ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Hindusim

Post Top Ad

স্বাগতম

16 February, 2026

ব্রহ্মসূত্র

16 February 0

ব্রহ্মসূত্র

ভ্রাচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী ভারতীয় ইতিহাস এবং দর্শনের গুরুতর অনুসন্ধানদৃষ্টি-সম্পন্ন প্রৌঢ় বিদ্বান। তাঁর তর্কণাসমূহ এবং স্থাপনাসমূহের দ্বারা ভারতীয় ইতিহাসের পুনঃশোধন হচ্ছে। ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অস্মিতাকে ধূমিল করে দেওয়া পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের এবং তাঁদের অনুগামী দেশীয় লেখকদের পূর্বগ্রহবদ্ধ দৃষ্টি এই সু-বিবেচিত ভাবনার দ্বারা খণ্ডিত হতে পারবে — এতে আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে।

ব্রহ্মসূত্রের বিদ্যোদয়ভাষ্য আমার সামনে রয়েছে। এটি শাস্ত্রীজির মৌলিক কর্ম, যেখানে ব্রহ্মসূত্রের মূল প্রতিপাদ্যের সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ কিন্তু শ্রুতিসম্মত অর্থ বৈজ্ঞানিক পরিপাটিতে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্রহ্মসূত্রের উপর Adi Shankara এবং শংকরেতর আচার্যদের ভাষ্যসমূহের অনুশীলন বহু চিন্তাবিদ করেছেন। শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব এবং আর্য চিন্তাধারাকে নিয়ে শংকরোত্তর আচার্যরা ব্রহ্মসূত্রকে তাঁদের অধ্যয়নের বিষয় বানিয়েছেন।

শ্রীকণ্ঠ শৈববিশিষ্টাদ্বৈতের দৃষ্টিতে শৈভাষ্য এবং শ্রীপতি বীর শৈববিশিষ্টাদ্বৈতের দৃষ্টিতে শ্রীকরভাষ্যের রচনা করেন, আর জগন্নাথ তর্ক-পঞ্চানন শাক্ত আগমিক প্রসঙ্গে শক্তিভাষ্যের প্রণয়ন করেন। বৈষ্ণব ভাষ্যকারদের মধ্যে Ramanuja-এর শ্রীভাষ্য, Nimbarka-এর বেদান্তপারিজাত-সৌরভ, Madhvacharya-এর পূর্ণপ্রজ্ঞ, Vallabhacharya-এর শৃণু এবং Baladeva Vidyabhushana-এর গোবিদভাষ্য উল্লেখযোগ্য। রামানন্দী সম্প্রদায়ে ভ্রানন্দভাষ্য এবং জানকভাষ্যের মহত্ত্ব আছে। রামানন্দ দ্বারা নির্মিত বলা হলেও আধুনিক অনুসন্ধানকারীরা এগুলিকে রামানন্দের রচনা স্বীকার করেননি?

শ্রার্যমুনি-কৃত বেদান্তদর্শনভাষ্য এবং স্বামী হরপ্রসাদ বৈদিকমুনি-কৃত বেদান্তসূত্র বৈদিকবৃত্তি আর্য চিন্তাধারার পোষক গ্রন্থ। শংকরের পূর্ববর্তী ভ্রাচার্যদের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়বদ্ধ দৃষ্টির অবিকল নিরূপণ পাওয়া যায় না। যদিও ভাচার্য সূত্র ১।৩।১৬-তে ‘ইতি মন্যন্তে’স্মদীয়াশ্চ কেচিত্’ বলে পূর্ববর্তী বেদান্তাচার্যদের ইঙ্গিত করেছেন।

জীবব্রহ্মের একতা এবং মায়ার কারণে ভিন্নত্বের কল্পনাই শংকরের মূল সিদ্ধান্ত, যার প্রথম সুসংবদ্ধ নিরূপণ তিনি করেন। অতএব সম্প্রদায়বদ্ধ ভাষ্য প্রণয়নের সূত্রপাতের—

১. রামানন্দ সম্প্রদায় ডা० বদরীনারায়ণ শ্রীবাস্তব


শ্রেয় আচার্য Adi Shankara-কেই দেওয়া উচিত। ভ্রাগমিক গ্রন্থগুলিতেও যদিও ‘পরাত্মজীবয়োরৈক্যং ময়াত্র প্রতিপাদ্যতে’ (গন্ধর্বতন্ত্র)–এর মতো উক্তি পাওয়া যায়, তথাপি অদ্বৈতের প্রতিষ্ঠাপন শংকরই করেছেন। শ্রুতিসম্মত আখ্য্যান এবং পরমত নিরাকরণের অপূর্ব তর্কণা ও গভীর চিন্তনার কারণে শংকর ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মস্তিষ্কে আজ পর্যন্ত ছায়া বিস্তার করে আছেন। এটি উল্লেখযোগ্য সত্য যে বিদ্যোদয়ভাষ্যে এই আতঙ্কের প্রভাব নেই। ভাষ্যকার আচার্য শংকর ও অন্যান্য আচার্যদের সঙ্গে বিমত পোষণ করে বৈদিক দৃষ্টিতে সূত্রগুলির ভাষ্য করেছেন। পরমত নিরাকরণের প্রসঙ্গে তাঁর বৈদুষ্য এবং প্রমাণসিদ্ধ সমালোচনা-পদ্ধতির সুন্দর পরিচয় পাওয়া যায়। ‘সূত্রার্থো বর্ণ্যতে যত্র পদৈঃ সূত্রানুসারিভিঃ’ — এই কসৌটিতে বিদ্যোদয়ভাষ্য খাঁটি প্রমাণিত হয়। এখানে বিদ্যোদয়ভাষ্যকারের কয়েকটি মৌলিক স্থাপনার উল্লেখ আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

সূত্রকারের সময়

ব্রহ্মসূত্রগুলির রচয়িতা বাদরায়ণ এবং ব্যাস অভিন্ন বলে বলা হয়। ডা० রাজবলী পাণ্ডেয় ‘হিন্দুধর্ম কোশ’ (পৃষ্ঠা ৪৩৬)-এ লিখেছেন যে বাদরায়ণ ও ব্যাস অভিন্ন। এঁদের সময় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দী। ‘সাম-বিধান ব্রাহ্মণ’-এর অন্তেও আচার্য বদরের উল্লেখ আছে। ডা० সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য ‘ভারতীয় ইতিহাস কোশ’-এ, শ্রী রাণাপ্রসাদ শর্মা ‘পৌরাণিক কোশ’-এ এবং ডা० ভগবতশরণ উপাধ্যায় ‘ভারতীয় ব্যক্তি কোশ’-এ মহাভারত, পুরাণ এবং বেদান্তসূত্রের রচয়িতা হিসেবে Ved Vyasa-কেই মেনেছেন — যাঁর অন্য নাম বাদরায়ণও। কুমারিলভট্ট তন্ত্রবর্ত্তিকে ব্রহ্মসূত্রকে ব্যাসকৃত বলে স্বীকার করেছেন। বাসিকের টীকাকার উম্বেক স্পষ্টীকরণ দিয়ে লিখেছেন — ‘ন্যাসবচনেন দর্শয়তি তথা চেতি’। এখানে ডা० রামকৃষ্ণ ভ্রাচার্য তাঁর গবেষণা-প্রবন্ধ ‘ব্রহ্মসূত্রগুলির বৈষ্ণবভাষ্যগুলির তুলনামূলক অধ্যয়ন’-এ ব্রহ্মসূত্রগুলিকে বেদব্যাসপ্রণীত মানেননি। এ বিষয়ে তিনি যে আপত্তিগুলি উত্থাপন করেছিলেন, শাস্ত্রীজি সেগুলির সবিস্তারে খণ্ডন করেছেন। শাস্ত্রীজি এই বিষয়ে বিস্তৃত অধ্যয়ন ও দার্শনিক সূক্ষ্মবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন।

ডা० শ্রাচার্য তর্কপাদে নিরাকৃত মতগুলির নিরাকরণ প্রসঙ্গে ইতরেতর প্রত্যত্ব (২।২।১৬), পূর্ব নিরোধ (২।২।২০), প্রতিসংসখ্যাপ্রতিসংখ্যা নিরোধ (২।২।২২) প্রভৃতি বৌদ্ধমত থেকে পরিগৃহীত শব্দের কারণে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে সূত্রগুলির বর্তমান রূপ বৌদ্ধদর্শনের বিকাশের পরবর্তী; অতএব ব্যাসের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। শাস্ত্রীজি এই গুরুত্বপূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার উত্তর দিয়ে বলেন যে সূত্রকার কেবল ব্রহ্মসত্তাকে আরও দৃঢ় ভিত্তির উপর সুপুষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চান; সেখানে যে বিরোধী বিকল্প থাকতে পারে, সেগুলির স্বতঃ উদ্ভাবনা করে সেই ভিত্তিতেই বিবেচনা উপস্থাপন করেন। সূত্রকারের ভাবনা বৌদ্ধদর্শন অথবা অন্য কোনো প্রচলিত মতের নিরাকরণ নয়।

জাপানি বিদ্বান যামাকামি সীগনও ‘সিস্টেম শ্রফ বুদ্ধিস্টিক থাট’-এ এই শব্দগুলিকে বৌদ্ধদর্শনে অভিমত অর্থের অনুকূল মনে করেন না। শাস্ত্রীজি ‘সংখ্যা’ পদকে জ্ঞান অর্থে প্রয়োগ মনে করেছেন। সাংখ্যদর্শনের নামকরণেও এই অর্থ নিহিত। প্রকৃতপক্ষে আচার্য শংকর তাঁর ভাষ্যে সূত্রকার কর্তৃক উদ্ভাবিত জগতের মূল কারণগুলিকে সমুদায়মাত্র বলে মান্য করা বিকল্পের বিবেচনায় কিছু সাদৃশ্য পেয়ে নিজের কালে বিকশিত বৌদ্ধদর্শনের মান্যতাগুলিকে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন।

বাস্তব অবস্থা এই যে এই সূত্রগুলিতে ‘প্রতিসংখ্যানিরোধ’ পদের অর্থ আচার্য শংকর এবং বাচস্পতি প্রভৃতি ব্যাখ্যাকাররা করেছেন — ভাব (বস্তু)-এর জ্ঞাননিমিত্তক নিরোধ (অভাব) হয়ে যাওয়া। এই অবস্থাই সংসারে জীবন্মুক্ত ব্যক্তির বলে বর্ণিত। সংসার পূর্ববৎ চলতে থাকলেও জীবন্মুক্তের কাছে তা তুচ্ছসদৃশ, না থাকার মতো — এই অভাবই ওই পদ দ্বারা বোঝানো হয়েছে; এটাই এর তাৎপর্য। বৌদ্ধদর্শনে আচার্য বসুবন্ধুর মতে তত্ত্বজ্ঞানরূপ প্রজ্ঞা (প্রতিসংখ্যা) দ্বারা সানব ধর্ম অথবা ক্লেশের বিযুক্তি বা ক্ষয়কে প্রতিসংখ্যানিরোধ বলা হয়েছে। এই অবস্থা জীবন্মুক্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? তা যে প্রক্রিয়াতেই লাভ করা হোক — বৌদ্ধদর্শন প্রতিপাদিত পদ্ধতিতে বা বৈদিকদর্শন প্রতিপাদিত পদ্ধতিতে।

এই অবস্থা বৌদ্ধদর্শনে এই পদগুলির পারিভাষিকতাকে শিথিল করে দেয়। শুধু তাই নয়, এই সূত্রগুলিতে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যার দ্বারা জানা যায় যে এখানে ‘অষ্টসাহসিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’-পূর্ববর্তী দুর্বল বিজ্ঞানবাদ অথবা বৌদ্ধপরম্পরা প্রসূত কোনো বিজ্ঞানবাদের নিরাকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই এর কারণ ভাষ্যকারদের উপর তৎকালীন বৌদ্ধদর্শনের প্রভাব এবং তার নিরাকরণের মানসিকতা। এই অবস্থায় প্রকৃত সূত্রার্থ আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এই কারণেই এই বক্তব্য নিরাধার হয়ে যায় যে এই সূত্রগুলিতে বৌদ্ধপরম্পরা প্রসূত সর্বাস্তিবাদ, সৌত্রান্তিকবাদ অথবা অন্য কোনো বাদের নিরাকরণ উপস্থাপিত হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ব্রহ্মসূত্রগুলির সঙ্গে মহাভারতের সংযোগ তিলক স্বীকার করেছেন। গীতা (১৩।৪)-এ ব্রহ্মসূত্রের নির্দেশ প্রমাণ করে যে এদের রচনাকাল সমকালীন হওয়া উচিত। গীতা মহাভারতের অংশ এবং ব্রহ্মসূত্র ও মহাভারত ব্যাসের রচনা — অতএব ব্রহ্মসূত্রগুলির রচনাকাল বুদ্ধের প্রাদুর্ভাব-কালের পরবর্তী বলে মানা যায় না।

ডা० বাসুদেবশরণ আগরওয়াল পাণিনির সময় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী নির্ধারণ করেছেন। অষ্টাধ্যায়ী-এর সূত্র ‘পারাশর্যশিলালিভ্যাং ভিক্ষুনটসূত্রয়োঃ’ অবলম্বনে ‘পারাশর্য’ পদের সঙ্গে সম্পর্ক করে ‘ভিক্ষুসূত্র’-এর অর্থ ব্রহ্মসূত্র ধরে বিদ্বানরা বাদরায়ণকে পাণিনির পূর্বসমকালিক বলেছেন। ডা० রাজবলী পাণ্ডেয় খ্রিস্ট—

১. ঋষিভির্বহুধা গীতং ছন্দোভির্বিবিধঃ পৃথক্ । ব্রহ্মভূতপর্ববর্জয় হেতুমদ্ধিবিনিশ্চিতঃ ।


কি চতুর্থ শতীতেই ব্রহ্মসূত্রগুলির রচনাকাল এই কারণেই নির্ধারিত করা হয়েছে। ডা० গোপীনাথ কবিরাজ ব্রহ্মসূত্র শাঙ্করভাষ্যের হিন্দি রূপান্তরের ভূমিকায় ভিক্ষুসূত্রকে ব্রহ্মসূত্র মনে করে উদ্ভাবনা করেছিলেন। শাস্ত্রীজি এই ভ্রান্তিরও নিরাকরণ করেছেন। পরাশর গোত্রীয় কপিলের প্রশিষ্য ভিক্ষু পঞ্চশিখের সাংখ্যবিষয়ক রচনা ভিক্ষুসূত্র — ব্রহ্মসূত্র নয়। পাণিনির কাল সম্পর্কেও যে প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্ত্রীজি বিচার করেছেন, তা তাঁর বিস্তৃত অধ্যয়নের পরিচায়ক। তিনি পাণিনিকে বুদ্ধ-পূর্ব সিদ্ধ করেছেন। পাণিনির গুরু আচার্য পর্ব এবং তাঁর ভাই উপবর্ষ সমকালিক ছিলেন। ব্রহ্মসূত্রগুলির উপর বোধায়ন রচিত বৃত্তির সংক্ষেপ উপবর্ষ করেছিলেন। এই কারণে ব্রহ্মসূত্র-বৃত্তিকার বোধায়নের কাল পাণিনির পূর্ববর্তী। এমন অবস্থায় ব্রহ্মসূত্রগুলির রচনা বুদ্ধ-পরবর্তী কালে হয়েছে বলে মানা সর্বথাই অসম্ভব।

পাণিনি কর্তৃক প্রয়ুক্ত শ্রমণ, নির্বাণ, চীবর এবং মস্করি পদগুলিকে কেন্দ্র করে ডা० আগরওয়াল ‘পাণিনিকালীন ভারতবর্ষ’-এ যে উদ্ভাবনাগুলি করেছিলেন, তাতে পাণিনিকে বুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। শাস্ত্রীজি শতপথ, তৈত্তিরীয় আরণ্যক, বৌধায়ন শ্রৌতসূত্র, মহাভারত, ঋক্ তন্ত্র ব্যাকরণ, গীতা, বাল্মীকি রামায়ণের ভিত্তিতে উক্ত শব্দগুলির প্রয়োগ বুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রমাণ করেছেন। তাৎপর্য এই যে, কেবল শব্দমাত্র দেখে পাণিনি অথবা বাদরায়ণকে বৌদ্ধ-পরবর্তী প্রতিপন্ন করা যুক্তিযুক্ত নয়। ‘বেদান্তদর্শনের ইতিহাস’ গ্রন্থে শাস্ত্রীজি বিস্তৃতভাবে আপত্তিগুলির সমাধান করেছেন। গুণমতি, ধর্মকীর্তি, দিঙনাগ প্রভৃতি বৌদ্ধ দার্শনিকদের কাল সম্পর্কেও তিনি নতুন করে বিচার করেছেন। শাস্ত্রীজি ভারতীয় ইতিহাসেরও দৃঢ় ভিত্তিসম্পন্ন বিদ্বান!

পুরাণগুলিতেও ব্যাস ও বাদরায়ণকে অভিন্ন ব্যক্তি বলা হয়েছে। ‘বায়ু-পুরাণ’-এর ১৪০ অধ্যায়ে পরাশর-পুত্র Ved Vyasa কর্তৃক পৌরাণিক কাহিনি কথন এবং বেদানুকূল সূত্র-নির্ণয়ে জীব–ঈশ্বর–ব্রহ্মের ভেদ নিরসনের উল্লেখ আছে—

১.পরাশরসুতো ব্যাসঃ কৃত্বা, পৌরাণিকোঁ কথাম্
সর্ববেদার্থঘটিতাং চিন্তয়ামাস চেততি ।

জীবেশ্বরব্রহ্মভেদো নিরস্তঃ সূত্রনির্ণয়ে ।
নিরূপিতং পরং ব্রহ্ম শ্রুতিযুক্তবিচারতঃ । ২০।২২

বায়ুপুরাণের এই প্রসঙ্গ মহাভারতের বনপর্ব (১৬১।১৬)-এও পাওয়া যায়—

এতত্তে সর্বমাখ্যাতমতীতানাগতং ময়া মায়ুপ্রোক্তমনুস্মৃত্য পুরাণমুবিসংস্তুতম্ ।

যানি বেদবিদাং শ্রেষ্ঠো ভগবান্ বাদরায়ণঃ ধন্যে চ মুনয়ঃ সূত পরাবরবিদো বিদুঃ ।

শ্রীমদ্ভাগবত ১।১।৭


তাৎপর্য এই যে মহাভারতের উপলব্ধ রূপে বায়ুপুরাণের উক্তি উভয়ের সমকালিকতা প্রমাণ করে এবং সূত্রকার ও পুরাণকার ব্যাসের পরিচয় দেয়। Adi Shankara ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে ‘নামরূপে চ ভূতানাং’ (বায়ু० ৬।৬৩), ‘ঋষীণাং নাম ঘেয়ানি যাশ্চ বেদেষু দৃষ্টয়ঃ’ তথা ‘যথতুষ্বৃতু লিগানি নানা রূপাণি পর্যয়ে’ — এই শ্লোকগুলি বায়ুপুরাণ (৬।৬৪, ৬।৬৫) থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এটাও সম্ভবত এই কারণেই যে বায়ু-পুরাণ বাদরায়ণ ব্যাসের রচনা এবং সূত্রকার ও পুরাণকার রূপে ব্যাসের কর্তৃত্ব প্রমাণ করে। ডা० রামকৃষ্ণ ভ্রাচার্য কর্তৃক উত্থাপিত আপত্তির এই অন্তঃসাধ্যের ভিত্তিতে পরিহার হয়ে যায়।

শাস্ত্রীজি উপসংহারে বলেন যে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন Ved Vyasa-এর অপর নাম বাদরায়ণ, এবং ব্রহ্মসূত্রে সূত্রকার রূপে বাদরায়ণের নির্দেশ আছে। স্পষ্ট হয়ে যায় যে ব্রহ্মসূত্রগুলির রচনাকাল মহাভারত যুদ্ধের পূর্ববর্তী সন্নিহিত কালে ধরা যেতে পারে। অতএব এই ভ্রান্ত ধারণা গ্রহণ করা যায় না যে সূত্রগুলির লেখক ব্যাস ব্যতীত বাদরায়ণ নামক অন্য কোনো ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বুদ্ধের পরে সূত্রগুলির রচনা করেছিলেন।

ব্রহ্মসূত্রগুলির তাৎপর্য ইষ্টে না কি অদ্বৈতে

আচার্য শংকর এবং রামানুজাদি বৈষ্ণব আচার্যগণ ও পঞ্চাননের মতো শাক্ত আচার্যগণ ব্রহ্মসূত্রগুলির তাৎপর্য অদ্বৈত, দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত ও স্বরূপাদ্বৈতে বলেছেন। শাস্ত্রীজি স্বাধীন চিন্তার প্রতিপাদন করেছেন। তাঁর বক্তব্য — সূত্রকারের অভিপ্রায় জীবাত্মা ও প্রকৃতির স্বাধীন অস্তিত্ব উপেক্ষা করে ব্রহ্ম অদ্বৈতের উপপাদনে নয়। যদিও ব্রহ্ম না কোনো সজাতীয় তত্ত্ব, না বিজাতীয়, এবং না নিজস্ব কোনো ভেদ বা অংশ প্রভৃতির কল্পনা করা যায়। এমন সচ্চিদানন্দ স্বরূপ ব্রহ্মের উপপাদনই সূত্রকারের লক্ষ্য।

উদাহরণস্বরূপ ‘পূর্ব তু বাদরায়ণো হেতুব্যয়দেশাত্’ (৩।২।৪১) সূত্রটি গ্রহণ করুন। এখানে ব্রহ্মকে কার্যমাত্রের হেতু বলা হয়েছে। এখানে ‘হেতু’ পদ নিমিত্তকারণের বোধক, উপাদানের নয়। জগতের উৎপত্তি ও কর্মফল প্রদানে ব্রহ্মই কারণ। মাণ্ডুক্য উপনিষদে ব্রহ্মকে সকলের কারণ বলা হয়েছে — এষ যোনিঃ সর্বস্য। শ্বেতাশ্বতরে বলা হয়েছে — স কারণং করণাধিপাধিপঃ। তিনি সকলের কারণ এবং করণ ইন্দ্রিয়সমূহের যে অধিপ আত্মা, তিনি সেই আত্মাদেরও অধিপতি। যজুর্বেদে বলা হয়েছে — ইন্দ্রো–বিশ্বস্য রাজতি — পরমাত্মা সকলের নিয়ন্তা। এর অনুসারে বৃহদারণ্যকে বলা হয়েছে — স বা অয়মাত্মা সর্বেষাং ভূতানাং রাজা।

শাস্ত্রীজি জৈমিনি ও বাদরায়ণের মতের মধ্যে কোনো পার্থক্য মানেন না। জৈমিনি কর্মের কারণত্বের উপর জোর দিতে চান, কারণ ব্রহ্ম কর্মের ফলদাতা; ফলপ্রদানে তিনিও কর্মের অপেক্ষা করেন। বাদরায়ণের কেবল এতটুকুই তাৎপর্য যে কর্ম জড় হওয়ায় স্বতঃ—

১. বেদান্তদর্শনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১১৪


ফলরূপে পরিণত হতে অসমর্থ থাকে; অতএব চেতন হওয়া এবং কার্যমাত্রের হেতু হওয়ার কারণে প্রধানত ব্রহ্মকেই ফলপ্রদাতা মানা প্রমাণসঙ্গত। ফল প্রদানের নিমিত্ততা থেকে কর্মকে বাদ দেওয়া যায় না, কারণ ফল তো কর্মেরই প্রাপ্তি। Adi Shankara এবং পঞ্চাননও পরমেশ্বরকেই ফলদাতা বলেছেন, কারণ ধর্ম–কর্মের হেতুও সেই পরমেশ্বর। শংকর কৌষীতকি (৩।৮) এবং পঞ্চানন গীতা (৭।২১,২২) উদ্ধৃত করেছেন। বৈষ্ণব আচার্যরাও ব্রহ্মের সর্বফলপ্রদত্ব প্রতিপাদন করেছেন। অন্যান্য ভাষ্যকারদের থেকে এখানে শাস্ত্রীজির বিশেষত্ব এই যে তিনি উপনিষদের সঙ্গে সংহিতাশ্রুতিও উদ্ধৃত করেছেন এবং জৈমিনি ও বাদরায়ণের ভেদও স্পষ্ট করেছেন।

শুধু তাই নয় — ‘আত্মংবেবং সর্বম্’ (ছান্দোগ্য ৭।২৫।২) এবং ‘ইদং সর্বং যদয়-মাত্মা’ (বৃহদারণ্যক ২।৪।৬)-এর পূর্বাপর প্রসঙ্গ স্পষ্ট করে তিনি বলেছেন যে ব্রহ্মের মহিমা প্রকাশ করাই এদের তাৎপর্য; এগুলির দ্বারা ব্রহ্মের নানাত্ব কল্পনা করা উচিত নয়। ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ এবং ‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’-এর মতো মহাবাক্য থেকে জীবাত্মাকে ব্রহ্ম বলা হয় — এই ভিত্তিরও তিনি ঝালচনা করেন। ‘নেতরো’নুপপত্তেঃ’, ‘ভেদব্যপদেশাচ্চ’, ‘কর্মকর্তৃ ব্যপদেশাচ্চ’ এবং ‘শো’ত এব’ প্রভৃতি সূত্র উদ্ধৃত করে তিনি জীব–ব্রহ্ম ঐক্যের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেন।

শংকর জীবাত্মা ও ব্রহ্মের ভেদ অবিদ্যাজনিত বলেছেন, কিন্তু শাস্ত্রীজি ব্রহ্মসূত্রে তার স্পষ্ট নির্দেশ পান না। শংকরানুসারে তো বলা হয়েছে —
‘তত্রাপি জীব-ব্রহ্মণোরোপাধিকং ভেদমাশ্রিত্য ভেদ ব্যপদেশাচ্চেত্যুক্তম্ । অতো ন তত্র পারমার্থিকং ভিন্নত্বমাশঙ্কনীয়ম্’
কারণ উক্ত স্থলে এবং সর্বত্র শ্রুতিতে জীব–ব্রহ্মের উপাধিগত ভেদ নিয়েই বাক্‌ব্যবহারাদি দেখা যায়; অতএব পরমার্থ ভেদের আশঙ্কা করা উচিত নয়।

শাস্ত্রীজির মত হলো — আচার্য শংকর বিজ্ঞানময় আত্মা এবং আনন্দময় ব্রহ্মের এই ভেদব্যপদেশকে অবিদ্যাকৃত বলেছেন এবং বাস্তবে তাঁদের অভিন্ন প্রতিপন্ন করেছেন। যদি সূত্রকারের নিকট এমন ভেদব্যপদেশ স্বীকৃত হতো, তবে এখানে এই হেতুর নির্দেশ অনাবশ্যক হতো। আচার্যের মতে অবিদ্যাকৃত ভেদ সংসার অবস্থায় বলা যুক্তিযুক্ত; কিন্তু আত্মজ্ঞান বা মোক্ষাবস্থা প্রাপ্ত হলে অবিদ্যা থাকে না — সেই অবস্থায় ভেদব্যপদেশকে অবিদ্যাকৃত বলা যায় না। পঞ্চকোষে অন্তিম কোষ দ্বারা আত্মার মোক্ষাবস্থার বর্ণনা আছে; সেখানে ভেদের কথন অবিদ্যাজনিত বলা শাস্ত্রসম্মত নয়। সূত্রকার নিজেই তাঁর রচনার অন্তিম অংশে (৪।৪।১৭) স্বীকার করেছেন যে মুক্ত আত্মা ব্রহ্মরূপ হয় না; তখন আত্মা ও ব্রহ্মের ভেদব্যপদেশে এখানে সূত্রকারের এই ভাবার্থ বোঝা উচিত নয় যে এই ভেদকথন—

১. বিক্ষোভ্য ভাব্য পৃষ্ঠা ৫৬৮


ফলরূপে পরিণত হতে অক্ষম হওয়ায়, চেতন হওয়া এবং কেবল কার্যকারণ-হেতু হওয়ার কারণে প্রধানত ব্রহ্মকেই ফলদাতা মানা প্রমাণসঙ্গত। তবে ফলপ্রদানের নিমিত্ত হিসেবে কর্মকে একেবারে বাদ দেওয়া যায় না, কারণ ফল তো কর্ম থেকেই প্রাপ্ত হয়।

আদি শঙ্করাচার্য ও পঞ্চাননও পরমেশ্বরকেই ফলদাতা বলেছেন, কারণ ধর্ম ও কর্মের হেতুও সেই পরমেশ্বরই। শঙ্কর কৌষীতকী (৩।৮) এবং পঞ্চানন গীতা (৭।২১–২২) উদ্ধৃত করেছেন। বৈষ্ণব আচার্যরাও ব্রহ্মের সর্বফলপ্রদাতা স্বভাব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এখানে শাস্ত্রীজীর বিশেষত্ব এই যে, তিনি উপনিষদের সঙ্গে সংহিতা-শ্রুতিও উদ্ধৃত করেছেন এবং জৈমিনি ও বাদরায়ণের পার্থক্যও স্পষ্ট করেছেন।

শুধু তাই নয় — “আত্মৈব সর্বং” (ছান্দোগ্য ৭।২৫।২) এবং “ইদং সর্বং যদয়মাত্মা” (বৃহদারণ্যক ২।৪।৬) — এই বাক্যগুলোর পূর্বাপর প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, এগুলোর উদ্দেশ্য ব্রহ্মের মহিমা প্রকাশ; এগুলো থেকে ব্রহ্মের নানাত্ব কল্পনা করা উচিত নয়।

“অহং ব্রহ্মাস্মি” ও “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” প্রভৃতি মহাবাক্যের দ্বারা জীবাত্মাকে ব্রহ্ম বলার ভিত্তিও তিনি সমালোচনাভাবে বিচার করেছেন। “নেতরোऽনুপপত্তেঃ”, “ভেদব্যপদেশাচ্চ”, “কর্মকর্তৃব্যপদেশাচ্চ” এবং “সোऽত এব”— এই সূত্রগুলি উদ্ধৃত করে তিনি জীব–ব্রহ্ম ঐক্যের তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

শঙ্করাচার্যের মতে জীবাত্মা ও ব্রহ্মের ভেদ অবিদ্যাজনিত; কিন্তু শাস্ত্রীজী ব্রহ্মসূত্রে তার স্পষ্ট নির্দেশ খুঁজে পান না। শঙ্করের বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে উপাধিগত ভেদ অবলম্বন করেই ভেদ-ব্যবহার দেখা যায়; অতএব পারমার্থিক ভেদ কল্পনা করা উচিত নয়।

শাস্ত্রীজীর মত হলো— শঙ্করাচার্য বিজ্ঞানময় আত্মা ও আনন্দময় ব্রহ্মের এই ভেদ-ব্যপদেশকে অবিদ্যাকৃত বলেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে উভয়কে অভিন্ন মান্য করেছেন। কিন্তু যদি সূত্রকার এই ভেদ স্বীকার করতেন, তবে এখানে আলাদা করে এই হেতু দেখানো অপ্রয়োজনীয় হতো।

আবার, অবিদ্যাকৃত ভেদ সংসারাবস্থায় মানা গেলেও আত্মজ্ঞান বা মোক্ষপ্রাপ্তির পরে অবিদ্যা থাকে না; সেই অবস্থায় ভেদকে অবিদ্যাকৃত বলা যায় না। পঞ্চকোষের অন্তিম কোষে আত্মার মোক্ষাবস্থার বর্ণনা আছে— সেখানে ভেদকে অবিদ্যাজনিত বলা শাস্ত্রসম্মত নয়।

সূত্রকার নিজেই তাঁর গ্রন্থের অন্তিম অংশে (৪।৪।১৭) স্বীকার করেছেন যে মুক্ত আত্মা ব্রহ্মরূপ হয়ে যায় না। সুতরাং এখানে ভেদ-ব্যপদেশকে কেবল অবিদ্যাকৃত বলা ঠিক নয়।


এরপর মুক্তাত্মাদের পুনর্জন্ম হয় কি না— এই প্রসঙ্গে “অনাবৃত্তিঃ শব্দাত্” সূত্রের ব্যাখ্যায় শঙ্করানুসারী পণ্ডিতেরা বলেন—

নাড়ী ও রশ্মিসহ অর্চিরাদি মার্গে গমনকারী উপাসকের আর পুনর্জন্ম হয় না। সেই মূর্ধন্য নাড়ী দিয়ে ঊর্ধ্বগামী ব্যক্তি অমরত্ব লাভ করে এবং তার পুনরাবৃত্তি ঘটে না। সে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয় এবং আর ফিরে আসে না— এভাবেই ক্রমমুক্তির দ্বারা অনাবৃত্তি বোঝানো হয়েছে।

নির্গুণ ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা যাঁদের অনাদি অনির্বচনীয় অজ্ঞান নষ্ট হয়েছে, তাঁদের অনাবৃত্তি তো স্বতঃসিদ্ধ। সেই নির্গুণ ব্রহ্মের আশ্রয়ে সগুণ ব্রহ্মোপাসকদেরও অনাবৃত্তি হয়— উল্টোটা নয়। অতএব কারণসহ সকল দুঃখের নিবৃত্তি ও পরমানন্দলাভরূপ মোক্ষ নির্গুণ ব্রহ্মজ্ঞানীদের তৎক্ষণাৎ এবং সগুণ ব্রহ্মোপাসকদের ক্রমে প্রাপ্ত হয়।

বল্লভাচার্য মুক্ত জীবের মধ্যে ভগবদাবেশ স্বীকার করে ভগবানের সঙ্গে ভোগানুভবের সামর্থ্যের কথা বলেছেন এবং জ্ঞানী ও ভক্ত— কারওই সংসারে প্রত্যাবর্তন মানেননি।

বলদেব বিদ্যাভূষণ মুক্তের জগৎকর্তৃত্ব অস্বীকার করে তাঁর ভগবৎসাম্যের সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং মুক্তির পরে সংসারে প্রত্যাবর্তন মানেননি।

পঞ্চানন বলেছেন— সন্ন্যাসী ও নিবৃত্তিধর্মী গৃহস্থ উভয়েই সমানভাবে মুক্তি লাভ করেন এবং তাঁদের পুনরাবৃত্তি হয় না।

শাস্ত্রীজীর মতে, শাস্ত্রের বক্তব্যের সারকথা হলো— তাঁরা আর এই জড় জগতে ফিরে আসেন না। নচেৎ সেই অবস্থা সংসারদশার মতোই জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতায় পরিণত হতো। আনন্দভোগের সেই কাল এত দীর্ঘ যে শাস্ত্রে সাধারণভাবে তাকে “অমৃত” বলা হয়েছে। সেই অবস্থায় সংসারের মতো অবিরাম জন্ম-মৃত্যুর চক্র থাকে না।

শঙ্করাচার্যের ভাষ্য উদ্ধৃত করে শাস্ত্রীজী তাঁর মত স্পষ্ট করেছেন—

“তে তেষু ব্রহ্মলোকে পরাঃ পরাবতঃ বসন্তি, তেষাং ন পুনরাবৃত্তিঃ” (বৃহদারণ্যক ৬।২।১৫)

এর ভাষ্যে শঙ্কর লিখেছেন—
তাঁরা বহু বহু বছর, বরং ব্রহ্মের বহু কল্পকাল পর্যন্ত ব্রহ্মলোকে অবস্থান করেন। ব্রহ্মলোকপ্রাপ্তদের এই সংসারে আর প্রত্যাবর্তন ঘটে না।

এখানে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে বৃহদারণ্যক থেকে; কিন্তু তাতে “তেষামিহ” এই পাঠ নেই। এই উপনিষদ যজুর্বেদীয় কাণ্ব শাখার শতপথ ব্রাহ্মণের অংশ। তবে বাজসনেয়ী শাখার শতপথ ব্রাহ্মণে (১৪।৬।১।১৮) “তেষামিহ ন পুনরাবৃত্তিঃ”— এই “ইহ” পদযুক্ত পাঠ পাওয়া যায়। ব্যাখ্যায় আচার্য শঙ্কর সেই পাঠেরই অতিদেশ করেছেন।

এরপর আচার্য লিখেছেন—

“যদি তারা একেবারেই না ফেরে, তবে এখানে ‘ইহ’ শব্দ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অনর্থক হয়ে যায়।”

কারণ, যদি ব্রহ্মলোকগত মুক্ত আত্মারা কখনোই ফিরে না আসে, তবে “ইহ” শব্দটির ব্যবহার অর্থহীন হয়।

এই প্রসঙ্গের উপসংহারে আচার্য শেষে বলেছেন—

“তস্মাদস্মাত্ কল্পাদূর্ধ্বম্ আবৃত্তির্গম্যতে”
অর্থাৎ— এই কল্পের পরে পুনরাবৃত্তি ঘটে— এমনটাই বোঝা যায়।

ছান্দোগ্য (৪।১৫।৫)-এর ব্যাখ্যাতেও আচার্যপাদ একই ভাব গ্রহণ করেছেন— অর্থাৎ রহটের মতো জন্ম-মৃত্যুর আকারে (জগৎসৃষ্টি-রূপ প্রবাহে) সেই আত্মাদের প্রত্যাবর্তন হয় না।

ছান্দোগ্য (৮।১৫।১)-এর ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে—

“যাবৎ ব্রহ্মলোকস্থিতিঃ তাবৎ তত্রৈব তিষ্ঠতি, প্রাক্ততো নাবর্তত ইত্যর্থঃ।”

অর্থাৎ— যতদিন ব্রহ্মলোকে অবস্থানের কাল থাকে, ততদিন সেখানেই থাকে; তার আগে প্রত্যাবর্তন হয় না। অবস্থানকাল পূর্ণ হলে ফিরে আসা সম্ভব।

স্বামী দयानন্দ সরস্বতী-ও মুক্ত জীবদের পুনরাগমন স্বীকার করেন এবং ঋগ্বেদের
“কস্য নূনং কতমস্যামৃতানাম্”

“অগ্নেং বয়ং প্রথমস্যামৃতানাম্”
এই মন্ত্রগুলি উদ্ধৃত করেন।

এই দৃষ্টিতে আদি শঙ্করাচার্য-এর সঙ্গে তাঁর কোনো মৌলিক ভেদ থাকে না। হ্যাঁ— মুক্ত জীব কতকাল থাকে, সেই ব্যবস্থা ব্রহ্মের অধীন; তার নিয়ন্ত্রণ তিনিই করেন।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে শাস্ত্রীজী শঙ্কর প্রভৃতি আচার্যদের প্রকৃত অভিপ্রায় তুলে ধরে নিজের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন।


বিদ্যোদয় ভাষ্যে মোট ৫৫৫টি সূত্র আছে। সূত্রপাঠ মূলত শঙ্করানুসারী। কেবল একটি সূত্র—
“প্রাণঃ কম্পনাত্” (১১৩।৩৬)
এখানে কিছু ভিন্নতা আছে।

এখানে “প্রাণ” শব্দ দ্বারা ব্রহ্মকেই বোঝানো হয়েছে— এটাই তাঁর অভিপ্রায়। শঙ্কর ও পঞ্চানন একে “কম্পনাধিকরণ” বলেছেন। পঞ্চানন বায়ু ও প্রাণ— এই দুই দেবতার বর্ণনা করে প্রাণকেই ব্রহ্ম বলেন এবং শ্বেতাশ্বতরের “যো দেবানামধিপো” শ্রুতি উদ্ধৃত করেন।

শঙ্কর উদ্ধৃত করেছেন—
“একো হংসো ভুবনস্যাস্য মধ্যে স এবাগ্নিঃ”।

শাস্ত্রীজী লক্ষ্য করেছেন— “কম্পনাত্” সূত্রে লক্ষ্যপদের নির্দেশ নেই, তাই তিনি “প্রাণঃ” শব্দটি যোগ করেছেন; কারণ পরবর্তী সূত্রগুলিতে “জ্যোতিঃ” ও “আকাশঃ”— এগুলো লক্ষ্য ও হেতুপদ হিসেবে এসেছে। সূত্ররচনার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই তিনি এমনটি করেছেন।

প্রাণ শব্দের ব্রহ্মবাচকতা প্রমাণ করতে তিনি উদ্ধৃত করেছেন—

  • যজুর্বেদ (৩১।১৮): “বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণম্”

  • অথর্ববেদ (১৩।৩।৩): “যো মারয়তি প্রাণয়তি যস্মাত্ প্রাণন্তি ভুবনানি বিশ্বা”

  • ঋগ্বেদ (১।১০০।১২): “স বজ্রভূদ্ দস্যুহা ভীম উগ্রঃ সহস্রচেতাঃ”

বায়ু ও প্রাণ ভিন্ন— তাই তো বলা হয়েছে—
“শ্রোত্রাদ্ বায়ুশ্চ প্রাণশ্চ”— পৃথকভাবেই উল্লেখ।

কঠ উপনিষদ (২।৩।৩) স্পষ্টই বলে—

“ভয়াদ্ ইন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ”
অর্থাৎ— ব্রহ্মভয়ের কারণেই ইন্দ্র, বায়ু এবং মৃত্যুও কর্মরত থাকে।

তৈত্তিরীয়েও বলা হয়েছে—

“ভীষাস্মাদ্ বাতঃ পবতে”
এই ব্রহ্মভয় থেকেই বায়ু প্রবাহিত হয়।

অতএব বায়ু প্রভৃতির নিয়ন্তা অবশ্যই ব্রহ্ম— এই কারণেই আলোচ্য প্রসঙ্গে “প্রাণ” শব্দের প্রয়োগ ব্রহ্মের জন্যই নিশ্চিত। এখন পর্যন্ত ভাষ্যকারদের মধ্যে উপনিষদের সঙ্গে সঙ্গে সংহিতা-মন্ত্রের প্রমাণ সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন শাস্ত্রীজীই।


এ ছাড়া মতনিরাকরণের প্রসঙ্গেও তিনি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ “পুরুষাশ্মবদिति চেত্ তথাপি” (২।২।৭) সূত্রটি ধরা যাক।

আদি শঙ্করাচার্য এখানে “পুরুষাশ্মবৎ” পদের ব্যাখ্যায় অন্ধ–পঙ্গু ন্যায় গ্রহণ করেছেন এবং প্রকৃতি ও পুরুষের পারস্পরিক সহযোগিতার তুলনায় সাংখ্য মতকে দৃষ্টান্তরূপে উপস্থাপন করেছেন।
রামানুজাচার্য-ও একে প্রধান-কারণবাদী সাংখ্য মতের খণ্ডন হিসেবেই নিয়েছেন।

রামানুজাদি বৈষ্ণব আচার্যগণ পাঞ্চরাত্র মতের সমর্থন ছাড়া বাকি অর্থ শঙ্করানুসারেই গ্রহণ করেছেন। পঞ্চানন দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১ থেকে ১০ নম্বর সূত্র পর্যন্ত শঙ্করের মতোই ব্যাখ্যা করে সাংখ্য মতকে অসঙ্গত প্রমাণ করেছেন। “অন্যথানুমিতৌ” ব্যাখ্যায় শাক্ত হওয়ার কারণে তিনি শক্তিহীন প্রকৃতিকে জগত্‌সৃষ্টিতে অক্ষম বলেন, কিন্তু চিদচিদাত্মক শক্তিকে যুক্তিসঙ্গত মানেন।

নিজ নিজ সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষা করলেও, এই সব স্থানে শঙ্করের বিরুদ্ধ মত অন্য কোনো আচার্য প্রকাশ করেননি। ভাষ্যকারদের মধ্যে একমাত্র আচার্য উদয়বীর শাস্ত্রীই সম্পূর্ণ প্রकरणকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে প্রচলিত ধারাই উল্টে দেন। “পুরুষাশ্মবদिति” ব্যাখ্যা থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। শাস্ত্রীজীর বক্তব্য সংক্ষেপে এই—

বাস্তব কথা হলো, কপিলীয় সাংখ্যসূত্রসমূহ (ষড়ধ্যায়ী ও তত্ত্বসমাস)-এ অন্ধ–পঙ্গু দৃষ্টান্তের কোনো উল্লেখ নেই। মহাভারত-এর বিস্তৃত সাংখ্য আলোচনাতেও এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। বৌদ্ধ যুগে কিছু সাংখ্য তত্ত্বকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। সম্ভবত সেই সময়েই জগত্‌সৃষ্টিবিষয়ক সাংখ্য মতকে নিজের মতো করে সাজাতে গিয়ে এই ন্যায়টির উদ্ভাবন করা হয়।

ঈশ্বরকৃষ্ণ সেই সংস্কারের প্রভাবেই তাঁর “সাংখ্যসপ্ততি” গ্রন্থে এই ন্যায় অবলম্বন করে জগত্‌সৃষ্টির কথা বলেছেন। শঙ্করাচার্য এই ভিত্তিতেই এখানে সাংখ্য মতের খণ্ডন করেছেন।


এই প্রসঙ্গে মূল বিচার্য বিষয় হলো— জড় উপাদান তত্ত্ব কি নিজে থেকেই ক্রিয়াশীল হয়, না কি চেতনের প্রেরণায়?

নিজে থেকেই প্রবৃত্তি বোঝাতে অন্ধ–পঙ্গু দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। ভাবুন তো— এই দৃষ্টান্ত এখানে কতটা সহায়ক?

