আক্ষেপ: “বেদে পিতা-কন্যার স*ঙ্গমের অনুমতি আছে”—দাবিটি কি সত্য?
সম্প্রতি একটি লেখায় ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর কিছু অনুবাদ দেখিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, বেদ ও উপনিষদে পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে এবং তাই হিন্দুসম্প্রদায়ে Incest বা নিকট আত্মীয়ের মধ্যে যৌ*ন সম্পর্ক অনুমোদিত।
এই দাবির ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কোনো অনুবাদে “father”, “daughter”, “union”, “seed” ইত্যাদি শব্দ এসেছে বলেই সেই অনুবাদই মূল বৈদিক অর্থের একমাত্র অর্থ হয়ে যায় না। বৈদিক মন্ত্রের অর্থ নির্ধারণে মূল সংস্কৃত, পদার্থ, অন্বয়, নিরুক্ত ও ভাষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭-এর ক্ষেত্রে দুটি বৈদিক ভাষ্য দেখি। 
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫):
প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ।
পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ ৫॥
পদার্থ— (য়স্য) যে রুদ্র নামী প্রজাপতি অগ্নির (ইষ্ণদ্) ঈক্ষণযুক্ত (বীরকর্মম্) উৎপাদন কর্ম (প্রথিষ্ঠ) প্রথিত হয় সেই (অনুস্থিতম্) স্থাপিত এবং স্থিত হওয়া উৎপাদন কর্মকে (অনর্বা) দৃঢ় (নর্য়ঃ) মনুষ্য আর দেবগণের হিতকারক পার্থিব অগ্নি (নু) নিশ্চয়ই (অপ, ঔহৎ) লুকিয়ে রাখে (তৎ) সেটা (পুনঃ) আবার (আবৃহতি) চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এটাই হল সেই তত্ত্ব (য়ৎ) যা (কনায়াঃ) উজ্জ্বল (দুহিতুঃ) দ্যুলোক থেকে (অনুভৃতম্) গ্রহণ করা হয়েছে (আঃ) হয়।
ভাবার্থ— প্রজাপতি রুদ্র=অগ্নির উৎপাদন শক্তি বিস্তার লাভ করে। তার দ্বারা স্থাপিত উৎপাদন শক্তি রূপ তেজকে দৃঢ় আর নর তথা দেবগণের হিতকারী পার্থিব অগ্নি নিজের ভেতরে ঢেকে রাখে আর সেই তেজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বস্তুতঃ এটা সেই তেজ, যা দ্যুলোক থেকে গ্রহণ করা হয়।
আক্ষেপে H.H. Wilson-এর ইংরেজি অনুবাদ এবং পণ্ডিত রাম গোবিন্দ ত্রিবেদীর হিন্দি ব্যাখ্যা দেখিয়ে পিতা-কন্যার যৌন সম্পর্কের অর্থ করা হয়েছে।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়।
তিনি এখানে—
“দুহিতুঃ” — দ্যুলোক/ঊর্ধ্বলোকের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
“কনায়া” — উজ্জ্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
এবং সমগ্র মন্ত্রকে প্রজাপতি রুদ্র/অগ্নির উৎপাদনশক্তি ও তেজের বিস্তার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর ভাবার্থের সারকথা:
প্রজাপতি রুদ্ররূপ অগ্নির উৎপাদনশক্তি বিস্তার লাভ করে। সেই তেজ পার্থিব অগ্নির মধ্যে ধারণ হয় এবং পরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এটি দ্যুলোক থেকে গৃহীত তেজ।
অর্থাৎ এখানে পিতা-কন্যার কোনো মানবীয় যৌন সম্পর্কের বর্ণনা নেই।
আক্ষেপে বলা হয়েছে—পিতা ও যুবতী কন্যা মিলিত হয়ে শুক্রপাত করলেন।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ব্যাখ্যায়—
পিতা = সূর্য
যুবতী = ঊষা/দ্যুলোক
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
এবং তাঁর ভাবার্থ অনুযায়ী:
আদিত্য ও ঊষা/দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে অরুণ কিরণরূপ তেজের প্রকাশ ঘটে এবং দিনের উৎপত্তি হয়।
অর্থাৎ এখানে “রেতঃ” শব্দটিকে মানুষের যৌন বীর্য ধরে নেওয়াই মূল সমস্যা।
বৈদিক ভাষ্যে একই শব্দ প্রসঙ্গভেদে তেজ, শক্তি, সৃষ্টিশক্তি, বীজ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬):
মধ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃণ্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্ ।
মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ।।৬॥
