ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

28 April, 2026

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান

28 April 0

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান

যখন নিউটন আপেলের ফলকে গাছ থেকে নিচে পড়তে দেখেছিলেন, তখন তাঁর মনে এই উহা ও তর্কের উদ্ভব হয়েছিল যে আপেল নিচেই কেন পড়ল? তাঁর এই চিন্তা থেকেই মাধ্যাকর্ষণের আবিষ্কার এবং এ-সম্পর্কিত পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়। আপেল পড়তে অনেকেই দেখে থাকে, তখনও দেখত, কিন্তু এই চিন্তা নিউটনের মস্তিষ্কেই এসেছিল, কারণ তিনি তর্ক ও উহা-সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। দর্শনকে ইংরেজি ভাষায় Philosophy বলা হয়, যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Chambers Dictionary-তে লেখা হয়েছে—
"In pursuit of wisdom and knowledge, investigation contemplation of the nature of being knowledge of the causes and laws of all things, the principles underlying any sphere of knowledge, reasoning."

Oxford Advanced Learners dictionary-তে এটিকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে—
"Search for knowledge and understanding of the nature and meaning of the universe and human life."

অর্থাৎ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তু, তাদের কারণ এবং কার্যকরী নিয়ম ইত্যাদি বিষয়কে তর্ক ও উহা-র ভিত্তিতে জানার প্রচেষ্টাকেই দর্শন বলা হয়।

এতে স্পষ্ট হয় যে বিজ্ঞান ও দর্শন উভয়েরই উদ্দেশ্য ব্রহ্মাণ্ডকে জানার চেষ্টা করা। উভয় প্রক্রিয়ায় কিছু পার্থক্য অবশ্যই আছে, কিন্তু উভয়ের উদ্দেশ্য এক। বিজ্ঞানের ক্ষেত্র মানব প্রযুক্তির সামর্থ্য পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং দর্শনের ক্ষেত্র চিন্তা, মনন ও উহা-র সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। কোথাও বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ প্রমাণাদি ক্রিয়ার উপস্থিতিতেও মূল কারণ বা নিয়মাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে অসীম পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না, আবার কোথাও দর্শনও দার্শনিকদের (বিশেষত পরম সিদ্ধ যোগীদের ব্যতীত) কল্পনার বেগে ভেসে গিয়ে ভ্রান্ত হতে পারে। আমাদের উভয় বিদ্যারই বিবেকসম্মত ব্যবহার করার চেষ্টা করা উচিত।

এখন আমরা পাঠকদের সামনে বিজ্ঞান ও দর্শনের সীমা ও সমন্বয় প্রদর্শন করে সৃষ্টির একটি নিয়ম নিয়ে চিন্তা করি—

যখন আমরা এই বিষয়ে চিন্তা করি যে একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত বস্তু অন্য একটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত বস্তুকে কেন আকর্ষণ করে, তখন এই জ্ঞানের প্রক্রিয়ায় প্রথমেই আমরা অনুভব করি যে বিপরীত আধানযুক্ত বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। এখানে আকর্ষণ বল আছে, তাহলে তার কারণও থাকবে— এই চিন্তা করা দর্শনের বিষয়। দুটি বস্তু পরস্পরের নিকটে আসছে, তাহলে তাদের মধ্যে কোনো আকর্ষণ বল কাজ করছে— এটিও জানা দর্শনের বিষয়। এখন ঐ আকর্ষিত বস্তুগুলির উপর বিপরীত বৈদ্যুতিক আধান রয়েছে— এটি বলা বিজ্ঞানের কাজ। এই আধান কিভাবে কাজ করে— এটিও বিজ্ঞানের কাজ। বর্তমান বিজ্ঞান জেনেছে যে যখন দুই বিপরীত আধানযুক্ত কণ কাছাকাছি আসে, তখন তাদের মধ্যে Virtual Photons উৎপন্ন ও সঞ্চারিত হতে শুরু করে। এই Particles (Photons)-ই আকর্ষণ বলের কারণ হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের মতে, এই Particles ঐ দুই কণের মধ্যবর্তী space-কে সংকুচিত করে তাদেরকে পরস্পরের নিকট আনতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াকে জানা বিজ্ঞানের কাজ। সম্ভবত বর্তমান বিজ্ঞানের সীমা এখানেই শেষ হয়; এর পর দর্শন বা বৈদিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্র শুরু হয়।

যখন আমি প্রশ্ন করি যে ধন ও ঋণ বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণগুলির নিকট আসামাত্র Virtual Particles কোথা থেকে এবং কেন প্রকাশ পায়, তখন বিজ্ঞানীরা বলেন— আমরা এর উত্তর জানি না। যেখানে বর্তমান বিজ্ঞান উত্তর দিতে পারে না, সেখানে বৈদিক বিজ্ঞান বা দর্শন উত্তর দেয়। এই উত্তর বৈদিক ঋষি বা বেদের মহান জ্ঞান থেকে পাওয়া যাবে, যা আমরা অন্য কোনো গ্রন্থে বিশদে ব্যাখ্যা করব। এখানে আমাদের বক্তব্য এই যে, বর্তমান বিজ্ঞান কোনো বলের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে, কিন্তু বৈদিক বিজ্ঞান বা দর্শন তারও পরবর্তী স্তরে গিয়ে বলে যে সেই বল কেন ঘটছে এবং তার মূল প্রেরক শক্তি কী। সেখানে আমরা প্রমাণ করব যে সমস্ত জড় বলের মূল প্রেরক শক্তি চেতন পরমাত্মা তত্ত্বের শক্তি। এখানে বর্তমান বিজ্ঞান না আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়, না ঈশ্বরতত্ত্বের মূল প্রেরক শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে। এই একগুঁয়েমি বিজ্ঞানীর পক্ষে যুক্তিযুক্ত নয়। তাকে হয় সমস্যার সমাধান করতে হবে, অথবা বৈদিক বিজ্ঞানীদের কাছে সমাধান জানতে হবে।

এখানে আমরা আলোচনা করছিলাম যে ব্রহ্মাণ্ডে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা মান্য মূলকণ অনাদি হতে পারে না, এবং তখন তাদের মধ্যে সংঘটিত কোনো ক্রিয়া বা গতি-ও অনাদি হতে পারে না। যদি কেউ বলে যে মূলকণ প্রাণাদি সূক্ষ্ম পদার্থ বা প্রকৃতি রূপ সূক্ষ্মতম পদার্থ থেকে গঠিত, তবুও সেই সূক্ষ্ম কারণ পদার্থে গতি অনাদি কেন হতে পারে না— এবং কেন এর জন্য চেতন ঈশ্বর তত্ত্বের প্রয়োজন?

এই বিষয়ে আমরা এভাবে চিন্তা করি—

এই সৃষ্টিতে যে কোনো গতি ও বল বিদ্যমান, তা পদার্থের সূক্ষ্মতম স্তর পর্যন্ত কার্যকর। পদার্থের অণুতে সংঘটিত কোনো ক্রিয়া বা বলের প্রভাব আয়ন পর্যন্ত পৌঁছায়। আয়নের মধ্যে সংঘটিত প্রতিটি গতি ও বলের প্রভাব বা সম্পর্ক ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন বা কোয়ার্ক ও গ্লুয়ন পর্যন্ত পৌঁছায়। আমাদের বিশ্বাস, বর্তমান বিজ্ঞানও এটিকে অস্বীকার করবে না। এই সূক্ষ্ম কণগুলির গঠন ও প্রকৃতি সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান অজ্ঞ, তাই এদের মধ্যে সংঘটিত গতি-ক্রিয়া-বল ইত্যাদির প্রভাবের বিস্তৃতি সম্পর্কেও সে অজ্ঞ। এই প্রভাব প্রাণ, মন ও বাক্ তত্ত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত, যা মূল প্রকৃতি ও ঈশ্বরে গিয়ে শেষ হয়। বাস্তবে ঈশ্বরতত্ত্বে কোনো ক্রিয়া হয় না এবং প্রকৃতিতে ক্রিয়া ঈশ্বরীয় প্রেরণায় ঘটে, কিন্তু তাতে প্রকৃতির মূল স্বরূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সমস্ত জ্ঞান বর্তমান বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয়।

গতি ও বলের এই ব্যাপ্তির পরে আমরা আরও ভাবতে পারি যে এই ব্রহ্মাণ্ডে যে প্রতিটি ক্রিয়া ঘটছে, তা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ঘটছে। সমগ্র সৃষ্টি আকস্মিক কোনো ঘটনার ফল নয়, বরং প্রতিটি বল বা ক্রিয়া সুসংগঠিত এবং বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ। মূলকণ, কোয়ান্টা প্রভৃতি সূক্ষ্ম পদার্থ কিংবা বৃহৎ বিশ্বসমূহ জড় হওয়ার কারণে তারা নিজে থেকে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ক্রিয়া করতে পারে না এবং নিজেদের কার্যকারণের উদ্দেশ্যও বুঝতে পারে না।

Stephen Hawking, যিনি তাঁর গ্রন্থ 'The Grand Design'-এ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অবৈজ্ঞানিক কুতর্কের মাধ্যমে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে শরীরে জীবাত্মার অস্তিত্বকেও অস্বীকার করতে চেয়েছেন। তিনি রোবট ও ভিনগ্রহী জীবের মধ্যে পার্থক্য করেন, কিন্তু ভিনগ্রহী জীবের মধ্যেও স্বাধীন ইচ্ছা ও বুদ্ধিযুক্ত আত্মাকে মানেন না। এই ধরনের একগুঁয়েমিই বর্তমান বিজ্ঞানকে ধ্বংসাত্মক ভোগবাদী পথে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি লিখেছেন—

"How can one tell if a being has free will? If one encounters an alien, how can one tell if it is just a robot or it has a mind of its own? The behaviour of a robot would be completely determined, unlike that of a being with free will. Thus one could in principle detect a robot as a being whose actions can be predicted. As we said in Chapter 2, this may be impossibly difficult if the being is large and complex. We cannot even solve exactly the equations for three or more particles interacting with each other. Since an alien the size of a human would contain about a thousand trillion trillion particles even if the alien were a robot, it would be impossible to solve the equations and predict what it would do. We would therefore have to say that any complex being has free will-not as a fundamental feature, but as an effective theory, an admission of our inability to do the calculations that would enable us to predict its actions." (The Grand Design- P. 178)

এখানে পাঠক চিন্তা করুন— যদি thousand trillion trillion কণই বুদ্ধি ও ইচ্ছার উৎপত্তির কারণ হতে পারে, তাহলে কি রোবটে এত কণ নেই? সেটিও তো একই মূলকণ দিয়ে গঠিত, যেগুলো দিয়ে আমাদের শরীর গঠিত। অণুস্তরে কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রায় পরমাণু স্তরে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই, আর মূলকণ স্তরে তো সম্পূর্ণ সমতা রয়েছে। তাহলে কেবল কণসংখ্যার ভিত্তিতে এই পার্থক্য মানা এবং জীবের আচরণকে অজ্ঞেয় বলে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? আজ একজন মানুষ বহু স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি করতে পারে, কিন্তু বহু রোবট একত্রে মিলেও কি মানুষের প্রেরণা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া একটি মানুষ তো দূরের কথা, নিজেরাই একটি রোবট তৈরি করতে পারে? এই অবৈজ্ঞানিক ও অহংকারপূর্ণ গ্রন্থে জন্ম, মৃত্যু, ইচ্ছা ইত্যাদি যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে হকিং মহাশয়কে একজন বিজ্ঞানীর পরিবর্তে একগুঁয়ে নাস্তিক দার্শনিক হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি পড়ে তাঁর প্রতি আমার যে সম্মান ছিল, তা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তাঁর প্রতিটি যুক্তির উত্তর সহজেই দেওয়া যায়, কিন্তু এই গ্রন্থে জীবাত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করা আবশ্যক নয়, তবুও এখানে আমরা সংক্ষেপে কিছু চিন্তা উপস্থাপন করছি।

রোবটে ইচ্ছা, জ্ঞান, প্রচেষ্টা, দ্বেষ, সুখ ও দুঃখ— এই কোনো গুণ থাকে না। এটি কোনো মানুষের দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত হয়। অন্যদিকে কোনো জীবিত প্রাণী অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং প্রত্যেক কর্ম সম্পাদনে স্বাধীন। আজ হকিং সাহেবের মতো যে সকল বিজ্ঞানী ইচ্ছা, জ্ঞান ইত্যাদি গুণযুক্ত আচরণের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করে জীবাত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করেন, তা বাস্তবে এইরূপ, যেমন কোনো ব্যক্তি কোনো মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারকের তৈরি করা খাদ্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আগুন, জল, ময়দা, চিনি, দুধ, ঘি, কড়াই, চামচ প্রভৃতির কাজ বর্ণনা করছে, খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্ন পরিবর্তনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে, কিন্তু প্রস্তুতকারকের কথাই বলছে না, বরং তার অস্তিত্বই অস্বীকার করছে। এই ধরনের কথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আসলে অবৈজ্ঞানিক ও একগুঁয়েমিপূর্ণ।

এই বিজ্ঞানীরা একইভাবে এই সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এর স্রষ্টা, নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী অসীম বুদ্ধি ও শক্তিসম্পন্ন চেতন পরমাত্মতত্ত্বকে উপেক্ষা করেনই না, বরং তার অস্তিত্ব অস্বীকার করতেও সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। আমরা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানীদের এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রশংসা করি। নিশ্চয়ই তারা মূল পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে গভীর গবেষণা করছেন এবং করা উচিত, কিন্তু এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় চেতন নিয়ন্ত্রক তত্ত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দেন। এই কারণেই বিজ্ঞান আজও মৌলিক পদার্থবিদ্যার বহু সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। এই কারণেই বিজ্ঞানের History of the time-এ গুরুতর ত্রুটি রয়েছে, শক্তি-দ্রব্য সংরক্ষণ ভঙ্গের সমস্যা রয়েছে, ‘কেন’ ও ‘কি’ ধরনের প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ার সমস্যা রয়েছে— প্রকৃতপক্ষে সর্বত্র সমস্যাই সমস্যা।

এই সমস্ত আলোচনার উদ্দেশ্য এই যে, সমগ্র জড় জগতে যে সকল বল ও গতি বিদ্যমান, তার পেছনে চেতন ঈশ্বরতত্ত্বেরই মৌলিক ভূমিকা রয়েছে; অপরদিকে জীবের দেহে আত্মার ভূমিকা থাকে। প্রতিটি গতির পেছনে কোনো না কোনো বলের ভূমিকা থাকে। কেবল বলের দ্বারা গতি আকস্মিক, উদ্দেশ্যহীন ও বিশৃঙ্খল হতো, কিন্তু সৃষ্টি সুসংগঠিত, বুদ্ধিগম্য ও উদ্দেশ্যমূলক— এই কারণে এতে বলের সাথে সচেতন প্রজ্ঞার ভূমিকাও অবশ্যই রয়েছে। বল ও বুদ্ধি অথবা ইচ্ছা, জ্ঞান ইত্যাদি কেবল চেতনের মধ্যেই সম্ভব। এই চেতন তত্ত্বই ঈশ্বর নামে পরিচিত। এই তত্ত্বের উপর চিন্তা করা বর্তমান বিজ্ঞানের সাধ্যের বিষয় নয়; এই কারণে বর্তমান বিজ্ঞানীদের উচিত পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শনশাস্ত্রেও গভীর চিন্তা করা, যেখানে ঈশ্বর, জীবরূপ সূক্ষ্মতম চেতন এবং প্রকৃতি, মন, প্রাণ প্রভৃতি সূক্ষ্ম জড় পদার্থের আলোচনা করা হয়— এতে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের বহু সমস্যার সমাধানে সহায়তা মিলবে।

মহর্ষি গৌতম কোনো তত্ত্বের (Theory) প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচটি অবয়ব নির্ধারণ করেছেন— "প্রতিজ্ঞাহেতূদাহরণোপনয়নিগমনান্যবয়বাঃ" (ন্যা.দ. ১.১.৩২)

অর্থাৎ এই পাঁচটি অবয়ব হলো—

(১) প্রতিজ্ঞা— গতি অনিত্য।
(২) হেতু— কারণ আমরা একে উৎপন্ন ও বিনষ্ট হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন জগতে জড় বস্তু বা চেতন প্রাণীদের দ্বারা বিভিন্ন গতির উৎপত্তি দেখা যায় এবং সেই গতির বিরামও চেতন দ্বারা ঘটে।
(৪) উপনয়— সেইরূপ অন্যান্য গতিও অনিত্য।
(৫) নিগমন— সমস্ত দৃশ্য ও অদৃশ্য গতি অনিত্য।

গতির অনিত্যতার প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে একইভাবে গতির পেছনে চেতন কর্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়—

(১) প্রতিজ্ঞা— গতি মূলত চেতনের শক্তি দ্বারা উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হয়।
(২) হেতু— আমরা জগতে বিভিন্ন গতিকে বিভিন্ন চেতন প্রাণীর দ্বারা উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন আমরা নিজেরাই নানা গতি সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করি।
(৪) উপনয়— সেইরূপ অন্যান্য গতি, যাদের কোনো প্রত্যক্ষ প্রেরক দেখা যায় না, সেগুলিও কোনো অদৃশ্য চেতন তত্ত্ব (ঈশ্বর ইত্যাদি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
(৫) নিগমন— সকল প্রকার গতিকে উৎপন্ন, প্রেরিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য কোনো না কোনো চেতন তত্ত্ব (ঈশ্বর বা জীব) অবশ্যই থাকে; অর্থাৎ চেতন ব্যতীত গতি উৎপন্ন ও পরিচালিত হতে পারে না।

একইভাবে বলের বিষয়েও বিবেচনা করা হয়—
প্রতিজ্ঞা— প্রত্যেক বলের পেছনে চেতন তত্ত্বের ভূমিকা আছে।
হেতু— কারণ আমরা চেতন প্রাণীদের মধ্যে বলের অস্তিত্ব দেখি।
উদাহরণ— যেমন আমরা দৈনন্দিন জীবনে নানা কাজে নিজের শক্তি ব্যবহার করি।
উপনয়— সেইরূপ সৃষ্টিতে যে বিভিন্ন বল দেখা যায়, সেগুলির পেছনেও কোনো অদৃশ্য চেতনের ভূমিকা রয়েছে।
নিগমন— প্রত্যেক বলের পেছনে কোনো না কোনো চেতন (ঈশ্বর বা জীব) থাকে অথবা সেই বল সেই চেতনেরই প্রকাশ। জড় পদার্থের নিজস্ব কোনো বল নেই।

এখন বুদ্ধিগম্য কার্যগুলিতে চেতন তত্ত্বের ভূমিকা—

(১) প্রতিজ্ঞা— প্রত্যেক বুদ্ধিগম্য, সুসংগঠিত রচনার পেছনে চেতন তত্ত্ব থাকে।
(২) হেতু— কারণ আমরা চেতন প্রাণীদের দ্বারা বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হতে দেখি।
(৩) উদাহরণ— যেমন আমরা নিজেদের বুদ্ধি দ্বারা বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করি।
(৪) উপনয়— সেইরূপ সৃষ্টির বিভিন্ন বুদ্ধিগম্য বিন্যাসের পেছনে ঈশ্বররূপ অদৃশ্য চেতনের ভূমিকা রয়েছে।
(৫) নিগমন— সমস্ত বুদ্ধিগম্য রচনা বা সমগ্র সৃষ্টির প্রতিটি ক্রিয়ার পেছনে চেতন তত্ত্বের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে।

এইভাবে গতি ও সংযোগজনিত পদার্থের অনাদি ও অনন্ত না হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গতি, বল ও বুদ্ধিসম্পন্ন রচনার পেছনে চেতন তত্ত্বের অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে জীবরূপ চেতনের ভূমিকা থাকে। এই কারণেই মহর্ষি বেদব্যাস বলেছেন— "সা চ প্রশাসনাত্" (ব্র. সূ. ১.৩.১১) অর্থাৎ এই সমগ্র সৃষ্টির বিভিন্ন ক্রিয়া সেই ব্রহ্মের নিয়ন্ত্রণেই সম্পন্ন হয়।

এইভাবে পাঠক বুঝতে পারবেন যে যে কোনো পদার্থ, যা সূক্ষ্ম কারণ পদার্থের সংযোগে তৈরি এবং যা অন্যের দ্বারা প্রেরিত গতি, বল, ক্রিয়া প্রভৃতি গুণে যুক্ত, তা অনাদি হতে পারে না; কিন্তু যে পদার্থ এমন সূক্ষ্ম অবস্থায় বিদ্যমান যার আর কোনো কারণ নেই, তা অনাদি হতে পারে। এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে মূল প্রকৃতিরূপ পদার্থ, যেখানে কোনো গতি ইত্যাদি গুণ নেই, সেটিই অনাদি। সেই অনাদি পদার্থ থেকেই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক, সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ ঈশ্বরতত্ত্ব সময়ে সময়ে এই সৃষ্টির রচনা করেন। কখনো সৃষ্টি, কখনো প্রলয় ঘটে। এই সৃষ্টি-প্রলয়ের চক্রের না কোনো শুরু আছে, না কোনো শেষ। কোনো সৃষ্টি অনাদি ও অনন্ত নয়, প্রলয়ও নয়— কিন্তু এদের চক্র অনাদি ও অনন্ত।

এইভাবে আমরা Big Bang Theory ও Eternal Universe— এই দুই মতের আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্টির রচয়িতা চেতন ঈশ্বরতত্ত্বের অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা করেছি। String Theory ও M-Theory উভয়ই Big Bang-কে মানে, তাই এদের ভিত্তিতে পৃথকভাবে ঈশ্বরতত্ত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ পাঠকদের উচিত নিজেদের জেদ, একগুঁয়েমি ও অহংকার ত্যাগ করে প্রকৃত বৈজ্ঞানিকতার পরিচয় দেওয়া।

Read More

Eternally Evolving Infinite Universe Theory

28 April 0

অনাদি বিকশিত অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড সিদ্ধান্ত (Eternally Evolving Infinite Universe Theory)

Eternally Evolving Infinite Universe Theory
ব্রহ্মাণ্ডের এই মডেল সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডকে অনাদি ও অনন্ত মনে করে। এই পক্ষের বিজ্ঞানীদের মত হল যে এই ব্রহ্মাণ্ড অনাদি এবং অনন্তকাল পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। যদিও বিভিন্ন গ্যালেক্সি এবং তাদের ভিতরে তারাদের সৃষ্টি ও বিনাশ নিরন্তর চলতে থাকবে, তথাপি এই ব্রহ্মাণ্ডের একসাথে সম্পূর্ণ বিনাশ কখনো হবে না। এর সাথে মিলযুক্ত ধারণাকে ১৬৪৮ সালে ইংল্যান্ডের তিনজন বিজ্ঞানী— হায়ল, বন্ডি এবং গোল্ড Quasi Steady State Theory নাম দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন, এমনটি ভারতীয় খগোলজ্ঞ ড. জয়ন্ত বিষ্ণু নারলীকর ‘বিজ্ঞান, মানব এবং ব্রহ্মাণ্ড’ নামক গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫০-এ লিখেছেন। বাস্তবে বিগ ব্যাং সিদ্ধান্তে বহু অনসুলঝে প্রশ্ন উঠার কারণে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এই মতের উৎপত্তি হয়েছে, এমনটি আমাদের মনে হয়। প্রো. আভাস মিত্র এই মতের প্রবল প্রস্তোতা। তিনি এই বিষয়ের উপর জগদ্বিখ্যাত কাজ করেছেন। এই বিষয়ক তাঁর বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ আমার কাছে বিদ্যমান, যা সময়ে সময়ে তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন। কথিত ব্ল্যাক হোলের স্থানে MECO নামক বিশাল লোকের কল্পনা এবং Big Bang থেকে শুরু হওয়া ব্রহ্মাণ্ডের স্থানে Eternal Universe-এর কল্পনা— তাঁর এই দুই কাজ বিশ্বচর্চিত ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রো. মিত্র MECO অর্থাৎ Magnetic Eternal Collapsing Objects-এ কোয়ার্ক, গ্লুয়ন এবং ইলেকট্রন-পজিট্রন প্লাজমা ও ব্যারিয়নসমূহের মিশ্রণ মানেন। তাঁর মতে MECO থেকে নিরন্তর এই সূক্ষ্ম পদার্থগুলির অন্তরিক্ষে প্রক্ষেপণ হতে থাকে, যার ফলে নানা লোক, গ্যালেক্সি ইত্যাদির নির্মাণ হতে থাকে। তিনি আমাকে পাঠানো একটি প্রবন্ধ A New Case for an Eternally Old Infinite Universe-এ এই বিষয়ে লিখেছেন—

"At the same time ECOs also accrete preexisting gas from the ISM (infinite static model). Thus a stellar mass ECO acts as the fundamental churning pot of cosmic matter."

