ঋতু রশ্মি
ঋতু হচ্ছে একটা পদার্থ, যা রশ্মির রূপে হয়। দুই-দুই মাস রশ্মির যুগ্মকে ঋতু বলা হয়। ঋতু রশ্মি দিশাকে উৎপন্ন করে অর্থাৎ এর কারণে বিভিন্ন লোক বা কণা ঘূর্ণনের দিশা নির্ধারিত হতে সহযোগ পাওয়া যায়। উৎপন্ন সব পদার্থকেও "ঋতু" বলে, কারণ তারা সবাই সর্বদা নিরন্তর গমন করতে থাকে।
ঋতু রশ্মি প্রকাশ নির্মাণ করতে নিজের বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো পদার্থের সঙ্গে এর মিলন দ্বারা ঊষ্মার তীব্রতা বৃদ্ধি হয়। এই রশ্মি কণা ও তরঙ্গাণুর (কোয়ান্টা) পরস্পর সংযোজন-বিয়োজনের মধ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তারার কেন্দ্রীয় ভাগের মতো স্থানগুলোতে ঊর্জার উৎপত্তি হয়, এই রশ্মির প্রাধান্য সেখানেও থাকে। তারার বাইরের বিশাল ভাগের মধ্যেও ঋতু রশ্মির বিশেষ প্রাধান্য থাকে। ঋতু রশ্মি বিভিন্ন প্রাণাদি রশ্মিকে তীব্রতার সঙ্গে অবশোষিত করে, এই কারণে যেকোনো পদার্থের সঙ্গে এর মিলন দ্বারা সেই পদার্থ ঊষ্মাকে তীব্রতার সঙ্গে অবশোষিত করে। এই রশ্মি অন্য রশ্মিকে নিজের সঙ্গে সঙ্গত করতে অথবা তাদের আচ্ছাদিত করতে বিশেষ সমর্থ হয়।
ঋতু সম্পর্কে ঋষিদের বক্তব্য হলো— অগ্নয়ো বা ঋতবঃ (শ. ব্রা. ৬.২.১.৩৬), তস্য (সংবৎসরস্য) হর্তব এব মুখানি (জৈ. ব্রা. ১.২৪৬), রশ্ময় ঋতবঃ (মৈ. সং. ৪.৮.৮, ক. সং. ৪৫.১)। এর অর্থ হলো, ঋতু নামক রশ্মিগুলি অগ্নিকে সমৃদ্ধ করে এবং এই রশ্মিগুলিই নক্ষত্র নির্মাণে কার্যকর হয়ে তাদের মুখস্বরূপ হয়। ঋগ্বেদ ১.১৫.৪-এ অগ্নি ও ঋতু উভয়ের একসঙ্গে স্তব করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই ছন্দ রশ্মির প্রভাবে অগ্নি ও ঋতু রশ্মি উভয়ই প্রকাশিত হতে শুরু করে।
এইভাবে এই পাঁচটি পদার্থ অগ্নির সংস্তবিক দেব বলে পরিচিত হয়। এরপর গ্রন্থকার লিখেছেন যে, অগ্নি ও বিষ্ণুর সম্মিলিত হবি দেওয়া হয়। এখানে এর প্রমাণস্বরূপ স্বামী ব্রহ্মমুনি পরিব্রাজক তাঁর 'নিরুক্তসম্মর্শঃ' গ্রন্থে মৈত্রায়ণী সংহিতাকে এইভাবে উদ্ধৃত করেছেন— 'অগ্নাবিষ্ণূ সজোষসেমা বর্ধন্তু বাং গিরঃ। দ্যুম্নৈর্বাজেভি-রাগতম্॥' (মৈ. সং. ৪.১০.১)। কিন্তু ঋগ্বেদের দশটি মণ্ডলের কোথাও এমন একটি মন্ত্রও নেই, যেখানে অগ্নি ও বিষ্ণুর একসঙ্গে স্তব করা হয়েছে। একইভাবে অগ্নি ও পূষা দেবতার একসঙ্গে হবি দেওয়ার বিধান রয়েছে, কিন্তু ঋগ্বেদে এমন কোনো ঋচা নেই, যেখানে এই দুই দেবতার একসঙ্গে স্তব করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে অগ্নি ও পূষা উভয় দেবতার পৃথক পৃথক স্তবযুক্ত মন্ত্রের উদাহরণ অবশ্যই দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী খণ্ডে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী খণ্ড শুরু করার আগে আমরা এই বিষয়টি বিবেচনা করি যে, অগ্নি ও বিষ্ণুকে একসঙ্গে হবি দেওয়ার তাৎপর্য কী? আমাদের দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য হলো, এই সৃষ্টিতে এমন অনেক রশ্মি রয়েছে, যাদের হবি অগ্নিতত্ত্ব এবং যজ্ঞরূপ বিষ্ণু অর্থাৎ যজন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী কণাগুলিকে দেওয়া হয়। এর ফলে অগ্নিতত্ত্বের পাশাপাশি সংযোগাদি প্রক্রিয়াও সমৃদ্ধ হয়।
বেদে অগ্নি ও বিষ্ণু উভয়ের সম্মিলিত দেবত্ব অর্থাৎ একসঙ্গে স্তব একটি পৃথক বিষয়, যার সঙ্গে একসঙ্গে হবি দেওয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই—এই তথ্যটি তুলে ধরাই গ্রন্থকারের উদ্দেশ্য। একইভাবে অগ্নি ও ঊষ্মা উভয়কে একসঙ্গে হবি দেওয়ার তাৎপর্য হলো, কিছু রশ্মি নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কণা ও তরঙ্গাণুর সঙ্গে সংযুক্ত হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে তারা সমগ্র নক্ষত্রেরও অঙ্গ হয়ে ওঠে। এই কারণেই তাদের সমান হবি-যুক্ত বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেও একটি বিষয় হলো, সমগ্র ঋগ্বেদে অগ্নি ও পূষা (সূর্য) উভয়ের সমান দেবত্বযুক্ত এমন কোনো ঋচা বিদ্যমান নেই। এখন আমরা পরবর্তী খণ্ডে অগ্নি ও পূষা উভয়ের পৃথক পৃথক স্তবযুক্ত ঋচাটি উদ্ধৃত করছি।
ছয় ঋতু রশ্মি হচ্ছে এই রকম -
1. বসন্ত (মধু + মাধব)
2. গ্রীষ্ম (শুক্র + শুচি)
3. বর্ষা (নভস্ + নভস্য)
4. শরদ্ (ঈষ্ + ঊর্জ্)
5. হেমন্ত (সহস্ + সহস্য)
6. শিশির (তপস্ + তপস্য)
১. বসন্ত — এই বিষয়ে ঋষিরা লিখেছেন— মুখং বা এতদ্ ঋতূনাং যদ্ বসন্তঃ (তৈ. ব্রা. ১.১.২.৬-৭), বসন্তো বৈ সমিত্ (শ. ব্রা. ১.৫.৩.৯), ঊর্গ্ বৈ বসন্তঃ (ঐ. ব্রা. ৪.২৬), বসন্ত এব ভর্গঃ (গো. পূ. ৫.১৫), ব্রহ্ম হি বসন্তঃ (শ. ব্রা. ২.১.৩.৫), যো বসতি যত্র বা স বসন্তঃ (উ. কো. ৩.১২৮)।
এর অর্থ হলো, এই সৃষ্টিতে ঋতুর রশ্মিগুলির উৎপত্তির ক্রমে বসন্ত রশ্মিগুলিই সর্বপ্রথম উৎপন্ন হয় এবং এই রশ্মিগুলির মধ্যেই অন্যান্য ঋতুর রশ্মিগুলি উৎপন্ন ও অবস্থান করে। এই রশ্মিগুলিই অন্যান্য রশ্মিকে শক্তি প্রদান করে তাদের জন্য জ্বালানির মতো কাজ করে। এই রশ্মিগুলি সর্বাধিক ব্যাপক ও তেজযুক্ত হওয়ার কারণে অগ্নি ও পৃথিবীর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রাখে।