পদার্থ - (কামম্) ইচ্ছামতো (পিতরি) সূর্য (য়ুবত্যাম্) দ্যুলোক বা ঊষার (কৃণ্বানে) করার পর (য়ৎ) যে (কর্ত্বম্) কর্ম (মধ্যা) অন্তরিক্ষের মধ্যে (অভীকে) তাদের নিকট (অভবৎ) হয়েছিল বা হয় তাতে (মনানক্) সামান্য (রেতঃ) অরুণ কিরণ নামক তেজকে (বিয়ন্তা) পরস্পর অভিগমনকারী দুইজনে (জহতুঃ) ছেড়েছিল বা ছাড়ে। এটা হল সেই তেজ যাকে প্রজাপতি সূর্য দ্বারা (সুকৃতস্য) উত্তম কর্মের (সানৌ) উঁচু (য়োনৌ) স্থান দ্যুলোকে (নিষিক্তম্) নিষিক্ত থাকে।
ভাবার্থ- আদিত্য আর ঊষা বা দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে যে কর্ম হয়, তাতে আদিত্য অরুণ কিরণ নামক তেজকে ঊষা বা দ্যুলোকের মধ্যে ছেড়ে দেয় আর দিনের উৎপত্তি হয়। সূর্যের এই তেজ দ্যুলোকের মধ্যে ভরা থাকে।
আক্ষেপে বলা হয়েছে:
“When the father u*nited with the daughter…”
কিন্তু স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজকের ভাষ্যে—
পিতা = আদিত্য/সূর্য
দুহিতা = ঊষা/দ্যুলোক
ক্ষ্মা = পৃথিবী
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
তাঁর ব্যাখ্যার মূল বক্তব্য:
আদিত্য যখন ঊষা বা দ্যুলোককে অভিব্যাপ্ত করে এবং পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে তার তেজ আকাশে সঞ্চার করে, তখন সেই তেজ থেকে দিনের প্রকাশ ও অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।
এখানে আবারও মানব পিতা নিজের জৈবিক কন্যার সঙ্গে যৌ*ন সম্পর্ক করছে- এমন অর্থ অপরিহার্য নয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭):
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ক্ষ্ময়া রেতঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ।
স্বাধ্যোऽজনয়ন্ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ॥৭॥
পদার্থ— (পিতা) প্রজাপতি আদিত্য (য়ৎ) যখন (স্বাম্) নিজের (দুহিতরম্) ঊষা অথবা দ্যুলোককে (অধিষ্কন্) প্রাপ্ত করেন তখন (ক্ষ্ময়া) পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে (রেতঃ) নিজের অরুণ কিরণ নামক তেজকে (নিসিঞ্চৎ) আকাশে সেচন করেন তখন (স্বাধ্যঃ) ভালোভাবে প্রকট (দেবাঃ) দিব্য শক্তিগুলো - সূর্যকিরণগুলো (ব্রহ্ম) অগ্নিকে (অজনয়ন্) উৎপন্ন করে আর তাকে (ব্রতপাম্) ব্রতের পালক (বাস্তোঃ, পতিম্) বাস্তোষ্পতি রুদ্র নামক অগ্নিকে (নিঃ, অতক্ষন্) নির্মিত করে।
ভাবার্থ— আদিত্য যখন দ্যুলোক অথবা ঊষাকে অভিব্যাপ্ত করে, তখন পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে আকাশে তেজ সেচন করে, সেটা থেকে দিনের প্রকাশ অগ্নি ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। এই অগ্নিকে বাস্তোষ্পতি রুদ্র-অগ্নি বলা হয়।
আক্ষেপে স্বামী মাধবানন্দের অনুবাদ এবং শঙ্করাচার্যের ভাষ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে—
Manu/Viraj তাঁর কন্যা Śatarūpā-র সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং সেখান থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়।
এখানে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে “daughter called Satarupa” এবং তাঁর সঙ্গে union-এর একটি আক্ষরিক বর্ণনা পাওয়া যায়—এটি গোপন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এখান থেকেও সরাসরি এই সিদ্ধান্ত: “হিন্দুধর্ম (সম্প্রদায়ে) পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্ককে নৈতিকভাবে অনুমোদন করেছে”—এটি একটি অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত। কারণ সৃষ্টিতত্ত্বের পৌরাণিক/দার্শনিক রূপক এবং সাধারণ মানুষের জন্য নৈতিক বিধান এক জিনিস নয়।
আক্ষেপকারী বলছেন— “বেদে Incest নিষিদ্ধ করার একটি মন্ত্র দেখান।”
কিন্তু কোনো গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের নাম করে নিষেধ না থাকলেই কি সেই কাজ অনুমোদিত হয়ে যায়?
