অনশ্বো জাতো অনভিশু রকথ্যে রথস্ত্রিচক্রঃ
মূলত সেই শিক্ষকের পরামর্শেই শিবকরের পরিচয় ঘটে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর লেখা বিমান চালনাবিদ্যা বিষয়ক বই ‘ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদ ভাষ্য’-এর সাথে। সেই সঙ্গে কৃষ্ণজি বাজের উড়ান সম্পর্কিত বই থেকেই উড়োজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা মাথায় খেলেছিলো শিবকরের। তবে ভাষ্যের একাধিক্রম থাকুক আর না থাকুক, এটা স্পষ্ট যে, শিবকর উড়োজাহাজ তৈরির প্রাথমিক ধারণাটুকু পরোক্ষভাবে বেদ থেকেই পেয়েছিলেন। কেননা উপরে বর্ণিত বইগুলোতে সংস্কৃত পুরাণ ও বেদে উল্লেখিত বিশেষ দৈবযন্ত্র ‘বিমানা’কে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
উক্ত ব্যাখ্যাসমূহের মূল কথা এই যে, সেই ‘বিমানা’ বা ‘বিমান’-ই হচ্ছে অধুনা বায়ুগতিবিদ্যার (Aerodynamics) উড়নযন্ত্র বা উড়োজাহাজ। বেদ থেকে উড়োজাহাজের প্রাথমিক ধারণা পাবার পর শিবকর আরো বিশদ জানতে থমাস আলভা এডিসনের গ্যাসবেলুন ও হাইরাম ম্যাক্সিমের বদ্ধ-বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত উড়োজাহাজের নকশা নিয়ে পড়াশোনা করেন। শুধু কি জেনেই ক্ষান্ত হলেন শিবকর? ভারতে বসে বিশ্বের প্রথম সফল উড়োজাহাজ বানানোর নেশা পেয়ে বসলো তাকে। সেই অনুযায়ী কাজে নেমে পড়লেন তিনি।
ঋগ্বেদে একাধিক মন্ত্রের মাধ্যমে ২০০র অধিকবার বিমানের উল্লেখ রয়েছে৷ এতে ত্রিতল বিশিষ্ট, ত্রিকোণাকৃতি ও ত্রিচক্রী বিশিষ্ট বিভিন্ন আদি বিমানের উল্লেখ রয়েছে৷ এগুলির প্রাথমিক নির্মাণ করেছিলেন যুগ্মদেবতা অশ্বিনীকুমার, যারা যুগল দেববৈজ্ঞানিক নামেও পরিচিত ছিলেন৷ আদিবিমানগুলিতে তিনজন যাত্রী যেতে পারতেন এবং এগুলির দুদিকে দুটি পাখা যুক্ত থাকতো৷ বিমান তৈরীর উপকরণগুলির মধ্যে মূলত তিনটি ধাতুর ব্যবহার হতো যথা- সোনা, রূপা এবং লোহা৷ বেদে বিমান তৈরীর সময়ে বিভিন্ন আকার দেওয়ার কথারও উল্লেখ রয়েছে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অগ্নিহোত্র বিমানে ছিলো দুটি শক্তির উৎস তথা ইঞ্জিন আবার হস্তী বিমানে দুইয়ের অধিক শক্তির উৎস ছিলো৷ যে কোনো বিমানের মৌলিক আকির ছিলো আজকের মাছরাঙ্গা পাখির আকৃৃতির৷ এছাড়া একপ্রকার জলযানেরও উল্লেখ পাওয়া যায় যা জলে এবং আকাশে উভয়স্থানেই বিচরণ করতে পারতো(ঋগ্বেদ - ৬.৫৮.০৩)৷ কারা নামক বিমানটিও জল ও বায়ু উভয়ক্ষেত্রেই সচল ছিলো(ঋগ্বেদ - ৯.১৪.০১)৷ আবার ত্রিতলা নামক বিমানটি নামানুসারে তিনটি তল বিশিষ্ট ছিলো(ঋগ্বেদ - ৩.১৪.০১)৷ ত্রিচক্র নামক তিনটি চাকাযুক্ত বিমানটি আকিশে উড়তে পারতো(ঋগ্বেদ - ৪.৩৬.০১)৷ রথের মতো দেখতে অপর একটি বিমান আকাশপথে বায়ুশক্তি বা বাষ্পের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে চলতো(ঋগ্বেদ - ৫.৪১.০৬)৷ আবার বিদ্যুৎরথ বা বিদ্যুদ্রথ নামক বিমান বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলতো(ঋগ্বেদ - ৩.১৪.০১)৷