এর দ্বারা স্পষ্ট যে তিনি MECO’s-কে এই ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণের জন্য মূল পদার্থের ভাণ্ডার মনে করেন। এই প্রবন্ধে তিনি এর বিস্তৃত প্রক্রিয়াকে পর্যায়ক্রমে প্রদর্শন করেছেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনাদি কাল থেকে চলে আসছে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত চলতে থাকবে।

সমীক্ষা— এই সৃষ্টি শূন্য থেকে আকস্মাৎ উৎপন্ন হয়নি, বরং সদাই বিদ্যমান সূক্ষ্ম পদার্থ থেকেই এর নির্মাণ হয়েছে এবং এর বিনাশ হয়ে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড সেই সূক্ষ্ম পদার্থেই রূপান্তরিত হয়ে যায়— এই সিদ্ধান্ত সত্য ও যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু এতে কিছু প্রশ্ন এইরূপ উপস্থিত হয়—

(১) কি গ্লুয়ন-কোয়ার্কস, ইলেকট্রন্স পজিট্রন্স প্লাজমা এবং বিভিন্ন ব্যারিয়ন্স তথা এদের দ্বারা নির্মিত MECOs অনাদি হতে পারে?
(২) কি এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কোনো চেতন কর্তার বিনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হতে পারে এবং হতে থাকবে?

এই প্রশ্নগুলির উপর আমরা ক্রমান্বয়ে চিন্তা করি—

(১) আমাদের মতে কোনো সংযোগজনিত পদার্থ অনাদি হতে পারে না। মহর্ষি দयानন্দ সরস্বতী ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের অষ্টম সমুল্লাসে যথার্থই লিখেছেন—

সংযোগজন্য পদার্থ অনাদি নয়


"বিনা কর্তা কোনো ক্রিয়া বা ক্রিয়াজনিত পদার্থ তৈরি হতে পারে না..... যা সংযোগে তৈরি হয়, তা সংযোগের পূর্বে থাকে না এবং বিয়োগের শেষে থাকে না....." (সত্যার্থ প্রকাশ পৃ.২১৮)। MECOs অথবা কোনো লোক বিভিন্ন কণ বা কোয়ান্টাজূ-এর সংঘাত থেকে তৈরি হওয়ার কারণে অনাদি হতে পারে না। যেগুলিকে বর্তমান বিজ্ঞান মূল কণ বলে মানে, সেই কোয়ার্ক, গ্লুয়ন, লেপ্টন, ব্যারিয়ন, ফোটন ইত্যাদির মধ্যে কোনো কণই গঠনহীন নয়। বর্তমান বিজ্ঞান এই কণ বা কোয়ান্টাজূ-এর গঠন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে এগুলিকেই মূল পদার্থ মানতে বাধ্য। আমরা এই বিষয়ে পরে পঞ্চমহাভূত প্রकरणে আলোকপাত করব। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, এই পদার্থগুলি নিজেরাই সূক্ষ্ম প্রাণ ও ছন্দ রশ্মির বিভিন্ন সংযোগে তৈরি হয়েছে, এই কারণে এদের মধ্যে কোনো কণ বা কোয়ান্টা অনাদি ও অবিনাশী হতে পারে না। প্রশ্ন হল, সংযোগজন্য পদার্থ অনাদি কেন হতে পারে না? এর কারণ এই যে, বিভিন্ন সূক্ষ্ম কারণভূত পদার্থ থেকে মিলিত হয়ে যখন কোনো কণ তৈরি হয়, তখন সেই কারণরূপ সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থের মধ্যে বিশেষ পরিস্থিতিজনিত উৎপন্ন বলের বন্ধন কাজ করে। যখন কোনো কারণে সেই পরিস্থিতি শেষ হয়ে যায়, তখন সেই বন্ধক বলও শেষ হয়ে যায়, ফলে কণ বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই সূক্ষ্ম কারণরূপ সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থে পরিণত হয়ে যায়, যেগুলি থেকে তার নির্মাণ হয়েছিল। তার পরে আবার যখন কখনো সেই পরিস্থিতি কারও দ্বারা উৎপন্ন করা হয়, তখন পুনরায় সেই সূক্ষ্ম কারণরূপ রশ্মি ইত্যাদি পদার্থ বন্ধক বলযুক্ত হয়ে বিভিন্ন কণ বা কোয়ান্টাজ্ উৎপন্ন করে।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে সংযোগজন্য বস্তুকে অনাদি কেন মানা যায় না? এর উত্তরে আমাদের মত হল যে সংযোগজন্য বস্তুর কারণরূপ সূক্ষ্ম পদার্থগুলি পরস্পর উপরিউক্ত বন্ধক বল দ্বারা আবদ্ধ থাকে। যদি এই বন্ধক বল না থাকে, তবে সংযোগই সম্ভব হবে না। এখন আমরা ভাবি যে দুই বা দুইয়ের অধিক পদার্থের মধ্যে বন্ধক আকর্ষণ বল কিভাবে উৎপন্ন হয়? যদিও আমরা এই বিষয়ে অন্য কোনো গ্রন্থে আলোচনা করব, তথাপি এখানে এতটুকু বলব যে দুই আকর্ষিত কণ ও তরঙ্গের মধ্যে অতি সূক্ষ্ম রশ্মি ইত্যাদি পদার্থের বিনিময় বা সঞ্চালন হয়। তার ফলে আকাশ তত্ত্ব প্রভাবিত হয়ে উভয় কণ বা তরঙ্গ পরস্পর আকৃষ্ট হয়ে আবদ্ধ হয়। বর্তমান বিজ্ঞানের বলের ধারণা অপূর্ণ ও অস্পষ্ট, তথাপি সে এটুকু মানে যে আকর্ষিত হওয়া দুই কণের মধ্যে সূক্ষ্ম ফিল্ড রশ্মি নিরন্তর নির্গত হয়, যার ফলে আকর্ষণজনিত বন্ধক বল উৎপন্ন হয়। যে ফিল্ড রশ্মিগুলি নির্গত হয়, সেগুলি সেই সূক্ষ্ম কণগুলির ভিতরে সর্বদা ভরা থাকে, নতুবা সেগুলি নির্গতই হতে পারত না। এখন ভাবা যাক, যখন প্রতিটি কণের ভিতরে এই রশ্মিগুলি ভরা থাকে, তখন সেগুলি কোনো না কোনো সময় ফাঁকাও হয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ তাতে অনন্ত রশ্মির ভাণ্ডার থাকতে পারে না। যখন সেই ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে, তখন সেই কণও বিনাশ প্রাপ্ত হয়ে সেই কারণভূত রশ্মিতে পরিণত হবে। এই কারণেই কোনো সূক্ষ্মতম কণ অনাদি/অজন্মা ও অনন্ত/অবিনাশী হতে পারে না— এই আমাদের দৃঢ় মত। যদি কেউ বলে যে আকর্ষিত কণগুলির মধ্যে ফিল্ড রশ্মির বিনিময় হয়, ফলে সেই রশ্মিগুলি একটি চক্রের মতো উভয় কণের মধ্যে ঘুরতে থাকে এবং তাই তা কখনো শেষ হয় না। এই বিষয়ে আমাদের মত হল যে চক্রাকারে ঘুরতে থাকা রশ্মিগুলি উভয় কণে সমান নয়, বরং পৃথক-পৃথক হয়; এর সাথে সেই রশ্মিগুলির অতি সূক্ষ্ম অংশ আকাশ তত্ত্বে নিঃসৃত হতে থাকে, এই কারণে প্রতিটি সংযোগজন্য পদার্থ অর্থাৎ কণ, কোয়ান্টা ইত্যাদির আয়ু অনন্ত নয়। বর্তমান বিজ্ঞান ইলেকট্রন ও ফোটন ইত্যাদির আয়ু অনন্ত বলে মানে, তা সঠিক নয়। এই ভ্রান্তি এই কারণে উৎপন্ন হয়েছে যে বিজ্ঞান ফোটনের গঠন ও উৎপত্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সামান্যতমও জ্ঞান রাখে না। যদিও বর্তমানে কিছু বিজ্ঞানী ইলেকট্রনকে Cloud of tiny particles বলে মানেন, কিন্তু এই বিষয়েও এখনো অপূর্ণ ও অস্পষ্ট জ্ঞানই রয়েছে। যেদিন বর্তমান বিজ্ঞান কণ, কোয়ান্টাজ্ এবং তাদের মধ্যে কার্যরত বলগুলির প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারবে, তখন তারা আমাদের এই মতের সাথে একমত হতে পারবে যে কোনো কণ বা কোয়ান্টা না অনাদি অজন্মা হতে পারে, না অবিনাশী/অনন্ত। হ্যাঁ, যে পদার্থের কোনো অভ্যন্তরীণ গঠন নেই, সেই পদার্থ অনাদি ও অনন্ত হতে পারে। সেই পদার্থ থেকেই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড একটি নির্দিষ্ট সময়ে সৃষ্টি হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিনষ্ট হয়ে মূল কারণ পদার্থে পরিণত তাও হয়ে যায়। মূল পদার্থ অনাদি ও অনন্ত, কিন্তু এই ব্রহ্মাণ্ড না অনাদি, না অনন্ত; তবে নির্মাণ ও বিনাশের প্রবাহচক্র অনাদি ও অনন্ত। মূল কণ ও কোয়ান্টাজ্জূ-কে অনাদি ও অনন্ত মানা ছাড়া প্রো. মিত্রা সাহেবের অন্যান্য রচনাক্রমের উপর আমাদের বিশেষ আপত্তি নেই। তবে এটুকু অবশ্যই যে তাঁর এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে অপূর্ণ। বর্তমানে কিছু আধুনিক ভৌত বিজ্ঞানীরাও মূলকণ বলে মানা কণগুলিকে মূলকণ হিসেবে মানতে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন। জার্মানির বিজ্ঞানী Walter Greiner এবং Andereas Schofer-এর বক্তব্য—

"The nonexistence of the decays n pte and ny+y also indicates the presence of a new quantum number. The proton and neutron are given a baryonic charge B = 1 and the electron B = 0 Similarly the electron is assigned leptonic charge L = 1 the nucleons L = 0 From the principle of simplicity it appears very unsatisfactory to regard all observed particles as elementary. (Quantum-chromodynamics-P. 1)"

এর দ্বারা স্পষ্ট যে বর্তমান বিজ্ঞানীরা শুধু প্রোটন ও নিউট্রন নয়, বরং ইলেকট্রন, মিউঅন, নিউট্রিনো প্রভৃতি কণকেও মূল পদার্থ হিসেবে মানতে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন। এই মতই আমরা উপরে ব্যক্ত করেছি। এ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা বৈদিক সৃষ্টির উৎপত্তি প্রক্রিয়া প্রকরণে করব।

(২) এই রচনাক্রম ও প্রক্রিয়ায় চেতন কর্তার অপরিহার্যতার আলোচনা আমরা 'ঈশ্বর অস্তিত্ব ও স্বরূপের বৈজ্ঞানিকতা' নামক অধ্যায়ে করব।

String Theory
এই বিষয়ে John Gribbin লিখেছেন—
"Any of a class of theories in physics that describe the fundamental particles and their interactions in terms of tiny one dimensional entities- strings. These strings from loops which are much smaller then particles such as protons, but the important point is that they are not mathematical points- even the electrons previously regarded as a point like entity, can be described in terms of string." (Q is for Quantum- particle physics from A to Z, P. 379)

তিনি পুনরায় একই গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৩৮৩-এ লিখেছেন—
"The central idea of all subsequent string theories is that the conventional picture of fundamental particles (leptons and quarks) as points with no extension in any direction is replaced by the idea of particles as objects which have extension in one dimension like a line drawn on a piece of paper or the thinnest of strings. The extension is very small about 10-35m. It would take 1020 such strings, laid end to end, to stretch across the diameter of a proton."

এই দুই বক্তব্য থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই সৃষ্টির যে কণগুলি মূল কণ হিসেবে মানা হয়, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে সূক্ষ্ম strings-এর ঘনীভূত রূপ। এদের প্রত্যেকটি string শূন্য পুরুত্বের এবং 10-35 m. দৈর্ঘ্যের হয়।

বাস্তবে এই থিওরি সৃষ্টির উৎপত্তির কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদর্শন করে না, বরং এটি বিভিন্ন কণ, কোয়ান্টাজূ এবং তাদের মধ্যে কার্যরত বিভিন্ন প্রকারের বলের উৎকৃষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে, এমনটাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই থিওরিটিও Big Bang মডেলকেই নিজের উপায়ে ব্যাখ্যা করে। এই বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বলেন—

"In the theory of inflation, the rapid initial expansion of the universe is caused by a hypothetical particle called the inflaton. the exact properties of this particle are not fixed by the theory but should ultimately be derived from a more fundamental theory such as string theory. Indeed there have been a number of attempts to identify an inflation within the spectrum of particles described by string theory and to study inflation using string theory. While these approaches might eventually find support in observational data such as measurement of the cosmic microwave background, the application of string theory to cosmology is still in its early stages." (String theory- Cosmology- from Wikipedia-Becker, Becker and Schwarz 2007, P.533, 539-43)

এর দ্বারা স্পষ্ট হয় যে বিজ্ঞানীরা string theory দ্বারা Big Bang Theory-ই ব্যাখ্যা করেন। এতে ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ, cosmic background radiation ইত্যাদি সব কিছুর ব্যাখ্যা করা হয়। এই কারণে এই থিওরি সৃষ্টির উৎপত্তি বিষয়ে কোনো নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করে না, বরং বিগ ব্যাং-এরই সমর্থন করে। এই কারণে এর সৃষ্টির উৎপত্তি ও সৃষ্টির মূল উপাদান কারণ বিষয়ে সমীক্ষা তখন অনাবশ্যক, যখন আমরা বিগ ব্যাং, ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ ইত্যাদির সমীক্ষা ইতিমধ্যেই করে ফেলেছি। যেখানে পর্যন্ত বিভিন্ন কথিত মূলকণকে একটি string-এর ন্যায় মানার প্রশ্ন, এটি আমাদের কাছে প্রচলিত point particle-এর তুলনায় কিছুটা বেশি উপযুক্ত বলে মনে হয়। এই strings কিভাবে এবং কোথায় উৎপন্ন হয়, তা সবই অন্ধকারে। যদিও এটিও একটি সত্য যে string theory-কে বর্তমানে বহু বিজ্ঞানী গ্রহণ করতে পারছেন না। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী Lee Smolin তিনজন বিজ্ঞানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন—

(1) "Gerard't Huf a noble prize winner for his work in elementary physics has characterized the state of string theory this way! 'Actually, I would not even be prepared to call string theory a 'theory' rather a 'model' or not even that: just a hunch" (The trouble with physics: Introduction P. XV)

(2) David Gross, a noble laureate for his work on the standard model, has since become one of the most aggressive and formidable champions of string theory-says- "we don't know what we are taking about?" (id. P-XV)

(3) Brian Greene (String theorist) নিজের latest book 'The Fabric of the Cosmos'-এ লিখেছেন—
"Even today, more than three decades after its initial articulation, more string practitioners believe we still don't have a comprehensive answer to the rudimentary question, what is string theory? (id. P. XV)

এই তিন বিজ্ঞানীর বক্তব্য থেকে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে আসে যে বর্তমান বিজ্ঞানীরা string theory সম্পর্কে হতাশা ও সন্দেহের অবস্থায় আছেন। গ্রন্থের লেখক Lee Smolin-ও তাঁর উক্ত গ্রন্থের Introduction-এ লিখেছেন যে গত ত্রিশ বছরে বিজ্ঞান string theory ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করতে পারেনি।

আমার string theory নিয়ে আলোচনা গত কয়েক বছর ধরে বহু ভারতীয় বিজ্ঞানীর সাথে হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে তাদের প্রায় অজ্ঞতা, অনাগ্রহ বা সন্দেহই দেখা গেছে; তবে আমি বহু বছর ধরে এটিকে গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখে আসছি। ২০১২ সালে ভারতীয় বিজ্ঞানী প্রো. অশোক সেন string theory ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরের Fundamental Physics পুরস্কার পান, যা আমার string theory সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তি দিয়েছে। যদিও আমি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হওয়া নানা গবেষণা ও তাতে প্রাপ্ত নোবেল ইত্যাদি পুরস্কার দ্বারা সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত না হয়েই আমার কাজ করে যাই। নোবেল পুরস্কার তো বিগ ব্যাং থিওরির ক্ষেত্রেও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক কখনো বিগ ব্যাং থিওরিকে গ্রহণ করেনি। এর বিপরীতে string theory-র কিছু বিষয় আমি কখনো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করিনি। যতক্ষণ না এই থিওরি স্পষ্ট ও বিস্তৃত রূপে প্রকাশিত হয়, ততক্ষণ এ বিষয়ে বিশেষ সমীক্ষা করা উপযুক্ত নয়। যদি এই থিওরি আধুনিক বিজ্ঞানের বহু রহস্য সমাধানের দাবি করে, তবে তাকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে এটুকু অবশ্যই যে এই থিওরির যৌক্তিক সমালোচনা করা উচিত। বর্তমানে এতটুকু ভাবা উচিত যে যে strings থেকে elementary particles-এর নির্মাণ ধরা হয়, সেই strings-এর সৃষ্টি কখন ও কিভাবে হয়? এদের দৈর্ঘ্য প্লাঙ্ক দূরত্বের সমান ধরা হয়, তাহলে কি এদের কম্পন এই দৈর্ঘ্যের কম দূরত্বে ঘটে? কি string-এর শক্তি h-এর থেকেও কম হয়? আমাদের মতে তাই হওয়া উচিত। এদের শক্তি কোথা থেকে এবং কে প্রদান করে, যার ফলে এরা বিভিন্ন মূলকণ, ফোটন ও space-এর নির্মাণে সক্ষম হয়।

বাস্তবে string ও point—এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা অধিক বৈজ্ঞানিক। এই বিষয়ে আমরা মূলকণগুলির উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে একটি পৃথক গ্রন্থে আলোচনা করব। তবে বিজ্ঞ পাঠক এই গ্রন্থেও তা জানতে পারবেন।

এইভাবে সৃষ্টির উৎপত্তি সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান মূলত দুইটি তত্ত্বই মানে, যার বিস্তারিত সমীক্ষা আমরা ইতিমধ্যেই করেছি। M-Theory-ও Big Bang-এরই একটি অংশ। এই theory, theory of everything অর্থাৎ unified theory হওয়ার দাবি করলেও এটি নিজেই কেবল কল্পনা মাত্র। Unified theory অর্থাৎ Theory of Everything কেবল বৈদিক বিজ্ঞানের কাছেই আছে, যার আলোচনা পরে করা হবে। সুশিক্ষিত পাঠক এর দ্বারা বুঝতে পারবেন যে সৃষ্টির উৎপত্তির প্রাথমিক অবস্থার বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান এখনো অন্ধকারে রয়েছে। তবে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে বর্তমান বিজ্ঞান বিশদভাবে ভালো আলোকপাত করে, যার আলোচনা এখানে করা আমরা অপ্রাসঙ্গিক মনে করি। তথাপি আমরা এটুকু অবশ্যই বলতে চাই যে সম্পূর্ণ বর্তমান বিজ্ঞানে এখনও বহু গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। সেইসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করব এবং তাদের সমাধান বৈদিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে করার চেষ্টা করব। ইতি।