উদাহরণস্বরূপ—
“বেদে অমুক নির্দিষ্ট অপরাধের নাম নেই”
“বেদ অমুক অপরাধকে অনুমোদন করেছে।”
অনুমোদনের দাবি করতে হলে অনুমোদনকারী বিধান দেখাতে হবে।
ঠিক একইভাবে কোনো মন্ত্রের একটি বিতর্কিত অনুবাদ পাওয়া গেলেই বেদ Incest অনুমোদন করেছে— এটি প্রমাণিত হয় না।
বৈদিক সাহিত্যে ব্রহ্মচর্য, ইন্দ্রিয়সংযম ও সংযত জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন অথর্ববেদ ১১.৫ সূক্তে বারবার ব্রহ্মচর্য-এর মাহাত্ম্য এসেছে।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে রাজা রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন—এই আদর্শ এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে কন্যা উপযুক্ত যুবককে স্বামী হিসেবে লাভ করে।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে দেবগণ মৃত্যুকে অতিক্রম করেছেন—এমন ভাব প্রকাশ করা হয়েছে।
এখানেও ব্রহ্মচর্যের ধারণা উপস্থিত।
অতএব বৈদিক আদর্শকে “যৌন অবাধতা” হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।
আরেকটি আপত্তি: “বেদে এমন শব্দ কেন থাকবে?”
এখানে বৈদিক যৌগিক শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ বুঝতে হবে।
যেমন “অগ্নি” শব্দটি কেবল রান্নার আগুন বোঝায় না; বৈদিক ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গ অনুযায়ী তাপ, আলো, বিদ্যুৎ, শক্তি, বিদ্বান, রাজা ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।
একইভাবে “যো*নি” শব্দের অর্থ সব ক্ষেত্রে কেবল নারীর যৌ*নাঙ্গ নয়। ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২-এর ব্যাখ্যায় মহর্ষি যাস্ক— “যো*নিরন্তরিক্ষম্” বলেছেন—অর্থাৎ অন্তরীক্ষকেও “যো*নি” বলা হয়েছে।
কারণ “যো*নি” শব্দের মূল ধারণার মধ্যে উৎপত্তিস্থান, আশ্রয়, উৎস ইত্যাদি অর্থ রয়েছে।
সুতরাং— একটি শব্দ আধুনিক প্রচলিত যৌ*ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে বলেই বেদের প্রতিটি স্থানে সেই যৌ*ন অর্থ বসিয়ে দেওয়া যায় না। এটাই ভাষাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম।
উক্ত মন্ত্রে স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক ভাষ্য—
প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ। পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ট) য়স্য গৃহস্থস্য পুত্রকর্ম পুত্রার্থকর্ম বীর্য়সেচনম্ 'পুত্রো বৈ বীরঃ' [শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২] প্রথিতম্ প্রথতে বা (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপেণ প্রাপ্তম্ 'ইষ্ণন্ প্রাপ্নুবন্' [ঋগ্বেদ ৪.১৭.৩ দয়ানন্দঃ] সেবিতম্ সেবায়াম্ সফলীভূতম্ য়ুবানম্ (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) পুনস্তম্ স সমন্তাদুদ্যচ্ছতি পুত্রোৎপাদনেন (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরেভ্যো হিতো হিতকরঃ সন্ সর্বকার্য়ভারম্ ত্যজেৎ (য়ৎ) য়তঃ (কনয়াঃ-দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) কান্তায়াঃ সন্তানদোহনয়োগ্যায়াঃ পত্ন্যাঃ-আনুকূল্যেন ধারিতমাসীৎ (অনর্বা) স্বস্মিন্ সমর্থাऽনন্যাশ্রমী জাতঃ ।
ভাষান্বয়ার্থ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ঠ) যে গৃহস্থের পুত্রকর্ম-পুত্র উৎপাদনের জন্য কর্ম বীর্য সেচন দ্বারা প্রথিত-পুষ্ট হয় (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপে প্রাপ্ত সফলীকৃতকে (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) তারপর তাকে সে ভালোভাবে উৎসাহিত করে পুত্র উৎপাদনের দ্বারা (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরদের অবশ্যই হিতকর হয়ে সব কার্যভার ত্যাগ করে (য়ৎ) যার দ্বারা (কনায়াঃ দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) সন্তান দোহন যোগ্য-উৎপাদন যোগ্য কান্তার অনুকূলতায় ধারণ করা হয় (অনর্বা) নিজের মধ্যে সমর্থ স্বাশ্রয়ী হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ — গৃহস্থের লক্ষ্য হল সন্তান উৎপাদন করা, তদর্থ বীর্য সেচন করার পর কমনীয় সন্তানকে দোহনকারী পত্নীতের মধ্যে সেটা পুষ্ট হয়ে সন্তানের রূপে উৎপন্ন হয় আর সে যুবক হয়ে যায়। তখন পিতা তাকে পুত্র পরম্পরা চালানোর জন্য উৎসাহিত করে। যখন সেই পুত্র পুত্রবান হয়ে যায়, তখন আবার তার পিতা গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে, অন্য মানুষদের হিত কর্ম করার জন্য।
.
