ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

26 September, 2026

ঈশ্বরের অবতার কি সম্ভব ?

26 September 0

ঈশ্বরের অবতার কি সম্ভব ?, অবতার, অবতারবাদ বেদ বিরুদ্ধ
পরমাত্মা অনন্ত শক্তিযুক্ত অজন্মা, নিরন্তর, সদা যুক্ত, ন্যায়কারী, নির্মল, সর্বজ্ঞ, সকলের সাক্ষী, নিয়ন্তা, অনাদিস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনি সর্বব্যাপক, শোকরহিত, স্থূলদেহরহিত, পূর্ণ, পবিত্র, সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বাশ্রয়; তিনি বহু বৎসর ব্যাপিয়া সত্য বিষয়সমূহের প্রকাশ করেছেন।' ইত্যাদি বাক্যে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে সর্বব্যাপক ঈশ্বর জন্মগ্রহণ করেন না। 'মরণশীল মানুষ যাতে তাঁকে দেখতে পায়' এজন্য তাঁর একটি মরদেহ ধারণের কোন প্রয়োজন নেই।

স পর্য॑গাচ্ছু॒ক্রম॑কা॒য়ম॑ব্র॒ণম॑স্নাবি॒রꣳ শু॒দ্ধমপা॑পবিদ্‌ধম্।
ক॒বির্ম॑নী॒ষী প॑রি॒ভূঃ স্ব॑য়॒ম্ভূর্যা॑থাতথ্য॒তোऽর্থা॒ন্ ব্যদধাচ্ছাশ্ব॒তীভ্যঃ॒ সমা॑ভ্যঃ॥ যজু০ ৪০।৮॥
হে মনুষ্যগণ ! যে ব্রহ্ম (শুক্রম্) শীঘ্রকারী সর্বশক্তিমান্ (অকায়ম্) স্থূল সূক্ষ্ম ও কারণশরীর রহিত (অব্রণম্) ছিদ্ররহিত এবং ছিদ্র করিবার যোগ্য নহে (অস্নাবিরম্) নাড়ি আদি সহ সম্বন্ধরূপ বন্ধন হইতে রহিত (শুদ্ধম্) অবিদ্যাদি দোষ হইতে রহিত হওয়ায় সর্বদা পবিত্র এবং (অপাপবিদ্ধম্) যিনি পাপযুক্ত, পাপকারী এবং পাপে প্রীতিকারী কখনও হয়না (পরি, অগাৎ) সব দিক দিয়া ব্যাপ্ত, যিনি (কবিঃ) সর্বজ্ঞ (মনীষী) সকল জীবদের মনোবৃত্তিকে জানেন (পরিভূঃ) দুষ্ট পাপীদেরকে তিরস্কারকারী এবং (স্বয়ম্ভুঃ) অনাদি স্বরূপ যাহার সংযোগ হইতে উৎপত্তি, বিয়োগ হইতে বিনাশ, মাতা, পিতা, গর্ভবাস, জন্ম, বৃদ্ধি ও মরণ হয় না সেই পরমাত্মা (শাশ্বতীভ্যঃ) সনাতন অনাদি স্বরূপ নিজ নিজ স্বরূপে উৎপত্তি ও বিনাশরহিত (সমাভ্যঃ) প্রজাদিগের জন্য (য়াথাতথ্যতঃ) যথার্থ ভাবপূর্বক (অর্থাৎ) বেদ দ্বারা সকল পদার্থকে (ব্যদধাৎ) বিশেষ করিয়া নির্মাণ করে । (সঃ) সেই পরমেশ্বর তোমাদের উপাসনা করিবার যোগ্য ॥
'একটি বিশেষ সম্প্রদায় একমাত্র মুক্তি উপস্থাপিত করেন, 'অচিন্ত্যশক্তিত্বাৎ'- অচিন্ত্যশক্তি প্রভাবে তিনি যদি সবই পারেন, তাহলে মনুষ্য দেহ নিতে পারবেন না কেন? ঠিক ঐ যুক্তিতেই আপনারা বুঝতে পারবেন, তিনি 'অচিন্ত্যশক্তি প্রভাবে', মানুষ দেহ গ্রহণ না করেও কেন না, মরণশীল মানুষকে-ভক্তকে দর্শন দিতে পারবেন?
মুমুক্ষু ভক্তজন সমাধিধৌত হৃদয়ে তাঁকে দর্শন করেন। উপনিষদ বলছে- (মু০ ৩।১।৫)
সত্যেন লভ্যস্তপসা হোষ আত্মা সম্যগ্‌ জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্য্যেণ নিত্যম্, অন্তঃশরীরে জ্যোতির্ময়ো হি শুভ্রঃ, পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ।
সত্য, ব্রহ্মচর্য্য এবং তপস্যা প্রভাবে নির্মলহৃদয় যতিগণ অন্তঃশরীরে সেই জ্যোতিস্বরূপ পুণ্যময় পরমাত্মাকে দর্শন করেন। ফুলের মধ্যে যেমন সুগন্ধি, কাঠের মধ্যে যেমন আগুন, দুগ্ধে যেমন ঘৃত থাকে, তেমনি সকলের মধ্যেই সেই সর্বব্যাপক পরমাত্মা বিরাজিত। কাষ্ঠে কাষ্ঠে ঘর্ষণ যেমন অগ্নির প্রকাশ হয়, দুগ্ধকে মন্থন করে জ্বাল দিলে যেমন ঘৃত পাওয়া যায়, তেমনি ধ্যানদণ্ড-মন্থনের দ্বারা যম নিয়ম ধ্যান ধারণা সমাধি গুরুকূপা প্রভৃতিতে যোগী বা ভক্তের হৃদয়ে তিনি প্রকট হন, প্রেমিক ভক্তকে দর্শন দেওয়ার জন্য তাঁকে মানুষ দেহ গ্রহণ করতে হয় না। শৈবালাচ্ছন্ন পুষ্করিণীতে বা ধূলি মলিন আয়নাতে যেমন চন্দ্র বা সূর্যের প্রকাশ দেখা যায় না (দেখা না গেলেও যে তাতে চন্দ্র ও সূর্যের কিরণ বা প্রতিবিম্ব পড়ে না তা নয়, পড়ে, কেবল আবরণের জন্য দেখা যায় না), কিন্তু ঐ শেওলা বা ধূলি আবরণ দূর হলেই যেমন চন্দ্র এবং সূর্যের পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায়, তেমনি ঈশ্বর সকলের হৃদয় আলো করে থাকলেও কোটি কোটি জন্মের কর্মের আবরণ, বাসনার জাল, মানুষের চিত্তরূপ হৃদয় বা দর্পণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সাধন প্রভাবে ঐ আবরণ দূর হলেই মুমুক্ষু প্রেমিক ভক্ত সেই হহৃদয়স্থ পরমাত্মাকে, অমৃতস্বরূপকে পেয়ে জেনে কৃতকৃত্য হতে পারেন এবং হয়েও থাকেন। তার জন্য শ্রীভগবানের অবতারবাদ স্বীকার করে, তাঁর পরিণামশীল দেহ গ্রহণ আর জঠর যন্ত্রণা ভোগ করার কথা না স্বীকার করলে ভক্তদের কিছু ভক্তির হ্রাস বৃদ্ধি হবে না।
অনন্ত জলরাশির কোন কোন অংশ যেমন শৈত্যের সংস্পর্শে জমে বরফ হয়, তেমনি ভক্তি-হিমের সংস্পর্শে, ভক্ত-হৃদয়ে সেই স্বতঃপ্রকাশ, অনন্ত পরমাত্মা ভক্তমনলোভা বাঞ্ছিতরূপ গ্রহণ করে প্রকট হন, ভক্ত হৃদয়ে তাঁর Manifestation হয়। ভক্ত যখন তাঁকে দর্শন করেন, তখন তিনি স্থুল দেহধারী হলেও, ইন্দ্রিয়পরিচ্ছিন্ন দেহের মধ্যে তাঁর মন বা চিত্ত থাকে না, ভূমার ভূমিতে উধাও হয়ে যায়; পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মনচিত্তাদি অন্তরেন্দ্রিয় কোন ইন্দ্রিয় দিয়েই সে ইন্দ্রিয়াতীতকে জানা যায় না। জীবাত্মা, ইন্দ্রিয়ের সীমাগণ্ডী অতিক্রম করে, পঞ্চকোষের আবরণ ভেদ করে তার চিন্ময় সত্তা দিয়েই, সেই পরমাত্ম বস্তুকে অনুভব করে। কাজেই ভক্তকে দর্শন দেওয়ার জন্য সর্বব্যাপক পরমাত্মারও স্কুলদেহ ধারণের, 'মানুষী তনু আশ্রয়ের' কোন প্রয়োজন নেই।
আকাশ ব্যাপক বলে তা যেমন কোথাও যায় না, আসেও না, সর্বত্র সমভাগে বিদ্যমান, তেমনি সর্বব্যাপক পরমাত্মাও কোথাও যান-ও না, আসেন না। 'তিনি সর্বব্যাপক বলে তাঁর গমনাগমন হতে পারে, যিনি নিত্যপূর্ণ, সর্বব্যাপী, তিনি কি গর্ভাশয়ে ব্যাপক ছিলেন না, যে অন্য স্থান থেকে আসলেন। (মহর্ষি দয়ানন্দ) 'তিনি পরিচ্ছন্ন দেহ গ্রহণ করে জন্মগ্রহণ করেন বললে তাঁর ব্যাপকত্ব এবং অসীমত্ব ক্ষুন্ন হয়, যিনি দেহ ধারণ করে আসেন তিনি কখনই সেই সর্বব্যাপক পরমাত্মা হতে পারেন না।" (সোহহং স্বামী)
যাঁদেরকে আপনারা অবতার বলে পূজা করেন বা ভক্তিতে গদগদ হন, তাঁদের মৎস্য কুর্ম বরাহ নৃসিংহ প্রভৃতি মূর্তি একেবারে কাল্পনিক, বাস্তবে তাঁদের কোন দিনই অস্তিত্ব ছিল না, আর রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ প্রভৃতি ঈশ্বরদর্শী মহাপুরুষ হতে পারেন, সাক্ষাৎ পরমাত্মা কেউ কখনই ছিলেন না। যে যার সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার জন্য, বিশ্বাস বা মোহগ্রস্ত মনে বহু অবতার কল্পনা করে, কল্পনার আতিশয্যে যিনি অজ, তাঁকে জন্মগ্রহণ করিয়ে, যিনি নিত্য পূর্ণ তাঁকে খণ্ড করে, যিনি ব্যাপক তাঁকে পরিচ্ছন্ন করে, মনোমত কল্পনার বিচিত্র রং এ চিত্রিত করে বসে আছে। অবিবেকী যারা সেই সব কল্পনাপ্রিয় ভক্তদল সদৃচ্ছা কল্পনা করতে পারেন, তাঁরা তাঁদের। ভগবানকে শিখিপুচ্ছধারী, গোচারণরত, স্ত্রী বিহনে কেঁদে আকুল, শোকাচ্ছন্ন পরকীয়া প্রেমরত, নানারকম। উৎকট বিকট কার্য্যকারী, এমন কি সাপ, শকুন, ব্যাঙ, ভালুক, কচ্ছপ, বরাহ বা নরপশুরূপে কল্পনা করে ফেলতে পারেন, তাঁদেরকে পূর্ণ ভগবান জ্ঞানে প্রতিমূর্তি গড়িয়ে, পুষ্প-চন্দন নৈবেদ্য-ডালি দিয়ে ধূলি ধূসরিত হয়ে গোড়ালুটি দিতে পারেন কিন্তু বিবেকী জনের কাছে তা অগ্রাহ্য। কেননা, সর্বজনমান্য বেদ-উপনিষদের সিদ্ধান্ত হল-
দিব্যো হামূর্তঃ পুরুষা স বাহ্যাভ্যন্তরো হাজর।
অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রোহ্যক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।।
(মুণ্ডকোপনিষদ ২।১।২)
দিব্য, শুদ্ধ, অমূর্ত, সকলের মধ্যে পূর্ণ, অন্তরে বাহিরে নিরন্তর ব্যাপক, প্রকাশ স্বরূপ ইত্যাদি পরমেশ্বরের। বিশেষণ। তিনি 'অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।'
পরমাত্মার এই ধরাধামে অবতীর্ণ হওয়ার দ্বিতীয় কারণরূপে অনেকে বলছেন "লীলা রসাস্বাদনের জন্য"। কৈ কৃষ্ণ তো অর্জুনকে কোথাও বলছেন না যে, 'আমি গোচারণের জন্য, পরের বাড়ীর ক্ষীর সর ছানা ননী চুরি করে খাওয়ার জন্য, পরনারীর বস্ত্র হরণ করে তাদের ঈষৎ অক্ষত যোনি (ভাগবত মতে।) দর্শন করে কৃতার্থ হওয়ার জন্য, কিংবা গভীর নিশীথে কামবর্ধন বাঁশী বাজিয়ে, পরস্ত্রীকে জঙ্গলে এনে তাদের সঙ্গে শৃঙ্গার লীলা করবার জন্য- ইত্যাদি নানারকমের ছল বল কৌশলরূপ লীলা রসাস্বাদনের জন্য কিংবা পরবর্তীকালে আমাগতগণপ্রাণ-ভক্তগণ যাতে সখীবেশ ধারণ করে, কিশোরী ভজন নায়িকা ভজনাদি পরকীয়া প্রেমের মধুর রস আস্বাদন করতে পারে, এই জন্য কেবল তাদেরই মুখ চেয়ে, যে কোন লীলা খেলা যাতে তারা আমার সৎদৃষ্টান্ত! অনুযায়ী সমর্থন করতে পারে, এ জন্য আসি। আমি অবতীর্ণ হই"।। বর্তমানে নানা লীলা রসাস্বাদনকারী ভক্তরাজগণকে চুপিসারে তাঁদের কৃষ্ণচন্দ্র যা বলে গেছেন, তা সেই নর ঋষির অবতার প্রাণপ্রিয় সখা অর্জুনের কাছে বলেন নি কেন। তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার কারণ স্বরূপ 'লীলা রসাস্বাদনের" ঐ সব বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা করতে তিনি কিঞ্চিৎ লজ্জা অনুভব করেছিলেন বুঝি!!

