ব্রহ্মচর্য ও য়জ্ঞোপবীত - ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম্মতত্ত্ব

ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান, ধর্ম গ্রন্থ কি , হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়, ইসলাম খ্রীষ্ট মত বিষয়ে তত্ত্ব ও সনাতন ধর্ম নিয়ে আলোচনা

धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते-Theology

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

Post Top Ad

স্বাগতম

03 March, 2025

ব্রহ্মচর্য ও য়জ্ঞোপবীত

একাদশ অধ্যায়
ব্রহ্মচর্য ও য়জ্ঞোপবীত

🍁 মেখলা 🍁

প্রাচীনকালে গুরুকুলগুলোতে বেদের বিদ্বান বেদসংজ্ঞক আচার্য য়জ্ঞোপবীত সংস্কার করাতেন আর তারপর তারা বেদারম্ভসংস্কারের সময় মেখলা কৌপীনাদি বস্ত্র দণ্ড আর কমণ্ডলু ধারণ করাতেন। মেখলা ব্রহ্মচর্য পালনের জন্য দীক্ষার একটা চিহ্নরূপে গুরু দ্বারা দেওয়ার পরম্পরা চলে আসছিল। মহাভারত (বিশ্ব) যুদ্ধের পশ্চাৎ যখন গুরুকুল শিক্ষাপ্রণালী লুপ্ত হয়ে যায় তখন মেখলা ধারণ করার রীতি তো চলতে থাকে কিন্তু গুরুর স্থানে গৃহের মায়েরা এই কাজ নিজের মাথায় নিয়ে নেন আর আজ পর্যন্ত মায়েরাই এটা বেঁধে এই শ্রেষ্ঠ পদ্ধতিকে চালিয়ে আসছেন।
.
এখন এর গুরুত্বকে প্রায় সবাই ভুলে গেছে। গুরুকুলেও এটা বাঁধা অনিবার্য ধরা হয় না। এই কল্যাণকারী ঋষিদের প্রিয় মেখলা, যা কিনা ব্রহ্মচারীর ব্রহ্মচর্যের প্রাণের সমান রক্ষক, তার উপর ধ্যান দেওয়া হয় না। কোনো-কোনো বেদভক্ত অনুভবী আচার্য তাঁর ব্রহ্মচারীদের মেখলা বেঁধে জনতার ধ্যান সেদিকে নিয়ে যান। বেদের কোনো বিদ্বান মেখলাসূক্তের উপর লিখে তার গুরুত্ব সম্বন্ধে সঠিকভাবে প্রকাশ ফেলেনি।
.
মহর্ষি দয়ানন্দ জী সংস্কারবিধিতে এটা বাঁধার জন্য বল দিয়েছেন আর এটা সর্বদা ধারণ করার জন্য ব্রহ্মচারীর নিত্যধর্ম কর্তব্য বলেছেন। শ্রদ্ধাবশত নিজের বুদ্ধি তথা অনুভবের আধারে জনকল্যাণের ভাবনা মাথায় রেখে মেখলাসূক্তের উপর কিছু লেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা পড়ুন আর মেখলা-ধারণ করার লাভ নিন।
✍️ ওমানন্দ সরস্বতী
.
🍁 ব্রহ্মচারীর তিনটা ধার্মিক চিহ্ন 🍁
ব্রহ্মচারী তিনটা ধার্মিক চিহ্ন ধারণ করে, যথা - শিখা, য়জ্ঞোপবীত আর মেখলা।
.
(১) শিখা - যখন শিশু এক থেকে তিন বছরের হয় সেই সময় তার মুণ্ডন বা চূড়াকর্ম সংস্কার করা হয়। এতে শিশুর মস্তকের সব কেশ কেটে ফেলা হয় তবে কেবল শিখা রেখে দেওয়া হয়। সেইরূপ দ্বিতীয় বার কেশ মুণ্ডনের সময় শিখা রেখে দেওয়াকে ভালো ভাবা হয়।
.
(২) সূত্র বা য়জ্ঞোপবীত - এটা হল বিদ্যার চিহ্ন, ব্রহ্মচারী এটা উপনয়ন সংস্কারের সময় ধারণ করে। বাড়িতে মাতা-পিতা তথা গুরুকুলে আচার্য য়জ্ঞোপবীত সংস্কার করে সূত্র বা পৈতা ধারণ করিয়ে দেন। বেদের মধ্যে আজ্ঞা দেওয়া হয়েছে -
আচার্য় উপনয়মানো ব্রহ্মচারিণম্ কৃণুতে গর্ভমন্তঃ ।
তম্ রাত্রিস্তিস্র উদরে বিভর্তি তম্ জাতম্ দ্রষ্টুমভিসম্য়ন্তি দেবাঃ ।। (অথর্বঃ ১১/৭/৩)
.
আচার্য ব্রহ্মচারীকে য়জ্ঞোপবীত (পৈতা) ধারণ করিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসেন, তিনি এমন নিকটে নিয়ে আসে যেন তাকে নিজের গর্ভে ধারণ করেন, তার মাতার সমান ধারণ-পোষণ করেন। আচার্যের ছত্র-ছায়াতে থেকে তার বিদ্যার দ্বিতীয় জন্ম হয়, যার দ্বারা সে দ্বিজ বলে পরিচিত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত তার তিন প্রকারের অজ্ঞান অর্থাৎ আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক আর আধিদৈবিক অজ্ঞান দূর না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আচার্য তাকে নিজের দেখাশোনাতে রাখবেন। একেই আচার্যের গর্ভের তিন রাত্রি বলা হয়। প্রকৃতি, জীবাত্মা আর পরমাত্মা সম্বন্ধীয় অজ্ঞানই হল সেই তিন অন্ধকারময় রাত্রি, এগুলো দূর করে আচার্য ব্রহ্মচারীকে দর্শনীয় বিদ্বান করে তোলেন, তখন সেই ব্রহ্মচারীকে সব দেব বিদ্বান ব্যক্তিরা আদর সম্মান করেন আর ব্রহ্মচারীর ব্রহ্মসূত্র বা য়জ্ঞোপবীত ধারণ করা, আচার্যের নিকট আসা (উপনয়ন ধারণ করা) সার্থক হয়। সেই ব্রহ্মচারী জ্ঞানী-তেজস্বী-বিদ্বান হয়ে চতুর্থ প্রকাশময় অবস্থা অর্থাৎ দেবতাদের উঁচু স্থানকে প্রাপ্ত করে। য়জ্ঞোপবীত ধারণ করার সময় ৫ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত আয়ু ধরা হয়। ব্রহ্মচারীর এই দ্বিতীয় ধার্মিক চিহ্নকে য়জ্ঞোপবীত, পৈতা বা উপনয়ন বলে। বিদ্যা পড়তে সক্ষম সকল বালক-বালিকারা এটা ধারণ করতে পারে।
.
(৩) মেখলা - এটা হল ব্রহ্মচারীর তৃতীয় ধার্মিক চিহ্ন, একে তাগড়িও বলে। এটা ধারণ করার সময়ও সাধারনত ৫ থেকে ১২ বছরের আয়ু হয় আর বেদারম্ভ সংস্কারের সময়ই বিদ্বান আচার্য ব্রহ্মচারীকে মেখলা ধারণ করিয়ে দেন। আজকাল বাড়িতে মায়েরাই বালকের মেখলা বা তাগড়ি বেঁধে দেন। আগে মেয়েরাও মেখলা তথা য়জ্ঞোপবীত ধারণ করতো। এখন কেবল ছেলেরাই মেখলা এবং য়জ্ঞোপবীত পরে। মেয়েরা পরে না তবে বিবাহ হলে আভূষণ রূপে রুপোর তাগড়ি বা মেখলা পরে। পুরোনো মূর্তিতে দেখলে এটাই প্রমাণিত হয় যে আগেকার দিনে স্ত্রী-পুরুষ উভয়ই মেখলা তথা য়জ্ঞোপবীত ধারণ করতো। দেবসংজ্ঞক বিদ্বানই ব্রহ্মচারীকে মেখলা প্রদান করতেন। বেদের মধ্যে মেখলাসূক্তের উপর সুন্দরভাবে প্রকাশ ফেলা হয়েছে। এই সূক্তের মধ্যে পাঁচটা মন্ত্র আছে, তার ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হল।
.
🌿 মেখলাসূক্ত -
য় ইমাম্ দেবো মেখলামাববন্ধ য়ঃ সন্ননাহ য় উ নো য়ুয়োজ। য়স্য দেবস্য প্রশিষা চরামঃ স পারমিচ্ছাৎ স উ নো বিমুঞ্চাৎ।। (অথর্বঃ ৬/১৩৩/১)
.
অর্থ - (য়ঃ দেবঃ) দেবসংজ্ঞক যে বিদ্বান, আচার্য, গুরু (নঃ) আমাদের (ইমাম্) এই (মেখলাম্) মেখলা (আববন্ধ) সঠিকভাবে বেঁধেছেন (য়ঃ সন্ননাহ) যিনি সাজিয়েছেন (উ) আর (য়ঃ য়ুয়োজ) যিনি সংযুক্ত করেছেন (য়স্য) যে (দেবস্য) বিদ্বান আচার্যের (প্রশিষা) উত্তম শাসন দ্বারা (চরামঃ) আমরা (ব্রহ্মচারী) বিচরণ বা যাপন করি (সঃ) তিনি (নঃ) আমাদের (পারম্) পার (ইচ্ছাৎ) করাবেন (সঃ উ) কষ্ট থেকে, দুঃখ থেকে, সর্বপ্রকারের বন্ধন থেকে তিনিই (বিমুঞ্চাৎ) মুক্ত করবেন, নিবৃত্ত করবেন।
.
মহর্ষি দয়ানন্দ জী হলেন এই যুগের আপ্ত পুরুষ। "আপ্তোপদেশঃ শব্দঃ" (ন্যায়দর্শন ১১/৩) অর্থাৎ আপ্ত পুরুষের উপদেশ বা কথন সত্য হয়, সুতরাং সেটা শব্দ প্রমাণের শ্রেণীতে আসে, এইজন্য সেটা সবার মান্য হয়। মহর্ষি দয়ানন্দ জী সত্যার্থপ্রকাশের মধ্যে লিখেছেন - "বিদ্বাম্সো হি দেবাঃ" (শতপথব্রাহ্মণ ৩/৭/৩/১০) "যারা বিদ্বান ব্যক্তি তাদেরই দেব বলা হয়। যে ব্যক্তি সাঙ্গোপাঙ্গ চার বেদের জ্ঞানী, তাদের নাম ব্রহ্মা আর যারা তাদের থেকে কিছু ন্যুন হয়, তাদের নাম দেব বা বিদ্বান।"
.
🍁 বেদের মধ্যে দেব শব্দ 🍁
মহর্ষি দয়ানন্দ জী বলেছেন যে "বেদ হল সব সত্য বিদ্যার পুস্তক।" তিনি আরও বলেছেন যে "ব্রহ্মা থেকে জৈমিনি পর্যন্ত সব ঋষি-মহর্ষি এই সিদ্ধান্তই মেনে আসছেন।" অন্যদিকে মহর্ষি মনু মহারাজ বলেছেন - "ধর্মম্ জিজ্ঞাসমানানাম্ প্রমাণম্ পরমম্ শ্রুতিঃ" অর্থাৎ ধর্মকে যথাযথ ভাবে জানতে বেদকেই পরম প্রমাণ মানা হয়েছে।
.
বেদের মধ্যে দেব শব্দের ব্যবহার বহু স্থানে আছে। দেব শব্দ "দিবু" ধাতু দিয়ে তৈরি আর এর বারোটা অর্থ আছে। খেলা জেতার ইচ্ছা, ব্যবহার (আদান-প্রদান), প্রকাশ, প্রশংসা, আনন্দ, অহংকার, নিদ্রা, শোভা, গতি (জ্ঞান, গমন, প্রাপ্তি) আদি। দেবতাদের দেব সবথেকে বড় বিদ্বান হওয়ার কারণে পরমাত্মাকেও দেব বলা হয়।
.
(১) এই সংসার পরমাত্মা আর বিদ্বান উভয়ের জন্য ক্রীড়াক্ষেত্র। পরমাত্মা হলেন সংসারের কর্তা-ধর্তা আর হর্ত্তা, তিনি সৃষ্টির রচনা করেন, সব প্রাণীর পালন-পোষণ করেন আর সব জীবের কর্মের যথাযোগ্য ফল দিয়ে সুখী বা দুঃখী রাখেন, এটাই হল প্রভুর খেলা। বিদ্বান ব্যক্তিও বিদ্যার দ্বারা তার ক্রিয়া করেন, অবিদ্যার নাশ করে প্রাণীদের অনেক ধরণের সুখ প্রদান করেন। দেবকোটির বিদ্বান ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে চলে নিজের খেলা খেলেন। বিদ্বান ব্যক্তি নিজে খুব আনন্দ নেন তথা বিদ্যার দ্বারা অন্য প্রাণীদেরও সুখ প্রদান করেন। কিন্তু মুর্খ বা অবিদ্বান ব্যক্তি তার মূর্খতা দিয়ে এমন খেলা খেলে যে অনেক দুঃখ আর বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
.
(২) বিদ্বান ব্যক্তির সব কাজে সফল হয়, বিজয় তার পদ চুম্বন করে। মুর্খ ব্যক্তির পদে-পদে পরাজয় হয়।
.
(৩) দেব পুরুষ ব্যবহারকুশল হয় আর মুর্খ তার বিপরীত ব্যবহারশূন্য হয়।
.
(৪) দেব পুরুষ জ্ঞানী হন তথা অন্যকে জ্ঞান দান করেন। জ্ঞানের প্রকাশ তাকে অনেক দিব্যগুণে পরিপূর্ণ করে তোলে। এইভাবে তিনি সংসারের পথপ্রদর্শক বা গুরু হয়ে যান।
.
(৫) অনেক বিদ্যার্থী দিব্যগুণের কারণে তাদের স্তুতি বা প্রশংসা করে কারণ সেই দেব পুরুষরা পরোপকার কর্মেই লেগে থাকেন।
.
(৬) দেব পুরুষদের স্বপ্ন সদা সংসারকে স্বর্গ করে তোলার হয়। তারা শরীর আর মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার জন্য উচিত মাত্রায় আহার-নিদ্রার সেবন করেন।
.
(৭) পরমাত্মার আজ্ঞানুসারে আচরণ করার জন্য দেব পুরুষরা সর্বদা মুদিত অর্থাৎ প্রসন্নচিত্ত আনন্দে থাকেন।
.
(৮) দেবতাদের মধ্যে স্বাত্মাভিমান থাকে কিন্তু মিথ্যা অভিমান অহংকার থাকে না।
.
(৯) নিজের দিব্যগুণের কারণে তাদের মধ্যে বিশেষ কান্তি বা কমনীয়তা থাকে।
.
(১০) সব বিদ্যার দ্বারা দেবসংজ্ঞক বিদ্বান সংসারের মধ্যে অবিদ্যার নাশ করে বিদ্যার প্রকাশ ছড়িয়ে দেন।
.
(১১) দেব পুরুষ সর্বদা শুভ কর্ম করার জন্য পুরুষার্থ করেন, তৎপর থাকেন আর মুর্খ প্রমাদি অলস ব্যক্তিরা অধর্ম পাপ কর্ম করতে নিজের কর্তব্যের পূর্তি মনে করে।
.
(১২) দেব পুরুষ তার জীবনে পৃথিবী থেকে পরমেশ্বর পর্যন্ত জ্ঞান প্রাপ্ত করে তথা অন্য ব্যক্তিকে করান। তারা স্বয়ং জীবন মুক্ত হন আর অন্য ব্যক্তিকেও জীবনের চরম লক্ষ্য মোক্ষের দিকে প্রবৃত্ত করান। এই অর্থ বিদ্বান আর পরমাত্মা উভয়ের মধ্যে ঘটে এইজন্য উভয়কে দেব বলা হয়।
.
বেদের ব্যাকরণ নিরুক্তে মহর্ষি য়াস্ক দেব শব্দের অর্থ নিম্ন প্রকারে করেছেন -
দেবো দানাদ্বা দীপনাদ্বা দ্যোতনাদ্বা দ্যুস্থানো ভবতীতি বা।।
(নিরুক্ত ৭/৪/১৫)
দান দেওয়ার জন্য দেব নাম হয়, যে ব্যক্তি নিজের বিদ্যাদি সব পদার্থকে সংসারের হিতার্থে দেয়, সেই বিদ্বান ব্যক্তি দেব নামে সংসারে প্রসিদ্ধ হয়। বিদ্যার প্রকাশ করার জন্য দীপন, সত্যোপদেশ দেওয়ার জন্য দ্যোতন, বিদ্বানকে দেব বলা হয়। সব মূর্তিমান দ্রব্যকে প্রকাশিত করার জন্য সূর্যাদিলোককেও দেব বলা হয়, তবে সেটা জড়। চেতন দেব হল মাতা, পিতা, আচার্য আর অতিথি, বিদ্বান সন্ন্যাসী, তারা পালন, বিদ্যা আর সত্য উপদেশ করার জন্য তাদের দেব বলা হয়। এইসব দেবের দেব আদি গুরু ঈশ্বরকে তাঁর উপরোক্ত গুণের কারণে সবথেকে বড় দেব মহাদেব বলা হয়।
.
🍁 দেবের দ্বারা মেখলা বন্ধন 🍁
এই মন্ত্রের মধ্যে দেব শব্দের ব্যবহার বিদ্বান-আচার্য-গুরুর জন্য হয়েছে, তাঁরাই ব্রহ্মচারীদের মেখলা বাঁধিয়ে দেন। কারণ মেখলার সমান পবিত্র চিহ্নের দ্বারা ব্রতের মধ্যে বাঁধার অধিকার কেবল বেদ ভগবান্ দেবসংজ্ঞক আচার্যকেই দিয়েছেন। কারণ "সদা দেবা অরেপসঃ" অর্থাৎ দেবসংজ্ঞক নিষ্কাম জ্ঞানী বিদ্বান আচার্য সর্বদা নির্দোষ আর নিষ্পাপ হন, কারণ তাঁরা পবিত্র বেদের জ্ঞানের গঙ্গা প্রবাহিত করে সারা সংসারের পাপ তথা দোষকে ধুয়ে ফেলে সবাইকে জ্ঞানামৃত পান করিয়ে নিষ্পাপ করে তাদের ধারণ-পোষণ করেন।
.
এই দেব পুরুষরা স্বয়ং পরিশ্রমী হন আর "ন ঋতে শ্রান্তস্য সখ্যায় দেবাঃ" অর্থাৎ বিনা পরিশ্রমে দেব কারও মিত্র বা সখা হয় না, তাঁরা পুরুষার্থীদেরই সাথী হন। কারণ দেবতাদের মিত্রতার লাভ পরিশ্রম দ্বারা ক্লান্ত হওয়া মানবরাই প্রাপ্ত করে। দেবতাদের দেব ভগবান্ স্বয়ং "ইন্দ্র ইচ্চরতঃ সখা" অর্থাৎ পুরুষার্থীরই সখা সহায়ক হয় আর দেবসংজ্ঞক বিদ্বান "প্রশিষম্ য়স্য দেবাঃ" পরমদেব ভগবানের প্রত্যক্ষ সত্যস্বরূপ শাসন ন্যায় আর তার একমাত্র আজ্ঞাকেই মেনে চলেন। এইজন্য তাঁরাও ঈশ্বরের সমান পুরুষার্থী, বিদ্যার্থীদের প্রতি বিশেষ স্নেহ রাখেন। তাই নীতিকারগণ এই সত্যকে এইভাবে প্রকট করেছেন -
সুখার্থী চেত্ত্যজেদ্ বিদ্যাম্ বিদ্যার্থী চেত্ত্যজেদ্ সুখম্।
সুখার্থিনঃ কুতো বিদ্যা নাস্তি বিদ্যার্থিনঃ সুখম্।।
(চাণক্যনীতিশাস্ত্র ১/৩)
.
প্রাচীনকালে বিদ্যালয়গুলোতে এই ধরণের শ্লোক দ্বারের উপর লাগানো থাকতো। যার অর্থ হল - সুখ যে চায় তার বিদ্যা কোথায় আর বিদ্যা যে চায় তার সুখ কোথায়? এইজন্য যে সুখ চায় সে বিদ্যা ছেড়ে দিবে আর বিদ্যার্থী সুখ ছেড়ে দিবে। এখানে সুখের অর্থ হল সাংসারিক ভোগ-বিলাস, যার পরিণাম বিষের তুল্য হয়।
.
সাংসারিক বিষয়ভোগের মিথ্যা ক্ষণিক সুখ থেকে দেব পুরুষরা সর্বদা নিজেকে দূরে রাখেন তথা শিষ্য ব্রহ্মচারীকেও দূরে রাখেন। কিন্তু দেব-বিদ্বান-আচার্যই আনন্দকন্দ ভগবানের আনন্দময়ী কোলে বসার অধিকার প্রাপ্ত করেন আর মোক্ষরূপী আনন্দামৃত পান করার সৌভাগ্য দেব পুরুষরাই প্রাপ্ত করেন। "য়ত্র দেবা অমৃতমানশানাস্তৃতীয়ে ধামন্নধ্যৈরয়ন্ত" অর্থাৎ যে সাংসারিক সুখ দুঃখ থেকে রহিত নিত্যানন্দযুক্ত মোক্ষরূপ ধারণকারী পরমাত্মার মধ্যে মোক্ষরূপ আনন্দামৃতকে প্রাপ্ত করে দেবসংজ্ঞক বিদ্বান পুরুষ স্বেচ্ছাপূর্বক নিজের অধিকার জেনে জীবনযাপন করেন, কারণ সেটা প্রাপ্তির জন্য সংযম, ব্রহ্মচর্যব্রতের সেবন দেব হওয়ার জন্য করেন। ব্রহ্মচর্যরূপী তপের মাধ্যমেই তারা দেব-বিদ্বান-আচার্যপদ "আচার্য়ো ব্রহ্মচারী ব্রহ্মচারী প্রজাপতিঃ" -কে প্রাপ্ত করেন। সত্য ব্রহ্মচারীই আসলে আচার্য হয় আর সে নিজের শিষ্য ব্রহ্মচারীকে নিজের সন্তান মেনে নিয়ে তাদের পালন-পোষণ করে, এইজন্য আচার্যকে প্রজাপতিও বলা হয়। ব্রহ্মচারীই "আচার্য়ো ব্রহ্মচর্য়েণ ব্রহ্মচারিণমিচ্ছতে" নিজের শিষ্যকে ব্রহ্মচারী করতে পারে, কেবল শব্দের উপদেশের কিছু প্রভাব পড়ে নয়, প্রভাব তো আচরণের পড়ে, এইজন্য "আচারম্ গ্রাহয়তি ইতি আচার্য়ঃ" স্বভাবের শিক্ষা নিজের উচ্চ আচরণের শিক্ষা দিয়ে বিদ্যার্থীকে আচারবান্ করে তোলার জন্য আচার্য সংজ্ঞাকে প্রাপ্ত করে। আচার্য তো যথানাম তথা গুণের হয়। আর এই দেব পুরুষ ব্রহ্মচর্য থেকে দেব হয়ে মহাদেব প্রভুকে প্রাপ্ত করেন।
.
"য়দিছন্তো ব্রহ্মচর্য়ম্ চরন্তি" সেই পরমাত্মাকে প্রাপ্তির ইচ্ছায় বিদ্বান ব্যক্তিরা ব্রহ্মচর্যের সাধনা বা পালন করেন, কারণ "তেষামেষ ব্রহ্মলোকো য়েষাম্ তপো ব্রহ্মচর্য়ম্" ব্রহ্মলোক হল তাদের যারা ব্রহ্মচর্য পালনার্থ তপস্যা করে, অর্থাৎ তপস্বী ব্রহ্মচারী তপ করে দেব হয়ে প্রভুকে প্রাপ্ত করে। কারণ দেবের দেব পরমাত্মা হচ্ছেন স্বয়ং ব্রহ্মচারী আর সেই ব্রহ্মচারী নিষ্কাম দেব বিদ্বানদেরই "তচ্চক্ষুর্দেবহিতম্" হিতৈষী, হিত সাধক। এইজন্য নিজের হিতৈষী পূর্ণ ব্রহ্মচারী প্রভুর প্রশাসন "প্রশিষম্ য়স্য দেবাঃ" আজ্ঞাতে দেব পুরুষরা চলেন আর তাঁর ছত্র-ছায়া বা আশ্রয়কে "য়স্যচ্ছায়ামৃতম্" অমৃতের তুল্য মানেন আর "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুমপাঘ্নত" (অথর্ববেদ) এই নিষ্কাম জ্ঞানী দেব পুরুষই ব্রহ্মচর্যরূপী তপ দ্বারা মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে দেন, মৃত্যুর উপর বিজয় প্রাপ্ত করেন।
.
এমন দেব-বিদ্বান-আচার্য যিনি নিজেকে ব্রহ্মচর্যরূপী তপস্যার আগুনে খুব তপ্ত হয়েছেন, নিজের ব্রহ্মচারীদের তিনি মেখলার ব্রতবন্ধন ঠিকভাবে বেঁধে দেন। তিনি সেটা এমন ভাবে বাঁধেন যে সেটা সেই ব্রহ্মচারীদের জন্য বন্ধন থাকে না কিন্তু সেটা আভূষণের রূপ ধারণ করে নেয়, সেই মেখলা সেই ব্রহ্মচারীদের সাজিয়ে তোলে আর তারা সেটা দিয়ে সেজে ওঠে। এইজন্য ব্রহ্মচারী মজা করে বলে যে এই মেখলা আমাদের আচার্য আমাদের (আববন্ধ) ঠিকভাবে বেঁধেছেন। শুধু তাই নয়, (য়ঃ সম্ননাহ) সেই দেব সুন্দর আভূষণের সমান এই মেখলাকে সাজিয়েছেন আর এই মেখলা আমাদের সঙ্গে (য়ঃ য়ুয়োজ) যিনি সংযুক্ত করেছেন অর্থাৎ এই মেখলার সঙ্গে সর্বদার জন্য আমাদের দৃঢ় সম্বন্ধ জুড়ে দিয়েছেন। আমরা সব ব্রহ্মচারী এর সঙ্গে জুড়ে গেছি, এখন আমরা এই বন্ধনকে বন্ধন নয় কিন্তু আভূষণ মনে করছি কারণ এর দ্বারা আমরা মহান ব্রত, ব্রহ্মচর্যব্রতের সাধনায় সফলতা প্রাপ্ত করবো, যার দ্বারা আমরা আমাদের বিদ্বান গুরু নিষ্কামদেবের আজ্ঞাতে থেকে বা চলে এই ভবসাগর থেকে পার হয়ে যাবো। আমাদের দেব গুরু এই মেখলা আমাদের সংসারের বন্ধন থেকে, দুঃখ থেকে, কষ্ট থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বেঁধেছেন। মেখলার এই বন্ধন অন্য সব বন্ধন থেকে ছাড়িয়ে আমাদের পার করিয়ে দিবে। এইজন্য আমাদের দেব গুরুর এই বন্ধনকে আমরা সব ব্রহ্মচারী আভূষণ মনে করি কারণ এর দ্বারাই ব্রহ্মচর্যামৃতকে পান করে আমরা দেব হবো, মৃত্যুকে জিতবো আর অমরপদকে প্রাপ্ত করবো। পুনরায় এমন দেবের সুন্দর বন্ধনকে-মেখলাকে সর্বশ্রেষ্ঠ আভূষণ কেন বলবো না? কারণ এই নৌকা দিয়ে আমাদের সবাইকে সব দুঃখ থেকে আচার্যদেব বাঁচিয়ে ভবসাগর থেকে পার করাবেন।
.
এই মন্ত্রের সার তো এটাই যে ব্রহ্মচারী হর্ষোল্লসিত হয়ে শ্রদ্ধাপূর্বক গর্ভপূর্ণ ভাষায় বলছে, তাদের বাণীই নয় হৃদয়স্থিত আত্মা বলছে, আমাদের পূজনীয় গুরু দেবতাস্বরূপ আচার্য আমাদের সবাইকে এই মেখলা খুব ভালো করে বেঁধেছেন, বাঁধা নয় যেন আভূষণের রূপে সাজিয়েছেন, এটা আমাদের এত প্রিয় লাগে যে এরদ্বারা সর্বদার জন্য আমরা সংযুক্ত হয়ে গেছি, সম্বন্ধীয় হয়ে গেছি। মেখলার বন্ধন আমাদের জন্য বন্ধন নয়, আভূষণ, কারণ এই সম্বন্ধ আমাদের পরমহিতৈষী বিদ্যা আর আচারের শিক্ষক আচার্য এই মেখলা দিয়ে করিয়েছেন, তাই এই সম্বন্ধ অটুট। আমরা একে কিভাবে ছাড়তে পারি। এটা আমাদের সব প্রকারের বন্ধনকে, দুঃখকে দূর করার জন্য, সফল জীবন করার জন্য আর জীবনের চরমলক্ষ্য মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য তথা এই ভবসাগর থেকে পার হয়ে পরমধামে পৌঁছানোর জন্য বিধিপূর্বক দেওয়া মেখলা হল আমাদের জন্য আচার্যপ্রবরের, দেবতাদের বরদান। আমরা ব্রহ্মচারীরা তো আচার্যের অধীনে থেকে "আচার্য়াধীনো বেদমধীষ্ব" নিত্য সাঙ্গোপাঙ্ক বেদ পড়ার ব্রত নিয়েছি, "আচার্য়াধীনো ভবান্যত্রাধর্মাচরণাৎ" আমরা সর্বথা সর্বদার জন্য আচার্যের অধীনে থেকে তাঁর আজ্ঞানুসারে চলার ব্রত নিয়েছি কারণ তিনি হলেন ধর্মাত্মা, আচারের ধনী, আচারের সাক্ষাৎ আদর্শ মূর্তি, তিনি আমাদের অধর্ম করার উপদেশ তো স্বপ্নেও কখনও দিবেন না। মেখলা ধারণ করাকে তিনি আমাদের নিত্যধর্ম বলেছেন। তাহলে এই পবিত্র কল্যাণকারী মেখলা যেটা আমাদের ব্রহ্মচর্যব্রতের সাধিকা, তাকে আমরা কিভাবে ত্যাগ করতে পারি। আমাদের কটিতে মেখলা বেঁধে, সাজিয়ে তো আমাদের ব্রহ্মচর্যপালনের দীক্ষা দিয়ে সন্নদ্ধ করে দিয়েছেন, সজ্জিত করে দিয়েছেন। "ব্রহ্মচারী অসি অসৌ" আজ থেকে তুমি ব্রহ্মচারী, এই শব্দ আমাদের জন্য আচার্যদেব বলেছেন। আমরা কি একে নিজের আচরণে সত্য সিদ্ধ করে দেখাবো না? অবশ্যমেব।