মথ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃন্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্। মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) য়দা য়ুবত্যাম্ ভাৰ্য়ায়াম্ পুত্ৰোৎপাদনকৰ্ত্তব্যম্ পূৰ্ণম্ ভবতি (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবতি পিতরি তদাশ্রমে পুত্ৰস্য পুত্ৰোৎপাদনম্ কামম্ কুৰ্বতি সতি তৎসম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ- জহতুঃ) বিশিষ্টতয়া প্ৰাপ্নুবন্তৌ পতিপত্ম্যৌ-অল্পাঃ প্ৰজাস্তু ত্যজতাম্ 'রেতঃ প্ৰজাঃ' [ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৩] (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মণঃ পিতৄণ্যস্য প্ৰতীকারায় গৃহে গৃহাশ্রমে বিভক্তে জগতে নিষক্তম্ নিষেচনীয়ম্ কৰ্ত্তব্যম্ ভৱতি 'সানৌ বিভক্তে জগতি' [ঋগ্বেদ ১.১৪৬.২ দয়ানন্দঃ]।
.
ভাষান্বয়াৰ্থ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) যখন যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদন থেকে কৰ্তব্য পূৰ্ণ হয়ে যায় (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবিত পিতার মধ্যে - তার আশ্ৰয়ে পুত্ৰের পুত্ৰ উৎপাদনের কামনা হয়ে গেলে তার সম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ জহতুঃ) বিশিষ্টতা থেকে প্ৰাপ্ত হতে থাকা পতি পত্নী অল্প সন্তানদের তো ত্যাগ করবেন - উৎপন্ন করবেন (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মের অৰ্থাৎ পিতৃ ঋণের প্ৰতীকার হয়ে যাওয়ার পর গৃহাশ্ৰমে বিশেষ সেবন করার যোগ্য জগতে নিষেক করা কৰ্তব্য হয়।
.
ভাবাৰ্থ - যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদনের জন্য বীৰ্য নিষেক করা কৰ্তব্য হয়। পিতা জীবিত থাকাকালীন অন্ততঃ প্ৰজা তো অবশ্যই উৎপন্ন করবে। এর জন্য গৃহস্থ আশ্ৰম হল পুণ্যের স্থান। বিশেষ সেবনীয় জগতে সন্তান পরম্পরার জন্য নিষেক করা আবশ্যক হয়। এটা হল গৃহস্থাশ্ৰমের পরম্পরা।
.
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ ক্ষ্ময়া তঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ। স্বাধ্যোऽজনয়ন্ ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ।। (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭)
সংস্কৃতান্বয়ার্থঃ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানস্য ভূমিরূপয়া ভার্য়য়া সঙ্গচ্ছমানঃ (রেতঃ-নিষিঞ্চন্) বীর্য়ম্ গর্ভাধানরূপেণ নিষিঞ্চন্ সন্ (পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন্) পিতা স্বাম্ কন্যাম্ প্রাপ্নোতি-উত্পাদয়তি 'স্কন্ নিস্সারয়তু' [য়জুর্বেদ ১.২৬ দয়ানন্দঃ] 'স্কন্দন্তি-প্রাপ্ত হয়' [ঋগ্বেদ ৫.৫১.৩ দয়ানন্দঃ ] ন তু পুত্রম্ (স্বাধ্যঃ দেবাঃ- ব্রহ্ম জনয়ন্) সু-আধ্যাতারঃ-দূরদর্শিনো বিদ্বাংসো জ্ঞানম্ প্রাদুর্ভাবয়ন্তি মন্যন্তে ঘোষয়ন্তি (বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন্) য়ৎ তাম্ কন্যাম্ গৃহস্য পতিম্ স্বামিনীম্ কর্মপালিকাম্ পিতৃকর্মরক্ষিকাম্ নির্ধারয়ন্তি ।
ভাষান্বয়াৰ্থ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানের ভূমিরূপ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে তথা ( রেতঃ-নিষিঞ্চন ) গর্ভাধান রীতিতে বীর্য সেচন করে ( পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন ) পিতা তার কন্যাকে প্রাপ্ত করেন - উৎপন্ন করেন - পুত্র প্রাপ্ত করেন না, তখন ( স্বাধ্যঃ-দেবাঃ-ব্রহ্ম জনয়ন ) দূরদর্শী বিদ্বান জ্ঞানকে - গৃহস্থ জ্ঞানকে নিয়মকে প্রকট করেন, ঘোষিত করেন ( বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন ) সেই কন্যাকে গৃহপতি - ঘরের স্বামী রূপে পিতৃকর্মের রক্ষিকা নির্ধারিত করেন।
ভাবার্থ — যদি পুরুষের স্ত্রী সহবাস অর্থাৎ বীর্যসেচন করার পর পুত্রকে না প্রাপ্ত করে কেবল কন্যাকে প্রাপ্ত করে, তখন সেই কন্যা পিতৃকর্মের রক্ষিকা তথা পিতার ঘরের সম্পত্তির স্বামী হয়। বেদের পরম্পরা এবং বৈদিক বিদ্বানদের মান্যতা হল এটা।