যখন কোন ভক্ত তাঁকে দর্শন করেন, তখন সেই প্রেমিক ভক্তের যৎ যৎ বস্তুতে দৃষ্টি পড়ে, সকলের মধ্যেই দেখেন, তাঁরই চিন্ময় সত্তার প্রকাশ বিকাশ- "সদ্গুরু নূর তামাম্" (কবীর); সর্বভূতে তখন তিনি তাঁকেই দেখেন, প্রতি ঘটনার পশ্চাতে দেখেন তাঁরই মহান্ ঐশী লীলা, সর্বত্রই এক দিব্য সুষমা, দিব্য শৃঙ্খলা, সবই ছন্দোময়, সবই সত্য শিবসুন্দর; প্রতি কর্মই তখন তাঁর পূজা হয়ে ফুটে ওঠে, প্রতি ধূলিকণা অণুপরমাণু পর্যন্ত তাঁর কাছে আনন্দমের অভিব্যক্তি, আনন্দময় আনন্দ-পরিপ্লুত বলে মনে হয়- ফলে, প্রত্যেক বস্তুতে, প্রত্যেক কর্মেই তাঁর হয় সেই সচ্চিদানন্দ ভাগবত সত্ত্বার রসাস্বাদন, ভক্ত ভগবানে এ লীলা নিত্যই চলছে। অণুর মধ্যে সেই মহতো মহীয়ানের দিব্যপ্রকাশ লীলা বা বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর খেলার- অনুভূতি দেওয়ার জন্য পরমাত্মাকে স্কুল মানবদেহে ধারণ বা মৎস্য কুর্ম বরাহরূপ গ্রহণের কোন ও প্রয়োজন হয় না। 'তিনি যেহেতু অচিন্ত্যশক্তিসম্পন্ন - এজন্য তিনি মানুষ হয়ে জন্মান'- এইরূপ বিশ্বাস পোষণ করে, বেদ, উপনিষদ বিরুদ্ধ, অনুভব-বিরুদ্ধ, ধারণার ঘূর্ণিপাকে ঘূর্ণমান বিভ্রান্ত হওয়ার চেয়ে তিনি যেহেতু অচিন্তা শক্তিসম্পন্ন সেইজন্যে তিনি জন্মগ্রহণ না করেও, সব ভক্তকে, সব সময়, সমকালে, সমভাবে ধন্য করতে পারেন। পূর্ণকাম করতে পারেন, এই ধারণা করতে কি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ক্লেদাক্ত হৃদয়ে ব্যথা লাগে। তাঁর অচিন্ত্য শক্তির এই মর্ম গ্রহণ করলে সম্প্রদায় টিকে না বুঝি। 'লোকানুগ্রহার্থ,' নিজ মায়াকল্পিত দেহধারণ করে, জনম মরণশীল জীবের ন্যায় উৎপন্ন, বর্জিত, কর্মানুষ্ঠানরত এবং পরিশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ারূপ লীলা পরমাত্মা করেন না। তবে তাঁতে ওগুলি আরোপ করে, ব্যক্তিবিশেষকে অবতার বলে প্রচার করে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি সাধনের কূট কৌশল ঐ সব ভক্তদেরই লীলাখেলা বলতে পারেন।
অবতারবাদের এবার তৃতীয় কারণটি পর্যালোচনা করা যাক্। গীতানুসারে বলা হয়, সাধুদের পরিত্রাণের জন্য, ধর্মসংস্থাপনের জন্য এবং দুষ্কৃতকারীর বিনাশের জন্য, সর্বব্যাপী, অসীম, অনস্ত যিনি, তিনি জন্মগ্রহণ করতে পারেন না। যিনি 'সর্বশক্তিমান, তিনি কি মানুষরূপে জন্মগ্রহণ না করে কি সাধুকে রক্ষা করতে পারেন। না? তাঁর 'সর্বশক্তিমত্তা' এবং 'অচিন্ত্যশক্তির' কত সংকীর্ণ অর্থ করা হয়েছে দেখুন। ধর্ম লুপ্ত হলে তবে সংস্থাপন অর্থাৎ সম্যকরূপে স্থাপনের প্রশ্ন আসে, কিন্তু সত্যের উপর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত, সত্য এবং পরমাত্মা একই অর্থবোধক। পরমাত্মা সত্যস্বরূপ, ধারণাৎ ধর্মমিত্যাচ্ছ, সেই জগদাধার অনন্ত চৈতন্য সত্তাই অখিল ব্রহ্মাণ্ড, সমগ্র জীবজগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি কি মাঝে মাঝে লুপ্ত হন, না, ধ্বংস হয়ে যান যে ধর্মকে সংস্থাপনের প্রয়োজন হয়? অবশ্য যদি 'সংস্থাপন' বলতে 'সম্প্রদায় স্থাপন' বোঝায়, তাহলে অবশ্য বহু ব্যক্তিগত ভগবানের উৎপন্ন হওয়া এবং অবতরণ সিদ্ধ হয়।।
'বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্' দুর্জন বিনাশের জন্য নাকি নিত্য, পুণ্য, সর্বব্যাপী ভগবানকে জঠর যন্ত্রণা ভোগ কদরতে হয়। একটু গভীরভাবে বিচার করে দেখুন ঐ দেদীপ্যমান সূর্যের চেয়ে অনেক লক্ষ লক্ষ গুণ বৃহত্তর তারকা নক্ষত্র আছে, এই সৌরমণ্ডলের সূর্য যেমন ঐটি, তেমনি বহু সৌরমণ্ডলে বহু সূর্য আছে, তাদের চেয়ে বহু কোটি কোটি গুণ বৃহদাকার তারা আছে; এই অসংখ্য গ্রহ তারকারাজি সূর্যসহ সৌরমণ্ডল তাঁরই সৌরমণ্ডলু তাঁরই অচিন্ত্য শক্তিপ্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর শক্তির অনুপাতে কারণজগৎ (Casual universe) কিছু নয়, কারণ জগতের তুলনায় সূক্ষ্মজগৎ, ক্ষুদ্রতর, সূক্ষ্মজগতের (Subtle universe) তুলনায় ঐ অসংখ্য গ্রহতারামণ্ডল সমন্বিত স্কুলজগৎ (Gross universe) নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর, সমগ্র স্কুলজগতের তুলনায় সূর্য একটি বিন্দু মাত্র, আমাদের পৃথিবী আবার এই সূর্যের তুলনায় একটি বিন্দু (dot) মাত্র। এই পৃথিবীর কোটি কোটি জীবের তুলনায় একটিমাত্র জীবের অস্তিত্ব (তিনি যত বড়ই হোন) নিতান্তই নগন্য। ঐ একটা মানুষকে সর্বশক্তির মূলাধার পরমাত্মার সঙ্গে তুলনা করাই বাতুলতা। এহেন একটা নগন্য জীবকে হিরণ্যাক্ষ হিরণ্যকশিপু রাবণ কংসাদিকে বধ করবার জন্য পূর্ণ পরমেশ্বরের অবতরণ কল্পনা একেবারে প্রলাপপোক্তি।
তিনি সর্বব্যাপক বলে ঐসব দুষ্কৃতকারীর মধ্যেও আছেন ইচ্ছা করলেই তিনি অতি সহজেই তাদের যবনিকাপাত ঘটাতে পারেন। তাছাড়া কালবশে সবাইকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়, কাজেই পরেমশ্বর বিক্ষিৎ অপেক্ষা করলেই, স্বাভাবিক কালবশেই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হত কিংবা কোন উৎকট ব্যাধির বীজাণু বিশেষকে হুকুম করলেই ভগবানের বিনাশায় ১ দুষ্কৃতাম এই মহৎ কার্য অল্পায়াসেই সম্পন্ন হতে পারত, তার জন্য দয়াল হরিকে কচ্ছপ শূকর বা বিভিন্ন মানুষ মূর্তি গ্রহণ করার কষ্ট স্বীকার করতে হত না, সত্যসন্ধ ঋষিদের বেদ উপনিষদ মুখে 'অজ একপাৎ' ইত্যাদি যে সত্য প্রকাশ করেছিলেন, এক এক অবতারে, ভিন্ন ভিন্ন পরস্পর বিরোধী বাক্য বলে স্বমত খগুন বা মণ্ডনও করতে হত না।।।
এই অবতারবাদ দেশের বহু সর্বনাশ করেছে। এই অবতারবাদের জন্যই বিভিন্ন সম্প্রদায়, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে দ্বেষাদ্বেষী, এক সম্প্রদায়ের অবতার অন্য সম্প্রদায়ের মান্য নয়, বহু স্বকপোলকল্পিত গ্রন্থ রচিত হয়ে নানা বিকৃত সত্য পরিবেশন চলে আসছে। চিন্তা করে দেখুন, যত অবতার এসেছেন এই ভারতবর্ষে। কেন। ভারতবর্ষেই কি শুধু সাধু জন্মান এবং তাঁরা দুর্জনদের যারা নির্যাতিত হন। এইজন্য কি বেছে বেছে। কেবল ভারতবর্ষেই কি ভগবানকে বার বার 'পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম' জন্ম নিতে হয়েছে। শুধু ভারতবর্ষেই কি ধর্ম মাঝে মাঝে রসাতলে চলে যায়, এইজন্য 'ধর্ম সংস্থাপনার্থায়' তাঁকে এইখানেই আসতে হয়। আশ্চর্য ঈশাবতারে ভগবান যা বলে গেলেন, মুসাবতারে তার বিরোধী বাক্যে শোনা যায় খ্রীষ্ট ভগবানের ভক্তগণ, মহম্মদ ভগবানের কথা মানতে রাজী নয়। রাম অবতারে তিনি যা বলে যান, কৃষ্ণ অবতারে তাঁর উক্তিতে অন্য রকম দেখা যায়। একই ভগবানের বারবার জন্মগ্রহণের ফলে বুঝি যোগচ্যুতি ঘটে। স্মৃতিভ্রংশ দেখা যায়। বুদ্ধরূপে তিনি যা বলে যান এই ভারতবর্ষে, শঙ্কররূপে জন্মগ্রহণ করে তিনি আবার তা খণ্ডন করেন। চৈতন্যরূপে অবতীর্ণ হয়ে আবার পূর্বজন্মের কথা ভুল বলে, 'মায়াবাদীর মিথ্যা উক্তি' বলে খণ্ডন করে যান। এইরকম এক একটি ব্যক্তিগত অবতারের দল এসে এমনভাবে এক একটা মতবাদের সৃষ্টি করে যান, যাতে তাঁরই পরমবাক্য বেদ উপনিষদও পাত্তা পায় না। ভগবান এক একবার জন্মে এক এক অবতাররূপে স্বীয় ভক্তগণকে যা বলে যান, অন্য অন্য অবতারের ভক্তরা তাতো মানেই না, বরং পরস্পর পরস্পরকে 'নাস্তিক', 'পাষণ্ডী', 'মায়াবাদী', 'অসুর' ইত্যাদি মুখরোচক বাক্যে আপ্যায়িত করে থাকেন।।
ভগবান নাকি মৎস্যরূপে, কুর্মরূপে, বরাহরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; Theory of Evoluton অনুযায়ী তাই বলে কিন্তু মৎস্য কুর্ম বরাহের বংশগুলি উন্নত বা দিব্যরূপ হতে পারে নি কিংবা ভগবান ঐ সব রূপ পরিগ্রহ করেছিলেন বলে ঐ গুলি প্রতীকরূপে কোথাও পূজিতও হয় না। বরং ভক্তরা ভগবানের ঐ মূর্তি-মৎস্য কূর্ম বরাহাদির বংশগুলিকে 'হৃদয়স্থ' না করে উদরস্থ' করতে বাগ্ন। হৃদয় বিহারী ভগবান 'লীলা রসাস্বাদনের' নিমিত্ত যে সব মূর্তি পরিগ্রহ করেছিলেন, ভক্তরাজগণ সেগুলি 'উদারবিহারী' হলে কেমন হয় সেই রসনার তৃপ্তিকর রসাস্বাদন করে চলেছেন।।
অন্যান্য অবতারদের অবশ্য মূর্তি, অর্চ্চা, ধড়া, চূড়া, জুতা, জামা, দাঁত, হাড় সকল কিছুরই পূজা হয়, আবার বলা হয় এগুলি নাকি নিতা। চিন্ময়। অপ্রাকৃত। এক একদল উপাসক আবার Measurement করে কোন্ ভগবান এক আনা, কোনটি দু' আনা, চারি আনা, ছয় আনা, বার আনা, কোনটি পুরাপুরি যোল আনা তাও নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে ফেলেছে।।
প্রত্যেকেই নিজ নিজ উপাস্য অবতারকে নিত্য ভেবে ভগবানের অন্য অবতারবৃন্দকে কোন যুক্তিতে উপেক্ষা বা হেয় করে। যদি সকল অবতারের দেহ 'নিতা', অপ্রাকৃত হয় এবং সকলেই স্ব স্ব ধামে পরিবারসহ নিত্যলীলার রসাস্বাদনে ব্যাপৃত থাকেন, তাহলে জগৎকারণ পরমেশ্বরের বহু নিত্যদেহে অধিষ্ঠান স্বীকার করতে হয়। কিন্তু ভগবানের বহুত্ব স্বীকার্য কি। শুধু ভারতবর্ষের প্রতিই শ্রীভগবানের পক্ষপাতিত্ব আছে তাই এখানের সাধুগুলিকেই পরিত্রাণ এবং দুর্জনের বিনাশের জন্য তাঁকে বারবার অবতীর্ণ হওয়ার শ্রম স্বীকার করতে হয়, তিনি যে কেবল ভারত-উদ্ধারের জন্যই Duty bound এমন কি স্বীকার করা যায়। যদি বলেন যে, না না, তিনি সর্বত্রই জন্মাচ্ছেন এবং শুধু এই ব্রহ্মাণ্ডের নয়, অন্যান্য ব্রহ্মাণ্ডেরও সাধু-পরিত্রাণ, দুর্জন বিনাশরূপ পবিত্র কর্ম তাঁকে করে মরতে হয়, এবং প্রতি জন্মের প্রতিবারের দেহই নিতা হয়, তাহলে বেচারার শ্রীভগবানেরই ত Cycle of birth and death এর গোলকচক্রে ঘুরে মরতে হচ্ছে।। 'সর্বজ্ঞ' পুরাণকাররা এবং 'লীলা রসাস্বাদনকারী' ভক্তরাজ প্রভুপাদরা ছাড়া এই 'অপ্রাকৃত তত্ত্ব' কোন যুক্তিবাদী বিবেকী পুরুষের হৃদয়ঙ্গম হওয়া শক্ত। মৎস্য অবতারের বর্ণনায় পুরাণকার বলছে প্রলয়ঙ্কর প্লাবনে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার সময় মনু যখন তর্পণ করছিলেন, হঠাৎ পরমেশ্বর পুঁটি মৎস্যরূপে তাঁর অঞ্জলি মধ্যে পতিত হলেন। দেখতে দেখতে পুঁটি ভগবানের কলেবর বিংশতি অযুত যোজন ব্যাপী বড় হল আর জলমগ্না কূর্মরূপে মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠে ধারণ করলেন, দেবদৈত্য প্রাণপণে সমুদ্র মন্থন করল, শ্রীভগবানকেও ভক্তানুগ্রহকল্পে মন্থনাঘাতে কিরকম রসের সঞ্চার হয় সেই রসটুকু আস্বাদনের জন্য মন্থনদণ্ডাঘাত সহ্য করতে হল। অহো অবিদ্যাগ্রস্ত ভক্তদের জন্য ভক্তবৎসল প্রভুকে কত না দুঃখ ভোগ করতে হয়। ঐ মন্থনদণ্ড যন্ত্রণা ভোগের পুরস্কারও ভগবান পেলেন - সমুদ্রমন্থনকালে শ্রীদেবী সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়ে মুকুন্দকে বরণ করলেন। তারপর অমৃত নিয়ে দেব দৈতো লাগল বিরোধ। শ্রীভগবান এই মোহিনী মূর্তি দেখে অসুরদের মনে সত্ত্বগুণের উদয় হওয়ার পরিবর্তে তারা কামোন্মত্ত হয়ে উঠল। মুগ্ধ হয়ে তারা অমৃত কুস্তুটি মোহিনীর হাতে দিয়ে বিরোধ মীমাংসা করে দেওয়ার প্রস্তাব করল। দেব ও অসুরদেরকে দুই পৃথক পংক্তিতে বসিয়ে, ঐ মোহিনী ওরফে শ্রীভগবান দৈত্যদেরকে নানা ছলাকলায় ভুলিয়ে, বঞ্চিত করে, দূরস্থ দেবতাদেরকে অমৃত পান করালেন (ভাগবত, ৮ স্বন্ধ) না হলে লীলা। রাহু ছদ্মবেশে অমৃত পান করে ফেলেছিল, চন্দ্র সূর্য তা চিনিয়ে দিতে, সর্বজ্ঞ কামিনী-ভগবান তখন জানতে পেরে, নিজমূর্তি ধারণ করে চক্র দ্বারা রাহুর মাথা কেটে ফেললেন। কিন্তু সে অমৃত পান করেছিল, তাই মরল না এবং সেই আক্রোশে আজও রাহু চন্দ্র সূর্যকে গ্রাস করে থাকে (ভাগবত, ৮ স্বন্ধ)। এখানে ভূগোল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সবজান্তা পুরাণকারের কিঞ্চিৎ বিরোধ দেখা যাচ্ছে। তা হলই বা এখানে 'নিখিলশাস্ত্র রাজচক্রবর্তী (বৈষ্ণবমতে) ভাগবতের কাছে বিজ্ঞানের পরাজয় অবশান্তাবী। তারপরে ব্রহ্মার নাসারন্ধ্র থেকে অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ বরাহ শিশু ওরফে বরাহ ভগবানের উৎপত্তি। 'ইত্যাভিধ্যায়তো নাসা বিবরাৎ সহসা অনয়। বরাহতোকো নিরগাদঙ্গুষ্ঠ পরিমাণকঃ।।। হিরণ্যাক্ষ বধ, পৃথিবীর গর্ভে নরক নামক অসুর-উৎপাদন আর জলমগ্না পৃথিবীর উদ্ধার সাধন-এই তিনটি মহৎ কার্যের অনুষ্ঠানেই বরাহ-ভগবানের লীলা পর্য্যবসান। হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে মাদুরের ন্যায় জড়িয়ে শুয়েছিল। বরাহ ভগবান 'ঘ্রাণেন পৃথ্বাঃ পদবীং বিজিয়ন' পশুর ন্যায় ঘ্রাণ নিতে নিতে খোঁহ্ যৌত করতে করতে (11) দৌড়ে এসে তার মস্তকের নিম্নদিক দিয়ে পৃথিবীকে দন্তে তুলে ধরলেন। বিয়ম যুদ্ধ, অন্তে হিরণ্যাক্ষ বধ। হিরণ্যাক্ষ বধ ভগবানের পক্ষে সহজ সাধ্য। পৃথিবী শব্দ স্ত্রীলিঙ্গ, কাজেই তার গর্ভে পুরোৎপাদনও সম্পূর্ণ ব্যাকরণ সঙ্গত।" (সোহহং স্বামীর শ্লেষ) ।। শ্রীভগবানের ঐ লীলাদর্শন করে, স্মরণ করে এবং পাঠ করে, 'অপ্রাকৃত ভক্তজনের অবিরলধারে অশ্রুবর্ষণ ও লীলাস্ফুরণ অসম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের মত যে সব প্রাকৃতজন 'অপ্রাকৃত ভক্ত হয়ে বিবেক বস্তুটি শ্যামকুণ্ডু বা যমুনার জলে বিসর্জন দিয়ে বসে নি, তাদের মনে স্বতঃই প্রশ্ন জাগে- পৃথিবীকে যদি মাদুরের মতই জড়িয়ে হিরণ্যাক্ষ শুয়েছিল, তাহলে সে কিসের উপর দাঁড়িয়ে বরাহ-ভগবানকে ভীষন গদাপ্রহারে -'লীলা রসাস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। ভগবানের কথা বাদ দিলাম, কেন না 'লীলা রসাস্বাদনকারী। 'অপ্রাকৃত ভক্তগণ তাঁর জন্য বুক পেতে দিতে পারেন। কিন্তু ভক্তবৃন্দের আশ্রয় ভূমি কি ছিল?