অন্ধ এখানে জড় প্রকৃতি, পঙ্গু এখানে চেতন পুরুষ। স্পষ্ট যে পঙ্গু অন্ধের কাঁধে চড়ে পথ দেখায়। এই অর্থে দৃষ্টান্তটি বোঝাতে চায়—

চেতন নির্দেশ দেয়, জড় কর্ম সম্পাদন করে।

উল্টো এই দৃষ্টান্তই প্রমাণ করে যে জড় উপাদান তত্ত্বকে চেতন পুরুষই প্রেরণা দেয়। ভ্রাচার্য এই সূত্রের ব্যাখ্যায় পুরুষের যে স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন, তা বাস্তব অবস্থায় সাংখ্যের অভিমত নয়। ভাচার্য মনে করেছেন যে কপিল জড় উপাদান তত্ত্বে চেতনের সহযোগ ছাড়া স্বতঃপ্রবৃত্তি স্বীকার করেছেন— এই ধারণাই ভ্রান্ত। সূত্রকারেরও এখানে এমন অভিপ্রায় প্রতীয়মান হয় না যে জগতের জড় উপাদান তত্ত্বের স্থলে চেতন ব্রহ্মকে জগতের উপাদান বলা হবে। এই সূত্রগুলির উদ্দেশ্য কেবল এটুকু নির্ণয় করা— জড় উপাদান তত্ত্বে চেতনের প্রেরণা ছাড়া স্বতঃপ্রবৃত্তি সম্ভব নয়। এই ভিত্তিতেই চেতন ব্রহ্মের অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়।

এই একই দৃষ্টিভঙ্গি জৈন, বৌদ্ধ প্রভৃতি মতের খণ্ডনেও দেখা যায়। শাস্ত্রীজীর মতে, আদি শঙ্করাচার্য এই সূত্রগুলিকে পরমত নিরাকরণে যে ভাবে ব্যবহার করেছেন, তা বাদরায়ণের অভিপ্রেত নয়। শাস্ত্রীজীর এই পক্ষ চিন্তার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পাঁচরাত্র মত ও পাশুপত মত নিরাকরণ বিষয়ে শাস্ত্রীজীর মতের সঙ্গে মতভেদের অবকাশ আছে। শ্রীমদ্ভাগবতের চিন্তাধারার খণ্ডন শঙ্কর কোথায় করেছেন? ভাগবত দর্শন পাঁচরাত্রবাদীদের সম্পূর্ণ অনুকরণ নয়। প্রকৃতপক্ষে নিরীশ্বরবাদী, বিশেষত বৌদ্ধ দর্শনের খণ্ডনই শঙ্করের অভিপ্রেত ছিল— এই কারণেই তিনি সূত্রগুলিতে এই মতগুলির আরোপ করে তাদের খণ্ডন করেছেন।


শাস্ত্রীজীর তৃতীয় মৌলিকতা — আচার্য শঙ্করের কালনির্ধারণ

আচার্য শঙ্কর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মঠসমূহের বিবরণ এবং উপলব্ধ সাহিত্যিক উৎসের অনুসীলন করার পরে তিনি শঙ্করের জন্মকাল খ্রিস্টপূর্ব ৫০৬ বছর নির্ধারণ করেন। বেদান্তদর্শনের ইতিহাস গ্রন্থে এই সমস্ত উপাদান পাওয়া যায়। অশ্বঘোষ, নাগার্জুন প্রভৃতি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের যে তথাকথিত কাল পাশ্চাত্য লেখকেরা প্রস্তাব করেছেন, তা শুদ্ধ নয়। সেই কাল যদি প্রায় তেরো শতাব্দী পূর্বে সরানো হয়, তবে তা তাঁদের প্রকৃত সময়ের অনেক কাছাকাছি হবে। এইভাবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের নানা অনুমান পরীক্ষা করে পণ্ডিতজি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাতে ইতিহাসক্ষেত্রে প্রচলিত বহু ভ্রান্তি দূর হবে। আচার্য শঙ্করের অনুগামী দশনামী সন্ন্যাসী সমাজেরও পণ্ডিতজি প্রস্তাবিত তারিখ গ্রহণ করা উচিত।

প্রকৃতপক্ষে বিদ্যোদয়ভাষ্য এবং বেদান্তদর্শনের ইতিহাস— উভয়ই একে অপরের পরিপূরক গ্রন্থ। ব্রহ্মসূত্রের বেদব্যাস কর্তৃত্ব, রচনাকাল, ব্রহ্মসূত্রের তাত্পর্য, সূত্রের ভাষ্যকারগণ, শঙ্করের গুরুপরম্পরা, বাদরায়ণ কিংবা শঙ্করের সঙ্গে সম্পর্কিত ইতিবৃত্ত— এই সবই ভাষ্যকারের অন্য মৌলিক রচনা বেদান্তদর্শনের ইতিহাস-এ সংগৃহীত উপাদানের ভিত্তিতে বিশ্লেষিত হয়েছে।

শঙ্কর ও বৌদ্ধ দার্শনিকগণ এবং শঙ্করের সময়কাল— এই গ্রন্থে সব দিক থেকেই বিচার করা হয়েছে। ইতিহাসনির্ভর এমন বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি এই ক্ষেত্রের ভারতীয় ও পাশ্চাত্য চিন্তকদের মধ্যে এই গ্রন্থের আগে দেখা যায়নি।


বাদরায়ণ ব্যাস বেদান্ত-কর্মযোগের পুনরুদ্ধার করেছিলেন। শान्तিপর্বে যুগান্তে লুপ্ত হয়ে যাওয়া বেদ ও ইতিহাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াসের উল্লেখ যেমন আছে, তেমনি—

“বেদান্তকর্মযোগঞ্চ বেদবিদ্ ব্রহ্মবিদ্বিভুঃ ।
দ্বৈপায়নো নিজগ্রাহ”

— এই বাক্যে ব্যাসকে বেদান্তের উদ্ধারক বলা হয়েছে। এখানে বেদান্ত বলতে কেবল উপনিষদ নয়, সূত্রও বোঝানো হয়েছে। সূত্রে বেদান্ত, কর্ম ও যোগের সমন্বয়ের প্রয়াস রয়েছে। অধ্যাত্মবিদ্যায় মানবমাত্রের অধিকার আছে এবং সূত্রে অধ্যাত্মবিদ্যার আলোচনা হয়েছে— অতএব সূত্র মানবমাত্রের জন্যই। সূত্রকারের অন্তর্লীন ভাবনাও এই ছিল।

“ভাবং তু বাদরায়ণোऽস্তি হি”— এই সূত্রের ব্যাখ্যায় পণ্ডিতজি এ কথাই বলেছেন। তিনি যজুর্বেদের শ্রুতি— “শূদ্রায় চার্যায় চ স্বায় চারণায়”

উদ্ধৃত করেছেন। এই প্রসঙ্গে হরিপ্রসাদ বৈদিকমুনি ও ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজকের ঐতরেয় বিষয়ক ধারণাও তিনি খণ্ডন করেছেন। “দাস্যাঃ পুত্রঃ কিতবোऽ-ব্রাহ্মণঃ”— এই বাক্যের ব্যাখ্যায় উক্ত আর্য পণ্ডিতেরা “দাস্যাঃ পুত্রঃ” থেকে শূদ্র অর্থ করে বেদাদি বিষয়ে শূদ্রের অধিকার স্থির করেছিলেন; কিন্তু শাস্ত্রীজী একে অশাস্ত্রীয় বলেছেন। কবষ ঐলূষ বেদদ্রষ্টা হয়েও কিতব— অর্থাৎ জুয়ারী ছিলেন। ‘জুয়ারী’ শব্দটির প্রতি দৃষ্টি না দেওয়াতেই আর্য পণ্ডিতদের এমন অর্থ করতে হয়েছে। পাণিনীয় নিয়ম (ভ্রষ্টা ৬।৩।২২) অনুসারে “দাসীপুত্র” কেবল নিন্দাসূচক পদ। যদিও এটি ক্রোধার্থেও ব্যবহৃত হতে পারে, কিন্তু অসমস্ত “দাস্যাঃ পুত্রঃ” পদ “দাসীর পুত্র” এই অর্থে গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব ব্রাহ্মণ প্রসঙ্গে এই পদের প্রয়োগ দেখে কবষ ঐলূষকে দাসীর পুত্র বলে শূদ্র প্রমাণ করা সম্পূর্ণ অশাস্ত্রীয়।

আবার তিনি ঋগ্বেদের দ্যূতসূক্তের দ্রষ্টাও। নিজের মতের সমর্থনে শাস্ত্রীজী স্বপ্নবাসবদত্তম্ নাটকের বিদূষকের উক্তি—

“দাস্যাঃ পুত্রৈর্মধুকরৈঃ পীড়িতোऽস্মি”

উদ্ধৃত করে “দাসীপুত্র”-এর দুষ্টার্থ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কথার সার হলো— শাস্ত্রীজী ভাষ্যে সম্পূর্ণ নিষ্পক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। আর্যসমাজ বা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের পূর্বাগ্রহ তাঁর মধ্যে নেই। শুদ্ধ বৈদিক দৃষ্টিতে শ্রুতি, পুরাণ, স্মৃতি এবং কাব্যগ্রন্থাদির পরিপ্রেক্ষিতে সূত্রকারের মূল দৃষ্টিকে স্বচ্ছ ও নির্বিভ্রান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার সফল প্রয়াস বিদ্যোদয়ভাষ্য-এ হয়েছে। শঙ্করের মতকে কেন্দ্র করে অন্যান্য আচার্যের মত পরীক্ষা করে বৈদিক সিদ্ধান্ত ও আর্ষ গ্রন্থে প্রবাহিত ভাবধারা ও পরম্পরাগুলিকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করার ফলে এই ভাষ্য সত্যের আরও নিকটবর্তী বলে প্রতীয়মান হয়। এই কারণে এটি গতানুগতিক বা পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যা নয়— একে স্বাধীন ব্যাখ্যাই বলা যায়।

এটি আনন্দের বিষয় যে বিদ্যোদয়ভাষ্য-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হতে চলেছে। ১৬৬৬ ঈ० সালে এর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল। তখন থেকে এই গ্রন্থটি বিদ্বানদের আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। ব্যাসকৃত বেদান্তসূত্রসমূহের এই বিশদ ভাষ্য দার্শনিক বিদ্বান এবং অনুসন্ধিৎসুদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে—এটি কম গুরুত্বপূর্ণ কথা নয়। ভ্রাচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, যোগ ও বেদান্তের বিশিষ্ট বিদ্বান। সমস্ত দর্শনের উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি সফল ভাষ্য রচনা করেছেন। অসঙ্গতিহীন, সমন্বয়মূলক দৃষ্টিভঙ্গিনিষ্ঠ, যুক্তিসম্মত ও চিন্তাপুষ্ট এবং প্রাঞ্জল শৈলীতে রচিত এই ভাষ্যটি পরম্পরাগত প্রবাহ থেকে কিছুটা সরে থাকার কারণে মৌলিকতা অনুসন্ধানকারী তত্ত্বান্বেষীদেরও চিন্তার জন্য উদ্দীপিত করবে—এ বিষয়ে আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তাত্ত্বিক বাদ-বিবাদে তিনি নিরপেক্ষ থাকলেও তাঁর ঝোঁক যদিও অন্তবাদ-এর দিকেই। সার্বিকভাবে একে বেদান্তের একটি প্রামাণিক বিবেচনা বলা যেতে পারে।

ডা० বিষ্ণুদত্ত রাকেশ, ডি० লিট্০

ভাষ্যকারের নিবেদন

ভারতীয় দর্শনে অধিভূত ও অধ্যাত্মের বিস্তৃত বিবেচনা রয়েছে। এদের মধ্যে সাংখ্য-দর্শন প্রধানত অধিভূতের মূলগত বিশ্লেষণের সঙ্গে অধ্যাত্মের যথার্থ বিবেচনাও উপস্থাপন করে; অপরদিকে বেদান্তদর্শনে প্রধানত অধ্যাত্মেরই বিবেচনা রয়েছে। তাতেও কেবল ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপ প্রকাশ করাই মুখ্য লক্ষ্য। অতিপ্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় চিন্তকদের মতে মানবজীবনের পরম লক্ষ্য মোক্ষ অথবা অপবর্গ-লাভ বলে মানা হয়েছে। ভারতের সমগ্র সাহিত্যেই এই ভাবনা ওতপ্রোতভাবে বিদ্যমান। ভারতীয় দর্শন এবং তাদের ভিত্তিভূত বেদ ও অন্যান্য বৈদিক সাহিত্য এই লক্ষ্য অর্জনের নানা উপায় ও প্রকারের বিবেচনা উপস্থাপন করে। সাক্ষাৎকৃত ধর্মা ঋষিগণ বিশ্ব의 যথার্থতা অনুধাবন করে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার জন্য তিনটি মৌলিক তত্ত্বের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন—সমস্ত চিন্তাধারার ভিত্তি এই তত্ত্বগুলিই। এটি এমন এক কেন্দ্র, যার সঙ্গে অসংযুক্ত কোনো চিন্তা সম্ভব নয়। ঋষিগণ এই তত্ত্বগুলিকেই অধিভূত ও অধ্যাত্ম রূপে উপস্থাপন করে তাদের যথার্থতা বোঝানো ও প্রত্যক্ষ করার প্রয়াস করেছেন। অধিভূতে জড়তত্ত্ব এবং অধ্যাত্মে প্রধানত চেতন তত্ত্বের সমাবেশ রয়েছে। প্রথমটি মূলপ্রকৃতি ও তার বিকাররূপ সমগ্র বিশ্ব; দ্বিতীয়টি চেতন তত্ত্ব—জীবাত্মা ও পরমাত্মা।

ব্রহ্মসূত্রগুলির প্রতিপাদ্য বিষয় — বিভিন্ন দর্শনে এই তত্ত্বগুলিরই ন্যূনাধিক বা মুখ্য-অমুখ্য রূপে বর্ণনা পাওয়া যায়। বেদান্তদর্শনে প্রধানত ব্রহ্মস্বভাবের বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাচীন ঋষি ও শাস্ত্রকারগণ ব্রহ্মকে সৎ-চিত্-আনন্দরূপ বলে মান্য করেছেন। বেদান্তদর্শনের প্রথম সূত্রে ব্রহ্মজিজ্ঞাসার প্রতিজ্ঞা করে পরবর্তী আঠারোটি (২-১৬) সূত্রে ব্রহ্মের এই স্বরূপেরই বর্ণনা রয়েছে। ২-৪ সূত্রে সৎ, ৫-১১ সূত্রে চিত্ এবং ১২-১৬ সূত্রে ব্রহ্মের আনন্দ-রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর পর প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি পর্যন্ত প্রধানত এমন কিছু পদের বিবেচনা রয়েছে, যেগুলি উপনিষদ প্রভৃতি অধ্যাত্মবিষয়ক শাস্ত্রে ব্রহ্মের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু লোক-বেদসাহিত্যে স্পষ্ট ও অস্পষ্টভাবে অন্য অর্থ প্রকাশের জন্যও যেগুলির ব্যবহার প্রচলিত। প্রথম অধ্যায়ের এই অংশে এমন প্রায় দশ-বারোটি পদের বিবেচনা আছে এবং প্রায় একই সংখ্যক অন্যান্য ঔপনিষদিক প্রসঙ্গের বিবেচনাও রয়েছে, যেখানে ব্রহ্মের বর্ণনা আছে; কিন্তু আপাতত সেই প্রসঙ্গগুলিতে অন্য তত্ত্বের বর্ণনার আশঙ্কা করা যেতে পারে। কিছু প্রসঙ্গগত অন্যান্য বিষয়সমূহ ……–এর কথাও উল্লেখ আছে। এইভাবে প্রথম অধ্যায়ে পূর্ণরূপে ব্রহ্মস্বভাবকে স্পষ্ট করা ও বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আলোচিত পদ ও প্রসঙ্গগুলির অতিরিক্ত আরও যেসব পদ ও প্রসঙ্গ আছে—সেগুলির বিষয়ে সূত্রকার অধ্যায়ের শেষ সূত্রে অতিদেশ করেছেন, অর্থাৎ যেসব পদ ও প্রসঙ্গ এখানে বর্ণিত হয়নি, সেগুলিকেও একই ভাবনায় বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

প্রথম অধ্যায়ের বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে ব্রহ্মই জগতের উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কর্তা, চিদানন্দস্বরূপ, সর্বান্তর্যামী, সর্বাধার এবং সকলের নিয়ন্তা; নিজে অপরিণামী থেকেও সকলকে পরিচালনা করেন। এই বিষয়ে যদি এমন কোনো অন্য চিন্তা উঠে আসে, যা ব্রহ্মের এই স্বরূপের বিরুদ্ধে ভাবনা জাগাতে পারে—তেমন যতদূর সম্ভব নানা চিন্তার বিবেচনা দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম দুই পাদে উপস্থাপন করা হয়েছে। শেষ দুই পাদে ভূতসৃষ্টি, জীবাত্মার গতি-আগতি এবং ইন্দ্রিয়-সৃষ্টি প্রভৃতির বিবেচনা রয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম দুই পাদে জীবাত্মার সংসারগতি, সুষুপ্তি প্রভৃতি অবস্থা এবং কর্মানুসারে জীবদের প্রতি পরমাত্মার ফলপ্রদান ইত্যাদির বর্ণনা আছে। তৃতীয় পাদে বিভিন্ন উপাসনার বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ পাদে বলা হয়েছে যে মোক্ষপ্রাপ্তি কেবল ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারাই সম্ভব। এইভাবে জীবাত্মার সংসারদশায় আনা-গোনা, চূড়ান্ত লক্ষ্য ব্রহ্মজ্ঞান এবং তার বিভিন্ন সাধনের উপযুক্ত বিবেচনা এই অধ্যায়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

ব্রহ্মজ্ঞানের জন্য সাধনার নিরন্তর অনুশীলন, দেবযান-পিতৃযান প্রভৃতি গতি, ব্রহ্মজ্ঞানের ফলস্বরূপ মোক্ষপ্রাপ্তি এবং তার স্বরূপের বর্ণনা চতুর্থ অধ্যায়ে করা হয়েছে। এতে এই শাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্য স্পষ্ট—ব্রহ্মের যথার্থ স্বরূপ বুঝে শাস্ত্রানুমোদিত উপায়-বিধিতে তার সাক্ষাৎকার করে মোক্ষলাভ করা। বিভিন্ন মতের প্রত্যাখ্যানই মুখ্য নয়; বরং স্বাভীষ্টের উপপাদনই সূত্রকারের প্রধান উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হয়।

ব্রহ্মসূত্রের প্রাচীন ভাষ্যকার — প্রাপ্ত ভাষ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ভাষ্য আচার্য শংকরের; এই দৃষ্টিতে তিনিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন আচার্য। শংকরের কাল বিষয়ে বহু মতভেদ আছে। আচার্যের মঠগুলিতে এই বিষয়ে যে উপাদান সংরক্ষিত আছে, কাল-নির্ণয়ের জন্য তার ব্যবহার এখনও পর্যন্ত করা হয়নি। এখানে তার বিবেচনা অন্বেষ্য। আচার্য শংকর এবং অন্যান্য ব্রহ্মসূত্রভাষ্যকারদের কালবিষয়ক আলোচনার জন্য পৃথক রচনার সংকল্প আছে। আচার্য শংকর ও রামানুজ প্রভৃতি ভাষ্যকারদের লেখাগুলি থেকে—

১। দেখুন— শংকরভাষ্য, ব্রহ্ম সূ০ ১।৩।২৮, এবং ৩।৩।৫৩। রামানুজভাষ্য ব্রহ্ম সূ০ ১।১।১

…এতে জানা যায় যে, এর আগেও ব্রহ্মসূত্রের বহু ভাষ্যকার হয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে উপবর্ষ ও ভগবান বোধায়নের নাম সর্বপ্রথম ভাষ্যকারদের মধ্যে গণ্য করা হয়। এদের মধ্যেও ভগবান বোধায়নের ‘বৃত্তি’কে অধিক প্রাচীন বলা হয়। সূত্রগুলির উপর এই বৃত্তি অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আচার্য রামানুজ ইঙ্গিত করেছেন যে, পূর্বাচার্যরা এই বৃত্তির সংক্ষেপ করেছিলেন (ব্রহ্মসূত্র ১।১।১)। এতে মূলরূপে এই বৃত্তির ব্যাপকতার ধারণা পাওয়া যায়। যদিও আচার্য রামানুজ জায়গায় জায়গায় এই বৃত্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তবু সে সময়ে এই বৃত্তি সম্পূর্ণ অবস্থায় উপলব্ধ ছিল কি না—এ বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

ব্রহ্মসূত্র (২।১।১৪)-এর ভাষ্যে আচার্য রামানুজ দ্রাবিড়াচার্যের একটি মত উদ্ধৃত করেছেন—এতে বোঝা যায় যে তিনিও ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যকার ছিলেন। এ ছাড়া টঙ্ক, গুহদেব, ভারুচি, কপর্দী, ভট্টুং হরি, ভট্টু প্রপঞ্চ প্রমুখ বহু আচার্যের মত ও উদ্ধৃতি বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। এতে প্রতীয়মান হয় যে তাঁদেরও ব্রহ্মসূত্রের উপর ব্যাখ্যান ছিল। কিন্তু এ সকল সাহিত্য আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় বলা কঠিন যে সূত্রব্যাখ্যা ও শাস্ত্রের উদ্দেশ্য বিষয়ে তাঁদের প্রকৃত ভাবনা কী ছিল।

এমন মনে হয় যে আচার্য শংকর ব্যাখ্যার সেই প্রাচীন পদ্ধতি ও সূত্রপদানুসারী ভাবনাকে এক নতুন মোড় দেন। ব্যাখ্যার যে পথ আচার্য শংকর নির্মাণ করেছিলেন, পরবর্তী প্রত্যেক আচার্য সেই পথই অনুসরণ করেছেন। শংকরভাষ্যের বহু প্রসঙ্গ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে পূর্ববর্তী আচার্যরা ঐ সব প্রসঙ্গে সূত্রার্থ কোন ভাবনায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। সূত্রগুলিতে বর্তমান অধিকরণগুলির বিন্যাস আচার্য শংকরের দ্বারাই করা হয়েছে—এমনটাই প্রতীয়মান হয়। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভাষ্যকাররা নিজেদের ভাবনার অনুযায়ী এতে পরিবর্তন এনেছেন। সম্ভবত আচার্য শংকরের পূর্ববর্তী ভাষ্যকাররা অধিকরণগুলির এই ধরনের বিন্যাস মান্য করেননি। সে ক্ষেত্রে সূত্রার্থে নানা রকম উলট-পালটের যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল—এই সুযোগ নিয়েই আচার্য শংকর নিজের মতকে সূত্রানুসারে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন; একই পদ্ধতি অবলম্বন করে বৈষ্ণব ভাষ্যকাররাও নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করেছেন।

আচার্য শংকর প্রথম দেড় অধ্যায়ে পরমত-প্রত্যাখ্যানের প্রবণতাকে যে তীব্রতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, পরবর্তী ভাষ্যকাররাও প্রায় সেই রূপেই তার অনুসরণ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে গভীর সন্দেহ থেকেই যায়—সূত্রকারের নিজস্ব ভাবনা আদৌ কি এই ধরনের ছিল?

(পাদটীকা অংশ অপরিবর্তিত অর্থে রইল—আনন্দময়াধিকরণ প্রভৃতি প্রসঙ্গে শংকরভাষ্যের বিভিন্ন স্থানে পূর্ববর্তী ব্যাখ্যার উল্লেখ করে পরে নিজের অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।)

…প্রত্যাখ্যানেই ছিল—এ বিষয়টিও পুরোপুরি সন্দেহজনক। একইভাবে এ কথাও নিশ্চিত নয় যে সূত্রকারের অভিপ্রায় এমন ছিল—ব্রহ্ম ছাড়া আর কোনো সত্তাই নেই। বিবর্তবাদ-এর কোনো ইঙ্গিত সূত্রগুলিতে পাওয়া যায় না। এই অবস্থায় ব্রহ্মকেই জগতের উপাদানকারণ বলা—এ ধারণাও আর সূত্রানুসারী থাকে না। বৈষ্ণব ভাষ্যকারদের প্রচেষ্টা এই ধাঁধাকে মেটানোর বদলে আরও জটিল করে তুলেছে। সম্প্রদায়গত ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে সূত্রপদগুলির গভীর অধ্যয়ন কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তিকে অন্তত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। সম্ভবত, বর্তমান ভাষ্যগুলিতে গৃহীত রীতিতে নয়—বরং সূত্রার্থকে অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করলে আমরা আচার্য শংকর-পূর্ববর্তী ভাষ্যকারদের ভাবনার আরও নিকটে পৌঁছাতে পারি।

ব্রহ্মের অদ্বৈতভাব

উপনিষদের কয়েকটি বাক্যের ভিত্তিতে ব্রহ্মের অদ্বৈতভাব প্রতিপাদন করা হয়। কিন্তু এসব বাক্য সম্পর্কে সবসময়ই সন্দেহ থাকে—এগুলির তাত্পর্য কি ব্রহ্ম ছাড়া সমস্ত তত্ত্বকে নাকচ করে কেবল একমাত্র ব্রহ্ম-তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা করা, না কি অন্য তত্ত্বগুলিকে অস্বীকার না করেও শুধু ব্রহ্মের একত্ব প্রকাশ করা?

ব্রহ্মকে সাজাতীয়-বিজাতীয়-স্বগত ভেদশূন্য বলা হয়—এ কথা কেবল ব্রহ্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ ব্রহ্ম একমাত্র তত্ত্ব—তার কোনো সমজাতীয় দ্বিতীয় ব্রহ্ম নেই, কোনো ভিন্নজাতীয় তত্ত্ব নেই, এবং সেই এক ব্রহ্মের মধ্যেও কোনো ভাঙন, বিভাজন বা অংশবিশেষ সম্ভব নয়। এটুকুই “ব্রহ্মের অদ্বৈত” বর্ণনার সম্ভাব্য অর্থ; এতে অন্য তত্ত্বগুলির সম্পূর্ণ নিষেধের ভাব নেই। শংকর বা শাংকর সম্প্রদায়ের আচার্যরা অনাদি ছয় পদার্থ স্বীকার করে দেখিয়েছেন—ব্রহ্ম ছাড়া অন্য পদার্থেরও অস্তিত্ব আছে।

ব্রহ্মের সর্বাত্মতার পক্ষে কয়েকটি উপনিষদীয় বাক্য উদ্ধৃত করা হয়—

  • “ইদং সর্বং যদয়মাত্মা” — বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২।৪।৬

  • “আত্মৈবেদং সর্বম্” — ছান্দোগ্য উপনিষদ ৭।২৫।২

  • “ব্রহ্মৈবেদমমৃতং পুরস্তাত্… ব্রহ্মৈবেদং সর্বম্” — মুণ্ডক উপনিষদ ২।২।১১

  • “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” — ছান্দোগ্য ৩।১৪।১

  • “নেহ নানাস্তি কিঞ্চন” — বৃহদারণ্যক ৪।৪।১৬

এই বাক্যগুলির ভিত্তিতে বলা হয়—যা কিছু দৃশ্য-অদৃশ্য আছে, সবই ব্রহ্ম; ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু এভাবে বোঝা বা বোঝানো কত বড় ভ্রান্তি—এবং তা চোখ বন্ধ করে মেনে নেওয়া—এ এক বিস্ময়কর জাদুর মতো ব্যাপার। যদি কেউ এই বাক্যগুলির পূর্বাপর প্রসঙ্গ ভালো করে দেখেন, তবে সত্যটা স্পষ্ট হবে।

এই সব বাক্যই ব্রহ্ম-বর্ণনার প্রসঙ্গে বলা—এগুলির উদ্দেশ্য ব্রহ্মের মহিমা প্রকাশ করা। ব্রহ্ম আমাদের সামনে-পেছনে, উত্তর-দক্ষিণে, উপর-নীচে—সর্বত্র ব্যাপ্ত; এমনকি এই বিশ্বকেও অতিক্রম করে বিস্তৃত।

(পাদটীকা অনুযায়ী: শংকরভাষ্য [ব্রহ্মসূত্র ২।১।১৪]-এ আচার্য যে পাঠ দিয়েছেন, মূল মুণ্ডক উপনিষদ ২।২।১১-এ সেখানে “সর্ব”-এর স্থলে “বিশ্বং” পাঠ রয়েছে।)

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, দেব, ভূত এবং সবকিছুই তাঁর দ্বারা ব্যাপ্ত। তিনিই এই সমস্তের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়ের নিয়ন্তা। সেই একমাত্র ব্রহ্ম সম্বন্ধে নানাত্বের কল্পনা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত—এই ভাবই সংশ্লিষ্ট সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।

সব বাক্যের বিস্তৃত বিবেচনা এখানে প্রত্যাশিত নয়; না এ জন্য এটাই উপযুক্ত সময়, না স্থান। শুধু একটি মুণ্ডক উপনিষদ [২।২।১১]-এর বাক্যটি ধরুন—

‘ব্রহ্ম বেদমমৃতং পুরস্তাত্’

কত স্পষ্ট বাক্য—এই সমস্তই আমাদের সামনে অমৃত-ব্রহ্মই। এবার মূল উপনিষদ খুলে এর পূর্বপ্রসঙ্গ দেখুন। সেখানে ব্রহ্মের বর্ণনাই প্রকৃত বিষয়। তার ঠিক আগের প্রসঙ্গ—

‘ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং’

অর্থাৎ সূর্য, চন্দ্র প্রভৃতি ব্রহ্মকে প্রকাশ করে না; বরং এ সকলই তাঁর দ্বারাই প্রকাশিত। এরপরই শুরু হয়—

‘ব্রহ্ম বেদমমৃতং পুরস্তাত্’

বাক্যের পদগুলির প্রসঙ্গানুসারে অন্বয় এটাই হতে পারে— ‘ইদমেব অমৃতং ব্রহ্ম পুরস্তাত্’—এই অমৃত ব্রহ্মই আমাদের সামনে, এই পেছনে, এই উত্তরে, এই দক্ষিণে ইত্যাদি। এখানে ‘ইদং’ পদটি ‘পুরস্তাত্’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে জগত্-অর্থ বোঝাচ্ছে না; বরং পূর্বপ্রকৃত ব্রহ্মেরই নির্দেশক, যার বর্ণনা আগের প্রসঙ্গগুলোতে আছে। ফলে এই বাক্য জগতের ব্রহ্মাত্মকতার প্রমাণকারী বলা যায় না। প্রায় সব বাক্যের অবস্থাই এমন। অতএব শাস্ত্রানুসারে ব্রহ্মের অদ্বৈতভাবের যে অর্থ প্রথমে নির্দেশ করা হয়েছে, সেটাকেই গ্রহণ করা উচিত।

তথাকথিত মহাবাক্য-বিবেচনা

মহাবাক্যের কল্পনা আচার্য শংকর-এর মস্তিষ্কপ্রসূত বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রসঙ্গের মাঝখান থেকে এই বাক্যগুলো এমনভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে, যেন ‘মকান’ বা ‘দোকান’ শব্দ থেকে শুধু ‘কান’ ধরে নেওয়া হল। পূর্বোক্ত অভেদবোধক বাক্যগুলোর মতোই এদের অবস্থাও। এই বাক্যের সংখ্যা চার বলা হয়—

(১) অহং ব্রহ্মাস্মি

(২) অয়মাত্মা ব্রহ্ম

(৩) তত্ত্বমসি

(৪) সো’হম্ অথবা প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম

উপনিষদে এদের মূলস্থান যথাক্রমে এইরূপ—

১. ব্রহ্ম বা ইদমগ্র আসীৎ তদাত্মানমেবাবেত্—অহং ব্রহ্মাস্মি ইতি । তস্মাত্তৎসর্বমভवत্
[বৃহদারণ্যক উপনিষদ ১।৪।১০]

২. তদেতদ্ ব্রহ্মাপূর্বমনপরমনন্তরমবাহ্যম্—অয়মাত্মা ব্রহ্ম সর্বানুভূরিত্যনুশাসনম্
[বৃহদারণ্যক ২।৫।১৬]

৩. স য এষোণিমৈতদাত্ম্যমিদং সর্বং তৎসত্যং স আত্মা তত্ত্বমসি শ্বেতকেতো ইতি
[ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬।৮–১৬]

৪. আত্মৈবেদমগ্র আসীত্ পুরুষবিধঃ সো’নুবীক্ষ্য নান্যদাত্মনো’পশ্যৎ সো’হমস্মীতি অগ্নে ব্যাহরত্ ততো’হংনামাভवत্
[বৃহদারণ্যক ১।৪।১]

১. এই সব বিষয়ের বিস্তৃত বিবেচনার জন্য ‘ব্রহ্মসিদ্ধান্ত’ অথবা ‘বেদান্তদর্শনের ইতিহাস’ নামে পৃথক গ্রন্থ লেখার সংকল্প আছে। প্রভুর অনুগ্রহ প্রত্যাশিত।

এই বাক্যগুলির প্রয়োগ অন্যত্রও সম্ভব; এখানে কেবল উদাহরণের জন্য একটি স্থান দেওয়া হয়েছে।

প্রথম স্থানের দিকে দৃষ্টি দিন—উপনিষদকার তাঁর নিজস্ব এক বিশেষ রচনাশৈলী অনুসারে জগৎসৃষ্টির পূর্ববর্তী অবস্থার বর্ণনা করেন—

‘ব্রহ্মই সৃষ্টির আগে ছিল, তিনি নিজেকেই জেনেছিলেন— “আমি ব্রহ্ম”—এইভাবে। সেখান থেকেই এই সব হল।’

স্পষ্ট যে, উপনিষদকার ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বাক্যটি ব্রহ্মের দিক থেকেই উচ্চারিত করেছেন। ব্রহ্ম নিজের সম্বন্ধেই বলেন—
‘অহং ব্রহ্মাস্মি’আমি ব্রহ্ম।

ব্রহ্মের এই স্বরূপই উপাস্য। এতে ব্রহ্মের একমাত্র তত্ত্ব হওয়ার ভাব নিহিত আছে। সৃষ্টির পরে যখন উপাসক আত্মা ব্রহ্মের উপাসনা করে, তখন সে প্রাকৃত তত্ত্ব দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সেগুলোর মাধ্যমেই ব্রহ্মের কল্পনা ও জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু ব্রহ্মের সেই উপাস্য রূপে প্রকৃতি ও জগতের কোনও সংযোগ থাকা উচিত নয়; এই বাস্তবতাকেই সৃষ্টির পূর্বাবস্থায় বিশুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপের অভিব্যক্তির জন্য ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বাক্যের প্রয়োগ করা হয়েছে।

এরপর এই প্রসঙ্গেই ব্রহ্মের সেই একই স্বরূপকে উপাস্য বলে পুনরুক্ত করা হয়েছে—দেব, ঋষি ও মানুষের মধ্যে যে-ই সেই স্বরূপকে জেনেছে, সে ব্রহ্মকে লাভ করেছে; এখনও এবং চিরকালই তা করা যেতে পারে—

‘তদিদমপ্যেষ য এবং বেদ—অহং ব্রহ্মাস্মি ইতি স ইদং সর্বং ভবতি।’

সৃষ্টির পূর্বে ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’—এইভাবে প্রকাশিত প্রকৃতি প্রভৃতি থেকে অসংস্পৃষ্ট ব্রহ্মস্বরূপ—যে এখন বা যখনই তা জেনে নেয়, সে “এই সব” হয়ে যায়; অর্থাৎ এই সমস্তের আধারভূত ব্রহ্মকে লাভ করে।

এই অবস্থায় আত্মা অতিশয় ভক্তিভাবের উন্মেষে নিজেকে ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্ম বলে অনুভব করে। তাঁকে পেয়ে তার সমস্ত কামনা পূর্ণ হয়ে যায়; তখন এমন উদ্‌গার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে—যার উল্লেখ বামদেব প্রসঙ্গে আছে। যদি জীবাত্মা স্বভাবতই স্বয়ং ব্রহ্ম হত, তবে এই সমস্ত অনুভূতি ভিত্তিহীন হয়ে যেত। ব্রহ্মের দ্বারা উচ্চারিত ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ বাক্যে এই অন্তর্নিহিত স্বারস্যই বিদ্যমান।

উপনিষদগুলির নিজস্ব এক বিশেষ লেখনশৈলী আছে। যদি আমরা তার বাস্তবতাকে দৃষ্টির আড়ালে সরিয়ে দিই, তবে নিশ্চিতভাবেই তাতে নিহিত অর্থের সত্যতার দিকে না গিয়ে আমরা পথভ্রষ্ট হই।

আমাদের অভিপ্রায় কখনওই এই নয় যে উপনিষদে আত্মা–ব্রহ্মের অভেদভাবনার কোনও ইঙ্গিতই নেই; আমাদের বক্তব্য কেবল এই যে, এমন ইঙ্গিতগুলি ‘দেবদত্ত এব কুলম্’ প্রভৃতি লৌকিক প্রয়োগের মতোই ব্রহ্মের অতিশয় মহিমাকেই প্রকাশ করে।

এইসব প্রসঙ্গ থেকে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান অর্থকে বাস্তব ধরে নিয়ে আচার্য শংকর তার সমর্থনে যে দুর্গ নির্মাণ করেছেন এবং তাকে অভেদ্য বলে মনে করেছেন—বাস্তবে তাতে বহু গোপন দ্বার খোলা রয়ে গেছে। চিন্তাশীল বিদ্বানরা এই সত্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন।

অন্য তথাকথিত মহাবাক্যগুলির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

দ্বিতীয় মহাবাক্যটি যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে, তা ব্রহ্মবর্ণনার প্রসঙ্গ। সেই ব্রহ্ম সম্পর্কেই বলা হয়েছে—
‘অয়মাত্মা ব্রহ্ম’ (অয়ম্ আত্মা ব্রহ্ম) — এই আত্মাই ব্রহ্ম।
এখানে জীবাত্মাকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে—এমন কোনও ভিত্তি নেই।

তৃতীয়টির বিষয়ে বর্তমান বিদ্যোদয়ভাষ্যের [ব্রহ্মসূত্র ১।১।৭–৮] স্থান দ্রষ্টব্য।
চতুর্থ মহাবাক্যের প্রসঙ্গ প্রথমটির মতোই। এখানে অধিক বিস্তার অনাবশ্যক।


জীব–ব্রহ্মের ভেদ ব্রহ্মসূত্রে

জীব–ব্রহ্মের ঐক্য প্রমাণের জন্য মহাবাক্যের কল্পনা একটি স্পষ্ট প্রপঞ্চনা। এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং ব্রহ্মসূত্র।

ব্রহ্মসূত্রে বহু স্থানে স্পষ্টভাবে জীবাত্মা ও ব্রহ্মের ভেদের উল্লেখ আছে। এই বিষয়ের কয়েকটি সূত্র নিম্নরূপ—

  • নেতরো’নুপপত্তেঃ [১।১।১৬]

  • ভেদব্যপদেশাচ্চ [১।১।১৭]

  • অনুপপত্তেস্তু ন শরীরঃ [১।২।৩]

  • কর্মকর্তৃত্বব্যপদেশাচ্চ [১।২।৪]

  • প্রাণভূচ্চ [১।৩।৪]

  • ভেদব্যপদেশাৎ [১।৩।৫]

  • নাত্মা শ্রুতে নিত্যত্বাচ্চ তাভ্যঃ [২।৩।১৭]

  • সো’ত এব [২।৩।১৮]

  • জগদ্ব্যাপারবর্জ প্রকরণদসংনিহিতত্বাচ্চ [৪।৪।১৭]

এই সব সূত্রের ভাষ্যে আচার্য শংকর নিজেই ভেদমূলক অর্থ গ্রহণ করেছেন—জীবাত্মা ও ব্রহ্মের ভেদ স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি কোথাও লিখতে ভোলেননি যে এই ভেদ অবিদ্যাকৃত।

আশ্চর্যের বিষয়—সমগ্র ব্রহ্মসূত্রে কোথাও ইঙ্গিতমাত্রও নেই যে জীবাত্মা ও ব্রহ্মের ভেদ অবিদ্যার কারণে। স্পষ্টতই এটি সম্পূর্ণ সূত্রবহির্ভূত ও কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য। সূত্রকার জানেন—অবিদ্যা ব্রহ্মে কোনও প্রকার ভেদ সৃষ্টি করতে পারে না। অবিদ্যা ব্রহ্মের উপর প্রভাব ফেলবে—এ সম্পূর্ণ অসম্ভব।

এই স্থানগুলির অতিরিক্ত দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় পাদে জীবাত্মার নিত্যতা ও চৈতন্যের উল্লেখ করে তার উৎক্রমণ ও কর্তৃত্ব প্রভৃতির বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পরে [২।৩।৪৩]-এ জীবাত্মা ও ব্রহ্মের উপকার্য–উপকারকভাব স্বয়ং আচার্য শংকর স্বীকার করেছেন এবং অংশাংশিভাবের প্রসঙ্গে ‘অংশ ইবাংশঃ’ বলে স্পষ্ট করেছেন যে জীবাত্মা প্রকৃত অর্থে ব্রহ্মের অংশ নয়।

এরপর সূত্রকার কর্তৃক অনুমতি–পরিহার প্রভৃতির বর্ণনার মাধ্যমে জীবাত্মা ও ব্রহ্মের স্পষ্ট ভেদ নিরূপিত হয়েছে।


সূত্রপাঠ ও অধিকরণ

প্রকাশিত সমস্ত প্রাচীন ও আধুনিক ভাষ্যে ব্রহ্মসূত্রের পাঠ একরূপ পাওয়া যায় না। সূত্রগুলিতে পদভেদের পাশাপাশি এমন ভেদও আছে—যেখানে একটি সূত্রকে কেটে দুইটি করা হয়েছে, আবার দুইটি সূত্রকে মিলিয়ে একটি করা হয়েছে…দেওয়া হয়েছে। এইভাবে সূত্রপাঠে ব্যতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র সূত্রসংখ্যাতেও ভেদ হয়ে গেছে। বর্তমান ভাষ্যে সূত্রপাঠ আচার্য শংকর প্রদর্শিত পাঠ অনুসারেই গৃহীত হয়েছে। সমগ্র সূত্রসংখ্যা ৫৫৫। কেবল একটি [১।৩।৩৬] সূত্রে আমরা ‘প্রাণঃ’ পদ অতিরিক্ত যোগ করেছি। তার কারণ ভাষ্যেই লিখে দেওয়া হয়েছে। পরিশিষ্ট–১ সূত্রসূচিতে বর্ণানুক্রম অনুযায়ী উভয় পাঠই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্রহ্মসূত্রে অধিকরণগুলির কল্পনা সর্বপ্রথম আচার্য শংকরই উদ্ভাবন করেছিলেন—এমনটাই প্রতীয়মান হয়। নিজের মতের সমর্থনে আচার্য সেইভাবে সূত্রগুলিকে শ্রেণিবদ্ধ করেন। আচার্যের পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা—বিশেষত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভাষ্যকাররা—এই শ্রেণিবিন্যাস সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেননি; নিজেদের মত অনুসারে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে তাতে কিছু উলটফের করেছেন। এই কারণেই বর্তমান ভাষ্যে অধিকরণ-নির্দেশ উপেক্ষা করা হয়েছে; তবে এই নিবেদনের পর ‘অধিকরণ নির্দেশ’ শিরোনামের অধীনে আচার্য শংকর নির্দেশিত অধিকরণ-তালিকা বর্তমান ভাষ্যের পৃষ্ঠাক্রম অনুসারে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে অঙ্কের মাধ্যমে এটাও দেখানো হয়েছে যে আচার্য কতগুলি সূত্রে অধিকরণ নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন ভাষ্যকার অনুসারে সূত্রপাঠ ও অধিকরণসমূহের বিচার নিয়ে বিদ্বানরা যথেষ্ট কাজ করেছেন; এখানে সে সবের নির্দেশ অনাবশ্যক।


ব্রহ্মসূত্রের রচয়িতা

এই সূত্রগুলির রচয়িতা কে—এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সন্দেহমুক্ত কোনও একক সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়নি। এর প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আচার্য শংকরের ভাষ্য। আচার্য বিভিন্ন দার্শনিক মত—বিশেষত বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের—যে স্তরে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার ফলে আধুনিক আলোচকদের মধ্যে এই ধারণা গড়ে উঠেছে যে বৌদ্ধ–জৈন দর্শনের সেই স্তরের বিকাশের পরেই সূত্রগুলির রচনা হওয়া উচিত।

ভারতীয় পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে এই বিশ্বাস প্রচলিত যে এই সূত্রগুলির রচয়িতা দ্বাপরের অন্তে আবির্ভূত বেদব্যাস; তাঁর সাংস্কৃতিক নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, আর তাঁরই অপর নাম বাদরায়ণ। আধুনিক চিন্তাবিদেরা এই পরম্পরা মানতে চান না, কারণ আচার্য শংকর এই সূত্রগুলির ভিত্তিতে যেভাবে বৌদ্ধ–জৈন দর্শনের প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেই রূপটি বেদব্যাসের কালের বহু সহস্র বছর পরে বিকশিত—অতএব বেদব্যাস নিজের কালে সেই রূপে বৌদ্ধ–জৈন দর্শনের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন—এটা সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় কেবল দুইটিই বিকল্প থাকতে পারে—
১) হয় এই সূত্রগুলির রচয়িতা বেদব্যাস নন; বৌদ্ধ–জৈন দর্শনের বিকাশের পর কোনও বাদরায়ণ আচার্য এদের রচয়িতা; অথবা
২) আচার্য শংকর যে ভাবে এই প্রসঙ্গগুলির ব্যাখ্যা করেছেন, তা সম্পূর্ণরূপে সূত্রকারের অভিপ্রায়ের অনুসারী নয়।
এই দুইয়ের মধ্যে একটিই সত্য হতে পারে। আধুনিক চিন্তাবিদেরা আচার্য শংকরের লেখার উপর প্রশ্ন তোলাকে দুঃসাহস মনে করে ভারতীয় পরম্পরাকেই ভ্রান্তি বলে উড়িয়ে দেন—যদিও তা সত্যভিত্তিক হোক।

এই কেন্দ্রবিন্দুর চারপাশে আধুনিক চিন্তাবিদেরা যথেষ্ট উপাদান সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন—এই প্রমাণের জন্য যে বৌদ্ধ দর্শনের সেইরূপ বিকাশের পর বাদরায়ণ নামে কোনও আচার্য এই সূত্রগুলি রচনা করেছিলেন। এ বিষয়ে অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করার সংকল্প আমাদের আছে; কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা অনুপযুক্ত। তবে একটি কথা লেখা প্রয়োজন—বিদ্বানরা এ বিষয়ে চিন্তা করুন।

আচার্য শংকর ব্রহ্মসূত্রভাষ্যে দুই স্থানে [১।৩।২৮ এবং ৩।৩।৫৩] ভগবান উপবর্ষের স্মরণ করেছেন। দ্বিতীয় স্থান থেকে জানা যায়—উপবর্ষ জৈমিনীয় মীমাংসা সূত্র এবং চতুরধ্যায়ী ব্রহ্মসূত্র—উভয়ের উপরই ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। আধুনিক বিদ্বানরা উপবর্ষের কালকে পাণিনি–এর সমসাময়িক বলে মনে করেন। ঐতিহাসিক ভিত্তিতে প্রমাণিত—পাণিনির গুরুর ভাই ছিলেন উপবর্ষ।

পাশ্চাত্য খ্রিস্টান পণ্ডিতেরা ভারতের প্রাচীন আচার্যদের কালসরোবরের মধ্যে প্রায়ই মিথ্যা ও সন্দেহজনক তর্কের এমন পাথর ছুঁড়েছেন যে সেই সরোবর সম্পূর্ণ ঘোলা হয়ে উঠেছে। পাণিনির কাল নিয়েও ঐকমত্য নেই। পাশ্চাত্য পণ্ডিত ও তাঁদের অনুসারী ভারতীয় চিন্তাবিদেরা পাণিনির কাল বহু টানাপোড়েন করে বিক্রম সংবৎ শুরু হওয়ার প্রায় পাঁচশো বছর পূর্বে স্থির করেছেন; এর বিপরীতে পণ্ডিত যুধিষ্ঠির মীমাংসক ভারতযুদ্ধের প্রায় তিনশো বছর পরে পাণিনির অবস্থান প্রমাণ করেছেন। এই দুই কালের মধ্যে বিরাট ব্যবধান—প্রায় দুই সহস্র বছরেরও বেশি।

তবে সুজনতোষন্যায় অনুসারে আমরা চিন্তার সুবিধার জন্য প্রথম মতটিই গ্রহণ করি। পাণিনির এই কালের আশেপাশেই আধুনিক বিদ্বানরা ভগবান বুদ্ধ–এর আবির্ভাবকাল নির্ধারণ করেছেন। সেই সময়ে বৌদ্ধ দর্শনের বিকাশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল—এ কথা কোনওভাবেই প্রমাণ করা যায় না, যে রূপের প্রত্যাখ্যান আচার্য শংকর সূত্রের ভিত্তিতে করেছেন। যদি এই যুক্তিতে বলা হয় যে তখন ব্রহ্মসূত্রের অস্তিত্বই ছিল না—তবে পাণিনিকালে আবির্ভূত ভগবান উপবর্ষ কীভাবে এই সূত্রগুলির উপর ব্যাখ্যা লিখলেন?

