ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

01 April, 2026

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

01 April 0

 বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

প্রশ্ন- পরমাত্মা সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের বহু মানুষের মধ্যে কেবল চার ঋষিকেই জ্ঞান কেন দিলেন? কি ঈশ্বর পক্ষপাতী? আবার এই প্রশ্নও আছে যে পরমাত্মা তাঁর জ্ঞান বৈদিক ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষাতেই কেন দিলেন? এতে কি অন্যান্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে ভেদভাব বা দোষ পরমেশ্বরের উপর আসে না?

উত্তর- এটি সত্য যে সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মে বহু স্ত্রী-পুরুষ যুগল উৎপন্ন হয়। তারাও পূর্ণ যৌবন অবস্থায় পৃথিবী-রূপী গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়। যারা পূর্ণ যৌবন অবস্থা ও ভূমি থেকে উৎপত্তি নিয়ে সন্দেহ করেন, তাদের মহর্ষি দয়ানন্দ কৃত ‘সত্যার্থ-প্রকাশ’ এবং মদ্রচিত ‘সত্যার্থ প্রকাশ উভরতে প্রশ্ন-গর্জতে উত্তর’ নামক গ্রন্থগুলি পড়ার চেষ্টা করা উচিত। বিস্তারের ভয়ে আমরা এই বিষয়টি এখানে ছেড়ে দিচ্ছি। তদুপরি প্রত্যেক বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার পাঠক এটি মানবে যে প্রথম প্রজন্মের উৎপত্তি কেবল এইভাবেই সম্ভব।

সেই প্রথম প্রজন্মে সেই চার ঋষিই সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও সামর্থ্যসম্পন্ন ছিলেন। এই কারণে তাঁদেরই জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা সকলকে জ্ঞান প্রদান করতে পারেন। সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞান দেওয়ার বিষয়ে সন্দেহের প্রসঙ্গে জানা উচিত যে সেই সময় সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ভাষার উৎপত্তিই হয়নি। যা উৎপন্ন হয়েছিল তা কেবল সংস্কৃত বৈদিক ভাষাই ছিল, তাও বৈদিক ছন্দের রূপে। পরে সেই ঋষিরাই এই ভাষাকে কথ্য ভাষায় ব্যবহার করেছিলেন। কালক্রমে সংস্কৃত ভাষা থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে বিশ্বে বহু ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে সংস্কৃত ভাষাই সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছে। আজ বিশ্বজুড়ে এটি সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে সংস্কৃত ভাষাই সমস্ত মানব ভাষার জননী। এই কারণে সংস্কৃত ভাষায়ই জ্ঞান দেওয়া অনিবার্যও ছিল এবং নিরপেক্ষতাও ছিল।

প্রশ্ন- যদি ছন্দ অন্য কোনো ভাষা যেমন হিন্দি, ইংরেজি, চীনা, আরবি ইত্যাদি কোনো এক ভাষায় হতো এবং সেই ভাষা থেকে অন্যান্য ভাষার উৎপত্তি হয়ে যেত, তবে কী অসুবিধা ছিল? ঈশ্বরের কি কেবল সংস্কৃত ভাষার প্রতিই প্রেম ছিল? এটি কি সংস্কৃত ভাষাবিদদের নিজস্ব কল্পনা ও পূর্বাগ্রহ নয়?

উত্তর- হ্যাঁ, যেখানে পর্যন্ত কোনো এক ভাষার প্রথম উৎপত্তির প্রশ্ন, সেখানে পর্যন্ত আপনার প্রশ্ন যথার্থ ও স্বাভাবিক। আমরা 'বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান' নামক অধ্যায়ে স্পষ্ট করব যে বৈদিক সংস্কৃত ভাষার শব্দগুলির সঙ্গে তাদের অর্থের সম্পর্ক নিত্য। যে শব্দের যে অর্থ, সেই অর্থ কোনো মানুষ নিজের কল্পনা থেকে গ্রহণ করেনি, বরং সেই অর্থ সেই শব্দের সঙ্গে নিত্য সম্পর্কযুক্ত। যে বস্তু বিশেষ যখন সৃষ্টি-প্রক্রিয়ায় নির্মিত হচ্ছিল, তখনই সেই বিশেষ শব্দেরও উৎপত্তি হচ্ছিল। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় বাচক ও বাচ্য-এর সম্পর্ক নিত্য, প্রাকৃতিক, ঈশ্বরীয়, মানবীয় কখনোই নয়। এই বিশেষতা অন্য কোনো ভাষায় নেই। এইভাবে বৈদিক শব্দই নিত্য, অন্য কোনো ভাষার শব্দ নয়। বৈদিক শব্দই প্রাণরূপ হয়ে সৃষ্টির সমস্ত পদার্থের উপাদান কারণও, অথচ এই বিশেষতা কোনো মানব ভাষায় নামমাত্রও নেই। এই কারণে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা কোনো শ্রেণী, দেশ বা সম্প্রদায়, এমনকি কেবল পৃথিবীবাসী মানবজাতির ভাষাও নয়, বরং এটি ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা। বৈদিক ছন্দ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণবায়ু Vibrations-এর রূপে ব্যাপ্ত। বিভিন্ন সূক্ষ্ম কণার উৎপত্তিও এগুলি থেকেই হয়েছে। এইভাবে বৈদিক সংস্কৃত ভাষা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, শাশ্বত ও সর্বদেশীয় হওয়ায় অত্যন্ত সুসংবদ্ধ। এর ব্যাকরণ অন্য যে কোনো ভাষার ব্যাকরণের তুলনায় অধিক সুসংবদ্ধ। আধুনিক কালে প্রাপ্ত একমাত্র প্রামাণিক ব্যাকরণ-ভিত্তিক গ্রন্থ পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ী আজও বিশ্বব্যাপী ভাষাবিজ্ঞানীদের জন্য আশ্চর্যজনক আদর্শ।

এই অষ্টাধ্যায়ীর গুরুত্ব বর্ণনা করা কয়েকটি উক্তি আমরা 'অষ্টাধ্যায়ী ভাষ্য প্রথমাবৃত্তি- পং. ব্রহ্মদত্ত জিজ্ঞাসু, সংস্করণ ২০৪২ বিন.স. সন ১৬৮৫-এর প্রাক্কথন থেকে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করছি—

(১) তত্রাশক্যং বর্ণেনাপ্যনর্থকেন ভবিতুং কিং পুনরিয়তা সূত্রেণ (মহাভাষ্য-১.১.১ চৌখম্বা সংস্করণ)
অর্থাৎ তাঁর অর্থাৎ ভগবান পাণিনি-এর একটি বর্ণও অনর্থক নয়, তবে এত বড় সূত্রের তো কথাই নেই? মহর্ষি পতঞ্জলি পুনরায় বলেন—
সামর্থ্যযোগান্নহি কিঞ্চিদস্মিন্ পশ্যামি শাস্ত্রে যদনর্থক স্যাত্ অর্থাৎ শাস্ত্রের সামর্থ্য দ্বারা আমি এই শাস্ত্রে এমন কিছুই (কোনো বর্ণ বা পদ) দেখি না, যা অনর্থক হয়।

(২) চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং— শব্দ এবং অক্ষর বিষয়ক কোনো জ্ঞানই এতে অবশিষ্ট থাকে না।
(৩) মোনিয়ের উইলিয়ামস— অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থ মানব মস্তিষ্কের প্রতিভার আশ্চর্যতম অংশ, যা মানব মস্তিষ্কের সামনে এসেছে।
(৪) হন্টার— মানব মস্তিষ্কের অতীব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এই অষ্টাধ্যায়ী।
(৫) লেনিনগ্রাদ-এর প্রো. টি. ভাত্স্কি— মানব মস্তিষ্কের এই অষ্টাধ্যায়ী সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা।

এইভাবে সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের এই গ্রন্থ বিশ্বে আজও সকলের সম্মানের পাত্র। এই গ্রন্থের পূর্বেও বহু বৈয়াকরণ হয়েছেন। বহু বৈয়াকরণের নাম ভগবান পাণিনি নিজেই তাঁর অষ্টাধ্যায়ীতে উল্লেখ করেছেন। যে কোনো ভাষার ব্যাকরণ পৃথিবীতে সর্বাধিক সুসংবদ্ধ ও বিস্ময়ের কারণ হয়, সেই ভাষাই তো পরমাত্মার দ্বারা প্রথম উৎপন্ন প্রাকৃতিক ব্রহ্মাণ্ডীয় ভাষা হতে পারে। এই কারণে পৃথিবীর সুবিজ্ঞ ব্যক্তিদের উচিত যে তারা সংস্কৃত ও বেদের দিকে অবশ্যই অগ্রসর হওয়ার প্রবল চেষ্টা করুন। এদের উপর মানবমাত্রের সমান অধিকার আছে। পৃথিবীকে আর্য্যাবর্তবাসীদের (ভারতবাসীদের) এজন্য ধন্যবাদ জানানো উচিত যে তারা অন্তত এগুলিকে কিছুটা হলেও সংরক্ষিত রেখেছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বেদপাঠী ব্রাহ্মণদের প্রতিও পৃথিবীর ঋণী হওয়া উচিত, যারা এই মহৎ সম্পদকে নিজেদের কণ্ঠে সংরক্ষণ করে বিনাশ থেকে রক্ষা করেছেন।

এইভাবে আমরা এটি প্রমাণ করেছি যে অগ্নি, বায়ু ইত্যাদি চার ঋষির মধ্যে সর্বসৃষ্টা পরমাত্মা বৈদিক ছন্দগুলির মাধ্যমে জ্ঞান ও ভাষার উৎপত্তি করেছেন। এই কথাই ভগবান মনু মহারাজ বলেছেন—
অগ্নিবায়ুরভিভ্যস্তু ত্রয়ং ব্রহ্ম সনাতনম্। দুদোহ যজ্ঞসিদ্ধ্যর্থমৃগ্যজুঃসামলক্ষণম্ ॥ (মনু.১.২৩)

এর অর্থ করতে গিয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা ও সত্যার্থ প্রকাশ-এ লিখেছেন—
অগ্নি, বায়ু, আদিত্য এবং অঙ্গিরা এই চার ঋষিকে জ্ঞান দেওয়া হয়। এখানে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে যে বেদ তিন না চার? এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করে গ্রন্থ বা আয়তন বৃদ্ধি করতে চাই না। এ বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দকৃত গ্রন্থগুলির সঙ্গে বহু আর্য বিদ্বান যথেষ্ট ও সিদ্ধান্তমূলক লিখেছেন। পাঠক সেখানে দেখতে পারেন। হ্যাঁ, বৈদিক বিদ্যা অবশ্যই ঋক্, যজুঃ ও সাম এই তিন লক্ষণযুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক অর্থাৎ আধিদৈবিক রূপ আমাদের এই গ্রন্থে পদে পদে পাওয়া যাবে। এখানে একটি সন্দেহ বিদ্বানদের মধ্যে অবশ্যই উপস্থিত হতে পারে, যার সমাধান সম্ভবত আর্য বিদ্বানরাও কোথাও করেননি, এমন আমাদের ধারণা। সেই সন্দেহ এই যে মহর্ষি দয়ানন্দ এখানে ‘অগ্নি’, ‘বায়ু’ ও ‘রবি’ এই তিন নাম দ্বারা অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চারটির গ্রহণ কেন করলেন? একইভাবে সত্যার্থ প্রকাশ গ্রন্থে শতপথের প্রমাণে অগ্নি, বায়ু ও সূর্য থেকে ‘অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা’ এই চার নামের গ্রহণ কেন করা হলো? এটি কি স্বেচ্ছাচারিতা ও পূর্বাগ্রহের প্রমাণ নয়? বেদ চার এবং ঋষিও চার—এর বহু প্রমাণ অন্যত্র অবশ্যই পাওয়া যায়, কিন্তু এখানে উভয় স্থানে কেবল তিনটি নাম রয়েছে। বেদকে শৈলীর ভেদে চার-এর পরিবর্তে তিন ধরা গেলেও ব্যক্তিবাচক নামের ক্ষেত্রে তিন থেকে চার-এর গ্রহণ কীভাবে হবে? আরেকটি প্রশ্নও ওঠে যে কি কোনো ব্যক্তির নামের স্থানে তার সমার্থক শব্দের ব্যবহার করা যেতে পারে? এটি তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে এই সূর্য বা রবি-এর ব্যবহার আদিত্য-এর স্থানে কীভাবে হলো?