তারপর দয়াময় ভগবান বিবট নরসিংহ মূর্তি ধারণ করে হিরণ্যকশিপুর নাড়িভুড়ি ছিন্ন করলেন। কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্রহ্মা যে এভাবে মাঝে মাঝে অসুরগুলোকে বর দিয়ে তাঁকে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেন, এজন্য মৃদু তিরস্কার করলেন। যে প্রহ্লাদের উর্দ্ধতন একুশ পুরুষ ছিলই না, লীলাবৈকলো, ভক্ত প্রেমে বিগলিত অর্জনর-অর্থগণ্ড শ্রীভগবান তাঁর উর্দ্ধতন একুশ পুরুষেরই উদ্ধারের ব্যবস্থা করে ফেললেন। পুরাণকারদেরই মতে 'সত্যযুগে পূর্ণং পূর্নং পাপং নাস্তি তবুও সত্যযুগে ভগবানকে ভাগবতকার চার চারবার জন্মগ্রহণ করিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সত্যযুগে পাপই যদি ছিল না, তাহলে পৃথিবীকে দু' দু'বার জলমগ্ন করে পাপ প্রক্ষালনের রহস্যাটা যে কি তা কেবল ভাগবতকার এবং 'অপ্রাকৃত লীলাবিগ্রহের অপ্রাকৃত ভক্তজনেরই' সহজবোধ্য।। ত্রেতাযুগে ভগবান বামনরূপে কশ্যপ গৃহে জন্ম নিলেন। এই অবতারে সত্যস্বরূপ শ্রীভগবান, 'সবা সত্যনিষ্ঠ বিশ্ববিজয়ী বদান্যবর বলীকে যাচক বেশে ছলনা করেছিলেন। এবং তার সাম্রাজ্য কাপুরুষ গুরুপত্নীগামী পাষণ্ড ইন্দ্রকে প্রদান পূর্বক পৌরাণিক ভগবানোচিত সদৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছিলেন।' (সোহহং স্বামী)। বান করে বলি হলেন পাতালস্থ। ওখানে যদি তিনি পাষণ্ড ইন্দ্রকে দলন করে বলীকে পুরস্কৃত করতেন তাহলে বরং দুস্কৃতের বিনাশ এবং সাধুর পরিত্রাণ যথার্থ ভাবে হত। ব্রহ্মা যখন বললেন- 'হে ভূতেশ। এই হাত সর্বস্ব বলীকে মোচন করুন। এ নিগ্রহ যোগা নয়। সত্যরক্ষার জন্য অকাতরে সর্বসম্পদসহ নিজেকেও আপনার চরণে বিলিয়ে দিয়েছে।' তদুত্তরে ভাগবতকারের ভগবান বললেন। ব্রহ্মণ। যমনুগৃহামি তদ্বিশো বিধুনোম্যহম্। যম্মদঃ পুরুষং স্তক্কো লোকং মাঞ্চাবমনাতে।। (ভাগবত, ৮, ২২, ২৪) -'হে ব্রাহ্মণ। আমি যাকে অনুগ্রহ করি, তাকে সকল সম্পদ হতে বঞ্চিত করি। কারণ, পুরুষ সম্পদে মত্ত ও অবিনীত হয়ে সমস্ত লোককে, এমন কি, আমাকেও অবজ্ঞা করে।' ভগবানের এই প্রাণতোষিণী অমৃত বাক্য শ্রবণ করে ভক্তদের প্রাণ ঠাণ্ডা হতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতজনদের মনে স্বতাই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি তিনি বলীকে সর্বহারা পাতালবাসী করে অনুগ্রহ করে অনুগ্রহ (!) করলেন আর ইন্দ্রকে করলেন নিগ্রহ (!) স্বর্গদান করে। পূর্ব অবতারে যে ইনি মোহিনী মূর্তি ধারণ করে দৈতাদেরকে বঞ্চিত করে দেবতাদেরকে অমৃতদান 'নিগ্রহের' নামান্তর। কী অপূর্ব লীলা। প্রভু কি তাহলে বলীর সর্বসম্পদ হরণ করলেন, পাছে বলী মত্ত হয়ে অবিনীত হয়, তাঁকে অবজ্ঞা করে। কিন্তু বলীর চরিত্রে ত, অন্ততঃ সেদিনকার ব্যবহারে কোন দম্ভবা দুবিনীত ভাব দেখা যায় নি। ভগবানকে অবজ্ঞা করা ত দূরের কথা, বামনদের বলীর যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হওয়া মাত্রেই, তিনি তাঁর পাদদ্বয় ধৌত করে, পাদোদক মস্তকে ধারণ করে, ভক্তিবিনম্র চিত্তে আবাহন জানিয়ে বলেছিলেন অদ্য নঃ পিতরস্বপ্তা অদা নঃ পাবিতং কুলম্।
অদ্য দ্বিষ্টঃ ত্রাতুরয়ং যদ-ভবানাগতো গৃহান্।। (ভাগবত, ৮, ১৮, ৩০, ৩২) অদ্য আমার পিতৃগণ তৃপ্ত হলেন, কুল পবিত্র হল, এই যজ্ঞ সার্থক হল, যেহেতু আপনি আমার গৃহে আগমন করেছেন। বলির এই কথাগুলির কি সম্পদ মত্ততা বা দম্ভের লক্ষণ? বামনাবতার বিনিময়ে বর দিলেন- "এখন সুতলে বাস কর, সাবর্ণি মন্বস্তরে তুমি ইন্দ্র হবে।' দয়াময় হরি কী অপূর্ব স্বেচ্ছায় দান করে দিচ্ছেন, ভাগবতকারের ভগবান তাঁকে সাবর্ণি মন্বন্তরে সেই ইন্দ্র হওয়ার বর দিয়ে চরিতার্থ করেছেন। পুরাণকারদের এই অবতারতত্ত্ব শুনে ভক্তের রোমাঞ্চ হতে পারে, প্রেমাশ্রুও ঝরতে পারে কিন্তু যার বিবেক আছে, তিনি নিশ্চয়ই রক্তে উষ্ণতা অনুভব করবেন।
পরশুরামরূপে ভগবানকে এবার অবর্তীর্ণ করালেন পুরাণকার। এই অবতারে প্রভু মাতৃহত্যা এভং ক্ষত্রিয়দের আবালবৃদ্ধবনিতাকে একুশবার নাকি কুঠারে করে কেটে কুচি কুচি করেছিলেন। এই অবতারে তিনি বীভৎস উগ্র ও ভয়ানক রসের লীলা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এও বাহা ইনি বেঁচে থাকতে থাকতেই শ্রীভগবান অর্ধাংশে রাম, সিকি অংশে ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন দু' দু'আনা অংশে জন্মালেন। কী ভীষণ প্রহেলিকা। পরশুরামরূপে ভগবান জন্মগ্রহণ করে কুঠার হস্তে মার মার কাট কাট লীলা যখন করে চলেছেন, তখনই আবার তিনি চারি অংশে জন্ম নিলেন। রাম বনাম পরশুরাম, দুই ভগবানে যে একবার শক্তি পরীক্ষাও হয়েছিল, রসিক ভক্তজন তারও রসাল কর্ণনা দিয়েছে। বাল্মীকির রামচন্দ্র আদর্শ মানব, সম্প্রদায়ীরা তাঁকেই 'অবতার' 'পূর্ণ ভগবান' বলে খাড়া করেছে। তাঁর দেহান্তকালে নাকি গরু, গাধা, শৃগাল, শকুন, তির্ষকযোনি সবাইকে ব্রহ্মা শতকোটি দিব্য বিমান এনে স্থাবর জঙ্গম প্রাণী সহ বৈকুণ্ঠে নিয়ে গেলেন। অথচ এই সর্বজ্ঞ প্রভুর পত্নী বিরহে বিলাপ, পথে ঘাটে প্রান্তরে 'হা সীতা, হা সীতা' বলে ক্রন্দনের সুন্দর আলেখ্য, উপাসনারত শম্বুক বধ (শূদ্র বলে।) এবং কিঞ্চিৎ ছলনা করে বালী বধ ইত্যাদিরও বর্ণনা আছে। ঘরে ঘরে তাই চলেছে রামের মূর্তিপূজা, সলাঙ্গুল হনুমানও মন্দিরে মন্দিরে পূজিত। বাল্মীকি যে সত্যসন্ধ, মহারত, পিতৃভক্ত, প্রজাবৎসল, মানবপ্রেমিক রামের বর্ণনা দিয়েছেন সেই মহত্তম আদর্শ সম্প্রদায়ী ভক্তরা গ্রহণ করে নি।
তারপর ভগবানকে জন্মাতে দেখি হলধর বলরাম ও কৃষ্ণরূপে। বলরামরূপে প্রভু সদা কাদম্বরী সুরাপানে মত্ত থাকতেন। নিরীহ বৃদ্ধ সুতহত্যা, কৃষ্ণের গোপিনীদের সঙ্গে সরস লীলা, যমুনা জল ক্রীড়া করতে রাজী না হওয়ায় হলদ্বারা জোর করে আকর্ষণ করায় পৌরাণিক ভগবান সুলভ বিক্রম প্রকাশাদি ছাড়া আর কোন লীলাবিস্তার করেছিলেন কি না পুরাণকার সে বর্ণনা দেয়নি। অবতারতত্ত্ব প্রতিষ্ঠাকারী পুরাণকারদের মতে 'চাংশ কাল পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং'। কৃষ্ণরূপে পরমাত্মা বস্ত্রহরণ, রাসলীলাদি সাব্বী পরিত্রাণমূলক অনেক গোপন লীলারসের অনুষ্ঠান করে তাঁর ভক্তদের সামনে 'পূর্ণ ভগবত্তা' প্রামণ করে গেছেন। ঐ সব অশ্লীল লীলা রসাস্বাদনে অপ্রাকৃত রসিক ভক্তদের তৃষিত প্রাণ এমনই পরিতৃপ্ত যে, তারা এঁর, নিত্যবৃন্দাবনে 'বেদবিধিব অগোচর রতনবেদিকোপরি' শ্রীমতির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমাপ্লুত অবস্থার ধ্যানে রসাবিষ্ট। 'যৎখদাচরতে শ্রেষ্ঠ-শ্রেষ্ঠ জন যা আচরণ করে যান, ইতর জন তাই অনুসরণ করে" এই কৃষ্ণ বাক্যানুযায়ী, সেজন্য কৃষ্ণভক্তগণ্য গোপন রাসলীলা এবং পরকীয়া প্রেমের অনুসরণ ও অনুকরণ করে কত যে প্রাকৃতজনের ভববন্ধন মোচন করে চলেছেন- তার ইয়ত্তা নেই। (মনে রাখবেন, এসব ভাগবতকারেরই সৃষ্টি মহাভারতের বেদব্যাস এ সব লিখেন নি (!)
ভাগবতকার বুদ্ধকেও অবতার বলে বর্ণনা করে বলেছে তিনি 'নাস্তিকাবতার'। ভগবান বুদ্ধাবতার হয়ে পাষণ্ডবেশে অসুরদিগকে নানা উপধর্মের উপদেশ দেন'। (ভাগ, ২য় স্কন্ধ, ৭ অধ্যায়)। তাহলে, করুণাঘন বুদ্ধদেব যাঁদেরকে উপদেশ দিয়ে গেলেন, তাঁরা অসুর। পাষণ্ড। পৃথিবীর চারিদিকে যত বৌদ্ধ জৈন তাঁরা। সবাই পাষণ্ড, অসুর আর একমাত্র যারা গোপীজনবল্লভের সেবায় সখী অনুগত ভজন করছেন সেই সব কৃষ্ণভক্তরাই বুঝি একমাত্র প্রকৃত ভক্ত। একই ভগবান এক একবার জন্মে বুঝি খামখেয়ালি করে যান? এই অবতারবাদের মূলে যে জঘন্য সাম্প্রদায়িকতা, স্বার্থবোধ এবং কুৎসিত বিদ্বেষভাব আছে তা সহজেই অনুমেয়।
এইবার দশম অবতার কল্কির আসার কথা। পুরাণকারদের মতে, এইবার ভগবান কল্কিরূপে জন্মে 'অশ্বমাণ্ডগমারুহ্য অসিহাসাধুদমনম্' অর্থাৎ দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে অসি হস্তে দুষ্কৃতগণকে দমন করে লীলা দেখাবেন। তিনি যে বিষ্ণুযশা ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মাবেন এ সমস্তও তিনি বোধ হয় কোন অপ্রাকৃত Telephone যোগে (১) জানিয়ে দিয়েছেন। তবে, ভক্তদের মনোভিলাস এবং অসার ভবিষ্যদ্বাণী পুরণের জন্য। কেন যে এখনও তিনি জন্মাচ্ছেন না, সেইটে ভাবনার বিষয়। মনে হয়, অজ্ঞ পুরাণকারদের অস্ত্রজ্ঞানের দৌড় ত অসি পর্যন্ত, কাজেই তারা ত অসি হস্তে অবর্তীর্ণ হওয়ার ভবিষ্যদ্‌বাণী করে চলে গেছে, ইতিমধ্যে যে প্রাকৃত জন অ্যাটম ও হাইড্রোজেন বোমাদি ভীষণ মারাত্মক আগ্নেয় অস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সামান্য অসি হস্তে এই সমস্ত সাধুদের (1) সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব হবে কিনা, হয়ত সেই চিন্তাতে তিনি ভাবিত আছেন। তাছাড়া, সময়ও ত এখনও আছে, পুরাণকারের মতে কলির পরিমাণ ৪২০০০০ বছরের মধ্যে ৫০০০ বছর গত হয়েছে মাত্র। কিন্তু তাঁর ঐ দীর্ঘসূত্রতা এবং ভীতির জন্য ত আর সাধুর পরিত্রাণ, দুষ্কৃত বিনাশ কিংবা ধর্ম সংস্থাপনাদি কার্য বন্ধ থাকতে পারে না। কাজেই তাঁকে এখন নারদ ব্রহ্মাদি অমাত্যসহ শলা-পরামর্শ করার সময় দিয়ে, তাঁর ভক্তরাই ইত্যবসরে বহু অবতার সৃষ্টি করে ফেলেছে। এক এক সম্প্রদায় তাদের উপাস্য বা প্রতিষ্ঠাতাকেই স্বয়ং ভগবান অবতার দাঁড় করিয়েছে।
জৈমিনী পূর্ব-মীমাংসাতে বলেছেন যে, যাতে অনুশাসন, উপদেশ, আদেশ এবং নিষেধ থাকে তাই শাস্ত্র নামের যোগ্য। কেবলমাত্র প্রতিষ্ঠিত এবং পরিনিষ্ঠিত তত্ত্বের কথা থাকলে তাকে শাস্ত্র বলা যায় না। জৈমিনী এই দৃষ্টিতেই বেদের জ্ঞানকাণ্ড খণ্ডন করেছেন যে, বেদের জানকাণ্ডে পরিনিষ্ঠিত বিশুদ্ধ সত্যের প্রকাশ। থাকলেও তাতে উপদেশ রয়েছে। অতএব তা শাস্ত্রের মর্যাদা পাবার যোগা। গীতার উপরোক্ত শ্লোকে পরোক্ষ উপদেশ এবং প্রেরণা রয়েছে এই দৃষ্টিতেই তা মনন করা উচিত।
বেদ বলেছেন- একোহহং বহুস্যাম বহু সৃষ্টিং প্রজায়েয়। ইন্দ্রঃ মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে। অবতারবাদীরা অবতারবাদ সমর্থনের জন্য বহুস্থলেই এই মন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু এখানে ইন্দ্রের অর্থ কি? ইন্দ্র ব্রহ্মবাচক। তিনি তদ্রষ্টাতদেবানুপ্রাবিশৎ এক তিনিই আছেন, আর কিছু নাই। তা হলে অবতার কোথা হতে আসবেন। এই সৃষ্টি, আপনি, আমি সব মিথ্যা যেন একটা স্বপ্ন। সৃষ্টি নাই, জগৎ নাই। যথাপূর্বমকল্পয়ৎ। তিনি কল্পনা করেছিলেন। সবই কল্পনা ব্রহ্ম ও মায়ার মধ্যে তৃতীয় নাই ঈশ্বরই বা কোথায়। তার আবার অবতার। দৃষ্টান্তমাত্রেই সামগ্রিকভাবে ত্রুটিহীন নয় যেমন রজ্জুতে সর্পভ্রম। বেদান্তের এই উপমাটি কেবল অধ্যাস বুঝাবার জন্য। এখানে রজ্জু ব্রহ্মা আর আমরা অর্থাৎ সমগ্র জীবজগৎ অধ্যস্ত বস্তু নিচয় হল সর্প। এই ভ্রম। কার হবে। যার হবে, তার মনে তো সর্পের সংস্কার থাকা প্রয়োজন। কারণ, যে অনুভব করবে সেও তো অধ্যাস্ত। বস্তুর অন্তর্গত। ব্রহ্মের জ্ঞান কি পূর্ব হতে থাকা সম্ভব। মনে যে সংস্কার নাই, তৎ বিষয়ক ভ্রম বা স্বগ্ন কদাপি হতে পারে না। গণ্ডার দেখেছি, সিংহও দেখেছি। এখন স্বপ্নের মধ্যে মন সিংহের মস্তকে খড়গ দিয়ে একটা বিস্তৃতকিমাকার জীব দেখাতে পারে। এমন কি এলাহাবাদের ময়দানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলও দেখাতে পারে। কিন্তু উভয়স্থানই পূর্বে দেখা চাই- অন্ততঃ উভয়স্থান সম্বন্ধে পুস্তক বা লোক মারফৎ কিঞ্চিৎ তপ্রবণ করা চাই, তবেই স্বপ্নে দর্শন সম্ভব। যেমন ধরুন, কাশীর কোন গৃহে নিদ্রিত এক ব্রাহ্মণ দেখেছেন। Brain Centre & মন একটি সূক্ষ্ম অণু বস্তু সে স্বপ্নের জাল বুনেছে। স্বপ্নে ব্রাহ্মণ দেখেছে সে হরিদ্বারের বুদ্ধমেলায় গেছে, অনেক সাধুসন্ত দর্শন করতে করতে এক মহাত্মার নিকট গিয়ে বসল। ব্রাহ্মাণ তাকে বলল সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দিন'। মহাত্মা বললেন 'আচ্ছা দেখি, চঈশ্বর কে? জগৎ কে। আমাকে ঈশ্বর তিনি ধ্যানস্থ হলেন।
একটু বিচার করলেই বোঝা যাবে যে, ঐ মহাত্মা যতই ধ্যান করুন, তাঁহার পক্ষে ঈশ্বর এবং জগৎ সম্বন্ধে সমগ্র কোন ধারণা করা সম্ভব হবে না। কারণ সমস্ত ঘটনাটাই absurd, মনে রাখতে হবে ঘটনাটি ব্রাহ্মণ তাঁর কাশীস্থ স্বগৃহে শয়নপূর্বক নিদ্রিত অবস্থায় দর্শন করেছেন বাস্তবে ব্রাহ্মাণই আছেন আর কেহ সেই গৃহে নাই, তাঁর স্বপ্নদৃষ্ট হরিদ্বার, কুজমেলা, সাধু সন্ত, মহাত্মা, মহাত্মার কথোপকথন এবং ধ্যান- সবই মিথ্যা। তাৎপর্য এই যে, একমাত্র ব্রহ্মাই আছেন, আর কেহ নাই। অজ্ঞাত ও বিকারের ঘোরেই অজ্ঞরা অবতার দেখছে।
Read More