আরও দেখুন—ভগবান উপবর্ষ ব্রহ্মসূত্রের উপর নিজের ভাষ্য বোধায়নবৃত্তির…যে ভিত্তিতে এটি লেখা— ‘প্রপঞ্চহৃদয়’ নামক গ্রন্থের লেখ থেকে জানা যায় যে, অত্যন্ত বিস্তৃত বোধায়ন-বৃত্তিকে উপবর্ষ সংক্ষিপ্ত করেছিলেন। এমনটাই সাধারণত হয়ে থাকে— যখন অতিবিস্তৃত গ্রন্থ অধ্যয়নের জন্য পরবর্তীকালে মানুষের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে না, তখন সেই গ্রন্থগুলোর সংক্ষেপ রচনা করা হয়। খুব সম্ভব, উপবর্ষও এমনই একটি প্রচেষ্টা করেছিলেন। এই পরিস্থিতি সম্ভব হতে হলে উপবর্ষ ও বোধায়নের কালের ব্যবধান দশ–বিশ–পঞ্চাশ বছর নয়, বরং শতাধিক বছর ধরেই ধরতে হবে।

উপবর্ষের বহু পূর্বে বোধায়নের কাল ধরা হোক বা না হোক— তিনি যখন ব্রহ্মসূত্রের উপর বৃত্তি লিখেছিলেন, এটুকু নিশ্চিত যে এই সূত্রগুলি বৌদ্ধদর্শনের সেই বিকাশের অনেক আগেই বিদ্যমান ছিল, যার উল্লেখ করেছেন আচার্য শংকর। আধুনিক পণ্ডিতরা এই বিষয়ে লিখতে গিয়ে ব্রহ্মসূত্রের বৌদ্ধপ্রত্যাখ্যান-প্রসঙ্গ এবং পাণিনিসূত্রে ব্যবহৃত কয়েকটি পদের ভিত্তিতে দেখাতে চেয়েছেন যে ব্রহ্মসূত্র ও পাণিনিসূত্র বৌদ্ধদর্শনের বিকাশের পরে রচিত। কিন্তু কয়েকটি পদের জটিল মিল কেবলমাত্র বিভ্রান্তি— এসবের উপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট পূর্বাপর নির্ণয় করা অসম্ভব।

এই অবস্থায় ব্রহ্মসূত্রের ভিত্তিতে আচার্য শংকর যে ধরনের বৌদ্ধদর্শন-প্রত্যাখ্যান করেছেন, সে বিষয়ে ভাবা প্রয়োজন। এমন নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্রহ্মসূত্রগুলিতে পরবর্তীকালে বিকশিত বৌদ্ধদর্শনের স্বীকৃত মতগুলোর কোনো ইঙ্গিত নেই। আচার্য শংকর তাঁর সমগ্র জীবন বৌদ্ধপ্রত্যাখ্যানেই ব্যয় করেছেন। ভবিষ্যতে তার প্রচার ও স্থায়িত্বের জন্য তিনি ব্রহ্মসূত্রকে ভিত্তি করেন, কারণ এখানে প্রধানত ব্রহ্মের প্রতিপাদন রয়েছে— আর বৌদ্ধদর্শন ব্রহ্মের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। সেই প্রত্যাখ্যানের জন্য এই ভিত্তিই ছিল উপযুক্ত।

সূত্ররচনার কালে ‘বৌদ্ধদর্শন’ নামে কোনো সুসংবদ্ধ প্রত্যাখ্যান-চিন্তা ছিল না। ব্রহ্মের অস্তিত্ব স্পষ্ট করতে কেবল ‘সমুদায়’-এর ভিত্তিতে জগতের প্রক্রিয়ার কল্পনা করে সূত্রকার সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। কেবল মূলতত্ত্বসমূহের সমষ্টিই যদি জগৎ হয়— এই মতকে এগিয়ে নিতে হলে তাদের প্রতি ক্ষণে পরিবর্তনশীল মানতেই হয়। সেই পরিবর্তনেরই চমৎকারিত্ব সমুদায়। এই ধারণায় ব্রহ্মের অস্তিত্ব উপেক্ষিত হয়ে যায়। সেই কারণেই সূত্রকার এই বিকল্প উত্থাপন করে তার বিচার করেছেন। সেই ইঙ্গিত পেয়ে আচার্য শংকরের কাজ শুধু এটুকুই— নিজের কালে সুবিন্যস্ত বৌদ্ধদর্শনের বিশেষ মতগুলোকে সূত্রের ভিত্তিতে খণ্ডন করা, কারণ তাঁর সামনে উপস্থিত বৌদ্ধদর্শনেরই প্রত্যাখ্যান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রত্যাখ্যান-পদ্ধতিই সূত্ররচনাকাল ও সূত্রকার সম্পর্কে আধুনিক চিন্তকদের বিভ্রান্ত করেছে। সত্য অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে এর সমাধান অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু এই বিষয়ে ভারতীয় পরম্পরাকে উপেক্ষা করা সমুচিত নয়।

ব্রহ্মসূত্র ও আচার্য শংকর প্রভৃতির ভাষ্য

আচার্য শংকর ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যার জন্য যে পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, পরবর্তী প্রায় সকল ভাষ্যকারই সেই পথ অনুসরণ করেছেন। বৈষ্ণব ভাষ্যকারেরা সামান্য রদবদল করে কেউ ‘ব্রহ্ম’-এর জায়গায় ‘বিষ্ণু’, কেউ ‘বাসুদেব’ বসিয়েছেন। প্রমাণের দিক থেকে তাঁদের ভাষ্যে পুরাণশ্লোকের প্রাচুর্য দেখা যায়। এই ক্ষেত্রে আচার্য রামানুজের ভাষ্য উৎকৃষ্ট। কিন্তু ব্যাখ্যার পদ্ধতিতে সবাই সেই পথেই হেঁটেছেন, যা আচার্য শংকর নির্মাণ করেছিলেন— বিশেষত যেখানে পরমত-প্রত্যাখ্যানের প্রসঙ্গ এসেছে।

সবচেয়ে বেশি জোর তিনি দিয়েছেন সাংখ্য-প্রত্যাখ্যানে। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাকে ‘প্রধানমল্ল’ মনে করে পরাস্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। পঞ্চম সূত্র থেকেই এর সূচনা হয়ে প্রথম দুই অধ্যায়ের বহু প্রসঙ্গে এর বিস্তার রয়েছে। সাংখ্য ছাড়াও বৈশেষিক, বৌদ্ধ, জৈন, ভাগবত প্রভৃতি মতেরও তিনি সূত্রের ভিত্তিতে খণ্ডন করেছেন।

এই খণ্ডনগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য— তার বিস্তারিত আলোচনার স্থান এখানে নয়। তবু কয়েকটি ইঙ্গিত দেওয়া অনুচিত হবে না। প্রথম কথা, এই প্রত্যাখ্যানে আচার্য শংকর যে বিরোধী মানসিকতা প্রকাশ করেছেন, তা সূত্রকারের ছিল— এ বিষয়ে গভীর সন্দেহ আছে। তাছাড়া এগুলি ব্রহ্মের শাস্ত্রীয় স্বরূপ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়কও নয়, যেখানে অন্য ব্যাখ্যা-পদ্ধতিতে আরও সঙ্গত উপস্থাপন সম্ভব।

সাংখ্যের এই রূপের প্রত্যাখ্যান কপিলের প্রকৃত মতকে বিকৃত করে করা হয়েছে, ফলে তা ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে। বৈশেষিকের খণ্ডনও যেন কেবল খণ্ডনের জন্যই। বৈশেষিকের অবস্থান না মেনে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। বৌদ্ধমত খণ্ডন করা আচার্যের উদ্দেশ্য ছিল। জৈনদর্শনের ক্ষেত্রে কেবল সপ্তভঙ্গী নয়ের প্রতিবাদ করেছেন— এই নয়ের বিকাশ কবে হয়েছে, তা নির্ণয় করলেই এই প্রত্যাখ্যানের যথার্থতা বোঝা যাবে।

ভাগবতদর্শনের খণ্ডনও বিস্ময়কর। ভাগবতদর্শন বলতে সেই দর্শনই বোঝানো হয়েছে, যার বিবরণ আছে শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থে। বলা হয় এটি বেদব্যাস রচিত। যদি ব্রহ্মসূত্রও তাঁরই রচনা হয়, তবে নিজের বক্তব্য নিজেই খণ্ডন— এ কেমন ব্যাপার? আর যদি ভাগবত পরে রচিত হয়, তবে সূত্রে তার খণ্ডন এল কীভাবে? আবার যদি সূত্রকার অন্য কোনো পরবর্তী ‘বাদরায়ণ’ হন— তবে সেটিও ভারতীয় পরম্পরার পরিপন্থী।

এই সমস্ত দিক বিবেচনা করে আমাদের বক্তব্য শুধু এটুকুই— যে তাৎকালিক আবেগে আচার্য শংকর সূত্রে পরমত-নিরাকরণের যে রূপ আরোপ করেছেন, তা সূত্রশৈলীর অভিপ্রেত নয়। পরবর্তী ভাষ্যকারেরা কেন সেই পথই অনুসরণ করলেন— তা ভাবনার বিষয়। সম্ভবত নিজ নিজ সম্প্রদায়-পোষণের প্রবণতাই এর সহায়ক হয়েছে।


ব্রহ্মসূত্র এবং প্রস্তাবিত বিদ্যোদয়ভাষ্য— এই ‘নিবেদন’-এর পংক্তিগুলিতে ব্রহ্মবিষয়ক ভাবনার যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, সেই ভাবনাই এই সূত্রগুলির ব্যাখ্যার মূল আধার। কোনো পূর্ববর্তী ভাষ্যের এতে অনুকরণ করা হয়নি। সূত্র-পদ থেকে—প্রসঙ্গের উপেক্ষা না করে—যে ভাবগুলি বোঝা যেতে পারে, সেগুলিকেই ব্যক্ত করা হয়েছে। ব্রহ্মবিষয়ক বৈদিক সিদ্ধান্তসমূহ এবং সেই পরম্পরাগুলিকে সমানভাবে ধ্যানে রাখা হয়েছে, যা অতিপ্রাচীনকাল থেকে অধ্যাত্মশাস্ত্রে প্রবাহিত। কোনো সম্প্রদায়ের সমর্থন বা নিরাকরণ এই ভাষ্যের লক্ষ্য নয়। যতদূর সম্ভব, সত্যকে ব্যক্ত করার লক্ষ্যই প্রধান রাখা হয়েছে। এই রূপে এটি কোনো অনুবর্তী ব্যাখ্যা নয়, বরং স্বতন্ত্র ভাষ্য। বিশেষ পরমতের নিরাকরণে সূত্রকারের ভাবনা ছিল না—এর যথাসম্ভব পালন এই প্রস্তাবিত ভাষ্যে করা হয়েছে। বিবেচক পাঠকদের উদ্‌বোধক ভাবনার স্বাগত জানাতে ভাষ্যকার সদা অভিলাষী।

কৃতজ্ঞতা-প্রকাশন— ব্রহ্মসূত্রের সেই সকল মহান বিদ্বান ভাষ্যকারদের কাছে আমি ঋণী, যাঁদের ব্যাখ্যানের আধারে আমি সূত্রার্থ বুঝবার চেষ্টা করেছি। ঋষিতুল্য সেই গুরু-চরণগুলির প্রতি হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞ, যাঁদের অনুপম বাৎসল্যপূর্ণ দয়াভাষ এবং বরদহস্তের ছায়ায় বসে নিগূঢ় রহস্য বুঝবার শ্রম করে এসেছি। যথার্থের জ্ঞানের জন্য যাঁরা জানা-অজানা মহানুভবদের সংস্পর্শে এসেছি, এবং যাঁরা সদা দয়া করে আমাকে তাঁদের সময় দিয়েছেন—তাঁদের সকলের প্রতিই আমি হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞ।

বিরজানন্দ বৈদিক (শোধ) প্রতিষ্ঠান-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্বামী বেদানন্দতীর্থ-এর জীবনকালে আমার একটি রচনা ‘সাংখ্যদর্শনের ইতিহাস’ শ্রীস্বামীজীর আন্তরিক ও আর্থিক সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ই সাংখ্য-বিষয়ক আরও দুটি রচনার পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল, যেগুলির প্রকাশ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালক সভাপতি শ্রীস্বামী বিজ্ঞানানন্দ সরস্বতী এবং মন্ত্রী শ্রী পং. সত্যানন্দ শাস্ত্রী M.A.-এর সদ্‌প্রচেষ্টায় গত বছরগুলিতে সম্পন্ন হয়েছে।

শ্রী স্বামী বেদানন্দতীর্থজীর এই সংকল্প ছিল— সাংখ্য-বিষয়ক অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠান দ্বারা যে রীতিতে উপস্থাপিত হয়েছে, সেই একই রীতিতে যদি বেদান্তদর্শন এবং যথাসম্ভব অন্যান্য দর্শনেও কাজ করা যায়, তবে তা এক লোকোপকারী কার্য হবে। সেই সংকল্পে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সভাপতি ও মন্ত্রী মহোদয়ের অনুমতিতে বেদান্ত-দর্শনের উপর কাজ শুরু করা হয়, যার প্রথম রচনা ‘ব্রহ্মসূত্রবিদ্যোদয়ভাষ্য’ রূপে উপস্থাপিত। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মহানুভবেরা সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিয়ে এই পুণ্যকার্য সম্পন্ন করেছেন—তাঁদের প্রতি আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।

অচিন্ত্যশক্তি ভগবান আমাদের সকলকে শক্তি দিন, যাতে আমরা আমাদের সদ্‌প্রচেষ্টায় সাফল্য লাভ করতে পারি—এই একান্ত প্রার্থনা।

বড়ি হোলি, গাজিয়াবাদ,

চৈত্র শুক্ল ১০, শুক্রবার,

সংবৎ ২০২৩ বিক্রমী

বিনীত, উদয়বীর শাস্ত্রী


ও৩ম্

ব্রহ্মসূত্র-বিদ্যোদয়মাষ্যম্ সমন্বয়াত্মকে প্রথমাধ্যায়ে প্রথমঃ পাদঃ।

চেতন এবং অচেতনরূপ দুই প্রকারের তত্ত্ব সংসারে পাওয়া যায়। সৃষ্টিবিদ্যার পারদর্শী বিদ্বানরা এই বিষয়ে যে বিশদ চিন্তা উপস্থাপন করেছেন, তা প্রত্যেক চিন্তাশীল ব্যক্তিকে এই ফলাফলের কাছেই পৌঁছে দেয়। এই তত্ত্বগুলির বিবেচনা ভারতীয় শাস্ত্রসমূহে বিস্তারের সঙ্গে করা হয়েছে; বিশেষরূপে দর্শনশাস্ত্রগুলির এটাই প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। যদিও আজ এমন মনে করা হয় যে, ভারতীয় দর্শনসমূহে পরস্পরবিরোধী অর্থের প্রতিপাদন হয়েছে—তারা একে-অপরের প্রতিপাদ্য অর্থের প্রতিষেধ করতে দেখা যায়। এমন অবস্থায় প্রকৃত তত্ত্ব কী—এ সিদ্ধান্ত করে নেওয়া সহজ কাজ নয়।

দর্শনশাস্ত্রের এই অবস্থাকে আধুনিক দৃষ্টিতে এই ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয় যে, এই ধরনের ভাববৈচিত্র্য মানবীয় মস্তিষ্কের বিকাশ এবং তার ক্রমিক উর্বরভাবের দ্যোতক। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের এই প্রবৃত্তিকে যথার্থ রূপে অনুভব করা যায়। এর থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছি যে, মানুষ চিন্তার দাসত্বকে স্বাভাবিকভাবে সর্বাত্মনায় কখনও গ্রহণ করেনি, নিজের উপর কখনও তাকে প্রভাবশালী হতে দেয়নি। এই ভাবমূলক সংঘর্ষ জনতার সামনে সদা এসে থাকে, এবং আসতেই থাকবে। এই প্রবৃত্তিকে মানুষের জ্বলন্ত জাগৃতি ও সতর্কতার প্রমাণ বলা হয়।

এই বিষয়ে মহান আত্মাদের অভিজ্ঞতা এই যে—এই প্রবৃত্তি স্বাভাবিক হলেও, জীবন্ত জাগৃতির চিহ্ন হলেও, একদিকে জানালার ফাঁক দিয়ে নিঃশব্দে অজ্ঞানের ছায়া এতে উঁকি দেয়। মানুষ ঘুরে সেই দিকে খুব কমই তাকিয়েছে। বলা যেতে পারে—এই প্রবৃত্তি নিজের রূপে যতই বাস্তব হোক, তবু এর দ্বারা তত্ত্বের সিদ্ধান্ত ও তার স্বরূপের সমাধানে কোনো সন্তোষজনক সহযোগ পাওয়া যায় না; যখন সেই ভাবগুলি এত স্পষ্ট বিভেদের সঙ্গে আমাদের সামনে আসে, তখন তাদের মধ্যে কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা—তা জানা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় দুইটি বিকল্প হতে পারে—তাদের মধ্যে কোনো একটি ভাব সত্য, অথবা কোনোটিই সত্য নয়; আর এ যেন অন্ধকারে লাঠি চালানো ও হাত-পা ছোড়ার প্রদর্শন চলছে। কারণ এই যে—তত্ত্বের স্বরূপ একটিই হতে পারে; সম্ভব যে মানুষ এখনও তাকে পায়নি, কিন্তু তাকে জানার ও পাওয়ার জন্য …তার এই প্রয়াস প্রশংসনীয়।

আমরা নিজেদের এমন অবস্থায় অনুভব করি যে, যেসব পারদৃশ্বা বিদ্বান সেই চিন্তাগুলি উপস্থাপন করেছেন, তাঁদের পবিত্র লোককল্যাণকারী ভাবনাগুলিকে সমঝে নিয়ে এই সাহস হয় না যে, সেই ভাবনাগুলিকে অনায়াসে অসত্য বলে ধরা হয়। তখন যে-কোনো চিন্তাবিদের সম্মুখে এই গুরুতর সমস্যা এসে দাঁড়ায়—সেই বিভেদের ছায়ার মধ্যে কোন্‌সী সমতা অন্তর্নিহিত আছে, যা এর সমাধান দিতে পারে। ক্রান্তদর্শী আচার্যরা এর জন্য কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন; আসুন, সেগুলির উপর চিন্তা করি।

জানা যায়—তত্ত্বের বাস্তবতার স্বরূপের বিস্তার অনন্ত। সময়-সময় যে তত্ত্বদর্শী বিদ্বানরা ভূ-মণ্ডলে প্রাদুর্ভূত হয়ে এসেছেন, এবং সেই তত্ত্বের বাস্তবতার মহাসাগরে অবগাহন করে এসেছেন; তাঁরা লোককল্যাণের ভাবনা থেকে সেই অতল সাগরের যতখানি জ্ঞান-রত্ন তখনকার জন-মানসের জন্য প্রয়োজনীয় অথবা প্রত্যাশিত মনে করেছেন, ততখানিই উপস্থাপন করার স্তুত্য প্রয়াস করেছেন। তাঁদের সামনে এই পরিস্থিতি সদা জাগ্রত ছিল যে, যেসব ব্যক্তির জন্য এই তত্ত্ব-স্বরূপ আলোকিত করা হচ্ছে, তা গ্রহণ করার ক্ষমতা তাঁদের মধ্যে কতখানি আছে। জ্ঞান গ্রহণের ক্ষমতার ভিত্তিতে জিজ্ঞাসু অধিকারীকে তত্ত্বের কোনো অংশ উপদেশদানকারী আচার্য সম্পর্কে এ কথা বলা যায় না যে, তাঁর তত্ত্ব-বিষয়ক জ্ঞান ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ। নিজেদের অজ্ঞতার কারণে আমরা এ কথা ভেবে নিই যে, আচার্যের এতটুকু উপদেশই চূড়ান্ত, এবং এটিই তাঁর তত্ত্ববিষয়ক জ্ঞান-সীমা; সেই সত্যটিকে আমরা চোখের আড়াল করি—যার দ্বারা প্রেরিত হয়ে উপদেশদাতা জিজ্ঞাসু অধিকারীর গ্রহণক্ষমতা বিচার করে তত্ত্বের উপদেশ দিয়েছেন। উপদেশদাতার জিজ্ঞাসুর প্রতি সদা কল্যাণের ভাবনাই থাকে, নিজের তত্ত্বজ্ঞান প্রদর্শনের নয়। এইভাবে প্রত্যেক দর্শন তত্ত্ববিষয়ে যতখানি অংশের বর্ণনা করে, তাকেই সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত ধরে নিয়ে তাদের পারস্পরিক বিরোধ ঘোষণা করা সমুচিত নয়।

এই ভাবনার ছায়ায় যদি আমরা দর্শনগুলির প্রতিপাদ্য বিষয়গুলির দিকে লক্ষ্য করি, তবে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রত্যেক দর্শন একে-অপরের পরিপূরক, বিরোধী নয়। ভারতীয় দর্শনগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়—এক আস্তিক দর্শন, দ্বিতীয় নাস্তিক দর্শন। আস্তিক দর্শন ছয়টি—ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা, বেদান্ত। নাস্তিক দর্শনের মধ্যে চার্বাকদর্শন, জৈনদর্শন এবং বৌদ্ধদর্শনের সমাবেশ।

আস্তিক দর্শনগুলিকে ধরা যাক। ন্যায়দর্শনে প্রমাণ, প্রমেয় প্রভৃতির বর্ণনা আছে। বস্তুতত্ত্বকে বোঝার জন্য কোন্‌ পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে, অথবা কোন্‌ রীতি এর জন্য প্রত্যাশিত—এই কথাগুলিকেই বোঝাতে ও স্পষ্ট করতে এই দর্শনের প্রয়াস। বস্তু-মাত্রের সিদ্ধির জন্য প্রত্যেক স্তরে প্রমাণের আশ্রয় নিতে হয় …হয়। এই অবস্থার কোনো দর্শন বিরোধিতা করে না। ন্যায় মূলত এটিই বর্ণনা করে।

তত্ত্ববিষয়ক জিজ্ঞাসা হলে প্রথমে সেই বিষয়ের শিক্ষার উপক্রম সেখান থেকেই হয়, যার প্রতিপাদন বৈশেষিক করেছে। এখানে সেই ভৌতিক তত্ত্বগুলির বিবেচনা আছে, যা জীবনের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে। মানবজীবন অথবা প্রাণীমাত্র যে পরিবেশ দ্বারা আবৃত, এবং নিজের নির্বাহ ও নিজের অস্তিত্ব—যতদূর সম্ভব—অটুট রাখার জন্য যেসব ভূত-ভৌতিক তত্ত্বের উপর সরাসরি নির্ভর করে, সেগুলির এবং তাদের স্থূল-সূক্ষ্ম সাধারণ স্বরূপ ও তাদের গুণ-ধর্মের বিবেচনাই বৈশেষিক দর্শনের প্রধান বিষয়। এটিকে জেনেই পরে তত্ত্বগুলির অতিসূক্ষ্ম অবস্থাগুলি জানার-বোঝার দিকে প্রবৃত্তি ও সক্ষমতা হওয়া সম্ভব। এর বিরোধের কোনো সুযোগ আসে না—এটি তত্ত্ববিষয়ক জ্ঞানের নিজস্ব একটি স্তর। বেদান্ত প্রভৃতির অধ্যয়নও এর ছাড়া অসম্পূর্ণ থাকে। তার প্রতিপাদ্য বিষয় বুঝতে জ্ঞান-সাধনের এই স্তর দিয়ে অতিক্রম করা প্রয়োজন। বেদান্ত অথবা অন্য কোনো দর্শন এর বিরোধ করে না।

তত্ত্বগুলির সেই অতিসূক্ষ্ম অবস্থাগুলি এবং চেতন-অচেতন রূপে তাদের বিশ্লেষণ ও তাদের বস্তুগত ভেদজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সাংখ্য উপস্থাপন করে। প্রমাণের দ্বারা বস্তুসিদ্ধি এবং বৈশেষিকের তত্ত্ববিষয়ক প্রতিপাদ্য অংশকে সে নিজের সীমার মধ্যে ধারণ করে রাখে। তখন ন্যায়-वैশেষিকের সঙ্গে তার বিরোধের প্রশ্নই ওঠে না। না তারা দু’জন সাংখ্যের বিরোধ করে, কারণ তাদের নিজেদের প্রতিপাদ্য বিষয়ের ক্ষেত্র সীমিত। বেদান্ত প্রভৃতির সঙ্গেও সাংখ্যের কোনো বিরোধ নেই, কারণ বেদান্তের প্রধান প্রতিপাদ্য ব্রহ্মতত্ত্বকে স্বীকার করতে সে অস্বীকার করে না, আর না মীমাংসা-প্রতিপাদ্য বর্ণাশ্রম-ধর্মগুলির অনুষ্ঠানেও সে বিরোধী। সাংখ্য যে চেতন-অচেতন বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে, তার সাক্ষাৎকারের প্রক্রিয়াগুলির বর্ণনা যোগে আছে। এর বিরোধ কোনো দর্শনই করে না। বেদান্ত কেবল ব্রহ্মের অস্তিত্বকে সিদ্ধ করে; বেদান্তের অধ্যয়নমাত্র সেই চেতনতত্ত্ব ব্রহ্মের স্বরূপের সাক্ষাৎকার করাতে পারে না; তার জন্য যোগের প্রক্রিয়া এবং ঔপনিষদ উপাসনার আশ্রয় নিতে হবে। তাহলে বেদান্ত প্রভৃতির সঙ্গে এর বিরোধ কেমন করে হয়?

যোগপ্রতিপাদিত এই প্রক্রিয়াগুলির প্রধান সাধনভূত মন অথবা অন্তঃকরণের যে নানা অবস্থার বিশ্লেষণ যোগে বর্ণিত হয়েছে, সেটিই মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিকের একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি। সমাজের সমগ্র গতি-প্রগতির ডোর এটির হাতেই থাকে। তাহলে সমাজের কর্তব্য-অকর্তব্যের বিশ্লেষণাত্মক বিবরণ প্রদানকারী মীমাংসাশাস্ত্রের সঙ্গে এর বিরোধ কেমন করে? মীমাংসা সমাজের জন্য সেই অনুষ্ঠানগুলির বর্ণনা করে, যা বর্তমানের অভ্যুদয় ও মৃত্যুর পর কল্যাণের সাধন। এটি সেই মনোদশাগুলির প্রদীপ, যা অন্তর্নিহিত থেকে সমাজকে খেলিয়ে থাকে। সমগ্র বিশ্বের পরিচালনাকারী ও নিয়ন্তা চেতন-তত্ত্বের বর্ণনা বেদান্ত করে। জগতের কর্তা-ধর্তা-সংহর্তা রূপে প্রত্যেক শাস্ত্রই একে স্বীকার করেছে, কেউ এর প্রতিষেধ করে না। বেদান্তের তাত্পর্য কেবল ব্রহ্মের অস্তিত্ব সিদ্ধ করায়, অন্য তত্ত্বগুলির প্রতিষেধে নয়। বেদান্তের প্রখর ভাষ্যকার ভগবান আদিশঙ্করাচার্যও এই কথা স্পষ্ট করতে সক্ষম হননি যে, সেই পরমতত্ত্ব চেতন ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কোনো তত্ত্বের সর্বথা অস্তিত্ব নেই। বর্তমান ব্যাখ্যায় এই অবস্থাকে যথাস্থানে স্পষ্ট করা হয়েছে। দর্শনশাস্ত্রগুলির দ্বারা উপস্থাপিত এই জ্ঞান-সাধনের কর্মসূচি ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী বর্ণাশ্রম-ধর্ম ও কর্তব্যরূপে সম্পূর্ণরূপে সুবিন্যস্ত। এই মৌলিক লক্ষ্যের দৃষ্টিতে কোথাও কারও সঙ্গে কারও বিরোধের উদ্ভব কল্পনাতীতই মনে করা উচিত।

নাস্তিক দর্শন (চার্বাক)—ভারতীয় দর্শনগুলির মধ্যে আস্তিক দর্শন-বিভাগকে লক্ষ্য করে তাদের পারস্পরিক অবিরোধ প্রকাশ করার জন্য উপরোক্ত পংক্তিগুলি দেওয়া হয়েছে। যদি এই একই তুলাদণ্ডে তথাকথিত নাস্তিক দর্শনগুলিকে মাপা হয় এবং গম্ভীরভাবে তাদের পরীক্ষা করা হয়, তবে এই দর্শনগুলিতেও আস্তিক বলে কথিত দর্শনগুলির সঙ্গে কোনো তীব্র বা মৌলিক বিরোধভাব নেই—এ কথা যথেষ্ট পরিমাণে স্পষ্ট হয়ে যায়। আস্তিক দর্শনগুলির মতো চার্বাক অথবা জৈন-বৌদ্ধ দর্শনেও চেতন-অচেতন রূপে তত্ত্বগুলির বিবেচনা করা হয়েছে। চার্বাকদর্শনের এই মান্যতাকে যখন আমরা চিন্তাকোটিতে সামনে রাখি—যে এই সমগ্র চর-অচর ও জড়-চেতন জগতের মূল আধারতত্ত্ব কেবল জড়—তখন তার তাত্পর্য আমাদের কেবল এই অর্থেই বুঝতে হবে যে, এই লোকে আমাদের সুখ-সুবিধা ও সর্বপ্রকার অভ্যুদয়ের জন্য সর্বপ্রথম তথাকথিত জড়তত্ত্বের বাস্তবতা ও তার প্রাণী-কল্যাণকারী উপযোগিতা জানা পরম প্রয়োজন; তাকে উপেক্ষা করে সংসারে আমাদের সুখে থাকা সম্ভব হবে না।

এই মান্যতার বিরোধে চার্বাকদর্শনের সামনে যখন এই আশঙ্কা তোলা হয় যে—জড়তত্ত্ব ছাড়াও কি চেতনতত্ত্বের নিত্য অস্তিত্ব মানা উচিত নয়?—তখন এর সমাধানে চার্বাকদর্শনের কথাই হল, চেতনের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হচ্ছে না; কিন্তু সে নিত্য কি না, কেমন, কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়—ইত্যাদি চিন্তা-মন্থন ততদিন পর্যন্ত অনাবশ্যক, যতক্ষণ না সেই তত্ত্বগুলির যথার্থতা ও উপযোগিতা জানা যায়, যাদের উপর আমাদের বর্তমান অস্তিত্ব নির্ভর করে। মরার পরে কী হবে—তার চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হল আমরা বেঁচে থাকব কীভাবে। বর্তমান জীবনের ভিত্তিভূত জড়তত্ত্বের রহস্যময় বাস্তবতা ও উপযোগিতা জানার আগে যদি আমরা এমন ধরে নিই যে, চেতন—তত্ত্ব জড় থেকেই উদ্ভূত হলে তাতে কী ক্ষতি আছে? চার্বাকদর্শনের এই মত ‘অন্তিমেত্যম্’ নয়; মানবসমাজের চিন্তাপ্রবাহ ও কর্তব্যের এটি একটি স্তর, একে উপেক্ষা করা মঙ্গলের মূল নয়। প্রত্যক্ষ দেখা যায়, প্রায় মানুষ করে তাই, যা চার্বাকদর্শন বলে; কিন্তু বলে এমন কথা, যা সেই দর্শনের বিষয় নয়—ফলে স্বভাবতই সংঘর্ষের অবস্থা সৃষ্টি হয়। অতএব এই দর্শনের তাত্পর্য এতটুকুই, যে সর্বপ্রথম আমাদের সেই তত্ত্বগুলিকে বোঝার ও কাজে লাগানোর চেষ্টা করা উচিত, যেগুলি আমরা আমাদের চারদিকে বিছিয়ে থাকতে দেখি। এর অতিরিক্ত কিছুর প্রতিষেধে তার কোনো তাত্পর্য নেই। তখন কারও সঙ্গে কারও কোনো ধরনের বিরোধভাব আপনাআপনি শান্ত হয়ে যায়।

জৈন–বৌদ্ধদর্শন—চার্বাকদর্শনের তুলনায় এই দুই দর্শনে এই বিশেষত্ব আছে যে, এগুলি জড়তত্ত্ব ছাড়াও চেতনতত্ত্বের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের উপদেশ দেয়। সম্ভবত এই দর্শনগুলির মূল প্রবক্তারা চিন্তার দৃষ্টিতে কিছু উন্নত জিজ্ঞাসুজনকে তত্ত্বজ্ঞানের এই স্তরের যোগ্য মনে করে চেতন–অচেতন তত্ত্বগুলির বিবেচনা উপস্থাপন করেছিলেন। জৈনদর্শন চেতন (আত্ম) তত্ত্বকে যেখানে সংকোচ–বিকাসশীল বলে, অন্য দর্শন তাকে জ্ঞানস্বরূপ মেনে ক্ষণিক বলে এবং তার নির্বিকার ভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়। বৌদ্ধদর্শনে বিভিন্ন অধিকারী-স্তরের ভাবনায় জ্ঞানরূপ (অথবা বিজ্ঞানরূপ) চেতনতত্ত্বের বিবেচনা সেই অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতিপাদন করা হয় যে সমগ্র চরাচর জড়–চেতন জগৎ সেই ‘বিজ্ঞান’-এরই আভাস; বাহ্য জগতের নিজের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, বস্তুগত সত্তা একমাত্র বিজ্ঞান—যদিও তা ক্ষণিক। সম্ভব যে, আদিরূপে তারও বস্তুগত অস্তিত্ব না থাকে। এইভাবে আমরা সংসারের মূলতত্ত্বের বিবেচনা ও অনুসন্ধান করতে করতে এক রহস্যময় অবস্থায় পৌঁছে যাই। এগুলি সব তত্ত্বচিন্তার বিভিন্ন স্তর। সম্ভবত এদের মধ্যে এমন কোনো এক জায়গা নেই, যাকে ‘অন্তিমেত্যম্’ বলে নিশ্চিতভাবে সেখানে থিতু হওয়া যায়। এতে ওই-ওই চিন্তার মূল প্রবক্তাদের অজ্ঞ বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়; তারা প্রকৃতপক্ষে সর্বজ্ঞসদৃশই ছিলেন, তাঁদের সেই উপদেশে লোককল্যাণের ভাবনাই বেশি থাকতে পারে। ফলে চেতন–অচেতনের এই বিবেচনা যে এত নানা প্রকারে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে পারস্পরিক বিরোধভাব নয়—জিজ্ঞাসু অধিকারীর কল্যাণভাবই বেশি।

আস্তিক–নাস্তিক দর্শনের ভেদের কারণ ঈশ্বর অথবা ব্রহ্মতত্ত্বের মান্যতা–অমান্যতা বলা যেতে পারে। আস্তিক দর্শনগুলি তার অস্তিত্ব সর্বতোভাবে স্বীকার করে, আর অন্যগুলি করে না—এই ভিত্তিতেই তাদের নামভেদ হয়েছে। আরেকটি কারণ হল বেদের প্রামাণ্য মানা বা না মানা; কিন্তু সেটিও প্রথম কারণের উপর নির্ভরশীল। যারা বেদ মানে তারা তাকে ঈশ্বরীয় জ্ঞান বলে; যারা ঈশ্বর মানে না, তারা কেন ঈশ্বরীয় জ্ঞান বেদ বা তার প্রামাণ্য মানবে? এই প্রসঙ্গে আমাদের মত হল—তথাকথিত নাস্তিক দর্শনের মূল প্রবক্তারা ঈশ্বর অথবা এমন কোনো চেতন পরাশক্তি, যা সমগ্র সংসারকে নিয়ন্ত্রণ করে—তার অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁদের রচনাগুলি থেকে বোঝা যায়, তাঁরা কিছু বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এমন উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিগুলি জিজ্ঞাসুজনের যোগ্যতার উপর নির্ভরশীল হতে পারে, অথবা ঈশ্বর বা বেদ মান্যকারীদের দ্বারা নিজেদের মান্যতাগুলি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার ফলে সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে, কিংবা তৎকালীন সামাজিক প্রবৃত্তি প্রভৃতি অন্য কারণও থাকতে পারে। মনে হয়, সেই-সেই কালের লোকনেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ঈশ্বর বা সংশ্লিষ্ট মান্যতাগুলিকে অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক সংঘর্ষের কারণ ভেবে মানুষকে বুঝিয়েছিলেন—ভাই! এই অদৃশ্য অজ্ঞেয় তত্ত্বগুলোকে কিছু সময়ের জন্য এক পাশে রাখো, নিজের বর্তমান জীবনকে উন্নত করো, সবার কল্যাণের জন্য সদাচারে মন দাও, পরস্পরের সঙ্গে সহানুভূতিতে থাকতে শেখো; তাতে এই লোক সুখময় হবে, পরলোকও। এমন আচরণে ঈশ্বরের কাছেও পৌঁছানো যায়। তাঁরা সমাজের সদাচারের উপরই বেশি জোর দিয়েছিলেন। তখন এর প্রয়োজন ছিল, আসলে এর প্রয়োজন সবসময়ই থাকে। সেই প্রবক্তাদের তাত্পর্য ঈশ্বরাস্তিত্ব অস্বীকার করা—এভাবে বোঝা উচিত নয়। তাহলে এমন বিরোধভাব এই দর্শনগুলিতে কোথায় থাকে?

পরবর্তী কালে ওই-ওই চিন্তার অনুসারীরা আদিপ্রবক্তার তাত্পর্য যথার্থভাবে না বুঝে পারস্পরিক বিরোধভাবকে উসকে দিতে সহায়তা করেছে। ধীরে ধীরে এমন প্রবৃত্তিগুলি বাড়তে থাকে; কালক্রমে তারা বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা পন্থের রূপ নেয়, তখন পরস্পরবিরোধী আখড়াগুলি স্থায়িত্ব লাভ করে। প্রত্যেক চিন্তার ব্যাখ্যাকার বিদ্বানেরা সেই রূপেই নিজ নিজ বিষয়ের বিশাল সাহিত্য রচনা করেছেন। তাতে কারণ তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ হোক বা অন্য কারণ—তা বলা কঠিন; কিন্তু আজ আমরা সেই আদর্শের ভিত্তিতেই মূল তত্ত্ব-বিবেচনাকে যাচাই করার চেষ্টা করি। নিশ্চিত যে, মূল উদ্দেশ্য থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। আদিপ্রবক্তাদের জনকল্যাণমূলক লক্ষ্য চিন্তার এই কালো–হলুদ ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তত্ত্বের অনুসন্ধানে এই ভাবনাই আমাদের সত্যের শেষ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে—সৃষ্টির এই অনবরত প্রবাহে সেই সব চিন্তা নিজ নিজ স্থান ও স্তরে ঠিকই আছে, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত; তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে উন্মোচনে আজ পর্যন্ত যে সফল প্রচেষ্টা হয়েছে, তাতে চেতন ও অচেতনের প্রকৃত সত্যস্বরূপ বোঝায় পূর্ণ সহযোগ পাওয়া গেছে।

চিন্তার এই অবতরণের ছায়ায় স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সৃষ্টি-বিষয়ক তত্ত্বজ্ঞানের সেই দীর্ঘ পথে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অংশ বা অঙ্গের বিস্তৃত বিবেচনা তাদের উপযোগী ভূমিকাসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে উপস্থাপিত হয়েছে।

যা সব মিলিয়ে সেই সম্পূর্ণ পথের সত্যস্বরূপকে প্রকাশ করে। সেই অনুসারেই উপস্থাপিত বেদান্তদর্শন-এ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের কর্তা–ধর্তা–সংহর্তা সর্বশক্তিমান ব্রহ্ম-চেতনতত্ত্বের অস্তিত্ব শাস্ত্রসমন্বয় ও ঊহাপোহপূর্বক প্রতিপাদিত হয়েছে। এই কারণেই এই শাস্ত্রের নাম ‘ব্রহ্মসূত্র’। পরমকারুণিক ভগবান বেদব্যাস সেই পরমতত্ত্বে নিশ্চয় করানোর অভিপ্রায়ে শাস্ত্রের সূচনা করে শিষ্যদের সম্মুখে প্রথম সূত্র বলেন—

অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ॥১॥

[অথ] অনন্তর, এখন; [অতঃ] এখান থেকে, এই কারণে; [ব্রহ্মজিজ্ঞাসা] ব্রহ্মকে জানবার ইচ্ছা (ব্রহ্মবিষয়ক চিন্তার সূচনা)।

সূত্রপঠিত ‘অথ’ পদের প্রয়োগ অনন্তর্য ও অধিকার—উভয় অর্থেই দেখা যায়। উচ্চারণমাত্রেই এই পদকে মঙ্গলসূচক ধরা হয়। শাস্ত্রের শুরুতে এমন পদের প্রয়োগ আচার্য ও অধ্যেতাদের কল্যাণের সূচক। ‘অথ’ পদের ‘অধিকার’ অর্থ অনুযায়ী সূত্রপদগুলির পরিকল্পনা—এখান থেকে ব্রহ্মবিষয়ক জিজ্ঞাসা–মীমাংসার সূচনা করা হচ্ছে। ব্রহ্মজিজ্ঞাসায় সেই বিষয়ের ‘মীমাংসা’ থাকা অপরিহার্য। ঊহাপোহপূর্বক বস্তু বিচার করাকেই ‘মীমাংসা’ বলা হয়। এইভাবে ব্রহ্মকে জানবার ইচ্ছার সমাধান ঊহাপোহপূর্বক চিন্তা করে এই শাস্ত্রের দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে। সেই শাস্ত্র ও তার প্রতিপাদ্য বিষয় এখান থেকেই শুরু।

‘অথ’ পদের ‘অনন্তর্য’ অর্থ নিলে সূত্রার্থ হবে—জিজ্ঞাসু পূর্বে প্রয়োজনীয় কিছু তত্ত্ব জেনে-বুঝে নিয়েছে এবং এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্রহ্মজিজ্ঞাসার উদ্ভব সম্ভব; সেই সবের পর এখন ব্রহ্মজিজ্ঞাসার উপযুক্ত সময়। কোন কোন বস্তু ও অবস্থা জেনে ও লাভ করে ব্রহ্মজিজ্ঞাসা হতে পারে—এটি বিবেচ্য। সংসারে প্রাপ্ত দুই প্রকার তত্ত্ব—চেতন ও অচেতন—এর সাধারণ জ্ঞান অন্য শাস্ত্র থেকেই হয়ে যায়। চেতন ছাড়াও অচেতনরূপ প্রকৃতি ও যতদূর সম্ভব প্রাকৃতিক তত্ত্বগুলি প্রমাণ ও পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে জেনে নিলে জিজ্ঞাসুর সামনে একটি সমস্যা দাঁড়ায়—এই সমস্ত প্রাকৃত জগৎ এই রূপে কীভাবে আসে? কেবল প্রকৃতি ও জীবাত্মতত্ত্বের দৃশ্যমান অবস্থার দ্বারা এর সমাধান সে পায় না। সংসারে সব নির্মাণই জ্ঞানপূর্বক দেখা যায়। তাই জগৎ-নির্মাণেও তেমনই কল্পনা করা যায়। প্রকৃতি জড়—অতএব সে নিজে নিজে এই রূপে আসে—এ কথা মানা অসম্ভব। জীবাত্মতত্ত্ব অল্পজ্ঞ, অল্পশক্তিসম্পন্ন ও বহু হওয়ায় এই অনন্ত জগতের নির্মাণে অক্ষম। অতএব এমন এক সর্বশক্তিসম্পন্ন চেতনের কল্পনা হয়, যিনি এই জগতকে এই রূপে আনেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন। যদিও সাধারণভাবে এই বিষয় অন্য শাস্ত্র থেকে জানা যায়, বিশেষভাবে এই তত্ত্বের প্রতিপাদন সেখানে নেই—কারণ প্রত্যেক শাস্ত্রের নিজস্ব নির্দিষ্ট প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। ব্রহ্মতত্ত্বের যথার্থতা না জানলে প্রাকৃত তত্ত্বজ্ঞের মনে এই সংশয় জাগতে পারে—এমন তত্ত্বের অস্তিত্ব মানা উচিত কি না? যদি মানা হয়, তবে কেন?

তত্ত্বজ্ঞ প্রাকৃত তত্ত্বগুলির পরিবর্তনশীলতা ও নশ্বরতা দেখে, গভীরভাবে চিন্তা করে; প্রত্যেক বস্তুর অবস্থা, বর্ণাশ্রমধর্মের আচরণ ও তার ফলের ভঙ্গুরতা, আর তাদের মধ্যবর্তী সংঘর্ষ ও উথাল-পাথাল দেখে বুঝে সে এ দিক থেকে উপেক্ষা করতে শেখে, এই প্রবৃত্তিগুলির প্রতি উদাসীন হয়। সে এক শাশ্বত তত্ত্বের সন্ধানে ঝুঁকে পড়ে। এই অবস্থাতেই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা জন্মায়। শাস্ত্র অধ্যয়ন ও পুণ্যকর্মের আচরণ ইত্যাদির দ্বারা জিজ্ঞাসুর অন্তঃকরণ শুদ্ধ হয়। সংসারের প্রতি বৈরাগ্যভাব জাগে; ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, ব্রহ্মচর্য প্রভৃতি ব্রত পালন, অধ্যাত্মবিষয়ক আলোচনা শ্রবণ ইত্যাদি ব্রহ্মজিজ্ঞাসার প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে অত্যন্ত সহায়ক। এই সব অবস্থার পরই ব্রহ্মজিজ্ঞাসার উদয় হয়। এই ধরনের জিজ্ঞাসু অধিকারী লোকসমাজে পাওয়া যায়; অতএব তাঁদের কল্যাণের জন্য ব্রহ্মবিষয়ক বিবেচনা উপস্থাপনকারী শাস্ত্রের সূচনা অত্যাবশ্যক।

অভিজ্ঞ শাস্ত্রকারেরা বলেছেন—ব্রহ্মের সাক্ষাৎ জ্ঞানই মোক্ষরূপ অতিশয় আনন্দানুভূতির একমাত্র ভিত্তি। বেদ বলে—

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাত্ । 

তমেব বিদিত্বাঽতিমৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেऽয়নায় ।। [যজুঃ ৩১।১৮]

অতিতেজোময় মহান আত্মাকে জানবার চেষ্টা করা উচিত, যিনি অন্ধকারময় জড় প্রকৃতির ঊর্ধ্বে। তাঁকেই জেনে মানুষ দুঃখ অতিক্রম করে; সেই অবস্থায় পৌঁছানোর অন্য কোনো পথ নেই। ‘বিদ্যয়াঽমৃতমশ্নুতে’ [যজুঃ ৪০।১৪]—বিদ্যা, জ্ঞান ও সাধনার দ্বারা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে পুরুষ অমৃতের আস্বাদ পায়। একে জেনে সেই অতিশয় নিরবচ্ছিন্ন আনন্দানুভূতির দিকে সংসারের সংঘর্ষে ক্লান্ত মানুষ সর্বদা প্রেরিত হয়। তার জন্য ব্রহ্মবিষয়ক মীমাংসা উপস্থাপন করা প্রয়োজন ॥১॥

বাস্তবে ব্রহ্মতত্ত্ব বাহ্যদৃষ্টির বিষয় নয়; তবু আমরা তাঁকে জানতে চাই—তাই সহজভাবে তাঁর অস্তিত্ব কীভাবে বোঝা উচিত? সূত্রকার বলেন—

জন্মাধ্যস্য যতোঃ ॥২॥

[জন্মাদি] জন্ম–উৎপত্তি প্রভৃতি, [অস্য] এর, [যতঃ] যাঁর থেকে।
এই সমগ্র সংসারের উৎপত্তি এবং ‘আদি’ পদ দ্বারা গৃহীত স্থিতি ও প্রলয়—যাঁর দ্বারা সংঘটিত হয়—তিনিই ব্রহ্ম।

অদৃশ্য ব্রহ্মের অস্তিত্ব বোঝাবার জন্য এই সূত্র নির্দেশ করা হয়েছে। কোনো বস্তুর অস্তিত্ব লক্ষণ ও প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধ করা হয়। লক্ষণ দুই প্রকার—এক তটস্থলক্ষণ, অন্য স্বরূপলক্ষণ। তটস্থলক্ষণ হল—যেখানে কোনো বস্তুর গুণ বা ক্রিয়াশক্তির মাধ্যমে সেই বস্তুর বোধ করানো হয়; যেমন গোরু চিহ্নিত করা হলে বলা হয়—যে বিশেষ লক্ষণযুক্ত দুধদায়ী পশু, সে গোরু। এটি গোরুর তটস্থলক্ষণ। স্বরূপলক্ষণ হল—যেখানে পদার্থের যথাযথ স্বরূপই বর্ণনা করে দেওয়া হয়; যেমন—যে পশুর সাস্না আছে, সে গোরু—এটি গোরুর স্বরূপলক্ষণ।

এই সূত্রে ব্রহ্মের তটস্থলক্ষণ বলা হয়েছে। এই সংসার উৎপন্ন হওয়া পদার্থ। প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থের কোনো না কোনো উৎপাদক কর্তা অবশ্যই থাকে, এবং সে কর্তা চেতন তত্ত্বই হতে পারে। যেমন ঘট প্রভৃতির কর্তা চেতন কুম্ভকার, আর কটক-কুণ্ডল প্রভৃতির কর্তা স্বর্ণকার। কুম্ভকার ও স্বর্ণকার ছাড়া ঘট-কটক প্রভৃতির নির্মাণ অসম্ভব। ঠিক সেইরূপ এই উৎপন্ন বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডেরও কোনো চেতন কর্তা অবশ্যই থাকতে হবে। অচেতন উপাদান নিজে নিজে জগতের রূপে পরিণত হতে পারে না। পৃথিবী, দ্যুলোক প্রভৃতির রচনা তার কোনো চেতন স্রষ্টাকে প্রমাণ করে। যিনি একে উৎপন্ন করেন, তিনিই এর স্থিতি ও পরিচালনার অধিষ্ঠাতা। উৎপন্ন বস্তু সময় পেলে অবশ্যই বিনষ্ট হয়, অতএব এই বিশ্বের প্রলয়কারী—অর্থাৎ একে পুনরায় কারণরূপে ফিরিয়ে নেওয়াও—সেই একই ব্রহ্মতত্ত্ব।

এইভাবে সমগ্র জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয়ের নিয়ামক যে চেতনতত্ত্ব—তিনিই ব্রহ্ম। এখানে ব্রহ্মের সর্বশক্তিমত্তা প্রভৃতি গুণ এবং জগত্‌রচনার ক্রিয়াশক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর অস্তিত্ব সিদ্ধ করা হয়েছে; অতএব এটি ব্রহ্মের তটস্থলক্ষণ।

ব্রহ্মের এই তটস্থলক্ষণ অন্য শাস্ত্রে ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের অস্তিত্ব সিদ্ধ করার জন্য অনুমান-প্রমাণরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও ব্রহ্মতত্ত্ব এবং অন্যান্য নিত্য পদার্থের অস্তিত্ব স্বতঃসিদ্ধ, তবু সেই অবস্থাকে বোঝাতে ও বোঝাবার জন্য প্রমাণাদির আশ্রয় প্রয়োজন হয়। যদি অন্য শাস্ত্রে অনুমানাদি দ্বারা ব্রহ্মের অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই সিদ্ধ করা হয়ে থাকে, তবে এই শাস্ত্রে তাঁর প্রতিপাদনের বিশেষতা কী, যার জন্য এই পৃথক শাস্ত্রপ্রবচন করা হল? বিশেষতা এই—অন্য শাস্ত্রে সাধারণভাবে প্রসঙ্গক্রমে তাঁর উল্লেখ আছে, কিন্তু এখানে সর্বতোভাবে প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় এই ব্রহ্মই; এই কারণেই কেবল তটস্থলক্ষণ নয়, বরং ব্রহ্মের স্বরূপলক্ষণও— Conti>

Read More

31 January, 2026

অথর্ববেদ অষ্টাদশ কাণ্ড

31 January 0

অথর্ববেদ অষ্টাদশ কাণ্ড

ঋষি – য়ম মন্ত্রোক্ত – য়ম দেবতা – ত্রিষ্টুপ ছন্দ – অথর্বা সূক্ত – পিতৃমেধ সূক্ত

ও চিৎ সখায়ং সখ্যা ববৃত্যাং তিরঃ পুরু চিদর্ণবং জগদ্বান্। 

পিতুর্নপাতমা দধীত বেধা অধি ক্ষমি প্রতরং দীধ্যানঃ ॥

অথর্ব০ ১৮।১।১

ও ইতি॑ । চি॒ত্ । সখা॑য়ম্ । স॒খ্যা । ব॒বৃ॒ত্যা॒ম্ । তি॒রঃ । পু॒রু । চি॒ত্ । অ॒র্ণ॒বম্ । জ॒গ॒ন্বান্ । পি॒তুঃ । নপা॑তম্ । আ । দ॒ধী॒ত॒ । বেধাঃ । অধি॑ । ক্ষমি॑ । প্র॒ত॒রম্ । দীধ্যা॑নঃ ॥ (স্বরসহঃ পদপাঠ)

বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কারকৃত পদার্থ ভাষ্যঃ (সখ্যা) সখীভাবপূর্বক/সখী ভাবনায় (সখায়ম্) তোমার/সখার দিকে (আ ববৃত্যাম্) আমি আগমন করি, তোমাকে প্রাপ্ত হই - ইহা আমার অভিলাষা। তুমি ব্রহ্মচর্যরূপী  (পুরূ অর্ণবম্ চিৎ) মহান্ তথা সদ্গুণ-সমূহ দ্বারা পরিপূর্ণ সমুদ্রকে  (তিরঃ)  অতিক্রম  (জগন্বান্)  করেছো, পার করেছো। (বেধাঃ) এইজন্য বিধিবিধান তুমি জানো। বিধিবিধানের জ্ঞাতার উচিৎ, (ক্ষমি অধি) পৃথিবীতে নিজের ভবিষ্যতের (প্রতরং দীধ্যানঃ) পূর্ণরূপে ধ্যান/মনন/স্মরণ/চিন্তন করা,   (পিতুঃ)  নিজ পিতার (নপাতম্) পৌত্র উৎপন্ন করার লক্ষ্য করে, (আ দধীত) বিবাহ-পূর্বক গর্ভাধান করা।