বাস্তবে এই দুই সন্দেহই গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতে এর সমাধান নিম্নরূপ—

আর্শ গ্রন্থগুলিতে যদিও প্রায় সর্বত্র এবং স্বয়ং বেদ সংহিতাতেও চার প্রকার বেদের বর্ণনা থাকায় বেদের তিন হওয়া সম্ভব নয়। বহু স্থানে চার বেদের জ্ঞান চার ঋষির দ্বারা গ্রহণের বর্ণনাও আছে, কিন্তু এখানে মনুস্মৃতি ও সত্যার্থ প্রকাশ-এ উদ্ধৃত প্রমাণে তিনটি নামই রয়েছে। এখানে বেদ বিদ্যার শৈলীগত বিভাগ তিন প্রকারে করা হয়েছে, তখন তাদের চার নামের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে, এটিও সমস্যা। এই কারণেই ‘রবি’ ও ‘সূর্য’ উভয় শব্দ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা-এর গ্রহণ হয়েছে বলে প্রতীত হয়। এখানে উভয় স্থানেই ‘আদিত্য’ শব্দের ব্যবহার নেই। যোগিক অর্থের দৃষ্টিতে আদিত্য-এর সমার্থক রবি ও সূর্য উভয়ই এবং অঙ্গিরা প্রাণকে বলা হয়। "প্রাণো বা অঙ্গিরা" (শ.৬.১.২.২৮)। মহর্ষি দয়ানন্দ যজুর্বেদ ১১.১৫-এ অঙ্গিরা-এর অর্থ সূর্য করেছেন। সূর্য প্রাণতত্ত্বের সর্ববৃহৎ ভাণ্ডার, এই কারণেও সূর্য থেকে অঙ্গিরা-এর গ্রহণ করা হয়েছে। সূর্যে বহু প্রকার তীব্র বিস্ফোরণজনিত ধ্বনি ঘটতে থাকায় তাকে রবি বলা হয়। এইভাবে ‘রবি’ ও ‘সূর্য’ পদ থেকে আদিত্য ও অঙ্গিরা উভয় ঋষির গ্রহণ ত্রয়ী বিদ্যার সামঞ্জস্যের জন্য করা হয়েছে। বাস্তবে অথর্ববেদে তিন প্রকার বিদ্যাই আছে। তখন তাকে কেবল কোনো একটি বিদ্যা দ্বারা নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়, অতএব বিদ্যার শৈলীর দৃষ্টিতে বেদ তিনই দেখাতে হয়েছে। এখন এই প্রশ্ন যে কি ব্যক্তির নামগুলিতে সমার্থক শব্দের ব্যবহার শোভন? আমাদের মতে অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এগুলি কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, বরং যেসব ঋষিকে ক্রমানুসারে ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়, তাদের নামই অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা হয়। এমন প্রত্যেক সৃষ্টির আদিতে ঘটে। এইভাবে এই নামগুলি যোগিক না হলেও যোগরূঢ় অবশ্যই, যেন এগুলি তাদের উপাধি। এই পরিস্থিতিতে ত্রয়ী বিদ্যার সামঞ্জস্যে তিনটি পদ থেকে চারটি পদের গ্রহণ সমার্থক শব্দ হিসেবেও গ্রহণ করা অনুচিত নয়। আবার আর্শ প্রয়োগ শোভনই মনে করা উচিত, এটি বৈদিক পরম্পরা। আমরা মানবীয় ইতিহাসেও এমন কিছু প্রয়োগ দেখতে পারি, যেখানে ‘রাম’ শব্দ দ্বারা তিন মহাপুরুষকে বোঝানো হয়। সেই তিন ব্যক্তি হলেন—মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম, মহর্ষি পরশুরাম এবং বসুদেব-পুত্র বলরাম। এখানে ‘রবি’ বা ‘সূর্য’ দ্বারা একইভাবে আদিত্য ও অঙ্গিরা উভয় মহর্ষির গ্রহণ করা উচিত।

অস্তু।

বেদ বিদ্যার বিষয়ে ভগবদ্ ব্যাস মহর্ষি মহাভারত শান্তিপর্ব অধ্যায় ২৩২-এ শুকদেবকে বলেন—
অনাদিনিধনা বিদ্যা বাগুৎসৃষ্টা স্বয়ম্ভুভা ।।২৪
ঋষীণাং নামধেয়ানি যাশ্চ বেদেষু সৃষ্টয়ঃ । নানারূপং চ ভূতানাং কর্মণাং চ প্রবর্তনম্ ।।২৫

বেদশব্দেব্য এভাদৌ নির্মিমীতে স ঈশ্বরঃ॥২৬

অর্থাৎ পরমব্রহ্ম পরমাত্মা অনাদি বেদবাণীকে উৎপন্ন করেছেন। এখানে 'উৎসৃষ্ট' শব্দ সেই ইঙ্গিতই
করছে, যা মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণে ব্রহ্মা থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের ন্যায় বাণীর উৎপত্তি বলেছেন।
এখানে 'বিদ্যা-বাক্‌'-এর অর্থ হলো যে সেই বাণী, যার মধ্যে যথার্থ জ্ঞানও আছে অর্থাৎ বেদবাণী ॥২৪॥

বিভিন্ন ঋষির নাম অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডস্থিত ঋষি-প্রাণদের নাম, যাদের থেকে মানব ঋষিরা নিজেদের
নাম রেখেছেন। সৃষ্টির যে-যে পদার্থ বৈদিক ছন্দরূপ প্রাণে নির্মিত হয়েছে, বিভিন্ন পদার্থ ও প্রাণীদের
নানারূপ এবং তাদের কর্মসমূহকে আদিসৃষ্টিতে ঈশ্বর বৈদিক শব্দ বা ছন্দ থেকেই রচনা করেন এবং
সেগুলির মাধ্যমেই তাদের বর্ণনাও করেন ॥২৫-২৬॥

এখানে কেবল ভাষা ও জ্ঞানের উৎস বেদের আলোচনা নয়, বরং সেই বেদ অর্থাৎ প্রাণ (ছন্দ)
সমষ্টিরূপ বেদেরও ইঙ্গিত আছে, যার থেকে সমস্ত পদার্থের উৎপত্তি হয়। বাস্তবে এই দুইটি এক।
আমরা এই আলোচনা 'বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান' নামক অধ্যায়ে করব। যদি এমন না হতো, তবে 'ভূতানাং
নানারূপং' এই পদ থাকত না। কর্মের প্রবর্তন তো ভাষা ও জ্ঞান থেকে হয়েছে, কিন্তু প্রাণী ও পদার্থের
রূপ তো জড় উপাদান থেকেই গঠিত হবে। সম্ভবত ভগবান ব্যাসের এই ভাবনা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে
মহাবিদ্বান ভর্তৃহরি তাঁর বাক্যপদীয়ম্ গ্রন্থের ব্রহ্ম কাণ্ডের প্রথম শ্লোকে লিখেছেন—

অনাদিনিধনং ব্রহ্ম শব্দতত্ত্বং যদক্ষরম্। বিবর্ততে অর্থভাবেন প্রক্রিয়া জগতঃ যতঃ॥

অর্থাৎ অনাদি ও অবিনশ্বর শব্দতত্ত্বরূপ যে ব্রহ্ম, তা অর্থের ভাব থেকে বিবর্ত প্রাপ্ত হয়। এর অর্থ এই যে শব্দব্রহ্ম অর্থাৎ মূল শব্দ ওঁকার সৃষ্টির রচনার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাণী-ছন্দে পরব্রহ্ম পরমাত্মার দ্বারা বিস্তৃত করা হয়, প্রথমে সর্বত্র ওঁকাররূপী বাক্‌ ব্যাপ্ত হয়ে যায়, তারপর সমস্ত বৈদিক ছন্দ ব্যাপ্ত হয়ে যায়। এর দ্বারা জগত্‌ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অপরদিকে সেই বেদ-বাক্‌ থেকে সমগ্র মানব জগতের আচরণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যায়। আর্শ গ্রন্থের অধিক প্রমাণ এই কারণে দিচ্ছি না যে দুর্ভাগ্যবশত এই গ্রন্থগুলির আজ পৃথিবীতে তো কী, ভারতেও সম্মান অবশিষ্ট নেই। আমরা আমাদের গ্রন্থ বিশেষভাবে সেই বিদ্বানদের জন্য লিখছি, যারা কেবল বিজ্ঞান ও যুক্তির সহায়তায় অগ্রসর হওয়ার পক্ষে এবং নিজেদের বৈজ্ঞানিক বা বৌদ্ধিক অহংকারে ভরে বেদ বা আর্শ গ্রন্থের উপহাস বা নিন্দা করাকেই গৌরব মনে করেন, অস্তু।

এই চার ঋষি সর্বপ্রথম জ্ঞান মহর্ষি ব্রহ্মাকে দিয়েছিলেন। এর দ্বারা এটি স্পষ্ট যে মহর্ষি ব্রহ্মা সেই আদিসৃষ্টিতেই ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। মহর্ষি ব্রহ্মা এই চার ঋষির কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম চতুর্বেদবিত্ ঋষি হয়েছিলেন। এরপর জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরম্পরা মহর্ষি ব্রহ্মা থেকে অদ্যপর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে চলেছে। যেহেতু মহর্ষি ব্রহ্মাই প্রথম চতুর্বেদবিত্ ছিলেন, তাই ভারতীয়
পরম্পরায় তাকেই বিদ্যা-পরম্পরার আদ্য পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই পরম্পরায় ভগবান মনু,
ভগবান শিব, ভগবান বিষ্ণু, দেবরাজ ইন্দ্র, দেবগুরু মহর্ষি বৃহস্পতি, সনৎকুমার, নারদ, বসিষ্ঠ, অগস্ত্য,
ভরদ্বাজ, বাল্মীকি, বিশ্বামিত্র, ব্যাস, গৌতম, পতঞ্জলি, কণাদ, যাস্ক, পাণিনি, জৈমিনি প্রভৃতি বহু ঋষি-মুনির মাধ্যমে বিস্তৃত জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। এইভাবে সাহিত্য-শৃঙ্খলায় অপৌরুষেয় চার বেদসংহিতার পর বহু শাখা-গ্রন্থ, মনুস্মৃতি, বাল্মীকি রামায়ণ, মহাভারত, ঐতরেয়-শতপথ-গোপথ প্রভৃতি ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, শিক্ষা, কল্প, ছয় দর্শনশাস্ত্র (ন্যায়, সাংখ্য, বৈশেষিক, যোগ, বেদান্ত, মীমাংসা), উপনিষদ, বহু নীতিগ্রন্থ প্রভৃতির অত্যন্ত সমৃদ্ধ পরম্পরা অব্যাহত ছিল। পৃথিবীজুড়ে বেদ থেকেই জ্ঞান ও ভাষার বিকাশ হয়েছে। এর ইতিহাসের জন্য পং. ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার রচিত 'বৈদিক
বাঙ্গময়ের ইতিহাস' এবং পং. রঘুনন্দন শর্মা রচিত 'বৈদিক সম্পত্তি' গ্রন্থ বিশেষভাবে পাঠযোগ্য ও
মননীয়।

এই অধ্যায়টি লেখার আমাদের উদ্দেশ্য কেবল এটুকুই ছিল যে জ্ঞান ও ভাষার প্রথম উৎপত্তি কোথা
থেকে এবং কীভাবে হয়, যার উপর যথেষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে।

এই বিষয়টি সর্ববিদিত যে পৃথিবীর কোনো দেশই তার বিদ্যা ও সভ্যতার পরম্পরাকে মানবসৃষ্টির
আদিকালের সঙ্গে যুক্ত করার সাহস করে না। বর্তমান সময়ে বিকাশবাদ-এর মিথ্যা প্রচার, যা বিজ্ঞানের
নামে প্রচলিত, এর ফলে সকলেই যেন নিজেদের পশুর বংশধর মনে করে মূর্খ পূর্বপুরুষদের সন্তান
বলে স্বীকার করতে বাধ্য। এই বিষয়টি আমাদের বোধগম্য নয় যে বর্তমান বিজ্ঞানের প্রবল প্রভাবে মানুষ
নিজেকে পশু ও অরণ্যবাসী মানুষের বংশধর বলতে এত জোর কেন করে? এমন কি নয় যে পাশ্চাত্য
দেশগুলির বিজ্ঞানীরা নিজেদের গবেষণাকেও তাদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার পক্ষপাত থেকে মুক্ত রেখে
নিরপেক্ষভাবে বিচার করার সাহস করতে পারেন না? তারা কি এই ভয়ে আক্রান্ত নয় যে নিজেদের মহান
মনিষীদের সন্তান প্রমাণ করলে তাদের সাম্প্রদায়িক মত ভেঙে পড়বে এবং বৈদিক ও ভারতীয় মত সত্য
প্রমাণিত হবে? বাস্তবে বেদবিদ্যার যথাযথ বোধ না থাকায় বৈদিক পরম্পরাকে কেবল হিন্দু বা ভারতীয়
পরম্পরা বলে সাম্প্রদায়িক বা আঞ্চলিক দৃষ্টিতে দেখা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এই দেশের তথাকথিত বেদানুরাগী বৈদিক বিদ্বানদের সঙ্গে তথাকথিত প্রগতিশীল শ্রেণী এবং রাজনীতিই এ সমস্তের জন্য অধিক দায়ী। এর বর্ণনা করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়। বিবেকবান নিরপেক্ষ মানুষ জ্ঞান ও ভাষার পরম্পরার আরম্ভ সম্পর্কিত বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত বিভিন্ন মতের সঙ্গে আমাদের বৈদিক মতের তুলনা করে নিজেই সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন।


Read More

বাণীর প্রকার

01 April 0

বাণীর প্রকার

বিদ্বানরা বাণীর চার রূপ বলেছেন। ঋগ্বেদের—
চুত্বারি বাক্‌পরিমিতা পদানি তানি বিদুর্ব্রাহ্মণা যে মনীষিণঃ।
গুহ্যা ত্রীণি নিহিতা নেঙ্গয়ন্তি তুরীয়ং বাচো মনুষ্যা বদন্তি।। (ঋ. ১.১৬৪.৪৫)

এর ভাষ্যে মহর্ষি দयानন্দ চার প্রকার বাণীকে ব্যাকরণবিদদের দৃষ্টিতে নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাত এই রূপে বিভাগ করেছেন। আচার্য সায়ণ এর ভাষ্যে বাণীর বিভাগ ব্যাকরণবিদদের দৃষ্টির অতিরিক্ত নিরুক্তকার প্রভৃতির দৃষ্টিকেও গ্রহণ করেছেন। এতে একটি বিভাগ আছে—পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং বৈখরী। এদের মধ্যে বৈখরী বাণীই মানব ব্যবহারে আসে, অবশিষ্ট তিন প্রকার বাণীকে কেবল যোগী পুরুষই দেখতে বা জানতে পারেন।

মহর্ষি প্রবর যাস্ক নিরুক্ত ১৩.৬-এ এই মন্ত্রের ব্যাখ্যানে বাণীর বিভাগ নিম্নরূপ বলেছেন—
"চত্বারি বাচঃ পরিমিতানি পদানি। তানি বিদুর্ব্রাহ্মণা যে মেধাবিনঃ। গুহায়াং ত্রীণি নিহিতানি। নার্থ বেদয়ন্তে। গুহা গূহতে। তুরীয়ং ত্বরতে। কতমানি তানি চত্বারি পদানি। ওংকারো মহাব্যাহৃতয়শ্চেত্যার্ষম্। নামাখ্যাতে চোপসর্গনিপাতাশ্চেতি ব্যাকরণাঃ। মন্ত্রঃ কল্পো ব্রাহ্মণং চতুর্থী ব্যবহারিকীতি যাজ্ঞিকঃ। ঋচো যজুঁষি সামানি চতুর্থী ব্যবহারিকীতি নিরুক্তাঃ। সর্পাণাং বাক্‌বয়সাং ক্ষুদ্রস্য সরীসৃপস্য চতুর্থী ব্যবহারিকীতি একে। পশুষু তূণবেষু মৃগেষ্বাত্মনি চেত্যাত্মপ্রবাদাঃ। অথাপি ব্রাহ্মণং ভবতি।।"

এখানে বিভাগ নিম্নরূপ—
(১) আর্শমত— ওংকার এবং ভূঃ ভুবঃ স্বঃ মহাব্যাহৃতি।
ভগবান মনু মহারাজও বলেন—
"অকারং চাপ্যুকারং চ মকারং চ প্রজাপতিঃ। বেদত্রয়ান্নিরদুহদ্ ভূর্ভুবঃ স্বরিতীতি চ।।" (মনু.০২.৭৬)
অর্থাৎ প্রজাপতি বেদ থেকে এই চার পদ দোহন করেছেন— ওম্, ভূঃ, ভুবঃ এবং স্বঃ। এটিই বেদের সার।