সমাধি

26 September 0

সমাধি সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের মনে নানারকম কৌতুকপ্রদ ধারণা বর্তমান। প্রায় কমবেশি সকলেরই ধারণা, সমাধিকালে হাত-পা শিথিল হবে, ঠাণ্ডা হবে, চোখ বন্ধ থাকবে নতুবা উর্ধ্বনেত্রে স্থানুবৎ থাকবে। কেউ কোন ভক্তিমূলক গান বা কীর্তন শুনতে শুনতে যদি উপরের দিকে হাত তুলে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে বা চোখ বন্ধ করে ঢলে পড়ে, ভক্তেরা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বলে উঠে- 'বাবার সমাধি হয়েছে।' সমাধি সম্বন্ধে মানুষের মনে এই রকম বহু বিচিত্র ধারণা থকার ফলে ভণ্ডদের acting and posing এর সুবিধা হয়। তাই দুর্লভতম নির্বিকল্প সমাধির দাবীদার বাজারে অনেক।

বলা বাহুল্য, প্রকৃত সমাধির লক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমাধি সম্ + অ ধা কি, সমাধীয়তে অস্মিন্ মনো জনৈরিতি কিঃ অর্থাৎ মন চিত্ত বা অন্তঃকরণকে এক ধোয় বস্তুতে আধান বা স্থাপন করার নামই সমাধি। যোগাচার্য ভগবান পতঞ্জলি সমাধির লক্ষণ নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন- তদেবার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূণ্যমিব সমাধিঃ (৩/৩) ধ্যান যখন অর্থ নির্ভাস হয় অর্থাৎ ধ্যান যখন এমন প্রগাঢ় হয় যে ধোয় বিষয়মাত্রের সত্তাই কেবল উপলব্ধি হতে থাকে এবং নিজের প্রত্যয়াত্মক স্বভাবও শূণ্যবৎ হয় অর্থাৎ 'আমি ধ্যান করছি' এ বোধও যখন থাকে না, তখন সেই ধ্যানকে সমাধি বলা হয়। এখানে প্রত্যয় শব্দের অর্থ অনুভূতির একাগ্রতা 'মনসোহামনীভাবঃ'।
যাজ্ঞবন্ধ্যের মতে-
সমাধিঃ সমতাবস্থা জীবান্মা-পরমাত্মনোঃ।
ব্রহ্মণ্যের স্থিতিবা সা সমাধি প্রত্যাগাত্মনঃ।।
(যোগী যাজ্ঞবল্ক্যম্ 30/2 )
অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মার সমতাবস্থা এবং অভেদজ্ঞানই সমাধি। এটি যুগপৎ ব্রহ্মানন্দ রসাবেশ ও জ্ঞানসিদ্ধির অবস্থা সন্দেহ নাই।
এই মহত্তম অনুপম অবস্থা কোনক্রমেই মনের মৃচ্ছাগ্রস্ত অবস্থা বা তন্ময়ত্ব নয়। অথচ অনেক সাধক ও প্রেমিক ভক্ত তন্ময়ত্বকেই সমাধি মনে করে বিভ্রান্ত হন। অনেকেই দেখেছে দ্বৈতসাধক তাঁর আরাধ্যের ধ্যান করতে করতে তীব্র ভাবনা ও দৃঢ় ইচ্ছাবলে বাহাজগৎ ভুলে গিয়ে আরাধ্য বস্তুতে ডুবে যান। আবার, কোন সাধনা ছাড়াই বালক যুবা বৃদ্ধা প্রায় প্রত্যেকেই নিজের কাজ বা কাম্য বস্তুর চিন্তাতে, এবং প্রেমিক প্রেমিকা আপন আপন প্রেমাস্পদের চিন্তায় স্থানকালপাত্র ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণ বিভোর ও মগ্ন হয়ে যান, এমন ঘটনাও আমরা অহরহ প্রত্যক্ষ করি। আমার এক সহপাঠীকে দেখেছি, সে লেখাপড়ার সময় এমনই তন্ময় হয়ে পড়ত যে তার জানালার পাশ দিয়ে বাদ্যভাণ্ড সহ কোন মিছিল গেলেও তার তন্ময়তার কোন ছেদ পড়ত না। গ্যালিলিও যখন তাঁর বিখ্যাত ক্ষেত্রতত্ত্ব নিয়ে অঙ্ক কষায় মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর চারদিকে যে উদ্যত তরবারি হস্তে গ্রীক সৈন্যগণ তাঁকে হত্যা করতে উপস্থিত, সে দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল না। শুনেছি, দার্শনিকশ্রেষ্ঠ আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল, ছাদের উপর বসে নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখতে দেখতে এতই তন্ময় হয়ে পড়তেন কখন যে রাত্রি প্রভাত হয়ে যেত, তা তিনি জানতে পারতেন না। এই যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে বস্তুভেদে বিভিন্ন শ্রেণীর তন্ময়ত্ব - একে কোনমতেই সমাধি বলে ভুল করা উচিত নয়। কারণ ঐ ধরনের তন্ময়তা সম্পূর্ণভাবে মনেরই ক্রিয়া, মন বস্তুবিশেষে বিশেষভাবে লিপ্ত হয় মাত্র। এই অবস্থায় ধ্যান ধ্যেয় ধ্যাতা তিনই বিদ্যমান থাকে। অথচ প্রকৃত সমাধিতে দ্রষ্টা দৃশ্য দর্শন, ধ্যেয় ধ্যাতা ধ্যান, জ্ঞেয় জ্ঞাতা জ্ঞান- এই ত্রিপুটির লয় হয়।
প্রতিদিন নিদ্রান্তে যে কেউ লক্ষ্য করলে দেখতে পাবে, সুযুপ্তি ভঙ্গে জাগ্রৎ অবস্থায় জগৎ জ্ঞান উপস্থিত হওয়ার পূর্বক্ষণে ক্ষণকালের জন্য একটা শূণ্যময় অবস্থা ভাসে। এর নাম নির্বিকল্প স্থিতি। অনেক যোগী ঐ স্থিতিকে লক্ষ্য করে সমাধিস্থ হওয়ার চেষ্টা করেন অর্থাৎ ভাবেন যে ঐ স্থিতি দীর্ঘতর ও স্থায়ী করতে পারলেই বুঝিবা সমাধির অবস্থা আসবে। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রমাত্মক। মানুষের জীবনে কত রকম ভাবে যে নির্বিকল্প স্থিতি দেখা দেয় সে'সম্বন্ধে শাক্ত্যাগমের বিখ্যাত গ্রন্থ 'ত্রিপুরারহস্যের' জ্ঞানকাণ্ডে বিশদ আলোচনা আছে। সমাধির স্বরূপটি ভালভাবে জানার জন্য তৎসদৃশ যতগুলি অবস্থা আসে (যথা-মনের মুচ্ছা, তন্ময়তা, নির্বিকল্পতা, মুগ্ধাবস্থা, জড়াবস্থা ইত্যাদি) সাধকের মনে সমাধি সম্বন্ধে ভ্রম উৎপাদন করে অর্থাৎ যেগুলিকে সাধারণ ভক্ত ও সাধকের দল ভুলক্রমে সমাধি বলে মনে করেন সেগুলি সম্বন্ধে সর্বাগ্রে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যেই আমি একটু আগে তন্ময়তা সম্বন্ধে কিছু বলেছি, এখানে নির্বিকল্প স্থিতি প্রসঙ্গে 'ত্রিপুরারহস্য' হতে কিছু উদ্ধৃত দিচ্ছি
যচ্চিরাদ্ধাবাঞ্ছিতং কিঞ্চিদলভ্যত্বেন নিশ্চিতম্। অকস্মাৎ তস্য সম্প্রাপ্তিয়দা ভবতি বৈ মুনে। ৬
তদান বেদ বাহ্যং বাপ্যান্তরং বা ক্ষণং নরা। তিষ্ঠেন্ননিদ্রয়াক্রান্তঃ স সমাধিরুদীরিতা। ৭
- লৌকিক ব্যবহারিক জীবনে চিরবাঞ্ছিত কোন বস্তু যখন অলভ্য বলে সুনিশ্চিত ধারণা জন্মে, তখন যদি অকস্মাৎ দৈববশে সে বস্তু প্রাপ্ত হওয়া যায়, তখন প্রাপক জীব ক্ষণকালের জন্য বাহ্য বা আন্তর সর্বপ্রকার অনুভূতিরহিত স্থিতি প্রাপ্ত হয় অথচ নিদ্রিতও থাকে না এই স্থিতিই নির্বিকল্প স্থিতি। তখন ক্ষণকালের জন্য জীব স্বস্বরূপে স্থিতই থাকে কিন্তু সেই স্বরূপস্থিতি সম্বন্ধে উদ্বুদ্ধ হয় না। মুহূর্তকাল পরেই বিষয়প্রাপ্তি জনিত আনন্দানুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে।
অতিপ্রিয়ং স্বপুত্রাদি বিভুং চ গৃহকর্মণি। অরোগিনং যদকস্মাৎ সংশূণোতি মৃতং কিলা। ১০
তদান বেদ বাহাং বাপ্যান্তরং বা ক্ষণং নরা। তিষ্ঠেন্ননিদ্রয়াক্রান্তঃ স সমাধিরুদীরিতঃ।। ১১
- ব্যবহারিক জীবনে উপার্জনরত ও পরিবারের সর্বময় কর্তা স্বাস্থ্যবান অরোগী একমাত্র গুণবান পুত্রের অকস্মাৎ মৃত্য সংবাদ প্রাপ্তিতেও জীবের ক্ষণকালের জন্য বাহ্য ও আন্তর সর্বপ্রকার অনুভূতিরহিত এক নির্বিকল্প স্থিতি উপস্থিত হয় অথচ নিদ্রাভিভূত থাকে না, কিছুক্ষণ পরেই অসাড় দেহমনে পুত্রবিয়োগ ব্যথার অনুভূতি জাগে, সে শোকাভিভূত হয়।
নির্বিকল্প স্থিতির এই রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। নবপরিণীতা স্ত্রীর সঙ্গে সম্পরিঙ্গক্ত অবস্থায় অথবা সহসা ব্যাঘ্রাদি দর্শনেও মনে অনুরূপ স্থিতি দেখা দেয়। কোন অতি দূরবর্তী বস্তুকে দৃষ্টিগোচর করার জন্য মন যখন একাগ্র হয় তখন মন জলৌকার মত দীর্ঘ হয়ে যায় (অর্থাৎ জলৈাকা যেমন এক তৃণ হতে অপর তৃণে যাবার জন্য দীর্ঘতা প্রাপ্ত হয় মন তখন তেমনি ভাবে দীর্ঘতা প্রাপ্ত হয়) এবং যে পর্যন্ত না সেই বস্তু প্রত্যক্ষ হয়, সেই পর্যন্ত এই উভয় অবস্থার সন্ধিস্থলে অন্তবর্তীকালটুকুতে দেহবোধও থাকে না, বস্তুবোধও জাগে না এমন একটি আংশিক নির্বিকল্প স্থিতি দেখা দেয়। বৈজ্ঞানিকগণ যখন গবেষণায় মন্ত্র থাকেন, তখন তাঁদের মধ্যেও তদগত অবস্থায় নির্বিকল্প স্থিতি দেখা যায়। এই নির্বিকল্প স্থিতিকালেই তাঁদের নিকট প্রকৃতির আবরণ উন্মোচিত হয়, তাঁরা অভীষ্ট সত্য আবিষ্কারে সমর্থ হন।
মানুষের জীবনে সকলেরই চিত্তে এক বৃত্তিজ্ঞান বিলয়ের পরেই অপর বৃত্তিজ্ঞান ভাসে। খণ্ড খণ্ড পৃথক। বৃত্তিজ্ঞানের প্রবাহ নিয়েই আমাদের জীবনযাত্রা। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, এক বৃত্তিজ্ঞানের বিলয় ও অপর বৃত্তিজ্ঞানের উদ্ভবের সন্ধিক্ষণে প্রতি জীবই নির্বিকল্প দশায় স্থিতি লাভ করে থাকে 'তদন্তরক্ষণৌষেয় নির্বিকল্পদশাস্থিতা'।
নির্বিকল্প স্থিতির এত সব বিবরণ দেওয়ার পর কিন্তু ত্রিপুরারহস্যকার মন্ত্রব্য করেছেন যে ঐ সমস্ত স্থিতি সমাধি শব্দে বা সংজ্ঞায় অভিহিত হওয়ার যোগ্য নয়। স্বাভাবিক ব্যবহারিক জীবনের পূর্ববর্ণিত নির্বিকল্প স্থিতির অনুকরণে, যাঁরা তদনুরূপভাবে দীর্ঘকাল নির্বিকল্প স্থিতিতে থাকবার চেষ্টায় প্রাণস্পন্দন নিরোধ ও চিত্তস্পন্দন নিরোধ করে সমাধিলাভ হয়েছে বলে মনে করেন, গ্রন্থকার তাঁদের কঠোর ভাষায় নিন্দ্য করে বলেছেন যে ঐ রকম তথাকথিত সমাধিস্থিতি শশশুঙ্গবৎ অসৎ 'সমাধিরপ্তি চান্যস্য সমাধিঃ শশশুঙ্গবৎ।। সমাধিবৎ নির্বিকল্পস্থিতি অজ্ঞান সমাধি, জড় সমাধি বা মূঢ় সমাধি নামের যোগ্য। শাজ্যাগমের ঐ অনুভবী সাধকপ্রবরের মতে, সমাধির্বৈ স্বরূপস্য বিমর্শো নান্য উচ্যতে। নির্বিকল্পস্বরূপা তু সর্বাশ্রয়াতয়া সদা।। ১১৩
অর্থাৎ অবিচ্ছেদে আত্মস্বরূপানুসন্ধানের নামই সমাধি। নির্বিকল্প জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা সর্বাধিষ্ঠানরূপে বর্তমান বলেই সর্ববস্তু স্ফূর্তি পায়, স্বপ্রকাশ আত্মচৈতন্যই অজ্ঞান ও অজ্ঞানমূলক জীবজগতের ভাসক। 'অহং ব্রহ্ম্যাস্মি' বৃত্তি দ্বারা সেই নিত্যস্ফূর্তি আত্মচৈতন্য প্রত্যয়ের একতানতাই সমাধি নামের যোগ্য।
প্রথম জীবাবস্থা থেকে সমাধি অবস্থায় যাবার সময় মুগ্ধাবস্থা এসে যোগীর গতিরোধ করে। ধ্যানকালে অকস্মাৎ জ্যোতিদর্শন, অতীন্দ্রিয় দৃশ্য দর্শন বা অলৌকিক শব্দ শ্রবণ করলে যোগীর মন বিস্ময়ে ও আনন্দে স্বৰীভূত হয়ে পড়ে। এই অবস্থার নাম মুগ্ধাবস্থা। মুগ্ধাবস্থাতে জগৎ জ্ঞান এবং স্বীয় অস্তিত্ব জ্ঞান থাকে না। এই অবস্থা হতে হঠাৎ জাগ্রত হয়ে সাধক উপলব্ধি করেন যেন কিছুক্ষণের জন্য তাঁর আত্মসত্তা এবং সৃষ্টির সম্প্র লোপ পেয়েছিল। এটি কিন্তু সুষুপ্তির মতই জীবের অবস্থা বিশেষ। কিন্তু অনেক প্রবীণ সাধকও এই মুগ্ধ অবস্থাকেই সমাধি অবস্থা মনে করে ভ্রমে পতিত হন এবং অভ্যাস দ্বারা এই অবস্থারই স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতে প্রয়াস পান। তাঁরা এই সত্যটি ভুলে যান যে, সৃষ্টিজ্ঞান এবং দেহাত্মক জ্ঞান লুপ্ত হয়ে যে শুদ্ধ চিন্ময় নির্গুণ আত্মসত্তাতে অবস্থিতি একমাত্র তাকেই সমাধি অবস্থা বলা যায়। মুগ্ধাবস্থাতে আত্মসত্তার অবিদ্যমানতা বোধ হলেই তাকে সমাধি বলা যাবে না। লয় বা নির্মাণ অবস্থাতেও সৃষ্টিজ্ঞান ও আত্ম অস্তিত্ব জ্ঞান লুপ্ত হয়। কিন্তু সুষুপ্তি বা মুগ্ধাবস্থা এবং লয় বা নির্মাণ অবস্থাতে প্রভেদ এই যে, মুগ্ধাবস্থা বা সুযুপ্তি হয় জীবের, জীব স্বীয় খণ্ড-অস্তিত্ব-জ্ঞান হতে ঐ দুটি অবস্থাতে প্রবেশ করে এবং তা হতে ব্যুত্থিত হয়ে পুনরায় খণ্ড-অস্তিত্বরই অনুভব করে। যেমন, কেশবের মোহ বা সুষুপ্তি অবস্থা হয় এবং কেশবই জাগ্রত হয় কিন্তু প্রকৃত সমাধিতে জীবভাব লুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ নির্গুণ আত্মসম্বিৎ এর উদয় হয়। ব্যুত্থানের পরেও তার আর জীবভাব থাকে না। অনেক সাধককেই দেখা যায়, খেচরী মুদ্রা সহযোগে (জিহ্বাকে বিপরীত দিকে তালুকুহরে প্রবেশ করিয়ে) মাটির নীচে সমাহিত অবস্থায় দীর্ঘকাল থাকার পর পুনরায় উত্থিত হন, কেউ বা ঊর্ধ্ববাহু, কেউ এক পদে দণ্ডায়মান, কারও বিশাল জটাভারের মধ্যে তৃণগুম্মাদির জঙ্গল, কেউ বা দীর্ঘকাল পদ্মাসন বা সিদ্ধাসনে নির্বাত দীপশিখার মত চলৎশক্তিহীন অবস্থায় দীর্ঘকাল কাটিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ লোকে ঐ সব চিত্তচমৎকারী দৃশ্য দেখে মনে করেন যে ঐ সমস্ত সাধক নিশ্চয়ই সমাধির রস আস্বাদন করেছেন। কিন্তু ঐ সমস্ত কঠোর তপস্বীদের মধ্যে সকলেই যে যথার্থ সমাধির অবস্থা লাভ করেছেন এ কথা শাস্ত্র স্বীকার করেন না। শাস্ত্রমতে ঐ রকম অধিকাংশ সাধকের সমাধিই জড়সমাধি বা মূঢ় সমাধি মাত্র। মূঢ় সমাধি বা জড় সমাধির অপর নাম অজ্ঞান সমাধি। ঐ রকম সমাধি চিত্তের সপ্ত অবস্থার (জাগ্রৎ, স্বপ্ন, সুযুপ্তি, মুচ্ছা, মূঢ় সমাধি, মৃত্যু, তুরীয়) এক একটি অবস্থা বিশেষ। তার দ্বারা চিত্ত নাশ হয়। ঐ রূপ সমাধি তপস্যার ফল বটে, অনেক সময় তার দ্বারা অনেক অলৌকিক শক্তি অর্থাৎ বিভূতিলাভও সম্ভব হয়। কিন্তু জড়সমাধি দ্বারা মোক্ষলাভ হয় না বরং মোক্ষ সুদূর পরাহত হয়, কেননা সমাধি ভঙ্গে দৃঢ় অহংবোধ সহ চিত্ত পুনরুত্থিত হয়ে দৃঢ়তর বন্ধনের হেতু হয়। তৎযথা:-
সিদ্ধিকামনয়া যৈন্তু তপ উগ্রং কৃতং মহৎ। দেহোহপি বিস্মৃততৈস্ত ক্রিমিকীটাদিভক্ষিতঃ।। (৩৪/১৭)
নেয়ং মুচ্ছা ন রোগেহয়ং ন মৃত্যুজীবনাদয়ম্। সুযুপ্তানন্দবিরহান্ন সুযুপ্তিরিতি স্ফুটম্।। (৩৪/১৮)
স্বরূপ লাভ বিরহাম্মঢ়ত্বান্ন তৃরীয়কম্। দৃশাভানং তু নাম্ব্যাসু তাবতা ন কৃতার্থতা।। (৩৪/১৯)
ব্যুথানানস্তরং তেষাং সংসারোহপি যদা স্থিতঃ। যদাত্মদর্শনং নাস্তি সংসারোহবর্ধিততস্ততঃ।। (৩৪/২০)
(বিশ্বশ্বর্য নরহরি বিরচিত বোধসাবঃ)
অত্যুৎকট উগ্ন কঠোর তপস্যা দ্বারা সিদ্ধিলাভের ইচ্ছায় জড় সমাধি কালে যাঁরা দেহ বিস্মৃত হন এমন কি ক্রিমিকীটাদি দ্বারা ভক্ষিত হতে থাকলেও যাঁরা জানতে পারেন না, তাঁদের সেই সমাধি অবস্থা মূর্ছা নয়, যেহেতু তা রোগাদি জনিত নুয়, ঐ অবস্থা মৃত্যু পদবাচ্যও নয় যেহেতু প্রাণবিয়োগ ঘটে না; সুষুপ্তিও নয় কেননা সুখানুভূতি থাকে না এবং তুরীয়বস্থাও নয়, যেহেতু সে সময় স্বয়ং প্রকাশ আত্মচৈতন্যের অনুভূতি নয়। এর একমাত্র যোগ্য নাম মুঢ় সমাধি। কেবল দৃশ্যবোধ না থাকলেও কেউ কৃতার্থতা লাভ করে না। জড় সমাধিবান যোগী যেহেতু আত্মদর্শনের পথে জ্ঞান-সমাধি লাভ করেন না, এই জন্য তাঁদের ব্যুত্থানের পর পুনরায় জীবজগৎ। রূপ সংসার ভেসে উঠে।
পুরাণাদিতে হিরণ্যকশিপু, রাবণ প্রভৃতি দৈত্য ও রাক্ষসগণের উগ্র তপস্যার বিবরণ আছে। তাঁরা নাকি বায়ুমাত্র আহার করে দীর্ঘকাল যাবৎ নিষ্পন্দ অবস্থায় তপস্যা করেছিলেন। সেই সময় তাঁরা যে সমাধি লাভকরেছিলেন, তা জড় সমাধি বা মুঢ় সমাধি। বু্যুত্থানের পর দেখা গেছে তারা যুদ্ধবিগ্রহের দ্বারা স্বর্গজয় ও পৃথিবী জয় করেছিলেন। মূঢ় সমাধিতে আত্মজ্ঞানের অভাবে এইভাবে ভোগ বাসনা অর্থাৎ সংসার বীজরূপে থেকে যায়।
এতক্ষণ ধরে সমাধি সম্বন্ধে আমি এই কথাটাই বুঝাতে চাইছি যে, 'অহং রগ্যাম্মি' বৃত্তি দ্বারা আত্মস্বরাপে স্থিতিলাভই সমাধি। সে পথ জ্ঞানের পথ, বিচারের পথ। আত্মবিমর্শহীন কোন ক্রিয়া বা পদ্ধতি অবলম্বন করে যত কঠোর তপস্যা করা যাক না কেন, তাতে যথার্থ সমাধিলাভ কখনই সম্ভব নয়। এ সম্বন্ধে পূর্বতন সকল ঋষিই একমত। সুপ্রাচীন কাশ্মীরী শৈবাগমের পুস্তক 'শিবসূত্রম্' নামক মহাগ্রন্থে (যার রচয়িতা স্বয়ং মহাযোগেশ্বর মহাদেব) এইভাবেই ব্যঞ্জিত। সেখানে শিব বলেছেন ময়াঃ স্বচিত্তে প্রবিশৎ। শিবসূত্রম্ ৩/২১।
এর তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রীমদ আচার্য ভট্ট ভাস্কর বলছেন-
স্বাত্মনোব নিমগ্নঃ স্যাৎ প্রবৃত্যুপরমে সতি। এবং নিমেষবশতঃ শিবো ভূত্বা স্বচেতসা।
(শিবসূত্রবার্তিকম্ ৩/২১)
অর্থাৎ বহির্মুখ চিত্তকে অন্তর্মুখ করার নাম নিমেষ, নিমীলন বা আবৃতচক্ষু। চিত্তকে বহিবিষয় হতে উপরত করে কেবল আত্মাতে নিমগ্ন করলে তবেই শিব-তাদাত্ম্য লাভ হয় অর্থাৎ জীব শিবস্বরূপ পরমায়ার সঙ্গে ঐক্য লাভ করে। এইভাবে চিত্তকে আত্মনিমগ্ন করার নামই শিবসমাপত্তি বা সমাধি।