বেদের স্বাভাবিক (অর্থ) কেবল আধিদৈবিকই হয়, বাকি দুই প্রকারের ভাষ্য ভাষ্যকারীর রুচি ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করে আর সেগুলো থেকে সমাজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ লাভ করে। এই দুই বিদ্বানই আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর আধিদৈবিক ভাষ্য সাধারণ স্তরের, তবুও আক্ষেপকারীর আক্ষেপকে নির্মূল করতে সক্ষম আছে। এই বিদ্বানদের ভাষ্য পড়ে কোনো সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই মন্ত্রগুলোর উপর কোনো আক্ষেপ করতে পারবে না। এই মন্ত্রগুলোর বাস্তবিক বিজ্ঞানের বোধ কেবল আমার বেদভাষ্য থেকেই হওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে বেদের মধ্যে এমন ভাষায় উপদেশ কেন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে নানা প্রকারের অবাঞ্ছিত যৌন সম্পর্কের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় অর্থাৎ কিছু মন্ত্রের এমনও অর্থ হতে পারে, যা অশ্লীল হবে? এর উত্তর জানার জন্য বেদ তথা ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। বেদ সেই ভাষায় আছে, যে ভাষা বেদের উৎপত্তি অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে চার ঋষির দ্বারা আকাশ থেকে বৈদিক ঋচার রশ্মিকে গ্রহণ করার পূর্বে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল না।
বেদের তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রন্থের সাথে করা যায় না। পৃথিবীর অন্য সব গ্রন্থ সেই ভাষায় লেখা হয়েছে, যে ভাষা সেই গ্রন্থগুলো লেখার পূর্বে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, কোরআন লেখার পূর্বে আরবি ভাষা আরবে প্রচলিত ছিল। আরবি ভাষা আরবদের কথ্য-ভাষা ছিল। একইভাবে অন্যান্য সব গ্রন্থের ক্ষেত্রেও এটাই বুঝুন, কেবল বেদই হল এর ব্যতিক্রম।
সারমর্ম হল অন্যান্য গ্রন্থের ভাষাগুলো সংসার থেকে সেই গ্রন্থগুলোতে গেছে। কিন্তু বেদ থেকে সংসারে ভাষা ও জ্ঞান উভয়েরই উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে যে শব্দগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যে অর্থে সেগুলো সেই অঞ্চলে বলা হয়, অথচ বেদের মধ্যে এমনটা আবশ্যক নয়। এই কারণে সংসারে প্রচলিত অর্থ দেখে বৈদিক পদের অর্থ করা আনাড়ি কাজ হবে, যেটা বেশিরভাগ ভাষ্যকার করেছেন। বৈদিক শব্দগুলোর অর্থের বোধ শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত ও নিঘন্টুর আধারেই হওয়া সম্ভব। এরমধ্যেও এই বিষয়টা ধ্যানে রাখতে হয় যে বেদের পদগুলো শুধুমাত্র য়ৌগিকই হয়, রূঢ় নয়।
আমি এখানে শব্দের তিনটা প্রকার স্পষ্ট করবো -
১. রূঢ় - এমন শব্দ, যা কোনো প্রকৃতি-প্রত্যয়ের নিশ্চয়তা ছাড়াই সমাজে প্রচলিত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, 'খাট' শব্দটা চারপাই (খাট) বোঝাতে সমাজে ব্যবহৃত হয়। এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই।
২. য়োগরূঢ় - এমন শব্দ, যা নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয়, কিন্তু সেগুলো কোনো বিশেষ বস্তুর জন্যই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, নীরজ, বারিজ আদি। এগুলোর অর্থ হল- জলে উৎপন্ন বস্তু, কিন্তু জলে উৎপন্ন প্রত্যেকটা পদার্থ, উদ্ভিদ বা প্রাণীকে নীরজ অথবা বারিজ বলা যায় না, শুধুমাত্র কমলের জন্যই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।
৩. য়ৌগিক - যেসব শব্দ নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয় অথবা যেগুলোর অর্থের ভিত্তিতে তাদের ব্যাখ্যা করা যায়। এই শব্দগুলো কোনো বিশেষ পদার্থের জন্য কখনও ব্যবহৃত হয় না, বরং প্রসঙ্গ অনুযায়ী অনেক পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, 'অগ্নি' পদ প্রকৃতি-প্রত্যয় থেকেও উৎপন্ন হয়। এছাড়া মহর্ষি য়াস্ক নিরুক্তের মধ্যে এর বিস্তারিত নির্বচন করেছেন। প্রসঙ্গ অনুসারে এর অনেক অর্থ হওয়া সম্ভব, যেমন- প্রাণ, তাপ, বিদ্যুৎ ও আলো আদিতে যুক্ত পদার্থ, রাজা, সেনাপতি, বিদ্বান, আত্মা ও পরমাত্মা। বেদের মধ্যে সমস্ত পদ এই প্রকারের হয়, এই কারণে বৈদিক পদের কেবল এক প্রকারেই অর্থ করা অজ্ঞানতা হবে। বেদের মধ্যে 'অগ্নি' পদ দেখে মানুষ সমাজে আগুনে 'অগ্নি' নাম দিয়েছে, কারণ আগুনের মধ্যে তাপ ও আলো আদির গুণ বিদ্যমান থাকে।
একইভাবে বেদের (ঋগ্বেদ ৩.২৭.৪) মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' শব্দটি আছে। এর বিষয়ে শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.৩.৯ মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন-