(২) ব্যাকরণ মত— নাম, আখ্যাত, উপসর্গ এবং নিপাত।

(৩) যাজ্ঞিক মত— মন্ত্র, কল্প, ব্রাহ্মণ এবং ব্যবহারিকী অর্থাৎ লোকভাষা।

(৪) নিরুক্ত মত— ঋক্, যজুঃ, সাম এবং ব্যবহারিকী অর্থাৎ লোকভাষা।

(৫) অন্যমত— সাপদের বাক্‌, পক্ষীদের বাক্‌, ক্ষুদ্র রেঙে চলা প্রাণীদের বাক্‌ এবং ব্যবহারিকী (মানব-লোকভাষা)।

(৬) আত্মবাদী মত— পশুদের মধ্যে, বাদ্যযন্ত্রে, সিংহ প্রভৃতিতে এবং আত্মায় অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারিক বাণী।

এগুলির অতিরিক্ত নিরুক্তকার (১৩.৬, পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার ভাষ্য) বাণীর অন্য শ্রেণী বলার জন্য মৈত্রায়ণী সংহিতাকে উদ্ধৃত করে বলেন—
"অথাপি ব্রাহ্মণং ভবতি—সা বৈ বাক্ সৃষ্টা চতুর্ধা ব্যবভবৎ। এষ্বেব লোকেষু ত্রীণি। পশুষু তুরীয়म्। যা পৃথিব্যাং সাগ্নী সা রথন্তরে। যাঽন্তরিক্ষে সা বায়ী সা বামদেব্যে। যা দিবি সাদিত্যে সা বृहতী সা স্তনয়িত্রী। অথ পশুষু। ততো যা বাক্ অত্যরিচ্যত তাং ব্রাহ্মণেষ্বদধুঃ। তস্মাদ্ ব্রাহ্মণা উভয়ীং বাকং বদন্তি যা চ দেবানাং যা চ মনুষ্যানাম্। (মৈ.১.১১.৫) ইতি"

আমরা মৈত্রায়ণী সংহিতায় পাঠ এইরূপ পেয়েছি—
সা বৈ বাক্ সৃষ্টা চতুর্ধা ব্যবভবৎ, এষু লোকেষু ত্রীণি তুরীয়াণি, পশুষু তুরীয়ঃ, যা পৃথিব্যা সাগ্নী
সা রথন্তরে, যা অন্তরিক্ষে সা বাতে সা বামদেব্যে। যা দিবি সা বৃহতী সা স্তনয়িত্না, অথ পশুষু। ততো যা
বাক্ অত্যরিচ্যত তাং ব্রাহ্মণে ন্বদধু, তস্মাদ্ ব্রাহ্মণ উভয়ী বাক্ বদন্তি যশ্চ দেব যশ্চ ন, .... । অর্থাৎ
সেই উৎপন্ন বাণী চার প্রকার। ভূঃ ভুবঃ এবং স্বঃ এই তিন লোক বা সূক্ষ্ম ছন্দ রশ্মির রূপে তিন প্রকারে
এবং পশু অর্থাৎ বিভিন্ন মরুত্ ও ছন্দ রশ্মির রূপে {পশবো বৈ মরুতঃ মৈ.৪.৬.৮} চতুর্থ প্রকারে। যে
বাণী পৃথিবীতে আছে, সেইই অগ্নিতে এবং সেইই রথন্তর সামে আছে। এর তাৎপর্য এই যে যে বাণী
অপ্রকাশিত পরমাণুতে থাকে, সেইই উষ্ণতা ও বিদ্যুৎ-সংযুক্ত কণায় থাকে এবং সেইই বাণী রথন্তর সাম
অর্থাৎ এমন তীব্র বিকিরণসমূহে, যা মনোরম হয়েও তীক্ষ্ণ ভেদক এবং বিভিন্ন কণাকে অতিক্রম করাতে
সমর্থ, তাতেও বিদ্যমান থাকে। যে বাণী অন্তরীক্ষে থাকে, সেই বাণী বায়ু (সূক্ষ্ম ও স্থূল)-এও বিদ্যমান
থাকে। এখানে সূক্ষ্ম বায়ু দ্বারা বিভিন্ন প্রকার প্রাণের কথাও বোঝানো হয়েছে। সেইই বাণী বামদেব্যে
অর্থাৎ বিভিন্ন সৃষ্টি-প্রজনন ক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রশংসনীয় ও উজ্জ্বল প্রাণ তত্ত্বেও বিদ্যমান থাকে।
যে বাণী দ্যুলোক অর্থাৎ সূর্য প্রভৃতি নক্ষত্রে থাকে, সেইই তাদের রশ্মিতে এবং সেইরূপ বাণী স্তনয়িত্নু
অর্থাৎ শব্দকারী বিদ্যুতে-ও থাকে। এর পরে অন্য বাণী পশু অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারিকী=লোক ভাষার
বাণী হয়। এর অতিরিক্ত যে বাণী আছে, তা পরমাত্মা ব্রাহ্মণদের মধ্যে স্থাপন করেছেন। এখানে
'ব্রাহ্মণ' শব্দের অর্থ অত্যুচ্চ স্তরের যোগী পুরুষ, যারা পরব্রহ্ম পরমাত্মায় সর্বদা রমণ করেন। এইরূপ
ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ উভয় প্রকার (মোট চার প্রকার) বাণীকে, যা বিভিন্ন দেব (লোকাদি)-তে বিদ্যমান
অথবা মানুষের কথ্য বাণী, জানেন। এইরূপ ব্রাহ্মণের অক্ষর স্তব।" এখানে নিরুক্তকার নিজের মত এবং
মৈত্রায়ণী সংহিতার মত অনুযায়ী বাক্-তত্ত্বের গভীর ও ব্যাপক স্বরূপের উপর আলোকপাত করেন।

বর্তমান বৈজ্ঞানিকরাও বিভিন্ন প্রকার ধ্বনিকে জানেন। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত
শক্তিশালী তরঙ্গকে বৈজ্ঞানিকরা Shock waves বলেন। ইউ.এস.এ.-র খগোল ভৌতবিজ্ঞানী John Gribbin
ডার্ক ম্যাটার এবং কসমিক রশ্মিতেও সূক্ষ্ম ধ্বনি তরঙ্গের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। এই কথা তিনি নিজের
গ্রন্থ The origins of the future- ten questions for the next ten years পৃষ্ঠা ১৩০ এবং ১৩৪-এ
লিখেছেন। আজ সৃষ্টির উৎপত্তির মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব Big Bang Theory, যার সমালোচনা আমরা পরবর্তী
অধ্যায়ে করব, তাতে যে Background radiation, 2.7 °K শীতল থাকে, তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়।
সেই অত্যন্ত শীতল radiation-এও সেই সময় ওঠানামা Fluctuations-এর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, যখন
এই ব্রহ্মাণ্ড তার প্রাথমিক অবস্থায় ছিল। এই ওঠানামা ধ্বনি তরঙ্গ দ্বারা হয় বলে মানা হয়। The trouble
with Physics নামক গ্রন্থে Lee Smolin পৃষ্ঠা-২০৫-এ লিখেছেন—

"Over the last decades, the temperature fluctuations of the microwave background have been mapped by satellites, balloon borne detectors, and ground based detectors, one way to understand what these experiments measure is to think of the fluctuations as if they were sound waves in the early universe."

স্পষ্টই এখানে সূক্ষ্ম ধ্বনি তরঙ্গের আলোচনা হয়েছে। সূর্যে হওয়া বিস্ফোরণ এবং সাধারণ অবস্থাতেও,
পৃথিবীর ভিতরে বিভিন্ন কার্যকলাপ এবং অন্তরীক্ষে cosmic rays-এর সংঘর্ষ থেকেও ধ্বনি তরঙ্গের
উৎপত্তি হয়—এটি বৈজ্ঞানিকরা মানেন এবং জানেন। যে বিষয় বৈজ্ঞানিকরা আজ জানেন, তার থেকেও
সূক্ষ্ম বিজ্ঞান যাস্ক এবং মৈত্রায়ণী সংহিতাকার সহস্র বছর পূর্বেই জানতেন। বৈদিক সাহিত্যে বাক্-এর
বিজ্ঞান অত্যন্ত বিস্তৃত এবং গভীর। এই ধ্বনি প্রকৃতপক্ষে কি, তা বৈজ্ঞানিকরা এখনও সম্পূর্ণভাবে জানতে পারেননি। ধ্বনি বিষয়ে বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য—

'Sound is an alteration in pressure, stress, particle displacement or particle velocity, which is propagated in an elastic material, or the superposition of such propagated vibrations- (definition recommended by American Standard Association)- "Acoustics" By Joseph L. Hunter

এখানে অবশ্যই ধ্বনির স্পষ্ট ও উৎকৃষ্ট স্বরূপ বলা হয়নি, বরং কোনো পদার্থে উৎপন্ন চাপের রূপেই
ধ্বনি তরঙ্গকে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত সাধারণ কথা। সেই চাপ কেন এবং কিভাবে উৎপন্ন হয়,
এই বিষয় বর্তমান বিজ্ঞান কিছুই স্পষ্ট করতে পারে না।

বর্তমান বৈজ্ঞানিকরা আলোক প্রভৃতি বিকিরণের মতো ধ্বনির কণারও কল্পনা করেন। Q is for Quantum
particle physics from A to Z নামক গ্রন্থের পৃষ্ঠা ২৮১-এ John Gribbin ধ্বনিকণ Phonon সম্পর্কে
লিখেছেন—

"Phonon - A particle of sound travelling through a crystal lattice. The idea of a sound wave can be replaced by the idea of phonons in an analogous way to the description of light in terms of photons."

এখানে ধ্বনির কণার ধারণা স্পষ্ট। বৈদিক ভাবধারায়ও শব্দ তন্মাত্রার স্বীকৃতি প্রাচীনকাল থেকেই
চলেছে।

এপর্যন্ত আমরা বাণীর বিভিন্ন রূপের আলোচনা করার পরে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং বৈখরী এই চার
রূপের উপর বিশেষ আলোচনা করি। বাণীর এই বিভাগ, যা আচার্য সায়ণ করেছেন, তার প্রামাণিকতা
সম্পর্কে কিছু আর্য বিদ্বান প্রশ্ন তুলতে পারেন। যদিও বৈদিক গ্রন্থগুলি বোঝার ক্ষেত্রে সায়ণের পদ্ধতি
অত্যন্ত দোষপূর্ণ অথবা মূর্খতাপূর্ণ। যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের আমি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা লিখছি, তাতে সায়ণ
ভাষ্যের প্রায় উপেক্ষা করা হয়েছে, কারণ তার ভাষ্য সর্বতোভাবে দোষপূর্ণ, কোথাও-কোথাও বিকৃত,
অশ্লীল, মূর্খতাপূর্ণ এবং বৈদিক দৃষ্টির সম্পূর্ণ বিপরীত। এতকিছুর পরেও আমাদের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য
নয় যে সায়ণাচার্যের কোনো যুক্তিসঙ্গত কথাকেও গ্রহণ করা হবে না। এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ আর্য বিদ্বান
পণ্ডিত ভগবদ্দত্ত রিসার্চ স্কলার নিজের নিরুক্ত ভাষ্য ১৩.৬-এ লিখেছেন—

"পরাবাক্-এর সিদ্ধান্ত নতুন নয়। দেবকীপুত্র ভগবান কৃষ্ণ এর বর্ণনা সাম্ব পঞ্চাশিকার তৃতীয় শ্লোকে করেছেন।" এইরূপে মহৎ বেদবিজ্ঞানী যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মত আমাদের সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য। যে বিদ্বান এর উপরও সন্দেহ করে, তাদের কোনো উপায় নেই।

পরা, পশ্যন্তী প্রভৃতি বাণীর চারটি রূপের আলোচনা ব্যাকরণ মহাভাষ্যের ভাষ্য প্রদীপে আচার্য কৈয়ট এবং নাগেশ ভট্টও করেছেন। তারা "বাক্যপদীয়ম্" এর বহু শ্লোকও উদ্ধৃত করেছেন।

আমরা বাণীর এই চারটি স্বরূপের উপর কিছু চিন্তা করি—

(১) পরা— পরাবাণী সর্বাধিক সূক্ষ্ম কিন্তু সর্বাধিক উৎকৃষ্ট এবং সমস্ত বাণীর সর্বোচ্চ মূল স্বরূপ। 'পরা' একটি অব্যয় পদ, যার ব্যবহার আপ্টে সংস্কৃত-হিন্দি কোষে বহু অর্থে দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে যাওয়া, সম্মুখীন হওয়া, পরাক্রম, আধিক্য, পরাধীনতা, মুক্তি, একদিকে সরিয়ে রাখা প্রভৃতি প্রধান। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এই অব্যয়ের ব্যবহার উপরিভাবে, দূরার্থে, পৃথক, প্রকৃষ্টার্থে, দূরীকরণে, পরাজয়ের অর্থে প্রভৃতিতে করেছেন। (দেখুন— বৈদিক কোষ - আচার্য রাজবীর শাস্ত্রী।)

যদিও এখানে আমরা 'পরা' উপসর্গ অব্যয় পদের আলোচনা করছি না, তথাপি এই অর্থগুলি থেকে 'পরা' পদের অর্থ জানা গেলে 'পরাবাক্' এর স্বরূপও বোঝা যায়। সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রয়োগ করে কোনো শব্দের অর্থের সম্পর্ক এবং তার বাচ্য পদার্থের স্বরূপ বোধ করানোই ব্যাকরণ শাস্ত্রের বৈজ্ঞানিকতা। এইভাবে পরাবাক্ একটি এমন সূক্ষ্ম বাণী, যা সর্বাধিক সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী, অত্যধিক পরিমাণে বিদ্যমান, সকলকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে কিন্তু নিজে সকলের থেকে মুক্ত এবং সর্বোচ্চ অবস্থাসম্পন্ন। এটি এত সূক্ষ্ম হওয়ায় কখনোই শ্রবণগোচর হতে পারে না। এটি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে সূক্ষ্মতম রূপে ব্যাপ্ত থেকে প্রতিটি কণাকে নিজের সঙ্গে সমন্বিত রাখে। এটিকে কেবল উৎকৃষ্ট যোগী পুরুষরাই অনুভব করতে পারেন। এটিকে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি দ্বারা জানা যায় না। আমাদের মতে মানুষ যে বৈখরী বাণী শুনে, সেই বাণী আত্মতত্ত্ব দ্বারা পরা অবস্থাতেই গ্রহণ করা হয়।