Read More

20 April, 2026

রামায়ণ সন্দর্শিকা

20 April 0

রামায়ণ সন্দর্শিকা
সমগ্র বিশ্বে নিম্নলিখিত ৩টি গ্রন্থ সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ— (১) বেদ (২) রামায়ণ (৩) মহাভারত। এই তিনটি গ্রন্থের প্রভাব কেবল ভারতবর্ষেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সাহিত্যে সর্বাধিকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বেদের শব্দ (পদ) বিশ্বের সকল ভাষায় তৎসম বা তদ্ভব রূপে পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে যেসব স্থান (ভৌগোলিক অঞ্চল)-এর নাম ও উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি আজও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলির নাম আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে রাখা হয়েছিল এবং সেই নামগুলি- রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, হনুমান, দশরথ, সীতা, কৌশল্যা, সুমিত্রা, অনুসূয়া, তারা প্রভৃতি আজও সহস্রাব্দ ধরে রাখা হয়ে আসছে। একইভাবে, রামায়ণে যাদের নিন্দিত চরিত্র ছিল, সেই রাবণ, কুম্ভকর্ণ, কৈকেয়ী, মন্ত্রা এবং শূর্পণখার নাম আজও ভারতীয় সমাজে রাখা হয় না। ওয়াশিংটনস্থিত ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক শ্রী তুফাইল আহমদ ভারতীয়দের আত্মপরিচয় ও সত্তাকে রামায়ণের আদর্শ ও বার্তায় প্রত্যক্ষ করেন। রামায়ণের কাহিনি শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ সকলেই কেবল শিক্ষা লাভ করেন না, বরং শিক্ষার পাশাপাশি আনন্দও পান। বিশ্বকবির ভাষায় ‘যদি কবি বাল্মীকি মানুষের চরিত্রের বর্ণনা না করে দেব-চরিত্রের বর্ণনা করতেন, তবে অবশ্যই রামায়ণের গৌরব কমে যেত.....। রামের মানুষ হওয়ার কারণেই রামচরিতের এত মহিমা। রামায়ণে দেবতা পদচ্যুত হয়ে নিজেকে মানুষ করেননি, মানুষই নিজের গুণের কারণে দেবতা হয়ে উঠেছে।’

সংস্কৃত ভাষায় রচিত অধিকাংশ প্রাচীন সাহিত্যে ⚠️প্রক্ষেপ (অন্তর্বর্তী সংযোজন) হয়েছে। বৈদিক সংহিতাগুলি ব্যতীত রামায়ণ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতি-র মতো প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলি (যেগুলি সহস্রাব্দ ধরে বিদ্বজ্জন থেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠহার হয়ে আছে) তাও এ থেকে রক্ষা পায়নি। বেদ-মন্ত্রগুলির অষ্ট বিকৃতপাঠের কারণে, বিশেষত ক্রমপাঠ এবং ঘনপাঠের জটিলতা বৈদিক সংহিতার পাঠকে বিকৃত হওয়া এবং প্রক্ষেপের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলেছে। এর অতিরিক্ত বৈদিক বাঙ্ময়ে অনুক্রমণীকাররা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্যভাবে ঋষি, দেবতা, ছন্দ, বর্ণ, মাত্রা এবং স্বর পর্যন্ত গণনা করে রেখেছেন, যার ফলে মন্ত্রসংহিতায় প্রক্ষেপ করার সাহস কেউ করতে পারেনি। কিছু ব্রাহ্মণগ্রন্থ স্বরাঙ্কিত হওয়া সত্ত্বেও পশুমাংসলোলুপ কর্মকাণ্ডীরা পরবর্তী ব্রাহ্মণগ্রন্থ এবং কল্পসূত্র সাহিত্যেও প্রক্ষেপ করতে কোনও কসুর রাখেনি। পুনরায় পূর্বাপর ক্রমের প্রতি দৃষ্টি রাখলে এই প্রক্ষেপস্থলগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়।
‘রামায়ণ’ থেকে শুরু করে ভক্তিকালীন ‘রামচরিতমানস’ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রক্ষেপের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। রামচরিতমানস-এর সম্পূর্ণ ‘লবকুশকাণ্ড’ প্রক্ষিপ্ত। একইভাবে বাল্মীকীয় 📚রামায়ণের সম্পূর্ণ উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত। কারণ, যে কোনও গ্রন্থ ‘ফলশ্রুতি’ পর্যন্তই সমাপ্ত বলে গণ্য হয়। ‘রামায়ণ’-এ এই ফলশ্রুতি যুদ্ধকাণ্ডের ১২৮তম সর্গের ১০৭তম শ্লোক থেকে শুরু হয়ে ১২৫তম শ্লোক পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অতিরিক্ত উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও শক্তিশালী কারণ রয়েছে। উত্তরকাণ্ডের দ্বিতীয় সর্গ থেকে ৩৪তম সর্গ পর্যন্ত রাবণ এবং রাক্ষসদেরই বর্ণনা আছে, যার রামকথার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। উত্তরকাণ্ডের রচনাশৈলী কাব্যশৈলী না হয়ে পুরাণশৈলী। বাল্মীকি স্থান-স্থানান্তরে প্রকৃতি, পর্বত, বন, ঋতু এবং পশুপাখির বর্ণনাও করেছেন, যা উত্তরকাণ্ডে সামান্যও নেই। বাল্মীকি-র উপমাগুলি আনন্দদায়ক ও প্রাসঙ্গিক, যার উত্তরকাণ্ডে সম্পূর্ণ অভাব। রামায়ণে আগত চরিত্রগুলির জন্মাদি সংক্রান্ত অন্তর্কথার বিস্তার বিভিন্ন পুরাণে পাওয়া যায়, যা রামায়ণের কথকরা পুরাণ থেকে নিয়ে এখানে সংযোজন করেছেন। এই অন্তর্কথাগুলির পূর্ণ বিশ্লেষণ রামকথার উৎপত্তি ও বিকাশের সম্পূর্ণ যাত্রাপথের গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত Father Kamil Bulke করেছেন। সচেতন পাঠকবর্গ এই বিষয়ের বিস্তৃত তথ্য বুলকের প্রসিদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ ‘রামকথা : উৎপত্তি এবং বিকাশ’ (প্রকাশক— হিন্দি পরিষদ, হিন্দি বিভাগ, প্রয়াগ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ, ষষ্ঠ সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে পেতে পারেন।
বাল্মীকীয় রামায়ণের গবেষকদের🧠 সিদ্ধান্ত হলো যে বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড নিঃসন্দেহে প্রক্ষিপ্ত। এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী কাণ্ডগুলিতেও বহু স্থানে পরবর্তী কথকরা প্রক্ষিপ্ত অংশ সংযোজন করেছেন। কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি প্রকৃত অবস্থা জানলেও পৌরাণিক বিশ্বাসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে এ বিষয়ে লেখা বা বলা থেকে বিরত থাকেন। শম্বূক প্রসঙ্গ, যযাতি–শুক্রাচার্য, লবণাসুর এবং ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যুকে শূদ্রের তপস্যার সঙ্গে যুক্ত করার মতো অধিকাংশ বিষয়ের রামায়ণের সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। সীতার নির্বাসনও পরবর্তীকালে সংযোজিত অংশ। প্রক্ষিপ্ত অংশগুলি চিহ্নিত করার জন্য গবেষণামূলক🔎 দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। এর বহু মানদণ্ড আছে— মূল কাহিনির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা, অলৌকিকতার প্রদর্শন, অযৌক্তিক বক্তব্য এবং অমানবিক প্রবৃত্তির আধিক্য ইত্যাদি। প্রক্ষেপের ধারার প্রধান ভিত্তি হলো রামকে ঈশ্বরীয় পরব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, অবতারবাদ, উপকাহিনি, ভিন্ন প্রসঙ্গ, অতিশয়োক্তি এবং পুনরুক্তি; অথচ রামায়ণের মূল স্বর মানবত্ব, দেবত্ব নয়। বাল্মীকি বহু মানবগুণে সমৃদ্ধ এক পুরুষ সম্পর্কে জানতে চান—

জ্ঞাতুমেবংবিধং নরম্।

নারদ তাঁকে সেইরূপ পুরুষের কথাই বলেন—

তৈর্যুক্তঃ শ্রূয়তাং নরঃ (বালকাণ্ড ১/৭)।

এভাবেই সীতা নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—

নারীণামুত্তমা বধূঃ (১/২৭)।

রাবণের মৃত্যু ও সীতার মুক্তির পর রামও এই মানবীয় দিকটিকেই গুরুত্ব দেন—

দৈবসম্পাদিতো দোষো মানুষেণ ময়া জিতঃ (যুদ্ধকাণ্ড ১১৫/৫)।

অর্থাৎ রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল, সেই দোষ দৈববশত সংঘটিত ছিল; আমি মানুষ হয়ে তা দূর করেছি।রামায়ণের মূল স্বর বা মূল পাঠের দিকে বিদ্বান চিন্তাবিদদের দৃষ্টি পূর্বেও আকৃষ্ট হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে বহু পণ্ডিত তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। মহামহোপাধ্যায় Swami Bhagavadacharya বাল্মীকী রামায়ণের উপর তাঁর গবেষণাপূর্ণ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সীতার অগ্নিপরীক্ষার সময় রামের মুখ দিয়ে যে কঠোর বাক্য বলানো হয়েছে, তা বাল্মীকির চরিত্র-আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনও নারী-নিন্দক ব্যক্তি রাম ও সীতার চরিত্রকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে রামায়ণের মূল পাঠে এই নিকৃষ্ট প্রসঙ্গ সংযোজন করেছে। অগ্নিপরীক্ষার রাম-সীতা-সংলাপ বাল্মীকির “চারিত্র্যেণ চ কো যুক্তঃ” তত্ত্বদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে বাল্মীকি যেন তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত বলে মনে হয়। তিনি যে রামকে খুঁজছিলেন—

জিতক্রোধো দ্যুতিমান্ কোऽনসূয়কঃ

অর্থাৎ ‘যিনি ক্রোধজয়ী, উজ্জ্বলচিত্ত এবং অনিন্দক’— সেই রাম কি করে তাঁর সতী-সাধ্বী পত্নীকে এভাবে অপমান করতে পারেন! ভগবদাচার্যজি একে বাল্মীকির বাক্য বলে মানেন না। তাই তিনি তাঁর সংশোধিত বাল্মীকীয় রামায়ণ থেকে অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গ সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়েছেন। Tulsidas-ও তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ মায়াময় সীতারই অগ্নিপরীক্ষা করিয়েছেন; প্রকৃত সীতা পূর্বেই অগ্নিতে গোপনবাসে চলে গিয়েছিলেন। ‘মানস’-এর ‘অরণ্যকাণ্ড’-এ তুলসীর রাম সীতাকে বলেন—

সুনহু প্রিয়া ব্রত রুচির সুসীলা, ম্যাঁ কছু করবি ললিত নর লীলা।
তুম্হ পাৱক মহুঁ করহু নিবাসা, জৌঁ লাগি করৌঁ নিশাচর নাসা।

অধ্যাত্ম রামায়ণে-ও সীতার ছায়ামূর্তিই অগ্নিতে প্রবেশ করেছিল। তামিলের মহাকবি কম্বনও তাঁর রামায়ণ মহাকাব্যে সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রসঙ্গকে বাল্মীকির দোষপরিহারের রূপেই প্রকাশ করেছেন। সীতার সতীত্বের উপর লাঞ্ছনায় তিনি বিচলিত হয়ে ওঠেন। সীতার ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র বর্ণনা যুদ্ধকাণ্ডের সর্গ ১১৪ থেকে ১২০ পর্যন্ত রয়েছে। এর প্রক্ষিপ্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—এই প্রসঙ্গে সীতার প্রতি রামের প্রেমে যে আকস্মিক পরিবর্তন দেখানো হয়েছে, তা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকও। (Bulke, Ramkatha-অনুচ্ছেদ ৫৬৫)। সীতাহরণের পর রামের বিরহের বর্ণনা বহু সর্গে পাওয়া যায়। যুদ্ধকাণ্ডের শুরুতেই রাম নিজেই বলেন যে আমার বিরহজনিত শোক দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে (সর্গ-৫ শ্লোক-৪২)। লঙ্কা অবরোধের পরেও সীতার জন্য রামের আকাঙ্ক্ষা—

জগাম মনসা সীতা দুযমানেন চেতসা (৪২/৭)

—এইরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। ইন্দ্রজিতের দ্বারা মায়া সীতার বধের সংবাদ শুনে রাম মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান—

তস্য তদ্বচনং শ্রুত্বা রাঘবঃ শোকমূর্ছিতঃ।
নিপপাত তদা ভূমৌ ছিন্নমূল ইব দ্রুমঃ ॥ (৮৩/১০)

এতে স্পষ্ট যে সীতার প্রতি রামের প্রেম অপরিবর্তিত ছিল। কিন্তু এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবণবধের পর আগত সীতাকে দেখে রামের মুখে এই কথা বলা—আমি শত্রুর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি, এখন তোমার প্রতি আমার কোনও আকর্ষণ নেই; লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব অথবা বিভীষণের মধ্যে কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারো; তোমার চরিত্র নিয়ে আমার সন্দেহ আছে—এই তথাকথিত বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে রাম সীতার সত্যবচনে, যা তার পতিব্রতা স্বভাব এবং রামের প্রতি একান্ত প্রেমের পরিচায়ক, বিশ্বাস করেননি। পূর্বে রাবণের বক্তব্যও স্পষ্ট, যেখানে সে সীতাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণের জন্য এক বছরের সময় দিয়েছিল, নচেৎ সে রাবণের পাকশালার উপাদান হয়ে যাবে (অরণ্যকাণ্ড, সর্গ-৫৫)। দশ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন সীতা রাবণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তখন রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলে—নির্ধারিত সময় পূর্ণ হতে আরও দুই মাস বাকি আছে; এর পরও যদি তুমি স্বেচ্ছায় আমার পত্নী না হও, তবে আমার রাঁধুনিরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে আমার প্রাতরাশের অংশ করে দেবে—

দ্বাভ্যামূর্ধ্বং তু মাসাভ্যাং ভর্ত্তারং মামনিচ্ছন্তীম্।
মম ত্বাং প্রাতরাশার্থে সূদাশ্ছেত্স্যন্তি খণ্ডশঃ ॥
(সুন্দর০, সর্গ-২২ শ্লোক-৯)

এতে স্পষ্ট যে রাবণ সীতার উপর জোরপূর্বক অত্যাচার করতে পারেনি। এই অবস্থায় সীতার চরিত্র নিয়ে রামের সন্দেহের কোনও সুযোগই নেই, এবং এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষারও কোনও প্রয়োজন নেই।

এই তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষার পর রামের এই উক্তি—আমার মনে তোমার প্রতি কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু জনসমাজের দৃষ্টিতে তোমার এই শুদ্ধিকরণ প্রয়োজন ছিল—বুলকের ভাষায়, এই ধরনের প্রদর্শন সমগ্র মূল বাল্মীকী রামায়ণের ভাবধারার বিরোধী। (বুলকে, অনুচ্ছেদ ৫৬৫)।

এই প্রকরণ (অগ্নিপরীক্ষা)-র প্রক্ষেপ অবতারবাদ স্বীকৃত হওয়ার পরেই সম্ভব হয়েছে। কারণ পরবর্তীতে বলা হয়েছে যে রামের প্রকৃত কোনও দুঃখ নেই, তিনি তো নরলীলা করছেন। রাম ও সীতা যথাক্রমে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর অবতার। ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতারা রামকে বিষ্ণু এবং সীতাকে লক্ষ্মীর অবতার জেনে তাঁদের স্তব করছেন। বাল্মীকী রামায়ণের এটিই একমাত্র স্থান যেখানে সীতা ও লক্ষ্মীর অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে (যুদ্ধকাণ্ড– ১১৭/২৭)।

এই প্রসঙ্গের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ আছে—

১. যুদ্ধকাণ্ডের ১২৪তম সর্গে ভরদ্বাজ তপোবলে রামকথা জেনে যে বর্ণনা করেন, তাতে এই প্রসঙ্গ নেই। একইভাবে ১২৬তম সর্গে হনুমান ভরতকে যে কাহিনি বলেন, তাতেও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ নেই।

২. বালকাণ্ডের সর্গ–১ এবং সর্গ–৩-এ রামকথার সংক্ষিপ্ত অনুক্রমণিকা দেওয়া হয়েছে। সর্গ–১-এর তালিকায় অগ্নিপরীক্ষা আছে, কিন্তু সর্গ–৩-এর তালিকায় নেই। Father Kamil Bulke-এর মতে, এই দুই অনুক্রমণিকার প্রামাণিক সংস্করণই অগ্নিপরীক্ষার বিষয়ে নীরব (বুলকে, Ramkatha, পৃ–৪২৫, সংস্করণ–২০০৪)।

৩. উত্তরকাণ্ডও অগ্নিপরীক্ষা সম্পর্কে কিছুই বলে না। ২ (দুই) স্থানে রাম সীতার নির্দোষতার প্রমাণের উল্লেখ করেন। প্রথমবার সীতা-ত্যাগের সময় তিনি কেবল দেবতাদের সাক্ষ্যের কথা বলেন। দ্বিতীয়বার তিনি বাল্মীকিকে বলেন যে লঙ্কা-নিবাসের পর আমি তখনই সীতাকে গ্রহণ করেছি, যখন তিনি তাঁর সতীত্বের শপথ নিয়েছিলেন—

প্রত্যয়শ্চ পুরা বৃত্তো বৈদেহ্যাঃ শপথশ্চ কৃতস্তত্র তেন বেষ্ম সুসন্নিধৌ। প্রবেশিতা ॥
(সর্গ-৯৭, শ্লোক-৩)

যদি এই সর্গের রচনাকালে অগ্নিপরীক্ষার ঘটনা প্রচলিত থাকত, তবে এখানে রামের দ্বারা সীতার সতীত্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের উল্লেখ অবশ্যই হত। অতএব মানতে হবে যে উত্তরকাণ্ডের প্রামাণিক কাহিনি লিপিবদ্ধ হওয়ার পরেই অগ্নিপরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রক্ষেপ যুদ্ধকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়েছে।

৪. মহাভারতের রামোপাখ্যান থেকেও এই সিদ্ধান্ত (অর্থাৎ সীতার অগ্নিপরীক্ষার প্রক্ষিপ্ততা) সমর্থিত হয়। রামায়ণের এই প্রাচীনতম সংক্ষিপ্ত রূপে কোথাও অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

3. অগ্নিপরীক্ষার পরবর্তী দুই সর্গ (১১৯–১২০)ও অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত। এতে শিব রামের স্তব করেন, স্বর্গ থেকে রাজা দশরথ উপস্থিত হন এবং ইন্দ্র রামের অনুরোধে মৃত বানর-সৈন্যদের পুনরুজ্জীবিত করেন।

রামকথার উৎস হিসেবে বাল্মীকীয় রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, কম্বন রামায়ণ এবং তুলসীদাসকৃত ‘রামচরিতমানস’ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। এর মধ্যে বাল্মীকী রামায়ণই সর্বপ্রাচীন। কিন্তু এতে কবি, কথক এবং বিভিন্ন মত-পন্থার সমর্থক-বিরোধীদের এত হস্তক্ষেপ ঘটেছে যে আজ তার কাহিনিতে আসল-নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

জার্মান ভারতেরবিদ্যা-বিশারদ Hermann Jacobi বাল্মীকী রামায়ণের উত্তরকাণ্ড ও বালকাণ্ডকে সম্পূর্ণ প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। তবে সমগ্র বালকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হতে পারে না, কারণ অযোধ্যার বর্ণনা, রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত ও নাগরিকদের বিবরণ, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্নের জন্ম, বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণের যজ্ঞরক্ষার্থে গমন, বল ও অতিবল শক্তির প্রাপ্তি, তাড়কা বধ, বিশ্বামিত্রের যজ্ঞরক্ষা, রামের বিবাহ এবং অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন—এই সমস্তই বালকাণ্ডে বর্ণিত। বালকাণ্ডে রামকথার মূল অংশ সর্গ ১–৮, ১৩, ১৪, ১৮–৩১, ৬৬–৭৩ এবং ৭৭—মোট ৩৩টি সর্গে সীমাবদ্ধ, অথচ এই কাণ্ডে মোট ৭০টি সর্গ আছে। অতএব বালকাণ্ডের অধিকাংশ অংশ (যা রামকথার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়) এবং সমগ্র উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত হওয়া প্রমাণিত হয়।

বাল্মীকী রামায়ণের বালকাণ্ডের প্রথম সর্গে প্রদত্ত বিষয়সূচীতেও উত্তরকাণ্ডের ঘটনাবলির উল্লেখ নেই। যুদ্ধকাণ্ডেই রামকথা সমাপ্ত করা হয়েছে। সীতা নির্বাসন উত্তরকাণ্ডের মূল কাহিনি। অধ্যাত্ম রামায়ণ, Tulsidas-রচিত ‘রামচরিতমানস’ এবং কম্বন-প্রণীত তামিল রামায়ণেও বাল্মীকীর অনুকরণে অযোধ্যায় রামের রাজ্যাভিষেক ও রামরাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই কাহিনির সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

সিয় নিন্দক অঘ ওঘ নসায়ে। লোক বিসোক বনাই বসায়ে ॥
(রামচরিত মানস, বালকাণ্ড)

তুলসীদাসকৃত এই চৌপাই থেকে সীতার বনবাসের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, লেখকের মতে এটি গোস্বামীজির রচনা নয়, বরং পরবর্তীকালের প্রক্ষেপ।

সীতার নির্বাসনকে প্রসিদ্ধ আধুনিক তামিল রামায়ণের রচয়িতা C. Rajagopalachari-ও বাল্মীকীর রামচরিত্রের আদর্শের সঙ্গে অসঙ্গত বলে মনে করেন। তাঁর ‘রামকথা দশরথ-নন্দন শ্রীরাম’-এ তিনি এই অংশ অন্তর্ভুক্ত করেননি এবং এটিকে প্রক্ষিপ্ত বলে স্বীকার করেছেন।

রামকথায় অতিশয়োক্তিপূর্ণ অমানবিক বর্ণনা কীভাবে বিস্তৃত হয়ে লোকমুখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা রাবণের ‘দশশীর্ষ’ (দশানন) এবং বিশটি বাহুর বর্ণনায় স্পষ্ট দেখা যায়। যদিও বাল্মীকী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের দশম সর্গের ৮টি শ্লোকে (১০/১৫–২২) রাবণের দুইটি বাহুরই বর্ণনা রয়েছে। পরবর্তীতে রাবণ ও সুগ্রীবের যুদ্ধে রাবণ দুই হাতে সুগ্রীবকে ধরে মাটিতে আছাড় মারেন—

বাহুভ্যামাক্ষিপত্তলে (যুদ্ধকাণ্ড, ৪০/১৩)

