পঞ্চমহাভূতে বর্ণিত অগ্নি নামক মহাভূত বিদ্যুৎ আবেশ তথা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ এই দুটোকেই অগ্নি বলা হয়। নিরুক্ত শাস্ত্রের মধ্যে এগুলোকে পৃথক-পৃথক শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। মহর্ষি ব্রহ্মার কথন হল -
তৃতীয়ম্ জ্যোতিরিত্যাহুশ্চক্ষুরধ্যাত্মমুচ্যতে।
অধিভূতম্ ততো রূপম্ সূর্য়স্তত্রাধিদৈবতম্।।২০।।
(মহাভারত, আশ্বমেধিক পর্ব, অনুগীতা পর্ব, অধ্যায় - ৪২)
অর্থাৎ তৃতীয় মহাভূতকে জ্যোতিরূপ অগ্নি বলা হয়। এই সময়ই চক্ষু ইন্দ্রিয় রূপ সূক্ষ্ম রশ্মিগুলো উৎপন্ন হয়। সূর্য অর্থাৎ বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের ফোটনগুলো অগ্নির রূপই হয়।
তস্মিন্ বায়্বম্বুসম্ঘর্ষে দীপ্ততেজা মহাবলঃ।
প্রাদুরভূদূর্দ্ধশিখঃ কৃত্বা নিস্তিমিরম্ নভঃ।।১৪।।
(মহাভারত শান্তি পর্ব, মোক্ষধর্ম পর্ব, অধ্যায় - ১৮৩)
অর্থাৎ পূর্বোক্ত আকাশ এবং বায়ুর সংঘর্ষ দ্বারা দীপ্ত তেজ এবং বলবান্ অগ্নি তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, যারফলে সম্পূর্ণ আকাশ তত্ত্ব প্রকাশিত হয়ে ওঠে। অগ্নির রশ্মির দিশা আকাশের সঙ্গে সংঘর্ষ করতে-করতে বায়ু রশ্মির দিশার বিপরীত হয়, একেই ঊর্ধ্বশিখ নাম দেওয়া হয়েছে। এখানে আমি "অম্বু" শব্দের অর্থ জল গ্রহণ না করে আকাশ মহাভূত গ্রহণ করেছি। এই শব্দ এই প্রকরণের মধ্যেই "সলিল" -এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যার দ্বারা বায়ু তত্ত্বের উৎপত্তি বলা হয়েছে। জল থেকে বায়ুর উৎপত্তি সম্ভব নয়, এই কারণে আমি পূর্বে এর অর্থ আকাশই গ্রহণ করেছি, এই কারণে সেই সলিলের স্থানে ব্যবহৃত "অম্বু" শব্দ আকাশেরই বাচক মানা উচিত, জলের বাচক নয়। ঋষি দয়ানন্দ উণাদিকোষ ১.২৭ ব্যাখ্যাতে "অম্বু" পদের ব্যুৎপত্তি করে বলেছেন -
"অমন্তি গচ্ছন্তি চেষ্টন্তে প্রাণিনো য়ে তদ্ অম্বু"
প্রাণ তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পরমাণু আদি পদার্থ অবশ্যই আকাশ তত্ত্বের দ্বারা প্রেরিত হয় অর্থাৎ সেগুলোর প্রত্যেক ক্রিয়া-গতি আদির মধ্যে আকাশের অনিবার্য ভূমিকা আছে। ঋষি দয়ানন্দ এই শব্দের অর্থ জল করেছেন, এই বিষয়টা ভিন্ন। এই ব্যুৎপত্তি থেকে আকাশের গ্রহণ করা সর্বথা সম্ভব ও প্রকরণের অনুকূল। আমার দৃষ্টিতে এই শব্দের ব্যুৎপত্তি এইভাবেও হওয়া সম্ভব - অমন্তি গচ্ছন্তি চেষ্টন্তে পরমাণবো য়স্মিন্ তদ্ অম্বু।
এখন অগ্নির বিষয়ে কিছু অন্য ঋষিদের বচনকে উদ্ধৃত করবো -
১. অগ্নয়ো বৈ ছন্দাꣳসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫.৭.৯.৩)
২. অগ্নিম্ বৈ পশবঃ প্রবিশন্ত্যগ্নিঃ পশূন্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.৮.২)
