্রাণ আছে, তাদের মধ্যে যে প্রাণ নামক প্রাথমিক প্রাণ আছে, সেটিই মধু। নিরুক্তকার মহর্ষি ইয়াস্ক বলেন— ‘মধু ধমতের্বিপরীতস্য’, ‘ধমতি অর্চতিকর্মা গতিকর্মা বধকর্মা’ অর্থাৎ ‘অগ্নিমীড়ে পুরোহিতম্’ এই ছন্দ রশ্মি (ধ্বনি বা কম্পন) এমন এক প্রাণ রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়, যা আলোকযুক্ত হয়ে গমন করে এবং যদি কোনো বাধক রশ্মি বা তরঙ্গ তার সংস্পর্শে এসে যায়, তবে তাকে নষ্ট করে দেয়। এমন প্রাণ রশ্মি দ্বারা যে রশ্মি আচ্ছাদিত হয়, তাকে বলা হয়— মধুচ্ছন্দা। প্রাণ রশ্মি বাধক পদার্থকে নষ্ট করে এবং আলোকযুক্ত হয়ে গমন করে, যে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে, তাকে মধুচ্ছন্দা বলা হয়। সেই রশ্মি থেকে এই ‘অগ্নিমীড়ে পুরোহিতম্ ... ’ রশ্মি উৎপন্ন হয়েছে।

এখানে আলোকযুক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে আমরা তাকে দেখে ফেলি। প্রতিটি আলোককে আমরা দেখতে পারি না, কারণ আমাদের দেখার একটি সীমা আছে। প্রতিটি ধ্বনি আমরা শুনতে পারি না, কারণ আমাদের শোনারও একটি সীমা আছে। প্রতিটি কণ (পার্টিকল) থেকে যে অব্যক্ত আলোকের তরঙ্গ বের হচ্ছে, আমরা সেগুলি দেখতে পারি না। এখানে এটাও বলে দিই যে যে ছন্দ রশ্মি যে ঋষি রশ্মি থেকে উৎপন্ন হয়, তারও তার উপর প্রভাব থাকে। যেমন যে পিতা-মাতা থেকে যে সন্তান জন্মায়, সেই সন্তানের উপর পিতা-মাতার প্রভাবও থাকে। তেমনই যে ঋষি রশ্মি থেকে যে ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হয়, সেই ছন্দ রশ্মির উপর সেই ঋষি রশ্মিরও প্রভাব থাকে।

ঋষি রশ্মি থেকে উৎপন্ন রশ্মিও কি কারো সাপেক্ষে ঋষি রশ্মি হতে পারে ? এর উত্তর— হ্যাঁ। ঋষি রশ্মিগুলি খুব সূক্ষ্ম হয় এবং ছন্দ রশ্মিগুলি তুলনামূলকভাবে স্থূল হয়। কিছু ছন্দ রশ্মি এমন হয়, যা অন্যান্য রশ্মিকেও উৎপন্ন করে। বহু সূক্ষ্ম রশ্মি থেকে স্থূল ছন্দ রশ্মিগুলি উৎপন্ন হয়। তাদের মধ্যে গায়ত্রী এবং অনুষ্টুপ্ ছন্দ রশ্মিগুলি প্রধান। এই ছন্দ রশ্মিগুলিকে বাক্ রূপ বলা হয়েছে। এই রশ্মিগুলি অন্যান্য রশ্মিকে উৎপন্ন করে। গায়ত্রী ও অনুষ্টুপ্ রশ্মিগুলিও আট প্রকারের হয়— দৈবী, প্রাজাপত্যা, আসুরি, সাম্নী, আর্চী, আর্শী, ব্রাহ্মী এবং যাজুষী। দৈবী গায়ত্রী সকলের মূল হয়।

এই মন্ত্রের দেবতা অগ্নি এবং ছন্দ গায়ত্রী। এর অর্থ এই হল যে যেখানে-যেখানে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হবে, সেখানে-সেখানে এর দেবতা বিদ্যমান হবে। দেবতা কী হয় ? কোনো মন্ত্রের দেবতা হয়— তার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় অর্থাৎ সেই মন্ত্রে কাকে নিয়ে বিশেষভাবে বলা হয়েছে এবং তদ্দ্বারা সৃষ্টির উপর প্রধানত কী প্রভাব পড়বে ? সেই ছন্দ রশ্মি দ্বারা যে পদার্থ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়, তাকে সেই ছন্দ রশ্মির দেবতা বলা হয়। এর দেবতা অগ্নি, তাই যখন এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হবে, যেখানে-যেখানে উৎপন্ন হবে, সেখানে অগ্নি তত্ত্ব সমৃদ্ধ হবে অথবা উৎপন্ন হবে। অগ্নি তত্ত্বের অনেক অর্থ হয়— উষ্ণতা, আলো, বিদ্যুৎ, প্রাণ ইত্যাদি। আধিদৈবিক অর্থে অর্থাৎ সৃষ্টি বিজ্ঞানের অর্থে যেখানে-যেখানে এই ছন্দ রশ্মি উৎপন্ন হবে, সেখানে অগ্নিতত্ত্ব সমৃদ্ধ, তেজস্বী অথবা শক্তিশালী হবে এবং যদি উৎপন্ন না হয়ে থাকে তবে উৎপন্ন হবে।

এখন যে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ঈশ্বরের আলোচনা অথবা প্রশংসা এখানে এখানেও আছে। আমি বিশ্বের বৈদিক পণ্ডিতদের বলতে চাই যে বেদকে বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভ্রান্তি হয়েছে। কেউ কেউ তো বলেন যে কোনো মন্ত্রের একই প্রকারের অর্থ হয়। আমাদের এখানেও এমন একগুঁয়ে মানুষ অনেক আছেন, তারা এই বিষয়টি জানার এবং মানার জন্য প্রস্তুতই নন। তারা না জানেন, না মানেন এবং বোঝার চেষ্টা পর্যন্ত করেন না। এমনই বৈদিক পণ্ডিতেরা আজকের বৈজ্ঞানিক যুগে বেদকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন। আমি তাদের বলতে চাই যে কোনো মন্ত্রের স্বাভাবিক এবং প্রথম ভাষ্য বা অর্থ আধিদৈবিকই হয়, না আধ্যাত্মিক এবং না আধিভৌতিক। এমন কেন হয় ? এটিকে বোঝার চেষ্টা করি—