'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্ শিশ্নম্ হীদম্ শিশ্নিনম্ ভূয়িষ্ঠম্ শোচয়তি ।'
এখানে 'কেশ' শব্দের বিষয়েও জানা আবশ্যক। নিরুক্ত ১২.৩৬ মহর্ষি য়াস্ক লিখছেন-
'কেশা রশ্ময়ঃ'
তৈত্তিরীয় সংহিতার (৭.৫.২৫.১) মধ্যে বলা হয়েছে-
'রশ্ময়ঃ কেশাঃ'
এইভাবে শিশ্ন সেই বস্তুকে বলা হয়, যার রশ্মি তেজস্বী হয়। এইভাবে যে কোনও নক্ষত্র, যার মধ্যে আমাদের সূর্যও সম্মিলিত আছে, শোচিষ্কেশ নামে পরিচিত হবে। এর কারণ হল তাদের রশ্মিগুলো তেজস্বী হয়।
'শোচিষ্কেশ' -এর মধ্যে 'শুচ্' ধাতু শোক করার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং 'শোচতি জ্বলতিকর্মা' (নিঘন্টু ১.১৬) থেকে জ্বালাতে ও তেজস্বী হওয়ার অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই থেকেই 'শোচিষ্কেশ'-এর অর্থ নক্ষত্র প্রমাণিত হয়। এইভাবে 'শিশ্ন' -এর অর্থও নক্ষত্র হয়। এখানে 'শোচিষ্কেশঃ'-এর মধ্যে বহুব্রীহি সমাস মানলে এই অর্থ হয়। যদি এখানে কর্মধারয় সমাস মানা হয়, তাহলে তেজস্বিনী কিরণই 'শোচিষ্কেশ' এবং শিশ্ন বলা হবে তথা নক্ষত্রকে শিশ্নিন যুক্ত বলা হবে। 'শিশ্ন'-এর অন্য নির্বচন মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে করেছেন - যেটা শিশ্নযুক্তকে প্রভূত মাত্রায় প্রকাশিত করে। এর অর্থ হল শিশ্নী নক্ষত্র বলা হবে, কারণ নক্ষত্রকে তার শিশ্নরূপী কিরণই প্রকাশিত করে অর্থাৎ দর্শায়।
এখানে 'শিশ্ন' শব্দ, যেটা বেদের মধ্যে সূর্য বা সূর্যের কিরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটা দেখে মানব সমাজ পুরুষেন্দ্রিয়েরও 'শিশ্ন' নাম সেই সময় রাখে, যখন তার কোনো নাম ছিল না অর্থাৎ সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে। পুরুষের উপস্থও মানুষকে সন্তান উৎপন্ন করার চিন্তায় যুক্ত করে আর কামুক পুরুষদের এই ইন্দ্রিয়ই অন্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় সর্বাধিক দুঃখী ও অস্থির করে তোলে। এখানে 'শুচ্' ধাতু শোক করা অর্থেও ব্যবহৃত হয় আর জ্বালানো অর্থে গ্রহণ করলে কামাগ্নির প্রচণ্ডতা সর্বজনবিদিত।
এখন এখানে সুলেমান রিজভীর মতো বেদবিরোধী বলবেন যে বেদের মধ্যে সূর্যকিরণ বা সূর্যের জন্য 'শিশ্ন' বা 'শিশ্নী'-র প্রয়োগ কেন হয়েছে? এই মূর্খতাপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত রিজভী মহাশয় বুঝে গেছেন। এখানে শতপথ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতির পূর্বভাগ 'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্' লোকপ্রচলিত শিশ্নের জন্য না হয়ে কেবল নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই কথা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বেদের পাশাপাশি শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' এবং 'শিশ্ন' পদ পুরুষের উপস্থের জন্য নয়, বরং নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃতির কিছু অংশের সাদৃশ্য থেকে সমাজে পুরুষেন্দ্রিয়ের নাম শিশ্ন রেখে দেওয়া হয়।
একইভাবে "য়োনিঃ শব্দ বেদের মধ্যে অন্তরীক্ষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটা উদাহরণ মন্ত্র আছে -
য় ঈম্ চকার ন সো অস্য বেদ য় ঈম্ দদর্শ হিরুগিন্নু তস্মাৎ । স মাতুর্য়োনা পরিবীতো অন্তর্বহুপ্ৰজা নির্ঋতিমা বিবেশ ॥ (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২)
এর ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার মহর্ষি য়াস্কের উক্তি হল—
"য়োনিরন্তরিক্ষম্ মহানবয়বঃ পরিবীতো বায়ুনা।'
অর্থাৎ অন্তরীক্ষকে (আকাশ) য়োনি বলা হয়, যার খুব বড় অংশ বায়ু দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। এই পদ 'য়ু মিশ্রণেऽমিশ্রণে চ' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদ বেদের মধ্যে য়ৌগিক শব্দ হয়, যা অন্য আরও কিছু পদার্থের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকেই লোকসমাজে স্ত্রীর জননেন্দ্রিয়ের জন্যও এই শব্দ প্রচলিত হতে শুরু করে। তার পূর্বে এই অঙ্গের কোনো নামই ছিল না, কারণ সংসারে ভাষার উৎপত্তি বেদ থেকেই হয়েছে। এই অঙ্গও মাংসপেশী, রক্তনালী, স্নায়ু আদি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকার কারণে য়োনি নামে পরিচিত হয়। মূলত এই শব্দ আকাশ আদির জন্য হয়, বিশেষ করে বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মধ্যে।
