ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

08 October, 2026

ঋগ্বেদ ১০/৬১/৫

08 October 0

ঋগ্বেদ ১০/৬১/৫, ঋগ্বেদ ১০/৬১/৬, ঋগ্বেদ ১০/৬১/৭, বেদে পিতা-কন্যার সঙ্গমের অনুমতি আছে?

আক্ষেপ: “বেদে পিতা-কন্যার স*ঙ্গমের অনুমতি আছে”—দাবিটি কি সত্য?
সম্প্রতি একটি লেখায় ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর কিছু অনুবাদ দেখিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, বেদ ও উপনিষদে পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে এবং তাই হিন্দুসম্প্রদায়ে Incest বা নিকট আত্মীয়ের মধ্যে যৌ*ন সম্পর্ক অনুমোদিত।
এই দাবির ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কোনো অনুবাদে “father”, “daughter”, “union”, “seed” ইত্যাদি শব্দ এসেছে বলেই সেই অনুবাদই মূল বৈদিক অর্থের একমাত্র অর্থ হয়ে যায় না। বৈদিক মন্ত্রের অর্থ নির্ধারণে মূল সংস্কৃত, পদার্থ, অন্বয়, নিরুক্ত ও ভাষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭-এর ক্ষেত্রে দুটি বৈদিক ভাষ্য দেখি। 👇
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫):
প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ।
পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ ৫॥
পদার্থ— (য়স্য) যে রুদ্র নামী প্রজাপতি অগ্নির (ইষ্ণদ্) ঈক্ষণযুক্ত (বীরকর্মম্) উৎপাদন কর্ম (প্রথিষ্ঠ) প্রথিত হয় সেই (অনুস্থিতম্) স্থাপিত এবং স্থিত হওয়া উৎপাদন কর্মকে (অনর্বা) দৃঢ় (নর্য়ঃ) মনুষ্য আর দেবগণের হিতকারক পার্থিব অগ্নি (নু) নিশ্চয়ই (অপ, ঔহৎ) লুকিয়ে রাখে (তৎ) সেটা (পুনঃ) আবার (আবৃহতি) চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এটাই হল সেই তত্ত্ব (য়ৎ) যা (কনায়াঃ) উজ্জ্বল (দুহিতুঃ) দ্যুলোক থেকে (অনুভৃতম্) গ্রহণ করা হয়েছে (আঃ) হয়।
ভাবার্থ— প্রজাপতি রুদ্র=অগ্নির উৎপাদন শক্তি বিস্তার লাভ করে। তার দ্বারা স্থাপিত উৎপাদন শক্তি রূপ তেজকে দৃঢ় আর নর তথা দেবগণের হিতকারী পার্থিব অগ্নি নিজের ভেতরে ঢেকে রাখে আর সেই তেজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বস্তুতঃ এটা সেই তেজ, যা দ্যুলোক থেকে গ্রহণ করা হয়।
📖 ১. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫— “পিতা কন্যার সঙ্গে স*ঙ্গম করলেন”—এটাই কি একমাত্র অর্থ?
আক্ষেপে H.H. Wilson-এর ইংরেজি অনুবাদ এবং পণ্ডিত রাম গোবিন্দ ত্রিবেদীর হিন্দি ব্যাখ্যা দেখিয়ে পিতা-কন্যার যৌন সম্পর্কের অর্থ করা হয়েছে।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ পাওয়া যায়।
তিনি এখানে—
“দুহিতুঃ” — দ্যুলোক/ঊর্ধ্বলোকের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
“কনায়া” — উজ্জ্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থে,
এবং সমগ্র মন্ত্রকে প্রজাপতি রুদ্র/অগ্নির উৎপাদনশক্তি ও তেজের বিস্তার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর ভাবার্থের সারকথা:
প্রজাপতি রুদ্ররূপ অগ্নির উৎপাদনশক্তি বিস্তার লাভ করে। সেই তেজ পার্থিব অগ্নির মধ্যে ধারণ হয় এবং পরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এটি দ্যুলোক থেকে গৃহীত তেজ।
অর্থাৎ এখানে পিতা-কন্যার কোনো মানবীয় যৌন সম্পর্কের বর্ণনা নেই।
☀️ ২. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬— যৌ*ন স*ঙ্গম নয়, সূর্য ও ঊষার প্রতীকী সম্পর্ক
আক্ষেপে বলা হয়েছে—পিতা ও যুবতী কন্যা মিলিত হয়ে শুক্রপাত করলেন।
কিন্তু আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ব্যাখ্যায়—
পিতা = সূর্য
যুবতী = ঊষা/দ্যুলোক
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
এবং তাঁর ভাবার্থ অনুযায়ী:
আদিত্য ও ঊষা/দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে অরুণ কিরণরূপ তেজের প্রকাশ ঘটে এবং দিনের উৎপত্তি হয়।
অর্থাৎ এখানে “রেতঃ” শব্দটিকে মানুষের যৌন বীর্য ধরে নেওয়াই মূল সমস্যা।
বৈদিক ভাষ্যে একই শব্দ প্রসঙ্গভেদে তেজ, শক্তি, সৃষ্টিশক্তি, বীজ ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬):
মধ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃণ্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্ ।
মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ।।৬॥
পদার্থ - (কামম্) ইচ্ছামতো (পিতরি) সূর্য (য়ুবত্যাম্) দ্যুলোক বা ঊষার (কৃণ্বানে) করার পর (য়ৎ) যে (কর্ত্বম্) কর্ম (মধ্যা) অন্তরিক্ষের মধ্যে (অভীকে) তাদের নিকট (অভবৎ) হয়েছিল বা হয় তাতে (মনানক্) সামান্য (রেতঃ) অরুণ কিরণ নামক তেজকে (বিয়ন্তা) পরস্পর অভিগমনকারী দুইজনে (জহতুঃ) ছেড়েছিল বা ছাড়ে। এটা হল সেই তেজ যাকে প্রজাপতি সূর্য দ্বারা (সুকৃতস্য) উত্তম কর্মের (সানৌ) উঁচু (য়োনৌ) স্থান দ্যুলোকে (নিষিক্তম্) নিষিক্ত থাকে।
ভাবার্থ- আদিত্য আর ঊষা বা দ্যুলোকের পারস্পরিক অভিগমনে যে কর্ম হয়, তাতে আদিত্য অরুণ কিরণ নামক তেজকে ঊষা বা দ্যুলোকের মধ্যে ছেড়ে দেয় আর দিনের উৎপত্তি হয়। সূর্যের এই তেজ দ্যুলোকের মধ্যে ভরা থাকে।
🌞 ৩. ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭— “পিতা নিজের কন্যার সঙ্গে”—আবারও প্রতীকী ব্যাখ্যা
আক্ষেপে বলা হয়েছে:
“When the father u*nited with the daughter…”
কিন্তু স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজকের ভাষ্যে—
পিতা = আদিত্য/সূর্য
দুহিতা = ঊষা/দ্যুলোক
ক্ষ্মা = পৃথিবী
রেতঃ = অরুণ কিরণরূপ তেজ
তাঁর ব্যাখ্যার মূল বক্তব্য:
আদিত্য যখন ঊষা বা দ্যুলোককে অভিব্যাপ্ত করে এবং পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে তার তেজ আকাশে সঞ্চার করে, তখন সেই তেজ থেকে দিনের প্রকাশ ও অগ্নি প্রভৃতি উৎপন্ন হয়।
এখানে আবারও মানব পিতা নিজের জৈবিক কন্যার সঙ্গে যৌ*ন সম্পর্ক করছে- এমন অর্থ অপরিহার্য নয়।
আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর ভাষ্য— ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭):
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ক্ষ্ময়া রেতঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ।
স্বাধ্যোऽজনয়ন্ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ॥৭॥
পদার্থ— (পিতা) প্রজাপতি আদিত্য (য়ৎ) যখন (স্বাম্) নিজের (দুহিতরম্) ঊষা অথবা দ্যুলোককে (অধিষ্কন্) প্রাপ্ত করেন তখন (ক্ষ্ময়া) পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে (রেতঃ) নিজের অরুণ কিরণ নামক তেজকে (নিসিঞ্চৎ) আকাশে সেচন করেন তখন (স্বাধ্যঃ) ভালোভাবে প্রকট (দেবাঃ) দিব্য শক্তিগুলো - সূর্যকিরণগুলো (ব্রহ্ম) অগ্নিকে (অজনয়ন্) উৎপন্ন করে আর তাকে (ব্রতপাম্) ব্রতের পালক (বাস্তোঃ, পতিম্) বাস্তোষ্পতি রুদ্র নামক অগ্নিকে (নিঃ, অতক্ষন্) নির্মিত করে।
ভাবার্থ— আদিত্য যখন দ্যুলোক অথবা ঊষাকে অভিব্যাপ্ত করে, তখন পৃথিবীর সাথে সঙ্গত হয়ে আকাশে তেজ সেচন করে, সেটা থেকে দিনের প্রকাশ অগ্নি ইত্যাদি উৎপন্ন হয়। এই অগ্নিকে বাস্তোষ্পতি রুদ্র-অগ্নি বলা হয়।
📜 ৪. বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর বিষয়টিও একইভাবে দেখতে হবে
আক্ষেপে স্বামী মাধবানন্দের অনুবাদ এবং শঙ্করাচার্যের ভাষ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে—
Manu/Viraj তাঁর কন্যা Śatarūpā-র সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং সেখান থেকে মানুষ সৃষ্টি হয়।
এখানে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে শঙ্করাচার্যের ভাষ্যে “daughter called Satarupa” এবং তাঁর সঙ্গে union-এর একটি আক্ষরিক বর্ণনা পাওয়া যায়—এটি গোপন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু এখান থেকেও সরাসরি এই সিদ্ধান্ত: “হিন্দুধর্ম (সম্প্রদায়ে) পিতা-কন্যার যৌ*ন সম্পর্ককে নৈতিকভাবে অনুমোদন করেছে”—এটি একটি অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত। কারণ সৃষ্টিতত্ত্বের পৌরাণিক/দার্শনিক রূপক এবং সাধারণ মানুষের জন্য নৈতিক বিধান এক জিনিস নয়।
🧠 সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত ভুল
আক্ষেপকারী বলছেন— “বেদে Incest নিষিদ্ধ করার একটি মন্ত্র দেখান।”
কিন্তু কোনো গ্রন্থে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের নাম করে নিষেধ না থাকলেই কি সেই কাজ অনুমোদিত হয়ে যায়?
❌ না।
উদাহরণস্বরূপ—
“বেদে অমুক নির্দিষ্ট অপরাধের নাম নেই”
“বেদ অমুক অপরাধকে অনুমোদন করেছে।”
অনুমোদনের দাবি করতে হলে অনুমোদনকারী বিধান দেখাতে হবে।
ঠিক একইভাবে কোনো মন্ত্রের একটি বিতর্কিত অনুবাদ পাওয়া গেলেই বেদ Incest অনুমোদন করেছে— এটি প্রমাণিত হয় না।
🕉️ বৈদিক আদর্শ কী?
বৈদিক সাহিত্যে ব্রহ্মচর্য, ইন্দ্রিয়সংযম ও সংযত জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন অথর্ববেদ ১১.৫ সূক্তে বারবার ব্রহ্মচর্য-এর মাহাত্ম্য এসেছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৭ ব্রহ্মচর্যেণ তপসা রাজা রাষ্ট্রং বি রক্ষতি।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে রাজা রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন—এই আদর্শ এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৮ ব্রহ্মচর্যেণ কন্যা যুবানং বিন্দতে পতিম্।
ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে কন্যা উপযুক্ত যুবককে স্বামী হিসেবে লাভ করে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.১৯ ব্রহ্মচর্যেণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত।
ব্রহ্মচর্য ও তপস্যার মাধ্যমে দেবগণ মৃত্যুকে অতিক্রম করেছেন—এমন ভাব প্রকাশ করা হয়েছে।
📖 অথর্ববেদ ১১.৫.২১ অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ যে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ।
এখানেও ব্রহ্মচর্যের ধারণা উপস্থিত।
অতএব বৈদিক আদর্শকে “যৌন অবাধতা” হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।
🔥 “বেদে অশ্লীল শব্দ কেন?”—এ প্রশ্নেরও উত্তর আছে
আরেকটি আপত্তি: “বেদে এমন শব্দ কেন থাকবে?”