কোনোও বেদমন্ত্র সৃষ্টিতে এক কম্পনরূপে আছে। কম্পনের সবচেয়ে প্রথম প্রভাব কী হলো? যেমন আমাদের মোবাইলে কোথাও থেকে কোনো তরঙ্গ আসছে, এটি আমাদের উপর তো পরে প্রভাব ফেলবে, কিন্তু প্রথমে যেসব কণার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আসছে, তাদের উপর কী প্রভাব ফেলবে, এটি ভাববার বিষয়। বায়ুমণ্ডলে যে পার্টিকলস বা মলিকিউলস আছে, তাদের উপর এই মোবাইলের তরঙ্গগুলি কী প্রভাব ফেলবে? পথে বৃক্ষ, বনস্পতি ইত্যাদি এসেছে, তাদের উপর কী প্রভাব ফেলেছে? তারপর আমাদের শরীরে কানের পর্দার সঙ্গে ধাক্কা খাবে, প্রথম প্রভাব তো এটি হলো এবং তার পরে এর দ্বারা যে জ্ঞান হবে, তার আমাদের উপর কী প্রভাব হবে, সেটি পরের প্রভাব হবে।

এইভাবে কোনো ছন্দ রশ্মির প্রথম অর্থ বা প্রথম প্রভাব আধিদৈবিকই হয় অর্থাৎ কোনো মন্ত্রের স্বাভাবিক ভাষ্য আধিদৈবিকই হয়। সেই স্বাভাবিক ভাষ্যে কোথাও ঈশ্বরের কথা নেই। ঈশ্বর নিজের প্রশংসা করছেন না, কারণ সেটি স্বাভাবিক ভাষ্যের অর্থ নয়, প্রভাব এবং সেই প্রভাবের আমরা অর্থ করব, তাহলে সেটি আধিদৈবিক পক্ষেই আসবে। তাই যেখানে এমন মনে হয় যে ঈশ্বর নিজের কথা বলছেন, নিজের স্তুতি, প্রার্থনা ও উপাসনা করাচ্ছেন, সেখানে সেই অর্থ দ্বিতীয়ক (সেকেন্ডারি) অর্থ। প্রাথমিক অর্থ এটি যে সেই রশ্মির সৃষ্টির উপর কী প্রভাব পড়ছে। এমন কথা না কোনো বাইবেলওয়ালা বলতে পারে, না কোরানওয়ালা এবং না অন্য কোনো গ্রন্থওয়ালা বলতে পারে। বাইবেল, কোরান ইত্যাদি গ্রন্থগুলির সৃষ্টির উপর কোনো প্রভাব পড়বে না, কারণ সৃষ্টি তো কোটি বছর আগেই তৈরি হয়ে গেছে এবং এই গ্রন্থগুলি এখন তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অসম্পূর্ণ রইল, অবশিষ্ট আলোচনা আমরা আগামীকাল করব। আজ এতটুকুই। 

ওম্ শম্।

ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রের বৈজ্ঞানিক অর্থ

ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।।

প্রিয় শ্রোতাগণ! গতকাল আমরা এক শ্রোতার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছিলাম যে বেদেও ঈশ্বরের প্রশংসা আছে, তাই আমি বলেছিলাম যে বেদের কোনো মন্ত্রের প্রথম বা স্বাভাবিক অর্থ আধিদৈবিকই হয়, কারণ বেদমন্ত্র একটি পদার্থ। পদার্থ সম্পর্কে আর একটু স্পষ্ট করে দিই, এতে আমাদের অনেক বিদ্বান অত্যন্ত বিভ্রান্ত এবং তারা খুব জোর দিয়ে বলেন যে না, বেদমন্ত্র উপাদান কারণ নয়। প্রথমে তো কারণই মানেন না এবং কল-এ আমাকে বলেন যে নিমিত্ত মানো, উপাদান মানো না। আমি বললাম যে উপাদান কেন মানব না? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—মন্ত্র কী, ক্রিয়া না দ্রব্য? তখন আমি বললাম ক্রিয়াশীল দ্রব্যই মন্ত্র। তিনি আবার বললেন—এটা কীভাবে? এটি তো ক্রিয়া, নড়াচড়া বা কম্পন।

আমি বললাম, একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে এবং সে দৌড়াতে শুরু করল, তখন সেই ব্যক্তিকে কী বলা হবে? ধাবক। ধাবক কি অন্য কোনো পদার্থ, না সেই একই ব্যক্তি, যে দাঁড়িয়ে ছিল? সেই দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরই নাম হয়ে গেল—ধাবক, অর্থাৎ দৌড়ানো ব্যক্তি। এটি শুনে কল করা ব্যক্তি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। যখন মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে, তখন তাতে যে কম্পন উৎপন্ন হয়, তাকেই ছন্দ রশ্মি বলা হয়। এখন বলুন, রশ্মি উপাদান কারণ হলো না নিমিত্ত কারণ? তখন তারা নীরব হয়ে গেলেন।

ছন্দ রশ্মিগুলি সৃষ্টিতে নির্মিত যে কোনো পদার্থের, যা সেই রশ্মিগুলির পরে নির্মিত হয়েছে, উপাদান কারণ। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় বললে সেই পদার্থ হলো—আকাশ তত্ত্ব, যা ছন্দ রশ্মি দ্বারা গঠিত। রশ্মি কিসে গঠিত? মনস্তত্ত্ব থেকে। মনস্তত্ত্ব কিসে গঠিত? মূল প্রকৃতি থেকে। কিন্তু নির্মাতা ঈশ্বর, তাঁর ছাড়া এগুলি কিছুতেই সৃষ্টি হতে পারে না। তাই কোনো মন্ত্র বা ছন্দ রশ্মির প্রথম প্রভাব কেবল আধিদৈবিকই হয়। অতএব আমরা প্রথমে আধিদৈবিক অর্থের আলোচনা করব।