🍁 মেখলা-ধারণের মন্ত্র 🍁

মেখলা ধারণ করার সময় প্রত্যেক ব্রহ্মচারী আচার্যের সম্মুখে এই মন্ত্রটা বলে -

ইয়ম্ দুরুক্তম্ পরিবাধমানা বর্ণম্ পবিত্রম্ পুনতী ম আগাত্। প্রাণাপানাভ্যাম্ বলমাদধানা স্বসা দেবী সুভগা মেখলেয়ম্।। (পারস্কর গৃহ্যসূত্র ২/২/৮)
.
এই মন্ত্রের উচ্চারণ আচার্য তার ব্রহ্মচারীকে দিয়ে করিয়ে মেখলা ধারণ করে দেন। মহর্ষি দয়ানন্দ জীও এই মন্ত্রটা বলেছেন আর আচার্যকে দিয়ে আগে থেকে বানিয়ে রাখা সুন্দর মসৃণ মেখলা বালকের কটিতে বাঁধার আদেশ দিয়েছেন। এই মেখলা ব্রাহ্মণকে মুঞ্জ বা দর্ভের, ক্ষত্রিয়কে ধনুষ সংজ্ঞক তৃণ বা বল্কলের আর বৈশ্যকে উল বা শণের ধারণ করা উচিত, এইরূপ সংস্কার বিধিতে লেখা আছে।
.
পারস্কর গৃহ্যসূত্রের যে দুটো মন্ত্র দেওয়া হয়েছে তাতে মেখলার স্বরূপ সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
.
অর্থ - (ইয়ম্ মেখলা) এই মেখলা মুঞ্জাদি দিয়ে তৈরি (স্বসা, সুভগা) ভগিনীর (বোন) তুল্য সৌভাগ্যবতী ঐশ্বর্য প্রদানকারী (দেবী) দিব্যগুণযুক্ত অথবা সুন্দর উজ্জ্বলকারী আর (দুরুক্তম্) নিন্দাযুক্ত বচনকে (পরিবাধমানা) সব দিক থেকে সরিয়ে দিয়ে আর (বর্ণম্ পবিত্রম্ পুনতী) বর্ণভাবকে পবিত্র করে আর (প্রাণাপানাভ্যাম্) প্রাণ ও অপান বায়ুকে ঠিক রাখার কারণে (বলমাদধানা) বল দাতা হয়। (ইয়ম্) এই মেখলা (মে) আমি (আগাত্) সঠিকভাবে প্রাপ্ত করেছি।
.
এই মন্ত্রের মধ্যে মেখলাকে বোনের সমান হিতকারিণী, ঐশ্বর্য দাতা আর দিব্যগুণযুক্ত বলা হয়েছে। এটা সুন্দর উজ্জ্বল আর মসৃণ হওয়া উচিত, মর্মপীড়াদায়ক আর কুরূপ মোটেও নয়। এটা ধারণ করলে প্রাণ ও অপান উভয়ের গতি ঠিক থাকে। মেখলা বীর্যরক্ষাতে সহায়ক তথা বল প্রদান করে। ব্রহ্মচর্য পালন করে বলবান হয়ে ব্রহ্মচারীর প্রশংসা সর্বত্র হয়, তার বর্ণ=রঙ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, মুখে লালী বা তেজ হওয়াতে সবার কাছে ব্রহ্মচারী দেখতে সুন্দর হয়, তার কেউ নিন্দা করে না। সত্য ব্রহ্মচারীর তেজের কারণে নিন্দকও চাপা পড়ে যায়। তাহলে কেন ব্রহ্মচারী মেখলার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্বক এমন বচন বলবে না যে "এই মেখলা আমার দেবতাস্বরূপ আচার্যপ্রবর আমাকে আমার কল্যাণার্থ বিধিপূর্বক বেদ-আরম্ভ সংস্কারে প্রদান করেছেন। আমি একে সর্বদা আভূষণ রূপে ধারণ করবো। কারণ আমার মুখ্য ব্রত ব্রহ্মচর্যসাধনাতে এটা আমার পরম সহায়িকা আর এটাও য়জ্ঞোপবীতের সমান পবিত্র। আমার জীবনের আধার এই মেখলা হল বলের ভাণ্ডার, তাই আমার এটা খুব প্রিয়। এটা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় আর বৈশ্য সব দ্বিজ বর্ণকে পবিত্র করে শোভা বাড়িয়ে তোলে।
.
🍁 মেখলার নাম 🍁

অমরকোষে মেখলার অনেক নাম আছে -

স্ত্রীকট্যাম্ মেখলা কাঞ্চী সপ্তকী রশনা তথা।
ক্লীবে সা রসনম্ চাথ পুম্স্কট্যা শৃঙ্খলম্ ত্রিষু।।১০৮।।
.
স্ত্রীরা যেসব মেখলা ধারণ করতো তার পাঁচটা নাম হল - মেখলা, কাঞ্চী, সপ্তকী, রশনা (রসনা) আর নপুংসক লিঙ্গ রসনম্। একে সিঞ্জনি আর করধনীও বলা হয়। পুরুষদের মেখলা শৃঙ্খল বা শৃঙ্খলা বলা হতো। কিছু গ্রন্থকার এই ভেদকে এই রকম মানেন - এক (১) লড়ীযুক্ত করধনীকে কাঞ্চী, আট (৮) লড়ীযুক্তকে মেখলা, ষোলো (১৬) লড়ীযুক্ত মেখলাকে রশনা আর পঁচিশ (২৫) লড়ীযুক্তকে কলাপ বলা হতো। কিন্তু এই ভেদ তখন হয়ে থাকবে যখন স্ত্রীরা একে সোনা রূপার মেখলা বানিয়ে আভূষণ রূপে ধারণ করা শুরু করে। পুরুষদের মেখলার নাম শৃঙ্খল বা শৃঙ্খলা, শাস্ত্রের মধ্যে তো কোথাও ব্যবহার হয়নি, বেদ শাস্ত্রের মধ্যে তো সর্বত্র মেখলাই ব্যবহার হয়েছে। প্রতিত হয় যে এই নাম তথা ভেদ পরবর্তী কালে হয়েছে, যখন স্ত্রীরা একে আভূষণ রূপে ধারণ করে তখন থেকে এটা সোনা রূপার তৈরি হতে থাকে। স্ত্রীদের মধ্যে সোনা রূপার মেখলা আভূষণ রূপে এখনও প্রচলিত।
.
🍁 শাস্ত্রের মধ্যে মেখলা 🍁

শাস্ত্রের মধ্যে তো বর্ণভেদ দ্বারা মুঞ্জাদি মেখলার বর্ণনা পাওয়া যায়। মনুস্মৃতির দ্বিতীয় অধ্যায়ে এইভাবে লেখা আছে -