এখানে বৈদিক যৌগিক শব্দের বহুমাত্রিক অর্থ বুঝতে হবে।
যেমন “অগ্নি” শব্দটি কেবল রান্নার আগুন বোঝায় না; বৈদিক ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গ অনুযায়ী তাপ, আলো, বিদ্যুৎ, শক্তি, বিদ্বান, রাজা ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।
একইভাবে “যো*নি” শব্দের অর্থ সব ক্ষেত্রে কেবল নারীর যৌ*নাঙ্গ নয়। ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২-এর ব্যাখ্যায় মহর্ষি যাস্ক— “যো*নিরন্তরিক্ষম্” বলেছেন—অর্থাৎ অন্তরীক্ষকেও “যো*নি” বলা হয়েছে।
কারণ “যো*নি” শব্দের মূল ধারণার মধ্যে উৎপত্তিস্থান, আশ্রয়, উৎস ইত্যাদি অর্থ রয়েছে।
সুতরাং— একটি শব্দ আধুনিক প্রচলিত যৌ*ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে বলেই বেদের প্রতিটি স্থানে সেই যৌ*ন অর্থ বসিয়ে দেওয়া যায় না। এটাই ভাষাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম।

উক্ত মন্ত্রে স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক ভাষ্য—

প্রথিষ্ট য়স্য বীরকর্মমিষ্ণদনুষ্ঠিতম্ নু নর্য়ো অপৌহৎ। পুনস্তদা বৃহতি য়ৎকনায়া দুহিতুরা অনুভৃতমনর্বা ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ট) য়স্য গৃহস্থস্য পুত্রকর্ম পুত্রার্থকর্ম বীর্য়সেচনম্ 'পুত্রো বৈ বীরঃ' [শতপথ ব্রাহ্মণ ৩.৩.১.১২] প্রথিতম্ প্রথতে বা (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপেণ প্রাপ্তম্ 'ইষ্ণন্ প্রাপ্নুবন্' [ঋগ্বেদ ৪.১৭.৩ দয়ানন্দঃ] সেবিতম্ সেবায়াম্ সফলীভূতম্ য়ুবানম্ (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) পুনস্তম্ স সমন্তাদুদ্যচ্ছতি পুত্রোৎপাদনেন (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরেভ্যো হিতো হিতকরঃ সন্ সর্বকার্য়ভারম্ ত্যজেৎ (য়ৎ) য়তঃ (কনয়াঃ-দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) কান্তায়াঃ সন্তানদোহনয়োগ্যায়াঃ পত্ন্যাঃ-আনুকূল্যেন ধারিতমাসীৎ (অনর্বা) স্বস্মিন্ সমর্থাऽনন্যাশ্রমী জাতঃ ।

ভাষান্বয়ার্থ — (য়স্য বীরকর্মম্-প্রথিষ্ঠ) যে গৃহস্থের পুত্রকর্ম-পুত্র উৎপাদনের জন্য কর্ম বীর্য সেচন দ্বারা প্রথিত-পুষ্ট হয় (ইষ্ণৎ-অনুষ্ঠিতম্) পুত্ররূপে প্রাপ্ত সফলীকৃতকে (পুনঃ-তৎ আবৃহতি) তারপর তাকে সে ভালোভাবে উৎসাহিত করে পুত্র উৎপাদনের দ্বারা (নু নর্য়ঃ-অপৌহৎ) নরদের অবশ্যই হিতকর হয়ে সব কার্যভার ত্যাগ করে (য়ৎ) যার দ্বারা (কনায়াঃ দুহিতুঃ-অনুভৃতম্-আস্) সন্তান দোহন যোগ্য-উৎপাদন যোগ্য কান্তার অনুকূলতায় ধারণ করা হয় (অনর্বা) নিজের মধ্যে সমর্থ স্বাশ্রয়ী হয়ে যায়।
.
ভাবার্থ — গৃহস্থের লক্ষ্য হল সন্তান উৎপাদন করা, তদর্থ বীর্য সেচন করার পর কমনীয় সন্তানকে দোহনকারী পত্নীতের মধ্যে সেটা পুষ্ট হয়ে সন্তানের রূপে উৎপন্ন হয় আর সে যুবক হয়ে যায়। তখন পিতা তাকে পুত্র পরম্পরা চালানোর জন্য উৎসাহিত করে। যখন সেই পুত্র পুত্রবান হয়ে যায়, তখন আবার তার পিতা গৃহস্থ জীবন ত্যাগ করে, অন্য মানুষদের হিত কর্ম করার জন্য।
.
মথ্যা য়ৎকর্ত্বমভবদভীকে কামম্ কৃন্বানে পিতরি য়ুবত্যাম্। মনানগ্রেতো জহতুর্বিয়ন্তা সানৌ নিষিক্তম্ সুকৃতস্য য়োনৌ ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৬)
.
সংস্কৃতান্বয়াৰ্থঃ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) য়দা য়ুবত্যাম্ ভাৰ্য়ায়াম্ পুত্ৰোৎপাদনকৰ্ত্তব্যম্ পূৰ্ণম্ ভবতি (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবতি পিতরি তদাশ্রমে পুত্ৰস্য পুত্ৰোৎপাদনম্ কামম্ কুৰ্বতি সতি তৎসম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ- জহতুঃ) বিশিষ্টতয়া প্ৰাপ্নুবন্তৌ পতিপত্ম্যৌ-অল্পাঃ প্ৰজাস্তু ত্যজতাম্ 'রেতঃ প্ৰজাঃ' [ঐতরেয় আরণ্যক ২.১.৩] (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মণঃ পিতৄণ্যস্য প্ৰতীকারায় গৃহে গৃহাশ্রমে বিভক্তে জগতে নিষক্তম্ নিষেচনীয়ম্ কৰ্ত্তব্যম্ ভৱতি 'সানৌ বিভক্তে জগতি' [ঋগ্বেদ ১.১৪৬.২ দয়ানন্দঃ]।
.
ভাষান্বয়াৰ্থ - (য়ৎ য়ুবত্যাম্ কৰ্ত্বম্-অভবৎ) যখন যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদন থেকে কৰ্তব্য পূৰ্ণ হয়ে যায় (পিতরি কামম্ কৃন্বানে-অভীকে) জীবিত পিতার মধ্যে - তার আশ্ৰয়ে পুত্ৰের পুত্ৰ উৎপাদনের কামনা হয়ে গেলে তার সম্মুখে (বিয়ন্তৌ মনানক্-রেতঃ জহতুঃ) বিশিষ্টতা থেকে প্ৰাপ্ত হতে থাকা পতি পত্নী অল্প সন্তানদের তো ত্যাগ করবেন - উৎপন্ন করবেন (সুকৃতস্য য়োনৌ সানৌ নিষক্তম্) পুণ্যকৰ্মের অৰ্থাৎ পিতৃ ঋণের প্ৰতীকার হয়ে যাওয়ার পর গৃহাশ্ৰমে বিশেষ সেবন করার যোগ্য জগতে নিষেক করা কৰ্তব্য হয়।
.
ভাবাৰ্থ - যুবতী ভাৰ্যাতে পুত্ৰোৎপাদনের জন্য বীৰ্য নিষেক করা কৰ্তব্য হয়। পিতা জীবিত থাকাকালীন অন্ততঃ প্ৰজা তো অবশ্যই উৎপন্ন করবে। এর জন্য গৃহস্থ আশ্ৰম হল পুণ্যের স্থান। বিশেষ সেবনীয় জগতে সন্তান পরম্পরার জন্য নিষেক করা আবশ্যক হয়। এটা হল গৃহস্থাশ্ৰমের পরম্পরা।
.
পিতা য়ৎস্বাম্ দুহিতরমধিষ্কন্ ক্ষ্ময়া তঃ সজ্ঞগ্মানো নি ষিঞ্চৎ। স্বাধ্যোऽজনয়ন্ ব্রহ্ম দেবা বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নিরতক্ষন্ ।। (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৭)

সংস্কৃতান্বয়ার্থঃ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানস্য ভূমিরূপয়া ভার্য়য়া সঙ্গচ্ছমানঃ (রেতঃ-নিষিঞ্চন্) বীর্য়ম্ গর্ভাধানরূপেণ নিষিঞ্চন্ সন্ (পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন্) পিতা স্বাম্ কন্যাম্ প্রাপ্নোতি-উত্পাদয়তি 'স্কন্ নিস্সারয়তু' [য়জুর্বেদ ১.২৬ দয়ানন্দঃ] 'স্কন্দন্তি-প্রাপ্ত হয়' [ঋগ্বেদ ৫.৫১.৩ দয়ানন্দঃ ] ন তু পুত্রম্ (স্বাধ্যঃ দেবাঃ- ব্রহ্ম জনয়ন্) সু-আধ্যাতারঃ-দূরদর্শিনো বিদ্বাংসো জ্ঞানম্ প্রাদুর্ভাবয়ন্তি মন্যন্তে ঘোষয়ন্তি (বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন্) য়ৎ তাম্ কন্যাম্ গৃহস্য পতিম্ স্বামিনীম্ কর্মপালিকাম্ পিতৃকর্মরক্ষিকাম্ নির্ধারয়ন্তি ।

ভাষান্বয়াৰ্থ — (ক্ষ্ময়া সজ্ঞগ্মানঃ) সন্তানের ভূমিরূপ স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে তথা ( রেতঃ-নিষিঞ্চন ) গর্ভাধান রীতিতে বীর্য সেচন করে ( পিতা স্বাম্ দুহিতরম্-অধিষ্কন ) পিতা তার কন্যাকে প্রাপ্ত করেন - উৎপন্ন করেন - পুত্র প্রাপ্ত করেন না, তখন ( স্বাধ্যঃ-দেবাঃ-ব্রহ্ম জনয়ন ) দূরদর্শী বিদ্বান জ্ঞানকে - গৃহস্থ জ্ঞানকে নিয়মকে প্রকট করেন, ঘোষিত করেন ( বাস্তোষ্পতিম্ ব্রতপাম্ নির্-অতক্ষন ) সেই কন্যাকে গৃহপতি - ঘরের স্বামী রূপে পিতৃকর্মের রক্ষিকা নির্ধারিত করেন।

ভাবার্থ — যদি পুরুষের স্ত্রী সহবাস অর্থাৎ বীর্যসেচন করার পর পুত্রকে না প্রাপ্ত করে কেবল কন্যাকে প্রাপ্ত করে, তখন সেই কন্যা পিতৃকর্মের রক্ষিকা তথা পিতার ঘরের সম্পত্তির স্বামী হয়। বেদের পরম্পরা এবং বৈদিক বিদ্বানদের মান্যতা হল এটা।

বেদের স্বাভাবিক (অর্থ) কেবল আধিদৈবিকই হয়, বাকি দুই প্রকারের ভাষ্য ভাষ্যকারীর রুচি ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করে আর সেগুলো থেকে সমাজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ লাভ করে। এই দুই বিদ্বানই আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক ভাষ্য করেছেন। আচার্য বৈদ্যনাথ শাস্ত্রীর আধিদৈবিক ভাষ্য সাধারণ স্তরের, তবুও আক্ষেপকারীর আক্ষেপকে নির্মূল করতে সক্ষম আছে। এই বিদ্বানদের ভাষ্য পড়ে কোনো সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই মন্ত্রগুলোর উপর কোনো আক্ষেপ করতে পারবে না। এই মন্ত্রগুলোর বাস্তবিক বিজ্ঞানের বোধ কেবল আমার বেদভাষ্য থেকেই হওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে বেদের মধ্যে এমন ভাষায় উপদেশ কেন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে নানা প্রকারের অবাঞ্ছিত যৌন সম্পর্কের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় অর্থাৎ কিছু মন্ত্রের এমনও অর্থ হতে পারে, যা অশ্লীল হবে? এর উত্তর জানার জন্য বেদ তথা ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। বেদ সেই ভাষায় আছে, যে ভাষা বেদের উৎপত্তি অর্থাৎ সৃষ্টির আদিতে চার ঋষির দ্বারা আকাশ থেকে বৈদিক ঋচার রশ্মিকে গ্রহণ করার পূর্বে এই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল না।