অতএব অনুমান করা যায়, মূল কাহিনিতে রাবণের দুই হাতই ছিল। ‘দশগ্রীব’ শব্দের প্রকৃত অর্থ না বুঝে পরবর্তী সংযোজকরা তাকে বিশ বাহুযুক্ত করে তুলেছেন। দশমস্তকের প্রসঙ্গে বুলকে লিখেছেন— “রাবণের দশটি মস্তক ছিল... এমন বর্ণনা যেমন পাওয়া যায়, তেমনই অনেক স্থানে তার একটিমাত্র মস্তকের উল্লেখও রয়েছে। ‘দশগ্রীব’ শব্দটি প্রথমে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল (অর্থাৎ যার গ্রীবা দশজন সাধারণ মানুষের সমান শক্তিশালী), পরে তা আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে।” (Ramkatha: Utpatti aur Vikas, পৃ. ৯৩, অনুচ্ছেদ ১১২, সংস্করণ ২০০৪)

এরপর Vasudev Sharan Agrawal-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বুলকে অথর্ববেদের একটি মন্ত্র উল্লেখ করেছেন—

ব্রাহ্মণো জজ্ঞে প্রথমো দশশীর্ষো দশাস্যঃ।

স সোমং প্রথমঃ পপৌ স চকারারসং বিষম্ ॥ (৪/৬/১)

এবং লিখেছেন— অথর্ববেদে এক ‘দশাস্য’ (দশমুখ) ও ‘দশশীর্ষ’ ব্রাহ্মণের উল্লেখ আছে, যা রাবণের রূপকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে—এটি অসম্ভব বলা যায় না।

বুলকের এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে Ram Vilas Sharma তাঁর ‘রামকথা এবং ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন— অথর্ববেদের এই মন্ত্রেও রূপক অর্থই নিহিত, যেমন সাতভালেকরের টীকায় বলা হয়েছে— “শীর্ষ শব্দ বুদ্ধির এবং আস্য শব্দ বক্তৃতার প্রতীক; দশগুণ বুদ্ধিমান ও দশগুণ বিদ্বান—এই তার অর্থ।” এই ধরনের রূপকের সূচনা ঋগ্বেদের—

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ (ঋগ্বেদ ১০/৯০/১)

—ইত্যাদি মন্ত্র থেকেই। কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যাতা এই রূপককে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে রাবণের এক মাথাকে দশটি এবং দুই হাতকে বিশটি করে তুলেছেন।

প্রক্ষেপসমূহের আলোচনা কেবল আধুনিক কালেই হয়েছে, এমন নয়। বেদান্ত দর্শনের দ্বৈতবাদ প্রবর্তক Madhvacharya (জন্ম—১১৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)-এর অপর নাম ‘আনন্দতীর্থ’। তিনি বেদান্তের উপর ‘পূর্ণপ্রজ্ঞ’ নামে ভাষ্য রচনা করেন। তাঁর আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘মহাভারত-তাত্পর্য-নির্ণয়’। এতে তিনি লিখেছেন—

ক্বচিদ্গ্রন্থান্ প্রক্ষিপন্তি ক্বচিদন্তরিতানপি।
কুর্যুঃ ক্বচিচ্চব্যত্যাসং প্রমাদাৎ ক্বচিদন্যথা ॥৩॥
অনুৎসন্না অপি গ্রন্থা ব্যাকুলা ইতি সর্বশঃ।
উৎসন্নাঃ প্রায়শঃ সর্বে কোট্যংশোপি ন বর্ততে ॥৪॥ (২/৩–৪)

এর অর্থ এই যে— “প্রক্ষেপকারীরা কেবল নতুন শ্লোক রচনা করে মূল গ্রন্থে সংযোজনই করেন না, বরং বহু মূল শ্লোক (পাঠ) অপসারণও করেন। কোথাও কোথাও মূল শ্লোকের কিছু অংশ পরিবর্তন করে তার স্থলে নিজেদের রচিত পাঠ সংযোজন করেন। এর ফলে প্রাচীন গ্রন্থকারদের রচনায় ব্যাপক বিকৃতি (উলটপালট বা বিপর্যয়) ঘটেছে।” এই কারণেই রামায়ণ ও মহাভারতের মূল কাহিনিতে অনৈতিহাসিক, প্রত্যক্ষ প্রমাণবিরোধী এবং সৃষ্টিক্রমবিরোধী অসম্ভব ঘটনার আধিক্য দেখা যায়, যার ফলে বহু বিদ্বান এই কাহিনিগুলিকে কবিকল্পিত বলে মনে করেন।

রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণ

১. পশ্চিমী সংস্করণ—নির্ণয় সাগর প্রেস (১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং Gujarati Printing Press (১৯১২–১৯২০) থেকে প্রকাশিত। এটি দাক্ষিণাত্য পাঠের প্রতিনিধিত্ব করে এবং অধিক প্রচলিত।

২. দাক্ষিণাত্য সংস্করণ—সম্পূর্ণ দাক্ষিণাত্য পাঠ, কুম্ভকোণম ও মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত।

৩. পূর্বোত্তরীয় (বঙ্গীয়) সংস্করণ—Gasper Gorresio (প্যারিস) সম্পাদিত; ‘গৌড়ীয় সংস্করণ’ নামেও পরিচিত; Calcutta Series থেকে প্রকাশিত।

৪. পশ্চিমোত্তরীয় সংস্করণ—D.A.V. College, Lahore থেকে পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত, পণ্ডিত রামলভায়া এবং পণ্ডিত বিশ্ববন্ধু শাস্ত্রী সম্পাদিত।

৫. আলোচনামূলক সংস্করণ (Critical Edition)—Baroda-এর Maharaja Sayajirao University-এর Oriental Institute-এর পণ্ডিতগণ প্রায় দুই সহস্র পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে ১৯৬০–১৯৭৫ সালের মধ্যে সাত কাণ্ডে প্রকাশ করেন।

প্রচলিত সংস্করণে ৭ কাণ্ড, ৬৪৫ সর্গ এবং ২৪,০৪৯ শ্লোক পাওয়া যায়; কিন্তু Baroda Critical Edition-এ ৭ কাণ্ড, ৬০৬ সর্গ এবং ১৮,৭৬৬ শ্লোক প্রকাশিত হয়েছে।

ঈসা-পরবর্তী তৃতীয় শতকের গ্রন্থ Abhidharma Mahāvibhāṣā-তে রামায়ণের উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘Ramayana’ নামক গ্রন্থে ১২,০০০ শ্লোক রয়েছে। এর অর্থ এই যে সেই সময়ে রামায়ণের আকার বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ছিল; অতএব ‘আদি রামায়ণ’-এ শ্লোকসংখ্যা আরও কম ছিল। ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে Śrīmad-Valmīkiya-Rāmāyaṇam (শোধিত) গ্রন্থের সম্পাদক Śrī Niranjanlal Mangal মূল শ্লোকসংখ্যা ৩৬০৭ নির্ধারণ করেছেন এবং সেই অনুযায়ী প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে যুদ্ধকাণ্ডই উত্তরকাণ্ড, পৃথক উত্তরকাণ্ড নেই। এই অনুযায়ী ৬ কাণ্ড, প্রতি কাণ্ডে ২৪ সর্গ এবং প্রতি সর্গে ২৪ শ্লোক।

রামায়ণের গবেষণামূলক উপস্থাপনার বহু প্রচেষ্টা পূর্বে হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশক ‘সংক্ষিপ্ত Ramayanam’ প্রকাশ করেছেন। Arya Samaj-এর ক্ষেত্রে Brahmachari Akhilanand প্রক্ষিপ্ত শ্লোকগুলি পৃথকভাবে চিহ্নিত করে প্রকাশ করেন। মহামহোপাধ্যায় আর্যমুনি-র ‘রামায়ণার্য ভাষ্য’, শ্রিপাদ দামোদর সাতভালেকর-এর টীকা, পণ্ডিত প্রেমচন্দ্র শাস্ত্রী সম্পাদিত সংস্করণ, স্বামী জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতীর প্রচেষ্টা, ঈশ্বরীপ্রসাদ প্রেম-এর ‘শুদ্ধ রামায়ণ’—এসব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্বামী ব্রহ্মমুনি-র ‘রামায়ণ দর্পণ’ এবং স্বামী জগদীশ্বরানন্দ-এর ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম’ গ্রন্থ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উপস্থাপিত ‘Ramayan Sandarshika’ গ্রন্থটি তরুণ পণ্ডিত যশপাল-এর গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার ফল। লেখক রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণার খণ্ডন করে যুক্তি ও প্রমাণসহ সঠিক সমাধান উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন সংস্করণ ও পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই নতুন গ্রন্থ নিঃসন্দেহে রামায়ণ বিষয়ক সাহিত্যে সমৃদ্ধি আনবে এবং রামায়ণপ্রেমী পাঠকদের আনন্দ প্রদান করবে।

বাল্মীকী রামায়ণে প্রক্ষেপ, বিকৃতি, ভ্রান্তি ও নানা সমস্যা বিদ্যমান। গ্রন্থকার শ্রী যশপাল কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপত্তিজনক প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ভ্রান্তিগুলিকে দূর করার একটি প্রশংসনীয় প্রচেষ্টা করেছেন। প্রক্ষেপ চিহ্নিত করার জন্য তিনি রামায়ণের পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন সংস্করণ, Critical Edition, পুরাণ এবং প্রাচীন টীকাকারদের পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ‘পারস্পরিক বিরোধ’-কে ভ্রান্তি-নিরসনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোথাও কোথাও বেদমন্ত্র, মনুস্মৃতি এবং Dayananda Saraswati ও পাশ্চাত্য লেখকদের মতামতের দ্বারা নিজের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।

✍️ সূত্র: 📕রামায়ণ সন্দর্শিকা
ডঃ জ্বলন্তকুমার শাস্ত্রী, বৈদিক বিদ্বান,
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সংস্কৃত বিভাগ,
রণবীর রণঞ্জয় স্নাতকোত্তর মহাবিদ্যালয়,
আমেঠি–২২৭৪০৫ (উত্তর প্রদেশ)
প্রাক্তন সম্পাদকঃ ‘বৈদিক পথ’ (মাসিক)।
Read More

13 April, 2026

The revenge of geography

13 April 0




























কপিরাইট © ২০১২ রবার্ট ডি. ক্যাপলান
মানচিত্রের কপিরাইট © ২০১২ ডেভিড লিন্ডরথ, ইনক।

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত র‍্যান্ডম হাউস দ্বারা, যা দ্য র‍্যান্ডম হাউস পাবলিশিং গ্রুপের একটি ইমপ্রিন্ট, র‍্যান্ডম হাউস, ইনক., নিউ ইয়র্ক-এর একটি বিভাগ।

র‍্যান্ডম হাউস এবং কোলফোন র‍্যান্ডম হাউস, ইনক.-এর নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক।

ভূমিকায় রবার্ট ডি. ক্যাপলানের পূর্ববর্তী চারটি গ্রন্থ থেকে উপাদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
Soldiers of God (নিউ ইয়র্ক: হটন মিফলিন হারকোর্ট পাবলিশিং কোম্পানি, ১৯৯০), An Empire Wilderness (নিউ ইয়র্ক: র‍্যান্ডম হাউস, ইনক., ১৯৯৮),
Eastward to Tartary (নিউ ইয়র্ক: র‍্যান্ডম হাউস, ইনক., ২০০০), এবং
Hog Pilots, Blue Water Grunts (নিউ ইয়র্ক: র‍্যান্ডম হাউস, ইনক., ২০০৭)।

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ক্যাটালগিং-ইন-পাবলিকেশন ডেটা
ক্যাপলান, রবার্ট ডি.
The Revenge of Geography: what the map tells us about coming conflicts and the battle against fate / রবার্ট ডি. ক্যাপলান।
পৃষ্ঠা সংখ্যা (p. cm.)
eISBN: ৯৭৮-০-৬৭৯-৬০৪৮৩-৯
১. রাজনৈতিক ভূগোল. I. শিরোনাম।
JC319.K335 ২০১২
৩২০.১’২—dc23 ২০১২০০০৬৫৫

www.atrandom.com

শিরোনাম-স্প্রেড চিত্র: © iStockphoto

জ্যাকেট নকশা: গ্রেগ মোল্লিকা

ফ্রন্ট-জ্যাকেটের চিত্রাবলি (উপরে থেকে নিচে): জেরার্ডাস মেরকেটর, দ্বি-গোলার্ধবিশিষ্ট বিশ্বমানচিত্র, ১৫৮৭ (ব্রিজম্যান আর্ট লাইব্রেরি); জোয়ান ব্লাউ, প্রাচীন থেসালির দৃশ্য, Atlas Maior থেকে, ১৬৬২ (ব্রিজম্যান আর্ট লাইব্রেরি); রবার্ট উইলকিনসন, “একটি নতুন ও সঠিক মানচিত্র

কিন্তু ঠিক এই কারণেই যে আমি মানব অবস্থার কাছ থেকে খুব কম প্রত্যাশা করি, মানুষের সুখের সময়কাল, তার আংশিক অগ্রগতি, আবার শুরু করার এবং এগিয়ে যাওয়ার তার প্রচেষ্টা—এসব আমার কাছে যেন বহু অলৌকিক ঘটনার মতো মনে হয়, যা প্রায় ভয়াবহ বিপর্যয় ও পরাজয়ের, উদাসীনতা ও ভুলের বিশাল স্তূপকে পুষিয়ে দেয়। বিপর্যয় ও ধ্বংস আসবেই; বিশৃঙ্খলা জয়ী হবে, তবে সময়ে সময়ে শৃঙ্খলাও জয়ী হবে।—মার্গারিত ইউরসেনার, Memoirs of Hadrian (১৯৫১)

বিষয়সূচি

কভার
শিরোনাম পৃষ্ঠা
কপিরাইট
উদ্ধৃতি
ভূমিকা: সীমান্তসমূহ

অংশ I
দূরদর্শীরা

অধ্যায় I: বসনিয়া থেকে বাগদাদ
অধ্যায় II: ভূগোলের প্রতিশোধ
অধ্যায় III: হেরোডোটাস এবং তাঁর উত্তরসূরিরা
অধ্যায় IV: ইউরেশীয় মানচিত্র
অধ্যায় V: নাৎসি বিকৃতি
অধ্যায় VI: রিমল্যান্ড তত্ত্ব
অধ্যায় VII: সমুদ্রশক্তির আকর্ষণ
অধ্যায় VIII: “স্থানের সংকট”

অংশ II
একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক মানচিত্র

অধ্যায় IX: ইউরোপীয় বিভাজনের ভূগোল
অধ্যায় X: রাশিয়া এবং স্বাধীন হার্টল্যান্ড
অধ্যায় XI: চীনা শক্তির ভূগোল
অধ্যায় XII: ভারতের ভৌগোলিক দ্বিধা
অধ্যায় XIII: ইরানীয় কেন্দ্রবিন্দু
অধ্যায় XIV: প্রাক্তন অটোমান সাম্রাজ্য

অংশ III
আমেরিকার নিয়তি

অধ্যায় XV: ব্রডেল, মেক্সিকো, এবং মহাকৌশল

সীমান্তসমূহ

বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার একটি ভালো উপায় হলো মাটির উপর থাকা, যতটা সম্ভব ধীরে ভ্রমণ করা।

উত্তর ইরাকের মরুভূমির মাটি থেকে ঢেউয়ের মতো উঠে আসা গম্বুজাকৃতি পাহাড়গুলোর প্রথম সারি যখন দিগন্তে দেখা দিল, যা ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দশ হাজার ফুট উঁচু পর্বতমালায় পরিণত হয়েছে, যেখানে ওক ও মাউন্টেন অ্যাশ গাছে আচ্ছাদিত, তখন আমার কুর্দি চালক বিশাল, পিঠার খোলের মতো সমতল ভূমির দিকে ফিরে তাকাল, অবজ্ঞাভরে জিহ্বা দিয়ে শব্দ করল, এবং বলল, “আরাবিস্তান।” তারপর পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে সে মৃদুস্বরে বলল, “কুর্দিস্তান,” এবং তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এটি ছিল ১৯৮৬ সাল, সাদ্দাম হোসেনের দমবন্ধ করা শাসনের চূড়ান্ত সময়, তবুও আমরা যখন কারাগারের মতো উপত্যকা এবং ভয়ঙ্কর খাদগুলোর মধ্যে আরও ভেতরে প্রবেশ করলাম, তখন সর্বত্র দেখা যাওয়া সাদ্দামের বিলবোর্ডের ছবি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। ইরাকি সৈন্যরাও তেমনই হারিয়ে গেল। তাদের জায়গায় এল কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধারা, কাঁধে গুলির বেল্ট, মাথায় পাগড়ি, ঢিলেঢালা পাজামা এবং কোমরে কুমারবন্দ পরা। রাজনৈতিক মানচিত্র অনুযায়ী, আমরা কখনোই ইরাক ছেড়ে যাইনি। কিন্তু পাহাড়গুলো সাদ্দামের শাসনের একটি সীমা নির্ধারণ করেছিল—একটি সীমা যা অতিক্রম করা হয়েছিল সবচেয়ে চরম পদক্ষেপের মাধ্যমে।

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে, এই পাহাড়গুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুর্দিদের যে স্বাধীনতা দিয়েছিল, তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাদ্দাম ইরাকি কুর্দিস্তানের উপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালান—কুখ্যাত আল-আনফাল অভিযান—যাতে আনুমানিক ১,০০,০০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। পাহাড়গুলো স্পষ্টতই চূড়ান্ত নির্ধারক ছিল না। কিন্তু তারা এই মর্মান্তিক নাটকের পটভূমি—প্রাথমিক বাস্তবতা—হিসেবে কাজ করেছিল। পাহাড়গুলোর কারণেই কুর্দিস্তান এখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্যত ইরাকি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

পাহাড় হলো একটি রক্ষণশীল শক্তি, যা প্রায়ই তাদের গিরিখাতের মধ্যে আদিবাসী সংস্কৃতিকে রক্ষা করে সমতলভূমিতে বারবার ছড়িয়ে পড়া আধুনিকায়নের তীব্র মতাদর্শ থেকে, যদিও আমাদের যুগে এগুলো মার্ক্সবাদী গেরিলা ও মাদক কার্টেলের আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করেছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট লিখেছেন যে “পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় পালিয়ে যাওয়া, পলাতক, স্বাধীন সম্প্রদায় হিসেবে, যারা দুই সহস্রাব্দ ধরে উপত্যকার রাষ্ট্র-গঠন প্রকল্পগুলোর নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসছে।” কারণ সমতলভূমিতেই নিকোলাই চাউশেস্কুর স্তালিনবাদী শাসন জনগণের উপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে একাধিকবার কারপাথিয়ান পর্বতমালা অতিক্রম করার সময় আমি সমবায়ীকরণের খুব কম চিহ্ন দেখেছি। মধ্য ইউরোপের পশ্চাদ্দ্বার হিসেবে পরিচিত এই পাহাড়গুলো কংক্রিট ও লোহার পরিবর্তে কাঠ ও প্রাকৃতিক পাথরের ঘরবাড়ির জন্য বেশি পরিচিত ছিল—যা ছিল রোমানিয়ান সাম্যবাদের প্রিয় উপাদান।

রোমানিয়াকে ঘিরে থাকা কারপাথিয়ান পর্বতমালা কুর্দিস্তানের পাহাড়গুলোর মতোই একটি সীমানা। পশ্চিম দিক থেকে, জরাজীর্ণ অথচ মহিমান্বিত হাঙ্গেরীয় পুস্তা অতিক্রম করে কারপাথিয়ানে প্রবেশ করার সময়—যেখানে কয়লার মতো কালো মাটি এবং লেবু-সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ ক্ষেত ছিল—আমি ধীরে ধীরে প্রাক্তন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের ইউরোপীয় জগৎ ছেড়ে অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র প্রাক্তন অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের অঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকি। চাউশেস্কুর প্রাচ্য স্বৈরশাসন, যা হাঙ্গেরির এলোমেলো ‘গুলাশ’ সাম্যবাদের তুলনায় অনেক বেশি দমনমূলক ছিল, শেষ পর্যন্ত কারপাথিয়ান পর্বতমালার প্রাচীরের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

তবুও কারপাথিয়ান ছিল না অপ্রবেশযোগ্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবসায়ীরা এর বিভিন্ন গিরিপথ ব্যবহার করে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, পণ্য ও উচ্চ সংস্কৃতি বহন করে নিয়ে গেছে, যাতে বুখারেস্ট ও রুসের মতো শহর ও নগরে মধ্য ইউরোপের একটি আবেগময় প্রতিচ্ছবি গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু পাহাড়গুলো এক অস্বীকারযোগ্য ধাপে ধাপে পরিবর্তন নির্দেশ করেছিল, পূর্বদিকে একের পর এক স্তরে, যা শেষ পর্যন্ত আরব ও কারা কুম মরুভূমিতে গিয়ে শেষ হয়।

১৯৯৯ সালে, আমি কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত আজারবাইজানের রাজধানী বাকু থেকে একটি মালবাহী জাহাজে করে পূর্ব তীরে তুর্কমেনিস্তানের ক্রাসনোভদস্কে রাতারাতি যাত্রা করি—যা তৃতীয় শতকে সাসানীয় পারস্যরা ‘তুর্কেস্তান’ বলে অভিহিত করেছিল। আমি জেগে উঠি এক শূন্য, বিমূর্ত উপকূলে: মৃত্যুর মতো মাটির রঙের খাড়ির বিপরীতে সাদা কুঁড়েঘর। ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমাদের সবাইকে এক সারিতে দাঁড়াতে বলা হয় একটি খসে পড়া গেটের সামনে, যেখানে একমাত্র পুলিশ আমাদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করছিল। এরপর আমরা একটি খালি, দমবন্ধ করা ঘরে প্রবেশ করি, যেখানে আরেকজন পুলিশ আমার পেপ্টো-বিসমল ট্যাবলেট দেখে আমাকে মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। সে আমার টর্চ নিয়ে ১.৫-ভোল্টের ব্যাটারিগুলো মাটিতে ফেলে দেয়। তার মুখভঙ্গি ছিল সেই ভূদৃশ্যের মতোই কঠোর ও অনিয়ন্ত্রিত। শেডের বাইরে যে শহরটি দেখা যাচ্ছিল তা ছিল ছায়াহীন ও হতাশাজনকভাবে সমতল, যেখানে কোনো দৃশ্যমান বস্তুগত সংস্কৃতির চিহ্ন ছিল না। হঠাৎ আমার বাকুর জন্য নস্টালজিয়া জাগে—তার দ্বাদশ শতকের পারস্য প্রাচীর এবং প্রথম তেল ব্যবসায়ীদের নির্মিত স্বপ্নময় প্রাসাদ, ফ্রিজ ও গার্গোয়েল দিয়ে সজ্জিত—যেখানে কারপাথিয়ান, কৃষ্ণ সাগর এবং উঁচু ককেশাস থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায়নি। পূর্বদিকে ভ্রমণ করতে করতে, ইউরোপ ধাপে ধাপে আমার চোখের সামনে বিলীন হয়ে যায়, এবং কাস্পিয়ান সাগরের প্রাকৃতিক সীমানা ছিল সেই শেষ ধাপ, যা কারা কুম মরুভূমির আগমনী বার্তা দেয়।