টিপ্পণীঃ

[১৮ তম কাণ্ডে পিতরদের বর্ণনা আছে। পিতরদের সত্তা/বিদ্যমানতা গৃহস্থ ধর্মের ওপর আশ্রিত। এইজন্য ১৮তম কাণ্ডের প্রারম্ভে বিবাহের চর্চা হয়েছে। বিবাহের চর্চা যমযমী-এর সংবাদরূপে করা হয়েছে। মন্ত্রগুলোতে যম-যমীকে যমজ ভাই-বোন রূপে উপস্থিত করা হয়েছে। যম তো ব্রহ্মচর্যাশ্রমে যম-নিয়মের পালন করে স্নাতক হয়ে এসেছে। এইজন্য সে বিবাহ আদির বিধিবিধান জানে। যমী হল যুবতি, কিন্তু বিবাহের বিধিবিধান থেকে অনভিজ্ঞ। সে যম-এর সাথে বিবাহ করতে চায়। এইজন্য যম-এর প্রতি বিশ্বাস প্রস্তাব দিচ্ছে। বিবাহের সপ্তপদীর বিধিতে "সখে সপ্তপদী ভব" দ্বারা বিবাহ-বন্ধন দৃঢ় হয়ে যায়। ইহাকেই মূল লক্ষ্য/উদ্দেশ্য করে যমী যমের প্রতি বলে,- আমি সখীভাবপূর্বক তোমাকে নিজের বিবাহিত সখা করতে চাই। অনেক প্রকারের উক্তি এবং প্রত্যুক্তির প্রসঙ্গে যম, ভাই-বোনের পারস্পরিক বিবাহকে তর্কসঙ্গত, অবৈজ্ঞানিক তথা শিষ্টাসম্মত দর্শিয়ে বিবাহ-সম্বন্ধের প্রত্যাখ্যান করে। যম-যমী ঐতিহাসিক ব্যক্তি নয়। অপিতু সংবাদের কল্পিত পাত্র। যেমন উপন্যাস, কথা-কাহিনী, এবং নাটকে পাত্র কল্পিত করে নেওয়া হয়। বেদে এমন সংবাদ প্ররোচনার্থ যত্র-তত্র পাওয়া যায়। যথা-উর্বশী ও পুরুরবা এর সংবাদ (ঋ০ ১০।৯৫); বিশ্বামিত্র ও নদীর সংবাদ (ঋ০ ৩।৩৩); সরমা ও পণিদের সংবাদ (ঋ০ ১০।১০৮)। এমন সংবাদকে নিরুক্তকার "আখ্যান" তথা "আখ্যায়িকা" বলেছে। ও=আ+উ। “আ” এর সম্বন্ধ/সম্পর্ক "ববৃত্যাম্" এর সাথে রয়েছে। তিরঃ এর অর্থ হল - সন্তরণ করে, সফলতাপূর্বক ব্রহ্মচর্যাশ্রম সমাপ্ত করে "তৄ সন্তরণে"। মহর্ষি দয়ানন্দ "ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা" এর ব্রহ্মচর্য-প্রকরণে "স সদ্য এতি পূর্বস্মাদুত্তরং সমুদ্রম্" (অথর্ব০ ১১।৫।৬) এর অর্থ করেছেন- "স ব্রহ্মচারী (পূর্বস্মাৎ) ব্রহ্মচর্যানুষ্ঠানভূতাৎ সমুদ্রাৎ (উত্তরম্) গৃহাশ্রমসমুদ্রং শীঘ্রং প্রাপ্নোতি"। এইজন্য আমি মন্ত্র ১ এ "অর্ণবম্" পদের অর্থ "ব্রহ্মচর্যাশ্রম" করেছি, এবং এই অর্থ এখানে উপযুক্ত। পুরূ=মহান্, তথা "পৃ" (পূরণে)। নপাত=নপাৎ এর অর্থ হল "নাতি"। যমী "নপাৎ" এবং "পিতুঃ" শব্দের প্রয়োগ করে যমকে "পিতৃ-ঋণ" থেকে মুক্ত হওয়ার দিকে প্রেরিত করে। ইহা তখনই সম্ভব যখন যম বিবাহ করে পুত্রের নিমিত্ত গর্ভাধান করে। যমী সাথে এটাও বলে, পুত্র বিনা বৃদ্ধাবস্থা তথা রোগগ্রস্ত অবস্থায় জীবন অন্ধকারময় হয়ে যায়। অতঃ ভবিষ্যতের স্মরণ করিয়ে, সে যমকে বিবাহের জন্য প্রেরিত করে।]

টীকাঃ অথর্ববেদ ভাষ্য (শুভঙ্কর মণ্ডল / ক্ষেমকরন ত্রিবেদী)

১—(ও) সম্বোধনে (চিত্) ঐব (সখায়ম্) সুহৃদম্ (সখ্যা) সুপাংশুলুক্। पा. ৭।১।৩৯। বিভক্তের আকারঃ। সখ্যেন। বন্ধুত্ব দ্বারা (ববৃত্যাম্) বৃতু-বর্তনে লিঙ্, শপঃ শ্লুঃ। প্রবর্তয়েয়ম্ (তিরঃ) পারে (পুরু) বহুপ্রকারে (চিত্) ঐব (অর্ণবম্) অর্ণবং বিজ্ঞানম্—দয়ানন্দ ভাষ্যে, যজু. ১২।৪৯। ধাপৃবস্য জ্যতিভ্যো নঃ। উ. ৩।৬। ঋ গতিপ্রাপণযোঃ—ন প্রত্যয়ঃ, ততো মত্বর্থীয়ো বহ্। বিজ্ঞানযুক্ত শাস্ত্র (জগন্বান্) গমের্ লিটঃ ক্বাসুঃ। গতবান্ (পিতুঃ) স্বজনকস্য (নপাতম্) নপ্তারম্—পৌত্রম্ (আদধীত) আদধ্যাত্। সমন্তাদ্ ধারয়তু (বেধাঃ) মেধাবিনাম্—নিঘ. ৩।১৫। মেধাবীভবান্ (ক্ষমি অধি) ভূমের্ উপরি (প্রতরম্) প্রকৃষ্টতম্ (দীধ্যানঃ) দীধীং—দীপ্তি-দেবনযোঃ—শানচ্। দীপ্যমানঃ ॥

(ক্ষেমকরণ ত্রিবেদী) ভাবার্থঃ এই মন্ত্রটি স্ত্রীকাব্যচন। আমরা দু’জন বড় প্রেমিক, তুমি বেদাদি শাস্ত্রের জ্ঞানী বুদ্ধিমান পুরুষ—এমন প্রয়त्न করা উচিত যে, আমাদের উভয়ের সম্পর্ক থেকে উত্তম সন্তান উৎপন্ন হয় ॥১॥ এই সূক্তের মন্ত্র ১–১৬-তে যমী–যম অর্থাৎ যমজ বোন এবং ভাইয়ের সংলাপ বা প্রশ্ন–উত্তরের রীতিতে এটি বলা হয়েছে যে, তারা উভয়ই বোন–ভাই হয়ে পরস্পরের সঙ্গে কখনো বিবাহ করবে না; কিন্তু বোন ভাই ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে এবং ভাই বোন ছাড়া অন্য স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ করবে ॥ মন্ত্র ১–৫।


হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ

পদার্থ

১. যমী যমকে বলে যে— (ওচিত্) = নিশ্চয়ই (সখায়ম্) = মিত্ররূপ তোমাকে (সখ্যা) = মিত্রভাবের দ্বারা (আববর্ত্যাম্) = আবৃত করছি। ‘সখে সপ্তপদী ভব’—এই সপ্তম পদসংক্রান্ত বাক্য অনুসারে স্বামী-স্ত্রী এই সংসার-সমুদ্রে পরস্পরের সখা হয়ই; সেই জন্য আমি তোমাকে স্বামীরূপে কামনা করি যে— (পুরূচিত্) = এই অত্যন্ত বিস্তৃত (অর্ণবম্) = সংসার-সমুদ্রে (জগন্নান্) = গমনকারী মানুষ (তিরঃ) = অন্তর্হিত হয়ে যায়। মানুষ মৃত্যুগ্রস্ত হয়ে সংসার-সমুদ্রে লীন হয়ে যায়।
২. এই কথাটি মনে রেখেই (প্রতরং দীধ্যানঃ) = এই বিস্তৃত সমুদ্রের কথা চিন্তা করতে করতে (বেধাঃ) = বুদ্ধিমান পুরুষ (অধিক্ষমিঃ) = এই পৃথিবীতে (পিতুঃ নপাতমা) = পিতার বিনাশ না হতে দেওয়া সন্তানকে (আদধীত) = প্রতিষ্ঠা করে। এইভাবে এই নশ্বর দেহ নষ্ট হয়ে গেলেও সে সন্তানরূপে বিদ্যমান থাকে। যমীর যুক্তিক্রম এই যে— [ক] এই বিশাল সংসার-সমুদ্রে মানুষ অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তর্হিত হয়ে যায়, [খ] সন্তানরূপেই তার চিহ্ন রয়ে যায়, [গ] অতএব সন্তানপ্রাপ্তির জন্য তুমি আমাকে স্ত্রীরূপে কামনা করো।

ভাবার্থ

এই বিশাল সংসার-সমুদ্রে মানুষ সন্তানরূপেই বিদ্যমান থাকে; অতএব সন্তানপ্রাপ্তির জন্য ‘যম’ ‘যমী’-কে কামনা করুক। ‘যম–যমী’ শব্দপ্রয়োগ থেকে স্পষ্ট যে স্বামী-স্ত্রী সংযত জীবনযাপনকারী হোক।

জয়দেব শর্মাকৃত পদার্থভাষ্যঃ

সন্তানের উদ্দেশ্য। আমি স্ত্রী (সখ্যা) = সখীভাব দ্বারা প্রেরিত হয়ে (সখায়ং চিত্) = নিজের আদরণীয় সখার ন্যায় স্বামীকে (আ ববৃত্যাম্ উ) = নিজেই বরণ করে নিয়েছি। আর (পুরূ) = অতিশয় মহান (অর্ণবম্ চিত্) = সাগরের ন্যায় বিস্তৃত, কাম্য জীবনকে (তিরঃ) = পার হয়ে (জগন্নান্) = অতিক্রমকারী (বেধাঃ) = বুদ্ধিমান পুরুষ (অধি ক্ষমি) = এই জগতে, পৃথিবীর উপর বা নিজের ভূমিরূপ স্ত্রীতে (প্রতরম্) = পুত্রকেই ভবসাগর পার হওয়ার উপায় বলে (দীধ্যানঃ) = বিবেচনা করতে করতে (পিতুঃ) = কন্যার পিতার (নপাতম্) = নাতি অথবা নিজের পিতার (নপাতম্) = বংশকে পতন থেকে রক্ষা করা বংশধর সন্তানকে (অধি ক্ষমি) = গর্ভধারণে সক্ষম স্ত্রীতে (আ দধীত) = স্থাপন করে।

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−

ঋষি: যম দেবতা: ত্রিষ্টুপ ছন্দ: অথর্বা সূক্ত: পিতৃমেধ সূক্ত

নতে সখা সখ্যং বষ্ট্যেতৎ সলক্ষ্মা যদ বিষরূপা ভবাতি। 

মহস্পুত্রাসো অসুরস্য বীরা দিবো ধর্তার উর্বিয়া পরি খ্যন্ অথর্ব০ ১৮।১।২

ন । তে॒ । সখা॑ । স॒খ্যম্ । ব॒ষ্টি॒ । এ॒তত্ । সऽল॑ক্ষ্মা । য॒ত্ । বিষু॑ऽরূপা । ভবা॑তি । মহঃ । পু॒ত্রাস॑ঃ । অসু॑রস্য । বী॒রাঃ । দি॒বঃ । ধ॒র্তার॑ঃ । উ॒র্বি॒য়া । পরি॑ । খ্য॒ন্ ॥ (স্বরসহিত পদপাঠ) 

(ক্ষেমকরণ জী) পদার্থ ঃ (সখা) [এই] প্রেমী (তে) তোমার (এতৎ) এই (সখ্যম্) প্রীতি (ন) না (বষ্টি) চায়/কামনা করে−(যৎ) যে (সলক্ষ্মা) সমান [ধার্মিক] লক্ষণযুক্ত [তুমি] (বিষুরূপা) নানা স্বভাবগত [চঞ্চলঅধার্মিক] (ভবাতি) হয়ে যাও। (মহঃ) মহান্ (অসুরস্য) বুদ্ধিমান্ পুরুষের (দিবঃ) ব্যবহার/আচরণ (ধর্তারঃ) ধারণকারী, (বীরাঃ) বীর (পুত্রাসঃ) পুত্র (উর্বিয়া) ভূমিতে (পরি খ্যন্) বিখ্যাত হয়েছে ॥২॥

ভাবার্থঃ এই মন্ত্র পুরুষের উত্তর। হে স্ত্রী ! তুমি যে আমার থেকে পুত্রের কামনা করো, তা উচিত নয়, আমরা দুজন ধর্মাত্মা হয়ে অধর্ম না করি−কেননা কুল/বংশে উৎপন্ন ব্যবহার কুশল ধর্মাত্মা বীরই সংসারে কীর্তিমান্ হয় ॥২॥

বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার জীর টীকা ও পদার্থঃ

(তে) তোমার (সখা) সমান-খ্যাতিসম্পন্ন, তোমার (এতৎ) এই (সখ্যম্) সখ্যকে, (ন) না (বষ্টি) চায়/আকাঙ্ক্ষা করে; (যদ্) কেননা/কারণ (সলক্ষ্মা) তুমি সমান-লক্ষণযুক্ত। (বিষুরূপা) বিবাহের জন্য বধূ বিভিন্ন বিষম লক্ষণযুক্ত (ভবতি) হওয়া উচিৎ। (মহঃ অসুরস্য) মহাপ্রজ্ঞ ও মহাবলী পরমেশ্বর (বীরাঃ পুত্রাঃ) বীর পুত্র, (দিবঃ ধর্তারঃ) যিনি দ্যুলোকেরও ধারণকারী/ধর্তা, তিনি (উর্বিয়া) পৃথিবীরও (পরি খ্যন্) পূর্ণরূপে নিরীক্ষণ করছেন।

টিপ্পণীঃ [যম যমীর প্রতি বলে– রজবীর্যের দৃষ্টিতে আমরা দুজন সমান খ্যাতিসম্পন্ন, কারণ আমরা দুজন একই মাতা-পিতার যমজ সন্তান। এইজন্য রজ-বীর্যের গুণের দৃষ্টিতে সমান। তুমি বিবাহের প্রস্তাব করে, সমান লক্ষণযুক্ত হয়েও, বিভিন্ন লক্ষণযুক্ত নিজেকে উপস্থাপন করছো। সমান রজ-বীর্যসম্পন্নদের পরস্পর বিবাহ "Eugenic-science" অর্থাৎ উৎপত্তি/প্রজননশাস্ত্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। ঔষধি-সমূহ, বৃক্ষ-সমূহ, বনস্পতির মধ্যেও সজাতীয়, কিন্তু বিলক্ষণ গুণবিশিষ্ট শাখার কলম লাগানো হয়, তবেই এগুলোতে ফুল তথা ফল উৎকৃষ্ট গুণবিশিষ্ট হয়। বৈদিক ধর্মের দৃষ্টিতেও, বিবাহে মাতার সাত পুরুষ, তথা পিতার গোত্র পরিত্যাজ্য বলা হয়েছে। দেখো! আমরা কোথাও লুকিয়েও পরস্পর বিবাহ করতে পারবো না। কারণ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান্ পরমেশ্বরের পুত্র অর্থাৎ নিয়ম, যা দ্যুলোকের অসংখ্য তারাগণের ধারণ করছে, পৃথিবীরও পূর্ণরূপে নিরীক্ষণ করছে। সেই নিয়ম-বীর, আমরা তা পরাস্ত করতে পারবোনা। তা সুদৃঢ় এবং কঠোর। উর্বিয়া = উর্বী + ডিয়াচ্। অসুর = অসু + র (বালা)। অসু=প্রজ্ঞা (নিঘং০ ৩।৯); অসু = প্রাণ (নিরু০ ৩।২।৮)। পুত্রাসঃ বীরাঃ=এই সুদৃঢ় নিয়মসমূহকে "পুত্র" বলা হয়েছে, যা সবকিছুর "পুনীত" করে, এবং সকলের "ত্রাণ" করে। নিয়মের শিথিলতা ভঙ্গ করে দেয়। অথর্ববেদে এই নিয়ম-সমূহকে "দিব্যস্পশঃ" অর্থাৎ দিব্যগুপ্তচরও বলা হয়েছে, যা এই জগতে বিচরণ করছে। যা মানোং সহস্র চক্ষুবিশিষ্ট যা ভূমি তথা ভূমি থেকে দূরেও নিরীক্ষণ করছে। যথা-"দিব স্পশঃ প্র চরন্তীদমস্য সহস্রাক্ষা অতি পশ্যন্তি ভূমিম্" (৪।১৬।৪)।]

হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ

পদার্থ

১. যমীকে যম বলে যে—সন্তানপ্রাপ্তির জন্য পুরুষ ও নারীর মিত্রভাব যথার্থই, কিন্তু (তে সখা) = সহোদ্ভূত হওয়ার কারণে তোমার মিত্র আমি (এতৎ সখ্যং) = এই স্বামী-স্ত্রীরূপ মিত্রতাকে (ন বষ্টি) = চাই না; (যৎ) = কারণ (সলক্ষ্মা) = সমলক্ষণযুক্ত কন্যা সন্তান উৎপত্তির জন্য (বিষুরূপা) = অত্যন্তই বিষমরূপা হয়ে থাকে। সন্তান উৎপত্তির ক্ষেত্রে সমলক্ষণত্ব ক্ষতিকর। এই ধরনের সম্পর্কে বিকৃত ও স্বল্পায়ু সন্তান জন্ম নেয়।
২. (মহস্পত্ৰাসঃ) = তেজস্বিতার দ্বারা নিজেকে পবিত্র ও রক্ষিতকারী (পুনাতি ত্রায়তে), (অসরস্য বীরাঃ) = সেই প্রাণশক্তি প্রদানকারী প্রভুর বীর সন্তানরা (অসুন্ রাতি), (দিবঃ ধর্তারঃ) = আলোক ও জ্ঞানের ধারক ব্যক্তিরা এই নিকট সম্পর্ককে (উর্বিয়াপরিখ্যন্) = অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষেধ করেন। নিকট সম্পর্কে—[ক] সন্তান তেজস্বী হয় না, কারণ এই সম্পর্ক ভোগবৃত্তিকেই প্রাধান্য দেয়; [খ] আমরা সেই প্রভুর সন্তান না থেকে প্রকৃতির সন্তান হয়ে যাই এবং সন্তানরা ক্ষীণ প্রাণশক্তিসম্পন্ন হয়; [গ] এই সম্পর্ক হলে জ্ঞানও ক্ষীণ হয়ে যায়।

ভাবার্থ

নিকট সম্পর্ক বিকৃত সন্তান জন্ম দেয়। এর ফলে সন্তান নি:তেজ, বিলাসপ্রবণ ও ক্ষীণ জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে থাকে।

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−

ঋষি – যম মন্ত্রোক্ত – যম দেবতা – ত্রিষ্টুপ ছন্দ – অথর্বা সূক্ত – পিতৃমেধ সূক্ত

উশান্ত ঘা তে অমৃতাস এতদেকস্য চিৎ ত্যজসং মর্ত্যস্য। 

নি তে মনো মনসি ধায্যস্মে জন্যুঃ পতিস্তবমা বিবিশ্যাঃ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩ 

উ॒শন্তি॑ । ঘ॒ । তে । অ॒মৃতা॑সঃ । এ॒তত্ । এক॑স্য । চি॒ত্ । ত্য॒জস॑ম্ । মর্ত্য॑স্য । নি । তে॒ । মন॑ঃ । মন॑সি । ধা॒য়ি॒ । অ॒স্মে ইতি॑ । জন্যু॑ঃ । পতি॑ঃ । ত॒ন্ব᳡ম্ । আ । বি॒বি॒শ্যা॒ঃ ॥ (স্বরসহিত পদপাঠ)

অথর্ববেদ ভাষ্য ( বাংলা অনুবাদক-- শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী)

পদার্থঃ (তে) সেই (অমৃতাসঃ) অমর [যশস্বী] লোকেরা (ঘ) অবশ্যই (এতৎ) এইভাবে (একস্য) এক [অদ্বিতীয়, অতি শ্রেষ্ঠ] (মর্ত্যস্য) মনুষ্যের (চিৎ) ই (ত্যজসম্) সন্তানের (উশন্তি) কামনা করে। (তে মনঃ) তোমার মন (অস্মে) আমার (মনসি) মনের মধ্যে (নি ধায়ি) স্থিত হোক, এবং (জন্যুঃ) উৎপন্নকারী/জন্ম প্রদায়ী (পতিঃ) পতি [হয়ে] (তন্বম্) [আমার] শরীরের মধ্যে (আ বিবিশ্যাঃ) প্রবেশ করো ॥৩॥

ভাবার্থঃ স্ত্রী-এর বচন।মহাত্মাগণ মান্য করে, অদ্বিতীয় বীর পুরুষের সন্তান অদ্বিতীয় বীর হয়, এইজন্য তুমি শ্রেষ্ঠ হয়ে আমার সাথে বিবাহ করে শ্রেষ্ঠ সন্তান উৎপন্ন করো ॥৩॥

অথর্ববেদ ভাষ্য ( বাংলা অনুবাদক--শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার)

পদার্থঃ (তে) সেই (অমৃতাসঃ) অমর সুদৃঢ় নিয়ম (ঘ) নিশ্চিতরূপে (এতৎ) ইহা (উশন্তি) চায়/কামনা করে (একস্য) প্রত্যেক (মর্ত্যস্য চিৎ) মরণধর্মা প্রাণীর (ত্যজসম্)১ সন্তান হোক। (তে) হে যম! তোমার (মনঃ) মন (অস্মে) আমার (মনসি) মনের অনুকূলে (নি ধায়ি) হয়ে যাক, তুমি (জন্যুঃ পতিঃ) কেবল জন্মদাতা নিযুক্ত পতি হয়ে (তন্বম্) আমার শরীরে (আ বিবিশ্যাঃ) অধিকার করো।

টিপ্পণীঃ

[যমী যম-এর প্রতি বলে,- স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য, তথা এঁদের মধ্যে নিষ্ঠ পারস্পরিক পুত্রোৎপাদন-নিমিত্ত কামবাসনা — ইহা অমর সুদৃঢ় নিয়মের কারণে, যা সন্তানোৎপাদনের জন্য প্রত্যেক মরণধর্মা প্রাণীর মধ্যে নিহিত করা হয়েছে। এইজন্য আমার ইচ্ছার অনুকূলে তুমি নিজের ইচ্ছা/কামনা করে নাও, এবং আমার শরীরের স্বামী হয়ে সন্তানোৎপাদন করে মন্ত্রে "জন্যুঃ" পদ, যম-এর মধ্যে জননশক্তির বিদ্যমানতা ও তাঁর নিয়োগ দ্বারা সন্তানোৎপাদকতার সূচক।] [১. ত্যজসম্=ত্যাগং গর্ভান্নির্গমনম্, উৎপত্তিম্- (সায়ণ)।]

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−

ঋষি – যম মন্ত্রোক্ত – যম দেবতা – ত্রিষ্টুপ্ ছন্দ – অথর্বা সূক্ত – পিতৃমেধ সূক্ত

न य॑त्पु॒राच॑कृ॒मा कद्ध॑ नू॒नमृ॒तं वद॑न्तो॒ अनृ॑तं॒ रपे॑म। ग॑न्ध॒र्वो अ॒प्स्वप्या॑ च॒योषा॒ सा नौ॒ नाभिः॑ पर॒मं जा॒मि तन्नौ॑ ॥

ন যৎ পুরা চকুমা কদ্ধ নূনমৃতং বদন্তো অনূতং রপেম।
গন্ধর্বো অস্বপ্যা চ যোষা সা নৌ নাভিঃ পরমং জামি তন্নৌ ॥
অথর্ব০ ১৮।১।৪

ন । যত্ । পু॒রা । চ॒কৃ॒ম । কত্ । হ॒ । নূ॒নম্ । ঋ॒তম্ । বদ॑ন্তঃ । অনৃ॑তম্ । র॒পে॒ম॒ । গ॒ন্ধ॒র্বঃ । অ॒প্ঽসু । অপ্যা॑ । চ॒ । যোষা॑ । সা । নৌ॒ । নাভি॑ঃ । প॒র॒মম্ । জা॒মি । তত্ । নৌ॒ ॥ (স্বরসহ পদপাঠ)

অথর্ববেদ ভাষ্য ( বাংলা অনুবাদক-- শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী) 

পদার্থঃ (যৎ) যে [কর্ম] (পুরা) পূর্বে (ন চকৃম) আমরা করিনি,  (কৎ)  কেমনভাবে  (হ)  নিশ্চিতরূপে  (নূনম্) এখন (ঋতম্) সত্য (বদন্তঃ) বলে আমরা   (অনৃতম্) অসত্য (রপেম) বলবো [যেমন]  (অপ্সু) সৎকর্ম (গন্ধর্বঃ) রক্ষণকারী পুরুষ (চ) এবং (অপ্যা) সৎকর্মে প্রসিদ্ধ (যোষা) সেবিকা স্ত্রী [হোক/হয়], (সা) তা (নৌ) আমাদের দুজনের (নাভিঃ) বন্ধুত্ব, এবং (তৎ) তা (নৌ) আমাদের দুজনের (পরমম্) সর্বোচ্চ/পরম (জামি) সম্বন্ধ [হোক] ॥৪॥

ভবার্থঃ পুরুষের বচন। তুমি বলো−শ্রেষ্ঠ পুরুষের সন্তান শ্রেষ্ঠ হয়, কিন্তু আমি মর্যাদা লঙ্ঘন করে অসত্য কখনও বলবো না। স্ত্রী-পুরুষ সদা সৎকর্ম করুক, ইহাই দুজনের মধ্যে পরস্পর স্নেহের কারণ ॥৪॥

( বাংলা অনুবাদক--শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার)

পদার্থঃ যম, যমীর প্রতি বলে - (যৎ) যে কাজ/কার্য (পুরা) পুরা কালের সৃষ্টিতে (ন চকৃম) আমরা মনুষ্যরা করিনি, (কৎ হ) কিভাবে তা এখন আমরা করবো? (ঋতং বদন্তঃ) সত্যবাদী আমরা (কৎ হ), কিভাবে (অনৃতম্) অসত্য (রপেম) বলবো। (গন্ধর্বঃ) বেদবাণীর ধারণকারী/ধারক আমি (অপ্সু) সেই রজ-বীর্যের জল থেকে সৃষ্টি/উৎপন্ন/জন্ম হয়েছি, (অপ্যা চ) এবং সেই রজ-বীর্যের জলে তুমি স্ত্রীরূপে সৃষ্টি/উৎপন্ন/জন্ম হয়েছো। (নৌ) আমরা দুজনের ভাই-বোনের (সা তাভিঃ) সেটাই দৃঢ় বন্ধন। (নৌ) আমাদের দুজনের (তৎ) তা (পরমং জামি) জন্মকৃত পরম সম্বন্ধ/সম্পর্ক।

টিপ্পণীঃ [নূনম্=বিচিকিৎসার্থীয়ঃ (নিরু০ ১।২।৬)। বিচিকিৎসা=শঙ্কিত বিবেচনা। রপেম=রপ ব্যক্তায়াং বাচি। গন্ধর্বঃ =গাম্=বাণী (নিঘং০ ১।১১) ধরতি। ইহার দ্বারা যম বলে, ব্রহ্মচর্যাশ্রমে আমি বেদবাণীর মনন করেছি। আমি বেদবাণীর বিরুদ্ধে কিভাবে চলবো ? অপ্সু, অপ্যা=অপ্ বা আপঃ শব্দ জলবাচক। কিন্তু এখানে "অপ্" দ্বারা সামান্য জলের বর্ণনা অভীষ্ট নয়। মন্ত্রে সেই জলের বর্ণনা হয়েছে, যা দ্বারা/থেকে/মাধ্যমে গন্ধর্ব ও যোষা-এর উৎপত্তি হয়েছে। সেই জল হল রক্তরূপ। পুরুষের রক্তে বীর্যকণা (male cells sperm cells, যা spermatozoa) এর নিবাস থাকে, এবং স্ত্রী-এর রক্তে female cells বা ova এর নিবাস থাকে। এই দুইয়ের মিলনে সন্তানোৎপত্তি হয়। ova কে Egg-cells ও বলা হয়। অথর্ববেদে রক্তকে "আপঃ" বলা হয়েছে। যথা- কো অস্মিন্নাপো ব্যদধাত্বিষূবৃতঃ পুরূবৃতঃ সিন্ধুসৃত্যায় জাতাঃ। তীব্রা অরুণা লোহিনীস্তাম্রধূম্রা ঊর্ধ্বা অবাচীঃ পুরুষে তিরশ্চীঃ ॥ অথর্ব০ ১০।২।১১॥ মন্ত্রে "পুরুষ" শব্দ দ্বারা "আপঃ" এর সত্তা স্ত্রী-পুরুষ এর মধ্যে দর্শানো হয়েছে, যার সরণ হৃদয়-সমুদ্র থেকে এবং হৃদয়-সমুদ্রের দিকে হয়। যা স্বাদে তীব্র। লাল, ঈষৎ-লাল, এবং তামার vapour (ধূম্র) এর সদৃশ নীল বর্ণের এবং যা শরীরে উপরের দিকে, নীচের দিকে তথা পার্শ্বে সদা গতিশীল/চলমান। যোষা এর অর্থ হল স্ত্রী। যোষা শব্দ "যু" ধাতু থেকে সৃষ্টি/উৎপন্ন হয়, যার অর্থ হল "মিশ্রণ"। যেহেতু বীর্যকণা এবং রজঃকণা এর মিশ্রণ স্ত্রী-এর মধ্যে হয়, এইজন্য স্ত্রীকে যোষা বলা হয়। যৌতীতি যোষা (উণা০ ৩।৬২) বাহুলকাৎ।]

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

गर्भे॒ नु नौ॑जनि॒ता दम्प॑ती कर्दे॒वस्त्वष्टा॑ सवि॒ता वि॒श्वरू॑पः। नकि॑रस्य॒ प्र मि॑नन्तिव्र॒तानि॒ वेद॑ नाव॒स्य पृ॑थि॒वी उ॒त द्यौः ॥

গর্ভে নু নৌ জনিতা দম্পতী কর্দেবস্তুষ্টা সবিতা বিশ্বরূপঃ। 

নকিরস্য প্র মিনন্তি ব্রতানি বেদ নাবস্য পৃথিবী উত দ্যৌঃ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৫

গর্ভে॑ । নু । নৌ॒ । জ॒নি॒তা । দম্প॑তী॒ ইতি॒ দম্ঽপ॑তী । ক্ব॒ । দে॒বঃ । ত্বষ্টা॑ । স॒বি॒তা । বি॒শ্বऽরূ॑পঃ । নকি॑ঃ । অ॒স্য॒ । প্র । মি॒ন॒ন্তি॒ । ব্র॒তানি॑ । বেদ॑ । নৌ॒ । অ॒স্য । পৃ॒থি॒বী । উ॒ত । দ্যৌঃ ॥ (স্বরসহ পদপাঠ)

( বাংলা অনুবাদক-- শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী) 
পদার্থঃ(জনিতা) উৎপন্নকারী, (দেবঃ) প্রকাশমান, (ত্বষ্টা) সৃষ্টিকর্তা, (সবিতা) প্রেরক, (বিশ্বরূপঃ) সকলকে রূপ প্রদানকারী পরমেশ্বর (গর্ভে) গর্ভের মধ্যে (নু) ই (নৌ) আমাদের দুজনকে (দম্পতী) পতি-পত্নী (কঃ) করেছেন। (অস্য) এই [পরমেশ্বরের] (ব্রতানি) নিয়ম-সমূহকে (নকিঃ প্র মিনন্তি) কেউই ভঙ্গ করতে পারে না, (নৌ) আমাদের দুজনের জন্য (অস্য) এই [কথা] (পৃথিবী) পৃথিবী (উত) এবং  (দ্যৌঃ) সূর্য (বেদ) জানে ॥৫॥ ভাই-বোনের পরস্পর বিবাহের নিষেধাজ্ঞা।

ভাবার্থঃ স্ত্রী-এর বচন। পরমাত্মা নিজের অটল নিয়ম দ্বারা মাতার গর্ভেই আমাদের দুজনকে একসাথে উৎপন্ন করে পতি-পত্নী করেছেন, যেমন এটা প্রত্যক্ষ যে, সৃষ্টির আদি থেকে সূর্য এবং পৃথিবীতে পতি-পত্নী ভাব রয়েছে, কেননা সূর্য বৃষ্টি করে, পৃথিবী তা গ্রহণ করে অন্ন আদি উৎপন্ন করে ॥৫॥

( বাংলা অনুবাদক--শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার)
পদার্থঃ (জনিতা) জন্মদাতা, (ত্বষ্টা) নানারূপ এবং আকৃতির নির্মাতা, (সবিতা) সর্বপ্রেরক তথা (বিশ্বরূপঃ) বিশ্বের রূপ প্রদানকারী পরমেশ্বর, (নু) নিশ্চিতরূপে, (গর্ভে) মাতৃগর্ভেই (নৌ) আমাদের দুজনকে (দম্পতী) জায়া ও পতি/দম্পতি (কঃ) করে দিয়েছে। (দেবঃ) তিনি দিব্যগুণসম্পন্ন, অতঃ আমাদের দুজনকে দম্পতি করা উনার দিব্যতার পরিণাম (অস্য) এই পরমেশ্বরের (ব্রতানি) কৃত কর্মকে (নকিঃ) না কেউ (প্র মিনন্তি) উলঙ্ঘন/উপেক্ষা করতে পারে। (নৌ) আমাদের দুজনের (অস্য) এই দাম্পত্যভাবকে (পৃথিবী উত দ্যৌঃ) পৃথিবীলোক এবং দ্যুলোকও (বেদ) জানে।

ভাবার্থঃ [যম এবং যমী যেহেতু যমজ ভাই-বোন, অতঃ এই দুজন একই মাতৃগর্ভে একসাথে ছিল। এইজন্য যমী, যমের প্রতি বলে- আমাদের জন্মদাতা পরমেশ্বর আমাদের দম্পতি রূপে করে দিয়েছেন/করেছেন। পৃথিবী দ্যৌঃ = কবিতারূপে পৃথিবী এবং দ্যৌঃ কে চেতন মানা হয়েছে। অথবা ইহার অর্থ হল পৃথিবীবাসী তথা দ্যুবাসী। "তাৎস্থ্যাৎ তাচ্ছব্দ্যম্" যথা মঞ্চাঃ ক্রোশন্তি। অথবা গৃহস্থ স্ত্রী তথা পুরুষ। যথা- (অথর্ব০ ১৪।২।৭১)। এই মন্ত্রে "বর" নিজেকে দ্যৌঃ, তথা 'বধূ' কে পৃথিবী বলে]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

को अ॒द्ययु॑ङ्क्ते धु॒रि गा ऋ॒तस्य॒ शिमी॑वतो भा॒मिनो॑ दुर्हृणा॒यून्।आ॒सन्नि॑षून्हृ॒त्स्वसो॑ मयो॒भून्य ए॑षां भृ॒त्यामृ॒णध॒त्स जी॑वात् ॥

কো অদ্য যুক্ত ধুরি গা ঋতস্য শিমীবতো ভামিনো দুর্ছণায়ূন।

আসন্নিষুন্ হৃৎস্বসো ময়োভূন য এষাং ভৃত্যামৃণধৎ স জীবাৎ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৬

কঃ । অ॒দ্য । যুঙ্ক্তে॒ । ধু॒রি । গাঃ । ঋ॒তস্য॑ । শিমী॑ऽবতঃ । ভা॒মিন॑ঃ । দু॒ঃऽহৃ॒ণা॒য়ূন্ । আ॒সন্ঽই॑ষূন্ । হৃ॒ৎসু঒ऽঅস॑ঃ । ম॒য়॒ঃऽভূন্ । যঃ । এ॒ষা॒ম্ । ভৃ॒ত্যাম্ । ঋ॒ণধ॑ত্ । সঃ । জী॒বা॒ত্ ॥ (স্বর সহঃ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
( বাংলা অনুবাদক-- শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী)
পদার্থঃ (কঃ) কর্তা [প্রজাপতি] পরমেশ্বর (অদ্য) আজ (ঋতস্য) সত্যের (গাঃ) গায়ক, (শিমীবতঃ) উত্তম কর্মযুক্ত, (ভামিনঃ) তেজস্বী (দুর্হৃণায়ূন্) [শত্রুদের ওপর] মহাক্রোধযুক্ত, (আসন্নিষূন্) সঠিক স্থানে বাণ প্রেরণকারী, (হৃৎস্বসঃ) [শত্রুদের] হৃদয়ে শস্ত্র প্রক্ষেপণকারী/প্রক্ষিপ্তকারী/প্রক্ষেপক এবং (ময়োভূন্)  [ধর্মাত্মাদের] সুখ প্রদানকারী বীরদের (ধুরি) ধুরী [ভারী বোঝার সাথে] (যুঙ্ক্তে) যুক্ত করে, (যঃ) যে পুরুষ (এষাম্) এই [বীরদের] (ভৃত্যাম্) পোষণরীতিকে (ঋণধৎ) বৃদ্ধি করবে, (সঃ) সে (জীবাৎ) জীবিত/যশস্বী থাকবে ॥৬॥

ভাবার্থঃ পুরুষের বচন। পরমাত্মা ধুরন্ধর ধর্মাত্মা বীরদের ওপর সংসারের রক্ষার ভার রাখে, এবং তাঁরা সেই নিয়মের যথাবৎ পালন করে। যে মনুষ্য এমন মর্যাদা পুরুষের নীতি অনুসরণ করে, সে সংসারে যশস্বী হয়ে অমর হয় ॥৬॥ এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে, ১।৮৪।৬।মহর্ষি দয়ানন্দ সেনাপতির যোগ্য কর্মে ইহার ব্যাখ্যা করেছেন ॥

(বাংলা অনুবাদক--শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার) 
পদার্থভাষ্যঃ যম, যমী-এর প্রতি বলে- (কঃ) কে (অদ্য) এই সময় (ঋতস্য) সত্যের রথের (ধুরি) ধুরা-এর মধ্যে (গাঃ) নিজের বাণীকে (যুঙ্ক্তে) সংযুক্ত করে ? সত্য-বাণী যা (শিমীবতঃ) ক্রিয়া অর্থাৎ কর্মে সমন্বিত, যার অনুরূপ কর্ম, (ভামিনঃ) প্রকাশযুক্ত অর্থাৎ স্পষ্ট, (দুর্হৃণায়ূন্) যার কথনের ক্ষেত্রে লজ্জা তথা সঙ্কোচ করা উচিৎ নয়, এমন (অসন্ ইষূন্) যা মুখ থেকে নিঃসৃত বাণের সমান হয়, (হৃৎসু অসঃ) যা হৃদয়ে গিয়ে লাগে/বিদ্ধ করে, (ময়োভূন্) কিন্তু পরিণামে কল্যাণকারিণী হয়। (যঃ) যে (এষাম্) এই সত্যবাণীর (ভৃত্যাম্) ভৃত্য হয়ে ইহার (ঋণধৎ) পরিচর্যা করে, (সঃ) সে মানো (জীবাৎ) জীবিত।

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

को अ॒स्य वे॑दप्रथ॒मस्याह्नः॒ क ईं॑ ददर्श॒ क इ॒ह प्र वो॑चत्। बृ॒हन्मि॒त्रस्य॒ वरु॑णस्य॒धाम॒ कदु॑ ब्रव आहनो॒ वीच्या॒ नॄन् ॥

কো অস্য বেদ প্রথমস্যাহ্নঃ ক ঈং দদর্শ ইহ প্র বোচৎ।

বৃহন্মিত্রস্য বরুণস্য ধাম কদু ব্রব আহনো বীচ্যা নূন্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৭ 

কঃ । অ॒স্য । বে॒দ॒ । প্র॒থ॒মস্য॑ । অহ্ন॑ঃ । কঃ । ঈ॒ম্ । দ॒দ॒র্শ॒ । কঃ । ই॒হ । প্র । বো॒চ॒ত্ । বৃ॒হত্ । মি॒ত্রস্য॑ । বরু॑ণস্য । ধাম॑ । কত্ । ঊং॒ ইতি॑ । ব্র॒ব॒ঃ । আ॒হন॒ঃ । বীচ্যা॑ । নॄন্ ॥ (স্বর সহঃ পদপাঠ)

( বাংলা অনুবাদক-- শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী)
পদার্থঃ (কঃ) কোন [পুরুষ] (অস্য) এই [জগতের] (প্রথমস্য) প্রথম (অহ্নঃ) দিন (বেদ) জানে (কঃ) কে (ঈম্) এই [দিনকে] (দদর্শ) দর্শন করেছে, (কঃ) কে (ইহ) এই [বিষয়ে] (প্র বোচৎ) বলে। (মিত্রস্য) সর্বপ্রেরক (বরুণস্য) শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বরের (বৃহৎ) বৃহৎ (ধাম) ধাম [ধারণসামর্থ্য বা নিয়ম] রয়েছে/আছে, (আহনঃ) হে ! (কৎ উ) কেমন (বীচ্যা) ছলনার সাথে (নৄন্) নর [নেতাদের] (ব্রবঃ) তুমি বলতে পারো॥৭॥

ভাবার্থঃ ইহাও পুরুষের বচন। তুমি বলছো- সূর্য এবং পৃথিবী প্রাকৃতিক পদার্থেও পতি-পত্নী ভাব রয়েছে, ইহা সঠিক নয়। পরমেশ্বরের নিয়ম মনুষ্য বুঝতে অক্ষম, যেমন সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে আকর্ষণ ধারণ আদি গুণ রয়েছে, যার কারণে সেগুলোর মাঝামাঝি বারংবার পরস্পরের প্রতি বৃষ্টি দেওয়ার এবং নেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। তুমি আমাদের ঠকিও না ॥৭॥মন্ত্র ৭-১২ কিছু অভেদ বা ভেদপূর্বক ঋগ্বেদে আছে−১০।১০।৬-১১ ॥

টিপ্পণী

৭- (কঃ) = প্রশ্নবাচক। কে (অস্য) = এই (জগতঃ) = জগতের (বেদ) = জানে (প্রথমস্য) = প্রথমের (অহ্নঃ) = দিনের (অহঃ) = দিনকে? (কঃ) = কে (ঈম্) = এই (ইদং দিনম্) = এই দিনকে (দদর্শ) = দেখেছে? (কঃ) = কে (ইহ) = এখানে, এই বিষয়ে (প্র বোচৎ) = প্রকাশ করে বলতে পারে? (বৃহৎ) = মহান (মিত্রস্য) = মিত্রের, অর্থাৎ (ডুমিঞ্ প্রক্ষেপণে–ক্ত্র) = সর্বপ্রেরক (বরুণস্য) = শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর বরুণের (ধাম) = ধারণশক্তি, সামর্থ্য, (প্রভাবঃ) = প্রভাব (কত্) = কীভাবে (উ) = পদপূরণার্থক (ব্রবঃ) = বলবে? (ব্রবীষি) = তুমি বলছ। (আহনঃ) = আঙ্ + হন্ (হিংসা ও গতি অর্থে) + অসুন্; হে আঘাতকারী স্বভাবযুক্ত, ক্লেশকারিণী। (বীচ্যা) = ব্যচ্ ব্যাজীকরণে + কি প্রত্যয়; ছান্দস দীর্ঘ। (নৃন্) = ছল দ্বারা মানুষদের পরিচালনা করে—নয়তে ডিচ্চ; উ০ ২।১০০। (ণীঞ্) = প্রাপ্তি অর্থে + ঋ, এবং তা ডিত্; (নেতৃন্) = পুরুষদের।


(বাংলা অনুবাদক--শুভঙ্কর মণ্ডল / ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার) 
পদার্থঃ যমী, যমের প্রতি বলে– (অস্য) এই জগতের (প্রথমস্য অহ্নঃ) প্রথম দিনকে (কঃ বেদ) কে জানে? (ঈম্) এই প্রথম দিনকে (কঃ দদর্শ) কে কখনও দেখেছে? (ইহ) এই জীবনে (কঃ) কে এই তত্ত্বের (প্রবোচৎ) প্রবচন করেছে ? (মিত্রস্য বরুণস্য) সকলের মিত্র এবং সাথে সকলকে বেষ্টনকারীর (বৃহৎ ধাম) বৃহৎ/অনেক তেজ আছে, (কদ্ উ ব্রবঃ) ইহা তুমি কিভাবে বলতে পারো ? (আহনঃ) হে হৃদয়ে আঘাতকারী/হৃদয়বিদারক/হৃদয়বিদ্ধকারী যম ! আমি তো (নৄন্) পুরুষদের (বীচ্যা) ঠগ (ব্রবে) বলি।

টিপ্পণীঃ [বীচ্যা = বীচ্যান্। ব্যচ্ ব্যাজীকরণে। যমী বলে- তুমি ধর্মের বিষয়ে বড়ো-বড়ো কথা বলো। দেখো, জগতের প্রথম দিন পর্যন্ত তো কেউ জানে না, তবে ধর্মের তত্ত্বকে কে জানতে পারে ? তুমি পরমেশ্বরকে সকলের মিত্র বলো, কিন্তু বরুণরূপে তিনি সকলকে নিজের বন্ধনে কেন আবদ্ধ করে রেখেছেন ? (মন্ত্রসংখ্যা ২,৯)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

জয়দেব শর্মাকৃত পদার্থভাষ্যঃ

পদার্থঃ (অস্য) = এই সংসারের (প্রথমস্য অহ্নঃ) = প্রথম দিনের বিষয়ে (কঃ বেদ) = কে জানে? (ঈম্) = এই জগতকে সৃষ্টি হতে থাকা অবস্থায়ও (কঃ দদর্শ) = কে দেখেছে? (ইহ) = এই বিষয়ে (কঃ প্রবোচৎ) = কে বলতে পারে? (মিত্রস্য) = সকলের স্নেহশীল (বরুণস্য) = সর্বশ্রেষ্ঠ পরমাত্মার (ধাম) = তেজ ও ধারণক্ষমতাও (বৃহৎ) = অত্যন্ত মহান। (নৃন্) = সমস্ত মানুষের (বীচ্য) = বিচার-বিবেচনা করে, হে (আহনঃ) = হৃদয়ে আঘাতকারী অথবা হৃদয়ে প্রবেশকারিণী প্রিয়তমে! তুমি (কত্ উ) = কীই বা (ব্রবঃ) = বলতে পারো?