যারা বলেন যে আমরা বিজ্ঞানের নকল করি, তারা আগে আমাদের গ্রন্থগুলি পড়ুন এবং তারপর বিজ্ঞানের উচ্চস্তরের বই খুলে বসে আমাকে বলুন যে আমি যা বলছি, তা বিজ্ঞানের কোন বইয়ে লেখা আছে? আমি আপনাদের এতটুকু অবশ্যই বলব যে বর্তমান সময়ে বৈদিক ও প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞানের উপর গবেষণা করা লোকেরা প্রায়ই বর্তমান বিজ্ঞানের পিছনে চলাকেই নিজেদের জন্য গৌরব মনে করেন। এই কারণে লোকেরা আমার বিষয়েও এমন ভ্রান্ত ধারণা করে নেন, অথচ আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং বেদ ও ঋষিদের মহান বিজ্ঞানের উপর গর্ব করি। ঈশ্বরের কৃপায় আমি এই বিজ্ঞানকে বোঝার চাবিকাঠিও পেয়ে গেছি।

‘যজ্ঞস্য অগ্নিম্ ইলে’—এর সাধারণ অর্থ হলো—যজ্ঞাগ্নির স্তব করি; সেই অগ্নি পুরোহিত, দেব, হোতা, রত্নধাতম। এখন যজ্ঞ কী, এই পদটির উপর চিন্তা করি। মহর্ষি দयानন্দ যজুর্বেদ-ভাষ্য 2.21-এ লিখেছেন—‘ক্রিয়াকাণ্ডজন্যং সংসারম্’—সমস্ত সংসারই যজ্ঞ এবং ঋগ্বেদ ভাষ্যের প্রথম মণ্ডলের অষ্টাদশ সূক্তের সপ্তম মন্ত্রে তিনি লিখেছেন—‘সঙ্গতঃ সংসারঃ’ অর্থাৎ সংসারই যজ্ঞ। এই যজ্ঞ কীভাবে হয়? যজ্ঞে আমরা কী করি? যজ্ঞের জন্য আমরা বহু জড়ি-বুটি আনি, অনেক পদার্থ একত্র করে অগ্নিতে আহুতি দিই; তাতে পদার্থ সূক্ষ্ম অণুতে ভেঙে গ্যাসের রূপে ছড়িয়ে পড়ে—এটাই যজ্ঞ। সেইভাবে পরমাত্মা প্রকৃতিরূপী পদার্থ, যা সর্বত্র বিস্তৃত ছিল, তাতে ক্রিয়া করলেন এবং সেই ক্রিয়ার ফলস্বরূপ যা সৃষ্টি হলো, সেটিই সৃষ্টি বা ব্রহ্মাণ্ড। ব্রহ্মাণ্ড একটি সংগঠিত পদার্থ; এর সংযোজক পরমাত্মা এবং যেই পদার্থ দিয়ে এটি নির্মিত হয়েছে, সেটি হলো প্রকৃতি।

ব্যাকরণ অনুসারে যজ্ঞের অর্থ হয়—দেবপূজা, সংগতিকরণ এবং দান। বিভিন্ন দেব পদার্থ অর্থাৎ সত্ত্ব-রজ-তম গুণযুক্ত প্রকৃতি, প্রকৃতি থেকে নির্মিত পদার্থ—মহৎ, অহংকার, মন, ছন্দ ও প্রাণ ইত্যাদি রশ্মির পূজা অর্থাৎ তাদের ব্যবহার পরমাত্মা করেন। পূজার অনেক অর্থ আছে, ব্যবহার করাও তার একটি। এখন ব্যবহার কীভাবে করেন? যেমন জড়ি-বুটি সংগ্রহ করে একত্র করা হয়, তারপর তাদের সংগতিকরণ অর্থাৎ মিশিয়ে হোম-সামগ্রী তৈরি হয়। তেমনি মহৎ, অহংকার, মন, প্রাণ এবং ছন্দ রশ্মি ইত্যাদি সবকিছু বিশেষ বুদ্ধিপূর্বক সংযোগের মাধ্যমে মিলিয়ে সৃষ্টি নির্মিত হয়েছে। যজ্ঞের তৃতীয় অর্থ কী? দান। ঈশ্বর সৃষ্টি নির্মাণ করে তা আমাদের জীবাত্মাদের দান করেছেন। এইভাবে সমগ্র সৃষ্টি যজ্ঞ।

কেউ জানে না যে এই সৃষ্টিতে কত পার্টিকলস, অ্যাটমস, মলিকিউলস, ফোটন্স ইত্যাদি আছে। যখন এগুলিই কেউ জানে না, তখন ছন্দ রশ্মি কত, তা কেউ কীভাবে জানতে পারে? অর্থাৎ জানতে পারে না। ছন্দ রশ্মিকে বর্তমান সময়ে কোনো প্রযুক্তি না দেখতে পারে, না অনুভব করতে পারে। তারপর প্রাণ এবং মরুদ্ রশ্মি, যা ছন্দ রশ্মির থেকেও সূক্ষ্ম, সেগুলি কত, তাও কেউ জানতে পারে না।

মনস্তত্ত্ব, অহংকার ও মহৎ-এর বিস্তার

মনস্তত্ত্ব, অহংকার ও মহৎ-এর কতটা বিস্তার আছে, তা কেউ জানে না। এগুলোর থেকেও বড় বিস্তার প্রকৃতিরূপী পদার্থের এবং তার থেকেও বড় বিস্তার স্বয়ং পরমাত্মার। এই সবকিছুর মধ্যে পরমাত্মা চেতন। এই সবের মাধ্যমেই পরমাত্মা প্রকৃতিকে বিকৃত করে সৃষ্টি নির্মাণ করেছেন। কোনো পদার্থকে বিকৃত করেই অন্য পদার্থ তৈরি করা যায়। নির্বিকার কখনো কোনো পদার্থের অংশ হয় না। জীবাত্মা ও পরমাত্মা নির্বিকার; এদের থেকে কোনো পদার্থ বা সৃষ্টি তৈরি হয় না, এরা তো নির্মাতা। যেমন হালুয়াই মিষ্টান্ন, ডাল-চাল, রুটি তৈরি করে, কিন্তু সেই হালুয়াই সেই খাদ্যের অংশ হয়ে যায় না। খাদ্যের অংশ তো পানি, আটা, তেল, ঘি, লবণ, মসলা ইত্যাদি। অংশরূপে আছে প্রকৃতি এবং প্রকৃতি থেকে তৈরি পদার্থসমূহ। তেমনি সৃষ্টিতে পরমাত্মা আছেন, যিনি সৃষ্টি নির্মাণ করছেন, তাই সমগ্র সৃষ্টি যজ্ঞ।