অবশ্যই, ভূগোল তুর্কমেনিস্তানের হতাশাজনক অবস্থাকে প্রমাণ করে না। বরং এটি কেবল ঐতিহাসিক ধারা অনুসন্ধানের প্রাথমিক জ্ঞান নির্দেশ করে: পার্থিয়ান, মঙ্গোল, পারসিক, জারশাসিত রুশ, সোভিয়েত এবং অসংখ্য তুর্কি গোষ্ঠীর পুনরাবৃত্ত আক্রমণ একটি উন্মুক্ত ও অরক্ষিত ভূদৃশ্যের উপর। এখানে সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল অতি সীমিত, কারণ কোনো সভ্যতাকেই স্থায়ীভাবে গভীর শিকড় গাঁথতে দেওয়া হয়নি, এবং এটি এই স্থানের প্রতি আমার প্রথম ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

পৃথিবী হঠাৎ উঁচু হয়ে উঠল, এবং যা কিছুক্ষণ আগে একক বালুকাপাথরের স্তূপ মনে হচ্ছিল, তা ভেঙে পড়ে নদীর শুকনো খাত ও ভাঁজের এক গোলকধাঁধায় পরিণত হলো, যেখানে ধূসর ও খয়েরি রঙের ছায়া প্রতিফলিত হচ্ছিল। প্রতিটি পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের আলো ভিন্ন কোণে পড়ে লাল বা গেরুয়া দাগ তৈরি করছিল। ঠান্ডা বাতাস বাসের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল—পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ারের গরম আবহাওয়ার পর আমার প্রথম পাহাড়ি শীতলতার স্বাদ। খাইবার পাসের পরিমাপ নিজে খুব চিত্তাকর্ষক নয়—এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সাত হাজার ফুটেরও কম এবং ঢালও খুব খাড়া নয়। তবুও, ১৯৮৭ সালে এক ঘণ্টারও কম সময়ে আমি একটি সংকীর্ণ, আগ্নেয়গিরির মতো গহ্বরপূর্ণ জগৎ অতিক্রম করি—ভারতীয় উপমহাদেশের উষ্ণ, সজীব ভূমি থেকে মধ্য এশিয়ার শীতল, শুষ্ক অঞ্চলে; কালো মাটি, উজ্জ্বল পোশাক ও মশলাদার খাবারের জগত থেকে বালি, মোটা উল ও ছাগলের মাংসের জগতে।

কিন্তু কারপাথিয়ানের মতোই, যার গিরিপথ দিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রবেশ করত, আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের ভূগোল ভিন্ন শিক্ষা দেয়: ব্রিটিশরা যাকে প্রথম “নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার” বলেছিল, হার্ভার্ডের অধ্যাপক সুগত বোসের মতে তা “ঐতিহাসিকভাবে কোনো সীমান্তই ছিল না,” বরং একটি “ইন্দো-পারসিক” এবং “ইন্দো-ইসলামিক” ধারাবাহিকতার “কেন্দ্র”, যা ব্যাখ্যা করে কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তান একটি জৈবিক একক গঠন করে, পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ভৌগোলিক অসংগতিতে অবদান রাখে।

এরপর ছিল আরও কৃত্রিম সীমান্ত:

আমি ১৯৭৩ এবং ১৯৮১ সালে দুইবার বার্লিন প্রাচীর অতিক্রম করে পূর্ব বার্লিনে প্রবেশ করি। বারো ফুট উঁচু কংক্রিটের দেয়াল, উপরে মোটা পাইপ বসানো, পশ্চিম জার্মানির দরিদ্র তুর্কি ও যুগোস্লাভ অভিবাসী পাড়াগুলো এবং পূর্ব জার্মানির পরিত্যক্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত ভবনগুলোর মধ্য দিয়ে চলে গেছে। পশ্চিম পাশে, যেখানে দেয়ালে গ্রাফিতি ছিল, সেখানে প্রায় যেকোনো জায়গা থেকে দেয়ালের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যেত; মাইনফিল্ড এবং পাহারার টাওয়ার সব ছিল পূর্বদিকে।

তৎকালীন সময়ে এই নগরভূমির কারাগারের মতো দৃশ্য যতই অদ্ভুত মনে হোক, নৈতিক দৃষ্টিকোণ ছাড়া এটিকে প্রশ্ন করা হতো না, কারণ সেই সময়ের প্রধান ধারণা ছিল যে শীতল যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। বিশেষত আমার মতো যারা শীতল যুদ্ধের সময় বড় হয়েছি কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো স্মৃতি নেই, তাদের কাছে এই প্রাচীর, যতই নিষ্ঠুর ও ইচ্ছামতো হোক, একটি পর্বতমালার মতোই স্থায়ী মনে হতো। সত্যটি প্রকাশ পায় বই ও জার্মানির ঐতিহাসিক মানচিত্র থেকে, যা আমি ১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে, বনে একটি ম্যাগাজিনের কাজের সময়, সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে পড়া শুরু করি। বই ও মানচিত্রগুলো একটি গল্প বলেছিল:

উত্তর ও বাল্টিক সাগর এবং আল্পস পর্বতমালার মাঝখানে ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থান করে জার্মানরা, ইতিহাসবিদ গলো মানের মতে, সবসময়ই একটি গতিশীল শক্তি ছিল, যা একটি “বড় কারাগারে” বন্দী ছিল এবং বেরিয়ে আসতে চাইত। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণে জল ও পাহাড় দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে, তাদের বিস্তার পূর্ব ও পশ্চিমে হয়েছিল, যেখানে কোনো ভৌগোলিক বাধা ছিল না। “গত একশ বছরে জার্মান চরিত্রকে যে বিষয়টি চিহ্নিত করেছে তা হলো তার আকারহীনতা, তার অস্থিরতা,” মান লিখেছেন, ১৮৬০ থেকে ১৯৬০-এর অশান্ত সময়ের কথা উল্লেখ করে, যা অটো ভন বিসমার্কের দ্বারা চিহ্নিত।বিস্তার এবং দুটি বিশ্বযুদ্ধ।⁵ কিন্তু জার্মানির ইতিহাস জুড়ে মানচিত্রে তার আকার ও গঠনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

প্রকৃতপক্ষে, প্রথম রাইখ, যা ৮০০ খ্রিস্টাব্দে শার্লেম্যাগনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ছিল একটি বিশাল পরিবর্তনশীল ভূখণ্ড, যা বিভিন্ন সময়ে অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, ইতালি এবং যুগোস্লাভিয়ার অংশ অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ইউরোপ যেন এমনই নিয়তি বহন করছিল যে এটি সেই অঞ্চলের দ্বারা শাসিত হবে, যা আজ জার্মানির সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু তারপর এলেন মার্টিন লুথার, যিনি রিফরমেশনের মাধ্যমে পশ্চিমা খ্রিস্টধর্মকে বিভক্ত করেন, যা আবার ত্রিশ বছরের যুদ্ধকে উসকে দেয়, যা প্রধানত জার্মান ভূমিতেই সংঘটিত হয়েছিল। ফলে মধ্য ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। আমি যত বেশি পড়তে থাকি—আঠারো শতকে প্রুশিয়া ও হ্যাবসবার্গ অস্ট্রিয়ার দ্বৈততা সম্পর্কে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে বিভিন্ন জার্মান রাজ্যের মধ্যে শুল্ক ইউনিয়ন সম্পর্কে, এবং উনিশ শতকের শেষের দিকে বিসমার্কের প্রুশিয়াভিত্তিক একীকরণ সম্পর্কে—ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বার্লিন প্রাচীর ছিল কেবল এই চলমান ভূখণ্ডগত রূপান্তরের আরেকটি ধাপ।

বার্লিন প্রাচীরের পতনের পরপরই যে শাসনব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়েছিল—চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া এবং অন্যান্য স্থানে—সেগুলোকে আমি কাজ ও ভ্রমণের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতাম। কাছ থেকে তারা এতটাই অপ্রবেশযোগ্য, এতটাই ভীতিজনক মনে হতো। তাদের হঠাৎ ভেঙে পড়া আমার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল, শুধু সব স্বৈরতন্ত্রের অন্তর্নিহিত অস্থিরতা সম্পর্কে নয়, বরং এই সত্য সম্পর্কেও যে বর্তমান, যতই স্থায়ী ও প্রভাবশালী মনে হোক না কেন, তা ক্ষণস্থায়ী। একমাত্র স্থায়ী বিষয় হলো মানচিত্রে একটি জনগোষ্ঠীর অবস্থান। তাই অস্থিরতার সময়ে মানচিত্রের গুরুত্ব বেড়ে যায়। যখন রাজনৈতিক ভূমি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তখন মানচিত্র, যদিও নির্ধারক নয়, ভবিষ্যতে কী হতে পারে তার ঐতিহাসিক যুক্তি বোঝার সূচনা করে।

দুটি কোরিয়ার মধ্যবর্তী নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল (DMZ)-এ সহিংসতার ছাপ ছিল প্রধান অনুভূতি। ২০০৬ সালে আমি দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যদের দেখেছিলাম, যারা তায়কোয়ানদো প্রস্তুত ভঙ্গিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, মুষ্টি ও বাহু শক্ত করে ধরে, উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিটি পক্ষই এই কাজের জন্য সবচেয়ে লম্বা ও ভয়ঙ্কর সৈন্যদের বেছে নিয়েছিল। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া ও মাইনফিল্ডের মধ্যে প্রদর্শিত এই আনুষ্ঠানিক ঘৃণা সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনো এক সময় ইতিহাসে পরিণত হবে। বিংশ শতাব্দীর অন্যান্য বিভক্ত দেশের উদাহরণ—জার্মানি, ভিয়েতনাম, ইয়েমেন—দেখলে বোঝা যায়, বিভাজন যত দীর্ঘই হোক না কেন, ঐক্যের শক্তিই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, যদিও তা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত, কখনো সহিংস এবং দ্রুত ঘটে। ডিএমজেড, বার্লিন প্রাচীরের মতোই, একটি কৃত্রিম সীমানা যার কোনো ভৌগোলিক যুক্তি নেই, যা একটি জাতিগত জাতিকে সেই স্থানে বিভক্ত করে যেখানে দুটি বিরোধী সেনাবাহিনী এসে থেমে গিয়েছিল। যেমন জার্মানি পুনরায় একীভূত হয়েছিল, তেমনি আমরা আশা করতে পারি—অথবা অন্তত পরিকল্পনা করা উচিত—একটি ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর কোরিয়ার জন্য। আবারও, সংস্কৃতি ও ভূগোলের শক্তিই কোনো এক সময় প্রাধান্য পাবে। যে মানবনির্মিত সীমানা প্রাকৃতিক সীমান্ত অঞ্চলের সঙ্গে মেলে না, তা বিশেষভাবে দুর্বল।

আমি জর্ডান থেকে ইসরায়েল এবং মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসীমান্তও অতিক্রম করেছি: সেসব সীমান্ত এবং অন্যান্য বিষয়ে পরে আলোচনা করব। এখন আমি আরেকটি ভ্রমণে যেতে চাই—একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের—ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানের নির্বাচিত কিছু পৃষ্ঠার মধ্য দিয়ে, যা দশক, এমনকি শতাব্দী পেরিয়েও টিকে আছে এবং ভূগোলের উপর তাদের জোরের কারণে আমাদেরকে ভূ-প্রকৃতির মানচিত্র আরও ভালোভাবে পড়তে সাহায্য করে, এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাজনীতির রেখাচিত্র কিছুটা হলেও দেখতে সাহায্য করে। কারণ এতগুলো সীমান্ত অতিক্রম করার অভিজ্ঞতাই আমাকে সেই স্থানগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীরভাবে কৌতূহলী করে তুলেছিল, যেগুলোর মধ্য দিয়ে আমি ভ্রমণ করেছি।

তিন দশকের রিপোর্টিং আমাকে নিশ্চিত করেছে যে আমাদের সবারই সময় ও স্থানের প্রতি সেই সংবেদনশীলতা পুনরুদ্ধার করা দরকার, যা জেট ও তথ্যযুগে হারিয়ে গেছে, যখন জনমত গঠনের অভিজাতরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মহাসাগর ও মহাদেশ পেরিয়ে যায়, যা তাদেরকে সহজেই এমন একটি “সমতল পৃথিবী” সম্পর্কে কথা বলতে দেয়, যেমনটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশিষ্ট কলামিস্ট থমাস এল. ফ্রিডম্যান উল্লেখ করেছেন। পরিবর্তে, আমি পাঠকদের এমন কিছু চিন্তাবিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব, যারা আজকাল তেমন জনপ্রিয় নন, কিন্তু যারা এই ধারণার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান যে ভূগোল আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই ভ্রমণের প্রথম অংশে আমি তাদের চিন্তাভাবনাকে কিছুটা গভীরভাবে তুলে ধরব, যাতে দ্বিতীয় অংশে তাদের জ্ঞানকে প্রয়োগ করা যায়—ইউরেশিয়া জুড়ে, ইউরোপ থেকে চীন পর্যন্ত, যার মধ্যে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশ অন্তর্ভুক্ত—কি ঘটেছে এবং কি ঘটতে পারে তা বোঝার জন্য। আমাদের বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গিতে ঠিক কী হারিয়ে গেছে, কীভাবে তা হারিয়েছি, এবং ধীরগতিতে ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করা—প্রয়াত পণ্ডিতদের গভীর জ্ঞান ব্যবহার করে—এই ভ্রমণের লক্ষ্য।

“Geography”  শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ মূলত “পৃথিবীর বর্ণনা,” এবং এটি প্রায়ই নিয়তিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, ফলে কলঙ্কিত হয়েছে: কারণ বলা হয়, ভূগোলগতভাবে চিন্তা করা মানে মানবিক পছন্দকে সীমাবদ্ধ করা। কিন্তু ভূ-প্রকৃতির মানচিত্র ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণের মতো উপায় ব্যবহার করে আমি কেবল প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতির বিশ্লেষণে আরেকটি স্তর যোগ করতে চাই, এবং এর মাধ্যমে পৃথিবীকে আরও গভীর ও শক্তিশালীভাবে দেখার একটি উপায় খুঁজে পেতে চাই। ভূগোলগত নির্ধারণবাদী না হয়েও বোঝা যায় যে ভূগোল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যত বেশি বর্তমান ঘটনায় মনোযোগ দিই, তত বেশি ব্যক্তিরা এবং তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; কিন্তু শতাব্দীর পরিসরে তাকালে, ভূগোলের ভূমিকা ততই স্পষ্ট হয়।

মধ্যপ্রাচ্য এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আমি যখন এটি লিখছি, মরক্কো থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের সংকটের মধ্যে রয়েছে। স্বৈরশাসনের পুরনো ব্যবস্থা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে, যদিও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়া জটিল। এই বড় অস্থিরতার প্রথম পর্যায়ে নতুন যোগাযোগ প্রযুক্তির শক্তির মাধ্যমে ভূগোলকে অতিক্রম করা হয়েছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলো সমগ্র আরব বিশ্বে প্রতিবাদকারীদের একটি একক সম্প্রদায় তৈরি করেছে: ফলে মিশর, ইয়েমেন ও বাহরাইনের মতো ভিন্ন ভিন্ন স্থানের গণতন্ত্রপন্থীরা তিউনিসিয়ায় যা শুরু হয়েছে তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। ফলে এই দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে একটি সাধারণতা রয়েছে। কিন্তু বিদ্রোহ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব বর্ণনা তৈরি করেছে, যা তার নিজস্ব গভীর ইতিহাস ও ভূগোল দ্বারা প্রভাবিত। তাই কোনো নির্দিষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের দেশের ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, সেখানকার ঘটনাগুলো তত কম বিস্ময়কর মনে হবে।

কারণ এটি হয়তো আংশিক কাকতালীয় যে অস্থিরতার সূচনা তিউনিসিয়ায় হয়েছিল। প্রাচীনকালের একটি মানচিত্রে দেখা যায়, যেখানে আজ তিউনিসিয়া অবস্থিত সেখানে বসতির ঘনত্ব ছিল, আর তার পাশে আধুনিক আলজেরিয়া ও লিবিয়ার তুলনামূলক শূন্যতা। সিসিলির কাছে ভূমধ্যসাগরে অগ্রসর হয়ে থাকা তিউনিসিয়া শুধু কার্থাজিনীয় ও রোমানদের অধীনেই নয়, ভ্যান্ডাল, বাইজেন্টাইন, মধ্যযুগীয় আরব ও তুর্কিদের অধীনেও উত্তর আফ্রিকার জনসংখ্যার কেন্দ্র ছিল। যেখানে পশ্চিমের আলজেরিয়া ও পূর্বের লিবিয়া ছিল কেবল অস্পষ্ট ভৌগোলিক ধারণা, সেখানে তিউনিসিয়া ছিল প্রাচীন সভ্যতার এক কেন্দ্রীভূত অঞ্চল। (লিবিয়ার ক্ষেত্রে, তার পশ্চিমাঞ্চল ত্রিপোলিটানিয়া ঐতিহাসিকভাবে তিউনিসিয়ার দিকে ঝুঁকেছিল, আর পূর্বাঞ্চল সাইরেনাইকা—বেনগাজি—সবসময় মিশরের দিকে ঝুঁকেছিল।)

দুই হাজার বছর ধরে, কার্থেজের (আধুনিক তিউনিসের কাছাকাছি) যত কাছে, উন্নয়নের স্তর তত বেশি। তিউনিসিয়ায় নগরায়ন দুই সহস্রাব্দ আগে শুরু হওয়ায় যাযাবর জীবনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উপজাতীয় পরিচয়—যা মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ ইবন খালদুনের মতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে—তুলনামূলকভাবে দুর্বল। প্রকৃতপক্ষে, ২০২ খ্রিস্টপূর্বে রোমান সেনাপতি স্কিপিও তিউনিসের বাইরে হ্যানিবালকে পরাজিত করার পর একটি সীমানা খাল খনন করেন, যা সভ্য অঞ্চলের পরিসীমা নির্দেশ করত। এই fossa regia আজও বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এখনও কিছু স্থানে দৃশ্যমান, এটি তিউনিসিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের টাবারকা থেকে দক্ষিণে নেমে পূর্বদিকে ঘুরে ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর স্ফ্যাক্স পর্যন্ত গেছে। সেই রেখার বাইরে থাকা শহরগুলোতে রোমান নিদর্শন কম, এবং আজও সেগুলো তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও কম উন্নত, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে বেকারত্বের হার বেশি। সিদি বুজিদ শহর, যেখানে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে একজন ফল ও সবজি বিক্রেতা প্রতিবাদ হিসেবে আত্মাহুতি দেন এবং আরব বিদ্রোহ শুরু হয়, সেটি স্কিপিওর সেই রেখার ঠিক বাইরে অবস্থিত।

এটি কোনো নিয়তিবাদ নয়। আমি কেবল বর্তমান ঘটনাগুলোর জন্য ভূগোল ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি: আরব বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সমাজে—যা ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের সবচেয়ে কাছাকাছি—গণতন্ত্রের জন্য বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, তবে একই সঙ্গে সেই দেশের এমন একটি অংশে, যা প্রাচীনকাল থেকেই উপেক্ষিত ছিল এবং ফলে অনুন্নত রয়ে গেছে।

এই ধরনের জ্ঞান অন্যত্র যা ঘটছে তা বোঝার গভীরতা বাড়াতে পারে: যেমন মিশরে, যা তিউনিসিয়ার মতোই প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র; বা ইয়েমেনে, যা আরব উপদ্বীপের জনসংখ্যার কেন্দ্র, যেখানে ঐক্যের প্রচেষ্টা পাহাড়ি ও বিস্তৃত ভূপ্রকৃতির কারণে ব্যাহত হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় সরকারকে দুর্বল করে এবং উপজাতীয় কাঠামো ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্ব বাড়ায়; অথবা সিরিয়ায়, যার মানচিত্রের সংকুচিত আকৃতির মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন লুকিয়ে আছে। ভূগোল (Geography) দেখায় যে তিউনিসিয়া ও মিশর স্বাভাবিকভাবেই সংহত; লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া ততটা নয়। ফলে তিউনিসিয়া ও মিশরকে একত্রে রাখতে তুলনামূলকভাবে মাঝারি ধরনের স্বৈরশাসন যথেষ্ট ছিল, যেখানে লিবিয়া ও সিরিয়ায় আরও কঠোর শাসন প্রয়োজন হয়েছিল। অন্যদিকে, ইয়েমেনকে শাসন করা সবসময়ই কঠিন ছিল। ইয়েমেন ছিল এমন একটি “খণ্ডিত” সমাজ, যা বিশ শতকের ইউরোপীয় পণ্ডিত আর্নেস্ট গেলনার ও রবার্ট মন্টান বর্ণনা করেছেন, যেখানে পাহাড় ও মরুভূমিতে বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূপ্রকৃতি একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে দোদুল্যমান সমাজ তৈরি করে। এখানে উপজাতি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রীয় সরকার তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এমন স্থানে উদার শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রাম এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকলে এবং বিশ্ব ক্রমশ আরও জটিল হয়ে উঠলে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত তা নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন ওঠে, ভূগোল অন্তত কিছুটা হলেও তা বোঝার একটি উপায় দেয়। পুরোনো মানচিত্র এবং অতীতের ভূগোলবিদ ও ভূরাজনৈতিক চিন্তাবিদদের কাজের মাধ্যমে, আমি একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করিয়ে দেখতে চাই, যেমনটি আমি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই সীমান্তগুলো অতিক্রম করার সময় দেখেছিলাম। কারণ আমরা যদিও সৌরজগতের বাইরের অঞ্চলে উপগ্রহ পাঠাতে পারি—এবং যদিও আর্থিক বাজার ও সাইবারস্পেসের কোনো সীমানা নেই—তবুও হিন্দুকুশ পর্বতমালা এখনও একটি ভয়ঙ্কর বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

viii

যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে, তখন ভারত কোন দিকে ঝুঁকবে তা একবিংশ শতাব্দীতে ইউরেশিয়ার ভূ-রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। অন্য কথায়, ভারত এক চূড়ান্ত কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্পাইকম্যানের মতে, এটি এক বৃহৎ রিমল্যান্ড শক্তি। মহান উল্লেখ করেছিলেন যে ভারত, যা ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীন—উভয়েরই সমুদ্রপথে প্রবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতীয় রাজনৈতিক শ্রেণি যেখানে অত্যন্ত গভীরভাবে আমেরিকার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অবস্থানকে বোঝে, সেখানে আমেরিকান রাজনৈতিক শ্রেণির ভারতের প্রতি তেমন কোনো বোঝাপড়া নেই। তবুও, যদি আমেরিকানরা ভারতের অত্যন্ত অস্থির ভূ-রাজনীতি—বিশেষত পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো—বোঝার চেষ্টা না করে, তবে তারা এই সম্পর্ককে গুরুতরভাবে ভুলভাবে পরিচালনা করবে। প্রাচীনকাল থেকে ভারতের ইতিহাস ও ভূগোলই নির্ধারণ করে দেয়, নয়া দিল্লি থেকে পৃথিবীকে কীভাবে দেখা হয়। আমি শুরু করছি ভারতীয় উপমহাদেশকে সামগ্রিক ইউরেশিয়ার প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে।