এখন যদি কোনো কামুক ব্যক্তি বেদাদি শাস্ত্রের মধ্যে শিশ্ন ও য়োনি শব্দ দেখা মাত্র তাতে অশ্লীলতার অভিযোগ করে, তাহলে সেই অশ্লীলতা তার মস্তিষ্কে ভরা আছে, শাস্ত্রের মধ্যে নয়। কোনো গ্রন্থের মধ্যে শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞানের প্রসঙ্গে যদি লোকপ্রচলিত শিশ্ন ও য়োনি বাচক শব্দও থাকে, তাহলেও সেটা বিজ্ঞানের বিষয় হবে, অশ্লীল কথা নয়। অনেক অশ্লীলতা তো ভাষ্যকারদের মনে ভরা ছিল আর বাকিটা সুলেমান রিজবীদের মতো মানুষদের মন পূরণ করে দিয়েছে। যদি এনার মধ্যে একটুও বুদ্ধি থাকে, তাহলে এনার অশ্লীলতা দেখার অশ্লীল বৃত্তি এই সমাধানের মাধ্যমে দূর হয়ে যাবে।
এখন আমি বেদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের বিধানকারী কিছু মন্ত্র এখানে উদ্ধৃত করবো -
১. অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ। (অথর্ববেদ. ১১.৫.২১)
পশু আর পাখিও ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ তারা ঋতুগামী হয়।
২. ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরৎ। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ঐশ্বর্যবান রাজা ব্রহ্মচর্যের সাধনাতেই সমস্ত দেবতাদের তেজস্বী বানান। এর অর্থ হল যে রাষ্ট্রের রাজা জিতেন্দ্রিয় হন, সেই রাষ্ট্রে সমস্ত বিদ্বান বিদুষী, মাতা-পিতা, কৃষক, চিকিৎসক, সৈনিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক, বণিক আদি সমস্ত প্রজা জ্ঞান আর আনন্দে যুক্ত হয়।
৩. তৎ কেবলম্ কৃণুতে ব্রহ্ম বিদ্বান্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১০)
জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বামী কেবল ব্রহ্মচর্যপূর্বকই হওয়া সম্ভব।
৪. তস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে সমোতাঃ। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচারী অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মধ্যেই সকল দিব্য গুণ বাস করে।
৫. তানা তিষ্ঠতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ ১১.৫.১১)
ব্রহ্মচর্যপূর্বক অনুসন্ধানকারীই কেবল রশ্মির মতো সূক্ষ্ম পদার্থের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
৬. তান্ সর্বান্ ব্রহ্ম রক্ষতি ব্রহ্মচারিণ্যাভৃতম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.২২)
ব্রহ্মচারীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজ্ঞানই সকল প্রাণীর রক্ষা করতে পারে, যখন বিষয়ী (ভোগী) মানুষের বিজ্ঞান সকলের বিনাশকারী হয়।
৭. তে রক্ষতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ১১.৫.৮)
ব্রহ্মচারী বিদ্বানই কেবল নিজের তপ আর সাধনার দ্বারা পৃথিবী আর সূর্যের রক্ষা করতে পারে। এর অর্থ হল, এমন বিদ্বান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো প্রকারের অশুভ রশ্মি নির্গত না করে সর্বদা সাত্ত্বিক রশ্মির দ্বারা সকল পদার্থকে সুষম করতে নিজের ভূমিকা পালন করে।
৮. ব্রহ্মচর্য়েন কন্যা য়ুবানম্ বিন্দতে পতিম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
ব্রহ্মচর্য পালন করেই কেবল কন্যা যুবক ব্রহ্মচারীকে স্বামী হিসেবে বরণ করে।
৯. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা দেবা মৃত্যুমপান্ত। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কেবল বিদ্বান লোকেরা মৃত্যু অর্থাৎ দুঃখকে জয় করতে পারে।
১০. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা রাজা রাষ্ট্র বি রক্ষতি। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৭)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কোনো রাজা নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে, অন্যথায় রাজা রাষ্ট্রের সেই প্রকার বিনাশ করে দেয়, যেমন আজ সংসারের বিনাশ হচ্ছে।
১১. ব্রহ্মচারী ব্রহ্ম ভ্রাজদ বিভর্তি। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদাদি শাস্ত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন।
বেদের এই আদেশ ও উপদেশগুলো মাথায় রেখেই ভগবান মনু মনুস্মৃতির মধ্যে স্পষ্টভাবে লিখেছেন-
অর্থকামেষ্বসক্তানাম্ ধর্মজ্ঞানম্ বিধীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২.১৩)