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- आर्षी पङ्क्तिछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

य॒मस्य॑ माय॒म्यं काम॒ आग॑न्त्समा॒ने योनौ॑ सह॒शेय्या॑य। जा॒येव॒ पत्ये॑ त॒न्वंरिरिच्यां॒ वि चि॑द्वृहेव॒ रथ्ये॑व च॒क्रा ॥

যমস্য মা যম্যং কাম আগন্‌ৎসমানে যোনৌ সহশেয্যায়।

জায়েব পত্যে তন্বং রিরিচ্যাং বি চিদ বৃহেব রথ্যেব চক্রা ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৮

য॒মস্য॑ । মা॒ । য॒ম্য᳡ম্ । কাম॑ঃ । আ । অ॒গ॒ন্ । স॒মা॒নে । যোনৌ॑ । স॒হ॒ऽশেয়্যা॑য় । জা॒য়া॑ঽইভ । পতিয়ে॑ । ত॒ন্ব᳡ম্ । রি॒রি॒চ্যা॒ম্ । বি । চি॒ত্ । বৃ॒হে॒ব॒ । রথ্যা॑ঽইভ । চ॒ক্রা ॥ (স্বর সহঃ পদপাঠ)

ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী
ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
পদার্থঃ (যমস্য) যম-এর (কামঃ) কামনা (মা) আমার (যম্যম্) যমীকে, (সমানে যোনৌ)  একঘরে  (সহশেয়্যায়) একসাথে শয্যার জন্য, (আ অগন্) এসে প্রাপ্ত হয়েছে। (জায়াইব) পত্নীর সমান  (পত্যে) পতির জন্য (তন্বম্) [নিজ] শরীর (রিরিচ্যাম্) আমি বিস্তার করি, (চিৎ) এবং (রথ্যা) রথ বহনকারী (চক্রা ইব) দুই চাকার সমান (বিবিরহেব) আমরা দুজন মিলিত হই ॥৮॥

ভাবার্থঃ স্ত্রী-এর বচন। তুমি এবং আমি দুজনেই এক মাতা থেকে এক সাথে উৎপন্ন হয়েছি, সুতরাং আমাদের দুজনের মধ্যে অতিপ্রীতি রয়েছে। আমরা দুজনেই নিজেদের মধ্যে বিবাহ করে পতি-পত্নী হইবো এবং একসাথে গৃহস্থআশ্রম চালাবো, যেমন রথের দুই চাকা পরস্পর একসাথে মিলে রথ চালায় ॥৮॥

হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত ভাষ্যঃ

পদার্থ

১. (যমস্য) = তোমার, যমের (কামঃ) = প্রেম (যম্যং মা) = আমার, যমীর প্রতি (আগন্) = আগত হোক। (সমানে যোনৌ) = একই গৃহে (সহশেয়্যায়) = একসঙ্গে বাস করার জন্য আমরা হই।
২. হে যম! তুমি আমার কামনা করো এবং আমি (জায়া ইব) = স্ত্রীর ন্যায় (ভান্তি পত্যে) = স্বামীর রূপে তোমার জন্য (তন্বং রিরিচ্যাম্) = নিজের দেহ প্রকাশ করি; অর্থাৎ আমরা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী রূপে থাকি। (চিত) = এবং নিশ্চিতভাবেই (বিবৃহেব) = আমরা ধর্ম, অর্থ ও কামরূপ পুরুষার্থের জন্য উদ্যোগী হই। (রথ্যা চক্রা ইব) = যেমন রথের দুই চাকা রথকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, তেমনই আমরা স্বামী-স্ত্রী এই জীবনরথের দুই চাকার ন্যায় হয়ে জীবনকে সফল করি।

ভাবার্থ

যমী বলে—হে যম! তোমার কি আমার প্রতি প্রেম নেই? আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক। আমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে ধর্ম, অর্থ ও কাম প্রভৃতি পুরুষার্থ সাধন করে জীবনকে সফল করি।


ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার
পদার্থঃ (সমানে) একই (যোনৌ) ঘরে আমরা দুজন সদা (সহশেয়্যায়) একসাথে শয়ন করি, এইজন্য (মা) আমাকে (যম্যম্) যমীকে (যমস্য কামঃ) যম-সম্বন্ধী সন্তান-নিমিত্ত কামনা (আগন্) প্রাপ্ত হয়েছে, জাগৃত হয়েছে। (জায়া ইব) জায়া যেমন (পত্যে) পতির জন্য, তেমন আমি তোমার জন্য (তন্বম্) নিজের শরীরকে (রিরিচ্যাম্) সুপুর্দ করি/করবো; অনাচ্ছাদিত করি/করবো - ইহা আমার অভিলাষা। যাতে (রথ্যা চক্রা ইব) রথের দুই চক্রের সদৃশ আমরা দুজন (চিদ্) ও (বি বৃহেব) গৃহস্থ-পথে উদ্যম করি। [যোনি = গৃহনাম (নিঘং০ ৩।৪)। বৃহেব = বৃহ্, উদ্যমনে।]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

न ति॑ष्ठन्ति॒ ननि मि॑षन्त्ये॒ते दे॒वानां॒ स्पश॑ इ॒ह ये च॑रन्ति। अ॒न्येन॒ मदा॑हनो याहि॒तूयं॒ तेन॒ वि वृ॑ह॒ रथ्ये॑व च॒क्रा ॥

ন তিষ্ঠন্তি ন নি মিষন্ত্যেতে দেবানাং স্পশ ইহ যে চরন্তি।

অন্যেন মদাহনো যাহি তুয়ং তেন বি বৃহ রথ্যেব চক্রা ৷ অথর্ব০ ১৮।১।৯

ন । তি॒ষ্ঠ॒ন্তি॒ । ন । নি । মি॒ষ॒ন্তি॒ । এ॒তে । দে॒বানা॑ম্ । স্পশ॑ঃ । ই॒হ । যে । চর॑ন্তি । অ॒ন্যেন॑ । আ॒হন॒ঃ । যা॒হি॒ । তূয়॑ম্ । তেন॑ । বি । বৃ॒হ॒ । রথ্যা॑ঽইভ । চ॒ক্রা ॥ (স্বর সহ পদপাঠ)

ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী
ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
(দেবানাম্) বিদ্বানদের (এতে) এই (স্পশঃ) নিয়ম (ন) না (তিষ্ঠন্তি) স্থিত হয় এবং (ন) না (নি মিষন্তি) নিমিষ/wink/twinkle করে, (যে) যে (ইহ) এখানে (চরন্তি) চলে। (আহনঃ) হে ক্ষত সৃষ্টিকারী ! তুমি (মৎ) আমার থেকে (অন্যেন) অন্যের সাথে (তূয়ম্) শীঘ্র (যাহি) যাও এবং (তেন) তাঁর সাথে (রথ্যা) রথ বহনকারী (চক্রা ইব) দুই চাকার সমান (বি বৃহ) সংযোগ করো ॥৯॥

পুরুষের বচন। বিদ্বানদের অটল মর্যাদা সকলের মান্য করা উচিৎ, আমি বোনের সাথে বিবাহ করতে পারবো না, তুমি অন্যের সাথে বিবাহ করে গৃহস্থিনী হও ॥৯॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার
পদার্থঃ যম, যমীর প্রতি বলে– (দেবানাং এতে স্পশঃ) দেবতাদের যে গুপ্তচর আছে, (যে) যা (ইহ) এই সংসারে (চরন্তি) বিচরন করছে, তা (ন তিষ্ঠন্তি) না তো বিশ্রাম করে, এবং (ন নিমিষন্তি) না চোখ বন্ধ করে, অর্থাৎ সকলকে দেখতে থাকে। (আহনঃ) হে হৃদয়ে আঘাতকারী ! (মৎ) আমার থেকে (অন্যেন) ভিন্ন পুরুষের সাথে তুমি (তূয়ম্) শীঘ্র (যাহি) চলে যাও। (তেন) তাঁর সাথে (বিবৃহ) তুমি উদ্যম করো, গৃহস্থ মার্গে চলো (ইব) যেমন (রথ্যা চক্রা) রথের দুই চাকা পরস্পর একসাথে পথে চলে।

টিপ্পণীঃ [আহনঃ = মন্ত্র ৭ এর অনুসারী যমী "বীচ্যা নৄন্" পদের দ্বারা পুরুষের ওপর আঘাত করেছে। দেবানাং স্পশঃ= দেবতাদের স্পশ হল প্রাকৃতিক ও সদাচারের সুদৃঢ় কঠোর নিয়ম, যা মানো বিশ্রাম পায় না, এবং সদা জাগরূক থেকে সকলের কর্ম-সমূহ মানো দেখছে, (দেখো - মন্ত্রসংখ্যা ২)।]

হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কারকৃত ভাষ্যঃ

১. যম উত্তর দিতে গিয়ে বলে যে— ‘আমাদের এই সম্পর্ক গোপনই থেকে যাবে’—এভাবে ভাবা ঠিক নয়। মানুষ জানতে না পারলেও, সূর্য প্রভৃতি দেবতারা আমাদের এই কর্ম অবশ্যই দেখে থাকেন।
(যে এতে) = যারা এই, (দেবানাং স্পশঃ) = দেবতাদের গুপ্তচর, মানুষের আচরণ লক্ষ্য করে (ইহ চরন্তি) = এখানে বিচরণ করে, (ন তিষ্ঠন্তি) = তারা দাঁড়িয়ে থাকে না, (ন নিমিষান্তি) = পলকও ফেলে না। অর্থাৎ, এই দেবতারা অদৃশ্য অবস্থায় আমাদের সমস্ত কর্ম জেনে থাকেন।

২. অতএব, হে (আহনঃ) = গতি দ্বারা সকল অকল্যাণ নাশকারিণী আমার ভগিনী! (মদ্ অন্যেন) = আমার থেকে ভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে (তূয়ম্) = তুমি (শীন) (যাহি) = এই জীবনযাত্রায় অগ্রসর হও। (তেন) = তারই সঙ্গে (বিবৃহ) = ধর্ম, অর্থ ও কামরূপ পুরুষার্থের জন্য উদ্যোগী হও। তার সঙ্গে মিলিত হয়ে তোমরা উভয়ে (রথ্যা চক্রা ইব) = রথের চাকার ন্যায় জীবনযাত্রায় ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকো।

ভাবার্থঃ দেবতারা আমাদের প্রতিটি কর্ম দেখছেন; অতএব নিকট আত্মীয় সম্পর্ককে দূরে রেখে, দূর সম্পর্ক স্থাপন করে ধর্মার্থ ও কামরূপ পুরুষার্থ সাধনে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত।

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

रात्री॑भिरस्मा॒अह॑भिर्दशस्ये॒त्सूर्य॑स्य॒ चक्षु॒र्मुहु॒रुन्मि॑मीयात्। दि॒वा पृ॑थि॒व्यामि॑थु॒ना सब॑न्धू य॒मीर्य॒मस्य॑ विवृहा॒दजा॑मि ॥

রাত্রীভিরস্মা অহভির্দশস্যেৎ সূর্যস্য চক্ষুর্মুহুরুন্মিমীয়াৎ।

দিবা পৃথিব্যা মিথুনা সবন্ধু যমীর্যমস্য বিবৃহাদজামি ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১০

রা॒ত্রী॑ভিঃ । অ॒স্মৈ॒ । অহ॑ऽভিঃ । দ॒শ॒স্যে॒ত্ । সূর্য॑স্য । চক্ষু॑ঃ । মুহু॑ঃ । উৎ । মি॒মী॒য়া॒ত্ । দি॒বা । পৃ॒থি॒ব্যা । মি॒থু॒না । সব॑ন্ধূ॒ ইতি॒ সऽব॑ন্ধূ । য॒মীঃ । য॒মস্য॑ । বি॒বৃ॒হা॒ত্ । অজা॑মি ॥ (স্বর সহ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (রাত্রীভিঃ) রাত্রির সাথে এবং (অহভিঃ) দিনের সাথে (অস্মৈ) এই [ভাইকে] (সূর্যস্য) সূর্যের (চক্ষুঃ) জ্যোতি (দশস্যেৎ) [সুমতি] প্রদান করুক এবং (মুহুঃ) বারংবার (উৎ মিমীয়াৎ) বিস্তৃত হোক। (দিবা) সূর্যের সাথে এবং (পৃথিব্যা) পৃথিবীর সাথে (মিথুনা) মিথুন/দম্পতি/couple (সম্বন্ধূ) ভাইয়ের সাথে সম্বন্ধযুক্ত, (যমীঃ) যমজ বোন (যমস্য) যমজ ভাইয়ের (অজামি) সম্পর্ক ছাড়াই (বিবৃহাৎ) উদ্যম করে/করুক॥১০॥

ভাবার্থঃ স্ত্রী-এর বচন। হে ভাই ! সূর্যের প্রকাশে/আলোতে চোখ খুলে দেখো, রাত্রি এবং দিন বোন-ভাই হয়ে পতি-পত্নী রূপে থাকে এবং সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে সব পদার্থেও এই সম্পর্ক রয়েছে, তাই আমিও বোন হয়ে নিজের ভাইয়ের সাথে বিবাহ করি ॥১০॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার পদার্থঃ (রাত্রীভিঃ) রাত্রির সাথে থাকা দিন, এবং (অহভিঃ) দিনের সাথে থাকা রাত্রী, এই দৃষ্টান্ত দ্বারা, (অস্মৈ) এই যমের জন্য, পরমেশ্বর (দশস্যেৎ) মার্গ নির্দেশ করে। দেখো, (সূর্যস্য চক্ষুঃ) সূর্য যা এই দুইয়ের অর্থাৎ রাত ও দিনের পিতা, উহার [সূর্যের] চোখ (মুহুঃ) বার-বার (উন্মিমীয়াৎ) এই ঘটনা-সমূহ দেখছে। এবং দেখো, দ্যূলোকের সাথে পৃথিবী, এবং (পৃথিব্যা) পৃথিবীর সাথে দ্যুলোক (মিথুনা) এগুলোও মিথুন/দম্পতি, (সবন্ধূ) এবং একই পরমেশ্বর এগুলোর সমান রূপে বন্ধু, পিতা কিন্তু (যমীঃ) যমীই (যমস্য) যমের (অজামি) বন্ধুত্ব বিনা (বিবৃহাৎ) এই জগতে উদ্যমশীল হয়ে থাকুক।

হরিশরণজীর পদার্থভাষ্যঃ ১. যম চায় যে তার বোন (মদ্ অন্যেন) = তার থেকে ভিন্ন যে কোনো পুরুষকে স্বামীরূপে প্রাপ্ত হোক এবং (রাত্রীভিঃ অহভিঃ) = রাত-দিন (অস্মা) = নিজের সেই স্বামীর জন্য (দশাস্যেত্) = বিশ্রাম ও সুখ দেওয়ার কামনা করুক। তার বোন ও বোনের স্বামীর ওপর (সূর্যস্য চক্ষুঃ) = সূর্যের চোখ (মুহুঃ) = বারবার (উন্মিমীয়াত্) = উন্মুক্ত থাকুক; অর্থাৎ তাদের জীবন দীর্ঘ হোক।

২. যেমন (দিবা পৃথিব্যা) = দ্যুলোক ও পৃথিবীলোক পরস্পরের সঙ্গে যুগল-সম্পর্কযুক্ত, একসঙ্গে ও সমান বন্ধুত্বপূর্ণ থাকে, তেমনই তারাও পরস্পর বন্ধুত্বসম্পন্ন হোক। দ্যুলোক ও পৃথিবীলোক যেমন বহু দূরে অবস্থিত, তেমনি যম চায় যে তার বোন ও তার ভবিষ্যৎ স্বামীও পরস্পর সुदূর অবস্থানকারী হোক। (যমীঃ) = সংযত জীবনযাপনকারী আমার বোন (যমস্য) = আমার, যমের (অজামি) = অসংযুক্ত ব্যক্তি, অর্থাৎ কোনো দূর গোত্রের পুরুষকেই (বিবৃহাত্) = বর্ধনকারী হোক—তারই বংশবৃদ্ধি সাধনকারী হয়ে উঠুক।

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

आ घा॒ ताग॑च्छा॒नुत्त॑रा यु॒गानि॒ यत्र॑ जा॒मयः॑ कृ॒णव॒न्नजा॑मि। उप॑ बर्बृहि वृष॒भाय॑बा॒हुम॒न्यमि॑च्छस्व सुभगे॒ पतिं॒ मत् ॥

আ ঘা তা গচ্ছানুত্তরা যুগানি যত্র জাময়ঃ কৃণবন্নজামি। 

উপ ববৃহি বৃষভায় বাহুমন্যমিচ্ছস্ব সুভগে পতিং মৎ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১

আ । ঘ॒ । তা । গ॒চ্ছা॒न् । উৎ্তা॑রা । যু॒গনি॑ । যত্র॑ । জা॒ময॑ঃ । কৃ॒ণব॑न् । অজা॑মি । উপ॑ । ব॒র্বৃ॒হী॒ । বৃ॒ষ॒ভায়॑ । বা॒হুম্ । অ॒ন্যম্ । ই॒চ্ছ॒স্ব॒ । সু॒’ভগে॒ । পতি॑ম্ । মত্ ॥ (স্বর সহ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (তা) তা (উত্তরা) আগামী (যুগানি) যুগ [সময়] (ঘ) নিঃসন্দেহে (আ গচ্ছান্) আসবে/আসুক, (যত্র) যেখানে/যখন (জাময়ঃ) কুলস্ত্রী [বা বোন] (অজামি) কুলস্ত্রী [বা বোনের] অযোগ্য কাজ (কৃণবন্) করবে/করুক। (বৃষভায়) শ্রেষ্ঠ বরের জন্য (বাহুম্) [নিজের] বাহু (উপবর্বৃহি) সামনের দিকে বিস্তারিত করো, (সুভগে) হে সুভগে ! [ঐশ্বর্যবতী] (মৎ) আমার থেকে (অন্যম্) অন্য (পতিম্) পতির (ইচ্ছস্ব) ইচ্ছা করো ॥১১॥

ভাবার্থঃ পুরুষের বচন। যদিওবা কুলস্ত্রীগণ ধর্ম ত্যাগ করে অধর্ম করে, আমি অধর্ম করবো না, তুমি নিজের জন্য অন্য পতি/বরের গৃহস্থ আশ্রম করো ॥১১॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার পদার্থঃ (ঘ) নিশ্চিতরূপে (তা) সেই (উত্তরা যুগানি) আগামী যুগ (আ গচ্ছান্) আসবে, (যত্র) যার মধ্যে (জাময়ঃ) স্ত্রীগণ (কৃণ্বন্) সেই কাজ করবে, (অজামি) যা স্ত্রী/নারীদের করা উচিৎ নয়। এইজন্য হে যমী ! তুমি কোনো (বৃষভায়) বীর্যবান, পুরুষের জন্য (বাহুম্) নিজের বাহূকে, জলগ্রহণের জন্য নিজের হাতকে (উপবর্বৃহি) পুরুষের হাতের সমীপে ওঠাও, উদ্যত করো। (সুভগে) হে সৌভাগ্যবতী ! (মৎ অন্যম্) আমার থেকে ভিন্নকে (পতিম্ ইচ্ছস্ব) পতিরূপে কামনা করো।

টিপ্পণীঃ [সত্যযুগ বা কৃতযুগ, ত্রেতা, দ্বাপর তথা কলিযুগ-এগুলোর ক্রম পরস্পর যুক্ত। সৃষ্টি-নিয়মের অনুসারে এক যুগের পরে আগামী-আগামী যুগ আসতে থাকে। এবং যুগানুসারে বিচার তথা আচরণেও পরিবর্তন আসতে থাকে। মন্ত্রে কলিযুগের নির্দেশ করা হয়েছে। যুগ-পরিবর্তনের ইহা সামান্য নিয়ম। ভূমণ্ডলের অধিবাসীদের সামূহিক/দলবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা, এই সামান্য নিয়মের অপবাদ। [বর্বৃহি = বৃহ্, উদ্যমনে ঊঞ্চা করনা।] যম ভাই হওয়ার কারণে যমী হতে সন্তানোৎপত্তি করার ক্ষেত্রে অসমর্থ। এইজন্য সে যমীকে প্রেরিত করে, যাতে যমী যম হতে ভিন্ন অন্য কোনো বীর্যবান্ ও শ্রেষ্ঠ পুরুষকে জলগ্রহণ দ্বারা পতিরূপে স্বীকার করে। ইহার মাধ্যমে এই ভাবনা দ্যোতিত হয়, বিবাহিত পতি যদি সন্তানোৎপত্তির ক্ষেত্রে অসমর্থ হয়, এবং পত্নী যদি সন্তানের কামনাশীল হয়, তবে পতি নিজের পত্নীকে স্বীকৃতি দেবে যে, সে [পত্নী] অন্য কোনো বীর্যবান্ শ্রেষ্ঠ পুরুষের দ্বারা, তাঁকে পতিরূপে স্বীকার করে, সন্তান প্রাপ্ত করুক এইজন্য মহর্ষি দয়ানন্দ সত্যার্থপ্রকাশ, সমুল্লাস ৪ এর নিয়োগ-প্রকরণে "অন্যমিচ্ছস্ব সুভগে পতি মৎ" এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন – "যখন পতি সন্তানোৎপত্তির ক্ষেত্রে অসমর্থ হবে, তখন নিজের স্ত্রীকে আজ্ঞা দেবে, হে সুভগে ! সৌভাগ্যের কামনাকারী স্ত্রী! তুমি আমার থেকে অন্য পতির ইচ্ছা করো, কেননা এখন আমার দ্বারা সন্তানোৎপত্তি হবে না। তখন স্ত্রী অন্যের সাথে নিয়োগ করে সন্তানোৎপত্তি করে/করবে।" উপরের মন্ত্রগুলোতে "জন্যুঃ পতিঃ" (সংখ্যা ৩); তথা "জায়েব পত্যে" (সংখ্যা ৮) এই উপমা দ্বারা যমী, যমের সাথে সন্তানোৎপত্তির জন্য কেবল তানবিক অর্থাৎ শারীরিক সম্বন্ধ/সম্পর্ক কামনা করে, যা নিয়োগ বিধির সূচক। যমী মন্ত্র (১) দ্বারা প্রথমে তো বিবাহের প্রস্তাব করেছে/দিয়েছে, কিন্তু যম দ্বারা এই প্রস্তাব অস্বীকৃত হওয়ার পরেও তাঁর সামনে নিয়োগের প্রস্তাব প্রস্তুত করে/দেয়। যমী মন্ত্র (৫) দ্বারা এক মাতৃগর্ভে নিবাসের কারণে, যম ও নিজের মধ্যে দাম্পত্যভাব মনে করে তাঁকে পতি স্বীকার করে নিয়েছে। এইজন্য এক প্রকারে যম, পতিরূপে, যমীকে নিয়োগের আজ্ঞা দিচ্ছে- এটা মানা যেতে পারে।]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

किंभ्राता॑स॒द्यद॑ना॒थं भवा॑ति॒ किमु॒ स्वसा॒ यन्निरृ॑तिर्नि॒गच्छा॑त्। काम॑मूताब॒ह्वे॒तद्र॑पामि त॒न्वा॑ मे त॒न्वं सं पि॑पृग्धि ॥

কিং ভ্রাতাসদ যদনাথং ভবাতি কিমু স্বসা যন্নিঋতিনিগচ্ছাৎ। 

কামমৃতা বহৃেত রপামি তন্বা মে তন্বং সং পিপৃদ্ধি ৷ অথর্ব০ ১৮।১।১২ 

কিম্ । ভ্রাতা॑ । অ॒সৎ । যত্ । অনা॒থम् । ভবা॑তি । কিম্ । ঊং॒ ইতি॑ । স্বসা॑ । যত্ । নিঃঋ॑তিঃ । নিঃগচ্ছা॑ত্ । কাম॑অমূতা । ব॒হূ । এ॒তত্ । র॒পা॒মি॒ । ত॒ন্ব᳡ । মে॒ । ত॒ন্ব᳡ম্ । সম্ । পি॒পৃ॒গ্ধি॒ ॥ (স্বর সহ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (ভ্রাতা) ভাই (কিম্) কী (অসৎ) হবে, (যৎ) যখন [বোনকে] (অনাথম্) অনাশ্রয় (ভবাতি) হবে, (উ) এবং (স্বসা) বোন (কিম্) কী (যৎ) যখন [ভাইয়ের ওপর] (নির্ঋতিঃ) মহাবিপত্তি (নিগচ্ছাৎ) আসবে। (কামমূতা) কামবদ্ধ আমি (বহু) বহু/অনেক কিছু (এতৎ) এরকম (রপামি) বলি, (তন্বা) [নিজের] শরীর দ্বারা (মে) আমার (তন্বম্) শরীরকে (সম্পিপৃগ্ধি) সংস্পর্শ করো ॥১২॥

ভাবার্থঃ স্ত্রী-এর বচন । সে ভাই নয় যে বোনের বিপত্তিতে সহায়তা করে না এবং না সে বোন যে ভাইয়ের কষ্ট দূর করে না। আমি কাম দ্বারা পীড়িত হয়ে তোমার সাথেই বিবাহের জন্য বলি॥১২॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার
পদার্থঃ (কিম্) কী (অসৎ) হয় (ভ্রাতা) ভাই, (যৎ) যার থাকা অবস্থায় বোন (অনাথং ভবাতি) অনাথ হয়, এবং (কিম্ উ) কী (স্বসা) বোন, (যৎ) যার থাকা অবস্থায় ভাই (নির্ঋতিঃ) কৃচ্ছ্রাপত্তি/কষ্ট (নিগচ্ছাৎ) প্রাপ্ত হয়। হে ভাই ! (কামমূতা) পুত্রের কামনাবদ্ধ আমি (এতৎ বহু) এই বহু/অনেক (রপামি) স্পষ্ট কথন করছি। তুমি (তন্বা) নিজ তনূ দ্বারা, (মে তন্বম্) আমার তনূর সাথে, (সং পিপৃগ্ধি) সম্যক্ সম্পর্ক করো।

টিপ্পণীঃ [মুতা = মূ বন্ধনে। নির্ঋতিঃ= ভাই একা থাকবে, এবং কষ্ট ভোগ করবে- ইহাও বোনের জীবিত থাকা অবস্থায় সঠিক নয়। এইভাবে যমী যমকে এটা বোঝায়, আমাদের পরস্পর বিবাহ হলে না আমি অনাথ থাকবো, এবং না তুমি কষ্ট ভোগ করতে থাকবে। অনাথম্= ভবাতি এর ক্রিয়াবিশেষণ।]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

न ते॑ ना॒थंय॒म्यत्रा॒हम॑स्मि॒ न ते॑ त॒नूं त॒न्वा॒ सम्प॑पृच्याम्। अ॒न्येन॒ मत्प्र॒मुदः॑कल्पयस्व॒ न ते॒ भ्राता॑ सुभगे वष्ट्ये॒तत् ॥

ন তে নাথং যম্যত্রাহমস্মি ন তে তনূং তন্বা সং পপৃচ্যাম্। 

অন্যেন মৎ প্রমুদঃ কল্পয়স্ব ন তে ভ্রাতা সুভগে বষ্ট্যেতৎ ৷৷ অথর্ব০ ১৮।১।১৩ 

স্বরযুক্ত পদপাঠঃ ন। তে॒। না॒থম্। যমি॒। অত্র॑। অ॒হম্। অ॒স্মি॒। ন। তে॒। ত॒নূম্। ত॒ন্বা। সম্। পপৃ॒চ্ছ্যাম্।
অন্যেন॑। মত্। প্র॒মুদঃ। ক॒ল্পয়স্ব। ন। তে॒। ভ্রাতা॑। সু॒ভগে॒। বষ্টি। এ॒তত্॥

স্বরছাড়া পদপাঠঃ ন। তে। নাথম্। যমি। অত্র। অহম্। অস্মি। ন। তে। তনূম্। তন্বা। সম্। পপৃচ্ছ্যাম্। অন্যেন। মত্। প্রামুদঃ। কল্পয়স্ব। ন। তে। ভ্রাতা। সু’ভগে। বষ্টি। এতত্॥

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী
পদার্থঃ (যমি) হে যমী ! [বোন] (অহম্) আমি (অত্র) এই [বিষয়ে] (তে) তোমার (নাথম্) আশ্রয় (ন) না (অস্মি) হই, (তে) তোমার (তনূম্) শরীরকে (তন্বা) [নিজের] শরীরের সাথে (ন) না (সম্) একসাথে (পপৃচ্যাম্) স্পর্শ করবো। (মৎ) আমার থেকে (অন্যেন) অন্য [বরের] সাথে (প্রমদঃ) আনন্দ (কল্পয়স্ব) সাধন করো, (সুভগে) হে সুভগে ! [ঐশ্বর্যবতী] (তেভ্রাতা) তোমার ভাই (এতৎ) ইহা (ন) না (বষ্টি) চায় ॥১৩॥

ভাবার্পুথঃ রুষের বচন। এটা ঠিক যে, আমরা দুজন ভাই-বোন হয়ে বিপত্তিতে পরস্পরের সহায়তা করি, কিন্তু ধর্ম ত্যাগ করে বোনের সাথে বিবাহ করবো না। আমি তোমাকে বলি, তুমি অন্য যোগ্য বরের সাথে বিবাহ করে নাও ॥১৩॥ এই মন্ত্রের উত্তরার্দ্ধ ঋগ্বেদে আছে−১০।১০।১২ ॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার
পদার্থঃ (যমি) হে যমী ! (অত্র) এই বিবাহ প্রস্তাবে (অহম্) আমি (তে) তোমার (নাথম্) স্বামী (ন অস্মি) নয়। (তন্বা) নিজের তনূ দ্বারা (তে তনূম্) তোমার তনূর সাথে (ন সং পপৃচ্যাম্) সম্পর্ক করবোনা। (মৎ) আমার থেকে (মন্যেন) ভিন্ন পুরুষের সাথে (প্রমুদঃ) মোদ-প্রমোদ (কল্পয়স্ব) করো। (সুভগে) হে সৌভাগ্যবতী ! (তে) তোমার (ভ্রাতা) ভাই (এতৎ) এই সম্পর্ককে, বা বিবাহকে (ন বষ্টি) চায় না।

পদার্থভাষ্যঃ হে (যমি) = যমী! যতেন্দ্রিয় প্রিয়তম! নিজের আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা না থাকা সত্ত্বেও স্বামী গৃহে সংযমে থাকা নারী! (তে নাথম্) = তোমার সন্তানলাভ, আশা ও প্রয়োজনের জন্য (অহম্) = আমি (ন অস্মি) = পূর্ণ করতে সক্ষম নই। এবং এই কারণে (তে তনূম্) = তোমার দেহের সঙ্গে আমার (তন্বঃ) = দেহের (ন সম্পপৃচ্ছ্যাম্) = সংস্পর্শ ঘটাই না। অতএব (মত্ অন্যেন) = আমার থেকে ভিন্ন অন্য পুরুষের সঙ্গে নিজের (প্রামুদঃ) = হৃদয়ের কাম্য আনন্দগুলি (কল্পয়স্ব) = উপভোগ কর। হে (সুভগে) = সৌভাগ্যবতী! তোমার আক্ষেপ অনুযায়ী এই অসক্ষম স্বামী (তে ভ্রাতা) = তোমার ভ্রাতা হোক। সে (এতৎ) = এই দেহসংস্পর্শ ইত্যাদি কাজ (ন বষ্টি) = করতে চায় না। (জয়দেবশর্মা)

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- भुरिक् त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

न वा उ॑ ते त॒नूंत॒न्वा॒ सं पि॑पृच्यां पा॒पमा॑हु॒र्यः स्वसा॑रं नि॒गच्छा॑त्। असं॑यदे॒तन्मन॑सोहृ॒दो मे॒ भ्राता॒ स्वसुः॒ शय॑ने॒ यच्छयी॑य ॥

ন বা উ তে তনুং তন্বা সং পপৃচ্যাং পাপমাহুর্যঃ স্বসারং নিগচ্ছাৎ। 

অসংযদেতন্মনসো হৃদো মে ভ্রাতা স্বসুঃ শয়নে যচ্ছয়ীয় ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৪ 

স্বররহিত পদপাঠঃ ন। বৈ। ঊঁ ইতি। তে। তনূম্। তন্বা। সম্। পপৃচ্ছ্যাম্। পাপম্। আহুঃ। যঃ। স্বসারম্। নিঃগচ্ছাত্। অসম্যত্। এতৎ। মনসঃ। হৃদঃ। মে। ভ্রাতা। স্বসুঃ। শযনে। যৎ। শযীয়॥ (স্বর সহ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
ভাষ্য়কার- ক্ষেমকরন ত্রিবেদী
পদার্থঃ (বৈ উ) কখনও (তেতনূম্) তোমার শরীরকে (তন্বা) [নিজের] শরীর দ্বারা (ন) না (সম্) একসাথে (পপৃচ্যাম্) স্পর্শ করবো, [সেই মনুষ্যকে] (পাপম্) পাপী (আহুঃ) তাঁরা [শিষ্ট লোকেরা] বলে, (যঃ) যে (স্বসারম্) বোনকে (নিগচ্ছাৎ) অধোমার্গ অবলম্বন করে প্রাপ্ত করে। (এতৎ) এই [কথা] (মে) আমার (মনসঃ) মন [সংকল্পের] এবং (হৃদঃ) হৃদয় [নিশ্চিতরূপে] (অসংয়ৎ) অসঙ্গত−(যৎ)যে (ভ্রাতা) আমি ভাই (স্বসুঃ) বোনের (শয়নে) শয্যায় (শয়ীয়) শয়ন করবো ॥১৪॥

ভাবার্থঃ ইহাও পুরুষের বচন। আমি কখনও তোমার সাথে বিবাহ করবো না। বিদ্বানগণ ভাইয়ের সাথে বোনের বিবাহ পাপ মানে এবং আমিও অন্তঃকরণ দ্বারা ইহাকে পাপ মনে করি ॥১৪॥ এই মন্ত্রের পূর্বার্দ্ধ ঋগ্বেদে আছে−১০।১০।১২ ॥

ভাষ্য়কার- বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারঃ
পদার্থঃ(বৈ উ) নিশ্চিতরূপে (তন্বা) নিজের তনূর সাথে আমি (তে তনূম্) তোমার তনূর (সং পপৃচ্যাং ন) সম্পর্ক/সংস্পর্শ করবোনা। (যঃ) যে (স্বসারম্) বোনের সাথে (নি গচ্ছাৎ) সঙ্গম করে, তাঁকে (পাপম্) পাপী ( আহুঃ) বলা হয়। (মে) আমার (মনসঃ) মনের এবং (হৃদঃ) হৃদয়ের (অসংয়ৎ)  প্রতিকূল (এতৎ) ইহা  (যৎ) যে (ভ্রাতা) ভাই হয়ে (স্বসুঃ) বোনের (শয়নে) শয্যায় (শয়ীয়) আমি শয়ন করবো॥ [অসংযৎ = সংযমরহিত।]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- आर्षी पङ्क्तिछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

ब॒तो ब॑तासि यम॒नैव ते॒ मनो॒ हृद॑यं चाविदा॒म। अ॒न्या किल॒ त्वां क॒क्ष्येव यु॒क्तं परि॑ष्वजातौ॒ लिबु॑जेव वृ॒क्षम् ॥

বতো বতাসি যম নৈব তে মনো হৃদয়ং চাবিদাম। 

তস্য বা ত্বং মন ইচ্ছা স বা তবাধা কৃণুম্ব সম্বিদং সুভদ্রাম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৫ 

ব॒তঃ । ব॒ত॒ । অ॒সি॒ । য॒ম॒ । ন । এ॒ভ । তে॒ । মন॑ঃ । হৃদ॑য়ম্ । চ॒ । অ॒বিদা॒ম॒ । অ॒ন্যা । কিল॑ । ত্বাম্ । ক॒ক্ষ্যা᳡ऽইভ । যু॒ক্তম্ । পরি॑ । স্ব॒জাতৈ॒ । লিবু॑জাঽইভ । বৃ॒ক্ষম্ ॥ (স্বরসহ পদপাঠ)

ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−

পদার্থঃ (বত) হ্যাঁ ! (যম) হে যম ! [ভাই] তুমি (বতঃ) অতি নির্বল (অসি) হও, (তে) তোমার (মনঃ) মন [সংকল্পকে] (চ) এবং (হৃদয়ম্) হৃদয় [নিশ্চয়তাকে] (এব) নিঃসন্দেহে (ন অবিদাম) আমি পাইনি। (অন্যা) অন্য স্ত্রী (কিল) অবশ্যই (ত্বাম্) তোমার সাথে (পরি ষ্বজাতৈ) আলিঙ্গন করবে, (কক্ষ্যা ইব) যেমন ঘোড়ার কটিবেষ্টনী/পেটী (যুক্তম্) যুক্ত থাকে [ঘোড়ার] সাথে এবং (লিবুজা ইব) যেমন বেল/বীরুৎ [লতা] (বৃক্ষম্) বৃক্ষের সাথে [লিপ্ত হয়ে যায়/থাকে] ॥১৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ স্ত্রী-এর বচন। ভাই ! আমি তোমাকে এত বুঝিয়েছি কিন্তু তুমি কথা মান্য করোনি, অবশ্যই আমার থেকে অন্য স্ত্রী তোমার সাথেই বিবাহ করে সুখ ভোগে করবে ॥১৫॥ মন্ত্র ১৫ এবং ১৬ কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।১০।১৩, ১৪ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (বত) হে দুর্বল! (বতঃ অসি) তুমি বস্তুতঃ দুর্বল। [বতঃ = বলাৎ অতীতঃ (নিরু০ ৬।৫।২৫)] (যম) হে যম (তে) তোমার (মনঃ) মন (চ) এবং (হৃদয়ম্) হৃদয়কে (ন অবিদাম) আমি জানতে পারিনি। (কিল) নিশ্চিতরূপে (অন্যা) অন্য কেউ আছে তোমার মন এবং হৃদয়ে, যে (ত্বাম্) তোমাকে (পরি ষ্যজাতৈ) আলিঙ্গন করবে; (ইব) যেমন (কক্ষ্যা) অশ্বের বগল অর্থাৎ ছাতিতে লিপ্ত পট্ট (যুক্তম্) রথের সাথে যুক্ত অশ্বের আলিঙ্গন করে, এবং (ইব) যেমন (লিবুজা) লতা  (বৃক্ষম্) বৃক্ষের আলিঙ্গন করে।- বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

अ॒न्यमू॒ षुय॑म्य॒न्य उ॒ त्वां परि॑ ष्वजातै॒ लिबु॑जेव वृ॒क्षम्। तस्य॑ वा॒ त्वं मन॑ इच्छा॒स वा॒ तवाधा॑ कृणुष्व संविदं॒ सुभ॑द्राम् ॥

অন্যম্ ষু যম্যন্য উ ত্বাং পরি স্বজাতৈ লিবুজেব বৃক্ষম্।

তস্য॑ বা॒ ত্বং মন॑ ইচ্ছা॒স বা॒ তবাধা॑ কৃণুষ্ব সংবিদং॒ সুভ॑দ্রাম্॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৬ 

অ॒ন্যম্ । ঊং॒ ইতি॑ । সু । য॒মি॒ । অ॒ন্যঃ । ঊং॒ ইতি॑ । ত্বাম্ । পরি॑ । স্ব॒জাতৈ॒ । লিবু॑জাঽইভ । বৃ॒ক্ষম্ । তস্য॑ । বা॒ । ত্বম্ । মন॑ঃ । ই॒চ্ছ । সঃ । বা॒ । তব॑ । অধ॑ । কৃ॒ণু॒ষ্ব॒ । স॒ম্ঽবিদ॑ম্ । সু’ভদ্রাম্ ॥ (স্বরসহ পদপাঠ)

 ভ্রাতৃভগিনীপরস্পরবিবাহনিষেধোপদেশঃ−
পদার্থঃ (যমি) হে যমী ! [বোন] তুমি (অন্যম্) অন্য পুরুষের সাথে (সু উ) উত্তমরূপে [মিলিত হও], (উ) এবং (অন্যঃ) অন্য পুরুষ (ত্বাম্) তোমার সাথে (পরি ষ্বজাতৈ) আলিঙ্গন করুক, (লিবুজা ইব) যেমন বীরুৎ [লতা] (বৃক্ষম্) বৃক্ষের সাথে। (বা) এবং (ত্বম্) তুমি (তস্য) তাঁর (মনঃ) মন (ইচ্ছ)কামনা করো, (বা) এবং (সঃ) সে (তব) তোমার [মন কামনা করুক], (অধ) তদনন্তর তুমি (সুভদ্রাম্) অত্যন্ত মঙ্গলযুক্ত (সম্বিদম্) সঙ্গতি (কৃণুষ্ব) করো॥১৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ভাবার্থঃ পুরুষের অন্তিম বচন। হে বোন ! তুমি প্রসন্ন হয়ে অন্য যোগ্য বরের সাথে বিবাহ করে নাও । তোমরা দুজন পরস্পর প্রীতি বৃদ্ধি করে আনন্দ ভোগ করো ॥১৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যমি) হে যমী ! (চ) নিশ্চিতরূপে (অন্যম্) অন্য পুরুষকে তুমি, (উ) এবং নিশ্চিতরূপে (অন্যঃ)  অন্য পুরুষ (ত্বাম্) তোমাকে (সু পরিষ্বজাতৈ) উত্তমরূপে আলিঙ্গন করবে, (ইব) যেমন  (লিবুজা) লতা  (বৃক্ষম্) বৃক্ষের আলিঙ্গন করে। (তস্য) সেই পুরুষের (মনঃ) মনকে (ত্বং বা ইচ্ছ) বা তুমি চাও/কামনা করো, (বা) বা সে (তব) তোমার মন কামনা করুক (অধা) তদনন্তর তুমি (সুভদ্রাম্) সুখদায়ী এবং কল্যাণকারী (সম্বিদম্) সহানুভূতি বা ঐকমত্য তাঁর সাথে (কৃণুষ্ব) প্রকট করো। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ত্রীণি চ্ছন্দাংসি কবয়ো বি যেতিরে পুরুরূপং দর্শতং বিশ্বচক্ষণম্। 
আপো বাতা ওষধয়স্তান্যেকস্মিন্ ভুবন আর্পিতানি॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৭ 

ত্রীণি॑ । ছন্দাং॑সি । ক॒বয়॑ঃ । বি । যে॒তি॒রে॒ । পুরুঽরূপ॑ম্ । দ॒র্শ॒তম্ । বি॒শ্বऽচ॑ক্ষণম্ । আপ॑ঃ । বাত॑াঃ । ওষ॑ধয়ঃ । তানি॑ । এক॑স্মিন্ । ভুব॑নে । আর্পি॑তানি ॥ (স্বরসহঃ পদপাঠ)

বিদ্বৎকর্মোপদেশঃ−বিদ্বানদের কর্তব্যের উপদেশ।
পদার্থঃ (কবয়ঃ) বুদ্ধিমানগণ (পুরুরূপম্) অনেক প্রকার নিরূপণ যোগ্য, (দর্শতম্) অদ্ভুত গুণবিশিষ্ট (বিশ্বচক্ষণম্) সকলের দেখার যোগ্য/সর্বদর্শনীয়, (ত্রীণি) তিন (ছন্দাংসি) আনন্দ প্রদায়ী পদার্থকে (বি) বিবিধ প্রকারে (যেতিরে) যত্নে/প্রচেষ্টায় করেছে। তা (আপঃ) জল, (বাতাঃ) পবন এবং (ওষধয়ঃ) ঔষধি-সমূহ [সোমলতা, যব, চাল প্রভৃতি], (তানি) সেই সব (একস্মিন্) এক (ভুবনে) ভুবন [সবকিছুর আধার পরমাত্মার] মধ্যে (আর্পিতানি) নিবেশিত ॥১৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ভাবার্থঃ বিদ্বানগণ অনেক প্রকার উপকারী জল, বায়ু, এবং ঔষধি-সমূহের গুণকে বিদ্বানদের প্রতি উপদেশ করে লাভ করুক এবং সেগুলোর কর্তা পরমাত্মার মহিমা জেনে উন্নতি করুক ॥১৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী 

পদার্তঃ (কবয়ঃ) মেধাবী মনুষ্য (ছন্দাংসি) আহ্লাদকারী (ত্রীণি) তিন তত্ত্বের (বি যেতিরে) বিশেষ শুদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা করে, (পুরুরূপম্) নানা রূপ পরিবর্তনকারী শরীরের, (দর্শতম) বিষয়-সমূহ দর্শনে সহায়ক ইন্দ্রিয়-সমূহের, তথা (বিশ্বচক্ষণম্) বিশ্বের এবং জগতে ব্যাপক বিশ্বনামক পরমেশ্বরের দ্রষ্টা জীবাত্মার বিশেষ শুদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা করে। সাথে জীবনের সাধনভূত (আপঃ, বাতাঃ, ঔষধয়ঃ) জল, বায়ু, অন্ন তথা স্বাস্থ্যবর্ধক ঔষধি-সমূহেরও বিশেষশুদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা করে। (তানি) সেই তত্ত্ব পরমেশ্বর (ভুবনে)  এই ভূমিতে (অর্পিতানি) অর্পিত করেছেন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ভাবার্থঃ [অর্থাৎ এই পৃথিবীতেই মানুষ, জীবন, এবং সেই জীবনের জন্য জল আদি সাধন প্রদান করেছেন। বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত পৌঁছোতে-পৌঁছোতে নবোৎপন্ন বালকের শরীরের নানা রূপ বদলাতে/পরিবর্তন হতে থাকে। এইজন্য এই শরীরকে "পুরুরূপম্" বলা হয়েছে। "দর্শতঃ" এর অভিপ্রায় হল- "ইন্দ্রিয়সমূহ"; পশ্যতি যেন স দর্শতঃ (উণা০ ৩।১১০) দয়ানন্দভাষ্য। বিশ্বচক্ষণম্ = জীবাত্মা যা বিশ্বকে দেখে। বিশ্ব-এর অর্থ পরমেশ্বরও হয় (সত্যার্থ প্রকাশ, প্রথম সমুল্লাস)। সংসারকে বা পরমেশ্বরকে দেখার যোগ্যতা জীবাত্মার মধ্যেই আছে/রয়েছে। ছন্দাংসি = চদি আহ্লাদনে (উণা০ ৪।২২০)। যেতিরে = যত উপস্কারে; যত্নে।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त
বৃষা॒ বৃষ্ণে॑দুদুহে॒ দোহ॑সা । দি॒বঃ পযাং॑সি য॒হ্বো অদি॑তের দা॑ভ্যঃ ।

বিশ্বং॒ স বেএ॑দ॒ বরু॑ণো॒ যথা॑ ধি॒য়া স য॒জ্ঞিয়ো॑ যজতি য॒জ্ঞিয়া॑ঁ ঋ॒তূন্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৮ 

বৃষা॑ । বৃষ্ণে॑ । দু॒দু॒হে॒ । দোহ॑সা । দি॒বঃ । পযাং॑সি । য॒হ্বঃ । অদি॑তে । আদি॑ভ্যঃ । বিশ্ব॑ম্ । সঃ । বে॒দ॒ । বরু॑ণঃ । যথা॑ । ধি॒য়া । সঃ । য॒জ্ঞিয়॑ঃ । য॒জতি॒ । য॒জ্ঞিয়াঃন্ । ঋ॒তূন্ ॥

বিদ্বানদের কর্তব্যের উপদেশ।

ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (যহ্বঃ) মহান্, (অদাভ্যঃ) অহিংসিত (বৃষা) বৃহৎ ঐশ্বর্যবান পরমাত্মা (বৃষ্ণে) পরাক্রমী মনুষ্যের জন্য (দিবঃ) আনন্দ প্রদায়ী (অদিতেঃ) অখণ্ড বেদবাণীর (দোহসা) পূর্ণতাপূর্বক (পয়াংসি) অনেক রস দ্বারা (দুদুহে) ভরপূর করেছেন। (বরুণঃ যথা) শ্রেষ্ঠ পুরুষের সমান (সঃ) সেই [মনুষ্য] (বিশ্বম্) সংসারকে (ধিয়া) [নিজের] বুদ্ধি দ্বারা (বেদ) জানে এবং (সঃ) সে (যজ্ঞিয়ঃ) পূজনীয় হয়ে (যজ্ঞিয়ান্) পূজনীয় (ঋতূন্) ঋতু-সমূহকে [উচিতকাল/সময়ে] (যজতি) পূজা করে ॥১৮॥

ভাবার্থঃ পরমাত্মা বেদ দ্বারা পুরুষার্থীর জন্য সংসারে অনেক ঐশ্বর্যের উপদেশ দিয়েছেন। সেই জ্ঞানী পুরুষ শ্রেষ্ঠদের সমান আচরণ করে উচিত সময় ত্যাগ না করে সংসারের উপকার করে॥১৮॥মন্ত্র ১৮-২৪ কিছুটা ভেদ বা অভেদপূর্বক ঋগ্বেদে আছে−১০।১১।১-৭ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী 

পদার্থঃ বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার (বৃষা) ভক্তিরসের বর্ষণকারী (অদাভ্যঃ) কামাদি দ্বারা না দমনশীল, (যহ্বঃ) মহা ব্যক্তি, (দোহসা) দোহনবিধি দ্বারা, (অদিতেঃ) অনশ্বর বেদবাণীরূপী গৌ/গাভী থেকে (দিবঃ পয়াংসি) দিব্য জ্ঞান-দুগ্ধ (দুদুহে) দোহন করে। এবং সেই জ্ঞান-দুগ্ধ (বৃষ্ণে) আনন্দরসবর্ষী পরমেশ্বরের জন্য সমর্পিত করে দেয়। (যথা) যেমন (বরুণঃ) বরণকারী শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর (বিশ্বম্) জগতের রহস্যকে (বেদ) জানে, তেমনই (সঃ) সেই ভক্তিরসবর্ষীও (ধিয়া) বৈদিক প্রজ্ঞা প্রাপ্ত করে (বিশ্ব বেদ) জগতের রহস্য-সমূহকে জেনে নেয়। (সঃ) সেই ভক্তিরসবর্ষী (যজ্ঞিয়ঃ) পূজা সৎসঙ্গ তথা দানের পাত্র হয়ে, (ঋতূন) সব ঋতুতে (যজ্ঞিয়ান্) যজ্ঞিয়-বিচার এবং যছ্যিয়-কর্ম (যজতি) যজ্ঞভাবনাপূর্বক করতে থাকে।

টিপ্পণীঃ [অদিতি = বাক্ (নিঘং০ ১।১১) তথা গৌ (নিঘং০ ২।১১)। যহ্বঃ= মহন্নাম (নিঘং০ ৩।৩)। যজ্ঞিয়ঃ = যজ দেবপূজাসঙ্গতিকরণদানেষু। ঋতূম্ = ঋতূন্ লক্ষ্যীকৃত্য।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

বিদ্বানদের কর্তব্যের উপদেশ।

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

রপদ গন্ধবীরপ্যা চ যোষণা নদস্য নাদে পরি পাতু নো মনঃ।

ইষ্টস্য মধ্যে অদিতিনি ধাতু নো ভ্রাতা নো জ্যেষ্ঠঃ প্রথমো বি বোচতি ॥ অথর্ব০ ১৮।১।১৯ 

রপ॑ত্ । গ॒ন্ধ॒র্বীঃ । অপ্যা॑ । চ॒ । যোষা॑ণা । ন॒দস্য॑ । না॒দে । পরি॑ । পা॒তু॒ । নঃ । মন॑ঃ । ই॒ষ্টস্য॑ । মধ্যেঃ । অদি॑তিঃ । নিঃ ধা॒তু॒ । নঃ । ভ্রাতা॑ । নঃ । জ্যে॒ষ্ঠঃ । প্র॒থ॒মঃ । বি । বো॒চ॒তি॒ ॥

ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (গন্ধর্বীঃ) বিদ্বানদের ধারণকারী, (অপ্যা) সৎকর্মে প্রসিদ্ধ (চ) এবং (যোষণা) সেবন যোগ্য [বেদবাণী] (রপৎ) স্পষ্ট বলে− সেই [বেদবাণী] (নদস্য) স্তোতা [গুণজ্ঞ] পুরুষের (নাদে) সৎকারে (নঃ) আমাদের (মনঃ) মন [বা বিজ্ঞানের] (পরি) সবদিক থেকে (পাতু) রক্ষা করে। (অদিতিঃ) অখণ্ড বেদবাণী (ইষ্টস্য) অভীষ্ট সুখের (মধ্যে) মধ্যে (নঃ) আমাদের (নি) নিত্য (ধাতু) রাখুক/স্থাপন করুক, (ভ্রাতা) ভাই [এর সমান হিতকারী] (জ্যেষ্ঠঃ) অতিশ্রেষ্ঠ, (প্রথমঃ) মুখ্য পুরুষ (নঃ) আমাদের (বি) অনেক প্রকার (বোচতি) উপদেশ করে/করুক ॥১৯॥

ভাবার্থঃ বেদবাণী আমাদের উপদেশ করে, মনুষ্য গুণ-সমূহের জ্ঞানের মাধ্যমে নিজের রক্ষা করে এবং অভীষ্ট সুখ প্রাপ্ত করে, শ্রেষ্ঠ বিদ্বান্ পরস্পর এই উপদেশ করে ॥১৯॥

বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার পদার্থঃ (গন্ধর্বী) বেদবাণীর ধারক পরমেশ্বরের বেদবাণী (রপদ্= রপৎ) আমাদের জীবনীয় তত্ত্ব-সমূহের কথন করে, যেমন (অপ্যা) প্রাণপ্রিয়া বা জলবৎ শীতলস্বভাবযুক্ত (যোষণা) পত্নী নিজের পতিকে পরামর্শের কথন করে। (নদস্য) বেদের অন্তর্নাদকারী পরমেশ্বরের বৈদিক অন্তর্নাদ হলে সেই পরমেশ্বর (নঃ) আমাদের (মনঃ) মননশক্তির (পরি পাতু) সব প্রকারে রক্ষা করেন। (ইষ্টস্য মধ্যে) জীবনে বস্তুতঃ অভীষ্ট মার্গ কী, ইহার নির্ণয়ে (অদিতিঃ) অনশ্বর নিত্যা বেদবাণী (নঃ) আমাদের (নি ধাতু) যথার্থ মার্গে স্থাপিত করে। তদনন্তর (ভ্রাতা) সব, সকলের ভরণ-পোষণকারী (প্রথমঃ জ্যেষ্ঠঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর (নঃ) আমাদের (বি বোচতি) বিশেষভাবে জীবনমার্গের উপদেশ করে।

টিপ্পণীঃ বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারঃ[গন্ধর্বঃ= গাং বেদবাণীং ধরতি = পরমেশ্বরঃ; তস্য বাণী গন্ধর্বী। গান্ধর্বী = বাক্ (নিঘং০ ১।১১), হ্রস্বঃ ছান্দসঃ। অপ্যা= আপঃ প্রাণাঃ, তৎ-প্রিয়া। অদিতিঃ = (মন্ত্র ১৮)। চ= পাদপূরণার্থঃ (আপ্টে)।]

বিদ্বৎকর্মোপদেশঃ−

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

সো চিন্নু ভদ্রা ক্ষুমতী যশস্বত্যুষা উবাস মনবে স্বর্বর্তী। 

যদীমুশন্তমুশতামনু ক্রতুমগ্নিং হোতারং বিদথায় জীজনম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