বেদে বলা হয়েছে— “অয়ং হোতা প্রথমঃ পশ্যত ইদম্” অর্থাৎ দেখো! এই পরমাত্মাই সৃষ্টিযজ্ঞের সর্বপ্রথম হোতা অর্থাৎ আহুতি দানকারী। তাকে দেখো অর্থাৎ বুঝো। এটি সৃষ্টিযজ্ঞ এবং এর হোতা অগ্নি; অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হতে পারে না। যেমন হোমকুণ্ডের অগ্নি ছাড়া যজ্ঞ হতে পারে না।

মহর্ষি যাস্ক ‘অগ্নি’-এর নিরুক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন— “অগ্নিঃ কস্মাত্? অগ্রণীর্ ভবতি। অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে। অঙ্গং নয়তি সন্নমমানঃ।” অর্থাৎ যে সর্বাগ্রে চলে, সবার নেতৃত্ব দেয়, সকলকে নিজের পিছনে নিয়ে যায়, তাকে অগ্নি বলা হয়। কোনো যজ্ঞে অর্থাৎ সংযোগ ও বিযোজনের প্রক্রিয়ায়—তা সে কসমোলজিক্যাল, রাসায়নিক, ভূগর্ভীয়, জৈবিক বা অন্য যে কোনো ক্রিয়াই হোক—সেখানে সর্বপ্রথম অগ্নির প্রয়োজন হয়। “অঙ্গং নয়তি সন্নমমানঃ” অর্থাৎ অগ্নি অন্য কোনো পদার্থকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের মতো করে নেয় বা নিজের দিকে আকর্ষিত করে। এমন অগ্নি কী হতে পারে? অগ্নির বহু অর্থ হতে পারে, যেগুলো আমরা একে একে বলব।

অগ্নি সম্পর্কে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন— “অগ্নির্ বৈ দেবানাং বসিষ্ঠঃ” অর্থাৎ অগ্নি সমস্ত দেব পদার্থের মধ্যে সকলকে উৎপন্ন ও ধারণকারী। ধারণকারীদের মধ্যে অগ্নি সর্বশ্রেষ্ঠ। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেন— “অগ্নির্ বৈ দেবানাং মুখম্ প্রজনয়িতা স প্রজাপতিঃ।” অগ্নি বিভিন্ন দেব পদার্থ যেমন কণ, তরঙ্গ, আকাশ ইত্যাদি সবকিছুকে উৎপন্ন করে, অর্থাৎ সবার মুখ। সেই অগ্নির মাধ্যমেই এই দেব পদার্থগুলি জীবিত থাকে; অর্থাৎ অগ্নি ছাড়া এই দেব পদার্থগুলির অস্তিত্ব থাকবে না, তাই তার নাম অগ্নি। সকলকে উৎপন্নকারী হওয়ায় অগ্নিকে প্রজাপতি বলা হয়।

অগ্নি কী? এর উত্তর মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণে দিয়েছেন— “বাক্ এব অগ্নিঃ” অর্থাৎ বাক্ তত্ত্ব বা রশ্মি অর্থাৎ ছন্দ রশ্মিগুলিই অগ্নি। এগুলি অগ্নি এই কারণে যে সর্বপ্রথম এই বাক্ তত্ত্ব কম্পনের রূপে উৎপন্ন হয় এবং তারপর এগুলিই অন্যান্য কম্পন সৃষ্টি করে।

“অগ্রণীর্ ভবতি”—অর্থাৎ একটি রশ্মি অন্য রশ্মিগুলিকে সামনে নিয়ে যায় বা নিজের পিছনে নিয়ে আসে এবং যখন সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়া হয়, তখন রশ্মিগুলির এই গুণের কারণেই রশ্মিগুলির বিনিময় ঘটে। এখন ভৌতবিজ্ঞানের জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা বলবেন যে মৌলিক বল চারটি এবং তাদের মধ্যে সংযোগ-বিয়োগের ক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি কাজ করে তড়িৎ-চুম্বকীয় বল। কিন্তু এই তড়িৎ-চুম্বকীয় বল কী? এর প্রকৃতি কী? এটি কীভাবে কাজ করে? কেন উৎপন্ন হয়? ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। কেউ জানলে আমাদের বলুক। মিডিয়েটর কণ কীভাবে তৈরি হয়, তাদের ক্রিয়াবিজ্ঞান কী—এটিও কেউ জানে না। কিন্তু আমরা বলতে পারি যে এই কণাগুলিও বাক্ রশ্মি দ্বারা গঠিত। বাক্, ছন্দ এবং প্রাণ প্রভৃতি রশ্মির কারণেই মিডিয়েটর কণগুলির পরস্পরের মধ্যে বিনিময় ঘটে অর্থাৎ এগুলি এক্সচেঞ্জ হয়।

যদি কেউ বলে যে ছন্দ রশ্মি তো মন অর্থাৎ সমষ্টি মনের ভিতরে উৎপন্ন হয়। এই বিষয়ে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন— “মন এব অগ্নিঃ” অর্থাৎ ছন্দ রশ্মিরও আগে যেগুলিকে সামনে নিয়ে যায়, সেই মনস্তত্ত্বই অগ্নি। তারপর শতপথ ব্রাহ্মণে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেন— “অগ্নিরেব ব্রহ্মা” অর্থাৎ অগ্নিই ব্রহ্মা; অর্থাৎ এই বাক্ রশ্মিগুলিই সর্বাধিক ব্যাপক ও শক্তিশালী, এদের বলই সর্বাধিক ব্যাপক। মহর্ষির এ বিষয়ে আরেকটি উক্তি আছে— “আত্মৈব অগ্নিঃ।” আত্মার এখানে দুটি অর্থ—একটি পরমাত্মা, যাকে আমরা আধ্যাত্মিক অর্থে নেব। আত্মার দ্বিতীয় অর্থ হলো সূত্রাত্মা বায়ু। সূত্রাত্মা বায়ুর রশ্মিগুলি সমস্ত প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির থেকেও সূক্ষ্ম। এই অগ্নির বাক্, মন ইত্যাদি বহু অর্থ হতে পারে।