৩. অগ্নিঃ প্রজনয়িতা (কাঠক সংহিতা ৬.৭; ২৭.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৬.৫)
৪. অগ্নিঃ প্রথম ইজ্যতে (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৮.১)
৫. অগ্নিনা তপোऽন্বাভবৎ (কাঠক সংহিতা ৩৫.১৫; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪৭.১৩)
৬. অগ্নিনা বা অনীকেনেন্দ্রো বৃত্রমহন্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১০.৫; কাঠক সংহিতা ৩৫.২০; কপিষ্ঠল সংহিতা ৪৭.১৮)
৭. অগ্নিরসি পৃথিব্যাꣳশ্রিতঃ। অন্তরিক্ষস্য প্রতিষ্ঠা (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.১১.১.৭)
৮. অগ্নিরেকাক্ষরয়োদজয়ন্মামিমাম্ পৃথিবীম্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১১.১০)
৯. অগ্নিরেকাক্ষরয়া বাচমুদজয়ত্ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১১.১০; কাঠক সংহিতা ১৪.৪)
১০. অগ্নিরু দেবানাম্ প্রাণঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ১০.১.৪.১২)
১১. অগ্নির্গায়ত্রছন্দাঃ (কাঠক সংহিতা ৯.১৩)
১২. অগ্নিম্ বৈ বিভাজম্ নাশক্নুবꣳ স্তমশ্বেন ব্যভজন্ (কাঠক সংহিতা ৮.৫)
১৩. অগ্নির্বৈ দেবানাম্ পথিকৃৎ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.৮.৯)
১৪. অগ্নির্বৈ মিথুনস্য কর্ত্তা প্রজনয়িতা (শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৪.৩.৪)
১৫. তে বাऽএতে প্রাণা এব য়দ্ অগ্নয়ঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ২.২.২.১৮)
১৬. দেবরথো বা অগ্নয়ঃ (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৫.১০)
১৭. ভূরিতি বা অগ্নিঃ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ৭.৫.২; তৈত্তিরীয় উপনিষদ ১.৫.২)
১৮. বিশ্বকর্মায়মগ্নিঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.২.২.২)
১৯. মিথুনম্ বা অগ্নিশ্চ সোমশ্চ সোমো রেতোধা অগ্নিঃ প্রজনয়িতা (কাঠক সংহিতা ৮.১০; কপিষ্ঠল সংহিতা ৭.৬)
এই উপরোক্ত বচনগুলো থেকে নিম্নলিখিত নিষ্কর্ষ প্রাপ্ত হয় -
১. এই পদার্থ পূর্বোক্ত ছন্দ রশ্মিরই রূপ হয় অর্থাৎ সেগুলো থেকেই নির্মিত হয় আর সেগুলোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত থাকে।
২. পশুঃ = প্রাণাঃ পশবঃ (শতপথ ব্রাহ্মণ ৭.৫.২.৬; তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ ৭.৩.২৮),
পশবো মারুতঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৩.৩.১০; কাঠক সংহিতা ২১.১০),
পশবো বৈ মরুতঃ (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৬.৮; কাঠক সংহিতা ৩৬.১; ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৩.১৯),
পশবো বৈ ছন্দাꣳসি (তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৪.১.৩),