বেদের তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রন্থের সাথে করা যায় না। পৃথিবীর অন্য সব গ্রন্থ সেই ভাষায় লেখা হয়েছে, যে ভাষা সেই গ্রন্থগুলো লেখার পূর্বে পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, কোরআন লেখার পূর্বে আরবি ভাষা আরবে প্রচলিত ছিল। আরবি ভাষা আরবদের কথ্য-ভাষা ছিল। একইভাবে অন্যান্য সব গ্রন্থের ক্ষেত্রেও এটাই বুঝুন, কেবল বেদই হল এর ব্যতিক্রম।

সারমর্ম হল অন্যান্য গ্রন্থের ভাষাগুলো সংসার থেকে সেই গ্রন্থগুলোতে গেছে। কিন্তু বেদ থেকে সংসারে ভাষা ও জ্ঞান উভয়েরই উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে যে শব্দগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যে অর্থে সেগুলো সেই অঞ্চলে বলা হয়, অথচ বেদের মধ্যে এমনটা আবশ্যক নয়। এই কারণে সংসারে প্রচলিত অর্থ দেখে বৈদিক পদের অর্থ করা আনাড়ি কাজ হবে, যেটা বেশিরভাগ ভাষ্যকার করেছেন। বৈদিক শব্দগুলোর অর্থের বোধ শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ গ্রন্থ, নিরুক্ত ও নিঘন্টুর আধারেই হওয়া সম্ভব। এরমধ্যেও এই বিষয়টা ধ্যানে রাখতে হয় যে বেদের পদগুলো শুধুমাত্র য়ৌগিকই হয়, রূঢ় নয়।

আমি এখানে শব্দের তিনটা প্রকার স্পষ্ট করবো -

১. রূঢ় - এমন শব্দ, যা কোনো প্রকৃতি-প্রত্যয়ের নিশ্চয়তা ছাড়াই সমাজে প্রচলিত হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, 'খাট' শব্দটা চারপাই (খাট) বোঝাতে সমাজে ব্যবহৃত হয়। এর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই।

২. য়োগরূঢ় - এমন শব্দ, যা নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয়, কিন্তু সেগুলো কোনো বিশেষ বস্তুর জন্যই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, নীরজ, বারিজ আদি। এগুলোর অর্থ হল- জলে উৎপন্ন বস্তু, কিন্তু জলে উৎপন্ন প্রত্যেকটা পদার্থ, উদ্ভিদ বা প্রাণীকে নীরজ অথবা বারিজ বলা যায় না, শুধুমাত্র কমলের জন্যই এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়।

৩. য়ৌগিক - যেসব শব্দ নির্দিষ্ট প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে উৎপন্ন হয় অথবা যেগুলোর অর্থের ভিত্তিতে তাদের ব্যাখ্যা করা যায়। এই শব্দগুলো কোনো বিশেষ পদার্থের জন্য কখনও ব্যবহৃত হয় না, বরং প্রসঙ্গ অনুযায়ী অনেক পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, 'অগ্নি' পদ প্রকৃতি-প্রত্যয় থেকেও উৎপন্ন হয়। এছাড়া মহর্ষি য়াস্ক নিরুক্তের মধ্যে এর বিস্তারিত নির্বচন করেছেন। প্রসঙ্গ অনুসারে এর অনেক অর্থ হওয়া সম্ভব, যেমন- প্রাণ, তাপ, বিদ্যুৎ ও আলো আদিতে যুক্ত পদার্থ, রাজা, সেনাপতি, বিদ্বান, আত্মা ও পরমাত্মা। বেদের মধ্যে সমস্ত পদ এই প্রকারের হয়, এই কারণে বৈদিক পদের কেবল এক প্রকারেই অর্থ করা অজ্ঞানতা হবে। বেদের মধ্যে 'অগ্নি' পদ দেখে মানুষ সমাজে আগুনে 'অগ্নি' নাম দিয়েছে, কারণ আগুনের মধ্যে তাপ ও আলো আদির গুণ বিদ্যমান থাকে।

একইভাবে বেদের (ঋগ্বেদ ৩.২৭.৪) মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' শব্দটি আছে। এর বিষয়ে শতপথ ব্রাহ্মণ ১.৪.৩.৯ মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য লিখেছেন-

'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্ শিশ্নম্ হীদম্ শিশ্নিনম্ ভূয়িষ্ঠম্ শোচয়তি ।'

এখানে 'কেশ' শব্দের বিষয়েও জানা আবশ্যক। নিরুক্ত ১২.৩৬ মহর্ষি য়াস্ক লিখছেন-

'কেশা রশ্ময়ঃ'
তৈত্তিরীয় সংহিতার (৭.৫.২৫.১) মধ্যে বলা হয়েছে-

'রশ্ময়ঃ কেশাঃ'
এইভাবে শিশ্ন সেই বস্তুকে বলা হয়, যার রশ্মি তেজস্বী হয়। এইভাবে যে কোনও নক্ষত্র, যার মধ্যে আমাদের সূর্যও সম্মিলিত আছে, শোচিষ্কেশ নামে পরিচিত হবে। এর কারণ হল তাদের রশ্মিগুলো তেজস্বী হয়।

'শোচিষ্কেশ' -এর মধ্যে 'শুচ্' ধাতু শোক করার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি, বরং 'শোচতি জ্বলতিকর্মা' (নিঘন্টু ১.১৬) থেকে জ্বালাতে ও তেজস্বী হওয়ার অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই থেকেই 'শোচিষ্কেশ'-এর অর্থ নক্ষত্র প্রমাণিত হয়। এইভাবে 'শিশ্ন' -এর অর্থও নক্ষত্র হয়। এখানে 'শোচিষ্কেশঃ'-এর মধ্যে বহুব্রীহি সমাস মানলে এই অর্থ হয়। যদি এখানে কর্মধারয় সমাস মানা হয়, তাহলে তেজস্বিনী কিরণই 'শোচিষ্কেশ' এবং শিশ্ন বলা হবে তথা নক্ষত্রকে শিশ্নিন যুক্ত বলা হবে। 'শিশ্ন'-এর অন্য নির্বচন মহর্ষি য়াজ্ঞবল্ক্য উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিতে করেছেন - যেটা শিশ্নযুক্তকে প্রভূত মাত্রায় প্রকাশিত করে। এর অর্থ হল শিশ্নী নক্ষত্র বলা হবে, কারণ নক্ষত্রকে তার শিশ্নরূপী কিরণই প্রকাশিত করে অর্থাৎ দর্শায়।

এখানে 'শিশ্ন' শব্দ, যেটা বেদের মধ্যে সূর্য বা সূর্যের কিরণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটা দেখে মানব সমাজ পুরুষেন্দ্রিয়েরও 'শিশ্ন' নাম সেই সময় রাখে, যখন তার কোনো নাম ছিল না অর্থাৎ সৃষ্টির প্রারম্ভিক প্রজন্মে। পুরুষের উপস্থও মানুষকে সন্তান উৎপন্ন করার চিন্তায় যুক্ত করে আর কামুক পুরুষদের এই ইন্দ্রিয়ই অন্য ইন্দ্রিয়ের তুলনায় সর্বাধিক দুঃখী ও অস্থির করে তোলে। এখানে 'শুচ্' ধাতু শোক করা অর্থেও ব্যবহৃত হয় আর জ্বালানো অর্থে গ্রহণ করলে কামাগ্নির প্রচণ্ডতা সর্বজনবিদিত।

এখন এখানে সুলেমান রিজভীর মতো বেদবিরোধী বলবেন যে বেদের মধ্যে সূর্যকিরণ বা সূর্যের জন্য 'শিশ্ন' বা 'শিশ্নী'-র প্রয়োগ কেন হয়েছে? এই মূর্খতাপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত রিজভী মহাশয় বুঝে গেছেন। এখানে শতপথ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতির পূর্বভাগ 'শিশ্নম্ বৈ শোচিষ্কেশম্' লোকপ্রচলিত শিশ্নের জন্য না হয়ে কেবল নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই কথা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, বেদের পাশাপাশি শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে 'শোচিষ্কেশ' এবং 'শিশ্ন' পদ পুরুষের উপস্থের জন্য নয়, বরং নক্ষত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ধৃতির কিছু অংশের সাদৃশ্য থেকে সমাজে পুরুষেন্দ্রিয়ের নাম শিশ্ন রেখে দেওয়া হয়।

একইভাবে "য়োনিঃ শব্দ বেদের মধ্যে অন্তরীক্ষের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটা উদাহরণ মন্ত্র আছে -

য় ঈম্ চকার ন সো অস্য বেদ য় ঈম্ দদর্শ হিরুগিন্নু তস্মাৎ । স মাতুর্য়োনা পরিবীতো অন্তর্বহুপ্ৰজা নির্ঋতিমা বিবেশ ॥ (ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৩২)

এর ব্যাখ্যায় নিরুক্তকার মহর্ষি য়াস্কের উক্তি হল—

"য়োনিরন্তরিক্ষম্ মহানবয়বঃ পরিবীতো বায়ুনা।'
অর্থাৎ অন্তরীক্ষকে (আকাশ) য়োনি বলা হয়, যার খুব বড় অংশ বায়ু দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। এই পদ 'য়ু মিশ্রণেऽমিশ্রণে চ' ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই পদ বেদের মধ্যে য়ৌগিক শব্দ হয়, যা অন্য আরও কিছু পদার্থের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকেই লোকসমাজে স্ত্রীর জননেন্দ্রিয়ের জন্যও এই শব্দ প্রচলিত হতে শুরু করে। তার পূর্বে এই অঙ্গের কোনো নামই ছিল না, কারণ সংসারে ভাষার উৎপত্তি বেদ থেকেই হয়েছে। এই অঙ্গও মাংসপেশী, রক্তনালী, স্নায়ু আদি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকার কারণে য়োনি নামে পরিচিত হয়। মূলত এই শব্দ আকাশ আদির জন্য হয়, বিশেষ করে বেদ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের মধ্যে।

এখন যদি কোনো কামুক ব্যক্তি বেদাদি শাস্ত্রের মধ্যে শিশ্ন ও য়োনি শব্দ দেখা মাত্র তাতে অশ্লীলতার অভিযোগ করে, তাহলে সেই অশ্লীলতা তার মস্তিষ্কে ভরা আছে, শাস্ত্রের মধ্যে নয়। কোনো গ্রন্থের মধ্যে শরীর ক্রিয়াবিজ্ঞানের প্রসঙ্গে যদি লোকপ্রচলিত শিশ্ন ও য়োনি বাচক শব্দও থাকে, তাহলেও সেটা বিজ্ঞানের বিষয় হবে, অশ্লীল কথা নয়। অনেক অশ্লীলতা তো ভাষ্যকারদের মনে ভরা ছিল আর বাকিটা সুলেমান রিজবীদের মতো মানুষদের মন পূরণ করে দিয়েছে। যদি এনার মধ্যে একটুও বুদ্ধি থাকে, তাহলে এনার অশ্লীলতা দেখার অশ্লীল বৃত্তি এই সমাধানের মাধ্যমে দূর হয়ে যাবে।