সো ইতি॑ । চি॒ত্ । নু । ভ॒দ্রা । ক্ষু॒ऽমতী॑ । যশ॑স্বতী । উ॒ষাঃ । উ॒বা॒স॒ । মন॑বে । স্ব᳡ঃऽবতী । যত্ । ঈ॒ম্ । উ॒শন্ত॑ম্ । উ॒শ॒তম্ । অনু॑ । ঋতু॑ম্ । অ॒গ্নিম্ । হোতা॑রম্ । বি॒দথা॑য় । জীজ॑নন্ ॥

বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার পদার্থঃ (সো) সেই/তা (চিৎ) নিশ্চিতরূপে (নু) এখন (ভদ্রা) কল্যাণী,  (ক্ষুমতী) অন্নবতী, (যশস্বতী) যশমতী, (স্বর্বতী) সুখময় [বেদবাণী], (উষাঃ) ঊষা [প্রভাতবেলার সমান], (মনবে) মনুষ্যের জন্য (উবাস) প্রকাশমান হয়েছে। (যৎ) কেননা (ঈম্) এই [বেদবাণীর] (উশন্তম্) অভিলাষী, (হোতারম্) দানী (অগ্নিম্) বিদ্বান্ পুরুষকে (উশতাম্) অভিলাষী পুরুষদের (ক্রতুম্ অনু) বুদ্ধিপূর্বক/বুদ্ধির সাথে (বিদথায়) জ্ঞান সমাজের জন্য (জীজনন্) তাঁরা [বিদ্বানগণ] উৎপন্ন করেছে ॥২০॥

পরমাত্মা মনুষ্যের কল্যাণের জন্য বেদবাণীকে সূর্যের প্রকাশ/আলোর সমান সংসারে প্রকট করেছেন। যে মনুষ্য বেদজ্ঞাতা মহাবিদ্বান্ হয়, বিদ্বানগণ তাঁকে মুখ্য/প্রধান করে সমাজের সুখ বৃদ্ধি করুক ॥২০॥

বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারঃ পদার্থঃ (চিৎ) জ্ঞানময়ী, (ক্ষুমতী) মন্ত্র-শব্দযুক্ত, (ভদ্রা) কল্যাণকারিণী,   (উশস্বতী) সকলের কল্যাণ কামনাকারী (সা) সেই অদিতি (১৯) (নু) নিশ্চিতরূপে, এবং (উ) অবশ্যই,   (মনবে) মনুষ্যমাত্রের জন্য (উবাস) অজ্ঞানান্ধকার দূর করে। যেমন (স্বর্বতী) দ্যুলোকে থাকা (উষা) প্রাতঃকালীন ঊষা, মনুষ্যমাত্রের জন্য, রাত্রীর অন্ধকার দূর করে, (যদ্) যদ্যপি  (উশতাম্) পরমেশ্বরের কামনাকারীর (ক্রতুম্) সঙ্কল্প ও কর্মের (অনু) অনুসারে, তাঁদের (উশন্তম) কাম্য, (হোতারম্) শক্তিপ্রদাতা (ঈম অগ্নিম্) এই জ্যোতির্ময় প্রভুর কামনাকারী উপাসক, – (বিদথায়) সাক্ষাৎকারের জন্য (জীজনন্) প্রকট করে নেয়।

বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারঃ [অদিতি = অনশ্বর নিত্যা বেদবাণী। অভিপ্রায় হল, উপাসক যখন পরমেশ্বরের সাক্ষাৎকার করে নেয়, তখন জ্ঞানময়ী-প্রভুবাণী তাঁর অজ্ঞানান্ধকার বিনষ্ট করে দেন। অর্থাৎ যতক্ষণ পরমেশ্বরের সাক্ষাৎকার না হয়, ততক্ষনে পর্যন্ত বৈদিক রহস্য সে দর্শন করতে পারে না। "বেদ" শব্দের অর্থ হল "জ্ঞান"। এই ভাবকে "চিৎ" দ্বারা স্পষ্ট করা হয়েছে। উবাস= (বস্ অপহরণে, চুরাদি)।]

বিদ্বৎকর্মোপদেশঃ−

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

অধ॒ ত্যন্দ্র॒প্সং বি॒ভ্বং বি॒চক্ষ॒ণং বি॒রাভ॑রদি॒ষিরঃ শ্যে॒নো অ॑ধ্ব॒রে।
যদী॒ বিশো॑বৃ॒ণতে॑ দ॒স্মমার্যা॑ অ॒গ্নিং হোতা॑রমধ॒ ধীর॑জায়ত ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২১

অধ॑ । ত্যম্ । দ্র॒প্সম্ । বি॒ऽভ্ব᳡ম্ । বি॒ऽচ॒ক্ষ॒ণম্ । বি: । আ । অ॒ভ॒রত্ । ই॒ষি॒রঃ । শ্যে॒নঃ । অ॒ধ্ব॒রে । যদি॑ । বিশ॑ঃ । বৃ॒ণতে॑ । দ॒স্মম্ । আর্যা॑ঃ । অ॒গ্নিম্ । হোতা॑রম্ । অধ॑ । ধীঃ । অ॒জা॒য়॒ত॒ ॥১.২১

পদার্থঃ (অধ) এবং (ত্যম্) সেই (দ্রপ্সম্) হর্ষ প্রদায়ী, (বিভ্বম্) বলশালী (বিচক্ষণম্) চতুর [বিদ্বান্] পুরুষকে (শ্যেনঃ) শ্যেন [বাজ] (বিঃ) পক্ষীর [সমান] (ইষিরঃ) শীঘ্রগামী [আচার্য আদি] (অধ্বরে) যজ্ঞে (আ অভরৎ) নিয়ে এসেছে। (যদি) যদি (আর্যাঃ) আর্য [শ্রেষ্ঠ] (বিশঃ) মনুষ্য (দস্মম্) দর্শনীয়, (হোতারম্) দানী (অগ্নিম্) বিদ্বান্ পুরুষকে (বৃণতে) নির্বাচন/বরণ করে, (অধ) তবে (ধীঃ) তা কর্ম (অজায়ত) হয়ে যাবে/যাক ॥২১॥ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ভাবার্থঃ যে বিদ্বান্ দূরদর্শী বিদ্বানকে উত্তম গুণের কারণে বিদ্বান্ আচার্য আদি প্রসিদ্ধ করে, তাঁকে শ্রেষ্ঠরা প্রধান করে কার্য সিদ্ধ করুক ॥২১॥ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যদ্ ঈ) যখনই (আর্যাঃ) ঈশ্বরের পুত্র, অর্থাৎ ঈশ্বরকে নিজের পিতা মান্যকারী (বিশঃ) প্রজাজন,– (দস্মম্) অবিদ্যাক্ষয়কারী তথা দর্শনীয়, (হোতারম্) জ্ঞানপ্রদাতা (অগ্নিম্) জ্ঞানময় প্রভুকে (বৃণতে) আপন করে নেয়, (অধ) তদনন্তর (ধীঃ) ঋতম্ভরা-প্রজ্ঞা (অজায়ত) প্রকট হয়, (অধ) তদনন্তর (ইষিরঃ) ঈশ্বরের কামনাকারী (শ্যেনঃ) জ্ঞানী (বিঃ) জীবাত্ম-পক্ষী (অধ্বরে) হিংসারহিত যোগধ্যানরূপী যজ্ঞে (দ্রপ্সম্) সূর্যসম, অজ্ঞানান্ধকার বিনাশী (বিভ্বম্) বিভু, (বিচক্ষণম্) বিবিধ জগতের দ্রষ্টা, (ত্যম্) সেই জ্যোতির্ময় ঈশ্বরকে (আ ভরৎ) নিজের দিকে/প্রতি আকৃষ্ট করে নেয়। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ভাবার্থঃ [দ্রপ্স = সূর্য; দৃ বিদারণে; প্সা= ভক্ষণে; অন্ধকার বিদীর্ণকারী/বিদারক, অন্ধকার গ্রাসকারী। “অসৌ বা আদিত্যো দ্রপ্সঃ (শ০ ৭।৪।১।২০) বিঃ= জীবাত্মা, যথা- "দ্বা সুপর্ণা সয়ুজা সখায়া" (অথর্ব০ ৯।৯।২০) সুপর্ণ= পক্ষী। আভরৎ = আহরৎ। ইষিরঃ= ইষু ইচ্ছায়াম্। শ্যেনঃ= শ্যেন আত্মা ভবতি, শ্যায়তেঃ জ্ঞানকর্মণঃ (নিরু০ ১৩(১৪), পা০ ২(১) খং০ ৭২ (১৪)। আর্যাঃ= ঈশ্বরপুত্রাঃ (নিরু০ ৬।৫।২৬)। দস্ম = দস্ উপক্ষয়ে; দস (দর্শনে)। বিশ্বঃ= বিশতি সর্বত্র সঃ (উণা০ ১।১৫১)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালংকারঃ

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

সদাসি রম্বো যবসেব পুষ্যতে হোত্রাভিরগ্নে মনুষঃ স্বধ্বরঃ।

বিপ্রস্য বা যচ্ছশমান উত্থ্যো বাজং সসবাঁ উপযাসি ভূরিভিঃ ৷ অথর্ব০ ১৮।১।২২

সদা॑ । অ॒সি॒ । র॒ণ্বঃ । যব॑সাঽইব । পুষ্য॑তে । হোত্রা॑ভিঃ । অ॒গ্নে॒ । মনু॑ষঃ । সু॒ऽঅ॒ধ্ব॒রঃ । বিপ্র॑স্য । বা॒ । যত্ । শ॒শ॒মা॒নঃ । উ॒ক্থ্য᳡ঃ । বাজ॑ম্ । স॒স॒ऽবান্ । উ॒প॒ऽযাসি॑ । ভূরি॑ऽভিঃ ॥ 

পদার্থঃ (অগ্নে) হে বিদ্বান্ ! (স্বধ্বরঃ) সুন্দর যজ্ঞশীল হয়ে (মনুষঃ) জ্ঞানের (হোত্রাভিঃ) বাণী-সমূহের দ্বারা (পুষ্যতে) পুষ্টকারী [মনুষ্যের] জন্য (যবসা ইব) যেমন ঘাস [গাভী আদির জন্য] (সদা) সদা তুমি (রণ্বঃ) রমণীয় [সুখদায়ক] (অসি) হও। (বা) এবং (যৎ) যেহেতু (বিপ্রস্য) বিদ্বান্ [আচার্য আদির] (বাজম্) বিজ্ঞান (সসবান্) সেবনকারী হয়ে, (শশমানঃ) শীঘ্রগামী, (ভূরিভিঃ) অনেক [উত্তম পুরুষের] দ্বারা (উক্থ্যঃ) স্তুতিযোগ্য তুমি (উপয়াসি) আগমন করো ॥২২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বিদ্বানদের উচিৎ, জ্ঞানদাতা আচার্যদের নিজের সৎকর্ম দ্বারা সদা প্রসন্ন রাখা, কেননা সেই মহাত্মাদের কৃপায় সে বিজ্ঞান প্রাপ্ত করে সংসারে বিখ্যাত হয়েছে॥২২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অগ্নে) হে জ্যোতির্ময়! (মনুষঃ) মননাভ্যাসীর (হোত্রাভিঃ) আত্মসমর্পণের আহুতি দ্বারা (স্বধ্বরঃ) আপনি তাঁর অহিংসাময়-উপাসনা যজ্ঞ সফল তথা সুফল করেন/করে দেন, এইজন্য তাঁকে আপনি/তাঁর প্রতি আপনি (সদা রণ্বঃ অসি) সদা রমণীয় প্রতীত হন, (ইব) যেমন (পুষ্যতে) শারীরিক পুষ্টিকারীর জন্য (যবসা) খাদ্য পদার্থ রমণীয় প্রতীত হয়। (বা) তথা (উক্থ্যঃ) বৈদিক সূত্র দ্বারা প্রশংসনীয় আপনি, (যত) যখন (বিপ্রস্য) মেধাবী উপাসকের (বাজম্) সমর্পণকে (সসবান্) স্বীকার করেন, তখন আপনি (শশমানঃ) মানো প্লুতগতিমান হয়ে, মেধাবী উপাসককে (ভূরিভিঃ) নানাবিধ এবং প্রভূত সম্পত্তি সহিত (উপয়াসি) প্রাপ্ত হন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

টিপ্পণীঃ [শশমানঃ= শশ প্লুতগতৌ। সসবান্ = সন্ সম্ভক্তৌ। সম্ভক্তি=sharing in (আপ্টে)।]

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- जगतीछन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

উদীরয় পিতরা জার আ ভগমিয়ক্ষতি হর্ষতো হৃত্ত ইষ্যতি।

বিবক্তি বহ্নিঃ স্বপস্যতে মখস্তবিষ্যতে অসুরো বেপতে মতী ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২৩ 

উত্ । ঈ॒র॒য়॒ । পি॒তারা॑ । জারঃ । আ । ভগ॑ম্ । ইয়॑ক্ষতি । হ॒র্য॒তঃ । হৃ॒ত্তঃ । ই॒ষ্য॒তি॒ । বিব॑ক্তি । বহ্নি॑ঃ । সু॒ऽঅ॒প॒স্যতে॑ । ম॒খঃ । ত॒বি॒ষ্যতে॑ । অসু॑রঃ । বেপ॑তে । ম॒তী ॥

পদার্থঃ [হে বিদ্বান্ !] (জারঃআ) স্তোতা [গুণজ্ঞ পুরুষের] সমান (পিতরা) মাতা-পিতাকে (ভগম্) ঐশ্বর্যের দিকে (উৎ ঈরয়) উদ্বুদ্ধ করো, [কেননা] (হর্যতঃ) [শুভগুণ] কামনাকারী (হৃত্তঃ) হৃদয় থেকে (ইয়ক্ষতি) [তাঁদের] পূজা করতে চায় এবং (ইষ্যতি) চলে। (বহ্নিঃ) ভার বহনকারী (বিবক্তি) বলে/কথন করে, (মখঃ) উদ্যোগী (স্বপস্যতে) সৎকর্ম করতে চায় এবং (অসুরঃ) প্রাণবান্ [বলবান্] (তবিষ্যতে) মহান্ হতে চায়, এবং (মতী) বুদ্ধিপূর্বক (বেপতে) চেষ্টা করে॥২৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বিদ্বান্ কৃতজ্ঞ পুরুষ ধন আদি দ্বারা মাতা-পিতার সেবা করে/করুক, কেননা বৃদ্ধদের সেবার মাধ্যমে মনুষ্য পুরুষার্থী হয়ে জগতে বড়ো/মহান হয়॥২৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পরমেশ্বর ! (পিতরা) জগতের মাতাদের এবং পিতাদের ধর্মকার্যে (উদীরয়) সমুন্নত করুন, (আ) যেমন (জারঃ) স্তোতা (ভগম্) নিজ ভাগ্যকে সমুন্নত করে, বা (জারঃ) আদিত্য যেমন (ভগম্) জগতে শ্রী শোভাকে সমুন্নত করে। (হর্যতঃ) আপনার কামনাকারী (ইয়ক্ষতি) আপনার দর্শনের কামনা করে, (হৃত্তঃ) হৃদয় থেকে (ইষ্যতি) ইচ্ছা/কামনা করে। (বহ্নিঃ) আপনার সদুপদেশ বহনকারী (বিবক্তি) বিবেকজ্ঞানের উপদেশ করে/দেয়, (স্বপস্যতে) প্রজাদের কর্মকে উত্তম করে (মখঃ) এবং তাঁর দ্বারা যজ্ঞকর্ম (তবিষ্যতে) বিস্তার করা হয়। কিন্তু (অসুরঃ) আসুরী-প্রবৃত্তিযুক্ত ব্যক্তি (মতী) নিজ দুর্মতির কারণে (বেপতে) ভয়ভীত হয়ে কাঁপতে থাকে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[জারঃ= জরতি অর্চতিকর্মা; জরিতা স্তোতা (নিঘং০ ৩।১৪; ৩।১৬)। জারঃ = আদিত্যঃ (নিরু০ ৩।৩।১৬)। স্বপস্যতে = সু + অপঃ= কর্ম (নিঘং০ ২।১)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

যস্তে অগ্নে সুমতিং মর্তো অখ্যৎ সহসঃ সূনো অতি স প্র শৃপ্নে।

ইষং দধানো বহমানো অশ্বৈরা স দ্যুমাঁ। অমবান্ ভূষতি দ্যূন্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

যঃ । তে॒ । অ॒গ্নে॒ । সু॒ऽম॒তিম্ । মর্ত॑ঃ । অখ্য॑ত্ । সহ॑সঃ । সূ॒নো॒ ইতি॑ । অতি॑ । সঃ । প্র । শৃ॒ণ্বে॒ । ইষ॑ম্ । দধা॑নঃ । বহ॑মানঃ । অশ্বৈ॑ঃ । আ । সঃ । দ্যু॒ऽমান্ । অম॑ऽবান্ । ভূ॒ষ॒তি॒ । দ্যূন্ ॥

পদার্থঃ (অগ্নে) হে বিদ্বান্ ! (যঃ মর্তঃ) যে মনুষ্য (তে) তোমার (সুমতিম্) সুমতি (অখ্যৎ) কথন/ব্যাখা করে, (সহসঃসূনো) হে বলবান্ পুরুষের পুত্র ! (সঃ) সে (অতি) অতি (প্র) ব্যপকভাবে (শৃণ্বে) শ্রবণিত হয় [যশস্বী হয়]। এবং (সঃ) সে (ইষম্) অন্ন (দধানঃ) রক্ষণ/ধারণ করে, (অশ্বৈঃ) অশ্বদের দ্বারা (বহমানঃ) বাহিত/পরিবাহিত হয়ে, (দ্যুমান্) প্রকাশমান এবং (অমবান্) পরাক্রমী হয়ে (দ্যূন্) দিনকে (আ) সব প্রকারে (ভূষতি) অলঙ্কৃত করে ॥২৪॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যে মনুষ্য কুলীন বলশালী বিদ্বানদের সুমতিতে চলে, সে যশস্বী, ধনী এবং পরাক্রমী হয়ে সংসারের উপকার করে॥২৪॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অগ্নে) হে জ্যোতির্ময় ! (সহসঃ সূনো) হে বল প্রেরক ! (যঃ) যে (মর্তঃ) মনুষ্য (তে) আপনার দ্বারা প্রদত্ত (সুমতিম্) সুমতির (অখ্যৎ) সকলের প্রতি কথন/বর্ণনা করে, (সঃ) সে (অতি প্র শৃণ্বে) অতি প্রসিদ্ধ হয়/হয়ে যায়, বা লোকেরা অনেক শ্রদ্ধাপূর্বক তাঁর কথন শ্রবণ করে। (ইষম্) আপনার ইচ্ছা/কামনা (দধানঃ) ধারণ করে, (অশ্বৈঃ) অশ্ব দ্বারা/সহিত যুক্ত রথ দ্বারা এই [উপাসক/স্তোতাকে] সৎকারপূর্বক (বহমানঃ) নিয়ে আসা হয়। (দ্যুমান্) শোভায়মান, (অমবান্) তথা বলসম্পন্ন (সঃ) সেই [স্তোতা/উপাসক] (দ্যুন্) দিনকে (আভূষতি) বিভূষিত করে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[অমম্ = বলম্ (নিরু০ ১০।২।২১)। অখ্যৎ= খ্যা প্রকথনে। সহস=বল (নিঘং০ ২।৯)। সূনো = সূ প্রেরণে]  

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

শ্রুধী নো অগ্নে সদনে সধস্থে যুক্ষ্ণা রথমমৃতস্য দ্রবিভুম্।

আনো বহ রোদসী দেবপুত্রে মাকিদেবানামপ ভূরিহ স্যাঃ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

শ্রু॒ধি । ন॒ঃ । অ॒গ্নে॒ । সদ॑নে । স॒ধऽস্থে॑ । যু॒ক্ষ্ব । রথ॑ম্ । অ॒মৃত॑স্য । দ্র॒বি॒ত্নুম্ । আ । ন॒ঃ । ব॒হ॒ । রোদ॑সী॒ ইতি॑ । দে॒বপু॑ত্রে॒ ইতি॑ । দে॒বऽপু॑ত্রে । মাকি॑ঃ । দে॒বানাম্ । অপ॑ । ভূ॒ঃ । ই॒হ । স্যা॒ঃ ॥১.২৫॥

পদার্থঃ (অগ্নে) হে বিদ্বান্ ! (সধস্থে) একসাথে বসার/অবস্থানের যোগ্য (সদনে) বৈঠক [সমাজে] (নঃ) আমাদের [কথা] (শ্রুধি) শ্রবণ করো−(অমৃতস্য) অমৃত [অমরত্ব, পুরুষার্থের] (দ্রবিত্নুম্) বেগবান/শীঘ্রগামী (রথম্) রথকে (যুক্ষ্ব) যুক্ত করো। (নঃ) আমাদের জন্য (রোদসী) ভূমি এবং সূর্যের [সমান উপকারী] (দেবপুত্রে) বিদ্বানদের পুত্র রক্ষণকারী [প্রজা অর্থাৎ মাতা-পিতাকে] (আবহ) নিয়ে এসো, (দেবানাম্) বিদ্বানদের মাঝে (মাকিঃ) না কখনও (অপ ভূঃ) তুমি দূরে/অপগত হও, (ইহ) এখানে [আমাদের মাঝে] (স্যাঃ) থাকো ॥২৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বিদ্বানগণ সভার মাঝে অধিক বিদ্বান্ পুরুষকে প্রধান করে ব্যবস্থা করুক যাতে সব মাতা-পিতা বিজ্ঞানপূর্বক উত্তম সন্তান উৎপন্ন করে সংসারের উপকার করে এবং বিদ্বানদের সাথে আদরপূর্বক মিলিত হয় ॥২৫॥এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−১০।১১।৯ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অগ্নে) হে জ্যোতির্ময় ! (সধস্থে) জীবাত্মার সাথে একসাথে/মিলিতভাবে বসার/অবস্থানের (সদনে) ঘরে, অর্থাত হৃদয়ে, আপনি (নঃ) আমাদের স্তুতি এবং প্রার্থনা (শ্রুধি) শ্রবণ করুন। (অমৃতস্য) মোক্ষ পর্যন্ত প্রেরণকারী/প্রেরক (রথম্) আমাদের শরীর রথকে (যুঙক্ষ্ব) যুক্ত করুন, ইহাকে আপনিই চালনা করুন। এবং ইহাকে (দ্রবিত্নুম্) মোক্ষরূপী লক্ষ্য পর্যন্ত প্রেরণের/পৌঁছানোর ক্ষেত্রে/জন্য শীঘ্রগতিসম্পন্ন করুন। (দেবপুত্রে) আপনার/দেবতার পুত্ররূপ যে (রোদসী) ভূলোক ও দ্যূলোক আছে, তা আমাদের উদ্দেশ্যে, (নঃ) আমাদের (আ বহ) অনুকূলে করুন। (দেবানাম্) আমাদের দিব্য উপাসকদের মধ্যে আপনি সদা বিরাজমান থাকুন, (মাকিঃ অপ ভূঃ) কখনও আমাদের থেকে দূরে যাবেন না। (ইহ) আমাদের দিব্য উপাসকদের এই হৃদয়ে (স্যাঃ) সদা স্থিত থাকুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

যদগ্ন এষা সমিতির্ভবাতি দেবী দেবেষু যজতা যজত্র। 

রত্না চ যদ বিভজাসি স্বধাবো ভাগং নো অত্র বসুমন্তং বীতাৎ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

যৎ । অ॒গ্নে॒ । এ॒ষা । সম্ঽই॑তিঃ । ভবা॑তি । দে॒বী । দে॒বেষু॑ । য॒জ॒তা । য॒জ॒ত্র॒ । রত্না॑ । চ॒ । যৎ । বি॒ऽভজা॑সি । স্ব॒ধা॒ऽব॒ঃ । ভা॒গম্ । ন॒ঃ । অব॑ । অত্র॑ । বসু॑ऽমন্তম্ । বী॒তা॒ৎ ॥১ 

পদার্থঃ (যজত্র) হে সঙ্গতিযোগ্য ! (অগ্নে) হে বিদ্বান্ ! (যৎ) যখন (এষা) এই (সমিতিঃ) সমিতি [সভা] (দেবেষু) বিদ্বানদের মাঝে (দেবী) বিজ্ঞানবতী এবং (যজতা) সঙ্গতিযোগ্য (ভবাতি) হয়/হবে। (চ) এবং (যৎ) যখন, (স্বধাবঃ) হে আত্মধারী ! তুমি (রত্না) রত্ন-সমূহকে (বিভজাসি) বিভাজন/বিভাগ/বণ্টন করবে, (নঃ) আমাদের জন্য (অত্র) এখানে [সংসারে] (বসুমন্তম্) বহুধন যুক্ত (ভাগম্) ভাগ (বীতাৎ) প্রেরণ করো ॥২৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

মনুষ্যদের উচিৎ, বিদ্বানদের সৎসঙ্গ দ্বারা সার্বভৌম বিদ্যাসভা সৃষ্টি করে বিজ্ঞানের প্রচার করা যাতে লোকেরা গুণী হয়ে ধনী হয় ॥২৬॥ এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−১০।১১।৮ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অগ্নে) হে জ্যোতির্ময়! (দেবেষু) আমাদের দিব্য উপাসকদের মধ্যে আপনার (যদ্) যে (এষা) এই (দেবী) দিব্য (সমিতিঃ) পারস্পরিক মেল (ভবাতি) হয়, - (যজত্র) হে পারস্পরিক মেল স্থাপনকারী ! (যজতা) সেই পারস্পরিক মেল/মিলতভাবকে আপনিই স্বয়ং করেন। (স্বধাবঃ) হে স্বয়ং নিজের ধারণকারী স্বয়ম্ভূ ! (যদ) যে (রত্না) আধ্যাত্মিক রত্ন (বিভজাসি) আপনি আমাদের প্রদান করেন, (অত্র) এই জীবনে (নঃ) আমাদের সেই (বসুমন্তং ভাগম্) রত্নযুক্ত ভাগ/অংশকে (বীতাৎ) কৃপা করে সমর্পণরূপে স্বীকার করুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[সমিতিঃ = সম্ + ইতিঃ। যজতা= যজ্= সঙ্গতি, পরস্পর-মেল; যজ্ + অতচ্ (উণা০ ৩।১১০)। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

পরমাত্মগুণোপদেশঃ−

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

অন্বগ্নিরুষসামগ্রমখ্যদন্বহানি প্রথমো জাতবেদাঃ। 

অনু সূর্য উষসো অনু রশ্মীননু দ্যাবাপৃথিবী আ বিবেশ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

অনু॑ । অ॒গ্নিঃ । উ॒ষসা॑ম্ । অগ্র॑ম্ । অ॒খ্য॒ত্ । অনু॑ । অহা॑নি । প্র॒থ॒মঃ । জা॒তऽবে॑দাঃ । অনু॑ । সূর্য॑ঃ । উ॒ষস॑ঃ । অনু॑ । র॒শ্মীन् । অনু॑ । দ্যাবা॑পৃথি॒বী ইতি॑ । আ । বি॒বে॒শ॒ ॥

 ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (অগ্নিঃ) সর্বব্যাপক পরমেশ্বর (উষসাম্) ঊষার (অগ্রম্) বিকাশকে (অনু) নিরন্তর, [সেই] (প্রথমঃ) সর্বপ্রথম বর্তমান (জাতবেদাঃ) উৎপন্ন বস্তু-সমূহের জ্ঞান প্রদানকারী পরমেশ্বর (অহানি) দিনকে (অনু) নিরন্তর (অখ্যৎ) প্রসিদ্ধ করেছেন। (সূর্যঃ) [সেই] সূর্য [সর্বব্যাপক বা সকলকে চালনাকারী পরমেশ্বর] (উষসঃ) ঊষার মধ্যে (অনু) নিরন্তর, (রশ্মীন্) ব্যাপক কিরণ-সমূহে (অনু) নিরন্তর, (দ্যাবাপৃথিবী) সূর্য ও পৃথিবীতে (অনু) নিরন্তর (আবিবেশ) প্রবেশ করেছেন ॥২৭॥

যে পরমেশ্বর সূক্ষ্ম ও স্থূল পদার্থ রচনা করে সকলকে নিজের বশে/বশবর্তী করে রেখেছেন, তিনি সব মনুষ্যদের উপাস্য ॥২৭॥মন্ত্র ২৭, ২৮ আছে-অ০ ৭।৮২।৪, ৫ ॥মন্ত্র ২৭ এর প্রথম পাদ ঋগ্বেদে আছে−৪।১৩।১ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (প্রথমঃ) অনাদি, (জাতবেদাঃ) প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থে বিদ্যমান, প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থের জ্ঞাতা, বেদ প্রদাতা (অগ্নিঃ) জ্যোতিঃস্বরূপ পরমেশ্বর কখনও তো উপাসককে (উষসাম্) ঊষাকালের (অগ্রম্ অনু) প্রারম্ভের পর (অখ্যৎ) প্রত্যক্ষ হয়ে যায়, কখনও (অহানি অনু) দিনের সমাপ্তি কালে প্রত্যক্ষ হয়ে যায়/হন। (সূর্যঃ) সূর্যের সূর্য তিনি কখনও (উষসঃ অনু) ঊষাকালের পর, এবং কখনো (রশ্মীন্ অনু) রশ্মির কেবল চমকের পর প্রকট হন। তিনি (দ্যাবাপৃথিবী অনু) দ্যূলোক ও ভূলোকে নিরন্তর (আ বিবেশ) ব্যাপ্ত। বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

[অভিপ্রায় হল, পরমেশ্বরের ভক্তিতে সদা মগ্ন থাকা উচিত, কেউ জানে না কখন দর্শন দেবেন।]   বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

পরমাত্মগুণোপদেশঃ−

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त 

প্রত্যগ্নিরুষসামগ্রমখ্যৎ প্রত্যহানি প্রথমো জাতবেদাঃ। 

প্রতি সুর্যস্য পুরুধা চ রশ্মীন্ প্রতি দ্যাবাপৃথিবী আ ততান ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২

প্রতি॑ । অ॒গ্নিঃ । উ॒ষসা॑ম্ । অগ্র॑ম্ । অ॒খ্য॒ত্ । প্রতি॑ । অহা॑নি । প্র॒থ॒মঃ । জা॒তऽবে॑দাঃ । প্রতি॑ । সূর্য॑স্য । পু॒রু॒ऽধা । চ॒ । র॒শ্মীन् । প্রতি॑ । দ্যাবা॑পৃথি॒বী ইতি॑ । আ । ত॒তা॒ন॒ ॥ 

ক্ষেমকরন ত্রিবেদী পদার্থঃ (অগ্নিঃ) সর্বব্যাপক পরমেশ্বর (উষসাম্) ঊষার (অগ্রম্) বিকাশকে (প্রতি) প্রত্যক্ষরূপে, [সেই] (প্রথমঃ) সর্বপ্রথম বর্তমান (জাতবেদাঃ) উৎপন্ন বস্তু-সমূহের জ্ঞান প্রদানকারী পরমেশ্বর (অহানি) দিনকে (প্রতি) প্রত্যক্ষরূপে (অখ্যৎ)প্রসিদ্ধ করেছেন। (চ) এবং (সূর্যস্য) সূর্যের (রশ্মীন্) ব্যাপক কিরণ-সমূহকে (পুরুধা) অনেক প্রকারে (প্রতি) প্রত্যক্ষরূপে, এবং (দ্যাবাপৃথিবী) সূর্য ও পৃথিবীলোককে (প্রতি) প্রত্যক্ষরূপে (আ) সবদিকে (ততান) বিস্তৃত করেছেন ॥২৮॥

সব জগতের উৎপাদক এবং সর্বনিয়ন্তা ঈশ্বরের মহিমা বিচার করে মনুষ্য নিজের উন্নতি করুক ॥২৮॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (প্রথমঃ) অনাদি, (জাতবেদাঃ) প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থে বিদ্যমান, প্রত্যেক উৎপন্ন পদার্থের জ্ঞাতা, বেদপ্রদাতা (অগ্নিঃ) জ্যোতিঃস্বরূপ পরমেশ্বর, কখনও (উষসামগ্রম্) ঊষাকালের প্রারম্ভে (প্রতি অখ্যৎ) প্রত্যক্ষ হন, কখনও (অহানি) দিনকে লক্ষ্য করে (প্রতি) প্রত্যক্ষ হন, কখনও (সূর্যস্য পুরুধা রশ্মীন্) নানা শিক্ষায় বিস্তৃত সূর্যের রশ্মিকে লক্ষ্য করে (প্রতি) প্রত্যক্ষ হন। সেই পরমেশ্বর (দ্যাবাপৃথিবী) দ্যূলোক ও পৃথিবী লোককে (প্রতি আ ততান) প্রত্যক্ষ রূপে সর্বত্র বিস্তার করেছেন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ऋषि- यम, मन्त्रोक्तदेवता- त्रिष्टुप्छन्द- अथर्वासूक्तम्- पितृमेध सूक्त

দ্যাবাহ ক্ষামা প্রথমে ঋতেনাভিশ্রাবে ভবতঃ সত্যবাচা। 

দেবো যন্মর্তান যজথায় কৃন্বন্‌ৎসীদদ্ধোতা প্রত্যঙ্ স্বমসুং যন্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।২৯ 

দ্যাবা॑ । হ॒ । ক্ষামা॑ । প্র॒থ॒মে ইতি॑ । ঋ॒তেন॑ । অ॒ভি॒ऽশ্রা॒বে । ভ॒ব॒ত॒ঃ । স॒ত্য॒ऽবাচা॑ । দে॒বঃ । যত্ । মর্তা॑ন্ । য॒জথা॑য় । কৃ॒ণ্বন্ । সীদ॑ৎ । হোতা॑ । প্র॒ত্যঙ্ । স্বম্ । অসু॑ম্ । যন্ ॥

পদার্থঃ (দ্যাবা ক্ষামা) সূর্য ও পৃথিবীর [সমান উপকারী], (প্রথমে) মুখ্য, (সত্যবাচা) সত্যবাণীযুক্ত/সত্যবাদী [উভয় প্রজা স্ত্রী ও পুরুষ] (হ) নিশ্চিতরূপে (ঋতেন) সত্য ধর্ম দ্বারা (অভিশ্রাবে) পূর্ণ কীর্তির মাঝে (ভবতঃ) হয়। (যৎ) কেননা (হোতা) দানী, (দেবঃ) প্রকাশমান [পরমেশ্বর] (মর্তান্) মনুষ্যদের (যজথায়) পরস্পর মিলনের জন্য (কৃণ্বন্) করে এবং (স্বম্) নিজের (অসুম্) বুদ্ধিকে (যন্) প্রাপ্ত হয়ে (প্রত্যঙ্) সামনে (সীদৎ) বসে॥২৯॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

সবথেকে মুখ্য সর্বোপকারী স্ত্রী-পুরুষ কীর্তি প্রাপ্ত করে, কেননা সর্বব্যাপক পরমাত্মা মনুষ্যদের পরস্পর সহায়ক করে কর্মের ফল দেওয়ার জন্য নিজের জ্ঞান দ্বারা সকলের সন্মুখে থাকেন ॥২৯॥মন্ত্র ২৯, ৩০ ঋগ্বেদে আছে- ১০।১২।১, ২ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (ঋতেন) সৃষ্টির নিয়মানুসারে (সত্যবাচা) পরমেশ্বরীয় সত্যেচ্ছার শব্দের দ্বারা, (প্রথমে) বিস্তৃত (দ্যাবা ক্ষামা) দ্যূলোক ও ভূলোক (অভিশ্রাবে ভবতঃ) প্রসিদ্ধি প্রাপ্ত করে, অর্থাৎ উৎপন্ন হয়। তদনন্তর (স্বম্ অসুম্) নিজ স্বাভাবিক প্রজ্ঞান (যন্) প্রাপ্ত, (প্রত্যঙ্) জগতের প্রত্যেক পদার্থে ব্যাপ্ত, (দেবঃ) সেই দেবাধিদেব, (যৎ) যখন (মর্তান্) মনুষ্যদের (যজথায়) যজ্ঞিয় কর্ম করার জন্য (কৃণ্বন্) উৎপন্ন করেন, তখন তিনি (সীদৎ) মনুষ্যদের হৃদয়ে স্থিত হয়ে (হোতা) তাঁদের শক্তি প্রদান করেন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[সত্যবাচা = "তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়" (ছা০ অ০ ৬, সং০ ২), সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বরের মধ্যে এই ইচ্ছা প্রকট হয়, "আমি জগতের নানারূপে প্রকট হই/হবো" তখন জগতের সৃষ্টি হয়। "প্রকট হই/হবো"- এই ইচ্ছা মানসিক শব্দ, মানসিক বাণী, যা সত্যস্বরূপা, যা প্রত্যেক সৃষ্ট্যারম্ভে প্রকট হয়। এই ইচ্ছাময়ী বাণীর পরে পরমেশ্বরীয় দর্শন হয়। ইহাকে মন্ত্রে "অসু" বলা হয়েছে। নিঘণ্টুতে অসু এর অর্থ দেওয়া হয়েছে/আছে "প্রজ্ঞা" (৩।৯)। এই প্রজ্ঞা বা প্রজ্ঞান "ঈক্ষণ" রূপ। যথা - "তদৈক্ষত" (ছান্দো০ অ০ ৬।২), তথা "ঈক্ষতের্নাশব্দম্" (বেদান্ত ১।১।৫)। মনুষ্যদের মধ্যেও কোনো কার্যের আরম্ভে প্রথমে ইচ্ছা উৎপন্ন হয়। তদনন্তর ইচ্ছাকে কার্যান্বিত করার জন্য তদুপযোগী সাধনের নিরীক্ষণ হয়। মন্ত্রে এটাও বলা হয়েছে মনুষ্য-জীবনের উদ্দেশ্য হল - যজ্ঞিয় কর্ম করা। এইজন্য/কারণে পরমেশ্বর মনুষ্যদের হৃদয়ে স্থিত, এবং তাঁদের যজ্ঞিয় কর্ম করার জন্য মার্গ দর্শন করাতে থাকেন।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

দেবে দেবান্ পরিভূর্খতেন বহা নো হব্যং প্রথমশ্চিকিত্বান। 

ধূমকেতুঃ সমিধা ভাঋজীকো মন্দ্রো হোতা নিত্যো বাচা যজীয়ান্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পদার্থঃ [হে পরমাত্মন্ !] (দেবঃ) প্রকাশমান, (ঋতেন) সত্য ধর্ম দ্বারা (দেবাকগন্) গতিমান্ লোক-সমূহে (পরিভূঃ) ব্যাপ্ত হয়ে, (প্রথমঃ) প্রথম থেকে বর্তমান (চিকিত্বান্) [সর্ব] জ্ঞাতা তুমি (নঃ) আমাদের জন্য (হব্যম্) গ্রাহ্য পদার্থ (বহ) প্রেরণ করো। (সমিধা) সমিধা [কাষ্ঠ আদি] দ্বারা (ধূমকেতুঃ) ধোঁয়ার ধ্বজাযুক্ত [অগ্নিরূপ] তুমি (ভাঋজীকঃ) বহুপ্রকাশযুক্ত, (মন্দ্রঃ) আনন্দদাতা,   (হোতা) দানকর্তা  (নিত্যঃ) সদা বর্তমান এবং (বাচা) বাণীদ্বারা (যজীয়ান্) অতি সংযোগকারী/সংযোজক ॥৩০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

মনুষ্য অনাদি অনন্তসর্বস্রষ্টা পরমাত্মাকে সর্বব্যাপক, সর্বনিয়ন্তা এবং সর্বজ্ঞ জেনে পুরুষার্থ সহিত গ্রাহ্য পদার্থ-সমূহ উপার্জন করুক ॥৩০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পরমেশ্বর! আপনি (দেবঃ) দেবাধিদেব। (ঋতেন) অনাদি নিয়মের অনুসারে আপনি (দেবান্) দিব্য-জনের (পরিভূঃ) রক্ষার জন্য তাঁদের ঘিরে থাকেন। আপনি (নঃ) আমাদের শ্রদ্ধাময় (হব্যম্) হবি (বহ) স্বীকার করুন। আপনি (প্রথমঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ ও অনাদি, (চিকিত্বান্) যথার্থবেত্তা। (সমিধা) সমিধা দ্বারা (ধূমকেতুঃ) যজ্ঞিয়াগ্নির সদৃশ প্রকাশমান (ভাঋজীকঃ) প্রভা/দীপ্তিতে আপনি সূর্যসদৃশ, (মন্দ্রঃ) হর্ষপ্রদাতা, (হোতা) শক্তিপ্রদাতা, (নিত্যঃ) সদা সৎ, তথা (বাচা) নিজ বাণী দ্বারা (যজীয়াম্) আমাদের যজ্ঞিয় কর্মকে সফল করে দেন/করেন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[ঋজীকঃ= সূর্যঃ (উণাদি ৫।৫১), দয়ানন্দভাষ্য]

অর্চামি বাং বর্ধায়াপো ঘৃতস্থ দ্যাবাভূমী শৃণুতং রোদসী মে।

অহা যদ দেবা অসুনীতিমায়ন্ মঞ্চা নো অত্র পিতরা শিশীতাম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পদার্থঃ (ঘৃতস্নূ) হে জলসমান [ব্যবহার] শুদ্ধকারী ! [মাতা-পিতা] (বর্ধায়) [নিজের] বৃদ্ধির জন্য (বাম্) তোমাদের দুজনের (অপঃ) কর্মের (অর্চামি) আমি পূজা করি, (রোদসী) হে ব্যবহারের রক্ষক ! [প্রজাগণ] তোমরা (দ্যাবাভূমী) সূর্য এবং ভূমির [সমান উপকারী হয়ে] (মে) আমার কথা (শৃণুতম্) শ্রবণ করো। (যৎ) কেননা (অহা) দিন এবং (দেবাঃ) গতিমান্ লোক (অসুনীতিম্) প্রাণদাতা [পরমাত্মাকে] (আয়ন্) প্রাপ্ত হয়, (অত্র) এখানে [সংসারে] (নঃ) আমাদের (পিতরা) মাতা-পিতা [তোমরা দুজন] (মধ্বা) জ্ঞান দ্বারা (শিশীতাম্) তীক্ষ্ণ করো॥৩১॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যে মাতা-পিতা আদি পূজনীয় বিদ্বানদের কর্ম দ্বারা এবং সংসারের বিবিধ পদার্থ থেকে পরমেশ্বরের জ্ঞান প্রাপ্ত করে, তাঁরাই মহাজ্ঞানী হয় ॥৩১॥এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।১২।৪ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে মাতা-পিতা ! (বাম্) আপনাদের দুজনের (অর্চামি) আমি পূজা করি, যাতে (অপঃ) আমার সৎকর্ম-সমূহের (বর্ধায়) বৃদ্ধি হতে পারে। (ঘৃতস্নূ) আপনারা দুজন আমার জন্য ঘৃত আদি পদার্থ-সমূহ প্রবাহিত করেন, (দ্যাবাপৃথিবী) আপনারা দুজন দ্যূলোক ও পৃথিবীলোকের সদৃশ আমার জন্মদাতা, (রোদসী) কষ্ট-সমূহ এবং দুঃখের কারণে প্রকটিত আমার রুদনকে আপনারা দূর করেন। (শৃণুতম্) আপনারা আমার প্রার্থনা শ্রবণ করুন, (দেবাঃ) অতিথি দেব তথা আচার্য দেব প্রমুখ (যদ্ অহা) যে-যে দিনে আমাদের (অসুনীতিম্) প্রজ্ঞা ও প্রাণশক্তি, তথা বল-এর নীতির (আয়ন্) উপদেশ দেন, সেই-সেই দিন (পিতরা) হে আমার মাতা-পিতা ! (অত্র) এই ঘরে আপনারা (নঃ) আমাদের (মধ্বা) তাঁদের মধুর উপদেশের (শিশীতাম্) সদা শিক্ষা দিতে থাকেন/থাকুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[রোদসী = রুদ্ (রোদন) + অস্ (প্রক্ষেপে)। শিশীতাম্ = শিশীতিঃ দানকর্মা (নিরু০ ৫।৪।২৩)] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

স্বাবৃগ্ দেবস্যামৃতং যদী গোরতো জাতাসো ধারয়ন্ত উর্বী।

বিশ্বে দেবা অনু তৎ তে যজুগুদুহে যদেনী দিব্যং ঘৃতং বাঃ৷ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পদার্থঃ (যদি) যেহেতু (দেবস্য) প্রকাশময় পরমেশ্বরের (অমৃতম্) অমৃত [জীবন সামর্থ্য] (গোঃ) পৃথিবীর জন্য (স্বাবৃক্) সহজে প্রাপ্তি যোগ্য, (অতঃ) এই [জীবন সামর্থ্য] দ্বারা (জাতাসঃ) উৎপন্ন প্রাণী (উর্বী) পৃথিবীতে (ধারয়ন্তে) [নিজেকে] ধারণ করে। হে পরমাত্মন্ ! (বিশ্বে) সব (দেবাঃ) বিদ্বানগণ (তে) তোমার (তৎ) সেই (যজুঃ অনু) পূজনীয় কর্মের অনুসারে/অনুকূলে (গুঃ) চলে, (যৎ) কেননা (এনী) গমনশীল ভূমি (দিব্যম্) শ্রেষ্ঠ (ঘৃতম্) সারযুক্ত (বাঃ) বরণীয় উত্তম পদার্থ (দুহে) ভরপূর করে॥৩২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পরমেশ্বর প্রাণীদের পালনের জন্য পৃথিবীতে আলো, বায়ু, জল, অন্ন আদি অনেক পদার্থ স্বয়ং প্রাপ্তির যোগ্য করেছেন, সব বিদ্বানগণ পরমেশ্বরের নিয়ম বুঝে সংসারে অনেক লাভ করে ॥৩২॥এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−১০।১২।৩ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যদ্ ঈ) যখন উপাসক (দেবস্য) পরমেশ্বর দেবের (গোঃ) বেদবাণী দ্বারা (স্বাবৃগ্) নিজ পাপের বর্জন করে নেয়, এবং (অমৃতম্) মোক্ষ বা অনশ্বর প্রভুকে প্রাপ্ত করে নেয়, তখন (অতঃ) এই বেদবাণী দ্বারা (জাতাসঃ) দ্বিজন্মারূপে সৃষ্ট/উৎপন্ন উপাসক (উর্বী ধারয়ন্তে) সমগ্র পৃথিবীর ধারণ নিজের সদুপদেশ দ্বারা করে। হে পরমেশ্বর ! তখন সেই (বিশ্ব দেবাঃ) সব দেবতা (তে) আপনার (যজুঃ) যজ্ঞকর্মের (অনু গুঃ) অনুগামী হয়ে যায়। (যদ্) যদ্যপি (এনী) বিচিত্রবর্ণা অর্থাৎ বিবিধ জ্ঞানের বর্ণনাকারী বেদবাণী, তার/তাদের জন্য (দিব্যং ঘৃতং বাঃ) দিব্য ঘী ও দিব্য জল (দুহে) দোহরূপে প্রদান করে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[স্বাবৃগ্ = স্বাবৃক্ =স্ব+আ+ বৃজ্ (বর্জনে)। গৌঃ= বাক্ (নিঘং০ ১।১১)। যজুঃ = পরমেশ্বরের যজ্ঞকর্ম হল পরোপকারার্থ সৃষ্টির পালন। এনী = গৌ। "দুহে" পদ দ্বারাও এনী এর অর্থ গাভী প্রতীত হয়। দিব্যং ঘৃৎ বাঃ= বেদবাণী উপাসকের বীর্য ও রস-রক্তকে দিব্য করে, সাত্ত্বিক করে। ঘৃত= রেতঃ বীর্য। যথা - "রেতঃ কৃত্বাজ্যং দেবাঃ পুরুষমাবিশন্" (অথর্ব০ ১১।৮।২৯) বাঃ=আপঃ=রস-রক্ত (অথর্ব০ ১০।২।১১)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

কিং স্কিন্নো রাজা জগৃহে কদস্যাতি ব্রতং চকুমা কো বি বেদ।

মিত্রশ্চিদ্ধি ষ্মা জুহুরাণো দেবাং্যোকো ন যাতামপি বাজো অস্তি ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পদার্থঃ (কিং স্বিৎ) কেন [কোন কর্মফলে] (নঃ) আমাদের (রাজা) রাজা [পরমেশ্বর] (জগৃহে) গ্রহণ করেছেন [সুখ দিয়েছেন], (কৎ) কখন (অস্য) এই [পরমাত্মার] (ব্রতম্) নিয়ম (অতি চকৃম) আমরা উলঙ্ঘন করেছি [যার ফলে ক্লেশ প্রাপ্ত করেছি/হয়েছি], (কঃ) প্রজাপতি পরমেশ্বর [তা] (বি) বিবিধ প্রকারে (বেদ) জানেন। (হি) কেননা (মিত্রঃ) সকলের মিত্র [পরমাত্মা] (চিৎ) ই (স্ম) অবশ্য (দেবান্) উন্মত্তদের (জুহুরাণঃ) বিকৃতকারী এবং (যাতাম্) গতিশীল [পুরুষার্থীদের] (অপি) ই (শ্লোকঃ ন) স্তুতির সমান (বাজঃ) বল (অস্তি) হয়॥৩৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পূর্বজন্মের কর্মফল ব্যবস্থা, যা আমাদের অকস্মাৎ সুখ-দুঃখের কারণ, পরমেশ্বর তা জানেন, কিন্তু তিনি নিজের ন্যায়ব্যবস্থা দ্বারা উন্মত্তদের কষ্ট এবং উদ্যোগীদের সুখ প্রদান করেন ॥৩৩॥মন্ত্র ৩৩-৩৬ ঋগ্বেদে আছে−১০।১২।৫-৩৮ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (কিং স্বিৎ) কেন (রাজা) জগতের রাজা (নঃ) আমাদের (জগৃহে) জন্ম-মরণের বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছেন ? (কৎ = কদ্) কখন (অস্য) এই রাজার (ব্রতম্) নিয়মব্যবস্থা আমরা (অতি চকৃম) অতিক্রমণ = উল্লঙ্ঘন করেছি ? (কঃ বি বেদ) কে বিবেকপূর্বক ইহা জানে ? (মিত্রঃ চিদ্ হি) তিনি নিশ্চিতরূপে আমাদের মিত্র, (স্ম= স্মঃ) এবং আমরা উনার মিত্র। (দেবান) তিনি তো দেবকোটির লোকেদের (জুহুরাণঃ) চন্দ্রসম আহ্লাদ প্রদান করেন। তিনি (যাতাম্) ধর্মমার্গে গমনশীল/গমনকারীদের (বাজঃ) বলরূপ (অস্তি) হয়, (শ্লোকঃ ন) যেমন বৈদিক মন্ত্র স্বাধ্যায়শীলের জন্য বলরূপ। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[জুহুরাণঃ = চন্দ্রমা (উণা০ ২।৯২)।]