রাশিয়া ইউরেশিয়ার বিশাল স্থলভাগে আধিপত্য বিস্তার করলেও, জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম; এই সুপার-মহাদেশের চারটি প্রধান জনবসতির কেন্দ্র তার প্রান্তভাগে অবস্থিত: ইউরোপ, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন। ১৯১৭ সালে ভূগোলবিদ জেমস ফেয়ারগ্রিভ লিখেছিলেন, চীনা ও ইউরোপীয় সভ্যতা যথাক্রমে ওয়েই নদীর উপত্যকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সভ্যতার বিকাশ ছিল আরও জটিল: পিউ ও মন জনগোষ্ঠী, পরে বর্মী, খমের, শ্যামদেশীয়, ভিয়েতনামি, মালয় এবং অন্যান্যরা—যারা চীন থেকে দক্ষিণমুখী অভিবাসনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল—ইরাবতী ও মেকং নদীর উপত্যকা বরাবর এবং জাভা ও সুমাত্রার মতো দ্বীপে গড়ে উঠেছিল। ভারত সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদাহরণ। চীনের মতোই ভারতেরও একটি ভৌগোলিক যুক্তি রয়েছে—পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে আরব সাগর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে পাহাড়ি বার্মিজ জঙ্গল, এবং উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে হিমালয়, কারাকোরাম ও হিন্দুকুশের পর্বতশ্রেণি দ্বারা বেষ্টিত। ভারতও চীনের মতো অভ্যন্তরীণভাবে বিশাল। কিন্তু চীনের তুলনায় কম পরিমাণে, ভারতের একটি একক জনসংখ্যাগত কেন্দ্র নেই—যেমন ওয়েই উপত্যকা বা নিম্ন হলুদ নদী—যেখান থেকে একটি রাষ্ট্র সবদিকে বিস্তার লাভ করতে পারে।

এমনকি গঙ্গা নদীর উপত্যকাও উপমহাদেশের গভীর দক্ষিণ পর্যন্ত একটি একক ভারতীয় রাষ্ট্রের বিস্তারের জন্য যথেষ্ট ভিত্তি প্রদান করতে পারেনি: কারণ গঙ্গা ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র, নর্মদা, তুঙ্গভদ্রা, কাবেরী, গোদাবরী ইত্যাদি বিভিন্ন নদী ব্যবস্থা উপমহাদেশকে আরও বিভক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কাবেরী বদ্বীপ দ্রাবিড় জীবনের কেন্দ্র, যেমন গঙ্গা হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর জীবনের কেন্দ্র।² তদুপরি, ইউরেশিয়ার জনবসতির কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ভারত (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে) সবচেয়ে উষ্ণ জলবায়ু এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও সজীব প্রাকৃতিক পরিবেশের অধিকারী, এবং তাই ফেয়ারগ্রিভের মতে, এখানকার অধিবাসীদের সম্পদ সংগঠনের জন্য রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন ততটা ছিল না, যতটা ছিল নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চীন ও ইউরোপে। অবশ্যই, এই শেষ বক্তব্যটি অতিরিক্ত নির্ধারণবাদী এবং তার সরলতায় কিছুটা বর্ণবাদী বলে মনে হতে পারে—যা ফেয়ারগ্রিভের সময়ের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তবুও, ম্যাকিন্ডারের মতো, যিনি চীনের তথাকথিত “হলুদ বিপদ” নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, ফেয়ারগ্রিভের ভারতের উপর সামগ্রিক বিশ্লেষণ মূলত যথার্থ এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ।


কারণ যদিও এটি স্পষ্টতই নিজস্ব এক অনন্য সভ্যতা, উপরোক্ত কারণগুলোর জন্য ভারতীয় উপমহাদেশ তার ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে চীনের মতো রাজনৈতিক ঐক্য অর্জন করতে পারেনি, একই সঙ্গে এটি তার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে কেন্দ্রীভূত আক্রমণের জন্য উন্মুক্ত ছিল—যা তার সীমান্ত অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে অস্পষ্ট ও দুর্বলভাবে সুরক্ষিত, যেখানে ভারত বিপজ্জনকভাবে মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল এবং পারস্য-আফগান মালভূমির খুব কাছাকাছি, যাদের তুলনামূলকভাবে “প্রবল” নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের সভ্যতা রয়েছে। ইতিহাস জুড়ে এই আক্রমণগুলোকে প্রণোদিত করেছে পাঞ্জাবের সমতলভূমির উর্বরতা, যা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের অভাব সত্ত্বেও উৎপাদনশীল ছিল, কারণ এটি সিন্ধু নদী ও তার উপনদীগুলোর দ্বারা সেচপ্রাপ্ত—ঠিক সেই স্থানে যেখানে পারস্য-আফগান মালভূমি নেমে এসে উপমহাদেশের সমতলে মিশেছে। প্রকৃতপক্ষে, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া থেকে বজ্রগতির আক্রমণ ও অনুপ্রবেশই উপমহাদেশে ঐক্য ও স্থিতিশীলতার অনুসন্ধানকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ব্যাহত করেছে। ম্যাকিন্ডার তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন: “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এমন একটি মাত্র স্থলসীমান্ত আছে যেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। সেটি হলো ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত।”

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মহাশক্তি হওয়ার পথে ভারতের সুবিধা ও অসুবিধা এখনও এই ভূগোলের মধ্যেই নিহিত। প্রয়াত ইতিহাসবিদ বার্টন স্টেইন উল্লেখ করেছেন যে মধ্যযুগে ভারতের একটি মানচিত্র মধ্য এশিয়া ও ইরানের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতো, অথচ একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমের সিন্ধু উপত্যকা এবং গঙ্গার দক্ষিণে উপদ্বীপীয় ভারতের মধ্যে কেবল একটি দুর্বল সংযোগই দেখাত।⁵ যেমন আজকের চীন অভ্যন্তরীণ এশিয়ার স্তেপভূমি এবং চীনের মূল ভূখণ্ডের বন্যাপ্রবণ সমতলের সম্পর্কের এক সফল পরিণতি, তেমনি ভারত সহস্রাব্দ ধরে তার উচ্চভূমির ছায়া অঞ্চলের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে, যেগুলোকে চীনের মতো সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, ফলে ভারত অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

উপমহাদেশীয় ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের মধ্যে সংযোগ তাদের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে স্পষ্ট, কিন্তু ভারত ও মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল এবং ভারত ও ইরানীয় মালভূমির মধ্যকার সম্পর্কও সমানভাবে গভীর। ভারত ও ইরান উভয়ই মধ্য এশিয়া থেকে মঙ্গোল আক্রমণের শিকার হয়েছে, আবার আখেমেনীয় যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে চতুর্থ শতাব্দী) থেকে শুরু হওয়া আক্রমণের ফলে ইরানি সংস্কৃতির গতিশীলতা ভারতের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে ১৮৩৫ সাল পর্যন্ত পারসিক ভাষা ভারতের সরকারি ভাষা ছিল। ভারতের ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের মুঘল সম্রাটরা “পারসিক সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন,” প্রয়াত ইতিহাসবিদ কে. এম. পানিক্কার উল্লেখ করেন, “এবং ঐতিহ্যগত উৎসবের মাধ্যমে নওরোজ উদযাপন করতেন এবং শিল্পকলায় পারসিক কৌশল জনপ্রিয় করেছিলেন।” একই সময়ে, পাকিস্তানের সরকারি ভাষা উর্দু—যা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত রাষ্ট্র—পারসিক (এবং আরবি) ভাষা থেকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত এবং সংশোধিত আরবি লিপিতে লেখা হয়। অতএব, ভারত একদিকে একটি উপমহাদেশ, অন্যদিকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তসীমা। এখানেই আমরা উইলিয়াম ম্যাকনিলের সভ্যতাগুলোর মিশ্রণ ও সমন্বয়ের ধারণাটি সত্যিকারভাবে বুঝতে পারি।

অতএব, ভারতকে বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো এই উপলব্ধি যে, উপমহাদেশ হিসেবে ভারত অত্যন্ত যৌক্তিক হলেও, তার প্রাকৃতিক সীমান্তগুলো কিছু ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বল।

এর ফলে ইতিহাস জুড়ে এমন বহু রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে, যা আমাদের ধারণা অনুযায়ী ভারতের ভৌগোলিক সীমার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, বরং তার উপর বিস্তৃত হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান ভারত রাষ্ট্রও উপমহাদেশের সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, এবং এটিই তার প্রধান সমস্যার কেন্দ্র: কারণ পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং কিছুটা হলেও নেপালও উপমহাদেশের মধ্যে অবস্থিত, এবং তারা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, যার ফলে ভারত তার সেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হারায়, যা অন্যথায় ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা যেত।

প্রাচীনকাল থেকে মানব বসতি উপমহাদেশীয় ভূগোলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এমন নয়; বরং ভারতের ভূগোল নিজেই সূক্ষ্ম, বিশেষত উত্তর-পশ্চিমে, যা প্রথম দৃষ্টিতে মানচিত্রে দেখা ধারণার চেয়ে ভিন্ন গল্প বলে। প্রথম দৃষ্টিতে, ভূ-প্রকৃতির মানচিত্রে দেখা যায় একটি বাদামি পর্বতমালা ও মালভূমির স্তর, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বর্তমান সীমান্ত বরাবর মধ্য এশিয়ার শীতল অঞ্চলকে উপমহাদেশের সবুজ উষ্ণ অঞ্চলের থেকে আলাদা করে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে সিন্ধু নদীর দিকে অবতরণ—যা পাকিস্তানের মাঝ বরাবর প্রবাহিত—খুবই ধীর, ফলে সহস্রাব্দ ধরে একই ধরনের সংস্কৃতি উচ্চ মালভূমি এবং নিম্ন নদীভূমি উভয় জায়গাতেই বিস্তৃত ছিল—যেমন হরপ্পা, কুষাণ, তুর্কি, মুঘল, ইন্দো-পারসিক, ইন্দো-ইসলামিক বা পশতুন সংস্কৃতি। এছাড়াও, মাকরান ও বালুচিস্তানের ক্ষারীয় মরুভূমি, যা ইরানকে উপমহাদেশের সঙ্গে যুক্ত করে; অথবা মধ্যযুগীয় সমুদ্র বাণিজ্য, যা পূর্বানুমেয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আরবকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছিল—এসবও উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে উইঙ্ক—একটি আরবি পরিভাষা ব্যবহার করে—যে অঞ্চলকে “আল-হিন্দের সীমান্ত” বলে উল্লেখ করেন, যা পূর্ব ইরান থেকে পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পারসিক প্রভাবিত মুসলিম জনগোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত, সেটি ইতিহাস জুড়ে একটি তরল সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল, ফলে রাষ্ট্রসীমা নির্ধারণ স্বভাবতই জটিল।

হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র—যা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষ থেকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রধানতন্ত্রগুলোর একটি জটিল নেটওয়ার্ক ছিল—একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী, দুটি প্রধান শহর ছিল মোহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা, উভয়ই সিন্ধু নদীর তীরে; ফলে সিন্ধু নদী উপমহাদেশ ও অভ্যন্তরীণ এশিয়ার মধ্যে সীমারেখা না হয়ে বরং নিজেই একটি সভ্যতার কেন্দ্র ছিল। হরপ্পা বিশ্বের বিস্তৃতি বালুচিস্তান থেকে উত্তর-পূর্বে কাশ্মীর পর্যন্ত এবং সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় দিল্লি ও মুম্বাই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, থর মরুভূমিকে ঘিরে—অর্থাৎ এটি প্রায় বর্তমান ইরান ও আফগানিস্তানকে স্পর্শ করেছিল, পাকিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করেছিল। এটি এমন একটি জটিল বসতি কাঠামো ছিল, যা সেচের উপযোগী ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মানানসই ছিল এবং একই সঙ্গে দেখায় কীভাবে একটি বিশাল উপমহাদেশের ভেতরে বহু প্রাকৃতিক বিভাজন থাকতে পারে।

আর্যরা সম্ভবত ইরানীয় মালভূমি থেকে প্রবেশ করেছিল এবং উপমহাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের দিকে উত্তর ভারতের গঙ্গা সমতলে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিল। এর ফলে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন রাজ্য গড়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত নন্দ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়, যা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে পাঞ্জাব থেকে বঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ সালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ধননন্দকে অপসারণ করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হয়, দক্ষিণের গভীর অংশ ছাড়া, এবং এইভাবে প্রথমবারের মতো ভারতকে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করার ধারণা তৈরি করে। বার্টন স্টেইনের মতে, বহু নগর-রাষ্ট্র ও প্রধানতন্ত্রকে একত্রিত করে একটি সুসংহত ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার পেছনে বাণিজ্যের পাশাপাশি আংশিকভাবে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের হুমকিও কাজ করেছিল, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে গঙ্গা উপত্যকা জয় করার প্রান্তে পৌঁছেছিলেন, যদি না তাঁর সৈন্যরা বিদ্রোহ করত। ঐক্যের আরেকটি কারণ ছিল বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের উদ্ভব, যা উপমহাদেশজুড়ে বিস্তৃত হয়ে বণিক সম্প্রদায়ের আনুগত্য অর্জন করেছিল।

মৌর্য রাজারা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যিক পদ্ধতির ভিত্তিতে, যা এজিয়ান অঞ্চল ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে ভারতে পৌঁছেছিল। তবুও এই বিশাল সাম্রাজ্যকে একত্রে ধরে রাখতে মানবিক দক্ষতার নানা প্রয়াস প্রয়োজন ছিল। চন্দ্রগুপ্তের উপদেষ্টা সম্ভবত কৌটিল্য, যিনি অর্থশাস্ত্র নামে একটি রাজনৈতিক গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়: নিজের সংলগ্ন যে কোনো নগর-রাষ্ট্রকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কারণ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে তাকে দমন করতে হবে; কিন্তু যে দূরবর্তী নগর-রাষ্ট্র শত্রুর প্রতিবেশী, তাকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এত বিশাল উপমহাদেশীয় সাম্রাজ্য ধরে রাখা কঠিন হওয়ায়, কৌটিল্য জটিল মৈত্রী নেটওয়ার্ক এবং বিজিত জনগণের প্রতি সদয় আচরণের পক্ষে ছিলেন, যাতে তাদের জীবনযাত্রা অক্ষুণ্ণ থাকে। মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল অত্যন্ত বিকেন্দ্রীভূত, যার কেন্দ্র ছিল পূর্ব গঙ্গা সমতল এবং চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র অশোকের সময় চারটি আঞ্চলিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে: উত্তর-পশ্চিমে তক্ষশিলা, পশ্চিম-মধ্য ভারতে উজ্জয়িনী, দক্ষিণে কর্ণাটকে সুবর্ণগিরি, এবং বঙ্গোপসাগরের তীরে কলিঙ্গ।

এই প্রাথমিক যুগে সীমিত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও এত বৃহৎ উপমহাদেশ জুড়ে একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ছিল এক অসাধারণ সাফল্য। মৌর্যরা দেখিয়েছিল যে একটি একক রাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল অঞ্চলে ভৌগোলিক যুক্তি প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু তাদের পতনের পর আবার উত্তর-পশ্চিম থেকে আক্রমণ শুরু হয়—বিশেষ করে খাইবার পাস দিয়ে: খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে গ্রিক এবং প্রথম শতকে স্কিথিয়ানরা। এর ফলে উপমহাদেশ আবার আঞ্চলিক রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়—শুঙ্গ, পান্ড্য, কুনিন্দ ইত্যাদি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কুষাণ সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে, যার শাসকরা ফেরগানা উপত্যকা থেকে শুরু করে উত্তর ভারতের বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে। কুষাণ সাম্রাজ্যের মানচিত্র আধুনিক দৃষ্টিতে বিস্ময়কর—এটি সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এটি একদিকে নদী উপত্যকা অনুসরণ করেছিল, আবার অন্যদিকে পর্বতমালা অতিক্রম করেছিল—অর্থাৎ এটি ভূগোলকে অনুসরণও করেছে, আবার অস্বীকারও করেছে। এটি দেখায় যে বর্তমান রাষ্ট্রসীমা রাজনৈতিক সংগঠনের চূড়ান্ত রূপ নয়।

গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩২০–৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) আবার উপমহাদেশে কিছুটা ঐক্য ফিরিয়ে আনে, পশ্চিমে সিন্ধু থেকে পূর্বে বঙ্গ পর্যন্ত এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যদিও দক্ষিণের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং উত্তর-পশ্চিম থেকে মধ্য এশিয়ার অশ্বারোহী যোদ্ধাদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। মৌর্যদের মতোই, গুপ্ত সাম্রাজ্যও ছিল একটি দুর্বলভাবে সংযুক্ত রাষ্ট্রসমষ্টি, যা বাণিজ্য ও করের মাধ্যমে গঙ্গা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় অঞ্চল, যা সংস্কৃতভিত্তিক উত্তর ভারতের থেকে ভিন্ন ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বহন করত, ছিল একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল, যা দাক্ষিণাত্য মালভূমি দ্বারা উত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক প্রভাবের অধীন ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ছোট ছোট রাজ্যের সমাবেশ দেখা যায়, যা আবারও দেখায় যে ভারত চীনের মতো নয়, যেখানে কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রবণতা বেশি।

সপ্তম থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে ভারতে প্রবেশ করে। আরবরা প্রথমে স্থল ও সমুদ্রপথে আসে, কিন্তু স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি; পরে তুর্কিরা, প্রায় ১০০০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকে, ইরানীয় মালভূমি ও আফগানিস্তান হয়ে প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই, হিন্দু শাসকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে উত্তর ভারতের সমগ্র সমতলভূমি মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে। দক্ষিণে, বালুচিস্তান ও সিন্ধ ছিল সেই “মরুভূমির বেল্ট”-এর অংশ, যা মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশ কার্যত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে: অষ্টম শতকে ইরাকি আরবদের সিন্ধ, পাঞ্জাব, রাজস্থান ও গুজরাটের কিছু অংশ দখল; একাদশ শতকে গজনির মাহমুদের সাম্রাজ্য, যা ইরাকের কুর্দিস্তান থেকে শুরু করে ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; এবং ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত দিল্লি সুলতানাত, যেখানে তুর্কি তুঘলক, আফগান লোদী এবং অন্যান্য মধ্য এশীয় বংশ উত্তর ও আংশিক দক্ষিণ ভারত শাসন করেছিল।

আক্রমণকারীদের জন্য ভারতের রাজধানী হিসেবে দিল্লির নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণভাবে ভূগোলের ফল। ফেয়ারগ্রিভ লিখেছেন, “সিন্ধ ও সিন্ধু উপত্যকা, যার মধ্যে পাঞ্জাব অন্তর্ভুক্ত ... আসলে ভারতের একপ্রকার অগ্রকক্ষ, যেখানে প্রবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ একটি পথ রয়েছে—ভারতীয় মরুভূমি ও হিমালয়ের মাঝখানে প্রায় ১৫০ মাইল চওড়া। এই পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে দিল্লি।” দিল্লির পেছনে ছিল ইসলামী বিশ্ব; সামনে ছিল হিন্দু বিশ্ব। (এই সময়ের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম, যার জন্মভারতেই, প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিল।) ভূগোল নির্ধারণ করেছে যে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি একটি স্থির সীমান্ত নয়, বরং ইরান ও আফগানিস্তান থেকে শুরু হয়ে দিল্লিতে শেষ হওয়া এক অন্তহীন ধাপে ধাপে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা—আবারও মানব সভ্যতার বৃহৎ ইতিহাসে ম্যাকনিলের ধারণার প্রমাণ।

মুঘল সাম্রাজ্য ছিল এই বাস্তবতার এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রকাশ। খুব কম সাম্রাজ্যই মুঘলদের মতো শিল্প ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের গৌরব বহন করেছে। তারা ১৫০০-এর দশকের শুরু থেকে ১৭২০ সাল পর্যন্ত ভারত ও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে শক্তভাবে শাসন করেছে (এরপর সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে যায়)। “মুঘল” শব্দটি আরবি ও পারসিক ভাষায় “মঙ্গোল”-এর রূপ, যা ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত সব বিদেশি মুসলমানদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, একজন চাগতাই তুর্কি, যিনি ১৪৮৩ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানের ফেরগানা উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং যুবক বয়সে তিমুরের পুরনো রাজধানী সমরকন্দ দখলের চেষ্টা করেন। চেঙ্গিস খানের বংশধর মুহাম্মদ শায়বানি খানের কাছে পরাজিত হয়ে বাবর ও তার অনুসারীরা দক্ষিণে গিয়ে কাবুল দখল করেন। সেখান থেকে বাবর আফগানিস্তানের উচ্চ মালভূমি থেকে পাঞ্জাবের দিকে নেমে আসেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশ জয়ের সূচনা করেন।