(২) পশ্যন্তী— এই শব্দের রূপই বলে দেয় যে এই বাণী পরার তুলনায় স্থূল এবং এটি বিভিন্ন বর্ণকে দেখে অর্থাৎ তাদের স্বরূপ প্রদান করতে করতে বীজরূপে থাকে। এটি পরাবাণী থেকে স্থূল এবং মধ্যমা থেকে সূক্ষ্ম। সাম্বপঞ্চাশিকার চতুর্থ শ্লোক—
"যা সা মিত্রাবরুণসদানাদুচ্চরন্তী ত্রিষষ্টিং
বর্ণান্তঃ প্রকটকরনৈঃ প্রাণ সংগাৎ প্রসূতে।।"

এর ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ বলেছেন—
"তত্র চিজ্জ্যোতিষি গুণীভূত সূক্ষ্মপ্রাণসঙ্গাৎ পশ্যন্তাম্।"

অর্থাৎ পশ্যন্তীতে চিত্-জ্যোতির প্রধানতা এবং সূক্ষ্মপ্রাণ গৌণ থাকে, সেই অবস্থাতেও বর্ণ উৎপন্ন হয়। (দেখুন— মহাত্মা ভর্তৃহরি রচিত বাক্যপদীয়ম্-এর ব্রহ্মকাণ্ডে পণ্ডিত শিবশঙ্কর अवस्थীর টীকা, পৃ. ৪২৩-২৪)

{মিত্রাবরুণৌ = মনো মৈত্রাবরুণঃ (শ.১২.৮.২.২৩), যজ্ঞো বৈ মৈত্রাবরুণঃ (কৌ.ব্রা. ১৩.২), প্রাণাপানী মিত্রাবরুণী (তা.৬.১০.৫), প্রাণোদানৌ বৈ মিত্রাবরুণৌ (শ.১.৮.৩.১২)। সদনম্ = গর্ভস্থানম্ (ম.দ.য. ভা. ১২.৩৬)} আমাদের মতে এই শ্লোকের ভাব এই যে পশ্যন্তী বাক্ সংযোজ্য মনস্তত্ত্বের ভিত্তিতে অথবা তার মধ্যেই উৎপন্ন হয়। প্রাণ, অপান ও উদানাদি রশ্মির গর্ভরূপ এই পশ্যন্তী বাক্ তত্ত্ব, অর্থাৎ সমস্ত প্রাণ ও ছন্দ রশ্মি এই বাক্ তত্ত্ব থেকেই এবং এইতেই উৎপন্ন হয়। এখানে "প্রাণ সংগাৎ প্রসূতে" এ প্রাণের অর্থ মনস্তত্ত্ব বোঝা উচিত। পরার অতিরিক্ত তিন প্রকার বাণীর উৎপত্তিই এখানে সাম্বপঞ্চাশিকার এই শ্লোক থেকে বোঝা যাচ্ছে। পরাবাণীতে তিরেষট্টি বর্ণের অস্তিত্ব থাকে না। ক্ষেমরাজের বক্তব্য থেকে এটিই স্পষ্ট হয় যে চেতনা যখন মনরূপ সূক্ষ্মপ্রাণের সঙ্গে সংযোগ করে অর্থাৎ যখন চেতনার প্রধানতা এবং সেই সূক্ষ্মপ্রাণ গৌণ হয়, তখন এই পশ্যন্তী বাক্-এর উৎপত্তি হয়। এই পশ্যন্তী বাক্ সমস্ত বর্ণের মূলরূপকে ধারণ করে থাকে। সম্ভবত এই বাণীকে ভবিষ্যতে কোনো সূক্ষ্ম প্রযুক্তি দ্বারা গ্রহণ করা যেতে পারে, এমনই আমাদের মত। এখানে এমন প্রতীয়মান হয় যে বাণীর বর্ণরূপ এই পশ্যন্তী অবস্থাতেই মূলরূপে প্রকাশিত হয়। পরাবাক্ সম্পূর্ণ অব্যক্ত রূপে থাকে। আমাদের মতে পরাবাণীতেও অক্ষরের সংস্কার সূক্ষ্মতম রূপে অবশ্যই থাকে এবং সেই থেকেই মূলরূপ পশ্যন্তী বাক্-এর উৎপত্তি হয় অথবা পরাবাক্-ই পশ্যন্তী বাক্-এর রূপে পরিবর্তিত হয়। লক্ষ্যণীয় যে পশ্যন্তীতেও বর্ণের স্পষ্ট রূপ বিদ্যমান থাকে না।

ডাঃ শিবশঙ্কর অবস্থী বাক্যপদীয়ম্-এর টীকা পৃ.সং. ৭৪-এ এক অজ্ঞাত রচিত শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন—
বৈখরী শব্দনিষ্পত্তির্মধ্যমা শ্রুতিগোচরা। দ্যোতিতার্থা চ পশ্যন্তী সূক্ষ্মা বাগনপায়িনী।।

এই শ্লোক কিছু পাঠভেদসহ ব্যাকরণের ভাষ্যপ্রদীপকার নাগেশ ভট্টও 'চত্বারি বাক্‌পরিমিতা' (ঋ. ১.১৬৪.৪৫) মন্ত্রের ব্যাখ্যানে দিয়েছেন।

এতে পশ্যন্তী-এর স্বরূপের বিবেচনায় অবস্থী-এর বক্তব্য যথার্থই যে এতে শ্রোতার বুদ্ধিতে অর্থের দ্যোতন হয়। যখন কোনো ব্যক্তি কর্ণ দ্বারা কোনো কথা শোনে, তখন কানের স্নায়ুর দ্বারা সংবেদন মস্তিষ্ক হয়ে পুনরায় মনস্তত্ত্বে পৌঁছে। সেই সংবেদনে বর্ণের বিদ্যমানতার মধ্যেই মন এর সহযোগে মস্তিষ্ক বর্ণগুলির পরিচয় করে। যদি ঐ সংবেদনগুলিতে যদি বর্ণের সম্পূর্ণ অভাব হতো, তবে মস্তিষ্ক বা মনস্তত্ত্ব বাণীকে কখনোই চিনতে পারত না। সেই বাণীই পশ্যন্তী, যা কানে শোনা যায় না কিন্তু মস্তিষ্কের মাধ্যমে মনস্তত্ত্ব যাকে অনুভব করে।

(৩) মধ্যমা- সাম্বপঞ্চাশিকা-এর উপরিউদ্ধৃত শ্লোকের ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ লিখেছেন-
"গুণীভূত চিৎসূক্ষ্মপ্রাণসঙ্গান্মধ্যমায়াম্।" এই সম্পর্কে ড. অবস্থী পৃ.সং.৪২৪-এ লিখেছেন যে মধ্যমা
বাণীতে চিজ্জ্যোতি গৌণ এবং সূক্ষ্মপ্রাণ প্রধান হয়। এই বাক্‌কে পশ্যন্তী থেকে স্থূল এবং বৈখরী থেকে
সূক্ষ্ম মানা হয়। উপরিউক্ত অজ্ঞাতরচিত শ্লোকের ব্যাখ্যায় ড. অবস্থী-এর বলা যে যে বাণী শ্রোতার কর্ণ দ্বারা শোনা যায়, তা মধ্যমা হয়। এর থেকে আমাদের এই প্রতীত হয় যে কর্ণপটলে যে ধ্বনি শোনা যায়, তা যে স্বরূপ ধারণ করে, সেটিই মধ্যমা হয়। মস্তিষ্ক ও কানের মধ্যে যে বাণীর সঞ্চারণ হয়, সেটিই এই। এতে বর্ণের রূপ পশ্যন্তীর তুলনায় স্থূল এবং বৈখরীর তুলনায় সূক্ষ্ম হয়। এতে চেতন-এর সান্নিধ্যেরও পশ্যন্তীর
ন্যায় অপরিহার্যতা থাকে, কিন্তু তার তুলনায় কিছু কম হয়।

(৪) বৈখরী- এটি সেই স্থূল বাণী, যা আমরা বলি। 'বৈখরী' শব্দের নিরুক্ত আপ্টে তাঁর কোষে করেছেন- "বিশেষেণ খং রাতি" অর্থাৎ যা বিশেষরূপে আকাশে মিলিয়ে যায়। এই বাণীই বক্তা ও শ্রোতার মধ্যে গমন করে, যা শেষে শ্রোতার মস্তিষ্কে গিয়ে পশ্যন্তী-এর রূপ ধারণ করে। এর বিষয়ে উপরিউদ্ধৃত সাম্বপঞ্চাশিকা-এর শ্লোকের ব্যাখ্যায় ক্ষেমরাজ লিখেছেন- "স্থূল প্রাণসঙ্গাদ্বৈখর্যাং বর্ণা জায়ন্তে।" অর্থাৎ স্থূল প্রাণের সংযোগে বৈখরীতে বর্ণের উৎপত্তি হয়। এখানে বক্তার স্বরযন্ত্র থেকে বিভিন্ন আভ্যন্তর ও বাহ্য প্রয়াসে যে ধ্বনি-রূপ বর্ণের উৎপত্তি হয়, সেটিই সংকেত। এটিই লোক ভাষা।

এখন বাণীর চার রূপের উপর সায়ণাচার্য-এর মত উদ্ধৃত করা হয়-
"পরাপশ্যন্তী মধ্যমা বৈখরীতি চত্বারীতি। একৈব নাদাত্মিকা বাগ্মূলাধারাদুদিতা সতি পরেত্যুচ্যতে।
নাদস্য চ সূক্ষ্মত্বেন দুর্নিরূপত্বাৎ সৈব হৃদয়গামিনী পশ্যন্তীত্যুচ্যতে যোগীভির্দ্রষ্টুং শক্তত্বাৎ। সৈব বুদ্ধি গতা
বিবক্ষা প্রাপ্তা মধ্যমেত্যুচ্যতে মধ্যে হৃদয়াখ্য উদীয়মানত্বান্মধ্যমায়াঃ। অথ যদা সৈব বক্ত্রে স্থিতা
তাল্বোষ্ঠাদিব্যাপারেণ বহির্নির্গচ্ছতি তদা বৈখরীত্যুচ্যতে ... ।।" (ঋগ্বেদ ভাষ্য. ১.১৬৪. ৪৫)

অর্থাৎ যখন কোনো মানুষ বাণীর উচ্চারণ করে, তখন সর্বপ্রথম নাদরূপ বাক্‌ মূলাধার চক্রে উৎপন্ন হয়ে উপরে উঠতে থাকে। এটিই বাণীর সূক্ষ্মতম পরা-রূপ। এর নিরূপণ সম্ভব নয় অর্থাৎ অত্যন্ত দুষ্কর। যখন এই পরাবাণী হৃদয় চক্রে আসে, তখন সেখানে এটিই পশ্যন্তী বাক্‌-এর রূপ গ্রহণ করে। এই বাণী যখন বুদ্ধি তত্ত্বের সঙ্গে সংযোগে আসে, তখন মধ্যমা রূপে প্রকাশিত হয়ে কণ্ঠে অবস্থিত তালু-ওষ্ঠাদি-এর প্রয়াসে বৈখরীর রূপ ধারণ করে বাইরে বের হয়।

এখানে বিবেচনীয় যে বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের মধ্যে বাণীর চার রূপ পৃথক-২ স্থানে প্রকাশিত হয়। সাধারণ মানুষের শোনা ও বলা যোগ্য বাণী বৈখরীই, এটি নিশ্চিত।

এখন প্রশ্ন এটি উঠে যে যখন সর্বপ্রথম চার ঋষি অন্তরীক্ষ থেকে ঈশ্বরীয় সহায়তায় সম্প্রজ্ঞাত সমাধির ভিতরে বৈদিক ছন্দগুলি গ্রহণ করেছিলেন, তখন সেই ছন্দগুলি ব্রহ্মাণ্ডে বাণীর এই চার রূপের মধ্যে কোন রূপে ব্যাপ্ত ছিল? কি যেমন বেদ পাঠী আজ বৈখরী বাণীতে বেদপাঠ করেন, তেমনই আকাশে শব্দ ব্যাপ্ত ছিল? আমাদের মতে এমন সম্ভব নয়। তাল্বাদি প্রয়াস ছাড়া এমন শব্দ অর্থাৎ বৈখরী বাণীর উৎপন্ন হওয়া সম্ভব নয়। অতএব আমাদের মতে এই সমস্ত ছন্দ পরা এবং পশ্যন্তী বাণীর রূপে সর্বত্র ব্যাপ্ত ছিল। বর্ণত্বের বীজ তো বিদ্যমান ছিল কিন্তু শ্রব্য অবস্থায় নয়। এখন এই পশ্যন্তী বাক্‌কে ঋষিরা কিভাবে গ্রহণ করেছিলেন? এর আলোচনা আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতে লিখেছি। এই বিষয়েই মহাত্মা ভর্তৃহরির বাক্যপদীয়ম্-এর ব্রহ্ম কাণ্ডের ১৩৬তম শ্লোক যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয়-

"আবিভাগাদ বিবৃত্তানামভিখ্যা স্বপ্নবচ্ছ্রুতি।
ভাবতত্ত্বং তু বিজ্ঞান লিঙ্গেব্যো বিহিতা স্মৃতিঃ।।"

এর আশয় এই যে অখণ্ড পরমেশ্বর অথবা পরাবাক্‌ রূপ একাক্ষর 'ওম' পদ বাচক থেকে বিস্তৃত ও প্রকাশিত বিভিন্ন ছন্দ, যা পশ্যন্তী রূপে বিদ্যমান থাকে, তার স্বপ্নের ন্যায় জ্ঞান হয়। এর তাৎপর্য এই যে যেরূপ শ্রোত্রেন্দ্রিয়-এর সহায়তা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে সূক্ষ্ম শরীর দ্বারা বিভিন্ন বাণী শোনা যায়, সেইরূপ সবিচার সমাধি, যেখানে যোগী সূক্ষ্ম বিষয়গুলির বিচার করে, তাতে এই ছন্দগুলিকে নিজের সূক্ষ্ম শরীর অথবা অন্তঃকরণ দ্বারা গ্রহণ করে নিজের চিত্তে অগ্নি, বায়ু ইত্যাদি চার ঋষি সঞ্চিত করে নিয়েছিলেন।

প্রশ্ন- আপনি ভগবদ্যাস্ক দ্বারা নিরুক্ত শাস্ত্রে প্রদর্শিত বাণী সম্পর্কিত ছয় প্রকারের শ্রেণীবিভাগের
উপেক্ষা করে আচার্য সায়ণ অথবা সাম্বপঞ্চাশিকা-এ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অথবা ব্যাকরণ মহাভাষ্য-এর
ভাষ্য প্রদীপকার আচার্য কৈয়ট ও আচার্য নাগেশভট্ট-কে প্রমাণ মেনে পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা এবং
বৈখরী এই শ্রেণীবিভাগকে কেন গ্রহণ করেছেন? এই যুগের মহান বেদজ্ঞ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী
বৈয়াকরণদের মতানুসারেই পূর্বে বর্ণিত ঋ. ১.১৬৪.৪৫-এর ভাষ্য করেছেন, পুনরায় আপনি মহর্ষি
দয়ানন্দ-এর উপেক্ষা, কি এই কারণে করেছেন, কারণ এতে আপনার ছন্দ বিজ্ঞান এবং তাদের অগ্ন্যাদি চার ঋষিদের দ্বারা গ্রহণের কল্পিত প্রক্রিয়ার সমর্থন হতে পারত না। মহর্ষি দয়ানন্দ তাঁর ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা এবং সত্যার্থপ্রকাশাদি গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন যে পরমাত্মা সেই অগ্ন্যাদি চার
ঋষির আত্মায় বেদের প্রকাশ করেছিলেন। কি আপনার বেদজ্ঞান-এর আবির্ভাবের প্রক্রিয়া এর বিপরীত
মনগড়া নয়?