এখন আমি বেদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের বিধানকারী কিছু মন্ত্র এখানে উদ্ধৃত করবো -
১. অপক্ষাঃ পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ। (অথর্ববেদ. ১১.৫.২১)
পশু আর পাখিও ব্রহ্মচর্য পালন করে অর্থাৎ তারা ঋতুগামী হয়।

২. ইন্দ্রো হ ব্রহ্মচর্য়েণ দেবেভ্যঃ স্বরাভরৎ। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ঐশ্বর্যবান রাজা ব্রহ্মচর্যের সাধনাতেই সমস্ত দেবতাদের তেজস্বী বানান। এর অর্থ হল যে রাষ্ট্রের রাজা জিতেন্দ্রিয় হন, সেই রাষ্ট্রে সমস্ত বিদ্বান বিদুষী, মাতা-পিতা, কৃষক, চিকিৎসক, সৈনিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক, বণিক আদি সমস্ত প্রজা জ্ঞান আর আনন্দে যুক্ত হয়।

৩. তৎ কেবলম্ কৃণুতে ব্রহ্ম বিদ্বান্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১০)
জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বামী কেবল ব্রহ্মচর্যপূর্বকই হওয়া সম্ভব।

৪. তস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে সমোতাঃ। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচারী অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির মধ্যেই সকল দিব্য গুণ বাস করে।

৫. তানা তিষ্ঠতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ ১১.৫.১১)
ব্রহ্মচর্যপূর্বক অনুসন্ধানকারীই কেবল রশ্মির মতো সূক্ষ্ম পদার্থের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

৬. তান্ সর্বান্ ব্রহ্ম রক্ষতি ব্রহ্মচারিণ্যাভৃতম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.২২)
ব্রহ্মচারীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিজ্ঞানই সকল প্রাণীর রক্ষা করতে পারে, যখন বিষয়ী (ভোগী) মানুষের বিজ্ঞান সকলের বিনাশকারী হয়।

৭. তে রক্ষতি তপসা ব্রহ্মচারী। (অথর্ববেদ১১.৫.৮)
ব্রহ্মচারী বিদ্বানই কেবল নিজের তপ আর সাধনার দ্বারা পৃথিবী আর সূর্যের রক্ষা করতে পারে। এর অর্থ হল, এমন বিদ্বান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোনো প্রকারের অশুভ রশ্মি নির্গত না করে সর্বদা সাত্ত্বিক রশ্মির দ্বারা সকল পদার্থকে সুষম করতে নিজের ভূমিকা পালন করে।
 
৮. ব্রহ্মচর্য়েন কন্যা য়ুবানম্ বিন্দতে পতিম্। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৮)
ব্রহ্মচর্য পালন করেই কেবল কন্যা যুবক ব্রহ্মচারীকে স্বামী হিসেবে বরণ করে।
 
৯. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা দেবা মৃত্যুমপান্ত। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৯)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কেবল বিদ্বান লোকেরা মৃত্যু অর্থাৎ দুঃখকে জয় করতে পারে।
 
১০. ব্রহ্মচর্য়েন তপসা রাজা রাষ্ট্র বি রক্ষতি। (অথর্ববেদ ১১.৫.১৭)
ব্রহ্মচর্যের তপস্যা দ্বারাই কোনো রাজা নিজের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে, অন্যথায় রাজা রাষ্ট্রের সেই প্রকার বিনাশ করে দেয়, যেমন আজ সংসারের বিনাশ হচ্ছে।

১১. ব্রহ্মচারী ব্রহ্ম ভ্রাজদ বিভর্তি। (অথর্ববেদ ১১.৫.২৪)
ব্রহ্মচর্য পালন করে বিদ্বান ব্যক্তিরা বেদাদি শাস্ত্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক বিদ্যা অর্জন করতে পারেন।

বেদের এই আদেশ ও উপদেশগুলো মাথায় রেখেই ভগবান মনু মনুস্মৃতির মধ্যে স্পষ্টভাবে লিখেছেন-

অর্থকামেষ্বসক্তানাম্ ধর্মজ্ঞানম্ বিধীয়তে। ধর্মজিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ॥ (মনুস্মৃতি ২.১৩)

অর্থাৎ অর্থ ও কামে আসক্ত ব্যক্তি কখনও ধর্মের পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবে না, অর্থাৎ সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে, বরং সে পদার্থ বিজ্ঞানকেও সূক্ষ্ম স্তরে গিয়ে জানতে পারবে না। এই উভয় প্রকারের বিদ্যার জন্য বেদই হল পরম প্রমাণ, যাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমেই ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।

Read More

26 September, 2026

ঈশ্বরের অবতার কি সম্ভব ?

26 September 0

ঈশ্বরের অবতার কি সম্ভব ?, অবতার, অবতারবাদ বেদ বিরুদ্ধ
পরমাত্মা অনন্ত শক্তিযুক্ত অজন্মা, নিরন্তর, সদা যুক্ত, ন্যায়কারী, নির্মল, সর্বজ্ঞ, সকলের সাক্ষী, নিয়ন্তা, অনাদিস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনি সর্বব্যাপক, শোকরহিত, স্থূলদেহরহিত, পূর্ণ, পবিত্র, সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বাশ্রয়; তিনি বহু বৎসর ব্যাপিয়া সত্য বিষয়সমূহের প্রকাশ করেছেন।' ইত্যাদি বাক্যে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে সর্বব্যাপক ঈশ্বর জন্মগ্রহণ করেন না। 'মরণশীল মানুষ যাতে তাঁকে দেখতে পায়' এজন্য তাঁর একটি মরদেহ ধারণের কোন প্রয়োজন নেই।