সমরাঙ্গণসূত্রধার নামক বাস্তুশাস্ত্রীয় বইটিতে বিমানের বিষয়ে এবং বিমানসম্বন্ধীয় বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক রোমাঞ্চকর তথ্য পাওয়া যায়৷ বইটিতে প্রায় ২২৫টি অনুচ্ছেদে বিমান নির্মাণ, উড্ডয়ন পদ্ধতি, গতি বিষয়ক, অবতরন এবং জরুরীকালীন অবতরন সহ একাধিকবার পক্ষীকুলের সঙ্গে আকস্মিক সংঘাতের ঘটনার উল্লেখও রয়েছে৷
বাল্মীকি পুষ্পক বিমানের যথাসম্ভব বিস্তৃৃত বিবরণ দিয়েছেন,
মেঘের সমান উচ্চতাযুক্ত, সোনার বরণ কান্তিময়, তথা পুষ্পককে ভূমিতে একত্রিত সোনার পিণ্ডের মতো দেখতে৷ অধিক রত্ন বিভূষিত, বিভিন্ন প্রকার ফুলে আচ্ছাদিত ও পুষ্পপরাগে ভরপুর পর্বত শিখরের মতো শোভিত৷ চন্দ্রচ্ছটায় পূজিত, মেঘের মতো রমনীয় ও রত্নজ্যোতিতে দোদীপ্যমান ছিলো বিমানটি৷ আকাশে বিচরণের সময়ে বৃহদায়তন শ্রেষ্ট হাসের দ্বারা চালিত হতো৷ এর নির্মান খুব সৌন্দর্যের সাথে অদ্ভুত শোভাযুক্ত করে করা হয়েছিলো৷ বিমানটি নির্মাণে একাধিক ধাতুর ব্যবহার এমনভাবেই করা হয়েছিলো যেন গ্রহ পর্বত শিখর ও জ্যোৎস্নার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিনন রঙের ছটা বিচ্ছুরিত করছে এমন মনে হতো৷ ইআর ভূমি সংলগ্ন দিকটি স্বর্ণমণ্ডিত ও কৃত্রিম পর্বত শিখরের শ্রেণীর মতো দেখতে ছিলো৷ কৃত্রিম পর্বত শিখরগুলিতে গাছ এবং ফুল থাকতো এবং সাথে প্রজাপতিও অবস্থান করতো৷ বিমানেরভেতর সাদা রঙের একটি অট্টালিকা নির্মিত ছিলো এবং এই অট্টালিকার চারিদিকে অদ্ভুত সুন্দর বন এবং সরোবর তৈরী করা হয়েছিলো৷ বিমানটি রত্নমণ্ডিত ছিলো এবং প্রয়োজন মতো যেখানে খুশি ভ্রমন করা যেত৷
বিমানটিতে বিভিন্ন রত্ন ও রং ব্যবহার করে সাপের আকৃৃতি তৈরী করা হয়েছিলো তথা স্বঙ্গযুক্ত অশ্বও ছিলো এটিতে৷ বিমানটিতে কামদেবের সহায়ক সুদৃশ্য মুখ ও ডানাযুক্ত বিভিন্ন প্রজাতির পাখি অঙ্কিত ছিলো৷ গজগুলি অঙ্গারকমণি, প্রবাল ও স্বর্ণখচিত ছিলো এবং পুষ্পনির্মিত ডানাগুলি শ্রীলক্ষ্মীর আরাধনারত ছিলো৷ গজের সাথে দেবী গজলক্ষ্মীর মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত ছিলো, যা প্রতিনিয়ত হাতিগুলির দ্বারা অভিষিক্ত হতো৷ বিভিন্ন প্রকার পতঙ্গযুক্ত পর্তশিখরগূলির বসন্ত ঋতুতে সুগন্ধি গাছে ভরে উঠতো৷ বাল্মীকি রামায়ণে পুষ্পক বিমানের উল্লেখ কিছুটা এভাবে পাওয়া যায় যে,
বিভিন্ন গ্রন্থ অধ্যয়ণ করে বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, রাবণের লঙ্কায় পুষ্পক ছাড়াও একাধিক বিমান ছিলো৷ এই বিমানগুলি তিঁনি রাজ্যের মধ্যে আলাদা আলাদা দিকে অবস্থিত বন্দরগুলি পরিদর্শন এবং রাজ্যের বাইরে ভ্রমনের জন্য ব্যবহার করতেন৷ বাল্মীকি রাময়ণ অনুসারে রামে লঙ্কাবিজয়ের পরে তিনি লক্ষ্মণকে বলেছিলেন যে, একাধিক বিমানের সমারোহে এই ধরনীতে লঙ্কা উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