দুর্মন্তুত্রামৃতস্য নাম সলক্ষ্মা যদ বিষুরূপা ভবাতি।

যমস্য যো মনবতে সুমন্ত্রগ্নে তমৃদ্ধ পাহ্যপ্রযুচ্ছন্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পরমাত্মগুণোপদেশঃ−

পদার্থঃ (অত্র) এখানে [সংসারে] (অমৃতস্য) অমর [অবিনাশী পরমাত্মার] (নাম) নাম (দুর্মন্তু) দুর্মাননীয় [সর্বদা অপূজনীয়] [হবে], (যৎ) যদি (সলক্ষ্মা) সমান লক্ষণবিশিষ্ট [ধর্মব্যবস্থা] (বিষুরূপা) নানা স্বভাবগত [চঞ্চল, অধার্মিক] (ভবাতি) হয়। (যঃ) যে [মনুষ্য] (যমস্য) ন্যায়কারী পরমেশ্বরের [নামকে] (সুমন্তু) বড়ো মাননীয় (মনবতে) মানে, (অগ্নে) হে জ্ঞানময় ! (ঋষ্ব) হে মহান্ পরমেশ্বর ! (তম্) তাঁকে (অপ্রয়ুচ্ছন্) অপ্রমাদ করে (পাহি) পালন করো ॥৩৪॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যদি পরমাত্মা অন্যায় করেন তবে সব সংসার উলট-পালট হয়ে যাবে। যে মনুষ্য উনার ন্যায়ব্যবস্থা অনুসারে চলে, সে সুখ পায়/প্রাপ্ত হয় ॥৩৪॥এই মন্ত্রের দ্বিতীয় পাদ মন্ত্র ২ এ আছে॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অত্র) এই জীবনে (অমৃতস্য) অমর পরমাত্মার (নাম) ও৩ম্ নাম, মনন করাও (দুর্মন্তু) দুর্মনন হয়ে যায়, (যদ্) যখন (সলক্ষ্মা) সমান লক্ষণযুক্ত চিতিশক্তি (বিষুরুপা) বিভিন্ন লক্ষণযুক্ত (ভবাতি) হয়ে যায়। (যঃ) যে মনুষ্য (যমস্য) অমর নিয়ন্তার "ও৩ম্" নামের (মনবতে) সলক্ষ্ম হয়ে মনন করে, তার মনন (সুমন্তু) সুমনন হয়। (ঋষ্ব) হে মহান্ (অগ্নে) জ্যোতির্ময় পরমাত্মন্ ! (তম্) এরুপ মননকর্তার আপনারা (অপ্রয়ুচ্ছন্) নিরন্তর সদা (পাহি) রক্ষা করুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

সলক্ষ্মা = চিতিশক্তি অর্থাৎ জীবাত্মা, পরমাত্মার সদৃশ লক্ষণযুক্ত। উভয়ই আত্মরূপ, উভয়ই চিদ্রূপ, উভয়ই নিত্য সদ্রূপ। উভয়ই একসাথে থাকা সখা = সয়ুজা সখায়া। কিন্তু অজ্ঞানবশত যখন চিতিশক্তি অর্থাৎ জীবাত্মা নিজেকে দেহরূপ বা মনরূপ মনে করে দেহাদির পালনে রত হয়ে যায়, বা মানসিক সঙ্কল্প-বিকল্পকে নিজ ধ্যেয় বুঝে নেয়/মনে করে, তখন এই চিতিশক্তি "বিষুরূপা" হয়ে যায়। বিষুরূপা-এ “ও৩ম্” এর মনন বাস্তবিক মনন হয় না। এই কৃত মননও বাস্তবে দুর্মননই থাকে। এইজন্য "সলক্ষ্ম" হয়ে "ও৩ম্” নামের মনন করাই সুমনন। ঋষ্ব= মহন্নাম (নিঘং০ ৩।৩)। অপ্রয়ুচ্ছন্ = প্রমাদ বিনা।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

যস্মিন্ দেবা বিদথে মাদয়ন্তে বিবস্বতঃ সদনে ধারয়ন্তে।

সূর্যে জ্যোতিরদধুর্মাস্যকুন্ পরি দ্যোতনিং চরতো অজস্রা ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

পদার্থঃ (যস্মিন্) যে [পরমাত্মার] মধ্যে (দেবাঃ) দিব্য নিয়ম (বিদথে) বিজ্ঞানের মাঝে (মাদয়ন্তে) তৃপ্ত থাকে এবং (বিবস্বতঃ) প্রকাশময় [পরমেশ্বরের] (সদনে) ঘর [ব্রহ্মাণ্ডে] (ধারয়ন্তে) [নিজেকে] ধারণ করে রাখে। (সূর্যে) সূর্যের মধ্যে (জ্যোতিঃ) জ্যোতি এবং (মাসি) চন্দ্রের মধ্যে (অক্তূন্) [সূর্যের] কিরণ-সমূহকে (অদধুঃ) সেই [নিয়ম] রেখেছে, (অজস্রা) নিরন্তর [সূর্য-চন্দ্র] (দ্যোতনিম্) সেই প্রকাশমান [পরমাত্মার] (পরি চরতঃ) সেবা করে ॥৩৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ঋষি-মুনিগণ ধ্যান করে যে পরমাত্মার জ্ঞানের প্রচার সংসারে বিস্তারিত করে, সেই পরমেশ্বরের নিয়মে সূর্য-চন্দ্র আদি লোক উপকার করে ॥৩৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যস্মিন্ বিদথে) যে বিবেক-জ্ঞান প্রকট হলে, (দেবাঃ) পরমেশ্বরীয় দিব্য শক্তি-সমূহ, আমাদের (মাদয়ন্তে) তৃপ্ত প্রমুদিত করে, এবং (বিবস্বতঃ সদনে) অজ্ঞানান্ধকার দূর/পরাভূতকারী পরমেশ্বরের আশ্রয়ে (ধারয়ন্তে) আমাদের স্থাপিত করে, সেই দিব্যশক্তি-সমূহ (সূর্যে) সূর্যের মধ্যে (জ্যোতিঃ) দ্যুতি (অদধুঃ) স্থাপিত করেছে। এবং (মাসি) চন্দ্রের মধ্যে (অক্তূন্) রাত্রি বা অভিব্যক্ত তারাগণ স্থাপিত করেছে, যা (অজস্রা= অজস্রৌ) মানো অক্ষীণ সূর্য ও চন্দ্র, (দ্যোতনিম্) জ্যোতিঃ স্বরূপ পরমেশ্বরের মানো (পরি চরতঃ) পরিচর্যা করছে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[বিবস্বান্ = বিবাসনবান্ (নিরু০ ৭।৭।২৭) = অজ্ঞানান্ধকার-নাশনবান্।]

যস্মিন্ দেবা মন্মনি সঞ্চরন্ত্যপীচ্যে ন বয়মস্য বিঘ্ন।

মিত্রো নো অত্রাদিতিরনাগানৎসবিতা দেবো বরুণায় বোচৎ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

যস্মি॑ন্ । দে॒বাঃ । মন్নি । স॒ম্ঽচর॑ন্তি । অ॒পী॒চ্যে᳡ । ন । ব॒য়ম্ । অ॒স্য॒ । বি॒দ্ম॒ । মি॒ত্রঃ । ন॒ঃ ।
অত্র॑ । অদি॑তিঃ । অনা॑গান্ । স॒বি॒তা । দে॒বঃ । বরু॑ণায় । বো॒চ॒ত্ ॥

পদার্থঃ (যস্মিন্) যে [পরমাত্মার] মধ্যে (দেবাঃ) দিব্য নিয়ম (অপীচ্যে) গুপ্ত (মন্মনি) জ্ঞানের মাঝে (সঞ্চরন্তি) চলতে থাকে/বিচরন করে, (বয়ম্) আমরা (অস্য) তা (ন) না (বিদ্ম) জানি। (মিত্রঃ) সকলের মিত্র, (অদিতিঃ) অখণ্ড, (সবিতা) সকলকে উৎপন্নকারী, (দেবঃ) প্রকাশমান পরমাত্মা (অনাগান্ নঃ) আমাদের নিরপরাধীদের [ধার্মিক পুরুষার্থীদের] (অত্র) এই [বিষয়ে] (বরুণায়) শ্রেষ্ঠ গুণের জন্য (বোচৎ) উপদেশ করে ॥৩৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পরমাত্মার নিয়ম সংসারে এমন যে, যতই বিদ্বানগণ তা অন্বেষণ করতে থাকে, ততই অধিক জানতে/জ্ঞাত হতে থাকে। মনুষ্য নিরালসী হয়ে পরমেশ্বরের শরণে থেকে সদা পুরুষার্থ করুক॥৩৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যস্মিন্) যে (মন্মনি) জ্ঞানবান্ (অপীচ্যে) কিন্তু অন্তর্হিত পরমেশ্বরের মধ্যে, (দেবাঃ) জীবন্মুক্ত দিব্য যোগী (সঞ্চরন্তি) সম্যক্ বিচরন করে, (অস্য) এই পরমেশ্বরের বিধিবিধানকে (বয়ম্) আমরা সংসারী লোকেরা (ন বিদ্ম) না জানি/জানি না/জ্ঞাত নয়। (মিত্রঃ) মিত্রজন, (অদিতিঃ) মাতা, তথা (সবিতা দেবঃ) পিতৃদেব এঁদের মধ্যে প্রত্যেকে (নঃ) আমাদের, (অত্র) এই জীবনে, (অনাগান্) পাপরহিত (বোচৎ) বলুক, উদ্ঘোষিত করুক। যাতে আমরাও (বরুণায়) বরণকারী শ্রেষ্ঠ পরমেশ্বরের প্রাপ্তির যোগ্য হতে পারি। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

সখায় আ শিষামহে ব্রহ্মেন্দ্রায় বজ্রিণে।

স্তষ উযু নৃতমায় ধৃষ্ণবে ॥  অথর্ব০ ১৮।১।৩

রাজনির্বাচনোপদেশঃ−

পদার্থঃ (সখায়ঃ) হে মিত্রগণ ! (বজ্রিণে) বজ্র [অস্ত্র-শস্ত্র] ধারণকারী, (নৃতমায়) অনেক বড়ো নেতা, (ধৃষ্ণবে) সাহসী (ইন্দ্রায়) ইন্দ্র [ঐশ্বর্যবান পুরুষকে] (ব্রহ্ম) ব্রহ্মজ্ঞান (স্তুষে) স্তুতি করার জন্য (উ) অবশ্যই (সু) উত্তমরূপে (আ শিষামহে) আমরা নিবেদন করি ॥৩৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

সব বিদ্বানগণ মহাগুণী, নীতিজ্ঞ পুরুষার্থী মনুষ্যকে রাজসিংহাসনে বিরাজ করার জন্য নিবেদন/প্রার্থনা করুক ॥৩৭॥এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−৮।২৪।১ এবং সামবেদে পূ০ ৪।১০।১০॥

পদার্থঃ (সখায়ঃ) হে উপাসক মিত্রগণ ! (স্তুষে) স্তবনের জন্য, (বজ্রিণে) ন্যায়বজ্রধারী (নৃতমায়) সকলের নেতা, (ধৃষ্ণবে) পাপ-সমূহের পরাভবকর্ত্তা (ইন্দ্রায়) পরমেশ্বরের প্রতি (ব্রহ্ম) তৎপ্রতিপাদক মহাস্তোত্র (আশিষামহে) আমরা প্রারম্ভ করি। [স্তুষে = স্তোতুম্, স্তৌমি (সায়ণ)।]

শবসা হাসি শ্রুতো বৃত্রহত্যেন বৃত্রহা।

মঘৈর্মঘোনো অতি শূর দাশসি ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

রাজনির্বাচনোপদেশঃ−

পদার্থঃ (হি) কেননা/যেহেতু, (শূর) হে বীর ! তুমি (শবসা) বল দ্বারা (শ্রুতঃ) বিখ্যাত এবং (বৃত্রহত্যেন) দুষ্টদের বিনাশের মাধ্যমে (বৃত্রহা) দুষ্টনাশক (অসি) হও, এবং (মঘৈঃ) ধন-সম্পদের কারণে (মঘোনঃ অতি) ধনবানদের থেকে অধিক (দাশসি) তুমি দান করো ॥৩৮॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

হে রাজন্ ! আপনি মহাবলশালী, শত্রুনাশক এবং সুপাত্রদের জন্য অনেক দান প্রদানকারী, এই গুণ-সমূহের দ্বারা আমরা আপনাকে রাজা করি ॥৩৮॥এঈ মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−৮।২৪।২ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পরমেশ্বর ! আপনি (হি) নিশ্চিতরূপে, (শবসা) বল-এর কারণে (শ্রুতঃ অসি) বিশ্রুত, এবং (বৃত্রহত্যেন) পাপ-সমূহের হননের কারণে, (বৃত্রহা) পাপ-হন্তা নাম দ্বারা বিশ্রুত। (শূর) হে দানবীর ! আপনি (মঘৈঃ) ধনদানের দৃষ্টিতে (মঘোনঃ) ধনদাতাদের থেকে (অতি দাশসি) অধিক মহাদান করছেন। বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

স্তেগো ন ক্ষামত্যেষি পৃথিবীং মহী নো বাতা ইহ বাস্তু ভূমৌ।

মিত্রো নো অত্র বরুণো যুজ্যমানো অগ্নির্বনে ন ব্যসৃষ্ট শোকম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৩

রাজকৃত্যোপদেশঃ

[পদার্থঃ হে রাজন্ !] (স্তেগঃন) সংগ্রহকর্তা পুরুষের সমান (ক্ষাম্) নিবাস প্রদায়ী (পৃথিবীম্ অতি) পৃথিবীতে (এষি) তুমি চলো/গমন করো, (বাতাঃ) বায়ুর [সমান বেগবান পুরুষ] (ইহ) এখানে [রাজ্যে] (নঃ) আমাদের জন্য (মহী) বড়ো (ভূমৌ) ভূমিতে (বান্তু) চলুক/গমন করুক। (অত্র) এখানে (নঃ) আমাদের (যুজ্যমানঃ) একসাথে (বরুণঃ) শ্রেষ্ঠ (মিত্রঃ) মিত্র [আপনি] (শোকম্) প্রতাপ (বি) দূর-দূর পর্যন্ত (অসৃষ্ট) বিস্তারিত করেছো, (অগ্নিঃ ন) যেমন অগ্নি (বনে) বনে [তাপ বিস্তৃত করে] ॥৩৯॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

রাজার উচিৎ অনেক ধন সংগ্রহ করে রাজ্যের রক্ষা করা এবং প্রজাগণকে উদ্যোগী করে শত্রুদের বিনাশ করা ॥৩৯॥ এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।৩১।৯। এবং সেখানে [বিশ্বেদেবাঃ] দেবতা ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (স্তেগঃ ন) হরিণ যেমন (অতি) বাধা-সমূহের অতিক্রমণ করে (ক্ষাং পৃথিবীম্) নিজ নিবাসস্থান প্রাপ্ত করে, তেমনই আপনি আমাদের অন্তরায়ের (অতি) অতিক্রমণ করে (এষি) আমাদের প্রাপ্ত হন। আপনার কৃপায়, (নঃ) আমাদের জন্য, (ইহ) এই (মহী ভূমৌ) মহাভূমিতে (বাতাঃ) সুখকর বায়ু (বান্তু) প্রবাহিত/বাহিত হোক। (যুজ্যমানঃ) যোগবিধি দ্বারা যুক্ত (মিত্রঃ) সর্ব-মিত্র এবং (বরুণঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর, (নঃ) আমাদের (অত্র) এই জীবনে, (শোকম্) নিজ প্রকাশের (ব্যসৃষ্ট) বিসর্জন করে, (নঃ) যেমন (অগ্নিঃ) অগ্নি (বনে) বনে (শোকং ব্যসৃষ্ট) প্রকাশের/আলোর বিসর্জন করে [স্তেগ = stag (হরিণ)। ব্যসৃষ্ট = বিসর্জন, বিশেষ সর্জন।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

স্তুহি শ্রুতং গর্তসদং জনানাং রাজানং ভীমমুপহত্বমুগ্রম্।

মৃড়া জরিত্রে রুদ্র স্তবানো অন্যমস্মৎ তে নি বপন্তু সেন্যম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

পদার্থঃ (রুদ্র) হে রুদ্র ! [শত্রুনাশক রাজন্] (শ্রুতম্) বিখ্যাত, (গর্তসদম্) রথে স্থিতিশীল/রথারোহী, (জনানাম্) মনুষ্যদের মাঝে (রাজানম্) শোভায়মান, (ভীমম্) ভয়ঙ্কর, (উপহত্নুম্) হননকারী, (উগ্রম্) প্রচণ্ড [সেনাপতির] (স্তুহি) প্রশংসা করো। এবং (স্তবানঃ) প্রশংসিত তুমি (জরিত্রে) প্রশংসাকারীর জন্য (মৃড) সুখী হও, (অস্মৎ) আমাদের থেকে (অন্যম্) অন্য পুরুষ [অর্থাৎ শত্রুকে] (তে) তোমার (সেন্যম্) সেনাদল (নিবপন্তু) ছেদন করুক॥৪০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

রাজার উচিৎ বড়ো-বড়ো বীর সেনাপতিদের প্রশংসা করে আদর করা, এবং যে প্রজাগণ আদি রাজার শ্রেষ্ঠ গুণ-সমূহের স্তুতি করে/করবে, তাঁদের প্রসন্ন করা এবং ধর্মাত্মাদের রক্ষা করে শত্রুদের নাশ করা ॥৪০॥এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে ২।৩৩।১১॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে উপাসক ! (শ্রুতম্) বিশ্রুত, (জনানাম্) লোকেদের (গর্তসদম্) হৃদয়-গুহায় স্থিত, (ভীমম্) পাপীদের জন্য ভয়ানক, (উপহন্তুম্) তাঁদের হন্তা (উগ্রম) নিজের নিয়মে উগ্ররূপ, (রাজানম্) জগতের রাজার (স্তুহি) তুমি স্তুতি করো। (রুদ্র) হে রৌদ্ররূপ পরমেশ্বর ! (জরিত্রে) স্তোতার জন্য (স্তবানঃ) সন্মার্গের স্তবনকারী আপনি (মৃড) তাঁকে সুখী করুন। হে পরমেশ্বর ! (তে) আপনার সেনা (সেন্যম্) সেনা দ্বারা আক্রমণীয়, (অস্মৎ অন্যম্) আমাদের/স্তোতাদের থেকে ভিন্ন অন্য অস্তোতাদের (নিবপন্তু) ছিন্ন-ভিন্ন করুক। [বপন্তু = বপ (ছেদনে)। পরমেশ্বরের সেনা হল "উনার উগ্র সুদৃঢ় নিয়ম"।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

সরস্বতীং দেবয়ন্তো হবন্তে সরস্বতীমধ্বরে তায়মানে।

সরস্বতীং সুকৃতো হবন্তে সরস্বতী দাশুষে বার্যং দাৎ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

সরস্বতী আহ্বানের উপদেশ।

পদার্থঃ (সরস্বতীম্) সরস্বতী [বিজ্ঞানবতী বেদবিদ্যাকে], (সরস্বতীম্) সেই সরস্বতীকে (দেবয়ন্তঃ) দিব্যগুণ-সমূহের কামনাকারী পুরুষ (তায়মানে) বিস্তারশীল (অধ্বরে) হিংসারহিত ব্যবহারে (হবন্তে) আহ্বান করে। (সরস্বতীম্) সরস্বতীকে (সুকৃতঃ) সুকৃতী/পুণ্যকর্মীরা (হবন্তে) আহ্বান করে, (সরস্বতী) সরস্বতী (দাশুষে) নিজের ভক্তকে (বার্যম্) শ্রেষ্ঠ পদার্থ (দাৎ) প্রদান করে ॥৪১॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বিজ্ঞানী পরিশ্রমপূর্বক ও আদরপূর্বক বেদবিদ্যার অভ্যাস করে পুণ্য কর্ম করে এবং মোক্ষ আদি ইষ্ট পদার্থ প্রাপ্ত করে ॥৪১॥ মন্ত্র ৪১-৪৩। কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে ১০।১৭।৭-৯ ॥ এই সূক্ত মেলাও-অ০ ৭।৬৮।১-৩ ॥ এই তিনটি মন্ত্র আছে অ০ ১৮।৪।৪৫-৪৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (দেবয়ন্তঃ) পরমেশ্বর দেবতার কামনাকারী (সরস্বতীম্) জ্ঞান প্রদায়িনী বেদবাণীর (হবন্তে) উচ্চারণ বা জপ করে। (অধ্বরে) অহিংসা-যজ্ঞ (তায়মানে) করার সময় (সরস্বতীম্) যাজ্ঞিকগণ জ্ঞানপ্রদা বেদবাণীর উচ্চারণ করে। (সুকৃতঃ) সুকর্মকারীরা (সরস্বতীম্) সুকর্মের জ্ঞানের জন্য জ্ঞানপ্রদা বেদবাণীর (হবন্তে) উচ্চারণ-পূর্বক স্বাধ্যায় করে। (সরস্বতী) জ্ঞানময়ী বেদবাণী (দাশুষে) ব্রহ্মদানকারীদের জন্য, (বার্যম্) তাঁকে অভিলষিত ফল (দাৎ) দেয়/প্রদান করে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[সরস্বতী = সরঃ জ্ঞানম্ (উণা০ ৪।১৯০ দয়ানন্দ ভাষ্য) + বতী। সরস্বতী অর্থাৎ বেদবাণীর সম্বন্ধে নিরুক্তকার যাস্কাচার্য লিখেছেন- "অর্থ বাচঃ পুষ্পফলমাহ। যাজ্ঞদৈবতে পুষ্পফলে, দেবতাধ্যাত্মে বা (১।৬।২০)। অর্থাৎ বেদবাণীর ফল তিনটি- যজ্ঞপ্রক্রিয়ার জ্ঞান, তথা অগ্নি বায়ু সূর্য সোম আদি দিব্যতত্ত্ব-সমূহের জ্ঞান, তথা অধ্যাত্মতত্ত্ব-সমূহের জ্ঞান, অর্থাৎ শরীর, ইন্দ্রিয়াং, মন, বুদ্ধি, জীবাত্মা, পরমাত্মা, জন্ম-মরণ, মোক্ষ তথা কর্মব্যবস্থা ও পরমেশ্বরের স্বরূপাদির জ্ঞান। সরস্বতী = বাক্ (নিঘং০ ১।১১); তথা (উণা০ ৪।১৯০)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

সরস্বতীং পিতরো হবন্তে দক্ষিণা যজ্ঞমভিনক্ষমাণাঃ।

আসদ্যাস্মিন্ বর্হিষি মাদয়ধ্বমনমীবা ইষ আ ধেহ্যস্মে ৷ অথর্ব০ ১৮।১।

পদার্থঃ (সরস্বতীম্) সরস্বতী [বিজ্ঞানবতী বেদবিদ্যাকে] (দক্ষিণা) সরল মার্গে (যজ্ঞম্) যজ্ঞ [সংযোগব্যবহার] (অভিনক্ষমাণাঃ) প্রাপ্তকারী (পিতরঃ) পিতর [পালনকারী বিজ্ঞানীরা] (হবন্তে) আহ্বান করে। [হে বিদ্বানগণ !] (অস্মিন্) এই (বর্হিষি) বৃদ্ধি কর্মে (আসদ্য) বসে (মাদয়ধ্বম্) [সকলকে] তৃপ্ত করো, [হে সরস্বতী !] (অস্মে) আমাদের মধ্যে (অনমীবাঃ) পীড়া রহিত (ইষঃ) ইচ্ছা (আ ধেহি) স্থাপিত করো॥৪২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বিদ্বানগণ নির্বিঘ্ন হয়ে সরল রীতিতে সকলের সাথে মিলেমিশে বেদবিদ্যার প্রচার দ্বারা বিজ্ঞানের বৃদ্ধি এবং ইষ্ট পদার্থের সিদ্ধি করে ॥৪২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (দক্ষিণা = দক্ষিণাবন্তঃ) দক্ষিণা প্রদান করে/প্রদানকারী, এবং (যজ্ঞম্) যজ্ঞে (অভি নক্ষমাণাঃ) ব্যাপ্ত থাকা (পিতরঃ) গৃহস্থী মাতা-পিতা বা পতি-পত্নী, (সরস্বতীং হবন্তে) তদনুকূল বেদবাণীর উচ্চারণ করে। হে পিতরগণ ! (অস্মিন্ বর্হিষি) এই বৃদ্ধিকারক যজ্ঞকর্মে (আসদ্য) নিষ্ঠাবান্ হয়ে আপনারা (মাদয়ধ্বম্) স্বয়ংও আনন্দিত থাকুন, এবং অন্যদেরও আনন্দিত করুন। হে সরস্বতী= জ্ঞানপ্রদা বেদবাণী ! তুমি (অস্মে) আমাদের মধ্যে (অনমীবাঃ বাঃ) নীরোগ (ইষঃ) ইচ্ছা-সমূহের (আ ধেহি) আধান/সঞ্চার করো, অর্থাৎ তোমার স্বাধ্যায় দ্বারা আমাদের ইচ্ছা সাত্ত্বিক হোক/হয়। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[বর্হি= বৃংহতি বর্দ্ধতে তদ্ বর্হিঃ (উণা০ ২।১১১), দয়ানন্দ ভাষ্য। নক্ষতি ব্যাপ্তিকর্মা (নিঘং০ ২।১৮)।]

সর॑স্বতি॒ যাস॒রথং॑ য॒যাথো॒ক্থৈঃ স্ব॒ধাভি॑র্দেবি পি॒তৃভি॒র্মদ॑ন্তী।

স॑হস্রা॒র্ঘমি॒ডোঅত্র॑ ভা॒গং রা॒যস্পোষং॒ যজ॑মানায় ধেহি ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

সরস্বতী আহ্বানের উপদেশ। 

পদার্থঃ (সরস্বতি) হে সরস্বতী ! [বিজ্ঞানবতী বেদবিদ্যা] (দেবি) হে দেবী ! [উত্তম গুণবতী] (যা) যে তুমি (উক্থৈঃ) বেদোক্ত স্তোত্র দ্বারা (সরথম্) রমণীয় গুণান্বিত হয়ে এবং (স্বধাভিঃ) আত্মধারণ শক্তির সহিত [বিরাজমান] (পিতৃভিঃ) পিতরদের [বিজ্ঞানীদের] সাথে (মদন্তী) তৃপ্ত হয়ে (যয়াথ) প্রাপ্ত হয়েছো। সেই তুমি (অত্র) এখানে (ইডঃ) বিদ্যার (সহস্রার্ঘম্) সহস্র প্রকার পূজনীয় (ভাগম্) ভাগকে এবং (রায়ঃ) ধনের (পোষম্) বৃদ্ধিকে (যজমানায়) যজমান [বিদ্বানদের সৎকারীর] জন্য (ধেহি) দান করো॥৪৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

আত্মবিশ্বাসী বিজ্ঞানীগণ বেদবিদ্যা প্রাপ্ত করে আনন্দ ভোগ করে। সব মনুষ্য বিদ্বানদের সৎসঙ্গ দ্বারা বেদবিদ্যা গ্রহণ করে ধন আদির বৃদ্ধি করুক ॥৪৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (দেবি) হে জ্ঞানপ্রদায়িনী! (সরস্বতি) জ্ঞানময়ী বেদবাণী ! (পিতৃভিঃ) মাতা-পিতা আচার্য আদি পিতরদের দ্বারা (মদন্তী) জ্ঞান-বিজ্ঞানেল স্তবনকারী (যা) যে তুমি, (উক্থৈঃ) নিজ সূক্ত সহিত, এবং (স্বধাভিঃ) বিবিধ লৌকিক ও পরলৌকিক অন্নের জ্ঞান প্রদানকারী, (সরথম্) এবং এই জ্ঞান-সমূহের সাথে রমণ করে (যয়াথ) আমাদের প্রাপ্ত হয়েছো, সেই তুমি (অত্র) এই জীবনে, (যজমানায়) তোমার যজন অর্থাৎ স্বাধ্যায় সঙ্গ তথা ব্রহ্ম/অন্নদানকারীর জন্য, (ইডঃ) মন্ত্রসমূহে স্তুত (সহস্রার্ঘম) বহুমূল্য (ভাগম্) সেবনীয় ভাগ, তথা (রায়স্পোষম্) লৌকিক ও পরলৌকিক সম্পত্তির পরিপোষণ, (ধেহি) স্থাপিত করো, প্রদান করো। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[সরথম্ = মানো এক রথে স্থিত; in company with। যযাথ = যা প্রাপণে। পিতৃভিঃ = "জনকো জননী চৈব যশ্চ বিদ্যাং প্রয়চ্ছতি। অন্নদাতা ভয়ত্রাতা পঞ্চৈতে পিতরঃ স্মৃতাঃ"। মদন্তী=মদ স্তুতৌ। ইডঃ= ইল়ঃ ঈট্টে স্তুতিকর্মণঃ (নিরু০ ৮।২।৮)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

উদীরতামবর উৎ পরাস উন্মধ্যমাঃ পিতরঃ সোম্যাসঃ। 

অসুং য ঈয়ূরবৃকা ঋতজ্ঞান্তে নোহবস্তু পিতরো হবেষু ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৪ 

পিতৃসৎকারোপদেশঃ−

পদার্থঃ (অবরে) নিম্ন পদস্থ (সোম্যাসঃ) ঐশ্বর্যের হিতকারী, (পিতরঃ) পিতর [পালনকারী বিদ্বান্] (উৎ) উত্তমরূপে, (পরাসঃ) উচ্চ পদস্থ (উৎ) উত্তমরূপে এবং (মধ্যমাঃ) মধ্য পদস্থ (উৎ) উত্তমরূপে (ঈরতাম্) চলুক/গমন করুক। (যে) যে (অবৃকাঃ) নেকড়ে বা চোরের স্বভাবরহিত, (ঋতজ্ঞাঃ) সত্য ধর্মের জ্ঞাতা [বিদ্বানগণ] (অসুম্) প্রাণ [বল বা জীবন] (ঈয়ুঃ) প্রাপ্ত করেছে (তে) সেই (পিতরঃ) পিতর [পালনকারীরা] (নঃ) আমাদের (হবেষু) সংগ্রামে (অবন্তু) রক্ষা করুক ॥৪৪॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

প্রধান পুরুষের উচিত, বিদ্যা, কর্ম এবং স্বভাবের যোগ্যতা অনুসারে বিদ্বানদের সৎকার করা, যাতে তাঁরা সকলের রক্ষা করার ক্ষেত্রে সদা তৎপর থাকে ॥৪৪॥মন্ত্র ৪৪-৪৬ কিছুটা হলেও ঋগ্বেদে আছে−১০।১৫।১, ৩, ২ এবং যজুর্বেদে ১৯।৪৯, ৫৬, ৬৮ এবং মহর্ষিদয়ানন্দকৃত ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা পিতৃযজ্ঞবিষয়েও ব্যাখ্যাত রয়েছে॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অবরে) কম আয়ু-এর, (মধ্যমাঃ) মধ্যম আয়ু-এর, (পরাসঃ) তথা এগুলো থেকে বড়ো আয়ু-এর, (সোম্যাসঃ) সোম্যস্বভাবযুক্ত (পিতরঃ) পিতর (উদীরতাম্) আমাদের সদুপদেশের কথন করুক। (যে) যে পিতর (অসুম্) যথার্থ প্রজ্ঞা = যথার্থ জ্ঞান (ঈয়ুঃ) প্রাপ্ত করেছে, (অবৃকাঃ) নেকড়ে/কোনোরকম/সবরকম হিংস্রবৃত্তি এবং ক্রোধী স্বভাব রহিত, তথা (ঋতজ্ঞাঃ) ঋত ও অনৃত-এর বিবেকী, (তে পিতরঃ) সেই পিতর (হবেষু) আমাদের শ্রদ্ধাপূর্বক আহ্বানে (নঃ অবন্তু) আমাদের প্রাপ্ত হোক, এবং নিজের সদুপদেশ দ্বারা আমাদের রক্ষা করুক। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[উদীরতাম্ = উদ্ + ঈর্= কথন। যথা - "উদীরিতোঽর্থঃ পশুনাপি গৃহ্যতে"। মনু-এর অনুসারে পিতৃশ্রাদ্ধ গৃহস্থের ধর্ম। পঞ্চমহাযজ্ঞে পিতৃ-যজ্ঞেরও বিধান আছে। জ্যেষ্ঠ পুত্রের প্রথম সন্তান হবার পর গৃহস্থী প্রায় ৫০ বর্ষের হয়ে ধর্মানুসারে বানপ্রস্থী হয়ে যায়। সেই সময় গৃহস্থীর পিতামহ প্রায় ৭৫ বর্ষের, তথা প্রপিতামহ ১০০ বর্ষের হয়/হয়ে যায়। বৈদিক সিদ্ধান্তানুসারে মনুষ্যের আয়ু ১০০ বর্ষের বলা হয়েছে। এইজন্য মনুষ্যকে শতায়ু বলা হয়। ব্রহ্মচারী ২৫তম বর্ষের আরম্ভে বিবাহ করে প্রায় এক বর্ষের ভেতর/মধ্যে সন্তানযুক্ত/সন্তানসম্পন্ন হতে পারে। এইভাবে এই গৃহস্থীর জন্য "পিতৃযজ্ঞ" বা পিতৃশ্রাদ্ধে আহ্বানযোগ্য এঁর পিতা পিতামহ এবং প্রপিতামহের জীবিত থাকা প্রায় সম্ভাবিত। এঁদের মধ্যে গৃহস্থীর পিতাকে "অবর", পিতামহকে "মধ্যম", তথা "প্রপিতামহ" কে "পর" পিতর বলা হয়েছে। শ্রাদ্ধও কেবল এই তিন পুরুষ পর্যন্তই সীমিত থাকে। এইজন্য মন্ত্র ৪৪ এ জীবিত পিতরদেরই বর্ণনা জানা/বোঝা উচিৎ। জীবিত পিতরই উপদেশ দেয়/প্রদান করে/দিতে সক্ষম, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সৌম্যস্বভাব তথা ঋতানৃত বিবেকী হয়ে তথা গৃহস্থীদের প্রাপ্ত হয়ে নিজ সদুপদেশ দ্বারা গৃহস্থীর রক্ষা করতে পারে/সক্ষম। উৎ= তিন প্রকারের পিতরদের সাথে "উৎ + ঈরতাম" এর অন্বয় হয়। এইজন্য "উৎ" এর প্রয়োগ তিন বার হয়েছে। অবন্তু-এ "অব্" = প্রাপ্তি তথা রক্ষা। "অসুম্ ঈয়ুঃ" এর অর্থ 'জীবনপ্রাপ্ত বা প্রাণ প্রাপ্ত" - এমনটা প্রায়ঃ করা হয়। যে মৃতপিতর নবজীবন এবং নবপ্রাণ প্রাপ্ত হয়ে গেছে, তাঁদের আহ্বান অসম্ভব। তাঁরা তো নতুন শরীরে চলে গেছে।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

আহং পিতৃনৎসুবিদত্রাঁ অবিৎসি নপাতং চ বিক্রমণং চ বিষ্ণোঃ। 

বহিষদো যে স্বধয়া সুতস্য ভজন্ত পিত্বস্ত ইহাগমিষ্ঠাঃ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

পিতৃসৎকারোপদেশঃ−

পদার্থঃ (অহম্) আমি (বিষ্ণোঃ) বিষ্ণু [সর্বব্যাপক পরমাত্মা] থেকে (সুবিদত্রান্) বড়ো জ্ঞানী বা বড়ো ধনী (পিতৄন্) পিতরদের [পালনকারী বিদ্বানদের] (চ চ) এবং (নপাতম্) অনশ্বর (বিক্রমণম্) বিবিধ প্রবৃত্তিকে (আ অবিৎসি) প্রাপ্ত করেছি। (যে) যে তোমরা (বর্হিষদঃ) উত্তম পদে স্থিত (স্বধয়া) নিজের ধারণ শক্তি দ্বারা (সুতস্য) ঐশ্বর্যযুক্ত (পিত্বঃ) রক্ষাসাধন অন্নের (ভজন্ত) সেবন করেছো, (তে) সেই তোমরা সবাই (ইহ) এখানে (আগমিষ্ঠাঃ) এসেছো/আগমন করেছো ॥৪৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

প্রধান পুরুষ পরমাত্মার কৃপা দ্বারা ধর্মাত্মাদের সাথে কার্যকুশলতা প্রাপ্ত করে/করুক এবং যে বড়ো পরাক্রমী বিদ্বান্ আছে, তাঁদের উচিত সৎকার করে প্রজাদের রক্ষা করে/করুক ॥৪৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ শ্রদ্ধাবান্ গৃহস্থী বলে, আমার দেওয়া নিমন্ত্রণে (অহম্) আমি (সুবিদত্রান্) সুবিজ্ঞ (পিতৄন্)  পিতরদের (আ অবিৎসি) প্রাপ্ত করেছি। এবং তাঁদের সদুপদেশ দ্বারা আমি (বিষ্ণোঃ) সর্বব্যাপক পরমেশ্বরের সেই নিয়ম-ব্যবস্থাকে (ন পাতম্) যার দ্বারা/মাধ্যমে মনুষ্যের পতন হয় না, তথা (বিক্রমণ চ) সর্বব্যাপক পরমেশ্বরের বিক্রম ও পরাক্রমকে আমি জেনে নিয়েছি/জ্ঞাত হয়েছি। (যে) যে পিতর (বর্হিষদঃ) কুশ-আসনের ওপর বসে, (স্বধয়া) নিজ-নিজ ধারণার অনুসারে, (সুতস্য) পুত্রের  (পিত্বঃ) অন্নের (ভজন্ত) সেবন করে, (তে) সেই পিতর (ইহ) এই আমার ঘরে (আ গমিষ্ঠাঃ) এসে পদার্পণ করেছে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[নপাতম্ এর অর্থ অনেকে "পৌত্র" করেছে। বিষ্ণুর কী কোনো "পৌত্র" আছে? স্বধা = স্ব + ধা (ধারণা)। পিতুঃ= অন্ন (নিঘং০ ২।৭); পিত্বঃ ষষ্ঠ্যেকবচন। বিক্রমণম্ = সর্বব্যাপক পরমেশ্বর পরাক্রমশীল। উনার নিয়ম ব্যবস্থার উল্লঙ্ঘন করে দণ্ড থেকে বঞ্চিত কেউ হতে পারে না।]  বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ইদং পিতৃভ্যো নমো অদ্ভুদ্য যে পূর্বাসো যে অপরাস ঈয়ুঃ। 

যে পার্থিবে রজস্যা নিষত্তা যে বা নূনং সুবৃজনাসু দিক্ষু ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৬ 

পিতৃসৎকারোপদেশঃ−

পদার্থঃ (ইদম্) এই (নমঃ) অন্ন (পিতৃভ্যঃ) সেই পিতরদের [পালনকারী বীরদের] জন্য (অদ্য) আজ (অস্তু) হোক(যে) যে (পূর্বাসঃ) পূর্বে [বিদ্বান্] হয়ে এবং (যে) যে (অপরাসঃ) অর্বাচীন [নবীন বিদ্বান্] হয়ে (ঈয়ুঃ) চলেছে। (যে) যে (পার্থিবে) ভূমি বিদ্যা [রাজনীতি আদি] সম্পর্কিত (রজসি) সমাজে (আ) এসে (নিষত্তাঃ) উপবেশন করেছে, (বা) এবং (যে)  যে (নূনম্) নিশ্চিতরূপে (সুবৃজনাসু) অনেক শক্তিসম্পন্ন [গঢ় সেনা আদি] (দিক্ষু) বিভিন্ন দিশায় রয়েছে॥৪৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

রাজা সেই বৃদ্ধ এবং যুবক বিদ্বানদের যথোচিত আদর করে, যে/যারা নীতিকুশল হয়ে ভূমিসম্বন্ধী অনেক বিদ্যার প্রচার করে রাজ্যের উন্নতি করে ॥৪৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অদ্য) আজ পিতৃযজ্ঞে (পিতৃভ্যঃ) পিতরদের জন্য (ইদম্) এই (নমঃ) নমস্কার তথা অন্ন (অস্তু) হোক, (যে) যে পিতর (পূর্বাসঃ) পূর্বকালের, অর্থাৎ বয়স্ক পিতামহ তথা প্রপিতামহ, (যে) যে (অপরাসঃ) অপর কালের, অর্থাৎ তাঁদের থেকে ছোটো আয়ুর পিতা আদি আছে, যে/যারা (ঈয়ুঃ) আমার ঘরে আগমন করেছে/এসেছে। পিতর (যে) যারা (পার্থিবে রজসি) পৃথিবী লোকে (নিষত্তাঃ) স্থিত, (বা) এবং (যে) যে/যারা (নূনম্) নিশ্চিতরূপে (সুবৃজনাসু) চোর ডাকাত তথা পাপকর্ম বর্জিত (দিক্ষু) দিগ্-দিগন্তরে স্থিত। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[বা সমুচ্চয়ার্থে (নি০ ১।২।৫)।]

মাতলী কব্যৈর্ষমো অঙ্গিরোভিবৃহস্পতিঋক্বভির্বাবৃন্ধানঃ। 

যাংশ্চ দেবা বাবৃধুর্যে চ দেবাংস্তে নোহবস্তু পিতরো হবেষু ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৭ 

পিতৃকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ (মাতলী) ঐশ্বর্য সিদ্ধকারী, (যমঃ) সংযমী এবং (বৃহস্পতিঃ) বৃহস্পতি [বৃহৎ বিদ্যার রক্ষক পুরুষ] (কব্যৈঃ) বুদ্ধিমানদের হিতকারী (অঙ্গিরোভিঃ) বিজ্ঞানী মহর্ষিদের দ্বারা (ঋক্বভিঃ) প্রশংসাযোগ্য কাজের দ্বারা (বাবৃধানঃ) বর্ধমান/বর্ধনশীল হয়। (চ) এবং (যান্) যে [পিতরদের] (দেবাঃ) বিদ্বানগণ  (বাবৃধুঃ) বর্ধিত করেছে, (চ) এবং (যে) যে [পিতরগণ] (দেবান্) বিদ্বানদের [বর্ধিত করেছে], (তে) সেই (পিতরঃ) পিতর [পালনকারীগণ] (নঃ) আমাদের (হবেষু) সংগ্রামে (অবন্তু) রক্ষা করবে/করুক ॥৪৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ঐশ্বর্য কামনাকরী জিতেন্দ্রিয় পুরুষ বড়ো-বড়ো বিদ্বানদের উপদেশ এবং বেদাদি শাস্ত্রের মনন দ্বারা উন্নতি করে সংসারের রক্ষা করুক ॥৪৭॥এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে −১০।১৪।৩। এবং ঋগ্বেদ পাঠ মহর্ষিদয়ানন্দকৃত সংস্কারবিধি অন্ত্যেষ্টিপ্রকরণে উদ্ধৃত ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (কব্যৈঃ) বেদকাব্যের কবি পরমেশ্বরের উপাসকদের সমেত/সহিত (মাতলী) মাতৃরূপ পরমেশ্বরের মধ্যে লীন যোগেশ্বর; (অঙ্গিরোভিঃ) প্রাণায়ামাভ্যাসী শিষ্যদের সমেত/সহিত (যমঃ) যম-নিয়মে সিদ্ধ সংযমী; (ঋক্বভিঃ) ঋচা-সমূহের স্বাধ্যায়কারী শিষ্যদের সহিত (বৃহস্পতিঃ) বৃহতী = বেদবাণীর আচার্য; (বাবৃধানঃ) এদের মধ্যে প্রত্যেকে, যে/যারা নিজের শিষ্যবর্গের বৃদ্ধি করে, সেই-সেই বিষয়ের দৃষ্টিতে তাঁদের বৃদ্ধি করে; তথা (দেবাঃ) দেবকোটির প্রজাজন (যান্) যে এই উপর্যুক্ত সাধকদের বর্ধিত করে; (চ) এবং (যে) যে এই সাধক (দেবান্) প্রজাদের মধ্যে দেবকোটির লোকেদের বৃদ্ধি নিজ সদুপদেশ দ্বারা করে, - (তে) সেই এমন (পিতরঃ) পিতর (হবেষু) আমাদের নিমন্ত্রণে (নঃ) আমাদের (ভবন্তু) প্রাপ্ত হোক, এবং সদুপদেশ দ্বারা আমাদের রক্ষা করুক। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[অঙ্গিরাঃ = প্রাণঃ, "অঙ্গানাং রসঃ" (বৃহদারণ্যক০ ১।৩৯। ৩)। বৃহস্পতিঃ= বৃহতী = বাক্, তস্যাঃ পতিঃ। কবি= পরমেশ্বরঃ - "কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূঃ" (যজু০ ৪০।৮)। মাতলী = মাতরি জগন্মাতরি লীয়তে ইতি, বিভক্তিলোপঃ ছান্দসঃ। "মাতলী" শব্দের ওপর নিম্নলিখিত মন্ত্র বিশেষ আলোকপাত করে । যথা- ১. মা॒য়া হ॑ জজ্ঞে মা॒য়ায়া॑ মা॒য়ায়া॒ মাত॑লী॒ পরি॑। (অথর্ব০ ৮।৯।৫)। (মায়া) অর্থাৎ প্রজ্ঞা। নিঘং০ ৩।৯ (মায়ায়াঃ) অর্থাৎ প্রজ্ঞান ব্রহ্মের প্রজ্ঞা দ্বারা/থেকে (জজ্ঞে) প্রকট হয়েছে। এবং এই প্রকটিত (মায়ায়াঃ পরি) প্রজ্ঞা দ্বারা/থেকে (মাতলী) মাতলী প্রকট হয়েছে। অভিপ্রায় হল, যোগীর প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞানময় ব্রহ্মের অনুগ্রহ দ্বারা প্রকট হয়। এবং যৌগিক প্রজ্ঞা থেকে/দ্বারা জগন্মাতার মধ্যে লীন যোগেশ্বর প্রকট হয়। ২. যন্মাত॑লী রথক্রী॒তম॒মৃতং॒ বেদ॑ ভেষ॒জম্। তদিন্দ্রো॑ অ॒প্সু প্রাবে॑শয়॒ত্তদা॑পো দত্ত ভেষ॒জম্ ॥ (অথর্ব০ ১১।৬।২৩) (মাতলী) মাতলী (যৎ) যে (অমৃতম্) অমর ব্রহ্মকে (রথক্রীতম্) নিজের শরীর-রথ এবং মনোরথের মূল্য দ্বারা ক্রয় করেছে, সেই অমর ব্রহ্মকে মাতলী (ভেষজম্) ভেষজরূপ (বেদ) জেনেছে। (ইন্দ্রঃ) তদনন্তর প্রবুদ্ধ জীবাত্মা (তৎ) সেই ভেষজকে (অপ্সু) নিজের রস-রক্ত এবং কর্মে (প্রাবেশয়ৎ) প্রবিষ্ট করিয়ে দিয়েছে। (আপঃ) তদনন্তর কর্ম (তদ্) সেই (ভেষজম্) ভেষজ (দত্ত) অন্যদেরকেও প্রদান করেছে। এই মন্ত্র দ্বারাও "মাতলী" জগন্মাতার মধ্যে ধ্যানপ্রকর্ষ দ্বারা লীন যোগীই প্রতীত হয়। যোগাভ্যাসী যখন নিজের শারীরিক প্রচেষ্টা এবং মানসিক সঙ্কল্প-বিকল্পকে পরমেশ্বরের প্রতি উপহার রূপে অর্পণ করে দেয়, তখন সে পরমেশ্বরের ভেষজরূপ জানতে পারে/জ্ঞাত হয়। এই ভেষজ দ্বারা তার সব অন্তরায় এবং অবিদ্যারূপী রোগ নষ্ট হয়/হতে থাকে/হতে শুরু করে। যোগী এই ভেষজকে নিজের জীবনের সাধনভূত রস-রক্তে তথা কর্ম-সমূহের মধ্যে প্রবিষ্ট করে, নিজের রস-রক্ত এবং কর্মের রোগ-সমূহের নিবৃত্তি করে। তৎপশ্চাৎ নিজ কর্মের দ্বারা সেই ভেষজের জ্ঞান অন্যদেরও দেয়/প্রদান করে। [আপঃ; অপঃ= উদকম্ (নিঘং০ ১।১২); তথা কর্ম (নিঘং০ ২।১)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

স্বাদুদ্ধিলায়ং মধুমাঁ উতায়ং তীব্রঃ কিলায়ং রসবাঁ উতায়ম্। 

উতো স্বস্য পপিবাংসমিন্দ্রং ন কশ্চন সহত আহবেষু ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