স পর্য॑গাচ্ছু॒ক্রম॑কা॒য়ম॑ব্র॒ণম॑স্নাবি॒রꣳ শু॒দ্ধমপা॑পবিদ্‌ধম্।
ক॒বির্ম॑নী॒ষী প॑রি॒ভূঃ স্ব॑য়॒ম্ভূর্যা॑থাতথ্য॒তোऽর্থা॒ন্ ব্যদধাচ্ছাশ্ব॒তীভ্যঃ॒ সমা॑ভ্যঃ॥ যজু০ ৪০।৮॥
হে মনুষ্যগণ ! যে ব্রহ্ম (শুক্রম্) শীঘ্রকারী সর্বশক্তিমান্ (অকায়ম্) স্থূল সূক্ষ্ম ও কারণশরীর রহিত (অব্রণম্) ছিদ্ররহিত এবং ছিদ্র করিবার যোগ্য নহে (অস্নাবিরম্) নাড়ি আদি সহ সম্বন্ধরূপ বন্ধন হইতে রহিত (শুদ্ধম্) অবিদ্যাদি দোষ হইতে রহিত হওয়ায় সর্বদা পবিত্র এবং (অপাপবিদ্ধম্) যিনি পাপযুক্ত, পাপকারী এবং পাপে প্রীতিকারী কখনও হয়না (পরি, অগাৎ) সব দিক দিয়া ব্যাপ্ত, যিনি (কবিঃ) সর্বজ্ঞ (মনীষী) সকল জীবদের মনোবৃত্তিকে জানেন (পরিভূঃ) দুষ্ট পাপীদেরকে তিরস্কারকারী এবং (স্বয়ম্ভুঃ) অনাদি স্বরূপ যাহার সংযোগ হইতে উৎপত্তি, বিয়োগ হইতে বিনাশ, মাতা, পিতা, গর্ভবাস, জন্ম, বৃদ্ধি ও মরণ হয় না সেই পরমাত্মা (শাশ্বতীভ্যঃ) সনাতন অনাদি স্বরূপ নিজ নিজ স্বরূপে উৎপত্তি ও বিনাশরহিত (সমাভ্যঃ) প্রজাদিগের জন্য (য়াথাতথ্যতঃ) যথার্থ ভাবপূর্বক (অর্থাৎ) বেদ দ্বারা সকল পদার্থকে (ব্যদধাৎ) বিশেষ করিয়া নির্মাণ করে । (সঃ) সেই পরমেশ্বর তোমাদের উপাসনা করিবার যোগ্য ॥
'একটি বিশেষ সম্প্রদায় একমাত্র মুক্তি উপস্থাপিত করেন, 'অচিন্ত্যশক্তিত্বাৎ'- অচিন্ত্যশক্তি প্রভাবে তিনি যদি সবই পারেন, তাহলে মনুষ্য দেহ নিতে পারবেন না কেন? ঠিক ঐ যুক্তিতেই আপনারা বুঝতে পারবেন, তিনি 'অচিন্ত্যশক্তি প্রভাবে', মানুষ দেহ গ্রহণ না করেও কেন না, মরণশীল মানুষকে-ভক্তকে দর্শন দিতে পারবেন?
মুমুক্ষু ভক্তজন সমাধিধৌত হৃদয়ে তাঁকে দর্শন করেন। উপনিষদ বলছে- (মু০ ৩।১।৫)
সত্যেন লভ্যস্তপসা হোষ আত্মা সম্যগ্‌ জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্য্যেণ নিত্যম্, অন্তঃশরীরে জ্যোতির্ময়ো হি শুভ্রঃ, পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ।
সত্য, ব্রহ্মচর্য্য এবং তপস্যা প্রভাবে নির্মলহৃদয় যতিগণ অন্তঃশরীরে সেই জ্যোতিস্বরূপ পুণ্যময় পরমাত্মাকে দর্শন করেন। ফুলের মধ্যে যেমন সুগন্ধি, কাঠের মধ্যে যেমন আগুন, দুগ্ধে যেমন ঘৃত থাকে, তেমনি সকলের মধ্যেই সেই সর্বব্যাপক পরমাত্মা বিরাজিত। কাষ্ঠে কাষ্ঠে ঘর্ষণ যেমন অগ্নির প্রকাশ হয়, দুগ্ধকে মন্থন করে জ্বাল দিলে যেমন ঘৃত পাওয়া যায়, তেমনি ধ্যানদণ্ড-মন্থনের দ্বারা যম নিয়ম ধ্যান ধারণা সমাধি গুরুকূপা প্রভৃতিতে যোগী বা ভক্তের হৃদয়ে তিনি প্রকট হন, প্রেমিক ভক্তকে দর্শন দেওয়ার জন্য তাঁকে মানুষ দেহ গ্রহণ করতে হয় না। শৈবালাচ্ছন্ন পুষ্করিণীতে বা ধূলি মলিন আয়নাতে যেমন চন্দ্র বা সূর্যের প্রকাশ দেখা যায় না (দেখা না গেলেও যে তাতে চন্দ্র ও সূর্যের কিরণ বা প্রতিবিম্ব পড়ে না তা নয়, পড়ে, কেবল আবরণের জন্য দেখা যায় না), কিন্তু ঐ শেওলা বা ধূলি আবরণ দূর হলেই যেমন চন্দ্র এবং সূর্যের পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায়, তেমনি ঈশ্বর সকলের হৃদয় আলো করে থাকলেও কোটি কোটি জন্মের কর্মের আবরণ, বাসনার জাল, মানুষের চিত্তরূপ হৃদয় বা দর্পণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সাধন প্রভাবে ঐ আবরণ দূর হলেই মুমুক্ষু প্রেমিক ভক্ত সেই হহৃদয়স্থ পরমাত্মাকে, অমৃতস্বরূপকে পেয়ে জেনে কৃতকৃত্য হতে পারেন এবং হয়েও থাকেন। তার জন্য শ্রীভগবানের অবতারবাদ স্বীকার করে, তাঁর পরিণামশীল দেহ গ্রহণ আর জঠর যন্ত্রণা ভোগ করার কথা না স্বীকার করলে ভক্তদের কিছু ভক্তির হ্রাস বৃদ্ধি হবে না।
অনন্ত জলরাশির কোন কোন অংশ যেমন শৈত্যের সংস্পর্শে জমে বরফ হয়, তেমনি ভক্তি-হিমের সংস্পর্শে, ভক্ত-হৃদয়ে সেই স্বতঃপ্রকাশ, অনন্ত পরমাত্মা ভক্তমনলোভা বাঞ্ছিতরূপ গ্রহণ করে প্রকট হন, ভক্ত হৃদয়ে তাঁর Manifestation হয়। ভক্ত যখন তাঁকে দর্শন করেন, তখন তিনি স্থুল দেহধারী হলেও, ইন্দ্রিয়পরিচ্ছিন্ন দেহের মধ্যে তাঁর মন বা চিত্ত থাকে না, ভূমার ভূমিতে উধাও হয়ে যায়; পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মনচিত্তাদি অন্তরেন্দ্রিয় কোন ইন্দ্রিয় দিয়েই সে ইন্দ্রিয়াতীতকে জানা যায় না। জীবাত্মা, ইন্দ্রিয়ের সীমাগণ্ডী অতিক্রম করে, পঞ্চকোষের আবরণ ভেদ করে তার চিন্ময় সত্তা দিয়েই, সেই পরমাত্ম বস্তুকে অনুভব করে। কাজেই ভক্তকে দর্শন দেওয়ার জন্য সর্বব্যাপক পরমাত্মারও স্কুলদেহ ধারণের, 'মানুষী তনু আশ্রয়ের' কোন প্রয়োজন নেই।
আকাশ ব্যাপক বলে তা যেমন কোথাও যায় না, আসেও না, সর্বত্র সমভাগে বিদ্যমান, তেমনি সর্বব্যাপক পরমাত্মাও কোথাও যান-ও না, আসেন না। 'তিনি সর্বব্যাপক বলে তাঁর গমনাগমন হতে পারে, যিনি নিত্যপূর্ণ, সর্বব্যাপী, তিনি কি গর্ভাশয়ে ব্যাপক ছিলেন না, যে অন্য স্থান থেকে আসলেন। (মহর্ষি দয়ানন্দ) 'তিনি পরিচ্ছন্ন দেহ গ্রহণ করে জন্মগ্রহণ করেন বললে তাঁর ব্যাপকত্ব এবং অসীমত্ব ক্ষুন্ন হয়, যিনি দেহ ধারণ করে আসেন তিনি কখনই সেই সর্বব্যাপক পরমাত্মা হতে পারেন না।" (সোহহং স্বামী)
যাঁদেরকে আপনারা অবতার বলে পূজা করেন বা ভক্তিতে গদগদ হন, তাঁদের মৎস্য কুর্ম বরাহ নৃসিংহ প্রভৃতি মূর্তি একেবারে কাল্পনিক, বাস্তবে তাঁদের কোন দিনই অস্তিত্ব ছিল না, আর রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ প্রভৃতি ঈশ্বরদর্শী মহাপুরুষ হতে পারেন, সাক্ষাৎ পরমাত্মা কেউ কখনই ছিলেন না। যে যার সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার জন্য, বিশ্বাস বা মোহগ্রস্ত মনে বহু অবতার কল্পনা করে, কল্পনার আতিশয্যে যিনি অজ, তাঁকে জন্মগ্রহণ করিয়ে, যিনি নিত্য পূর্ণ তাঁকে খণ্ড করে, যিনি ব্যাপক তাঁকে পরিচ্ছন্ন করে, মনোমত কল্পনার বিচিত্র রং এ চিত্রিত করে বসে আছে। অবিবেকী যারা সেই সব কল্পনাপ্রিয় ভক্তদল সদৃচ্ছা কল্পনা করতে পারেন, তাঁরা তাঁদের। ভগবানকে শিখিপুচ্ছধারী, গোচারণরত, স্ত্রী বিহনে কেঁদে আকুল, শোকাচ্ছন্ন পরকীয়া প্রেমরত, নানারকম। উৎকট বিকট কার্য্যকারী, এমন কি সাপ, শকুন, ব্যাঙ, ভালুক, কচ্ছপ, বরাহ বা নরপশুরূপে কল্পনা করে ফেলতে পারেন, তাঁদেরকে পূর্ণ ভগবান জ্ঞানে প্রতিমূর্তি গড়িয়ে, পুষ্প-চন্দন নৈবেদ্য-ডালি দিয়ে ধূলি ধূসরিত হয়ে গোড়ালুটি দিতে পারেন কিন্তু বিবেকী জনের কাছে তা অগ্রাহ্য। কেননা, সর্বজনমান্য বেদ-উপনিষদের সিদ্ধান্ত হল-
দিব্যো হামূর্তঃ পুরুষা স বাহ্যাভ্যন্তরো হাজর।
অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রোহ্যক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।।
(মুণ্ডকোপনিষদ ২।১।২)
দিব্য, শুদ্ধ, অমূর্ত, সকলের মধ্যে পূর্ণ, অন্তরে বাহিরে নিরন্তর ব্যাপক, প্রকাশ স্বরূপ ইত্যাদি পরমেশ্বরের। বিশেষণ। তিনি 'অক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ।'
পরমাত্মার এই ধরাধামে অবতীর্ণ হওয়ার দ্বিতীয় কারণরূপে অনেকে বলছেন "লীলা রসাস্বাদনের জন্য"। কৈ কৃষ্ণ তো অর্জুনকে কোথাও বলছেন না যে, 'আমি গোচারণের জন্য, পরের বাড়ীর ক্ষীর সর ছানা ননী চুরি করে খাওয়ার জন্য, পরনারীর বস্ত্র হরণ করে তাদের ঈষৎ অক্ষত যোনি (ভাগবত মতে।) দর্শন করে কৃতার্থ হওয়ার জন্য, কিংবা গভীর নিশীথে কামবর্ধন বাঁশী বাজিয়ে, পরস্ত্রীকে জঙ্গলে এনে তাদের সঙ্গে শৃঙ্গার লীলা করবার জন্য- ইত্যাদি নানারকমের ছল বল কৌশলরূপ লীলা রসাস্বাদনের জন্য কিংবা পরবর্তীকালে আমাগতগণপ্রাণ-ভক্তগণ যাতে সখীবেশ ধারণ করে, কিশোরী ভজন নায়িকা ভজনাদি পরকীয়া প্রেমের মধুর রস আস্বাদন করতে পারে, এই জন্য কেবল তাদেরই মুখ চেয়ে, যে কোন লীলা খেলা যাতে তারা আমার সৎদৃষ্টান্ত! অনুযায়ী সমর্থন করতে পারে, এ জন্য আসি। আমি অবতীর্ণ হই"।। বর্তমানে নানা লীলা রসাস্বাদনকারী ভক্তরাজগণকে চুপিসারে তাঁদের কৃষ্ণচন্দ্র যা বলে গেছেন, তা সেই নর ঋষির অবতার প্রাণপ্রিয় সখা অর্জুনের কাছে বলেন নি কেন। তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার কারণ স্বরূপ 'লীলা রসাস্বাদনের" ঐ সব বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা করতে তিনি কিঞ্চিৎ লজ্জা অনুভব করেছিলেন বুঝি!!