পশবশ্ছন্দাꣳসি (মৈত্রায়ণী সংহিতা ৪.৩.৫; কাঠক সংহিতা ১২.৮; কপিষ্ঠল সংহিতা ৩০.৮; কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ১১.৫)
বিভিন্ন পশু অর্থাৎ প্রাণ, মরুত্ ও ছন্দ রশ্মি অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করে এবং অগ্নি তত্ত্ব এই রশ্মিগুলোর মধ্যে ব্যাপ্ত থাকে অর্থাৎ অগ্নি তত্ত্ব এই রশ্মিগুলোর ভিতরে-বাইরে সম্পূর্ণভাবে ভরে থাকে।
৩. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন পদার্থের উৎপন্নকারী হয়। এর অভাবে কোনো স্থূল পদার্থের উৎপত্তি হওয়া সম্ভব নয়।
৪. পরমাণু (কণা বা বিকিরণ) রূপে এই পদার্থই বিদ্যমান হয়, যারমধ্যে সর্বপ্রথম সংযোগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপূর্বে উৎপন্ন বায়ু পদার্থ কণা রূপে নয়, বরং ক্রমাগত প্রবাহের রূপে বিদ্যমান রশ্মির রূপে বিদ্যমান থাকে, অথচ অগ্নি তত্ত্ব কণা বা কোয়ান্টার রূপেও বিদ্যমান থাকে আর তার সংযোগ-বিয়োগ বায়ু রশ্মির সংযোগ-বিয়োগ থেকে ভিন্ন হয়।
৫. ঊষ্মার সর্বপ্রথম উৎপত্তি অগ্নি তত্ত্বের দ্বারা অর্থাৎ এর রূপেই হয়। এর উৎপন্ন হওয়ার পূর্বে সম্পূর্ণ পদার্থ প্রায় ঊষ্মারহিত অবস্থায় থাকে।
৬. তীক্ষ্ণ বিদ্যুৎ আবেশিত তরঙ্গ এই সৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন কস্মিক মেঘ তথা বাঁধক ডার্ক পদার্থ বা ডার্ক এনার্জিকে নষ্ট বা নিয়ন্ত্রিত করে।
৭. বিদ্যুৎ আবেশ অথবা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ কোনো কণার মধ্যে আশ্রিত হয় এবং আকাশকে নিজের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত করে রাখে। এগুলো আকাশের মধ্যে কখনও স্থায়িত্বকে প্রাপ্ত করতে পারে না, বরং এগুলো আকাশের মধ্যে নিরন্তর গমন করতে থাকে।
৮. অগ্নি তত্ত্ব একাক্ষরা বাক্ রশ্মি অর্থাৎ "ওম্" এবং "ভূঃ" আদির দ্বারা সব প্রকারের পার্থিব পরমাণুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর থেকে সংকেত পাওয়া যায় যে বিদ্যুৎ আবেশিত কণার পরস্পর একে-অপরের ক্রিয়া করার সময় তথা বিভিন্ন কোয়ান্টার দ্বারা কোনো কণাকে বিভিন্ন গতি ও ক্রিয়াযুক্ত করার সময় এই "ওম্" এবং "ভূঃ" রশ্মির অনিবার্য অবদান থাকে। এখানে "মা" থেকে পৃথিবী তত্ত্বেরই গ্রহণ করা উচিত। এই বিষয়ে বলা হয়েছে -
"অয়ম্ বৈ (পৃথিবী) লোকো মা অয়ম্ লোকো মিত ইব" (শতপথ ব্রাহ্মণ ৮.৩.৩.৫)।
৯. এই অগ্নি তত্ত্ব অথবা এর অঙ্গভূত প্রাণ রশ্মিগুলো "ওম্" একাক্ষরা বাক্ রশ্মির দ্বারাই অন্য বাক্ অর্থাৎ মরুত্ ও ছন্দ রশ্মিকে নিয়ন্ত্রিত করে বা রাখে। এই কারণে অগ্নি তত্ত্বের নির্মাণ কিংবা কাজগুলোতে এই একাক্ষরা বাক্ রশ্মির অনিবার্য ভূমিকা আছে।