মৌঞ্জী ত্রিবৃৎসমা শ্লক্ষ্ণা কার্য়া বিপ্রস্য মেখলা ।
ক্ষত্রিয়স্য তু মৌর্বী জ্যা বৈশ্যস্য শণতান্তবী ।।৪২।।
.
ব্রাহ্মণকে মুঞ্জের তিন লড়ের মেখলা বানানো উচিত। এই মেখলা সমান, মসৃণ আর সুখস্পর্শযুক্ত হতে হবে, মর্মপীড়াদায়ক হবে না, দেখতেও সুন্দর হবে, এর গুণও এক সমান হতে হবে।
.
কুল্লুকেভট্ট লিখেছেন -

মুঞ্জময়ী ত্রিগুণা সমগুণত্রয়নির্মিতা সুখস্পর্শা ব্রাহ্মণস্য মেখলা কর্ত্তব্যা। ক্ষত্রিয়স্য মূর্বাময়ী জ্যা ধনুর্গুণরূপা মেখলা।
.
ক্ষত্রিয়কে মূর্বার দুটো মেখলা পরা উচিত। মূর্বা নামক একটা লতা আছে যা দিয়ে ধনুকের দড়ি তৈরি হয়, একে চিনার বা চুরনহারও বলা হয়।
.
বৈশ্যকে শণের তিন লড়ের মেখলা ধারণ করা উচিত। "বৈশ্যস্য শণসূত্রময়ী" অর্থাৎ শণের দড়ি বানিয়ে তাকে ত্রিবৃত তিন লড়ের (ভাণ) বিভক্ত করা উচিত।
.
সাধারণত "ত্রিগুণপ্রদক্ষিণা মেখলা" মেখলা তিন গুণের হয়, এইজন্য একে "ত্রিগুণ"ও বলা হয়। এখন পর্যন্ত এই রীতিটাই চলে আসছে যে তিন লড়ের মেখলা বাঁধা হয়।
.
🍁 মেখলার নির্মাণে বিকল্প 🍁

মনুস্মৃতিতে লেখা আছে -

মুঞ্জালাভে তু কর্ত্তব্যা কুশাশ্মন্তকবল্বজৈ ।
ত্রিবৃতা গ্রন্থিনৈকেন ত্রিভিঃ পঞ্চভিরেব বা ।।৪৩।।
.
যদি উপরোক্ত মুঞ্জ আদি প্রাপ্ত না হয় তাহলে মুঞ্জের অভাবে ব্রাহ্মণকে কুশা আর ক্ষত্রিয়কে মুঞ্জের অভাবে অশ্মন্তক আর বৈশ্যকে শণের অভাবে বল্বজ দিয়ে মেখলা বানানো উচিত আর মেখলা ত্রিবৃতা (তিন লড়যুক্ত) হওয়া উচিত। মেখলাতে এক তিন বা পাঁচ গ্রন্থি হতে পারে। কারও-কারও মতে ব্রাহ্মণকে এক, ক্ষত্রিয়কে তিন আর বৈশ্যকে পাঁচ গ্রন্থি লাগানো উচিত।
.
🍁 মুঞ্জের গুণ 🍁

যেসব মুঞ্জাদি দিয়ে মেখলা তৈরি করা হয় তাদের গুণ নিঘন্টুতে এইভাবে লেখা আছে -

ভদ্রমুঞ্জঃ শরো বাণস্তেজনশ্চক্ষুবেষ্টনঃ ।
মুঞ্জো মুঞ্জাতকো বাণঃ স্থূলদর্ভঃ সুমেখলঃ ।।১৫০।।
মুঞ্জদ্বয়ম্ তু মধুরম্ তুবরম্ শিশিরম্ তথা ।
দাহতৃষ্ণাবিসর্পাস্রমূত্রকৃচ্ছ্রাক্ষিরোগহৃত্ ।।১৫১।।
দোষত্রয়হরম্ বৃষ্যম্ মেখলাসূপয়ুজ্যতে ।
.
ভদ্রমুঞ্জকে রামশরও বলা হয়। সংস্কৃতে এর ভদ্রমুঞ্জ, শর, বাণ, তেজন, চক্ষুবেষ্টন আদি নাম আছে।

🍁 মুঞ্জের নাম 🍁

মুঞ্জ, মুঞ্জাতক, বাণ, স্থূলদর্ভ, সুমেখলা আদি সংস্কৃতের নাম আছে। উভয় প্রকারের মুঞ্জ মধুর, তিক্ত, শীতল, বীর্যবর্ধক আর দাহ, তৃষা, বিসর্প, রক্তদোষ, মূত্রকৃচ্ছ্র, নেত্ররোগ তথা তিন দোষকে নষ্ট করে। মুঞ্জের দড়ি দিয়ে মেখলা তৈরি হয় এইজন্য একে সুমেখলাও বলে। এটা স্তম্ভক বীর্যকে ধারণকারী= বীর্যবর্ধক বীর্যরক্ষাতে সহায়ক আর পুষ্টিকারক হয়। যে ভূমিতে এটা হয়, কৃষকরা তাকে কৃষি কাজের যোগ্য ভূমি বলে মনে করে।
.
মুঞ্জের অভাবে ব্রাহ্মণকে কুশা বা দর্ভের মেখলা ধারণ করতে বলা হয়েছে।

দর্ভদ্বয়ম্ ত্রিদোষঘ্নম্ মধুরম্ তুবরম্ হিমম্ ।
মূত্রকৃচ্ছ্রাশ্মরীতৃষ্ণাবস্তিরুক্প্রদরাস্রজিত্ ।।
.
দর্ভ কুশা দুই প্রকারের হয়, যার লম্বা পাতা আছে তাকে ডাভ বলে, একে ক্ষুরপত্র বলে। এর গুণ হল - কুশ আর ডাভ ত্রিদোষনাশক, মধুর, তিক্ত, শীতল আর মূত্রকৃচ্ছ্র, পাথর, তৃষা, বস্তিরোগ, প্রদর (স্ত্রীদের ধাতুরোগ) তথা রুধিরবিকারনাশক হয়। উপরোক্ত গুণ অনুসারে অনেক রোগকে মুঞ্জ দর্ভ কুশাদির মেখলা দূর করে ব্রহ্মচারীকে নিরোগ বানিয়ে ব্রহ্মচর্য পালন অর্থাৎ বীর্যরক্ষাতে সহায়তা হয়। এই ধরণের গুণ শণ ঊর্ণাদিতেও আছে।
.
শণের গুণ - এটা টক, তিক্ত, বাত কফের দোষকে দূর করে, অঙ্গ ভঙ্গের রোগকে দূর করে আর আলস্য দূর করতে শরণের মেখলা সহায়ক হয়।
.
উলের মেখলা উলের বস্ত্রের সমান কটিস্থলের উষ্ণতাকে বাইরে যেতে দেয় না আর বাইরের গরম বায়ুর প্রকোপ থেকে কটির রক্ষা করে। মুঞ্জ-কুশ-শণের মেখলাতে যেমন লাভ আছে, তেমনই উলের মেখলাতেও লাভ আছে। তিন বর্ণের পৃথক-পৃথক পরিচয়ের জন্য পৃথক-পৃথক বস্তু দিয়ে মেখলা নির্মাণ করার কথা লেখা আছে। লাভ তো সব মেখলা থেকেই হয়।
.
🍁 মেখলার অর্থ 🍁

প্রথম অর্থ - মেখলার অর্থ কিছু কোশের মধ্যে করা হয়েছে। বাচস্পত্যকোশে "মি" ধাতু দিয়ে খলচ্ প্রত্যয় গুণ আর স্ত্রীলিঙ্গে টাপ্ করে মেখলা শব্দ সিদ্ধ করেছে।
.
দ্বিতীয় অর্থ - সংস্কৃত শব্দার্থকৌস্তুভের মধ্যেও খল, গুণ, টাপ্ করে সিদ্ধ করা হয়েছে। "মীয়তে প্রক্ষিপ্যতে কায়মধ্যভাগে", কায় = শরীরের মধ্যভাগে অর্থাৎ কটিতে যেটা বাঁধা হয়, তাকে মেখলা বলে। উভয়ের অর্থ একই হবে।
.
তৃতীয় অর্থ - কিছু বিদ্বানের মনে করেন যে এতে অশুদ্ধ আছে। শ্রী পূজ্য স্বামী বেদানন্দ জী (মাম্+ঈখ্+লা) এইভাবে সিদ্ধ করেন। এতে ঈখ্ ধাতু গত্যর্থক আছে। আদান অর্থযুক্ত লা ধাতু দিয়ে ঘঞ্ প্রত্যয় ভাবে আছে। অর্থ এইরূপ হবে - মাম্ ঈখ্ = গতি লাতি = আদদাতি = প্রাপয়তি "আতোऽনুপসর্গে কঃ" সাথে ক প্রত্যয় হবে, টাপ্ স্ত্রীলিঙ্গে - আমাকে গতি, উৎসাহ, জ্ঞান, সচেতনতা, পরাক্রম শক্তি অর্থাৎ ব্রহ্মচর্যকে প্রাপ্ত করায়।
.
চতুর্থ অর্থ - "মা ইহ স্খলতি অনয়া ইতি মেখলা। অনয়া মেখলয়া (ধারণেন) বীর্য়স্খলনম্ ন ভবতি", অর্থাৎ যেটা ধারণ করলে বীর্যরক্ষা হয়, ব্রহ্মচর্যের পালন হয়, তাকে মেখলা বলে।
.
পঞ্চম অর্থ - "মাম্ খম্ ব্রহ্ম লাতি প্রাপ্নোতি য়া সা মেখলা" অর্থাৎ যেটা আমাকে পরমাত্মা, মোক্ষ, বেদজ্ঞান তথা ব্রহ্মচর্য প্রাপ্ত করাবে তাকে মেখলা বলে।
.
ষষ্ঠ অর্থ - মে= মম খানি= ইন্দ্রিয়কে লাতি= নিয়ন্ত্রণ করে, আমাকে জিতেন্দ্র করে তোলে, ব্রহ্মচারী বানায়, তাকে মেখলা বলে।
.
সপ্তম অর্থ - মা= জীবাত্মা, খ= পরমাত্মা, লা= প্রকৃতি রূপী সাধন, এই তিনের জ্ঞান করিয়ে দেয়, তাকে মেখলা বলে।
.
যাকে ধারণ করে বালক ব্রহ্মচারী বিদ্বান বলবান নিরোগ সুস্থ জিতেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে আর প্রকৃতি থেকে পরমাত্মা পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করে মহান ব্রহ্ম (বড়) হয়ে ওঠে, উচ্চপদ প্রাপ্ত করে, জীবাত্মার চরমলক্ষ্য মোক্ষকে প্রাপ্ত করে, সেই শক্তি মেখলা প্রদান করে।
.
আসলে মেখলা হল ব্রহ্মচারীর একমাত্র চিহ্ন এবং এটা ব্রহ্মচর্যব্রতের প্রতীক। য়জ্ঞোপবীত শিখা তো ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ আর বানপ্রস্থ তিন আশ্রমই ধারণ করে কিন্তু মেখলাকে ধারণ করার অধিকারী কেবল ব্রহ্মচারীর আছে। ব্রহ্মচারী একে ধারণ করেই ঋষি আর দেবতা হয়। দেবতাস্বরূপ আচার্যই এটা ব্রহ্মচারীকে পরানোর অধিকারী আর এটা য়োগী দেবতাদের মাতা, শ্রদ্ধার দুহিতা আর ঋষিদের স্বসা। এটা তপস্বী ব্রহ্মচারী ব্রতবন্ধনের আভূষণ হয়, প্রাণাপানকে নিয়ন্ত্রণকারী হয়। প্রাণ নিয়ন্ত্রণে আসাতে মনাদি সব ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে চলে আসে আর ব্রহ্মচারী পূর্ণ জিতেন্দ্র য়োগী হয়ে বেদাদি সব শাস্ত্রের বিদ্যায় পারঙ্গত হয়, তারপর ব্যাসের পদবী ধারণ করে।
.
এইভাবে মহর্ষি দয়ানন্দ জীর কথানুসারে মেখলার দ্বারা ব্রহ্মচর্যব্রতে দীক্ষিত হয়ে এমন ব্রহ্মচারীই মরণপর্যন্ত ব্রহ্মচারী হয়ে থাকতে পারবে। এটা খুবই কঠিন কাজ তাই এই কাজ পূর্ণবিদ্যাযুক্ত জিতেন্দ্রিয় আর নির্দোষ স্ত্রী আর পুরুষের, সুতরাং মেখলাধারী ব্রহ্মচারী নিষ্কাম দেবসংজ্ঞক জ্ঞানীর চরণে থেকেই পূর্ণ ব্রহ্মচারী, পূর্ণয়োগী হয়ে ওঠবে আর নির্দোষ জিতেন্দ্রিয় পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে পূর্ণায়ু অর্থাৎ চারশো বছরের দীর্ঘায়ুকে সুখপূর্বক ভোগ করতে পারবে। এই জীবনেও পূর্ণ সুখী জীবন-মুক্ত হবে তথা পরমপদ মোক্ষকে প্রাপ্ত করবে, যেমন মহর্ষি ভারদ্বাজাদি হয়েছেন, ব্রহ্মচারী ভীষ্ম আর গৃহস্থ গুরু দ্রোণাচার্য হয়েছিলেন। মহর্ষি ব্যাসাদি মহাভারতের পতনকালের সময় এই ব্রহ্মচর্যব্রতের কারণেই দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। গুরু দ্রোণাচার্যের বিষয়ে লেখা আছে -

আকর্ণপলিতঃ শ্যামো বয়সাশীতিপঞ্চকঃ ।
সম্খ্যে পর্য়চরদ্ দ্রোণো বৃদ্ধঃ ষোডশবর্ষবত্ ।।
(মহাভারত দ্রোণপর্ব)

গুরু দ্রোণাচার্য যাঁর কান পর্যন্ত পলিত (সাদা চুল) ছিল তথা শ্যাম বর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর আয়ু ৮০×৫=৪০০ বছর পূর্ণ হয়েছিল, সেই বৃদ্ধ এই যুদ্ধে ১৬ বছরের যুবকের সমান স্ফূর্তি-উৎসাহ সহিত লড়াই করে যাচ্ছিল। তাঁরা ব্রহ্মচর্যের কারণেই এইরূপ বলবান বিদ্বান আর দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন।
.
মেখলা ধারণ করিয়ে নিজের সন্তানকে যারা ব্রহ্মচারী বানায় তারা বাস্তবে আসল দেবতা। মহর্ষি দয়ানন্দ জী লিখেছেন - যেসব আচার্য আর মাতা-পিতা নিজের সন্তানকে বাল্যকালে বিদ্যা আর গুণ গ্রহণের জন্য তপস্বী করেন (মেখলা ধারণ করিয়ে) আর তারই উপদেশ করে আর সেই সন্তান স্বয়ং অক্ষণ্ডিত ব্রহ্মচর্য-সেবন দ্বারা তৃতীয় উত্তম ব্রহ্মচর্যের সেবন করে পূর্ণ অর্থাৎ চারশো বছর পর্যন্ত আয়ুকে বাড়াবে সেইরূপ তোমরাও বাড়াবে। কারণ যে সকল ব্যক্তি এই ব্রহ্মচর্যকে প্রাপ্ত করে নষ্ট করে না তারা সব ধরণের রোগ থেকে মুক্ত হয়ে ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।
.
এইজন্য আচার্য মেখলাকে ধারণ করিয়ে বালককে তপস্বী করে তোলেন। মেখলা হচ্ছে ব্রহ্মচারীর মুখ্য চিহ্ন, তপস্যার প্রতীক, ব্রহ্মচর্যের ব্রত বন্ধন। সর্বদা সচেতন সাবধান থাকার জন্য মেখলাকে কটিতে বাঁধা হয়। কারণ একটু মাত্র অসাবধানীতেই ব্রহ্মচর্য ব্রত ভেঙে যাবে, বীর্য খণ্ডিত হবে। ব্রহ্মচারীর জন্য আলস্য উপেক্ষা অসাবধানী মৃত্যু, তাই সর্বদা সচেতন সাবধান থাকা ব্রহ্মচারীই ব্রহ্মচর্যে সফলতা প্রাপ্ত করে।