ঐ অবস্থা লাভের জন্য প্রত্যেক সাধকের পক্ষেই কতকগুলি প্রাথমিক তথ্য নিত্য স্মরণে রাখা কর্তব্য। তাঁদের জানা দরকার যে, যোগসাধনের প্রথম অবস্থাতে মন যখন বাহ্য জগৎ ত্যাগ করে অন্তর্মুখী হয়, তখন নানা রকমের জ্যোতিদর্শন ও শব্দের ঝঙ্কার শ্রুতিগোচর হয়, সে সব উপলব্ধি বড় বিচিত্র। এই জ্যোতিমাত্র দর্শনকে যাঁরা যোগের চরমসীমা বলে মনে করেন তিনি জ্যোতিতে ব্রহ্ম ভ্রম করে জ্যোতিঃস্বরূপ বলে গেছেন এবং 'আমার ব্রহ্মাদর্শন হল' মনে করে আপ্যায়িত হয়েছেন। যাঁর শব্দ শ্রবণ মাত্রই চরম সীমা, তিনি শব্দ ব্রহ্ম, প্রণব ব্রহ্ম, ওঁকার ব্রহ্ম ইত্যাদি বলে গেছেন এবং শব্দ শ্রবণকেই চরম অনুভূতি বলে ডঙ্কানাদ করেছেন। কিন্তু সত্য কথা বলতে কি আত্মযাজী বৈদান্তিকের দৃষ্টিতে এ সকলই ভ্রম। বেদান্তের সাধক জানেন যে ঐ সমস্ত দর্শন ও শ্রবণ অন্তর্মুখী মনেরই কার্য। প্রকৃত প্রস্তাবে অন্তর্মুখী মন যখন জ্ঞানাগ্নিতে দগ্ধ হয়ে বিশুদ্ধ সূক্ষ্মাবস্থা প্রাপ্ত হয়, তখন তা যদি আত্মসত্তা অবলম্বন করে তবে তা আত্মাতেই বিলীন হয়ে যায় এবং প্রকৃত সমাধির অবস্থা উপস্থিত হয়। সাধনার লক্ষ্যই হল জীবভাব থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মভাবে স্থিতি। বাল্যকালে যেমন শত সাধনাতেও যৌবন আসে না, যৌবনে বার্ধক্য আসে না, বাল্যাবস্থার লয়ে যেমন যৌবনের উদয় ও যৌবনের লয়ে যেমন বার্ধক্যের উদয় হয়, সেই রকম জীবাবস্থার অবসানে ব্রহ্মাবস্থা আপনা হতেই উদিত হয়। ব্রহ্মাবস্থা এবং জীবাবস্থা আত্মারই অবস্থান্তর মাত্র। আত্মাই বদ্ধাবস্থায় জীব এবং মুক্তাবস্থায় ব্রহ্ম। একমাত্র আত্মাতে সমাপত্তি লাভের সাধনা ছাড়া আর কোন ভাবেই জীবভাবের আবরণ অপাবৃত হয় না। জগতে অন্যান্য যতরকম সাধনা আছে, সে সব সাধনায় বহুতর বিচিত অনুভূতি ও ঐশ্বর্য লাভ হলেও ব্যুত্থানের পর সংসারক্ষেত্র অবলম্বন মাত্র সাধকের মন মলিনতা ও জড়ত্ব প্রাপ্ত হয় কিন্তু যদি মুহূর্তের জন্য আত্মাকে অবলম্বন করে সমাধিলাভ করা যায় এবং 'অহং ব্রহ্মাস্মি' বোধে জাগরণ ও সমুত্থান ঘটে তাহলে বহির্জগতে প্রত্যাবর্তন অর্থাৎ ব্যুত্থানের পরও সেই সাধক নিত্য ব্যুত্থিত ও নিত্য সমাধিস্থ থাকেন। জীবভাবের উদ্বোধক মন নামক কোন পদার্যের ক্রিয়া তিনি অনুভব করেন না। শাস্ত্র বলেছেন, সেই আত্মজ্ঞ সাধকের মন তখন 'দগ্ধাবস্ত্রাবভাসঃ' অর্থাৎ অগ্নিদগ্ধ বস্ত্রখণ্ডের মত আভাসমাত্র বিদ্যমান থাকে, বস্তুতঃ সেই মনের কোন ক্রিয়া থাকে না। এটি নির্বিকল্প সমাধির অবস্থা। নির্বিকল্প সমাধিবান যোগীর ব্রহ্মাত্মতা লাভের ফলে বুদ্ধিও নিশ্চল অবস্থা প্রাপ্ত হয়। আচার্য শঙ্কর বলছেন ব্রহ্মানন্দরসাবেশাদেকীভূয় তদাত্মনা। বুদ্ধে যা নিশ্চলাবস্থা স সমাধিরকল্পকঃ ।। (সর্ববেদান্ত-সিদ্ধান্ত-সার-সংগ্রহ। ৮৯৯) অর্থাৎ ব্রহ্মানন্দ রসাবেশে ব্রহ্মস্বরূপের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করলে বুদ্ধির যে নিশ্চলাবস্থা হয় তার নামই নির্বিকল্প সমাধি।

শেষ কথা, শাস্ত্র-স্বাধ্যায়ের ফলে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, সমাধি হল সম্যকভাবে এবং সমভাবে অধিষ্ঠান, চৈতন্যের জাগরণ।

সবসময় সর্বত্র যে কোন অবস্থাতেই সেই অখণ্ড পরমানন্দ, সমরস, রসস্বরূপ, জ্যোতিস্বরূপে সমভাবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে অধিষ্ঠিত থাকাই সমাধি। সমত্বং যোগমুচ্যতে। যখন সমত্ব বোধ সব কিছুতে হয় তখনই হয় সমাধি। যখন যোগী ধ্যানযোগে সচ্চিদানন্দময়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান, সর্বভূতান্তরাত্মার সঙ্গে একাত্মবোধ হয়, তখন তাঁর কোন বিভেদ বোধ থাকে না। এই নির্বিকল্প সমাধি অবস্থায় আচার্য শঙ্কর বলে উঠেছিলেন - 'অহং নির্বিকল্পো নিরাকারোপেবিভূব্যাপী সর্বত্র সর্ব্বেন্দ্রিয়াণাম্"। আবার যেহেতু এই অবস্থায় চিদাকাশে সম্যক জ্ঞানের উদয় হয়, সেহেতু বিশ্বের সকল রহস্যেরও সমাধান তাঁর কাছে হয়ে যায়। যোগীর তখন কিছুই অজানা থাকে না, পূর্ণভাবে জানা হয়ে যায়। কাজেই সমাধিবান ঋষি বা যোগী ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে যান। তার পূর্ণতম প্রজ্ঞা, পূর্ণতম আনন্দ লাভ হয়।

তখন অনুভবী সাধক তাঁর অনুভবের স্তর থেকে সমাধিস্থ অবস্থায় কিরকম অনুভূতি হয় তা বলতে গিয়ে কলেছেন