উত্তর- বাক্‌-এর শ্রেণীবিভাগের উপর বিবেচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে নিরুক্ত যে শ্রেণীবিভাগের মতগুলির বর্ণনা করেছে, সেইরূপ শ্রেণীবিভাগ পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি নয়। আপনার সন্দেহের সমাধানের জন্য আমরা সমস্ত শ্রেণীবিভাগের উপর ক্রমান্বয়ে বিবেচনা করি।

(১) আর্যমত- ও৩ম্, ভূঃ ভূবঃ, স্বঃ।
যেমন আমরা পূর্বে প্রদর্শন করেছি যে এই মত ভগবান মনু মহারাজও প্রদর্শন করেছেন। এটিকে
আর্শমত বলার পিছনে আমাদের দুইটি প্রধান কারণ দেখা যায়।
(ক) ভগবান মনু থেকে সমস্ত মহর্ষি ভগবন্তদের মতে বাণীর এই শ্রেণীবিভাগ গ্রহণযোগ্য ছিল। এই
কারণে একে আর্শমত বলা হয়েছে।

(খ) বিভিন্ন ঋষি প্রাণে চার ছন্দ 'ওম', 'ভূঃ', 'ভুবঃ', 'স্বঃ' বিদ্যমান থাকে অথবা এগুলির থেকেই সকল ঋষি অর্থাৎ প্রাণের উৎপত্তি হয়। এই কারণেও একে আর্শ মত বলা হয়, এমন আমাদের মত হয়। ঋষি প্রাণ কী হয়, এটি আমরা বৈদিক সৃষ্টি উৎপত্তি বিজ্ঞান নামক অধ্যায়ে লিখব।

বাণীর এই শ্রেণীবিভাগ ধ্বনি উৎপত্তির বিশেষত তার পর্যায়গুলির বর্ণনা নয়, বরং বাক্‌ এর প্রকারগুলির বর্ণনা করে। হ্যাঁ, 'ওম' মূল বাক্‌, এটি অবশ্যই। এই শ্রেণীবিভাগ থেকে বাক্‌-এর গ্রাহ্যতার পর্যায় বা সামর্থ্যের কোনো স্পষ্টীকরণ হয় না। এগুলি সকলেই ছন্দ, যা সৃষ্টি আরম্ভে উৎপন্ন হয়েছিল এবং আজও সর্বতোব্যাপ্ত। পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি চারটি রূপে এই চারটি ছন্দ 'ওম', 'ভূঃ' ইত্যাদি থাকে বা থাকতে পারে। এটিকে এইভাবে বোঝা যায় যে কোনো গায়ক ক্রমানুসারে নির্দিষ্ট চারটি ভজন গায় এবং সেই ভজনগুলি এমন, যা তার পরবর্তীতে গাওয়া ভজনগুলির যেন ভূমিকার রূপ হয় অথবা সে সর্বপ্রথম চারটি ছন্দ 'দোহা', 'সোরঠা', 'চৌপাই', ও 'কবিত্ব' গায়, কিন্তু তাদের চার প্রকার স্তর বা ধ্বনি তরঙ্গের কম্পাঙ্কে গায়। তখন চার স্তর এবং চার ছন্দ উভয় প্রকারের শ্রেণীবিভাগ পৃথক-২ স্তর থেকে হয়। এইভাবে প্রত্যেক ছন্দ বা বাক্‌ তত্ত্ব পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি চার রূপে থাকে।

(২) বৈয়াকরণ মত- নাম, আখ্যাত, উপসর্গ ও নিপাত। এগুলি চারটিই বাক্‌-এরই রূপ, কিন্তু চারটিই পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি স্তরে থাকে। এদের পরস্পরের কোনো বিরোধ নেই।

এইভাবে পূর্বোক্ত যাজিক, নৈরুক্ত ইত্যাদি সমস্ত মতের বিষয়ে জানুন। পরা, পশ্যন্তী ইত্যাদি শ্রেণীবিভাগ প্রকৃতপক্ষে বক্তা ও শ্রোতার বলা ও শোনার প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করে এবং অন্যান্য শ্রেণীবিভাগ এই ভিত্তিতে যে বক্তা ও শ্রোতা কী বলছে বা শুনছে। এই বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগগুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এটি।

এখন যেহেতু আমরা পূর্ব মহর্ষিদের দ্বারা বৈদিক ছন্দগুলির গ্রহণের বর্ণনা করছি অর্থাৎ সেই প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিকতাকে বোঝার চেষ্টা করছি, তখন বাণীর অন্য কোনো বর্ণনা এখানে গুরুত্ব রাখে না, বরং পরা, পশ্যন্তী রূপগুলির বর্ণনাই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই আমরা প্রসঙ্গানুযায়ী এইটিরই আলোচনা করেছি। যেখানে পর্যন্ত মহর্ষি দয়ানন্দ-এর সেই মতের প্রশ্ন, যেখানে তিনি অগ্ন্যাদি চার ঋষির আত্মায় বেদের প্রকাশের আলোচনা করেছেন, তা আমাদের মত সম্পূর্ণ বর্ণিত হওয়ার পরেই বোঝা যাবে। এই কারণে আমরা আমাদের পূর্ব প্রসঙ্গে পুনরায় আসি—যখন চার ঋষির চিত্তে বৈদিক ছন্দ পশ্যন্তী বাক্‌-এর অবস্থায় সঞ্চিত হয়ে গেল, তখন তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার বিষয়ে আমরা বেদের বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ-এর মতের উপর পরবর্তীতে বিবেচনা করি। ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-তে বেদোৎপত্তিবিষয় নামক অধ্যায়ে 'বেদ' শব্দের অর্থ করতে গিয়ে লিখেছেন—"বেদ: = বিদন্তি-জানন্তি, বিদ্যন্তে= ভবন্তি, বিন্দন্তি বিন্দতে= লভন্তে, বিন্দতে= বিচারয়ন্তি সর্বে মনুষ্যাঃ সর্বাঃ সত্যবিদ্যা ধৈর্যেষু বা তথা বিদ্বাংশ্চ ভবন্তি তে বেদাঃ" অর্থাৎ যেগুলি পড়ার দ্বারা যথার্থ বিদ্যার বিজ্ঞান হয়, যেগুলি পড়ে বিদ্বান হওয়া যায়, যেগুলিতে সমস্ত সুখের লাভ হয়, এবং যেগুলির দ্বারা যথাযথ সত্যাসত্যের বিচার মানুষ করতে পারে, সেই কারণে ঋক্ সংহিতাদি-র নাম 'বেদ'। এতে বিদ্ জ্ঞানে, বিদ্লূ লাভে, বিদ্ সত্তায়াম্, এবং বিদ্ বিচারণে এই চার ধাতু থেকে 'বেদ' শব্দের উৎপত্তি দেখানো হয়েছে। আমরা এই চার ধাতু থেকে কিছু অন্য প্রকারের অর্থও গ্রহণ করব। বিদ্ জ্ঞানে থেকে, যা জ্ঞানরূপ এবং যার দ্বারা সকল মানুষ সত্যাসত্যের পূর্ণ জ্ঞান পায়। বিদ্ সত্তায়াম্ থেকে সেই জ্ঞান এমন হয়, যার সর্বদা সত্তা থাকে অর্থাৎ এর দ্বারা সকল সত্য বিদ্যারই জ্ঞান হয়, কোনো অনিত্য ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের জ্ঞান এর দ্বারা হয় না। বিদ্লূ লাভে, অর্থাৎ সেই বেদের জ্ঞান থেকে মানবমাত্র বা মানবমাত্রের এর ব্যবহার দ্বারা প্রাণীমাত্রের সকল যথার্থ সুখের লাভ হয়। বিদ্ বিচারণে থেকে অর্থাৎ যে জ্ঞান অগ্নি, বায়ু, আদিত্য ও অঙ্গিরা এই চার ঋষিকে সবিচার সম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তর্গত হয়, সেই জ্ঞান বিচার অর্থাৎ সম্পূর্ণ সংশয়হীন হয়।

ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা-এর 'বেদোৎপত্তিবিষয়' নামক অধ্যায়ে মহর্ষি দয়ানন্দ উদ্ধৃত করেন—
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে। ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদূ যজুস্তস্মাদজায়ত ॥ (যজু.৩১.৭) এবং বা অরেऽস্য মহতো ভূতস্য নিঃশ্বাসিতমেতদ্যদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদোऽথর্বাঙ্গিরসঃ ॥ (শ.১৪.৫.৪.১০)

অর্থাৎ তস্মাদূ যজ্ঞাৎ সচ্চিদানন্দাদিলক্ষণাত্ পূর্ণাৎ পুরুষাত্ সর্বহুতাৎ সর্বপূজ্যাত্ সর্বোপাস্যাত্ সর্বশক্তিমতঃ পরব্রহ্মণঃ ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদশ্চ চত্বারো বেদাস্তেনৈব প্রকাশিতা ইতি বৈদ্যম্। মহত আকাশাদপি বৃহতঃ পরমেশ্বরস্যৈব সকাশাৎ ঋগ্বেদাদিবেদচতুষ্টয়ং নিঃশ্বাসবৎ সহজতয়া নিঃসৃতমস্তীতি বেদ্যম্। যথা শরীরাচ্ছ্বাসো নিঃসৃত্য পুনঃ তদেব প্রবিশতি, তথৈবেশ্বরাদ্ বেদানাং প্রাদুর্ভাবতিরোভাবৌ ভবত ইতি নিশ্চয়ঃ ।।

অর্থাৎ সেই সচ্চিদানন্দস্বরূপ পূর্ণ পুরুষ পরমাত্মা থেকেই ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ সেই চার ঋষির হৃদয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এখন তারা কীভাবে প্রকাশিত হয়, তার প্রক্রিয়া বোঝানোর জন্য মহর্ষি দয়ানন্দ শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য-এর উক্তি উদ্ধৃত করেন, যার ভাব এই যে পরমেশ্বর, যিনি আকাশাদি থেকেও অনেক বড়, তার থেকেই চার বেদ সেই চার ঋষির মধ্যে এভাবে প্রকাশিত হয়েছে বা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে এভাবে উৎপন্ন হয়েছে, যেমন কোনো প্রাণী স্বাভাবিকভাবে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে। যেরূপ প্রাণীকে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ প্রচেষ্টা করতে হয় না, সেইরূপ পরব্রহ্ম পরমাত্মার দ্বারা ছন্দরূপ বেদ এই ব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টি-উৎপত্তির সময় প্রসারিত করা হয়।


এখানে ভগবান যাজ্ঞবল্ক্য যে উপমা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চেতন প্রাণী জড় প্রাণকে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে, সেইরূপ চেতন পরমাত্মা জড় প্রকৃতি থেকে ছন্দগুলির উৎপত্তি ও প্রলয় করেন। এর থেকে আমাদের মতে বেদের সেই মহর্ষিদের আত্মা বা চিত্তে প্রকাশিত হওয়ার একটি আরও বিজ্ঞানও উদ্ঘাটিত হচ্ছে। তা এইরূপ—যখন সেই ঋষিরা সম্প্রজ্ঞাত সবিচার সমাধিতে থাকেন, তখন পরমাত্মা ব্রহ্মাণ্ডে সেই সময় ব্যাপ্ত বিভিন্ন বৈদিক ছন্দগুলিকে সেই ঋষিদের ভিতরে শ্বাসের ন্যায় প্রবেশ করিয়ে দেন এবং সেই ছন্দগুলির মধ্যে থেকে যে যে সেই মহর্ষিদের এমন প্রতীত হয়, যাদের অর্থের প্রকাশ মানব বা প্রাণিজাতির জন্য প্রয়োজনীয় হয়, তাকে গ্রহণ করে নেন, এবং অবশিষ্টকে প্রশ্বাসের ন্যায় ব্রহ্মাণ্ডে নিঃসৃত করে দেন। যেরূপ প্রাণী বায়ুমণ্ডল থেকে বায়ুকে গ্রহণ করে তার মধ্যে থেকে অক্সিজেনকে ফুসফুসের দ্বারা গ্রহণ করে নেয় এবং অবশিষ্ট বায়ুকে বাইরে বের করে দেয়, সেইরূপ বৈদিক ছন্দগুলির গ্রহণ ও বিসর্জন হয়।

Read More

বিদ্যার সংজ্ঞা

01 April 0

বিদ্যার সংজ্ঞা বিদ্যাই একটি এমন গুণ, যা এই মানবজাতিকে অন্যান্য সমস্ত জীবধারীদের থেকে পৃথক একটি বিশেষ পরিচয় প্রদান করে। বিদ্যাই সেই গুণ, যা জগতের সমস্ত জড় ও চেতন পদার্থগুলির যথার্থ স্বরূপ জানায়। এটিও বিশেষভাবে বোঝার বিষয় যে, কোনো মানুষ সৃষ্টির বিভিন্ন পদার্থের যথার্থ স্বরূপ এবং তাদের পারস্পরিক বাস্তব সম্পর্ক ঠিকভাবে না জেনে তাদের থেকে যথাযথ উপকার নিতে পারে না। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী লেখেন “যার দ্বারা পদার্থের স্বরূপ যথাযথভাবে জেনে তা থেকে উপকার নিয়ে নিজের এবং অন্যদের জন্য সমস্ত সুখসমূহকে সিদ্ধ করা যায়, সেটিই বিদ্যা বলা হয়।” (ব্যবহারভানু)