সৃষ্টি নির্মাণে বিভিন্ন স্তরে অগ্নির বিভিন্ন রূপ থাকে। এখন আমরা প্রথম স্তরটি দেখি। প্রথম স্তরে অগ্নি কী? বাক্। কোন বাক্? পরা ‘ওম্’। পরা ‘ওম্’ রশ্মিই অগ্নির প্রথম রূপ। পরা ‘ওম্’ রশ্মি মন থেকেও প্রথম অগ্নি, কারণ এটি প্রকৃতিতে উৎপন্ন হয়। এটি প্রকৃতিতে উৎপন্ন হয়ে যাওয়ার পরে পরা ‘ওম্’ রশ্মিযুক্ত প্রকৃতি পদার্থকেই মহৎ বলা হয়, যা মনস্তত্ত্বের পূর্ববর্তী একটি অবস্থা। সৃষ্টিতে সর্বপ্রথম অগ্নি অর্থাৎ পরা ‘ওম্’ রশ্মি ছাড়া কিছুই নির্মাণ হতে পারে না, তাই সেটিই সকলের অগ্রণী অর্থাৎ সকলকে সামনে নিয়ে চলার ক্ষমতাসম্পন্ন। এই রশ্মি উৎপন্ন হওয়ার পরেই আন্দোলন শুরু হয় এবং তার পরেই প্রকৃতিতে বিকার শুরু হয় ও সৃষ্টি নির্মাণের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়।

দ্বিতীয় অগ্নি কী? দ্বিতীয় অগ্নি হলো—সমষ্টি মন। যখন সমগ্র সৃষ্টি বা প্রকৃতি পদার্থে পরা ‘ওম্’ রশ্মি সর্বত্র উৎপন্ন হয়ে যায়, তখন প্রকৃতির সেই অবস্থার নাম হয়—মহৎ, যার পরবর্তী স্তর হলো—অহংকার এবং তার পরবর্তী স্তর হলো—মন। তিনটিকে ক্রমান্বয়ে এভাবে বোঝা যায়—যেমন একটি কাঁচা আম, একটি আধাপাকা আম এবং একটি সম্পূর্ণ পাকা আম। এখানে মনস্তত্ত্বকেও অগ্নি বলা হয়েছে, কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত মনস্তত্ত্ব তৈরি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাতে কোনো রশ্মি উৎপন্ন হতে পারে না। এখন তৃতীয় অগ্নি কী? সেটি হলো—আত্মা। আধিদৈবিক ভাষ্যে এর অর্থ পরমাত্মা নেব না, এই অর্থ আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে নেওয়া হবে। এখানে আমরা এর অর্থ সূত্রাত্মা বায়ু নেব। যদিও মনস্তত্ত্বের পরে আরও রশ্মি উৎপন্ন হয়, যেমন—‘ভূঃ’, ‘ভুবঃ’, ‘স্বঃ’ ইত্যাদি, কিন্তু এগারো প্রাণ রশ্মির মধ্যে সূত্রাত্মা বায়ুই সর্বপ্রথম উৎপন্ন হয়, তাই এটিও অগ্নি।

এর পরের অগ্নি কাকে বলা হয়েছে? চতুর্থ অগ্নি হলো—প্রাণ। সূত্রাত্মা বায়ুর পরে ‘প্রাণ’ নামক প্রাথমিক প্রাণই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন—‘প্রাণো বৈ সম্রাট্ পরমং ব্রহ্ম’ অর্থাৎ প্রাণতত্ত্বই ব্রহ্ম বা ব্রহ্মা; অন্যদিকে মহর্ষি তিত্তির বলেছেন—‘বলং বৈ ব্রহ্মা’ অর্থাৎ বলই ব্রহ্মা, অর্থাৎ প্রাণরূপ অগ্নিই ব্রহ্মা। এর কারণ হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত সৃষ্টিতে বলের উৎপত্তি না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সৃষ্টি এগোয় না। আজকের বিজ্ঞান কেবল চার প্রকারের বল জানে, অথচ বৈদিক ভৌতবিজ্ঞানে নয়টি বল আছে।

এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের অনুকরণ করি না। আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষপাতীরা শুনুন যে একদিন তাদের বৈদিক ভৌতবিজ্ঞানের পিছনে আসতেই হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এগোতে পারবে না। আমি কাউকে অনুকরণ করতে বলছি না, আমি শুধু এতটুকুই বলছি যে আপনারা বৈদিক বিজ্ঞানের গম্ভীরভাবে অধ্যয়ন করুন। যদি আপনাদের মনে হয় যে আমাদের কথাগুলি যুক্তিসঙ্গত, আপনাদের ভৌতবিজ্ঞানের জন্য উপকারী, আপনাদের নতুন দিশা দিতে পারে এবং এমন ফল দিতে পারে যা আপনাদের বড় বড় ল্যাবরেটরিও দিতে পারছে না, তাহলে আমাদের কথাগুলি একবার বিবেচনা করুন।

সৃষ্টির সর্বপ্রথম এবং মূল বল ঈশ্বরের, সেটিকে এখানে নেব না, তা হলে বিষয়টি আধ্যাত্মিক হয়ে যাবে। পরা ‘ওম্’ রশ্মি দ্বারা যে বল উৎপন্ন হয়, সেই বলই অগ্নি। অগ্নির একটি অর্থ বিদ্যুৎও। যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ আধান উৎপন্ন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কণাগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে না। অগ্নির আরেকটি অর্থ হলো—উষ্মা। বিভিন্ন স্তরে অগ্নির বিভিন্ন অর্থ হয়। অগ্নির অর্থগুলির আলোচনা করার পরে এর কী কী বিশেষণ আছে, তা আমরা আগামীকাল বলব। আজ এতটুকুই। ওম্ শম্।

প্রথম বেদমন্ত্রের বৈজ্ঞানিক রহস্য

ওম্ অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হোতারং রত্নধাতমম্।।

প্রিয় পাঠকগণ! আগে আমরা আলোচনা করেছিলাম যে ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রে অগ্নির ছয়টি অর্থ আছে এবং এই ছয় প্রকারের অগ্নি পৃথক-পৃথক স্তরে সংযোগ-বিয়োগের প্রক্রিয়ার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয় হয়। আমরা অগ্নির শেষ অর্থ উষ্মা বলেছিলাম। আধুনিক বিজ্ঞানও এই বিষয়টি জানে যে যতক্ষণ পর্যন্ত উষ্মা উৎপন্ন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সৃষ্টির উৎপত্তি সম্ভব নয়।