শূরবীরলক্ষণোপদেশঃ−

পদার্থঃ (অয়ম্) ইহা [সোম অর্থাৎ বিদ্যারস বা সোমলতা আদি রস] (কিল) নিশ্চিতরূপে  (স্বাদুঃ) স্বাদু, (অয়ম্) ইহা (মধুমান্) বিজ্ঞানযুক্ত [বা মধুরগুণযুক্ত], (উত) এবং (অয়ম্) ইহা (কিল) নিশ্চিতরূপে (তীব্রঃ) তেজস্বী, (উত) এবং (অয়ম্) ইহা (রসবান্) উত্তম রসালো [বীর্যবান্] । (উতো) এবং (নু) এখন (অস্য) এই [রসের] (পপিবাংসম্) পানকারী/আস্বাদনকারী (ইন্দ্রম্) ইন্দ্র [বড়ো ঐশ্বর্যবান বীর পুরুষকে] (কঃ চন) কেউ (আহবেষু) সংগ্রামে (ন) না (সহতে) পরাজিত করে ॥৪৮॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যে মনুষ্য জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী হয়ে বিদ্যারস তথা পরীক্ষিত মহৌষধির রস গ্রহন করে তেজস্বী হয়, সে যুদ্ধে শত্রুদের পরাজিত করে॥৪৮॥এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−৬।৪৭।১ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ(স্বাদুঃ) সুস্বাদু (কিল) নিশ্চিতরূপে (অয়ম) এই রস, (উত) এবং (মধুমান্) মধুময় বা মধুর (অয়ম) এই রস, (কিল) নিশ্চিতরূপে (তীব্রঃ) ঔষধি-সমূহের তীব্র (অয়ম্) এই রস, (উত) এবং (রসবান্) নানা রসের সঙ্গে মিশ্রিত (অয়ম্) এই রস। (উত উ নু) এবং নিশ্চিতরূপে (অস্য) এমন রস (পপিবাংসম) পানকারী (ইন্দ্রম্) জীবাত্মাকে, (আহবেষু) দেবাসুর সংগ্রামে, (কশ্চন) কোনো আসুরী কর্ম বা আসুরী ভাব (ন সহতে) না পরাভূত/পরাজিত করতে পারে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নানাবিধ রসালো পদার্থের সেবন করা উচিৎ, যা সাত্ত্বিক এবং সুপাচ্য, এবং ঔষধগুণ যুক্ত। ইহার মাধ্যমে ব্যক্তি সাত্ত্বিক এবং নীরোগ হয়ে পাপের ওপর বিজয় পায়/প্রাপ্ত করে। ইন্দ্রঃ=জীবাত্মা। যথা - ইন্দ্রিয়ম্ = ইন্দ্রলিঙ্গম্। মন্ত্রে আনন্দরসরূপ পরমেশ্বরের বর্ণনাও অভিপ্রেত আছে/হয়েছে।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

পরেয়িবাংসং প্রবতো মহীরিতি বহুভ্যঃ পন্থামনুপস্পশানম্। 

বৈবস্বতং সঙ্গমনং জনানাং যমং রাজানাং হবিষা সপর্ষত ॥ অথর্ব০ ১৮।১।

প॒রে॒য়ি॒ऽবাংস॑ম্ । প্র॒ऽবত॑ঃ । ম॒হীঃ । ইতি॑ । ব॒হুঽভ্য॑ঃ । পন্থা॑ম্ । অ॒নু॒ऽপ॒স্প॒শা॒নম্ ।
বৈ॒ব॒স্ব॒তম্ । স॒ম্ঽগম॑নম্ । জনা॑নাম্ । য॒মম্ । রাজা॑নম্ । হ॒বিষা॑ । স॒পর্য॑ত॒ ॥ 

পরমাত্মশক্ত্যুপদেশঃ−

পদার্থঃ(প্রবতঃ) উত্তমগতিযুক্ত (মহীঃ) বিস্তৃত ভূমিতে (পরেয়িবাংসম্) পরাক্রমপূর্বক আগত/উপস্থিত/উপনীত, (ইতি) ইহার দ্বারা/মাধ্যমে, (বহুভ্যঃ) অনেক [লোক-সমূহ এবং জীবদের] জন্য (পন্থাম্) মার্গ (অনুপস্পশানম্) বন্ধনকারী (বৈবস্বতম্) সূর্যলোক-সমূহে বিদিত, (জনানাম্) মনুষ্যদের/মনুষ্যদের মধ্যে (সঙ্গমনম্) সংযোগকারী/সংযোজক/মেল সৃষ্টিকারী (যমম্) যম [ন্যায়কারী পরমাত্মা] (রাজানম্) রাজা [শাসককে] (হবিষা) ভক্তিপূর্বক (সপর্যত) তুমি পূজা করো ॥৪৯॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যে পরমাত্মা সব লোক-সমূহের মধ্যে ব্যাপক এবং সূর্য আদির আকর্ষক এবং মনুষ্য আদির নিয়ামক, সকল মনুষ্য উনার উপাসনা দ্বারা উন্নতি করুক ॥৪৯॥মন্ত্র ৪৯, ৫০ কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে−১০।১৪।১, ২। এবং ঋগ্বেদপাঠ মহর্ষিদয়ানন্দকৃত সংস্কারবিধি অন্ত্যেষ্টিপ্রকরণে উদ্ধৃত॥ ক্ষেমকরণ ত্রিবেদী

পদার্থঃ(প্রবতঃ) দূর-দূরান্তের (মহীঃ) মহালোকলোকান্তরে (পরেয়িবাংসম) উপনীত, (বহুভ্যঃ) নানা উপাসকদের (পন্থাম্, অনু পস্পশানম্)১ নিরন্তর মার্গ দর্শিয়ে/দেখিয়ে, (বৈবস্বতম্) সূর্যাধিপতি (জনানাম্) উপাসকদের (সঙ্গমনম্) নিজ সঙ্গতিতে গ্রহণকারী, (যমম্) জগন্নিয়ন্তা, (রাজানম্) জগতের মহারাজ পরমেশ্বরের, (হবিষা) আত্মসমর্পণের হবি-সমূহের দ্বারা, (সপর্যত) পরিচর্যা করো। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

["পস্পশাহ্নিক" (মহাভাষ্য পতঞ্জলি) তথা "স্পশাঃ" শব্দগুলোতে স্পশ ধাতু দর্শনার্থক প্রতীত হয়। ইংরেজির "spy" শব্দেও এই "স্পশ" এর প্রয়োগ হয়/হয়েছে/আছে। ইহা বৈদিক ধাতু।]

যমো নো গাতুং প্রথমো বিবেদ নৈষা গব্যূতিরপভর্তবা উ। 

যত্রা নঃ পূর্বে পিতরঃ পরেতা এনা জজ্ঞানাঃ পথ্যা অনু স্বাঃ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৫০

পরমাত্মশক্ত্যুপদেশঃ−

পদার্থঃ (প্রথমঃ) সর্বপ্রথম বর্তমান (যমঃ) যম [ন্যায়কারী পরমাত্মা] (নঃ) আমাদের জন্য (গাতুম্) মার্গ (বিবেদ) জেনেছেন, (এষা) এই (গব্যূতিঃ) মার্গ (উ) কখনও (অপভর্তবৈ) অপসারণ যোগ্য (ন) নয়। (যত্র) যে [মার্গে] (নঃ) আমাদের (পূর্বে) পূর্বে (পিতরঃ) পিতর [পালনকারী লোকেরা] (পরেতাঃ) পরাক্রমী হয়ে চলেছে, (এনা) উহার মাধ্যমে (জজ্ঞানাঃ) উৎপন্ন [প্রাণী] (স্বাঃ) নিজ-নিজ (পথ্যাঃ অনু) পথে [চলুক] ॥৫০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পরমাত্মা সর্বপ্রথম সকলের জন্য বেদমার্গ উন্মুক্ত করেছেন, যেভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই মার্গে গমন করে যশ প্রাপ্ত করেছে, সেই বেদমার্গে গমন করে সব মনুষ্য উন্নতি করুক ॥৫০॥

[অপ + ভৃ = অপ + হৃ। হৃগ্রহোঃ ভঃ ছন্দসি। পরেতাঃ= "পরা + ইতাঃ" শব্দ "মৃত্যু" অর্থ বাচক নয়। সূর্যা সূক্তের বিবাহ-প্রকরণে নব-বিবাহিত বধূকে বলা হয়েছে- 'এবা ত্বং সম্রাজ্ঞ্যেধি পত্যুরস্তং পরেত্য" (অথর্ব০ ১৪। ১।৪৩)। এ "পরেত্য" শব্দের অর্থ হল "গিয়ে", গত হয়ে নয়। এবিষয়ে অথর্ববেদের নিম্ননির্দিষ্ট মন্ত্র দ্রষ্টব্য। ৫।২২।৮; ৪।৩২।৫; ২।২৬।১; ১২।২।২৯।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

বহিষদঃ পিতর উত্যর্বাগিমা বো হব্যা চক্মা জুষধ্বম্।

ত আ গতাবসা শন্তমেনাধা নঃ শং যোররপো দধাত ৷ ৫১৷

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ(বর্হিষদঃ) হে উত্তম পদে স্থিত (পিতরঃ) পিতরগণ [পালনকারী বীরগণ] (ঊতী) রক্ষার সহিত (অর্বাক্) সামনে/অভিমুখী [হয়ে] (ইমা) এই (হব্যা) গ্রাহ্য ভোজন আদি (জুষধ্বম্) সেবন করো [যেগুলো] (বঃ) তোমাদের জন্য (চকৃম) আমরা তৈরি করেছি। (তে) সেই তোমরা (শন্তমেন) অত্যন্ত সুখদায়ক (অবসা) রক্ষার সহিত (আ গত) আগমন করো, (অধ) তদনন্তর (নঃ) আমাদের জন্য (শম্) সুখ, (যোঃ) অভয় এবং (অরপঃ) নির্দোষ আচরণ (দধাত) ধারণ করতে থাকো ॥৫১॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

সব মনুষ্য বয়োবৃদ্ধ এবং বিদ্যাবৃদ্ধ পিতরদের উত্তমরূপে/যত্নপূর্বক সৎকার করুক এবং তাঁদের থেকে শারীরিক, আত্মিক এবং সামাজিক উন্নতির শিক্ষা প্রাপ্ত হোক/করুক ॥৫১॥মন্ত্র ৫১, ৫২ কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে ১০।১৫।৪, ৬ এবং যজুর্বেদেও−১৯।৫৫, ৬২ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (বর্হিষদঃ) উত্তম কুশ-আসনের ওপর উপবেশয়িতা (পিতরঃ) হে পিতরগণ ! আপনারা (ঊতী) আমাদের রক্ষার জন্য (অর্বাক্) আমাদের সমীপে পদার্পণ করেছেন, (বঃ) আপনাদের জন্য (ইমা) এই (হব্যা) ভোজন যোগ্য পদার্থ-সমূহ (চকৃম) আমরা প্রস্তুত করেছি, (জুষধ্বম্) প্রীতিপূর্বক তা সেবন করুন। (তে) সেই আপনারা (শন্তমেন) অত্যন্ত কল্যাণকারক (অবসা) আমাদের রক্ষার জন্য (আ গত) আগমন করেছেন/এসেছেন। (অধা) ভোজনানন্তর (নঃ) আমাদের জীবনে (শম্) সুখশান্তি (অরপঃ) এবং পাপরহিত সত্যাচরণ (দধাত) স্থাপিত করুন, তথা আমাদের থেকে দুঃখকে (যোঃ) পৃথক্ করুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[শং যোঃ = "শমনং চ রোগাণাং যাবনং চ ভয়ানাম্" (নিরু০ ৪।৩।২১)।]

আচ্যা জানু দক্ষিণতো নিষদ্যেদং নো হবিরভি গৃণন্তু বিশ্বে।

মা হিংসিষ্ট পিতরঃ কেন চিন্নো যদ্‌ ব আগঃ পুরুষতা করাম্ ॥৫২॥

পদার্থঃ (পিতরঃ) হে পিতরগণ ! [রক্ষক বিদ্বানগণ] (বিশ্বে) তোমরা সবাই (জানু) জানু (আচ্য) নত/নীচু করে এবং (দক্ষিণতঃ) ডানদিকে (নিষদ্য) বসে (নঃ) আমাদের (ইদম্) এই (হবিঃ) গ্রাহ্য অন্ন (অভিগৃণন্তু) প্রশংসা যোগ্য করো। (বঃ) তোমাদের (যৎ) যা কিছু (আগঃ) অপরাধ (করাম) আমরা করি, (কেন চিৎ) সেই কোন [অপরাধের] কারণে (নঃ) আমাদের (পুরুষতা) নিজের পুরুষত্ব দ্বারা (মা হাসিষ্ট) দুঃখ দিও না ॥৫২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

মনুষ্য নিজের পিতাপিতামহ আদি পিতরদের সৎকারপূর্বক বসিয়ে ভোজন আদি সেবা করাবে এবং নিজের কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে ॥৫২॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পিতরগণ ! (জানু) জানু/হাঁটু (আচ্য) নত করে, অর্থাৎ আসনপিঁড়ি হয়ে বসে, এবং (দক্ষিণতঃ) যজমানের ডানদিকে (নিষদ্য) বসে, (বিশ্বে) আপনারা সবাই (নঃ) আমাদের সমর্পিত (হবিঃ) ভোজ্যান্নের দোষ-গুণ (অভি গৃণন্তু) কথন করুন, বা ভোজ্যান্ন স্বীকার করে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপদেশ দিন। (পিতরঃ) হে পিতরগণ ! সেবাশুশ্রূষায় (কেনচিৎ) কোনোরকম খামতি/ত্রুটি/অভাব অর্থাৎ অপরাধ দ্বারা আপনারা (নঃ) আমাদের (মা হিংসিষ্ট) হিংসিত করবেন না। (যদ্) যে অপরাধ (বঃ) আপনাদের প্রতি, (পুরুষতা) মানুষ-সুলভ প্রজ্ঞানের কারণে (করাম) আমরা করেছি। বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

[আসনপিঁড়ি হয়ে বসা, ভোজ্যান্ন স্বীকার করা, উপদেশাদির কথন - এগুলো জীবিত পিতরদের মধ্যেই সম্ভব, মৃতদের মধ্যে নয়। হিংসিষ্ট - সেবার ক্ষেত্রে অভাব/ত্রুটির কারণে ভবিষ্যতে নিমন্ত্রণে না আসা, এবং ইহার ফলে যজমানের দুঃখী হওয়া-এগুলোই হিংসা, মানসিক হিংসা। গৃণন্তু= গৃশব্দে, বিজ্ঞানে চ।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ত্বষ্টা দুহিত্রে বহতুং কৃণোতি তেনেদং বিশ্বং ভুবনং সমেতি।

যমস্য মাতা পর্যুহ্যমানা মহো জায়া বিবস্বতো ননাশ । ৫৩॥

অজ্ঞাননাশোপদেশঃ−

পদার্থঃ (ত্বষ্টা) ত্বষ্টা [প্রকাশমান সূর্য] (দুহিত্রে) দুহিতা [পূর্তিকারী/পূরণকারী ঊষার] (বহতুম্) বহন/চালনা (কৃণোতি) করে, (তেন) সেই [চলনের] সাথে (ইদম্) এই (বিশ্বম্) সব (ভুবনম্) জগৎ (সম্) ঠিক-ঠিক/সঠিকভাবে (এতি) চলে। (যমস্য) যম [দিনের] (মাতা) মাতা [নির্মাত্রী/রাত্রি], (মহঃ) মহৎ (বিবস্বতঃ) প্রকাশমান সূর্যের (জায়া) পত্নী রূপ [রাত্রি] (পর্যুহ্যমানা) সবদিকে দূরে গিয়ে (ননাশ) লুকিয়ে যায়/অদৃষ্ট হয়ে যায় ॥৫৩॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যেমন সূর্য ঊষা অর্থাৎ প্রভাত কিরণ-সমূহকে বিস্তারিত করে, সব জগৎ নিজ-নিজ কার্যে প্রচেষ্টা করে, এবং দিন বৃদ্ধির সাথে-সাথে, রাত্রির অন্ধকার দূর হয়ে যায়, এইভাবে জ্ঞানী পিতরগণ অজ্ঞান দূর করে জ্ঞানের প্রকাশ/আলো দ্বারা সংসারে সুখ প্রদান করুক॥৫৩॥ এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে −১০।১৭।১ ॥ভগবান্ যাস্ক মুনি নিরুক্ত১২।১১ এ ব্যাখ্যা করেছেন−“ত্বষ্টা দুহিতার বহন [চালনা] করে, এই সব ভুবন সঠিকভাবে চলে এবং এই সব প্রাণী সবদিক থেকে এসে মিলিত হয়, যমের মাতা সব দিকে গিয়ে লুকিয়ে গেছে। রাত্রি সূর্যের [পত্নী] সূর্য উদয় হলে লুকিয়ে যায়” ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (ত্বষ্টা) ঊষার রূপের নির্মাণকারী অনুদিত সূর্য, (দুহিত্রে) উষারূপী দুহিতার জন্য (বহতুম্) বিবাহ (কৃণোতি) রচনা করে, (তেন) এই কারণে (বিশ্বং ভুবনম্) সমগ্র প্রাণী ও অপ্রাণী জগত (সমেতি) মানো একত্রিত হয়। (যমস্য) দিন ও রাতের যুগলের/দম্পতির (মাতা) নির্মাণকারী ঊষা (পর্যুহ্যমানা) যখন চলে যেতে থাকে, তখন (মহঃ) তেজস্বী চমকিত (বিবস্বতঃ) সূর্যের (জায়া) জায়া রাত্রী (ননাশ) বিনষ্ট হয়ে যায়, অদৃষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

[ত্বষ্টা = "ত্বষ্টা বৈ রূপাণি করোতি" (তৈ০ ২।৭।২।১)। ত্বষ্টা দ্বারা অভিপ্রায় অনুদিত সূর্য। সেই সময়ে সূর্যের রশ্মি ঊষা রূপে পূর্ব আকাশে চমকিত হয়। ইহা মানো ঊষার পূর্ব আকাশের সাথে বিবাহ। এই সময়ে প্রাণী জগৎ জাগরিত হয়/থাকে, এবং অপ্রাণী জগতও চমকিত হয়, মানো তারা ঊষার বিবাহে সম্মিলিত হয়েছে। তদনন্তর তেজস্বী সূর্য চমকিত হয় তখন সূর্যের জায়া অর্থাৎ রাত্রী অদৃষ্ট হয়ে যায়। পিতৃ-প্রকরণে এই মন্ত্রের উল্লেখ ইহা দর্শানোর জন্য যে, পিতৃযজ্ঞ এই সময়ে হওয়া উচিৎ, রাত্রীকালে নয়।বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

প্রেহি প্রেহি পথিভিঃ পূর্যাণৈর্যেনা তে পূর্বে পিতরঋ পরেতাঃ। 

উভা রাজানৌ স্বধয়া মদন্তৌ যমং পশ্যাসি বরুণং চ দেবম্ ॥ অথর্ব০ ১৮।১।৫৪

প্র । ই॒হি॒ । প্র । ই॒হি॒ । প॒থিঽভি॑ঃ । পূ॒ঃऽযানৈ॑ঃ । যেন॑ । তে॒ । পূ॒র্বে॑ । পি॒তর॑ঃ । পরা॑ऽইতাঃ । উ॒ভা । রাজা॑নৌ । স্ব॒ধয়া॑ । মদ॑ন্তৌ । য॒মম্ । প॒শ্যাসি॒ । বরু॑ণম্ । চ॒ । দে॒বম্ ॥

মনুষ্যের উন্নতির উপদেশ।

পদার্থঃ [হে মনুষ্য !] তুমি (প্রইহি) অগ্রগামী/অগ্রসর হও, (পূর্যাণৈঃ) নগরের অভিমুখের (পথিভিঃ) মার্গ দ্বারা (প্র ইহি) অগ্রগামী/অগ্রসর হও, (যেন) যে [কর্ম] দ্বারা (তে) তোমার (পূর্বে) পূর্বে (পিতরঃ) পিতর [রক্ষক পিতাআদি মহাপুরুষ] (পরেতাঃ) পরাক্রমপূর্বক পৌঁছেছে। এবং (স্বধয়া) নিজের ধারণ শক্তি দ্বারা (মন্দন্তৌ) তৃপ্ত হয়ে (উভা) উভয় (রাজানৌ) শোভায়মান, [অর্থাৎ] (দেবম্) প্রকাশমান (যমম্) যম [ন্যায়কারী পরমাত্মাকে] (চ) এবং (বরুণম্) বরুণ [শ্রেষ্ঠ জীবাত্মাকে] (পশ্যাসি) তুমি দেখো ॥৫৪॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

মনুষ্যের উচিৎ, পূর্ব মহাত্মাদের বেদোক্ত মার্গে গমন করে দেশ-দেশান্তরে গিয়ে উন্নতি করা এবং সদা পরমাত্মার উপাসনা দ্বারা জীবাত্মার বিভিন্ন দশার চিন্তন করা/করতে থাকা ॥৫৪॥মন্ত্র৫৪, ৫৫ কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।১৪।৭, ৯ এবং উভয়ের ঋগ্বেদপাঠ মহর্ষিদয়ানন্দকৃত সংস্কারবিধি অন্ত্যেষ্টিপ্রকরণে উদ্ধৃত ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ বানপ্রস্থ ধারণকারীকে বলা হয়, (প্রেহি) যাও, (পূর্যাণৈঃ) নাগরিক-রথ দ্বারা (পথিভিঃ) তথা নাগরিক মার্গ দ্বারা (প্রেহি) যাও, (যেন) যে মার্গের দ্বারা (তে) তোমার (পূর্বে পিতরঃ) পিতা পিতামহ আদি আগামী-আগামী আশ্রমে (পরেতাঃ) গেছে। সেখানে তুমি (যমং দেবম্) যম দেবতার (চ) এবং (বরুণং দেবম্) বরুণদেবতার (পশ্যাসি) দর্শন করবে, যিনি (উভা) উভয়ের (রাজানৌ) সেই-সেই আশ্রমের রাজা, এবং (স্বধয়া) নিজ-নিজ স্বাভাবিক ধারণ-সামর্থ্য দ্বারা (মদন্তৌ) কান্তিমান্, শোভায়মান। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[পরেতাঃ = দেখো মন্ত্রসংখ্যা (৫০)। রাজানৌ = প্রত্যেক আশ্রমের রাজা, অর্থাৎ নিজ-নিজ আশ্রমের কুলপতি। স্বধয়া= স্ব +ধা (ধারণে)-তৃতীয়ৈকবচন। মদন্তৌ = মদ কান্তি (শোভা)। যমং বরুণম্ = অথর্ববেদ ব্রহ্মচর্য সূক্তে আচার্যকে "মৃত্যু ও বরুণ" বলা হয়েছে। যথা - আচার্যো মৃত্যুর্বরুণঃ (অ০ ১১।৫।১৪)। মন্ত্রে "মৃত্যু" শব্দ দ্বারা "যম" অর্থ অভিপ্রেত হয়েছে। এবং "বরুণ" শব্দ দ্বারা "বরণকারী পরমেশ্বর" অভিপ্রেত হয়েছে। যথা - অমা ঘৃতং কৃণুতে কেবলমাচার্যো ভূত্বা বরুণো যদ্যদৈচ্ছৎপ্রজাপতৌ। (অথর্ব০ ১১।৫।১৫)। অর্থাৎ "বরুণ" আচার্য হয়ে ব্রহ্মচর্যাশ্রম রূপী ঘর (অমা= গৃহ, নিঘং০ ৩।৪) এ ব্রহ্মচারীকে সে জ্ঞানঘৃত পান করায়, যা গৃহস্থাশ্রমে অপেক্ষিত/আবশ্যক/প্রত্যাশিত।" মৃত্যু অর্থাৎ যম-আচার্যের নিজ স্বাভাবিক রূপ, এবং বরুণ পরমেশ্বরের রূপ। মৃত্যু-এর অভিপ্রায় হল, আচার্য নিজের আশ্রমের কঠোর নিয়ম-সমূহের দ্বারা ব্রহ্মচারীর মধ্যে আমূল পরিবর্তন করে, তাঁর পূর্বরূপকে বিনষ্ট করে তাঁকে দ্বিতীয় জন্ম দিয়ে দ্বিজন্মা করে দেয়। তদনন্তর ব্রহ্মচারী আচার্যের মধ্যে স্থিত যে বরুণরূপ আছে, তা দর্শন করে। প্রত্যেক আশ্রমে কোনো না কোনো আচার্য থাকে, এবং প্রত্যেক আশ্রমের আচার্যের দুটি রূপ আবশ্যক- মৃত্যুরূপ এবং বরুণরূপ। বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস আশ্রমের আচার্যের এই দুই রূপ হওয়া উচিৎ। এই দুই রূপ সেই-সেই আশ্রমের রাজা, কুলপতি। পরমেশ্বর নিজ বরুণরূপে আচার্যের মধ্যে বিদ্যমান, যিনি দ্বিজন্মার "বরণ" করে তাঁকে নিজ স্বরূপের প্রত্যক্ষ করায়। যথা - "যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্যস্তস্যৈষ আত্মা বিবৃণুতে তনূং স্বাম্ ॥" (কঠ০ ১।২।২২; মুণ্ডক ৪।২।৩)। বৃণুতে ইতি বরুণঃ।] বিশ্বনাথ বিদ্যালংকার

অপেত বীত বি চ সর্পতাতোহম্মা এতং পিতরো লোকমক্রন।

অহোভিরম্ভিরক্রুভিব্যক্তং যমো দদাত্যবসানমস্মৈ ॥৫॥

পদার্থঃ [হে বিদ্বানগণ !] (অতঃ) এখান থেকে [এই ঘর বা বিদ্যালয় আদি থেকে] (অপ ইত) বাহিরে চলো, (বি ইত) বিবিধ প্রকারে চলো, (চ) এবং (বি সর্পত) ছড়িয়ে যাও, (অস্মৈ) এই [জীবের হিতের] জন্য (এতম্) এই (লোকম্) লোক [সমাজ] (পিতরঃ) পিতরগণ [রক্ষক মহাত্মাগণ] (অকরন্) করেছে। (যমঃ) যম [ন্যায়কারী পরমাত্মা] (অস্মৈ) এই [সমাজকে] (অহোভিঃ) দিন দ্বারা, (অক্তুভিঃ) রাতের দ্বারা এবং (অদ্ভিঃ) জল [অন্ন জল আদি] দ্বারা (ব্যক্তম্) স্পষ্ট (অবসানম্) বিরাম [স্থির পদ] (দদাতি) প্রদান করেন ॥৫৫॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ব্রহ্মচারীগণ মহাপুরুষদের দ্বারা নির্মিত বিদ্যালয় আদি থেকে বিদ্যা সমাপ্ত করে বিবিধ উদ্যোগ করুক এবং পরমাত্মার উপকার-সমূহকে বিচার করে নিজের সময় ও আহার-বিহার আদির সুপ্রয়োগ করে সমাজকে স্থির সুখ প্রদান করুক ॥৫৫॥এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে যজুর্বেদেও আছে−১২।৪৫ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পুরাতন আশ্রমবাসীগণ ! যে তোমরা এই আশ্রমের সময় সমাপ্ত করেছো, সেই তোমরা (অতঃ অপেত) এই আশ্রম থেকে পৃথক্ হও, (বীত) আগামী আগামী বিবিধ আশ্রমে যাও, (বি সর্পত) আলাদা-আলাদা আশ্রমে ছড়িয়ে যাও। (পিতরঃ) এই আশ্রমের পিতৃগণ (অস্মৈ) এই নবাগত আশ্রমবাসীদের জন্য (লোকম্) স্থান (অক্রন্) নিয়ত করে দিয়েছে। (যমঃ) যম-নিয়ম তথা নিয়ন্ত্রণের আচার্য (অস্মৈ) এই নবাগতদের জন্য (অবসানম্) নিবাসস্থান (দদাতু) নিয়ত করে, যে নিবাসস্থান (অহোভিঃ অক্তুভিঃ) দিন ও রাত্রির দৃষ্টিতে (ব্যক্তম্) অভিব্যক্ত অর্থাত সুখদায়ী, এবং যা (অদ্ভিঃ) জল-ব্যবস্থার দৃষ্টিতে সুখদায়ী। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[অস্মৈ = এই নবাগত শিষ্যসমূহের জন্য। বি + সৃপ্ = To go about in different dirietion (আপ্টে)। অবসানম্= place, স্থান (আপ্টে)। এক শ্রেণীর বিদ্যার্থী পাশ করে যখন আগামী শ্রেণীতে চলে যায়, তাঁদের পূর্বের শ্রেণীতে নব বিদ্যার্থী প্রবিষ্ট করে/হয়, এরূপ আশ্রমব্যবস্থার বর্ণনা এই মন্ত্রে প্রতীত হয়।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

উশন্তস্তেধীমহ্যশন্তঃ সমিধীমহি।

উশন্নশত আ বহ পিতৃন হবিষে অত্তবে ॥ ৬॥

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ[হে ব্রহ্মচারী !] (উশন্তঃ) কামনারত আমরা (ত্বা) তোমাকে (ইধীমহি) প্রকাশিত করি, (উশন্তঃ) অভিলাষী আমরা (সম্) মিলে/মিলিতভাবে/একসাথে (ইধীমহি) তেজস্বী করি। (উশন্) অভিলাষী তুমি (উশতঃ) অভিলাষী (পিতৄন্) পিতরদের [রক্ষকদের] (হবিষে) গ্রহণ যোগ্য ভোজন (অত্তবে) খাওয়ার/সেবার/সেবনের জন্য (আ বহ) নিয়ে এসো ॥৫৬॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

যেমন বিদ্বান্ মাতা-পিতা আদি গুরুজন জিতেন্দ্রিয় বিদ্বান্ সভ্য সন্তানের কামনা করে, তেমনই সন্তানও সেই পিতৃজনদের সেবা করে গুণ প্রাপ্ত করুক ॥৫৬॥এঈ মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।১৬।১২ এবং যজুর্বেদে ৯।৭০। এবং মহর্ষিদয়ানন্দকৃত ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা পিতৃযজ্ঞবিষয়েও ব্যাখ্যাত আছে ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে যজ্ঞিয়াগ্নি ! (উশন্তঃ) পিতরদের ভোজন সৎকার কামনাকারী আমরা গৃহস্থী, (ত্বা) তোমাকে (ইধীমহি) প্রদীপ্ত করি, (উশন্তঃ) এই নিমিত্ত/হেতু পিতৃযজ্ঞের জন্য (সমিধীমহি) তোমাকে আমরা সমিধাধান দ্বারা প্রদীপ্ত করি। (উশন্) হে কান্তি-সম্পন্ন যজ্ঞিয়াগ্নি! (উশতঃ) ইচ্ছুক (পিতৄন্) পিতরদের তুমি (আ বহ) আমাদের প্রাপ্ত করাও। যাতে তাঁরা (হবিষে) প্রদত্ত অন্ন (অত্তবে) এসে খেতে/ভক্ষণ করতে পারে। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[পিতরদের নিমন্ত্রণ দিয়ে, পিতৃযজ্ঞ করা উচিৎ। যজ্ঞশীল গৃহস্থীর অন্নকেই পিতর স্বীকার করে। হবি= অর্থাৎ সৎকারার্থ সিদ্ধ অন্ন। যেহেতু অন্ন খাওয়ার বর্ণনা হয়েছে, এইজন্য পিতর জীবিত, যাদের নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। যজ্ঞিয়াগ্নির সম্বোধন কবিশৈলীর অনুরূপ। উশন্ = বশ কান্তৌ (= দীপ্তৌ), উশন্তঃ= কাময়মানাঃ। উশতেঃ= কাময়মানান্।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

দ্যুমন্তস্বেধীমহি দ্যুমন্তঃ সমিধীমহি।

দ্যুমান্ দ্যুমত আ বহ পিতৃন হবিষে অত্তবে ॥ ৭॥

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ [হে পুত্র !] (দ্যুমন্তঃ) প্রচণ্ড গতিশীল/গতিসম্পন্ন আমরা (ত্বা) তোমাকে (ইধীমহি) প্রকাশিত করি, (দ্যুমন্তঃ) ব্যবহারকুশল আমরা (সম্) এক হয়ে (ইধীমহি) তেজস্বী করি। (দ্যুমান্) ব্যবহারকুশল তুমি (দ্যুমতঃ) ব্যবহারকুশল (পিতৄন্) পিতরদের [রক্ষক বিদ্বানদের] (হবিষে) গ্রহণ যোগ্য ভোজন (অত্তবে) খাওয়ার/ভক্ষণের জন্য (আ বহ) নিয়ে এসো ॥৫৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

ভাবার্থঃ মন্ত্র ৫৬ এর সমান॥৫৭॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ হে পিতৃযজ্ঞ সম্বন্ধিত অগ্নি ! (দ্যুমন্তঃ) তেজস্বী আমরা (ত্বা) তোমাকে (সম্ ইধীমহি) সম্যক্ বা মিলিতভাবে প্রদীপ্ত করি, (দ্যুমন্তঃ) তেজস্বী আমরা (সমিধীমহি) তোমাকে সমিদাধান দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করি। (দ্যুমান্) হে যজ্ঞিয়াগ্নি ! তুমি তেজসম্পন্ন, (দ্যুমতঃ) তেজস্বী (পিতৄন্) পিতরদের (আ বহ) সেখানে প্রাপ্ত করাও (হবিষে) এই ভোজ্যান্ন (অত্তবে) খাওয়ার জন্য। বিশ্বনাথ  বিদ্যালঙ্কার 

[মন্ত্রে পিতৄন্ পদ দ্বারা পিতৃযজ্ঞকর্ত্তার রক্তসম্বন্ধী পিতর অভিপ্রেত নয়, অপিতু বনস্থ এবং সন্ন্যস্ত অন্য পিতরও অভিপ্রেত হয়েছে। অবশেষের জন্য দেখো মন্ত্র (সংখ্যা ৫৬)।] বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

অঙ্গিরসো নঃ পিতরো নবন্ধা অর্থবাণো ভূগবঃ সোম্যাসঃ।

তেষাং বয়ং সুমতৌ যজ্ঞিয়ানামপি ভদ্রে সৌমনসে স্যাম ॥৮॥

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ (নঃ) আমাদের (অঙ্গিরসঃ) মহাবিজ্ঞানী (পিতরঃ) পিতর [রক্ষক পিতা আদি বুদ্ধিমানগণ] (নবগ্বাঃ) স্তুতিযোগ্য চরিত্র [বা নবীন-নবীন বিদ্যা প্রাপ্তকারী এবং প্রাপ্তিতে সহায়ক], (অথর্বাণঃ) নিশ্চিত স্বভাবী, (ভৃগবঃ) পরিপক্ব জ্ঞানযুক্ত এবং (সোম্যাসঃ) ঐশ্বর্য প্রাপ্তির যোগ্য [হয়/হোক]। (তেষাম্) সেই (যজ্ঞিয়ানাম্) পূজনীয় মহাপুরুষদের (অপি) ই (সুমতৌ) সুমতিতে এবং (ভদ্রে) কল্যাণকারী (সৌমনসে) মনের প্রসন্নতায় (বয়ম্) যেন আমরা (স্যাম) হই ॥৫৮॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

সন্তানদের উচিৎ, বড়ো-বড়ো বিজ্ঞানী মাতা-পিতা আদি পূজনীয় মহাত্মাদের উত্তম শিক্ষাকে সদা গ্রহণ করা ॥৫৮॥এই মন্ত্র ঋগ্বেদে আছে−১০।১৪।৬ এবং যজুর্বেদে ১৯।৫০ ॥ এই মন্ত্রের উত্তরার্দ্ধ মেলাও-অথর্ব০ ৬।৫৫।৩ তথা ৭।৯৫।১ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (অঙ্গিরসঃ) সব বিদ্যার অঙ্গোপাঙ্গের জ্ঞাতা/বিদ্বান, (নবগ্বাঃ) নবীন-নবীন জ্ঞানের সদুপদেশক, (অথর্বাণঃ) হিংসাদি রহিত, (ভৃগবঃ) পরিপক্ববুদ্ধিযুক্ত, (সোম্যাসঃ) সোম্যস্বভাবযুক্ত, যে (নঃ) আমাদের (পিতরঃ) পিতা আদি জ্ঞানীগণ আছেন, (তেষাম্) সেই (যজ্ঞিয়ানাম্) পূজনীয়, সৎসঙ্গতি যোগ্য, তথা দানের পাত্র পিতরদের (সুমতৌ) সুমতিতে, (অপি) তথা (ভদ্রে) সুখদায়ী এবং কল্যাণকারী (সৌমনসে) তাঁদের মনের প্রসন্নতা-সম্পাদনে, বা তাঁদের দ্বারা প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ বোধ-এ (স্যাম) আমরা সদা থাকি। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[মন্ত্রার্থ মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। (যজুর্বেদ ১৯।৫০)।]

অঙ্গিরেভির্যজ্ঞিয়ৈরা গহীহ যমবৈরূপৈরিহ মাদয়স্ব।

বিবস্বন্তং হুবে যঃ পিতা তেহস্মিন্ বহিষ্যা নিষদ্য ॥ ৯॥

অঙ্গি॑রঃऽভিঃ । য॒জ্ঞিয়ৈ॑ঃ । আ । গ॒হি॒ । ই॒হ । যম॑ । বৈ॒রূ॒পৈঃ । ই॒হ । মা॒দ॒য়॒স্ব॒ । বিব॑স্বন্তম্ । হু॒বে॒ । যঃ । পি॒তা । তে॒ । অ॒স্মিন্ । ব॒র্হিষি॑ । আ । নি॒ऽসদ্য॑ ॥

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ (যম) হে সংযমী জন ! (অঙ্গিরোভিঃ) মহাবিজ্ঞানী, (যজ্ঞিয়ৈঃ) পূজাযোগ্য পুরুষদের সাথে (ইহ) এখানে [সমাজে] (আ গহি) তুমি এসো, এবং (বৈরূপৈঃ) বিবিধ পদার্থ-সমূহের নিরূপণকারী/নিরূপক বেদজ্ঞান দ্বারা (ইহ) এখানে (মাদয়স্ব) [আমাদের] তৃপ্ত করো। (অস্মিন্) এই (বর্হিষি) উত্তমপদে (আ) উত্তমরূপে (নিষদ্য) বসে (বিবস্বন্তম্) প্রকাশময় পরমাত্মাকে (হুবে) আমি আহ্বান করি, (যঃ) যে (তে) তোমার (পিতা) পালক ॥৫৯॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

জিতেন্দ্রিয় বিদ্বান্ পুরুষ বিবিধ বিদ্বানদের সৎসঙ্গ দ্বারা অনেক বিদ্যা প্রাপ্ত করেছে বেদাভ্যাস দ্বারা পরমাত্মার বিচার করুক ॥৫৯॥মন্ত্র ৫৯, ৬০ কিছুটা আলাদাভাবে ঋগ্বেদে আছে−১০।১৪।৫, ৪ এবং উভয় মন্ত্র মহর্ষিদয়ানন্দকৃত সংস্কারবিধি অন্ত্যেষ্টিপ্রকরণে উদ্ধৃত ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যম) হে আশ্রমের নিয়ন্তা ! আপনি, (যজ্ঞিয়ৈঃ) পূজনীয়, (অঙ্গিরোভিঃ) নানা বিদ্যার অঙ্গোপাঙ্গের জ্ঞাতা/বিদ্বান, (বৈরূপৈঃ) জ্ঞান বা রূপ রং-এর দৃষ্টিতে বিবিধ রূপযুক্ত মহাত্মা সমেত, (ইহ) এই পিতৃযজ্ঞে (আ গহি) আসুন, উপস্থিত হন, এবং (মাদয়স্ব) প্রস্তুত অন্নের দ্বারা নিজেকে সন্তৃপ্ত তথা সন্তুষ্ট করুন। আমি গৃহস্থী (বিস্বন্তম্) অন্ধকার-বিনাশক সূর্যের সদৃশ অজ্ঞানান্ধকার-বিনাশক বিজ্ঞানীকেও (হুবে) নিমন্ত্রিত করেছি, (যঃ) যে/যিনি (পিতা) আমাদের সকলের জ্ঞানদাতা পিতা। (তে) সেই আপনারা সবাই, (অস্মিন) এই (বর্হিষি) পিতৃযজ্ঞে কুশ-আসনের ওপর (আ নিষদ্য) বিরাজমান হয়ে নিজেকেই সন্তৃপ্ত তথা সন্তুষ্ট করুন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

ইমং যম প্রস্তরমা হি রোহাঙ্গিরোভিঃ পিতৃভিঃ সম্বিদানঃ।

আ ত্বা মন্ত্রাঃ কবিশস্তা বহন্ত্বেনা রাজন্ হবিযো মাদয়স্ব ॥ ১০॥

পিতৃসন্তানকর্ত্তব্যোপদেশঃ−

পদার্থঃ (যম) হে সংযমী পুরুষ ! (অঙ্গিরোভিঃ) মহাবিজ্ঞানী (পিতৃভিঃ) পিতরদের [রক্ষকদের] সাথে (হি) ই (সংবিদানঃ) মিলিত তুমি (ইমম্) এই (প্রস্তরম্) বিস্তীর্ণ আসনে (আ রোহ) আরোহণ করো। (ত্বা) তোমাকে (মন্ত্রাঃ) মন্ত্রকুশল [বিচারশীল] (কবিশস্তাঃ) বিদ্বানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুরুষ (আ বহন্তু) আহ্বান করে/করুক (রাজন্) হে ঐশ্বর্যবান্ পুরুষ ! (এনা) এই (হবিষঃ=হবিষা) ভক্তিদান দ্বারা (মাদয়স্ব) [আমাদের] প্রসন্ন করো॥৬০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী পুরুষ বিদ্বানদের সৎসঙ্গ দ্বারা উচ্চ পদ প্রাপ্ত করুক এবং নিজের শুভ গুণ এবং পরাক্রম দ্বারা সব প্রজাকে সদা প্রসন্ন রাখুক ॥৬০॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (যম) হে আশ্রমের নিয়ামক/ব্যবস্থাপক/নিয়ন্তা আচার্য আপনি (অঙ্গিরোভিঃ) নানা বিদ্যার অঙ্গোপাঙ্গের জ্ঞাতা/বিদ্বান (পিতৃভিঃ) পিতরদের সাথে (সম্বিদানঃ) ঐকমত্য প্রাপ্ত। আপনি (ইমম্) এই উচ্চ (প্রস্তরম্) আসনে (আরোহ) আরোহণ করুন। (কবিশস্তাঃ) কবিদের দ্বারা প্রশস্তিরূপে উচ্চারিত (মন্ত্রাঃ) মন্ত্র, (ত্বা) আপনাকে (আ বহন্তু) এই আসনে বসার জন্য প্রেরিত করুক। (রাজন) হে অঙ্গিরা আদি পিতরদের রাজা ! (এনা) এই প্রস্তুত (হবিষা উ) ভোজ্যান্ন দ্বারা (মাদয়স্ব) সন্তৃপ্ত তথা সন্তুষ্ট হন। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[অঙ্গিরোভিঃ এর অর্থ মহর্ষি দয়ানন্দের ভাষ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। দেখো মন্ত্র (সংখ্যা ৫৮) এর টিপ্পণী।]

ইত এত উদারুহন্ দিবস্পৃষ্ঠান্যারুহন।

প্র ভূর্জয়ো যথা পথা দ্যামঙ্গিরসো যযুঃ ॥ ১১৷

পদার্থঃ (এতে) এই [পিতরগণ] (ইতঃ) এই [সামান্য দশা] থেকে (উৎ) উত্তমরূপে (আ অরুহন্) উচ্চে আরোহণ করেছে, এবং (দিবঃ) ব্যবহারের (পৃষ্ঠানি) পৃষ্ঠে (আ অরুহন্) উচ্চতায় আরোহণ করেছে। (ভূর্জয়ঃ যথা) ভূমি জয়কারীর সমান (পথা) সন্মার্গ দ্বারা/সন্মার্গের মাধ্যমে (অঙ্গিরসঃ) বিজ্ঞানী মহর্ষিগণ (দ্যাম্) প্রকাশ (প্র) উত্তমরূপে (যয়ুঃ) প্রাপ্ত হয়েছে ॥৬১॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

বড়ো-বড়ো মহাত্মা ব্রহ্মচর্য আদি তপ সহিত বিদ্যা গ্রহণ করে সামান্য অবস্থা থেকে উত্তরণ করেছে, এভাবেই সব মনুষ্য পরিশ্রম এবং উদ্যোগ করে সদা উন্নতি করুক ॥৬১॥এই মন্ত্র কিছুটা আলাদাভাবে সামবেদে আছে−পূ০ ১।১০।২ ॥ ইতি প্রথমোঽনুবাকঃ ॥ ক্ষেমকরন ত্রিবেদী

পদার্থঃ (ইতঃ) এখান থেকে (এতে) এই অঙ্গিরা আদি (উদ্ আরুহন্) উপরে আরোহণ করে/করেছে। (দিবঃ) দ্যুলোকে (পৃষ্ঠানি) পৃষ্ঠে (আরুহন) আরোহণ করেছে। (ভূর্জয়ঃ) রজোগুণ ও তমোগুণের ভর্জন/বিনাশকারী যোগী (যথা) যেমন (পথা) যোগমার্গ থেকে/দ্বারা (দ্যাম্) দ্যুলোক পর্যন্ত (প্রয়যুঃ) পৌঁছেছে/পৌঁছায়, তেমনই (অঙ্গিরসঃ) নানা বিদ্যার অঙ্গোপাঙ্গের জ্ঞাতা/বিদ্বান বৈজ্ঞানিক, বিজ্ঞানমার্গ দ্যুলোক পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

[মন্ত্রের দুটি অভিপ্রায়- আধ্যাত্মিক ও আধিদৈবিক। যোগের দৃষ্টিতে উপরে আরোহণের অভিপ্রায় হল- শারীরিক চক্রগুলোর নীচের চক্র থেকে শুরু করে উপরের অন্তিম চক্র সহস্রারচক্র পর্যন্ত আরোহণ করা, এবং তদনন্তর মুক্ত হয়ে যাও। এই চক্র নিম্নলিখিত। মূলাধারচক্র গুদা/মলদ্বারের সমীপে, স্বাধিষ্ঠানচক্র নিতম্ব/শ্রোণীদেশে, মণিপূরচক্র নাভির পেছনে, অনাহতচক্র হৃদয়ের সমীপে, বিশুদ্ধচক্র কণ্ঠের পেছনে, আজ্ঞাচক্র দুই ভ্রুযুগলের মধ্যস্থানে, সহস্রারচক্র মস্তিষ্কে। এই সকল চক্র পৃষ্ঠবংশের সুষুম্ণা নাড়ীতে আছে। প্রায়ঃ এই সাত চক্রের বর্ণনা পাওয়া যায়। অথর্ববেদে ৮ চক্র বলা হয়েছে- "অষ্টচক্রা নবদ্বারা দেবানাং পূরয়োধ্যা" (১০।২।৩১)। অষ্টম চক্র, চক্র ৬ এবং ৭ এর মধ্য স্থানে আছে। যোগী এই চক্রগুলোতে ধ্যান-প্রকর্ষ দ্বারা, পরপর উপরের চক্রগুলোতে আরোহণ করে। এবং পরিশেষে "দিব" অর্থাৎ মস্তিষ্কের সহস্রারচক্রে স্থিত হয়ে, কালানুসারে এই সূর্য দ্বারা মুক্ত হয়ে পরমেশ্বরের মধ্যে বিচরণ করে। দিব্= মস্তিষ্ক বা মূর্ধা - "দিবং যশ্চক্রে মূর্ধানম্" (অথর্ব০ ১০।৭।৩২)। দিবস্পৃষ্ঠানি= দিব্ এর অভিপ্রায় মস্তিষ্ক অর্থাৎ মূর্ধা। এর মধ্যে তিনটি চক্র আছে- আজ্ঞাচক্র, সহস্রারচক্র এবং এই দুটির মাঝখানে বিশুদ্ধচক্র; অথবা বিশুদ্ধচক্র আজ্ঞাচক্র এবং সহস্রারচক্র। এগুলোর মধ্যে প্রত্যেকটির পৃষ্ঠে আরোহণ করে, আগামী-আগামী চক্রের পৃষ্ঠে যোগী আরোহণ করতে থাকে। মূর্ধা-এর তিনটি চক্রের দৃষ্টিতে মস্তিষ্ককে "তিস্রঃ দিবঃ" ও বলা। এই 'মূর্ধা' লোকবিভাগের দৃষ্টিতে তৃতীয়-লোক ও বলা হয়েছে। যথা-"শীর্ষলোকং তৃতীয়কম্" (অথর্ব০ ১৯।৩৯।১০)। সুষুম্ণা নাড়ীর দৃষ্টিতে মলদ্বার থেকে বুকের নীচ পর্যন্ত পৃথিবীলোক; বুকে আছে অন্তরিক্ষলোক, যার মধ্যে বায়ু তথা রক্ত জল থাকে; এবং বুকের উপরের ভাগ হল দ্যুলোক, যার মধ্যে জ্ঞানে দিব্যপ্রকাশ নিবাস করে। আধিদৈবিক দৃষ্টিতে "আঙ্গিরস" অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকরা বিজ্ঞান দ্বারা এই ভূমি থেকে উঠে দ্যুলোকের লোক পর্যন্ত আরোহণ করে। চন্দ্র গ্রহ তথা নক্ষত্র পর্যন্ত প্রয়াণ/গমন করে। দ্যাম্ = আধিদৈবিক দৃষ্টিতে প্রকাশমান দ্যুলোক, এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে মস্তিষ্ক- 'শীর্ষ্ণো দ্যৌঃ সমবর্তত' (যজু০ ৩১।১৩)। আগামী মন্ত্রগুলোতে অন্তরিক্ষসদ্ পৃথিবীষদ্ তথা দিবিষদ্ পিতরদের বর্ণনা আছে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে পৃথিবীষদ্ পিতর হল সামান্য পিতর, যারা খাদ্য-পানীয় ইত্যাদি সাংসারিক ব্যবহার থেকে উপরে উঠতে পারেনি। অন্তরিক্ষসদ্ পিতর তাঁরা, যারা প্রাণায়ামাভ্যাসী হৃদয়ে ধ্যান করার অভ্যাস করছে/অভ্যাসরত। তথা দিবিষদ্ পিতর তাঁরা, যারা আজ্ঞাচক্র তথা সহস্রারচক্রের উচ্চতা পর্যন্ত আরোহণ করেছে/পৌঁছেছে/পৌঁছে গেছে। এমনভাবেই আধিদৈবিক দৃষ্টিতে পৃথিবীষদ্ পিতর পৃথিবীতে বিহার/ভ্রমনকারী; অন্তরিক্ষসদ্ বিমান আদি দ্বারা অন্তরিক্ষে আগমন-গমনকারী; তথা দিবিষদ্ চন্দ্র আদি লোক-সমূহ পর্যন্ত প্রয়াণকারী ॥ বিশ্বনাথ বিদ্যালঙ্কার

Read More

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

ব্রহ্মসূত্র

ভ্রাচার্য উদয়বীর শাস্ত্রী ভারতীয় ইতিহাস এবং দর্শনের গুরুতর অনুসন্ধানদৃষ্টি-সম্পন্ন প্রৌঢ় বিদ্বান। তাঁর তর্কণাসমূহ এবং স্থাপনাসমূহের দ্বারা ভ...

Post Top Ad

ধন্যবাদ