২. গ্রীষ্ম ঋতু — এই ঋতুর রশ্মিগুলির বিষয়ে মহর্ষিদের বক্তব্য হলো— এতাবেব (শুক্রশ্চ শুচিশ্চ) গ্রৈষ্মৌ (মাসৌ) স যদেতয়োর্বলিষ্ঠং তপতি তেনো হৈতৌ শুক্রশ্চ শুচিশ্চ (শ. ব্রা. ৪.৩.১.১৫), গ্রীষ্মো গ্রস্যন্তেঽস্মিন্ রসাঃ (নিরু. ৪.২৭), ক্ষত্রং হি গ্রীষ্মঃ (শ. ব্রা. ২.১.৩.৫), গ্রীষ্মে মধ্যন্দিনে সহিতামৈন্দ্রীম্ (আলভেত) (তৈ. সং. ২.১.২.৫)।
অর্থাৎ, এই ঋতুর রশ্মিগুলি শুক্র ও শুচি নামক দুটি মাসের রশ্মির যুগ্মরূপ হয় এবং এগুলি বল ও তাপ দ্বারা বিশেষভাবে যুক্ত থাকে। বিভিন্ন রস অর্থাৎ প্রাণরশ্মিগুলিকে বিশেষভাবে শোষণ করে বলে এগুলি ভেদক শক্তিসম্পন্ন হয়। এগুলির বিদ্যমানতায় ইন্দ্রতত্ত্ব প্রবল হয়।
৩. বর্ষা ঋতু — এই বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হলো— যদা বৈ বর্ষাঃ পিন্বন্তেঽথৈনাঃ সর্বে দেবা সর্বাণি ভূতান্যুপজীবন্তি (শ. ব্রা. ১৪.৩.২.২২), বর্ষং সাবিত্রী (গো. পূ. ১.৩৩), বর্ষা বৈ সর্বঋতবঃ (শ. ব্রা. ২.২.৩.৭), বর্ষা এব যশঃ (গো. পূ. ৫.১৫), মরুতো বৈ বৃষ্ট্যা ঈশতে (মৈ. সং. ৪.১.১৪), বিড্ঢ বর্ষাঃ (শ. ব্রা. ২.১.৩.৫)।
এই প্রমাণগুলি থেকে সিদ্ধ হয় যে, বর্ষা ঋতুর রশ্মিগুলি উৎপন্ন হওয়ার সময় পর্যন্ত অন্যান্য সমস্ত ঋতুর রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায় এবং সমস্ত প্রকার দেবপদার্থও এই ঋতুর রশ্মিগুলি থেকে জীবন লাভ করে, অর্থাৎ এগুলির দ্বারাই সমৃদ্ধ হয়। এই রশ্মিগুলি সাবিত্রী রূপের হয়। এর তাৎপর্য হলো, এই ঋতুর রশ্মিগুলির উৎপত্তিকালে বিভিন্ন সূর্যাদি তেজস্বী লোকের উৎপত্তি হয়।
বিভিন্ন মরুৎ রশ্মি, যেগুলি তিনটি লোকেই বিদ্যমান থাকে এবং নানাপ্রকার দ্রব্য ও তাদের শক্তির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়। এই রশ্মিগুলি বিট্ রূপে বিভিন্ন পদার্থের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন রশ্মিকে প্রেরণা দেয়।
এই ঋতুর রশ্মিগুলির সঙ্গে আদিত্যলোকের ভক্তি এই কারণে মনে করা হয় যে, যেভাবে এই ঋতুর রশ্মিগুলি উৎপন্ন হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য সমস্ত ঋতুর রশ্মি উৎপন্ন ও সক্রিয় হয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই সূর্যলোকের উৎপত্তি হওয়া পর্যন্ত সমস্ত ঋতুর রশ্মি উৎপন্ন হয়ে যায়।
৪. শরৎ ঋতু — এই বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হলো— অন্ন বৈ শরদ্ (মৈ.সং. ১.৬.৯), যদ্বিদ্যোততে তচ্ছরদঃ (রূপম্) (শ. ব্রা. ২.২.৩.৮), শরদ্ধবিঃ (তৈ.আ. ৩.১২.৩)। এর অর্থ এই যে, এই ঋতুর রশ্মিগুলি সংযোজক গুণযুক্ত হয়। সেই সঙ্গে এগুলির মধ্যে সূক্ষ্ম দীপ্তিও বিদ্যমান থাকে। এই কারণে এগুলি বিভিন্ন ক্রিয়ায় হবি-র কাজ করে। এখানে পাঠক যদি পৃথিবীস্থানী অগ্নিতত্ত্বের সঙ্গে এই রশ্মিগুলির তুলনা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। এই কারণেই এই ঋতুর রশ্মিগুলিকে এখানে পৃথিবীস্থানী বলা হয়েছে।