আধুনিক বিজ্ঞান স্বীকার করে যে যতক্ষণ পর্যন্ত এই ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যুৎ আধান উৎপন্ন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পদার্থই উৎপন্ন হয় না, কিন্তু উষ্মা অথবা ফোটন বৈদিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে খুব স্থূল। যারা মনে করেন যে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের পিছনে চলি এবং সেই বিষয়গুলিকেই খুঁজি, যেগুলি আধুনিক বিজ্ঞান ইতিমধ্যে খুঁজে ফেলেছে—তারা এতটুকু জেনে রাখুন যে আমরা অগ্নির যে চারটি অর্থ—বাক্, মন, প্রাণ এবং সূত্রাত্মা বায়ু—বলেছি, সেগুলির বিষয়ে আধুনিক ভৌতবিজ্ঞান সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আধুনিক ভৌতবিজ্ঞানের সৃষ্টিকে বোঝার সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই বৈদিক ভৌতবিজ্ঞান শুরু হয়। বৈদিক ভৌতবিজ্ঞান মূলকণার থেকেও ছয় স্তর সূক্ষ্ম পদার্থের ব্যাখ্যা করতে পারে। এইভাবে বৈদিক ভৌতবিজ্ঞান আধুনিক বিজ্ঞানের থেকে ছয় স্তর এগিয়ে সৃষ্টি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে পারে।

এই মন্ত্রে অগ্নির বিশেষণ—পুরোহিত, দেব, ঋত্বিজ, হোতা এবং রত্নধাতম—বলা হয়েছে। এখন এদের বিষয়ে আলোচনা করি।

1. পুরোহিত—অগ্নির প্রথম বিশেষণ ‘পুরোহিত’। পুরোহিত কাকে বলে? আজকাল এই শব্দটি কথিত জাতিসূচক হয়ে গেছে। কোথাও শুনেছি যে এই মন্ত্র দেখে কেউ কেউ বলেন—এটি পুরোহিতের মন্ত্র। এ ধরনের অশিক্ষিতদের বহু ধারণা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। ‘পুরোহিত’ শব্দের অর্থ—‘যঃ পুরস্তাৎ সর্বং জগদ্ দধাতি ছেদনাকর্ষণগুণাভ্যাম্’। এই নিরুক্ত ঋষি দয়ানন্দ করেছেন। এই মন্ত্রের ভাষ্যে তিনি বলেছেন—যে এই জগতকে পূর্ব থেকেই ধারণ করে, যার ছেদন, ধারণ, আকর্ষণ, প্রতিকর্ষণ ইত্যাদি গুণ আছে, সে পুরোহিত নামে পরিচিত।

নিরুক্তকার ‘পুরোহিত’ শব্দের নিরুক্ত করতে গিয়ে বলেন—‘পুরোহিতঃ পুর এনং দধতি’ অর্থাৎ যে কোনো পদার্থকে সম্মুখ থেকে ধারণ করে। মহর্ষি জৈমিনিও একই কথা বলেছেন—‘প্রথমঃ পুরোহিতমিতি পুর এৱ ৱা এনমেতদ্ দধতে। যদগ্নিমাদধতে’ অর্থাৎ যে কোনো পদার্থকে সামনে থেকে বা সম্মুখ থেকে ধারণ করে, সে পুরোহিত নামে পরিচিত। যেমন আমরা কোনো পদার্থ বা কোনো ব্যক্তিকে ধরলে সামনে থেকে ধরি, পিছন থেকে নয়। তেমনি অগ্নি পদার্থ—সে বাক্, মন, প্রাণ, সূত্রাত্মা বায়ু, বিদ্যুৎ, উষ্মা যাই হোক না কেন—এদের সামনে যে কোনো পদার্থ এলে, তারা তাকে সম্মুখ থেকে গ্রহণ বা ধারণ করে, আকর্ষণ অথবা প্রতিকর্ষণ করে।

প্রথমে বাক্-কে গ্রহণ করি। বাক্ কী? সর্বপ্রথম বাক্ হলো—‘ওম্’। যত বেদমন্ত্র ও ছন্দ রশ্মি আছে, তারা সকলেই বাক্-রূপ, কিন্তু তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাক্ হলো ‘ওম্’। এর আগে এই ব্রহ্মাণ্ডে কোনো কম্পনই হয় না। আধুনিক বিজ্ঞানীরাও মনে করেন যে ধ্বনি তরঙ্গ বা পদার্থের ফ্লাকচুয়েশন (কম্পন) থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের কারণও ধ্বনি তরঙ্গ। কিছু বিজ্ঞানী বলেন যে ডার্ক ম্যাটার থেকেও ধ্বনি তরঙ্গ বের হয়। আমরা বলি যে শুধু সেখান থেকেই নয়, প্রতিটি পদার্থ থেকেই ধ্বনি তরঙ্গ বের হয়। সেই বিজ্ঞানীরা জানেন না যে সেই ধ্বনি তরঙ্গগুলি কী। যদি কোনো কণার থেকে ধ্বনি তরঙ্গ বের হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে তা বাণীর মধ্যমা অবস্থায় থাকবে। তার আগে তা পশ্যন্তী অবস্থায় থাকে। যখন কণা তৈরি হয় না, তখনও ধ্বনি তরঙ্গ থাকে।

কেউ মন্তব্য করেছিলেন যে ধ্বনি তরঙ্গ বা কম্পনের জন্য তো কোনো মাধ্যম থাকা উচিত। হ্যাঁ, বৈখরী তরঙ্গ বা ধ্বনির জন্য মাধ্যম প্রয়োজন, যেমন—বায়ু, জল, ধাতু অথবা অন্য কোনো কঠিন, তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ। এগুলি ছাড়া আমরা বাণী শুনতে পারব না, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বাণী উৎপন্নই হবে না। বৈখরীর পরে বাণীর মধ্যমা অবস্থা আসে, যার জন্য এই সব মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না, তারা ইলেকট্রিক সংকেত (সিগন্যালের) রূপে গমন করে। মধ্যমা বাণীর গমনের জন্য কোন মাধ্যম প্রয়োজন? এর জন্য আকাশ তত্ত্ব অর্থাৎ স্পেস প্রয়োজন। বাণীর মধ্যমা থেকেও যে সূক্ষ্ম অবস্থা আছে তা হলো — পশ্যন্তী। আমি বাণীকে ধ্বনি বা সাউন্ড বলি না, এর জন্য বৈদিক শব্দ ‘বাক্’। বাণীর এই সূক্ষ্ম স্তরের জন্য আকাশও প্রয়োজন হয় না। স্পেস অর্থাৎ আকাশ একটি নির্মিত পদার্থ, এর অর্থ শূন্য স্থান নয়।