মুঘল বা তিমুরীয় সাম্রাজ্য, যা বাবরের নাতি আকবরের সময় পূর্ণতা পায়, তার অভিজাত শ্রেণি গঠিত ছিল রাজপুত, আফগান, আরব, পারসিক, উজবেক ও চাগতাই তুর্কি, পাশাপাশি ভারতীয় সুন্নি, শিয়া ও হিন্দুদের দ্বারা—অর্থাৎ এটি ছিল এক বিস্তৃত জাতিগত ও ধর্মীয় জগত, যা উত্তর-পশ্চিমে দক্ষিণ রাশিয়া থেকে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারত তখন পার্শ্ববর্তী মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রবণতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার ছিল।

কাবুল ও কান্দাহার ছিল এই ঐতিহ্যবাহী দিল্লি-কেন্দ্রিক রাজবংশের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের বর্তমান বেঙ্গালুরুর আশপাশের দৃঢ় হিন্দু অঞ্চল ততটা নয়। আওরঙ্গজেব, “বিশ্বজয়ী,” যার শাসনামলে সপ্তদশ শতকের শেষদিকে মুঘল সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ বিস্তারে পৌঁছায়, তিনি আশির কোঠায় বয়সেও দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে মারাঠা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৭০৭ সালে তিনি দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে তার শিবিরে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের দমন করতে না পেরে। পানিক্কারের ভাষায়, দাক্ষিণাত্য “সবসময়ই ভারতের একটি প্রধান মধ্যবর্তী প্রাচীর” হিসেবে কাজ করেছে, যা গঙ্গা উপত্যকার জনগণের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে জয় করা সম্ভব হয়নি। তদুপরি, উত্তর-দক্ষিণমুখী উপমহাদেশে পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী নদীগুলোর প্রবাহ উত্তর ভারতের পক্ষে দক্ষিণ শাসন করা কঠিন করে তুলেছে—যেমনটি আওরঙ্গজেবের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়। সহজভাবে বলতে গেলে: উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক সংযোগ খুবই সীমিত।

বাস্তবে, দক্ষিণ ভারতে এই দীর্ঘস্থায়ী ও কঠিন বিদ্রোহই উত্তর ভারতের মুঘল অভিজাতদের ঐক্য ও মনোবল দুর্বল করে দেয়। মারাঠা যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকার ফলে সাম্রাজ্যের অন্যান্য সমস্যাগুলো উপেক্ষিত হয়, যা ডাচ, ফরাসি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলোকে উপকূলে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে সাহায্য করে, এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের পথ সুগম করে।

এই বিষয়টি জোর দিয়ে বলা যায়: আওরঙ্গজেবের পরিস্থিতি ছিল দিল্লিভিত্তিক শাসকদের শত শত বছরের অভিজ্ঞতারই পুনরাবৃত্তি, এমনকি প্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশে শাসনকারী শাসকদের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ, আজকের উত্তর ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত অঞ্চলটি প্রায়ই একটি একক রাজনৈতিক সত্তার অধীনে ছিল, অথচ দক্ষিণ ভারতের উপর কর্তৃত্ব অনিশ্চিত ছিল। ফলে ভারতীয় অভিজাতদের কাছে পাকিস্তানই নয়, আফগানিস্তানকেও ভারতের প্রাকৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবে ভাবা শুধু স্বাভাবিকই নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে যুক্তিসঙ্গত। বাবরের সমাধি দিল্লিতে নয়, কাবুলে অবস্থিত। এর অর্থ এই নয় যে ভারতের আফগানিস্তানের উপর ভূখণ্ডগত দাবি আছে, বরং এর অর্থ হলো নয়াদিল্লি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন থাকে আফগানিস্তানে কে শাসন করছে তা নিয়ে এবং চায় সেখানে এমন শাসন থাকুক যা ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ।

ব্রিটিশরা, ভারতের পূর্ববর্তী শাসকদের থেকে ভিন্নভাবে, ছিল মূলত একটি সামুদ্রিক শক্তি, স্থলশক্তি নয়। বোম্বে, মাদ্রাজ ও কলকাতা—এই তিনটি প্রেসিডেন্সি ছিল তাদের শাসনের কেন্দ্রবিন্দু, এবং সাগরপথেই তারা ভারত জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আক্রমণ ও অভিবাসনের পর ব্রিটিশরাই ভারতের ভূগোলের মৌলিক সত্যকে পুনরুদ্ধার করে—যে এটি আসলে একটি উপমহাদেশ। ১৯০১ সালের ভারতের একটি মানচিত্র এই বিষয়টি চমৎকারভাবে দেখায়: ব্রিটিশদের নির্মিত অসংখ্য রেললাইন সারা উপমহাদেশ জুড়ে ধমনীসদৃশ বিস্তৃত—আফগান সীমান্ত থেকে দক্ষিণে পাল্ক প্রণালী পর্যন্ত, এবং পশ্চিমে বর্তমান পাকিস্তানের করাচি থেকে পূর্বে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত। প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো এই বিশাল অভ্যন্তরীণ অঞ্চলকে একটি একক রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল।

নিশ্চয়ই, মুঘলরা (এবং কিছুটা মারাঠা কনফেডারেশন) এই সাফল্যের পূর্বসূরি ছিল, কারণ তারা উপমহাদেশের বৃহৎ অংশ দক্ষতার সঙ্গে শাসন করেছিল। কিন্তু মুঘল শাসন, যতই উজ্জ্বল হোক, তা ছিল উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত আরেকটি মুসলিম আক্রমণের ফল, যা আজও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা সমালোচিত হয়। অন্যদিকে, ব্রিটেন, একটি সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের মধ্যে একপ্রকার নিরপেক্ষ ছিল—যার ভিত্তি ছিল ভূগোল; কারণ ভারতের অধিকাংশ মুসলমান বসবাস করত উত্তর-পশ্চিমে, যেখান থেকে প্রায় সব আক্রমণ এসেছে, এবং পূর্ব বাংলায়—গঙ্গা সমতলের উর্বর পূর্ব প্রান্তে, যেখানে ত্রয়োদশ শতকের তুর্কি-মঙ্গোল আক্রমণ ও বন উজাড়ের ফলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে।

ব্রিটিশরা উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আধুনিক আমলাতন্ত্র ও রেলব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশকে একত্রিত করেছিল, কিন্তু ১৯৪৭ সালে তাদের দ্রুত ও অস্থির প্রস্থান এটিকে আবার বিভক্ত করে—যা আগের যেকোনো সাম্রাজ্যিক বিভাজনের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও আনুষ্ঠানিক ছিল। অতীতে, যেমন ইন্দো-গ্রিকরা গুপ্ত সাম্রাজ্যের সঙ্গে বা মুঘলরা মারাঠাদের সঙ্গে যেখানে মিলিত হয়েছিল, সেসব সীমান্ত আজকের মতো কাঁটাতার, মাইনফিল্ড, আলাদা পাসপোর্ট বা প্রচারমাধ্যমের যুদ্ধ দ্বারা চিহ্নিত ছিল না—যা আধুনিক প্রযুক্তির ফল। বর্তমান বিভাজন একটি কঠোর আইনি ও আংশিকভাবে সভ্যতাগত বিভাজন, যা ভূগোলের চেয়ে মানুষের সিদ্ধান্তের ফল বেশি।

সংক্ষেপে, ভারতের ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তান শুধু একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র, সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক, বা সীমান্তে উপস্থিত একটি বৃহৎ সেনাবাহিনী নয়। পাকিস্তান, যা ভারতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত—যেখানে পাহাড় সমতলের সঙ্গে মিলিত হয়েছে—ভারতের ইতিহাস জুড়ে সংঘটিত মুসলিম আক্রমণগুলোর ভৌগোলিক ও জাতীয় প্রতীক। পাকিস্তান ভারতের উত্তর-পশ্চিমে ঠিক সেইভাবেই অবস্থান করছে, যেমন অতীতে মুসলিম আক্রমণকারীরা করত। স্ট্র্যাটফর-এর প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ফ্রিডম্যান লিখেছেন, “পাকিস্তান হলো মধ্যযুগীয় ভারতে মুসলিম শাসনের আধুনিক অবশিষ্টাংশ,” একই সঙ্গে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল সেই উপমহাদেশীয় অংশ, যেখানে প্রথম আরব মুসলমানরা বসতি স্থাপন করেছিল।

ইরান এবং দক্ষিণ আফগানিস্তান থেকে আক্রমণ চালিয়ে।²⁰

এখানে বোঝা জরুরি, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা মুসলিমবিরোধী নন। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা ভারতের, এবং ভারতের মুসলিম রাষ্ট্রপতিও হয়েছে। কিন্তু ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, কারণ এটি রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ধর্মকে স্থান না দিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে, যদিও এটি প্রধানত একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত। পাকিস্তান, একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে, তার কিছু উগ্রপন্থী উপাদানের কারণে কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে, যা কখনও কখনও চরম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানায়।

পাকিস্তান ও এর প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল—যা এক অর্থে বলা যায়, “ইতিহাস যেন এখনো শেষ হয়নি।” অবশ্যই, ভারত পাকিস্তানকে প্রচলিত যুদ্ধে পরাজিত করতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক সংঘর্ষে, বা এমন এক যুদ্ধে যা পারমাণবিক বিনিময়ে পরিণত হয়, ভারতের পক্ষে গভীর অনুপ্রবেশ করা সম্ভব নয়, কারণ এর একটি কারণ হলো, আফগানিস্তানের মতো পাকিস্তানও বহিঃশত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। মুঘলদের ‘মুক্তিদায়ক মহাজাগতিকতা’ ছাড়াই, এটি আফগানিস্তানের মতোই। যতদূর আমরা জানি, পাকিস্তানকে আফগানিস্তান থেকে আলাদা করে এমন কোনো স্পষ্ট প্রাকৃতিক সীমা নেই, বরং এটি এক জটিল ভৌগোলিক চিত্র—যেখানে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (আনুষ্ঠানিকভাবে খাইবার পাখতুনখোয়া) গিরিখাত ও উপত্যকা আফগানিস্তানের সঙ্গে মিশে গেছে, যেখানে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর দুরান্ড রেখা কার্যত কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক রেখা। খাইবার পাসের একপাশের পশতুনরা প্রায়ই পরিচয়পত্র ছাড়াই অবাধে চলাচল করে, আবার শত শত জিঙ্গল ট্রাক প্রতিদিন এই সীমান্ত অতিক্রম করে। উভয় পক্ষের রাষ্ট্রগুলো আফগান ও পাকিস্তানি—তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা এই সত্তাগুলোর ভৌগোলিক অসংগতি এতটাই গভীর যে তা সম্পূর্ণভাবে সফল হওয়া কঠিন। আখেমেনীয়, কুষাণ, ইন্দো-গ্রিক, গজনভি, মুঘল এবং অন্যান্য সাম্রাজ্য—সবাই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকারভুক্ত অঞ্চল হিসেবে দেখেছিল, যেগুলো ইরানীয় মালভূমি, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত।²¹ পারস্যের শাসক নাদির শাহ (১৭৩৮ ও ১৭৩৯ সালে), তিমুরিদ সাম্রাজ্যের (তামারলেন্ড) শাসক এবং আফগানিস্তানের মতোই ভারতের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলেন, যার রাজধানী ছিল যথাক্রমে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে।

এই কারণেই ভারতীয় অভিজাতদের কাছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান তাদের নিজস্ব কৌশলগত পরিসরের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভারতের ইতিহাস ও ভূগোলের দৃষ্টিকোণ থেকে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ভারতের প্রতিবেশীই নয়, বরং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির অপরিহার্য অংশ। দিল্লি থেকে দেখলে, ভারত, ইরান, পারস্য উপসাগর এবং সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো একই কৌশলগত পরিসরের অংশ বলে মনে হয়। ফলে, নয়াদিল্লির কাছে আফগানিস্তানের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, এবং সেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ শাসন প্রতিষ্ঠা ভারতের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি।

ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান প্রায়শই ভারতের সঙ্গে একই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি বোঝায় যে ভারতের জন্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তান শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

যদিও ভারতের ভূগোল সবসময়ই সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত নয়, পাকিস্তান—যা আক্রমণের প্রধান পথ বরাবর অবস্থিত—ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতার একটি জটিল দিক। পাকিস্তান সিন্ধু নদী উপত্যকার উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত, যেখানে পাহাড় সমতলের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে আক্রমণের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করেছে। পাকিস্তান, সিন্ধু নদী উপত্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে, ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পাকিস্তানের ভূগোলও জটিল, কারণ এটি একই সঙ্গে পাহাড়, মরুভূমি এবং নদীবিধৌত সমতলভূমির সমন্বয়ে গঠিত। ফলে পাকিস্তানের ভৌগোলিক বাস্তবতা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।

পাঞ্জাবিদের দ্বারা প্রভাবিত একটি বিদেশি সত্তা, যেখানে উত্তর-পশ্চিমের পশতুনরা আফগানিস্তানের তালেবান-প্রভাবিত রাজনীতির দিকে বেশি আকৃষ্ট। একটি ঐক্যবদ্ধ পাঞ্জাব-প্রধান সেনাবাহিনী ছাড়া পাকিস্তান হয়তো অস্তিত্ব হারিয়ে ইসলামিক বৃহত্তর পাঞ্জাবের একটি ক্ষুদ্র অংশে পরিণত হতো, যেখানে বালুচিস্তান ও সিন্ধ আধা-অরাজক অবস্থায় থাকত।

মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ছিল একটি আদর্শিক কাঠামোর উপর নির্মিত: মুসলিমদের জন্য একটি স্বদেশ, যেখানে এটি সত্য যে ১৯৪৭ সালের বিভাজনের সময় বাংলার অধিকাংশ মুসলিম এবং পশ্চিম পাকিস্তান (যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছিল, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পরিণত হয়) অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবুও ভারতের মূল ভূখণ্ডে বিপুল সংখ্যক মুসলিম রয়ে গিয়েছিল, ফলে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অসংগতিগুলো তার আদর্শিক সর্বোচ্চতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে, লক্ষ লক্ষ মুসলিম ও হিন্দু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার ফলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। উপমহাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস—আক্রমণ ও অভিবাসনের ধারাবাহিকতা—ধর্ম, ভাষা ও জাতিগততার মধ্যে জটিল সম্পর্ক তৈরি করেছে। হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও শিখধর্ম ভারতের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে; আবার খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতে বিকশিত হয়েছে। এই বৈচিত্র্য ভারতের দর্শনে প্রতিফলিত হয়, যা বহুস্তরীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক; কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রদর্শন তুলনামূলকভাবে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই আংশিক কারণেই ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

তবে এই ক্ষেত্রে ভূগোল ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ দেয়। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, পাকিস্তানের রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক সুবিধা—যা তাকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত বাণিজ্যপথের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে, যা ইন্দো-ইসলামিক বিশ্বের কেন্দ্রস্থল। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে উইঙ্কের ভাষায়, “আল-হিন্দের সামুদ্রিক-স্থল সংযোগপথের মধ্যে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।” পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বালুচিস্তান এবং সিন্ধ, যেখানে আরব ও পারস্যের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে প্রবল, এই অঞ্চলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

বুর্টন স্টেইনের মতে, তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক অতীতেও ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একত্রে বিবেচিত হতো, এবং মৌর্য, মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এই অঞ্চলে কে বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করছে তা নিয়ে তেমন প্রশ্ন ছিল না। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে, এই অঞ্চলগুলো একই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে ছিল বা অন্তত একই ভূ-রাজনৈতিক পরিসরের অংশ ছিল।

আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান ভূ-রাজনীতি দেখায় যে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান, এবং মধ্য এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোও স্বাধীন। ফলে, এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

সিন্ধু নদী ও তার উপনদীগুলো—যার কেন্দ্র পাঞ্জাব—ইন্দো-ইসলামিক বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসংখ্যাগত কেন্দ্র গঠন করে। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে আলাদা করা সবসময় সহজ ছিল না। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বহু বছর ধরে আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, বিশেষত হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে, যারা পাকিস্তান-আফগান সীমান্ত অঞ্চলে সক্রিয়। এর ফলে হিন্দুকুশ পর্বতমালার দক্ষিণ ও পূর্ব অংশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে, যা মধ্য এশিয়ার অক্সাস (আমু দরিয়া) ও ত্রান্স-অক্সাস অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে—উজবেকিস্তান ও দক্ষিণ তাজিকিস্তানের দিকে।

ফলে, একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের মানচিত্র অনেকটাই প্রাচীন বিশ্বের মানচিত্রের মতো দেখাতে পারে। আফগানিস্তানের কথাই ধরা যাক—যা, যেমন আমরা দেখেছি, ইতিহাস জুড়ে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ভাগ্যে অত্যন্ত কেন্দ্রীয়—একটু ভেবে দেখা যাক। এটি এমন একটি দেশ যেখানে গড় আয়ু চুয়াল্লিশ বছর, সাক্ষরতার হার ২৮ শতাংশ (এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা আরও অনেক কম), মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে মাত্র ৯ শতাংশ মেয়ে, এবং জনসংখ্যার মাত্র এক-পঞ্চমাংশের পানযোগ্য জলের প্রাপ্তি রয়েছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে আফগানিস্তানের অবস্থান একেবারে শেষের দিক থেকে দ্বিতীয়। ২০০৩ সালে মার্কিন আক্রমণের ঠিক আগে ইরাকের অবস্থান ছিল ১৩০, এবং তার সাক্ষরতার হার ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো—৭৪ শতাংশ। যেখানে ইরাকে নগরায়নের হার ৭৭ শতাংশ, ফলে ২০০৭ সালে সৈন্যবৃদ্ধির সময় বৃহত্তর বাগদাদে সহিংসতা কমানো পুরো দেশকে শান্ত করতে সাহায্য করেছিল, সেখানে আফগানিস্তানে নগরায়নের হার মাত্র ৩০ শতাংশ: অর্থাৎ একটি গ্রাম বা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করার প্রচেষ্টা অন্য কোথাও প্রভাব ফেলতে নাও পারে।

মেসোপটেমিয়া, যেখানে সমতল ভূমিতে বৃহৎ নগরসমূহ রয়েছে, সামরিক দখলদার বাহিনীর জন্য উপযোগী; কিন্তু আফগানিস্তান ভূগোলের দিক থেকে প্রায় দেশ বলেই মনে হয় না। এর ভেতরে গির্জার মতো উঁচু পর্বতমালার সারি রয়েছে, যা পশতুন, তাজিক এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিভাজনকে আরও দৃঢ় করে, যদিও প্রাকৃতিক বাধার দিক থেকে আফগানিস্তানকে পাকিস্তান বা ইরান থেকে আলাদা করে এমন তেমন কিছু নেই। ভূ-প্রকৃতির মানচিত্রে দেখা যায়, বিশ্বের ৪২ মিলিয়ন পশতুনের অর্ধেকেরও বেশি পাকিস্তানে বাস করে; তাই কল্পনায় “পশতুনিস্তান” নামে একটি রাষ্ট্র গঠন করা যায়, যা হিন্দুকুশ পর্বতমালা ও সিন্ধু নদীর মাঝখানে অবস্থিত, এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অংশগুলোর উপর বিস্তৃত।

আফগানিস্তান প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয় আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন আহমদ খান—নাদির শাহের পারসিক সেনাবাহিনীর আবদালি অংশের নেতা—পারস্য এবং ভেঙে পড়া মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি বাফার অঞ্চল তৈরি করেন, যা পরে জারশাসিত রাশিয়া ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যবর্তী বাফার অঞ্চলে পরিণত হয়। ফলে বলা যায়, মধ্য এশিয়ায় সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যের ধীর অবসান এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্রমাগত দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে একটি ঐতিহাসিক পুনর্গঠন ঘটছে, যার ফলে ভবিষ্যতে আফগানিস্তান রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে: যেমন, ভবিষ্যতে হিন্দুকুশ (যা প্রকৃতপক্ষে উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত) পশতুনিস্তান এবং বৃহত্তর তাজিকিস্তানের মধ্যে সীমানা হয়ে উঠতে পারে। তালেবান—যা পশতুন জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা, মাদক অর্থ, দুর্নীতিগ্রস্ত সামন্তপ্রভু এবং আমেরিকান দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ঘৃণার ফল—এশিয়া বিশেষজ্ঞ সেলিগ হ্যারিসনের ভাষায়, হয়তো এই বৃহৎ ও গভীর রূপান্তরের কেবল বাহন মাত্র, যা ওয়াশিংটনে অধৈর্য বেসামরিকদের দ্বারা পরিচালিত কোনো বিদেশি সামরিক শক্তির দ্বারা থামানো সম্ভব নয়।

কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে—যা এই ধরনের নির্ধারণবাদকে অস্বীকার করে। আফগানিস্তান ইরাকের চেয়ে বড় এবং জনসংখ্যা বেশি ছড়িয়ে থাকা—এই বিষয়টি মূলত ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রধান সড়ক নেটওয়ার্কের ৩৫ মাইলের মধ্যে বাস করে, যা মধ্যযুগীয় কাফেলার পথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে ৩৪২টি জেলার মধ্যে মাত্র ৮০টিই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আহমদ খানের সময় থেকে আফগানিস্তান কমবেশি কেন্দ্র থেকে শাসিত হয়েছে: কাবুল, সবসময় কর্তৃত্বের কেন্দ্র না হলেও, অন্তত একটি সালিশি কেন্দ্র ছিল। বিশেষত ১৯৩০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৭০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত, আহমদ খানের বংশধর জহির শাহের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের অধীনে আফগানিস্তান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও গঠনমূলক শাসন অভিজ্ঞতা লাভ করে। প্রধান শহরগুলো সড়কপথে যুক্ত ছিল, যেখানে নিরাপদে যাতায়াত করা যেত, এবং উন্নয়নমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচির মাধ্যমে ম্যালেরিয়া প্রায় নির্মূলের পথে ছিল। এই সময়ের শেষ দিকে আমি নিজে আফগানিস্তান জুড়ে হিচহাইকিং করেছি এবং স্থানীয় বাসে ভ্রমণ করেছি, কখনো নিরাপত্তাহীন বোধ করিনি, এমনকি ডাকঘরের মাধ্যমে বই ও পোশাক বাড়িতে পাঠাতেও পেরেছি। ইরান, পাকিস্তান বা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পৃথক একটি শক্তিশালী আফগান জাতীয় পরিচয়ও তখন বিদ্যমান ছিল। এটি হয়তো উপজাতীয় সম্পর্কের একটি ভঙ্গুর জাল ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে এটি কেবল একটি বাফার রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠছিল। পশতুনিস্তান একটি বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্বের মতোই আফগানিস্তানও নিশ্চিতভাবেই একটি বাস্তবতা। ১৯৭০-এর দশকে কাবুলে তিনটি অভ্যুত্থানের জন্য, যা দেশের দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতার সূচনা করে, দায় কেবল আফগানদের নয়, বরং পার্শ্ববর্তী বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নেরও।