উপেক্ষা নামরূপে ছে সচ্চিদানন্দ বস্তুনি।

সমাধিং সর্বদা কুর্যাদ হৃদয়ে বাথবা বহিঃ।

স বিকল্লোহবিকল্পশ্চ সমাধিদ্বিবিধো হ্যাদি।

দৃশাশব্দানুবেধেন সবিকল্পঃ পুনদ্বিধা।

কামাদ্যাশ্চিত্তাসাদৃশ্যান্ডৎ সাক্ষিত্বেন চেতনাম্। ধ্যায়েদুশ্যানুবিস্কোয়ং সমাধিঃ সবিকল্পকঃ। অসঙ্গঃ সচ্চিদানন্দঃ সপ্রভো দ্বৈতবর্জিতঃ।

অর্থীতি শব্দবিদ্ধোয়ং সবিকল্প সমাহিতঃ।।

স্বানুভূতিরসাবেশাব্দ্দশ্য শব্দানুপেক্ষ্য তু।

নির্বিকল্প সমাধিঃ স্যান্নিবাতস্থলদীপবৎ ।।

অর্থাৎ 'সচ্চিদানন্দ পরব্রহ্মাই একমাত্র সত্যবস্তু। নামরূপ কল্পিত বা মিথ্যা, এইটে নিশ্চয় করে, নামরূপকে পরিত্যাগপূর্বক, অন্তরে বা বাহো, সর্বদাই সমাধি আশ্রয় করবে। আন্তর সমাধি সবিকল্প নির্বিকল্প ভেদে দুই প্রকার, আবার নির্বিকল্প সমাধিও দুই প্রকারের (১) দৃশ্যানুবিদ্ধ, (২) শব্দানুবিদ্ধ। ভাবাভাব চিত্তের কামাদি বৃত্তিগুলিও ভার অভাব ধর্মযুক্ত। কারণ চিত্তের সম্ভাবে তাদের সম্ভাব চিত্তের অভাবে তাদের অভাব। জাগ্রতাবস্থায়, ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন হয়ে বৃত্তিগুলি প্রকাশিত হয়, অর্থাৎ এক বৃত্তির পর অপর বত্তির উদয় হয়। চিত্ত কখনও বৃত্তিশূন্য থাকে না, এক বৃত্তির লয় হলে আবার অন্য বৃত্তির উদয় হয়। পরন্তু সুষুপ্তি ও মূর্ছাদি অবস্থাতে চিত্তের লয় হওয়ায় আর কোন বৃত্তিরও উদয় হয় না। সেই চিত্তবৃত্তির বিবিধ প্রকার বিকৃতাবস্থা, তার ভাব ও প্রভাব এবং তদুভয়ের সন্ধিস্থল যিনি স্বপ্রকাশরূপে প্রকাশ করেন, তিনি প্রত্যক্ষ চৈতনারূপ আত্মা। অপরোক্ষভাবে এটি অবগত হয়ে তাঁর ধ্যান করবে ইহাই দৃশ্যানুবিদ্ধ সবিকল্প সমাধি। এই দৃশ্যানুবিদ্ধ সমাধি দ্বারা প্রত্যেক চৈতন্যস্বরূপ আত্মার অনুভূতি দৃঢ় হলে, সেই অসঙ্গ, অদ্বিতীয়, স্বপ্রকাশ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ ব্রহ্মচৈতন্য উপলব্ধি হয়ে থাকে। এইরূপ দৃঢ় ভাবনাকে শব্দানুবিদ্ধ সবিকল্প সমাধি বলে। পূর্বোক্ত দৃশ্য ও শব্দানুবিদ্ধ সমাধি দ্বারা চিত্ত যখন সুস্থির হয়ে স্বরূপের সঙ্গে একত্ব লাভ করবে, তখন দৃশ্য ও শব্দ উভয়ই অন্তর্হিত হয়ে যাবে। তখন কেবল স্বয়ংসাক্ষী ও সাক্ষ্যভাবরহিত অখণ্ড সচ্চিদানন্দস্বরূপ পূর্ণানন্দরসে নিমগ্ন থাকবে, চিত্তনির্বাহ দীপকলিকার ন্যায় নিশ্চল হয়ে তদাকার অবস্থা প্রাপ্ত হবে, এই হল নির্বিকল্প সমাধি।'


Read More

25 September, 2026

আদি শঙ্করের রচনাবলি

25 September 0

শঙ্করাচার্যের রচনাবলি, আদি শঙ্করের রচনাবলি

প্রাচীনকাল হতে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন ভাষায় ভাষ্য, প্রকরণ গ্রন্থ এবং স্তোত্রাদি মিলিয়ে প্রায় ২০০ খানা গ্রন্থ শঙ্করের নামে প্রচলিত আছে।

তার মধ্যে ব্রহ্মসূত্রের উপর বিখ্যাত শারীরক ভাষ্য, ঈশ-কঠ-মুণ্ডক-ঐতরেয়-ছান্দোগ্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের উপর রচিত উপাদেয় ভাষ্যরাজি, গৌড়পাদকৃত মাণ্ডুক্যকারিকার ভাষ্য, বিষ্ণুসহস্রনাম ভাষ্য, শ্রীমদ্ভগবদগীতা ভাষ্য, মণ্ডলব্রাহ্মণোপনিষদের উপর রাজযোগ ভাষ্য, বিবেকচূড়ামণি, সর্ববেদান্তসিদ্ধান্তসংগ্রহ, উপদেশসহস্রী, অদ্বৈতানুভূতিঃ, অনাত্মশ্রীবির্গহন প্রকরণম্, মঠাম্নায়ঃ, মোহমুদগরঃ, নির্বাণদশকম্, আত্মবোধঃ, অদ্বৈতপঞ্চক, কেবলোহম্ ওর্বষ্টকম্, দক্ষিণামূর্তিস্তোত্রম্, পরাপূজা, নির্গুণমানসপূজা, প্রবোধসুধাকর, স্বাত্মপ্রকাশিকা, প্রশ্নোত্তরমালিকা, মণিরত্নমালা, বিজ্ঞান-নৌকা (স্বরূপানুসন্ধানম্), ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা, ব্রহ্মানুচিন্তনম্ এবং নির্বাণষটকম্ প্রভৃতি গ্রন্থ যে আদি শঙ্করাচার্যের রচিত এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নাই। নিশ্চিত প্রমাণের ভিত্তিতে পণ্ডিতরা সকলেই এ বিষয়ে একমত। কিন্তু আপনার উল্লেখিত ভবাণ্যষ্টক, গঙ্গাষ্টক, গণেশাষ্টক, শিবস্তুতি, দুর্গাপরাধভঞ্জনস্তোত্র প্রভৃতি প্রায় ৭৫ খানি স্তবস্তুতি গ্রন্থ সহ শঙ্করের নামাঙ্কিত আরও কয়েকটি ভাষ্য ও উপদেশগ্রন্থ সম্বন্ধে আমার মনে ঘোরতর সংশয় অছে।
'দেবী সুরেশ্বরি ভগবতি গঙ্গে' থেকে আরম্ভ করে প্রণমামি শিবং শিবকল্পতরুণ, ভবান্যষ্টক, দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্র, কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্র, গণেশাষ্টক প্রভৃতি স্তোত্র শঙ্করের রচিত নয়। ঐগুলি প্রক্ষিপ্ত।
শঙ্করাচার্যের নামে প্রকাশিত তাবৎ গ্রন্থকে তাঁর লেখা বলে স্বীকার না করলে তাতে তাঁর মহিমা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। গ্রন্থকারের কৃতিত্ব সংখ্যাধিক্যের উপর নির্ভর করে না, বিষয় গৌরব, বস্তু গৌরব, চিন্তার স্বকীয়তা ও গভীরতা, সর্বোপরি গ্রন্থনিহিত বোধির দীপ্তিই গ্রন্থকারকে অমরতা দান করে।
ভারতের ধর্ম, দর্শন এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আচার্য শঙ্কর ছিলেন কোহিনুর স্বরূপ- কোহিনুরই বা বলি কেন, তিনি ততোধিক। কোহিনুর বহুবার লুন্ঠিত হয়েছে, তুর্কী-মোগল-ইংরেজ অনেকের কাছেই হস্তান্তরিত হয়েছে বারবার, তাতে আমাদের স্থায়ী কিছু ক্ষতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু যদি শঙ্করাচার্যের মূল একখানি গ্রন্থও চিরতরে অপহৃত বা নষ্ট হত তাহলে দেশের যে ক্ষতি হত তা অপূরণীয়। ১৫০/২০০ টির পরিবর্তে মাত্র ৩৫টি গ্রন্থকে তাঁর প্রকৃত রচনা বলায় আপনি ক্ষুণ্ণ হচ্ছেন, কিন্তু মাত্র ৩২ বৎসর আয়ুষ্কালের মধ্যে ৩৫ খানা কালজয়ী গ্রন্থ লেখাও কি কম কথা? আমার মতে তিনি যদি কেবল ব্রহ্মহ্মসূত্রের শারীরিক ভাষ্য লিখে যেতেন, অন্য কোন বই লেখার সুযোগ তাঁর নাও হত তাহলেও তিনি মৃত্যুজিৎ কীর্ত্তির অধিকারী হতেন।
নিম্নলিখিত প্রমাণ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শঙ্করের নামে প্রচলিত অনেক পুস্তকই প্রকৃত পক্ষে অন্য লোকের দ্বারা রচিত হয়ে তাঁর নামে আরোপিত হয়ে আসছে:-
(ক) উদাহরণস্বরূপ প্রথমেই 'জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং 'বোধসারা' নামক দুইখানি গ্রন্থের কথাই ধরা যাক। ১২৯২ সালে জনৈক অন্নদাপ্রসাদ বসু ঐ দুখানি পুস্তক কলিকাতা হতে প্রকাশ করেন। রচনার লালিত্য, রস এবং উপাদেয়তা লক্ষ্য করে তিনি ভুলক্রমে এইগুলিকে স্বয়ং শঙ্করাচার্যের লেখা বলে প্রচার করেন। কিন্তু পরে পন্ডিতরা আবিষ্কার করেন যে বিখ্যাত সংস্কৃত কাব্যকার এবং দার্শনিক বিদ্বদ্বর্ষ নরহরি নামক জনৈক দক্ষিণী ব্রাহ্মণ ঐ বই দুখানির লেখক। প্রকৃত তথ্য হল, অন্নদাপ্রসাদ বসু নরহরি রচিত 'বোধসারঃ' হতে ২৫০টি শ্লোক সঙ্কলন করেছিলেন মাত্র। নরহরি বাংলা ১২২০ সালে 'বোধসারা' রচনা করেন এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য দিবাকর ১২২৩ সালে (১৭৩৮ শকাব্দে) তার টাকা রচনা করেন। তাঁরা কেউ শঙ্করাচার্যের নাম উল্লেখ করেন। নি। জ্ঞানগঙ্গাশতক এবং বোধসারঃ এর গ্রন্থকার যে শঙ্করাচার্য নন তার একটি বড় প্রমাণ ঐ বই দুটিতে শঙ্কর প্রবর্তিত সন্ন্যাস ধর্মের বিধি ও চিহ্নাদি ধারণের নিন্দা আছে। তাছাড় গ্রন্থমধ্যে ষোড়শ শতাব্দীতে আবির্ভূত মধুসূদন সরস্বতীর বহু উদ্ধৃতিই প্রমাণ করে যে বইটি শঙ্করাচার্যের রচনা নয়।
(খ) কাল্যপরাধভঞ্জন স্তোত্রটিও শঙ্করের রচিত নয়। কারণ, স্তোত্রটি গুপ্তার্ণব তন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। যিনি তন্ত্রমত খণ্ডন করে তার উচ্ছেদ সাধন ঘটিয়েছিলেন এবং যার জন্য বহু স্থানে তাঁর তান্ত্রিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছিল, এমন কি একসময় একজন কাপালিকের হাতে তাঁর প্রাণ যাওয়ারও উপক্রম ঘটেছিল, সেই শঙ্কর কোন তান্ত্রিক ভাবধারামণ্ডিত স্তোত্র রচনা করবেন বলে মনে হয় না।
(গ) আচার্যের নামে প্রচারিত দুর্গাপরাধভঞ্জন স্তোত্রটি সম্বন্ধেও ঐ একই কথা। একথা সবাই জানেন, পণ্ডিতমহলেও একথা স্বীকৃত সত্য যে আচার্য শঙ্কর ৭৮৮ খৃঃ ৮২০ খৃষ্টাব্দ অর্থাৎ ৩২ বৎসর বয়স পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এমতাবস্থায় স্তোত্রটিকে শঙ্কর রচিত বলে স্বীকার করলে তিনি ৮৫ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে মানতে হবে। কারণ ঐ স্তোত্রের মধ্যে রচয়িতা স্বীকারোক্তি করেছেন মা দুর্গে। অন্য দেবতা পরিত্যাগ করে পঁচাশি বৎসর বা তদধিক কাল পর্যন্ত তোমারই সেবা করে এলাম। এখন তুমি যদি আমায় কৃপা না কর, তাহলে আমি আর কার শরণ নিবা পরিত্যক্তা দেবা বিবিধবিধিসেবাকুলতয়া ময়া পঞ্চাশীতেরধিকমপনীতে তু বয়সি। অপীদানীং মাতস্তব যদি কৃপা নাপি ভবিতা নিরালম্বো লম্বোদর-জননি কং যামি শরণম।।
(ঘ) শুনলে আশ্চর্য হবেন বাংলাদেশেও একজন শঙ্করাচার্য ছিলেন। লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে রক্ষিত 'তারারহস্যবৃত্তিকা' নামে একখানি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। নেপাল দরবার লাইব্রেরীতেও ঐ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি রয়েছে। ঐ প্রতিলিপির তারিখ লক্ষ্মণসংবৎ ৫১১ (১৬৩০ খৃঃ)। গ্রন্থের পুষ্পিকায় লেখক আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তিনি বাঙালী এবং কৌল। তাঁর পিতার নাম কমলাকর, পিতামহের নাম লম্বোদর (Descriptive Catalougue of Sanskrit Mss in India Office Libary 4/2603)। এই গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য রচিত 'মৃত্যুঞ্জয় পূজা', 'প্রপঞ্চসার' এবং 'সৌন্দর্যলহরী' প্রভৃতি গ্রন্থ বৈদান্তিক চূড়ামণি জ্ঞান-গুরু শঙ্করের নামে অবলীলাক্রমে প্রচলিত হয়ে আসছে।
(ঙ) প্রকৃতপক্ষে শঙ্করের রচিত নয় অথচ তাঁর নামে প্রচলিত হয়ে আসছে এমন গ্রন্থগুলিকে তাঁর মূল রচনার সঙ্গে তুলনামূলক ভাবে বিচার করলেই যে কোন নিরপেক্ষ পাঠকের চোখে উভয় শ্রেণীর গ্রন্থের মধ্যে ভাষাগত ও ভাবগত অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। যেমন শ্বেতাশ্বতর ও নৃসিংহতাপনীয় উপনিষদের তথাকথিত শঙ্করভাষা। ঐ দুটি ভাষ্যের লেখক পৌরাণিক প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আদি শঙ্করাচার্যের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, তিনি তাঁর লেখার মধ্যে উপনিষৎ প্রমাণকেই প্রধান্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ঐ দুখানি ভাষ্যে ব্যাকরণ অশুদ্ধিও রয়েছে। এতেই বুঝা যায় যে, ঐ দুটি ভাষ্যের ব্যাখ্যাতা আর যিনিই হোন, তিনি কদাপি আদি শঙ্করাচার্য নন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষৎ ভাষ্যের একস্থানে গৌড়পাদের একটি কারিকার (৩/৫৫) উল্লেখ এইভাবে করা হয়েছে 'তথা চ শুকশিয্যো গৌড়পাদাচার্যঃ। অর্থাৎ শুকের শিষ্য কোন এক গৌড়পাদাচার্য ইত্যাদি। শঙ্করাচার্যের মত মহাজ্ঞানী শিষ্যের আচার-বিরুদ্ধ এইরকম লঘু ভাষায় লঘু চালে নিজ পরমগুরুর নাম স্মরণ করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।
(চ) কেনোপনিষদের পদভাষ্য এবং বাক্যভাষাও শঙ্করের নামে প্রচলিত। কিন্তু যে কোন অনুসন্ধানী পাঠক একটু খুঁটিয়ে বিচার করলেই দেখতে পাবেন এই উভয় ভাষ্যের কোন কোন অংশে মূলের ব্যাখ্যা পরস্পর ভিন্ন এবং বিপরীত। মূল ২/১/২ এর পাঠ পদভাষ্য মতে 'নাহম' কিন্তু বাক্যভাষ্য মতে 'নাই'। লেখক একজন হলে বিশেষতঃ শঙ্করের মত মহাপণ্ডিত এর রচয়িতা হলে এই ধরণের ভাবগত ও ভাষাগত ভুল কখনও সম্ভব নয়।
(ছ) সম্প্রতি বর্তমান ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ তত্ত্বদর্শী মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ প্রণীত 'ভারতীয় সাধনার ধারা' নামে একখানি অমূল্য গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই বই-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, মাণ্ডুক্য উপনিষদের ভাষ্যও আদি শঙ্করের নয়। এর দুটি মঙ্গল শ্লোক অত্যন্ত নিকৃষ্ট ভাষায় রচিত। দ্বিতীয় শ্লোকে ত পরিষ্কার ছন্দোভঙ্গের দোষ। শ্লোকের প্রথম তিন পক্তি মন্দাক্রান্তা এবং চতুর্থ পঙক্তি অধরা ছন্দে লিখিত। অন্তিম তিন শ্লোকে ব্যাকরণগত অশুদ্ধিও বর্তমান। এই সব মারাত্মক ত্রুটি কি শঙ্করাচার্যের লেখায় সম্ভবপর।
সম্ভব যে নয় তা বিচারশীল লোকমাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য। তবুও যে নানা অবৈদিক মতবাদে কণ্টকিত (কোন কোন ক্ষেত্রে শঙ্করের জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবধারায় পরিপূর্ণ) গ্রন্থও অবলীলাক্রমে তাঁর নামে কিভাবে চলে আসছে, তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের দেশের দু' একটি বিশিষ্ট প্রাচীন রীতি এবং বিচিত্র মানসিকতাকেই দায়ী করতে হয়। সাম্প্রদায়িক স্বার্থ এবং অতিভক্তির জলাভূমিতেই এই রীতি ও মানসিকতার জন্ম। স্বরচিত গ্রন্থের গৌরব বৃদ্ধির জন্য অনেকেই আমাদের দেশে নিজ নাম গোপন করে প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ মহাত্মা ও মনীষীর নামে গ্রন্থরচনা করে গেছেন অনেকে আবার নিজ মতবাদকে জনপ্রিয় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রসিদ্ধ আকরগ্রন্থের মধ্যে স্বরচিত অনেক শ্লোকও সুকৌশলে প্রক্ষেপ (Interpolation) করেছেন। পরবর্তীকালে অনেক গবেষক পণ্ডিতের চোখে এ রহস্য ধরাও পড়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে অভিসন্ধিপরায়ণ লোকেরা বিশেষতঃ নানা মঠ মিশনের মোহান্ত মহারাজের দল এইরকম অপকার্য করে এসেছেন। এখানে কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি। যেমন রামের দুর্গাপুজা প্রসঙ্গ। রাম দুর্গাপূজা করেন নি, মূল বাল্মীকি রামায়ণে দুর্গাপূজার উল্লেখ নাই। রাজসাহী জেলার অন্তর্গত তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ খুঃ পঞ্চদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান করেন। তাঁর সভাপণ্ডিত ও পুরোহিত। পণ্ডিত রমেশ চন্দ্র শাস্ত্রীই দুর্গাপূজার পদ্ধতি ও মন্ত্রাদি রচনা করে বাজাকে দিয়ে পূজা করান। ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের লেখা 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' নামক বই-এ এই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে এবং রাজা কংসনারায়ণের সাক্ষাৎ বংশধর, কাশীস্থ ভারতীয় ধর্ম মহামণ্ডলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রাজা শশিশেখরেশ্বর রায়ও প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র দৃষ্টে এই তথ্য সমর্থন করেছেন। কিন্তু রাজার সভাকবি কৃত্তিবাস তাঁর বাংলা রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রের নামে এই মহাপূজা আরোপ করার পর থেকে সারাদেশে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে গেল। এখন আবালবৃদ্ধবনিতা বিশ্বাস করেন যে রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন এবং মহামুনি বাল্মীকিই যেন ঐ পূজাপদ্ধতির প্রবর্তক।
বুদ্ধদেবের কথা ভেবে দেখুন যে বুদ্ধদেবের প্রতিষ্ঠিত ধর্মের মূল মন্ত্রই ছিল ক্ষমা, প্রেম, মুদিতা, করুণা ও অহিংসা, যে বুদ্ধদেব ঈশ্বর সম্বন্ধে সারাজীবন নীরব থেকেছেন, মূর্তিপূজা ও বহিরাচারকে যিনি অসার ও নিরর্থক বলেছেন, তন্‌হা অর্থাৎ তৃষ্ণা দূর করে নির্বাণলাভই ছিল যাঁর ধর্মে পরম পুরুষার্থ, সেই অমিতাভবুদ্ধের মৃত্যুর পর কি দেখা গেল। দেখা গেল, তথাগতের ধর্ম কতকগুলো ভ্রষ্টাচারী ভিক্ষু ভিক্ষুণীর স্বকপোলকল্পিত তান্ত্রিক পূজাপাঠ এবং গুহ্য ক্রিয়াকৌশলে পরিণত হয়ে গেল। একদিকে যেমন তা মহাযান, হীনযান, বজ্রযান প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হল, অন্যদিকে তেমনি তা দণ্ডেশ্বরী, বজ্রেশ্বরী, চক্রেশ্বরী প্রভৃতি বহুতর দেবদেবীর অনুষ্ঠানসর্বস্ব পূজাপদ্ধতিতে হল পর্যবসিত। যেহেতু বৌদ্ধধর্মের কোন কোন সম্প্রদায়ে ঐ সব অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে, এজন্য কি কেউ বলবেন যে বুদ্ধদেব ঐ সব মূর্তিপূজা এবং তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ। করতেন।
আমি বলতে চাই যে রাম ও বুদ্ধদেবের মত নির্বিশেষে ব্রহ্মহ্মবাদী শঙ্করাচার্যের নামে নানা দেবদেবীর আরাধনা এবং তদনুকূল স্তোত্রমন্ত্রাদি প্রচলনের মূলেও ঐ একই মনোবৃত্তি বর্তমান। প্রক্ষেপের ভূত ভারতের ধর্মজগতে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে, অনেক অনাচারেরই জন্ম দিয়েছে। এই ভৌতিক উপদ্রব থেকে ব্যাসদেব এমন কি স্বয়ং ভূতনাথও রক্ষা পাননি। বোম্বাই এর ক্ষেমরাজ কোম্পানী দেবনাগরী অক্ষরে একখানি পুরাণ প্রকাশ করেছেন। নাম- ভবিষাপুরাণ। অন্যান্য পুরাণ-গ্রন্থের মত এটিও ব্যাসদেবের রচিত বলে অপপ্রচার করা হয়েছে। বইটিতে আছে মহাদেবেন লোকার্থে ভবিষ্যং রচিতং শুভম্' লোকহিতের জন্য মহাদেবই যেন বইখানির প্রণেতা। লক্ষ্য করুন, এখানে লেখক এক ঢিলে দুই পাখী মারার আশ্চর্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