বিমান অবতরণ ও উড্ডয়নের জন্য লঙ্কায় মোট ছয়টি বিমানবন্দর ছিলো৷ এর মধ্যে কিছু বিমান ও বিমানবন্দরের বিবরণ নিম্নরূপ,
- বেরাগনটোটা - এটি বর্তমানে মধ্য শ্রীলঙ্কার মহীয়াঙ্গনে অবস্থিত৷ সিংহলি ভাষাতে এই নামটির অর্থ বিমান অবতরণের স্থল৷
- তোটুপোলা কন্দ - তোটুপোলার আক্ষরিক অর্থও বিমান সম্বন্ধীয় তথা যেই স্থান থেকে কেউ যাত্রারম্ভ করে তাই তোটুপোলা৷ কন্দ অর্থ পর্বত৷ সমুদ্রতল থেকে ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটি ছিলো বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের অনুকুল৷
- দণ্ডুমোনরা বিমান - রাবণ দ্বারা ব্যবহৃত এই বিমানটির স্থানীয় সিংহলি ভাষায় অর্থ, যা ময়ূরের মতো উড়তে পারে৷ স্থানীয় ভাষায় মোনরা শব্দের অর্থ ময়ূর৷
- বারিয়াপোলা - এটি বর্তমানে শ্রীলঙ্কার মাতালে অঞ্চলে অবস্থিত৷ বা (ওয়া) শব্দের অর্ত বায়ু, রিযা শব্দের অর্থ যান এবং পোলা শব্দের অর্থ স্থান অর্থাৎ আক্ষরিক ভাবে এটি ছিলো আকাশযান অবতরণের একটি স্থান৷
- গুরূলোপোথা - সিংহলি ভাষায় এর আক্ষরিক অর্থ পাখিদের দেহাংশ৷ এই বিমানবন্দরটিতে বিমানঘর ঐ বিমান মেরামতিকেন্দ্র ছিলো বলে অনুমান করা হয়৷
বিমানের জ্বালানিতে ব্যবহার করা হত পারদ আবার কখনও হলুদেটে সাদা তরল। খুব সম্ভবত তিনি গ্যাসোলিন এর কথা বলেছেন। উনার বিবরণ দ্বারা বুঝা যায় বিমানগুলোতে কম্বাসচন ইঞ্জিন এবং পালস-জেট ইঞ্জিন দুই ধরনের ইঞ্জিনই ব্যবহার করা হত। যে পালস-জেট ইঞ্জিন নিয়ে হাজার বছর পর নাৎসিরা গবেষণা শুরু করে।তাদের রকেটে ব্যবহার করার জন্য। যেভাবেই হোক হিটলার প্রাচীর ভারতের এই গ্রন্থগুলো সম্পর্কে জানতেন এবং এগুলো সংগ্রহ করার জন্য তার প্রতিনিধিদের ভারতবর্ষে পাঠিয়েছিলেনও।
শিবকরের উড়োজাহাজ তৈরির ঘটনাটি বিশদে বর্ণিত হয়েছে মারাঠি স্থপতি ও ঐতিহাসিক প্রতাপ বেলকারের বই ‘পাথারে প্রভুঞ্চ ইতিহাস’ নামক বইটিতে। শিবকরের ভাইঝি রোশান, নিকটাত্মীয় চন্দ্রকান্তের বিভিন্ন বক্তব্য এবং ছাত্র পি. সাটওয়ালকারের কিছু প্রবন্ধকে রেফারেন্স হিসেবে বইটিতে ব্যবহার করেছেন বেলকার। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, জেজে স্কুল অব আর্টের ওয়ার্কশপে গাড়ির চাকা আর পাখির ডানা- এ দুইয়ের নকশা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন শিবকর। এদের সংমিশ্রণে তিনি এরপর এমন একটি যন্ত্র তৈরি করতে চাইলেন, যা মাটি থেকে উড়ে যেতে সক্ষম।
শিবকরের তৈরি করা সে যন্ত্রটির নকশা সাজানো হয়েছিলো পারদ ও সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে। শিবকর শখ করে এর নাম দেন মরুৎসখা। সংস্কৃতে মরুৎ অর্থ বায়ু ও সখা অর্থ বন্ধু। কোথাও বর্ণিত হয়েছে এ উড়োজাহাজটি ছিলো মোচাকৃতির, কোথাও বর্ণিত হয়েছে নলাকৃতির। তবে মজার বিষয়, উড়োজাহাজটিতে কোনো ডানা ছিলো না।