দেশটিকে নিজেদের প্রভাববলয়ে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার প্রয়াসে সোভিয়েতরা অনিচ্ছাকৃতভাবে আফগান রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে, যার ফলে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে তাদের আক্রমণ ঘটে। কারণ আফগানিস্তান, যা ইরানীয় মালভূমি, মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে একটি ভৌগোলিক বাফার, অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এবং তাই শুধু রাশিয়াই নয়, ইরান, পাকিস্তান এবং ভারতীয় নীতিনির্ধারকরাও এটি নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী।

তালেবান-প্রভাবিত একটি আফগানিস্তান ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উগ্র ইসলামি সমাজ গঠনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এটি কার্যত একটি “বৃহত্তর পাকিস্তান”-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে, যা পাকিস্তানের আইএসআই-কে একটি গোপন সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুযোগ দেবে—যেখানে জালালউদ্দিন হাক্কানি, গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার এবং লস্কর-ই-তৈবার মতো গোষ্ঠীগুলো থাকবে—যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হবে। বিপরীতে, একটি শান্তিপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে উদার কাবুল-শাসিত আফগানিস্তান নয়াদিল্লিকে তার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করবে, এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানকে তার পশ্চিম ও পূর্ব উভয় সীমান্ত থেকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেবে। এ কারণেই ১৯৮০-এর দশকে ভারত কাবুলে সোভিয়েত-সমর্থিত মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ সরকারের সমর্থন করেছিল—যা কিছু প্রো-পাকিস্তানি ইসলামপন্থী মুজাহিদিনের তুলনায় ধর্মনিরপেক্ষ এবং অপেক্ষাকৃত উদার ছিল—এবং একই কারণে আজও ভারত হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে সমর্থন করে।

একটি স্থিতিশীল ও মাঝারি পথের আফগানিস্তান শুধু দক্ষিণ মধ্য এশিয়ার নয়, বরং সমগ্র ইউরেশিয়ার একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। ম্যাকিন্ডারের হার্টল্যান্ড ধারণা এখানে প্রতিফলিত হয়, যেখানে রাশিয়া, চীন, ভারত এবং ইরানের স্বার্থ একত্রিত হয়ে মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে পরিবহন করিডোর গড়ে তোলার দিকে ধাবিত হয়।

ইউরেশিয়ার বাণিজ্যপথের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি হলো চীন ও ভারতের অর্থনীতি। মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থলপথে ভারতীয় বাণিজ্য বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হয়। আফগানিস্তান যুদ্ধাবস্থায় থাকার কারণেই নয়াদিল্লি এখনো ট্রাক, ট্রেন বা ট্রান্স-কাস্পিয়ান জাহাজের মাধ্যমে ইস্তাম্বুল বা তিবলিসির সঙ্গে, কিংবা সড়ক ও রেলপথে আলমাটি ও তাশখন্দের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। তবুও, ভারত ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিতভাবে আফগানিস্তানের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ভারত-অর্থায়িত জারাঞ্জ-দেলারাম মহাসড়ক পশ্চিম আফগানিস্তানকে আরব সাগরের ইরানি বন্দর চাবাহারের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

একটি শান্ত আফগানিস্তান ভারতের জন্য কী সুবিধা আনতে পারে তা ভারতীয়রা উপলব্ধি করতে পারে, যদিও তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি সহিংসতার মধ্যে রয়েছে। কারণ একটি শান্ত আফগানিস্তান শুধু নিজের ভেতরেই নয়, পাকিস্তানসহ আশেপাশের অঞ্চলেও সড়ক, রেলপথ ও পাইপলাইন নির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে—যা পাকিস্তানের অস্থিরতারও চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে। যদিও শান্তিপূর্ণ একটি অঞ্চল ভারতের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী, কারণ তার অর্থনীতি চীন ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বড়।

কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি নেই। এখন বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে একটি। সাম্রাজ্য ও আক্রমণের ইতিহাস এখানে জীবন্ত, কারণ তা আজকের গভীর অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অনেক দিক থেকে বৃহত্তর ভারত আধুনিক যুগের শুরুর ইউরোপের মানচিত্রের মতো, তবে পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে আরও বিপজ্জনক। সেই সময় ইউরোপে বিভিন্ন জাতিগত ও জাতীয় গোষ্ঠী প্রশাসনিক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছিল, একই সঙ্গে শক্তির ভারসাম্যের জটিল ব্যবস্থায় জড়িয়ে ছিল, যা ভুল বোঝাবুঝির কারণে মাঝে মাঝে যুদ্ধে পরিণত হতো। আধুনিক জাতীয়তাবাদ তখন যেমন তরুণ ও শক্তিশালী ছিল, আজ দক্ষিণ এশিয়ায়ও তেমনই। কিন্তু সেই বহুমেরু ইউরোপের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ায় রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিমুখী সংঘাত, যেখানে আফগানিস্তান একটি যুদ্ধক্ষেত্র এবং বিতর্কিত হিমালয় রাজ্য কাশ্মীর আরেকটি। তবে এই সংঘাত শীতল ও নিয়ন্ত্রিত নয়; এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক শত্রুতার সংঘাত, যেখানে একটি হিন্দু-প্রধান (যদিও ধর্মনিরপেক্ষ) রাষ্ট্র এবং একটি মুসলিম রাষ্ট্র মুখোমুখি, এবং তাদের মধ্যে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ একটি অভিন্ন সীমান্ত। পাকিস্তানের সিন্ধু নদী অববাহিকা এবং ভারতের গঙ্গা অববাহিকার মধ্যে দূরত্ব দুইশ মাইলেরও কম। এই ভূগোলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি বন্ধ ও সংকীর্ণ—যেমনটি পল ব্র্যাকেন নতুন পারমাণবিক যুগ নিয়ে তার বিশ্লেষণে বর্ণনা করেছেন।

ভারত মরিয়া হয়ে এই ভূগোল এবং এই ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। চীনের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা ও একাগ্রতা এই মুক্তির প্রচেষ্টারই একটি অংশ। চীনের সঙ্গে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো মোটেই নয়: এটি আরও বিমূর্ত, কম আবেগপ্রবণ, এবং (অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণভাবে) কম অস্থির। এবং এটি এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যার পেছনে প্রকৃতপক্ষে কোনো ইতিহাস নেই।

প্রায় অর্ধশতাব্দী হয়ে গেছে, যখন ভারত একটি বিতর্কিত হিমালয় সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, যেখানে উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মীরের নিকটবর্তী আকসাই চিন অঞ্চলে এবং উত্তর-পূর্বে ভুটানের কাছে অরুণাচল প্রদেশে চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৬২ সালের এই যুদ্ধের পটভূমি—যেখানে ২,০০০-এরও বেশি সৈন্য নিহত এবং ২,৭৪৪ জন আহত হয়েছিল—ছিল ১৯৫৯ সালের তিব্বত বিদ্রোহ, যা ১৯৫০ সালে চীনের তিব্বত আক্রমণের পর দালাই লামাকে ভারতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছিল। একটি স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত, যা সামান্য হলেও ভারতপন্থী, চীনা কৌশলবিদদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলত। তিব্বত সংকটের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, বিতর্কিত সীমার উত্তরে ভারতীয় আউটপোস্ট স্থাপনকে চীন যুদ্ধের কারণ হিসেবে দেখেছিল, এবং শরৎকালের এক মাসের লড়াইয়ে ভারতীয় বাহিনীকে পরাস্ত করেছিল। কোনো পক্ষই তাদের নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী ব্যবহার করেনি, ফলে যুদ্ধটি সীমাবদ্ধ ছিল এমন দূরবর্তী অঞ্চলে যেখানে জনসংখ্যা কম, যা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের বিপরীত—যেখানে জলাভূমি ও মরুভূমি পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাসকারী কৃষিসমৃদ্ধ পাঞ্জাব অঞ্চল বিস্তৃত।

ভারত-চীন সীমান্ত এখনও কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত। চীন তিব্বত জুড়ে সড়ক ও বিমানঘাঁটি নির্মাণ করেছে, এবং এখন ভারত চীনা যুদ্ধবিমানের কার্যপরিধির মধ্যে পড়ে, যদিও ভারতীয় বিমানবাহিনী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম, যার ১,৩০০-এরও বেশি বিমান ষাটটিরও বেশি ঘাঁটিতে বিস্তৃত। ভারতীয় উপগ্রহ ও রিকনেসান্স বিমান তিব্বতে চীনা সেনা চলাচল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর রয়েছে উভয় দেশের নৌবাহিনীর উত্থান। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে চীনা নৌবাহিনীর উত্থান আলোচনা করা হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে, ভূমধ্যসাগরের মতো কোনো আবদ্ধ সমুদ্র বা দ্বীপপুঞ্জ না থাকায়, এবং পৃথিবী উষ্ণ ও উৎপাদনশীল হওয়ায়, ভারত সম্প্রতি পর্যন্ত মূলত স্থলভিত্তিক একটি দেশ ছিল, যা উন্মুক্ত মহাসাগরের পাশে অবস্থান করত। কিন্তু সামরিক প্রযুক্তির অগ্রগতি, যা সমুদ্রভিত্তিক দূরত্বকে সংকুচিত করেছে, এবং ভারতের অর্থনীতির বিকাশ, যা বড় আকারের জাহাজ নির্মাণ ও ক্রয়ের অর্থ জোগাতে পারে, এই পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। আরেকটি কারণ যা ভারতকে সমুদ্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা হলো চীনের হুমকি, কারণ চীনের নিজস্ব নৌ-আকাঙ্ক্ষা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করছে।

চীন ভারতের চারপাশে বন্দর নির্মাণ বা উন্নত করতে সাহায্য করছে: মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা এবং পাকিস্তানের গওয়াদর। এই দেশগুলোর সবগুলোতেই চীন উল্লেখযোগ্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমর্থন প্রদান করছে। চীনের ইতিমধ্যেই একটি বিশাল বাণিজ্যিক নৌবহর রয়েছে এবং একটি গভীর সমুদ্রগামী নৌবাহিনী গড়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যা তার স্বার্থ রক্ষা করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে চীনের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত রাখবে। একই সময়ে, ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত সমগ্র ভারত মহাসাগর জুড়ে একধরনের মনরো নীতির মতো উপস্থিতি গড়ে তুলতে চায়। এই দুই দেশের নৌ-স্বার্থের ব্যাপক ওভারল্যাপ হিমালয়ের উত্তর সীমান্তের অমীমাংসিত বিরোধগুলোকে আরও জটিল করে তোলে। চীন মূলত তার সমুদ্র যোগাযোগের পথগুলো সুরক্ষিত রাখতে আধুনিক বন্দর ব্যবহার করছে। কিন্তু ভারত নিজেকে পরিবেষ্টিত মনে করে। পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে গওয়াদরে সম্ভাব্য পাকিস্তান-চীন নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ভারতের আরব সাগরের কারওয়ার নৌবন্দর সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। মিয়ানমারের কিয়াউকপিউতে চীন যে বন্দর ও জ্বালানি পাইপলাইন নির্মাণ করছে, তার প্রতিক্রিয়ায় ভারত উত্তর দিকে পঞ্চাশ মাইল দূরে সিত্তে নিজস্ব বন্দর ও জ্বালানি প্রকল্প শুরু করেছে, কারণ পশ্চিম ইন্দোচীনে রুট ও সম্পদের জন্য ভারত ও চীন তাদের প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে।

তবুও আবারও বলা যায়, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি নতুন সংগ্রাম, যার পেছনে ইতিহাসের শক্তি নেই। অতীতে ভারত ও চীনের মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল তা প্রায়শই ইতিবাচক ছিল: বিশেষত প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারত থেকে চীনে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার, যা পরবর্তীতে তাং রাজবংশের রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হয়। তিব্বতের প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও—যেখানে তিব্বতের স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে উপকারী হলেও চীনের জন্য ক্ষতিকর—হিমালয়ের উচ্চ প্রাচীর মূলত এই দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বিভাজন তৈরি করে।

শুধু সাম্প্রতিক দশকগুলোতেই, যখন পূর্বের দেশগুলোর নিজস্ব সামরিক শক্তি সমুদ্র, আকাশ এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করেছে, তখনই ইউরেশিয়া জুড়ে সংঘাতের এক নতুন ভৌগোলিক চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দূরত্বের অবসান—সভ্যতাগত বিভেদের চেয়ে অনেক বেশি—আজ ভারত-চীন সম্পর্কের প্রধান সমস্যা। শুধু ভারতের নীতিনির্ধারক শ্রেণিই চীন নিয়ে উদ্বিগ্ন, অথচ পাকিস্তানের সমস্যা পুরো দেশকে, বিশেষত উত্তর ভারতকে, আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তদুপরি, ভারত ও চীন বিশ্বের অন্যতম গতিশীল এবং পরস্পর-সম্পূরক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এক অর্থে, ভারত-চীন উত্তেজনা সাফল্যের সমস্যাকেই তুলে ধরে: বিশাল অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যা নয়াদিল্লি ও বেইজিং উভয়কেই এখন সামরিক কাজে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে, বিশেষ করে ব্যয়বহুল বিমান ও নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে। নিঃসন্দেহে, নতুন ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্র্যাকেনের সেই ধারণাকে জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে যুদ্ধের প্রযুক্তি ও সম্পদ সৃষ্টির প্রযুক্তি পাশাপাশি চলে, এবং পৃথিবীর সীমিত পরিসর ক্রমশ অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠছে, কারণ সামরিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে দূরত্বকে সংকুচিত করছে।

অতএব, ঠান্ডা যুদ্ধের পর প্রথম কয়েক দশক ধরে ভারত ও চীনের স্থলবাহিনী তুলনামূলকভাবে নিম্নপ্রযুক্তির ছিল, যারা নিজেদের সীমান্ত পাহারা দিত এবং জাতীয় সংহতির প্রাচীর হিসেবে কাজ করত। ফলে তারা একে অপরের জন্য হুমকি ছিল না। কিন্তু যখন বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ তাদের সামরিক ভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত হলো, এবং তাদের সেনাবাহিনী আরও বহির্মুখী হয়ে উঠল, তখন হঠাৎ করেই তারা নিজেদেরকে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের বিপরীত প্রান্তে দেখতে পেল। এটি শুধু ভারত ও চীনের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, বরং ইউরেশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—ইসরায়েল, সিরিয়া, ইরান, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি—যারা এখন পরস্পরের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে এক নতুন ও বিপজ্জনক ভৌগোলিক বন্ধনে আবদ্ধ।

এখন দেখা যাক ভারতীয় উপমহাদেশকে। সমুদ্র ও পর্বতমালায় ঘেরা হলেও এটি ভেতরে বিশাল, এবং প্রাথমিক রাজনৈতিক ঐক্য ও সংগঠনের জন্য প্রাকৃতিক ভিত্তির অভাব আজও স্পষ্ট—কারণ গণতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও চীন এখনও ভারতের তুলনায় অধিক সংগঠিত ও দক্ষভাবে পরিচালিত। চীন প্রতি বছর যত মাইল মহাসড়ক নির্মাণ করে, ভারতের মোট মহাসড়কও তার চেয়ে কম। ভারতের মন্ত্রণালয়গুলো চীনের তুলনায় ভারী ও দুর্বল। চীনে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ থাকলেও, ভারতে রয়েছে সহিংস বিদ্রোহ—বিশেষ করে দেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে মাওবাদী প্রবণতার নকশালদের আন্দোলন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ফেয়ারগ্রিভের “কম উন্নত” সভ্যতার বর্ণনা এখনও কিছুটা প্রযোজ্য।

যে ব্যক্তি দিল্লিতে বসে, যার পেছনে মুসলিম মধ্য এশিয়া, তাকে এখনও উত্তর-পশ্চিমের মালভূমিতে অস্থিরতা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তার সেনা প্রত্যাহার করবে, কিন্তু ভারতকে সেই পরিণতির সঙ্গে বসবাস করতে হবে এবং তাই গভীরভাবে জড়িত থাকতে হবে। ভারত এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। নতুন শতাব্দীতে তার মহাশক্তি হিসেবে উত্থান চীনের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতার দ্বারা শক্তিশালী হবে, কিন্তু একই সঙ্গে উপমহাদেশের ভেতরে দুর্বল ও আংশিকভাবে অকার্যকর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সীমান্ত তাকে আটকে রাখবে। আমরা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কথা বলেছি, কিন্তু নেপাল ও বাংলাদেশকেও সংক্ষেপে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজতন্ত্রের অবসান এবং প্রাক্তন মাওবাদী বিদ্রোহীদের ক্ষমতায় আগমনের পর নেপালের সরকার গ্রামীণ অঞ্চলে খুব সামান্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে, যেখানে দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ বাস করে। কখনো উপনিবেশ না হওয়ায়, নেপাল ব্রিটিশদের কাছ থেকে শক্তিশালী প্রশাসনিক ঐতিহ্য পায়নি। হিমালয়ের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও, নেপালের অধিকাংশ মানুষ ভারতের সঙ্গে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন সীমান্তের ধারে আর্দ্র ও নিচু ভূমিতে বাস করে। আমি নিজে এই অঞ্চল ভ্রমণ করেছি: অনেক দিক থেকে এটি গঙ্গা সমভূমির মতোই। যদি নেপাল সরকার রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তবে রাষ্ট্রটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে পারে। বাংলাদেশ, নেপালের চেয়েও বেশি, একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মরক্ষার জন্য কোনো ভৌগোলিক প্রতিরক্ষা নেই: সীমান্তের উভয় পাশে একই সমতল, জলাভূমি ও ধানক্ষেতের ভূদৃশ্য; সীমান্ত পোস্টগুলো, যেমন আমি দেখেছি, জীর্ণ, বিশৃঙ্খল এবং দুর্বল। এই কৃত্রিমভাবে গঠিত ভূখণ্ড—যা একসময় বাংলা, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশ ছিল—আঞ্চলিক রাজনীতি, মুসলিম ধর্মীয় উগ্রতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল প্রভাবে আবারও রূপান্তরিত হতে পারে।

পাকিস্তানের মতোই, বাংলাদেশের ইতিহাসও সামরিক ও বেসামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা, যেগুলোর খুব কমই যথেষ্ট কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শরণার্থী ইতিমধ্যেই অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। তবুও, এই লেখার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে এবং তার কর্মক্ষমতা উন্নত করছে। ভবিষ্যতে এটি ভারত, চীন এবং একটি সম্ভাব্য স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বার্মাকে সংযুক্তকারী স্থলবাণিজ্য ও পাইপলাইন রুটের একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও সফল হতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকেই উপমহাদেশ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ছিল, এবং এই বিভাজনই আজও তার সমস্যার মূল। এখন আমরা চরম উত্তরের দিকে তাকাই, যেখানে কারাকোরাম হিমালয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এখানেই কাশ্মীরের অঞ্চল, যা পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত এবং চীনের মাঝে গুঁজে আছে। কারাকোরাম পর্বতমালার উত্তরাঞ্চল, গিলগিট শহরসহ, পাকিস্তানের দখলে এবং ভারতের দাবিকৃত; একইভাবে পশ্চিমে আজাদ (“মুক্ত”) কাশ্মীরের অংশও। কাশ্মীরের কেন্দ্রে লাদাখ পর্বতমালা, যেখানে শ্রীনগর ও জম্মু শহর রয়েছে, ভারতের প্রশাসনে থাকলেও পাকিস্তান তা দাবি করে, যেমনটি উত্তরে সিয়াচেন হিমবাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আরও উত্তরে ও উত্তর-পূর্বে রয়েছে শাকসাম উপত্যকা ও আকসাই চিন, যা চীনের নিয়ন্ত্রণে কিন্তু ভারতের দাবিকৃত। তদুপরি, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে (লাদাখ পর্বতমালা) ৭৫ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, যা বহু বছর ধরে জিহাদি বিদ্রোহকে উসকে দিয়েছে। প্রয়াত ওসামা বিন লাদেন তার বক্তব্যে কাশ্মীরে হিন্দু ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তবুও কাশ্মীরের বড় অংশই উচ্চভূমির জনবসতিহীন দুর্গম এলাকা। কিন্তু এই অঞ্চলগুলোকে ঘিরে যুদ্ধ হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে। চীন ১৯৬২ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, কারণ তারা শিনজিয়াং থেকে তিব্বত পর্যন্ত পূর্ব কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করতে চেয়েছিল। ভারত চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি সীমান্ত সংযোগ প্রতিহত করতে।

কাশ্মীর, ফিলিস্তিনের মতোই, সাইবারস্পেস ও নতুন গণমাধ্যমের প্রভাবে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে ঘৃণা উসকে দিতে পারে, ফলে এর জটিল সমস্যার সমাধান আরও দূরে সরে যেতে পারে। কারণ যে প্রযুক্তিগুলো ভূগোলের বাধা কমিয়ে দেয়, সেগুলোই আবার ভূগোলের গুরুত্বও বাড়িয়ে তুলতে পারে। উপমহাদেশ একটি কঠোর ভৌগোলিক বাস্তবতা, কিন্তু এর সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকবে।

যেখানে প্রাচীন চীনা রাজবংশগুলো প্রায় সম্পূর্ণরূপে বর্তমান চীনের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ভারতের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত রাজবংশগুলো, যেমন আমরা দেখেছি, তেমন নয়। ফলে ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো—যেমন আফগানিস্তান ও অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চল—নিয়ে চীনের তুলনায় কম নিশ্চিন্ত। ভারত যতটা এই ভূগোলের দ্বারা আবদ্ধ, ততটাই এটি একটি আঞ্চলিক শক্তি; আর যতটা এটি এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে, ততটাই এটি একটি সম্ভাব্য মহাশক্তি।

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান

দর্শন ও বৈদিক বিজ্ঞান যখন নিউটন আপেলের ফলকে গাছ থেকে নিচে পড়তে দেখেছিলেন, তখন তাঁর মনে এই উহা ও তর্কের উদ্ভব হয়েছিল যে আপেল নিচেই কেন পড়ল...

Post Top Ad

ধন্যবাদ