বিদ্যা ছাড়া মানুষের পারস্পরিক ন্যায়সংগত ব্যবহারও সম্ভব নয়। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ লেখেন “যার দ্বারা পদার্থ যথাযথভাবে জেনে ন্যায়সংগত কর্ম করা যায়, সেটিই বিদ্যা বলা হয়।” (ব্যবহারভানু)
মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে বিদ্যার ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক, যার মধ্যে বর্তমান জগতে পড়ানো হয় এমন বহু বিদ্যা অন্তর্ভুক্ত যেমন ভৌত বিজ্ঞান এবং এর শাখাসমূহ খগোলভৌতবিদ্যা, 🌍খগোলবিজ্ঞান, পরমাণু ভৌতবিদ্যা, নাভিকীয় কণাভৌতবিদ্যা, ভূ-ভৌতবিদ্যা, সূর্যবিজ্ঞান, জীবভৌতবিদ্যা প্রভৃতি। রসায়নবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা— যেমন 🔬কার্বনিক রসায়ন, অকার্বনিক রসায়ন, 🧪ভৌত রসায়ন, জীবরসায়ন প্রভৃতি; 🐦প্রাণীবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভিন্ন ক্ষেত্র, অত্যন্ত উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান, শরীররচনা ও ক্রিয়াবিজ্ঞান, পশুপাখি বিজ্ঞান, পরিবেশ ও আবহাওয়াবিজ্ঞান, ভূগোল, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, 🔬শিল্প-বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা, ⚔️যুদ্ধবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, সঙ্গীত প্রভৃতি বিভিন্ন উপযোগী কলা সবই মহর্ষির মতে বিদ্যার অন্তর্গত।
এটিও লক্ষণীয় যে, এই সমস্ত বিদ্যাগুলি প্রধানত জড় পদার্থের সঙ্গেই বিশেষ সম্পর্ক রাখে। অথচ আমরা জানি যে, এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয়; এবং এই জড় পদার্থগুলি কেবল নিজের জন্যও নয়। ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাতা জড় হতে পারে না এবং একে ভোগকারীও জড় হতে পারে না। তবে এই বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে করব।
মহর্ষি দয়ানন্দের দৃষ্টিতে উপরে বর্ণিত বর্তমান প্রচলিত বিদ্যাগুলি বিদ্যার কেবল অর্ধেক অংশ। বিদ্যার দ্বিতীয় অর্ধেক অংশ, যা চেতন পদার্থগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত, পাশাপাশি যা ভৌত জগতের সূক্ষ্মতম বিজ্ঞান (কণাভৌতবিদ্যা, তরঙ্গভৌতবিদ্যা, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এবং স্ট্রিং থিওরি)-এর থেকেও সূক্ষ্ম এবং বৃহত্তম সৃষ্টি-বিজ্ঞানের থেকেও ব্যাপক এই দুই মিলেই বিদ্যার পূর্ণ স্বরূপ গঠিত হয়।
এইজন্য মহর্ষি বিদ্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লেখেন📚“যার দ্বারা ঈশ্বর থেকে নিয়ে পৃথিবী পর্যন্ত পদার্থগুলির সত্য বিজ্ঞান লাভ করে তাদের থেকে যথাযথ উপকার নেওয়া যায়, এর নাম বিদ্যা।” 📚(আর্যোদ্ধেশ্যরত্নমালা)
প্রাচীন বৈদিক ভারতে বিদ্যার সমগ্র স্বরূপেরই প্রচলন ছিল। এই কারণেই একবার দেবর্ষি নারদ মহর্ষি সনৎকুমারের কাছে গিয়ে বললেন—
"ঋগ্বেদং ভগবোऽধ্যেমি যজুর্বেদং সামবেদমাথর্বণং চতুর্থমিতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং বেদং পিত্র্যং রাশি দেবং নিধিং বাকোবাক্যমেকায়নং দেববিদ্যাং ব্রহ্মবিদ্যাং ভূতবিদ্যাং ক্ষত্রবিদ্যাং নক্ষত্রবিদ্যাং সর্পদেবজনবিদ্যামেতদ্ভগবোऽধ্যেমি ।।" (ছা০উ০ ৭।১।২ ডঃ সত্যব্রত সিদ্ধান্তালংকার ভাষ্য)
অর্থাৎ (নারদ) বললেন (ঋগ্বেদম্) ঋগ্বেদকে (ভগবঃ) হে ভগবান (অধ্যেমি) পড়ি, পড়েছি (যজুর্বেদম্) যজুর্বেদকে (সামবেদম্) সামবেদকে (অথর্বণম্) অথর্ববেদকে (চতুর্থম্) চতুর্থ (ইতিহাসপুরাণম্) ইতিহাস-পুরাণকে (পঞ্চমম্) পঞ্চম (বেদানাম্) বেদগুলির (বেদম্) বেদ জ্ঞান-প্রদানকারী, জ্ঞাপক অর্থাৎ ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, শিক্ষা, কল্প প্রভৃতি) কে (পিত্র্যম্) পিতৃ কর্ম (পিতৃ-শুশ্রূষা শাস্ত্র অর্থাৎ গৃহ বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ, কৃষি বিজ্ঞান প্রভৃতি) কে (রাশিম্) গণিত শাস্ত্রকে (দৈবম্) আবহাওয়া বিজ্ঞান, বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রकोপ প্রভৃতি সম্পর্কিত বিজ্ঞান এবং কর্মফল ব্যবস্থা (নিধিম্) অর্থশাস্ত্রকে (বাকোবাক্যম্) তর্ক শাস্ত্র এবং বিধি শাস্ত্রকে (একায়নম্) নীতিশাস্ত্র (দেববিদ্যাম্) সমস্ত প্রকাশিত সূক্ষ্ম পদার্থগুলির বিজ্ঞান এবং বেদমন্ত্রগুলির বিভিন্ন দেবতাদের বিজ্ঞান (ব্রহ্মবিদ্যাম্) বিদ্যুৎ বিদ্যা, মন-বাক্ তত্ত্ব প্রভৃতির বিজ্ঞান এবং পরমাত্মতত্ত্ব বিজ্ঞানকে (ভূতবিদ্যাম্) ভৌতবিদ্যা, রসায়ন বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, ভূগর্ভশাস্ত্র প্রভৃতি কে (ক্ষত্রবিদ্যাম্) যুদ্ধ এবং অস্ত্র-শস্ত্র বিদ্যাকে (নক্ষত্রবিদ্যাম্) খগোল ভৌতবিদ্যা, খগোল বিজ্ঞান, সূর্য এবং নক্ষত্রগুলির বিজ্ঞান (সর্পদেবজনবিদ্যাম্) পৃথিবীতে রেঙে চলা প্রাণীদের এবং বন্য প্রাণীদের বিজ্ঞান, শিল্পশাস্ত্র অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সঙ্গীত প্রভৃতি ললিত বিদ্যাগুলিকে (এতদ্) এই সমস্তকে (ভগবঃ) হে ভগবান (অধ্যেমি) শিক্ষা লাভ করছি (লাভ করেছি)।।২।।
"সোऽহং ভগবো মন্ত্রবিদেবাস্মি নাত্মবিচ্ছূতে হ্যেব মে ভগবদ্দৃশেভ্যস্তরতি শোকমাত্মবিদিতি। সোऽহং ভগবঃ শোচামি তং মা ভগবা ছোকস্য পারং তারয়ত্বিতি। তং হ উবাচ যদ্বৈ কিঞ্চৈতদধ্যগীষ্ঠা নামৈবৈতত্ ।।৩।।
(ছা০ উ০ ৭।১।৩)
অর্থাৎ (সঃ অহম্) সেই আমি অর্থাৎ বেদাদি শাস্ত্রকে জানা আমিও (ভগবঃ) হে ভগবান! (মন্ত্রবিত্+এব) মন্ত্রজ্ঞই (অস্মি) আছি অর্থাৎ পাঠকমাত্র (আত্মবিত্ ন) ব্রহ্মজ্ঞ নই (হি) কারণ (ভগবদ্দৃশেভ্যঃ) আপনার মতো তত্ত্বজ্ঞদের থেকে (মে) আমি (শ্রুতমেব) শুনেছি যে (আত্মবিত্) ব্রহ্মজ্ঞ (শোকম্ তরতি) শোককে অতিক্রম করে অর্থাৎ শোক করে না (ইতি) কিন্তু (ভগবঃ) হে ভগবান! (সোऽহম্) সেই আমি (শোচামি) শোক করছি, এই কারণে আমি আত্মজ্ঞ নই (তম্) সেই শোকগ্রস্ত (মা) আমাকে (ভগবান্) আপনি (শোকস্য পারম্) শোকের পার (তারয়তু) পার করান (ইতি) এই আমার প্রার্থনা। (তম্ হ উবাচ) সেই প্রসিদ্ধ সনৎকুমার সেই নারদকে বললেন যে (যত্কিঞ্চ) যা কিছু (এতত্) উপরে বর্ণিত বিজ্ঞানসমূহের (বৈ) নিশ্চয়ই (অধ্যগীষ্ঠাঃ) আপনি অধ্যয়ন করেছেন (এতত্ নামৈব) তা সবই নামমাত্র। ভাষ্য— (পণ্ডিত শিবশঙ্কর শর্মা 'কাব্যতীর্থ')


পাঠকগণ এখানে বিবেচনা করুন যে দেবর্ষি নারদের অধ্যয়ন কত বিশাল ছিল। কোনো একক ব্যক্তি এত বিষয়ের বিশেষজ্ঞও হতে পারে, এমন কল্পনাও করা অত্যন্ত কঠিন। দুর্ভাগ্যবশত আর্যাবর্ত (ভারতবর্ষ) অথবা বিশ্ব ভগবান নারদ প্রভৃতি মহাপুরুষদের যথার্থ চরিত্রকে বিস্মৃত হয়ে বসেছে। এখন একটু এই দিকটি বিবেচনা করুন যে সমগ্র জড় এবং চেতন জগতের বিস্তৃত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও দেবর্ষি নারদ কেন শোকে নিমগ্ন ছিলেন? তিনি কোন জ্ঞান-পিপাসায় মহর্ষি সনৎকুমারের শ্রীচরণে উপস্থিত হয়েছিলেন? এই কথার উত্তর তিনি নিজেই দেন যে আমি মন্ত্রজ্ঞ, আত্মজ্ঞ নই অর্থাৎ তিনি উপরে বর্ণিত সমস্ত বিদ্যার বিস্তৃত তাত্ত্বিক জ্ঞান তো রাখতেন। শিল্পশাস্ত্র অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে তাকে সমস্ত পদার্থ বিদ্যার প্রায়োগিক জ্ঞানও ছিল। ঈশ্বর এবং জীব উভয় চেতন তত্ত্বের গভীর মনন-চিন্তনও তিনি করেছিলেন কিন্তু এই চেতন তত্ত্বগুলির সাক্ষাৎকার করে জীবন্মুক্ত অবস্থা তখনও লাভ করতে পারেননি এবং এইটিই একমাত্র তার শোকের কারণ ছিল। এই বিষয়ে দুইটি কথা গভীরভাবে বিবেচনীয়—
ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের অনিবার্য সম্পর্ক

(১) সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ঈশ্বর-জীবের পূর্ণ তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়া চেতন তত্ত্বের সাক্ষাৎকার সম্ভব নয়। এই কারণেই ভগবান নারদ জগতের বিভিন্ন বিদ্যার অধ্যয়ন পূর্বেই করে নিয়েছিলেন এবং তার গুরুরাও এত বিদ্যার অধ্যাপন তাকে করিয়েছিলেন। যদি ঈশ্বর এবং আত্মসাক্ষাৎকারের জন্য এই সমস্ত বিদ্যা অনাবশ্যক হত, তবে সেই মহান বৈদিক কালে এবং সেই মহান দেব সমাজের মহান ঋষি মহাপুরুষেরা নারদের মতো মহান ব্যক্তিকে এই সমস্ত বিদ্যা পড়ানোর পুরুষার্থ করতেন না। এই বিষয়ে সেই মহাপুরুষদের গম্ভীরভাবে চিন্তা করা উচিত, যারা পদার্থ বিজ্ঞান এবং লোকব্যবহারের বিদ্যাগুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ঈশ্বর এবং মুক্তির কথা বলেন। আবার কেউ-কেউ মহাপুরুষ ক্ষণমাত্রে সমাধি প্রাপ্ত করানোর দাবি করেন। প্রকৃতপক্ষে এমন মহাপুরুষেরা বৈদিক আর্শ পরম্পরা এবং তারই এক অঙ্গ পাতঞ্জল যোগশাস্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

প্রশ্ন—আপনার মতে ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য যদি এত জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রয়োজন হয় এবং এর পরে ঈশ্বর সাক্ষাৎকারের উপায় করা হয়, তবে তো কোনো মানুষ ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবে না, কারণ না মহর্ষি নারদের মতো জ্ঞান হবে এবং না আত্মসাক্ষাৎকারের চেষ্টা করবে?