অর্থাৎ অর্থ ও কামে আসক্ত ব্যক্তি কখনও ধর্মের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, বরং সে পদার্থ বিজ্ঞানকেও সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে জানতে পারবে না। এই উভয় প্রকারের বিদ্যার জন্য বেদই হল পরম প্রমাণ, যাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমেই ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
১. অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ। (অথর্ববেদ. ১১.৫.২১)
পশু আর পাখিও ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ তারা ঋতুগামী হয়।
২. ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরৎ। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ঐশ্বর্যবান রাজা ব্রহ্মচর্যের সাধনাতেই সমস্ত দেবতাদের তেজস্বী বানান। এর অর্থ হল যে রাষ্ট্রের রাজা জিতেন্দ্রিয় হন, সেই রাষ্ট্রে সমস্ত বিদ্বান বিদুষী, মাতা-পিতা, কৃষক, চিকিৎসক, সৈনিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক, বণিক আদি সমস্ত প্রজা জ্ঞান আর আনন্দে যুক্ত হয়।
৩. তৎ কেবলম্ কৃণুতে ব্রহ্ম বিদ্বান্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১০)
জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বামী কেবল ব্রহ্মচর্যপূর্বকই হওয়া সম্ভব।
৪. তস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে সমোতাঃ। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচারী অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মধ্যেই সকল দিব্য গুণ বাস করে।
৫. তানা তিষ্ঠতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ ১১.৫.১১)
ব্রহ্মচর্যপূর্বক অনুসন্ধানকারীই কেবল রশ্মির মতো সূক্ষ্ম পদার্থের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
৬. তান্ সর্বান্ ব্রহ্ম রক্ষতি ব্রহ্মচারিণ্যাভৃতম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.২২)
ব্রহ্মচারীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজ্ঞানই সকল প্রাণীর রক্ষা করতে পারে, যখন বিষয়ী (ভোগী) মানুষের বিজ্ঞান সকলের বিনাশকারী হয়।
৭. তে রক্ষতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ১১.৫.৮)
ব্রহ্মচারী বিদ্বানই কেবল নিজের তপ আর সাধনার দ্বারা পৃথিবী আর সূর্যের রক্ষা করতে পারে। এর অর্থ হল, এমন বিদ্বান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো প্রকারের অশুভ রশ্মি নির্গত না করে সর্বদা সাত্ত্বিক রশ্মির দ্বারা সকল পদার্থকে সুষম করতে নিজের ভূমিকা পালন করে।
৮. ব্রহ্মচর্য়েন কন্যা য়ুবানম্ বিন্দতে পতিম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
ব্রহ্মচর্য পালন করেই কেবল কন্যা যুবক ব্রহ্মচারীকে স্বামী হিসেবে বরণ করে।
৯. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা দেবা মৃত্যুমপান্ত। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কেবল বিদ্বান লোকেরা মৃত্যু অর্থাৎ দুঃখকে জয় করতে পারে।
১০. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা রাজা রাষ্ট্র বি রক্ষতি। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৭)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কোনো রাজা নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে, অন্যথায় রাজা রাষ্ট্রের সেই প্রকার বিনাশ করে দেয়, যেমন আজ সংসারের বিনাশ হচ্ছে।
১১. ব্রহ্মচারী ব্রহ্ম ভ্রাজদ বিভর্তি। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদাদি শাস্ত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন।
বেদের এই আদেশ ও উপদেশগুলো মাথায় রেখেই ভগবান মনু মনুস্মৃতির মধ্যে স্পষ্টভাবে লিখেছেন-
অর্থকামেষ্বসক্তানাম্ ধর্মজ্ঞানম্ বিধীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২.১৩)
অর্থাৎ অর্থ ও কামে আসক্ত ব্যক্তি কখনও ধর্মের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, বরং সে পদার্থ বিজ্ঞানকেও সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে জানতে পারবে না। এই উভয় প্রকারের বিদ্যার জন্য বেদই হল পরম প্রমাণ, যাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমেই ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