৫. হেমন্ত ঋতু — এই বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হলো— হেমন্তো মধ্যম্ (সংবৎসরস্য) (তৈ. ব্রা. ৩.১১.১০.৪), তস্য (সংবৎসরস্য) বসন্ত এব দ্বারং হেমন্তো দ্বারং তং বা এতং সংবৎসরং স্বর্গং লোকং প্রপদ্যতে (শ. ব্রা. ১.৬.১.১৯), হেমন্তো হিমবান্ হিমং পুনর্হন্তের্বা হিনোতের্বা (নিরু. ৪.২৭)। এই বচনগুলি থেকে সিদ্ধ হয় যে, হেমন্ত ঋতুর রশ্মিগুলি কোনো নক্ষত্রের নির্মাণপ্রক্রিয়ার মধ্যবর্তী পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু এগুলিকে নক্ষত্রের নির্মাণপ্রক্রিয়ার প্রবেশদ্বারও বলা হয়। আমাদের কাছে এর তাৎপর্য এই বলে মনে হয় যে, কেন্দ্রীয় অংশের নির্মাণপ্রক্রিয়ার প্রারম্ভেই এগুলির উৎপত্তি হয়ে যায়, তাই এগুলিকে সংবৎসরের দ্বার বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বসন্ত রশ্মিগুলিকে যে সংবৎসরের দ্বার বলা হয়েছে, তার অর্থ হলো, কসমিক মেঘের অভ্যন্তরে নক্ষত্রের নির্মাণের জন্য যে অব্যক্ত কেন্দ্রগুলি গঠিত হতে শুরু করে, সেই সময় হেমন্ত নয়, বরং বসন্ত ঋতুর রশ্মিগুলির প্রাচুর্য ও বিদ্যমানতা থাকে। এই রশ্মিগুলির বিষয়ে এই গ্রন্থের খণ্ড ৪.২৭ পাঠকের অবশ্যই পড়া উচিত। এর ফলে তিনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে, নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অংশগুলির নির্মাণে এই রশ্মিগুলির ভূমিকা কেন থাকে।
আমরা পূর্বে খণ্ড ৭.১০-এ স্পষ্টভাবে লিখেছি যে, মাধ্যন্দিন সবনেই নক্ষত্রগুলির কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এই রশ্মিগুলিকে অন্তরীক্ষস্থানী বলা হয়েছে এই কারণে যে, এই সমস্ত ক্রিয়া আকাশেই সংঘটিত হয়, অর্থাৎ আকাশই সেগুলির সবকিছুর আধার।
৬. শিশির ঋতু — এই বিষয়ে ঋষিদের বক্তব্য হলো— স (প্রজাপতিঃ) গ্রীষ্মাদ্ এব বসন্তং নিরমিমীত, বর্ষাভ্যশ্শরদং, হেমন্তাচ্ছিশিরম্ ...। স যৎ প্রথমমতপ্যত্ ততো গ্রীষ্মমসৃজত। তস্মাৎ স বলিষ্ঠং তপতি (জৈ. ব্রা. ৩.১), শিশিরং বা অগ্নের্জন্ম সর্বাসু দিক্ষ্বগ্নিশ্শিশিরে (কাঠ. সং. ৮.১)।
এর তাৎপর্য হলো, অগ্নি (উষ্ণতা) বিশেষভাবে শিশির ঋতুর রশ্মিগুলিতে উৎপন্ন হয় এবং এই রশ্মিগুলির উৎপত্তি হেমন্ত ঋতুর রশ্মিগুলির পরে হয়। এই কারণে এই রশ্মিগুলির অবস্থান দ্যুলোক বা স্বর্গলোকে বলে মনে করা হয়েছে।