উত্তর—আমাদের উপরের কথার এই অর্থ নয় যে উপরোক্ত পদার্থ বিদ্যা অথবা চেতন বিদ্যার অধ্যয়নের সময় ঈশ্বরের উপাসনা করা হবে না। আমাদের বৈদিক সংস্কৃতিতে তো শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শিশুর পিতা স্বর্ণ শলাকার দ্বারা মধু দিয়ে শিশুর জিহ্বায় 'ওম' লিখে। এর উদ্দেশ্য এই হয় যে সেই শিশু জীবনে মাধুর্য নিয়ে জগতে নিজের মধুর আচরণের দ্বারা মাধুর্য ভরিয়ে দেবে এবং মধু উৎকৃষ্ট স্বাস্থ্যবর্ধক হওয়ার কারণে আয়ুর্বিজ্ঞান, আহারশাস্ত্র এবং শরীরোপযোগী বিভিন্ন বিদ্যার জ্ঞানী হয়ে উৎকৃষ্ট বল, বুদ্ধি, পরাক্রম, প্রজ্ঞা এবং দীর্ঘায়ু দ্বারা যুক্ত হয়ে সমগ্র জগৎকে নিজের মতোই গুণে পূর্ণ করার চেষ্টা করতে করতে এবং সোনা প্রভৃতি রত্ন দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে বিভিন্ন লোকোপযোগী বিদ্যার দ্বারা জগৎকে সুখী-সমৃদ্ধ করার চেষ্টা সর্বদা করতে থাকবে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে চিন্তনীয় যে এমন বিস্তৃত উদার ভাবনা কোনো ব্যক্তির মধ্যে তখনই আসতে পারে, যখন সে সমগ্র জগতকে নিজেরই পরিবার মনে করবে এবং নিজের পরিবার তখনই হয়, যখন তাকে উৎপন্ন করার পিতা-মাতার একটি জোড়া থাকে। এইজন্য সেই শিশুর জিহ্বায় 'ওম' শব্দ লেখা হয়। এটি এই বিষয়ের সংকেত যে হে শিশু! এই পরমাত্মাই এই সমগ্র জগতের মাতা এবং পিতা অথবা চেতন পরমাত্মা সকলের পিতা এবং জড় প্রকৃতি সকলের মাতা। এই কারণে জগতের সমস্ত প্রাণী এক পরিবারের সদস্য। এখানে এই বিষয়ও উল্লেখযোগ্য যে প্রকৃতিকে মাতা বলা হয়েছে কিন্তু পিতা কোথাও বলা হয়নি। অথচ পরমাত্মাকে—

"ত্বং হি নঃ পিতা বসো ত্বং মাতা শন্তক্রতো বভূবিথ।
অধা তে সুম্নমীমহে" ॥১১॥ (ঋ.৮.৬৮.১১), (সা.১৯৭০, অথর্ব. ২০.১০৮.২)

বলে মাতা এবং পিতা উভয় নামে সম্বোধন করা হয়েছে। এইজন্য সেই সর্বোচ্চ উপাস্য দেব এবং তারই প্রধান এবং নিজ নাম 'ওম'। এই কারণে শিশুকে শুধু জগৎ পরমাত্মার পরিবার—এই শিক্ষা দেওয়া হয় না, বরং সেই পরমাত্মাই আমাদের চূড়ান্ত পরমধাম—এই সংকেতও দেওয়া হয়।

এই কারণে পাতঞ্জল যোগের বিভিন্ন অঙ্গের সাধনা করতে করতে শৈশব থেকেই ঈশ্বরোপাসনা প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ ধর্ম হওয়া উচিত। ঈশ্বরোপাসনা এবং ব্রহ্মচর্য-প্রাণায়াম প্রভৃতি তপস্যার দ্বারা ছাত্র মহৎ প্রজ্ঞা লাভ করে বিভিন্ন পদার্থ বিদ্যার গভীর রহস্য এবং আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানকেও তুলনামূলকভাবে বুঝতে সক্ষম হয় এবং এইরূপ করতেই মহর্ষি নারদ উপরে বর্ণিত বিদ্যাগুলির মহান বিশেষজ্ঞ হতে পেরেছিলেন। এই কারণে কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জন্য পদার্থ বিদ্যার উপেক্ষা এবং নিন্দা কোনো অবস্থাতেই যুক্তিযুক্ত মনে করা যায় না, বরং পদার্থ বিদ্যা প্রত্যেক আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জন্য অনিবার্য বিষয় আছে। এটি খুবই সহজ কথা যে কার্যকে না দেখে কোনো কর্তার অনুমানও কিভাবে সম্ভব এবং যখন তার অস্তিত্বের অনুমানও হবে না, তখন তার স্বরূপের যথার্থ জ্ঞান এবং তার প্রাপ্তির তো কল্পনাও করা যায় না।

(২) সমগ্র সৃষ্টিকে জানার পরে এবং ঈশ্বর-জীবাত্মা বিষয়ক বিভিন্ন বেদাদি শাস্ত্রকে গম্ভীরভাবে অধ্যয়ন করার পরেও ঈশ্বর-আত্মার সাক্ষাৎকার ছাড়া অথবা জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত না করে সম্পূর্ণ বিশোক অবস্থার প্রাপ্তি সম্ভব নয়, এই অবস্থাকেই মুক্তি বলা হয়। আমাদের দৃষ্টিতে মহর্ষি নারদ মহর্ষি সনৎকুমারের কাছে আসার পূর্বে আত্মা অথবা ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করেননি, এমনটি কখনোই সম্ভব বলে মনে হয় না। মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি না হয়ে এত বিশাল এবং গভীর অধ্যয়ন করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এবং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি সেই হবে, যে ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার করেছে। বর্তমান কোনো আধ্যাত্মিক এবং প্রতিভাশালী বিদ্বানের দ্বারা বেদার্থ করা আলাদা কথা এবং সেই মহান যুগে মহর্ষি নারদের দ্বারা নিজেকে মন্ত্রবিত্ বলা খুব উচ্চ কথা। আমাদের দৃষ্টিতে 'মন্ত্রবিত্' এর অর্থ কেবল পাঠকমাত্র নয়, বরং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষির স্তর প্রাপ্ত করা। আমরা বিভিন্ন বিদ্বানদের দ্বারা মন্ত্রবিত্ শব্দের অর্থ 'পাঠকমাত্র' করা সঙ্গে সম্মত নই।

প্রশ্ন— যদি 'মন্ত্রবিত্' এর অর্থ ঋষিই হয়, তবে কি ঋষিরাও শোকাকুল এবং অপূর্ণবিদ্যা হয়, তাহলে তাদের এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য কি রইল?

উত্তর— জগতে সম্পূর্ণ পূর্ণপুরুষ তো কেবল পরমাত্মাই হতে পারে এবং জীবাত্মাদের স্তরে সম্পূর্ণ শোকহীন এবং সমস্ত জ্ঞেয়ের জ্ঞানী কেবল মুক্তাত্মা এবং জীবন্মুক্ত পুরুষই হতে পারে। অন্য স্তরগুলিতে কখনো-সখনো সামান্য শোক-দুঃখ আসতেই পারে এবং সেই অবস্থাই তখন মহর্ষি নারদের ছিল। এটিও লক্ষ্যণীয় যে এই স্তরের মহাপুরুষদের এবং অন্যান্য স্তরের মানুষের সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দে অনেক পার্থক্য থাকে।

এখন মহর্ষি নারদ তখন যে আত্মবিত্ না হওয়ার কথা বলেন, তার অর্থ এই যে তিনি মুক্তির কামনায় জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত করার জন্য ঈশ্বর সাক্ষাৎকারকে দৃঢ় করার এবং নিজের সমস্ত সংস্কারকে দগ্ধবীজ করার অভ্যাসের জন্য জীবন্মুক্ত অবস্থা প্রাপ্ত সদ্গুরু মহর্ষি সনৎকুমারের শরণে এসেছিলেন। এইরূপে এই সিদ্ধান্ত প্রাপ্ত হয় যে সমগ্র পদার্থ বিদ্যার জ্ঞানী বিজ্ঞানী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ সুখ প্রাপ্ত করতে পারে না, যতক্ষণ না সে চেতন তত্ত্বের সাক্ষাৎকার দ্বারা তার যথার্থ বিজ্ঞান প্রাপ্ত করে। সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি সুন্দর মালার ন্যায়। জগতের সমস্ত পদার্থ বিদ্যাগুলি সেই মালার সুন্দর মুক্তোর ন্যায় এবং সেই মুক্তোগুলিকে পরস্পর যুক্ত করার সূতোরূপ ভিত্তি চেতনতত্ত্ব বিজ্ঞান। যতক্ষণ এই সূতা থাকবে না, ততক্ষণ মুক্তোগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে সৌন্দর্য প্রাপ্ত করতে পারবে না। এইরূপে আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান ছাড়া পদার্থ বিজ্ঞান এবং ব্যবহারিক বিদ্যার বিভিন্ন শাখা মানব সমাজ অথবা প্রাণীমাত্রকে কখনোই সুখ-শান্তি দিতে পারে না। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিরোধভাব থাকবেই, যার কারণে সুখ-সুবিধার বিভিন্ন বিস্তার হওয়া সত্ত্বেও মানব সমাজ সুখী এবং আনন্দিত হতে পারবে না, তখন প্রাণীমাত্রের কথাই বা কি বলা যায়? দুর্ভাগ্যবশত আজ জগতে এইসবই ঘটছে। সুখ-সুবিধার উপকরণের ভিড়ে সুখ, শান্তি, প্রেম, মৈত্রী, করুণা প্রভৃতি মানবীয় গুণ কোথাও হারিয়ে গেছে। কোনো মালার সূতা শুধু সেই মুক্তোগুলিকে ভিত্তি দেয় না, বরং তাদের সুশৃঙ্খল ক্রম প্রদান করে সুন্দর এবং উপযোগীও করে তোলে। এইরূপে যথার্থ আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান বিভিন্ন বিদ্যাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে, তাদের পরস্পর পরিপূরক করে প্রাণীমাত্রের জন্য উপযোগীও করে তোলে। তখন যেখানে নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির বিকাশ হয়, যেখানে পরিবেশ সুন্দর এবং সংরক্ষিত থাকে, সেখানে মানুষের মধ্যে গলা-কাটা প্রতিযোগিতা না হয়ে পারস্পরিক প্রীতি এবং শান্তিও বজায় থাকে। তিন প্রকারের দুঃখ অর্থাৎ শারীরিক এবং মানসিক দুঃখ, প্রাকৃতিক প্রকোপ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন দুঃখ এবং প্রাণীদের পারস্পরিক সংঘর্ষজনিত দুঃখ কাউকেই পীড়িত করে না। অন্যদিকে বিভিন্ন পদার্থবিদ্যা এবং ব্যবহারিক জ্ঞানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল আধ্যাত্মের কথা বলার মহাপুরুষেরা কোনো সুন্দর মালার ন্যায় সামাজিক ব্যবস্থার কল্পনা থেকেও অত্যন্ত দূরে একটি সূতার ন্যায় এমন নীরস ব্যবস্থা উৎপন্ন করার হয় হয়, যেখানে তাদের পরমাত্মা অথবা মুক্তির প্রাপ্তি তো কি হবে, বরং তারা নিজেদের উদর-পোষণেও সক্ষম না হয়ে সম্পূর্ণ দুঃখী এবং অভিশপ্ত জীবন যাপন করে। এই কারণেই যজুর্বেদে বলা হয়েছে—

"অন্ধন্তমঃ প্রবিশন্তি যেऽবিদ্যামুপাসতে। ততো ভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াং রতাঃ ॥" (যজু. ৪০.১২)

অর্থাৎ যারা মানুষ কেবল পদার্থ বিজ্ঞানে নিমগ্ন থাকে, তারা দুঃখ-সাগররূপ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং যারা মানুষ পদার্থ বিদ্যার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে নিমগ্ন থাকতে চায়, তারা আরও অধিক গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এর কারণ পাঠক উপরে বুঝেই গেছেন। তখন, কিভাবে মানুষ সম্পূর্ণ সুখী হতে পারে, এর উত্তরে বেদ আবার বলে—

"বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্বেদোভাব্যং সহ। অবিদ্যয়া মৃত্যুঁ তীর্ত্বা বিদ্যয়া অমৃতমশ্নুতে ।।" (যজু. ৪০.১৪)

অর্থাৎ যে মানুষ পদার্থ বিদ্যা এবং আধ্যাত্মিক বিদ্যা উভয়কেই একসঙ্গে জানে, সেই মানুষ পদার্থ বিদ্যার যথাযথ এবং সর্বহিতকারী প্রয়োগের দ্বারা এবং শরীর ও জগতের নশ্বর হওয়ার জ্ঞান দ্বারা মৃত্যু-ভয় এবং অন্যান্য সমস্ত দুঃখ অতিক্রম করে যথার্থ আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের দ্বারা জীবন্মুক্ত অথবা মুক্তিরূপ পরমানন্দ প্রাপ্ত হয়।

এইভাবে জগতের বিদ্যাগুলির বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা এবং তাদের সমন্বিত, সুষম এবং যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা মানুষ নিজে সমস্ত প্রকার দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে অন্য সকল প্রাণীকেও সুখ দিতে সক্ষম হয়। এটিই বিদ্যার উপাদেয়তা।

Read More

গির জাতের গরু

01 April 0

গির জাতের গরু
গুজরাটের গির (Gyr) জাতের গরু ভারতের এক বিখ্যাত আদি ভারতীয় (বস ইন্ডিকাস) দুগ্ধগাভী। এর জন্মস্থান হলো কাথিয়াওয়ার উপদ্বীপ (খাসবাহা: গির বন)। গির গরুর বিশেষত্ব হলো উলকনের মত গম্বুজ মাথা, লম্বা ঝুলন্ত কান এবং উন্নত শারীরিক সহিষ্ণুতা – গরম আবহাওয়া ও অসুখ-প্রতিরোধে তারা স্বভাবতই মজবুত। এই জাতের গরুর গড় দুগ্ধ উৎপাদন ১২০০–২০৬০ লিটার/ল্যাক্টেশনে থাকে এবং দুধের চর্বির পরিমাণ প্রায় ৪.৭% (৪.৬৯–৪.৯৭%)। বিখ্যাত গির গাভী A2 প্রোটিন যুক্ত দুধ উৎপাদন করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অধিকতর উত্তম বলে মনে করা হয়। ব্রাজিলে বিশেষ করে গির প্রজনন ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ লক্ষের মতো গির গরু আছে। আজকের বাজারে গিরের A2 দুধের চাহিদা বাড়ছে, বেশিরভাগ আদিবাসী ব্রিডেই A2 β-কেসিনের ডোমিন্যান্স পাওয়া যায়

১. গির জাতের ইতিবৃত্ত ও বৈশিষ্ট্য

গির জাতের উত্স কাথিয়াওয়ার উপদ্বীপ (গুজরাট)। পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন মনে করিয়ে দেয় এর আদিম বসবাস বহু সহস্রাব্দ পুরনো হতে পারে। এই ব্রিডটি মূলত বস ইন্ডিকাস গোত্রের অংশ; অতীতে পেশোয়ার থেকে অশ্বমেধ, এবং আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রিজ (১৯০০-পেরিয়ে) রপ্তানি করা হয়েছে। ব্রাজিলে গির গরু বড় পরিসরে প্রজনন হয়েছে (বহু মিলিয়ন হেড)। দেশীয় গির গাভী মারস্থানে, মহারাষ্ট্রে, রাজস্থানে এবং গুজরাটেই দেখা যায়। গির গরুর মুখ গম্বুজ, বামনাটের মতো, কান লম্বা ঝুলন্ত, শরীর লালাভ বা সাদা মিশ্র রঙ। গিরের উচ্চতা প্রায় ৫৫ ইঞ্চি, ওজন পুরুষ ~৬০০ কেজি, স্ত্রী ~৪০০ কেজি পর্যন্ত হয় (ডাটা-উৎস: ন্যাশনাল বাণিজ্যিক গবাদি পশু সেন্টার)। এই জাতের গরু সাধারণত সহিষ্ণু (উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সহ্য করে), রোগ-প্রতিরোধী, এবং দীর্ঘকাল স্বাস্থ্যবান থাকতে পারে (~১২–১৫ বছর)। রেকর্ড অনুযায়ী গির জাতের উৎপাদন ক্ষমতা ভারতীয় আদিবাসী ব্রিডের মধ্যে শীর্ষে; গড়ে এক ল্যাক্টেশনে ~২০৬৩ লিটার দুধ উৎপন্ন হয়, যা গুজরাটের অন্তর্বর্তী খাদ্যাভাসের জন্য যথেষ্ট।