আকাশ এমন একটি পদার্থ যা প্রসারিত ও সংকুচিত হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে কণা, তরঙ্গ ইত্যাদি কোনো বাধা ছাড়াই এপার-ওপার চলে যেতে পারে। আকাশ সমগ্র শূন্যস্থানকে পূর্ণ করে রেখেছে, কিন্তু সে নিজে শূন্য নয়। আমাদের জন্য এবং কণা, তরঙ্গ ইত্যাদির জন্য এটি শূন্য বা ফাঁকা মনে হয়, কিন্তু এর থেকেও সূক্ষ্ম ছন্দ ও প্রাণ রশ্মি এবং মনের জন্য এটি শূন্য নয়, কারণ মন, প্রাণ এবং সূক্ষ্ম ছন্দ রশ্মি ইত্যাদি দিয়েই এই আকাশ তত্ত্ব (স্পেস) গঠিত। পশ্যন্তী বাকের জন্য মনস্তত্ত্ব মাধ্যম হিসাবে প্রয়োজন, যা সমগ্র সৃষ্টিতে পূর্ণ হয়ে আছে। পরা বাণীর জন্য প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু প্রয়োজন নেই।

প্রকৃতি অর্থাৎ মূল পদার্থ, যার বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান না জানে এবং না কখনো তার ভৌত যন্ত্র দিয়ে জানতে পারে। সেই মূল পদার্থে সর্বপ্রথম যে কম্পন হয়েছিল তা হলো — পরা ‘ওম্’ রশ্মি, অর্থাৎ সেই সময় সৃষ্টির প্রথম অগ্নির উৎপত্তি হয়েছিল। সেই অগ্নি কী করে? এই মন্ত্রের ভাষ্যে ঋষি দয়ানন্দ ‘পুরোহিত’ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে পরা ‘ওম্’ রশ্মি বা অগ্নির আটটি গুণ বলেছেন — রূপ (কোনো কিছুর দেখা যাওয়া), আকাশ (আকার), দাহ (উষ্ণতা), প্রকাশ, বেগ, ছেদন, ধারণ এবং আকর্ষণ ইত্যাদি। এখানে ‘ইত্যাদি’ থেকে আমরা প্রতিকর্ষণ গুণও গ্রহণ করব।

এখন এই আটটি গুণের মধ্যে আলো কীভাবে উৎপন্ন হয়, তা কেউ জানে না। বর্তমান বিজ্ঞানীরা বলেন যে ফোটন প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে — এখানে পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু ফোটনের মধ্যে এই গুণ কোথা থেকে এলো যে সে কোনো বস্তুর রূপ দেখাতে পারে? তার মধ্যে আলোর গুণ কোথা থেকে এলো? তার মধ্যে উষ্ণতার গুণ কোথা থেকে এলো? তার মধ্যে এবং অন্য কোনো কণার মধ্যে কী পার্থক্য আছে অথবা এক্স-রে এবং রেডিও ইত্যাদি তরঙ্গের মধ্যে কী পার্থক্য আছে? এই পার্থক্য কি কেবলমাত্র ফ্রিকোয়েন্সির? যদি ফ্রিকোয়েন্সির পার্থক্য হয়, তবে ফ্রিকোয়েন্সির পার্থক্য কেন হলো?

একটি মোটরসাইকেল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলে এবং একটি বিমান ঘণ্টায় ৭০০-৮০০ কিলোমিটার গতিতে চলে। দুটির মধ্যে পার্থক্য কী? তাদের গতির মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য কি শুধু এই যে একটি বিমান এবং অন্যটি মোটরসাইকেল? নাকি অন্য কোনো কারণে পার্থক্য? আপনি জানেন এর কারণ তাদের গঠনের পার্থক্য। যদি মোটরসাইকেল এবং বিমানের গঠনে পার্থক্য না থাকত, তবে বিমান কখনো মোটরসাইকেলের চেয়ে দ্রুত চলতে পারত না। দুটি গাড়ির গতিতে পার্থক্য থাকলে তার অর্থ তাদের গঠনে পার্থক্য আছে।

বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ যেমন রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে, গামা বা আল্ট্রা ভায়োলেট যাই হোক না কেন, তাদের গতিতে পার্থক্য নেই, কিন্তু তাদের গুণে পার্থক্য আছে। গুণের পার্থক্য অর্থাৎ তাদের ফ্রিকোয়েন্সির পার্থক্য। ফ্রিকোয়েন্সির পার্থক্য কেন? স্পষ্ট যে কোথাও না কোথাও তাদের অভ্যন্তরীণ গঠনে পার্থক্য আছে, আর সেই অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে কেউ জানে না। যদি কেউ জানে তবে আমাদের বলুক।

আমরা বলি যে এই তরঙ্গ বা কোনো কণার অভ্যন্তরীণ গঠন কী। এগুলি সব ছন্দ এবং প্রাণ রশ্মি বা কম্পন দিয়ে গঠিত এবং তারা যে ক্রিয়া করে তা তাদের অভ্যন্তরীণ গঠনের কারণেই করে। আমি কথা বলছি — এতে কি আমার অভ্যন্তরীণ গঠনের ভূমিকা নেই? যদি আমার কণ্ঠ নষ্ট হয়ে যায় তবে আমি কথা বলতে পারব না, অথবা মস্তিষ্কের যে অংশ কথা বলায় তা নষ্ট হয়ে গেলে তবুও আমি কথা বলতে পারব না। একজন মানুষ খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে, আর একজন ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না — কারণ তাদের গঠনে পার্থক্য আছে।