🍁 মেখলা আর কৌপীন 🍁 মেখলা আর কৌপীন লংগোটী ধারণ করা হল একই বিষয়, কারণ লংগোটী বা কৌপীন মেখলাতেই বাঁধা হয়। মেখলার মুখ্য প্রয়োজন কৌপীন ধারণ করা, লংগোট বা লংগোটী পরা। কারণ "পুরুষের লংগোট আর ঘোড়ার পা ২৪ ঘন্টা টানটান থাকা উচিত।" এটা পূর্ণ সত্য, পূর্ণ পুরুষ সে ব্যক্তিই হবে যে ব্রহ্মচারী হবে। সুতরাং ব্রহ্মচারীকে কিছু ক্ষণের জন্যও লংগোট বা কৌপীন বিনা থাকা উচিত নয়। কারণ উপস্থেন্দ্রিয় বা মূত্রেন্দ্রিয়ের সংযমই তো ব্রহ্মচর্য আর কৌপীন লংগোট উপস্থেন্দ্রিয় সংযমের (নিয়ন্ত্রণ) পরম সহায়ক হয়। হরিয়ানার লোকক্তি যেটা মেখলা বা তগড়ী খুলে গেলে বালক মজা করে তার সঙ্গীকে বলে - "তগ্গড় তোড় বানিয়ে কী ছোরী" অর্থাৎ যার মেখলা খুলে যায় সে দোকানদারের কন্যার সমান নির্বল হয়। কারণ দোকানদার পরিশ্রম না করার কারণে নির্বল হয় আর তার কন্যা তার থেকেও অধিক নির্বল হয়। তাই যে মেখলা তগড়ী ব্রহ্মচর্যব্রতকে খণ্ডিত করে, ভেঙে দেয় সে দোকানদারের কন্যার সমান নির্বল ভীরু হয়। মেখলার নাম তগড়ী হওয়ার কারণ হল এটা ধারণ করে ব্রহ্মচারী থাকলে শরীর তগড়া সুদৃঢ় বলবান হয়। "কৌপীনবন্তঃ খলু ভাগ্যবন্তঃ" কৌপীনধারী ব্রহ্মচারীরাই নিশ্চিতরূপে ভাগ্যবান হয়। . বীর্যরক্ষার্থ সদা কৌপীন বেঁধে রাখা, লংগোটকে সর্বদা টানটান করে রাখা অত্যন্ত শ্রেয়স্কর আর হিতকর। কারণ মূত্রেন্দ্রিয়ের উত্তেজনার কারণে বীর্যনাশ হয় আর কৌপীন ও মেখলা একে দূর করতে সহায়ক হয়। জাগরণ তথা শয়নের সময় উভয় কালে লংগোট উত্তেজনা থেকে বাঁচায়। মূত্রেন্দ্রিয়ের উত্তেজনার কারণে শরীর তথা মন দুটোই অশান্ত হয়ে ওঠে। এই উত্তেজনা সর্বনাশের কারণ হয়। লংগোট দ্বারা যেমন এটা দূর হয় তেমনই মনও শান্ত থাকে আর ব্রহ্মচর্যের সাধনাতে সিদ্ধি বা সফলতা প্রাপ্ত হয়। . 🍁 মেখলা আর অন্ত্রবৃদ্ধি 🍁 লংগোট বা কৌপীন বাঁধলে ডিম্বকোষ বাড়ে না আর এই ভয়ংকর রোগ থেকে তথা এর কষ্ট থেকে ব্যক্তি সর্বথা বেঁচে যায়। মেখলাধারণ করা তথা লংগোট বাঁধলে অন্ত্রবৃদ্ধি, অন্ত্রে বদ্ধতা (হর্নিয়া) আদি ভয়ংকর কষ্টদায়ক রোগ হয় না। . এখনকার লেখাপড়া জানা শিক্ষিত ব্যক্তিরা মেখলা ধারণ করে না আর না কৌপীন লংগোট বাঁধে। এইজন্য ৭৫% শিক্ষিত ব্যক্তির আজ ডিম্বকোষবৃদ্ধি অন্ত্রের বদ্ধতা (হর্নিয়া) আদি রোগ হয়। তারপর এর শল্যক্রিয়া (অপারেশন) করাতে এবং এরমধ্যে বেশিরভাগ অপারেশনে সফল না হওয়াতে অবল্পায়ুতেই মরে যায়। সুতরাং ব্রহ্মচারীর তো মেখলা আর কৌপীন ভূষণ হয়ই কিন্তু গৃহস্থীকেও লংগোট পরা সর্বথা হিতকর। লংগোটের কারণে অন্ত্র-বৃদ্ধি, ডিম্বকোষবৃদ্ধি, ব্যর্থ কামোত্তেজনা থেকে বেঁচে যায় আর তার পাশাপাশি বীর্যরক্ষা বা পুরুষত্বেরও রক্ষা হয়। লংগোট পরলে পুরুষত্ব হ্রাস হয় না বরং বৃদ্ধি পায়। এরদ্বারা পুরুষ অধিক পবিত্র শুদ্ধ আর অত্যন্ত সংযম জীবনযাপন করে, এগুলো সব অনুভবী ব্যক্তিদের অনুভব। আমার এমন অনেক গৃহস্থ মিত্র আছে যাদের সারাজীবন লংগোট বাঁধার পাক্কা স্বভাব আছে। তারা চব্বিশ ঘন্টা লংগোট বেঁধে রাখে, স্বাস্থ্য তাদের পূর্ণ সুস্থ আর অনেক সন্তানের পিতা তারা। . 🍁 লংগোট বা কৌপীন কেমন হবে? 🍁 লংগোট বা কৌপীন সুতির বস্ত্রের হওয়া উচিত। তবে কুস্তি করার দোহরা লংগোট ব্রহ্মচারী বা অন্য কোনো গৃহস্থীকে সবসময় পরা উচিত নয়। কারণ সেটা থেকে অধিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বীর্যনাশের সম্ভাবনা থাকে। নোংরা ময়লা লংগোট বা কৌপীনও হানিকারক, সুতরাং প্রত্যেক ব্রহ্মচারীকে অন্তত দুটো কৌপীন রাখা উচিত যা সুতির বস্ত্রের শুদ্ধ তথা পবিত্র ধুয়ে নেওয়া হবে। . মেখলা ধারণ করিয়ে আচার্য যুব ব্রহ্মচারীকে বেদারম্ভ সংস্কারে বস্ত্র ধারণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই মন্ত্র বলেন - য়ুবা সুবাসা পরিবীত আগাত্ স উ শ্রেয়ান্ ভবতি জায়মানঃ। তম্ ধীরাসঃ কবয় উন্নয়ন্তি স্বাধ্যো মনসা দেবয়ন্তঃ।। (পারস্কর গৃহ্যসূত্র ২/২/৯) . অর্থাৎ দৃঢ় শরীরধারী, স্বচ্ছ বস্ত্রধারণকারী য়জ্ঞোপবীত মেখলা আদি দ্বারা পরিবেষ্টিত ব্রহ্মচারী আজ সম্মুখ উপস্থিত হয়েছে, এইরূপ উপস্থিত থেকে সে সমাজের কল্যাণকারী হবে। বুদ্ধিপূর্বক কর্মকর্তা, পূর্বাপরদর্শী ভালো ধ্যানশীল, মন দিয়ে দেবভাবের কামনাকারী বিদ্বানজন সেই ব্রহ্মচারীকে সদ্গুণযুক্ত শিক্ষা-প্রদানের মাধ্যমে উন্নত করে তুলবেন। . এই বিষয়ে মহর্ষি দয়ানন্দ জী লিখেছেন - "এই মন্ত্রটা বলে দুটো শুদ্ধ কৌপীন, দুটো গামছা আর একটা চাদর আর দুটো কটিবস্ত্র (ধুতি) আচার্য ব্রহ্মচারীকে দিবেন। তারমধ্যে একটা কৌপীন, একটা কটিবস্ত্র আর একটা উপন্না বালককে আচার্য ধারণ করাবেন।" . আচার্য স্বয়ং কৌপীন ধারণ করেন তথা দুটো কৌপীন ব্রহ্মচারীকে দিবেন, এতে এটাই সিদ্ধ হয় যে কৌপীন হল ব্রহ্মচারীর সর্বদা ধারণ করার যোগ্য বস্ত্র। . তগড়িকে ধারণকারী সদা তগড়া সুদৃঢ় হয়। ব্রহ্মচারীকে সদা মেখলা তথা কৌপীনধারী হওয়া উচিত। মেখলা বা কৌপীন বিনা তাকে এক মুহূর্তও থাকা উচিত নয়। . 🍁 মেখলা ছিঁড়ে গেলে কি করতে হবে? 🍁 মনু জী লিখেছেন - মেখলামজিনম্ দণ্ডমুপবীতম্ কামণ্ডলুম্। অপ্সু প্রাস্য বিনষ্টানি গৃহ্ণীতান্যানি মন্ত্রবত্।। (মনুঃ১/১৬৪) মেখলা আদি নষ্ট হলে জলে ফেলে দিবে আর মন্ত্র বলে নতুন ধারণ করবে। . ব্রহ্মচর্য পালনে যেমন মেখলা আর কৌপীন সহায়ক হয় , তেমনই এর ধারণ করলে স্ফূর্তি উৎসাহ আসে, আলস্য দূরে পালিয়ে যায়, ব্যক্তি সচেতন থাকে, কর্ম করতে সদা তৎপর হয়। লংগোট বাঁধা থাকার কারণে চলতে ফিরতে দৌঁড়াতে পরিশ্রম আর ব্যায়াম করতে অনেক সুবিধা তথা গুপ্ত আর মর্মস্থানের বিশেষ সুরক্ষা হয়। আচার্য দুটো কৌপীন এই কারণে দেন যাতে ব্রহ্মচারী প্রতিদিন স্নান করার সময় একটা কৌপীনকে ধুয়ে শুকাতে দিবে তথা অন্য শুদ্ধ কৌপীন সে ধারণ করবে। . 🍁 মেখলার গিঁট 🍁 ত্রিবৃত্তা গ্রন্থিনৈকৈন ত্রিভিঃ পঞ্চভিরেব বা। (মনুঃ ২/৪৩) মেখলা তিন লড়যুক্ত হয় আর এতে এক তিন বা পাঁচটা গিঁট থাকে। এখানে গিঁটের বিকল্প আছে, একটা গিঁট বা তিনটা বা পাঁচটা, এমন কোনো স্পষ্ট বিধান নেই যে কাকে কয়টা গিঁট দিতে হবে। তবে কিছু টিকাকারের মত হল ব্রাহ্মণকে একটা, ক্ষত্রিয়কে তিনটা আর বৈশ্যকে মেখলাতে পাঁচটা গিঁট বাঁধতে হবে। অথবা এক তিন বা পাঁচ যেমন ইচ্ছে লাগাবে। . 🍁 মেখলার গিঁট থেকে লাভ 🍁 কিছু অনুভবী ব্রহ্মচারীর এমন মত হল মেখলার গিঁট পিঠের পিছনে লাগানো উচিত যাতে ব্রহ্মচারী সোজা শোয়ার ভুল না করে। কারণ সোজা হয়ে ঘুমালে স্বপ্ন আসে আর হাত বুকের উপর থাকলে নিদ্রালু ব্যক্তি অধিক স্বপ্ন দেখে তথা ঘুমের মধ্যে বকবক করে। ব্রহ্মচারীর নিদ্রা স্বপ্নহীন গভীর তথা গাঢ় হওয়া উচিত। সেই সময় মোটেও স্বপ্ন আসা উচিত নয়। মেখলাধারী ব্রহ্মচারীর কোমরে মেখলার গিঁট তাকে একটুও সোজা হয়ে ঘুমাতে দিবে না, সেটা খোঁচা দিবে আর ঘুম ভেঙে যাবে। এইভাবে ব্রহ্মচারী স্বপ্ন থেকে বেঁচে যাবে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন আসলে যদি স্বপ্ন নোংরা হয় তাহলে স্বপ্নদোষে ব্রহ্মচর্য নষ্ট হয়ে যাবে। জাগ্রত অবস্থায় মেখলা যেমন প্রাণাপানের গতিকে ঠিক করে বীর্যগতিকে উর্ধ্বে করে ব্রহ্মচারীকে ঊর্ধ্বরেতা করে তোলে, তেমনই নিদ্রার মধ্যে স্বপ্ন থেকে বাঁচিয়ে স্বপ্নরোগের দ্বারা বীর্যনাশ থেকে রক্ষা করে। গিঁটের খোঁচা খাওয়ার কারণে ব্রহ্মচারী সোজা হয়ে ঘুমানো ছেড়ে দেয় আর ডানপাশ হয়ে শুয়ে স্বপ্ন তথা বীর্যনাশ থেকে বেঁচে যায়। . এইভাবে মেখলা উভয় অবস্থায় স্বসা= বোন আর দুহিতা= কন্যার সমান ব্রহ্মচারীকে বীর্যনাশ থেকে বাঁচিয়ে পবিত্র করে তথা তার হিতের হয়। এটা ব্রহ্মচারীকে বীর্যবান বানিয়ে বীর আর বলবান করে। হরিয়ানার লোকোক্তি অনুসারে "জো জাগত হে সো পাবত হে জো সোবত হে সো খোবত হে, অর্থাৎ যে ব্যক্তি জাগে সে লাভ তুলে নেয় আর যে ঘুমায় সে হানি বহন করে। . বেদ ভগবান্ এই সত্যকে এইভাবে বলেছেন - য়ো জাগার তমৃচঃ কাময়ন্তে য়ো জাগার তমু সামানি য়ন্তি। য়ো জাগার তময়ম্ সোম আহ তবাহমস্তি সখ্যে ন্যোকা।। (ঋগ্বেদ ৫/৪৪/২৪) . যে জাগে তাকেই ঋক্ জ্ঞানে আহ্বান জানায়, সে য়জুর্বেদের কর্মকাণ্ড আর সামবেদের উপাসনাতে সফলতার সিদ্ধি প্রাপ্ত করে। যে জাগে তাকে সুখের বর্ষণকারী সোমরূপ প্রভু স্বয়ং বলেন যে আমি তোমার মিত্র, আমি তোমার সঙ্গে থাকবো, তুমি আর আমি এক সাথে একি ঘরে থাকবো। নিষ্কর্ষ হল, এই লোক আর পরলোক সবকিছুই জাগ্রত ব্যক্তির জন্য। আচার্যদেব তার ব্রহ্মচারীকে মেখলা জাগ্রত থাকার জন্যই তো বেঁধেছেন। কেবল জাগ্রতাবস্থাই নয়, নিদ্রাবস্থাতেও সাবধান থাকার জন্য মেখলার পবিত্র ব্রতবন্ধনে ব্রহ্মচারীর কোমর বেঁধেছেন, সাজিয়েছেন। এর তিনটা লড় এই শব্দই শোনাচ্ছে যে জেগে থাকো, স্বপ্নের মধ্যেও জেগে থাকো। গাঢ় নিদ্রাতেও জাগার সমান থাকো, কখনও অসাবধান থেকো না। অসাবধানী হল ব্রহ্মচারীর মৃত্যু আর সচেতনতা হল ব্রহ্মচারীর জন্য জীবন। মেখলার সারাংশ হল এটাই। নীতিকারগণও এই ভাবকে এইভাবে করেছেন - কাকচেষ্টা বকধ্যানম্ শ্বাননিদ্রা তথৈব চ। অল্পাহারী গৃহত্যাগী বিদ্যার্থী পঞ্চলক্ষণম্।। . অর্থাৎ - কাকের সমান প্রচেষ্টাকারী, সর্বদা সচেতন এবং সাবধানরত, বকের সমান নিজের লক্ষ্যে ধ্যান রাখা ব্যক্তি আর কুকুরের সমান নিদ্রালু অর্থাৎ নিদ্রার সময়ও এমন সাবধান থাকবে যে যখন ইচ্ছে উঠে যাবে, সর্বদা অল্প ভোজনকারী অর্থাৎ মিতাহারী খিদে রেখে আহারকারী হবে। বিদ্যার্থী জীবনে কখনও গৃহের মধ্যে মোহ রাখবে না, বিদ্যাসমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আচার্যের ছত্রছায়াতে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না বিদ্যা পূর্ণ হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত গুরুকুলেই বাস করবে। নিষ্কর্ষ হল, উঠতে-বসতে, আহার-বিহার করতে, নিদ্রা তথা জাগ্রত সদা সর্বদা সব অবস্থাতে সচেতন আর সাবধান থাকা ব্রহ্মচারীই ব্রহ্মচর্যপালনে সফল হয়। মেখলা নিরন্তর শ্রদ্ধাপূর্বক তথা দীর্ঘকাল অর্থাৎ জীবনের অন্তিম ক্ষণ পর্যন্ত সাবধান থাকার জন্য কটিতে আচার্য দ্বারা বাঁধা হয়। মারা গেলে মৃতদেহ থেকে মেখলা খুলে ফেলা হয় এমন দেখা যায়। 🍁 বীরদের মেখলা 🍁 আহুতাস্যভিহুতা ঋষীতৃণামস্যায়ুধম্। পূর্বা ব্রতস্য প্রাশ্নতী বীরঘ্নী ভব মেখলে।। (অ ৩/১৩৩/২) অর্থাৎ - (মেখলে) হে মেখলা! তুমি (আহূতা) যথাবিধি দান করা (অসি) হয়েছ। (ঋষীণাম্) ধর্মমার্গ বার্তাকারী ঋষিদের (আয়ুধম) শাস্ত্ররূপ (অসি) হও। (ব্রতস্য) উত্তম ব্রত বা নিয়মের (পূর্বী) পূর্বে (প্রাশ্নতী) ব্যাপ্ত হওয়ার আর (বীরঘ্নী) বীরদের প্রাপ্তকারী তুমি (ভব) হও। . মেখলাকে নিজের ইচ্ছে মতো কেউ স্বয়ং ধারণ করতে পারবে না। একে নিষ্কাম সেবক তথা চার বেদের জ্ঞাতা, বেদসংজ্ঞক বিদ্বান আচার্য বেদারম্ভ সংস্কারের সময় তার শিষ্য ব্রহ্মচারীকে যথাবিধি ব্রহ্মচর্যব্রতের দীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এটা প্রদান করেন। বিধিপূর্বক আচার্যের পক্ষ থেকে ব্রহ্মচারীকে মেখলা দান করা হয়। . ব্রহ্মচর্যব্রত দীক্ষা দেওয়ার পূর্বে আচার্য ব্রহ্মচারীর কটিতে মেখলা প্রতিজ্ঞাপূর্বক বাঁধেন আর তাকে সাবধান করে দেন যে আজ থেকে তুমি ব্রহ্মচারী। মেখলা দিয়ে ব্রহ্মচর্যব্রতের বন্ধনে তোমায় আজ আমি বেঁধে দিয়েছি। মেখলাবন্ধন হল ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা নেওয়ার সময় সর্বপ্রথম ক্রিয়া। ব্রহ্মচর্যব্রতে দীক্ষিত হতে মেখলা পূর্বরূপ ছিল আর এই বন্ধন থেকেই ব্রহ্মচর্যব্রত প্রারম্ভ হতো। ব্রহ্মচারীকে ব্রহ্মচর্যের ব্রত নেওয়ার সময় সর্বপ্রথম আচার্য মেখলা দান করে ব্রহ্মচারীকে সংজ্ঞা দিতেন তথা অন্য সব নিয়ম পশ্চাৎ উপদেশ করে দিতেন। . বেদ ভগবান্ মেখলাকে ঋষিদের আয়ুধ, শস্ত্র, রক্ষার সাধন বলেছেন। . মেখলা ধারণকারী বীর হয়, অথবা একে বীরপুরুষই ধারণ করতে পারে বা ধারণ করে আর এটা বীরপুরুষদের ভূষণ ছিল। ভীতু, ভীরু একে ধারণ করতে পারে না, তাই বেদ একে বীরদের প্রাপ্তকারী বলেছে। . 🍁 দেব আর ঋষিদের মধ্যে ভেদ 🍁 প্রথম মন্ত্রের মধ্যে দেবসংজ্ঞক-বিদ্বান-আচার্যকে মেখলা প্রদানকারী বলা হয়েছে আর এই মন্ত্রের মধ্যে ধর্মের মার্গ বলে এমন ঋষিদের মেখলাকে আয়ুধ বা শস্ত্র বলা হয়েছে। দেব তথা ঋষিদের মধ্যে পার্থক্য কি, এর উপর বোধায়নগৃহ্যসূত্রের (১/১) মধ্যে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 🍁 সাত প্রকারের বিদ্বান 🍁 ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, অনূচান, ঋষিকল্প, ভ্রূণ, ঋষি আর দেব, এই সাত প্রকারের বিদ্বানদের ভেদ বলা হয়েছে। . ১. "উপনীতমাত্রো ব্রতানুচারী বেদান্ কিঞ্চিদধীয় ব্রাহ্মণঃ" অর্থাৎ - যে ব্যক্তির কেবল য়জ্ঞোপবীত হয়েছে, ব্রহ্মচর্যাদি ব্রতের পালন যে ব্যক্তি করে তথা বেদের কিছু ভাগ যে অধ্যয়ন করেছে, সে হল ব্রাহ্মণ। এটা হল প্রথম প্রকারের বিদ্বান। সুতরাং জন্ম থেকে কেউ ব্রাহ্মণ হয় না, গুরুকুলে থেকে বেদাধ্যয়ন করে তবেই ব্রাহ্মণ হতে হয়। . ২. "একাম্ শাখামধীয় শ্রোত্রিয়ঃ" অর্থাৎ - উপরোক্ত লেখা অনুসারে য়জ্ঞোপবীত ধারণকারী ব্রহ্মচারী বেদের একটা শাখা অধ্যয়ন করার কারণে ক্ষত্রিয় হয়। . ৩. "অঙ্গাধ্যায়্যনূচানঃ" অর্থাৎ - উপরোক্ত নিয়ম পালনকারী ব্রহ্মচারী অঙ্গোসহিত বেদাধ্যয়ন করার কারণে অনূচান হয়। . ৪. "কল্পাধ্যায়ী ঋষিকল্পঃ" অর্থাৎ - কল্পসহিত বেদাধ্যয়ন করার কারণে বিদ্বানের সংজ্ঞা ঋষিকল্প হয়ে যায়। . ৫. "সূত্রপ্রবচনাধ্যায়ী ভ্রূণঃ" অর্থাৎ - সূত্রভাষ্যের সঙ্গে বেদাধ্যয়ন করার কারণে ভ্রূণ সংজ্ঞাকারী বিদ্বান হয়। . ৬. "চতুর্বেদাদৃষিঃ" চার বেদের অধ্যয়ন করার কারণে বা চার বেদের বিদ্বান হওয়াতে বিদ্বান ব্যক্তি ঋষি সংজ্ঞাকে প্রাপ্ত করে। . ৭. "অত ঊর্ধ্বম্ দেবাঃ" ঋষিদের থেকেও যারা অধিক উঁচু হয় অর্থাৎ অধিক বিদ্বান আর পরোপকারী হয়, তাঁদের দেব বলে। সাঙ্গোপাঙ্গ এক-একটা বেদ পড়তে ব্রহ্মচারীর ১২ বছর লাগে। যারা ৪৮ বছরের অধিক ব্রহ্মচর্যব্রতকে ধারণ করে চার বেদের বিদ্বান হয়, পূর্ণ বিদ্বান, পূর্ণ য়োগী, পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় হয় আর নিজের সর্বস্ব "পরোপকারায় সতাম্ বিভূতয়ঃ" প্রাণীমাত্রের কল্যাণার্থ দান করে দেয়, এমন সদাচারী বিদ্বানকে দেব বলা হয়। এমন ঋষি বা দেব কিভাবে হয়?