২. A2 দুধের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা

দুধের β-কেসিন (CSN2 জিন) হল অন্যতম প্রধান কেসিন প্রোটিন, যা জিনগতভাবে A1/A2 ভেরিয়েন্ট বিভক্ত। CSN2-এ একক নিউক্লিওটাইড পরিবর্তন (A1-এ His→A2-এ Pro@পজিশন 67) ঘটলে A1 (হিস্টিডিন) ও A2 (প্রোলিন) প্রোটিন ভিন্ন হয়। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনই A1 দুধে হজমে β-কাসোমরফিন-৭ (BCM-7) নামক অপিঅয়েড পেপটাইড ছাড়ে, যেটা অন্ত্রব্যাধি, স্নায়ুবিক অঙ্গহানি এবং প্রদাহজনিত সমস্যা (ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ইত্যাদি) সহ বিভিন্ন অসুখের সাথে যুক্ত। অপরদিকে A2 প্রোটিনে প্রোলিনের বন্ধন শক্ত হওয়ায় BCM-7 সৃষ্টি হয় না। তাই A2 দুধকে সহজপাচ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে বিবেচনা করা হয়। A2 দুধের সংজ্ঞা হল এমন গরুদের দুধ যা β-কেসিনের A2 জিনটাইপ (Pro⁶⁷) দ্বারা গঠিত। বিজ্ঞানীরা আজকাল এ2/A2 জিনাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন এবং Marker-Assisted Selection এর মাধ্যমে A2 প্রভূত করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন

৩. গির দুধের A2 প্রোফাইল

গির জাতের গরু প্রায়শই প্রায় শূন্য A1 allele বহন করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় গুজরাটের ২০০টি গির গরুতে β-কেসিন ভিন্নতা পরীক্ষায় পাওয়া গেছে – জেনোটাইপ: ৮৭.৫% গরু A2A2 ও ১২.৫% A1A2, এবং এলিল ফ্রিকোয়েন্সি: A2=0.94, A1=0.06। অর্থাৎ গিরের মধ্যে A2 এলিল প্রাধান্য (৯৪%)। নিচের টেবিলে বিভিন্ন ব্রিডের β-কেসিন A1/A2 আনুপাতিক তুলনা দেওয়া হল:

ব্রিড (উৎপত্তি)A1 এলিল (%)A2 এলিল (%)সূত্র ও মন্তব্য
গির (ভারত)৯৪গুজরাট থেকে সংগ্রহিত নমুনায় [β-casein CSN2]
থারপার্কার৯৬ইন্ডিয়ান জার্নাল অব এনিমেল রিসার্স অনুযায়ী Tharparkar
ফ্রিসওয়াল (HF×সাহীওয়াল)৩৭৬৩একই উত্স
জার্সে~৪০~৬০(সাধারণ H/F জার্সে) – আনুমানিক; উত্সসমূহে উঠে।
ভ্যাকরাস১০০সমস্ত জলহস্তি গাভে A2A2 genotype

টেবিলে দেখানো হল গির ও অন্যান্য ব্রিডে A2 এলিলের উচ্চতার সুস্পষ্টতা। আদিবাসী ব্রিডগুলোতে (গির, সাহীওয়াল, থারপার্কার) A2 প্রায় মৌলিক, যেখানে HF বা জার্সে জাতে A1 এলিলের হার তুলনামূলকভাবে বেশি

৪. পুষ্টিগুণ ও গুণগত তুলনা

গির দুধের পুষ্টি-গুণ সাধারণ গরুর দুধের তুলনায় বিশেষ: অধিক চর্বি এবং ভাজ্য উপাদান থাকে। গড় হিসেব অনুযায়ী গির দুধে ৪.৫–৫% চর্বি এবং ~৩.৫% প্রোটিন থাকে; অন্যদিকে হাইব্রিড (যেমন হলস্টিন) দুধে চর্বি ~৩.৫% এবং প্রোটিন ~৩.২%। নিচের গ্রাফে গির-দুধ ও একটি প্রমিত হলস্টিন দুধের প্রোটিন, চর্বি ও ল্যাকটোজ তুলনা করা হল (আনুমানিক শতাংশ):

mermaid
barChart
    title গির বনাম হলস্টিন দুধের পুষ্টিগত তুলনা (%)
    orientation vertical
    সময়কাল : Composition (%)
    Ch:Fat - Gir Cow: 4.7
    Ch:Fat - Holstein: 3.5
    C:Protein - Gir Cow: 3.5
    C:Protein - Holstein: 3.2
    D:Lactose - Gir Cow: 4.5
    D:Lactose - Holstein: 4.8

উপরের চার্টে দেখা যায় গির দুধে চর-বেশি (গড় ৪.৭%) এবং প্রোটিন সামান্য বেশি, ল্যাকটোজ সামান্য কম। এছাড়া গির দুধে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স) পরিমাণ সূক্ষ্মভাবে সমৃদ্ধ; উচ্চ ফ্যাটের কারণে ভিটামিন A,D,K,E মুক্তির সুযোগ বেশি। গিরের ছোট ফ্যাট গ্লোবিউল থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন এটি সহজপাচ্য। উভয় দুধেই ল্যাকটোজ প্রায় ৪.৭–৪.৮% রয়েছে। এছাড়া গির দুধে উপস্থিত কিছু বিশুদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক প্রোটিন (যেমন ল্যাকটোফেরিন, ল্যাকোপেরক্সিডেজ, ইমিউনোগ্লোবুলিন) প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। উপরোক্ত উপাদানগুলো বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত; উদাহরণস্বরূপ দেখা গেছে গির দুধের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি

৫. পালন, উৎপাদন ও বাজার

পালন: গির গরু সহজেই সহজতর আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ও যত্নবান। এরা মূলত প্রচুর ঘাস ও স্থানীয় গোবর খাওয়া পছন্দ করে; কমবেশি মাত্রায় চারা ও শস্যচুরাও খায়। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পোকামাকড়, রোগের অপ্রীতিকর পরিবেশে টিকে থাকে। গিরের উৎপাদনকাল সাড়ে ৯ মাস (কাউলেস্টন কালসহ ~২৮০–৩২০ দিন) এবং গড়ে বছরে ১২০০–২০৬০ লিটার দুধ দেয়। দুই বার দুধ দান উপযুক্ত (ডাবল মল) এবং গাভীর মাসিক কাল ২.৫–৩ মাস। গিরের গড় জীবনকাল ১২–১৫ বছর এবং বার্ষিক মৃত্যু মাত্রা খুব কম (~৩–৪%)। ইনকিউবেশনের পরে ১ বার বাছুর দেয়। অনুষঙ্গ: গিরের পুষ্টি খরচ তুলনামূলক কম; তারা সহজেই স্থানীয় চালা ও গাছের চারা খেয়ে চলে। স্বাস্থ্য-খরচ কম (প্রতিকূল জিনিস্র হাড় এবং উপযোগী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে)।

মিল্ক প্রক্রিয়াজাতকরণ: প্রায় সমস্ত গির দুধ উচ্চ-মানের খাঁটি গরুর দুধ হিসেবে সরাসরি বিক্রি করা হয়। সাধারণভাবে বিশুদ্ধতা-নিরীক্ষা কম থাকায় চেইনের মাধ্যমে সরবরাহ সীমিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুষল মিশ্রণ ও পরিষ্করণ প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। খাঁটি গির দুধের বৈশিষ্ট্যগত গন্ধ মিষ্টি-টক, এবং সেটি ঘি/দই-তে ভাংচুর ছাড়া ভালো থাকে।

বাজার: গিরের দুধে A2 এলিলের প্রচলন ও স্বাস্থ্য-রূপের কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বড় বড় ডেইরি, বিশেষ করে আমুল এর মতো সংস্থাগুলো ‘দেসি A2 দুধ’ বাজারজাত করছে। আমুল ২০১৬ সালে কানকেজ গাভীর A2 দুধ চালু করেছিল। এছাড়া গুরু-আপাসনাদের তুলনায় ছোট কোম্পানিগুলোও A2 গির দুধ সংরক্ষণ করে বিক্রি করছে। পর্যটক অঙ্ক ও উচ্চ-শ্রেণির দোকানে খাঁটি গির A2 দুধের দাম সাধারণ গরুর দুধের তুলনায় ~১৫–২০% বেশি (অংশিক ভিন্ন হতে পারে) পাওয়া যায়। তুলনামূলক ছোট বাজার (বিশেষ আকাঙ্ক্ষিত গ্রাহক) হওয়ার কারণে সরবরাহ ক্রমশ বাড়ছে।

অর্থনীতি ও SWOT:

  • দাম: খাঁটি গির-A2 দুধের দাম (প্যাকেট/বোতলে) ~৮০–১০০ টাকা/লিটার (সরকারি মজুদ দুধের চেয়ে ২০–৪০% বেশী) হতে পারে।
  • ব্যয়: গির পালনে খরচ তুলনামূলক কম; তবে ফলন কম হওয়ায় প্রতি লিটার খরচ বেশি।
  • বাজার: স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতা ও আয়ুর্বেদ প্রচার বৃদ্ধির সুযোগ।
  • SWOT: শক্তি: অভিজাত উৎপাদন (A2), দেশীয় রোধক্ষমতা; দুর্বলতা: নিম্ন দুধফল, সংযোগ সীমিত; সুযোগ: বহিঃবাজারে A2 সনদ, বিশেষ ব্র্যান্ড; হুমকি: বিপণন নিয়ন্ত্রণ (FSSAI নির্দেশিকা), সচেতনতার অভাব।

৬. নিয়ন্ত্রণ এবং লেবেলিং

ভারতে FSSAI ২০২৪ সালের নির্দেশনায় A1/A2 লেবেলিং নিষিদ্ধ করেছে। এ নির্দেশে বলা হয়েছে, “পণ্যে A1/A2 claims থাকলে ভোক্তা বিভ্রান্ত হতে পারে”। আমূল ইত্যাদি সংস্থা এখন A2 লেবেল না দিয়ে শুধুমাত্র “দেশী গরুর দুধ” হিসেবে বিক্রি করছে। বিস্তৃত জনস্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে, ব্রাজিল/যুক্তরাষ্ট্রে A2 আলাদা লেবেল নাই; তবে বিপণনে A2 উপাদান উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় বাজারে, ন্যূনতম ৬ মাসের মধ্যে স্বশক্তি ডিজাইনে A2 ট্যাগের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে

৭. সুপারিশসমূহ

  • কৃষক ও পঞ্চায়েত: গিরজাতের যত্নে দৃষ্টি বাড়ান। উচ্চ A2 গির বাছুর ধরে রাখুন। ডেইরি সমবায় গড়ে তুলুন, যেন গিরদুধ সংগ্রহ ও শীতল রক্ষণাবেক্ষণ সুনিশ্চিত হয়। স্বাস্থ্যপরিসেবা (টিকাদান, পোকামাকড় প্রতিরোধ) নিয়মিত করুন।
  • ক cooperatives ও এগ্রো-বিষয়ক সংস্থা: গির ব্রিডের মান-সম্প্রসারণ প্রকল্প শুরু করুন। গির-সংরক্ষণ কর্মসূচি (উদাহরণ: গির গাভী পালনাগার) সমর্থন করুন। গ্রামীণ মহিলাদের সমিতিতে গির-দুধ বিক্রয়-সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করুন। বাণিজ্যিক সংস্থাকে উৎপাদন সাথে সংযোগ করে শুদ্ধ চেইন নিশ্চিত করুন।
  • পলিসিমেকার: A2 দুধের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও সমন্বিত গবেষণা (CSN2 জিন, মানব স্বাস্থ্যে BCM-7 প্রভাব) ত্বরান্বিত করুন। ব্র্যান্ড ও খাঁটি পরিচয়ের জন্য দেশীয় ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ নিন। গির/A2 দুধ উৎপাদন ও রপ্তানি-সংক্রান্ত আইনি-নিয়মাবলী পরিষ্কার করুন (যেমন পরিচিতি লেবেলিং, মান-চাহিদা, প্যাকেজিং)। গবেষণায় NDDB ও ICARকে নির্দেশ দিন দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক গবেষণা চালাতে – A2 বাজারের লাভ-লোকসানের পরিসংখ্যান তৈরি করতে।

৮. উল্লেখযোগ্য উৎসসমূহ

পেশাগত গবেষণাপত্র ও সরকারী উৎস: সম্প্রতি প্রকাশিত β-casein জিন পলিমরফিজম নিয়ে গবেষণা, NFDB/ইইউএফএএফ উৎস (FSSAI নির্দেশিকা), এবং গির জাত সংক্রান্ত FAO/নিবন্ধগুলো। বিশেষত বেটা-কেসিন জেনোটাইপিং সম্পর্কিত প্রাথমিক গবেষণাগুলি (Vyas & Kulkarni 2024), কৃষি গবেষণা জার্নাল (Tharparkar–Frieswal), এবং পানিবাহক সংক্রান্ত তথ্য (সংকল্পিত অক্ষরে প্রকাশিত FAO) ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া Times of India-র প্রতিবেদন(2024) এবং আইএআইআর/এমবিও-র সরকারি প্রতিবেদনসমূহ থেকে পরিসংখ্যান এবং নীতিগত নির্দেশিকা সন্নিবেশিত হয়েছে

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন

 বেদ জ্ঞান সংস্কৃত ভাষাতেই কেন প্রশ্ন- পরমাত্মা সৃষ্টির প্রথম প্রজন্মের বহু মানুষের মধ্যে কেবল চার ঋষিকেই জ্ঞান কেন দিলেন? কি ঈশ্বর পক্ষপাতী...

Post Top Ad

ধন্যবাদ