১০. এই তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকাশিত পদার্থের প্রাণ রূপ হয় অর্থাৎ সেগুলোকে প্রকাশিত ও গতিশীল করতে এর ভূমিকা আছে। এই সৃষ্টিতে অগ্নির অভাবে কোনো কণা ও স্থূল পদার্থের না তো নির্মাণ হওয়া সম্ভব আর না সেটা কোনো ক্রিয়া ও গতি করতে সক্ষম হবে।
১১. অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে গায়ত্রী ছন্দ রশ্মির প্রাধান্য আছে।
১২. অগ্নির পরমাণু, আবেশিত কণা বা কোয়ান্টা সাধারণত বিভাজিত হতে পারে না, কিন্তু এর তীব্র ঊর্জা সম্পন্ন হওয়াতে তথা তীব্র ঊর্জা-ক্ষেত্র বা তীক্ষ্ণ বল সম্পন্ন ক্ষেত্র দিয়ে অতিক্রম করলে এর বিভাজন হওয়া সম্ভব।
১৩. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন কণার মার্গ নির্মাণকারী হয় অর্থাৎ কোনো কণার মার্গ সেই কণার ঊর্জার উপর নির্ভর করে।
১৪. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকারের কণার যুগ্মকে উৎপন্ন করে সেগুলোর দ্বারা বিভিন্ন পদার্থের নির্মাণকারী হয়। অগ্নির অভাবে কোথাও সংযোগ-বিয়োগের ক্রিয়া হওয়া সম্ভব নয়।
১৫. অগ্নি তত্ত্ব প্রাণ রশ্মির দ্বারা নির্মিত হওয়াতে প্রাণস্বরূপ হয়। পূর্বেও একে ছন্দ, মরুত্ ও প্রাণ রশ্মির দ্বারা নির্মিত বলা হয়েছে।
১৬. অগ্নি তত্ত্ব বিভিন্ন প্রকাশিত কণাকে রথের সমান বহনকারী হয়।
১৭. অগ্নি তত্ত্বের (বিশেষ করে বিদ্যুৎ আবেশ যুক্ত কণা) মধ্যে "ভূঃ" ছন্দ রশ্মি বিশেষ রূপে বিদ্যমান থাকে।
১৮. সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে যে কর্মই হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অগ্নি তত্ত্বের অনিবার্য ভূমিকা আছে। এই কর্ম বর্তমান ভৌতিক টেকনিক দ্বারা জানার যোগ্য মানা উচিত। বায়ু রশ্মির স্তরের কর্ম অগ্নির দ্বারা হয় না, এই কারণে সেগুলোকে বর্তমান ভৌতিক টেকনিক দ্বারা জানা সম্ভব নয়।
১৯. এই সৃষ্টি অগ্নি এবং সোমের মিথুন দ্বারা নির্মিত হয়। এখানে সোমের অর্থ অপ্রকাশিত ঠাণ্ডা বায়ু তত্ত্ব মানা উচিত। এই সোম তত্ত্বই অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে রেত অর্থাৎ বীর্যকে ধারণকারী হয় অর্থাৎ এই সোম রশ্মিগুলো (প্রাণ, ছন্দ ও মরুত্) অগ্নি তত্ত্বের মধ্যে বল ও তেজের সঞ্চার করে, যারফলে অগ্নি তত্ত্ব আগামী পদার্থকে উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়।
.
এই উপরোক্ত প্রমাণগুলো থেকে সুবিজ্ঞ পাঠকদের নিশ্চয়ই বিদিত হয়ে গেছে যে অগ্নি তত্ত্ব বিদ্যুৎ আবেশ এবং বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গেরই রূপ হয়। বর্তমান ভাষায় বলা যেতে পারে বিভিন্ন বিকিরণ বা ঊর্জা অগ্নি তত্ত্বেরই রূপ হয়। আমি এপর্যন্ত অগ্নির বিষয়ে যা যা প্রস্তুত করেছি, সেগুলোর মধ্যে অনেক বিষয়ে বর্তমান বিজ্ঞান নিতান্ত অনভিজ্ঞ আছে, তো কিছু বিষয়ে তার স্বল্প জ্ঞান আছে।