🍁 ঋষি আর দেবের নির্মাণ 🍁

মাতৃমান্ পিতৃমান্ আচার্য়বান্ পুরুষো বেদ।
(শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪/৫/৮/২)

বস্তুতঃ যখন তিন উত্তম শিক্ষক যথা এক মাতা, দ্বিতীয় পিতা আর তৃতীয় আচার্য হবে তবেই মানুষ জ্ঞানবান্ হয়ে উঠবে। সেই কূল ধন্য, সেই সন্তান বড় ভাগ্যবান্, যার মাতা-পিতা ধার্মিক বিদ্বান। সন্তান তার মায়ের কাছ থেকে যেরূপ উপদেশ আর উপকার লাভ করে অন্য কারও কাছ থেকে সেইরূপ লাভ করে না। মা যেমন তার সন্তানকে স্নেহ ও তার হিত কামনা করে, সেইরূপ অন্য কেউই করে না। আগেকার দিনে সন্তানকে বিদ্বান আর শ্রেষ্ঠ বানানোর জন্য মাতা-পিতা তপশ্চর্যা করতেন। এর উল্লেখ বৌধায়ন গৃহ্যসূত্রের (১/৭) মধ্যে বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। সামান্য বিদ্বান বানানোর জন্য সামান্য তপশ্চর্যা আর বিশেষ শ্রোত্রিয় আদি বিদ্বান বানানোর জন্য বিশেষ ব্রহ্মচর্যাদিব্রতের সেবন করা আবশ্যক ছিল। যেমন -
.
অথ য়দি কাময়েত শ্রোত্রিয়ম্ জনয়েয়মিতি আ অরুন্ধত্যুপস্থানাত্ কৃত্বা ত্রিরাত্রমক্ষারলবণাশিনাবধশ্শায়িনৌ ব্রহ্মচারিণাবাসাতে।।৯।।
.
যদি পতি-পত্নীর এমন ইচ্ছা হয় যে আমরা শ্রোত্রিয় বিদ্বান উৎপন্ন করবো তাহলে তিন দিন পর্যন্ত পতি-পত্নী ক্ষারলবণরহিত ভোজন করবে, ভূমিতে (নিচে) ঘুমাবে আর ব্রহ্মচর্যব্রতের পালন করবে। অগ্নিহোত্র করে, "চতুর্থ্যামুপসম্বেশনম্ বা" চতুর্থ রাত্রি গর্ভাধানার্থ বীর্যদান দিবে। এইভাবে সব প্রকারের বিদ্বান উৎপন্ন করার জন্য পতি-পত্নীকে তপস্যা করতে হতো। অনূচান উৎপন্ন করার জন্য পতি-পত্নীকে ১২ দিনের ব্রহ্মচর্যব্রত পালন তথা ভ্রূণ বিদ্বান উৎপন্ন করার জন্য চার মাস পর্যন্ত উপরোক্ত ক্ষারলবণরহিত ভোজন ও ভূমিশয়নের তপশ্চর্যার পাশাপাশি ব্রহ্মচর্যের পালন করতে হতো, তারপর গর্ভাধান করতো।
.
ঋষি উৎপন্ন করার জন্য আরও অধিক সময় ধরে তপশ্চর্যা আর ব্রহ্মচর্যের পালন করতো।
.
🍁 দেবের উৎপত্তি 🍁

"য়দি কাময়েত দেবম্ জনয়েয়মিতি সম্বৎসরমেতদ্ ব্রতম্ চরেত্", অর্থাৎ যদি দেব নামক বিদ্বান উৎপন্ন করার ইচ্ছা হয় তাহলে এক বছর পর্যন্ত ব্রহ্মচর্যের পালন পতি-পত্নী উভয়ই করতো, ভূমিশয়ন ক্ষারলবণরহিত ভোজন করা আবশ্যক ছিল। তখন হোম আদি করে সন্তান উৎপন্ন করার জন্য বীর্যদান বা গর্ভাধান করতো। তারপর মাতা-পিতা দেব-তুল্য সন্তান প্রাপ্ত করতো। এইরূপ প্রস্তুতি দ্বারা, তপস্যা দ্বারা উৎপন্ন করা সন্তান বেদাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করে ঋষি বা দেব তৈরি হতো। এই সিদ্ধান্তের অনুসারেই পূর্ণ যুবকাবস্থাতে দেবী অঞ্জনা আর মহাত্মা পবনের বিবাহ হয়েছিল। বিবাহের পশ্চাৎ সেই দুই পতি-পত্নীকে ২০ বছর পর্যন্ত কঠোর ব্রহ্মচর্যব্রতের পালন করতে হয়, তারই ফলস্বরূপ দেবরত্ন হনুমানের মতো যোদ্ধা তাঁদের গৃহে জন্ম নেয়। এইভাবে ধর্মাত্মা য়োগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ জীও তাঁর সমান পুত্রের কামনার জন্য তপস্যা করেছিলেন।
.
ব্রতম্ চচার ধর্মাত্মা কৃষ্ণো দ্বাদশবার্ষিকম্।
দীক্ষিতম্ চাগতৌ দ্রষ্টুমুভৌ নারদপর্বতৌ।।
(মহাভারত ১৩৯১/১০)

দেবী রুক্মিণীর সঙ্গে বিবাহের পশ্চাৎ য়োগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ জী গৃহস্থের মধ্যে প্রবেশ না করে বিষ্ণু পর্বতে উপমন্যু ঋষির আশ্রমে ১২ বছর পর্যন্ত ব্রহ্মচর্যব্রত পালন করেন। ক্ষারলবণরহিত ভোজন আর ভূমিতে শয়ন করেন, সেই সময় তাঁকে দেখতে নারদ আদি অনেক ঋষি এসেছিলেন। এই ব্রতপালনের ফলস্বরূপ নিজের অনুরূপ প্রদ্যুম্ন নামক তেজস্বী পুত্র তিনি প্রাপ্ত করেছিলেন।
.
প্রাচীনকালে ঋষি আর দেব আদি বিদ্বান উৎপন্ন করার জন্য গৃহস্থরা ব্রহ্মচর্যব্রতকে ধারণ করে কঠোর তপস্যা করতো। বিদ্বান হওয়ার পরই গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করার আজ্ঞা সমাজ বা রাজ্য থেকে পাওয়া যেত। মনু জীর ব্যবস্থানুসারে -

বেদানধীত্য বেদৌ বা বেদম্ বাপি য়থাক্রমম্।
অবিপ্লুতব্রহ্মচর্য়ো গৃহস্থাশ্রমমাবিশেত্।। (মনু ৩/২)

যখন যথাযথ ব্রহ্মচর্য আশ্রমে আচার্যের আজ্ঞানুসারে চলবে আর চার তিন দুই বা একটা বেদের সাঙ্গোপাঙ্গ অধ্যয়ন করবে আর যার ব্রহ্মচর্য খণ্ডিত হয়নি, সেই পুরুষ বা স্ত্রী গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করবে। স্ত্রী হোক বা পুরুষ, গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করার অধিকার কেবল বেদের বিদ্বান আর ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণী ব্যক্তিদেরই ছিল। তাই তাদের সন্তান ঋষি মহর্ষি দেব আর মহাদেব হতো।
.
এইজন্য মেখলাকে ঋষিদের আয়ুধ (রক্ষার্থ শস্ত্র) বলা হয়েছে। শস্ত্র শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ঋষি আর দেবতাদের শত্রু কাম-ক্রোধাদি ছিল। গীতার (১৬/২১-২২) মধ্যে এই শত্রুর চর্চা এইভাবে আছে -

ত্রিবিধম্ নরকস্যেদম্ দ্বারম্ নাশনমাত্মনঃ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্ ত্রয়ম্ ত্যজেত্।।

আত্মার পতনকারী নরকের এই তিন দ্বার হল - কাম, ক্রোধ আর মোহ। তাই এই তিনটাকে ছেড়ে দিবে। কারণ -

এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।
আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়ঃ ততো য়াতি পরাম্ গতিম্।।

হে কুন্তিপুত্র! মানুষ এই তিন তমোগুণের দ্বার থেকে নিবৃত্ত হয়ে নিজের কল্যাণ করে, তারপর সে পরমগতিকে প্রাপ্ত করে। এইসব শত্রুদের সঙ্গে দেবতা আর ঋষিরা যুদ্ধ করার জন্য য়ম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, ধারণা, ধ্যান আর সমাধি এই অষ্টাংয়োগের সাধনা করতেন। এই শক্রগুলোর দমন করার জন্য এই শস্ত্র বা আয়ুধই ছিল আর মেখলা এই শস্ত্রের প্রতীক মাত্র। এদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সর্বদা সচেতন থাকতে হয়। সদা সত্য, সদা সাবধান, সদা কটিবদ্ধ থাকার জন্য মেখলা কটিতে বাঁধা হতো। সব শত্রুর মহাসেনাপতি কামের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ব্রহ্মচর্যব্রত ছিল। মেখলা হল এই সাধনার প্রতীক, তাই ঋষিরা একে আয়ুধ বলেছে। কারণ প্রাণ ও অপান বায়ুর গতিকে ঠিক করতে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে, এটা সহায়ক। প্রাণাপানের উপর বিজয় প্রাপ্ত করলে, চঞ্চল মন নিয়ন্ত্রণে আসে। মন নিয়ন্ত্রণে আসলে সাধক জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী হয়ে বীর্যকে ধারণ করতে সক্ষম হয়। বীর্যবানই বলবান হয়, কারণ "বীর্য় বৈ বলম্" বীর্যই হল সব শক্তির আর সবপ্রকারের বলের ভাণ্ডার। এইজন্য আচার্য জী মেখলা বেঁধে তার ব্রহ্মচারী কুমারের মুখ দিয়ে এই উচ্চারণ করান "প্রাণাপানাভ্যাম্ বলমাদধানা" প্রাণাপানের দ্বারা মেখলা বল প্রদান করে। একে শ্রদ্ধা সহিত ধারণ করো, এটাই "ঋষিণামস্যায়ুধম্" ঋষিদের ব্রতের রক্ষার্থ আর কামাদি শত্রুদের দমনার্থ অমোঘ অস্ত্র, একে ধারণ করো। হে ব্রহ্মচারী! এটা তোমার ব্রতের রক্ষা করবে তথা তোমাকে তোমার শত্রুর থেকে রক্ষা করবে। এর প্রতি ভয় পাওয়ার আবশ্যকতা নেই, কারণ এটা হচ্ছে দিব্য গুণের ভাণ্ডার। এটা তোমাকে বীর করে তুলবে, কারণ ব্রহ্মচারী বীর্যবান হয়েই বীর হয়। এটা তোমার শিরায়-শিরায় আর লোমে-লোমে বীরতা ভরিয়ে দিবে। তোমাকে ব্রহ্মচারী, বীর্যবান, বলবান, জিতেন্দ্রিয় আর য়োগী করে তুলবে। ঋষিগণ একে ধারণ করেই ঊর্ধ্বে উঠতেন, কাম-ক্রোধ-লোভ আদি নরকের দ্বারকে, ঘোর শত্রুদের পরাজিত করে পরমগতি মোক্ষকে প্রাপ্ত করতেন। এই যুদ্ধের জন্য আর কোনো আয়ুধ নেই। মেখলা বাঁধো, তপস্যা করো, ব্রহ্মচর্যপালনার্থ প্রাণাপানের সাধনা করো। এই মেখলা সব কাজে আয়ুধের সমান (অমোঘাস্ত্র) তোমার রক্ষা করবে।
.
শীষ কাটানা হে সহজ, ঘড়ি এক কা কাম।
আঠ পহর কা জুঝনা, বিনা খাণ্ডে সংগ্রাম।।
.
শীষ কাটার যুদ্ধ তো এক পলকে সমাপ্ত হয়ে যায় কিন্তু এই কামাদি শত্রুদের সঙ্গে তো না সমাপ্ত হওয়া আট পহরের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে তীর, তলোয়ার খাণ্ডাও কোনো কাজে লাগে না। এই ভয়ানক যুদ্ধে তো জীবনের অন্তিম ক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করতে হয়। এর আয়ুধ হল (প্রাণায়ামঃ পরম্ তপঃ) প্রাণায়ামাদি পরম তপ, যার সাধনায় তোমার বোন স্বসা দেবী মেখলা তোমাকে সৌভাগ্য প্রদান করবে, তারই সহায়তা নিয়ে, বোন বা ভগিনীর থেকে অধিক মঙ্গল তোমার কে চাইবে, তোমার হিত কে করবে? এই স্বসার প্রেমে সত্যতা আছে, ছল নেই, কপট নেই, স্বার্থ নেই। তোমার জন্য এটা নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে দিবে। তোমার একটু আঁচও আসতে দিবে না , কষ্ট থেকে নিবৃত্তি করবে, ভবসাগর থেকে পার করিয়ে দিবে, ভয় পেয়ো না। এই পবিত্র দেবী তোমাকে সব প্রকারের সৌভাগ্য দিবে। একে পবিত্র রাখবে, এর সঙ্গে সদা সর্বদা সংযুক্ত থাকবে, এটা তোমার দেবগুরু আচার্যের দেওয়া উপহার, একে নষ্ট করবে না, ফেলে দিবে না। তোমার কল্যাণ ও তোমার বিজয় এরই মধ্যে আছে। গুরুদেব এই মেখলা তো মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বেঁধেছেন।
.
একে বেঁধে আচার্য তোমার ভিতরে বীরত্বের মন্ত্র ফুঁকে দিয়েছেন। জ্বলন্ত অগ্নিতে ঝাঁপিয়ে পরা, প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্যে তলোয়ার নিয়ে তারমধ্যে বীর পুরুষ তো হাসতে-হাসতে প্রবেশ করে ফেলে। এই কাজকে তো বীর পুরুষরা সরল আর সহজ কাজ মনে করে। কিন্তু সারা জীবন ধরে কাম ক্রোধাদি শত্রুদের প্রহার থেকে বিচলিত না হয়ে তারসঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষ করতে থাকা, শেষে এই মহাকঠিন যুদ্ধে বিজয় প্রাপ্ত করা, এটা কেবল কিছু বিশেষ বীর পুরুষের কাজ। এই মহাকঠিন সংগ্রামকে কেবল ব্রহ্মচারীই লড়াই করতে পারে। এরমধ্যে তাকে দেওয়া কবচ বা অমোঘাস্ত্র মেখলা তো আছেই কিন্তু আরও কিছু শস্ত্র আছে, আচার্যপ্রবর সেগুলো ব্রহ্মচারীকে প্রদান করেন।
.
🍁 মৃত্যুর ব্রহ্মচারী 🍁

মৃত্যোরহম্ ব্রহ্মচারী য়দস্মি নির্য়াচন্ ভূতাত্ পুরুষম্ য়মাম। তমহম্ ব্রহ্মণা তপসা শ্রমেণানয়ৈনম্ মেখলয়া সিনামি।। (অথর্বঃ ৬/১৩৩/৩)