যখন কোন ভক্ত তাঁকে দর্শন করেন, তখন সেই প্রেমিক ভক্তের যৎ যৎ বস্তুতে দৃষ্টি পড়ে, সকলের মধ্যেই দেখেন, তাঁরই চিন্ময় সত্তার প্রকাশ বিকাশ- "সদ্গুরু নূর তামাম্" (কবীর); সর্বভূতে তখন তিনি তাঁকেই দেখেন, প্রতি ঘটনার পশ্চাতে দেখেন তাঁরই মহান্ ঐশী লীলা, সর্বত্রই এক দিব্য সুষমা, দিব্য শৃঙ্খলা, সবই ছন্দোময়, সবই সত্য শিবসুন্দর; প্রতি কর্মই তখন তাঁর পূজা হয়ে ফুটে ওঠে, প্রতি ধূলিকণা অণুপরমাণু পর্যন্ত তাঁর কাছে আনন্দমের অভিব্যক্তি, আনন্দময় আনন্দ-পরিপ্লুত বলে মনে হয়- ফলে, প্রত্যেক বস্তুতে, প্রত্যেক কর্মেই তাঁর হয় সেই সচ্চিদানন্দ ভাগবত সত্ত্বার রসাস্বাদন, ভক্ত ভগবানে এ লীলা নিত্যই চলছে। অণুর মধ্যে সেই মহতো মহীয়ানের দিব্যপ্রকাশ লীলা বা বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর খেলার- অনুভূতি দেওয়ার জন্য পরমাত্মাকে স্কুল মানবদেহে ধারণ বা মৎস্য কুর্ম বরাহরূপ গ্রহণের কোন ও প্রয়োজন হয় না। 'তিনি যেহেতু অচিন্ত্যশক্তিসম্পন্ন - এজন্য তিনি মানুষ হয়ে জন্মান'- এইরূপ বিশ্বাস পোষণ করে, বেদ, উপনিষদ বিরুদ্ধ, অনুভব-বিরুদ্ধ, ধারণার ঘূর্ণিপাকে ঘূর্ণমান বিভ্রান্ত হওয়ার চেয়ে তিনি যেহেতু অচিন্তা শক্তিসম্পন্ন সেইজন্যে তিনি জন্মগ্রহণ না করেও, সব ভক্তকে, সব সময়, সমকালে, সমভাবে ধন্য করতে পারেন। পূর্ণকাম করতে পারেন, এই ধারণা করতে কি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ক্লেদাক্ত হৃদয়ে ব্যথা লাগে। তাঁর অচিন্ত্য শক্তির এই মর্ম গ্রহণ করলে সম্প্রদায় টিকে না বুঝি। 'লোকানুগ্রহার্থ,' নিজ মায়াকল্পিত দেহধারণ করে, জনম মরণশীল জীবের ন্যায় উৎপন্ন, বর্জিত, কর্মানুষ্ঠানরত এবং পরিশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ারূপ লীলা পরমাত্মা করেন না। তবে তাঁতে ওগুলি আরোপ করে, ব্যক্তিবিশেষকে অবতার বলে প্রচার করে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি সাধনের কূট কৌশল ঐ সব ভক্তদেরই লীলাখেলা বলতে পারেন।
অবতারবাদের এবার তৃতীয় কারণটি পর্যালোচনা করা যাক্। গীতানুসারে বলা হয়, সাধুদের পরিত্রাণের জন্য, ধর্মসংস্থাপনের জন্য এবং দুষ্কৃতকারীর বিনাশের জন্য, সর্বব্যাপী, অসীম, অনস্ত যিনি, তিনি জন্মগ্রহণ করতে পারেন না। যিনি 'সর্বশক্তিমান, তিনি কি মানুষরূপে জন্মগ্রহণ না করে কি সাধুকে রক্ষা করতে পারেন। না? তাঁর 'সর্বশক্তিমত্তা' এবং 'অচিন্ত্যশক্তির' কত সংকীর্ণ অর্থ করা হয়েছে দেখুন। ধর্ম লুপ্ত হলে তবে সংস্থাপন অর্থাৎ সম্যকরূপে স্থাপনের প্রশ্ন আসে, কিন্তু সত্যের উপর ধর্ম প্রতিষ্ঠিত, সত্য এবং পরমাত্মা একই অর্থবোধক। পরমাত্মা সত্যস্বরূপ, ধারণাৎ ধর্মমিত্যাচ্ছ, সেই জগদাধার অনন্ত চৈতন্য সত্তাই অখিল ব্রহ্মাণ্ড, সমগ্র জীবজগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি কি মাঝে মাঝে লুপ্ত হন, না, ধ্বংস হয়ে যান যে ধর্মকে সংস্থাপনের প্রয়োজন হয়? অবশ্য যদি 'সংস্থাপন' বলতে 'সম্প্রদায় স্থাপন' বোঝায়, তাহলে অবশ্য বহু ব্যক্তিগত ভগবানের উৎপন্ন হওয়া এবং অবতরণ সিদ্ধ হয়।।
'বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্' দুর্জন বিনাশের জন্য নাকি নিত্য, পুণ্য, সর্বব্যাপী ভগবানকে জঠর যন্ত্রণা ভোগ কদরতে হয়। একটু গভীরভাবে বিচার করে দেখুন ঐ দেদীপ্যমান সূর্যের চেয়ে অনেক লক্ষ লক্ষ গুণ বৃহত্তর তারকা নক্ষত্র আছে, এই সৌরমণ্ডলের সূর্য যেমন ঐটি, তেমনি বহু সৌরমণ্ডলে বহু সূর্য আছে, তাদের চেয়ে বহু কোটি কোটি গুণ বৃহদাকার তারা আছে; এই অসংখ্য গ্রহ তারকারাজি সূর্যসহ সৌরমণ্ডল তাঁরই সৌরমণ্ডলু তাঁরই অচিন্ত্য শক্তিপ্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর শক্তির অনুপাতে কারণজগৎ (Casual universe) কিছু নয়, কারণ জগতের তুলনায় সূক্ষ্মজগৎ, ক্ষুদ্রতর, সূক্ষ্মজগতের (Subtle universe) তুলনায় ঐ অসংখ্য গ্রহতারামণ্ডল সমন্বিত স্কুলজগৎ (Gross universe) নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর, সমগ্র স্কুলজগতের তুলনায় সূর্য একটি বিন্দু মাত্র, আমাদের পৃথিবী আবার এই সূর্যের তুলনায় একটি বিন্দু (dot) মাত্র। এই পৃথিবীর কোটি কোটি জীবের তুলনায় একটিমাত্র জীবের অস্তিত্ব (তিনি যত বড়ই হোন) নিতান্তই নগন্য। ঐ একটা মানুষকে সর্বশক্তির মূলাধার পরমাত্মার সঙ্গে তুলনা করাই বাতুলতা। এহেন একটা নগন্য জীবকে হিরণ্যাক্ষ হিরণ্যকশিপু রাবণ কংসাদিকে বধ করবার জন্য পূর্ণ পরমেশ্বরের অবতরণ কল্পনা একেবারে প্রলাপপোক্তি।
তিনি সর্বব্যাপক বলে ঐসব দুষ্কৃতকারীর মধ্যেও আছেন ইচ্ছা করলেই তিনি অতি সহজেই তাদের যবনিকাপাত ঘটাতে পারেন। তাছাড়া কালবশে সবাইকে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়, কাজেই পরেমশ্বর বিক্ষিৎ অপেক্ষা করলেই, স্বাভাবিক কালবশেই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হত কিংবা কোন উৎকট ব্যাধির বীজাণু বিশেষকে হুকুম করলেই ভগবানের বিনাশায় ১ দুষ্কৃতাম এই মহৎ কার্য অল্পায়াসেই সম্পন্ন হতে পারত, তার জন্য দয়াল হরিকে কচ্ছপ শূকর বা বিভিন্ন মানুষ মূর্তি গ্রহণ করার কষ্ট স্বীকার করতে হত না, সত্যসন্ধ ঋষিদের বেদ উপনিষদ মুখে 'অজ একপাৎ' ইত্যাদি যে সত্য প্রকাশ করেছিলেন, এক এক অবতারে, ভিন্ন ভিন্ন পরস্পর বিরোধী বাক্য বলে স্বমত খগুন বা মণ্ডনও করতে হত না।।।
এই অবতারবাদ দেশের বহু সর্বনাশ করেছে। এই অবতারবাদের জন্যই বিভিন্ন সম্প্রদায়, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে দ্বেষাদ্বেষী, এক সম্প্রদায়ের অবতার অন্য সম্প্রদায়ের মান্য নয়, বহু স্বকপোলকল্পিত গ্রন্থ রচিত হয়ে নানা বিকৃত সত্য পরিবেশন চলে আসছে। চিন্তা করে দেখুন, যত অবতার এসেছেন এই ভারতবর্ষে। কেন। ভারতবর্ষেই কি শুধু সাধু জন্মান এবং তাঁরা দুর্জনদের যারা নির্যাতিত হন। এইজন্য কি বেছে বেছে। কেবল ভারতবর্ষেই কি ভগবানকে বার বার 'পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম' জন্ম নিতে হয়েছে। শুধু ভারতবর্ষেই কি ধর্ম মাঝে মাঝে রসাতলে চলে যায়, এইজন্য 'ধর্ম সংস্থাপনার্থায়' তাঁকে এইখানেই আসতে হয়। আশ্চর্য ঈশাবতারে ভগবান যা বলে গেলেন, মুসাবতারে তার বিরোধী বাক্যে শোনা যায় খ্রীষ্ট ভগবানের ভক্তগণ, মহম্মদ ভগবানের কথা মানতে রাজী নয়। রাম অবতারে তিনি যা বলে যান, কৃষ্ণ অবতারে তাঁর উক্তিতে অন্য রকম দেখা যায়। একই ভগবানের বারবার জন্মগ্রহণের ফলে বুঝি যোগচ্যুতি ঘটে। স্মৃতিভ্রংশ দেখা যায়। বুদ্ধরূপে তিনি যা বলে যান এই ভারতবর্ষে, শঙ্কররূপে জন্মগ্রহণ করে তিনি আবার তা খণ্ডন করেন। চৈতন্যরূপে অবতীর্ণ হয়ে আবার পূর্বজন্মের কথা ভুল বলে, 'মায়াবাদীর মিথ্যা উক্তি' বলে খণ্ডন করে যান। এইরকম এক একটি ব্যক্তিগত অবতারের দল এসে এমনভাবে এক একটা মতবাদের সৃষ্টি করে যান, যাতে তাঁরই পরমবাক্য বেদ উপনিষদও পাত্তা পায় না। ভগবান এক একবার জন্মে এক এক অবতাররূপে স্বীয় ভক্তগণকে যা বলে যান, অন্য অন্য অবতারের ভক্তরা তাতো মানেই না, বরং পরস্পর পরস্পরকে 'নাস্তিক', 'পাষণ্ডী', 'মায়াবাদী', 'অসুর' ইত্যাদি মুখরোচক বাক্যে আপ্যায়িত করে থাকেন।।
ভগবান নাকি মৎস্যরূপে, কুর্মরূপে, বরাহরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; Theory of Evoluton অনুযায়ী তাই বলে কিন্তু মৎস্য কুর্ম বরাহের বংশগুলি উন্নত বা দিব্যরূপ হতে পারে নি কিংবা ভগবান ঐ সব রূপ পরিগ্রহ করেছিলেন বলে ঐ গুলি প্রতীকরূপে কোথাও পূজিতও হয় না। বরং ভক্তরা ভগবানের ঐ মূর্তি-মৎস্য কূর্ম বরাহাদির বংশগুলিকে 'হৃদয়স্থ' না করে উদরস্থ' করতে বাগ্ন। হৃদয় বিহারী ভগবান 'লীলা রসাস্বাদনের' নিমিত্ত যে সব মূর্তি পরিগ্রহ করেছিলেন, ভক্তরাজগণ সেগুলি 'উদারবিহারী' হলে কেমন হয় সেই রসনার তৃপ্তিকর রসাস্বাদন করে চলেছেন।।
অন্যান্য অবতারদের অবশ্য মূর্তি, অর্চ্চা, ধড়া, চূড়া, জুতা, জামা, দাঁত, হাড় সকল কিছুরই পূজা হয়, আবার বলা হয় এগুলি নাকি নিতা। চিন্ময়। অপ্রাকৃত। এক একদল উপাসক আবার Measurement করে কোন্ ভগবান এক আনা, কোনটি দু' আনা, চারি আনা, ছয় আনা, বার আনা, কোনটি পুরাপুরি যোল আনা তাও নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে ফেলেছে।।