যে দুটি কণা বা তরঙ্গের গুণে পার্থক্য আছে, নিশ্চিতভাবেই তারা ভিন্ন-ভিন্ন রশ্মি দিয়ে গঠিত, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি বিষয় সাধারণ — উভয়ের মধ্যেই ‘ওম্’ রশ্মি আছে। যখন কোনো ক্রিয়া ঘটে, যেমন ধরুন আমি এই টেবিলটিকে আঘাত করলাম এবং টেবিলে আঘাত করার ফলে শব্দ বের হলো — কেউ বলুক শব্দ কীভাবে এলো? এর ব্যাখ্যা আমি করব না, কিন্তু এর থেকে যে তরঙ্গ বের হলো, সেই তরঙ্গের মধ্যে যে রশ্মি আছে এবং সেই রশ্মির মধ্যেও যে সর্বশেষ রশ্মি আছে যার এই ব্রহ্মাণ্ডে মূল ভূমিকা আছে, তা হলো — ‘ওম্’ রশ্মি।

বাংলা অনুবাদ (মূল পাঠ অনুযায়ী, নতুন বাক্য যোগ করা হয়নি — A4 এক পৃষ্ঠা)

‘ওম্’ রশ্মি ছাড়া এই ব্রহ্মাণ্ডে কোনো ক্রিয়া কখনো হয়নি এবং কখনো হতে পারে না। তাই যারা বলেন যে ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া একটি পাতাও নড়ে না—এটি সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা মানুষের ইচ্ছার মতো নয়। এর অর্থ এই নয় যে আমরা কিছুই নই; আমরাও চেতন। আমাদের শরীরে যে ইচ্ছা ও চেষ্টা হয়, তা আমাদের নিজের, ঈশ্বরের নয়। কিন্তু আমাদের শরীর যে কণাগুলির সমন্বয়ে তৈরি, তার ভিতরে যে ক্রিয়াগুলি ঘটে, সেখানে শেষ পর্যন্ত ‘ওম্’ রশ্মিরই ভূমিকা থাকে।

যেমন আমি এই বইটি তুললাম—এখানে হাতের ভূমিকা আছে, কিন্তু হাতের পিছনে কার ভূমিকা আছে? মাংসপেশীর। মাংসপেশীর পিছনে কার ভূমিকা আছে? বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বলের। তার পিছনে কার ভূমিকা আছে? বহু ছন্দ রশ্মির। তাদের পিছনে কার ভূমিকা আছে? এইভাবে শেষে ‘ওম্’ রশ্মিরই ভূমিকা আসে।

অতএব ‘ওম্’ রশ্মি যেকোনো পদার্থকে সামনে থেকে ধারণ করে, তা সে ফোটন হোক বা ইলেকট্রন বা অন্য কোনো ছন্দ রশ্মি হোক। তাই বাক্ তত্ত্ব (পরা ‘ওম্’)ই অগ্নি এবং এটিই পুরোহিত। অগ্নির জন্য ‘পুরোহিত’ শব্দটি এখানে যথার্থ হয়েছে।

এখন মন সম্পর্কে চিন্তা করি। মন কী? মন একটি পদার্থ। বাক্ তো মন বা প্রকৃতির ভিতরে হওয়া কম্পন, কিন্তু মন সেই পদার্থ যা কম্পিত বা স্পন্দিত প্রকৃতির রূপ। মহৎ, অহংকার এবং মন—এই তিনটি মূলত এক, শুধু স্তরের সামান্য পার্থক্য আছে। মনে বাক্ আছে এবং বাকের মধ্যে মন আছে।

এই বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়—যেমন আপনি যদি পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন বা সমুদ্রের ঢেউ দেখেন, তবে ঢেউ কী? ঢেউয়ের ভিতরে পানি আছে এবং পানির ভিতরে ঢেউ আছে। অর্থাৎ ঢেউ পানি থেকে আলাদা নয় এবং পানি ঢেউ থেকে আলাদা নয়। তাহলে ঢেউ ও পানির মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য হলো—যখন পানিতে কোনো স্পন্দন নেই, তখনও তা পানি। পানি ঢেউ হয় তখনই, যখন তা স্পন্দিত হয়।

ঠিক তেমনি স্পন্দিত মনই বাক্ রূপ ধারণ করে। তাই মহর্ষি জৈমিনি বলেছেন—“বাগিতি মনঃ” অর্থাৎ এই বাকই মন। এবং মহর্ষি ঐতরেয় মহীদাস বলেছেন—“বাক্ চ মনশ্চ দেবানাং মিথুনম্” অর্থাৎ বাক ও মন—এই দুটির যুগল সম্পর্ক। যতক্ষণ পর্যন্ত মনে স্পন্দন না হয়, ততক্ষণ কিছুই সৃষ্টি হতে পারে না। স্পন্দন হলেই সৃষ্টি হয়।

যেমন আমরা যদি শুধু ঘুমিয়ে থাকি এবং আমাদের হাত-পা না নড়ে, তবে আমাদের থাকা বা না থাকার কোনো অর্থ থাকে না। কিন্তু যখনই আমাদের মধ্যে নড়াচড়া আসে, স্পন্দন হয়, তখনই আমরা কোনো কাজ করতে পারি। তেমনি বাক্-সহ মনই সৃষ্টির পরবর্তী স্তরের পদার্থ সৃষ্টি করে। তাই এই মনও অগ্নির একটি রূপ এবং সেই কারণেই একে পুরোহিত বলা হয়েছে। মনের ছাড়া বাক্ উৎপন্ন হতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, এখানে পশ্যন্তী বাকের কথা বলা হচ্ছে, পরা বাকের নয়।

অগ্নির তৃতীয় রূপ হলো—আত্মা। এখানে আধিদৈবিক দৃষ্টিতে আত্মার অর্থ হলো সূত্রাত্মা বায়ু। মনের পরে এগারো প্রকারের প্রাণ রশ্মি উৎপন্ন হয়, তার মধ্যে প্রথম স্থান সূত্রাত্মা বায়ুর। সূত্রাত্মা শব্দের অর্থ কী এবং এর গুণ কী—এই বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে। ওম্ শম্।

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

 বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন প্রশ্ন- পরমাত্মা সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের বহু মানুষের মধ্যে কেবল চার ঋষিকেই জ্ঞান কেন দিলেন? কি ঈশ্বর পক্ষপাতী...

Post Top Ad

ধন্যবাদ