শব্দার্থ - (ভূতাত্) প্রাপ্ত (মৃত্যোঃ) মৃত্যু থেকে (পুরুষম্) এই পুরুষ আত্মাকে (নির্য়াচন্) বাইরে বেরিয়ে আসা (অহম্) আমি (য়মায়) নিয়ম পালনের জন্য (য়ৎ) যে (ব্রহ্মচারী) ব্রহ্মচারী (অস্মি) আছি (তম্) সেইরূপ (এনম্) এই আত্মাকে (ব্রহ্মণা) বেদ জ্ঞান (তপসা) তপ য়োগাভ্যাস আর (শ্রমেণ) পরিশ্রম সহিত (অনয়া মেখলয়া) এই মেখলার সঙ্গে (অহম্) আমি (সিনামি) বাঁধি।
.
আরেকটা অর্থ এমন হবে -
(য়ৎ) যেহেতু (অহম্) আমি (মৃত্যোঃ) আদিত্যের সমান তেজস্বী বিদ্বানের অর্থাৎ অজ্ঞানের বন্ধন থেকে মুক্তকারী আচার্যের ব্রহ্মচারী। এইজন্য (ভূতাত্) এই পঞ্চভূতের তৈরি দেহ দিয়ে (য়মায়) সেই ব্রহ্ম সর্বনিয়ন্তা পরমেশ্বরের প্রাপ্তির জন্য (পুরুষম্) দেহপুরীর নিবাসী আত্মাকে (নির্য়াচন্ অস্মি) মুক্ত করার প্রচেষ্টায় আছি। হে আচার্য! এইরূপ (তম্) তাকে (এনম্) এই আত্মাকে (অহম্) আমি আপনার শিষ্য ব্রহ্মচারী (ব্রহ্মণা) ব্রহ্ম বেদোপদেশের মাধ্যমে (তপসা) তপ য়োগাভ্যাস দ্বারা (শ্রমেণ) ব্যায়ামাদির শ্রম দ্বারা (অনয়া মেখলয়া) এই মেখলা দিয়ে (সিনামি) বাঁধি।
.
উভয় প্রকারের অর্থের ভাব একই। এখানে আচার্যকে মৃত্যু নাম দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে আর ব্রহ্মচারী বলছে আমি মৃত্যু আচার্যের ব্রহ্মচারী। সেই আচার্যের শিক্ষার মাধ্যমে সংযম জীবনযাপন করে নিজের আত্মাকে উন্নত করে পরমেশ্বরকে প্রাপ্ত করবো অর্থাৎ মোক্ষপ্রাপ্ত করবো। এরজন্যই আমি আচার্যের কাছ থেকে মেখলা ধারণ করেছি, লংগোট বেঁধেছি, কৌপিনধারী হয়েছি। ব্রহ্মচর্যব্রতের পূর্তির জন্য মেখলা ধারণ করে যেমন দীক্ষা নিয়েছি তেমনই দেববিদ্যা, জ্ঞান অর্জন, য়োগাভ্যাস, তপশ্চর্যা, ব্যায়াম, প্রাণায়াম আদি ব্রহ্মচর্যের মুখ্য সাধনের সাধনায় আচার্যচরণে থেকে সঞ্চয় করেছি। আমার আচার্য তো স্বয়ং সাক্ষাৎ মৃত্যুর আচার্য, তিনি আমাকে মৃত্যু রহস্যকে পুরোপুরি ভাবে বুঝিয়েছেন। আমার এখন আর মৃত্যু ভয় নেই, কারণ যে মৃত্যুকে সবাই ভয় করে আমি তো সেই মৃত্যুকে দূরে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, তার উপর বিজয় প্রাপ্ত করার জন্য দেব হয়েছি। আমার গুরুদেব হলেন সাক্ষাৎ দেবতা। তিনি আমাকে মেখলা বেঁধে সংযম জীবনযাপনের পাশাপাশি জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী হয়ে মৃত্যুকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্রহ্মচর্যরূপী তপের আগুনে তপ্ত করে মৃত্যুঞ্জয় করে দিয়েছেন। আমি বেদ ভগবানের এই আজ্ঞাকে "ব্রহ্মচর্য়েণ তপসা দেবা মৃত্যুপাঘ্নত" পালন করতে মৃত্যু আচার্যের কৃপায় সক্ষম হয়ে গেছি।
.
আচার্যের নাম এখানে মৃত্যু এই কারণে বলা হয়েছে যে তিনি মৃত্যুর যথাযথ জ্ঞান করিয়ে মৃত্যুর ভয়কে তারিয়ে দেন। মৃত্যুর ভয় ততক্ষণ পর্যন্তই থাকে ততক্ষণ মানুষ তার সত্য স্বরূপকে জানে না। গীতার (১৩/২২) মধ্যে এর সুন্দর চিত্রণ করা হয়েছে -

বাসাম্সি জীর্ণানি য়থা বিহায়, নবানি গৃহ্বাতি নরোऽপরাণি। তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সম্য়াতি নবানি দেহী।।

মানুষ যেমন পুরোনো বস্ত্রকে ছেড়ে অন্য নতুন বস্ত্র পরে নেয়, সেইরূপ শরীরধারী পুরোনো শরীরকে ছেড়ে দেয় আর নতুন শরীরকে ধারণ করে। পুরোনো বস্তুর স্থানে নতুন বস্তু প্রাপ্ত হলে হর্ষই হবে, পুনঃ দুঃখ আর ভয় কিসের জন্য? মানুষ যখন এই রহস্য জেনে যায় তখন দুঃখ আর ভয়ের কারণ থাকে না। এই জীবনের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে নতুন জীবনে নতুন ভোগ-সামগ্রী প্রাপ্ত করানো হল মৃত্যুর কাজ আর এটা সুখের ধারণা। এই শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত ব্যক্তি উৎসাহিত হয়ে বলে -

জিস মরনে সে জগ ডরে মোকো সো আনন্দ।
কব মরিয়ে কব পাইয়ে পূরন পরমানন্দ।।

মৃত্যু তো নতুন জীবনের নাম আর মোক্ষের পরমানন্দের প্রাপ্তি এরদ্বারাই হয়। সুতরাং আচার্যের নাম মৃত্যু এটা সুখপ্রদ, এটা মোটেও ভয়ানক নয়।
.
উপনিষদের মধ্যে নচিকেতা (সন্দেহশূন্য) ব্রহ্মচারীও যম (মৃত্যু) নামক আচার্যের নিকট ব্রহ্মজ্ঞানের প্রাপ্তির জন্য গিয়েছিল।
.
এই বেদ মন্ত্রের মধ্যেও মৃত্যু নামক আচার্য তার ব্রহ্মচারীকে সবপ্রকারের দুঃখ, কষ্ট আর বন্ধন থেকে ছাড়িয়ে দেয় তথা মোক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। মেখলা, বেদজ্ঞান, তপ, য়োগ আর পরিশ্রম ব্যায়ামাদি ব্রহ্মচর্যের মুখ্য সাধনে বা নিয়মে বেঁধে, সেগুলোর শিক্ষা দিয়ে ব্রহ্মচারীকে মৃত্যুঞ্জয় করে তোলাই হল আচার্যের মুখ্য উদ্দেশ্য।
.
ব্রহ্মচর্যসূক্তের অন্য একটা মন্ত্রে আচার্যের অনেক নামের মধ্যে মৃত্যু নামও আছে -

আচার্য়ো মৃত্যুর্বরুণঃ সোম ওষধয়ঃ পয়ঃ।

মৃত্যু, বরুণ আর সোম এইসব হল আচার্যের গুণের অনুসারে নাম।
.
অথর্ববেদের ব্রহ্মচর্যসূক্তের মধ্যে একটা মন্ত্রে মেখলা সম্বন্ধে এইভাবে লেখা আছে -

ইয়ম্ সমিত্ পৃথিবী দ্যৌর্দ্বিতীয়োতান্তরিক্ষম্ সমিধা পৃণাতি। ব্রহ্মচারী সমিধা মেখলয়া শ্রমেণ লোকাম্স্তপসা পিপর্ত্তি।। (অথর্বঃ ব্রহ্মচর্যসূক্ত)
.
এই পৃথিবী হল ব্রহ্মচারীর প্রথম সমিধা, দ্যৌ হল দ্বিতীয় সমিধা আর তৃতীয় সমিধা হল অন্তরীক্ষ। এই তিন সমিধার দ্বারা অর্থাৎ এই তিন সমিধাকে নিজের আত্মাগ্নিতে আধান করে ব্রহ্মচারী সকলের পালন করে আর পূর্ণ করে। ব্রহ্মজ্ঞানে দীক্ষিত ব্রহ্মচারী সমিত্ আধান দ্বারা, মেখলা দ্বারা, শ্রম আর তপ দ্বারা সকল মানুষকে পালন করে আর এই সাধন দ্বারা ব্রহ্মচর্যের পালন করে। এই মন্ত্রের মধ্যে সমিধা শব্দ আছে, মেখলাসূক্তের মন্ত্রের মধ্যে ব্রহ্মণা শব্দ আছে, উভয়ের অর্থ একই। জ্ঞানের প্রকাশ, বেদজ্ঞানের দীপ্তি বা পবিত্র জ্যোতি দ্বারা সে নিজেকে তথা সারা সংসারকে প্রকাশিত করে। পৃথিবী অন্তরীক্ষ আর দ্যৌ এই তিনলোকের জ্ঞান অর্জন করে সংসারের মধ্যে জ্ঞানের প্রকাশ ছড়িয়ে দেয়। সে যেমন এই তিন বাহ্যলোকের অধ্যয়ন করে, জানার প্রচেষ্টা করে তেমনই নিজের তিনলোকের অর্থাৎ শরীর, অন্তঃকরণ (মন, বুদ্ধি, চিত্ত আর অহংকার) আর আত্মার সাক্ষাৎকারও করে। সে বেদজ্ঞান দ্বারা নিজের ভিতরে তথা বাইরের অবিদ্যাকে দূরে সরিয়ে দেয়। ভূত ভবিষ্যৎ আর বর্তমানের রহস্যকেও বোঝার চেষ্টা করে। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, আমার এখানে কাজ কি, পরর্বতীতে কোথায় যাবো, এইসব কালচক্রকে জানার চেষ্টা সে নিজের মৃত্যু নামক আচার্যের চরণে বসে করে। দানবীর থেকে কৃপণ পর্যন্ত, মূর্খ থেকে বিদ্বান পর্যন্ত, যে মৃত্যুর নাম শুনে সবাই ভয় পায় সে সেই রহস্যকে জানে, সেই মৃত্যুর সঙ্গে সে ক্রিয়া করে। নিজের জীবনকে সারা সংসারের সেবাতে লাগিয়ে, জনতা জনার্দনের সেবক হয়ে নিজের জীবনের এক-একটা শ্বাসের সদুপয়োগ করে। এইভাবে নিজের জীবনকে যজ্ঞময় বানিয়ে সংসারকে তথা স্বয়ং নিজেকে পূর্ণ করে। নিজের সর্বস্ব লোকসেবাতে অর্পণ করে অমর হয়ে যায়।
.
ব্রহ্মচারী ভালো পুষ্টিকারক ভোজন দ্বারা, ব্যায়াম দ্বারা, প্রাণায়াম আদি দ্বারা য়োগাভ্যাস তথা কঠোর পরিশ্রম করে নিজের শরীরকে এইজন্য সুদৃঢ়, সুন্দর, সুস্থ আর সুগঠিত করে তোলে যাতে সংসারের সব প্রাণীর মিত্র হয়ে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অধিক সেবা করতে পারে। তার শরীরের বীর্য এই তপস্যার কারণে তার শরীরে শারীরিক বলের রূপ ধারণ করে তথা তার বিচারাগ্নির জ্বালানি হয়ে তার মস্তিষ্ককে জ্ঞানের জ্যোতি দ্বারা প্রজ্বলিত করে, অর্থাৎ শারীরিক আর আত্মিক বল রূপে তারই মধ্যে থাকে। সেই অমূল্য বীর্যের একটা বিন্দুকেও সে নষ্ট করে না, সে অখন্ড ব্রহ্মচারী হয়ে ওঠে, ঊর্ধ্বরেতা ব্রহ্মচারী হয়ে যায়, মৃত্যুর উপর বিজয় প্রাপ্ত করে, নিজের যজ্ঞময় বা পরোপকারময় জীবনের কারণে সে অমর হয়ে যায়। তার মধ্যে না থাকে জীবনের ইচ্ছা আর না থাকে মৃত্যুর ভয়, সে জীবনমুক্ত হয়ে যায় আর পরমপদ মোক্ষ প্রাপ্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। এইসব কিছু সে তার দেবস্বরূপ আচার্য, মৃত্যু আচার্যের কৃপায় ওনার ছত্র-ছায়াতে থেকে, কঠোর তপস্যা করে, বেদজ্ঞানের দ্বারা মেখলা, কটিবদ্ধতা, সচেতনতা, ব্যায়াম, প্রাণায়ামাদি য়োগের দ্বারা প্রাপ্ত করে অর্থাৎ নিজের শ্রদ্ধেয় আচার্যচরণের কৃপায় পূর্ণ বিদ্বান, পূর্ণ য়োগী, পূর্ণ জিতেন্দ্রিয় আর ঊর্ধ্বরেতা ব্রহ্মচারী হয়ে সংসারের মধ্যে আদিত্যের সমান অবিদ্যান্ধকারকে দূর করতে-করতে বিচরণ করে বেড়ায়। সে যেদিকেই যায় সেদিকেই সোরগোল শুরু হয়ে যায়। যেরূপ ভূগর্ভাগ্নি এই পৃথিবীকে সদা চালিত রাখে সেইরূপ বীর্যের অগ্নি ব্রহ্মচারীকে খালি ব্যর্থ বসে থাকতে দেয় না। সে সংসারের সেবাতে মগ্ন থাকে, দুঃখীদের দুঃখ নিবৃত্তি করে বেড়ায়, অন্যের জন্য জীবনযাপন করে তথা অন্যের জন্যই জীবনের আহুতি দেয়। তার জীবন মরণ পর-সেবা আর পরোপকারের জন্য হয়। এইভাবে সে নিজের জীবনকে সফল করে অমর হয়ে যায়।