প্রত্যেকেই নিজ নিজ উপাস্য অবতারকে নিত্য ভেবে ভগবানের অন্য অবতারবৃন্দকে কোন যুক্তিতে উপেক্ষা বা হেয় করে। যদি সকল অবতারের দেহ 'নিতা', অপ্রাকৃত হয় এবং সকলেই স্ব স্ব ধামে পরিবারসহ নিত্যলীলার রসাস্বাদনে ব্যাপৃত থাকেন, তাহলে জগৎকারণ পরমেশ্বরের বহু নিত্যদেহে অধিষ্ঠান স্বীকার করতে হয়। কিন্তু ভগবানের বহুত্ব স্বীকার্য কি। শুধু ভারতবর্ষের প্রতিই শ্রীভগবানের পক্ষপাতিত্ব আছে তাই এখানের সাধুগুলিকেই পরিত্রাণ এবং দুর্জনের বিনাশের জন্য তাঁকে বারবার অবতীর্ণ হওয়ার শ্রম স্বীকার করতে হয়, তিনি যে কেবল ভারত-উদ্ধারের জন্যই Duty bound এমন কি স্বীকার করা যায়। যদি বলেন যে, না না, তিনি সর্বত্রই জন্মাচ্ছেন এবং শুধু এই ব্রহ্মাণ্ডের নয়, অন্যান্য ব্রহ্মাণ্ডেরও সাধু-পরিত্রাণ, দুর্জন বিনাশরূপ পবিত্র কর্ম তাঁকে করে মরতে হয়, এবং প্রতি জন্মের প্রতিবারের দেহই নিতা হয়, তাহলে বেচারার শ্রীভগবানেরই ত Cycle of birth and death এর গোলকচক্রে ঘুরে মরতে হচ্ছে।। 'সর্বজ্ঞ' পুরাণকাররা এবং 'লীলা রসাস্বাদনকারী' ভক্তরাজ প্রভুপাদরা ছাড়া এই 'অপ্রাকৃত তত্ত্ব' কোন যুক্তিবাদী বিবেকী পুরুষের হৃদয়ঙ্গম হওয়া শক্ত। মৎস্য অবতারের বর্ণনায় পুরাণকার বলছে প্রলয়ঙ্কর প্লাবনে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার সময় মনু যখন তর্পণ করছিলেন, হঠাৎ পরমেশ্বর পুঁটি মৎস্যরূপে তাঁর অঞ্জলি মধ্যে পতিত হলেন। দেখতে দেখতে পুঁটি ভগবানের কলেবর বিংশতি অযুত যোজন ব্যাপী বড় হল আর জলমগ্না কূর্মরূপে মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠে ধারণ করলেন, দেবদৈত্য প্রাণপণে সমুদ্র মন্থন করল, শ্রীভগবানকেও ভক্তানুগ্রহকল্পে মন্থনাঘাতে কিরকম রসের সঞ্চার হয় সেই রসটুকু আস্বাদনের জন্য মন্থনদণ্ডাঘাত সহ্য করতে হল। অহো অবিদ্যাগ্রস্ত ভক্তদের জন্য ভক্তবৎসল প্রভুকে কত না দুঃখ ভোগ করতে হয়। ঐ মন্থনদণ্ড যন্ত্রণা ভোগের পুরস্কারও ভগবান পেলেন - সমুদ্রমন্থনকালে শ্রীদেবী সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়ে মুকুন্দকে বরণ করলেন। তারপর অমৃত নিয়ে দেব দৈতো লাগল বিরোধ। শ্রীভগবান এই মোহিনী মূর্তি দেখে অসুরদের মনে সত্ত্বগুণের উদয় হওয়ার পরিবর্তে তারা কামোন্মত্ত হয়ে উঠল। মুগ্ধ হয়ে তারা অমৃত কুস্তুটি মোহিনীর হাতে দিয়ে বিরোধ মীমাংসা করে দেওয়ার প্রস্তাব করল। দেব ও অসুরদেরকে দুই পৃথক পংক্তিতে বসিয়ে, ঐ মোহিনী ওরফে শ্রীভগবান দৈত্যদেরকে নানা ছলাকলায় ভুলিয়ে, বঞ্চিত করে, দূরস্থ দেবতাদেরকে অমৃত পান করালেন (ভাগবত, ৮ স্বন্ধ) না হলে লীলা। রাহু ছদ্মবেশে অমৃত পান করে ফেলেছিল, চন্দ্র সূর্য তা চিনিয়ে দিতে, সর্বজ্ঞ কামিনী-ভগবান তখন জানতে পেরে, নিজমূর্তি ধারণ করে চক্র দ্বারা রাহুর মাথা কেটে ফেললেন। কিন্তু সে অমৃত পান করেছিল, তাই মরল না এবং সেই আক্রোশে আজও রাহু চন্দ্র সূর্যকে গ্রাস করে থাকে (ভাগবত, ৮ স্বন্ধ)। এখানে ভূগোল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সবজান্তা পুরাণকারের কিঞ্চিৎ বিরোধ দেখা যাচ্ছে। তা হলই বা এখানে 'নিখিলশাস্ত্র রাজচক্রবর্তী (বৈষ্ণবমতে) ভাগবতের কাছে বিজ্ঞানের পরাজয় অবশান্তাবী। তারপরে ব্রহ্মার নাসারন্ধ্র থেকে অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ বরাহ শিশু ওরফে বরাহ ভগবানের উৎপত্তি। 'ইত্যাভিধ্যায়তো নাসা বিবরাৎ সহসা অনয়। বরাহতোকো নিরগাদঙ্গুষ্ঠ পরিমাণকঃ।।। হিরণ্যাক্ষ বধ, পৃথিবীর গর্ভে নরক নামক অসুর-উৎপাদন আর জলমগ্না পৃথিবীর উদ্ধার সাধন-এই তিনটি মহৎ কার্যের অনুষ্ঠানেই বরাহ-ভগবানের লীলা পর্য্যবসান। হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে মাদুরের ন্যায় জড়িয়ে শুয়েছিল। বরাহ ভগবান 'ঘ্রাণেন পৃথ্বাঃ পদবীং বিজিয়ন' পশুর ন্যায় ঘ্রাণ নিতে নিতে খোঁহ্ যৌত করতে করতে (11) দৌড়ে এসে তার মস্তকের নিম্নদিক দিয়ে পৃথিবীকে দন্তে তুলে ধরলেন। বিয়ম যুদ্ধ, অন্তে হিরণ্যাক্ষ বধ। হিরণ্যাক্ষ বধ ভগবানের পক্ষে সহজ সাধ্য। পৃথিবী শব্দ স্ত্রীলিঙ্গ, কাজেই তার গর্ভে পুরোৎপাদনও সম্পূর্ণ ব্যাকরণ সঙ্গত।" (সোহহং স্বামীর শ্লেষ) ।। শ্রীভগবানের ঐ লীলাদর্শন করে, স্মরণ করে এবং পাঠ করে, 'অপ্রাকৃত ভক্তজনের অবিরলধারে অশ্রুবর্ষণ ও লীলাস্ফুরণ অসম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের মত যে সব প্রাকৃতজন 'অপ্রাকৃত ভক্ত হয়ে বিবেক বস্তুটি শ্যামকুণ্ডু বা যমুনার জলে বিসর্জন দিয়ে বসে নি, তাদের মনে স্বতঃই প্রশ্ন জাগে- পৃথিবীকে যদি মাদুরের মতই জড়িয়ে হিরণ্যাক্ষ শুয়েছিল, তাহলে সে কিসের উপর দাঁড়িয়ে বরাহ-ভগবানকে ভীষন গদাপ্রহারে -'লীলা রসাস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। ভগবানের কথা বাদ দিলাম, কেন না 'লীলা রসাস্বাদনকারী। 'অপ্রাকৃত ভক্তগণ তাঁর জন্য বুক পেতে দিতে পারেন। কিন্তু ভক্তবৃন্দের আশ্রয় ভূমি কি ছিল?
তারপর দয়াময় ভগবান বিবট নরসিংহ মূর্তি ধারণ করে হিরণ্যকশিপুর নাড়িভুড়ি ছিন্ন করলেন। কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্রহ্মা যে এভাবে মাঝে মাঝে অসুরগুলোকে বর দিয়ে তাঁকে অবতীর্ণ হতে বাধ্য করেন, এজন্য মৃদু তিরস্কার করলেন। যে প্রহ্লাদের উর্দ্ধতন একুশ পুরুষ ছিলই না, লীলাবৈকলো, ভক্ত প্রেমে বিগলিত অর্জনর-অর্থগণ্ড শ্রীভগবান তাঁর উর্দ্ধতন একুশ পুরুষেরই উদ্ধারের ব্যবস্থা করে ফেললেন। পুরাণকারদেরই মতে 'সত্যযুগে পূর্ণং পূর্নং পাপং নাস্তি তবুও সত্যযুগে ভগবানকে ভাগবতকার চার চারবার জন্মগ্রহণ করিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সত্যযুগে পাপই যদি ছিল না, তাহলে পৃথিবীকে দু' দু'বার জলমগ্ন করে পাপ প্রক্ষালনের রহস্যাটা যে কি তা কেবল ভাগবতকার এবং 'অপ্রাকৃত লীলাবিগ্রহের অপ্রাকৃত ভক্তজনেরই' সহজবোধ্য।। ত্রেতাযুগে ভগবান বামনরূপে কশ্যপ গৃহে জন্ম নিলেন। এই অবতারে সত্যস্বরূপ শ্রীভগবান, 'সবা সত্যনিষ্ঠ বিশ্ববিজয়ী বদান্যবর বলীকে যাচক বেশে ছলনা করেছিলেন। এবং তার সাম্রাজ্য কাপুরুষ গুরুপত্নীগামী পাষণ্ড ইন্দ্রকে প্রদান পূর্বক পৌরাণিক ভগবানোচিত সদৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছিলেন।' (সোহহং স্বামী)। বান করে বলি হলেন পাতালস্থ। ওখানে যদি তিনি পাষণ্ড ইন্দ্রকে দলন করে বলীকে পুরস্কৃত করতেন তাহলে বরং দুস্কৃতের বিনাশ এবং সাধুর পরিত্রাণ যথার্থ ভাবে হত। ব্রহ্মা যখন বললেন- 'হে ভূতেশ। এই হাত সর্বস্ব বলীকে মোচন করুন। এ নিগ্রহ যোগা নয়। সত্যরক্ষার জন্য অকাতরে সর্বসম্পদসহ নিজেকেও আপনার চরণে বিলিয়ে দিয়েছে।' তদুত্তরে ভাগবতকারের ভগবান বললেন। ব্রহ্মণ। যমনুগৃহামি তদ্বিশো বিধুনোম্যহম্। যম্মদঃ পুরুষং স্তক্কো লোকং মাঞ্চাবমনাতে।। (ভাগবত, ৮, ২২, ২৪) -'হে ব্রাহ্মণ। আমি যাকে অনুগ্রহ করি, তাকে সকল সম্পদ হতে বঞ্চিত করি। কারণ, পুরুষ সম্পদে মত্ত ও অবিনীত হয়ে সমস্ত লোককে, এমন কি, আমাকেও অবজ্ঞা করে।' ভগবানের এই প্রাণতোষিণী অমৃত বাক্য শ্রবণ করে ভক্তদের প্রাণ ঠাণ্ডা হতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতজনদের মনে স্বতাই প্রশ্ন জাগে তাহলে কি তিনি বলীকে সর্বহারা পাতালবাসী করে অনুগ্রহ করে অনুগ্রহ (!) করলেন আর ইন্দ্রকে করলেন নিগ্রহ (!) স্বর্গদান করে। পূর্ব অবতারে যে ইনি মোহিনী মূর্তি ধারণ করে দৈতাদেরকে বঞ্চিত করে দেবতাদেরকে অমৃতদান 'নিগ্রহের' নামান্তর। কী অপূর্ব লীলা। প্রভু কি তাহলে বলীর সর্বসম্পদ হরণ করলেন, পাছে বলী মত্ত হয়ে অবিনীত হয়, তাঁকে অবজ্ঞা করে। কিন্তু বলীর চরিত্রে ত, অন্ততঃ সেদিনকার ব্যবহারে কোন দম্ভবা দুবিনীত ভাব দেখা যায় নি। ভগবানকে অবজ্ঞা করা ত দূরের কথা, বামনদের বলীর যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হওয়া মাত্রেই, তিনি তাঁর পাদদ্বয় ধৌত করে, পাদোদক মস্তকে ধারণ করে, ভক্তিবিনম্র চিত্তে আবাহন জানিয়ে বলেছিলেন অদ্য নঃ পিতরস্বপ্তা অদা নঃ পাবিতং কুলম্।
অদ্য দ্বিষ্টঃ ত্রাতুরয়ং যদ-ভবানাগতো গৃহান্।। (ভাগবত, ৮, ১৮, ৩০, ৩২) অদ্য আমার পিতৃগণ তৃপ্ত হলেন, কুল পবিত্র হল, এই যজ্ঞ সার্থক হল, যেহেতু আপনি আমার গৃহে আগমন করেছেন। বলির এই কথাগুলির কি সম্পদ মত্ততা বা দম্ভের লক্ষণ? বামনাবতার বিনিময়ে বর দিলেন- "এখন সুতলে বাস কর, সাবর্ণি মন্বস্তরে তুমি ইন্দ্র হবে।' দয়াময় হরি কী অপূর্ব স্বেচ্ছায় দান করে দিচ্ছেন, ভাগবতকারের ভগবান তাঁকে সাবর্ণি মন্বন্তরে সেই ইন্দ্র হওয়ার বর দিয়ে চরিতার্থ করেছেন। পুরাণকারদের এই অবতারতত্ত্ব শুনে ভক্তের রোমাঞ্চ হতে পারে, প্রেমাশ্রুও ঝরতে পারে কিন্তু যার বিবেক আছে, তিনি নিশ্চয়ই রক্তে উষ্ণতা অনুভব করবেন।