শিব ও ব্যাসদেব দুজনকেই জড়িয়েছেন। দুইজনের পুণ্য নামকে যথেচ্ছভাবে অপব্যবহার করেছেন। ভাবখানা এই বইটি originally মহাদেবের দ্বারা লিখিত হলেও এই অধরম ধরাধামে ব্যাসদেবই তার প্রকাশক। শিবের উক্তিতে কলিকাতারও উল্লেখ করা হয়েছে 'কলিকাতা-পূরী রম্যা প্রসিদ্ধাভুৎ মহীতলে' (৪র্থ খণ্ড)। শান্তিপুরেরও নাম বাদ যায়নি 'গঙ্গামুলে শান্তিপুরং রচিতং তেন ধীমতা'। 'তেন' অর্থাৎ রাজা শাস্তিবমা গঙ্গাতীরে শান্তিপুর নগর নির্মাণ করলেন আর তাঁর পুত্র নদীবর্মা গৌড়দেশে গড়ে তুললেন 'নদীহা' অর্থাৎ নদীয়া 'চকার নগরীং রম্যাং নদীহাং গৌড়রাষ্ট্রভাক্ (শ্লোক ২৫) শিব একে ত্রিনয়ন তায় ত্রিকালদর্শী। কাজেই মতলবী গ্রন্থকার তাঁর মুখ দিয়ে রামানন্দ, শ্রীধরস্বামী ও তাঁর গীতার টীকা, জয়দেব-পদ্মাবতী এবং গীতগোবিন্দ, চৈতন্য-শঙ্কর-রামানুজ, কবীর-নানক-নিত্যানন্দ, বিশ্বমঙ্গল, তুলসীদাস সকলের কথাই বলিয়েছেন। স্থান-কাল-পাত্র, সমীচীনতা-অসমীচীনতা কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নাই।