🍁 ঋষিদের স্বসা মেখলা 🍁
শ্রদ্ধায়া দুহিতা তপসোধি জাতা, স্বসা ঋষীণাম্ ভূতকৃতাম্ বভূব। সা নো মেখলে মতিমা দেহি, মেধামথো নো ধেহি তপ ইন্দ্রিয়ম্ চ।। (অথর্বঃ ৬/১৩৩/৪)
এই মেখলা (শ্রদ্ধায়াঃ) শ্রদ্ধা শ্রত্ অর্থাৎ সত্যকে ধারণকারী বুদ্ধি (আস্তিক বুদ্ধি বিশ্বাসের) (দুহিতা) পুত্রীর সমান প্রিয় অথবা পূর্ণকারী বা দোহনকারী (তপসঃ) তপ-য়োগাভ্যাস দ্বারা, বেদরূপ ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা সত্য জ্ঞানের মাধ্যমে (অধি) সঠিকভাবে (জাতা) উৎপন্ন হয়েছে। (ভূতকৃতাম্) সকল সত্য পদার্থের উপদেশকারী (ঋষীণম্) ঋষি বা মন্ত্রদ্রষ্টাদের স্বসা (ভগিনী) রূপ হিতকারিণী বা উপকারক অথবা সঠিকভাবে প্রকাশক (বভূব) হয়েছে। (সা) তুমি সেই (মেখলে) মেখলা (নঃ) আমাকে (মতিম্) মননশক্তি আর (মেধাম্) নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি (আ) সবদিক থেকে (ধেহি) প্রদান করো (অথো) আরও (নঃ) আমাকে (তপঃ) য়োগাভ্যাস (চ) আর (ইন্দ্রিয়ম্) ইন্দ্রিয়ের চিহ্ন বা ইন্দ্রিয়তে বল, পরাক্রম, ঐশ্বর্য (ধেহি) প্রদান করো।
.
সত্যকে ধারণকারী বুদ্ধি বা বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা বলে। যার মনে সত্য আছে, বাণী দিয়ে সত্য কথাই বলে আর যার ব্যবহার সত্য সেই ব্যক্তি হল আসল সৎপুরুষ। তাকেই শ্রদ্ধা বলে, মহাত্মা বা দেবতা নামে ডাকা হয়। শতপথ ব্রাহ্মণের মধ্যে লেখা আছে -
সত্যম্ বৈ দেবা অনৃতম্ মনুষ্য়াঃ।
দেব সত্যস্বরূপ হয়, তাদের আচরণে মিথ্যা-অনৃত- অসত্যের লেশমাত্র থাকে না। তাদের জীবন আর ব্যবহার সত্য দিয়ে পরিপূর্ণ থাকে। তারা অসত্যকে ত্যাগ করতে আর সত্যকে গ্রহণ করার জন্য সর্বদা উদ্যত থাকে। সত্যের জন্য তারা কোমর বেঁধে থাকে। তারা "ন সত্যাত্ পরো ধর্মো নানৃতাত্ পাতকম্ পরম্" সত্যের চেয়ে বড় কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না আর না অনৃত (মিথ্যা) থেকে বড় কোনো পাপকে মানে। দেব আর মানুষের মধ্যে ভেদ তো এটাই যে দেব সদা সত্যের পূজারী বা ভক্ত হয় আর সাধারণ মানুষ সত্যের পরিত্যাগ করে মিথ্যাচরণ অধর্মে প্রবৃত্ত হয়। তারা অসত্যের দ্বারা স্বার্থসিদ্ধি মেনে নিয়ে অন্ধ হয়ে যায় কিন্তু সৎসঙ্গের মাধ্যমে লাভ নিয়ে মননশীল মানুষ "ইদমহমনৃতাত্সত্যমুপৈমি" অসত্য ব্যবহার ছেড়ে দিয়ে সত্য ধারণের প্রতিজ্ঞা করে, সত্য ব্রতকে ধারণ করে আর "মনুষ্যেভ্যো দেবানুপৈতি" মানুষ থেকে দেব হওয়ার কাজে লেগে যায়। সত্য তাকে দেবত্ব প্রাপ্ত করায়, যে ব্যক্তি দেব হতে চায় সে সত্যকে ধারণ করে নেয় অর্থাৎ শ্রদ্ধালু হয়ে যায়। এরদ্বারা এটাই সিদ্ধ হয় যে শ্রদ্ধালু বলুন অথবা দেব বলুন, দুটো বিষয় একই। শ্রদ্ধা মাতার কৃপায় মানুষ সত্যকে প্রাপ্ত করে দেব হয় আর শ্রদ্ধা মাতার দুহিতা হল একমাত্র প্রিয়পুত্রী মেখলা। এই মেখলাকে ধারণকারী তার মাতা শ্রদ্ধার থেকে কিভাবে দূরে থাকতে পারে, সে তো শ্রদ্ধাকে ছাড়া জীবিতই থাকতে পারবে না। "শ্রদ্ধয়া সত্যমাপ্যতে" শ্রদ্ধা মাতার কৃপায় সত্যকে প্রাপ্ত করে দেবতা হয়ে যায়। গীতার (৪/৩৯,৪০) মধ্যে লেখা আছে -
শ্রদ্ধাবাম্ল্লভতে জ্ঞানম্ তৎপরঃ সম্য়তেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানম্ লব্ধ্বা পরাম্ শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।।
শ্রদ্ধা যুক্ত ইন্দ্রিয়ের সংযমকারী জ্ঞানমার্গের পথিক জ্ঞানকে প্রাপ্ত করে। জ্ঞানকে প্রাপ্ত করে শীঘ্রই শ্রেষ্ঠ শান্তি (মোক্ষ) প্রাপ্ত করে।
অজ্ঞশ্চাদ্ধধানশ্চ সম্শয়াত্মা বিনশ্যতি।
নায়ম্ লোকোऽস্তি ন পরো ন সুখম্ সম্শয়াত্মনঃ।।
অজ্ঞানী আর শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি, সংশয়ের মূর্তি (মানুষ) নষ্ট হয়ে যায়। যার আত্মার মধ্যে সংশয় আছে, সেই ব্যক্তির না এইলোক ঠিক থাকে, না পরলোক আর না সে সুখী হয়। মানুষ শ্রদ্ধা থেকে জ্ঞান আর জ্ঞান থেকে পরম শান্তি মোক্ষকে প্রাপ্ত করে। কারণ গীতার (৪/৩৮) মধ্যে বলা হয়েছে -
ন হি জ্ঞানেন সদৃশম্ পবিত্রমিহ বিদ্যতে।
তৎস্বয়ম্ য়োগসম্সিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি।।
জ্ঞানের সমান শুদ্ধ পবিত্র এইলোকের মধ্যে কিছুই নেই। তাকে স্বয়ং (জ্ঞান) য়োগ দ্বারা সিদ্ধ হওয়া পুরুষ নিজেই সময়ানুসারে আত্মার মধ্যে প্রাপ্ত করে নেয় অর্থাৎ আত্মার সাক্ষাৎকার করে নেয়। সুতরাং শ্রদ্ধা থেকে জ্ঞানপ্রাপ্তি, শান্তি আর আত্মার দর্শন হয়।
.
বেদের মধ্যে শ্রদ্ধার বিষয়ে সুন্দর ভাবে বলা হয়েছে -
শ্রদ্ধয়াগ্নিঃ সমিধ্যতে শ্রদ্ধয়া হূয়তে হবিঃ।
শ্রদ্ধাম্ ভগস্য মূর্ঘ্নি বচসা দেবয়ামসি।। (ঋঃ ১০/১৫১/১)
শ্রদ্ধা ভক্তির দ্বারা অগ্নি প্রদীপ্ত করা হয়, শ্রদ্ধার দ্বারাই হবন সামগ্রী দিয়ে হবন করা হয়। ঐশ্বর্যের মস্তকে আমরা সবাই শ্রদ্ধাকে প্রশংসা সহিত স্বীকার করি।
প্রিয়ম্ শ্রদ্ধে দদতঃ প্রিয়ম্ শ্রদ্ধে দিদাসতঃ।
প্রিয়ম্ ভোজেষু য়জ্বী স্বদম্ ম উদিতম্ কৃধি।।২।।
হে শ্রদ্ধা দেবী! শ্রদ্ধা সহিত দান দাতার কল্যাণ করো, শ্রদ্ধা সহিত দেওয়ার ইচ্ছুক ব্যক্তির প্রিয় করো, শ্রদ্ধা সহিত ভোগ আর যজ্ঞকারীর কল্যাণ করো, আমার এইসব উদয় হতে পূর্ণ করো। শ্রদ্ধা ভক্তি সহিত পুরুষার্থ, দান আর কর্ম করা ব্যক্তির যশ প্রাপ্ত হয় আর তাদের সব পরিশ্রম সফল হয়।
য়থা দেবা অসুরেষু শ্রদ্ধামুগ্রেষু চক্রিরে।
এবম্ ভোজেষু য়জ্বস্বস্মাকমুদিতম্ কৃধি।।৩।।
যেভাবে দেবতারা অসুর অর্থাৎ নিজের জীবন অর্পণকারীর মধ্যে শ্রদ্ধা রেখেছিল, সেইভাবে ভোগ দাতা আর যজ্ঞ কর্তার মধ্যে আমাদের সবার উদয় করো।
.
দেব তথা বিদ্বানদের উচিত যে তারা যেন বীরপুরুষদের উপর শ্রদ্ধা রাখে আর বীরপুরুষদের উচিত সদা বিদ্বানদের উপর শ্রদ্ধা রাখা। দেব বিদ্বান জ্ঞানী তো যজ্ঞ পরোপকারের কাজ করে, বীরপুরুষ ক্ষত্রিয় রাষ্ট্র-রক্ষা তথা রাজৈশ্বর্যের ভোগকারী হয়, তাই তাদের মধ্যে পরস্পর শ্রদ্ধা হওয়া উচিত। যার দ্বারা সবার ভালো হতে পারে, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের মধ্যে এইরূপ শ্রদ্ধা দিয়ে পরস্পর সংগঠন হোক তবেই রাষ্ট্রের মধ্যে বিলক্ষণ বল আর সমৃদ্ধির প্রাপ্তি হওয়া সম্ভব আর শ্রদ্ধা সহিত সারা রাষ্ট্র তথা জাতির উন্নতি হওয়া সম্ভব।
.
শ্রদ্ধাম্ দেবা য়জমানা বায়ুগোপা উপাসতে।
শ্রদ্ধাম্ হৃদয়্যাকূত্যা শ্রদ্ধয়া বিন্দতে বসু।।৪।।
দেবসংজ্ঞক বিদ্বান য়জমান শ্রদ্ধাকে প্রাপ্ত করে। প্রাণ দ্বারা সুরক্ষিত হওয়া, প্রাণায়ামকারী য়োগী শ্রদ্ধার দ্বারাই উপাসনা করে। হৃদয়ের উচ্চভাব থেকে শ্রদ্ধা প্রাপ্ত হয় আর শ্রদ্ধা থেকেই ধন প্রাপ্ত হয়।
.
সব ব্যক্তি শ্রদ্ধা থাকার কারণেই সৎকর্ম করে। ধনের প্রাপ্তি, য়োগে সফলতা (প্রাণায়াম সিদ্ধি) অথবা ঈশ-উপাদনাদি শ্রদ্ধার দ্বারাই হয়। সব ধরণের উন্নতি সেটা বৈয়ক্তিক হোক অথবা রাষ্ট্রীয় হোক, শ্রদ্ধার দ্বারাই হয়। শ্রদ্ধা কোনো কেনার বস্তু নয় যে আপনি সেটা দোকানে কিনতে যাবেন, সেটা তো মানব হৃদয়ের এক বিশেষ ভাবনা থেকে উৎপন্ন হয়।
.
শ্রদ্ধাম্ প্রাতর্হবামহে শ্রদ্ধাম্ মধ্যন্দিনম্ পরি।
শ্রদ্ধাম্ সূর্য়স্য নিম্রুচি শ্রদ্ধে শ্রদ্ধাপহে নঃ।।৫।।
প্রাতঃকালে শ্রদ্ধা সহিত কাজ করি, সেইরূপ মধ্যাহ্নে আর সূর্যাস্ত হলেও শ্রদ্ধা সহিত ভক্তি করি। হে শ্রদ্ধা! আমাদের সবাইকে শ্রদ্ধার সাথে যুক্ত করো। প্রত্যেক ক্ষণ শ্রদ্ধার আবশ্যকতা আছে।
.
এই শ্রদ্ধাসূক্তের সার হল -
শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মনের নিশ্চয়, হৃদয়ের দৃঢ় বিশ্বাসই মানুষকে মহান থেকে মহান পুরুষার্থ করিয়ে দেয়। শ্রদ্ধা বিনা মানুষ কিছুই করতে পারে না। শ্রদ্ধার ভিতরে অদ্ভুত বল-শক্তি আছে, তাই শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি তার শ্রদ্ধার বল দিয়ে অদ্ভুত সব কাজ করে ফেলে। মানুষের মধ্যে যতই শক্তি হোক না কেন, বল হোক, ধন হোক, বুদ্ধি হোক বা অন্য কোনো প্রকারের সামর্থ্য হোক, কিন্তু যদি তার মধ্যে শ্রদ্ধা না থাকে তাহলে তার অন্য সব সদ্গুণ অকর্মন্য হয়ে পড়ে থাকবে, সে কোনো কাজই সফলতাপূর্বক করতে পারবে না। কারণ শ্রদ্ধার অভাবে সব সদ্গুণ বলহীন হয়ে যায়। যেমন প্রদীপ হওয়া সত্ত্বেও তেলের অভাবে জ্বলতে পারে না, প্রকাশ দিতে পারে না।
শ্রদ্ধার কারণে মানুষের হৃদয়ে বল আসে আর সেই কারণে সমস্ত গুণ প্রকাশমান হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধা না থাকলে সব শক্তি কুণ্ঠিত হয়ে যায়। শ্রদ্ধা হৃদয়ের মধ্যে স্ফূর্তি, উৎসাহ উৎপন্ন করে মানুষকে কঠিন থেকে কঠিন কাজ করার জন্য তৈরী করে দেয়। ধার্মিক হোক বা সাংসারিক, সব কাজ শ্রদ্ধার দ্বারাই সফল আর সুফল হয়। যার শ্রদ্ধা দেশ বা ধর্মের উপর আছে সে সেটা রক্ষা করার জন্য হাসতে-হাসতে ফাঁসিতে পর্যন্ত চড়ে যায়। ইতিহাস তার সাক্ষী আছে যে, হাজার নয়, লক্ষ-লক্ষ ধর্ম আর দেশের শ্রদ্ধালু ভক্ত নিজের উদ্দেশ্য পূর্তির জন্য পাগলের মতো নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করে দিয়েছিল। এইজন্য প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নিজের অন্তঃকরণে শ্রদ্ধাভক্তির বিকাশ হতে দেওয়া। শুষ্ক তর্ক বা শুষ্ক বুদ্ধি দিয়ে নিজেকে তথা অন্যকে তো ভ্রমে ফেলা যেতে পারে কিন্তু শ্রদ্ধা বিনা কোনো কাজ সিদ্ধ হয় না। এইজন্য যেকোনো উত্তম কর্ম সদা শ্রদ্ধাপূর্বক উত্তমভাবে করার অভ্যাস করা উচিত। যার অন্তঃকরণে শ্রদ্ধা নেই, তার মরুভূমিতে সদ্গুণের কোনো বীজ হবে না। তাই প্রযত্নে প্রত্যেককে নিজের ভিতর, নিজের তথা সকলের কল্যাণার্থ শ্রদ্ধার বীজের বপন করা উচিত। তবেই শুভ কর্মের ফুলবাড়ি ফুলে ভরে যাবে আর সারা সংসারকে মালামাল করে দিবে।
.
🍁 শ্রদ্ধা য়োগীর জননীর সমান 🍁
মহর্ষি ব্যাস জী য়োগদর্শনের ভাষ্যতে শ্রদ্ধার বিষয়ে লিখেছেন -
শ্রদ্ধা চেতসঃ সম্প্রসাদঃ। সা হি জননীব কল্যাণী য়োগিনম্ পাতি। তস্য হি শ্রদ্দধানস্য বিবেকার্থিনো বীর্য়মুপজায়তে।।
অর্থাৎ শ্রদ্ধা চিত্তকে প্রসন্ন করে, সেই শ্রদ্ধাই কল্যাণকারী মাতার সমান য়োগীর রক্ষা করে। সেই বিবেকার্থী শ্রদ্ধালুর উৎসাহ উৎপন্ন হয়, উৎসাহ থেকে স্মৃতি আর স্মৃতি থেকে চিত্ত দুঃখরহিত হয়ে একাগ্র হয়ে ধ্যান করে। সেই সমাধিস্থিত চিত্তের মধ্যে বিবেকযুক্ত বুদ্ধি উৎপন্ন হয়, যার দ্বারা বস্তুর যথাযথ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়। সেই বিবেক জ্ঞানের অভ্যাস আর তার বারংবার অনুভব করাতে আর বৈরাগ্যের কারণে অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি হয়। এইজন্য মহর্ষি ব্যাস জী ঠিকই বলেছেন যে শ্রদ্ধা য়োগীর কল্যাণকারী মাতা বা জননীর সমান হয়। এই শ্রদ্ধা-মাতার কৃপায় য়োগী অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি পর্যন্ত পৌঁছে যায়, অর্থাৎ মাতা শ্রদ্ধা তার শ্রদ্ধালু য়োগাভ্যাসীকে পূর্ণয়োগী বানিয়ে দেয়।
.
মেখলাকে শ্রদ্ধার দুহিতা বলা হয়েছে। মেখলাকে ধারণকারী ব্রহ্মচারী দেব তথা ঋষি হওয়ার জন্য সাধনা করছে। সেই তপ থেকে এটা উৎপন্ন হয় আর প্রসিদ্ধ হয়। এটা হল ঋষিদের ভগিনী, একজন বোনের মতো যে কল্যাণের জন্য যত্নশীল। এই ঋষি তথা ব্রহ্মচারীরা দেব হওয়ার জন্য তপ করে আর "তপো দ্বন্দ্বসহনম্" তপ দ্বন্দ্বসহনকে বলে। খিদে-তৃষ্ণা, শীত-উষ্ণ আদিকে সহ্য করার পাশাপাশি নিজের ধর্মকর্মের মধ্যে নিত্যকর্মকে, য়োগাভ্যাসকে নিরন্তর শ্রদ্ধাপূর্বক করতে থাকার নাম হল তপ। এমন ধার্মিক তপস্বী ব্রহ্মচারী আর ঋষিদের এই দুহিতা তথা স্বসা হল প্রিয় আর কল্যাণকারী। অর্থাৎ ব্রহ্মচারী তথা ঋষিরা একে নিজের তপস্যার দ্বারা প্রসিদ্ধ করে। তারাই মেখলা বা কৌপিনকে ধারণ করে ব্রহ্মচর্য তথা য়োগের সাধনা করে। তপস্যা দ্বারা একে প্রসিদ্ধ করে আর মেখলার কারণে সর্বদা সচেতন থাকে, সত্য ব্রহ্মচারী হয়ে নিজের জীবনের চরমলক্ষ্য মোক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, মেখলা ধারণ করে নিজের ব্রহ্মচর্যব্রতকে পূর্ণ করে। এই দেবপদবী মেখলার কাছে ভিক্ষে চায়, প্রার্থনা করে - আমায় সুমতি দাও, মেধা বুদ্ধি দিয়ে তপস্বী করে তোলো, আমার ইন্দ্রিয় তথা ইন্দ্রিয়ের রাজা ইন্দ্র অর্থাৎ আত্মার মধ্যে বল ও শক্তির আধান করো। পরাক্রম আর বিদ্যাদি ঐশ্বর্য পেয়ে আমি যেন ব্রহ্মচারী, মেধাবী, বলবান, জিতেন্দ্র, পূর্ণবিদ্বান আর পূর্ণয়োগী হয়ে উঠি। বস্তুতঃ ব্রহ্মচর্যব্রতের প্রতীকই হল মেখলা অর্থাৎ কৌপিন বা লংগোট। এটা ধারণ করে যখন পূর্ণ ব্রহ্মচারী ঊর্ধ্বরেতা হয় তখন তার জন্য কোনো কিছুই দুর্লভ থাকে না। সুমতি আর সুমেধা পেয়ে বীর আর ধীর হয়ে যায়।
.
আচার্যপ্রবরের কাছ থেকে যারা শ্রদ্ধাপূর্বক ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়ে মেখলা ধারণ করে তথা মেখলাকে দুহিতা স্বসার সমান প্রিয় আর হিতকারী মনে করে আর নিজের ভাবনাকে সদা পবিত্র রাখে, যেরূপ পুত্রী আর বোনকে দেখে তথা তাদের নিকট থেকেও পিতা আর ভাই সর্বদা পবিত্র ভাবনা রাখে, সেইরূপ মনের মধ্যে যারা শুদ্ধ বিচার রেখে নিজের মেখলা, লংগোট বা কৌপিনকে পবিত্র রাখে অর্থাৎ মুত্রেন্দ্রিয়ের উপর পূর্ণ সংযম রাখে, পরমপিতা পরমাত্মা এমন তপস্বী ব্রহ্মচারীদের সুমেধা তথা সুমতি প্রদান করেন। তারা জিতেন্দ্র হয়ে সত্য বীরযোদ্ধা আর ধীর ক্ষত্রিয় অথবা মেধাবী ব্রহ্মবর্চস্বী ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মর্ষি, রাজর্ষি আর দেবর্ষি হয়। কারণ এই মেখলা ব্রহ্মচারীকে ঋষি আর দেব বানানোর জন্যই দেবস্বরূপ আচার্য ধারণ করিয়েছেন যা সবপ্রকারের কষ্ট আর বন্ধন থেকে ছাড়িয়ে এদের ভবসাগর থেকে পার করে নিয়ে যেতে চায়। এইজন্য মেখলার ব্রত-বন্ধনে বেঁধে ঋষিদের পথে চলাই হল তাদের উদ্দেশ্য।