পরশুরামরূপে ভগবানকে এবার অবর্তীর্ণ করালেন পুরাণকার। এই অবতারে প্রভু মাতৃহত্যা এভং ক্ষত্রিয়দের আবালবৃদ্ধবনিতাকে একুশবার নাকি কুঠারে করে কেটে কুচি কুচি করেছিলেন। এই অবতারে তিনি বীভৎস উগ্র ও ভয়ানক রসের লীলা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এও বাহা ইনি বেঁচে থাকতে থাকতেই শ্রীভগবান অর্ধাংশে রাম, সিকি অংশে ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন দু' দু'আনা অংশে জন্মালেন। কী ভীষণ প্রহেলিকা। পরশুরামরূপে ভগবান জন্মগ্রহণ করে কুঠার হস্তে মার মার কাট কাট লীলা যখন করে চলেছেন, তখনই আবার তিনি চারি অংশে জন্ম নিলেন। রাম বনাম পরশুরাম, দুই ভগবানে যে একবার শক্তি পরীক্ষাও হয়েছিল, রসিক ভক্তজন তারও রসাল কর্ণনা দিয়েছে। বাল্মীকির রামচন্দ্র আদর্শ মানব, সম্প্রদায়ীরা তাঁকেই 'অবতার' 'পূর্ণ ভগবান' বলে খাড়া করেছে। তাঁর দেহান্তকালে নাকি গরু, গাধা, শৃগাল, শকুন, তির্ষকযোনি সবাইকে ব্রহ্মা শতকোটি দিব্য বিমান এনে স্থাবর জঙ্গম প্রাণী সহ বৈকুণ্ঠে নিয়ে গেলেন। অথচ এই সর্বজ্ঞ প্রভুর পত্নী বিরহে বিলাপ, পথে ঘাটে প্রান্তরে 'হা সীতা, হা সীতা' বলে ক্রন্দনের সুন্দর আলেখ্য, উপাসনারত শম্বুক বধ (শূদ্র বলে।) এবং কিঞ্চিৎ ছলনা করে বালী বধ ইত্যাদিরও বর্ণনা আছে। ঘরে ঘরে তাই চলেছে রামের মূর্তিপূজা, সলাঙ্গুল হনুমানও মন্দিরে মন্দিরে পূজিত। বাল্মীকি যে সত্যসন্ধ, মহারত, পিতৃভক্ত, প্রজাবৎসল, মানবপ্রেমিক রামের বর্ণনা দিয়েছেন সেই মহত্তম আদর্শ সম্প্রদায়ী ভক্তরা গ্রহণ করে নি।
তারপর ভগবানকে জন্মাতে দেখি হলধর বলরাম ও কৃষ্ণরূপে। বলরামরূপে প্রভু সদা কাদম্বরী সুরাপানে মত্ত থাকতেন। নিরীহ বৃদ্ধ সুতহত্যা, কৃষ্ণের গোপিনীদের সঙ্গে সরস লীলা, যমুনা জল ক্রীড়া করতে রাজী না হওয়ায় হলদ্বারা জোর করে আকর্ষণ করায় পৌরাণিক ভগবান সুলভ বিক্রম প্রকাশাদি ছাড়া আর কোন লীলাবিস্তার করেছিলেন কি না পুরাণকার সে বর্ণনা দেয়নি। অবতারতত্ত্ব প্রতিষ্ঠাকারী পুরাণকারদের মতে 'চাংশ কাল পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং'। কৃষ্ণরূপে পরমাত্মা বস্ত্রহরণ, রাসলীলাদি সাব্বী পরিত্রাণমূলক অনেক গোপন লীলারসের অনুষ্ঠান করে তাঁর ভক্তদের সামনে 'পূর্ণ ভগবত্তা' প্রামণ করে গেছেন। ঐ সব অশ্লীল লীলা রসাস্বাদনে অপ্রাকৃত রসিক ভক্তদের তৃষিত প্রাণ এমনই পরিতৃপ্ত যে, তারা এঁর, নিত্যবৃন্দাবনে 'বেদবিধিব অগোচর রতনবেদিকোপরি' শ্রীমতির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমাপ্লুত অবস্থার ধ্যানে রসাবিষ্ট। 'যৎখদাচরতে শ্রেষ্ঠ-শ্রেষ্ঠ জন যা আচরণ করে যান, ইতর জন তাই অনুসরণ করে" এই কৃষ্ণ বাক্যানুযায়ী, সেজন্য কৃষ্ণভক্তগণ্য গোপন রাসলীলা এবং পরকীয়া প্রেমের অনুসরণ ও অনুকরণ করে কত যে প্রাকৃতজনের ভববন্ধন মোচন করে চলেছেন- তার ইয়ত্তা নেই। (মনে রাখবেন, এসব ভাগবতকারেরই সৃষ্টি মহাভারতের বেদব্যাস এ সব লিখেন নি (!)
ভাগবতকার বুদ্ধকেও অবতার বলে বর্ণনা করে বলেছে তিনি 'নাস্তিকাবতার'। ভগবান বুদ্ধাবতার হয়ে পাষণ্ডবেশে অসুরদিগকে নানা উপধর্মের উপদেশ দেন'। (ভাগ, ২য় স্কন্ধ, ৭ অধ্যায়)। তাহলে, করুণাঘন বুদ্ধদেব যাঁদেরকে উপদেশ দিয়ে গেলেন, তাঁরা অসুর। পাষণ্ড। পৃথিবীর চারিদিকে যত বৌদ্ধ জৈন তাঁরা। সবাই পাষণ্ড, অসুর আর একমাত্র যারা গোপীজনবল্লভের সেবায় সখী অনুগত ভজন করছেন সেই সব কৃষ্ণভক্তরাই বুঝি একমাত্র প্রকৃত ভক্ত। একই ভগবান এক একবার জন্মে বুঝি খামখেয়ালি করে যান? এই অবতারবাদের মূলে যে জঘন্য সাম্প্রদায়িকতা, স্বার্থবোধ এবং কুৎসিত বিদ্বেষভাব আছে তা সহজেই অনুমেয়।
এইবার দশম অবতার কল্কির আসার কথা। পুরাণকারদের মতে, এইবার ভগবান কল্কিরূপে জন্মে 'অশ্বমাণ্ডগমারুহ্য অসিহাসাধুদমনম্' অর্থাৎ দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে অসি হস্তে দুষ্কৃতগণকে দমন করে লীলা দেখাবেন। তিনি যে বিষ্ণুযশা ব্রাহ্মণের ঘরে জন্মাবেন এ সমস্তও তিনি বোধ হয় কোন অপ্রাকৃত Telephone যোগে (১) জানিয়ে দিয়েছেন। তবে, ভক্তদের মনোভিলাস এবং অসার ভবিষ্যদ্বাণী পুরণের জন্য। কেন যে এখনও তিনি জন্মাচ্ছেন না, সেইটে ভাবনার বিষয়। মনে হয়, অজ্ঞ পুরাণকারদের অস্ত্রজ্ঞানের দৌড় ত অসি পর্যন্ত, কাজেই তারা ত অসি হস্তে অবর্তীর্ণ হওয়ার ভবিষ্যদ্‌বাণী করে চলে গেছে, ইতিমধ্যে যে প্রাকৃত জন অ্যাটম ও হাইড্রোজেন বোমাদি ভীষণ মারাত্মক আগ্নেয় অস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সামান্য অসি হস্তে এই সমস্ত সাধুদের (1) সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব হবে কিনা, হয়ত সেই চিন্তাতে তিনি ভাবিত আছেন। তাছাড়া, সময়ও ত এখনও আছে, পুরাণকারের মতে কলির পরিমাণ ৪২০০০০ বছরের মধ্যে ৫০০০ বছর গত হয়েছে মাত্র। কিন্তু তাঁর ঐ দীর্ঘসূত্রতা এবং ভীতির জন্য ত আর সাধুর পরিত্রাণ, দুষ্কৃত বিনাশ কিংবা ধর্ম সংস্থাপনাদি কার্য বন্ধ থাকতে পারে না। কাজেই তাঁকে এখন নারদ ব্রহ্মাদি অমাত্যসহ শলা-পরামর্শ করার সময় দিয়ে, তাঁর ভক্তরাই ইত্যবসরে বহু অবতার সৃষ্টি করে ফেলেছে। এক এক সম্প্রদায় তাদের উপাস্য বা প্রতিষ্ঠাতাকেই স্বয়ং ভগবান অবতার দাঁড় করিয়েছে।
জৈমিনী পূর্ব-মীমাংসাতে বলেছেন যে, যাতে অনুশাসন, উপদেশ, আদেশ এবং নিষেধ থাকে তাই শাস্ত্র নামের যোগ্য। কেবলমাত্র প্রতিষ্ঠিত এবং পরিনিষ্ঠিত তত্ত্বের কথা থাকলে তাকে শাস্ত্র বলা যায় না। জৈমিনী এই দৃষ্টিতেই বেদের জ্ঞানকাণ্ড খণ্ডন করেছেন যে, বেদের জানকাণ্ডে পরিনিষ্ঠিত বিশুদ্ধ সত্যের প্রকাশ। থাকলেও তাতে উপদেশ রয়েছে। অতএব তা শাস্ত্রের মর্যাদা পাবার যোগা। গীতার উপরোক্ত শ্লোকে পরোক্ষ উপদেশ এবং প্রেরণা রয়েছে এই দৃষ্টিতেই তা মনন করা উচিত।
বেদ বলেছেন- একোহহং বহুস্যাম বহু সৃষ্টিং প্রজায়েয়। ইন্দ্রঃ মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে। অবতারবাদীরা অবতারবাদ সমর্থনের জন্য বহুস্থলেই এই মন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু এখানে ইন্দ্রের অর্থ কি? ইন্দ্র ব্রহ্মবাচক। তিনি তদ্রষ্টাতদেবানুপ্রাবিশৎ এক তিনিই আছেন, আর কিছু নাই। তা হলে অবতার কোথা হতে আসবেন। এই সৃষ্টি, আপনি, আমি সব মিথ্যা যেন একটা স্বপ্ন। সৃষ্টি নাই, জগৎ নাই। যথাপূর্বমকল্পয়ৎ। তিনি কল্পনা করেছিলেন। সবই কল্পনা ব্রহ্ম ও মায়ার মধ্যে তৃতীয় নাই ঈশ্বরই বা কোথায়। তার আবার অবতার। দৃষ্টান্তমাত্রেই সামগ্রিকভাবে ত্রুটিহীন নয় যেমন রজ্জুতে সর্পভ্রম। বেদান্তের এই উপমাটি কেবল অধ্যাস বুঝাবার জন্য। এখানে রজ্জু ব্রহ্মা আর আমরা অর্থাৎ সমগ্র জীবজগৎ অধ্যস্ত বস্তু নিচয় হল সর্প। এই ভ্রম। কার হবে। যার হবে, তার মনে তো সর্পের সংস্কার থাকা প্রয়োজন। কারণ, যে অনুভব করবে সেও তো অধ্যাস্ত। বস্তুর অন্তর্গত। ব্রহ্মের জ্ঞান কি পূর্ব হতে থাকা সম্ভব। মনে যে সংস্কার নাই, তৎ বিষয়ক ভ্রম বা স্বগ্ন কদাপি হতে পারে না। গণ্ডার দেখেছি, সিংহও দেখেছি। এখন স্বপ্নের মধ্যে মন সিংহের মস্তকে খড়গ দিয়ে একটা বিস্তৃতকিমাকার জীব দেখাতে পারে। এমন কি এলাহাবাদের ময়দানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলও দেখাতে পারে। কিন্তু উভয়স্থানই পূর্বে দেখা চাই- অন্ততঃ উভয়স্থান সম্বন্ধে পুস্তক বা লোক মারফৎ কিঞ্চিৎ তপ্রবণ করা চাই, তবেই স্বপ্নে দর্শন সম্ভব। যেমন ধরুন, কাশীর কোন গৃহে নিদ্রিত এক ব্রাহ্মণ দেখেছেন। Brain Centre & মন একটি সূক্ষ্ম অণু বস্তু সে স্বপ্নের জাল বুনেছে। স্বপ্নে ব্রাহ্মণ দেখেছে সে হরিদ্বারের বুদ্ধমেলায় গেছে, অনেক সাধুসন্ত দর্শন করতে করতে এক মহাত্মার নিকট গিয়ে বসল। ব্রাহ্মাণ তাকে বলল সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দিন'। মহাত্মা বললেন 'আচ্ছা দেখি, চঈশ্বর কে? জগৎ কে। আমাকে ঈশ্বর তিনি ধ্যানস্থ হলেন।
একটু বিচার করলেই বোঝা যাবে যে, ঐ মহাত্মা যতই ধ্যান করুন, তাঁহার পক্ষে ঈশ্বর এবং জগৎ সম্বন্ধে সমগ্র কোন ধারণা করা সম্ভব হবে না। কারণ সমস্ত ঘটনাটাই absurd, মনে রাখতে হবে ঘটনাটি ব্রাহ্মণ তাঁর কাশীস্থ স্বগৃহে শয়নপূর্বক নিদ্রিত অবস্থায় দর্শন করেছেন বাস্তবে ব্রাহ্মাণই আছেন আর কেহ সেই গৃহে নাই, তাঁর স্বপ্নদৃষ্ট হরিদ্বার, কুজমেলা, সাধু সন্ত, মহাত্মা, মহাত্মার কথোপকথন এবং ধ্যান- সবই মিথ্যা। তাৎপর্য এই যে, একমাত্র ব্রহ্মাই আছেন, আর কেহ নাই। অজ্ঞাত ও বিকারের ঘোরেই অজ্ঞরা অবতার দেখছে।
Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ঋগ্বেদ ১০/৬১/৫

আক্ষেপ: “বেদে পিতা-কন্যার স*ঙ্গমের অনুমতি আছে”—দাবিটি কি সত্য? সম্প্রতি একটি লেখায় ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫–৭ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১.৪.৩-এর কিছু অনু...

Post Top Ad

ধন্যবাদ