ভবিষ্যপুরাণের শিব শুধু অসাধারণ ভবিষ্যৎ-দৃষ্টিরই অধিকারী নন, হিন্দু অহিন্দু সকলের প্রতিই তাঁর সমান করুণা। শুধু হিন্দুর কথাই তিনি বলেন, মুসলমান বা ইংরেজদের কথা বলবেন না, এমন ত আর হয় না। তাই তিনি পৃথ্বীরাজের প্রতিমূর্তির গলায় সংযুক্তার মাল্যদান এবং জয়চন্দ্র পৃথ্বীরাজের যুদ্ধপর্ব বর্ণনার পরেই কুতুবুদ্দিন সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন 'পৈশাচঃ কুতুবুদ্দিনঃ'। ইংরাজদের বেলায় শিবকে একটু গদগদ দেখা যায়। তাঁর মতে ইংরাজরা বড় ভাল লোক। তারা ঈশ্বরের পুত্র যীশুর মতাবলম্বী, বাণিজ্যের জন্যই তারা এদেশে এসেছে 'ঈশ-পুত্র-মতে সংস্থা তেষাং হৃদয়মুত্তমম'। তাদের কে রাজা এবং সে রাজার সিংহাসন কোথায় সে সব কথাও পঞ্চানন পঞ্চমুখে ব্যক্ত করেছেন- 'বিকটে পশ্চিমে দ্বীপে তৎপত্নী বিকটাবতী' বিকট অর্থাৎ অতি দুর্গম পশ্চিম দ্বীপে রাজার পত্নী বিকটাবর্তী অর্থাৎ রাণী ভিক্টোরিয়া। তিনি বর্তমানে আটজন কৌসলী অর্থাৎ কাউন্সিলারের সাহায্যে রাজাশাসন করছেন। 'অষ্ট কৌশলমার্গেণ রাজ্যমত্র চকার হ'। একেই বলে কলি-কৌতুক।
সংস্কৃত ভাষায় লিখিত হলেই তা যেমন শাস্ত্র হয় না, তেমনি 'শিব উবাচ', 'ব্যাস-উবাচ' বলে নিজেদের সংস্কার বিশ্বাস এবং মতবাদ প্রচারের প্রয়াসও কখনও মান্য ও প্রামাণ্য বলে গ্রাহ্য হতে পারে না। শঙ্করাচার্যের গদীতে বসে কেউ ফরমান জারী করলেও না।
ভবিষ্যপুরাণের শিব ও ব্যাসের উক্তিতে যেমন কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনি কৌতুক সৃষ্টি করা হয়েছে সাক্ষাৎ বেদান্ত মূর্তি আচার্য শঙ্করকে নিয়ে। ভবিষ্যপুরাণের শুদ্ধ ও সরল সংস্কৃত ভাষার কোন ব্যাকরণ গত দোষ নাই। তাই তা যেমন শিব ও ব্যাসের রচনা বলে চালাতে কোন অসুবিধা নাই, তেমনি লালিত্যমণ্ডিত ছন্দোবদ্ধ সংস্কৃতে নানা শ্লোক ও স্তোত্রমন্ত্রাদি রচনা করে শঙ্করের নামে প্রচার করলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাও সহজে ধরার উপায় নাই। সূক্ষ্ম মনন ও বিচারের আলো ফেলে শঙ্করের নামাঙ্কিত কোন কোন গ্রন্থে তাঁর জীবন-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব সুকৌশলে পরিবেশন করে সম্প্রদায়ীরা তাদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থবুদ্ধি চরিতার্থ করেছে, কয়জনই বা তা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে বলুন। তাই অগণিত মানুষ আজও সহজিয়া ভক্তিবশে আচার্যের নামাঙ্কিত প্রতিটি রচনাকেই তাঁরই মূল রচনা বলে মনে করেন। যিনি ছিলেন জ্ঞানগঙ্গার নব ভগীরথ, অদ্বৈতবাদের মহান্ উদ্‌গাতা, যাঁর অভেদ দৃষ্টিতে সর্বত্র সর্ব বস্তুতে অদ্বয় ব্রহ্মের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু ভাসত না, তাঁর পক্ষে 'দেবী। সুরেশ্বরী ভগবতে গঙ্গে' বলে ভৌম গঙ্গার স্তবস্তুতি এবং বাহ্যিক পূজারাধনামূলক মন্ত্রাদি রচনা সম্ভব কিনা তা একবারও কেউ বিচার করে দেখে না। যিনি স্বরচিত 'আত্মপূজা' বা 'পরাপূজা'তে ব্রহ্ম যজ্ঞের ভাব এবং 'নির্গুণমানসপূজা'তে বাহ্যিক পূজাঙ্গ ষোড়শোপচারাদির নিগূঢ় তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করে কিভাবে দিব্যভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে নির্গুণের ধ্যান করতে হয়, তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিশদভাবে বুঝিয়ে গেলেন, তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মঠের মঠাচার্যরা তবু কেন যে পূর্ণাগিরি, শারদাদেবী, প্রভৃতির জড়োপসানার ঠাঁট সাড়ম্বরে বজায় রেখেছেন, তা আমার বুদ্ধির অগম্য। ঐ সমস্ত মূর্তির পূজা যে তাঁর অন্তর্ধানের পর শিষ্য প্রশিষ্যদের দ্বারাই প্রচলিত হয় নি, তার কি কোন নিশ্চিত প্রমাণ আছে?
সত্য বটে, আচার্য তাঁর 'মঠাম্নায়ঃ' নামক অনুশাসন-গ্রন্থে সিদ্ধেশ্বর, নারায়ণ, জগন্নাথ, ভদ্রকালী, বিমলা ও পূর্ণাগিরি প্রভৃতি দেবদেবীর নামোল্লোখ করেছেন। কিন্তু তা কি অর্থে? তাঁর ঐ সনদ বা অনুশাসনে পূজ করার কোন নির্দেশ নাই, প্রধান চারটি মঠের পরিচয় দিতে আচার্য ঐ সব দেব-দেবীর কথা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন মাত্র। যেমন শারদা মঠের পরিচিতিতে বসেছেন দ্বারকাখ্য হি ক্ষেত্রং স্যাৎ দেবঃ সিদ্ধেশ্বরঃ স্মৃতঃ। ভদ্রকালী তু দেবী স্যাদাচার্যো বিশ্বরূপকা। মঠটি কোথায়। না দ্বারকাক্ষেত্রে, যেখানে সিদ্ধেশ্বর ও ভদ্রকালী রয়েছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন বিশ্বরূপ অর্থাৎ সুরেশ্বর। গোবর্দ্ধন মঠ সম্বন্ধে আচার্যের বিজ্ঞপ্তি- পুরুষোত্তমং তু ক্ষেত্রং স্যাজ জগন্নাথোহস্য দেবতা। বিমলাখ্যা হি দেবী স্যাদাচাৰ্য্যঃ পদ্মপাদকঃ। অর্থাৎ গোবর্দ্ধন মঠটি পুরুষোত্তমক্ষেত্র অর্থাৎ পুরীতে অবস্থিত যেখানে জন্মনাথ ও বিমলা দেবী আছেন, সেখানকার প্রথম আচার্য হবেন পদ্মপাদ। এখানে 'অস্য দেবতা' বলতে মঠের আরাধ্য দেবতা নন, অস্য ক্ষেত্রসা দেবতা। পুরীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ দেবতা জগন্নাথ, জগন্নাথের নামেই পুরীর নাম পুরুষোত্তম বা জগন্নাথক্ষেত্র। গোবর্দ্ধন মঠের অভ্যন্তরে জগন্নাথের কোন মূর্তি প্রতিষ্ঠিত নাই, আচার্যও তাঁর পূজার কথা বলছেন না। জ্যোতির্মঠ সম্বন্ধে বলেছেন বদরিকাশ্রমঃ ক্ষেত্রং দেবো নারায়ণঃ স্মৃতঃ। পূর্ণাগিরি চ দেবী স্যাদাচার্যড্রোটকঃ মৃতঃ।। এই মঠটি বদরিকাশ্রমে অবস্থিত যেখানে ক্ষেত্রদেবতা নারায়ণ এবং পূর্ণাগিরির মন্দির আছে সেখানে প্রথম আচার্য হবেন তোটকাচার্য। সর্বশেষে আচার্য শৃঙ্গেরী মঠের অবস্থান নির্দেশ করেছেন এইভাবে রামেশ্বরাহয়ং ক্ষেত্রমাদিবরাহ দেবতা। কামাক্ষী তস্য দেবী স্যাৎ সর্বকামফলপ্রদা। পৃথ্বীধরাখ্য আচার্যস্তুঙ্গভদ্রেতি তীর্থকম্।। শৃঙ্গেরী মঠটি কোথায়। না রামেশ্বরক্ষেত্রে, তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে এই তীর্থের দেবতা হলেন আদিবরাহ এবং দেবী কামাক্ষী। পৃথ্বীধর এখানকার প্রথম আচার্য হবেন।
আপনি যদি কাউকে আপনার বাসস্থান কলিকাতার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন যে, এই শহর গঙ্গাতীরে অবস্থিত, হিন্দুরা গঙ্গাকে তীর্থ বলে মনে করেন, এখানে কালীঘাটের কালী প্রধান দেবতা, এখানে নকুলেশ্বর শিবের মন্দির এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল রয়েছে, তাহলে তাতে যেমন আপনি ঐ ভদ্রলোককে কালী নকুলেশ্বর প্রভৃতিকে পূজা করতে বলছেন একথা মনে করা চলবে না, তেমনি মঠাপ্লায়ে দেবদেবীর উল্লেখ আছে বলেই আচার্য তাঁদের পূজার বিধান দিয়েছেন এ কথা ভাবাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আচার্যের আবির্ভাবের পূর্ব হতেই তাঁর মঠগুলির সন্নিহিত স্থানে ঐ সকল দেবদেবীর মন্দির বর্তমান ছিল, তিনি সেগুলির উল্লেখ করে নিজের মঠের অবস্থান (Location) বর্ণনা করেছেন।
তবুও যদি বলেন তবে কেন মঠাচার্য 'জগদ্গুরুর' দল ঐ সব মূর্তিপূজা করেন, তার একমাত্র উত্তর তাঁদের সংস্কার বদ্ধতা এবং প্রচলিত সামাজিক বিধিবিধান পালন করে জনতার তুষ্টি বিধানের মনোবৃত্তিই এর জন্য প্রধানতঃ দায়ী। এইভাবে তাঁরা অদ্বৈতবেদান্ত এবং বহিরাচারকে জোড়াতালি দিয়ে আপোষরফা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। আমার যুক্তির অনুকূলে আরও কিছু প্রমাণ দিচ্ছি। 'ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্যশঃ। যজুর্বেদের (৩২/৩) এই বিখ্যাত মন্ত্রের অর্থ আচার্য অবগত ছিলেন একথা আশা করি, সকলেই স্বীকার করবেন। 'ন প্রতীকে ন হিঃ সঃ' ব্রহ্মসূত্রের ((8/9) / 8) মন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, জড়মূর্তি কোনমতেই নির্বিশেষ ব্রহ্মের প্রতীক হতে পারে না। 'মনকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করবে এটি আধ্যাত্মিক প্রতীক। আকাশ ব্রহ্ম এটি আধিদৈবিক প্রতীক ইত্যাদি' (শারীরিক ভাষ্যের অনুবাদ)। শুধু তাই নয়, গীতার ১৮অ/৫০ শ্লোকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির পদ্ধতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ যেখানে বলেছেন- 'সিদ্ধিং প্রান্তো যথা ব্রহ্মা তথাপ্নোতি নিবোধ মে' সেখানে সেই শ্লোকের ভাষ্য করতে গিয়ে জ্ঞান-ভাস্করের বক্তব্য কত স্পষ্ট শুনুন। যাঁরা নিরাকার পরমাত্মার বুদ্ধিতে ধারণার জন্য মূর্তির দরকার বলে থাকেন, তাঁদের সেই অসার যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে আচার্য কতকটা যেন উষ্ণ কণ্ঠেই বলছেন 'কেচিত্ব পণ্ডিতম্মন্যা নিরাকারত্মাদাত্মবস্তু নোপৈতি বুদ্ধিরতো দুঃসাধ্যা সম্যগ জ্ঞাননিষ্ঠেতাহা। সত্যমেবং গুরুসম্প্রদায়রহিতানাং অশ্রুতবেদান্তানাং অত্যন্তবহিবিষয়াসক্তবুদ্ধীনাম্ সম্যক্ প্রমাণেষকৃতশ্রমানাং কোন কোন পণ্ডিতম্মন্য বলে থাকে যে পরমাত্মা নিরাকার বলে তাঁকে মনুষ্যবৃদ্ধি ধারণা করতে পারে না। কাজেই দুঃসাধ্য। সতা বটে, যারা সদগুরুর কোনদিন সেবা করেনি, বেদান্ত শ্রবণ মননের সৌভাগ্য যাদের হয়নি, ন্যায়াদি প্রমাণ বিষয়ে কিছুমাত্র পরিশ্রম করে নি, সেই সব অত্যন্ত বহির্মুখ বিষয়াসক্তরাই তো ঐ রকম বলবে।" অর্থাৎ সাকার উপাসনা সম্বন্ধে যাঁর মন্তব্য এতই কঠোর, তিনি তাঁর মঠে পূর্ণাগিরি, শারদা ইত্যাদি পূজার নির্দেশ দিয়ে যাবেন এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। যিনি প্রকৃত আচার্য তিনি নিজে যা বলেন, কার্যতঃ তাই আচরণ করেন। শঙ্কর ছিলেন আচার্যানাং আচার্য্য তাঁর practice এবং preaching এর মধ্যে বিরোধিতা (Self-contradiction) ত আমি ভাবতেই পারি না।
বজ্রগতি যখন এই প্রকার, কীর্তিমান শঙ্করপন্থীদের হাতেই যখন শঙ্করের ভাবধারা এইভাবে বিপর্যস্তঃ এবং বিকৃত, তখন কোন গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে তাঁরই লেখা, তা নির্ণয় করা দুরূহ সন্দেহ নাই। তবুও আমার মতে এর একটি সহজ উপায় আছে। সবাই জানেন গ্রন্থ হল লেখকের মানস-দর্পণ। গ্রন্থের ভাবধারা দিয়েই চেনা যায় লেখককে এবং তাঁর লেখাকে। আদি শঙ্করাচার্যের ভাবধারাও তাঁর কৃত ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যে বিধৃত রয়েছে; বিধৃত রয়েছে তাঁর গীতা এবং উপনিষদগুলির ভাষ্যের মধ্যে, ভাষাবৃত তত্ত্বের নিগূঢ় তাৎপর্য বিদ্যারণাকৃত পঞ্চদশী, বাচস্পতি মিশ্রের ভামতী টীকা, মধুসুদন সরস্বতীর অদ্বৈতসিদ্ধিঃ নামক গ্রন্থ এবং আরও অনেক বার্তিক ও টাকা টীপ্পনীর মধ্যে অত্যন্ত যুক্তিসিদ্ধ ভাষায় আম্লাত রয়েছে। সেইগুলি দেখলেই এই অদ্বৈতবাদী পরমযোগীর জীবন-দর্শনের সম্যক্ পরিচয় পেতে কারও অসুবিধা হয় না। এখন যদি এইসব চিন্তাধারার বিপরীত কোন তত্ত্ব কোন গ্রন্থে দেখা যায়, তাহলে অবিলম্বে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে ঐ সব তথাকথিত গ্রন্থ শঙ্করের নামে। প্রচারিত ও প্রচলিত হলেও তা নিশ্চয়ই শঙ্করের নয়। এই ব্রহ্মাজ্ঞ মহাপুরুষের মহত্তম স্থিতি এবং সর্বোত্তম গতির কথা একবারটি চিন্তা করে দেখুন। যিনি বলতে পেরেছিলেন অহং নির্বিকল্পো নিরাকাররূপো বির্ভূব্যাপী সর্বত্র সর্বেন্দ্রিয়াণাম। ন বা বন্ধনং বৈ মুক্তির্ন ভীতিশ্চিদানন্দরূপঃ শিবোহহম্ শিবোহহম্।। ৬ যিনি অনুভব করেছিলেন (নির্বাণঘাটকম) 'আমি বিকল্পশূণ্য, সর্বত্রব্যাপ্তিহেতু, আমি নিরাকার, সকল সময়ে সকল ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্বন্ধরহিত হওয়ায় আমি ইন্দ্রিয়াতীত, আমার যুক্তি বা বন্ধনের বালাই নাই, আমি সচ্চিদানন্দ শিব অর্থাৎ স্বয়ং ব্রহ্মাস্বরূপ, যদর্কেন্দুবিদ্যুৎ প্রভাজালমালা বিলাসাম্পদং যৎ স্বভেদাদিশূনাম। সমস্তং জগদ যস্য পাদাত্মকং স্যাল্ যতঃ শক্তিভানং তদেবাহম্মি।। ১০ (নির্বণিমারী) 'যিনি সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যুৎপ্রভাসমূহের বিলাসের আশ্রয়, যিনি স্বগতাদিভেদশূণ্য, সমস্ত জগৎ যাঁর এক চতুর্থাংশস্বরূপ, যা হতে সমস্ত শক্তির উদ্ভব ও প্রকাশ ঘটে, আমি সেই ব্রহ্মস্বরূপ। 'যিনি পুনঃ পুনঃ ঘোষণা করে গেছেন- 'নির্বিকার, নির্বিশেষ, নির্গুণ, চৈতনাস্বরূপ পরমাত্মা কখনও দ্বৈতভাবে উপাস্য নন, কেবল অহং ইত্যাকার জ্ঞানেই উপলভ্য,' তাঁর পক্ষে কখনও কি ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ প্রকটিতবদনে কামরূপে করালে' ইত্যাদি বলে সগুণ দেবতার পূজাপাঠ বা স্তবস্তুতি রচনা সম্ভব। যিনি নির্গুণমানসপূজাতে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন- অখণ্ডে সচ্চিদানন্দে নির্বিকল্পৈকরাপিণি। স্থিতিহদ্বিতীয়ভাবেহস্মিন্ কথং পূজা বিধয়ীতে।। তিনিই আবার স্নাহা প্রত্যুষকালে রূপনবিধিবিধৌ নাহৃতং গাঙ্গতোয়ং, পূজার্থং বা কদাচিদবহুতরগহনাৎ খণ্ডবিশ্বদলানি।। নানীতা পদ্মামালা সরসি বিকশিতা গন্ধযুপৌ ত্বদর্থং ক্ষন্তব্যোমেহপরাধঃ শিব শিব শির ভোঃ শ্রীমহাদের শন্তো।' (শিবপারবভঞ্জন ডোত্র)
ইত্যাদি বাহ্যপূজামূলক স্তোত্রাদি রচনা করেন কি করে। অত্যন্ত সহজ বুদ্ধিতেই ধরা পড়ে, প্রথমটি শঙ্কর-রচিত হলে দ্বিতীয়টি নিশ্চয়ই তিনি লেখেন নি। 'নির্গুণমানসপূজা' যে আদি শঙ্করাচার্যের লেখা, সে কথা সকল পণ্ডিতরাই স্বীকার করেন। কাজেই শিবপরাধভঞ্জন' স্তোত্রটি শঙ্কর-রচিত নয়, একথা বলাই বাহুল্য মাত্র। নিজের ইস্টের প্রাধান্য স্থাপনের জন্যই কোন শিবভক্ত শঙ্করাচার্যের নাম অপব্যবহার করেছেন।
দীর্ঘকাল ধরেই এই অপকার্য চলে আসছে। আমি পূর্বেই বলেছি সম্প্রদায়ীদের নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার দুরভিসন্ধি ছাড়াও এর মূলে আরও একটি কারণ রয়েছে, তার নাম দিয়েছি অতিভক্তির জলাভূমি। ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির গবেষক মাত্রেই জানেন যে প্রাচীনকালে শুরুগতপ্রাণ শিষ্যরা গ্রন্থ রচনা করে স্বীয় গুরুদেবের নামে উৎসর্গ করতেন গুরুর নামেই তা প্রকাশ করতেন। এই পদ্ধতি শুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা সন্দেহ নাই কিন্তু ব্রহ্মবিদ্‌ শুরু নিজে ভূমার ভূমিতে উঠে আপন উপলব্ধ সত্য যেমন ভাবে প্রকাশ করতে পারেন তেমনিভাবেই তাঁর কোন শিষ্যের পক্ষে তা কখনও নির্ভুলভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রশিষ্যরা প্রকাশ করলে ত আর কথাই নাই।আদিগুরুর ভাবধারার সঙ্গে তাঁদের ভাবধারার উপলব্ধিগত তারতম্য ঘটতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, নানক ও কবীরের কথা চিন্তা করে দেখুন। বিখ্যাত 'গ্রন্থসাহেবের' সকল চৌপাই বা দৌহা নানকের স্বরচিত নয়। তাঁর তিরোধানের পর গুরু অঙ্গদ হতে আরম্ভ করে শুরু অর্জুনদেব, হরকিষণজী, শুরু গোবিন্দ সিং প্রভৃতি অপর ৯ জন গুরুর বহু উপদেশও 'নানক কহে' এই বয়ানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কবীরের নামে যে অজস্র দোঁহা প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটি কবীরের রচিত নয়। তাঁর শিষ্য প্রশিষ্য রচিত দোঁহাও 'কহত কবীরা শুন ভাই সাধু'। বলে কবীরের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঐ সব দোঁহাতে যে স্থানে স্থানে ভাববিভ্রাট এবং তত্ত্বগত বিভ্রাট ঘটেছে তা যেকোন বিচারশীল পাঠকের চোখে ধরা পড়বে।
জ্ঞানগুরু শঙ্করের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য। ভারতবর্ষে আদি শঙ্করাচার্য ছাড়াও আরও অনেক 'শঙ্করের' সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি পূর্বেই এক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্যের কথা বলেছি। আচার্য প্রতিষ্ঠিত প্রধান চারটি মঠের মোহান্ত মাত্রেই শঙ্করাচার্য নামে অভিহিত হয়ে আসছেন অর্থাৎ তাঁরা প্রত্যেকেই 'শঙ্কর'। শৃঙ্গেরী মঠের গুরু পরম্পারাতেও বিদ্যাশঙ্কর ও ভারতীশঙ্কর নামে দুজন প্রসিদ্ধ 'শঙ্কর' ছিলেন। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের 'ত্রিপুরাতন্ত্রর' নামে একখানি গ্রন্থ আছে। ঐ গ্রন্থমতে শঙ্করাচার্যে ১৪ জন শিষ্য ছিলেন, তার মধ্যে ৫ জন সন্ন্যাসী এবং ৯জন গৃহী। ঐ ৫ জন সন্ন্যাসী শিষ্যের মধ্যে একজনের মূল নামই ছিল 'শঙ্কর'। এ ছাড়া কাজী-কামকোটি পীঠের গুরুপরম্পরাতে কৃপাশঙ্কর, উজ্জ্বলশঙ্কর, মুকশঙ্কর এবং অভিনবশঙ্কর নামেও কয়েকজন বিদ্বান্ সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটেছিল। অভিনবশঙ্করের তিরোভাব কাল ৮৪০ খৃষ্টাব্দ। আর আদি শঙ্করাচার্যের তিরোভাব কাল ৮২০ খৃষ্টাব্দ। অর্থাৎ আদি শঙ্করাচার্যের সমসাময়িক কালে ত বটেই তাঁর তিরোভাবের পরও কিছুকাল ঐ অভিনবশঙ্কর বর্তমান ছিলেন। এই সমস্ত 'শঙ্করের' রচিত অনেক গ্রন্থই নামসামা হেতু আদি শঙ্করের নামে প্রচলিত হয়ে আসছে বলে আমার ধারণা। বিশেষতঃ শঙ্করের নামে প্রচলিত যাবতীয় শক্তিবিষয়ক স্তবস্তুতি যে পূর্বোক্ত কৌলসাধক গৌড়ীয় শঙ্করাচার্য এবং ত্রিপুরাতন্ত্রোক্ত শঙ্করের দ্বারা রচিত হয়েছে, সে বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নাই। কবীর নানকের শিষ্য প্রশিযারা যেমন স্ববর্তিত রচনা স্ব স্ব গুরুবর্গের নামে প্রকাশ করে স্বেচ্ছায় আত্মবিলোপ ঘটিয়েছেন, তেমনি ঐ সমস্ত 'শঙ্কর মহারাজরাও' কেউ নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আবার কেউ বা গুরুভক্তির পরাকাষ্ঠা স্বরূপ নিজেদের রচনা আদি শঙ্করাচার্যের নামে স্বেচ্ছায় প্রচলিত করে থাকতে পারেন। তার ফলে তাঁদের ভাবধারাও শঙ্করাচার্যের ভাবধারা বলে অবলীলাক্রমে ভ্রমবশতঃ পরিগৃহীত ও পরিগণিত হয়ে আসছে।
এমতাবস্থায় গুরুমুখী বা হিন্দী ভাষায় রচিত যে কোন দোঁহার অন্তে 'নানক কহে' কিংবা 'কহত কবীরা' থাকলে তাকে যেমন নিঃসংশয়ে নানক বা কবীরের রচিত বলা যায় না, তেমনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত যে কোন গ্রন্থের অন্তে ইতি শ্রীমদ্ভগবৎ-পূজ্যপাদ-গোবিন্দপাদাচার্যশিষ্য-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য-শ্রীশঙ্করভগবৎপূজ্যপাদ বিরচিতং' ইত্যাদি ছাপা থাকলেই তা স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্যের দ্বারা লিখিত একথা বলা যুক্তিসঙ্গত নয়, এই হল আমার সিদ্ধান্ত। অলমিতি।
📚 গ্রন্থসূত্র:
তপোভূমি নর্মদা সপ্তম খণ্ড
(শ্রী শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী)

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঈশ্বরের অবতার কি সম্ভব ?

প রমাত্মা অনন্ত শক্তিযুক্ত অজন্মা, নিরন্তর, সদা যুক্ত, ন্যায়কারী, নির্মল, সর্বজ্ঞ, সকলের সাক্ষী, নিয়ন্তা, অনাদিস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনি সর্বব্যাপ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