🍁 ঋষিদের মেখলা 🍁
য়াম্ ত্বা পূর্বে ভূতকৃত ঋষয়ঃ পরিবেধিরে।
সা ত্বম্ পরিষ্বজস্ব মাম্ দীর্ঘায়ুত্বায় মেখলে।।
(অথর্বঃ ৬/১৩৩/৫)
(য়াম্ ত্বা) তোমাকে যে (পূর্বে) আগে (ভূতকৃতঃ) সত্যকর্মী (ঋষয়ঃ) ঋষিদের (পরিবেধিরে) চারিদিকে বেঁধে ছিল, (সা ত্বম্) তুমি সেই, (মেখলে) হে মেখলে! (দীর্ঘায়ুত্বায়) দীর্ঘ আয়ুর জন্য (মাম্) আমাকে (পরিষ্বজস্ব) আলিঙ্গন করো।
.
ব্রহ্মচারী মেখলাকে সম্বোধন করে বলছে, হে মেখলা! তোমাকে সর্বদা সত্যকর্মকারী অর্থাৎ সদাচারী ঋষিগণ নিজের কটির চারিদিকে বেঁধে আসছে। তারা তাদের শরীরে তোমাকে প্রিয় আভূষণের সমান ধারণ করে। তাদের সঙ্গে তোমার সকল সৃষ্টির ধরে সম্বন্ধ আছে। প্রথম যে ঋষি হয়েছে আর যে ঋষি এখন বর্তমানে আছে তথা যে ঋষি ভবিষ্যতে হবে, তারা সবাই তোমাকে তাদের স্বসা মনে করে আর মনে করবে তাহলে তারা কেন তোমাকে ত্যাগ করবে? ঋষি সারাজীবন ধরে পবিত্র ব্রহ্মচর্যব্রতের পালন করে, তাহলে তারা এই ব্রতের রক্ষাকারী একমাত্র প্রতীক মেখলাকে কেন পরিত্যাগ করবে? মেখলার সঙ্গে ঋষিদের গভীর অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ আছে, তারা একে সর্বদা ধারণ করে আর সর্বদা ধারণ করবে। কারণ "কৌপীনবন্তঃ খলু ভাগ্যবন্তঃ" কৌপীনধারী অর্থাৎ আসল ভাগ্যবান তো লংগোটধারীরাই হয় আর কৌপীনের আধারই হল মেখলা কারণ মেখলার মধ্যে কৌপীনকে পরা হয়। মেখলা হল ঋষিদের স্বসা, প্রকাশক, বোনের সমান তাদের প্রিয় আর মেখলার প্রিয় ভ্রাতৃগণ সত্যের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে এমন ঋষিগণই হয়। এইজন্য মেখলাকে সামনে-পিছে ডান-বাঁ সবদিক থেকে বেঁধে রেখেছে অর্থাৎ সারা শরীরকে মেখলার বন্ধনের মাধ্যমে ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা দেওয়া হয়েছে। সকল কর্মেন্দ্রিয় আর জ্ঞানেন্দ্রিয় এই মেখলার ব্রতবন্ধন দ্বারা সংযমে, অনুশাসনে থাকার পাশাপাশি ব্রহ্মচর্যের সাধনায় লেগে আছে। মন, বচন, কর্ম দিয়ে ঋষিগণ ব্রহ্মচারী হয়। বাইরে-ভিতরে, সামনে-পিছনে, ডান-বাঁ, উপর-নিচ থেকেও ব্রহ্মচর্যের বাতাবরণ বজায় থাকে। তারা জগতের সবকিছুকেই ব্রহ্মচারী হিসেবে দেখে। তারা এই ব্রহ্মচর্যব্রতকে ধারণ করে মেখলা বা লংগোটী লাগিয়ে ভূমি-মাতার সত্য লংগোটীবন্দ পুত্র হয়ে যায়। যেন তারা অথর্ববেদের ব্রহ্মচর্যসূক্তের ভাষায় বলছে -
ওষধয়ো ভূতভব্যমহোরাত্রে বনস্পতিঃ।
সম্বৎসরঃ সহর্তুভিস্তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ।।২১।।
অর্থাৎ - ঔষধি ভূতকাল, ভবিষ্যৎকাল, দিন ও রাত্রি, ঋতু সহিত সম্বৎসর, এগুলো সব ব্রহ্মচারী আর ব্রহ্মচর্য পালন করছে।
পার্থিবা দিব্যাঃ পশব আরণ্যা গ্রাম্যাশ্চ য়ে।
অপক্ষা পক্ষিণশ্চ য়ে তে জাতা ব্রহ্মচারিণঃ।।২২।।
অর্থাৎ - পৃথিবীর, দ্যুলোকের সকল মানব, পশু, যারা জংলী আর যারা গ্রামের আর বিনা পালকের প্রাণী আর যাদের পাখনা আছে, তারা সবাই ব্রহ্মচারী। ব্রহ্মচারী নিজের ব্রহ্মচর্যপালনের আবেগে এতো মগ্ন হয়ে গেছে যে সে সংসারের প্রাণী-অপ্রাণী, জড়-চেতন সবকিছুর মধ্যে ব্রহ্মচারীই দেখে। সংসারে এমন নিয়ম আছে যে, চোর সবাইকে চোর হিসেবেই দেখে, সৎ ব্যক্তি সব সৎ দেখে, এইরূপ ব্রহ্মচারী সব কিছুর মধ্যে ব্রহ্মচারীই দেখে। সে আবেগে বলছে - হে মেখলা! আদিকাল থেকে ঋষিগণ তোমাকে নিজের কটিতে বেঁধে আসছে। জন্ম থেকে কেউ ঋষি হয় না, শুরুতে তো তারাও আমার সমান মেখলা ধারণ করে ব্রহ্মচারী হয়েছিল, তারপর সৎকর্ম করে সৎকর্মী ঋষি হয়েছে। সুতরাং আমিও ঋষি হবো। মেখলাকে নিজের প্রিয় বোন স্বসা বানাবো, তাহলে আমার ভগিনী মেখলা আমাকে কেন ছাড়বে। আমি এই বোনের অটুট সম্পর্ক, সত্য স্নেহকে ভুলে কেন মেখলাকে ত্যাগ করবো? আমার প্রাণ থাকতে এটা আমার কটিতে সব সময় বাঁধা থাকবে। দীর্ঘায়ু পর্যন্ত, পূর্ণ আয়ু পর্যন্ত, পুরো চারশো বছরের আয়ু পর্যন্ত আমার কটিকে এটা চারিদিক থেকে সাজিয়ে থাকবে। না আমি একে ছাড়বো আর না এটা আমাকে ছেড়ে আলাদা হবে। ভাই-বোন দুইজনে পরস্পর একে অপরের সহায়তার্থ সঙ্গে থাকবো। যদি আমি একে ছাড়ার নির্বলতা দেখাই, তাহলে এই আমাকে শিক্ষা দিয়ে তিরস্কার করবে যে তুমি তো ঋষি হতে চেয়েছিলে, আজ নিজের স্বসা তগড়ী মেখলাকে ছেড়ে দিয়ে বণিকের কন্যার সমান নির্বল হয়ে যাচ্ছো কেন? তগড়ী ধারণ করে তগড়ে হও, দৃঢ় হও, দৃঢ় সংকল্পকারী হও, ঋষি হও, দেব হও, চারশো বছরের দীর্ঘায়ু ভোগকারী পূর্ণ য়োগী, পূর্ণ ব্রহ্মচারী, পূর্ণ বিদ্বান জিতেন্দ্র হয়ে রাজর্ষি হও, ব্রহ্মর্ষি হও অথবা দেবর্ষি হও। ঋষিদের সন্তান হয়ে ঋষির থেকে ন্যুন থাকলে ঋষিদের স্বসা মেখলা আমাকে বেঁধে নিয়ে যাবে। সাবধান আমি তোমার কোমর বেঁধেছিলাম, তোমাকে কটিবদ্ধ করে ছিলাম, সচেতন করেছিলাম। ভয় পেয়ো না, আমি যে শ্রদ্ধার দুহিতা, এখনই তোমার হৃদয়ে উৎসাহ ভরে দিচ্ছি। তোমাকে ঋষি বানিয়ে তবেই ছাড়বো। আমাকে শ্রদ্ধাপূর্বক ধারণকারী কখনও ঋষিদের পংক্তি থেকে কেন বাইরে চলে যাবে?
.
এই প্রকারের উচ্চশিক্ষা আর ভাবনা মেখলাধারীর মধ্যে থাকা উচিত, তবেই সে ঋষি হয়ে জীবনকে সফল আর সুফল বানিয়ে দীর্ঘায়ু (চারশো বছরের আয়ু) ভোগ করে নিজের তথা সংসারের উপকার করতে সক্ষম হবে। এইভাবে লক্ষ-লক্ষ ঋষি-মহর্ষি পরমাত্মার এই পবিত্র সৃষ্টিতে হয়েছিল। একথার জন্য ইতিহাস সাক্ষী আছে।
.
🍁 অষ্টআশি সহস্র ঋষি 🍁
অষ্টাশীতিসহস্রাণ্যূর্ধ্বরেতসামৃষীণাম্ বভূবুস্তত্র - অগস্ত্যাষ্টমৈর্ঋষিভিঃ প্রজনোऽভ্যুপগতঃ। তত্রভবতাম্ য়দপত্যম্ তানি গোত্রাণি, অতোऽন্যে গোত্রাবয়বাঃ।
(মহাভাষ্য ৪/১/৭৯)
ব্রহ্মা থেকে জৈমিনি পর্যন্ত অর্থাৎ আদি সৃষ্টি থেকে শুরু করে মহাভারত পর্যন্ত ৮৮ সহস্র ঊর্ধ্বরেতা অখণ্ড ব্রহ্মচারী ঋষি-মহর্ষি (রাজর্ষি আর দেবর্ষি) হয়েছেন। এরা সবাই নির্দোষ, নিষ্পাপ, নিষ্কামসেবী, দেবতুল্য আপ্ত পুরুষ ছিলেন। সারাজীবন ধরে ব্রহ্মচর্যরূপী তপস্যার আভূষণেই বিভূষিত ছিলেন। এই তাপস, তেজস্বী বিদ্বান দেবতাগণ বেদের পবিত্র জ্ঞানের প্রচার করতেন। এই মহাত্মাদের কৃপায় আর্যাবর্ত দেশ সারা সংসারের গুরু ছিল আর মহাভারত পর্যন্ত সারা ভূখণ্ডে এর একচ্ছত্র চক্রবর্তী রাজ্য ছিল।
.
উপরোক্ত ৮৮ সহস্র ঋষিদের মধ্যে কেবল অগস্ত্যাদি আট ঋষি প্রজা (সন্তান) উৎপন্ন করেন অর্থাৎ কেবল আটজন ঋষি বিবাহ করে গৃহস্থী হন। এইজন্য কেবল এই আট ঋষি গোত্রপ্রবর্ত্তক হন অর্থাৎ এদের সন্তান থেকেই আট গোত্র চালু হয়। প্রথমে শুরুতে এদের নামেই আট গোত্র ছিল, পশ্চাৎ অনেক উপগোত্র এদের সন্তান বা শিষ্যদের থেকে চলে। গৃহস্থ হওয়া সত্ত্বেও এই ঋষি-মহর্ষিগণ বড় সংযমী বা ব্রহ্মচর্য সহিত বাস করতেন, কেবল সন্তানোৎপত্তির জন্য বীর্যদান করতেন।
.
মহাভারত কালকে পতনের কাল মানা হয় কিন্তু সেই সময়ও গৃহস্থ থাকা য়োগীরাজ শ্রীকৃষ্ণের মতো মহাত্মা ছিলেন যিনি বিবাহ করার পশ্চাৎও পতি-পত্নী ১২ বছর পর্যন্ত ব্রহ্মচারী ছিলেন। এইজন্য মহর্ষি দয়ানন্দ তাঁর প্রশংসা করে লিখেছেন - "দেখুন! মহাভারতের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র অতি উত্তম আছে। তাঁর গুণ-কর্ম-স্বভাব আর চরিত্র আপ্ত পুরুষের সদৃশ লেখা আছে। তারমধ্যে কোনো অধর্মের আচরণ শ্রীকৃষ্ণ জী জন্ম থেকে মরণ পর্যন্ত কোনো মন্দ কাজ করেছেন, এমন লেখা নেই।"
.
এটা ঠিক যে মহাভারত থেকে এক সহস্র বছর পূর্বে দেশ পতনের দিকে চলে গিয়েছিল, তা স্বত্ত্বেও মহাভারতের সময় পর্যন্ত মহর্ষি ব্যাস, জৈমিনি আদি অনেক ঋষি-মহর্ষি বিদ্যমান ছিলেন, তাঁদের প্রভাবে ব্রহ্মচর্যপূর্বক পঠন-পাঠনের প্রণালী চলছিল। এইজন্য সেই সময় পর্যন্ত ১০০ বছরের আয়ু পর্যন্ত তো প্রায় সবাই জীবিত থাকতো তথা যুব আর বলবান যোদ্ধা হতো। মহর্ষি ব্যাসের আয়ু তিনশো বছরের বেশি ছিল। রাজর্ষি ব্রহ্মচারী ভীষ্মপিতামহ ১৭৬ বছরের আয়ুতে কৌরব দলের ১১ অক্ষৌহিণী সেনার মহাসেনাপতি ছিলেন। এই আয়ুতে তিনি একা নয়দিন পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ করেন। লক্ষ-লক্ষ যোদ্ধাকে মৃত্যুর কোলে পাঠিয়ে দেন। নিজের ইচ্ছানুসারে শরীর ত্যাগ করেন, মৃত্যুঞ্জয় নামে পরিচিত হন। এইসব কেবল মেখলাব্রত ব্রহ্মচর্যেরই প্রতাপ ছিল। সেই সময় ব্রহ্মচর্য পালনের কারণে অর্জুন, ভীম, নকুল, সহদেব আদি সবার আয়ু ১০০ বছরের ঊর্ধ্বে ছিল আর তাঁরা এই আয়ুতেও যুদ্ধ করছিল। ভারী আশ্চর্যের কথা হল সেই সময় চার প্রজন্ম এই যুদ্ধতে অংশগ্রহণ করেছিল আর তারা সবাই যুবক ছিল তথা বড়-বড় মহারথী ছিল।
.
যেমন মহারাজ শান্তনুর আপনভাই বাহ্লিক যুদ্ধের মধ্যে লড়াই করেন, তিনি ভীষ্ম পিতামহের কাকা ছিলেন। বাহ্লিকের পুত্র সোমদত্ত যুদ্ধে রত ছিলেন। সোমদত্তের পুত্র মহারথী ভূরিশ্রবা সেই সময়ের প্রসিদ্ধ যোদ্ধা ছিলেন। ভূরিশ্রবার পুত্রও যুদ্ধের মধ্যে লড়াই করেন। সেই সময় শত বর্ষ পর্যন্ত যুবক থাকার পাশাপাশি জীবিত থাকা আর যুদ্ধে ভাগ নেওয়া সাধারণ বিষয় ছিল।
.
সকল ঋষি-মহর্ষি এই মেখলা স্বসার পবিত্র ব্রহ্মচর্যব্রতের কারণে দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত করেছিলেন। ব্রহ্মচারী এটাই প্রতিজ্ঞা করতো যে আমার পূর্বজ ঋষিগণ মেখলাকে নিজের কল্যাণকারিণী হিতৈষিণী ভগিনী মেনে ধারণ করে আসছে, শরীরের চারিদিকে সস্নেহে বেঁধে আসছে। আমিও তাদের অনুকরণ করবো, দীর্ঘায়ু প্রাপ্তির জন্য ব্রহ্মচর্য ধারণ করবো, ব্রহ্মচর্য সাধনার্থ মেখলাকে শরীরের সঙ্গে খুব স্নেহপূর্বক সংযুক্ত করে রাখবো, বেঁধে রাখবো, কারণ এটাই আমার ব্রহ্মচর্য সাধনাকে সফল করে আমাকে দীর্ঘায়ু প্রদান করবে, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। মেখলার প্রতি আমার গভীর বিশ্বাস আছে, কারণ এটা স্বয়ং শ্রদ্ধার দুহিতা, সংসারের সম্পূর্ণ শক্তিকে দোহন করে এটা আমার ভিতরে ভরে দিবে। একে ধারণ করে আমি আসল ব্রহ্মচারী, সফল ব্রহ্মচারী, ঊর্ধ্বরেতা ব্রহ্মচারী হয়ে উঠবো। ব্রহ্মচর্যই হল জীবন, এর অপার আনন্দ আমি স্বয়ং অনুভব করে দেখেছি। তাহলে এই মেখলা, নিজের প্রিয় ভগিনী থেকে পৃথক কেন হবো, একে ধারণ করলে তবেই আমার কল্যাণ হবে। এটা আমার ভিতরে দৃঢ় বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা উৎপন্ন করে দিয়েছে। মানুষ অখণ্ডিত ব্রহ্মচর্যের পালন করে ঋষিদের সমান ৪০০ বছর পর্যন্ত আয়ু প্রাপ্ত করতে পারে আর যে মেখলাধারী ব্রহ্মচারী এই ব্রহ্মচর্যের লোপ বা নাশ করে না, তারাই সবপ্রকারের রোগরহিত হয়ে ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষকে প্রাপ্ত করে।
.
মহর্ষি দয়ানন্দ জী সাধারণ মানুষের জন্য উপদেশ করেছেন - "যারা নিজের কুলের শ্রেষ্ঠত্ব, উত্তম সন্তান, দীর্ঘায়ু, সুশীল, বুদ্ধি, বল, পরাক্রমযুক্ত বিদ্বান আর শ্রীমান করতে ইচ্ছুক, তারা ষোলো বছরের পূর্বে কন্যা আর পঁচিশ বছরের পূর্বে পুত্রের বিবাহ কখনও দিবে না। এই সবই উন্নতির উন্নতি আর সব সৌভাগ্যের সৌভাগ্যকারী কর্ম হল যে এই অবস্থায় ব্রহ্মচর্য থেকে নিজের সন্তানকে বিদ্যা আর সুশিক্ষা গ্রহণ করাবে যাতে উত্তম সন্তান হয়।"
.
ব্রহ্মচর্যের প্রতাপে মহর্ষি দয়ানন্দ এই যুগে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। মহর্ষি দয়ানন্দ আসার পূর্বে তো সারাবিশ্বে গভীর অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মচর্যের নামও সারা বিশ্বের মানুষের কাছে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বাল্যবিবাহ, বৃদ্ধবিবাহ আদি অনর্থ দিয়ে সমাজ ভরে গিয়েছিল। ভারতে ইউরোপের দূষিত অনার্ষশিক্ষা প্রণালীর কারণে ছল, চুরি, মদ্য, মাংস, হত্যা, ব্যভিচার আদি সব পাপের খুব ভরমার হয়ে গিয়েছিল। এইসব রোগের একমাত্র চিকিৎসা অমোঘৌষধ মহর্ষি দয়ানন্দ জী আর্ষশিক্ষা বেদশিক্ষা প্রণালী বলেন। এর পুনঃ প্রচার মহর্ষি বেদব্যাসের পর ৫ সহস্র বছর পশ্চাৎ আচার্যপ্রবর দেব দয়ানন্দ করেন। শিক্ষা সূত্র মেখলার পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন। এই বৈদিক সংস্কৃতির প্রতীক মেখলাদির গুরুত্ব পুনরায় ঋষিদের সন্তানদের জানিয়ে দেন। বস্তুতঃ কেউ মানুক অথবা না মানুক, বর্তমান যুগে মহর্ষি দয়ানন্দ জী একমাত্র বেদপ্রাণ পুরুষ আর আর্ষজ্ঞানের অদ্বিতীয় প্রচারক হন। আর্ষজ্ঞানের বিস্তার আর প্রচারের মাধ্যমে মানব সমাজে সুখ আর শান্তির সূর্য উদয় হবে। আর্ষ শিক্ষার কেন্দ্র হল কেবল গুরুকুল। এইজন্য সংসারকল্যাণার্থ আর সুখ শান্তি প্রাপ্তির জন্য বালক বালিকাকে কেবল গুরুকুলেই শিক্ষা দিবেন। স্কুল কলেজ হল রাবণের লঙ্কা, এইসব থেকে দূরে থাকবেন।
.
আমাদের সবার উপর মহর্ষি দয়ানন্দ জীর এত ঋণ আছে যে সেটা লিখে জানানো সম্ভব নয় আর বলে ব্যাখান করা সম্ভব নয়। যতগুলো লোম আমার শরীরে আছে, যদি আমি ততবার জন্ম নিয়ে সারাজীবন ব্রহ্মচর্যের পালন করার সঙ্গে-সঙ্গে বেদ ধর্ম আর আর্ষশিক্ষার প্রচার করি তাহলেও সেই দেবর্ষি দয়ানন্দের উপকার বা ঋণ থেকে অনৃণ হতে পারবো না। ঋষিবর তাঁর জীবনে ১৬ বার বিষ পান করেও আমাদের ব্রহ্মচর্যামৃতের পান করিয়েছেন। শিখা, সূত্র আর মেখলা পরিয়ে পুনরায় ব্রহ্মচর্যের লুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রণালীর উদ্ধার করেছেন। এক সত্যিকারের আচার্যের কর্তব্য পালন করেছেন। আর্যজাতিকে মৃত্যুশয্যা থেকে তুলে পুনরায় জীবনামৃতের পান করিয়ে দেন। মুন্সীরামকে পতিত থেকে মহাত্মা আর নাস্তিক গুরুদত্তকে মুনিবরের পদবী পর্যন্ত পৌঁছে দেন। স্বয়ং ব্রহ্মচর্যের তপ দ্বারা পরমপদকে প্রাপ্ত করে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে যান।
.
দেশের বালক আর যুবকদের ঋষিবরের পদচিহ্নের উপর চলা উচিত। বীর্যরক্ষার্থ মেখলা ধারণ করে সত্যিকারের ব্রহ্মচারী হওয়া উচিত, সত্যিকারের মানুষ হয়ে দেবতা হওয়ার চেষ্টা করা উচিত, এতেই সবার হিত আর কল্যাণ হবে।
(সমাপ্ত)

প্রস্তুতকরণে- আশীষ আর্য

No comments:

Post a Comment

ধন্যবাদ

বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

সূর্য কি স্থির না গতিশীল?

  সূর্য ও পৃথিবী সম্পর্কে জানুন ... সূর্যের অবস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫,০০০ - ২৮,০০০ আলোকবর্ষ দূরে, এবং এটি অবিরত ছায...

Post Top Ad

ধন্যবাদ