১৮৯৫ সালের কোনো এক সময়। উড়োজাহাজ তৈরি শেষ। এরপর এটিকে শিবকর নিয়ে যান চৌপত্তির বালুকাময় বেলাভূমিতে। অসংখ্য উৎসুক মানুষের চোখ তখন উড়োজাহাজের পানে। মোচাকৃতির বাঁশের তৈরি কাঠামোর ভেতর রাখা ছিলো গলিত পারদ। সূর্যের তাপে পারদের উদ্বায়নের দরুণ নির্গত হাইড্রোজেন গ্যাস বায়ুর থেকে হালকা। এতটাই হালকা যে, সেই হাইড্রোজেনের তোড়েই শূন্যে ভাসলো মরুৎসখা।
উড়োজাহাজটি মাটি থেকে ১,৫০০ ফুট ওপরে হাওয়ায় ভেসেছিলো ১৮ থেকে ২০ মিনিট অবধি। অনেক বর্ণনায় যদিও-বা বলা হয়, এই উড়োজাহাজ স্বল্প উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিলো, কিন্তু বেলকার সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে মরুৎসখা যে উড়েছিলো, এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই কোনো বর্ণনায়।
এ ঘটনাকে অনুপ্রেরণা করে ২০১৫ সালে বলিউডে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ‘হাওয়াইজাদে‘, যেখানে শিবকরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আয়ুষ্মান খুররানা।
Vaimanika Shastra PDF Download Link-
- http://www.samacharjagat.com/news/auto/pushpaka-vimana-of-ravana-86407
- ↑ https://m-hindi.webdunia.com/dussehra-special/ravana-116100500048_3.html#
- ↑ https://hindi.speakingtree.in/allslides/content-244055
- ↑ https://m-hindi.webdunia.com/dussehra-special/ravana-116100500048_3.html
- ↑ https://books.google.co.in/books?id=f4pUBQAAQBAJ&pg=PA102&lpg=PA102&dq=%E0%A4%85%E0%A4%B2%E0%A4%95%E0%A4%BE%E0%A4%AA%E0%A5%81%E0%A4%B0%E0%A5%80+%E0%A4%B0%E0%A4%BE%E0%A4%AE%E0%A4%BE%E0%A4%AF%E0%A4%A3+%E0%A4%AE%E0%A5%87%E0%A4%82&source=bl&ots=Fw5RYsnMpx&sig=ij1jjHJQ-WiBInjjGGCYRPQyd2U&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjkvdaq4f3SAhVIz1QKHYiVAOgQ6AEIHjAB#v=onepage&q=%E0%A4%85%E0%A4%B2%E0%A4%95%E0%A4%BE%E0%A4%AA%E0%A5%81%E0%A4%B0%E0%A5%80%20%E0%A4%B0%E0%A4%BE%E0%A4%AE%E0%A4%BE%E0%A4%AF%E0%A4%A3%20%E0%A4%AE%E0%A5%87%E0%A4%82&f=false
- ↑ https://www.amarujala.com/spirituality/religion/ramleela-puspak-viman-airport-of-ravan
- ↑ https://www.bhaskar.com/news/PUN-JAL-airport-prevailed-in-raavan-regime-4264114-PHO.html?&storyid=8248344&photoID=2072984
- ↑ https://m.bharatdiscovery.org/india/%E0%A4%AA%E0%A5%81%E0%A4%B7%E0%A5%8D%E0%A4%AA%E0%A4%95_%E0%A4%B5%E0%A4%BF%E0%A4%AE%E0%A4%BE%E0%A4%A8
- ↑ अतुलनीय पुष्पक विमान (हिन्दी)। अभिगमन तिथि: २४ मई, २०१३।
- ↑ কখ http://badalav.com/ravan-ka-pushpak-plane/
- ↑ http://ww1.delhitopnews.com/astro/the-history-of-this-gold-lanka/[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ https://www.lexilogos.com/english/sinhala_dictionary.htm
No comments:
Post a Comment
ধন্যবাদ